"স্যার, রাস্তা ভরা জাম।আইতেন কেমনে টাইম কইর্যা?"
আলমগীর আলী কালামের কথায় কান দেয়না।সে আবার হাই তুলে মনে মনে গালি দেয় নিজের ভাগ্যকে।সদরঘাটে টার্মিনালে তার ময়ুর-১ এবং ময়ুর-২ নামে দুটি লঞ্ছ চলে যার একটি গতকাল দুই শিশুকে চাপা দেয়।দুটি শিশুই মারা যায়, আর তাই আজ আলমগীর আলী ক্ষতিপূরণ দিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বাড়ি নিজামবাগে যাত্রা করেছে।খুব বেশিদিন হয়নি তার লঞ্ছটি সে চালু করতে পেরেছে-হবে হয়তো বছর দুই।এর মধ্যেই বহুবার ঝামেলার শিকার হয়েছে আলমগীর আলী।
"ফকিরা, লঞ্চটা বেইচ্যা দিমু ভাবতেছি,এই ছোটলোকের ব্যবসায় আমার পোষায়না।"
ফকির আলী গাড়ির পিছনে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।মালিকের কথায় ধড়পড় করে জেগে উঠে মাথা নাড়ায় জোরে জোরে।বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে, "কথা হাচা।আপনের মত বিরাট মানুষ এইসব ফকিন্নীগো ব্যবসা কইরা টিক্যা থাকতে পারবেন না।"
"হুনলাম, ওসি নাকি আমার লগে দেহা করবার চাইছে।কত চায়?", আলমগীর আলী জিজ্ঞাসা করে।
"হেয় ২০ হাজার চাইতাছে।আপনে দশ হাজার হাতে ভইর্যা দিয়েন।" ফকির মুখ গোমড়া করে বলে যেন টাকাটা তারই যাচ্ছে।
এভাবে কথা চলতে চলতে একসময় তারা নিজামবাগের ওই ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে পৌছায়।টিনশেড বাড়ি, যার ভাঙ্গাচোরা গেটের বাহিরে নোংরা সাইনবোর্ডে লিখা আছে আনোয়ার হাজির বিতান। আলমগীর আলী গলায় কাশি দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে যায়।বাহিরে ভেতরে তখন বহু মানুষের ভীড়।যে শিশু দুটি মারা গেছে তাদের নাম নাসিমা ও আল আমিন।এর মধ্যে নাসিমার লাশ সে বাড়ির উঠোনে দেখতে পায়।তাকে দেখে গুটি কয়েক এলাকার মানুষ সালাম দেয়। কামরাংগীচরের ওসি হাত কচলিয়ে তার কাছে এসে বড় করে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে, "শরীরটা ভালো নাকি স্যারের?"
আলমগীর আলি চোখ থেকে চশমা খুলে পাঞ্জাবীর কোণা দিয়ে মুছে ওসির দিকে তাকায় বলে, "শরীর ভালো নাই, মনটাও ভালো নাই।মাসুম বাচ্চাগুলা এইভাবে মইর্যা গেলো, কলিযায় একটা বিরাট বাড়ি খাইছি।"
ওসি কামরুল আশেপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে।তারপর ফিসফিস করে বলে, "আল্লাহর মাল আল্লায় নিছে,তাড়াতাড়ি কিছু দান খয়রাত দিয়া সুরাহা কইর্যা এইখান থিকা চইল্যা যান।পাবলিক সেন্টিমেন্টের একটা ব্যাপার আছে কিন্তু।"
আলমগীর আলী মুখ বাকিয়ে মাথা নাড়ায়।লাশের পাশে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা অদ্ভুত ভাবে গোঙ্গাচ্ছে।সে বুঝতে পারে এইটাই সন্তানদের মা।একটু বৃদ্ধ করে একটা লোক মেঝেতে শুয়ে বুকে হাত দিয়ে আছে।কিছুক্ষণ পরপর কাশছে আর বলছে, "কি হয়্যা গেলো রে।"
ওসি মানুষজন সরিয়ে আলমগীর আলীকে এগিয়ে নিয়ে যায় লাশের কাছে।লাশ দেখিয়ে বলে, "এই মেয়েটার নাম ছিলো আর এই মহিলা হইলো এর মা।এর নাম মরিয়ম।আরেকটা ছেলে যে মারা গেছে তার লাশ হাসপাতাল থেকে আসতাছে খুব দ্রুত।"
ওসি মরিয়মের কাছে যেয়ে বলে, "মরিয়ম স্যার আসছে।একটু উনার সাথে কথা বলো।উনি লঞ্চের মালিকপক্ষের লোক।"
মরিয়ম আলমগীর আলীর দিকে তাকায়, তারপর আবার সন্তানের লাশের দিকে চেয়ে থাকে।১২ বছরের নাসিমা, তার আদরের বড়মেয়ে বিকৃত অবস্থায় তার পাশে বসে আছে।মা মরিয়ম তার মমতার হাত দিয়ে মৃত নাসিমার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।সে নিশ্চুপ নিষ্পলক।যে মা খনিকের মধ্যে দুই ছেলেমেয়েকে হারিয়ে ফেলে তার মুখে ভাষা থাকার কথাও নয়।
আলমগীর আলী মরিয়মের কাছে এগিয়ে এসে বলে "আম্মাজী আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে আসছি।যে ডেরাইভার লঞ্চ চালাইতাছিলো তারে আমি নিজে জেলে ভইরা আসছি।আপনার সন্তানগোরে তো ফিরায় আনতে পারবোনা।পারমু শুধু আপনাগো পাশে একটু দাড়াইতে।আমি হাতজোড় কইর্যা ক্ষমা চাইতাছি, আপনে আমারে মাফ দেন।"
বৃদ্ধ আনিস মিয়া, সন্তানদের বাবা তার রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে স্ত্রী মরিয়মের পাশে বসে।মরিয়ম আর তার স্বামী আলমগীর আলীর কথায় তার দিকে খানিকটা চাহনী দেয়।আনিস মিয়াই বলে, "আমার পোলাটা ওর বুইজানরে দেখতে গ্রামে যাইতাছিলো।এই মাসুম পোলারে আল্লা কিলায় নিয়া গেলো।"এটুকু বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আনিস মিয়া।
আলমগীর আলী আনিস মিয়ার মাথায় হাত দিয়ে বলে, "বাইজান খোদায়ে পাকে যা লিখা রাখছে তা তো চেঞ্জ হইবোনা।আপনে আমি খালি হাত তুইল্যা উনার কাছে চাইবার পারি।এই মাসুম বাচ্চাগুলার জন্য জান্নাত ফরয।ওরায় আল্লার ঘরে খারাপ নাই, চিন্তা কইরেন্ন্যা।"
আনিস মিয়া কাদতে কাদতে হাত তুলে উপরে, "আল্লা আমার বাচ্চাগুলানরে দেইখো,আমার বাচ্চাগুলান দেইখো।"
আশেপাশের অনেক মানুষের চোখের কোণায় পানি জমে।একে একে অনেকে শান্তনা দিতে এগিয়ে আসে মরিয়ম আর আনিস মিয়ার দিকে।কিন্তু তাদের মুখে কোন ভাষা নেই আজ।
আলমগীর আলী সব মিটমাট করে যখন এক ঘন্টা পরে বাসা থেকে বের হচ্ছিলো, তখন ওসি কামরুল সাহেব আবার হাত কচলিয়ে কচলিয়ে তার কাছে আসে।
"স্যার ফকিন্নীর পোলা মাইয়া, তাই পার পায়া গেলেন।আপনার লঞ্চটাও বাচলো।মামলা খাইলেন না আর কি।"
আলমগীর আলী বিজ্ঞের মত মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তার পেট্রল নিশান গাড়ির সামনের সীটের দরজা খুলে বসতে যায়। ওসি তার পেছনের এক কনস্টেবলকে ডেকে নিয়ে এসে আলমগীর আলীর সামনে দাড় করিয়ে বলে, "এর হাতে কিছু দিয়া দিয়েন।আপনাদের জন্য এত কিছু করি, আপনারা যদি একটু না দেখেন তাইলে কেমনে চলবো বলেন?"
আলমগীর আলী ফকিরের দিকে আড়চোখে তাকায়। ফকির একটা খয়েরি মোটা খাম বের করে চোখ নিচে নামিয়ে কনস্টেবলের হাতে গুজে দেয়।ওসি কামরুল হাসিমুখে বলে, "স্যার ভালো থাকবেন।ফকিন্নীর পোলা-মাইয়া ঘন্টায় ঘন্টায় পয়দা হয়।ওগো নিয়া মন খারাপ কইরেন না।"
আলমগীর আলী দাত বের করে কামরুল ওসির দিকে তাকিয়ে বলে, "কথা সত্য বলছেন ওসি।আপনেও কি কোন ফকিন্নীর পোলা ছিলেন?নাইলে আপনাগো মত আমাগো রস খাওয়ার লোক এত পয়দা হইলো কুথা থিকা।"
কামরুল ওসি তার হলুদ দাত বের করে বলে, "সালাম স্যার ভালো থাইকেন।"
আলমগীর আলী ওয়ালিকুম বলে গাড়ীতে উঠে বসে দ্রুত কামারাঙ্গীচরের সেই সব হারানো পরিবারের আবাসস্থল থেকে দূরে চলে যায়।
মরিয়ম তখনো নাসিমার লাশ নিয়ে বসে আছে।সারাটি দুপুর, বিকাল অনেক কেদে তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে।আনিস মিয়ার বুক ধড়পড় করে, তবুও সে হাক ডেকে কাদে।একটু পর তার ছেলে, নয় বছরের আল আমিনের লাশ বাড়ির উঠোনে নাসিমার পাশে আশ্রয় নেয়।মরিয়ম একবার আমিনের লাশ আরেকবার নাসিমার লাশের দিকে তাকায়।তার আরেক মেয়ে হাসিনা তখন তার কাধে মাথা দিয়ে কাদে।বড় ছেলে মনির বাবার পাশে বসে আছে মাথা নিচু করে।তার গায়ে ছেড়া নীল জামা, তার ভাইটিও একই রকম একটা নীল জামা পড়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলো।তাদের একমাত্র ও আদরের ফুফু মিনা যাকে তারা বুইজান বলে তাকে দেখার জন্য।বুইজানের অনেক অসুখ।ঈদের দিনেও সে ঘর থেকে বের হতে পারেনি।কিন্তু আজ সেও মনিরদের বাসায় বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে।
মাগরেবের নামাজের পর মরিয়ম আবার জোরে জোরে কাদতে থাকে।মিনা মরিয়মকে জড়ায় ধরে সান্তনা দিতে যায়, কিন্তু নিজেই কেদে আকাশ বাতাস ভারী করে।সে আনিস মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, "ও ভাইজান আমার আমিন আর নাছিমার এইডা কি হইলো।ঈদের আগের দিন আমারে ফোন কইরা কইছিলো, বুইজান ঈদের খাবার রাইখ্যা দিয়ো।আমি তোমার শেমাই খামু পরের হপ্তাহর রবিবার আয়া।আমি এই শরীল লয়া ওগো লিগা রান্না কইরা রাখছিলাম রে ভাইজান।আমার পোলাডা খাইবার পারলোনারে।"
আনিস মিয়া কিছু বলে না।তার চোখ আকাশের দিকে, সে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন খোজার চেষ্টা করে।
মরিয়ম, আনিস মিয়ার পরিবার আলমগীর আলীর কাছে থেকে হাজার বিশেক টাকা পায়।পার পিছ সন্তানের জন্য ১০ হাজার করে।এর বিনিময়ে তারা ময়ুর-২ লঞ্চের নামে কেস করবেনা বলে চুক্তি হয়।আরেকটি লঞ্চ কোকো-১ তার থেকে আরো কিছু টাকা কম দিয়ে একই রকম চুক্তি করে।তাদের লঞ্চের কোন ভুল হয়নাই এ কারণেই তারা কিছু অর্থ কম দিয়েছিলো বলে জানা যায়।প্রশ্ন হলো, নাসিমা আর আমিনের মত শিশুদের মূল্য পার পিছ দশ হাজার আপনার কাছে কতটা যুক্তিযুক্ত?
হয়তো দুদিন পর গভীর রাতে মরিয়ম আবার চিৎকার করে কাদবে।হয়তো বিলাপ করে বলবে, "আমার পোলাডার দাম দশ হাজার টাকা?এই টাকা নিয়্যা আমার পোলারে কেউ দিয়া যাইবোগো?"
হয়তো বৃদ্ধ আনিস মিয়া সেই হাজার বিশ টাকা দিয়ে কেনা ভাতের হাড়িতে চোখ দিয়ে বলবে, "এই ভাত খামুনা।"
নাকি দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত মরিয়ম আর আনিস মিয়া সব ভুলে আবার আগের সেই ক্ষয়ে যাওয়ার জীবনের পুনরাবৃত্তির পথে এগিয়ে যাবে?
নাসিমা আর আমিনের দিকে তাকিয়ে দেখবেন কি একবার।আমি সেই নিষ্পাপ শিশুগুলোর মায়াভরা চোখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু দেখতে পাই।নাসিমার চোখে আমি অসম্ভব স্বপ্ন লালন করা একটি ছোট্ট শিশুকে দেখতে পাই।আল আমিনের চোখের দিকে তাকিয়ে আমি দেখতে পাই একটি দুরন্ত, খানিকটা দুষ্ট বালককে যার মাঝে আছে পড়াশোনা করতে না পারার দুঃখ, দেখতে পাই এই নয় বছর বয়সেই জুতার কারখানায় দিনভর পরিশ্রম করার ক্লান্তির গল্প।
তবে দুজনের চোখের মাঝেই একটা সাধারণ অনুভূতি আমি খেয়াল করি।কিসের যেন অভিমান! যে অভিমান অফিসে ইজি চেয়ারে বসা প্রফেশনাল আমার চোখে একফোটা পানি জমা করে।
আমি ভাবতে চেষ্টা করি যে সময় ময়ুর – ২ নামক লঞ্চটি এই মাসুম শিশুগুলাকে ধাক্কা দিয়েছিলো তখন তারা কি ভাবছিলো?আর আমি লজ্জা পাই, যখন মনে হয় এই শিশুগুলোর মত আরো শিশুগুলোর জন্য আমার কিছু করার নাই।
********************************************************************
আমার আজকের লিখায় অধিকাংশ নাম এবং পুরো ঘটনার সবটুকু সত্য(ঘটনাটি আজকের দৈনিক পত্রিকা থেকে জেনেছি)।কিছু কাল্পনিক তথ্য শুধু লিখার খাতিরে প্রবেশ করাতে হয়েছে।আজকে আমার এই লজ্জা দিবসে আপনাদেরও একটু লজ্জা দেয়ার বাসনা হলো তাই আমার এই লেখা।যাই হোক, ঘটনা শেষ।আসুন আবার আমরা আস্তিক নাস্তিক, সামু আমু নিয়ে মাতামাতি শুরু করি।ভালো থাকুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



