somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দস্যিপনা-২: ইচ্ছেপূরণ

০৬ ই মে, ২০১১ বিকাল ৩:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাবা-মার একমাত্র মেয়ে হওয়ার সুবাদে যখন যা চেয়েছি সাধ্যমত দেয়ার চেষ্টা করেছে তারা (অবশ্য সাধ্যের বাইরে কিছু চেয়েছি বলে মনেও পড়ে না)। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফিরে খেলতে যাওয়া, ফিরে এসে খেলনা নিয়ে গোসল করতে যাওয়া (যদিও এই কথা আম্মু জানতোনা, বড় হওয়ার পর বলেছি),দুপুরের খাবার খেয়ে আবার খেলার প্রস্তুতি নেয়া, ঘুমানোর জন্য আম্মুর শাসন (প্রতিদুপুর বেলাতেই আমি ঘুমাতাম আম্মুর মার খেয়ে,যদিও এখন আম্মু পারলে মার দিয়ে আমার ঘুম তাড়ায়), ঘুম থেকে উঠেই আবার খেলা। সন্ধ্যা হয়ে গেলে মাঠে গিয়ে আম্মু আমাকে ডেকে নিয়ে আসতো। অতঃপর মন খারাপ করে ফিরে আসতে হতো। কারণ বাসায় গিয়ে পড়তে বসতে হবে। এই পড়া নামক জিনিসটা আমি দু-চোখে সহ্য করতে পারি না। আমার ফ্রেন্ডরা সারাদিন কতো পড়াশোনা করতো, উলটো আমি গিয়ে ওদের ডেকে নিয়ে আসতাম খেলার জন্য। এই কারণে সব ফ্রেন্ডের মায়েরাই আমার উপর কম-বেশি রেগে ছিল। অবশ্য এইসব ব্যাপার আমি তেমন পরোয়া করতাম না। এই ছিলাম আমি। তবুও কেমন করে জানি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে দেখা যেতো আমার প্লেসটাই সবার আগে (আল্লাহ-তাআলার অশেষ রহমত, তা না হলে আমার এই অবাধ বিচরণ বেশিদিন চলতো না)।

ওই যে বললাম কোন আবদারই অপূর্ণ থাকতোনা, তাই আমার ছিল এক বিশাল খেলনার ভাণ্ডার। ফ্রেন্ডদের বাসায় নিয়ে এসে জটিল খেলা খেলতাম, কিন্তু আমার খেলার ভান্ডার থেকে যে প্রতিদিন কিছু না কিছু গায়েব হয়ে যেতো সেটা টের পেতাম না। সেইসব জিনিসের সন্ধান মিলতো ওইসব ফ্রেণ্ডের বাসায় যাওয়ার পর। কিন্তু তখন তো আর বলা যায় না যে তুই আমার খেলনা নিয়ে আসছিস কেন? অগত্যা বাসায় এসে আম্মুর কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করতাম। আম্মু রেগে গিয়ে বলতো এমন ছেলেমেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করার কি দরকার। কিন্তু এইসব কথা আমাকে বলে কি লাভ আছে? আমি তো ফ্রেন্ড বলতে অজ্ঞান।

অতঃপর কি আর করা? আম্মুকে রোজ রোজ আমার প্যানপ্যানানি শুনতে হতো। কিন্তু এই প্যানপ্যানানির টপিক যদি শুধু এটাই হতো মানা যেতো। খেলতে খেলতে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়লেও আমার তো আর ক্লান্তি আসে না। তাই ঘরে ফিরেই এক কথা, আমি এখন কি করবো, কার সাথে খেলবো ইত্যাদি ইত্যাদি। ফ্রেন্ডদের সবার ভাই-বোন আছে, ওরা ইচ্ছা করলে ঘরে বসেও খেলতে পারে, কিন্তু আমি তো পারি না। একা একা কি খেলা যায়? অতঃপর আমার আবদার হল আমার ভাই লাগবে। আব্বু জিজ্ঞেস করলো ভাই কেন, বোন হলে কি সমস্যা? আমার উত্তর ছেলেরা সারাদিন খেলে মেয়েরা খেলেনা। আমি তো সারাদিনই খেলবো, তাই আমার ভাই চাই (যদিও এর পেছনে আরো একটা কারণ আছে, সেটা হল বোন এনে আব্বু-আম্মুর আদরে ভাগ বসাতে দেয়ার মতো বোকা আমি নই)।

তখন আমি ক্লাস টুতে পড়ি। আমার জন্য মহিলা হুজুর ঠিক করা হল। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরে হুজুরের কাছে পড়তে হত। সবাই বাসায় ফিরে খেলে আর আমি বাসায় বসে হুজুরের কাছে পড়ি, এটা কি হতে পারে? তাই প্রতিদিন বিভিন্ন রকমের বাহানা দেখিয়ে হুজুরের কাছ থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিতাম। আমার হুজুরও ছিল সেইরকম। আমার চালাকিগুলো ধরতে তার বেশি সময় লাগলো না (মনে হয় উনিও আমার মতোই আঁকিবাজ ছিলেন)। এরপর থেকে আমার আর কোন বাহানাই কাজে লাগলো না। অতঃপর একদিন কোরআন শরীফ পড়া শুরু করলাম। যেদিন পড়া শুরু করতে যাবো সেদিন আম্মু বললো কোরআন শরীফ পড়া শেষ হলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হয়। আমি যা চাই তা যেন আল্লাহর কাছে দোয়া করি। তো পড়া শেষে আমি বিশাল এক দোয়া করলাম। দোয়া করে খুব খুশি। আম্মু জিজ্ঞেস করলো আমি কি দোয়া করলাম। খুব খুশি হয়ে বললাম আমি আল্লাহর কাছে দুইটা ভাই চেয়েছি। আম্মু শুনে আকাশ থেকে পড়লো। বললো দুইটা ভাই দিয়ে তুমি কি করবে? বেশি বেশি খেলবো...
তখন আম্মু আমাকে বললো,

: বোকা মেয়ে!! দুইটা ভাই কখনো হয় নাকি?
: হয় না??
: না। এরপর থেকে একটা ভাই চাইবে। ঠিক আছে?
: ঠিক আছে।

অতঃপর দীর্ঘ নয় মাস( আমার কায়দাসহ কোরআন শরীফ খতম করতে এই সময় লেগেছিল) আমি কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম আমার যেন একটা ভাই হয়।



১৯৯৭ সালের নভেম্বর মাস। আমরা সবাই নানু বাড়িতে গেলাম। চরম খুশি ছিলাম ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া লাগবে না তাই, তার চেয়েও বেশি খুশি ছিলাম আমার জন্য ভাই আনা হবে তাই। ৬ তারিখ সন্ধায় আম্মু আর নানু হসপিটালে গেল। আমি তো মহা খুশি। আন্টিদের সাথে বসে আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের সিনেমা দেখছিলাম। তখন রাত ১১টা বাজে। মামা আসলো বাসায়। আমি দৌড়ে মামার কাছে গেলাম আম্মু কই জানার জন্য। মামা বললো তোমার আম্মু তোমার জন্য ভাই এনেছে। কি মজা আমাকে আর পায় কে। আমি তো খুশিতে লাফাতে লাগলাম। মামা বললো,

: থামো,থামো আরেকটা কথা আছে।
: কি?
: তোমার দুইটা ভাই হয়েছে।

আমি তো বাক্যহারা...(এইসব কি বলে মামা?? আম্মু না বললো দুইটা ভাই হয় না?? ধুর আর কারো হলে হবে না হলে নাই, আমার তো দুইটা ভাই হয়েছে, এতেই চলবে)

সেইরাতে সাড়ে এগারোটার সময় মামাকে অনেক বলে কয়ে আমার অনেক আদরের পিচ্চি দুইটা ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম।

সেদিন আমার এক দিনের ইচ্ছের কাছে নয় মাসের প্রার্থনা হার মেনে ছিল। হয়তো একেই বলে ইচ্ছেপূরণ...

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১২ সকাল ১০:৩৬
৩০টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×