“মেঘবালক চিঠি লিখেছিলো মেঘবালিকাকে, কি লিখেছিলো তা নাহয় আমরা নাই জানি।আমরা শুধু জানি সেই মেঘবালক কদম ফুলের ঘ্রাণ নিয়েছিলো সবটুকু হৃদয় উজাড় করে।নিশি যখন গহীন আধারে হারিয়ে গিয়েছিলো তখন দুহাত বাড়িয়ে জোসনাকে চুপি চুপি ছুয়ে দেখেছিলো।মেঘবালিকার ভালোবাসা যখন দুষ্টু শশীকে নিভৃতে আড়াল করে, তখন মেঘবালক রাগে বোবা কান্নায় অভিমান করে।সেই অভিমানই বুঝি মেঘবালিকাকে মর্ত্যে নামিয়ে এনেছিলো, ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলো।আসো এবার সেই ভালোবাসার কথা বলি চুপিচুপি” – কাজী ভাই এভাবেই গল্পটা শুরু করেন।আমরা মনমুগ্ধ হয়ে তার আবেগভরা গমগমে কন্ঠের ঝরঝরে গল্পগুলো শুনি।
এখন রাত দশটা বাজে, একটু পর ভাবী আমাদের রুমে আসবেন।হাতে থাকবে একটা নীল ট্রে আর তাতে ঢাকা থাকবে আগুন গরম শীতল পিঠা।আমি এই পিঠা খেতেই গভীর রাত জেগে কাজী ভাইয়ের বাসায় পড়ে থাকি।কাজী ভাই আমাদের প্রাণের মানুষ, এই পুরো বানিয়াচর গ্রামের এমন একটা মানুষ যে কারো সাতে পাচে নেই।তিনি ভালোবাসতে জানেন, ভালোবাসা শেখাতে জানেন।আমরা কিছু স্বপ্নময় তরুণ তার আহবানে সাড়া দিয়ে গল্প শুনতে আসি।
কাজী ভাইয়ের লেখা স্থানীয় অনেক পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে।এইতো বছরখানেক আগে তার একটা কবিতা প্রকাশ পেয়েছিলো প্রথম আলো দৈনিকে। সেই কবিতাটা সদর থেকে ফটোকপি করে উনি অনেক বিশিষ্টজন আর মুরুব্বীদের বাসায় পৌছিয়ে দিয়ে এসেছেন।তার নিজের ঘরে একটা ফ্রেমে কবিতার পাতা সাজিয়ে রাখা আছে।লীনা ভাবি তার এহেন কাজকর্মে অত্যন্ত বিরক্ত।আমাদেরকে প্রায়ই বলেন, “তোমরা তোমাদের ভাইকে কিছু বলোনা কেন?সামান্য একটা কনফেকশনারী দিয়ে গল্প গুজব করে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।সে বুঝেনা তার একটা ছেলে আছে এখন?”
আমরা মাথা নাড়ি, আমরা বুঝতে পারিনা লীনা ভাবী কেন বুঝেনা তার মত ভাগ্যবতী তরুণীরা জনমে জনমে এমন একজন মানুষকে কাছে পায়।ভাবী কি ভুলে গেছে, এমন আলাভোলা মানুষটাই তার বিয়ে যেদিন হবে আরেকজনের সাথে সেদিন কি ভয়ংকর কাজ করেছিলো।কাজী ভাই সেদিন বিয়ের মঞ্চে উঠে বরকে ঝাড়া দিয়ে ফেলে চিৎকার করে বলেছিলো, “সারাজীবন যেই মেয়ের জন্য কবিতা লিখছি। আজ তাকে আরেকজনের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবো এত কাপুরুষ আমি না।দেখি কে পারে আমাকে এখান থেকে সরাতে।শ্বশুর আব্বা মেয়ে নিয়ে আসেন”।
কেউ মেয়ে নিয়ে আসেনি, লাঠি নিয়ে এসেছিলো।লাঠি দিয়ে কাজী ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো।মারতে মারতে যখন তাকে প্রায় অজ্ঞান করে ফেলে, তখনও সে লীনা ভাবির আব্বা তমিজ উদ্দিনের বাড়ি থেকে বের হয়নি।লীনা ভাবি একটু পর বিয়ের শাড়ি খুলে বাহিরে এসে কাজী ভাইয়ের হাত ধরে বললো, “চলো”। সেই যে কাজী ভাই ভাবীর হাত ধরেছিলো আজো তা ছাড়েনি।একবারের জন্যও না।
আজ খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে যখন উঠোনে পা দিলাম, তখন এক আশ্চর্য্য স্নিগ্ধতা আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললো।গাঢ় ঘন কুয়াশার আলিঙ্গন আর পায়ের নিচে সবুজ ঘাসের ঝকমকে শিশির বিন্দু আমাকে কবি কবি করে তুললো।আমি ভাবলাম জীবনে যা কখনো করিনি আজকে না হয় তাই একবার চেষ্টা করি।আমি একটা কবিতা লিখার জন্য প্রাণপণ প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।ঠিক তখন আমাকে আমার ছোট মামা কানাডা থেকে ফোন দিলো।আমি ফোন ধরলাম অনেক ভারী একটা মন নিয়ে।আমার পুরোটা শৈশব জুড়ে এই মামার স্মৃতি আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে।এখনো মনে পড়ে মামার হাত ধরে সাতার শেখা, সাইকেল চালানো শেখা এবং পাশের বাড়ির কাঠাল চুরি করতে শেখার মধুর অভিজ্ঞতার কথা।আমার এই মামার অতি অল্প বয়সে কি হয়েছে জানিনা, মা বলে গলায় ক্যানসার।যেদিন প্রথম জানলাম, সেদিন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে সারাদিন জায়নামাজে বসে ছিলাম।আমি প্রার্থনা করেছিলাম, আমার সবকিছু খোদা নিয়ে নিলেও যেন মামাকে আরো একশ বছর আয়ু দেয়।
ফোন ধরে মামার ফ্যাসফ্যাসে গলায় হ্যালো শুনি।আমি মামাকে বলি, “মামা শুনতে পাচ্ছি বলো”।
মামা হাসে।হাসতে হাসতে বলে, “বল্টু তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস মনে হয়।তোরে কত দিন দেখিনা।তোর সাথে পুকুরে সাতার কাটতে বড় ইচ্ছা হইতেছে।কিন্তু আয়ু নাই”।
এইটুকু বলে মামা ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন সে আমার সাথে সাতার কাটতে পারছেনা বলে দুঃখে মরে যাচ্ছে।আমি মামাকে বলি, “মামা তুমি দেশে এসে পড়োনা কেন?নিতু আন্টি প্রতিদিন বাসায় এসে তোমার কথা জিজ্ঞেস করে।উনার বাচ্চাটার নাম রাখছে মিশু”।
মামা আবার হাসে।হেসে হেসে বলে, “তোদের কাছে আর আসতে ইচ্ছা করেনা”।
আমি চুপ করে থাকি, কিছু বলিনা।আমার খুব মনে পড়ে সেদিনের কথা যেদিন নীতু আন্টির বিয়ে হয়ে যাচ্ছিলো।তার আগের রাতে আমার পাহাড়ায় নীতু আন্টি গোপনে মামার সাথে দেখা করতে এসেছিলো।আন্টি সবসময় মামার সাথে ঝগড়া করতো, তাই আমি যখন গোপনে তাদের কথা শুনছিলাম তখন অনেক অবাক হয়েছিলাম।যারা এত ঝগড়া করে তাদের মধ্যে প্রেম প্রেম ভাব আসে কি করে?আমার ছোট মাথায় তা ঢুকেনি।
পরেরদিন আমার নানাজান মামাকে ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে রেখেছিলো।উনি নীতু আন্টির পরিবারকে পছন্দ করতেন না, কারণ নীতু আন্টির বাবা নাই।তারা অনেক গরীব।আমি মামার বন্দী ঘরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম মামা হাত পা ছুড়াছুড়ি করছে।আমাকে দেখে মামা বলেছিলো, “বল্টু নীতুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছেতো! আর মাত্র কিছুক্ষণ।আমার দরজাটা একটু খুলে দে না”।
আমি নানাজানের ভয়ে আর মামার ঘরের সামনে যাইনি।মামাকে যখন পরদিন ঘর থেকে বের করে আনা হয় তখন মামা একেবারে শান্ত মানুষ।সুন্দর করে নানীর কাছে যেয়ে পা ধরে সালাম করে নানার কাছে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বললেন, “আব্বা আমি যাই”।
নানা জিজ্ঞেস করে, “কই যাবি বেটা?”
মামা হাসে, এরপর হারিয়ে যায়।অনেকদিনের জন্য হারিয়ে যায়।পাচ বছর হয়ে গেল মামা নানা-নানীর সাথে কথা বলেন না।মাঝে মাঝে আমাকে আর মাকে ফোন দেয়।আম্মু ফোন ধরলেই কাদে অনেক।মামাকে বলে, “তোর বোনকে দেখতে ইচ্ছা করেনা?তোকে মানুষ করছে কে?আমি না আম্মা?আমাকে তুই মা ডাকতিনা?”
আমিও একটু একটু কাদি, কারণ মামা আমাকে অনেক ভালোবাসতেন।আমাকে জন্মের পর থেকে কোলে নিয়ে নিয়ে মানুষ করেছেন।মা মামাকে বলতেন, “আমি তোকে মানুষ করেছি, এইবার তুই আমার ছেলেকে মানুষ করবি”।
আমার মামা আমাকে সবজায়গায় কোলে করে নিয়ে যেতেন।একটুও কোল থেকে নামতে দিতেন না।একবার মা কি কারণে যেন আমাকে বেদম মার মেরেছিলো।মামা আমাকে সেদিন আর একবারের জন্যও ছাড়েনি।আমি মার খেয়ে তিনদিন জ্বরে পড়েছিলাম।এই তিনদিন মামা আমার বিছানায় পাশে বসে ছিলেন।আমাকে নিয়ে সারা রাত ঘুমিয়েছেন।আজকে আমার এই মামা হয়তো আর বাচবেনা, তাকে চলে যেতে হবে অনেক অনেক দূরে।এই জন্য অনেকদিন হলো আমি আল্লাহর সাথে বিশাল বিশাল ঝগড়া করি।আল্লাহ মনে হয়না আমাকে পাত্তা দেয়।
মামা আমাকে ফোন রাখার আগে বললেন, “বল্টু তুই নীতুকে বলিস আমি স্যরি”।
আমি মাথা নেড়ে বলি, “আচ্ছা মামা বলবো”।
মামা বললো, “আমি আজকাল কথা বলতে পারিনারে।খুব কষ্ট হয় গলায়।আপাকে বলিস আমি পরে ফোন দিবো।ঠিক আছে?”
আমি আবার মাথা নাড়ি।মামা ফোন কেটে দেয়, আমি তবুও ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকি।আমি ভাবছি, শুধুই ভাবছি মামার কথা।কেন কিছু মানুষ জীবনে কিছু পায়না আমি জানিনা?
একটু রোদ উঠলে আমি কাজী ভাইয়ের বাসায় যাই।দুদিন হলো তার বাসায় যাওয়া হয়না।আমি যখন কাজী ভাইয়ের বাসায় পৌছালাম দেখলাম ভাবী কাদছে।কাজী ভাই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।আমি হতভম্ব হয়ে একবার ভাবলাম ফিরে যাই।তারপর ভাবলাম একটু খোজ নিয়ে দেখা দরকার।আমি কাজী ভাইয়ের পাশে যেয়ে বসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কাজী ভাই কি হয়েছে?”
কাজী ভাই কিছু বলেনা, চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার মাথার উপরে ঝুলন্ত ফ্যানের দিকে।ভাবী আমাকে বলে, “কাব্যর কি যেন হয়েছে?এই বাচ্চা মানুষের সাথে আল্লাহ কেন এমন করে?”
ভাবী এটুকু বলে অঝোরে কাদতে থাকে।আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি পাশে বিছানায় শুয়ে থাকা কাব্যর দিকে।কাব্যর ছোট্ট বুকটা কেমন উঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে।কাজী ভাই একটু স্বাভাবিক হলে আমাকে বুঝিয়ে বলে, এই রোগটা হলো Complex Pediatric Heart Disease। আমাদের ছোট্ট কাব্যর ছোট্ট হৃদয়ে কিভাবে যেন এই রোগটা বাসা বেধেছে।আজকে ডাক্তার বলেছে, ভারতের ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
কাজী ভাইয়ের মনটা অনেক ধনী হলেও, সম্পদে তিনি অনেক দরিদ্র।চিকিৎসা খরচ দেয়ার মত সামর্থ্য তার নেই।আমি হতভম্ব হয়ে থাকি, কিছু বলার মত সুযোগ আমার ছিলোনা।আজকে আবার পরম করুণাময়ের করুণার অভাব প্রবলভাবে বোধ করতে লাগলাম।১ বছরের কাব্যকে নিয়ে আমি আর আমার বন্ধুরা কত কিছু প্ল্যান করেছিলাম।এইতো আর মাত্র দুদিন পর কাব্যর জন্মদিন।আমি সদরে আছলাম আঙ্কেলের দোকান থেকে একটা খুব সুন্দর ছোটখাটোর মধ্যে গাড়ি কিনেছি, লাল রঙের গাড়ি।আমি বেকার মানুষ, নাহলে একটা সত্যিকার গাড়ি কিনে ওটায় কাব্যকে বসিয়ে ঘুরাতাম।কাব্য নামের বিলাই ছানাটা যদি হারিয়ে যায়, তবে এই জগতটা কি শব্দহীন হয়ে যাবে না?চারদিকের সবুজে কি সজীবতা আর খুজে পাওয়া যাবে?আমার মনে হয়না।কাজী ভাইয়ের সামর্থ্য না থাকতে পারে, আমাদের অনেকের তো আছে।আমি মনে মনে ঠিক করলাম, বন্ধু বান্ধব সবাই মিলে ভিক্ষা করে হলেও কাব্যর জন্য টাকার ব্যবস্থা করবো।
কাজী ভাইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে যখন বের হলাম তখন পড়ন্ত দুপুর।ঝা ঝা রোদের উষ্ণতা আমাকে স্পর্শ করলোনা, গনগনে লাল সূর্যের রৌদ্রজ্জ্বল শিখা আমাকে পরাস্ত করেনা।বুক ফেটে বারবার কান্না আসে যখন মনে পড়ে কাব্যের আধো আধো অর্থহীন শব্দগুলোর কথা, তার অভিমানী ছলছল চোখের আদরমাখা চাহনীর কথা।আমরা কাব্যকে নিয়ে কত শত স্বপ্ন দেখেছি।কাব্য অনেক বড় হবে, কাজী ভাইয়ের থেকেও বড় একজন কবি হবে।আমাদের স্বপ্নগুলো কি এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে, নিষ্পাপ কাব্য কি আমাদের চোখের সামনে থেকে টাকা নামক নোংরা বস্তুটার জন্য হারিয়ে যাবে।প্রিয় কাব্য এমনটা হবেনা, কথা দিচ্ছি এমনটা হবেনা।
পরবর্তী তিনদিন খুব ব্যস্ততার সাথে পার করলাম।আমি,সজল এবং রনির মত ১৬ – ১৭ বছরের কিছু ছেলে সদরের দোকানে দোকানে যেয়ে ভিক্ষা করেছি।কেউ পাচ টাকা দিয়ে বলেছে, “কি নেশা করিস?”
সবচেয়ে অবাক লেগেছিলো যখন একজন ফকির অত্যন্ত অভিমান নিয়ে আমাদের কাছে এসে বললো, “বাবারা তোমরা সবার কাছে গেলা বাচ্চাটার জন্য, আমার কাছে আসলানা কেন?আমি ফকির সম্পদে, মনে না।এই লও কচকচা একটা একশো টাকা, দুইদিন কম খাইলে কিছু হবেনা আমাগো”।
ফকির দাদুর সাথে একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।আমাদেরকে দেখে বারবার সে লজ্জায় আধখানা হয়ে যাচ্ছিলো।আমি পাশের দোকান থেকে একটা প্রাণ ম্যাংগোবার কিনে বাচ্চাটার হাতে দিয়ে তার গাল টিপে দিলাম।বাচ্চাটা জিহবা বের করে ভেংচি কেটে দৌড় দিয়ে কোথায় যে হারিয়ে গেলো আমরা হদিস পেলাম না।
পথে এভাবে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে কাজী ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেলো।কাজী ভাইয়ের বয়সটা হঠাৎ করে মনে হলো অনেক বেশি হয়ে গেছে।একটা মানুষের এভাবে রাতারাতি এত চুল পেকে যেতে পারে তা আমার বোধগম্যের বাহিরে ছিলো।আমি কাজী ভাইয়ের পাশে যেয়ে দাঁড়িয়ে তার কাধে হাত দিয়ে দাড়ালাম।কাজী ভাইকে বললাম, “কাব্য কেমন আছে?”
কাজী ভাই তার খোচা খোচা দাড়ি ভরা গালে চুলকাতে চুলকাতে বললো, “আমার দোকানটা বিক্রি করে দিছি আজকে।পানির দামে দিয়ে দিলাম।তোমার ভাবীর যা কিছু ছিলো সব বিক্রি করে দিছি।এখন আমি পথের ফকির”।
আমার চোখ ভিজে যায়।আমি কাজী ভাইকে ধরে নিয়ে পাশের চা দোকানে বসি।কাজী ভাইকে বলি, “আমরা ৩০ হাজার টাকার মত ব্যবস্থা করছি।আর কত টাকা লাগবে?”
কাজী ভাই বুকে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে চোখের জল মুছে।আমাকে বলে, “অনেক টাকা লাগবে, আরো দশ লাখ টাকা।কোথায় পাবো এত টাকা?”
আমি আমার মূল্যহীন চোখের জল মুছে কাজী ভাইকে সান্তনা দেই।তাকে বলি, “ভাই আমরা সবাই পাশের দশ গ্রামে যাবো, সবার কাছে যাবো।আরো সাহায্য আসবে, আপনি ভাবীর পাশে যেয়ে দাড়ান।আমরা আছি”।
কাজী ভাই তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট কাগজ বের করে আমাকে বললো, বল্টু আমার ছেলের জন্য কাল রাতে একটা কবিতা লিখছি।কবিতাটা পড়ি তুমি শোনঃ
“কাব্য একদিন তুমি বড় হবে তো?
তোমার বাবার সাদা পাঞ্জাবী ধরে প্রতি জুম্মাবারে
তুমি কি যাবে মুমিনের মসজিদ ঘরে?
তোমার মায়ের আচল ধরে লজ্জা পেয়ে
মুখ লুকিয়ে রাখবে তো?”
কাজী ভাই আর পড়তে পারেনা, আমিও আর শুনতে পাইনা।আশেপাশের জগত দেখতে পায় দুইজন দুর্ভাগা মানুষ একটি নোংরা চায়ের দোকানের ভাঙ্গা বেঞ্চে বসে চোখ মোছার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।কিন্তু কেউ দেখতে পায়না, এই মানুষগুলো আজ বড় অসহায়।একজন মানুষের ভালোবাসাগুলো যখন চোখের সামনে ধুকে ধুকে ক্ষয়ে যায়, তখন সেই যাতনা বুকে কত মর্মর ধ্বনি তোলে তা দেখার সামর্থ্য আছে কজনের?
গভীর রাতে আমার ছোট মামা ফোন করে।মামার কথা বলার ক্ষমতা আরো হ্রাস পেয়েছে, এখন আরো ফ্যাসফ্যাসে শোনায়।মামা ফোন করে বলে, “নীতুকে স্যরি বলেছিলি?”
আমি চুপ করে থাকি।কিছু শুনতে না পেয়ে মামা বলে, “তোর মন খারাপ নাকিরে বেটা?”
আমি মামাকে বলি, “মামা দশ লাখ টাকা লাগবে।দিতে পারবা?”
মামা কাশতে কাশতে বলে, “কেন লাগবে?এত টাকা দিয়ে তুই কি করবি?গাড়ি কিনবি?”
আমি মাথা নেড়ে বলি, “না মামা।কাজী ভাইয়ের ছেলেকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাবো মামা।ওর বুকে অনেক বড় অসুখ”।
মামা হাসতে হাসতে বলে, “এত টাকা কোথায় পাবোরে বল্টু?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, “তাও ঠিক মামা।তুমি চিন্তা করোনা।আমরা কালকে গ্রামে একটা নাটক করবো।মধুসূদন দত্তের বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো।টিকিটের দাম রাখছি দশ টাকা।যেভাবেই হোক টাকার ব্যবস্থা করে ফেলবো”।
মামা শান্ত হয়ে বলে, “বল্টু এই ইচ্ছাটা কখনো নষ্ট করিসনা।কারো জন্য কিছু করার ইচ্ছা সবার থাকেনা।তুই বেটা অনেক বড় হ।অনেক অনেক বড়”।
তিনদিন পর মামার একটা চিঠি আর সাথে ৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার একটা চেক আসে।মামা চিঠিটা লিখেছিলো আমাকে।আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সেই চিঠি পড়িঃ
“বল্টু, তোর মনে আছে তুই অনেক ছোট ছিলি যখন তখন আপুর কাছে প্রায় এসে ঘ্যানর ঘ্যানর করতি চুইংগাম খাওয়ার জন্য।আপু যখন তোকে টাকা দিতোনা তখন আমি তোর জন্য দুটাকা চুরি করে এনে দিতাম।তুই কখনো চুইংগাম একা খেতিনা, আমাকে অর্ধেক দিতি।আমি এখনো যখন বাড়ির কথা মনে পড়ে তখন একটা করে চুইংগাম কিনে অর্ধেক খাই আর অর্ধেক ফেলে দেই।তোদের অনেক মনে পড়ে।আপুকে বলিস আমাকে যেন মাফ করে দেয়।
মামা তুই এতগুলা টাকা চাইলি, আমার হাতে তো তখন এত টাকা ছিলোনা।নিজের চিকিৎসার কিছু টাকা ছিলো ওটাই পাঠিয়ে দিলাম।আমি আসলে এখন জানি, আমার আয়ু বেশিদিন নাই।তাই কাব্যর জীবন আমার থেকে অনেক অনেক মূল্যবান।কাজী ভাইকে বলিস, তার কবিতাগুলা সময় পেলে এখনো আমি আবৃত্তি করি।প্রতিবার পড়ি আর মনে ভাবি, এমন ভুয়া কবিতা মানুষ লিখে কিভাবে?এটাও তাকে বলবি।
মামা তোর নীতুকে আন্টিকে একবার বলিস আমাকে ক্ষমা করে দিতে।একদিন গভীর রাতে আমি তাকে ওয়াদা করেছিলাম কতগুলো স্বপ্নের কথা বলে।আমি তার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারিনি।তাকে বলিস আমাকে যেন আর মনে না রাখে”।
সেদিন ছিলো ঈদের আগের দিন, চাঁদ রাত।আমি আমার মোবাইলে আমার অনেক কষ্টে জমানো পাচশো টাকা ভরে নীতু আন্টির বাসায় গেলাম।নীতু আন্টির স্বামী দু বছর হলো মারা গেছেন।কি এক অদ্ভুত কারণে তার শ্বশুরবাড়িতে তাকে জায়গা দেয়া হয়নি।তাই এখন সে তার মায়ের সাথে থাকে।আমি যখন নীতু আন্টির বাসায় গেলাম তখন নীতু আন্টির মা ঘুমিয়ে পড়েছে।আমি নীতু আন্টিকে বললাম, “আন্টি আপনার একটা ফোন আছে”।
নীতু আন্টি কি বুঝলো জানিনা।আমাকে শান্ত কন্ঠে বললো, “ফোনটা দাও।ওর সাথে কথা হয়না অনেকদিন”।
আমি তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে মামার কাছে ফোন দিলাম লুকিয়ে।ক্রিং ক্রিং করে ফোন বেজে যখন মামা ফোনটা ধরলো তখন কানাডায় গভীর রাত।কিন্তু আমি বুঝতে পারি মামা ঘুমাতে পারছেনা।মামা এসময় জেগে জেগে কি করে তা অবশ্য আমি জানিনা।আমি নীতু আন্টিকে ফোনটা দিলে আন্টি ফোনটা নিয়ে তারা বাড়ির পিছনে গাছপালার আড়ালে চলে যায়।আমি জানি কারো কথা গোপনে শোনা খুব গর্হিত কাজ, কিন্তু তবুও আমি কান পেতে থাকি।আমি শুনতে পাই নীতু আন্টি বলছে, “তুমি আমার কাছে কেন ক্ষমা চাও?তোমার তো কোন দোষ নাই।আর তোমার কথা শোনা যায়না কেন?তোমার কি হইছে?অয়ন তোমার কি হইছে?”
নীতু আন্টি চিৎকার করে কাদে, আমিও কাদি।আমার কান্না দুটি কারণে। প্রথম কারণ, আমার মামা যাকে আমি সারাজীবন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মনে করে এসেছি সে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে কোন ভালোবাসা না পেয়েই হয়তো বিদায় নেবে খুব তাড়াতাড়ি।
আরেকটা কারণ সুখের কারণ।আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, কাব্য কাজী ভাই আর লীনা ভাবীর কোলে উঠে প্লেনে করে চিকিৎসার জন্য, এই পৃথিবীকে আরো হাজার বছর ভালোবাসার দাবী নিয়ে বেচে থাকার জন্য দূর প্রবাসে যাচ্ছে।কাজী ভাইয়ের চোখে নিশ্চয়ই তখন অনেক আনন্দজল থাকবে।কাব্য যখন বড় হবে তখন নিশ্চয়ই সে মানুষকে অনেক ভালোবাসবে।কারণ এই পৃথিবীর মানুষ তাকে ভালোবেসেছিলো।
গল্পটির সব চরিত্র কাল্পনিক, শুধু কাব্য চরিত্রটি ছাড়া।কাব্য নামের একটি ছোট্ট শিশু সত্যি বড় কষ্টে আছে।আমি যতবার শিশুটির মুখ দেখতে পাই, ততবার ভাবি আমরা এত ক্ষুদ্র কেন?প্রিয় কাব্য এই গল্পটা তোমার জন্য।আমি একটাবারও ভাবতে পারিনা যে তোমার মায়াকাড়া চোখগুলো দিয়ে তুমি পৃথিবীকে দেখতে পাবেনা।তোমার নিষ্পাপ মন নিয়ে তুমি আরো অনেক বছর সকল ভালোবাসা পেয়ে বেচে থাকো এই কামনা করি।যারা সত্যিকারের কাব্যর কথা জানতে চান তারা হয়তো নিচের লিঙ্কে যেতে পারেনঃ
কাব্য
সবশেষেঃ কাব্যকে নিয়ে লিখা পোস্টটা এখন হারিয়ে গেছে।কাব্য যেন হারিয়ে না যায়, তাই লেখাটা ব্লগে দিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১২:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


