somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের (বরিশাল স্টীমারঘাটের সৌন্দর্য্য দেখে বিমোহিত হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বলেছিলেন, বরিশাল হচ্ছে প্রাচ্যের ভেনিস) উজিরপুর ধানাধীন সাতলা গ্রামে। পিতা প্রাইম

উপমহাদেশের কিংবদন্তি গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৩ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


উপমহাদেশের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম গায়ক ও সুরস্রষ্টা এবং পাকিস্তানের চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র কণ্ঠশিল্পী মেহেদী হাসান। ' মেহবুব সুর'- এর অধিকারী গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের গজল শুনে কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী লতা মুঙ্গেশকর তাঁর বলেছিলেন, ' মেহেদী হাসানের কণ্ঠে বাস করেন স্বয়ং ঈশ্বর।' আর এক কিংবদন্তী গায়ক মো. রফি বলেছেন,' আমরা গান করি আমজনতার জন্য আর মেহেদী হাসান গান করেন আমাদের জন্য।' এ জন্যই বোধ হয় তাঁকে বলা হয় শাহেনশাহ-ই-গজল । শৈশব থেকেই সংগীতের ধ্বনি মাধুর্য তাঁকে আন্দোলিত করেছে। হাতেখড়ি বাবা-চাচার কাছে। পাকিস্তানী ফিল্মী গানের সর্বকালের সেরা গানগুলো মেহেদী হাসানের গাওয়া। তাঁর গায়কী জীবনে খ্যতি এন দেয় বিখ্যাত সেই গান ' গুলুমে রাঙ্গ ভারে'। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পঁচিশ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন তিনি। দুরূহ গজলও তাঁর কণ্ঠে কেমন হূদয়ছোঁয়া হয়ে ওঠে। কখনো উর্দু সাহিত্যের ছাত্র না হয়েও উর্দু গজলের শব্দ ও সুর নিয়ে খেলা করেছেন তিনি। উর্দু গজল ছাড়াও বাংলা গানেও রয়েছে তাঁর স্মরণযোগ্য অবদান। তাঁর গাওয়া বাংলা গান, 'হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়'; 'ঢাকো যত না নয়ন দুহাতে'; 'তুমি যে আমার' প্রভৃতি গান বাংলাদেশের সংগীত প্রেমিরা চিরদিন মনে রাখবে। পাকিস্তান সরকারের তরফে তমঘা-ই-ইমতিয়াজ, প্রাইড অব পারফরম্যান্স এবং হিলাল-ই-ইমতিয়াজ এবং নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে গোর্খা দক্ষিণা বাহু উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর ২০১২ সালের আজকের দিনে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে তাঁর মহাপ্রয়ান ঘটে। আাজ তাঁর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। কিংবদন্তি গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের মৃত্যুদিনে আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।


১৯২৭ সালের ১৮ জুলাই, অবিভক্ত ভারতের রাজস্থানের ঝুন ঝুন জেলার লুনা গ্রামে,এক সংগীত পরিবারে। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পরে ২০ বছর বয়সী মেহেদী হাসান এবং তাঁর পরিবার ভারত ছেড়ে পাকিস্তানের শাহিওয়াল এলাকায় চলে আসেন। নতুন দেশে এসে তাঁর পরিবার বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। জীবনের তাগিদে তরুণ মেহেদী হাসানকে জীবনসংগ্রামে নামতে হয়। কিন্তু সংগীতের দুর্নিবার আকর্ষণ তাঁকে সংগীতচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। এই কালজয়ী শিল্পীকেও জীবনের শুরুতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। সেখানে তাঁকে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগতে হয়। চিচাওয়ান্তি এলাকার একটি সাইকেলের দোকানে কাজ করতে থাকেন। সেখানে তিনি গাড়ী এবং ডিজেল ট্রাক্টর মেকানিক হিসেবে ছিলেন। আর্থিক অসচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও সঙ্গীত চর্চা করতে থাকেন। প্রত্যেহ রুটিনমাফিক দৈনিকভিত্তিতে গান চর্চা অব্যাহত রাখেন। তাঁর বাবা ওস্তাদ আজিম আলী খান এবং চাচা ওস্তাদ ইসমাইল খান ছিলেন ধ্রুপদী সংগীতের প্রখ্যাত পণ্ডিত। শৈশব থেকেই তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভাই উল্লেখ করেন যে প্রথম গান আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবশন করেন ১৯৩৫ সালে। লাহোরের বেশ ক'টি অনুষ্ঠানে গান গাইলেন কিন্তু সাফল্য পেলেন না। তাতে দমে যান নি মেহেদী হাসান। ১৯৫৭ সালে রেডিও করাচি স্টুডিওতে অডিশনের সুযোগ আসে। অডিশনে গাইলেন ঠুমরি, রাগ খাম্বাজ, পিলু, দেশ, তিলক, কামোদ । রেডিও কর্মকর্তাদ্বয় - জেড.এ. বুখারী এবং রফিক আনোয়ার তাঁর গজল গানের অনুরক্ত হন। তাঁদের আন্তরিক অনুপ্রেরণায় তিনি পাকিস্তানসহ প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গীত ঘরানায় অন্যতম জনপ্রিয় গজল গায়কে পরিণত হন। তাঁর গলার 'আকার'(signature) ঠুমরি ও গজলের জন্য মানানসই ছিল। তাই তিনি বিশুদ্ধ উচ্চাঙ্গ সংগীতের পরিবর্তে হালকা ক্ল্যাসিকাল ও গজলের দিকে মনোনিবেশ করেন। তাঁর গায়কির স্বতন্ত্র ধারা ও মিষ্টি কণ্ঠ স্রোতাদের নজর কাড়তে শুরু করে। মেহেদী হাসানের শিল্পীখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।


মেহেদী হাসান পঁচিশ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। জিন্দেগিমে সাভি পিয়ার কিয়া কারতে হেয়, তেরে ভিগে বাদানকি খুশবু, পিয়ার ভারে দো শারমিলে নেয়ন—রোমান্টিক সংগীতে যেমন ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে তেমনি এক নায়ে মোড়পে, মুঝে তুম নাজারছে, ইক হুসনেকি দেবিছে মুঝে পেয়ার হুয়া থা গায়কির চূড়ান্ত মানদণ্ড বলে ধরা হয়। মেহেদী হাসান পপ স্টার ছিলেন না; কিন্তু ৭০ দশকের শেষের দিকে রবিন ঘোষের সুরে গাওয়া 'কাভি ম্যায় সোচতা হু', 'মুঝে দিলছে না ভুলানা' উপমহাদেশে ফিউশন মিউজিকের দ্বার খুলে দেয়। মেহেদী হাসান উর্দু সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন না। অথচ মির, গালিব, ফয়েজ, আহমাদ ফারাজ কিংবা পারভিন শাকিরের মতো সেরা উর্দু কবিদের রচিত গজলে ব্যবহূত শব্দ এবং ছন্দের অন্তর্নিহিত বার্তা বোঝার ছিল তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা। উর্দু গজলের কোন স্বরের ব্যাপ্তি কতটুকু কিংবা কোন শব্দের ওপর কতটুকু জোর দিলে কাব্য-স্তবকের মর্মার্থ বেরিয়ে আসবে, সেটা তার মতো করে কোনো গজলশিল্পী গাইতে পারেননি। মেহেদী হাসানের অনন্য গায়কির জন্য অত্যন্ত জটিল রাগ-রাগিনীও শিশুর সহজ-সরল মিষ্টি হাসির মতো স্রোতাদের হূদয়ে ঢেউ তোলে। মেহেদী হাসান সুদীর্ঘকাল সঙ্গীত ভুবনে অবস্থান করে অগণিত পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৭৯ সালে ভারতের জলন্ধরে সায়গল পুরস্কার এবং ১৯৮৩ সালে নেপাল থেকে গোর্খা দক্ষিণা বাহু পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এছাড়াও জেনারেল আইয়ুব খান কর্তৃক তমঘা-ই-ইমতিয়াজ; ১৯৮৫ সালে জেনারেল জিয়াউল হক দিয়েছেন প্রাইড অব পারফরম্যান্স; জেনারেল পারভেজ মুশাররফের কাছ থেকে হিলাল-ই-ইমতিয়াজ, নিগার পুরস্কার লাভ করেন।


১৯৮০-এর দশকের শেষার্ধ থেকে তিনি বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হতে থাকেন। ফলে একান্তই বাধ্য হয়ে সঙ্গীত জগৎ ত্যাগ করেন মেহেদী হাসান। ক্রমবর্ধমান অসুখের পীড়ায় অবশেষে সঙ্গীত জীবন ত্যাগ করেন। কয়েক বছর পূর্ব থেকেই মেহেদী হাসান ফুসফুসের প্রদাহে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অবনতি হতে থাকে ও শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন। অবশেষে ২০১২ সালের ১৩ জুন দুপুর ১২:২২ ঘটিকায় সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী করাচীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৪ বছর। মেহেদী হাসান আমাদের মাঝে নেই, তবে বিশ্বের গজলপ্রেমী মানুষের কাছে তিনি অমরত্ব পেয়েছেন; অমরত্ব পেয়েছে তাঁর সংগীত— 'ভুলি বিছরি চান্দ উমিদে চান্দ ফাসানে ইয়াদ আয়ে/ তুম ইয়াদ আয়ে অওর তুমহারে সাথ জামানে ইয়াদ আয়ে'। মেহেদী হাসানের মতো মহৎ শিল্পী ও তাঁর সংগীতকে ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে বাঁধা যায় না। প্রকৃত অর্থে তিনি কোনো দেশের নন। এঁরা সর্ব দেশের, সর্ব কালের , সর্ব মানবের। বাংলাদেশেও রয়েছে মেহেদী হাসানের অগণন ভক্ত। আজ সর্বকালের সেরা গজলশিল্পী মেহেদী হাসানের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। কিংবদন্তি গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের মৃত্যুদিনে আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ফেসবুক লিংক
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৪৬
৭টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রাইম মিনিষ্টার সৌদী, মোদী, বৌদিদের বিনিয়োগ কেন চায়?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১১:০৬



মনে হয়, এটা বিনিয়োগের ব্যাপার নয়, আসলে কৌশলে ভিক্ষা চাওয়া; সৌদীরা শেখ হাসিনাকে পছন্দ করে না, ওদের পছন্দের লোক হলো বেগম জিয়া, জামাত, মুসলমিক লীগ! সৌদী রাজপুত্র সালমান আমেরিকান... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম যার যার উৎসব সবার

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ সকাল ৮:৫৬

'ধর্ম যার যার উৎসব সবার'' এই বাক্যটাতে আজকাল দেখছি অনেক মানুষের এলার্জি। আজ থেকে বিশ ত্রিশ বছর আগে ইন্টারনেট নামক কোন বস্তু ছিল না। হাজার হাজার মানূষের সাথে মতবিনিময় হবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্রাঞ্জি সে

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ সকাল ৯:৩৪



স্রাঞ্জি সে
১১/১০/১৮ইং।

ব্লগে যখন প্রথম আসিল
সকলেই প্রশ্ন করিল-এ আবার কে ?
রহস্যময় এক নাম স্রাঞ্জি সে।

তারপর সময়ের স্রোতে ব্লগে ভেসে
সকলের মন জয় করিল যে
সেতো আমাদের প্রিয় স্রাঞ্জি সে।

কবিতায় প্রেম-প্রকৃতি, মন-মননের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আইয়ূব বাচ্চু, আপনি আসবেন ফিরে গানে গানে, রুপালি গিটার হাতে...

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ দুপুর ১:৪৭


(১)
১৯৯০ এর দিকে আমাদের ব্যান্ড এ্যালবামগুলোর একটা ফরমেট ছিলো। বেশিরভাগ থাকবে বিরহের গান, একটি সন্ত্রাস অথবা মাদকবিরোধী গান, একটি ফোক গান। সেই সময়ে আমাদের ব্যান্ডগুলির মূল শক্তি ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বলো দুর্গা মা কি... 'জয়'

লিখেছেন অর্পিতা সাহা., ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ বিকাল ৫:০২



অবশেষে, সেফ ব্লগারের খাতায় আমার নামটাও উঠলো:
ব্লগের সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা। মডুদের থেকে গ্রীন সিগন্যাল পেয়েছি। মডারেশন স্ট্যাটাস সেফ, মানে আমি নিরাপদ ব্লগার। ভাবতেই কেমন লাগছে!... ...বাকিটুকু পড়ুন

×