বেশ কিছু দিন ধরেই ব্যস্ততার কারনে পোস্ট দেওয়া হয়ে উঠছিলোনা,আজ দিতেই হলো,তবে সেটা সম্পুর্ন ভিন্ন কারনে।
সকালবেলাতে অনলাইনে বিভিন্ন পত্রিকা ঘাঁটা একটা স্বভাব হয়ে দাড়িয়েছে,আজও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।প্রথম আলো পত্রিকাতে বিশাল লাল অক্ষরে একটা হেডলাইন দেখলাম শিশুজন্মে অযথাই অস্ত্রোপচার ,...... সংবেদনশীল এই ইস্যু নিয়ে কি ঘটলো অথবা রিপোর্টার কি আবিষ্কার করলেন,তা জানার আগ্রহ হলো। পুরো রিপোর্ট প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েকবার পড়তে হলো !! পাঠক জিজ্ঞাসা করতে পারেন কয়েকবার কেনো ?? কারনটা হলো, হেডলাইন আর ভিতরের খবর/মতে কোনো মিলই নেই !!
সিরিয়াস হবার আগে একটু হালকা কথা বলি ।
কোনো ব্যাপার সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে ভালোভাবে জেনে নেওয়া উচিত। এক পাপি আরেক পাপিকে জিজ্ঞেস করছিলো,''ঐ,তুই মসজিদে যাস না ক্যান ??'' । ২য় জন উত্তর দিলো,'' হুজুর কইছে,মসজিদে না যাইতে.....তাই যাই নাই।'' !! এখানে ২য় ব্যাক্তি হুজুরের কথা সম্পুর্নটা উল্লেখ করলো না...... কারন হুজুর নিশ্চয়ই তাকে বলেছিলো ''নাপাক অবস্থায়'' মসজিদে না যেতে !!!
রিপোর্টার শিশির মোড়ল যথেষ্ট উপাত্ত নিয়ে একখানা রিপোর্ট করলেন,কিন্ত সবকথা সবখানে উল্লেখ করলেন না..... কিন্ত আকর্ষনীয় এবং দিকবিভ্রমী একখানা রিপোর্ট সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে প্রসব ঠিকই করে দিলেন,কেননা তার উচিত ছিলো সঠিকভাবে আরো পড়ালেখা করে সময় নিয়ে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে রিপোর্ট প্সব করা।
আসুন রিপোর্টটির কিছু অংশ খেয়াল করি ,
২০০১ সালে ২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর জন্ম হয়েছিল অস্ত্রোপচারে, আর ২০১০ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশে। অর্থাৎ ১০ বছরে অস্ত্রোপচারে শিশু জন্মের হার পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়েছে.............সর্বশেষ ২০১০ সালের হিসাবে বাংলাদেশে অস্ত্রোপচারের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশে..............এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী শামস এল আরেফিন বলেন, শিক্ষিত ও ধনীদের যে এই হারে অস্ত্রোপচার দরকার, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হারের চেয়ে তা অনেক বেশি...................
কিন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কি বলছে ??? তাদের প্রকাশিত জার্নালে (World Health Organization. Appropriate technology for birth. Lancet 1985; 2: 436-7)বলা হয়েছে সিজারিয়ান সেকশন করার গ্রহনযোগ্য হার হচ্ছে ১৫% , যেখানে বাংলাদেশ এর চেয়ে কম হারে করছে। এটাকে কেনো এড়িয়ে রিপোর্ট করলেন,বলতে পারেন মন্ডল সাহেব ?? সুত্র বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি হারে বেশিরভাগ দেশেই অস্ত্রোপচার হচ্ছে,অথচ আপনার হেডলাইন দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশেই এর প্রাদুর্ভাব !!!
''......বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় ২০০৯ সালের। দেখা যায়, ওই বছর এক হাজার ৭০১ জন গর্ভবতী মা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে এক হাজার ১৭২ জনের অর্থাৎ ৬৮ দশমিক ৯০ শতাংশ মায়ের সন্তান হয় অস্ত্রোপচারে ......'' ......
আপনার নাম না জানা চিকিৎসকের ভাষ্যমতে নির্বিচারে পেট কাটা হচ্ছে।কিন্তু যে তথ্যটি গোপন করে গেলেন,তা হচ্ছে ,আজকাল সিজারিয়ান করাটা একটা স্ট্যাটাসের ব্যাপার।কিন্তু ঢাকায় যে খরচে বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান করা হয়,তা বেশিরভাগের পক্ষেই যোগানো সম্ভব না।তাই প্রায় সবাই চলে যান বিএসএমএমইউতে এবং নরমাল নয় ,অবশ্যই সিজারিয়ান (প্রথম আলোর বাংলা ব্যাকরনে যাকে অস্ত্রোপচার বলা হচ্ছে ) করতে ।আর বেসরকারিতে কসাইয়ের মত এত খরচ কেনো লাগে,তা আপনারা আমার চেয়ে ভালো জানবেন.......কেননা,আপনাদের পত্রিকায় তো প্রায়ই স্কয়ার/ইউনাইটেড/অ্যাপোলো প্রভৃতি হাসপাতালের বিজ্ঞাপন দেখি !!!
''আইসিডিডিআরবির জনসংখ্যা কার্যক্রমের প্রধান পিটার কিম স্ট্রিটফিল্ড বলেন, একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারে গর্ভ নষ্টের ঝুঁকি ও নবজাতক মৃত্যুহার বাড়ে.......প্রসব-পরবর্তীকালে মায়ের মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়........বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চহারে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের সঙ্গে অপরিণত শিশু জন্মের সম্পর্ক আছে, এতে শিশুর প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি বেশি।...........
দারুন!! অথচ মৃত্যুহার বাড়ছে অস্ত্রোপচারের কারনে,আবার একই রিপোর্টে উনি জানাচ্ছেন, ''একাধিক গবেষণা ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অর্থের সংশ্লিষ্টতা থাকলে অস্ত্রোপচারে শিশুর জন্মহার বাড়ে।..........'' বেশ বেশ !!!
প্রসব পরবর্তীকালে মায়ের মানসিক সমস্যার ব্যাপারে রিপোর্টার অন্যের উদ্ধৃতি তুলে দিয়ে জানালেন প্রসব পরবর্তীকালে মায়ের মানসিক সমস্যা ঘটে।একটু গুগল করলেই তো জানতে পারতেন এই মানসিক সমস্যার জন্য অস্ত্রোপচার দায়ী নয়,প্রসব-পরবর্তী সময়ে এটা নারীর হতে পারে,এমনকি নরমাল ডেলিভারিতেও।মানসিক অবসাদের জন্য উনি যে অস্ত্রোপচারকে দায়ী করে দিলেন.....অথচ পোস্টনাটাল ডিপ্রেশন/সাইকোসিস এর কারন এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যায়নি। আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন।
জানতে ইচ্ছা করছে কোন বিশেষ-অজ্ঞ অস্ত্রোপচারকে অপরিনত শিশুর জন্মের কারন হিসাবে দেখাচ্ছেন ! বিভিন্ন শিশু যারা কনজেনিটালি প্রতিবন্ধি হয়ে জন্ম নিচ্ছে,তাদের প্রতিবন্ধকতার পিছনে বেশ কিছু জেনেটিক অ্যাবনর্মালিটি দায়ি ( বিস্তারিত জানতে চাইলে কমেন্ট সেকশনে আলাপ হবে),দায়ি মায়ের প্রসবকালীন সময়ের অসুস্থতা,দায়ি করা যাবে কিছু ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে,আরো অনেক কিছুকে।কিন্ত অস্ত্রোপচারের কারনে শিশু প্রতিবন্ধি হবে,এটা বলা যায় না। অস্ত্রোপচার-কালীন আঘাতের কারনে শিশুর ক্ষতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না,কিন্তু মনে রাখতে হবে নরমাল ডেলিভারির সময় যদি প্রলম্বিত হয়,তবে ফিটাল ডিসট্রেসের (fetal distress ) কারনেই শিশুর প্রতিবন্ধি হবার সুযোগ বেশি থাকে এবং সেক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই জরুরী।
''........সরকার মাতৃ ও শিশুমৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্যে ৩৩টি উপজেলায় ডিমান্ড সাইড ফাইন্যান্সিং (ডিএসএফ) কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে.......নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গবেষক বলেছেন, দুই হাজার ৮৫০ টাকা প্রণোদনা ভাতা বেশি হওয়ার কারণে চিকিৎসক ও নার্সদের অস্ত্রোপচারে আগ্রহ বেশি।''
ডিএসএফ কর্মসুচী সম্পর্কে প্রথম আলোর নাম না জানা গবেষক জানালেন ,চিকিৎসকেরা ডিএসএফ হতে প্রনোদনা পাচ্ছেন,তাই তাদের অস্ত্রোপচারে আগ্রহ !! সামান্য হোমওয়ার্ক করে রিপোর্ট লিখতে হয়,এই জ্ঞানও নাম না জানা গবেষক (নাকি রিপোর্টার স্বয়ং) হারিয়েছেন দেখা যাচ্ছে!! ডিএসএফ প্রোগ্রাম চিকিৎসক ও নার্সদের আগ্রহের বিষয় নয়,সরকারের আগ্রহের বিষয় যেখানে মাতৃ-শিশুমৃত্যুহার কমানোই লক্ষ্য । সরকারের কর্মসুচীতে কি তাদের অংশগ্রহন করা উচিত নয় ?? আর রিপোর্ট খুব সুন্দরভাবে একটা বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, তা হলো অংশগ্রহনকারী মায়েরা ২০০০-২৫০০ টাকা এবং আনুষঙিক জিনিসপত্রও পান। দরিদ্র হবার কারনে তো বটেই ,ঘরের নোংরা কোনায় নোংরা দাঈয়ের টিটেনাসযুক্ত কাথা-সেলাইয়ের সুই এবং বহুলব্যবহৃত জং-ধরা ব্লেড দিয়ে নরমাল ডেলিভারীর চেয়ে তুলনামুলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মতউপায়ে অস্ত্রোপচার করাতেই আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক।
পুরো রিপোর্টটি পড়ে মনে হলো শুধুমাত্র একটি ডাটাশীট পড়লাম,যেটা আপনি নেটে বসেই গুগলের মাধ্যমে পেতে পারতেন। কিন্তু হেডলাইনের সাথে কোনোদিক দিয়েই সংগতিপূর্ন মনে হলোনা।কিছু সার্কুলেশন বেশি পাওয়াই যদি এই চটকদার হেডলাইনের উদ্দেশ্য হয়,তবে প্রথম আলো বেশ সফল। একটি জাতীয় দৈনিকের ফ্রন্টপেজে আসা একটি রিপোর্টের রিপোর্টার হোমওয়ার্কে এতই দুর্বল,উনি নিজের মতের পক্ষে কোনো যুক্তি দাড় করতে পারলেনই না।একটাই কথা মনে ঘুরতে থাকলো ,''ছাগল দিয়ে হালচাষ হয় না '' ।
সিজারিয়ান সেকশনের সুবিধা এবং অসুবিধা দুইই রয়েছে।কিন্তু এই রিপোর্ট দেখে মনে হলো সিজারিয়ান সেকশন তৈরিই হয়েছে ডাক্তারদের পয়সা খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য,আর হেডলাইন দেখে ভ্রান্তি হওয়াই স্বাভাবিক।
বি.দ্র. পোস্ট সিরিয়াস ধাঁচের হয়ে গেলো। চটকদার হেডলাইন পড়ে আর সংগতিহীন লেখাটি দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।গুছিয়ে লেখা হয়তো হলোনা,ক্ষমাপ্রার্থী। একটা সিনেমা দেখা শুরু করলাম,পাঠকরা বুঝে নিবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০১১ রাত ১০:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



