আকাশের মধ্য রেখায় সূর্যের কিলবিল রশ্মি ছেয়ে গেছে। রোদ্দুরে শরীর দাউ দাউ করে জ্বলে গিয়ে ঘামের কুয়াশা ফোঁটা ফোঁটা করে নেমে যাচ্ছে মাথা থেকে পা পর্যনত্ম। মগজের ভেতর বুদ বুদ করে শব্দ গড়ে তুলছে নিরনত্মর। এই রোদ্দুরে এক আবেগময় আক্রোশে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের আপন। বাতাসে দুলে দুলে কখনো কপালে কখনো শূন্যতায় খেলা করে আপনের চুল। আক্রোশে তীব্র হয়, সামনে পা চলে দ্রম্নত। যেভাবে হোক যেখান থেকে হোক একটা বোমা যোগাড় করবে আমাদের আপন। এই সময়টা আজ অসময় বলে একটা বোমা তার প্রয়োজন হয়ে উঠে খুব বেশী। এই একটি বোমাই তার মান-সম্মান, বাঁচিয়ে মেটাতে পারে নিজস্ব চাহিদা ও তারদাবী। পরিবারের কাছে সে যেন একটি তুচ্ছ বস'; তুচ্ছ সুলভ অবমূল্যায়নের হাত থেকে সে মুক্তি চায়। বোমাই কেবল মুক্তি এনে দিতে পারে। অতঃপর বোমার সন্ধানে পথে নেমে এগিয়ে যাচ্ছে আপন। বোমার বাজারে বোমার খোঁজে।
আমাদের দেশ খুব সুন্দর, ভয়াবহ শৃঙ্খলিত। সমপ্রতি এখানে বোমার বাজার নিদারুন হ্রাস পেয়েছে। নাম মাত্র মুল্যে বিক্রয় হচ্ছে বোমা, খোলা বাজারে। এই ক্রয়, এই বিক্রয়ে আপন কোনরূপে অব্যবস'ার খবর শুনেনি, জানেনি।
স্বাভাবিক এই নিয়মটা, কখনো অদ্ভুদ বলে মনে হয়নি। আশংকাখিত বলে মনে হয়নি আপনের। আপন দেখতে পেয়েছে এখানে চালের দাম বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে, মরিচ, পেঁয়াজ, তেল সহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের। দাম কমে যাচ্ছে ফ্রিজ, এ.সি, মদ সহ বিলাসিতার পণ্য সমূহের। আমাদের রাষ্ট্রীয় অভিভাবকরা খুব সহজেই মুখস' করেছে সরল গাণিতিক পাঠ। গরীবদের শাসিয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়ার মূলমন্ত্র খুব ভালো রপ্ত করেছে তারা। গরীব মেরে দেশ গরীব শূন্য করতে পারলে দেশের শতকরা শতভাগ মানুষ ধনী হবে। এতে বিশ্বেরবুকে ধনী রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের গর্ব হবে। গর্বে গৌরবময় হবো আমরা। এই সুন্দর আলোড়নকারী সূত্র আবিস্কার করার জন্য আমাদের অর্থমন্ত্রীকে পুরস্কারে কেউ ভূষিত না করলেও আমাদের আপন মনে মনে অভিনন্দন জানায়। আপন নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে বর্তমান বাজারে বোমা সহজ উপায়ে কম মূল্যেই সে পাবে। অবস'া দেখে তার কখনো মনে হয়নি বোমা ক্রয় অন্যায় কিংবা কোন অপরাধ। এমন কোন স'ান আছে যেখানে বোমা ফাটেনি? কিন' আমরা কেউ জানিনা এই বোমা কারা ফাটায়, কেন ফাটায়। আমাদের দেশ জুড়ে র্যাব, চিতা, কোবরার আর্বিভাব শোডাউন হওয়ার পরও বোমা হামলাকারী চিনত্মাহীন দায়িত্ব পালন করে অত্যনত্ম দায়িত্ব বোধ নিয়ে। নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে ও দায়িত্ব শেষে তারা ফিরে যায় নিজ গনত্মব্যে নিরাপদে। এতে বিস্ময় লাগে না কখনো। বরং মনে হয় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে অপরাধ বিহীন এক গনত্মব্যের দিকে। এখানে তদনেত্মর নামে ক্রমাগত বাড়তে থাকে তদনত্মকমিটি। এদেশে ১৬ কোটি মানুষ খুব সম্ভত ১৮ কোটি তদনত্ম কমিটি গঠনের সংবাদ শুনেছে, আর লক্ষ্য করেছে তদনত্মকারীরা কখনো গলফ মাঠে, কখনো ক্রিকেট মাঠে তদনত্ম করে রহস্য আবিস্কারের জন্য। তা যদি না হয় তবে তদনেত্মর পর আমরা কেন জানতে পারি না তদনেত্মর রহস্য। তদনত্মকারীদের অবস'াটা অনেকটা দাবা খেলায় রাজাকে বাঁচানোর কৌশল সৃষ্টির মতো। ফলে যা হবার তাই হয় “আই ওয়াশ”। আমরা ভুলে যাই বোমা, হত্যা, খুন। এটাই জীবনের পক্ষে, সৃষ্টির পক্ষে রঙ বদলানোর মতো। একে একে শেষ হয় প্রতিপক্ষের হাতে বিপরীত কিছু মানুষ, আমাদের প্রিয়জন।
এখানে বাঙ্গালীর সংস্কৃতি প্রিয় মানুষের উপর বোমা ফাটিয়ে অনেক রক্ত ও প্রাণকে শেষ করে দেয়া হল উদীচি ও ছায়ানটের অনুষ্ঠানে। হত দরিদ্র মেহনতি মানুষকে শেষ করতে বোমা ফাটিয়েছে পল্টনের লাল পতাকার সমাবেশে। বোমায় মরে ধর্মপ্রিয় মানুষ-মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মাজার, ওরোশ শরীফে। বোমা ফাটে সিনেমা হলে, এন. জিও অফিসে। বুকে সৎ, সত্যকে ধারণ করে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করার অপরাধে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হলো মানিক সাহা, দীপ আজাদ, কাজী আরেফ, ডাঃ ইউনুছ, হুমায়ূন আজাদ, শামসুর রহমান, হারুনুর রশিদ খোকন, শেখ বেলাল সহ আরো অনেক প্রিয় মানুষকে। আমরা কিছুই করতে পারিনি। কিছুই করতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা(বোমা হামলার ঘটনা আওয়ামীলীগ সরকার আমলেও হয়েছে, এখন যদিও ভয়াবহ)। আর পারেনি বলেই ২১ আগষ্টে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আই.ভি রহমানের রক্তের সাথে আরো বহুজনের রক্ত মিশে একাকার হলো। পারেনি বলেই সফল ব্যক্তিত্ব পুরুষ কিবরিয়াকে হারাতে হলো অত্যনত্ম লজ্জায়তন হয়ে। আমরা লজ্জা পেয়েছি বিস্মিত হয়ে উঠিনি। জানি, আরো ভয়াবহ লজ্জাজনক ঘটনা আমাদের দেখতে হবে এই প্রজন্মের তরুন বলে। আমাদের মতো কখনো বিস্মিত হয়না আপন ভালোবাসার দিনে ভালোবাসার মানুষের উপর বোমা ফাটানো কিংবা দশট্রাক মরণাস্ত্রের উদ্ভব দেখে (যে অস্ত্র খুব সম্ভবত ইতোমধ্যেই গুদাম থেকে হাওয়া হয়ে গেছে।
এই ভাবে মানুষ মরে। কখনো মরে বোমা হামলায় আততয়ী ঘাতকের হাতে; আবার কখনো জলে লঞ্চ ডুবে। আমরা কিছুই করতে পারি না। কি করতে পারি? আল্লাহর এই মহান বিশ্বে যা কিছু ঘটে সব কিছুই আল্লাহর হুকুমে। এখানে কার ও কিছু করার থাকেনা। আল্লাহ মাল আল্লাহ নিয়ে যাবে।যেভাবে হোক যেখান থেকে হোক, এতে বান্দাদের করার কিছু থাকেনা। এটা আমরা বুঝতে না পারলেও আমাদের মন্ত্রীরা ভালোই বুঝেন। এইও বুঝেন আমাদের বাংলাভাই আল্লাহর বান্দা তাকে সন্ত্রাসী বলা যাবে না। কেউ যদি বলেন কবিরা গুনাহ হবে। ফলে পুলিশ ভাই (সেও আল্লাহরবান্দা) তার পক্ষেই সাফাই গেয়ে চলে। দেশ জুড়ে জঙ্গি তৎপরতা, সন্ত্রাসীদের মহাউৎসবের খবরা-খবর যখন সবাই জানি ঠিক তখনি আমাদের প্রিয় আল্লামা মুজাহিদ(রাজাকারও বলা যাবে) খুব সহজেই লজ্জাহীন ভাবে বলেন,“ দেশে কোথাও সন্ত্রাস নেই” (বাহ চমৎকার মারহাবা মুজাহিদ)। এতে কোনদিন আপন বিস্মিত হয়না। বিস্মিত হয় না, আমাদের রাষ্ট্রীয় জ্যোতিষীদের বাণী শুনে। বোমা ফাটলেই সরকারী দলীয় জ্যোতিষীদের বলেন-আওয়ামীলীগের লোক এই বোমা ফাটিয়েছে। আওয়ামীলীগরাও কম নয়, তাদের জ্যোতিষীরাও বলেন- সরকারী দল এই বোমা ফাটিয়েছে। এতে বিস্মিত হওয়ার অবকাশ থাকে না। এটা রাজপুত্র তারেকের ক্রিকেট ম্যাচের মতো। হাওয়া ভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে হাওয়া ভবনের মাঠে দু’ভাইয়ের প্রীতিম্যাচ এইটা। ফলে বিস্মিত আমরা হইনি বোমার শব্দের সাথে সাথে বিশাল মিছিলের বাহার দেখে। রাজপথে “মুজিব হত্যার হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার” শ্লোগান শুনে। অতএব, আপন যে একটা বোমা ফাটাবে এতেও বিস্মিত হবো না। নিজ স্বার্থে -এই-বোমা। আপন নিরাপদে কাজ শেষ করবে এটাই তার বিশ্বাস। আপাতত ক্রসফায়ারের ভয় তার কাছে নেই। সে জানে ক্রসফায়ারের অর্থ যে সব সন্ত্রাসীদের বাবা থাকে তাদের রক্ষার অভিনব কৌশল। আপনের সে রকম কোন বাবা নেই। ক্রসফায়ার থেকে সে মুক্ত। যদিও ইদানিং সাংবাদিকদের ক্রসফায়ারের আওতায় আনতে দাবী করেছে জোট মহল। আপন সাংবাদিকও নয়। ক্রসফায়ার নাটক তাকে নিয়ে হওয়ার সম্ভাবনাও নেয়।
অসংখ্য চিনত্মার মগ্নতায় আপনের যেখানে পৌঁছে ধ্যান ভেঙ্গে গেছে। ওটা নির্জন নিরব একটা এলাকা। কোথাও শব্দ নেই, নেই মানুষের চিহ্ন। আপন এবার নিজেকে প্রশ্ন করে এটা কি বিশ্বের কোন স'ান। নাকি কোন গ্রহ-উপগ্রহ? সন্দেহ তবু সামনে এগিয়ে যায় আপন। কিছু দূর যেতে না যেতেই সে দেখতে পায় তার দিকে শূণ্য থেকে উড়ে আসছে কুৎসিত, বিবস্ত্র একটি মানুষ। আপন ভয় পায় দাঁড়িয়ে চোখ সি'র করে তার দিকে। মানুষ তার মূখো-মুখি দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়ে বলে-কি চাও বালক? এখানে কিভাবে এলে?
আপন দেখতে পায়, মানুষটির চোখের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। থর থর করে কাঁপতে থাকে আপন ভয় ও বিস্ময়ে। এবার কেঁদে উঠে আপন। মানুষটি এবার বলে-কান্না থামাও বালক। এখানে কেন, কিভাবে এলে এটাই বলো, আমার বেশীক্ষণ সময় হাতে নেই।
আপন ভেজা কন্ঠস্বরে বলে- আমি বাড়ী থেকে বের হয়ে একটা বিষয় নিয়ে চিনত্মা করে হাঁটতে হাঁটতে কখন এখানে এসে পৌঁছেছি আমি জানিনা।
-কি বিষয় নিয়ে চিনত্মা তোমার। মানুষটি জানতে চায়।
-না, মানি একটা..... বলে আপন থেমে যায়। মানুষটি বলে একটা কি?
আপন বলে-একটা বোমা কোথায় পাবো এই চিনত্মা।
মানুষটি এবার একটু সরে দাঁড়ায়। -একটা বোমা কোথায় পাবে এই চিনত্মা তোমার কেন বালক?
-একটা বোমা কিনতে চাই। আপনের কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠে মানুষটি। হাসতে হাসতে বলে-বয়স তের। বোমা কিনতে চাও? কত টাকা আছে তোমার।
আপন বলে-দুই টাকা।
মানুষটি এবার জানতে চায়- বোমা দিয়ে কি হবে বালক।
আপন বলে- আমার দাবী আদায় করবো। কিন' আপনি কে? কেন বা আমাকে এসব জিজ্ঞেস করছেন। তার চেয়ে বলুন আমি কোথায় গেলে একটা বোমা পাবো।
-বালক, তুমি তোমার উপযুক্ত জগতেই এসেছো। এটাই বোমার জগৎ। মানুষটির কথা শুনে আপন এবার হাস্যেজ্জল। সঙ্গে সঙ্গেই পকেটে হাত দিয়ে চক চকে একটা দু’টাকা নোট বের করে হাতে নিতে না নিতেই। যন্ত্রের মতো মানুষটি বালকের হাত থেকে দু’টাকার নোটটি টান দিয়ে কেড়ে নেয় আবার ফেরত দিয়ে বলে-বোমা কিনতে টাকা লাগে তোমাকে কে বলেছে? আজকের বাজারে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে আমারা ফ্রি বোমা সরবরাহ করি।
ফ্রি? একেবারে ফ্রি বোমা পাওয়া যায় ভাবতে আপনের মুখ থেকে ঝরে পরে অস্পুট হাসির সমেত সব কটি তিল। তার কাছে মনে হয় এই বোমার জগৎটা সবচেয়ে চমৎকার। এই জগৎটাতে এখন তারা কেবল দু’জন। একজন কিশোর ও অন্যজন ত্রিশোর্দ্ধ বিবস্ত্র মানুষ। মানুষটি এবার বলে-তোমার দাবীটি কি? যার জন্য বোমা লাগবে?
আপন বলে-ইদানিং স্কুলে যাওয়ার সময় মা-বাবা আমাকে দু’টাকার বেশী দিতে চায় না। আমার দাবী দশ টাকা! তার জন্য আমাকে অনেক জ্বালা সহ্য করতে হয়। এই জন্য একটা বোমা চাই। এই বোমা দিয়েই আমার দাবী আদায় করতে চাই। দয়া করে আমাকে একটু সাহায্য করেন।
মানুষ বলে-তোমাকে বোমা দেয়া হবে। তুমি সৎ ও সাহসী বালক। দাবী আদায়ের যোগ্য নেতৃত্ব তোমার আছে। তবে বালক, তুমি স্কুলে যাও শুনে খুশি হতে পারলাম না।
-স্কুলে আমিও যেতে চাইনা। আমাকে জোর করে পাঠানো হয়। আপন বলে।
-তাই না কি, তাহলে তোমাকে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব একটু দাঁড়াও, বলে মানুষটি শূণ্যে উড়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
কিছুক্ষণপর শূন্য থেকে উড়ে এসে আপনের সামনে দাঁড়ায়। মানুষটির হাতে একটা বক্স। বক্সটি আপনের হাতে তুলে দেয়। আপন বক্সটি পেয়ে খুশি ভীষণ। নিশ্চয় এই বক্সে বোমা। এতোদিন কেবল খবরের কাগজ, মিডিয়ার পর্দায় বোমার খবর ও ছবি দেখেছি এবার সত্যি সত্যি সে বাসত্মবিক বোমা দেখবো। আপন জানতে চায়-এই বক্সে কি বোমা।
মানুষটি এবার হেসে উঠে বলে-না বালক এই বক্সে বোমা নেয়। আমরা বোমা সরবরাহ করি না। কেবল বক্সভর্তি কিছু মিষ্টি পাঠায় পৃথিবীর একজনের কাছে। ওই তোমাকে বোমা দেবে একে বারে ফ্রি।
- তার মানে এই জগৎটা পৃথিবীর বাইরে?আপন বিস্মিত হয়ে জানতে চায়লে মানুষটি বলে-হ্যাঁ বালক, এখন তুমি একটি ভিন্ন গ্রহে। এটা বোমার জগৎ। এ জগতের মিষ্টির বক্স পৃথিবীর একজনের কাছে পৌঁছালে সেই তোমাকে দেবে বোমা। এই নাও তার ঠিকানা। বলে মানুষটি তার হাতে একটা কাগজ দেয়। আপন কাগজটি পকেটে রেখে বলে-এখন আমি কিভাবে দেশে ফিরে যাবো? মানুষটি বলে-সহজ একেবারে সহজ। তুমি চোখবন্ধ করো। আপন চোখ বন্ধ করে।
আপন উড়তে থাকে শূন্যে। ওপ্রানত্ম থেকে সে ছুটে আসে এপ্রানেত্ম। চোখ খুলতেই দেখতে পায় আপন এখন নিচের দেশে। আপন এখন বুঝতে পারে বোমার শক্তি কোথায়? আপনের গর্ব হয় ঐ শক্তির জগৎটাকে একবার ঘুরে আসতে পারায়। ঠিকানাটি এবার হাতে নিয়ে আপন ঠিকানার মানুষটির সন্ধানে পা বাড়ায়।
ওদিক এদিক যাচ্ছে কেবল যাচ্ছে। ঠিকানার সন্ধান মেলে না তার কাছে। বিকেলের লালচে আকাশ আপনের দিকে চেয়ে চেয়ে হাসে এবং স্বাগত জানায়। হে বালক, সু-স্বাগতম। এগিয়ে যাচ্ছে অজানা এক ঠিকানার মানুষটির খোঁজে। যেতে যেতে তার সামনে দেখতে পায়, ৩৪বছর বয়স্ক বিধ্বসত্ম, জীর্ণ দেহাবয়ব নিয়ে চলতে চলতে সি'র এক জননী তার দিকে চেয়ে আছে ফেল ফেল করে। আপনের ভালোলাগার মায়া ওই জননীর দিকে তাকে নিয়ে যায়। আপন জানতে চায়
-কে তুমি মা, এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?
একবার তার দিকে চোখ তুলে। আপন দেখতে পায় তার অসহায়ত্ব অভাবের রেখা তার চোখে, মুখে কপালে। ওই যা বিধ্বসত্ম অসহায় সুরে বলে-বাবা, আমি ক্ষুধার্থ, তৃষ্ণায় কণ্ঠ পুরে যাচ্ছে। আমার যা ছিলো তো কেড়ে নিয়েছে আমার প্রিয় সনত্মানরা, তারা আমাকে কিছুই দিতে পারেনি। তুমি যদি কিছু খাওয়াতে বাবা।
মায়ের কথা শুনে আপনের ভেতরেও ক্ষুধার প্রচন্ড তাড়না নেড়ে উঠে। কিন' কি করা যায়। ভাবতে আপনের মনে পড়ে হাতের বাক্সে তো মিষ্টি। এই মিষ্টি তো মা ও সে অনায়াসে খেতে পারে। ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য এই মূহুর্তে এর চেয়ে কোন উপায় থাকতে পারে না। ঠিকানার সন্ধান তো মেলেনি এবার বরং মিষ্টি গুলো খাওয়ায় ভালো। আপন বলে মা, আপাতত আমার কাছে এই বক্সের মিষ্টি গুলো আছে
এই গুলো খাওয়া যেতে পারে।
-মা বলে-তাই করো বাবা।
আপন এবার বক্স খুলতে চেষ্টা করে। খুলতে পারে না। মা সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। অনেক্ষণ খাটুনির পর বক্স খুলতে না খুলতেই প্রচন্ড এক আওয়াজে কেঁপে উঠে পুরো দেশের মাঠি। শূন্যে উড়ে জ্বলে উঠে আপন ও বিধ্বসত্ম জননীর অসহায় দেহ। এবার বিস্মিত ও বিস্ময়ের মানুষগুলো ভীড় করে দূরে দূরে। তখন আকাশের এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেলো শব্দহীন পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে। নিরবতায় সত্মব্দ চারদিক। আপন ও মায়ের দেহ আসেত্ম আসেত্ম পুড়ে পুড়ে নিচের দিকে নেমে আস্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চল পোড়ামাংস গুলো মাটির ধূলোর সাথে বিলীন হবে। তখন আমাদের কানে দূর কোথাও থেকে ভেসে আস্ছে এক পাল কুকুরের চিৎকার। ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ.....। মনে হয় এক পাল কুকুরের মিছিল এগিয়ে আস্ছে এদিকে। কুকুরের চিৎকার ক্রমাগত বেড়ে উঠতে থাকে। তখনো মা ও আপনের ভস্ম দেহ মাটিতে লুকিয়ে পরার কিছু সময় বাকী আছে।
আমরা তখনি দেখতে পাই আসেত্ম আসেত্ম মাটিতে নেমে এলো আপন ও মা। না কোথাও তাদের দেহের কোন চিহ্ন নেই। মাটিতে পড়ে আছে। বিবর্ণ ছেঁড়া লাল সবুজের চেনা-জানা পতাকাও পরিচিত একটি মানচিত্র। মানুষের ভীড় থেকে এক বয়োবৃদ্ধ পৌঢ় জীর্ণ শীর্ণ দেহ নিয়ে ছুটে আসে ভস্ম দেহাবশেষের সামনে। এসেই বুকে আঁকড়ে নিল ছেঁড়া পতাকা ও মানচিত্র। কেঁদে উঠে হু-হু করে। বৃদ্ধকে সান-্বনা দিতে আকাশের পাখি গুলো বেদনার আর্তনাদ করে করে সারা আকাশময় উড়তে থাকে অজানা ভয়, বিস্ময়ের চোখ নিয়ে। এদিক থেকে ওদিকে।
ভীড় বাড়তে থাকে। অসংখ্য মানুষের ভীড়টা পাথরের পর পাথর হয়ে যায়। পাথরের মানুষগুলোর ভার বই মাটি আর সইতে পারে না। এই মাটি ধসে যাচ্ছে আসেত্ম আসেত্ম ধীরলয়ে। মাটির সাথে সাথে পাতালের দিকে নিভৃতে যেতে থাকে পাথরের স'পটাও।
জানি একদিন ওই পাথরের স'প থেকে একটি মুঠিবদ্ধ হাত উঠে এসে আঁকড়ে ধরবে মাটির শেকড়। ঐ তীব্র হাতের আহ্বানে আমরা আমাদের প্রতিবাদ প্রতিরোধের মুষ্ঠিবদ্ধ দু’হাত খোলা আকাশের দিকে রেখে গেয়ে উঠবো
“সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে
কে....কে......কে........
পৃথিবী তোমায় আসামীর মত জবাব দিতে হবে।”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



