somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উগ্রবাঙালের ‘আদিবাসী চেতনা’ ও এক আদিবাসীর মর্মবেদনা (১ম পর্ব)

১৬ ই মে, ২০১০ সকাল ৮:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পার্বত্য এলাকার লোকজন মোবাইল ফোন-এর সেবা থেকে বঞ্চিত ছিলাম অনেক বছর। মোবাইল নেটওয়ার্ক আসার আগে অনেক লোক বিশেষ করে সেনাবাহিনী ও বিডিআরে কর্মরত লোকজন আলুটিলা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে সমতলে ফেলে আসা পরিবার পরিজনের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলতে যেতো।পাহাড়চূড়া থেকে মাঝেমাঝে নেটওয়ার্ক পাওয়া যেতো।চুপিসারে গিয়ে কথা বলার কাজটা সেরে আসতে হতো।তাদের মর্মবেদনা অনুভব করতাম তীব্রভাবে। পরিবার পরিজন থেকে অনেক দূরে। টাকা পয়সা পাঠাতে হয়। কিন্তু কী করার আছে! তারপরও মনে মনে বলতাম, “দেখ, তোমাদের কর্তাবাবুরা কতই না সমান অধিকারের কথা বলে। বুঝ, পাহাড়ে সমান অধিকার কাকে বলে”।
একদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আলু টিলার চূড়ায় অবস্থিত মন্দির প্রাঙ্গণে উঠেছিলাম। নিতান্তই বিকেল ভ্রমণের জন্যে। কিন্তু সেদিন সেসব অসহায় সেনা-বিডিআর সিপাহীদের আর চোখে পড়ল না। এখন মোবাইল নেটওয়ার্ক এসেছে। মনে হয়, মোবাইল করার জন্যে তাদের আর এখানে আসার প্রয়োজন পড়ে না।কিন্তু তাদের আগের দিনের কথাগুলো, মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া না পাওয়ার বেদনাগুলো আজো মনে পড়ল। প্রাণান্তকর চেষ্টার পর কথা বলতে না পেরে তখন অনেকে গালি দিতো, “শালার খানকি পোলারা যতসব সুবিধা ভোগ করছে, আর আমাদের মরণ হচ্ছে…”। বুঝতে অসুবিধা হতো না, এই গালি ছিল তাদের কর্তাবাবুদের উদ্দেশ্যে। কারণ কর্তাবাবুরা রাজার হালে থাকতো, আর সাধারণ সিপাহীরা খেটে-খুটে মরতো পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় অবস্থিত ক্যাম্পগুলোতে। আজও সেসব সেপাইদের কথা মনে মনে স্মরণ করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমার মোবাইল বেজে উঠল।
“হ্যালো, অডং তুই কোথায়?” লেইপেদা ফোন করেছে ঢাকা থেকে।
বললাম, “আলুটিলায় বেড়াতে এসেছি। বিকেল বেলার হাওয়া খেতে”। এ কথা বলতে না বলতে সে বলে উঠল, “খা খা, মুক্ত হাওয়া খা।এখানে ঢাকায় গলির ভিতর ইটের দেওয়ালের মধ্যে থেকে পচা হাওয়া খেতে খেতে আর বেশি দিন এ দুনিয়ায় বাঁচবো না রে”! বললাম, “ঢাকায় আরামে আছিস, চাকরী করছিস, যতসব নাগরিক সেবা ভোগ করছিস…” কথা শেষ করতে পারিনি। লেইপেদা বলে উঠল, “থামা, থামা, তোর আজেবাজে কথা, জান বাচেঁ না, আবার নাগরিক সেবা”! সে বলল, “অডং, তোরে ফোন করছি একটা বিষয়ে কথা বলার জন্যে”।

এ প্রসঙ্গে লেইপেদা সম্পর্কে একটু বলা প্রয়োজন। লেইপেদাসহ ভারতের শরণার্থী শিবিরে একসাথে ‘খোলা আকাশের নীচে’ পদাংতাং (বাংলায় ফকফকা) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুলে লেখাপড়া করেছিলাম। স্কুলের নাম পদাংতাং হওয়ার কারণ হলো, স্কুলের চারদিকে কোন বেড়া নেই, গাছের নীচে হালকা শনের ছাউনি ছিল। মূলত শরণার্থী শিবিরের ছেলেমেয়েরা যাতে লেখাপড়া ভুলে না যায়, পড়ালেখার চর্চা একটু হলেও করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে শিক্ষিত কয়েকজন অভিভাবক বিনা পয়সার পড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই পদাংতাং স্কুলে লেইপেদার সাথে পরিচয়। তারা এখন আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। পার্বত্য চুক্তির পরে দেশে ফিরে আসার পরও তারা তাদের আসল গ্রামের বাড়ী মাটিরাংগার অযোধ্যা এলাকায় ফিরে যেতে পারেনি। সেটেলার বাঙালরা তাদের গ্রাম ও জায়গা জমি দখল করে নিয়েছিল ’৮০-৮১ সালে।সেই থেকে তারা বাস্তুহারা যাযাবর জীবন যাপন করে আসছে। ’৮২ সালে দীঘিনালায় গিয়েছিল। সেখান থেকেও তারা সেটালার বাঙালদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে ’৮৬ সালে জীবন বাঁচার তাগিদে শরণার্থী হতে হয়েছিল ভারতে। অনেকদিন পর ফেসবুকের সূত্রে লেইপেদার সাথে যোগাযোগ হয়েছিল। তাই সে মাঝে মাঝে ফোন করতো।

তাকে বললাম, “কি বিষয় নিয়ে আমার সাথে আলাপ?”
“ব্লগ নিয়ে। সামহোয়ারইনব্লগ। তোর লেখা পড়লাম। তুই নিয়মিত লেখা দিচ্ছিস না কেন?”
বললাম, “কর্মব্যস্ততার মধ্যে ব্লগে লেখার জন্যে সময় মেলানো খুব কঠিন”।লেইপেদা সঙ্গে সঙ্গে বললো, “সময়-তময় বুঝি না।দেখলাম, উগ্রবাঙালরা তোর ব্লগে আদিবাসী প্রশ্ন নিয়ে লাফালাফি করছে। এ বিষয়ে তোর দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিতে হবে”।
“যাদের চোখ অন্ধ, বাঙ্গালী বাদে যারা অন্যকিছু চিন্তা করতে পারে না, ‘উপজাতিরা বহিরাগত’, বাঙালরাই এ দেশে প্রথম বসতিস্থাপন করেছিল - এ রকম বদ্ধমূল ধারনায় যারা আবিষ্ট তাদেরকে তত্ত্বকথা বলে বুঝানো যাবে কি? যারা জেগে জেগে ঘুমায় তাদের জাগানো যাবে কি?” তখন লেইপেদা বলে, “তোর এতসব কথা বুঝি না। আদিবাসী প্রশ্নে তোর লেখা দিতে হবে। আমি সেটা চাই। উগ্র বাঙালদের চোখ খুলুক আর নাই খুলুক আমি তোর লেখা চাই”।
লেইপেদার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বললাম। বললাম, “তোর ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাবে তো”। সে বললো, “ব্যালেন্স নিয়ে চিন্তা করিস না। তোর সঙ্গে সারাদিন কথা বলতে পারবো”।

চলবে…..
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০১০ বিকাল ৩:৫৯
২০টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×