somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... কেককাহন ভূলুআপা। এই ব্লগে তো বটেই; নেটে বাংলা ভাষায় লভ্য রেসিপিগুলোর মধ্যে তাঁরগুলোই সেরা।
প্রিয় সহব্লগার জেমিনির অনুরোধে এই পোস্ট দেয়া।

পোস্টটি নিজ ব্লগে প্রকাশিত; আপডেট করা হচ্ছে। রেসিপি বা রান্নায় আগ্রহ না থাকলে মন্তব্য না করার অনুরোধ রইলো]
[সর্বশেষ আপডেট ২০ জানুয়ারী২০১০]

এক.
পাশ্চাত্যের খাবার অথচ আমাদের উৎসব-আয়োজনের অংশ হয়ে গেছে, কেক এমনই একটা খাবার। ক্রিমের কারুকার্যময় নকশায় জন্মদিনসহ বিভিন্ন উপলক্ষের কেকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। এছাড়া চায়ের অনুষঙ্গ হিসেবে একটু ভারী টেক্সচারের, ক্রিমবিহীন কেকও আমরা কমবেশী খাই। অভিজাত বেকিং-চেইনের উচ্চমূল্যের কেক যেমন আছে; তেমনি আছে পাড়ার মুদিদোকানের বোয়ামে অনামী অখ্যাত বেকারির প্রোডাক্ট। কিংবা বিদেশ থেকে আমদানী করা পলিপ্যাকমোড়া কেক। খেতে কোনটাই খারাপ না।

অন্যদিকে ঘরে কেক বানানোর ঝক্কি অনেক। তবুও কেউ কেউ শখ করে এই কাজটা করেন। যারা একবার ঘরোয়া কেকের মজা পেয়ে যান, দোকানের কেকের স্বাদের ফাঁকিটা সহজেই ধরতে পারেন। এর কারণ হলো দোকানের কেকে খরচ কমানোর জন্য বিকল্প উপকরণের ব্যবহার করা হয়। বেশীদিন মেয়াদ থাকার জন্য প্রয়োগ করা হয় প্রিজারভেটিভ। ক্ষতিকর রাসায়নিক, রং, আর ভেজাল উপকরণের কথা বলাই বাহুল্য। এসব বিবেচনা করে, অথবা নেহাত শখের বশেই কেউ যদি কেক তৈরিতে আগ্রহী হন, তাদের জন্য এই পোস্ট। শুরুতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, উপকরণ, পাত্র ইত্যাদি নিয়ে কিছু কথা থাকবে। তারপর রেসিপি। বাংলাদেশে ঘরোয়া ব্যবহারের জন্য যেসব ওভেন পাওয়া যায় তার সবই বিদ্যুৎ- চালিত। অথচ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রচলিত গ্যাসের চুলা ব্যবহার করে কেক বানানোর বিকল্প উপায় নিয়েও কিছু টিপস থাকবে।

আমাদের চেনাজানা রেসিপি থেকে কেকের রেসিপি একেবারেই আলাদা। এর কারণগুলো বলি।
প্রথমতঃ কেকের প্রস্তুতিতে কিছু যন্ত্রপাতির যোগ আছে।
দ্বিতীয়তঃ যে পাত্রে কেক বানানো হবে তার পূর্বপ্রস্তুতির ব্যাপার আছে।
তৃতীয়তঃ উপকরণগুলো নির্দিষ্ট অনুপাতে বিশেষ কায়দায় মিশিয়ে ওভেনে বেক করতে দেয়া হয়ে গেলে তারপর আর কোনকিছু করার নেই। ফলে প্রথম পর্বের মেশানোতে কোন ভুলত্রুটি রয়ে গেলে সেটা শোধরানোর সুযোগ থাকবেনা।
চতুর্থতঃ কেক তৈরি হয়ে গেলে তা ঠাণ্ডা করা এবং সুন্দরভাবে কাটার জন্য বিশেষ কায়দা আছে।
উপরের ধাপগুলো সব ধরণের কেকের জন্য প্রযোজ্য। এছাড়া বিশেষ উপলক্ষে একাধিক স্তরবিশিষ্ট কেক বানালে ক্রিম তৈরী ও কেক সাজানোর বিভিন্ন পদ্ধতি আছে।

পেশাদার বেইকাররা অনেক উচ্চমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন, সেগুলো ঘরোয়া ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। তারপরও, ঘরে ঠিকঠাক কেক বানাতে কিছু জিনিস অপরিহার্য। এগুলো ছাড়া বানানো কেক স্বাদের বিবেচনায় খেতে ভাল হতে পারে; তবে ঠিক সেরকম নরম বা স্পঞ্জি হবেনা।

১.কিচেন স্কেইল (উপকরণ ওজন করার জন্য)। ইলেকট্রিক বা ডিজিটাল হলে দারুণ।

সাধারণ ডায়ালের হলেও কাজ চলে; এটা একেবারেই সস্তা; তবে বেশীদিন টেকেনা অথবা ঠিকমতো রিডিং দেয়না।


২. ইলেকট্রিক হ্যান্ড মিক্সার; দেশে যেকোন ব্র্যান্ডের শোরুমে পাওয়া যাবে। আমি কিনেছিলাম ফিলিপসেরটা; প্রায় বারো বছর আগে, তখন দাম ছিল হাজার দেড়েক, এখনও সার্ভিস দিচ্ছে <img src=" style="border:0;" />


৩. ওভেন থার্মোমিটার। এটা খুবই সস্তা। ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় টু-ডলার শপেও পাওয়া যায়। দেশে পাওয়া না গেলে বিদেশ থেকে কাউকে আনতে বলতে পারেন নির্দ্বিধায় <img src=" style="border:0;" />


৪. একটা বড় মিক্সিং বোল, পাইরেক্সের হলে সবচেয়ে ভালো।


৫. বড় হুইস্ক (চ্যাপ্টা বা সরু হলে চলবে না; বেলুনের মতো ফোলানো, বড়সড়)। প্লাস্টিক বা নাইলনের চেয়ে মেটালের হলে ভালো হয়।


৬. খুব নমনীয় (ফ্লেক্সিবল) স্প্যাচুলা। সিলিকনের হলে সবচেয়ে ভালো। প্লাস্টিক হলেও কাজ চলবে তবে সহজে ভেঙ্গে যায় বলে একাধিক রাখতে হবে।




উপকরণ:
দোকানের কেকের মোড়কের গায়ে অন্তত গোটাবিশেক উপকরণের তালিকা লেখা থাকে (যদি আদৌ থাকে <img src=" style="border:0;" />)। তবে ঘরে কেক বানাতে খুব বেশী উপকরণের প্রয়োজন হয়না। উপকরণের দিক থেকে কেক মূলতঃ দু'রকমের। বাটারকেক আর স্পঞ্জ কেক। বাটারকেকের মূল উপকরণ ময়দা, ডিম, চিনি, মাখন, বেকিং পাউডার। স্পঞ্জ কেকে সাধারণতঃ বেকিং পাউডার ও মাখন লাগেনা।

এছাড়া রেসিপির ভিন্নতা অনুযায়ী সামান্য দুধ, টকদই, সাওয়ার ক্রিম, সুগন্ধী যেমন ভ্যানিলা/লেমন/অরেন্জ এসেন্স, বেকিং সোডা, ক্রিম অফ টারটার, লবণ, শুকনো ফল, বাদাম, ফলের মোরব্বা, চটকানো কলা, আনারসের টুকরো, নারকেল কোরা, কমলা বা লেবুর খোসা কোরা, লেবুর রস, কোকো পাউডার, গলানো চকোলেট এসবের কোন কোনটা দেয়া যেতে পারে কেকে।

বেকিং পাউডার, বেকিং সোডা আর ক্রিম অফ টারটার নিয়ে অনেকের বিভ্রান্তি থাকে। তিনটি উপকরণই দেখতে সাদা পাউডারের মতো। বেকিং সোডা হলো সোডিয়াম বাই কার্বোনেট। বাংলাদেশের বাজারে বেকিং সোডা লেবেলবিহীন প্যাকেটেও বিক্রি হয়, এটা খাবার সোডা নামেও পরিচিত। ক্রিম অফ টারটার হলো পটাসিয়াম বাইটারট্রেইট (টারটারিক এসিডের পটাসিয়াম লবণ)। বেকিং পাউডার হলো বেকিং সোডা আর ক্রিম অফ টারটারের নির্দিষ্ট অনুপাতের মিশ্রণ। ক্রিম অফ টারটার আর বেকিং পাউডার দু'টোই দেশে সহজলভ্য।

কেকের জন্য বিশেষ ময়দা পাওয়া যায় (দেশে পাওয়া যায় কিনা জানা নেই)। একে বলে কেক ফ্লাওয়ার (সেল্ফ রেইজিং ফ্লাওয়ার নয় কিন্তু)। সাধারণ ময়দার সঙ্গে এর পার্থক্য হলো এটা কণাগুলো বেশী মিহি এবং ব্লিচ করা হয় বলে প্রোটিনের ভাগ কম থাকে। ফলে কেকের টেক্সচার মসৃণ হয়; কাটার সময় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরেনা। কেক ফ্লাওয়ার পাওয়া না গেলে ভালো মানের ময়দা তিনভাগ আর কর্নফ্লাওয়ার একভাগ মিশিয়ে নেয়া যেতে পারে (যেমন ছয় কাপ ময়দার সঙ্গে দুই কাপ কর্নফ্লাওয়ার)। হুইস্ক দিয়ে খুব ভালোভাবে নেড়ে মেশাতে হবে। একটা বড় বোয়ামে বা টিনে এই ময়দা ভরে রাখলে প্রতিবার কেক বানানোর সময় নতুন করে মেশানোর ঝামেলা করতে হবেনা।

ডিম, মাখন আর দুধ রুম টেম্পারেচারে থাকতে হবে। ফ্রিজে থাকলে অন্তত একঘন্টা আগে বের করে রাখতে হবে। মাইক্রোওভেন থাকলে মাখন আর দুধ খুব অল্প সময়ের জন্য সেখানে দিয়ে ঠাণ্ডা কাটানো যেতে পারে। মাখন নরম হওয়া চাই; তবে খেয়াল রাখুন যেন গলে তরল হয়ে না যায়।

সহজে মেশে বলে ছোট দানার চিনি ব্যবহার করা উচিত। বাজারে মিহি দানার চিনি ক্যাস্টর সুগার পাওয়া যায়। বিকল্প হিসেবে গ্রাইন্ডারে চিনি গুঁড়ো করে নেয়া যেতে পারে। চিনি গুঁড়ো করার জন্য পরিষ্কার খটখটে শুকনো শিলপাটাও ব্যবহার করা যেতে পারে। একবারে কয়েককাপ চিনি গুঁড়ো করে রাখলে বেশ কয়েকবার ব্যবহার করা যাবে। বোয়ামটি ঠাণ্ডা শুষ্ক জায়গায় রাখুন আর প্রতিবার ব্যবহারের আগে শুকনো কাঁটাচামচ দিয়ে ভালো করে দলাগুলো ভেঙে মসৃণ করে নিন।

কেকপ্যান:
যে পাত্রে কেক বেক করা হবে সেটার মাপ (আয়তন) ঠিকঠাক হওয়া জরুরি। কারণ ওভেনের ভেতরে বেক হওয়ার সময় কেক ফুলে উঠে আয়তনে বাড়বে। কেকের মিশ্রণের তুলনায় প্যানের আকার ছোট হলে ব্যাটার উপচে পড়বে। আবার প্যান বেশী বড় হলে কেকের উচ্চতা বেশী হবেনা। সবচেয়ে বড় কথা কোন ধরণের কেক বানানো হবে তার উপর নির্ভর করবে প্যান নির্বাচন। নাশতার জন্য সাধারণ বাটারকেক বা টি-কেক বানাতে হলে ব্রেড বা পাউরুটির আকারের প্যান আদর্শ। সুইস রোল ধরণের কেক করার জন্য চ্যাপ্টা ট্রের মতো পাত্র দরকার হয়। নকশাকাটা বান্ট প্যানে(Bundt pan) কিছু কিছু কেক (যেমন ফ্রুটকেক বা মার্বেল কেক) দেখতে ভালো লাগে। আবার বিশেষ উপলক্ষে কয়েক স্তরের (ভেতরে ক্রিমের পরত দেয়ার জন্য) কেক বানাতে হলে প্রয়োজনমতো গোল বা চারকোণা প্যান লাগবে। এধরণের পাত্রগুলো দুরকমের হতে পারে; প্যানের চারপাশের দেয়াল সোজা খাড়া হতে পারে অথবা ঢালু হতে পারে। সোজা খাড়া দেয়ালের কেকপ্যানের তলা আর মুখের মাপ সমান। চারপাশ ঢালু হলে প্যানের তলার চেয়ে মুখের দৈর্ঘ/প্রস্থ/ব্যাস বড় হয়। সোজা দেয়ালের কেকপ্যান ব্যবহার করার বাড়তি সুবিধা আছে। নীচের ছবিগুলোর মধ্যে হাতলসহ কেকপ্যানের চারপাশের দেয়াল ঢালু।






গাঢ় রঙের (কালো) বা বেশী চকচকে কেকপ্যান ব্যবহার না করাই ভালো; এগুলো দ্রুত গরম হয়ে কেকের ধারগুলো পুড়িয়ে দেয়। চকচকে না এমন ছাইরঙের অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র হলে চলে; ননস্টিক কোটিং থাকলে ভালো। তবে খুব বেশী দামী ব্র্যান্ড আইটেম কেনার দরকার আছে বলে আমার মনে হয়না।

দুই.




বাচ্চারা কাপকেক পছন্দ করে। কারণ এটা কাগজের কাপে থাকে বলে হাতে ধরে খাওয়া যায়। মায়েরা পছন্দ করেন কারণ বানাতে কম সময় লাগে, এটাতে কাটাকাটির কোন ঝামেলা নেই আর ক্রিম ইত্যাদি দিয়ে সাজানো খুব সহজ। কাপকেক বানাতে এরকম মাফিন ট্রে অথবা কাপকেক টিন ব্যবহার করেন অনেকে। কাপকেক বা মাফিনের প্যানের বাটিগুলোতে ছোট বাটি-আকৃতির কাগজ বসিয়ে দিতে হয়। একে কাপকেক লাইনার অথবা মাফিন কাপ বলা হয়। বিভিন্ন রং ও নকশার কাপ পাওয়া যায়, বাচ্চার পছন্দমতো কিনুন। (উপরে মাফিন টিন ও কাগজের কাপের ছবি আছে)

কেক বানানোর আগে পাত্র বা কেকপ্যানের কিছু প্রস্তুতি দরকার। এটা হলো বেকিং পেপার দিয়ে লাইনিং দেয়া। বেকিং পেপার (পার্চমেন্ট পেপারও বলা হয়) হলো একরকমের ওয়্যাক্স/সিলিকন-কোটেড কাগজ; এটা দিয়ে আস্তর দিলে পাত্রের গায়ে কেক আটকে যাবেনা; আবার কেকের গা থেকে সহজে এই কাগজ ছাড়িয়ে নেয়া যাবে। ঢালু দেয়ালের কেকপ্যান হলে পাত্রের তলার মাপে এই কাগজ কেটে দিতে হবে। খাড়া দেয়ালের কেকপ্যান হলে তলার সঙ্গে সঙ্গে পাশেও বেকিং পেপারের আস্তরণ দিতে পারেন। আস্তরণ দেয়ার আগে পাত্রের গায়ে সামান্য একটু তেল স্প্রে করে নিলে ("অয়েল স্প্রে" না থাকলে কয়েক ফোঁটা তেল ছিটিয়ে বা ব্রাশ করে দেবেন) বেকিং পেপার সেখানে ভালোমতো আটকে থাকবে। বেকিং পেপার পাওয়া না গেলে বিকল্প হিসেবে সাদা কাগজে ভালো করে তেল মাখিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। তেল মাখানোর কাজে ছোট পেস্ট্রিব্রাশ (ছবি আঁকার বড় ব্রাশ হলেও চলবে) ব্যবহার করলে ঝামেলা ও অপচয় হবেনা।

বেকিং পেপার যেভাবে ব্যবহার করতে হয়-
১. শুধু তলার লাইনিংএর জন্য
২. তলা ও পাশে লাইনিংএর জন্য (প্রথমে পাশে দিতে হবে; তারপর তলায়)



বান্ট প্যানের প্রস্তুতিতে বেকিং পেপার ব্যবহার করা যাবেনা (উপরে বান্ট প্যানের ছবি)। এটাতে তেল স্প্রে করতে হবে অথবা ব্রাশ করতে হবে। তারপর সামান্য দু'তিন চিমটি ময়দা ছিটিয়ে দিয়ে প্যান ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তেলের ওপর ছড়ান (চালুনিতে করে দিলে মিহিভাবে ছড়াবে)। উপুড় করে কয়েকবার হাল্কাভাবে ঝাঁকালে বাড়তি ময়দা ঝরে পড়বে।

তিন.



সিলিকোনের কেকপ্যান (উপরের ছবি) আজকাল বাজারে প্রচুর দেখা যায়। দেখতে সুন্দর, অনেক রঙে পাওয়া যায়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পরিস্কার করা সহজ। আঁচড় বা স্ক্র্যাচ, মরিচা পড়া এসবের ঝামেলা নেই। আর কাপকেকের জন্য অনেক নকশায় পাওয়া যায়। কোন কোন ব্র্যান্ড দাবী করে, সিলিকোন কেকপ্যানের প্রস্তুতির কিছু নেই; কাগজের লাইনিং দরকার হয়না। কিন্তু এর কিছু অসুবিধাও আছে। এটা যেহেতু খুবই নমনীয়, তাই একটা বেকিং ট্রে লাগে বসানোর জন্য। ওভেনের তাপমাত্রা বা বেকিঙের সময় পুনঃনির্ধারণ করে নিতে হয়। ননস্টিক কেক পেতে হলে রেসিপিতে তৈলাক্ত অংশ বাড়িয়ে দিতে হয়। কেক বের করার জন্য পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যার ফলে কেকের তলা ভেজা-ভেজা হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, সিলিকোন কেকপ্যানে কেক অতোটা ফোলে না, ফলে একটু ভারী কেক তৈরী হয়।


উপকরণের মাপ:
প্রচলিত রেসিপিগুলোতে সাধারণতঃ আয়তন হিসেবে উপকরণ পরিমাপ করা হয়। যেমন দুই কাপ ময়দা, এক কাপ চিনি, তিন টেবিলচামচ দুধ ইত্যাদি। এই রেসিপিগুলোকে আমি "ফুলপ্রুফ" বলবোনা। প্রথমত কাপের মাপটা ঠিক কী, সেটা বলা হয় না। চায়ের কাপ বিভিন্ন মাপের হতে পারে। দ্বিতীয়ত মাপের কাপও আয়তনের হতে পারে, ২৪০ সিসি(এমএল) আয়তনের কাপ আছে, আবার ২৫০ সিসির কাপও আছে। টেবিল চামচের মাপ কোথাও ১৫ সিসি, কোথাও ২০ সিসি। অতোটি ডিম- এটাও খুব যথাযথ নয় কেকের রেসিপির জন্য। ছোট দেশী মুরগীর ডিম আর বড় ফার্মের ডিমের মাপে যথেষ্ট পার্থক্য; যা কেকমিশ্রণের তরলতার কমবেশী করে, বেকিঙের সময় এবং কেকের টেক্সচারেও প্রভাব ফেলে। এজন্য পেশাদার অথবা খুঁতখুঁতে বেইকাররা ওজন মেপে পরিমাপ করা রেসিপি অনুসরণ করেন।

বেশীরভাগ উপকরণের জন্য ওজনের বিকল্প হিসেবে একটা নির্দিষ্ট আয়তনের উল্লেখ করা সম্ভব। যেমন ২০০ গ্রাম চিনির বদলে ১ কাপ চিনি (২৪০ সিসির কাপে) বলা যেতে পারে। চিনির বোয়ামে কাপটা ঢুকিয়ে কাপে করে চিনি নিলেন। বেশ কিছুটা চিনি ঢিবির মতো উঁচু হয়ে থাকবে; একটা ছুরি দিয়ে বাড়তি চিনি সরিয়ে কাপের মুখ বরাবর চিনি "লেভেল" করে নিতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হবে ময়দা মাপার ক্ষেত্রে। এককাপ ময়দা হালকাভাবে কাপে তুলে নেয়া যায়, আবার ঠেসে নিলে এক কাপের মধ্যে বেশ কিছুটা বাড়তি ময়দা ধরে। আবার ময়দা চেলে নিলে বেশ হাল্কা ফুরফুরে হয়ে যায়। সেজন্য ময়দার মাপটা "ওজন" হিসেবে নেয়াই শ্রেয়। যদি ওজন করার জন্য কিচেন স্কেইল না থাকে তাহলে বিকল্প হিসেবে এই কাজটা করতে পারেন। বড় একটা কাগজের উপর মাপের কাপ (২৪০ সিসি বা এমএল) রাখুন। ওপর থেকে চালুনির মধ্য দিয়ে ময়দা চালতে থাকুন। কাপের বাইরে পড়লে সমস্যা নেই, পরে কাগজ থেকে আবার টিনে তুলে রাখতে পারবেন। ময়দা চালতে চালতে কাপ ভরে গিয়ে আরেকটু উঁচু হলে চালা বন্ধ করুন। এক হাতে কাপটা ওখানেই ধরে রেখে আরেক হাতে ছোট পাতলা ছুরি হাল্কাভাবে আড়াআড়ি চালিয়ে বাড়তি ময়দা সরিয়ে কাপের মুখ বরাবর লেভেল করে ফেলুন। খেয়াল রাখবেন ময়দায় যেন চাপ না পড়ে, কাপটাও নাড়াবেন না। এভাবে চালা এককাপ ঝরঝরে শুকনো মিহিকণার ময়দার ওজন মোটামুটিভাবে ১০০ গ্রামের কাছাকাছি থাকে। রেসিপিতে বলা থাকুক আর না থাকুক (বিশেষ করে বাংলা বই বা পত্রিকায় পাওয়া), এক কাপ ময়দা মানেই হলো এভাবে চেলে নেওয়া এক কাপ ময়দা; প্রথমে এক কাপ ময়দা নিয়ে তার পরে চালা নয়।

ময়দা প্রসঙ্গে একটি জরুরি কথা। ময়দা ঝরঝরে শুকনো হওয়া চাই। আর্দ্র পরিবেশে ময়দা সংরক্ষণ করা হলে সেই ময়দা দিয়ে তৈরী কেক ভালো হয়না। কেক ফ্লাওয়ার (আগে আলোচনা করা হয়েছে) পাওয়া না গেলে বিশেষ করে স্পঞ্জ কেকের টেক্সচারে সমস্যা হতে পারে। ছড়ানো পাত্রে ১ ইঞ্চি পুরু করে ময়দা ঢেলে মাইক্রোওভেনে ১০০% পাওয়ারে এক-দেড় মিনিট রাখতে পারেন (পোড়া গন্ধ বের হলে বুঝতে হবে আরো কম সময় রাখতে হবে)। প্রতি ৩০ সেকেন্ড পর শুকনো চামচ দিয়ে একবার নেড়ে দেবেন। তারপর চেলে নেবেন।

চার.
কিছু সাধারণ সমস্যার সমাধানে টিপস-

প্লেন কেক, টি-কেক (চায়ের অনুষঙ্গ হিসেবে খাওয়া হয় বলে এমন নাম) এগুলো সাধারণত বাটার-কেকের রেসিপি অনুসরণ করে বানানো হয়। এটার জন্য সুবিধাজনক প্যান হলো ব্রেড বা পাউরুটি আকারের প্যান বা টিন। চারকোণা, আয়তাকার। এই আকৃতির কেক কাটা সহজ, সংরক্ষণও সহজ। কিন্তু বেক করার সময় ওপরটা ফেটে যায় বলে অনেকে এই প্যান পছন্দ করেন না।



ওপরের ছবিতে ফাটার পাশাপাশি আরেকটা সমস্যা দেখা যাচ্ছে। কেকের বাইরের দিকটা পোড়া পোড়া হয়ে গেছে। এটা রোধের জন্য কিছু টিপস:
১. বেকিং সময় পাঁচ-দশ মিনিট কমিয়ে দিন, সেক্ষেত্রে যদি দেখা যায় ভেতরটা কাঁচা রয়ে গেছে, তাহলে ওভেনের তাপমাত্রা ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করুন। ওভেন থার্মোমিটার ব্যবহার করুন। আর সেটা সম্ভব না হলে তাপমাত্রা কমিয়ে দিন (১৫ডিগ্রি ফারেনহাইট কমিয়ে দেখতে পারেন; বেকিং-সময় বাড়াতে হবে)।
২. কেকের উপরে রং গাঢ় হয়ে এসেছে অথচ ভেতরে হয়নি, আরও কিছু সময় কেক রাখতে হবে ওভেনে- এমন হলে ওই সময় কেকের উপর আলগোছে এক টুকরো এলুমিনিয়াম ফয়েল (কাঁটা চামচ দিয়ে কয়েকটা ফুটো করে) বসিয়ে দিন; চকচকে দিকটা ভেতরে রাখুন। এই ফয়েল ওভেনের উপরের দিক থেকে আসা তাপ ঠেকাবে; আবার ফুটো থাকায় বাষ্প জমে যাবে না।
৩. গাঢ় রঙের কেকপ্যানও এর জন্য দায়ী হতে পারে (কেকের কিনারার দিকে দ্রুত তাপ পরিবহন করে)।

ব্রেডপ্যানে বেক করলে প্লেন কেক ওরকমভাবে ফাটবেই। তবে সুন্দরভাবে ফেটেছে এমন কেকও হয় (নীচের ছবি)



টিপস:
কেক ২০-২৫ মিনিট বেক হয়েছে, এখনও ফাটতে শুরু করেনি, সে অবস্থায় একটা ছুরি (ছোট, ধারালো, তেলমাখানো) নিয়ে কেকের উপরে আধইঞ্চির মতো গভীর করে এমাথা থেকে ওমাথা দাগ কেটে দিন। ক্ষিপ্র হাতে খুব দ্রুত কাজটা করা চাই। অবশ্যই মনে রাখবেন, ধারে কাটতে হবে, ভারে না কিন্তু। তখন ওই দাগ বরাবরই কেকটা ফাটবে। খুব অল্পসময়ের মধ্যে দাগ কাটার কাজটা হওয়া চাই। ওভেনের দরজা বেশীক্ষণ খোলা রাখলে তাপমাত্রা কমে যাবে।

পাঁচ.




বিশেষ উপলক্ষে চাই এরকম কয়েকস্তরের ক্রিম দেয়া কেক। এগুলোকে বলা হয় লেয়ার কেক। এই লেয়ারগুলো তৈরির জন্য গোল বা চারকোণা কেকপ্যানে আলাদা আলাদাভাবে বেক করা যায়, আবার একটা কেক বানিয়ে আড়াআড়ি একাধিক লেয়ার কেটে নেয়া যায়।

তারপর লেয়ারগুলোকে ক্রিমের পরত দিয়ে একটার উপর একটা করে বসানো হয়, ওপরে ও চারপাশে ক্রিম দিয়ে ঢেকে দেয়াকে আইসিং বা ফ্রস্টিং বলা হয়।



লেয়ার কেক তৈরির সময় খুব সাধারণ সমস্যা হলো কেকের ওপরের দিকটা ফেটে যাওয়া, সমানভাবে না ফুলে মাঝখানের দিকটা পাহাড়চূড়ার মতো ফুলে ওঠা। তখন কেকের ওপরের দিক থেকে সমান করে কেটে নিতে হয়।



কিন্তু অনেকসময় দেখা যায় এভাবে কাটতে গিয়ে কেকের বেশীরভাগ অংশই ফেলে দিতে হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানে সমানভাবে ফোলা কেকের জন্য কিছু টিপস:

১. ধাতব পদার্থ খুব দ্রুত তাপ পরিবহন করে। তাই কেকের বাইরের অংশ, যা কেকপ্যানের সংস্পর্শে থাকে, তাড়াতাড়ি বেক হয়ে শক্ত হয়ে যায়, বেশী ফুলতে পারেনা। মাঝখানের অংশে তাপ ধীরে ধীরে পৌঁছায় বলে সেটা সময় নিয়ে বেক হয়, বেশী ফোলে। এ অবস্থায় তাপের ভারসাম্য আনতে ওভেনে ঢোকানোর আগে কেকপ্যানের চারপাশে magi-cake-strip অথবা bake-even-strip নামের একটা জিনিস ভিজিয়ে আটকে দিতে হয়।

এই বস্তুর একটা ঘরোয়া বিকল্পের কথা বলছি। ১০০% সূতির টাওয়েল থেকে প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ-প্রস্থের স্ট্রিপ কেটে নিয়ে ভিজিয়ে নিংড়ে কেকপ্যানের চারপাশে ভালোমতো জড়িয়ে কাঠ বা ধাতুর তৈরি ক্লিপ বা পিন দিয়ে আটকে দিন। অথবা কয়েকস্তরে ভাঁজ করা কিচেন পেপার টাওয়েল অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ভাঁজের মধ্যে রেখে একইভাবে আটকে দিন। আর ওভেনে কেকপ্যান বসানোর পর একটা স্টিলের পেরেক কেকমিশ্রণের মাঝখানে উল্টো করে বসিয়ে দিন। অবশ্যই পেরেকের মাথার দিকটা সমতল হতে হবে, আর সেটা আগেই পানিতে ফুটিয়ে নিতে ভুলবেন না। কেক তৈরি হয়ে গেলে কেকপ্যান উল্টে কেক বের করার পর ঐ পেরেক সহজেই সরিয়ে নেয়া যাবে।
২. উপরের কৌশলের পরও যদি কেক মাঝখানে বেশী ফোলে তবে রেসিপি খেয়াল করুন। এটা যদি বাটার কেকের রেসিপি হয়ে থাকে অর্থাৎ এতে যদি বেকিং পাউডার বা বেকিং সোডা থাকে তাহলে এর পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিপরীতে কেক যদি মাঝখানে দেবে যায় তাহলে পরিমাণ কমাতে হবে।
৩. লেয়ার কেকের জন্য স্পন্জকেকের রেসিপি ব্যবহার করুন। বাটার কেকের চেয়ে এটা তুলনামূলকভাবে বেশী কুশলতা দাবী করে।

লেয়ার কাটার জন্য টিপস:
লেয়ারগুলো সমান পুরুত্বের হওয়া চাই। সমানভাবে কাটতে পারা চাই। serrated knife অর্থাৎ ধারালো প্রান্তে করাতের মতো এমন লম্বা ছুরি ব্যবহার করতে হবে। সামনে পিছনে আগুপিছু করে কাটতে হবে। সমানভাবে লেয়ার কাটার জন্য অনেক রকম ঘরোয়া উপায় আছে। দুপাশে সমান উচ্চতার কাঠের ব্লক রাখতে পারেন, যার উপর ছুরি আড়াআড়িভাবে ঠেকিয়ে লেয়ার কাটতে পারেন। অথবা নির্দিষ্ট উচ্চতায় কেকের পরিধি বরাবর কয়েকটা টুথপিক গেঁথে সে বরাবর আড়াআড়ি ছুরি চালাতে পারেন; নীচের ছবিতে দেখুন।


অথবা পেশাদারদের মতো কেক লেভেলার ব্যবহার না করলেও তার ঘরোয়া সংস্করণটি কিনতে পারেন।

ছয়.

প্লেইন কেক / পাউন্ড কেক রেসিপি
(উপকরণের মাপ, তাপমাত্রা, ভৌত অবস্থা, কেকপ্যান প্রস্তুতি, কেক কাটা ইত্যাদি বিষয়ে আগে আলোচনা করা হয়েছে। সেসব টিপস অনুসরণ করলেই ভালো কেক তৈরি করা সম্ভব।)

উপকরণ
ক.
চেলে নেয়া কেকের ময়দা :১৫০ গ্রাম (দেড় কাপ)
চিনি : ১০০ গ্রাম (আধ কাপ; চিনির মিষ্টতা কম হলে পৌনে এক কাপ নিতে পারেন)
বেকিং পাউডার : এক চা চামচের চারভাগের তিনভাগ
লবণ : চার ভাগের এক চা চামচ

খ.
মাখন (নরম) : ১৬০ গ্রাম

গ.
দুধ (তরল) : ৩ টেবিল চামচ (৪৫ গ্রাম)
ডিম (বড়) : ৩ টা (১৫০ গ্রাম; খোসা ছাড়া)
ভ্যানিলা এসেন্স : দেড় চা-চামচ (আধ টেবিল চামচ)

প্রণালী
১. ৮ইঞ্চি বাই ৪ইঞ্চি বাই ২.৫ইঞ্চি মাপের (এটা চার কাপ মাপের; ছয় কাপ মাপ পর্যন্ত যে কোন ব্রেডপ্যান বা বান্টপ্যান এই রেসিপির জন্য উপযুক্ত) ব্রেড প্যান উপুড় করে তার উপর বেকিং পেপার চেপে বসান। চার কোণায় ভাঁজ করে স্ট্যাপল করে নিন। প্যানের মাপের কাগজের লাইনার তৈরি হলো। এটাকে প্যানের ভেতরে বসান। ওভেন ৩৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে প্রিহিট করুন।
২. গ গ্রুপের উপকরণগুলো একটা বাটিতে হাল্কাভাবে মেশান।
৩. বড় মিক্সিং বোলে ক গ্রুপের উপকরণগুলো ৩০ সেকেন্ড ধরে মিক্সারের লো স্পিডে মেশান।
৪. সম্পূর্ণ মাখন এবং গ গ্রুপের মিশ্রণ থেকে খানিকটা (আন্দাজ তিনভাগের একভাগ) যোগ করুন। মিডিয়াম স্পিডে ১ মিনিট মেশান যাতে উপকরণগুলো সমানভাবে ভিজে আসে। এরপর স্পিড বাড়িয়ে সর্বোচ্চ করুন। গ গ্রুপের বাকী মিশ্রণ থেকে অর্ধেকটা করে দুই ধাপে মেশান। সর্বোচ্চ স্পিডে ৫ থেকে ৭ মিনিট মেশান। মাঝে দুতিনবার স্প্যাচুলা দিয়ে বোলের চারপাশ থেকে মিশ্রণ scrape করে মাঝখানে নিয়ে আসুন।
৫. মিশ্রণটি লাইনিং দেয়া কেকপ্যানে ঢালুন। উপরে স্প্যাচুলা দিয়ে সমান করে দিন। প্যানের ওপরের দিকে অন্তত আধইঞ্চি জায়গা ফাঁকা থাকবে।
৬. ৫০-৬০ মিনিট ধরে বেক করুন। বান্ট প্যানের ক্ষেত্রে ৩৫-৪৫ মিনিট লাগবে। এই ধাপে চতুর্থ পর্বে দেয়া টিপসগুলো অনুসরণ করুন।
৭. অন্তত তিন চতুর্থাংশ সময় পার হবার আগে কেক হয়েছে কিনা দেখার জন্য ওভেন খুলবেন না। ন্যূনতম সময় পার হলে কেকের মাঝামাঝি বরাবর একটা টুথপিক ঢুকিয়ে বের করে আনলে যদি ভেজা মিশ্রণ লেগে থাকে তাহলে বুঝতে হবে কেক এখনো হয়নি। আর পরিষ্কার কাঠি বের হলে (বড়জোর তৈলাক্ত গুঁড়ো লেগে থাকতে পারে) বুঝতে হবে কেক হয়ে গেছে।
৮. কেক হয়ে গেলে ১০ মিনিট প্যানের মধ্যেই রেখে ঠাণ্ডা করুন। প্যানটি এসময় একটা rack এর উপর রাখুন (পঞ্চম পর্বে গোল ও চারকোণা rackএর ওপর কয়েকটা কেক রাখা ছবি আছে)। নইলে তলায় ভেজা চিটচিটে হয়ে যাবে। ১০ মিনিট পর প্যান থেকে কেক বের করে কাগজ সরিয়ে rack এর উপর রাখুন। ঠাণ্ডা হলে serrated knife দিয়ে কাটুন।

গ্যাসের চুলার ওপর কেক বসাতে হলে পুরনো (এখন ব্যবহার করেন না এরকম) ভারী লোহার তাওয়া নিন। ওপরে এক ইঞ্চি পুরু করে পরিষ্কার বালি দিন। তার ওপর বড় সসপ্যান ধরনের পাত্র (তলা সমতল) বসান। এর ভেতর কেকপ্যান বসান। ঢাকনা দিন। আঁচ সর্বনিম্ম রাখুন। সবচেয়ে ভালো হয় বড় পাত্রের ভেতর একটা ওভেন থার্মোমিটার বসিয়ে তাপমাত্রা নির্ধারণ করে নিলে এবং এই সসপ্যানের ঢাকনাটা পুরু কাঁচের হলে ভালো হয়।
============================================
সাত

ফ্রুট কেক

উপকরণ
ক গ্রুপ:
ময়দা ২১০ গ্রাম
বেকিং পাউডার ২ চা চামচ
চিনি ১২০ গ্রাম
লবণ এক চা চামচের ৪ভাগের একভাগ
মাখন (নরম) ৯০ গ্রাম

খ গ্রুপ:
দুধ ৮০ সিসি
ভ্যানিলা এসেন্স ১ চা চামচ
ডিম (বড়) ২টি
আদা, চেরি ইত্যাদির মোরব্বা (glace' fruit) আধা-এক কাপ

প্রণালী
ওভেন প্রিহিট করতে হবে ১৮০' সে অথবা ৩৫০'ফা তাপমাত্রায়। একটা বান্টপ্যানে তেল স্প্রে করে রাখতে হবে।

মাখন ছাড়া ক গ্রুপের উপকরণগুলো মিক্সারে লো স্পিডে ৩০ সেকেন্ড ধরে মেশাতে হবে। মাখন দিয়ে ৩০ সেকেন্ড বা প্রয়োজন অনুযায়ী তারও বেশী সময় মিক্সারের লো স্পিডে মেশান।

মোরব্বা ছাড়া খ গ্রুপের উপকরণগুলো আলাদা বাটিতে কাঁটাচামচ দিয়ে মেশাতে হবে। প্রথম মিশ্রণের সাথে তিনবারে যোগ করতে হবে; প্রতিবার মিডিয়াম স্পিডে মিক্সারে ৩০ সেকেন্ড করে মেশাতে হবে।

হাই স্পিডে পাঁচ থেকে সাত মিনিট বিট করতে হবে। থেকে থেকে দুতিনবার স্প্যাচুলা দিয়ে বোলের চারপাশ থেকে মিশ্রণ scrape করে মাঝখানে নিয়ে আসুন।

কেকপ্যানে একটু কেকমিক্স ঢেলে কিছু মোরব্বার টুকরো ছড়িয়ে দিতে হবে। আবার কিছুটা কেকমিক্স, তার উপর মোরব্বা। এভাবে সম্পূর্ণ মিশ্রণ ও মোরব্বা কেকপ্যানে দেয়া হলে সবার ওপরে কেকমিক্সের স্তর থাকবে।

ওভেনে ৩৫-৪০ মিনিট বেক করতে হবে।

টিপস:
কেক বেক হবার পর যদি মনে হয় প্যানের আকার অনুযায়ী আরেকটু বড় কেক তৈরি করা যেতো, তাহলে এই রেসিপি দেড়গুণ করে আরেকটু বড় কেক বানানো যেতে পারে। বেকিং সময় ১০ মিনিট বাড়িয়ে দেবেন। দুই তৃতীয়াংশ সময়ের পর সচ্ছিদ্র এলুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে ঢেকে দিলে ওপরটা পুড়বে না।

চেরির মোরব্বা কেকমিক্সের মধ্যে তলিয়ে নীচে জমা হতে পারে। এই অবস্থা রোধ করতে মোরব্বাগুলো হাল্কা গরম পানিতে ধুয়ে পেপার ন্যাপকিনে শুকিয়ে নিতে হবে। চেরির মোরব্বা দুই ফালি করে কেটে নিতে হবে। আদার মোরব্বা, শুকনো অ্যাপ্রিকট ইত্যাদি ধারালো ছুরি দিয়ে ছোট টুকরো করে নিতে হবে। চালকুমড়ার মোরব্বা, কিসমিস, পেস্তা এসবও দেয়া যেতে পারে।





============================================
স্পঞ্জ কেকের সেরা রেসিপি এখানে পাওয়া যাবে। প্রথম পর্ব,
দ্বিতীয় পর্ব

সহজে খুব ভালো বাটারক্রিম তৈরীর রেসিপি এখানে পাবেন।

কেক ডেকোরেশনের প্রাথমিক ধারণার জন্য এখানে দেখুন।


=============================================


শেষ। আশা করি জেমিনির প্রয়োজন মিটেছে। ছবিগুলোর শেষ দুটো নিজস্ব। বাকীগুলো নেটে বিভিন্ন পণ্যবিক্রয়মূলক সাইট থেকে নেয়া। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/29021242 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/29021242 2009-10-06 07:33:48
অটিজম নিয়ে কিছু কথা ============================================

ঐ পোস্টের দু'টো মন্তব্য কোট করছি।
*পৃথিবীর অনেক প্রতিভাবানরাও অটিষ্টিক ছিলেন
*রেইন ম্যানের মত দু চারটা অটিস্টিক যদি জন্ম নিত বঙ্গদেশে!

‌এখানে মনে রাখা দরকার, অটিজম সম্পর্কে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। এর একটি হলো ASD (Autism Spectrum Disorder) আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী।
বাস্তবতা: অটিস্টিকদের কেউ কেউ হয়তো বিশেষ পরিস্থিতিতে খুব ভাল আইকিউ স্কোর করতে পারে অথবা বিশেষ কোন কাজে দক্ষতা দেখাতে পারে, কিন্তু এটা নিছকই ব্যতিক্রমী ঘটনা। সাধারণ অটিস্টিক জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য মিডিয়ায়, চলচ্চিত্রে বা সাহিত্যে সমাদৃত হবার মতো আকর্ষণীয় কিছু নয়। বিশেষ কোন দক্ষতার অধিকারী অটিস্টিককে নিয়ে লিখিত উপন্যাস পড়ে, কিংবা তাকে নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি বা চলচ্চিত্র দেখে অনেকে ধারণা করে নেন ASD আক্রান্ত সবারই বিশেষ কোন প্রতিভা থাকে (যেমন গণিতে ভাল হওয়া)। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র রেইনম্যানে ডাস্টিন হফম্যানের চরিত্র, অথবা আইনস্টাইনের অটিজম থাকার প্রসঙ্গ অনেকেই জানেন এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে ভালবাসেন। বাস্তবতা হলো আমেরিকায় শিশুদের প্রতি ১৫০ জন একজন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৬০ জনে একজন শিশু অটিজম আক্রান্ত। যাদের অধিকাংশই ম্যাথ-জিনিয়াস হওয়া দূরে থাক, খুব সাধারণ দৈনন্দিন কাজকর্মেও অন্যের উপর নির্ভরশীল।
=============================================

আরেকটি মন্তব্য দেখা যাক।
*ইদানীং বাংলাদেশে শোনা যাচ্ছে।

বাস্তবতা: অটিজম বাংলাদেশে একেবারে নতুন কিছু না। স্রেফ শনাক্ত করা হয়নি বা হয়না বলেই আগে শোনা যেতোনা। অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে; বাংলাদেশে মাত্র কয়েক বছর আগেও চিকিৎসকদের অনেকেই (এমনকি শিশু বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও কেউ কেউ) ছিলেন যারা অটিজম সম্পর্কে সেভাবে সচেতন ছিলেন না। এই তথ্যটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অর্জন। কেউ আপত্তি করলে সবিনয়ে জানাতে চাই, জনৈক চক্ষুবিশেষজ্ঞ আমার অটিজম-আক্রান্ত সন্তানের চোখের সমস্যার জন্য আইড্রপ দিতে গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ দেখে প্রচণ্ড বিরক্ত হন। তখনই নাকি এই অটিজম টার্মটি সম্পর্কে উনি প্রথম জানতে পারেন। আরেকবার এক শিশু শল্যবিশেষজ্ঞ এই টার্মটি শুনে তখনই আবার হাসিমুখে অটিস্টিক-এর নিষ্ঠুর বঙ্গানুবাদ করেন: ভোদাইস্টিক। এখনও খুব বেশী আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন আসেনি এই অবস্থার। পনেরষোলকোটির দেশে একজনও স্পিচ থেরাপিস্ট নেই এবং স্পিচ থেরাপির গুরুত্ব বিষয়ে উন্নত বিশ্বে যতোটা জোর দেয়া হয়, আমাদের চিকিৎসকরা অভিভাবকদের কাছে বিষয়টি সেভাবে উপস্থাপন করেন বলে মনে হয়নি।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, ইউএসএ'তে ষাটের দশকে প্রথম অটিস্টিক শিশুকে চিহ্নিত করা হয়। তবে তখন একে অব্যাখ্যায়িত অক্ষমতা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ১৯৯১ সাল থেকে special education exceptionality হিসেবে অটিজমকে অন্যান্য শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতার বাইরে স্বতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত করা হয়। বর্তমানে এটা fastest-growing developmental disability এবং বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১০-১৭% (অটিজম সোসাইটি অফ অ্যামেরিকা'র ২০০৬ সালের তথ্যানুযায়ী)। পৃথিবীতে মাত্র চারটি দেশে অটিস্টিকদের সংখ্যার হিসাব রাখার ব্যবস্থা আছে (ইউএসএ, ইউকে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়; তাও সর্বত্র অপেক্ষাকৃত মৃদু মাত্রার অ্যাসপারগার সিনড্রোম ও PDDNOS (Pervasive developmental disorder not otherwise specified) কে হিসেবের মধ্যে ধরা হয়না। এইসব দেশের হারকে ব্যবহার করে অন্যান্য দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে অটিস্টিকদের অনুমিত সংখ্যা হিসাব করা হয়)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশের কোথাও কোথাও অটিস্টিকদের সংখ্যা ৫০০%-১০০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হার নিঃসন্দেহে আতঙ্কজনক। স্থানবিশেষে অটিস্টিকদের সংখ্যাবৃদ্ধির অস্বাভাবিক উচ্চহারের কারণ হিসেবে পরিসংখ্যানিক প্রক্রিয়ার আওতার পুনঃনির্ধারণকে হয়তো দায়ী করা যেতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হল এই হার সত্যিই বাড়ছে।
============================================

একই মন্তব্যের দ্বিতীয় অংশ:
*চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে।

বাস্তবতা: অটিস্টিক শিশু কখনোই পুরোপুরি সেরে উঠবে না। তারপরও, মৃদু মাত্রার অটিজম, যেমন অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা, সমর্থন ও শিক্ষা পেলে পরিণত বয়সে আত্মনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব। বাকীদের বেলায়, উচ্চমাত্রার অটিজমের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সেও অন্যের সাহায্য ছাড়া কখনোই স্বনির্ভর দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্ভব নয়।

============================================
============================================

এবার একান্তই আমার নিজের কিছু কথা।


অটিজম আক্রান্ত শিশুর পিতামাতা কী জীবন যাপন করেন, তারা ছাড়া আর কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব না। আমার অনুরোধ, তাদের প্রতি কোনরকম সান্ত্বনাবাণী দেবেন না। তাদেরকে এই সমস্যা মোকাবেলায় সাহায্য করুন। এটা দৈবক্রমে সেরে যাবেনা, তাদেরকে যা করতে হবে তা হলো মন স্থির করে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে শিশুটির সঙ্গে কঠোর পরিশ্রমসাধ্য কার্যকর সময় ব্যয়।

অটিজম আক্রান্ত শিশুকে অর্থপূর্ণভাবে কথা বলা, অন্যের সঙ্গে কমিউনিকেট করা, অন্যের ডাকে সাড়া দেয়া, অন্যের সঙ্গে আইকন্ট্যাক্ট করা, গ্রস মোটর অ্যাক্টিভিটি (হাঁটা, দৌড়ানো, হামাগুড়ি দেয়া, লাফানো, এক পায়ে লাফানো ইত্যাদি), ফাইন মোটর অ্যাক্টিভিটি (আঙুল দিয়ে কোন বস্তু (যেমন পেন্সিল) ঠিকভাবে ধরা, বোতাম লাগানো, কাগজ বা কাপড় ভাঁজ করা বা কাটা, হাত রগড়ে ধোয়া, হাত থেকে পানি ঝাড়া) ইত্যাদি কাজ শেখানো অকল্পনীয় ধৈর্য্য, সময় ও শ্রমসাপেক্ষ। স্বাভাবিক শিশুরা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকেই এতো স্বতঃফূর্তভাবে এসব শেখে যে আমরা ধারণাই করতে পারিনা এগুলো কোন বিশেষ "কাজ" কিনা আর সেসব "শেখাতেই" বা হবে কেন।

আমার সন্তান মাঝারি ধরণের অটিজমের শিকার; তাকে কথা শেখানোর জন্য অনর্গল গল্প বলে যেতে হয়েছে, অন্য কারো সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের সংলাপ আদানপ্রদানের পুনরাবৃত্ত অভিনয় দেখাতে হয়েছে বার বার। তার আগ্রহ অনুযায়ী খেলনা, চারপাশের জীবজড় নির্বিশেষে সবার মুখে সংলাপ বসিয়ে গল্প বলে যেতে হয়েছে। এই কাজ করতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আমার গলায় ঘা হয়ে গিয়েছিলো সেই সময়। সে সাইকেলে উঠে বসে থাকতো, প্যাডেলে চাপ দেয়ার সাধারণ ব্যাপারটা শেখানোর জন্য আমাকে তার পায়ের পাতা হাত দিয়ে চেপে ধরে তার সাইকেলের পাশে পাশে প্রায় হামাগুড়ি দিতে হয়েছে প্রতিদিন অন্তত আধাঘন্টা করে ছয় মাস। প্রতিদিন অন্তত আধাঘন্টা ধরে তাকে জামার বোতাম লাগাতে শেখাতে হয়েছে। কিছুক্ষণ বিছানায় পাশাপাশি দুটো জামা রেখে; একটা বোতাম নিজে লাগিয়ে তাকে দেখিয়ে, এবং একই কাজ তাকেও রিপিট করতে হবে সেটা বোঝাতে হয়েছে। আয়নার সামনে দুজনকেই দাঁড়াতে হয়েছে, পরে থাকা জামার বোতাম লাগিয়ে-খুলে আয়না দেখে দেখে প্র্যাকটিস করাতে হয়েছে। এভাবে প্রায় একবছর পর সে প্রথম নিজে নিজে বোতাম লাগাতে সক্ষম হয়। তেমনি পেন্সিল ধরে লেখা শেখানো। অসংখ্য তুচ্ছাতিতুচ্ছ অথচ দৈনন্দিন কাজ। এসব কাজ শেখানোর সময় সবচেয়ে কঠিন কাজটা হলো তার মনোযোগ আর দৃষ্টি ধরে রাখার জন্য অনর্গল তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এমনভাবে বুঝিয়ে বুঝিয়ে কথা বলে যাওয়া।

এতো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, এই স্নায়ুক্ষয়ী দীর্ঘমেয়াদী পরিশ্রমে শিশুর অভিভাবককে উদ্বুদ্ধ করুন। আইনস্টাইন অটিস্টিক ছিলেন-- এই ধরণের স্টুপিড উদাহরণ না দিয়ে এভাবে শ্রম আর সময় দেয়ার পর শিশুর উন্নতি দেখলে তাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করুন। শিশু তার ঘাটতি কমিয়ে আনবে এমন প্র্যাক্টিক্যাল আশাবাদ দিন। দয়া করে আমার সেই অর্বাচীন আত্মীয়টির মতো বলবেননা, "এইসব কোন ব্যাপার, সব ঠিক হয়ে যায়, দুইদিন আগে আর পরে। আর তুই করলি কী, ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে বেবীসিটিং! এতো পড়াশোনা তাহলে কেন করলি!" ব্লগে অটিজম নিয়ে পোস্ট দিতে গিয়ে নিষ্ঠুর থেকে শুরু করে অশ্লীল রসিকতা পর্যন্ত পেয়েছি। যে দেশের শিশু বিশেষজ্ঞ একটা শিশুকে "ভোদাইস্টিক" বলতে পারেন, সে দেশে শিক্ষিত লোকের জন্য এসব আসলে কোন ব্যাপারই না। তাদের বলি, দয়া করতে না পারলে স্রেফ অফ যান, শুধু নিষ্ঠুরতা দেখাবেন না প্লিজ। সেটা এক নিয়তিই আমাদের যথেষ্ট দেখিয়েছে।







আগ্রহীরা দেখতে পারেন--
http://www.nushera.com/taxonomy/term/25
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28987302 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28987302 2009-08-01 22:29:32
প্রতিদিন শত তুচ্ছে: ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই বৃষ্টি, আরো বৃষ্টি...
বছরের প্রথম বৃষ্টি নেমেছে ঢাকায়; ইমেইল, ফেইসবুক হয়ে ব্লগেও ছুঁয়ে গেছে অবিশ্রান্ত ধারাপাত; টুপটাপ, ঝিরঝির ঝুপঝুপ ঝমঝম। বৃষ্টিপ্রিয়তা আমাদের কোষেকোষে রন্ধ্রেরন্ধ্রে; একটুখানি উস্কে দিলেই বাদলাহাওয়া ভেজামাটি সোঁদাগন্ধ সপসপে-জুতো স্রোতনামা-ছাতারা কেবলই মন ভেজায়, চোখে বাষ্প জমায়। অন্য গোলার্ধে অন্য জলহাওয়া; তবু দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, ভিজে যাচ্ছি, ভিজে যাচ্ছি, মন ভাল হয়ে যাচ্ছে, মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে...........

বর্ষা আমার চোখের প্রিয় ঋতু, তবু ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়োনা। এমন দিনে তারে বলা যায়।


আসে হেমন্ত জীবনানন্দে...



আবহাওয়া দফতরের হিসেবমতো গ্রীষ্ম শেষ হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। এখন অটাম; গোড়াতে যদিও সামারেরই এক্সটেনশান; কিছুদিন যাবার পর শরৎ এলো কিনা বোঝার আগেই ঊষাগোধূলিতে হেমন্তের হিম। পথের ধারে বছরব্যাপী নির্লিপ্ত ঘনসবুজ গাছের সারি এই সময়টাতে এসে গোলাপি-বেগুনীর কণা ঝরিয়ে চলছে অবিরাম। আদুরে কোন নাম হয়তোবা আছে তার, কেউ মনে রাখেনা। হে-ফিভার-ফ্লাওয়ার বদনামটাই জুড়ে বসে গেছে কোমল পলকা রেণুকণায়। কঠিনপ্রাণ ড্যান্ডেলিয়নের দীর্ঘ আয়ুও ফুরিয়ে এলো বলে; আরো বেশী স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা পেতে হলদে পাপড়ির ডগা শুকিয়ে তুলো উড়িয়ে কাঁটাময় বীজে সবান্ধব বসতি গড়ছে সে।



আছিগো মা বিপদে...
-ঘটনা কী? ফোন ধরোনা, জিটকে আসোনা, ফেইসবুকে লালবাতি
-হে হে হে, বাত্তি নাইগো কব্বরে...
-এইসব বাদ দাও। পয়লাবৈশাখ সামনে মনে আছে?
-নাহ্ নাই, মনে রাইখা ফায়দা কী!
-ঢং কর, না? শোন, এইবার আর ওপেন প্রোগ্রাম হবেনা, বুঝছ তো সময় খারাপ, স্পন্সর পাওয়া যায়না... টিকেট কাটা লাগবে... দেশ থেকে শিবলিনীপা আসবে তো, আর নাটক...
-তাতে আপ্নের কী?
-আমার কী মানে! আমি গান গাইবোনা? তুমি তো আমার সাথে বাজাবাই, আর...
-আপ্নে গান, নাচেন, নাটক করেন যা খুশি করেন। এই বান্দীর চিত্তে এত সুখ নাইগো সুন্দরী খাতুন
-হিহিহিহি, তুমি একটা লেডি কমেডিয়ান...

এইখানটায় এসে ব্যাখ্যাতীত কোন কারণে ব্লগের কোনও "লেডি"র কথা মনে পড়ে যায় আমার। আরেকটা উইন্ডো খুলে সেখানে ঢুকে পড়ি, চলতি জাগতিক জটিলতার ভয়াবহ দিশাহীনতার কার্যকারণ শহরের সুনামী সুকণ্ঠীকে বোঝানো হয়না আর।

বড় মায়া হে...
ঘরে পোষা পশুপাখির হাতবদলের সময় পুরনো মালিক চোখ মোছেন; ছোটবেলায় ‌এদৃশ্য অনেকবার দেখেছি। অপরাহ'র টকশোতে মনোবিদ উপায় বাতলান স্মৃতিকাতরতার বোঝাক্রান্তকে; পূর্বপুরুষ থেকে উত্তরপুরুষের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তুগত স্মৃতির কোন নমুনাই ফেলতে না পেরে বোঝাই-ঘরে যিনি নিজেই জায়গা পাচ্ছেন না। সেই তিনিও শেষ পর্যন্ত ডাম্পিং গ্রাউন্ডের ধারে জঞ্জালমুক্তির আনন্দে কিংবা বেদনায় অশ্রুসিক্ত হন। নতুন সঙ্গী এসেছে আমার; কন্যার আক্রমণে জর্জরিত প্রায়-অকেজো প্রাচীন সঙ্গীকে ছাড়তে পারছিনা তারপরও। থাকুক সে এককোণে পড়ে, চোখের আড়ালে, তবুও থাকুক। আমার কাছে থাকুক, তবু আমার কাছে থাকুক।




ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই...
শিশুর মুখে আধোআধো বোলে কতকিছুই না ফোটে। শব্দের ছোট্ট ভাণ্ডারটি বাক্যে গাঁথার আগেই মায়ের মুখে শোনা ঘুমপাড়ানি গানের সুর ভাঁজে সে। অল্পপ্রাণ-মহাপ্রাণের ঝামেলায় না গিয়ে নিজস্ব-সৃজনের সংক্ষিপ্ত বর্ণমালায় কতোকি ছড়া কাটে চাঁদের কণা। তারপরও এই সুর, এই ছড়া সব মা সময়মতো শুনতে পায় না; কারও অপেক্ষার পালা কখনওবা শেষ হয়; বাকীরা হয়তো একসময় অপেক্ষা করতেও ভুলে যায়।

চাঁদের কণার মুখে একচিলতে ছড়া বা একটুখানি গানের আশা করতে করতে কত কতো দিন গেছে আমার। কতবার মনে হয়েছে, এবার আশা ছাড়ি। অবশেষে কাল রাতে প্রথম সুর ভাঁজল সে, দ্বিধাজড়ানো স্বরে, অস্ফুট উচ্চারণে। তারপরও বুঝতে অসুবিধা হলোনা কী গাইছে সে, "ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই... "। বুকে চেপে ধরি আকাশ থেকে নেমে আসা চাঁদটাকে।

সেই থেকে এই গান-- বাবু, চঞ্চল, বা কৃষ্ণকলির নয়, আমার ছোট্ট অপনার গান হয়ে-- বুকের গভীরে বেজে চলেছে, বেজেই চলেছে; তার কিংবা আমার এক পৃথিবী দীর্ঘশ্বাসের সমান দৈর্ঘ্যের অসহায়ত্ব নিয়ে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28931189 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28931189 2009-03-30 10:14:31
সুপ্ত অক্ষমতা: শিশু ও আমরা - ৬ স্পিচ থেরাপির প্রাথমিক ধারণা

অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে যাদের ইনটেলেকচুয়াল ডিজেবিলিটি নেই, অর্থাৎ অ্যাসপারগার সিনড্রোমে ভুগছে, এমন শিশুদের ১০-২০% নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যায় চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো একটু একটু করে কমিয়ে আনতে পারে, এবং কিছু অসুবিধা সত্ত্বেও একসময় সাধারণ স্কুলে স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়ালেখা করতে পারে। আরো ১০-২০% শিশু স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়তে না পারলেও বাসায় থেকে বা বিশেষায়িত স্কুলে নিবিড় যত্নসহ পড়ার সুযোগ পেলে, ভাষা সহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ নিয়ে সমাজে মোটামুটি স্বনির্ভর একটা স্থান করে নিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যার অন্যতম ব্যবহারিক উপায় হলো স্পিচ থেরাপি।

স্পিচ প্যাথোলজি বা স্পিচ থেরাপির আওতা যথেষ্ট বিস্তৃত। বাকযন্ত্রের গঠনজনিত কারণে কথা শেখার সমস্যা থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতির কারণে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বা মিথস্ক্রিয়ার সমস্যা-- এরকম বহুবিধ সমস্যার সমাধানে এর কার্যকর প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব। এখানে স্পিচ থেরাপির কিছু ব্যবহারিক কৌশলের ওপর আলোকপাত করার চেষ্টা করব। বলে নেয়া দরকার, শুধু মৃদু বা মাঝারি মাত্রার অটিজম আছে এমন শিশুরাই নয়, স্বাভাবিক বা মেইনস্ট্রিম শিশুদের মধ্যে যাদের অতিচঞ্চলতা, অস্থিরতা, শারীরিক আঘাতের প্রবণতা বা অমনোযোগিতার মতো আচরণগত সমস্যা আছে, তাদের জন্যও এসব কৌশল যথেষ্ট উপকারী।



এখানে যে কৌশলগুলো দেখানো হবে (পরবর্তী পর্ব থেকে), সেগুলো মূলতঃ কিছু স্ট্রাকচার্ড প্লে; যেগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন listening, watching, thinking, doing, sharing ও turn-taking এর মাধ্যমে থেরাপিস্টের সঙ্গে শিশুর মিথস্ক্রিয়া নিশ্চিত হয়। শিশুর সঙ্গে থেরাপিস্ট (এখানে 'শিক্ষক' টার্মটি ব্যবহার করা হবে) এগুলো খেলবেন। শিশু ও শিক্ষক মুখোমুখি বসবেন। তুলনামূলকভাবে ছোট মাপের চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করতে হবে; যাতে করে সহজে শিশুর সঙ্গে শিক্ষকের আই-কন্ট্যাক্ট ঘটে, এবং শিশুর মনোযোগের কেন্দ্রীভবন বাধাগ্রস্ত না হয়। মোটামুটিভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক বয়স আড়াই থেকে তিন বছর-- এমন বয়সগ্রুপ থেকে এই কৌশলগুলো প্রয়োগযোগ্য। শিশু অভ্যস্ত বা দক্ষ হওয়া পর্যন্ত নিয়মিতভাবে একই কৌশলের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। তারপর ক্রমান্বয়ে আরেকটু চিন্তাভাবনা করার সুযোগ আছে, এমন কাজ বা খেলাগুলোতে অগ্রসর হওয়া যাবে।

প্রতিবারে ৫/৬টি স্ট্রাকচার্ড প্লে করলে ভাল হয়। এসবের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের মধ্যে সংশ্লিষ্ট খেলনা, কার্ড, কাগজ, রংপেন্সিল, ইত্যাদি ছাড়াও আরো কিছু জিনিস লাগবে। যেমন দু'টো কার্ড; যার একটাতে "help" আর দ্বিতীয়টাতে "wait" লেখা (সঙ্গে উপযুক্ত ভাব-প্রকাশক কোন প্রতীক বা ছবি আঁকা)। কোন কাজ করতে গিয়ে শিশুর সমস্যা হলে তাকে "help" লেখা কার্ডটা তুলে ধরে শিক্ষকের সাহায্য চাইতে হবে। আবার কখনও শিক্ষকের নির্দেশনা পুরোপুরি না শুনে শিশু খেলা শুরু করলে, অথবা শিক্ষকের পালার সময় নিজে খেলতে চাইলে, কিংবা অন্য কোন অবস্থায় প্রয়োজন বুঝে "wait" লেখা কার্ডটি তুলে ধরে শিক্ষক তাকে অপেক্ষা করতে বলবেন। এই অভ্যস্ততা শিশুকে দৈনন্দিন জীবনে যে কোন কাজে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যের সাহায্য চাইতে এবং ধৈর্যশীল হতে শেখাবে।

যেসব কাজ বা খেলা করা হবে; তার উপকরণ, খেলনা ইত্যাদি খেলাশেষে গুছিয়ে রাখার জন্য টেবিলের নীচে বা মেঝেতে একটা খালি বাক্স রাখতে হবে। বাক্সের গায়ে দাবার ছকের মতো সাদাকালো খোপকাটা থাকবে, যেটা থেকে বোঝা যাবে এর নাম ফিনিশ-বক্স। টেবিলের একপাশে বা দেয়ালে থাকবে একটা ছোট আয়তাকার বোর্ড বা ওয়াল-হ্যাং; যাতে এক সারিতে বা এক কলামে সাজানো থাকবে খেলাগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করে এমন সব প্রতীক। এই প্রতীকগুলো হবে শক্ত কাগজ বা কার্ড কেটে তৈরি করা (ল্যামিনেট করে নিলে ভাল হয়); যাতে ছবি এঁকে ও লিখে একেকটা কাজ বা খেলা বোঝাতে হবে। সবশেষে থাকবে একটা ফিনিশ-পকেট; সাদাকালো খোপকাটা [ধারণা দেয়ার জন্য পরবর্তী ছবিতে এধরণের একটা নমুনা দেয়া হলো; অবশ্য এটা স্কুল-রুটিনের]।



প্রথম খেলাটি শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে তার উপকরণ/খেলনা গুছিয়ে ফিনিশ-বক্সে রাখবে শিশু। এরপর সে বোর্ড থেকে প্রথম প্রতীকটি সরিয়ে ফিনিশ-পকেটে রেখে দেবে। তারপর সে পরবর্তী প্রতীকটি দেখে শিক্ষককে বলবে পরবর্তী খেলা বা কাজটি কী। এভাবে প্রতিবার খেলনা গোছানো আর প্রতীক সরানোর মধ্য দিয়ে কাজের সূচনা, সিকোয়েন্স বা পর্যায়ক্রম, রুটিন, অপেক্ষা, সমাপ্তি-- এই প্রত্যয়গুলো সম্পর্কে শিশুর ধারণা জন্মাবে।



......... ক্রমশঃ

পর্ব-১
পর্ব-২
পর্ব-৩
পর্ব-৪
পর্ব-৫
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28930279 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28930279 2009-03-27 22:29:52
সুপ্ত অক্ষমতা: শিশু ও আমরা - ৫
চার থেকে ছয় বছর বয়সী অটিস্টিক শিশুদের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য
স্বাভাবিক বা মূলধারার শিশুরা সাধারণত চার বছর বয়সের মধ্যেই অন্যদের-- বিশেষ করে সমবয়সীদের-- চিন্তাধারা, কথাবার্তা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এসব সম্পর্কে ধারণা করতে শেখে। স্কুলে বা ঘরোয়া খেলার আসরে অন্যকে দেখে সে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে একটা বিশেষ খেলায় অংশগ্রহণের জন্য তার ঠিক কী করতে হবে। সে অনুযায়ী দৌড়াদৌড়ি, লাফঝাঁপ, হৈহল্লায় সে নিজেকে নিয়োজিত করে ফেলে। এই প্রক্রিয়াটি এত স্বত:স্ফূর্তভাবে ঘটে যে কীভাবে ঘটল তা আমাদের নজরে আসেনা। কিন্তু অটিস্টিক শিশুরা এ বয়স থেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে যায়। অন্যরা কি করছে- বা ভাবছে এ সংক্রান্ত চিন্তা করার মতো অবস্থা তাদের থাকেনা।

আমাদের দেশে একসময় শিশুরা পাঁচ বা ছ'বছর বয়সের আগে স্কুলে যেতনা। কিন্তু এখন তিন-চারের মধ্যেই প্লে-গ্রুপ বা কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। অটিজম সম্পর্কে বাবা-মায়ের সম্যক জ্ঞানের অভাবে অনেকসময় শিশুর অস্বাভাবিকতা পরিবারে তেমন আমলে আনা হয়না। কিন্তু স্কুলে অভিজ্ঞ ও যত্নশীল শিক্ষকের পক্ষে এধরণের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রথমত শিশুর আচরণ লক্ষ্য করে, দ্বিতীয়ত সমবয়সী অন্য শিশুদের সঙ্গে আচরণের তুলনা করে, তৃতীয়ত গ্রুপ ওয়ার্ক বা দলগত কাজে শিশুর বিসদৃশ পারফর্ম্যান্স দেখে। প্রথম দুটি সহজেই অনুমেয়; শিশুর অন্যমনস্কতা, একটা বিশেষ কাজ বারবার করতে চাওয়া, পাঠক্রমে বা ক্লাসরুমের পরিবেশ সম্পর্কিত কোন রদবদলে তীব্র অস্বস্তি বা প্রতিক্রিয়া, বন্ধুত্ব স্থাপন বা কথাবার্তায় অনীহা বা অক্ষমতা, প্রচন্ড ভীতি-লজ্জা, অন্যকে বা নিজেকে আঘাত করা-- এসব বিষয় শিক্ষকের দৃষ্টি এড়ানোর কথা না। গ্রুপ ওয়ার্ক বিষয়ক তৃতীয় ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

ধরুন পাঁচজন শিশুকে একটা টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসিয়ে শিক্ষক কোন কাজ করাবেন, যাতে turn-taking, sharing, group performance ইত্যাদি বিষয় জড়িত। হয়তো পাঁচজনের হাতে পাঁচটা রং পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে শিক্ষক কাগজে পাঁচ পাপড়ির একটা ফুল আঁকলেন। তারপর প্রথম শিশুটিকে দিলেন। নির্দেশনা অনুযায়ী সে হাতের রং-পেন্সিল দিয়ে একটা পাপড়ি রং করে কাগজটা এগিয়ে দিল পাশের জনকে। এভাবে শেষ জনকে দিয়ে পুরো ফুলটি রং করার কাজ সম্পন্ন হবার কথা। প্রথম বা দ্বিতীয় শিশুটির পরে আর নির্দেশনার প্রয়োজন হবার কথা না। কারণ স্বাভাবিক আগ্রহ থেকেই অন্য শিশুরা দেখবে কী করতে বলা হচ্ছে, তার "part" এখানে ঠিক কতটুকু। আগের জনের কাছ থেকে কাগজটা নিতে হবে, তারপর নিজের কাজটুকু করে পরের জনের কাছে হাতবদল করতে হবে। কিন্তু এদের মধ্যে যদি একজন অটিস্টিক শিশু থাকে, তবে সেক্ষেত্রে এই ঘটনাগুলো ঘটতে পারে--
১. শিক্ষক যখন কাজটি শুরু করছেন, তখন আই কন্ট্যাক্টের অভাবে বা অন্যমনস্কতার কারণে সেটা সে খেয়াল করবেনা।
২. একই ভাবে তার পূর্ববর্তী শিশুরা কী করছে, কেন করছে-- সেদিকেও তার নজর থাকবেনা। বা তাকিয়ে থাকলেও "সিকোয়েন্স"-এর ব্যাপারটা সে ধরতে পারবেনা।
৩. তাকে যখন কাগজটা এগিয়ে দেয়া হবে, তখন সে বুঝতেই পারবেনা কেন এটা তাকে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোন প্রশ্ন করে সেটা জানতে চাইবে না। তার তখন চেষ্টা থাকবে এই বিষয়টা থেকে চোখ সরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু দেখার, করার বা বলার; অথবা অসংলগ্ন আচরণ করার।
৪. শিক্ষক তার কাছে গিয়ে বারবার বুঝিয়ে হাতে ধরে সাহায্য করলেও সে শুধু রং ঘষে তার "part" শেষ করবে। পরবর্তীজনের কাছে pass করার কাজটি সে করবেনা। কারো দিকে তাকাবেই না।

এখানে লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো, তাকে একা যদি একটা ছবি আর ক্রেয়ন দিয়ে বসিয়ে দেয়া হতো, সে হয়তো ঠিকই পুরো ছবিটা রং করে ফেলত। কিন্তু গ্রুপে করতে দেয়ায় তার সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতাগুলো প্রকটভাবে ধরা পড়বে। আমাদের দেশে ক্লাসরুমে শিশুদের গ্রুপ-ওয়ার্কের সুযোগ মেলে কম। কিংবা আদৌ মেলেনা। তাই অটিজম বা অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের অস্বাভাবিকতা সেভাবে ধরা পড়ে না। তারা বরং অমনোযোগী, অমিশুক প্রকৃতির, মেধাহীন বা স্বল্প বুদ্ধির ব্যাকবেঞ্চার হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে পড়ে।

এ বয়সী অটিস্টিক শিশুদের আরও কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা বলা যেতে পারে, যেগুলো অনেকের মধ্যেই দেখা যায়।

* হাত নেড়ে টা-টা দেয়ার সময় অনেকে হাতের তালু নিজের দিকে মুখ করিয়ে রাখে। কারণ অন্যদের টাটা দেখার সময় সে দেখে যে হাতের তালুটা তার দিকে মুখ করা।

*কিছু দেখার সময় হঠাৎ হঠাৎ বস্তুটি চোখের একেবারে কাছে এনে দেখে যা দেখে মনে হতে পারে তার দৃষ্টিশক্তিতে কোন সমস্যা আছে অথবা সে খুব ক্ষুদ্র কিছু নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করার চেষ্টা করছে।

* অন্য কাউকে ছবি, বই, বা কার্ডজাতীয় কিছু দেখাতে হলে সে ছবিটা তার নিজের দিকে ফিরিয়ে রাখবে, আর উল্টো পিঠটা দেখাবে।

* কারো সঙ্গে দেখা হলো বা বাড়ীতে কেউ এলো, শিশুকে তখন কিছু সাধারণ সহবত শেখানো হয়, যেমন সালাম/আদাব দেয়া বা উইশ করা। অটিস্টিক শিশুর জন্য এই সামান্য কাজটিই অত্যন্ত কঠিন। কারণটি বিস্তৃত করা যাক। এক্ষেত্রে ১.মানুষটিকে চেনা, ২.নাম/পরিচিতিসূত্র মনে করা, ৩.মুখ খুলে কথা বলা আর ৪.পূর্বোক্ত তিনটি কাজ করার সময় মানুষটির সঙ্গে আই-কন্ট্যাক্ট বজায় রাখা-- এই চারটি কাজ একসঙ্গে করার মতো চাপ তার নার্ভ নিতে পারেনা। তাই দেখা যায়, পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলেও সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে বা মুখ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বারবার বলার পর বা জোর করা হলে হয়তো কোনমতে এক ঝলক আই-কন্ট্যাক্ট করেছে তো কথা জড়িয়ে ফেলেছে।

* তাকে বিশেষ কোন জায়গায়, যেমন মার্কেটে বা স্কুলে নিয়ে যাওয়া হবে, সেটা সে জানে। রেডি হয়ে দরজা খুলে দেখা গেল একটা পাখী বসে আছে বা খবরের কাগজ এসেছে। বাবা বা মা হয়তো সেটা নিয়ে কোন কথা বললেন। দেখা যাবে, পরবর্তীতে যখনই স্কুলে বা মার্কেটে যাবার কথা আসবে বা তাকে সেখানে যাবার জন্য রেডি করানো হবে, সে বলে উঠবে "পাখী এসেছে" বা "পেপার দিয়েছে" যদিও তার কোনটিই ঘটেনি। আগেরবারের ঘটনাটি তার মাথায় গেঁথে গেছে; সে যেটার পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। এই ব্যাপারটা একই সময়ে ঘটে যাওয়া যে কোন ধরণের একাধিক কাজ/ঘটনার ক্ষেত্রে ঘটতে পারে।

এমন অবস্থা কতদিন চলবে?
অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে যাদের ইনটেলেকচুয়াল ডিজেবিলিটি নেই, অর্থাৎ অ্যাসপারগার সিনড্রোমে ভুগছে এমন শিশুদের অনেকে নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যায় চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো একটু একটু করে কমিয়ে আনতে পারে, এবং কিছু অসুবিধা সত্ত্বেও একসময় সাধারণ স্কুলে স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়ালেখা করতে পারে। আরো ১০-২০% শিশু স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়তে পারে না, তারা বাসায় থাকে বা তাদের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত স্কুল ও বিশেষ প্রশিক্ষণের। বিশেষায়িত স্কুলে পড়ে, ভাষা সহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ গ্রহন করে তাদের পক্ষে সমাজে মোটামুটি স্বনির্ভর একটা স্থান করে নেয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু বাদবাকি প্রায় ৬০% অটিস্টিক শিশু, সব ধরণের সহায়তা পাওয়ার পরও স্বাধীন, স্বনির্ভর ও এককভাবে জীবন অতিবাহিত করতে পারে না। তাদের নিয়তি বা বাস্তবতা হলো দীর্ঘ দিনের-- এমনকি সারা জীবনের জন্য অন্যের উপর নির্ভরতা। পরিবারে অথবা বিশেষ আবাসনে, বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রয়োজন হয় তাদের।

অটিস্টিক শিশুর চিকিৎসা
এই চিকিৎসা সাধারণত তিনটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে দেয়া হয়।
১. অস্বাভাবিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য শিশুর বাবা মা এবং/অথবা অনুরূপ অভিভাবককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান। সময় ও যত্নসাপেক্ষ চর্চায় তারা বাড়িতে শিশুর আচরণগত পরিবর্তন আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। এই কাজটি সফলভাবে করা সম্ভব হলে পরিবার ও সমাজে ভবিষ্যতে শিশুটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্পিচ থেরাপিস্ট ও মনোবিদের পরামর্শ জরুরী। (এই ব্যাপারটিতে কিছু সহযোগিতার চেষ্টা আগামী পর্বগুলো থেকে থাকবে।)
২. বিশেষায়িত স্কুলের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুকে একদিকে যেমন প্রথাগত শিক্ষা প্রদান এবং ভবিষ্যতে তার জন্য উপযোগী কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৩. প্রয়োজন ও রোগলক্ষণ অনুযায়ী কিছু ঔষধ ও সাইকোথেরাপি। অবশ্যই সেটা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে।


পর্ব-১
পর্ব-২
পর্ব-৩
পর্ব-৪ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28886631 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28886631 2008-12-23 10:33:40
সুপ্ত অক্ষমতা: শিশু ও আমরা - ৪ অটিস্টিক শিশুর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য

অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের সবার ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো একরকম হয়না। কেউ কেউ মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতায় ভোগে; কারও হয়তো সেই ক্ষমতা সীমিতভাবে থাকে। কিন্তু অটিস্টিক শিশুর মধ্যে খুব অল্পবয়স থেকেই (২/৩ বছর) অটিজমের কিছু বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। ২য় পর্বে জেনেছি শিশুবিকাশের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র রয়েছে; সেগুলোর ভিত্তিতেই উদাহরণ দেয়া যাক।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া

* শিশুকে নাম ধরে ডাকলে সাড়া তো দেয়ই না, এমনকি চোখ ফিরিয়েও তাকায় না। সে হয়তো নামের ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনা, একেবারেই নির্লিপ্ত থাকে। অথবা ডাকের ব্যাপারটা শুনে বুঝতে পেরে যে কাজ বা খেলায় সে ব্যস্ত ছিল সেটা কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেয়; কিন্তু যে ডাকছে তার দিকে ফিরে তাকায়না।

* বাবামা বা নিয়মিতভাবে দেখা হচ্ছে এমন আপনজনদেরও চোখে চোখ রেখে তাকায়না। তার কাছে গিয়ে বা কোলে নিয়ে চেষ্টা করলেও দেখা যায়, খুব দ্রুতই সে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। eye-contact-এর অক্ষমতা অটিস্টিক শিশুর মধ্যে প্রকটভাবে দেখা যায়।

* সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মিশতে বা খেলতে চায় না। অন্য শিশুদের খেলতে দেখলে সে একপাশে সরে যায়। অন্যরা কী করছে, সেটা দেখতে বা তাদের খেলায় অংশ নিতে অনীহা বা বিরক্তি দেখায়। বেশীরভাগ অটিটিস্টিক শিশুকে ডায়াগনোসিসের আগেই পারিবারিক পরিমন্ডলে "অমিশুক" হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখা যায়।

* কোনো ধরণের আনন্দদায়ক বস্তু বা বিষয় সে অন্যদের সাথে শেয়ার করে না। সাধারণত: শিশুরা কোনো খেলনা হাতে পেলে সবাইকে সেটা দেখাতে চায়। কথা বলে বা অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিন্তু অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে এধরণের কোনো খেলনার প্রতি নিজস্ব কিছু আগ্রহ থাকলেও সেটা নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস থাকে না।

* স্বাভাবিক শিশুরা কারো কোলে চড়তে বা আদর পেতে পছন্দ করে। কিন্তু অনেক অটিস্টিক শিশু এই ব্যাপারে নিস্পৃহ থাকে। অন্য কারো সংস্পর্শে যাওয়াটা তারা খুব অপছন্দ করে।


যোগাযোগ

** পরিবেশ ও প্রতিবেশ এর সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা শিশুর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠার কথা। অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষমতা কমে যায়- দেখা যায় ২ থেকে ৩ বছর বয়সে স্বাভাবিক শিশুরা যেসমস্ত শব্দ উচ্চারণ করতে পারে সমবয়সী অটিস্টিক শিশুরা তা পারে না। তখন সমবয়সী অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা করে বাবামা বিষয়টি বুঝতে পারেন।

** আবার কোনো ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশুটি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হয়ত পারে কিন্তু একটি বাক্য শুরু করতে তার অস্বাভাবিক রকম দেরি হয় অথবা বাক্য শুরু করার পর তা শেষ করতে পারে না। ৩-৫ বছর বয়সেও দু'তিন শব্দের বেশী শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন করতে পারেনা। নিজের প্রয়োজনের বিষয়টা থার্ড পার্সনে বলে। যেমন "আমি খাব" না বলে "বাবু খাবে" এভাবে বলে। বহুবার শোনা ছড়া থেকেও অল্প কিছু শব্দের বাইরে আর কিছু বলতে পারেনা। যেমন "তাই তাই তাই মামা বাড়ি যাই/ মামী দিল দুধভাত পেট ভরে খাই/ মামা এল লাঠি নিয়ে পালাই পালাই" ছড়াটিকে সে হয়তো সংক্ষেপ করে এভাবে বলে "তাই তাই মামা যাই দুধ খাই লাঠি পালাই"। কিংবা "আয় চাঁদ টিপ যা" ইত্যাদি।

**একই শব্দ বা বাক্যাংশ বার বার উচ্চারণ করার প্রবণতা দেখা যায়। অটিস্টিক শিশুকে যদি প্রশ্ন করা হয় 'তুমি কি দুধ খাবে?' - দেখা যায় এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে প্রশ্নটিই আবার উচ্চারণ করে -'তুমি দুধ খাবে?'

** ৩ বছর বা তারও কম বয়সী শিশুরা তাদের বয়সোপযোগী নানা রকম খেলা স্বতস্ফূর্তভাবে নিজেরাই তৈরি করে খেলে। সেভাবে কথা বলতে না পারলেও ইশারা-ঈঙ্গিত-হৈহল্লার মধ্য দিয়ে তারা লুকোচুরি বা গাড়ীর প্রতিযোগিতা বা প্লেন ওড়ানো বা লড়াই/যুদ্ধ-- এমন "কল্পনা"ভিত্তিক খেলাধূলায় (imaginative play) মত্ত হয়। কিন্তু অটিস্টিক শিশুরা এরকম করে না। পুতুল, গাড়ী, স্টাফড অ্যানিম্যাল (টেডি বেয়ার, মিকিমাউস, খরগোশ এসব) ইত্যাদি নিয়ে কল্পনাশ্রয়ী কোন খেলা (যেমন পুতুলকে খাওয়ানো, পুতুল কাঁদছে, গাড়ীটা জোরে চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলল এমন ভান করা) এরা খেলতে পারেনা।


আচরণ

*** অটিস্টিক শিশু বিশেষ ধরণের আচরণ বারবার করতে থাকে। হয়ত হাত দোলাতে থাকে বা আঙুল নাড়াতে থাকে। খেলনার বাক্স উপুড় করে খেলনা (ছোট বল বা মার্বেল) বের করে ফেলে; আবার ঢুকিয়ে রাখে। আবার বের করে, আবার ঢোকায়। এভাবে চলতে থাকে। কোন কোন শিশু ঘরোয়া জিনিসপত্র দিয়ে খেলতে চায়। সেক্ষেত্রে দেখা যায় লবণদানি থেকে লবণ ঢেলে বাটিতে রাখছে, আবার সেটা আগের জায়গায় নিচ্ছে। বা দুটো গ্লাস নিয়ে একটা থেকে আরেকটায় পানি ঢালাঢালি করে চলেছে। এই পুনরাবৃত্ত কাজে বা রিপিটেটিভ প্লে-তে তারা দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেয়; কয়েক ঘন্টাও চলতে পারে। যা দেখে সাধারণত: পরিবারের সদস্যরা বাচ্চাটিকে (ভুলবশত) শান্ত স্বভাবের ভেবে স্বস্তি বোধ করেন।

*** অনেক অটিস্টিক শিশু আওয়াজ পছন্দ করে না। জোরে কথা বললে বা টিভি চালালে অস্বস্তি বোধ করে, কান্নাকাটি বা চীৎকার করে।

*** তারা রুটিন মেনে চলতে ভালোবাসে। দৈনন্দিন যে ধরণের জীবনযাপনে সে অভ্যস্ত, তার কোন ব্যতিক্রম হলে অটিস্টিক শিশুরা মন খারাপ করে, কাঁদে বা চিৎকার দিতে থাকে। বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও গেলে সে অস্বস্তিতে থাকে। রাতে ঘুমাবার আগে হাত মুখ ধুয়ে, কাপড় বদল করে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস হয়তো প্রায় সব শিশুরই থাকে কিন্তু কখনো এর ব্যত্যয় ঘটলে সাধারণ শিশুরা কিছু মনে না করলেও অটিস্টিকদের বেলায় দেখা যায় তারা কোনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।

*** পারিপার্শ্বিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন তারা সহ্য করতে পারে না। ধরা যাক, ঘরে আসবাবপত্রের অবস্থান অদল-বদল করা হলো। এতে তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। গোসল করানোর জন্য তার জামা-কাপড় খুলতে হবে, বা গোসল শেষে আগে পরে থাকা জামাটার বদলে নতুন জামা পরতে হবে, এই সাধারণ পরিবর্তনের ব্যাপারগুলো তারা মানতে পারেনা। গ্রীষ্মের সময় জানালা খোলা রেখে ঘুমানো হলো, এতে অভ্যস্ত হবার পর শীতকালে জানালা বন্ধ করার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সে প্রতিক্রিয়া দেখায়। বা রাতে ঘুমানোর সময় শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করার শব্দেও সে কাঁদে বা চিৎকার করে। এই প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটি অনেকক্ষণ ধরে চলে। এরকম প্রতিক্রিয়ার কারণে অটিস্টিক শিশুদের অনেককেই পরিবারে প্রাথমিকভাবে "জেদি" হিসেবে গণ্য করা হয়।

*** বিশেষ কোন কোন খেলনা বা সাধারণ কোন বস্তুর প্রতি তার অতিরিক্ত আকর্ষণ থাকে। সেটা সঙ্গে রাখতে চায় সবসময়। কিন্তু খেলনা হিসেবে সেটার যে বৈশিষ্ট্য, তা তাকে আকর্ষণ করেনা। যেমন কোন কোন শিশুর খেলনা গাড়ী চালানোতে আগ্রহ না থাকলেও কিন্তু সেটা উল্টে ধরে হাত দিয়ে চাকাগুলো ঘোরাতে দেখা যায়।

*** অধিকাংশ অটিস্টিক শিশু পেন্সিল বা কলম ধরে মুঠোবন্দী করে। দু'আঙ্গুল দিয়ে চিমটি দেয়ার মতো করে বা তিন আঙ্গুলে পেন্সিল ধরার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কিছু ধরতে পারেনা। হাত ধুয়ে মোছার আগে হাত থেকে পানি ঝেড়ে ফেলা বা কুলি করার কায়দাটা শিশুরা বড়দের দেখেই শিখে ফেলে। কিন্তু অটিস্টিক শিশু এই সাধারণ বিষয়গুলো আয়ত্বে আনতে পারেনা। শেখালেও দেখা যায় হাত ধুয়ে ঢেউয়ের মতো দোলাচ্ছে, পানি ঝরবে এমনভাবে ঝাড়তে পারছে না। হাত মুছতে গেলেও তোয়ালেটা এমনভাবে ধরছে যে ঠিকমতো মোছা হচ্ছেনা। Fine motor activityতে তাদের এমন বহু সমস্যা থাকে।

***সার্বক্ষণিক বা নিয়মিত বিরতিতে অন্যমনস্কতা এদের ক্ষেত্রে খুব সাধারণ ঘটনা। তার চারপাশে কোন ঘটনা ঘটছে, অথবা কোন কাজে সে ব্যস্ত আছে, তার মধ্যেও দেখা যায় সে খুব চিন্তামগ্ন ভঙ্গিতে শূণ্য দৃষ্টিতে একদিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আসলে কিছুই দেখছেনা।

*** কোনো কোনো অটিস্টিক শিশু কোনো কারণ ছাড়াই দেখা যায় হঠাৎ করে রেগে উঠে বা ভয়ার্ত হয়ে যায়।

*** অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে পঁচিশ শতাংশের খিঁচুনি থাকতে পারে।

উপরের লক্ষণগুলোর মধ্যে যে কোন কোনটি সাময়িকভাবে কিছু সময়ের জন্য স্বাভাবিক শিশুদের মধ্যেও থাকতে পারে। তাই একটি লক্ষণ দেখেই বাবা মায়েদের তাদের শিশুটিকে অটিস্টিক ভেবে নেয়া ঠিক হবেনা। আর একজন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে যে উপরের সবগুলো লক্ষণ একসঙ্গে থাকবে তাও নয়। আবার বাবা মায়েদের এটাও খেয়াল রাখতে হবে; এ ধরণের কয়েকটি লক্ষণ সন্তানের মধ্যে বেশি দিন ধরে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদি তা হয় তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপণ্ণ হতে হবে।

পর্ব-১
পর্ব-২
পর্ব-৩


---------------------------------------------------------------------
পরবর্তী পর্বে থাকবে স্পীচ থেরাপি; মূলধারার (স্বাভাবিক) শিশুর সুনিয়ন্ত্রিত আচরণেও যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28881005 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28881005 2008-12-11 12:36:45
সুপ্ত অক্ষমতা : শিশু ও আমরা -৩ ASD তথা অটিজম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতা

ভ্রান্ত ধারণা ১: ASD একটি আচরণগত/ আবেগঅনুভূতিগত/ মানসিক স্বাস্থ্যঘটিত ডিজঅর্ডার। এখানে শারীরিক কোন সমস্যা সম্পৃক্ত নয়।
বাস্তবতা: অটিজমের সঙ্গে বিকাশগত অক্ষমতা ও নিউরো-বায়োলজিকাল ডিজঅর্ডার জড়িত। জন্মের তিন বছরের মধ্যেই এটা প্রকাশ পায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি আজীবন এই অক্ষমতার সমস্যায় ভোগে।

ভ্রান্ত ধারণা ২: অটিস্টিকদের সবার সমস্যাই একরকম।
বাস্তবতা: ASD আক্রান্ত ব্যক্তিদের লক্ষণ ও উপসর্গের মাত্রা বিচিত্র। একজনের সঙ্গে আরেকজনের হুবহু মিল নেই। কেউ সবাক; বাকশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেউ কথা বলেনা। কারও আচরণ অ্যাগ্রেসিভ, কেউ অতিরিক্ত গুটিয়ে-থাকা স্বভাবের। Spectrum Disorder কথাটি অটিজমের বিশাল আওতার বৈশিষ্ট্য বোঝানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়।

ভ্রান্ত ধারণা ৩: পিতামাতার দুর্বল অভিভাবকত্ব সন্তানের অটিজমের জন্য দায়ী।
এই ধারণাটি অজ্ঞতাপ্রসূত এবং সম্পূর্ণ ভুল। অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত অজানা; বা সুপ্রমাণিত নয়। অনিরূপিত অটিজমের ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ না নেয়া হলে অবস্থার উন্নতি পিছিয়ে যায়; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জন্ম-পরবর্তী সময়কার weak parenting শিশুর অটিজমের জন্য দায়ী ছিল।

ভ্রান্ত ধারণা ৪: অটিজম নিরাময়যোগ্য, চিকিৎসা করালে অটিস্টিক ব্যক্তি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
এই ধারণার পিছনে মূলত: দায়ী হল নন-মেডিকেল সেলিব্রিটি ব্যক্তিত্বদের প্রচারণা (জেনি ম্যাকার্থি, অপরাহ্ উইনফ্রে প্রমুখ)।
কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং অতিনিবিড় ইনটারভেনশন ও থেরাপির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্যতার এই প্রচারণার সঙ্গে চিকিৎসক-গবেষকরা এখনও একমত হননি।

ভ্রান্ত ধারণা ৫: ASD আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী।
বাস্তবতা: অটিস্টিকদের কেউ কেউ হয়তো বিশেষ পরিস্থিতিতে খুব ভাল আইকিউ স্কোর করতে পারে অথবা বিশেষ কোন কাজে দক্ষতা দেখাতে পারে, কিন্তু এটা নিছকই ব্যতিক্রমী ঘটনা। সাধারণ অটিস্টিক জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য মিডিয়ায়, চলচ্চিত্রে বা সাহিত্যে সমাদৃত হবার মতো আকর্ষণীয় কিছু নয়। বিশেষ কোন দক্ষতার অধিকারী অটিস্টিককে নিয়ে লিখিত উপন্যাস পড়ে, কিংবা তাকে নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি বা চলচ্চিত্র দেখে অনেকে ধারণা করে নেন ASD আক্রান্ত সবারই বিশেষ কোন প্রতিভা থাকে (যেমন গণিতে ভাল হওয়া)। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র রেইনম্যানে ডাস্টিন হফম্যানের চরিত্র, অথবা আইনস্টাইনের অটিজম থাকার প্রসঙ্গ অনেকেই জানেন এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে ভালবাসেন। বাস্তবতা হলো আমেরিকায় শিশুদের প্রতি ১৫০ জন একজন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৬০ জনে একজন শিশু অটিজম আক্রান্ত। যাদের অধিকাংশই ম্যাথ-জিনিয়াস হওয়া দূরে থাক, খুব সাধারণ দৈনন্দিন কাজকর্মেও অন্যের উপর নির্ভরশীল।

ভ্রান্ত ধারণা ৬: ASD আক্রান্ত শিশুদের সবারই কোনকিছু শিখতে সমস্যা হয়।
বাস্তবতা: ASD আক্রান্তদের মধ্যে কারো কারো মারাত্মক learning problem থাকে। কিন্তু কেউ কেউ, বিশেষত অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্তদের অনেকেই, গণিতের মতো বিষয়ে মূলধারার শিশুদের মতোই দক্ষতা অর্জন করতে পারে। (স্মর্তব্য: অটিস্টিকদের ২০-৩০% অ্যাসপারগার সিন্ড্রোমে ভোগে)।

ভ্রান্ত ধারণা ৭: শিশুবয়সে নেয়া টিকা ASD-এর জন্য দায়ী।
বাস্তবতা: '৯০এর দশকে এই ধারণাটি খুব প্রচার পেয়েছিল। টিকার সংরক্ষণে ব্যবহৃত উপাদানে থাকা মার্কারি বা পারদ এজন্য দায়ী-- এমন কিছু গবেষণাও করা হয়। তবে ২০০১-২০০২-এ ব্যাপক আকারে হওয়া গবেষণার ফলাফল এই অনুমানকে নস্যাত করে দেয়।

ভ্রান্ত ধারণা ৮: ASD আক্রান্তদের জন্য বিশেষ ধরণের খাবার প্রয়োজন।
বাস্তবতা: এটা সত্য যে অটিস্টিকদের অনেকেই দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার, গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার ইত্যাদির প্রতি অ্যালার্জিক। চিনি ও ফুড এসিডের পরিমাণ বেশী, এমন খাবারও কারও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে (উত্তেজনাবৃদ্ধি, খিটখিটে মেজাজ)। তবে এসব উদাহরণ কোন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নয়।

ভ্রান্ত ধারণা ৯: এটা একটা সাময়িক সমস্যা; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেরে যাবে। কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার দরকার নেই।
বাস্তবতা: অটিস্টিক শিশু কখনোই পুরোপুরি সেরে উঠবে না। তারপরও, মৃদু মাত্রার অটিজম, যেমন অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা, সমর্থন ও শিক্ষা পেলে পরিণত বয়সে আত্মনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব। বাকীদের বেলায়, উচ্চমাত্রার অটিজমের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সেও অন্যের সাহায্য ছাড়া কখনোই স্বনির্ভর দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্ভব নয়।

ভ্রান্ত ধারণা ১০: একই পরিবারে অটিজম থাকার ঘটনা একবারের বেশী ঘটেনা।
বাস্তবতা: যদিও অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ এখনও সুপ্রমাণিত নয়; তারপরও জেনেটিক ডিজঅর্ডার অটিজমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে একই পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে একাধিকজনের এবং যমজ সন্তানদের উভয়ের অটিস্টিক হবার প্রবণতা দেখা গেছে।

ভ্রান্ত ধারণা ১১: অটিস্টিকদের সংখ্যা বাড়ছে না, আগেও একই হারে ছিল; এখন ডায়াগনোসিসের সুযোগ বেশী তাই সংখ্যা বেশী মনে হচ্ছে।
বাস্তবতা: পৃথিবীতে মাত্র চারটি দেশে অটিস্টিকদের সংখ্যার হিসাব রাখার ব্যবস্থা আছে (ইউএসএ, ইউকে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়; তাও সর্বত্র অপেক্ষাকৃত মৃদু মাত্রার অ্যাসপারগার সিনড্রোম ও PDDNOS কে হিসেবের মধ্যে ধরা হয়না। এইসব দেশের হারকে ব্যবহার করে অন্যান্য দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে অটিস্টিকদের অনুমিত সংখ্যা হিসাব করা হয়)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশের কোথাও কোথাও অটিস্টিকদের সংখ্যা ৫০০%-১০০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হার নি:সন্দেহে আতঙ্কজনক।

ভ্রান্ত ধারণা ১২: অটিজম থাকলে অন্য কোন ধরণের ডিজঅর্ডার থাকেনা।
বাস্তবতা: অটিস্টিকদের ক্ষেত্রে ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, অন্ধত্ব, বধিরতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা কিংবা অন্য কোন শারীরিক সমস্যা থাকার ঘটনা অস্বাভাবিক তো নয়ই; বরং সাধারণ।


পর্ব-১
পর্ব-২
------------------------------------------------------------------
গত পর্বে পরিসংখ্যানের আগ্রহ প্রকাশকারী সহব্লগাররা এই পর্বের ৫ ও ১১ নম্বর পয়েন্টদুটো দেখে এবিষয়ে পরিসংখ্যানের অপ্রতুলতার কিছু ধারণা পেতে পারেন। পরের পর্বে থাকবে : অটিস্টিক শিশু ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28879193 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28879193 2008-12-06 16:21:08
সুপ্ত অক্ষমতা: শিশু ও আমরা - ২ ১ম পর্ব

আগের পর্বে জেনেছি hidden disability কোন সুনির্দিষ্ট অক্ষমতা নয়; এর আওতা বিশাল; যা বোঝাতে ASD (Autism Spectrum Disorder) টার্মটি ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে তিন ধরণের ডিজঅর্ডারকে ASD বলা হয়, এগুলো হলো-- ১. অটিজম, ২. অ্যাসপারগার সিনড্রোম, ৩. PDDNOS (Pervasive developmental disorder not otherwise specified; ইংরেজিটাই সহজবোধ্য <img src=" style="border:0;" />)।

শারীরবৃত্তীয় রোগব্যাধি আর ASD আলাদা বিষয়। ম্যালেরিয়া বা পক্সের মতো রোগের উপসর্গ আমরা জানি; অন্য জটিলতা না থাকলে সাধারণত যেকোন রোগীর দেহে এর প্রভাব মোটামুটিভাবে একই। কিন্তু ASD'র প্রভাব সম্পর্কে সবার জন্য অভিন্নভাবে প্রযোজ্য কিছু বলা কঠিন। মেয়েদের চেয়ে ছেলেদেরই অধিকহারে ASD আক্রান্ত হতে দেখা যায়। ধারণা করা হয়, অটিজমের ক্ষেত্রে মেয়ে ও ছেলে শিশুর অনুপাত ১:৪ এবং অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে ১:৫। খুব অল্পবয়সেই, ভাবা হয় জন্মের সময় থেকেই, ASD'র কারণে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় দেড় থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যেই। শিশুর বিকাশের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র রয়েছে, ASD যেগুলোতে প্রভাব ফেলে (প্রভাবের ধরণ সংক্ষেপে ব্র্যাকেটে দেয়া হলো)--

১. Social interaction বা সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া (অন্য কোন ব্যক্তির প্রতি আগ্রহের অভাব বোধ করা। কে কী করছে তা নিয়ে আগ্রহ বা কৌতূহল না থাকা। অন্যদের আচরণ বুঝতে না পারা। বন্ধু হতে বা পেতে অনিচ্ছুক থাকা।)
২. Communication বা যোগাযোগ (কথা না শেখা। সীমিত শব্দভান্ডার ব্যবহার করে কোনমতে কথা বলা। কথা বলতে পারলেও আলাপচারিতা বা conversation এ সমর্থ না হওয়া।)
৩. Behaviour বা আচরণ (পুনরাবৃত্ত আচরণ অর্থাৎ একই কাজ বারবার করা। নিজস্ব রুটিন অনুযায়ী কাজ বা আচরণে অভ্যস্ততা এবং এতে অনমনীয় থাকা।)

এবার দেখা যাক, ASD'র তিন গ্রুপের কোনটিতে শিশুর বিকাশের এই ক্ষেত্রগুলো কীভাবে প্রভাবিত হয়।

অটিজম আক্রান্ত শিশুর বিকাশ উল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হয়। এদের অনেকে কথা শিখতে পারেনা বা কথা শেখা বিলম্বিত হয় (কথা শেখা আর কথা বলার মধ্যে পার্থক্যটি লক্ষ্যনীয়। বাকযন্ত্রের গঠন বা অনুরূপ কারণে শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য কথা বলতে না পারা ভিন্ন বিষয়। আর তেমন অসুবিধা না থাকা সত্ত্বেও কথা না বললে সেটা শেখার সমস্যা)। বেশীরভাগ অটিস্টিক শিশুর intellectual disability বা বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকে। ২০-৩০% অটিস্টিক শিশুর এই অক্ষমতা থাকেনা; যাদের অটিজমকে high-functioning autism বা অ্যাসপারগার সিনড্রোম বলা হয়।

অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের সাধারণত: বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকেনা। কখনো থাকলেও সেটা খুবই স্বল্পমাত্রার হয়ে থাকে। কথা শেখার বিচারে তারা তেমন পিছিয়ে নেই। তাদের মূল সমস্যা এই কথাগুলোকে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা নিয়ে। যেমন অন্য কারো সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নিতে তাদের সমস্যা হয়। কাউকে প্রশ্ন করা, অন্যের প্রশ্নের উত্তর দেয়া, বা কারও কথায় প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অক্ষমতার জন্য তারা প্রায়ই অমিশুক ও নিভৃতচারী
হিসেবে চিহ্নিত হয়।

PDDNOS আক্রান্ত শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। বিকাশের তিনটি ক্ষেত্রেই তাদের সমস্যা হতে পারে; কিন্তু এই সমস্যার মাত্রা এতটা প্রকট নয় যে অটিজম বা অ্যাসপারগার সিনড্রোমের diagnostic criteria পূরণ হতে পারে।


ASD'র মাত্রা নিরূপণ
এমন কোন সহজ একক "টেস্ট" নেই যা দিয়ে ASD'র প্রভাব বা মাত্রা নিরূপণ করা সম্ভব। এজন্য DSM-IV-TR (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, 4th Edition, Text Revision)-এ বর্ণিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এতে জন্ম থেকে শিশুর বেড়ে ওঠা পর্যালোচনা করা হয় এবং তার ভাষাগত দক্ষতা ও বুদ্ধিস্তর যাচাই করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেশ-পরিস্থিতি-অবস্থা তৈরি করে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এটা আসলে বিভিন্ন সম্পর্কিত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন অনেকগুলো অ্যাসেসমেন্টের সমষ্টি; এবং এই যাচাই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।


--------------------------------------------------------------------
ক্রমশ পরবর্তী পর্বের আলোচ্য বিষয়: অটিজম নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা, অটিস্টিক শিশু, ...

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28878600 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28878600 2008-12-05 12:55:29
সুপ্ত অক্ষমতা : শিশু ও আমরা -১ আজকের শিশু মানে আগামীর আমরা। পরিবার-সমাজ-জাতি-দেশ-পৃথিবীর ভবিষ্যত। শিশুর যথাযথ বিকাশের গুরুত্ব নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। সামহোয়্যারইন ব্লগে এবিষয়ে সহ-ব্লগারদের কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে লিখেছেন। সেগুলোর উপজীব্য বিষয় এবং মন্তব্যকারী ব্লগারদের পাঠপ্রতিক্রিয়া মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করার ব্যক্তিগত একটি কারণ আমার আছে। তারই ভিত্তিতে, এবং কিছু অধ্যয়ন ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে এই সিরিজ লেখার দু:সাহস করছি। এতে ব্লগ কর্তৃপক্ষের, সুনির্দিষ্টভাবে জানা'র, অনুপ্রেরণা অনস্বীকার্য। সম্মানিত পাঠকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ থাকবে সিরিজটি পড়ার পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিজস্ব অভিজ্ঞতা শেয়ার করার; এবং কিছু জেনে থাকলে সুযোগমতো তা অন্যদের জানানোর। অল্প সময়ে সহব্লগারদের অনেকেই নিয়মিতভাবে আমার পোস্টগুলো পড়ে ও মন্তব্য করে ধন্য করেছেন; এবারও তারা সঙ্গে থাকবেন, এ আশা রাখছি।


আচরণগত অস্বাভাবিকতা

আমরা যাদের সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিনি, দিনের শুরুতে ঘুম ভাঙা থেকে দিনশেষে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত তাদের সকলের দৈনন্দিন আচরণ কি অভিন্ন? কখনোই না। কারণ মন-মানসিকতা, চিন্তাশক্তি, সাড়াপ্রবণতা (রিফ্লেক্স), যুক্তিবুদ্ধির স্তর-- ব্যক্তিভেদে এসবের হেরফের ঘটে। তাই আমাদের activity ও behaviour এর প্রকাশেও কিছুটা ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক।

খুব সাধারণ কিছু উদাহরণ দিই। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন ছবি তুলতে গেলে অস্বস্তিতে ভোগেন, স্বাভাবিক মুখভঙ্গিটা ধরে রাখতে কষ্ট হয়, যাদেরকে আমরা বলি ক্যামেরা-শাই। অ্যাকাডেমিক ও পেশাগতভাবে অত্যন্ত সফল কারো হয়তো পাবলিক স্পিকিঙে গলা বুজে আসে, হাত-পা কাঁপে। আমাদের শিক্ষকদেরও কেউ কেউ আছেন বহু বছর শিক্ষকতা করার পরও ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে লেকচার দিতে পারেননা। ভীড়ের মধ্যে পূর্ব-পরিচিত কাউকে দেখলে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করলেও পারেন না কেউ কেউ। অদ্ভুত কিছু ফোবিয়া আছে কারো কারো। ছোটবেলার স্কুলজীবনের কথা ভাবুন তো। স্পোর্টসের মাঠে হুইসেল শোনার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে ছিটকে বেরুতে পারেনা, দৌড়ের শুরুতেই কেউ কেউ দেরী করে ফেলে। ক্লাসে সবার পেন্সিল বা কলম ধরার ভঙ্গি একরকম না; অল্পতেই হাত ব্যথা হয়ে যায় কারো কারো, তরতরিয়ে পাতার পর পাতা লিখতে পারেনা সবাই। দৈনন্দিন জীবনে খুঁটিনাটি সূক্ষ্ম কাজে সবার হাত-আঙ্গুল সমান পারদর্শী না; ছোট সরু স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে স্ক্রু বসানো বা খোলার কাজটি একাধিকবার চেষ্টার পর তবেই ঠিকভাবে করতে পারেন, এমন আছেন অনেকেই। সহজ কোন কথা সহজে প্রকাশ করতে বা বোঝাতে ঠিক স্বচ্ছন্দ নন কেউ কেউ। পরিস্থিতি অনুযায়ী আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খান কেউ কেউ। এইসব ছোটখাট অসঙ্গতি বা স্বল্পমাত্রার অক্ষমতাকে সাধারণ ধারণায় আমরা স্বাভাবিক বলেই ধরেই নিই। অর্থাৎ পরম স্বাভাবিক আচরণ থেকে কিছুটা বিচ্যুতি গ্রহণযোগ্য।

কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এইসব অস্বাভাবিকতার এক বা একাধিক রূপ একই ব্যক্তির মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে প্রকটভাবে দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, আলোচ্যক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম/আচরণ থেকে উচ্চমাত্রার বিচ্যুতির জন্য দায়ী disability বা অক্ষমতাগুলো প্রকাশ্য নয়। যেমন, দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও আই কন্ট্যাক্টে অক্ষমতা। কিংবা বাকশক্তি স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও কোন কথা স্বচ্ছন্দে বোঝাতে না পারা। এই hidden disability কোন সুনির্দিষ্ট অক্ষমতা নয়; এর সীমা বা আওতা (range) বিশাল; যা বোঝাতে ASD (Autism Spectrum Disorder) টার্মটি ব্যবহার করা হয়।


পর্ব-২
পর্ব-৩
পর্ব-৪

পরের পর্বের আলোচ্য বিষয়: অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28877094 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28877094 2008-12-02 08:32:31
এই পোস্টটা শুধুই নিজের জন্য (প্রথম পাতায় নেই)
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link

প্রিয় ব্লগার শিরোনামহীন, শিপন, মনজুরুল ভাই, শ্রদ্ধেয় আপা নাজনীন খলিল, লাবণ্যপ্রভা গল্পকার, এবং বিষাক্ত মানুষকে জানাই সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28860131 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28860131 2008-10-26 19:15:35
কলেজের দিনগুলো
তাই বলে মনে করবেন না পড়াশোনা ছাড়া অন্য কিছুর চর্চা ওখানে নেই। মজার ব্যাপার হল, ওখানে পড়াশোনাটাই সবচেয়ে কম করতাম আমরা।অ্যাডমিশন টেস্টের রেজাল্টের পর ভর্তি হতে গিয়ে দেখি সবাই কিউতে পিছনে দাঁড়াতে চাইছে। কারণটা না বুঝে বীরদর্পে এগিয়ে প্রথমদিকে ভর্তি হয়ে রোল নাম্বার "ফোর" পেলাম। কী ব্যাপার, ছেলেগুলো হাসছে কেন? মজা বুঝলাম ক্লাস করতে গিয়ে। ডিগ্রী-অনার্স-মাস্টার্সের ক্লাস হয় তাদের নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টে। আর একাদশ-দ্বাদশের পোলাপানরা থাকে দৌড়ের উপরে। প্রথম ঘন্টায় ইংরেজি তো পরের ঘন্টায় ফিজিক্স। মেইন বিল্ডিঙের তিনতলার গ্যালারি থেকে বেরিয়ে একতলায় নামো, টিলার গায়ে ভাঙাচোরা প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে লাইব্রেরীর সামনে যাও, তারপর আবার আধা কিলোমিটার হেঁটে ফিজিক্সের গ্যালারি। এর পরের ঘন্টায় বায়োলজিঅলারা বোটানি ভবনের তিনতলায়। আমরা পরিসংখ্যানঅলারা অন্য কোথাও। সায়েন্সের তিন সেকশনের প্রত্যেকটায় একশ বিশ জন করে ছাত্র। তার মধ্যে জনা পনেরো মেয়ে। ছেলেরা অনায়াসে দৌড়ে আগে চলে যেত; সংখ্যায় অনেক বেশী বলে "প্রক্সি"ও দিত অনায়াসে। আর আমরা মেয়েরা সবার পরে ক্লাসে ঢুকে দেখতাম রোলকল প্রায় শেষ। হায়, কেন আগেভাগে ভর্তি হয়ে গোড়ার রোল নম্বর পেলাম!

আমার সেকশনের অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টারে প্রথম জন ছিলাম আমি; "ফার্স্টলেডি" নামটা তাই প্রথমদিনেই পেয়ে যাই। সায়েন্সে মেয়ে কম ছিল; কমবেশী সব মেয়েকেই ছেলেরা এরকম কোন না কোন খেতাব দিয়ে ফেলত। সেটা জানান দেয়ার কায়দাও ছিল মজার। চিরকুট ছুঁড়ে বা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে। গ্যালারিতে ক্লাস হলে মেয়েরা বসতো সামনের দুই সারিতে। মেয়েদের ঠিক পিছনেই বসতো পড়ুয়া ক'জন ছেলে, যারা মূলত শিবির করতো। আর বেশী দুষ্টু ছেলেরা বসত পিছনে ওপরের সারিতে। অধ্যাপকের নজর এড়িয়ে গ্যালারির উপর থেকে দলা পাকানো চিরকুট ছুঁড়ে মারত। নিখুঁত নিশানায়। আমরা বিরক্তি দেখিয়ে (ভিতরে ভিতরে
আসলে দারুণ খুশি হতাম) সন্তর্পণে ওগুলো খুলতাম। চিরকুটের ভেতর বড়ইর বিচি থাকত (সম্ভবত মোমেন্টামের জন্য)। যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা তার রোল নম্বর লেখা থাকত ওপরে। সেটা পড়ে কন্টেন্ট বুঝে বান্ধবীদের পাস করা বা ছিঁড়ে ফেলা। বেশীরভাগই মজার হত। কাউকে দেয়া খেতাব, কার্টুন, প্যারোডি, কিংবা নিছক দুটো রোল নম্বরের মাঝে একটা যোগচিহ্ন। তখন আমির-সালমান রোম্যান্টিকতার জোয়ার চলছে, তারপরও, চেনাজানা থাকলেও ছেলেমেয়েরা ক্যাম্পাসে তেমন কথাবার্তা বলত না। শিবিরের মামু-দের ভয়ও ছিল। বুঝতেই পারছেন, চিরকুটগুলোর ভূমিকা তখন কত গুরুত্বপূর্ণ। আমি একবার পেলাম একটা, তাতে লেখা মাইলসের তখনকার হিট গান, তবে একটু বদলে-
চাঁদতারা সূর্য নও তুমি
নও পাহাড়ী ঝরণা
তুমি একটা সাধারণ মেয়ে
তোমার এত দেমাক কেন???
কোরবানী ঈদের ছুটির পর কলেজ খুলল। চিরকুটে কার্টুন এলো- লাস্ট কোরবানী আই গেইভ ইউ মাই কলিজা (লাস্ট ক্রিসমাসের প্যারোডি)।

শিক্ষকদের নাজেহাল করতে পটু ছিল কেউ কেউ। ইংরেজির এক লেকচারার ভীষণ নাকিস্বরে কথা বলতেন। পড়াতেন মাদার ইন ম্যানভিল। তার ক্লাসে পোলাপান নাকিসুরে "প্রেঁজেঁন্ট স্যাঁর, ইঁয়েঁস স্যাঁর" এর সিরিজে রেসপন্ড করত। বেগতিক দেখে বেচারা রোলকল বন্ধ করে দিলেন। ছেলেরা রেহাই দেবে কেন? তারপরের দিন ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডে ইংরেজিতে লেখা "মাদার ইন ম্যানভিল"- উপরে অসংখ্য চন্দ্রবিন্দু।

এদের সামনে বাংলার শিক্ষকরা সবচেয়ে অসহায়। এক অধ্যাপক প্রথম ক্লাসে পরিচয় দিলেন, "আমার নাম অর্ধেন্দু বিকাশ রুদ্র। কারো কোনো প্রশ্ন?" নিরীহ মুখে একজন দাঁড়াল। "কেমিস্ট্রিতে পূর্নেন্দু, বাংলায় অর্ধেন্দু, সোয়াইন্দু- সিকিইন্দু-পৌনেইন্দুরা কোথায়, স্যার?" এই অর্ধেন্দু রুদ্র স্যার কবিতা পড়াতেন খুব আবেগ দিয়ে আবৃত্তি করে । কী একটা কবিতায় যেন "রুদ্র উলঙ্গ" কথাটা ছিল। সঙ্গে সঙ্গে পিছনের সারি হইহই করে উঠল, "ছিছি স্যার, নিজের লজ্জার কথা এভাবে বলে না...!" এক ম্যাডাম ছিলেন, যার শাড়ির রং গায়ের রঙের সঙ্গে ঠিক মানানসই হতো না। বিকট কমলা রঙের শাড়ি পরে এসেছেন একদিন। ছেলেরা যথাসময়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে রাখল, "কয়লার খনিতে আগুন লেগেছে"। আরেক অধ্যাপক দুষ্টুমির শাস্তি হিসেবে একজনকে দাঁড় করিয়ে "সমুদ্রের প্রতি রাবণ" থেকে একলাইনের অর্থ বলতে বললেন। এখানেও মেধাবী দুষ্টুমি; ছেলেটা বলল, "সূর্য সূর্যে সূর্য যেন সূর্য" (কনক উদয়াচলে দিনমণি যেন অংশুমালী)। কোন শিক্ষক হয়তো বললেন, "কী গরম পড়ল- সবার অসুখবিসুখ করছে"- সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকবেঞ্চ থেকে গান "রোগবালাই তো আছে দুনিয়ায়, ভালো থাকার আছে যে উপায়।"
-কে গাইল? কে? (গায়ক ততক্ষণে পিছনের দরজা দিয়ে হাওয়া)
-অন্য কলেজের, স্যার, মজা করতে আসছিল...
-কোন্ কলেজ থেকে আসছে?
-গার্লস কলেজ, স্যার...
শিক্ষক ভদ্রলোক অগ্নিশর্মা হবার আগেই গ্যালারির সিঁড়ি বেয়ে মার্বেলের ঢল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

সে তুলনায় বিজ্ঞানের শিক্ষকরা যথেষ্ট স্মার্ট। ফিজিক্স ক্লাসে লালটু ছেলেটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিশেষ কোনো মেয়ের দিকে, যার মনোযোগ অন্য কোন ফাঁকিবাজিতে। অধ্যাপক দুজনকেই দাঁড় করান। "ওর তরে যে সে এখন সমুদ্র সৈকতে ঘোরে, আর তোমার তরে যে সে এখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ে। অতএব ঘাড় সোজা করে বসো বাবা।" কেমিস্ট্রির তাবলিগি স্যারও কম যান না। পড়া না পেরে বান্ধবীর দিকে তাকানো মেয়েটাকে নির্দ্বিধায় বলে দেন, "খালেদা জিয়ার মতো পাশের জনের দিকে তাকাও কেন?" (তখন খালেদা সবে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রীপরিষদের মিটিংয়ে বড় বেকায়দায়।)

কলেজের সাতদিকে সাতটা গেইট। সবসময় খোলা। তারপরও কেউ ক্লাস মিস দিত না তেমন। কারণ ক্লাসেই আসল মজা। তাও কেউ কেউ কোন কোন বিষয়ে ননকলেজিয়েট-ডিসকলেজিয়েট হয়ে যেত। ইয়ার ফাইনালের রেজাল্টের সঙ্গে সে খবরটাও অভিভাবকের কাছে পোস্ট করা হত। বুদ্ধিমান ছেলেরা এজন্য আগে থেকেই সুবিধামত "স্থানীয় ঠিকানা" দিত। "গার্জিয়ান কল" হলে সাজানো বাপ-চাচা হাজির করত। দুএকজন আবার ধরা পড়ে অন্যদের হাসির খোরাক হতো। ইউনিফর্ম ছিল ছেলেদের জন্য সাদা শার্ট আর মেয়েদের সাদা এপ্রন। সাদা শার্টের নীচে রঙিন টিশার্ট পরে দুটো বোতাম খোলা রেখে ছেলেরা ফ্যাশনেবল
থাকার চেষ্টা করতো। একবার "চোখ ওঠা"র ধুম পড়ল সবার; ওই ছুতোয় কালো চশমা পরে থাকার সুযোগ হারাতে চাইলোনা অনেকে।

কলেজ ছেড়ে এসেছি অনেক বছর হল। ওই দু'বছরেরও কম সময়ের স্মৃতিগুলো এখনও কী সজীব! এখনো হঠাৎ হঠাৎ কারো দেখা মেলে; খোঁজ পাই আরো ক'জনের। আমাকে চিরকুট লেখা অভীক, ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে পাস করে এখন মুম্বাইতে কোন বাঙালী পরিচালকের সহকারী। বাংলাদেশী বিজ্ঞাপনও নাকি বানায় কলকাতায়। ঝাঁকেঝাঁকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বেরিয়েছে; চিকিৎসকদের অনেকেরই নামের পরে অক্ষরের লম্বা লাইন। জলপাই-সাদা-আকাশীর উর্দি চাপিয়েছে কেউ কেউ; মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সাগরে ভাসছে জনাদশেক। লালটু তারেকের এখনকার বউ তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ত কিনা জানা হয়নি। তার সেই দৃষ্টিবন্দিনীর তরে অবশ্য সৈকতচারী কেউ অপেক্ষায় ছিলনা। ব্যাচের অন্তত চারটা মেয়েকে নিয়ে কবিতা লিখে ব্যর্থ শাওন পরে মহা ধুমধামে মিডিয়ার এক সুন্দরী তারকাকে পটিয়েছে; ওদের বিয়েও হয়েছে (অতি সম্প্রতি বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত সাড়া-জাগানো ভিডিওচিত্রটির পরিকল্পক এই শাওন)। উত্তর-কৈশোরের সরল আবেগ নিয়ে গড়ে ওঠা জুটিগুলোর টিকে থাকার খবর তেমন নেই। সুদর্শন রাসেল প্লেনক্র্যাশে মারা গেছে কুড়ি পেরোতেই; জিডি পাইলট হওয়া হয়নি তার। সালমান খানের কপি মিজান, মাকে চমকে দিতে আমেরিকা থেকে গোপনে ফিরে, ঢাকা-চিটাগাং হাইওয়েতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলে সবাইকেই চমকে দিয়েছে। বাকী সবার জীবনের সুখবরের আশায় থাকি আমরা; চট্টগ্রাম কলেজ ১৯৯২ ব্যাচের সবাই।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28833138 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28833138 2008-08-21 13:09:48
অন্য অলিম্পিক
দুদিকে কাঁচের দেয়ালঘেরা বিশাল হলরুমটাতে দেয়াল ঘেঁষে রাখা চেয়ারগুলোতে আমরা বসি। দরজা দিয়ে সারবেঁধে ঢোকে স্কুলের খুদে অলিম্পিয়ানরা। ওই দেড়ঘন্টায় ফোর বি, ফাইভ বি, সিক্স এ, বি- এই চারটি ক্লাসের খেলা। এখানে বলে রাখি, এরা ক্লাস ফোর-ফাইভ-সিক্স নয়; স্কুলের প্রথম বর্ষের পাঁচবছর বয়সী বাচ্চা সবাই। এদের সবারই কিছু না কিছু বিকাশগত সমস্যা আছে; এই স্কুলটি একটি বিশেষ অটিস্টিক স্কুল। মানসিক বিকাশের ধরণের ওপর নির্ভর করে তাদেরকে ওয়ান এ থেকে সিক্স বি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসে রাখা হয়েছে। প্রতি ক্লাসে ছ'জন করে বাচ্চা, তিনজন করে টিচার। প্রত্যেক টিচারের হাত ধরে আছে দুজন করে শিশু।

এরপর খেলা। হাল্কা মজার ইভেন্ট সব, হারজিতের কিছু নেই। একেক ক্লাস একেক ব্লকে রাখা ক্রীড়াসামগ্রী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তিনধাপ মই বেয়ে বারের ওপর সোজা হেঁটে আবার নেমে ঢালু একটা সারফেইসে গড়াগড়ি দেয়া হল জিমন্যাস্টিকস। ছয় ইঞ্চি উচ্চতার ক'খানা হার্ডল একজন একজন করে পেরোলেই হল। রিলে দৌড়ের পার্টনাররা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে; বন্ধুর হাতে ব্যাটন দিয়ে তার হাতটা ধরেই আবার ফিরতি দৌড়। অক্ষর বা নম্বর লেখা ছোট্ট কুশন ছুঁড়ে বক্সে ফেলার নাম শর্টপুট। স্টাইরোফোমের নুডলটা ছুঁড়লেই জ্যাভলিন থ্রো। ট্র্যাম্পোলিনে এক এক করে ঝাঁপানো। টিচারদের নিখুঁত নজরদারীতে কেউই কোন ইভেন্ট মিস করছেনা, শরীরে কোথাও চোট পাচ্ছেনা।

প্রতিযোগিতার লড়াই নেই, শুধুই অংশগ্রহণ। তারপরও শিশুদের সবার জন্য সেটা খুব উপভোগ্য হচ্ছেনা। এরা সেই দুর্ভাগার দল, যাদের মস্তিষ্ক অনুদ্ঘাটিত কোন বিচিত্র কারণে খুব সাধারণ কিছু কিছু বিষয়ও ধারণ করতে অক্ষম। কারও সমস্যা অক্ষর-রঙ-আকৃতি চেনায়। কেউ অচেনা মানুষ সহ্য করতে পারেনা। কেউ বা আই কন্ট্যাক্টে অক্ষম; সরাসরি কারো দিকে তাকাতে পারে না। নানান রকম ফোবিয়া আছে কারো কারো। ভয়ার্ত মুখের দেবশিশু ছোট্ট হাতের সবটুকু শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে তার টিচারের হাত, মুখ লুকিয়ে চোখ বুঁজে এগিয়ে চলছে কোনোমতে । দূরত্বের অনুমানে বিভ্রান্ত শিশু ছ'ইঞ্চির হার্ডলটা পেরোতেও ঠেকে যাচ্ছে প্রতিপদে। হাতের ব্যাটন রিলে'র সঙ্গীর দিকে এগিয়ে দিতে হবে, শুধু সেটুকু বুঝতেই বড় কষ্ট হচ্ছে কারো। তবু সবাই ওয়েল ডান; সবার জন্যই হাততালি, ফ্যান্টাস্টিক পারফর্ম্যান্স।

"ওয়ান" লেখা একটাই ভিক্টরি স্ট্যান্ড; একে একে সবাই সেটায় দাঁড়িয়ে "গোল্ড মেডেল" পরে নিল গলায়। হাইপারঅ্যাকটিভ কয়েকজন টিভিতে দেখা অলিম্পিক-বিজয়ীর ভঙ্গিতে মেডেলে চুমু খেল; ধারাভাষ্যকারকে কয়েকজন ইন্টারভিউও দিল। আমার কন্যাকে প্রশ্ন করা হল সে ফার্স্ট হয়ে গোল্ড নাকি সেকেন্ড হয়ে সিলভার মেডেল চায়। সে গম্ভীর মুখে জানালো, সেকেন্ড ওয়ান।

অলিম্পিকের পাট চুকলে যার যার ঘরে ফেরার তোড়জোড়। ড্রাইভওয়েতে আমরা কয়েকজন, কিছুক্ষণ দাঁড়াই। নিকোলাসের সদালাপী ল্যাটিন আমেরিকান বাবামা; ডেভিডের সহজসরল ভিয়েতনামী বাবা; থমাস-জেমস জমজদের অসম্ভব রূপবতী ইটালিয়ান মা; অপনার বাংলাদেশী মা। ওদের সবার শুকনো মুখে বিষণ্ণ হাসি; আয়না ছাড়াই বলে দিতে পারি আমাকে দেখেও ওরা ঠিক তাই ভাবছে। আমরা আমাদের দেবশিশুদের কথা বলি। কেউ পড়তে শিখলোনা এখনও; কেউ সেটা পারে তো কারো সঙ্গে কথা বলতে পারেনা; অপ্রকৃতস্থ চাহনি- আচরণে অস্বস্তির যোগান দিচ্ছে কেউ; খুব সাধারণ রেসপন্স-কগনিশন ব্যাপারগুলোই আবার কারো নেই... ... ... ওদের প্রত্যেকের দুটো করে বয়স, দ্বিতীয়টি "বুদ্ধিবৃত্তিক"; কবে দুটো বয়সের ব্যবধান কমে একটু স্বস্তিকর পর্যায়ে আসবে? তিন বছর পর এই স্কুলটা ওদের আর রাখবেনা, কোথায় যাবে ওরা? ডে কেয়ারে অচ্ছ্যুত... মূলধারার কোনো স্কুল ওদের নিতে চায়না... কোনমতে কোথাও একটু ঠাঁই জুটলে বুলিং আর র‌্যাগিংয়ের নিশ্চিত নিয়মিত শিকার... কোথায় যাব আমরা? আর তারও পরের... আরো অনেক, অনেক পরের জীবনে, যখন আমরা থাকবোনা, ওরা তখন কীভাবে থাকবে? কেমন হবে সে জীবন... ?

শীতের বিষণ্ণ আলোয় মুখগুলো ক্লান্ত দেখায়; হাসিগুলো ক্রমশ বিষণ্ণতর হয় । এ দেশেই ওরা অসীম শূণ্যে সূক্ষ তারের ওপর হাঁটছে, আমার জন্য নিজদেশে কী অপেক্ষা করে আছে! কুমারের মা, শিখপত্নী কিরণ, গলার পবিত্র লকেটটা কপালে ছোঁয়ায়। তাকে দেখেই হয়তোবা; জেমসের মা গ্যাবি দীর্ঘশ্বাসে টেনে টেনে বলে- জিইসাআআস... । আশা আর প্রার্থনায়, আশাভঙ্গ আর হতাশায়- আমরা আবার বাইরের পৃথিবীতে পা রাখি। যে পৃথিবী মানেই প্রতিযোগিতা। যেখানে জয় যোগ্যতমের । দেবশিশু এখানে চিরশিশু থাকেনা, আঁকড়ে ধরার মতো হাত এখানে কেবলই হারিয়ে যায়। ছয় ইঞ্চি হার্ডলের একক রেইসের অলিম্পিক এই পৃথিবীর নয়।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28832437 http://www.somewhereinblog.net/blog/nushera/28832437 2008-08-19 18:43:16