আমার প্রেম

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৮:৫৯

শেয়ার করুন:                   Facebook

আমার শৈশবের প্রেম? সেতো কবেই ভুলে গেছি। কিন্ডারগার্টেনে থাকতে এক মেয়েকে খুব মনে ধরেছিল। এতটাদিন একসাথে পড়লাম, কিন্তূ মনের কথাটা জানাতে পারলাম না। তখন প্রেম মানেই ছিল অজানা, অচেনা, নিষিদ্ধ এক বস্তু যা শুধু নাটক-সিনেমাতেই দেখা যায়। একটু বড় হয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হই। ক্লাস ৫-৬ এর দিকে আর একটি মেয়েকে ভাললেগে গেল। আমার চোখে সে ছিল অপরূপা। গভীর কালো চোখ, সিল্কি কালো বব করা চুল। স্কুলের নিয়ম ছিল ছেলেদের বিকালে আর মেয়েদের সকালে। নাম না জানা আমার ভাললাগা মেয়েটিকে দেখার জন্য রোজ সকাল সকাল স্কুলে চলে আসতাম, একবার যদি তারে দেখি দু’নয়ন ভরে। সে ছিল আমার নিষ্কাম ভালবাসা, যাকে শুধু ভালবাসা-ই যায়, দেবীর আসনে বসানো যায়। তখন ছিলাম দাম্পত্য সম্পর্ক সম্বন্ধে অজ্ঞ। হয়ত সেই কারনেই ভালবাসা শব্দটি এত মধুর ছিল। অবাক লাগে সেই সদ্য টিনেইজ-এর প্রেম। কত আবেগপূর্ণ ছিল সেই দিনগুলি। অবশ্য এই আবেগকে প্রেম বলাটা বুঝি ঠিক নয়। কারণ, ভালবাসার মধ্যে যতটুকু অপবিত্র জিনিস আছে তাই প্রেম। কিন্তূ আমার আবেগ ছিল শুচি শুভ্র, এতে ছিলনা অপবিত্রতার স্থান। কিন্তূ কালক্রমে সেই মেয়েটি হারিয়ে যায় অচেনা-অপরিচিতদের মাঝে। আমিও আমার আবেগের রাশ টেনে ধরি।

ক্লাস ৮-এ থাকতে আর একটি মেয়েকে পছন্দ করে ফেলি। মেয়েটি ছিল খুব মেধাবী, আমি আবার গবেট-মার্কা ছাত্র ছিলাম। তাই মেধাবী মেয়েদের খুব ভাল লাগত, ইংরেজি স্যারের কোচিং-এ তার সাথে দেখা। কোচিং-ও শেষ, আমার কাঁচা ভালবাসা অঙ্কুরেই ঝরে পড়ে গেল।

প্রথম প্রেমে(!)পড়ি ক্লাস ৯ থেকে ১০-এ উঠবার সময়। আমি আবার স্কুলের আতেঁল-বেতাল ধরণের ছাত্র ছিলাম, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো আর কি! বিভিন্ন কুইজ প্রতিযোগীতা, বিটিভির তুখোড়, শিশু-একাডেমি...এ রকম আরও সব প্রতিযোগীতায় অংশ নিতাম আর, হাওয়াইন গিটার বাজাতাম স্কুলের অনুষ্ঠান গুলোতে। সেই মেয়েটিও এসব দিক দিয়ে খুব পাকা ছিল। তাই দুজনের মধ্যে ভাল বন্ধুত্ব (নাকি প্রেম)হয়েছিল। আমি তার প্রতি কিছু একটা অনুভব করতাম, যা অন্য মেয়েদের প্রতি অনুভব করিনি। সেটাই বুঝি প্রেম! কিন্তূ কখনো তাকে বলা হয়নি, আমি তাকে ভালবাসি। ক্লাস ১০ এর শেষের দিকে ঘটল দুর্ঘটনা। ওর পাঠানো একটি ও একমাত্র চিঠি আম্মুর হাতে ধরা পড়ে। ব্যস শুরু হল ঝাড়ি। সামনে এস.এস.সি, তাই আমিও ব্যাপারটি ভুলে থাকার চেষ্টা করলাম। অনেকদিন পর খবর পেয়েছিলাম, এখন সে অন্যর ঘরণী, সুখের সংসার।

কলেজে উঠে হল আজব এক সমস্যা। এতদিন যাদের প্রেমে পড়েছি, তাদের সাধনা করলে হয়ত পাওয়া যেত। কিন্তূ এ সমস্যার তো কোনো সমাধান নেই। আমি ‘আনা কুর্নিকোভা’-র প্রেমে পড়েছি। তাকে নিয়ে কত দিবা-স্বপ্ন, কবিতা...আরও কত কি! অবশ্য এই ভূত মাথা থেকে চলে যেতেও দেরি করেনি, কারণ ‘এস্কেইপ’ এর মিউজিক ভিডিও দেখে সেই সাধের প্রেম কর্পূরের মতন ঊবে যায়। এখনো মাঝে মাঝে হাসি পায়। ম্যাচ্যুরিটি-র একটি পর্যায়ে এসে এমন ছেলেমানুষি যে কেন করেছিলাম, তা মনে হলেই অবাক লাগে। আরেকটি কথা মনে পড়ে, আপেক্ষিক তত্ত্ব সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাই। জিনিসটা খুব-ই মজার লেগেছিল। কলেজের শেষের দিকে এসে ভাললাগল আরেকজনকে, কিন্তূ ইন্টারের জন্য পড়ার চাপ ও বিশ্বঃবিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষার চাপে পড়ে, কিসের প্রেম, কিসের ভালবাসা- গোল্লায় যাক সবকিছু। অবশ্য ততদিনে বেশ কিছু মেয়ে বন্ধু হয়েছে, কিন্তূ তারা শুধু বন্ধুই ছিল। অনেকে আবার বলেন ছেলে-মেয়ে নাকি কখনো বন্ধুত্ব হয়না, সুক্ষ্ণ হলেও নাকি একটা কামার্ত ভাব থাকে। কারন ফ্রয়েড নাকি বলেছেন পুরুষ মানেই ধর্ষকামী, কিন্তূ আমার তো তা মনে হয়নি, নাকি বন্ধুত্বের এই দিকটা কখনো ভেবে দেখিনি আমি!!!

ইন্টারনেটের সাথে পরিচয় অনেক আগ থেকে হলেও চ্যাটরুমের সাথে পরিচয় বুয়েটে পড়ার সময়, ১ম বর্ষে। কি জানি, কোন এক দিন, একটি চ্যাটরুমে পরিচয় হয় একটি মেয়ের সাথে। ভালবাসা এর আগেও জীবনে এসেছে, কিন্তূ এত তীব্র আক্রমনাত্নক ভঙ্গিতে আসেনি। জীবনের সবচেয়ে বড় ভূলটি করলাম, অন্তর্নিহিত কথাগুলো না হয় উহ্য-ই থাক। কিছু বিষয় আছে যা প্রত্যেকের একান্তই ব্যক্তিগত, কারুর অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই হেথায়, অনেকটা একা একা ব্যাক্তিগত কামরায় রাত কাটানোর মতন। কিন্তূ সবই শুভাঙ্করের ফাঁকি। যাকে কখনও চোখেও দেখিনি(বিশ্বাস হয়?আমি কি বোকা তাইনা!) তার সাথে আবার ভালবাসা! আসলে কি সেটা ভালবাসা নাকি মোহ? ভালবাসা কখনো চট করে হয়না, এটা অনেক সাধনার বিষয়। কিন্তূ মানুষ চট করে মোহে পড়ে, এবং অনেক সময় পরিনাম হয় ভয়াবহ- ট্রয় নগরী ধ্বংশের মতন। একবছরেরও বেশি সময় ধরে এই মোহে ছিলাম, জীবনের এই স্বর্ণালী মুহুর্তে হঠাৎ করেই যেন ভরে গেল সীসার বিষবাষ্পে। মনের জোর ছিল, তাই হয়ত একেবারেই ভেঙ্গে পড়িনি, কিন্তূ যা ক্ষতি হয়েছে তার মাশুল আমি আজো গুণে যাচ্ছি। আমার বিধ্বস্ত প্রায় এই জীবনে নতুন দিনের আলো দেখাতে এল একটি মেয়ে, আমি তাকে কক্ষনোই ভুলবোনা। জীবনের সায়াহ্নকাল পর্যন্ত মনের অন্তরালে লুকিয়ে রাখব তাকে। সে যেন তপ্ত মরুর বুকে ছোট্ট একটি মরুদ্যান। তার সাথেও আমার নেটে পরিচয়, কিন্তূ কখনো দেখিনি বা ফোনে যোগাযোগ করিনি তার সাথে, শুধু নেটে আসলে কথা হত, একদিন ও বলল ওর নাকি ব্রেইন টিউমার হয়েছে, চিকিৎসার জন্য থাইল্যন্ড যাবে। এরপর থেকে ওকে আর নেটে দেখিনি, আমি ওর পরিবারের সাথে যোগাযোগ-ও করিনি। ভয় হয়, যদি কোন দুঃসংবাদ পাই তবে তো আমি সইতে পারবনা। আমিও তো মানুষ, কতটা আঘাত সহ্য করতে পারে একটা বেদনায় ভারাক্রান্ত হূদয়। তবুও আশায় বুক বাঁধি, হয়ত দেখা পাব তারে, এ জীবনে না হোক-অন্য জীবনে।

এখন আমি প্রেমের জন্য কাঁদিনা, ভালবাসার জন্য পিছুডাকি না। এখন আমার এগিয়ে যাবার সময়। কোন মেয়ের সস্তা প্রেম বা মুল্যবান ভালবাসার জন্য আমি আমার পরিবার ও বন্ধুদের মহামুল্যবান ভালবাসা, স্নেহ হারাতে চাইনা। বহুদিন পর নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাঘের এই কনকনে ঠান্ডায় স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আজ কত কথাইনা মনে পড়ল! ‘মহিনের ঘোড়াগুলির’ একটি গানের কথাও মনে পড়ে যায়,

“আমার দক্ষিন খোলা জানালায়

মাঘের এই অন্তরঙ্গ দুপুর বেলায়

না শোনান গল্প পুরোনো, মনে পড়ে যায়.....।।”


[ গল্প তো গল্প-ই, বাস্তব জীবনের সাথে এর মিল খুজতে যাওয়াটা অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয়।]

 

 

  • ৩ টি মন্তব্য
  • ৭৮ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৩ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১:৪৪
comment by: আহমেদ শারফুদ্দীন বলেছেন: প্রেম ধর্ম পশু ধর্ম
২. ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ২:২১
comment by: পুতুল বলেছেন: গল্প তো গল্প-ই, বাস্তব জীবনের সাথে এর মিল খুজতে যাওয়াটা অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয়। ৫


৩. ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৪:৫৩
comment by: মোসতফা মনির সৌরভ বলেছেন: দ্যা সিক্রেট অব হ্যাপিনেস ইজ টু বিলিভ দ্যাট নো ওয়ান এন্ড নাথিং ইন দিস ওয়ার্ল্ড বিলংগস টু ইউ - সম্ভবত ইটালিয়ান একটি গানের কথা। আমার খুব প্রিয় ডায়লগ। মেনে নিন কথাটি।
আর মানুষ মনে হয় সবচেয়ে বেশি ভালবাসে নিজেকে।
ভাল থাকবেন।

 



 


আমি নুভান। পৃথিবীর তাবৎ বিষয়ের ওপর আমার আগ্রহ অসীম। অলস সময় কাটাতে পছন্দ করি কিন্তু সময় হয়ে ওঠেনা। বাপ্রবি এর...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ৭৮৭