সাংগ্রেং উৎসবের ৩ দিনব্যাপী সমাপনী অনুষ্ঠানের শুরুতেই জলের ছোঁয়ায় মাতোয়ারা হলো কক্সবাজারের আদিবাসি রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা সকলেই পুরাতন বছরের পাপ, ব্যর্থতা ও সকল অসংগতি পানির শুভ্রতায় মুছে দিলেন। একে অপরকে পানি দিয়ে ধুয়ে মুছে শুদ্ধ হলেন নতুন বছরের শুরুতেই। রাখাইন বর্ষ ১৩৭২ সন বণার্ঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বরণ করতে রাখাইনদের এই আয়োজন। ৭ দিনের সাংগ্রেং পোওয়ে’র ৩ দিনের সমাপনী উৎসব গতকাল শনিবার থেকে শুরু হয়েছে। রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহি এই সাংগ্রেং পোওয়েকে ঘীরে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসব আমেজ। এই উপলক্ষ্যে রাখাইন পল্লীতে চলছে নানা অনুষ্ঠান।
সাধারণ লোকজনের কাছে পানি খেলা বা জলকেলি বলে পরিচিত এই উৎসব। কক্সবাজার শহরের রাখাইন পল্লীতে তৈরী ৯ টি প্যান্ডেলে চলছে এই পানি খেলা। এছাড়া জেলার টেকনাফ, মহেশখালী, উখিয়াসহ অন্যান্য উপজেলায় এই উৎসব শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুুর থেকে শহরের প্যান্ডেলকে কেন্দ্র করে রাখাইনদের মেতে উঠতে দেখা যায়।
এলাকা ভিত্তিক রাখাইন নারী-পুরুষ তাদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক পড়ে সারিবদ্ধভাবে নানারকম বাদ্যযন্ত্র ও নাচে গানে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব প্যান্ডেলে পানির পত্র নিয়ে সারি বদ্ধ ছিল রাখাইন তরুনীরা। শোভযাত্রা সহকারে প্যান্ডেলে আসা তরুণ তার পছন্দের তরুণীকে পানি নিক্ষেপ করে প্রথমে আমন্ত্রণ জানাই। উত্তরে তরুণীও তাকে পানিতে পানিতে মাতিয়ে রাখে। তরুণ তরুণীদের প্যান্ডেল কেন্দ্রিক এই পানি ছুঁড়া ছুঁড়িতে বয়স্করাও মেতেছে আনন্দে। শিশু কিশোর বয়সের রাখাইনদের প্যান্ডেলের আশে পাশে পানি নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে। শোভযাত্রা এক প্যান্ডেল থেকে অন্য প্যান্ডেলে ঘুরেছে দিনভর। চলে একই রকমের মাতোয়ারা উৎসব।
রাখাইন তরুণ কক্সবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী উরি জানান, সাংগ্রেং পোওয়ে’র ৩ দিনের সমাপনী উৎসবকে তাদের ভাষায় বলা হয় “মাহা সাংগ্রেং পোওয়ে”। সকালে এলাকা ভিত্তিক শোভযাত্রা বৌদ্ধ কিয়াং এ যায়। এক ঘন্টা বাদক বিশেষ ঘন্টা বাজিয়ে কিয়াং সহ প্যান্ডেল পরিদর্শনের নিদের্শনা দেন। এই শোভযাত্রায় তরুণরা মাটির তৈরী কলসী ও পেছনে বয়স্ক নারী-পুরুষ ‘কল্প তরু’ বহন করেছেন। কিয়াং থেকে শোভযাত্রাটি প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ায় আর পানি নিক্ষেপ খেলায় মেতে উঠেন তারা।
প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো এসব তরুণদের নাচে গানে আনন্দের পাশাপাশি তাদের ঐতিহ্যবাহী পানীয় (মদ) পান করতে দেখা যায়। মং রে চ্যং নামের এক তরুণ জানান, তাদের সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে আনন্দকে পুরোদমে উপভোগের জন্য এই পানীয় পান করা।
কক্সবাজার শহর সহ জেলাব্যাপী রাখাইন পল্লী গুলোতে চলছে এই উৎসব। গতকাল শনিবার বিকাল সাড়ে ৩ টায় শহরের বৌদ্ধ কিয়াং সংলগ্ন স্থাপিত মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩ দিনের পানি খেলার উদ্বোধন করেন কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপি অধ্যাপিকা এথিন রাখাইন। উদ্বোধনী বক্তব্যে এমপি এথিন রাখাইন বলেন, রাখাইনদের বৃহত্তম সামাজিক উৎসব এটা। ক্রমাগত এই উৎসব এখন সকল ধর্মের মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এই উৎসবের দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি সুন্দর ও সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান তিনি। এসময় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন আহমদ, রাখাইনদের নেতা অধ্যক্ষ ক্য থিং অং। এই মঞ্চটি দিনব্যাপী চলে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী সংগীত। উৎসবের অন্যতম জনপ্রিয় “পেং পাদা উশে পোওয়াংরে লা / সাংগ্রেং ক্যালোর মংরো প্যরে” (যার অর্থ হলো-রাঙ্গা পুস্প শোভিত এ মাসে, আত্মহারা হই সাংগ্রেংর আনন্দে) গান দিয়ে এই অনুষ্ঠানের শুরু হয়।
রাখাইন তরুনী এ ছে ন্ নু জানান, নববর্ষের বরণ করতে গিয়ে তাদের উৎসব আনন্দ দায়ক। অতীতের ভেদাভেদ ভুলে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তারা একে অপরের সাথে মেতে উঠেন। পুরো উৎসব তাদের কাছে উপভোগে।
জানা যায়, রাখাইন স¤প্রদায়ের বর্ষ পঞ্জিকা অনুসারে গত শুক্রবার ১৩৭১ মগীসন শেষ হয়েছে। গতকাল শনিবার থেকে শুরু হলো রাখাইনদের নববর্ষ ১৩৭২ সন। প্রতিবছর এই নববর্ষ উপলক্ষ্যে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের সামাজিক নিয়ম মতে আয়োজন করে পুরনো বছরের বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ অনুষ্ঠান। রাখাইনদের ভাষায় বলা হয় “সাংগ্রেং পোওয়ে’ বা বর্ষবরণ উৎসব শুরু হয়েছে ১৩ এপ্রিল থেকে। প্রথম দিন ১৩ এপ্রিল মঙ্গলবার পালিত হয় ‘ফারা রিসো পোওয়ে’ বা বুদ্ধের স্নান উৎসব। ওই দিন রাখাইন শিক্ষার্থীরা বুদ্ধ মুর্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্নান করান। পুরোহিত, দায়ক ও শিষ্যদের সহযোগিতায় সুগন্ধ দ্রব্য ও চন্দনের পানি, নানা রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে ধর্মীয় নানা আচারণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই মুর্তি ধুয়ে দেয়া হয়। উৎসবের ২য় দিন ১৪ এপ্রিল বুধবার পালিত হয়েঠে ‘রছা ফরা রিসো পোওয়ে’ বা বাড়ির বুদ্ধের স্নান উৎসব। উৎসবের ৩য় ও ৪র্থ দিন ১৫ ও ১৬ এপ্রিল ২ দিনব্যাপী চলছে শিশু-কিশোরদের ‘সাংগ্রেং পোওয়ে’। রাখাইন স¤প্রদায়ের শিশু-কিশোররা একে অপরকে পানি ছিটিয়ে এ উৎসব পালন করেছে।
গতকাল শনিবার থেকে শুরু হলো “মাহা সাংগ্রেং পোওয়ে” বা পানি খেলা। ৩ দিনব্যাপী চলবে এই উৎসব। অন্যান্য অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এ উৎসবে তাদের ঐতিহ্যবাহি ও প্রিয় খাবার নিয়ে এলাকা ও বন্ধুদের নিয়ে বনভোজনও চলবে বলে জানান রাখাইন নারী অরিং মং (৩৮)। তিনি জানান, অনুষ্ঠানের এই ৩ দিন পঞ্চশীল ও অষ্টশীল পালন করা হয়। এটা পালনের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান দিক হচ্ছে ধর্মীয় আচারাদি পালন, আনন্দ উপভোগ, রাখাইন সংস্কৃতি ধারায় সৃষ্ট কৃষ্টিকে লালন করা।
যদিও স্থানীয়দের মধ্যে এই পানি খেলাকে কেন্দ্র করে রাখাইন তরুণ তরুণীদের মধ্যে পছন্দ, প্রেম বিনিময় ও বিয়ের মাধ্যম বলে ধারণা রযেছে। প্যান্ডেল কেন্দ্রিক পানি নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অবিবাহিত তরুণ তরুণী অংশগ্রহণ করায় এই ধারণা জন্ম নেয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ১২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



