ওই যে বললাম কোন আবদারই অপূর্ণ থাকতোনা, তাই আমার ছিল এক বিশাল খেলনার ভাণ্ডার। ফ্রেন্ডদের বাসায় নিয়ে এসে জটিল খেলা খেলতাম, কিন্তু আমার খেলার ভান্ডার থেকে যে প্রতিদিন কিছু না কিছু গায়েব হয়ে যেতো সেটা টের পেতাম না। সেইসব জিনিসের সন্ধান মিলতো ওইসব ফ্রেণ্ডের বাসায় যাওয়ার পর। কিন্তু তখন তো আর বলা যায় না যে তুই আমার খেলনা নিয়ে আসছিস কেন? অগত্যা বাসায় এসে আম্মুর কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতাম। আম্মু রেগে গিয়ে বলতো এমন ছেলেমেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করার কি দরকার। কিন্তু এইসব কথা আমাকে বলে কি লাভ আছে? আমি তো ফ্রেন্ড বলতে অজ্ঞান।
অতঃপর কি আর করা? আম্মুকে রোজ রোজ আমার প্যানপ্যানানি শুনতে হতো। কিন্তু এই প্যানপ্যানানির টপিক যদি শুধু এটাই হতো মানা যেতো। খেলতে খেলতে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়লেও আমার তো আর ক্লান্তি আসে না। তাই ঘরে ফিরেই এক কথা, আমি এখন কি করবো, কার সাথে খেলবো ইত্যাদি ইত্যাদি। ফ্রেন্ডদের সবার ভাই-বোন আছে, ওরা ইচ্ছা করলে ঘরে বসেও খেলতে পারে, কিন্তু আমি তো পারি না। একা একা কি খেলা যায়? অতঃপর আমার আবদার হল আমার ভাই লাগবে। আব্বু জিজ্ঞেস করলো ভাই কেন, বোন হলে কি সমস্যা? আমার উত্তর ছেলেরা সারাদিন খেলে মেয়েরা খেলেনা। আমি তো সারাদিনই খেলবো, তাই আমার ভাই চাই (যদিও এর পেছনে আরো একটা কারণ আছে, সেটা হল বোন এনে আব্বু-আম্মুর আদরে ভাগ বসাতে দেয়ার মতো বোকা আমি নই)।
তখন আমি ক্লাস টুতে পড়ি। আমার জন্য মহিলা হুজুর ঠিক করা হল। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরে হুজুরের কাছে পড়তে হত। সবাই বাসায় ফিরে খেলে আর আমি বাসায় বসে হুজুরের কাছে পড়ি, এটা কি হতে পারে? তাই প্রতিদিন বিভিন্ন রকমের বাহানা দেখিয়ে হুজুরের কাছ থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিতাম। আমার হুজুরও ছিল সেইরকম। আমার চালাকিগুলো ধরতে তার বেশি সময় লাগলো না (মনে হয় উনিও আমার মতোই আঁকিবাজ ছিলেন)। এরপর থেকে আমার আর কোন বাহানাই কাজে লাগলো না। অতঃপর একদিন কোরআন শরীফ পড়া শুরু করলাম। যেদিন পড়া শুরু করতে যাবো সেদিন আম্মু বললো কোরআন শরীফ পড়া শেষ হলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হয়। আমি যা চাই তা যেন আল্লাহর কাছে দোয়া করি। তো পড়া শেষে আমি বিশাল এক দোয়া করলাম। দোয়া করে খুব খুশি। আম্মু জিজ্ঞেস করলো আমি কি দোয়া করলাম। খুব খুশি হয়ে বললাম আমি আল্লাহর কাছে দুইটা ভাই চেয়েছি। আম্মু শুনে আকাশ থেকে পড়লো। বললো দুইটা ভাই দিয়ে তুমি কি করবে? বেশি বেশি খেলবো...
তখন আম্মু আমাকে বললো,
: বোকা মেয়ে!! দুইটা ভাই কখনো হয় নাকি?
: হয় না??
: না। এরপর থেকে একটা ভাই চাইবে। ঠিক আছে?
: ঠিক আছে।
অতঃপর দীর্ঘ নয় মাস( আমার কায়দাসহ কোরআন শরীফ খতম করতে এই সময় লেগেছিল) আমি কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম আমার যেন একটা ভাই হয়।
১৯৯৭ সালের নভেম্বর মাস। আমরা সবাই নানু বাড়িতে গেলাম। চরম খুশি ছিলাম ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া লাগবে না তাই, তার চেয়েও বেশি খুশি ছিলাম আমার জন্য ভাই আনা হবে তাই। ৬ তারিখ সন্ধায় আম্মু আর নানু হসপিটালে গেল। আমি তো মহা খুশি। আন্টিদের সাথে বসে আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের সিনেমা দেখছিলাম। তখন রাত ১১টা বাজে। মামা আসলো বাসায়। আমি দৌড়ে মামার কাছে গেলাম আম্মু কই জানার জন্য। মামা বললো তোমার আম্মু তোমার জন্য ভাই এনেছে। কি মজা আমাকে আর পায় কে। আমি তো খুশিতে লাফাতে লাগলাম। মামা বললো,
: থামো,থামো আরেকটা কথা আছে।
: কি?
: তোমার দুইটা ভাই হয়েছে।
আমি তো বাক্যহারা...(এইসব কি বলে মামা?? আম্মু না বললো দুইটা ভাই হয় না?? ধুর আর কারো হলে হবে না হলে নাই, আমার তো দুইটা ভাই হয়েছে, এতেই চলবে)
সেইরাতে সাড়ে এগারোটার সময় মামাকে অনেক বলে কয়ে আমার অনেক আদরের পিচ্চি দুইটা ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম।
সেদিন আমার এক দিনের ইচ্ছের কাছে নয় মাসের প্রার্থনা হার মেনে ছিল। হয়তো একেই বলে ইচ্ছেপূরণ...
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১২ সকাল ১০:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



