somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা আমি ওর পশ্চাতে আরেকটা লাথি কষিয়ে সুন্দর করে ওর কথামত কম্বল দিয়ে কান ঢেকে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।চেষ্টা চেষ্টাই থাকলো, কিন্তু ঘুম আর আসলোনা।একসময় মোবাইলটা হাতে নিয়ে সময় দেখলাম ভোর সাড়ে চারটা।বিশাল জোরে একটা হাই তু্লে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম।এখন সময় হয়েছে শীতের কনকনে ভোরে কুয়াশার স্বাদ অন্তরে ধারণ করার।হঠাৎ করে মনে হলো আবিরের মত আমার যদি কেউ থাকতো! খারাপ হতোনা।হয়তো আমিও তখন লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখতাম, আমিও হয়তো গভীর রাতে আবিরের মত ফ্যাসফ্যাস করে কথা বলতাম।আচ্ছা কার সাথে কথা বলতাম?অনেকগুলো চেহারা মনে করার চেষ্টা করলাম।সবশেষে বুঝলাম, ঘটনা খারাপ।আমার দ্বারা হবেনা।

সকাল পৌণে আটটায় আমি যখন কোনরকমে নাস্তা গিলছি গোগ্রাসে তখন আফসার আমার সামনে বসে দাত বের করে বললো, “দোস্ত আজকে সকালে ক্লাস করমুনা”।
আমি ওকে বিরক্ত হয়ে বললাম, “কেন তোমার কি আবিরের মত নতুন গার্লফ্রেন্ড হইছে?ডেটিং করতে যাইবা?”

আফসার তার দন্ত আরো বিকশিত করে বললো, “দোস্ত ঠিক ধরছোস।আমি কবিতার প্রেমে পড়ছি।আজকে বিশ্ববিদ্যালয় কবিতা সংঘে আমার কবিতা পাঠ করতে হইবো।তুইও চল।কাল সারারাত বিদ্রোহী কবিতাটা মুখস্থ করলাম।আজকে ছন্দে ছন্দে আবৃত্তি করবো”।

আমার বন্ধু আফসার একজন অতি বিশিষ্ট গাধা।বেশ কিছুদিন আগে সে প্রিয়ন্তীর কাছে বিশাল একটা ছ্যাকা খেয়েছে।এরপর থেকে তার একটাই ভালবাসা – সাহিত্য।সে প্রায়ই ভয়ংকর ভয়ংকর সব সাহিত্য রচনা করে আমাদের তাক লাগিয়ে দেয়।দেখা গেছে এক গভীর রাতে সে আমার রুমের দরজায় ঠকঠক করে আওয়াজ করে বলবে, “একটা টাটকা সনেট লিখছি।একবার শুনে দেখ দোস্ত।বুকে শান্তি পাইতেছিনা তোকে না শুনানো পর্যন্ত”।আমি তার সনেট, ধ্রুপদী সাহিত্য সবই শুনি।বন্ধু বলে কথা।

ঠিক সাতটা ঊনষাট মিনিটে ক্লাসে পৌছালাম।ক্লাস যেয়ে দেখি সবাই OP-Amp নিয়ে পড়ছে।আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম।আজকে কি এটার ক্লাসটেস্ট ছিলো?আরে তাই তো!! আজকে সোমবার, প্রথম দুইটা চ্যাপ্টারের উপর ক্লাসটেস্ট।এমন করে ভুলে গেলাম কেন?কিছু যে পারিনা তা না।কিন্তু ২০ পাওয়ার মত তো প্রিপারেশান নেই।চারটা ক্লাসটেস্টের মধ্যে তিনটা হয়ে গেছে।এটা শেষ ক্লাসটেস্ট এই কোর্সের।আগের তিনটা আমার খুব ভালো হয়নাই।ভাবছিলাম শেষটা দিয়ে মার্কস কাভার করবো।হায় সব শেষ! এমন করে ধরা খেলাম।এসব ভাবতে ভাবতে ফাহিমের পাশে বসলাম।করুণ চোখে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বললাম, “দোস্ত ইয়ে মানে আজকে ভাবতেছিলাম তোর থেকে একটু হেল্প নিয়ে পরীক্ষাটা দিয়েই দেই”।

ফাহিম আমার দিকে বড় বড় চোখ নিয়ে তাকিয়ে বলে, “দোস্ত আমি তো কিছুই পারিনা আজকে।আমি তো ভাবলাম তোর থিকা হেল্প নিবো”।
আমি ফাহিমকে কিছু না বলে চুপচাপ ওর পাশে বসে পড়লাম।আমি জানি ওর এইসব কথার কোন বেল নাই।পরীক্ষা আরম্ভ হলে ওর খাতা এমনিতেই ইকুয়েশন আর সার্কিটে ভরে যাবে।

পরীক্ষা শেষ হলে আমি আমার প্রিয় লাল গেঞ্জিটা গায়ে চাপিয়ে ভার্সিটির সাথে লাগানো লেকের পাড়ে গিয়ে দাড়ালাম।আজ একজনের কথা খুব মনে হতে লাগলো।আমি তখন নটরডেম কলেজে কেবল ভর্তি হয়েছিলাম।বিজ্ঞান মেলায় ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তার সাথে আমার পরিচয় হয়।মিতুর সাথে আমার ফোনে অনেক কথা হতো।আমার কলেজ লাইফের একটা খুব সুন্দর সময় কেটেছিলো তার সাথে।আমি তাকে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ভাবতাম।সে ভাবতো কিনা জানিনা।আমাদের সম্পর্কটা যে আসলে কি ছিলো আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।ও বুঝেছিলো কিনা তাও জানিনা।

আমার সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলো ছিলো ওর সাথে ধানমন্ডির রাস্তায় শীতের বিকেলে হেটে বেড়ানো দিনগুলো।আমরা হাটতাম, শুধু হাটতাম।এটা সেটা হাবিজাবি কতকিছু নিয়ে গল্প করতাম।একদিন হঠাৎ করে সে আমাকে বিষণ্ন হয়ে বলেছিলো, “আমার একটা রোগ হয়েছে”।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বলো আমাকে কি হয়েছে!”
মিতু সুন্দর করে হেসে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাটে।আমি চুপ করে ছিলাম।একসময় তাকে বললাম, “তোমার কখনো মনে হয় তুমি অনেক একা?”

মিতু মাথা নাড়ে।আমাকে বলে, “মনে হবে কেন এটাই সত্যি”।
আমি হাসতে হাসতে বলি, “আমরা সবাই আসলে একা।ক্ষনিকের জন্য কেউ একজন পাশে এসে দাড়াবে।কিন্তু একসময় দেখবে আশেপাশে আর কোন মানুষের উষ্ণতা নেই”।
মিতু বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলে, “কি ভয়ংকর! তুমি এমন ভাবুক হয়ে গেলে কবে?”
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি।ওটার শব্দটা এতটা কটু ছিলো যে মিতু মনে হলো খুব ঘাবড়ে গেছে।এমনকি আমাকে এরপর সে অনেকক্ষণ খুচিয়েছিলো আমার কি হয়েছে জানার জন্য।সেদিন আমি প্রথম বুঝেছিলাম মেয়েটাকে আমি আমার পাশে সবসময় দেখতে চাই।এটাও বুঝেছিলাম, ব্যাপারটা কখনো সম্ভব নয়।এই কথাটা ওকে বলার মত সাহসটা আমার নেই।

এই ঘটনার এক সপ্তাহ পর আমি মিতুর একটা চিঠি পেয়েছিলাম।ওর বান্ধবী যখন আমাকে চিঠিটা দেয় আমি একটু বিরক্ত হয়েছিলাম।এই আধুনিক যুগে চিঠি দেয়ার মত নাটকীয়তা না করলেও চলতো।চিঠিতে মিতু শুধু দুটো বাক্য লিখেছিলোঃ
“প্রিয় অর্ক,
আজ রাতে বাবা মার সাথে আমি দেশের বাহিরে চলে যাবো।দুঃখিত আগে বলতে পারিনি”।

ব্যস এরপর আমি কখনো আর মিতুর দেখা পাইনি।আজকে হৃদয় কাপানো ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে আমার ওর কথা খুব মনে হলো।শেষ যেদিন দেখা হয়েছিলো ও একটা হালকা নীল চাদর গায়ে জড়িয়ে ছিলো।আমার গায়ে ছিলো এখন যে লাল গেঞ্জিটা পড়ে আছি ঠিক সেটাই।ডুবন্ত লালচে সূর্যের প্রতিচ্ছবি লেকের জলে একটা অদ্ভুত মোহ তৈরী করেছিলো।আমি জানিনা আমার চোখটা কখন ঝাপসা হয়ে গিয়েছিলো।আমি মনে মনে বললাম, “এভাবে কেউ ছেড়ে চলে যায়?”

নিজের উপরও বেশ রাগ পেলো।দুটো বছর আমরা এক সাথে কত শত গল্প করেছি।একজন আরেকজনের মনের খবর রেখেছি, তার যত্ন নিয়েছি।অথচ একটাবার তাকে আমার ভালো লাগার কথা জানাতে পারতাম না? হয়তো ব্যাপারটা তখন এমনটা হতোনা।


গভীর রাতে যখন একা একা হেটে হলে ফিরছিলাম তখন খুব চিৎকার চেচামেচি শুনতে পেলাম।আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি কি হচ্ছে।দৌড়িয়ে যখন হলের সামনে পৌছালাম তখন আশেপাশে শুধু ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।আমি হতভম্ব হয়ে সিড়ি দিয়ে উঠতে থাকলাম।সিড়িতে রক্তাক্ত কিছু অর্ধচেতন দেহ পড়ে আছে।আমার কিছু বন্ধু রহমান, ফয়সাল ওদের অবস্থা দেখলাম খুব করুণ।আমি আমার রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।আমার প্রচন্ড ভয় লাগছে।দেখলাম আমার রুমের পাশেই সবচেয়ে বেশি ভীড়।রুমে ঢুকে দেখি আবির ঘুমিয়ে আছে তার সারা মুখে লাল রক্ত নিয়ে।আমি স্পষ্ট দেখতে পাই তার মাথার একপাশটা কে যেন থেতলে দিয়েছে।মুখ দিয়ে গোঙ্গানীর মত কিছু একটা বের হয়।কিছু বলতে চাচ্ছি, কিন্তু পারলাম না।আমি আবিরের পাশে গিয়ে বসি।ওর গায়ে কে যেন ওরই বিছানার চাদরটা সেপটে দিলো।আমি ওর চোখের দিকে তাকাই।ভয়ংকর একটা ভয় ওর সারা চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।এই ভয়ের অনুভূতি আমাকেও যেন মনে হলো গ্রাস করলো।আমি জানি জনম জনম আমাকে এই ভয় তাড়া করবে।এর থেকে আমার নিস্তার নেই, একেবারে নেই।আমার পাশে আফসার আর ফাহিম চুপ করে বসে আছে।আমি আমার বন্ধু আবিরকে চিৎকার করে বলি, “দোস্ত তুই যত ইচ্ছা যার সাথে ইচ্ছা রাত জেগে কথা বল।আমি তোরে আর কিছু বলবোনা।একটু গাটা ঝাড়া দে।দোস্ত এমন করে চইলা যাইসনা।ওঠ শালা, ওঠ”।

আমার চার বছরের রুম মেট, যার সাথে জীবনের সবকিছু শেয়ার করছি আজ সে কোথায় উধাও হয়ে গেলো আমি বুঝতেই পারলাম না।আমার বুঝতে ইচ্ছাও করছিলোনা।এভাবে কেন মানুষগুলো চলে যায়।কেউ একবার বিদায়টাও নেয়না।আমি চিৎকার করে কাদতে থাকি।আমার বন্ধু আবির আমার এত আপন কেউ ছিলো তা আগে কখনো বুঝিনি।আজ তার চলে যাওয়া বুঝিয়ে দিলো আমাদের হৃদয়ের সর্বাঙ্গ এই আপন মানুষগুলোর ভালোবাসা দিয়ে গড়া।কারো একটু হারিয়ে যাওয়া বা দূরে চলে যাওয়া যেন হৃদয়ের একটা অংশ খসে পড়া।যে এমন কাউকে হারায়নি সে এই যন্ত্রনা কখনো কি বুঝবে?না, কখনোই না।

আবিরের বাবা খবর পেয়ে রাতের মাঝেই চলে এলো।তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে আছে।তিনি ছেলের দিকে একবারও তাকাতে পারছিলেন না।আমরা সবাই তাকে ঘিরে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।উনি লাশ নেয়ার ব্যবস্থা করছিলেন।লাশ নিয়ে যাওয়া হবে আবিরের ছোট্ট রাজশাহী শহরে।হলগেটে তখন একটা সাদা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে।আমি আঙ্কেলের পাশে দাঁড়িয়ে বললাম, “আমাদের ক্ষমা করবেন, আমরা কেউ কিছু করতে পারিনি।ওকে ওরা কেন মারলো তাও জানিনা।আমাদের আঙ্কেল মাফ করে দেন”।

আমার দিকে তাকিয়ে আঙ্কেল বললেন, “তোমরা কি করবা বাবা?দোষটা ওরই।আমার বড় ছেলেটা রাজনীতি করতে যেয়ে সারাজীবনের মত পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছে।আর একটা ছেলে জীবনটাই দিয়ে দিলো।এত্ত করে বুঝাইছি পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু করবানা।কিন্তু তারপরো সে নিশ্চয়ই রাজনীতি করছে।একটাবার ভাবলোনা আমাদের ও ছাড়া আর কেউ নেই।একটাবারও ভাবলোনা”।
আমি মূক হয়ে ওর বাবার কথা শুনছিলাম।ওর বাবার মুখ তখন এতই কঠিন হয়েছিলো আমি কিছু বলে উঠতে পারিনি।আমি শুধু দেখলাম আমার জানের বন্ধু আবিরের নিষ্প্রাণ দেহটা নিয়ে একটা মাইক্রো ছুটে যাচ্ছে।সবাই তাকিয়ে দেখছি আমাদের রোমান্টিক বন্ধুটা কিভাবে আস্তে আস্তে বিন্দুর মত হারিয়ে যাচ্ছে।কারোর কিছু বলার ছিলোনা।কারো না।

রাতের বেলা ফাহিম আমার কাছে চোখ মুখ শক্ত করে এলো।আমার দিকে রাগী রাগী চোখে তাকিয়ে বললো, “ও তো রাজনীতি করতোনা তাহলে ওকে মারলো ক্যান?”

আমি বিছানায় শুয়ে আড়চোখে আবিরের খালি বিছানার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি।কিছু বলতে ইচ্ছা করছেনা।তবুও ফাহিমকে বললাম, “দোস্ত ওরে যখন মারলো তখন আমরা কেউ পাশে ছিলাম না।ও খুব ভয় পাইছিলো তাই না?”

ফাহিম আমার দিকে দাত চিবিয়ে বলে, “আমরা কি এমনি এমনি ছাইড়্যা দিবো?আমি খবর নিছি এই কাজটা রাতুলের।সরকারী দলের পোলাপাইন যখন হলে আসে মারধর করতে তখন রাতুল নাকি আমাদের রুমে ঢুকছিলো চাপাতি নিয়া”।
আমি ফাহিমের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলি, “রাতুল তো ভার্সিটি ছেড়ে দিছে।ও এখন এই কাজ কেন করবে?”

ফাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ভার্সিটি ছাড়ছে।দল তো ছাড়েনাই।দোস্ত একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকেনা। আমাদের হলের কয়েকজন মাত্র রাজনীতি করে, বিরোধী দল করে।আমরা তো সাধারণ ছাত্র।আমাদেরকে ধইর্যার ধইর্যাি ওরা মারলো কেন?তুই জানিস, আমাদের জুনিয়র আতেল টাইপ ছেলেটা যে আমার কাছে পড়া শিখতে আসতো ওরে চারতলা থেকে ফেলে দিছে।ওর থেতলানো মাথাটা নিজ চোখে দেখছি।আমার আপন ছোট ভাইয়ের মত ছিলো।মাত্র তিনমাস ভার্সিটিতে ঢুকছে। এই বাচ্চা পোলাটা কি রাজনীতি বুঝে।ওকে মারলো কেন?”

আমি বিছানা থেকে উঠে বসি।ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলি, “৭১ এর আগে এন.এস.এফ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় আসছে সবাই শুধু আমাদেরকেই মারে।আমরা চুপ করে চোখে চশমা আর কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে পড়তে আসি।হঠাৎ করে অনুভব করি কে যেন ঠিক বুকের মাঝখানে একটা কোপ দিয়ে দিলো, অথবা একটা পোড়া বুলেটের গন্ধ আমার শরীরের কোন এক কোণে।এভাবে আমরা মরছি, এভাবেই আমরা মরবো।কেউ আমাদের বাচাবেনা বুঝছিস।কেউ না।কিন্তু এবার নিজেদের বাচতে হবে।কেউ তার হাতটা তুলে দাড়াক আর না দাড়াক আমি এবার সামনে গিয়ে দাড়াবো।আমি প্রতিবাদ করবো, আমি ওই কুত্তার বাচ্চাগুলোর সামনে গিয়ে দাড়াবো।এভাবে আর মরতে পারবোনা।অনেক মরছি”।

ফাহিম আমার কাধে হাত দিয়ে বলে, “আমিও দাড়াবো।আমরা সবাই দাড়াবো।আমাদের আবিরকে ওরা মেরে ফেলছে।আমরা কি ওর এমন বন্ধু ছিলাম যে ওর জীবনটা কুত্তাগুলো নিয়ে নিলো আর আমরা শিখন্ডীর মত দাঁড়ায় দাঁড়ায় হাততালি দিবো? আর কতদিন এইরকম নগ্ন ভয় নিয়ে আমরা মরবো?আমিও ওদের সামনে দাড়াবো, ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করবো, তোদের মাঝের পশুটাকে একটু দেখি তো?”


পরদিন ক্লাস যেয়ে দেখি থমথমে অবস্থা।আমাদের ক্লাসের দশ পনেরোজন খুবই আহত হয়েছে।তিন চারজন হাসপাতালে আছে।সকালে একজন মারা গেছে।যে মারা গেছে তার নাম ছিলো খোকন।শুনেছি খোকনের মা সারারাত ঢাকা মেডিকেলে ছিলো।খোকনকে পুরোটা সময় বুকের মাঝে আগলিয়ে রেখেও বাচাতে পারেন নাই।আরো জানলাম খোকনের মা ধানমন্ডীর একটা বাড়িতে কাজের বুয়া ছিলেন।তার স্বামী অনেক আগেই তাকে রেখে পালিয়ে গেছেন।এই একটা মাত্র সন্তান নিয়ে খোকনের মা যে বিশাল সংগ্রাম করেছেন পৃথিবীতে বেচে থাকতে তা কারো আর বুঝতে বাকি ছিলোনা।আমরা এমন মায়েদের কথা বেশিদিন মনে রাখিনা।মাঝে মাঝে পেপার পত্রিকায় এদের বিলাপ শুনি, হয়তো একটু চুকচুক আওয়াজ করি।তারপর সব ঠান্ডা।সেদিন পেপারে পড়লাম এক পরিবার হাহাকার করে বলছে, “তোরা কারে কাইড়্যা নিলি রে?”

এই প্রশ্নটার উত্তর দেয়ার মত কেউ নেই এদেশে।আমাদের বিশিষ্ট ক্ষমতাসীনেরা এই কথাগুলো শুনবেন, নাক দিয়ে একটু হয়তো ঘোৎঘোৎ আওয়াজ করবেন।তারপর পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সফরের প্রস্তুতে নেবেন।সাবাস আমাদের নীতিবোধ, আমাদের মূল্যবোধ এবং মনুষত্ব্যবোধ(?)।
প্রথম ক্লাসটা শেষ করে আমরা সবাই এক হয়ে দাড়ালাম।সবাই গতকালকের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম।আসলে ঠিকমত রাগে কেউ কথা বলতে পারছিলাম না।একসময় মিজান বললো, “আজকে ক্লাস শেষে আমরা ভিসির বাসভবনের নিচে গিয়ে দাড়াবো।এইভাবে আর কতদিন?আমি বিচার চাই, এই অত্যাচারের বিচার চাই।যেই কুকুরগুলা এই কাজ করছে তাদেরকে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো দেখা চাচ্ছে তার জবাব চাই”।
রাফি কাশতে কাশতে বললো, “বুঝলাম।কি লাভ হবে?ভিসি স্যার নিজেই তো একটা ভীতুর ডিম।তারে বইল্যা কি লাভ?আমাদের শিক্ষাটাই নষ্ট হয়ে গেছে।আমি তুই এবং একশোজন যতই ফাল পাড়ি ওরা চুপ করে থাকবোনা।ওরা আমাদেরকে আরো মারবে, আরো খুন করবে।আজকে তুই আমি আন্দোলন করলাম, অনশন করলাম, পুলিশের মাইর খাইলাম তাতে কিছুই কমবোনা।বরং দেখবি, দুইদিন পর আমাদেরই ভার্সিটি থেকে বাহির কইরা দিবো।এটাই এখন সিস্টেম, নষ্ট সিস্টেম”।

আমরা সবাই রাফির দিকে তাকিয়ে থাকি।কথাটা একটুও কি মিথ্যা বলছে? মিজান বললো, “বুঝলাম কিছু হবেনা, বুঝলাম কারো বিচার হবেনা।তো কি এইভাবে চলতে থাকবে?আবিরের মত আমরা একজন একজন কইর্যা মরবো?তারপর কাপুরুষের মত ভয়ে ভয়ে একটা একটা কইর্যাা দিন পার করবো।এটা কোন হিসাবের কথা?এতদিন এভাবে চলছে, এবার এইভাবে চলবেনা।কিছু করতে হবে।নিজে যদি মরতে হয় মরবো।তবুও কুত্তাগুলোরে ছাড়বোনা।যারা আবিরের মত অসহায় হয়ে বাচতে চাসনা তারা ক্লাস শেষ করে নিচে দাঁড়ায় থাকবি।সবাই একসাথে ভিসির বাসার নিচে দাড়াবো”।

মিজানের কথামত আমরা সবাই ক্লাস শেষ করে যখন এক সাথে হাটছি তখন সরকারী দলের কিছু ছাত্র হঠাৎ আমাদের সামনে এসে দাড়ালো।এর মধ্যে ভার্সিটির সরকারী ছাত্রদলের সভাপতি গুলজার ভাই ছিলেন।তিনি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “তোমরা কই যাও?ভিসির বাড়িত যায়া কি করবা?”

ফাহিম একটু সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “কেন আপনাদের সমস্যা কি?”
গুলজার ভাই হেসে ফাহিমের পাশে দাড়ালো।তারপর ঠাস করে ওর গালে একটা বিশাল চড় কষালো।আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।এরপর আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো, “বেয়াদ্দপী কইরোনা বাচ্চারা।তোমাদের কাছে আমি স্যরি বলতে আসছিলাম।চলো ক্যান্টিনের ভিতরে বসি।তোমরা কয়জন আছো? বিশ পচিশজন সবাইরে ক্যান্টিনে আজকে খাওয়ামু।চলো আমার সাথে।কিছু আলোচনা করি”।

আমরা ফাহিমের এভাবে চড় খাওয়া দেখে একটু ভড়কে গিয়েছিলাম।গুলজারের পেছন পেছন আমরা ক্যান্টিনে গিয়ে যখন বসি তখন ফাহিম আমাদের সাথে ছিলোনা।ও কোথায় গেছে জানিনা।গুলজার ভাই ক্যান্টিনে সবাইকে বসতে বলে নিজে সামনে গিয়ে দাড়ালো।রাতুল তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।এই ছেলেটা আমাদের ক্লাসের ছিলো।প্রথম বছরেই সরকারী দলের রাজনীতিতে যোগ দেয় এবং প্রতি টার্মে সে এক দুই বিষয়ে ফেল করতে শুরু করে।একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।বহুদিন পর আজকে তাকে প্রথম দেখলাম।আবিরের মুখটা মনে পড়তেই রাতুলের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমি তাকালাম।কিভাবে যেন নিজেকে তবুও শান্ত করে রেখেছিলাম।গুলজার আমাদের কাছে এগিয়ে বলতে থাকে, “কাল তোমাদের হলে মিরাজদের পোলাপাইনরে মাইর দিতে গেছিলাম।এই পোলাপাইনগুলো আমাদের ভার্সিটির কলংক।They were like stigma in the Lily. আমরা প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি করি।আমাদের ম্যানিফেস্টে কি লিখা আছে তোমরা কি জানো? ভার্সিটিতে ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায় সকল অপ্রগতির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে।বিরোধী দলের ছেলেগুলা হলো অপ্রগতি।দুঃখজনকভাবে তোমাদের মত কিছু সাধারণ ছেলে পেলে আহত হইছে।হাসপাতালে গেছে দু একটা। আমার ছেলেপেলের আসলে মাথাটা ঠিক ছিলোনা।সামনে যারেই পাইছে কোপায়া দিছে।কিন্তু এইটা তো এতো সিরিয়াস কিছু না যেই জন্য তোমরা ভিসির কাছে দৌড়াইতেছো! তাই না?”

আমরা হতভম্ব হয়ে পশুটার দিকে তাকালাম।কারো মুখে কোন ভাষা নাই।গুলজার আমাদের বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন।নিজেই আবার বললেন, “এইভাবে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত লাফালাফি করা বাদ দিয়ে নিজ নিজ পড়াশোনায় মন দাও।নাইলে ওই দেখো তোমাদের ওই বন্ধুর মত অবস্থা হইবো”।

আমরা দেখলাম ক্যান্টিনের পিছনের দিকের দরজা দিয়ে সরকারীদলের কিছু ছাত্র ফাহিমকে টেনে নিয়ে আসছে।ফাহিমের সারা মুখ ফুলে আছে মারের আঘাতে।ওর হাটু থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।ওর যে কোন জ্ঞান নেই এটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে।গুলজার ঠিক আমার সামনে এসে দাড়ালো।আমার কাধে হাত দিয়ে বললো, “কেন যে তোমরা বেয়াদ্দপী করো! আমার সাথে এমনে কথা বলার সাহস পাও কোথা দিয়্যা?কারও কিছু বলার থাকলে হাত তুলো।তার হাতটা ভাইঙ্গা এরপর কথা শুনবো”।

আমি হাত তুলে দাড়ালাম।একবার ফাহিমের দিকে রক্তাক্ত চোখে তাকিয়ে গুলজারের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, “গুলজার ভাই আপনি কোন জাতের কুকুর একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

ক্যান্টিনে তখন পিনপতন নীরবতা।আমি গুলজারের দিকে আরো এগিয়ে গেলাম।তার একদম কাছে দাড়িয়ে আবার বললাম, “আপনারে দেখেই মনে হয় আপনি কুকুর প্রজাতির একজন সম্মানিত সদস্য।একটু বলেন তো, আপনার জাতটা কি স্পেসিফিক্যালী?”


গুলজার ভাইয়ের মুখ দিয়ে রাগে ত্থুতু বের হতে লাগলো।আমার কাছে আস্তে করে এগিয়ে গেলো।তার হাতে তখন চাপাতি।আমার ভয় লাগছেনা।একটুও না।মনে হচ্ছিলো এই ব্যাপারটা অনেক আগে হওয়া দরকার ছিলো।এক বছর আগে যখন আমাদের খুব প্রিয় বন্ধু অভিককে মেরে ফেলে তখনই এমন কিছু হওয়া দরকার ছিলো।আমার ভিতরে তখন আগুন জ্বলছে।এই আগুন কাউকে ভয় পায়না।আমাকে চাপাতিটা দেখিয়ে বললো, “হ আমি কুত্তা।আর এইটা আমার দাত।এখন তোমারে সবার সামনে একটা কোপ দিবো।সবাই খাড়ায় খাড়ায় দেখবো।এই হিজুগুলা একটাও তোমার জন্য আগায় আসবোনা।এখান থিকা যাওয়ার আগে সবাই তোমার পশ্চাতে আমার কথা মত একটা কইর‍্যা লাথি মাইর‍্যা যাবো”।
কি হলো বুঝতে পারিনাই।হঠাৎ করে ঘাড়ে একটা প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলাম।আমি মাটিতে পড়ে গেলাম।মনে হচ্ছিলো মারা যাচ্ছি।এমন প্রবল যন্ত্রণা আর মৃত্যুর ভয় আমাকে আর কখনো গ্রাস করেনি।আমি মনে হয় কিছুক্ষণ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিলাম।যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আশেপাশের সবকিছু ঘুরছিলো চড়কির মত।টের পেলাম আমাকে গুলজার ক্রমাগত লাথি মারছে।আমার কেন যেন একটুও ব্যাথা লাগছিলো না।আমার আবিরের কথা মনে হতে লাগলো।সে বলতো, “দোস্ত ২০১৩ তে পাশ করমু।ওর মধ্যে একটা চাকরী জোগাড় করে ২০১৪ তে বিয়া করমু।২০১৬ এর মধ্যে জনসংখ্যা বাড়ায় তোরে চাচ্চা বানায় দিমু ইনশাল্লাহ”।

আচ্ছা আবিরকে নিয়ে ওর বাবা যখন চলে যায় তখন কি আমরা একটাবার ওর বাবাকে বলতে পারতাম না, ও কোন রাজনীত করতোনা।ও আপনাদের সভ্য ভদ্র আদর্শ ছেলে ছিলো।ওর জিপিএ সবসময় ৩.৫ এর উপরে ছিলো প্রতিটি টার্মে।আমি কোন শক্তিতে উঠে দাড়িয়েছিলাম আবার জানিনা।আমি আবিরের জন্য, খোকনের জন্য, অভিকের জন্য এবং এই দেশের সকল সাধারণ ছেলেদের জন্য উঠে দাড়িয়েছিলাম।আমি অনেক কষ্ট হলেও আমার সব বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে চিৎকারে করে বললাম, “আমার কথা শোন সবাই।এই কুত্তাগুলো সারাজীবন আমাদের কামড়ে গেছে, আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নির্যাতন করেছে।আবির, খোকনের বাবা মায়ের মত এরা আমাদের বাবা মাকেও একদিন কাদাবে।আমি যদি আজকে মারা যাই, সবার জন্য কথা বলতে গিয়ে মারাও যাই, তোরা কেউ চুপ করে থাকিস না।কুকুরকে লাথি মারতে হয়, তাদেরকে ভয় পেয়ে পিছু যেতে হয়না।তোরা আল্লাহর দোহাই লাগে চুপ করে থাকিস না।এদেরকে ছেড়ে দিসনা”।

গুলজার তার চাপাতিটা আরো উচু করে আমাকে মারতে চায়, আমার কাধ দিয়ে তখন রক্ত ঝরছে।আর একটু পর হয়তো আমি এই পৃথিবীতে থাকবো না। প্রিয় দেশটা, প্রিয় বাবা মাকে মনে করতে থাকলাম।একদিন হয়তো সবাই জানবে আমি একটা সত্য কথা বলতে যেয়ে, একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যেয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম সবার থেকে।কিন্তু আমার কথা শুনে নিশ্চিত আরো অনেকে এগিয়ে আসবে।আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।একটা ভয়ংকর আঘাতের অপেক্ষা তখন আমার সমস্ত সত্ত্বায়।
আচমকা কে যেন আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।আমি চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি মিজান গুলজারের সামনে দাঁড়িয়ে কাপছে।একসময় সে গুলজারকে বললো, “আজকে একটা মহান দিন রচনা হবে।আজকে আবির, খোকনের মত সাধারণ ছেলেগুলা কথা বলবে।আজকে কিছু কুকুর গোত্রীয় জীবকে কবর দেয়া হবে”।

মিজানের সারা দেহ কাপছে।সবার দিকে তাকিয়ে বললো, “ক্যান্টিনের সব দরজাগুলো লাগা।অনেকদিন কুত্তা পিটানো হয়না”।

আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।সেদিন আর কি কি হয়েছিলো আমার কিছুই মনে নেই।পরে জেনেছিলাম গুলজার আর তার সাথের কিছু ছেলেপেলে প্রচন্ড আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।রাতুল নামের একটি ছেলেকে কোথাও খুজে পাওয়া যায়নি।

সেই ঘটনার পর এক মাস আমি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে ছিলাম।আমার হাতের এক পাশ চিরজীবনের মত অবশ হয়ে গিয়েছিলো।একদিন সন্ধ্যা হয় হয় এমন সময় আমার কাছে একটা ফোন আসে।ফোন ধরতে একটা মেয়ের কন্ঠ শুনতে পেলাম।আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কে?”
মেয়েটা অনেকক্ষণ কিছু বলছিলোনা।একসময় আমতা আমতা করে বললো, “আমি আর আবির বন্ধু ছিলাম।আপনার কথা আমাকে আবির অনেকবার বলেছে।আমি অনেক কষ্ট করে আপনার নম্বরটা ম্যানেজ করেছি।ওর একটা ডায়েরী আমার কাছে আছে।অনেক আগে আমাকে পড়তে দিয়েছিলো।আপনি কি কষ্ট করে ডায়েরীটা আমার থেকে নিয়ে ওর বাবা মা কে বুঝিয়ে দেবেন?”

আমি ইরিনার থেকে ডায়েরীটা বুঝে নিয়েছিলাম।ইরিনা আমাকে জানালো, আবিরকে মেরে ফেলার আগে যখন হলে হত্যা তান্ডব চলছিলো তখন আবির ওকে কাদতে কাদতে ফোন দিয়েছিলো।ইরিনাকে বলেছিলো, ওর বাবা মাকে যেন জানানো হয় ও তাদের অনেক ভালোবাসে।ওর সাহস নেই তাদের সাথে এখন কথা বলার।আবির অনুরোধ করেছিলো যে ওর বাবা মা যেন জানতে পারে, ও কখনো নোংরা রাজনীতি করে নাই।
আমি খুব বুঝতে চাচ্ছিলাম আবিরের মনে তখন কি চলছিলো যখন ও ইরিনাকে ফোন করেছিলো।হঠাৎ করে মানুষ হিসেবে নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো।খুব অসহায়।

আবিরের বাবার সামনে আমি ওর ডায়েরীটা নিয়ে বসে আছি।ওর বাবা-মা দুজনের চোখে কালি পড়ে গেছে।হয়তো উনারা রাতে ঘুমাতে পারেন না। আমাকে আবিরের বাবা জিজ্ঞেস করলো, “আবিরের কি শুনাতে চাচ্ছো বলো তো?”

আমি ডায়েরীর পাতা খুলে তাদেরকে শুনাই আবিরের লিখা একটা ডায়েরীর পাতাঃ
“আজ ১৯শে জুলাই, আম্মুর জন্মদিন।আম্মু আমি তোমাকে একটু আগে শুভ জন্মদিন জানিয়েছি।কিন্তু আমার অনেক মন খারাপ।কারণ তোমার হাতের পোলাও খেতে ইচ্ছে করছে।এমন এমন বিশেষ দিনে তুমি কি সুন্দর করে রান্না করো।আমার খুব সেই খাবারগুলোর গন্ধ নিতে ইচ্ছা করছে।
কাল রাতে বাবা আমাকে আবার বকা দিয়ে বলেছে আমি যেন কোন রকম রাজনীতি না করি ভাইয়ার মত।বাবা কেন বুঝেনা আমি তাদেরকে অনেক ভালোবাসি।এভাবে ভুল না বুঝলে হয় না?আমি কখনো তাদেরকে কষ্ট দিয়ে এমন কিছু করবোনা।
বাবা মার থেকে এত দূরে বাস করে পড়াশোনা করতে আর ইচ্ছা করেনা।মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে তাদের কাছে চলে যাই”।

আবিরের বাবা আবিরের মার হাত ধরে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি আমার ছেলেটাকে অনেক বকা দিতাম?”
আবিরের মা মাথা নিচু করে চোখের পানি ফেলতে থাকেন।তার মুখে কোন ভাষা নেই।যে মা তার আদরের সন্তানটিকে এমন করে হারায় তার মুখে শব্দ আসতে পারে কি?

আমার ইঞ্জিনিয়ারিং জীবনের লাস্ট টার্ম ফাইনাল আজকে শেষ হলো।অনেক কষ্টে পরীক্ষা দিতে হয়েছে।আমার শারীরিক ও মানসিক দুই অবস্থায়ই খারাপ ছিল।আমি আমার লাল গেঞ্জীটা পরে আবার লেকের পারে দাঁড়িয়ে আছি।মিতু এখন কি করছে ভাবছি।আজ খুব ইচ্ছা হচ্ছে ধানমন্ডী ৯ নং এ ১২১/বি বাড়িটার সামনে আবার হেটে যাই।মিতুর বাড়ির সামনে গেলে মিতুর গায়ের গন্ধ আবার হয়তো পাবো।

আমি সত্যি সত্যি ওর বাড়ির সামনে গেলাম।তিনতলায় উঠে কলিং বেল টিপলাম বেশ কিছুক্ষণ।যখন ভাবছিলাম চলে যাবো ঠিক তখনি কেউ একজন দরজাটা খুললো।একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা।আমি মহিলার দিকে তাকিয়ে খুব বিস্মিত হলাম।এটা অবশ্যই মিতুর মা।কিন্তু ওরা তো দেশে নেই।মিতুর মা আমাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে কেন যেন বললো, “ভেতরে আসো।তোমার নাম অর্ক তাই না?”

আমি মাথা নাড়লাম।ঘরের ভেতরে ঢুকে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতাবোধ আমাকে গ্রাস করলো।ওর মা আমাকে সোফায় বসতে বলে আমার পাশে বসে বললেন, “আমি জানতাম তুমি একদিন আসবে।মিতু আমাকে বলেছিলো, তুমি আসবে”।

আমি ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম মিতু এই পৃথিবীতে নেই।কোথাও ওর মিষ্টি গন্ধটা আর চাইলেও খুজে পাওয়া যাবেনা।আমি ওর মায়ের দিকে অসহায়ের মত তাকিয়ে বললাম, “ও আপনাকে আমার কথা বলেছে?”
মিতুর মা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “ওকে যখন চিকিৎসার জন্য আমরা বাহিরে নিয়ে যাই তখন ও খুব কাদতো।আমি জিজ্ঞেস করিনি কেন।শেষের দিকে ও কথা বলতে পারতোনা সেভাবে।আমাকে তবুও অনেক কষ্ট করে তোমার কথা বলেছিলো।আমাকে বলেছিলো তুমি ওর জন্য অপেক্ষা করো।ও এটা জানে।মারা যাওয়ার দুদিন আগে ও আমার হাতে তোমার জন্য একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছিলো।আমি গত পাচ বছর চিঠিটা তোমার জন্য রেখে দিয়েছিলাম।একটু বসো আমি চিঠিটা নিয়ে আসি”।

মিতুর মায়ের সামনেই আমি চিঠিটা খুললাম।চিঠিতে অনেক আকিবুকি করা।শুধু একটা বাক্য আমি বুঝতে পারলাম।ও লিখেছে, “আমি আবার আসবো”।আমি চিঠিটায় হাত বুলাতে থাকি।ওর মা বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “কি লিখেছে চিঠিতে?আমার কথা ওর বাবার কথা কিছু বলেনি?”
আমি মাথা নাড়ি।ওর মাকে বলি, “ও লিখেছে ও আবার আসবে আপনাদের কাছে”।

মিতুকে যেখানে কবর দেয়া হয়েছিলো আমি সেখানে ঘন্টা দুই ধরে দাঁড়িয়ে আছি।অনেক রাত হয়ে গেছে কিন্তু আমি কবরস্থান থেকে যেতে পারিনা।আমার চোখ দিয়ে জল পড়া থামছেনা অথচ মুখে একটা আত্নতৃপ্তি।এই আত্নতৃপ্তি ওর গায়ের মিষ্টি গন্ধটা খুজে পাওয়ার।আমি কবরের মাটিতে হাত দিয়ে থাকি।আমি ওকে বলি, “তোমার আসবার জন্য আমিও অপেক্ষা করবো”।


আশেপাশের মানুষজন আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে।তারা অবাক হয়ে খেয়াল করে একটা উঠতি বয়সের তরুণের দুচোখ ভরা পানি অথচ মুখ ভরা প্রশান্তির হাসি।এমনটা তারা খুব বেশি দেখেনি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29527311 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29527311 2012-01-22 21:15:32
কাজলে আঁকা চোখ দুঃখিত মা, সাবধান হতে পারিনি।

টার্সাল, ফেবুলা আর কি কি যেন ভেঙ্গে গেছে।ডাক্তার সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এমন গাধার মত রাস্তা পার হও কেন?”
আমি যন্ত্রণাকাতর চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “ছাগলের মত কথা বলেন কেন?আমি সোজা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, ট্রাক আধো আলোতে আমাকে দেখতে না পেয়ে বাড়ি দিছে”।
আমার মুখে এমন উত্তর শুনে ডাক্তার সাহেবের চোয়াল মনে হয় ঝুলে পড়লো।পাশের নার্স কিছু না শোনার ভঙ্গি করে আমার কাছে এসে বসে থার্মোমিটার দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো।ডাক্তার সাহেব একটু মনুমনু কন্ঠে বললেন, “বেশি রক্ত গরম তো।মুখে যা আসে বলে ফেলো।তোমার মত চেংড়া পোলারে আমি দেখাচ্ছি মজা দাঁড়াও”।
আমি মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিকর আওয়াজ করি।আওয়াজটা দুটো অর্থ প্রকাশ করে।এক, ধুর মিয়া।দুই, ব্যাটা গেলি।
ডাক্তার সাহেব চলে যাওয়ার পর নার্স ম্যাডাম আমার কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো, “উচিত শিক্ষা দিছেন।বেশি ঝাড়ি নেয় ব্যাটা”।
আমি হাসি।হাসতে হাসতে বলি, “সে জন্মের পর থেকেই এমন ঝাড়ি নেয়।আমিও জন্মের পর থেকেই তাকে উলটা ঝাড়ি মারি”।
নার্স বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার কি হয়?”
আমি কৌতুকভরা দৃষ্টিতে নার্সের দিকে তাকিয়ে বলি, “আমার চাচ্চু।ছোট চাচ্চু”।
দুপুরবেলা আমার চাচা হাতে একটা পত্রিকা নিয়ে আসলেন।আমাকে বললেন, “এটা পড়ে দেখ।মাঝের পাতায় জীব বৈচিত্র নিয়ে একটা চ্যাপ্টার আছে।সেখানে আমাজনে কিছুদিন আগে পাওয়া একটা বিশাল এলিগেটরের ছবি আছে”।
আমি স্যুপ খেতে খেতে চাচার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুমি এত ফকিন্নী প্রজাতির কেন চাচ্চু?এইরকম মাছের ঝোলের মত স্যুপ আমাকে খাওয়াইতে পারলা?”
ছোটচাচা আমার দিকে হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে বললো, “আমাদের হাসতালে এর থেকে ভালো স্যুপ বানানো হয়না।২০ টাকায় এর বেশি আশা করোনা”।
আমি অসহায় দৃষ্টিতে চাচার দিকে তাকিয়ে বললাম, “একটু বিরিয়ানী খেতে ইচ্ছা করছে।আনায় দাও”।
ছোট চাচা কিছু বলেন না।পত্রিকা রেখে উঠে চলে গেলেন।দু মিনিটের মধ্যে সকালের নার্স ম্যাডাম একটা সুন্দর থালা আর বিরিয়ানী এনে আমার সামনে উপস্থিত হলেন।চাচা আগেই এনে রাখছিলেন।আমি এতে অবাক হইনাই।আমার ছোটচাচা আমাকে জন্মের পর থেকে এভাবেই ভালোবাসতেন।চাচী আমাকে আরো বেশি ভালোবাসতেন।তিনি মারা যাওয়ার সময় আমি পাশে ছিলাম না।নিজেকে আজও এর জন্য ক্ষমা করতে পারিনি।চাচার কোন ছেলে মেয়ে নেই।আল্লাহ যেই মানুষটার মনে এত ভালোবাসা দিয়েছেন, তার বুকে একটা ছোট্ট প্রাণ এনে দিতে এত দ্বিধা করলেন কেন জানিনা।
পত্রিকাটা হাতে নিয়ে পাঠকের মন্তব্য আগে পড়ছিলাম।একটা চিঠিতে হঠাৎ করে দৃষ্টি আটকে গেলো।চিঠিটা পাঠিয়েছে মায়া নাজিয়া।আমি খুব মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পড়তে থাকলামঃ

“প্রিয় সম্পাদক,
আগডুম বাগডুম নামে এই পত্রিকাটি যে কতটা বিরক্তিকর তা কি আপনি জানেন?আপনার এই লিটল মাগে যে বিগ বিগ গাধামী করা হয় এটা হয়তো আপনি নিজেও বুঝতে পারেন না।দুদিন আগে সুজির হালুয়া নামে একটা বিশাল কবিতা আপনার কাব্য পাতায় প্রকাশ পেয়েছিলো।সেখানে ডায়রিয়া ও হালুয়ার সম্পর্ক উদঘাটন পূর্বক তাদের উৎকট বর্ণনা ছন্দে ছন্দে দুলিয়া আনন্দে গ্রন্থিত হয়েছে।এইরকম আলতু ফালতু কবিতা দিয়ে আপনারা দেশ ও জাতির কোনরূপ উপকার করছেন না বলে নিশ্চিত থাকুন।ছাগলের রুচিবোধও আপনাদের থেকে উত্তম।দয়া করে পাঠককে আর বিরক্ত করবেন না এহেন কবিতা দিয়ে”।
আমি চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ মনে মনে হাসলাম।যেই মেয়েটি চিঠিটি লিখেছে তাকে হঠাৎ করে খুব দেখতে ইচ্ছা হলো।আচ্ছা মেয়েটা কি চোখে কাজল দেয়?আমার মনে হলো, তাকে একটা চিঠি লিখি।সৌভাগ্যবশত তার ঠিকানা তার লিখা প্রতিবাদলিপির নিচে দেয়া আছে।এটা একটা সুখকর কাকতালীয় ব্যাপার।আমার মনে হলো তাকে একটা চিঠি লিখি।কিন্তু চিঠিতে কি লিখবো তা মাথায় আসছিলোনা।এইসবকিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! কিন্তু ঘুমেও মায়া নাজিয়া আমার পিছু ছাড়লোনা।জেগে উঠার পর স্বপ্নে দেখা সবকিছু প্রায় ভুলেই গিয়েছি।আধো আধো মনে পড়ে সবকিছু।মনে পড়ে শুধু চোখে কাজল দেয়া কেউ একজনকে আমি অনেক আলোতে হাতড়ে হাতড়ে খুজে বেড়াচ্ছি।একটা প্রিয় মুখ বারবার সামনে ভাসতে থাকলো, কিন্তু আমি তাকে অনুভব করতে পারিনা কোনভাবেই।

হাসপাতাল থেকে আমাকে রিলিজ দিলো প্রায় এক সপ্তাহ পরে।ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, পড়াশোনা শুরু করতে হবে।কিন্তু উপায় নাই আইজুদ্দিন, মাইনকার চিপায় ফেসে গেছি।চাচ্চুর বাসায় যেয়ে দেখি ঘরের অবস্থা ভয়ংকর খারাপ।চাচী চলে যাওয়ার পর চাচা বাসায় থাকেন না জানতাম।রাতেও চাচা বাসায় আসতে চান না।প্রায় সময় হাসপাতালে কাটিয়ে দেন।জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন এমন করে।চাচা বলেছিলো, “ভালো লাগেনা বাসায় যেতে অর্ক।তোর চাচী একটু ঘুম পেলেই সামনে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে।আমি তার নিঃশ্বাসের আওয়াজ পাই।এগুলা সহ্য হয়নারে”।

গভীর রাতে আমি এক দিস্তা কাগজ নিয়ে বসলাম।মায়াকে চিঠি লিখা দরকার।এই নামটা যতবার মনে পড়ছে ততবার একটা অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে।পাঠককে জানানো দরকার এই নামটা কেন এত ভালো লেগেছে।আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি তখন একটু লুইস ক্যাটাগরীর ছিলাম।আমার বাসার ছাদে একটা গোলাপ বাগান ছিলো।আমি প্রায়ই গোলাপ ফুল নিয়ে স্কুলে যেয়ে একটু কিউট টাইপ টাইপ মেয়েদেরকে তা উপহার দিতাম।বেশি কিউট হলে সাথে লাজুক ভঙ্গীতে বললাম, “এই ফুল তোমার মতই সুন্দর”।
এক মেয়ে একবার গাল ফুলিয়ে বলেছিলো, “চড় খাবি?”
সেই মেয়েটার নাম ছিলো মায়া।ক্লাস থ্রিতে মেয়েটা হারিয়ে যায়।কোথায় হারিয়ে যায় তা অবশ্য জানিনা।শুধু মনে আছে একদিন স্কুলে এসে মেয়েটা আমার পাশে বসে পিচিক করে হেসে বলেছিলো, “আমি তোকে ভালোবাসি”।
এমন সুন্দর একটা কথা আর কেউ কখনো আমাকে বলেনি, শুনতে ইচ্ছা হয়েছিলো কারো কাছে তাও কিন্তু নয়।
মায়াকে কি লিখবো ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না।আমার হাতে কলম, মাথায় অজস্র চিন্তা।হঠাৎ করে মনে হলো, ছোট্টকালের মায়াকে নিয়েই লিখা শুরু করি।আমি তাকে লিখতে থাকলামঃ

“প্রিয় মায়া,
আমি যখন অনেক ছোট্ট তখন সেন্ট প্যাট্রিকস নামে একটি স্কুলে আপনার নামের একজনের প্রেমে পড়েছিলাম।সাল ১৯৯২, আমি তাকে একটি ফুল নিয়ে প্রপোজ করেছিলাম।জবাবটা সুন্দর ছিলোনা।তাই সে প্রসংগ বাদ দেই। আমি জানি আপনি সে নন।কিন্তু মেয়েটার প্রতি একটা ভালোলাগা সবসময় আমার হৃদয়ে আলোড়ন তুলতো।অনেকদিন পর সেই নামের কাউকে দেখে মনে হলো একটা চিঠি লিখি।এই চিঠিটা আপনাকে লিখা আমার প্রথম চিঠি।এটা শেষ চিঠি হতে পারে যদি আপনি আপত্তি করেন।
মায়া আমার ব্যাপারে আপনাকে তেমন কিছু জানানোর নেই।আমি সাধারণ একজন মানুষ।মাঝে মাঝে গল্প কবিতা লিখি, শুধু আমার জন্য।আপনাকে জানাই আমার একটি কবিতার নাম ছিলো মায়া।কবিতার শেষের চারটি পংক্তি লিখছিঃ

আচ্ছা তবে সাঙ্গ হোক এই বালুকাবেলায় কাটানো সময়টুকু
আমি নাহয় ফিরে যাই নিজ নীড়ে নির্জনে তোমায় ভাবতে
তোমার আমার না বলা কথাগুলো আজ নাহয় আড়ালে থাকলো
আমাদের ভালোবাসা বেচে থাক নয়নের অবগাহনে নীরবে নিভৃতে

মায়া, আমার সবসময় ইচ্ছা ছিলো কেউ একজন বহু দূর থেকে আমাকে চিঠি লিখবে।আমি তাকে কবিতা লিখে দিবো আমার প্রতিটি চিঠিতে।আপনাকে বন্ধু হিসেবে চাই।কথা দিচ্ছি যোগাযোগটা চিঠি লিখালিখির বাইরে আর কিছুতে চাইবোনা।ভালো থাকুন”।

চিঠিটা পোস্ট করার দু সপ্তাহ পরে উত্তর পেয়েছিলাম।আমি আসলে ভাবিনি উত্তর পাবো।খুব সুন্দর একটা খামে ভরা খুব সুন্দর একটা চিঠি।খামের উপর গোটা গোটা অক্ষরে লিখা, মায়া।আমি সেদিন রাতের বেলা বেশ আয়েশ করে চিঠিটা পড়া শুরু করি।হলের বন্ধুরা তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।চিঠিটা খুলে আমি পড়তে পারিনা একেবারে।কারণ এত সুন্দর হাতের লিখা আগে দেখেছি মনে পড়েনা।অবশেষে পড়তে থাকলামঃ

“প্রিয় অর্ক,
আপনাকে উত্তর দেয়ার কোন ইচ্ছা হয়তো হতোনা যদিনা আপনি এমন একটা কবিতা লিখে দিতেন।আমার একটা ছোট্ট নীল মলাটের ডায়েরী আছে যেখানে আমি এমন সুন্দর সুন্দর সব কথা লিখে রাখি।আপনার কবিতাটা আমি সেখানে যত্ন করে লিখে রেখেছি।
আমি সেই মায়া নই অবশ্যই।কারণ আপনি জেনে হয়তো বিষম খাবেন আমি অত্যন্ত পিচ্চি একটা মেয়ে।মাত্রই দশম শ্রেনীতে উঠেছি।আপনার চিঠিটা আমার বাবা যখন আমার হাতে দেয় তখন বেশ পুলকিত বোধ করেছিলাম।কেউ আমাকে আগে কখনো চিঠি লিখেনি।আমার বাবা খুব হেসেছিলো সেদিন।আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো চিঠিতে কি লিখা আছে।আমি বাবাকে শুধু কবিতাটা পড়ে শুনিয়েছিলাম।বাবা আপনার কবিতা পছন্দ করেছেন।
আমার ব্যাপারে বলি।আমার পুরোটা জগত জুড়ে আমার বাবা বাস করে।মা অনেক ছোটকালে মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা আমাকে কত কষ্ট করে মানুষ করেছেন তা অনেকে হয়তো অনুধাবন করতে পারবেনা।আমার বাবা সাংবাদিক, একটু হালকা পাতলা লিখালিখি করেন।আমার কাছে আমার বাবার থেকে বড় লেখক কেউ নেই।আমার কোন ভাইবোন নেই।

আমার বাবা কিন্তু কলকাতার মানুষ।মা আর বাবা দুজনই ভারতের শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করতেন।বাবা মাকে খুব ভালোবাসতেন।তাই মা যখন বললেন, তাকে বিয়ে করতে হলে চাটগায় থাকতে হবে বাবা সব ছেড়েছুড়ে এখানে এসে পড়েছিলেন।
আমি অনেক বই পড়ি।যা পাই তাই পড়ি।আমার যদি এমন একটা চিঠি বন্ধু থাকে তাহলে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাববো।শর্ত একটাই আমাকে বিশাল বিশাল চিঠি লিখতে হবে।
আর হা আমার প্রেমে পড়তে পারবেন না।আমি একজনকে অনেক ভালোবাসি।সেই ছেলেটাকে বলা হয়নি এখনো কথাটা।আসলে কখনো বলতে সাহস পাইনি।বাবা বলে, কাউকে ভালোবাসলে সেটা না বললে তা আমাদেরকে মনকে দগ্ধ করে।তাই আমার উচিত ছেলেটাকে খুব সুন্দর ভাবে কথাটা বুঝিয়ে বলা।যার কথা বলছি তিনি আমাকে বাসায় এসে পড়ান।তার একটা মাত্র বাদামী রঙের শার্ট আছে।সে যেন একটা শার্ট কিনতে পারে, এজন্য বেশ কয়েকবার বেতন দেয়ার সময় কিছু টাকা বেশি দিয়েছিলাম, ভাব ধরেছিলাম যে ভুল হয়েছে।উনি প্রতিবার ঘন্টাখানেক পরে এসে ফেরত দিয়ে গেছেন।তার নাম অয়ন।আমি তাকে নিয়ে একটা ছোট্ট কবিতা লিখেছিলামঃ
অয়ন অয়ন
আপনি আমার নিঃশ্বাসে বেচে থাকা
এক একটা জীবন
নয়নে নয়নে আপনাকে লুকিয়ে রাখি
রাখবো প্রতিটা ক্ষণ

ভালো থাকুন অর্ক।আপনার চিঠির অপেক্ষায় থাকবো”।

প্রায় তিনবছর আমি আর মায়া চিঠির পর চিঠি লিখেছি।তাকে চিঠি লিখতে ভালো লাগতো, কারণ আমার সাধারণ মানের সেই চিঠিগুলোর সে এত্ত সুন্দর করে উত্তর দিতো আমার বেশ ভালো লাগতো।


“প্রিয় মায়া,
আজ ২২শে শ্রাবন, আমার প্রথম চিঠি লিখার তিন বছর শেষ হলো।তুমি বলেছিলে তোমার প্রেমে না পড়তে।কিন্তু আমি হয়তো তোমার প্রেমে পড়ে গেছি।কারণ তোমার প্রথম দেয়া চিঠিটা আজও আমি অনেকবার পড়ি।প্রেমের সিনড্রোম, তাই না?
আচ্ছা অয়নকে তুমি এত ভালোবাসো, তুমি হয়তো তা উনাকে কখনো বলোনি।উনি কখনো বুঝে নাই?তুমি কিভাবে এমন কিছু তার এত কাছে থেকেও লুকিয়ে রাখো বলো তো?
এবার একটা বিশেষ কথা।একদিন বলেছিলাম তোমার সাথে কখনো এই মৃত্তিকার পৃথিবীতে দেখা করতে চাইবোনা, কথা বলতে চাইবোনা।কিন্তু আজ কেন যেন মনে হলো তোমার সাথে একবার দেখা হতেই পারে।এতোটা দিন যার সাথে এত এত কথা হলো, সে আসলে কেমন?কিভাবে কথা বলে?কেমন করে হাসে?তোমার লিখা একটা কবিতা আমাকে আবৃত্তি করে যদি শোনাও তবে তা কেমন হবে?এইসব আগ্রহগুলোর জন্ম কেমন করে হলো, তা জানিনা।তোমাকে জানালাম।তুমি সিদ্ধান্ত নিও”।
এই চিঠিটা লিখার পর মায়া আমাকে খুব তাড়াতাড়ি একটা চিঠি দিলোঃ
“প্রিয় অর্ক,
ভালোবাসার কথা কাছে বসে গুছিয়ে বলতে হয়।একসময় ভাবতাম, আমি তাকে আমার সব কথাগুলো, তার জন্য আমার ভালোবাসাটা গুছিয়ে বলবো। তার চোখে হাত দিয়ে, তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে সব কিছু তাকে জানাবো।আমি পারিনি অর্ক।ছেলেটা হারিয়ে গেছে, অনেক অনেক দূরে।যেদিন জানলাম ও আর নেই সেদিন থেকে আমি আর কবিতা লিখিনা।আমি শুধু তোমাদের লেখা কবিতাগুলো পড়ি, তাতে হারাই।আচ্ছা আর কখনো বলোনা অয়নের কথা।

তুমি দেখা করতে চাচ্ছো জেনে একটু পুলকিত বোধ করলাম।তোমাকে বলি শোন, কোন একদিন তোমার পাহাড় নিয়ে একটা খুব সুন্দর কবিতা আমাকে লিখে দিয়েছিলে।এরপর থেকে আমার তোমাকে একটা পাহাড় দেখাতে খুব ইচ্ছা ছিলো।পাহাড়টা আমার শহরের একেবারে শেষ মাথায়।নামটা অবশ্য জানা নেই।ক্ষমা করো তোমাকে পাহাড়টা এই জীবনে হয়তো দেখাতে পারবোনা।আর দু মাস পর আমার বিয়ে।বাবা আমার জন্য একটা বেশ সৌখিন ছেলে ঠিক করেছে।আমার সাথে যেদিন তার প্রথম দেখা হয় সে কেমন করে যেন তাকিয়ে আমাকে দেখছিলো।আমার ভালো লাগেনি।পরদিন সে উদ্ভ্রান্তের মত আমার বাসায় এলো গভীর রাতে।হাতে একটা বিশাল বড় পোট্রেট।আমি তাকিয়ে ছিলাম সারাটা সময় আমার আকা সেই পোট্রেটের দিকে।ইশ যদি তোমাকে দেখাতে পারতাম বন্ধু।
তুমি বলেছিলে, তোমার কবিতা কেউ ছাপতে চায়না।কেউ পড়তে চায়না।আমার কি মনে হয় জানো?মানুষগুলো খুব বোকা।তুমি কি সুন্দর করে সব কবিতা লিখো,আমার অনেক ভালো লাগে।
আমরা একটা ছোট্ট বাড়ি কিনেছি জানো।সেই বাড়িতে আমার ছোট্ট ঘরের জানালা দিয়ে আমি সবুজ পাহাড় দেখতে পাই।এর থেকে বেশি কিছু আর কি চেয়েছিলাম জীবনে।আমি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে জেগে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে রাখি।আমার খুব ভালো লাগে যখন পাহাড়ী বুনো হাওয়া আমার হাতটা ছুয়ে দিয়ে যায়।মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাদে ঢাকা পাহাড় দেখি।বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম পাহাড়ে দাঁড়িয়ে চাদটাকে ছোয়া যাবে কিনা।বাবা কিছু বলেনি, শুধু বলেছে আমি পাগল হয়ে গেছি।আমার বাড়ির পাশে একটা ছোট্ট ফুলের দোকান আছে জানো! সেখানে একদিন সকালে আমি গিয়েছিলাম।অবাক হয়ে দেখি একগুচ্ছ নীল পদ্ম ঈষাণ কোণে লুকিয়ে রাখা।দুষ্টু ফুলের দোকানী আমাকে কিছুতেই বিক্রি করলোনা ফুলগুলো।আমাকে বললো এই ফুলগুলো শুধু তার মেয়ের জন্য।তার মেয়েকে এভাবে থোকা ভরা ফুল না দিলে সে রাগ করে।আমি বলেছিলাম তার মেয়ের কাছে নিয়ে যেতে।আমি ছোট্ট মেয়েটাকে অনুরোধ করলে সে আমাকে একটা ফুল তো দেবেই।আমি তখন জানতাম না মেয়েটা একটা ছোট্ট কবরে ঘুমিয়ে আছে।আমি নিজ হাতে সেই কবরে তার প্রিয় নীল পদ্ম রেখে এসেছি।একটাও আমি চাইনি।

প্রিয় অর্ক, হয়তো এটা তোমাকে লিখা আমার শেষ চিঠি।তাই তোমাকে আমার নতুন ঠিকানাটা দিলাম না।আমি আমার পুরোটা সময়, মনোযোগ আর ভালোবাসা আমার জীবনে আসা নতুন সেই অসাধারণ মানুষটাকে দিতে চাই।কিন্তু তোমাকে একটা কথা জানাই।তুমি আমার অনেক কাছের একজন।তোমার একটা চিঠিও কেন যেন আমি একটুও অযত্ন করিনি।আমি মাঝে মাঝে ভয় পেয়েছি তোমাকে অন্যভাবে চাই কিনা তা ভেবে।যদি চেয়েও থাকি সেই চাওয়াটা আমার মাঝে থাক।ভালো থেকো।অনেক ভালো।কখনো কবিতা লিখা ছাড়বেনা”।

আমি চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষন।আমার কিছু বলার ছিলোনা।একটা প্রচন্ড শূণ্যতা হঠাৎ করে আমাকে গ্রাস করে ফেললো, এই শূণ্যতার কোন আদি নেই অন্ত নেই।এই ভয়ংকর অনুভূতিটা আমাকে কখনোও পিছু ছাড়বেনা আমি জানি।আমি ভয় পাই, এই গভীর রাতে মায়ার চিঠির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই ভয়টা আরো বাড়ে।কি অদ্ভুত ! এই মেয়েটাকে কখনো দেখিনি, তার কন্ঠ কখনো শুনিনি।অথচ আজ মনে হচ্ছে আমার সবচেয়ে কাছের একজন হারিয়ে গেলো।
এরপর এক মাস আমি একটা প্রচণ্ড জরায় জরাজীর্ণ হয়ে ছিলাম।আমি একের পর এক চিঠি লিখেছি মায়াকে।আমি মায়াকে বলতে চেয়েছি আমি তাকে আর চিঠি লিখতে চাইনা।রোদেলা একটা শুভ্র সকালে অথবা আধার কালো নিশুতি রাতের অল্প একটু রুপালী আলোয় আমি তার পাশে বসে তাকে আমার জীবনের সবগুলো জরুরী কথা বলতে চাই।আমি তাকে জানাতে চাই এই পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর কবিতাগুলো আমি তার জন্য লিখবো।

এতোগুলো চিঠি লিখে পাঠানোর পর একটারও উত্তর পাইনি।একটারও না।মাঝে মাঝে মনে হয়েছে আমি ভুল ঠিকানায় চিঠি দিয়েছি।একসময় বুঝতে পারলাম, কাউকে চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারটায় ভয়ংকর একটা নিষ্ঠুরতা আছে।কখনো কখনো কাউকে প্রবল ভাবে চাওয়া যায়।বিশ্বাস করুন সেই চাওয়ার কোন সীমা আপনি খুজে পাবেন না।সেই চাওয়াটা আপনাকে সারা দিনমান গ্রাস করে রাখবে।আমি ঠিক তেমন সর্বগ্রাসী রুপে মায়াকে চেয়েছিলাম।নিষ্ঠুরতাটা লুকিয়ে আছে, এই মানবী যাকে আমি এমন করে চেয়েছি সে আমার চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে।

একদিন অনেক অনেক ভোরবেলা আমি সিদ্ধান্ত নিলাম চাটগা যাবো।আমি জানিনা সে এখন কোথায় থাকে।আমি শুধু একবার জেনেছিলাম তার বাসার পাশে একটা ছোট্ট ফুলের দোকান আছে যেখানে নীল পদ্ম পাওয়া যায়।আমি জানিনা কিভাবে কোথায় তাকে পাবো।আমাকে যেতে হবে।যেভাবেই হোক যেতে হবে।

রম্যবচন নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের সামনে আমি বসে আছি।আমার উশকোখুশকো চুল দাড়ি দেখে সম্পাদক আনু ভাই আমাকে বললেন, “তোমার কবিতা যেটা ছাপাইছি সেটা আমার ভালো লাগেনি ব্যক্তিগতভাবে।তোমরা আধুনিক পোলাপাইন কবিতা লিখো ছন্দ ধরে।একটা লিমেরিক কেমনে লিখতে হয় তা কি তোমরা জানো?তোমরা শুধু সত্যেন্দ বাবুরে ফলো মারো।কবিতার ভিতর ওই জিনিসটা থাকতে হয়।তোমাদের ওটা কেন যেন থাকেনা।যাই হোক তারপর কেন আসছিলা বলো?”
আমি সরাসরি তাকে বলি, “আনু ভাই আমার কবিতা ছাপা হইলে বলেছিলেন ৫০০ টাকা দিবেন।টাকাটা কি আজকে পেতে পারি?আমার একটু কাজ ছিলো ঢাকার বাহিরে।টাকাটা খুব জরুরী দরকার ছিলো”।
আনু ভাই পান চিবোয়।আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে একশো টাকার একটা নোট এগিয়ে দিয়ে বলে, “আমার একটু কাজ আছে।তোমার সাথে পরে কথা হবে।এখন বিদায় হও”।
আমি টাকাটা নিয়ে চলে আসি।আমি জানি আনু ভাইয়েরা আমার প্রয়োজন বুঝবেনা।একবার মনে হলো ছোট চাচার কাছে যাই।কিন্তু ইচ্ছা করলোনা।চাচার কাছে টাকা চাইলে অনেক কিছু বুঝিয়ে বলতেও হবে।এটা সম্ভব না, একদম সম্ভব না।আমি কাউকে ওর কথা বলতে চাইনা।বললে কেমন যেন আরো শূণ্যতা বোধ হয়।আমার কাছে সব মিলিয়ে গুণে গুণে এখন ৭৫২ টাকা আছে।এর মধ্যে ট্রেনের টিকেট কিনতে খরচ হয়েছে ৫১২ টাকা।বাকি টাকাটা দিয়ে কিভাবে কি করবো বুঝতে পারছিনা।আমার জমানো টাকা সব আমার এক বন্ধুকে দিয়ে দিয়েছি কিছুদিন আগে।বাবা মা টাকা পাঠাতে আরো এক সপ্তাহ।কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।বুঝলাম ধার কর্জ করতে হবে।আচ্ছা তাই নাহয় করা যাবে।

পরের দিন খুব ভোরে যখন চাটগা পৌছালাম তখন পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে।আমার প্রচন্ড শীত লাগছিলো।গায়ে শাল জড়িয়ে আমি রেল স্টেশন থেকে বের হয়ে আসলাম।মায়ার শহরে এসে আমার বেশ ভালো লাগছিলো।আমার মনে হচ্ছিলো আমি যেন মায়ার স্পর্শ পাচ্ছি শীতল কুয়াশার হৃদকম্পনে।আমি জানিনা মায়াকে কিভাবে খুজে পাবো।আমি শুধু জানি আমাকে সেই ফুলের দোকানটা খুজে বের করতে হবে।মায়াকে খুজে পেতেই হবে।তাকে হারানোর সামর্থ্য আমার নেই।
আমি পাগলের মত চাটগার আশেপাশে ঘুরতে থাকলাম।রাস্তায় দিকহীন হয়ে আমি হাটতে থাকি।আমি জানিনা আমার ঠিক কোথায় যেতে হবে।একটু পরপর বিরতি নিয়ে আমি আশেপাশের মানুষজনকে ফুলের দোকানের কথা জিজ্ঞেস করি, পাহাড়ের কথা জিজ্ঞেস করি।অনেকগুলো ফুলের দোকানে আমি গিয়েছি, নীল পদ্মর কথা জিজ্ঞেস করেছি।কেউ আমাকে তার সন্ধান দিতে পারলোনা।একটাসময় ক্ষুধায় ক্লান্ত হয়ে আমি রাস্তার ধারে ফুটপাতের ওপর বসে পড়লাম।তখন রাত্রি সাড়ে দশটা বাজে।হঠাৎ করে মনে হলো আমি যদি তাকে আর না পাই।এটা ভাবতেই আমার ভিতরে অসহ্য একটা কষ্ট জন্ম নিলো।আমি জানিনা কবে থেকে মায়াকে এমন করে চেয়েছি।আমি জানিনা মায়াকে কেন এত ভালোবাসেছি।মায়াকে বলতে চাই, আমার সমস্ত সত্তায় সে বাস করে।প্রতিমুহূর্তে প্রতিক্ষণে সে আমাকে ছেয়ে থাকে।
এই জগৎটা অনেক নিষ্ঠুর, এটা আমার থেকে ভালো কে বুঝতে পেরেছিলো।আমি প্রায় দশদিন চাটগার এখানে সেখানে ঘুরে যখন প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলাম তখন কিছু দয়া দাক্ষিন্য আমাকে আবার বেচে থাকতে সাহায্য করেছিলো।সেই অচেনা অজানা মানুষগুলো আমাকে আমার শহর ঢাকায় পৌছিয়ে দেয়।বাবা মা, ছোট চাচা আমাকে খুব বকেছিলো।আমাকে অনেক প্রশ্ন তারা করেছিল, আমি কোনটির উত্তর দেইনি।কিভাবে তাদেরকে বলবো, কয়েকটা চিঠির পরিচয়ে মায়াকে অন্তহীন ভালোবাসার কথা।আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিঃশব্দের গহীনে।
মাসখানেক একটু স্বাভাবিক হয়ে ভার্সিটির হলে গেলাম।আমাকে দেখে আমার বন্ধুরা অবাক চোখে তাকালো।এভাবে টার্মের মাঝে দেড় মাস ছুটি নিয়ে পাগলামী করে বেড়ালে কারো স্বাভাবিকভাবে তাকানোর কথা না।ক্লাসে গেলে ফারিয়া আমার পাশে বসে।আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে, “দোস্ত তোকে কেমন যেন ভয় লাগতাছে”।
আমি ওর দিকে তাকাই।ও আরো ভয় পেয়ে যায়।আমি অনেকদিন পর একটু হাসি।ওকে হাসতে হাসতে বলি, “একটু পাগলামী হয়েছিলো।ঘুরে বেড়াইছি রাস্তা ঘাটে।এই কয়দিনে যে ক্লাস নোট গুলো তোলা হয়নি সেগুলো সুন্দর করে আমাকে বুঝায় দিস।ঠিক আছে?”

রাতের বেলা হলে পৌছালে দীপু আমাকে বলে, “দোস্ত তোর একটা চিঠি আছে।তোর মাই ডিয়ার প্রেমিকা দিছে।আমি কি তোরে আবৃত্তি করে শোনাবো?”
আমি কিছুক্ষণ নীরব থাকলাম।তারপর বললাম, “চিঠিটা দে”।
মায়ার আমাকে লিখা শেষ চিঠি।আমি জানি এই চিঠিতে মায়া আমায় তার বিয়ের দাওয়াত দেবে।বিয়ের জমকালো সাজপোশাকে তাকে কেমন লাগে একথা বলবে।মায়াকে একটা চিঠিতে বলেছিলাম, সে চোখে কাজল দেয় কিনা।কেন যেন মনে হচ্ছে মায়ার বিয়েতে মায়া তার নয়নজোড়া কাজল দিয়ে আকবে।আমি চিঠিটা খুলতে খুলতে মায়ার কাজল চোখে দেয়া একটা ছবি কল্পনা করতে চেষ্টা করি।আফসোস তাকে আমি কখনো দেখিনি।
“প্রিয় অর্ক,
তুমি আমাকে এমন ভয়ংকর চিঠিগুলো কেন দিয়েছো জানিনা।আমি তোমার চিঠিগুলো পড়ে রাগ করেছিলাম অনেক।আমি তোমাকে এতবার বলেছি আমাকে ভালো না বাসতে, অথচ তুমি তাই করলে।তবুও বলি, তোমার চিঠিগুলোতে একটা পাগলাটে ভালোবাসার সৌরভ ছিলো।আমি তা অনুভব করেছি প্রতিটা সময়।
একদিন আমার হবু বর আমার ছবি আকছিলো আমার পাশে বসে।আমার খুব ভালো লাগছিলো জানো।সেসময় হঠাৎ করে একটা কবিতা আমার মাঝে খেলা করলো।আমি গুনগুন করে তা আবৃত্তিও করছিলাম।এই কবিতাটা তুমি আমার জন্য লিখেছিলে।যদিও তুমি বলোনি কবিতাটা আমার জন্য, তবুও আমি জানতাম অর্ক এই কবিতাটা শুধু আমাকে নিয়েই লিখতে পারে।জানো তোমার কবিতাটা আমি যখন আবৃত্তি করছিলাম তখন আমার পুরো নয়নজুড়ে একগাদা জল এসে পড়লো।অর্ক আমি তোমাকে কতটা চাই এটা ঠিক সেসময় বুঝতে পেরেছিলাম।আমাকে ক্ষমা করো, আমি ব্যাপারটা আগে এমনভাবে বুঝতে পারিনি।আমি আসলে বুঝতেও চাইনি।একবার একজনকে ভালোবেসে ধাক্কা খেয়েছিলাম তো, তাই ভয় পেয়েছি।ভেবেছিলাম আমার পরিবার যাকে ঠিক করে দেবে ঠিক সেই মানুষটাকেই ভালোবাসার চেষ্টা করবো।তুমি মাঝ দিয়ে এসে সব উল্টিয়ে দিলে।এমন করে আমাকে পাগল করলে কেন?
অর্ক খামের পিছনে আমার ঠিকানা লিখা আছে।তোমাকে দেখার জন্য এই আমি সারাটিদিন আমার বারান্দায় বসে থাকি।একা একা আর পাহাড়টা দেখতে ইচ্ছা করেনা।তোমার ভালোবাসার মানুষকে আর অপেক্ষার কষ্ট দিওনা।কবে আসবে?”

মায়ার চোখে কাজল লেপ্টে ছিলো।আমার বারবার মনে হচ্ছিলো তার চোখ দুটো ছুয়ে দিতে।আচ্ছা এই মানবীকে আমি কেমন করে এমনটা চেয়েছিলাম।আমার তার প্রথম দেখায় আমি তার দিকে তাকিয়ে প্রথম কথাটা বলেছিলাম, “একটু তোমার গালে হাত রাখি?একটু চোখটা ছুয়ে দেই?”

মায়া মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে।আমি তার চোখে আমার জন্য গাঢ় ভালোবাসা দেখতে পাই।আমি অপেক্ষা করি কখন তার গালে হাত দিয়ে ভালবাসার কথা বলবো।তাকে বোঝাবো, এই ভালবাসাটা শুধু একটা মানুষের জন্য।আমার খুব ভালো লাগছে অপেক্ষার সময়টুকু।

*************************************************************


এই গল্পটার অর্ধেকটা লিখে আমি অনেকদিন একটা উপসংহারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।একটা অসম্পূর্ণ গল্প লেখকের জন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক।ভাগ্যক্রমে দুদিন আগে সেই যন্ত্রণার সমাপ্তি ঘটেছিলো।প্রিয় পাঠক, আমার লুতুপুতু লেখাগুলো থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেও পারছিনা।তবে এটা একটা সত্যি গল্প, বিশ্বাস করুন আর নাইবা করুন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29514979 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29514979 2012-01-02 20:23:07
সেই সময়, সেই একজন আমি বলি, “খামুনা”।
মা মাথায় বাড়ি দিয়ে বলে, “পাগল ছেলে।তোরে তো পিপড়ায় ধরবো”।
আমি ফিক করে হেসে বলি, “পিপড়া খায়া ফালামু”।
মা আমাকে আদর করে কোলে বসায় ভাত রাধে।আমার বয়স তখন ৬ বছর।বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আমি।আমরা প্রায়ই একটা প্রবাদ ব্যবহার করি, দুধে ভাতে মানুষ করা।আমার বাবা মা আমাকে দুধে ভাতে মানুষ করেছেন।আমার একটা দিনও মনে পড়েনা যেদিন বাবা আমাকে গভীর রাতে কোলে নিয়ে ঠাকুরমার ঝুলির ভয়ংকর সব মজার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াননি।আর মা তো আমাকে কোথাও বের হওয়ার আগেই বিশাল বড় একটা কাজল মাথায় একে দেবেন অবশ্যই।কার দৃষ্টি থেকে বাচাতে চাইতেন আজও বুঝিনা।

আমার বাবা একজন কৃষক ছিলেন।তবে তার বেশ অনেক জমিজমা ছিলো ।অনেক জমি বর্গা দিয়ে রেখেছিলেন।তবে বাবা অনেক বোকা ছিলেন তো,তাই হেমন্তের শুভক্ষণে বাবা অনেক গরীব বর্গাচাষী থেকে ধান বুঝে নিতেন না।এরই মধ্যে একজন ছিলেন জমির চাচা।আমি জমির চাচার কাছে প্রায় সময় যেয়ে বসে থাকতাম।উনি মজার মজার ছড়া বলতেন।আমি শুনতাম।যখন তার বর্গা জমিতে সোনালী ধানে ছেয়ে যেত উনি তখন ভাটিয়ালীর সুর তুলতেন।আমি বিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়ায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখতাম।আমাকে মাঝে মাঝে উনি কাধের উপর নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।আমাকে বলতেন, “চল বাজান আইজ তোমারে লই হাট যাইয়াম।মিষ্টি খাইবা?”
আমি মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মিষ্টি খাওয়ার আবদার করতাম।মা বলতেন, “এত মিষ্টি খেলে তো পেটে পোকা হবে”।আমি বলতাম, “পোকারে হজম করি ফেলুম”।
এই ছিলো আমার চমৎকার শৈশববেলা।শহরে তখন অনেক সংগ্রাম, যুদ্ধ মারামারি চলতো।আমাদের ছোট্ট নূরপুর গ্রামে তার কোন স্পর্শ ছিলোনা।বাবা যেদিন আমাকে প্রথম স্কুলে নিয়ে যান সেদিন আমার খুশি কে দেখে?আমি একটা কালো রঙের পোটলার মধ্যে স্বরে অ স্বরে আ-র বই নিয়ে ক্লাসে যেয়ে বসি।আমার পাশে একটু মোটকু সুটকু একটা ছেলে বসে ছিলো।আমি কেন যেন ছেলেটাকে পছন্দ করলাম না।তার বিশাল ভূড়িতে একটা লাথি দিলাম।লাথি খেয়ে ছেলে আমার দিকে ক্যাবলার মত তাকিয়ে বললো, “মারিস ক্যা বে?”
আমি একথা শুনে আরেকটা লাথি দিলাম।লাথি খাওয়া ছেলেটার নাম ছিলো মফরুদ।মফরুদ ৭১ সনে শহীদ হওয়া সবচেয়ে সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন বলে আমি বিশ্বাস করি।আমার এই বীর বন্ধু ৭১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে একা একা একটা পাকিস্তানী ক্যাম্পে ঢুকে পাচটা পাকসৈন্য মেরে ফেলেছিলো।যাওয়ার আগে আমাকে বলছিলো, “দোস্ত আম্মারে অনেকদিন দেখিনা।এগুলারে মাইরা আকাশে যায়া আম্মার লগে দেখা করমু।খুদা হাফেজ”।
আমি তাকে বাধা দিতে পারিনি।আমার সেই সামর্থ্য ছিলোনা।

১৯৬৮ সনের কথা বলছি।প্রথমবার ঢাকায় এলাম, মোটর গাড়ি দেখলাম।মুগ্ধ হয়ে রমনার গেটের সাথে লাগানো বিশাল বটগাছটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম।তখন পুরনো ঢাকায় গুটিকয়েক কাবাব ওয়ালা ছিলো।আমি প্রতি শুক্রবার কাবাব খেতে যেতাম।রমজান মোল্লার কাবাব।রমজান মোল্লা লোকটাকে আমার বিশাল পছন্দ ছিলো।তার কাঠ দিয়ে বানানো চুল্লীর মত চোঙ্গে ভাজা কাবাবের সামনে গেলে তিনি আমাকে বলতেন, “আব্বাজী আইজকা তোমারে কাবাব কেমনে বানাই সেই কথা শুনামু”।আফসোস আমাকে উনি আর কিছুই বলতেন না।একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কাকু আপনি অনেকবার বলেছেন কাবাব বানানো শিখাবেন।পরে আর তো কিছু শিখাইলেন না”।
কাকু বললেন, “আব্বাজী আমি যদি তোমারে শিখায় দেই তাইলে তুমি তো আমার ইহানে আর আইবানা।একটা পোলারে কালাজ্বরে হারাইছি।আরেকটারে কেমনে হারাই”।
কাকু সেদিন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।আমি মনে মনে বললাম, “বোকা কাকু তুমি আমাকে হাজার বার শিখাইলেও এই কাবাব আমি বানাতে পারবোনা।আমার অন্তরে এত ভালোবাসা সৃষ্টিকর্তা দেননি যা দিয়ে এমন যত্ন করে কাউকে কাবাব খাওয়ানো যায়”।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতাম।প্রতিরাতে মা আর বাবাকে চিঠি লিখতাম।আমার মা আর বাবা দুজন পাল্লা দিয়ে ইয়া বড় বড় চিঠি লিখে আমাকে জ্বালাতন করতেন।আমি পরম ভালোবাসায় প্রত্যেকটা চিঠি একটা ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগে ভরে রাখতাম।আমার বন্ধু আজগর একদিন আমাকে বলে, “বন্ধু চিঠিগুলো কোন প্রিয় বান্ধবীর একটু বলো তো শুনি”।
আমি হেসে বলতাম, “এই চিঠিগুলো আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আর বান্ধবীর।এরা আমাকে যতনে ভালোবাসায় যা কিছু লিখে তার সবটাই এই কাগজে বন্দী হয়ে আছে”।
আজগর হাসে, কিছু বলেনা।আমাকে বলে, “একদিন তোমার বাড়িতে যাবো।প্রিয় বন্ধু বান্ধবীকে দেখে আসবো”।
আমি মাথা নাড়ি।তাকে কথা দেই নিয়ে যাবো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন খুব কড়া নিয়ম কানুন ছিলো।ছেলেরা মেয়েরা আলাদা বসতো।কোন ছেলে যদি কোন মেয়ের সাথে কথা বলে তাহলে সেটা পুরো ক্লাসে ছড়িয়ে পড়তো।অজস্র কানাকানি হতো, তাদের মধ্যে প্রেম টাইপ কিছু হয়েছে বলেও ধরে নেওয়া হতো।আমার খুব প্রেম করতে ইচ্ছা করতো।আমি অবশ্য পারতাম না কারো দিকে প্রেম প্রেম ভাব করে তাকাতে।একবার অবশ্য চেষ্টা নিয়েছিলাম।ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রী ছিলো সুবর্ণা।আমি একদিন তাকে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ক্লাসে আসতে দেখলাম।তার দিকে সেদিন তাকিয়ে আমি বিশাল প্রেমে পড়ে গেলাম।সেদিনই হলে যেয়ে একটা কাগজ আর মুখে কলম গুজে চিঠি লিখার চেষ্টা করলাম।মুখ থেকে কলম বের করা হয়নি।চিঠিটাও লিখা হয়নি।দুমাস পরে সুবর্ণার বিয়ে হয়ে গেলো আমাদের এক শিক্ষকের সাথে।ওই স্যার আমাদের আপেক্ষিক জ্যোতির্বিদ্যা পড়াতেন।আমি মুগ্ধ হয়ে তার কন্ঠে জ্যোতির্বিদ্যার সূত্র শুনতাম।কিন্তু সুবর্ণাকে বিয়ে করার পর থেকে তার ক্লাস আর করিনি।বজ্জাত লোকটা কিনা শেষ পর্যন্ত ছাত্রীকেই বিয়ে করলো।আহত হৃদয়ে আমি কবিতা লিখার চেষ্টা করেছি কতবার।আফসোস সেটাও পারলাম না কখনো।

তবে আমার কিছু একটা অবশ্যই লিখা হতো।সেই অখাদ্যগুলোর শ্রোতা ছিলো আমারই বন্ধু আজগর।যতক্ষণ না তার নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া যেত ততক্ষণ আমি তার কর্ণে প্রদাহ সৃষ্টি পূর্বক কবিতা আবৃত্তি করতাম।একদিন কবিতা লিখলাম আমার প্রিয় সবজি পটল নিয়ে।আজগর সেদিন বিশাল রেগে গিয়ে ঘুম থেকে উঠে আমার গলা টিপে ধরেছিলো।আমাকে বলেছিলো, “হারামজাদা আরেকবার বেগুল পটল নিয়ে কবিতা লিখে আমার ঘুম নষ্ট করলে তোর গায়ে আগুন ধরায় সুবর্ণার কাছে পাঠায় দিবো”।সেটিই আমার জীবনে শেষ কবিতা ছিলো।কবিতার শেষ দু চরণ পাঠকের জন্য,
“পটল তোমার সবুজ খোসা আমি ভালোবেসে ফেলেছি
তোমায় সেদ্ধ করে খেয়ে আমি যেন স্বর্গ খুজে পেয়েছি”

৭০ সালের দিকে নির্বাচন হলো।শুনলাম মুজিব সাহেব বিশাল ব্যবধানে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।কিন্তু তাকে গদিতে বসতে দেয়া হবেনা।আমার বন্ধু পল্টু তখন এইসব রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলো।আমরা বন্ধুরা গোল হয়ে বসে তার জ্বালাময়ী রাজনৈতিক আলোচনা শুনতাম।পল্টু বলতো, “আমরা বাঙ্গালীরা কেন এমন নির্যাতিত এইটা কি জানো?কারণ আমরা হইলাম মেছো বাঙ্গালী।মাছ ভাত খাইতেই শুধু জানি।একটু রাস্তায় মিছিলে ডাক দিলে তোমরা বলো, Sorry need to do my water”.
আমি সেদিন সাহস করে বলে ফেলেছিলাম, “তুই কি বলতে চাস আমরা সবাই ডায়াবেটিকসের রোগী?”
পল্টু কিছু বললোনা।শুধু তার তীব্র দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো, “তোরে খাইছি”।

৭ই মার্চ ১৯৭১ সাল।আ্মি রেসকোর্সের ময়দানে।মাথার উপর গনগনে সূর্য।আজকে শেখ সাহেব আমাদের মাঝে আসবেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলবেন।তার সাথে নির্বাচনে জয়ের পরও যে হঠকারীতা হয়েছে তা নিয়ে আমাদেরকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানাবেন।আজ একটা কিছু হবে এটা সবাই বুঝতে পারছে।আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি।প্রচন্ড গরম লাগছে।একটু সামনেই একটা ডাবওয়ালাকে দেখতে পেলাম।পকেটে তখন একটা কচকচে এক টাকার নোট।ডাবওয়ালার কাছে যেয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, “ডাব খাবো।একটা ছিলা দাও”।ডাবওয়ালা কিছু বলেনা।আমার দিকে বিমর্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “ডাব বেচুমনা”।
আমি কিছু না শুনার ভান করে চলে এলাম।একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে।রক্ত শীতল করা অনুভূতি।মনে হচ্ছে আজকের দিনটা খুব খারাপ যাবে।আশেপাশে লক্ষাধিক মানুষ, সবাই চুপ হয়ে আছে।এই গুমোট ভাবের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে হবে।আজ আমি আর আজগর দুজনই ক্লাস ফাকি দিয়েছি।আমাদের ক্লাসের মেয়েগুলো ছাড়া আসলে সবাই ক্লাস ফাকি দিয়েছে।অনেকদিন ধরে এই দেশের মানুষ চাচ্ছিলো কিছু একটা হোক।আজ বোধহয় সেই কিছু একটা হওয়ার দিন।
শেখ সাহেবের গলা কাপানো ভাষণে সবার রক্তে কাপন ধরিয়ে দিয়েছিলো বিশ্বাস করুন।আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।এই মুগ্ধতার কারণ একটা স্বপ্ন।এই স্বপ্ন সবার চোখে মুখে ঠিকরে বের হয়ে পড়ছিলো।শেখ সাহেবের ডাক দেওয়া সংগ্রামে যে স্বপ্নটা সফল হবে, সেই স্বপ্নে আমরা একটা দেশ পাবো।এই দেশটাকে আমরা সবাই কতই না ভালোবাসি, কিন্তু আমাদের রক্তে এভাবে কে কবে পেরেছিলো কাপন ধরিয়ে দিতে।আমি আর আজগর যখন সন্ধ্যার দিকে হেটে হেটে হলে ফিরছিলাম তখন আমাদের মনে ভয়ংকর আগুন।এই আগুনে আশেপাশের সব অন্যায়, নিপীড়ন শোষণ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।আজগর একটা সিগারেট ধরালো হলের গেটের মাথায়।আমাকে বললো, “সামনে কি যুদ্ধ হবে?”
আমি ডানে বায়ে মাথা নাড়ি।বিজ্ঞ ভাব ধরে বলি, “হওয়ার কথা না।এই উত্তাল সময়ে একটু আকটু এমন বিদ্রোহ হবে হয়তো।তারপর দেখিস সব ঠান্ডা হয়ে যাবে”।

আজগর চোখ বন্ধ করে ধোয়া ছাড়ে।ধোয়াগুলো সব এক হয়ে রুপালী চাদের আলো ঢেকে ফেলতে চায়।আমি হাই তুলি।ঘুম পাচ্ছে।আজকে বিশাল একটা পেইন গেছে।সারাদিন প্রায় না খেয়ে ছিলাম।হলে একটা বিস্কিটের প্যাকেট আছে, কসমস বিস্কিট।ভাত খেতে ইচ্ছা করছেনা।সমস্যাটা হলো রক্ত খুব গরম হয়ে আছে।কি যেন করতে ইচ্ছা করছে।বুঝতে পারছিনা সেটা কি।বাবা মাকে দেখতে খুব ইচ্ছা হচ্ছে।আমাদের সবুজ গ্রামে এখন সবাই হয়তো শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে।ঢাকার গরম বাতাস তাদের কাছে পৌছুতে পারেনা।

পরের দিন সন্ধ্যাবেলা।আমি মায়ের কাছে বসে আছি।মাকে গল্প বলি ঢাকার।বাবা চুপ করে শোনে।আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার ক্লাস শুরু হবে কবে?”
আমি মাথা নাড়ি।বাবার দিকে তাকিয়ে বলি, “ক্লাস করতে ভালো লাগেনা আব্বা।তোমাদের সাথে থাকবো”।
আব্বা আমার কথা শুনে হাসে।মা আমার জন্য পায়েস বানিয়েছে।আমি মজা করে সেই পায়েস খাই।আমার মনে তখন একটা ভয়ংকর চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।যতবার বাহিরে তাকাই আমি লাল আগুন দেখতে পাই চারদিকে।এই আগুনটা অনেক ভয়ংকর।আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, সব শেষ হয়ে যাবে ওই আগুনে।
১০ই আগষ্ট, ১৯৭১ সাল।আমার বাবা মাকে এই একটু আগে আমার চোখের সামনে হত্যা করা হলো।আমার অনেকক্ষণ জ্ঞান ছিলোনা সেসময়।আমাকে প্রচন্ড জোরে মাথায় আঘাত করলে আমি শুধু মায়ের শেষ কথাটি শুনতে পেয়েছিলাম, “আমার বাজানরে মাইরোনা।ওরে বাচতে দাও”।
আমাকে একটা নৌকায় তুলে নেয় রাজাকার বদি আর তার দুই শিষ্য।একসময় আমাকে বলে, “তোমার বন্ধু মফরুদ আমার ঘরে আগুন ধরায় দিলো।সবার কাছে সে বইল্যা বেড়ায় আমারে নাকি তার বেয়াদ্দইপ মুক্তি বন্ধুগো লইয়া নেংটা কইর‍্যা গ্রামে ঘুরাইবো।তোমার বাড়িত তো কাল ও আসছিলো।আসেনাই?”

আমি মাথা নাড়ি।আমার মাথা থেকে একটু একটু করে রক্ত চুইয়ে পড়ছে পায়ের কাছে।আমি চাদের আলোয় সেই রক্ত দেখি।নৌকা নদীর পানিতে আস্তে আস্তে ঢুলে ঢুলে চলছে।আমি বদিকে বলি, “মফরুদ তোরে নিয়ে কি করবে জানিনা।আমি তোরে আজকে এই পানিতে চুবায় মারবো”।
বদি আমার দিকে তাকায় হতভম্ব দৃষ্টিতে।আমিও তার দিকে তাকাই।আমার বাবার কথা মনে পড়ে।আমার বুকে একটা ভয়ংকর হাহাকার সৃষ্টি হয়।আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুগুলো আমাকে আর কখনো আদর করে খাইয়ে দেবেনা। মা আমার মাথায় আর হাত বুলিয়ে দেবেনা।এই ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সময়ের স্রোতে তারা হারিয়ে গেছে।আমার বুকটা ভেঙ্গে যায়।এই তো একটু আগেও তারা নিঃশ্বাস নিচ্ছিলো, তাদের সত্ত্বাটা আমাকে ভালোবাসার জন্য জেগে ছিলো।আমি এই ভয়ংকর সময়ে যুদ্ধে যাইনি শুধু তাদের জন্য।আমার অনেক ভয় হতো যদি আমি মরে যাই, তাহলে আমার বাবা মাকে কে দেখবে।আমি এমন কোন সময়ের কল্পনা করতে পারতাম না যে সময়ে তারা আমার পাশে থাকবেন না।আমার মনে হচ্ছিলো আমি মারা যাচ্ছি।আমি বদির দিকে তাকাই।সে তখনো আমার দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।আমাকে বললো, “তোর সাহস তো কম না কাফিরের বাচ্চা।তোরে ক্যাম্পে নিয়া আজকে টাইট দিমু”।

আমি ডান দিকে তাকাই।আরেকটা নৌকা খুব দ্রুত আমাদের নৌকার দিকে এগিয়ে আসছে।বদি ভয় পাওয়া কন্ঠে বলে, “নৌকায় কেডা যায়?”
আমি মফরুদকে দেখতে পাই।মফরুদের হাতে চাইনীজ রাইফেল।আমি বদিকে নিয়ে নৌকা থেকে লাফ দেই।মফরুদ অপেক্ষা করেনা।বদির দুই শিষ্যর দিকে দ্রুতগতিতে অনেকগুলো গুলি ছোড়ে।আমি দুই রাজাকারের পানিতে পড়ার শব্দ পাই।বদিকে আমি পানিতে চেপে ধরে রাখি।পানি এদিকে খুব বেশি গভীর নয়।আমার গলা পর্যন্ত ঠিকমত পানি উঠেনি।আমি মাথা উপরে তুলে নিষ্পলক হয়ে বিশাল বড় চাদটাকে দেখি।আমার দুই হাত তখন বদির গলা টিপে পানিতে ডুবিয়ে রাখা।একসময় ক্লান্ত হয়ে আমি বদির দেহটা ছেড়ে দেই।বদির দেহটা পানিতে ডুবে যায়।সেই দেহে তখন আর প্রাণ ছিলোনা।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি, আমার দিনটা ঠিক মনে নেই।সেই দিনের পর আমি একটাদিনও কাদতে পারিনি।আমি কারো সাথে কথা বলতাম না।বুকের ভেতর একটা গনগনে রক্তলাল আগুন জ্বলতো।একটাই চিন্তা ছিলো মাথায়।সব পাক হারামীকে এই দেশের মাটিতে মারবো, এদের নাপাক নীল রক্তের বন্যা দেখার জন্য আমার ভিতরে আগুন জ্বলতো।আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না একটাবারের জন্য।একটু চোখটা লাগলেই ধ্রিম ধ্রিম আওয়াজ শুনতাম।মফরুদ আমাকে বলতো, “দোস্ত ঘুমা কিছুক্ষণ।আমি পাহারা দিচ্ছি”।

আমি ওর কথা শুনতাম না।আমাদের ১৬ জনের দল, সবাই কাউকে না কাউকে হারিয়েছে।যুদ্ধের ভয়ংকর সময়ে আমরা হয়তো আরো ভয়ংকর হয়ে গিয়েছিলাম।গভীর রাতে সবাই চুপ করে শুয়ে শুয়ে নিজের আপনজনদের কথা ভাবতো।আমাদের মধ্যে হাফিজ ভাই ছিলেন যার একটা ৬ বছরের মেয়ে ছিলো।উনি প্রতিরাতে তার মেয়েকে কাদতে কাদতে চিঠি লিখতো।সেই চিঠির একটাও তিনি তার মেয়েকে দিতেন না।আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, “হাফিজ ভাই এত চিঠি লিখেন।মেয়েকে দেন না কেন?”

হাফিজ ভাই আমার কাধে হাত দিয়ে বলে, “আমি যদি মারা যাই তবে এই চিঠিগুলা দেখে আমার মেয়ে আরো বেশি কাদবে।ওকে এত ভালোবাসা বোঝানোর কি দরকার বলো?”

মফরুদ প্রায় সময় বলতো, “দোস্ত ক্ষিদা লাগছে”।আমি খুব বেশি কিছু খেতাম না কখনো।মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তাদের কাছে খাবার চাইতে ভয়ংকর লজ্জা লাগতো।আমাদের বেশিরভাগ অপারেশন চলতো তখন ঢাকায়।দালানকোঠাগুলোর সব প্রায় সময় খালি থাকতো।দুই একটায় যারা থাকতো, তারা আমাদের দেখলে ভয় পেতো।আহমেদ ভাই নামে একজন কলেজের টিচারের বাসায় আমরা প্রায়ই আশ্রয় নিতাম।আহমেদ ভাই আমাদের দেখলে ভাত বসিয়ে দিতেন।মোটা চালের ভাত আমাদের থালায় যখন বেড়ে দিতেন তখন তাকে দেখে মনে হতো লজ্জায় মারা যাচ্ছেন।একদিন কেদে দিয়ে বললেন, “আমার ভাইটা যুদ্ধে গেছে তোমাদের মত।কিছুদিন আগে শুনলাম ভাইটাকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে।মনে হয় আর বেচে নেই তাই না?”

আমরা তাকে সান্তনা দিতাম না।ওই ভয়ংকর কালো সময়ে কেউ কাউকে সান্তনা দিতোনা।একদিন গভীর রাতে আহমেদ ভাইয়ের বাসায় যেয়ে দেখি বাসার দরজা ভাঙ্গা, ভিতরে আহমেদ ভাইয়ের জিহবা বের করা লাশ।ঘরবাড়ি সব লন্ডভন্ড।আমি আহমেদ ভাইয়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।সেদিন আমার সাথে কেউ ছিলোনা মফরুদ ছাড়া।মফরুদ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “লাশটা কবর দিতে হবে চল।এই লোকটা আমাদের জন্য যা করছে, তাকে এভাবে ফেলে রাখতে পারবোনা”।

গভীর রাতে আমি আর মফরুদ বখশীবাজার বড় মসজিদের পাশে যে একটা খালি জমি পড়ে আছে সেখানে কবর খুড়তে থাকলাম।আহমেদ ভাইকে কবর দিলাম আমরা সম্মানের সাথে।এই মানুষটা কখনো যুদ্ধ করেনি, কিন্তু একটা যুদ্ধকে বুকে আগলে রেখেছিলো।আমরা যখন তার বাসায় গোল হয়ে বসে খেতাম তখন তিনি প্রায়ই আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন।আমি তাকে কবর দিয়ে পাশে শুয়ে পড়ি।অনেকদিন পর চোখ দিয়ে পানি বের হলো।মফরুদ শব্দ না করে কাদছে।আমাকে বিড়বিড় করে জিজ্ঞাসা করলো, “দোস্ত আর কতদিন এমন কুত্তার লাহান বাচুম?”
আমি বলি, “আরো একশ বছর।নাহয় দুইশো বছর।কিন্তু যুদ্ধ থামাবোনা।সবগুলারে মারবো।একটারেও ছাড়বোনা”।

কথা বলতে বলতে আমাদের পাশ দিয়ে একটা মিলিটারী গাড়ি আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়।মফরুদ উঠে বসে।আমাদের দুজনের কাছে তখন দুটা চাইনীজ রাইফেল।দ্রুত আমরা একটা ভাঙ্গা দালানের আড়ালে ঢুকে যাই।গাড়ি থেকে একজন দুজন করে দশ বারোজন পাকসেনা নামে।এদের মধ্যে একজন অফিসার আছে বুঝতে পারি।সেই অফিসার রাস্তার মাঝে পায়চারী করতে থাকে।তার মুখে সিগারেট।আমার বন্ধু আমার দিকে তাকায় বলে, “সামনের স্কুলে ওরা ক্যাম্প বানাইছে দেখছোস”।

আমি বলি, “ফজলু আর বাবুল থাকলে একটা অপারেশন নিয়ে ফেলতাম”।
কথাটা বলতেই আমাদের দুজনের রক্ত গরম হয়ে যায়।বুকের মধ্যে আগুন জ্বলতে থাকে।আমরা জানি আজ এই গভীর কালো অন্ধকার রাতে আমাদের কিছু একটা করতে হবে।হয়তো আমরা মারা যাবো, কিন্তু আমাদের কিছু একটা করতে হবে।আমি মফরুদের জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকাই।মফরুদের জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই।আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে যাই অন্ধকার ঘেষে।হঠাৎ করে আমার বুকের মধ্যে একটা হাহাকার সৃষ্টি হয়।এই হাহাকার আমি যদি বেচে যাই তবুও কোনদিন ভুলতে পারবোনা।আজন্ম আমাকে তা জ্বালিয়ে মারবে।আজ হঠাৎ করে মনে হচ্ছে আমি এই দেশটাকে অনেক ভালোবাসি।এই দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া সহজ সরল মানুষগুলাকে অনেক ভালোবাসি।আমি তো ওদেরে জন্যই যুদ্ধ করছি।ইশ কেউ যদি আমার কথা লিখতো।আমি এই দেশের সাত কোটি মানুষের জন্য বুকের মধ্যে যে ভালোবাসা নিয়ে বেচে আছি তা যদি কেউ জানতো, কেউ বুঝতো।

মফরুদ আর আমি পাকসেনাদের থেকে একটা নিরাপদ দূরত্বে যেয়ে গুলি করার প্রস্তুতি নেই।বিশাল একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আমিই প্রথম গুলি ছুড়ি।একটার পর একটা গুলি।আমার হাত আগুনের ছিটায় জ্বলে যায় প্রায়, কিন্তু আমি গুলি ছুড়তে থাকি।পাকসেনারা প্রথমে বুঝতে পারেনি কোথা থেকে গুলি ছুটে আসছে। যখন বুঝতে পারলো সাথে সাথে তারা আমাদের দিকে গুলি ছুড়তে থাকলো।এভাবে কতক্ষণ গিয়েছিলো জানিনা।প্রতিটা মুহূর্তে মনে হচ্ছিলো এই বুঝি একটা গুলি এসে আমার বুকে লাগলো।কিন্তু আমার মনে কোন ভয় ছিলোনা।আজ হয়তো আমার এই সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে যাওয়ার দিন।তাতে কি?আমি নাহয় আকাশ থেকে এই বসুন্ধরাকে ভালোবাসবো।

আমি আর মফরুদ একসময় বুঝতে পারি আমাদের গুলি শেষ হয়ে যাচ্ছে।মফরুদ আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “দোস্ত আম্মারে অনেকদিন দেখিনা।এগুলারে মাইরা আকাশে যায়া আম্মার লগে দেখা করমু।খুদা হাফেজ”।
আমি তাকে বাধা দিতে পারিনি।বাধা দেয়ার সময় খেয়াল করলাম আমার পা দিয়ে রক্ত পড়ছে।ডান পায়ের উরুতে ভয়ংকর ব্যাথা।মফরুদ আরেকবার পিছন ফিরে তাকিয়ে বলে, “দোস্ত অনেক কষ্ট লাগতাছে।আমারে মনে রাখিস।তুই পালায়া যা।সবাইরে বলিস আমার কথা।যা ভাগ।দৌড়া।তোর জীবন অনেক দামী”।

আমি চুপ করে বসে ছিলাম।আমার মনে হচ্ছিলো আমি কেন যাচ্ছিনা।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম নিজেও জানিনা।জ্ঞান ফিরলো ভয়ংকর গুলির শব্দে।হয়তো এই শব্দের মাঝে আমার বন্ধু মফরুদের হারিয়ে যাওয়ার হাহাকার ছিলো।আমার তখন মাথায় কিছু আসছিলোনা।আমি অনেক কষ্টে একপায়ে ভর দিয়ে উঠে দাড়ালাম।অন্ধকারের মধ্যে কোন দিকে ছুটে গিয়েছিলাম জানিনা।একটা পুরনো বিল্ডিয়ের সিড়ি দিয়ে খোড়াতে খোড়াতে উঠলাম।সাদা জামা পড়া একটা মেয়ে আমাকে দেখে ভয়ে চিৎকার দিলো।আমি মেয়েটা যেই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম।আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় সেদিন শুরু হলো।

আমার যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমার পাশে একটা বৃদ্ধ লোক বসে আছে।আমার মাথায় কেউ একজন পানি দিয়ে যাচ্ছে।আমি চোখ খুললে কেউ একজন বললো, “এখন ভালো আছেন?”
আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি।ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি একদল নেকড়ে আমার মাংশ খুবলে খুবলে ছিড়ে নিচ্ছে।আমি ভয়ংকর চিৎকার করছি।কেউ সেই চিৎকার শুনতে পায়না।
আমি প্রায় দুমাস বিছানায় পড়ে ছিলাম।এই সময়টায় আমি হামিদ সাহেব নামে একজন হোমিওপ্যাথী ডাক্তারের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম।যে মেয়েটা আমাকে দেখে চিৎকার করেছিলো তার নাম ছিলো তাজিয়া।সে হামিদ সাহেবের মেয়ে।এই মেয়েটা আমাকে দেখলেই শুধু ভয় পায়।কেন পায় জানিনা।একদিন তাকে ডাকলাম।জিজ্ঞেস করলাম, “কি করো?”
মেয়েটা আমার দিকে তাকায় না একবারও।আমাকে আস্তে আস্তে বলে, “আমি কলেজে পড়তে চাই।স্কুল পাশ করেছি”।
আমি তার চোখে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে ভয় পান কেন?”
মেয়েটার মুখটা ভয়ে পাংশু হয়ে গেল যেন।আমাকে কিছু না বলে আমার ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।যাওয়ার আগে মনে হয় বললো, “কে বলেছে ভয় পাই?”

ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখ আমি আস্তে আস্তে হেটে জানালার কাছে গেলাম।আমাকে যে ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে সেখানে ঠিক পুব কোণে একটা ছোট্ট জানালা।নতুন কাঠের পরতা লাগানো।আমি জানালা খুলে আকাশের দিকে তাকাই।আমার পায়ে যে অংশে গুলি লেগেছিলো সেখানে এখনো প্রচন্ড ব্যাথা।আমার ভাগ্য ভালো যে গুলিটা আমার উরু ছুয়ে বের হয়ে গেছে।নাহলে হয়তো আজীবন পঙ্গু হয়ে যেতাম।
এসময় হামিদ সাহেব আমার রুমে এসে ঢুকলেন।আমাকে বললেন, “তুমি নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছো বাবা?”
আমি মাথা নাড়ি।তাকে জিজ্ঞেস করি, “দেশ স্বাধীন হলে কি করবেন?”
হামিদ সাহেব তার চশমা খুলে চোখটা মুছলেন।আমাকে বললেন, “একটা দেশ স্বাধীন করার থেকে তার স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।আমি অপেক্ষা করবো দেখার জন্য তোমরা তখন কি করে দেশটা চালাও”।
আমি মাথা নাড়ি।তিনি কি বললেন আমি সেটা ঠিকমত অনুধাবন করতে পারলাম বলে মনে হলোনা।হামিদ সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে আবারো বললেন, “বাবা আজাদ তোমাকে একটা কথা বলি।এই দেশটা কবে স্বাধীন হবে আমি জানিনা, আদৌ হবে কিনা তাও জানিনা।কিন্তু তোমার মত কিছু মানুষ যখন যুদ্ধে নেমে পড়লো, বুকের ভিতরের টগবগে ভালোবাসার সবটা দেশের জন্য দিয়ে দিলো তখনই আসলে একটা দেশ তৈরী হয়ে গেছে।আজ থেকে আরো এক হাজার বছর পরও এই দেশটা থাকবে।দেশ মাটির হিসাব দিয়ে, আয়তন দিয়ে তৈরী হয়না।একটা দেশ তৈরী হয় ভালোবাসায়।যতদিন তোমার মধ্যে এই ভালোবাসাটা থাকবে ততদিন এই দেশটা থাকবে।যেদিন এই ভালোবাসাটা মরে যাবে এই দেশটা ধ্বংস হয়ে যাবে”।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কেউ শুনতে পায়না।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল।আমি সারারাত জেগে রেডিও শুনেছিলাম।সেইসময় সমগ্র দেশে একটা ভয়ংকর আলোড়ন তৈরী হলো।যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার ঘোষণা শুনলাম আমি হামিদ সাহেবের বাড়ি থেকে নিচে নেমে আসলাম।যেই মাঠে আহমেদ ভাইকে কবর দিয়েছিলাম সেখানে খুড়িয়ে খুড়িয়ে পৌছালাম।আমার বন্ধু মফরুদের রক্ত এখানেই কোন এক ঘাসে ঢাকা ছিলো।আমি চিৎকার করে কাদতে কাদতে সেই রক্তের রঙ খুজে বেড়ালাম।একসময় ক্লান্ত হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লাম।আজকে আমার মন খুলে কাদার দিন।এখন আমি একটা দেশ পেয়েছি।এই দেশ কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা।এই দেশের জন্য বুকের গভীরে যে ভালোবাসা এটাও কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা।আমি পাগলের মত মাঠে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম আর কাদছিলাম।এই কান্না ভয়ংকর আনন্দের।প্রতিটা দিন, প্রতিটা সেকেন্ড একটা স্বাধীন দেশের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার এই আবেগ এই জাতি কখনো ভুলবেনা।আমি চোখ বন্ধ করে আমার বাবা মায়ের মুখটা কল্পনা করি।এই তো তারা আমার কত কাছে, অনেক কাছে।

সেদিন রাতে আমি হামিদ সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নেই।আমার সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়েছে।মনে হচ্ছে এই হাসি কখনো মুছবেনা।এখন আমি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে যাবো।বন্ধুদের খুজে বেড়াবো।আমার গ্রামে যাবো।আমার যে ছোট্ট একটা ঘর ছিলো, যেই ঘরে মা আমাকে প্রতিরাতে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিতো ছোটকালে সেই ঘরে আমি ফিরে যাবো।হামিদ সাহেব আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় বললেন, “বাবা তোমার জন্য আমার হাজার জীবনের দোয়া করলাম।তুমি একটা দেশ উপহার দিছো সেই তুলনায় আমি তোমাকে কিছুই দেয়ার যোগ্যতা রাখিনা।আমাদের বাবা মেয়েকে ভুলে যেওনা।নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে।মনে রেখো, ঠিক আছে?”

আমি মাথা নাড়লাম।আমি যখন সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিলাম, তখন তাজিয়া আমার পিছু নেয়।আমি দাঁড়িয়ে পড়ি।তাকে বললাম, “তুমি প্রতিরাতে আমার পাশে বসে থাকতে যখন আমার জ্ঞান ছিলোনা।আমি তখন কিন্তু তোমার উপস্থিতি অনুভব করতাম।তুমি যখন চামচে করে আমাকে খাইয়ে দিতে আমার সবসময় চোখ ভিজে যেত।আমার মা ছাড়া কখনো কেউ আমাকে এভাবে খাইয়ে দেয়নাই।কোন ভাষায় তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো তা জানা নাই।আমি তোমাকে কোনদিন ভুলবোনা।কোনদিন না”।
তাজিয়া চোখ মুছে বারবার।আমাকে লাজুক মেয়েটা আস্তে আস্তে বলে, “আপনার উপর না একটা মায়া পড়ে গেছে।আপনি আরো দুটা দিন থেকে যান না”।
আমি ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বলি, “দুদিন থাকলে কি হবে।চলে তো যেতে হবেই।আটকে রাখতে চাও?”
তাজিয়া আমার দিকে তাকায় না।মাথা নিচু করে পা দিয়ে সিড়িতে টোকা দিতে থাকে।একসময় বলে, “আমি আসলে স্বাধীনতা, যুদ্ধ অনেক ভালো বুঝিনা।আমি আপনার মুখে যখন যুদ্ধের কথা, স্বাধীনতার কথা শুনতাম তখনই শুধু বুঝতে পারতাম একটা কিছু হচ্ছে।অনেক বড় কিছু।আপনি যদি এখন হারিয়ে যান এত সুন্দর করে কেউ এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা বলবেনা।আমার আরো অনেক জানতে ইচ্ছা করে।এগুলো নিয়ে শুনতে ইচ্ছা করে”।

আমি অবাক হলাম কিছুটা।এই মেয়ে এত কথা কিভাবে বললো।আমি ওকে কিছু না বলে চলে গিয়েছিলাম।এর দু মাস পর নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে আমি তাজিয়াকে বিয়ে করি।

৪০ বছর পর আমি মন্ট্রিলে বসে যখন সংবাদপত্র পড়ছিলাম তখন পত্রিকার ঠিক ছোট্ট এক কোণে দেখলাম বাংলাদেশের পতাকার ছবি দেয়া আছে।নিচে লিখা, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ নামে ছোট্ট একটা দেশ অনেক রক্ত দিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা আদায় করেছিলো।এই দেশের মানুষ অনেক আবেগী এবং অলস।
আমি আজাদ করিম আজ থেকে ১০ বছর আগে যে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম তাকে ছেড়ে বিদেশ বিভুইয়ে দিন কাটাচ্ছি।আমার দুটা মেয়ে আর একটা ছেলে আছে।আমার চারটা নাতনীও আছে।আমি তাদের কাছে অনেক গর্ব করে আমার দেশের গল্প বলি।শুধু লজ্জা পাই যখন তারা জিজ্ঞেস করে, “আমাদের দেশের মানুষ যখন এই দেশটাকে এত ভালোবাসতো, রক্ত দিতে একটুও কার্পণ্য করেনি তাহলে আজ এসব কি হচ্ছে?”

আমি কেন দেশ ছেড়ে দিয়েছি তা তাদের বোঝাতে পারতামনা।এই অভিমান কেউ কখনো তাদেরকে বোঝাতে পারবেনা।আমি আমার স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প তাদের বলতে পারতাম না।আমি বলতে পারিনা রাজাকার বদির ভাই জমির উদ্দিন এখন সংসদে দেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে।আমি বলতে পারিনি এই দেশের সাধারণ মানুষরা আজকাল প্রায়ই ১৬ বছরের মিলনকে চোখের পলকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে মেরে ফেলে। আমি বলতে পারিনি এই দেশের এক মা তার সদ্য জন্মানো সন্তানকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিলো।এটাও বলতে পারিনি, যে এই দেশে এখন ছোট্ট ছোট্ট শিশুগুলো ভাত না খেতে পাওয়ার অভিমানে আত্নহত্যা করে।

আচ্ছা আপনাদের বলি, তবুও এই দেশটাকে আমি ভালোবাসি।আমি আমার পরবর্তী প্রত্যেকটা প্রজন্মকে এই দেশের জন্য আমার ভেতরে যে ভয়ংকর ভালোবাসাটা ছিলো সেটা গেথে দিয়ে যাবো।আমি আজও মনে একটা কথা লিখে রেখেছি, দেশ ভূমির মাপ দিয়ে হয়না।দেশ হয় ভালোবাসায়।এই ভালোবাসাটা যতদিন অন্তত একটা মানুষের মনে বেচে থাকবে, ততদিন এই দেশটা বেচে থাকবে।
*************************************************************

প্রিয় দেশ, এই লেখাটা তোমার জন্য।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29494612 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29494612 2011-12-02 00:41:06
একজন আমি - আমার অন্ধকার জগত ইফতি কিছু বলে না।আমার হাতে একটা চেরী ফল ধরিয়ে দেয়।আমি হাসি এবং একটা ছোট্ট কামড় দেই।কেমন যেন গন্ধ গন্ধ লাগে, তবুও খেয়ে ফেলি।আজ সকালে আমার নাস্তা করা হবেনা।হা্তে একটা পয়সাও নেই।আম্মা চিটাগাং থেকে কাল ফোন করেছিল।বলেছে আব্বুর এক্সিডেন্ট হয়েছে একটা ছোটখাটো।এখন আম্মুর হাত খালি, তাই একটু কষ্ট করে যেন ম্যানেজ করে নেই।আমি আম্মুকে অনেক উৎসাহ নিয়ে বলি, “কোন সমস্যা নাই মা।আমি সব ম্যানেজ করে নিবো”।

ইফতি আমাকে আরো দুটা চেরী খেতে দেয়।আমি একটা খেয়ে আরেকটা রেখে দেই।পরে ক্লাস করে এসে ক্ষুদা লাগলে খাবো।ও আমাকে বলে, “দোস্ত আজকে ক্লাস করবোনা”।
আমি অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করি, “আজকে কি ইমার সাথে ডেটিং আছে?”
ইফতি খেক খেক করে হাসে।আমাকে বলে, “ইমা আমার সাথে আজকাল ভালোভাবে কথাও বলেনা বুঝলি।কত রিকোয়েস্ট করছি আজকে দেখা করার জন্য!”
আমি ইফতিকে বলি, “সমস্যা নাই দোস্ত।আরেকটা গার্লফ্রেন্ড বানায় ফেল”।

ইফতি আমার কাধে একটা বাড়ি দেয়।ওর কোন শব্দ পাইনা আর ঘরে।আমি বুঝতে পারি ও আর রুমে নেই।আমি আস্তে আস্তে জানালার ধারে হেটে যাই।আমার রুমের জানালার পাশে একটা আম গাছ আছে।আমি প্রতিদিন যখন ইফতি থাকেনা আম গাছের পাতায় হাত বুলাই।আমার মনে হয় গাছটা আমাকে ভালোবাসে।আমি যখনই গাছটা ছুয়ে দেই তখনই একটা ঝিরঝিরে হাওয়া বয়ে যায় আমার চারপাশে।আমি মুগ্ধ হয়ে তাতে আশেপাশের সব কিছুর গন্ধ নেই।আমার মনে হয় চারদিকে অনেক অনেক আলো।এই আলো আমার অনেক ক্লান্তিকর জীবনটাকে অনেক সহজ করে দেয়।

আমার বন্ধু ইফতির কথা আপনাদেরকে বলি।ইফতি ছোটকালে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবে হাটার ক্ষমতা হারিয়েছে।আমি প্রায় সময় শুনি ও রাত্রেবেলা কাদে গুটুর গুটুর করে।একদিন তো বিশাল কান্নাকাটি।আমি খুব মন খারাপ করে পাশে বসে ছিলাম।ওর কাধে হাত দিয়ে বলেছিলাম, “দোস্ত কাদিস কেন?কি হইছে?”

আমাকে ও বললো, “আজকে ইমা আমাকে বলে ওর ফ্যামিলি নাকি আমাকে কোনদিন পছন্দ করবেনা।আমাকে নাকি ওর বাসায় ল্যাংড়া বলে ডাকে।ও এইরকম কাউকে বিয়ে করতে পারবেনা”।

আমি ইফতিকে কিছু বলতে পারিনি সেদিন।কি বললে ওর কষ্ট কিছুটা কমতো আমি জানিনা।ইমার সবচেয়ে পছন্দের খাদ্য হলো চেরী ফল।আমাকে একদিন ও ইমার সাথে দেখা করতে নিয়ে গিয়েছিলো।মেয়েটার কন্ঠটা কি মিষ্টি লাগলো।আমি সেদিন ইফতির উপর বেশ ঈর্ষা বোধ করেছিলাম।ইমা অবশ্য আমাকে পছন্দ করেনি একদম।আমাকে বেশিরভাগ মানুষ পছন্দ করেনা।আমি জানিনা কেন পছন্দ করেনা।তবে আমার খুব ইচ্ছা করে প্রতিটা মানুষকে দেখতে।মানুষ দেখতে নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর।সবচেয়ে বেশি লোভ জাগে নিজেকে দেখতে।আমি কি দেখতে ভালো?আমাকে কি কোন এক মানবী একটাবারের জন্যও অপলক চোখে দেখে?এই প্রশ্নগুলো নিজের মনে যখন আসে তখন মনে হয় আমি খুব একা।আমার চারপাশের অন্ধকার জগতের মাঝে আমি আরো বিলীন হয়ে যাই।

রুম থেকে যখন বের হয়ে ক্লাস যাবো ভাবছিলাম ঠিক তখন মনে পড়লো আজকে আমার একটা পরীক্ষা আছে।জুনিয়র ব্যাচের একটা ছেলেকে প্রতিমাসে আমি কিছু টাকা দেই আমার হয়ে পরীক্ষায় লিখে দেয়ার জন্য।পরীক্ষার আগের রাতে তাকে ফোন করে ম্যানেজ করে নিতে হয়।ছেলেটার নাম সজীব।ছেলেটা আমাকে পছন্দ করেনা কারন আমি ওকে খুব বেশি টাকা দিতে পারিনা।মাসে ১ হাজার টাকার থেকে বেশি কিছু দেয়ার সামর্থ আমার নেই।প্রতিবার যখন টাকাটা মাসের ৫ তারিখে ছেলেটার হাতে বুঝিয়ে দেই তখন সে প্রায়ই বলে, “ভাই পরের মাসে কিছু বাড়ায়া দিয়েন।আপনে তো প্রতি সপ্তাহে দুই তিনটা কইর্যা পরীক্ষা দেন”।
আমি কাচুমাচু হয়ে বলি, “চেষ্টা করি ভাইয়া।দেখি পরের মাসে কি করতে পারি”।

আজকে ক্লাসে যাওয়ার আগে আমাকে ফোন করতে হয় শুভকে।শুভ আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু।কারণ ও আমাকে কখনো করুণা করেনা, আমাকে আড়ালে কানাবাবা বলে ডাকেনা।ও আর আমি একই ডিপার্টমেন্টে পড়ি।তাই ক্লাসের আগে ওকে আমি ফোন দেই।ও আমাকে রাস্তা পার করে ভার্সিটিতে নিয়ে যায়।আমি শুভর প্রতি কৃতজ্ঞ।আমার সবচেয়ে সুন্দর সময় কাটে ক্লাস শেষ করে যখন আমি আর ও একসাথে বসে চা খাই।ও আমার সাথে রাজ্যের নারীঘটিত আলাপ করে, কার সাথে কখন প্রেম করলো সব জানায়।আমি চুপ করে শুনি, মাঝে মাঝে হুম হুম বলি।আমারো তখন অনেক প্রেম করতে ইচ্ছা করে।আমি একটা উদ্ভট কথা প্রায়ই ভাবি।এমন যদি হতো, আমাদের সাথে একটা আমার মতই দৃষ্টিশক্তিহীন মেয়ে পড়ে।তাহলে হয়তো, আমাদের মধ্যে অনেক প্রেম প্রেম হতো।কিন্তু এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছেনা।পাঠক হয়তো ভাবছেন, আমার মত অন্ধ লোকের এত প্রেম করার শখ কেন?তাদের জন্য বলি, প্রেম সবার জন্য।আপনাদের কাছে আমি হয়তো একজন কানাবাবা ছাড়া আর কিছুই না।কিন্তু আমার মনটা অন্ধ না।আমার মন ভালোবাসা দেখতে জানে।আমার বাবা মা আমাকে মনে হয় তেমন একটা ভালোবাসেনা, আমার কাছের মানুষরা আমাকে একটু কেমন যেন এড়িয়ে চলে।আমি যখন ভালোবাসা জিনিসটা বুঝতে শিখেছি তখন থেকে মনে হতো, আমাকে কেউ ভালোবাসেনা কেন?অথচ আমার কত ইচ্ছা করতো আমার মা বাবা আমাকে অনেক আদর করুক, মাথায় হাত দিয়ে বলুক, “এটা আমাদের ছেলে”।

অবশ্য আমি আমার বাবা মায়ের আসল ছেলে না।তাই আমাকে একটু অবজ্ঞা করবে এটাই স্বাভাবিক।আমার তখন বয়স ছয় বছর।আমার বাবা আর মায়ের মধ্যে তুমুল ঝগড়া তখন।আমি ভয়ে ঘুম ভেঙ্গে উঠে আমার ঘরের দরজার কাছে যাই।আমি শুনতে পাই বাবা বলছে, “এতিমখানা থেকে আর কাউকে পাইলানা, একটা ল্যাংড়া কানা বাচ্চা ধরে নিয়ে আসছো”।

আমার মা কাদে।বাবাকে বলে, “আমাদের তো কোন ছেলে মেয়ে হচ্ছিলোনা।আমি কি জানতাম এই নিষ্পাপ শিশুর চোখ আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাবে?”

বাবা গজগজ করে কি যেন বলে।এর কিছুদিন পর আমার মায়ের কোলজুড়ে একটা নতুন জীবন পৃথিবীতে আসে।তাই বাবা চাইতেননা আমি তাদের সাথে থাকি।আমার মা আমাকে একটু একটু ভালোবাসতো তাই ফেলে দেয় নাই।অবশ্য আমার বোন হওয়ার পর মা আমাকে মাঝে মাঝে অনেক মারতেন।একদিন আমি আমার ছোট্ট বোনের নাকে হাত দিয়ে দুষ্টুমি করছিলাম।মা দেখে অনেক মারে।আমাকে বলে, “খবরদার আমার বাচ্চার কাছে আসবিনা”।

আমি আর কখনো তিতিনের কাছে যাইনি।তিতিন অবশ্য আমাকে অনেক ভালোবাসে।ও আমাকে দেখলে আমার চুল ধরে টানে।মেয়েটা বড় হয়ে গেছে, তবুও এখনো এমনই করে।ওর সব বন্ধু বান্ধবীদের সাথে আমার পরিচয় করায় দেয়।অনেক আদর করে বলে, “এই দেখ, এই সুইট ছেলেটা আমার ভাইয়া।ভাইয়া একটা হাসি দিয়ে দেখাতো”।

আমি লজ্জা পাই, তবুও হাসি।তিতিন ওর বান্ধবীদের বলে, “যারা আমার এই সুইট ভাইয়ার সাথে প্রেম করবি হাত তোল”।

আমি জানিনা কেউ হাত তোলে কিনা।প্রায় মনে হতো, একবার জিজ্ঞেস করি তিতিনকে কেউ হাত তুলেছিলো কিনা।জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনো।
আমি আমার মা বাবার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।তারা আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন।এটা ঠিক আমাকে কেন যেন আমার স্কুল কলেজের শিক্ষকরা অনেক ভালোবাসতেন।আমি অন্য সাধারণ ছাত্রদের মত পরীক্ষা দিতাম।আমাকে শুধু একটু খাতাটা গুছিয়ে দিতে হতো।আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল আপার কাছে যেদিন আমার বাবা নিয়ে গিয়েছিলো সেদিন তিনি বলেছিলেন, “ছেলে পারবে তো?”

বাবা বলেন, “সব পারে আপা।S.S.C তে অপশনাল সহ ৪.৭৫ পেয়েছে।ক্লাসে স্যারদের কথা শুনে শুনে লিখতে পারবে খাতায়।একটু যদি সহযোগিতা করতেন তাহলেই হয়।ছেলে কালকে থেকে কান্নাকাটি করছে কলেজে ভর্তি করানোর জন্য।“

প্রিন্সিপাল আপা আমাকে ভর্তি করিয়েছিলেন।আমার যেদিন H.S.C এর রেজাল্ট দিলো তখন সারা দেশে মাত্র কয়েকজন 5.00 পেয়েছিলো।আমি তাদের মধ্যে একজন ছিলাম।আমাদের কলেজে একমাত্র ফাইভ।আপা আমার বাসায় এসে পড়েছিলেন।আমাকে ডেকে জড়িয়ে ধরে কেদে বললেন, “বাবারে তুই অনেক বড় হ।আমার যদি সামর্থ্য থাকতো আমি আমার চোখ দুইটা তোকে দিয়ে দিতাম।আমি তোর জন্য অনেক দোয়া করবো”।

আমার অনেক কান্না পেয়েছিলো সেদিন।আম্মু আব্বু আমাকে ওইদিন জীবনে প্রথমবার অনেক আদর করেছিলো।আমাকে একটা জামা কিনে দিয়েছিলো।রাতে আমি সেই জামা পড়ে এক রুম থেকে আরেক রুমে হেটে হেটে গান গাইছিলাম।আমার বোন আমাকে দেখে শুধু হাসছিলো।আমি ওর কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “তিতিনমণি আমার জামার রঙ কি?”
তিতিন বলে, “লাল রঙ ভাইয়া”।

আমি ধপ করে সোফায় বসে পড়ি, অনেক কাদি। আমার নষ্ট চোখ দিয়ে পানি পড়ে।তিতিনকে বলি, “আমার খুব এই রংটা দেখতে ইচ্ছা করে।আমাকে কেউ দেখতে দেয় না কেন?লাল রঙ কেমন?”

তিতিনমণি সারা রাত আমার হাত ধরে কাদছিলো।সেদিন আমি অনেক অনেক মন খারাপ করেছিলাম।আমি আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি আমাকে জীবন দিলে, কিন্তু জীবনের রংটা দেখতে দিলেনা কেন?”

শুভ যখন আমাকে ক্লাসে নিয়ে গেল তখনও স্যার ক্লাসে আসেননি।আজকে হ্যামলেট পড়ানো হবে।কিছুদিন আগে ওথেলো পড়ানো হয়েছিলো।আমার সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস “আ ফেয়ারওয়েল টু দ্যা আর্মস”।আমাকে এই বইটার অডিও উপহার দিয়েছিলো আমার স্কুল জীবনের বন্ধু অনিক।অনিক কিছুদিন আগে কক্সবাজারে ঘুরতে যেয়ে হারিয়ে যায়।ওকে আর কেউ খুজে পায়নাই।ও সমুদ্র দেখতে যাবার আগে বলেছিলো, “দোস্ত তোরে একদিন সাগরে নিয়ে যায়া স্রোতের ধাক্কা খাওয়াবো।জীবনে আর কিছুই চাইবিনা তাহলে”।

আমি বলি, “আচ্ছা”।

ক্লাসে আমাকে করুণা করে মনে হয় সবাই সামনে বসতে দেয়।আজকে শুভ আমাকে ক্লাসে দিয়ে চলে যাচ্ছিলো।আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই চলে যাস কেন?”
শুভ বললো, “ক্ষুদা লাগছে দোস্ত।আজকে নীরবে যামু কয়েকজন মিল্যা।তুই মন দিয়া ক্লাস কর।আমারে রাত্রে বুঝাবি যা ক্লাসে পরাইছে”।

আমি হাত নেড়ে ওকে বিদায় দেই।আমার চোখে আজকে সকাল থেকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।পানি এসে জমা হয়ে যাচ্ছে।যত পানি মুছি তত বেশি যন্ত্রণা বাড়ে।এই যন্ত্রণার মধ্যে একটা খুব সন্দর কন্ঠ শুনতে পেলাম।আমার অনেক কাছ থেকে কন্ঠটা আসছে।বুঝতে পারলাম, মেয়েটা ইতি। ইতি খুব সুন্দর একটা পারফিউম ব্যবহার করে।আজকে মনে হয় ও আমার পাশে বসেছে।ইতি মেয়েটাকে আশেপাশে দেখলে আমার মধ্যে কেমন কেমন যেন একটা লাগে।আমার মনে হয় এটা মেয়েটা বুঝতে পারে।ও আমাকে অবশ্য পাত্তা দেয়না।একদিন সাহস করে একটা কলম চেয়েছিলাম।ও অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি লিখতে পারো?”
আমি খুব বিব্রত বোধ করেছিলাম।প্রায়ই মানুষজন আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি তাদের মত নই।আমি ইতিকে বলেছিলাম, “ভুলে চেয়েছি।আমি আসলে লিখতে পারিনা”।

ইতি আমাকে অবশ্য কলম দিয়েছিলো।আমি ক্লাস শেষে যখন ওকে কলম ফেরত দিতে গেলাম তখন ও আমাকে স্যরি বললো।আমার এতে আরো খারাপ লেগেছিলো।এরপর থেকে ওর সাথে আর কখনো একটিবারের জন্যও কথা হয়নি।একদিন শুভকে বলে ফেলেছিলাম, ইতিকে আমার অনেক ভালো লাগে।শুভ খুব সুন্দর করে সেটা ইতিকে জানিয়ে দিয়েছিলো।ইতি এরপর আমাকে দেখলেও এড়িয়ে যেত মনে হয়।আমিও ওর আশেপাশে যেতামনা।
আজকে ক্লাস শেষে যখন চলে যাচ্ছিলাম ইতি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, “তুমি কি এখন লাঞ্চ করবা?”
আমি মাথা নাড়ি।ও নিজে থেকেই আমাকে বললো, “আজকে আমার জন্মদিন।আমি যদি আজকে তোমাকে লাঞ্চ করাতে চাই তুমি রাগ করবে?”
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না।মুখ দিয়ে হুম জাতীয় আওয়াজ করে বুঝাতে চাইলাম, “কোন সমস্যা নাই”।

ইতিকে নিয়ে যখন লাঞ্চ করতে গেলাম তখন ক্যান্টিনে কোন খাবার ছিলোনা তেমন।ইতি আমাকে বললো, “তোমার জন্য একটা পিৎজা নিয়ে আসি?”
আমি মাথা নাড়ি।যদিও ভার্সিটির পিৎজা আমার একদম ঘিন্না লাগে খেতে, কিন্তু ওকে তো এই অবস্থায় এটা বলা যাবেনা।আমি চুপ করে বসে থাকি।ও আমাকে বললো, “তুমি কি আমাকে পছন্দ করো?”
আমি একটা ধাক্কা খেলাম।কিছু না বলে ভাব করলাম এমন যেন কিছু শুনতে পাইনি।ইতি আমাকে বললো, “আচ্ছা তোমাকে কিছু বলতে হবেনা।লজ্জা পাচ্ছো কেন এত?”
ইতি কেন যেন অনেক হাসতে লাগলো।আমাকে ফিসফিস করে বললো, “আমাকে কেউ কখনো ভালবাসেনি জানো?”
আমার মনে হলো মেয়েটার মন খারাপ।আমি তাকে কি বলবো জানিনা।আমার মাথায় এত বুদ্ধিও নেই কিছু বানিয়ে বানিয়ে বলে তার মন ভাল করে দেয়ার মত।আমি আমতা আমতা করে বললাম, “মন খারাপ হওয়া ভালো না।হার্টে সমস্যা হয়”।
ইতি আবারো হাসে।আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আমাকে তোমার কি অনেক সুন্দরী মনে হয়?”
আমি অসহায় বোধ করি।ওকে বলি, “আমি জানিনা ইতি।তুমি কেন এমন করছো?”

ইতি কিছুক্ষণ চুপ করে বললো, “আমাকে যেদিন শুভ বললো তোমার আমাকে অনেক ভালো লাগে তখন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম।আমার কখনো মনে হয়নি আমাকে কেউ ভালোবাসতে পারে”।
আমি বললাম,” তুমি ভাল মেয়ে তো! কেন কেউ ভালোবাসবেনা?”
ইতি কেমন করে যেন বললো, “আমি দেখতে অনেক কালো তো, তাই আমাকে কেউ ভালবাসেনা।একটা ছেলেকে অনেক ভালবাসতাম।কালকে রাতে সে আমাকে একবারও উইশ করেনাই।আমি তাকে নির্লজ্জের মত ফোন দিয়েছিলাম।তাকে কিছু বলার আগেই সে জানালো অনেক ব্যস্ত আছে।আসলে জানো, ও এখন একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে।মেয়েটা অনেক কিউট”।

আমার অনেক মন খারাপ হলো।কেন যেন মনে হলো তাকে বলি, তুমি আরো অনেক কিউট।কিন্তু আমি বলতে পারলাম না।পিৎজায় একটা কামড় দিয়ে বললাম, “তুমি অনেক ভালোবাসো ছেলেটাকে?”
ইতি কি সুন্দর করে হাসলো।আমি দেখতে পাইনা তবুও ওর হাসির আওয়াজ শুনে অনেক অনেক ভালো লাগলো।আমি কি তাকে বলবো যে প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে আমি পারফিউম ব্যবহার করি একটা।পারফিউমটার গন্ধ ঠিক ওর গায়ে দেয়া পারফিউমের মত।আমি কতরাত মনে মনে ওর হাত ধরে বলেছি, ভালোবাসি।আমি কতদিন বৃষ্টির ঝাপটায় নিজেকে সিক্ত করেছি শুধু তাকে অনুভব করতে।ও তো অনেকটা বর্ষার মন খারাপ করা বৃষ্টির মত।ওটা আমাকে ছুয়ে দিয়ে যায় সব উষ্ণতা মুছে দিয়ে।আমি সেই বৃষ্টিকে অনেক ভালোবাসি, নিজেকে উজাড় করে দেই সেই শীতল জলস্পর্শে যার প্রতিটি ফোটায় আমি পুলকিত হই।আমি অনুভব করতে পারি পৃথিবীর প্রতি আমার গভীর ভালোবাসাকে।

প্রিয় ইতি, তোমাকে কথা দিচ্ছি সেই বৃষ্টির থেকেও আমি তোমাকে বেশি ভালোবাসবো।আফসোস এটা তাকে বলার মত অধিকার আমি রাখিনা।
ইতি যখন আমাকে আমার হলে নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছিলো তখন আবার সে একটা বিব্রতকর প্রশ্ন করলো।আমাকে বললো, “আচ্ছা অর্ক তোমার কি আমার জন্য অনেক ভালোবাসা?”
আমি মাথা নিচু করে হাসি।তাকে দুষ্টুমি করে বলি, “হা অনেক তো”।
ইতি আমার গালে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলে, “তুমি অনেক মিষ্টি একটা ছেলে।তোমার সাথে প্রেম করবো।করবা?”
আমি সেদিন নিস্তব্ধ থেকেছিলাম।শুধু মাথা নাড়িয়ে সাহস করে তার হাতটা ধরেছিলাম।আমি অনুভব করেছি আমার ভালবাসার স্পর্শে তার কেপে কেপে ওঠা।আল্লাহ যদি আমাকে একটু দেখতে দিতো, আমি সবার আগে আমার ভালোবাসার এই মানবীকে দু চোখ ভরে দেখতাম।তার চোখ দুটো একটাবার ছুয়ে দিতাম।তাকে বলতাম, “আজকের এই পৃথিবী শুধু তোমার আমার”।

পরের একটি বছর আমার জীবনে শুধু ইতি আর আমি, আমি আর ইতি।ও প্রতিদিন আমাকে নিয়ে ক্লাসে যেত।আমার বন্ধু ইফতি আমাকে এজন্য প্রতিদিন অনেক টিজ করতো।শুধু ইফতি না আমার আরো কিছু বন্ধু আমাকে নিয়ে দুষ্টুমি করতো।আমি কিছু বলতাম না।আমরা একটা মহাকালের কাহিনী লিখতাম।আমি যা লিখতাম তাতে ইতি থাকতো সবগুলো পাতা জুড়ে।ও সবসময় আমার হাত ধরে থাকতো।ক্লাসে আমার পাশে কাউকে বসতে দিতোনা।আমি ওকে মাঝে মাঝে রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা শোনাতাম।জীবনানন্দের কবিতা আমার খুব প্রিয়।প্রাণের কবির একটি একটি করে কবিতা ও আমাকে যখন শোনাত তখন মনে হত, এত ভালোবাসার আলো কেন চারদিকে। আমি দরিদ্র ছিলাম তাই ওকে কিছু কিনে দিতে পারিনি তেমন।তবে একদিন টাকা জমিয়ে একটা নুপূর কিনে দিয়েছিলাম।ও নুপূর পড়ে আমার সামনে এসে রিনঝিন আওয়াজ করতো।আমার তখন যে অনুভূতি হতো তা হয়তো কাউকে বোঝানো যাবেনা।কষ্ট একটাই ছিলো, ইতি কখনো আমাকে বলেনি সে আমাকে ভালোবাসে।আমি জানিনা সে বাসতো কিনা।জানতে ইচ্ছাও করেনাই।যদি এমন কিছু শুনি যে আমার মনটা ভেঙ্গে যায়, তবে তো সব হারালাম।

একদিন ইতির অনেক মন খারাপ।আমি চুপ করে তখন টি.এস.সিতে বসে বসে বাদাম খাচ্ছিলাম।ইতি আমাকে বললো, “তোমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়না কেন আমার মন খারাপ?”
আমি ওকে বললাম, “তুমি হয়তো বলবানা, তাই কিছু জিজ্ঞেস করছিনা”।
ইতি বলে, “আমার মন খারাপ কারণ কাল ও আমাকে ফোন করেছিলো।আমাকে বললো, সে আমাকে ভালোবাসতে চায়”।
আমি একটা ধাক্কা খেলাম।ওকে কি বলা উচিত ভাবছিলাম।তার আগেই ও বললো, “আমি ওকে কি বলবো অর্ক?”
আমার গলা তখন শুকিয়ে গেছে।অনেক কান্না পাচ্ছে। তবুও আমি ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললাম, “ওর কাছে যাও।ওকে আগে জিজ্ঞেস করে নিয়ো, ও তোমাকে ভালোবাসবে তো সবসময়?”
ইতি কাদে। আমাকে বলে, “আমাকে ও কত কষ্ট দিছে তুমি জানো।প্রতিটা রাতে আমি ছেলেটার জন্য কাদি।ও আমাকে এতদিন পরে ভালোবাসার কথা বলে কেন?আমি যে এত্তগুলা কষ্ট পাইলাম সেটা কে দেখবে?”
আমি হেসে বলি, “তুমি বিয়ে করে ওকে কাদিয়ো।ঠিক আছে?”

একদিন ইতির বিয়ের দিন।সেই বিশেষ দিনে আমি আর মনমরা ইফতি হলের ছাদে উঠে বসে আছি।ইফতি আমাকে বলে, “দোস্ত ইমাকে ফোন দিছিলাম আজকে।ও আমাকে গালাগালি করলো।আমি ওকে কি করে বুঝাবো যে তাকে ভুলা সম্ভব না?”
আমি ইফতির উপর রাগ করি।ইমার বিয়ে হয়ে গেছে তিনমাস হলো।ইফতির তো মেয়েটাকে ফোন করা উচিত না।আমি ওকে রাগত স্বরে বলি, “তুই ছ্যাচড়ার মত করিসনা।ওর বিয়ে হইছে।আর ফোন দিবিনা”।
ইফতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তুই বুঝবিনারে গাধা।মাঝে মাঝে মনে হয় শ্বাস আটকায় আসতেছে।ওর গলা না শুনলে মরেই যাবো।শালার ভালোবাসা! জীবনটা হেল কইর‍্যা দিলো”।

আমি ইফতির কথা শুনিনা।আমি ইতির কথা ভাবি।আমি কেন এত গাধা ছিলাম! আমার মত দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষকে ইতির মত চমৎকার একটা মেয়ে কেন ভালবাসবে?আমার চারপাশে এত অন্ধকার যে আমি সেখানেই বারবার হারিয়ে যাই।এমন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ভালোবাসতে নেই।

হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হলো।আমি বৃষ্টির ঝাপটায় নিজেকে যখন মেলে ধরলাম তখন একটা আশ্চর্য অনুভূতি হলো।আমার মনে হলো আমি যেন দেখতে পাচ্ছি আশেপাশের জগতটাকে।আমাদের মাথার ওপর নাকি একটা বিশাল চাঁদ আছে, সেই চাদের রঙ রুপালী।সেই চাঁদ মাঝে মাঝে স্বর্গকে আমাদের মাঝে এনে দেয়।আমরা স্বর্গকে নিজ হৃদয়ে ধারণ করি, তাতে বসবাস করা জোৎস্নার আলোয় নিজেকে আবিষ্কার করি।আজকে হয়তো সেই জোৎস্নাকে আমি দেখতে পাচ্ছি।আমি মনে মনে ইতির জন্য কবিতা সাজাই,

আজকের চাঁদ তোমার আমার তাতে জমে থাকা সবটুকু আলো আমাদের ভালোবাসার গল্প বলে তাদের স্নিগ্ধ রুপালী আলোয়

আমি ইতিকে সেই রুপালী আলোর গল্প বলতে চেয়েছিলাম।আমি সেই রুপালী আলো দেখতে পাইনা, কিন্তু তাকে অনুভব করি আমার অন্তরে।আজকের এই বৃষ্টিঝরা গভীর রাতে কেউ ভালোবাসার গল্প লিখুক আর না লিখুক, আমি ইতির জন্য লিখবো।শুধু লিখবো, “প্রিয় ইতি সুখে থাকো, ভালো থাকো”।

************************************************************

তাদের ভালোবাসার কথা কেউ লিখেনা, আমি লিখলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29483917 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29483917 2011-11-15 20:01:16
তাহার কথা
প্রিয় পাঠক, আজকে একটা বিশেষ দিন।আমি আজ জীবনে প্রথম পাত্রী দেখতে যাচ্ছি।আমার সাথে আমার এক দুঃসম্পর্কের খালা আছে, মামাতো ভাই দীপুও আছে।যেই মেয়েটাকে দেখতে যাচ্ছি তার নাম মিতু।তানজিয়া আফসিন মিতু।কিন্তু তাকে আমার কাজিন দীপু মিতু বেগম বলে ডাকে।আমার কোন যায় আসেনা।সত্যি বলতে বিয়ে করার কোন ইচ্ছা আমার ছিলোনা।জোর করে দেয়া হচ্ছে বলা যায়।ঢাকায় আমি একটা ব্যাচেলর মেসে থাকি উত্তর হাউজ বিল্ডিং এ।২ বছর আগে তড়িৎ মিস্তিরী হয়েছি।এখন ছোটখাট একটা চাকরী করছি নিতান্তই পেট চালানোর দায়ে।আমাকে যখন আমার প্রিয় আফিয়া খালা কান ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “বিয়ে করবিনা কেন?”
আমি হাসতে হাসতে বললাম, “খালা দুদিন আগে একটা ছ্যাকা খাইছি।বিয়া করতে মন চায় না।“
খালা মুখ বেকিয়ে বলেন, “মেরে ছাতু বানায় দিবো ফাজিল ছেলে।এইভাবে মেসে থাকতে থাকতে তোকে জংলী জংলী লাগে।দীপুর একটা বন্ধু আছে মিতু নামে। ওই মেয়ের জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে।মেয়ের পরিবার খুব ভালো।আমি মেয়ের ছবি দেখে মুগ্ধ।একেবারে ৬০ দশকের সুচিত্রা সেন আপার মত”।
আমি চোখ বড় বড় করে বলি, “খালাজান আমাকে এমন পুরান আমলের নায়িকার সাথে বিয়ে দিয়েন না”।
খালা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, “প্রবলেম নাই ডিয়ার। তোর জন্য আমি ময়ুরীর মত একজনকে ঠিক করে রেখেছি।দিনে রাতে তোরে আছাড় মারবে, কি মজা তাই না?”
আমি হাসি, পাশ দিয়ে আমার খালাতো বোন অভিনয় করে দেখায় কিভাবে আমাকে আছাড় মারা হবে।

বয়স আর কতইবা হলো, মাত্রই তো ২৫। এখনই বিয়ে করতে মন চাচ্ছিলোনা।কিন্তু কাছের মানুষের দাবী মানতে হবে, তাই তাদেরকে হা বললাম।আজকে উত্তরার ৪ নং সেক্টরে বাস করা বিশিষ্ট মিতু বেগমকে দেখতে সবাই যখন রওনা দিলাম আমার মনে একটা ভয় ভয় কাজ করছিলো।আমি বারবার ভাবছিলাম, যদি মেয়ের পরিবার আমাকে পছন্দ না করে।এই দুঃখ তখন রাখবো কোথায়।একথা বুঝতে পেরেই আমার কাজিন দীপু আমাকে বলে হয়তো, “কুল ডাউন ব্রো।মেয়ে খুবই ভালো।তার সামনে ব্যাং এনে দিলেও সে হাসিমুখে বলবে, বাহ সবুজ রঙের জামাই কতজন পায়?কি সুন্দর করে মুখ ফুলিয়ে ডাকে”।

আমি হাসি।আর ভাবি আমার মায়ের কথা।মায়ের মুখটা একটুও আমার স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়নি,যেমনটা হারিয়ে যায়নি মায়ের স্নেহমাখা হাতের চিড়া, দুধ আর কলা মাখানো স্বর্গান্নের কথা।আমার বাবা আমার মাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন, এতোটাই বেশি যে মা কখনো আমার বাবাকে ছেড়ে তার নানুবাড়িতেও যেতে চাইতেন না।কোন একদিন দুপুরবেলা মা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেন।আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে বললেন, “আমার ছেলেটা কি অনেক কষ্ট পাবে তার মা হারিয়ে গেলে”।
আমি বাচ্চা মানুষ কিছু না বুঝে ভ্যাক ভ্যাক করে কেদে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, “কোথাও যেতে পারবেনা”।

মা আমার কান্না শুনেনি।তার পরদিন মা হঠাৎ করে হারিয়ে যায়।দুদিন ধরে সব জায়গায় খোজা হয়েছিলো।কোথাও যখন পাওয়া যাচ্ছিলোনা, তখন হঠাৎ করে আমাদের বাড়ির পাশের শান বাধানো পুকুর ঘাটে পচা গন্ধ আসতে থাকে।আমার মাকে খুজে পাওয়া যায়।

মাকে যখন পুকুর থেকে টেনে তোলা হয় তখন আমার বাবা মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।তাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিলো শিকল দিয়ে বেধে।একমাস পর যখন বাবা একটু শান্ত হোন তখন তাকে ঘর থেকে বাহিরে বের করা হয়।আমি বাবার পাশে বসে থাকতাম শান্ত ছেলের মত।বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর বলতেন, “তোর মা আমাকে খুব যন্ত্রণা করে।দিন নাই রাত নাই একটু পরপর সামনে এসে বলে, আমার বাবুর কি হবে?তুমি ওরে দেখবা তো?”

আমি চুপ করে বাবার কথা শুনতাম, ওভাবে কিছু বুঝতামনা।বাবা একদিন যখন হারিয়ে যান তখনও কিছু বুঝিনি।বাবা শুধু গভীর রাতে আমাকে ডেকে তুলে বলেছিলেন, “বাবু তোর মা মেঘনা পারের এক চরে লুকিয়ে আছে।আমাকে ডাকে।আমি যাই?”

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলে বাবা চলে যায় কাউকে না বলে।আমি অপেক্ষা করতাম বাবার জন্য। খেতাম না, পড়তাম না।বাবা আর মাকে চিৎকার করে ডাকতাম।রাতে যখন ঘুমাতে ভয় পেতাম তখন গুটিগুটি পায়ে হেটে পুকুরঘাটে যেয়ে মাকে ডাকতাম আর বলতাম, “মা আসি, মা আসি?”
এভাবে একটা ভয়ংকর সময় পার করার পর আমার বড় মামা একদিন আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।মামা বিয়ে করেননি।কেন করেননি তা ঠিকমত উনি বলতেন না।আমি খালাজানের কাছ থেকে শুনেছিলাম, মামার একটা বিয়ে ঠিক হয়েছিলো অনেক আগে।মামার সাথে বিয়ের দিন সেই পাত্রী ভেগে গিয়েছিলো।মামা খুব অভিমান করে আর বিয়ে করেন নি।একদিন আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম তখন মামা বলেছিলেন, “একবার প্যারিসে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।মেয়েটা এখন ওখানে থাকে।আমার খুব জিজ্ঞেস করার ইচ্ছা, সে এমন করলো কেন?”

আমি একটু বড় হয়ে যখন মানুষের অনুভূতিগুলো দেখতে বুঝতে শিখলাম তখন মনে প্রশ্ন আসতো এত আবেগ আর ভালোবাসা মানুষগুলো কোথায় লুকিয়ে রাখে?আমার ব্যাচেলর মামার সাথে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ট সময়গুলো আমি পার করেছি।প্রতি শুক্রবার মামা আমাকে নিয়ে ঘুরতে যেতেন, আমার হাত ধরে হাটতেন।মামা আমাকে বড় হওয়া শিখিয়েছেন।উপরের নীল আকাশ যেমন তার বিশালত্ব নিয়ে আমাদের সামনে এসে বলে, “খোকা আমার মত হতে পারো?” মামাও তেমন একটা আকাশ হয়ে আমার সামনে নিজেকে মেলে ধরতেন।আমি শিখেছি, জীবনকে শিখেছি এবং জেনেছি।মামা তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

মিতুর বাবা মাহফুজ সাহেব একটা স্কয়ার ফ্রেম চোখে দিয়ে আছেন।লোকটাকে দেখেই মনে হয় যথেষ্ট সৌখিন।তার বিশাল বাড়ির চারদিকে অসাধারণ সব তৈলচিত্র।একটা তৈলচিত্র দেখে আমি মুগ্ধ হলাম।লালা পাড়ের সাদা শাড়ি পরা এক মায়াকাড়া নয়না তার আজন্ম লজ্জা মুখে লুকিয়ে কোথায় যেন তাকিয়ে আছে।এই ব্যাপারগুলো এভাবে ছবিতে ফুটিয়ে তোলার মত মানুষ পৃথিবীতে এসেছে বলেই কি পৃথিবীটা এত সুন্দর?

মাহফুজ সাহেব আমার পাশে এসে বসলেন।কাধে হাত দিয়ে বললেন, “বাবা তুমি যে ছবিগুলা দেখছো এগুলো সব আমার মেয়ের আকা।ও এই ছবিগুলো কাউকে দিতে চায়না, কোন একজিবিশনে ওর শো অফ করারও ইচ্ছা নাই।সব এঁকে এঁকে ঘর ভরিয়ে তুলেছে”।
আমি বিশাল লজ্জা পেলাম কোন এক কারণে।মাথা নেড়ে বললাম, “ছবিগুলো অনেক সুন্দর”।

মাহফুজ সাহেব হেসে দিলেন।আমার খালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাদের ছেলেটা তো মেয়েদের থেকেও বেশি লজ্জা পায়।আমার মেয়েটাও খুব লজ্জা পায়।এরা তো প্রেম ভালোবাসা করতে পারবেনা।বিয়ে ক্যান্সেল”।
আমার খালা হেসে বললেন, “আমরা শিখায় পড়ায় দিবো দুইজনকে।কিছু ক্যান্সেল করতে হবেনা।কিন্তু আমাদের মেয়ে কোথায়?”
একটু পর মিতু বেগম ঘরে আসলো।তার গায়ে একটা হালকা লালচে গোলাপী রঙের জামা।গায়ে একটা শাল, নিজ হাতের বুনোনে গাথা চমৎকার একটা শাল।সে কারো দিকে তাকায় না।মাথা নিচু করে তাকিয়ে আমাদের বিপরীতে বসে।আমি তাকে দেখি, হয়তোবা দেখতে পাইনা।আমি অন্য দিকে তাকিয়ে আড়চোখে তাকে দেখার আলতো চেষ্টা করি।ভাবছিলাম আমার কি তার প্রেমে পড়া উচিত।আমি বুঝতে পারিনা, আমার বোঝার ইচ্ছাও নাই।যা হবে হোক।এসব ভাবতে ভাবতে সে কখন যেন আমার সামনে তার হালকা মেহেদী রাঙ্গা হাতে এক কাপ ধোয়ায় ভেসে ওঠা চা নিয়ে দাড়ালো।আমি তাকে দেখলাম, এবং শুধুই দেখে গেলাম।এমনটা সিনেমায় হয়, অথবা রোমান্টির লেখকের লুতুপুতু গল্পে।আজকের এই শ্রাবণঝড়া সন্ধায়, আধার নেমে আসা দিনের শেষে আমাকে কেউ একজন ছুয়ে গেলো।মিতু বেগম, আপনাকে আমি কি কখনো ভালবাসতে পারবো?হয়তো না।আমি শুধু আপনাকে চেয়ে চেয়ে দেখবো আর গল্প লিখবো।আমার গল্প, যেগুলো আমি কখনো কাউকে বলিনি ঠিক সেই গল্পগুলো।

মাহফুজ সাহেব নীরবতা ভাঙ্গলেন।আমাকে বললেন, “অয়ন তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে।চলো আমার স্টাডিরুমে চলো, আমার বই দেখতে দেখতে কথা বলবে”।

আমি মাহফুজ সাহেবের সাথে হেটে চলি তার বিশাল বইসম্ভারের মাঝ দিয়ে।উনি আমাকে নিয়ে গেলেন তার লাইব্রেরীর ঠিক পূর্বকোণে।আমাকে মাথা নিচু করে বললেন, “বাবা আমার মেয়েটা অনেক ভালো এটা বুঝতে পারো?”

আমি মাথা নাড়ি।আমাকে তিনি আবার বললেন, “আমার মেয়ের যে একটা সমস্যা আছে এটা জানো?দীপু জানিয়েছে তোমাদের?”
আমি আবার মাথা নাড়ি।আমি জানি মিতু যখন এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হলো তখন তার এক কাজিনের সাথে গভীর প্রণয় ছিলো।ছেলেটাকে মিতুর বাবা মাও অনেক পছন্দ করতেন।সব কিছু ঠিকঠাক ছিলো।মিতু পাগলের মত ছেলেটাকে ভালোবাসতো।তার সবকিছু সে ছেলেটাকে অর্পণ করেছিল।তাই যখন হঠাৎ করে মিতু একটা অস্তিত্ব টের পায় তার মাঝে সে একটুও ঘাবড়ে যায়নি।সে অনেক ভালোবেসে ছেলেটাকে বলেছিলো, “আমাকে বিয়ে করবে?আমাদের একটা স্বপ্নকে আলো দেখানোর সময় হয়েছে”।
ছেলেটা বলেছিলো, “হা করবো তো।নাম ঠিক করেছো?”
মিতু মাথা নাড়ে।বলে, “ওর নাম দেবো স্বপ্ন”।

মিতুর সেই স্বপ্নকে আর দুনিয়া দেখানো সম্ভব হয়নি।হঠাৎ করে একদিন ধ্রুব বলে ওঠে, “এটা আমার স্বপ্ন না।অন্য কারো”।

মিতু চুপ করে শুনে, সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা।হারিয়ে যায় গভীর অতলে।যখন জ্ঞান ফিরে তখন ধ্রুব হারিয়ে গেছে।মিতু এক বছর অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলো।তারপর আবার নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করে যা কিনা ছিলো একটি প্রাণহীন জীবনের উচ্ছ্বল প্রয়াস।আমি সব জানতাম এবং জানা ব্যাপারগুলোতে আমার আপত্তি ছিলোনা।কেন আপত্তি থাকবে?একজন ভালোবেসেছিলো, একটা ছোট্ট ভুল করেছিলো কারণ সে আমার মতই একজন মানুষ।সহস্র ভুলে আমরা একজন মানুষ, আবার এই ভুলগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলার প্রাণশক্তিগুলোই তো মানুষ।আমার জীবনে আমার কখনো কোন চাহিদা ছিলোনা।আমার মত বাবা মা নেই এমন একজন মানুষের জন্য মিতুর মত অনেক কিছু হারানো একজন মানবীই হয়তো দরকার ছিলো।


মাহফুজ সাহেব অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে বললেন, “তোমার কি এত কিছুর পরও ওকে পছন্দ হয়েছে?”
আমি মাথা নাড়ি অনেক বিশ্বাসের সাথে।মাহফুজ সাহেব হেসে বললেন, “আমি চাচ্ছি তুমি মিতুর সাথে কথা বলো।আমি ওকে পাঠাই”।

এটুকু বলে মাহফুজ সাহেব চলে গেলেন।মিতু বেগম যখন আমার সামনে এসে দাড়ালো, আমি একটু আনমনা হয়ে গেলাম।তাকে কিছু বলার মত সাহস আমার ছিলোনা।আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।কেউ কিছু বলছেনা, সব নীরবতা এসে ভর করেছে আজকে তাহার আমার এই ছোট্ট কোণে।মিতু হঠাৎ করে আমাকে বললো, “আমি কি চলে যাবো?”
আমি বলি, “চলে যান।যাওয়ার আগে আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম”।
মিতু মাথা নাড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে।আমি ওর সম্মতি পেয়ে বললাম, “আমি খালাকে আজকে জানায় দিবো যে আমার আপনাকে অনেক পছন্দ হয়েছে।আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে”।
মিতু কিছু বলেনা।আমি মাহফুজ সাহেবের স্টাডিরুম থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তুতি নেই।হঠাৎ করে সাহস নিয়ে মিতুকে জিজ্ঞেস করি, “আপনার ফোন নম্বর পেতে পারি?”
মিতু দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে যায়।আমার মনে হলো সে বিশাল লজ্জা পেয়েছে।আমিও অবশেষে লজ্জা পেলাম।

আমার খালা এসময় বিশাল গল্প জুড়ে দিয়েছেন মাহফুজ সাহেবের সাথে।আমি সামনে গেলে বললেন, “বাবা তোমার যৌতুকনামা জানায় দাও”।
মাহফুজ সাহেব বললেন, “সাইকেল চাও না ঘড়ি?”
আমি মুচকি হেসে বলি, “ঈগল ব্র্যান্ডের রেডিও চাই।সোনালী রঙের হতে হবে”।

ঠিক যখন চলে যাচ্ছিলাম তখন মিতু আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট কাগজ বাড়িয়ে দেয়।আমি বুঝলাম কাগজে তার ফোন নম্বর লিখা।কেউ যেন না দেখতে পায় এমন ভাবে কাগজটা তার হাত থেকে বুঝে নিলাম।এই সময় একটিবারো আমি তার ধবধবে শুভ্র হাত বা তাতে স্বর্ণশিকড় হয়ে জড়িয়ে থাকা আঙ্গুলগুলো স্পর্শ করিনি।আমি নিশ্চিত একটুও যদি ছোয়া লাগতো মিতু অজ্ঞান হয়ে যেত।সে এতোটাই পবিত্ররূপে আমার সামনে প্রতীয়মান হয়েছিলো যে আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার সবগুলো অন্ধকার স্মৃতির কথা, আমার না বলা অব্যক্ত কান্নাগুলোর প্রত্যেকটি ব্যাথা।বিশ্বাস করুন আমি তার প্রেমে পড়িনি, এটা অন্য কিছু ছিলো।এই জগতের বাহিরে অন্য কোন জগতের অনুভূতি।

সেদিনের পরদিন রাত দশটা বেজে দশ মিনিটে আমি তাকে অনেক ইতস্ততার সাথে ফোন করলাম।সে ফোনটা ধরে কিছু বললোনা।সামান্য হ্যালো বলার কষ্টটাও করলোনা।আমার কেন যেন শুধু হাসি পাচ্ছিলো।আমি হাসি থামিয়ে বহু কষ্টে তাকে বললাম, “আপনি ভালো আছেন?”
মিতু কিছু বলেনা।অনেকক্ষণ পর শুনতে পাই সে হুমম জাতীয় একটা শব্দ করলো।আমি তাকে একটা একটা করে আমার গল্প বলি।সে শুধু বলে আচ্ছা।আর এভাবেই পুরো সপ্তাহ জুড়ে কথা বললাম সেই সলজ্জ নারীর সাথে, জানাতাম আমার সব স্বপ্নের কথা।বহু কষ্টে তার মুখ থেকে কথা বের করতে পেরেছিলাম।এখন সে আমাকে একটু একটু নিজের কথা বলে।
কোন এক শুক্রবার রাতে আমাকে সে জীবনে প্রথমবারের মত ফোন দিলো।ফোনটা ধরার সাথে সাথে প্রশ্ন করলো, “কেন আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন অয়ন?”

আমি একটুও না ঘাবড়িয়ে তাকে বললাম, “আমার আসলে ছোটকাল থেকে খুব কাছের কেউ নাই।আপনাকে দেখে অনেক কাছের কেউ মনে হয়েছিলো।আপনার চোখে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে মিতু।আমাকে ওটা অনেক কাছে টানে।আপনার ছোট্ট হাতের দিকে যখন আমি তাকাই তখন অনেক লোভ হয়েছিলো একটাবার আপনার হাতটা ধরে রাখার জন্য।আমি যখন আপনার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিলো এত সুন্দর করে সৃষ্টিকর্তা কি করে মানুষকে একেছেন, এতো শুভ্রতার উৎস কই?”
মিতু আমাকে কঠিন করে প্রশ্ন করে, “আমার ব্যাপারে আপনি সব জানেন?”
আমি বলি, “জানি।আমার কোন যায় আসেনা”।
মিতু আমাকে দম আটকানো স্বরে বলে, “কাল আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো।ঠিক দশটায় শহীদ মিনারের সামনে থাকবেন”।
আমি মিতুকে বললাম, “ঠিক আছে”।

এরপর সারারাত ঘুমাতে পারিনাই।ভোরবেলা ভয় ভয় নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।আমাকে ঠিক দশটায় একজন পরীর পাশে যেয়ে দাড়াতে হবে। একটুও দেরী করা চলবেনা।
আমি যখন মিতুর সাথে দেখা করতে গেলাম তখন চারদিকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের উদাসীনতা।মিতু আমাকে নিয়ে একটা রিকশায় উঠে শ্যামলীর শিশুপল্লীতে নিয়ে গেলো।একটু পর একটা চার বছরের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, “এটা আমার মেয়ে।আমি কখনো বিয়ে করতে চাইতাম না যদি না আমার এই মেয়েটা থাকতো।আমি যতদিন না বিয়ে করবো এই মেয়েটাকে কাছে রাখতে পারবোনা।এখন বলুন আমাকে বিয়ে করবেন?”
আমি ছোট্ট মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকি আনমনা হয়ে।তাকে বলি, “মামণি আইসক্রীম খাবা?”
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।এরপর তার মায়ের পিছনে আশ্রয় নেয়।আমি একটা সাহসিকতার কাজ করলাম।মেয়ে আর মা দুজনের হাত ধরে বললাম, “চলো কোথাও আইসক্রীম খেয়ে আসি।ধানমন্ডি আনাম র্যাং গস প্লাজায় বুমারস আছে।আমার প্রিয় আইসক্রীম পারলার।যাবে?”
মিতু মাথা নাড়ে।মিতুর মেয়েটাও মায়ের মত মাথা নাড়ে।মিতুকে আমি বললাম, “মিতু তোমার বাসার পাশে একটা লেক আছে।আমার খুব ভালো লাগে জায়গাটা।আমি ছোটকালে যে বাড়িতে বাবা মার সাথে ছিলাম সেখানে একটা পুকুর ছিলো।আমি ওই পুকুরের পাশে যেয়ে দাড়ালে যেমন বোধ করতাম, তোমাদের লেকেও একই রকম একটা অনুভূতি পাই।জানিনা কেন!আমি কথা দিচ্ছি প্রতিরাতে তোমাকে নিয়ে এই লেকের পাশে হাটবো”।

মাহফুজ সাহেব আমাকে একদিন বেশ সকালে ফোন দিয়ে তার বাসায় আসতে বললেন।তার কন্ঠ বেশ গম্ভীর ছিলো।আমাকে বললেন মিতুর আম্মু এবং তিনি আমার সাথে জরুরী কথা বলবেন।আমি তাকে জানালাম অফিস শেষ করে তার বাসায় আসবো।

ঠিক ছটার দিকে আমি যখন মিতুদের বাসায় পৌছালাম তখন আন্টি আর আঙ্কেল খুব ব্যস্ত।তাদের বাসায় কিছু মেহমান এসেছেন।আমি চুপ করে ওদের ড্রইংরুমে বসলে আন্টি আর আঙ্কেল আমাকে ডাকলেন।তারা তাদের একটি ঘরে নিয়ে আমাকে বললেন, “অয়ন, ধ্রুব কাল দেশে এসে আমাদের বাসায় এসেছিলো।ও মিতুকে বিয়ে করতে চায় এখন”।
আমি হেসে বললাম, “তাহলেতো অনেক ভালো।আমি খুব খুশি হলাম জেনে”।

মাহফুজ সাহেব বললেন, “অয়ন তোমার যদি কিছু কখনো প্রয়োজন হয় আমাদেরকে জানিয়ো”।

আমি আবারো হাসলাম।তাদেরকে বললাম, “কিছু চাইনা।আমার জন্য দোয়া করবেন”।

আন্টি আমাকে বললেন, “আমাদের মেয়েটা অনেক হাসিখুশি এখন।তুমি কোন রাগ রেখোনা আমাদের প্রতি”।

মিতুর কথা শুনে বুকের ভিতর হঠাৎ করে একটা ধক করে উঠলো।আমি তবুও স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে বললাম, “কোন রাগ নেই।আমি যাই?”
মিতুদের বাসা থেকে যখন বের হয়ে আসছিলাম ঠিক তখন ওদের বিশাল গেটের কাছে মিতুর গায়ের গন্ধ পেলাম।আমি পাশে তাকিয়ে দেখি মিতু হাটছে একটা উচ্ছ্বাসময় ছেলের সাথে।আমাকে সে দেখলো কিনা জানিনা।আমি দ্রুত একটা সি.এন.জিতে উঠে বসি।আমাকে পালাতে হবে এখান থেকে।মিতুর গায়ের মিষ্টি গন্ধ আমাকে তাড়া করে, আচ্ছা এটা কি ভালোবাসার গন্ধ।আমি বুঝতে পারিনা।আমার সমস্ত চোখে তখন অনেক আবেগ ঝরে পড়ছে।

আমার উত্তরায় ভাড়া করা শাদা বাড়িটার সামনে যখন আমি পৌছালাম তখন চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।আমি নিজের রুমে ঢুকে বারান্দায় যেয়ে পিচ্ছিল মেঝেতে বসে পড়ি।আমার একটু শ্বাসকষ্টের রোগ আছে।আমি টেনে টেনে শ্বাস নেই, কিন্তু চাদের রূপ দেখতে একটুও পিছপা হইনা।আজ পুরো আকাশ ভেঙ্গে জোসনা হয়েছে।আজ পুরো নীলাম্বরের বাধ ভেঙ্গেছে আমাদের এই ছোট্ট বসুধায়।আমি অদ্ভুত পৃথিবীর রূপ দেখি সব গ্লানি মুছে ফেলে।আমার এক পাশে একটা বিশাল চাঁদ, তাকে ঢেকে দিতে চায় ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টিধারা।এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে নাকি অন্য কোন এক কারণে আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে শুধু পানি ঝরে।আমি মুছে কূল পাইনা, ঝরতেই থাকে।থামতে চায়না।

মিতুদের বাসা থেকে বেশ দূরে একদিন উত্তরা লেকের পারে আমি বসে বসে মায়ের কথা ভাবি, বাবার কথা ভাবি।আমার বাবার সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিলো ভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর লেভেল ১ টার্ম ১ এ।বাবা আমার ভার্সিটির পাশে ক্যাফেটেরিয়ার শান্ত হয়ে বসে ছিলেন।আমাকে দেখে হাত দিয়ে কাছে ডেকে বলেছিলেন, “বাবু তোর চোখ এমন গর্তে ঢুকে গেছে কেন?”
আমি বাবাকে কোন প্রশ্নের উত্তর দেইনাই।বাবার হাত ধরে বসে ছিলাম।বাবাকে বরং জিজ্ঞেস করি, “তুমি আমাকে কিভাবে পেলে?”
বাবা হেসে বলে, “তোর মা আমাকে জানালো তুই বড় হয়ে গেছিস।তোকে দেখে আসতে বললো।তুই তো বেটা একটুও বড় হলিনা।ওইযে হাতে কাটা দাগটা এখনো আছে।

আজকে যখন লেকের পারে বসে বসে আনমনে বলছিলাম, মা আসি, মা আসি? তখন বাবাকে দেখতে পেলাম আবার।বাবা এখনো সেই সৌম্যদর্শন গ্রীক কবিদের মত বিশালতা নিয়ে বেচে আছেন।আমার পাশে বাবা এসে বসলেন।আমাকে বললেন, “বাবু তোর মা খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে কিছুদিন ধরে।বলে তোর অনেক কষ্ট হয়েছে।কোথায় কষ্ট দেখা”।
আমি কিছু বলিনা।বাবাকে বলি, “তুমি আমার সাথে থাকোনা কেন?”
বাবা মাথা চুলকিয়ে বলে, “ঠিক আছে থাকবো।পরের আশ্বিন থেকে থাকবো”।

আমি বাবার হাত ধরে ঝিম মেরে বসে থাকি।বাবা আমার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, “বাবু মেয়েটা তোর ভালোবাসা যেদিন বুঝবে সেদিন দৌড়িয়ে এসে পড়বে।ভালোবাসা অনেক পবিত্ররে বাবা, কেউ এটাকে অবহেলা করতে পারেনা”।

আমি কিছু বলিনা।বাবা উঠে বসে। এরপর হারিয়ে যায় কোথায় যেন আবার।আমি বিধাতাকে কখনো কোন অভিযোগ করিনি।আজ ভাবলাম করবো।অভিযোগ করবো, আমার ভালোবাসাগুলো কোথায়?সব হারিয়ে যায় কেন?

পাশ ফিরে খেয়াল করলাম একটা নীল শাড়ি পড়া শুভ্র নারী দৌড়িয়ে আমার কাছে ছুটে আসছে।আমি মিতুর দিকে তাকাইনা একবারও।আমার সমস্ত হৃদয়ে তখন অনেক অভিমান।কার প্রতি তা অবশ্য জানিনা।
মিতু আমার পাশে বসে।আমাকে বলে, “আমি খুজতে খুজতে অবশেষে আপনাকে পেলাম।হাত ধরুন।আপনি না আমার হাত ধরতে চাইতেন অনেক”।

আমি মিতুর হাত ধরি।তাকে শুধালাম, “তুমি তো আরেকজনের তাই না?”
মিতু মাথা নাড়ে দুপাশে।আমাকে বলে, “আপনার চোখে আমাকে নিয়ে যে ভয়ংকর সুন্দর স্বপ্নগুলো দেখেছি আমি তাতে বন্দী হয়ে গেছি।ধ্রুবর সাথে আমি যখনই কথা বলেছি, যতবার তার পাশে দাড়িয়েছি ততবার মনে হয়েছে আমি কেন আরেকজনের সাথে এভাবে কথা বলছি? আমি তো তার নই।আমি আপনাকে ভালোবাসি কিনা জানিনা অয়ন।কিন্তু আমি আপনাতে বাধা পড়ে গেছি”।

আমি কিছু বলতে পারিনা।আমি শুধু মিতুকে অনেক কাছে টেনে নিয়ে বসি।মিতু বাধা দেয়না, আমাকে শক্ত করে ধরে রাখে।আমি আমার কাধে মাথা দিয়ে রাখা মেয়েটাকে বলি, “আমি তোমাকে আরো স্বপ্ন দেখাতে চাই।দেখবে?”

মিতু মাথা নাড়ে।আমার তখন এক চোখে জল আরেক চোখে নতুন কিছু স্বপ্ন।

******************************************************************
ঈদের সময় ঘরে বসে মুড়ি খেতে খেতে আর খই ভাজতে ভাজতে মিতু নামের মেয়েটার কথা মনে পড়লো।গল্পটা শুধুই এই অসাধারণ মেয়েটার জন্য লেখা হলো।এই মেয়েটা আমাদের সত্যিকার দুনিয়ায় বেচে আছে।তাকে এবং তার শুভ্র জীবনযাপনকে আমি ভালোবাসা জানালাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29444887 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29444887 2011-09-08 19:39:13
কাব্য
এখন রাত দশটা বাজে, একটু পর ভাবী আমাদের রুমে আসবেন।হাতে থাকবে একটা নীল ট্রে আর তাতে ঢাকা থাকবে আগুন গরম শীতল পিঠা।আমি এই পিঠা খেতেই গভীর রাত জেগে কাজী ভাইয়ের বাসায় পড়ে থাকি।কাজী ভাই আমাদের প্রাণের মানুষ, এই পুরো বানিয়াচর গ্রামের এমন একটা মানুষ যে কারো সাতে পাচে নেই।তিনি ভালোবাসতে জানেন, ভালোবাসা শেখাতে জানেন।আমরা কিছু স্বপ্নময় তরুণ তার আহবানে সাড়া দিয়ে গল্প শুনতে আসি।

কাজী ভাইয়ের লেখা স্থানীয় অনেক পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে।এইতো বছরখানেক আগে তার একটা কবিতা প্রকাশ পেয়েছিলো প্রথম আলো দৈনিকে। সেই কবিতাটা সদর থেকে ফটোকপি করে উনি অনেক বিশিষ্টজন আর মুরুব্বীদের বাসায় পৌছিয়ে দিয়ে এসেছেন।তার নিজের ঘরে একটা ফ্রেমে কবিতার পাতা সাজিয়ে রাখা আছে।লীনা ভাবি তার এহেন কাজকর্মে অত্যন্ত বিরক্ত।আমাদেরকে প্রায়ই বলেন, “তোমরা তোমাদের ভাইকে কিছু বলোনা কেন?সামান্য একটা কনফেকশনারী দিয়ে গল্প গুজব করে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।সে বুঝেনা তার একটা ছেলে আছে এখন?”

আমরা মাথা নাড়ি, আমরা বুঝতে পারিনা লীনা ভাবী কেন বুঝেনা তার মত ভাগ্যবতী তরুণীরা জনমে জনমে এমন একজন মানুষকে কাছে পায়।ভাবী কি ভুলে গেছে, এমন আলাভোলা মানুষটাই তার বিয়ে যেদিন হবে আরেকজনের সাথে সেদিন কি ভয়ংকর কাজ করেছিলো।কাজী ভাই সেদিন বিয়ের মঞ্চে উঠে বরকে ঝাড়া দিয়ে ফেলে চিৎকার করে বলেছিলো, “সারাজীবন যেই মেয়ের জন্য কবিতা লিখছি। আজ তাকে আরেকজনের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবো এত কাপুরুষ আমি না।দেখি কে পারে আমাকে এখান থেকে সরাতে।শ্বশুর আব্বা মেয়ে নিয়ে আসেন”।

কেউ মেয়ে নিয়ে আসেনি, লাঠি নিয়ে এসেছিলো।লাঠি দিয়ে কাজী ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো।মারতে মারতে যখন তাকে প্রায় অজ্ঞান করে ফেলে, তখনও সে লীনা ভাবির আব্বা তমিজ উদ্দিনের বাড়ি থেকে বের হয়নি।লীনা ভাবি একটু পর বিয়ের শাড়ি খুলে বাহিরে এসে কাজী ভাইয়ের হাত ধরে বললো, “চলো”। সেই যে কাজী ভাই ভাবীর হাত ধরেছিলো আজো তা ছাড়েনি।একবারের জন্যও না।

আজ খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে যখন উঠোনে পা দিলাম, তখন এক আশ্চর্য্য স্নিগ্ধতা আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললো।গাঢ় ঘন কুয়াশার আলিঙ্গন আর পায়ের নিচে সবুজ ঘাসের ঝকমকে শিশির বিন্দু আমাকে কবি কবি করে তুললো।আমি ভাবলাম জীবনে যা কখনো করিনি আজকে না হয় তাই একবার চেষ্টা করি।আমি একটা কবিতা লিখার জন্য প্রাণপণ প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।ঠিক তখন আমাকে আমার ছোট মামা কানাডা থেকে ফোন দিলো।আমি ফোন ধরলাম অনেক ভারী একটা মন নিয়ে।আমার পুরোটা শৈশব জুড়ে এই মামার স্মৃতি আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে।এখনো মনে পড়ে মামার হাত ধরে সাতার শেখা, সাইকেল চালানো শেখা এবং পাশের বাড়ির কাঠাল চুরি করতে শেখার মধুর অভিজ্ঞতার কথা।আমার এই মামার অতি অল্প বয়সে কি হয়েছে জানিনা, মা বলে গলায় ক্যানসার।যেদিন প্রথম জানলাম, সেদিন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে সারাদিন জায়নামাজে বসে ছিলাম।আমি প্রার্থনা করেছিলাম, আমার সবকিছু খোদা নিয়ে নিলেও যেন মামাকে আরো একশ বছর আয়ু দেয়।

ফোন ধরে মামার ফ্যাসফ্যাসে গলায় হ্যালো শুনি।আমি মামাকে বলি, “মামা শুনতে পাচ্ছি বলো”।
মামা হাসে।হাসতে হাসতে বলে, “বল্টু তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস মনে হয়।তোরে কত দিন দেখিনা।তোর সাথে পুকুরে সাতার কাটতে বড় ইচ্ছা হইতেছে।কিন্তু আয়ু নাই”।
এইটুকু বলে মামা ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন সে আমার সাথে সাতার কাটতে পারছেনা বলে দুঃখে মরে যাচ্ছে।আমি মামাকে বলি, “মামা তুমি দেশে এসে পড়োনা কেন?নিতু আন্টি প্রতিদিন বাসায় এসে তোমার কথা জিজ্ঞেস করে।উনার বাচ্চাটার নাম রাখছে মিশু”।
মামা আবার হাসে।হেসে হেসে বলে, “তোদের কাছে আর আসতে ইচ্ছা করেনা”।

আমি চুপ করে থাকি, কিছু বলিনা।আমার খুব মনে পড়ে সেদিনের কথা যেদিন নীতু আন্টির বিয়ে হয়ে যাচ্ছিলো।তার আগের রাতে আমার পাহাড়ায় নীতু আন্টি গোপনে মামার সাথে দেখা করতে এসেছিলো।আন্টি সবসময় মামার সাথে ঝগড়া করতো, তাই আমি যখন গোপনে তাদের কথা শুনছিলাম তখন অনেক অবাক হয়েছিলাম।যারা এত ঝগড়া করে তাদের মধ্যে প্রেম প্রেম ভাব আসে কি করে?আমার ছোট মাথায় তা ঢুকেনি।
পরেরদিন আমার নানাজান মামাকে ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে রেখেছিলো।উনি নীতু আন্টির পরিবারকে পছন্দ করতেন না, কারণ নীতু আন্টির বাবা নাই।তারা অনেক গরীব।আমি মামার বন্দী ঘরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম মামা হাত পা ছুড়াছুড়ি করছে।আমাকে দেখে মামা বলেছিলো, “বল্টু নীতুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছেতো! আর মাত্র কিছুক্ষণ।আমার দরজাটা একটু খুলে দে না”।

আমি নানাজানের ভয়ে আর মামার ঘরের সামনে যাইনি।মামাকে যখন পরদিন ঘর থেকে বের করে আনা হয় তখন মামা একেবারে শান্ত মানুষ।সুন্দর করে নানীর কাছে যেয়ে পা ধরে সালাম করে নানার কাছে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বললেন, “আব্বা আমি যাই”।
নানা জিজ্ঞেস করে, “কই যাবি বেটা?”
মামা হাসে, এরপর হারিয়ে যায়।অনেকদিনের জন্য হারিয়ে যায়।পাচ বছর হয়ে গেল মামা নানা-নানীর সাথে কথা বলেন না।মাঝে মাঝে আমাকে আর মাকে ফোন দেয়।আম্মু ফোন ধরলেই কাদে অনেক।মামাকে বলে, “তোর বোনকে দেখতে ইচ্ছা করেনা?তোকে মানুষ করছে কে?আমি না আম্মা?আমাকে তুই মা ডাকতিনা?”

আমিও একটু একটু কাদি, কারণ মামা আমাকে অনেক ভালোবাসতেন।আমাকে জন্মের পর থেকে কোলে নিয়ে নিয়ে মানুষ করেছেন।মা মামাকে বলতেন, “আমি তোকে মানুষ করেছি, এইবার তুই আমার ছেলেকে মানুষ করবি”।
আমার মামা আমাকে সবজায়গায় কোলে করে নিয়ে যেতেন।একটুও কোল থেকে নামতে দিতেন না।একবার মা কি কারণে যেন আমাকে বেদম মার মেরেছিলো।মামা আমাকে সেদিন আর একবারের জন্যও ছাড়েনি।আমি মার খেয়ে তিনদিন জ্বরে পড়েছিলাম।এই তিনদিন মামা আমার বিছানায় পাশে বসে ছিলেন।আমাকে নিয়ে সারা রাত ঘুমিয়েছেন।আজকে আমার এই মামা হয়তো আর বাচবেনা, তাকে চলে যেতে হবে অনেক অনেক দূরে।এই জন্য অনেকদিন হলো আমি আল্লাহর সাথে বিশাল বিশাল ঝগড়া করি।আল্লাহ মনে হয়না আমাকে পাত্তা দেয়।
মামা আমাকে ফোন রাখার আগে বললেন, “বল্টু তুই নীতুকে বলিস আমি স্যরি”।
আমি মাথা নেড়ে বলি, “আচ্ছা মামা বলবো”।
মামা বললো, “আমি আজকাল কথা বলতে পারিনারে।খুব কষ্ট হয় গলায়।আপাকে বলিস আমি পরে ফোন দিবো।ঠিক আছে?”

আমি আবার মাথা নাড়ি।মামা ফোন কেটে দেয়, আমি তবুও ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকি।আমি ভাবছি, শুধুই ভাবছি মামার কথা।কেন কিছু মানুষ জীবনে কিছু পায়না আমি জানিনা?

একটু রোদ উঠলে আমি কাজী ভাইয়ের বাসায় যাই।দুদিন হলো তার বাসায় যাওয়া হয়না।আমি যখন কাজী ভাইয়ের বাসায় পৌছালাম দেখলাম ভাবী কাদছে।কাজী ভাই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।আমি হতভম্ব হয়ে একবার ভাবলাম ফিরে যাই।তারপর ভাবলাম একটু খোজ নিয়ে দেখা দরকার।আমি কাজী ভাইয়ের পাশে যেয়ে বসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কাজী ভাই কি হয়েছে?”
কাজী ভাই কিছু বলেনা, চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার মাথার উপরে ঝুলন্ত ফ্যানের দিকে।ভাবী আমাকে বলে, “কাব্যর কি যেন হয়েছে?এই বাচ্চা মানুষের সাথে আল্লাহ কেন এমন করে?”
ভাবী এটুকু বলে অঝোরে কাদতে থাকে।আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি পাশে বিছানায় শুয়ে থাকা কাব্যর দিকে।কাব্যর ছোট্ট বুকটা কেমন উঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে।কাজী ভাই একটু স্বাভাবিক হলে আমাকে বুঝিয়ে বলে, এই রোগটা হলো Complex Pediatric Heart Disease। আমাদের ছোট্ট কাব্যর ছোট্ট হৃদয়ে কিভাবে যেন এই রোগটা বাসা বেধেছে।আজকে ডাক্তার বলেছে, ভারতের ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।

কাজী ভাইয়ের মনটা অনেক ধনী হলেও, সম্পদে তিনি অনেক দরিদ্র।চিকিৎসা খরচ দেয়ার মত সামর্থ্য তার নেই।আমি হতভম্ব হয়ে থাকি, কিছু বলার মত সুযোগ আমার ছিলোনা।আজকে আবার পরম করুণাময়ের করুণার অভাব প্রবলভাবে বোধ করতে লাগলাম।১ বছরের কাব্যকে নিয়ে আমি আর আমার বন্ধুরা কত কিছু প্ল্যান করেছিলাম।এইতো আর মাত্র দুদিন পর কাব্যর জন্মদিন।আমি সদরে আছলাম আঙ্কেলের দোকান থেকে একটা খুব সুন্দর ছোটখাটোর মধ্যে গাড়ি কিনেছি, লাল রঙের গাড়ি।আমি বেকার মানুষ, নাহলে একটা সত্যিকার গাড়ি কিনে ওটায় কাব্যকে বসিয়ে ঘুরাতাম।কাব্য নামের বিলাই ছানাটা যদি হারিয়ে যায়, তবে এই জগতটা কি শব্দহীন হয়ে যাবে না?চারদিকের সবুজে কি সজীবতা আর খুজে পাওয়া যাবে?আমার মনে হয়না।কাজী ভাইয়ের সামর্থ্য না থাকতে পারে, আমাদের অনেকের তো আছে।আমি মনে মনে ঠিক করলাম, বন্ধু বান্ধব সবাই মিলে ভিক্ষা করে হলেও কাব্যর জন্য টাকার ব্যবস্থা করবো।

কাজী ভাইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে যখন বের হলাম তখন পড়ন্ত দুপুর।ঝা ঝা রোদের উষ্ণতা আমাকে স্পর্শ করলোনা, গনগনে লাল সূর্যের রৌদ্রজ্জ্বল শিখা আমাকে পরাস্ত করেনা।বুক ফেটে বারবার কান্না আসে যখন মনে পড়ে কাব্যের আধো আধো অর্থহীন শব্দগুলোর কথা, তার অভিমানী ছলছল চোখের আদরমাখা চাহনীর কথা।আমরা কাব্যকে নিয়ে কত শত স্বপ্ন দেখেছি।কাব্য অনেক বড় হবে, কাজী ভাইয়ের থেকেও বড় একজন কবি হবে।আমাদের স্বপ্নগুলো কি এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে, নিষ্পাপ কাব্য কি আমাদের চোখের সামনে থেকে টাকা নামক নোংরা বস্তুটার জন্য হারিয়ে যাবে।প্রিয় কাব্য এমনটা হবেনা, কথা দিচ্ছি এমনটা হবেনা।
পরবর্তী তিনদিন খুব ব্যস্ততার সাথে পার করলাম।আমি,সজল এবং রনির মত ১৬ – ১৭ বছরের কিছু ছেলে সদরের দোকানে দোকানে যেয়ে ভিক্ষা করেছি।কেউ পাচ টাকা দিয়ে বলেছে, “কি নেশা করিস?”

সবচেয়ে অবাক লেগেছিলো যখন একজন ফকির অত্যন্ত অভিমান নিয়ে আমাদের কাছে এসে বললো, “বাবারা তোমরা সবার কাছে গেলা বাচ্চাটার জন্য, আমার কাছে আসলানা কেন?আমি ফকির সম্পদে, মনে না।এই লও কচকচা একটা একশো টাকা, দুইদিন কম খাইলে কিছু হবেনা আমাগো”।
ফকির দাদুর সাথে একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।আমাদেরকে দেখে বারবার সে লজ্জায় আধখানা হয়ে যাচ্ছিলো।আমি পাশের দোকান থেকে একটা প্রাণ ম্যাংগোবার কিনে বাচ্চাটার হাতে দিয়ে তার গাল টিপে দিলাম।বাচ্চাটা জিহবা বের করে ভেংচি কেটে দৌড় দিয়ে কোথায় যে হারিয়ে গেলো আমরা হদিস পেলাম না।


পথে এভাবে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে কাজী ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেলো।কাজী ভাইয়ের বয়সটা হঠাৎ করে মনে হলো অনেক বেশি হয়ে গেছে।একটা মানুষের এভাবে রাতারাতি এত চুল পেকে যেতে পারে তা আমার বোধগম্যের বাহিরে ছিলো।আমি কাজী ভাইয়ের পাশে যেয়ে দাঁড়িয়ে তার কাধে হাত দিয়ে দাড়ালাম।কাজী ভাইকে বললাম, “কাব্য কেমন আছে?”
কাজী ভাই তার খোচা খোচা দাড়ি ভরা গালে চুলকাতে চুলকাতে বললো, “আমার দোকানটা বিক্রি করে দিছি আজকে।পানির দামে দিয়ে দিলাম।তোমার ভাবীর যা কিছু ছিলো সব বিক্রি করে দিছি।এখন আমি পথের ফকির”।
আমার চোখ ভিজে যায়।আমি কাজী ভাইকে ধরে নিয়ে পাশের চা দোকানে বসি।কাজী ভাইকে বলি, “আমরা ৩০ হাজার টাকার মত ব্যবস্থা করছি।আর কত টাকা লাগবে?”

কাজী ভাই বুকে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে চোখের জল মুছে।আমাকে বলে, “অনেক টাকা লাগবে, আরো দশ লাখ টাকা।কোথায় পাবো এত টাকা?”
আমি আমার মূল্যহীন চোখের জল মুছে কাজী ভাইকে সান্তনা দেই।তাকে বলি, “ভাই আমরা সবাই পাশের দশ গ্রামে যাবো, সবার কাছে যাবো।আরো সাহায্য আসবে, আপনি ভাবীর পাশে যেয়ে দাড়ান।আমরা আছি”।
কাজী ভাই তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট কাগজ বের করে আমাকে বললো, বল্টু আমার ছেলের জন্য কাল রাতে একটা কবিতা লিখছি।কবিতাটা পড়ি তুমি শোনঃ
“কাব্য একদিন তুমি বড় হবে তো? তোমার বাবার সাদা পাঞ্জাবী ধরে প্রতি জুম্মাবারে তুমি কি যাবে মুমিনের মসজিদ ঘরে? তোমার মায়ের আচল ধরে লজ্জা পেয়ে মুখ লুকিয়ে রাখবে তো?”

কাজী ভাই আর পড়তে পারেনা, আমিও আর শুনতে পাইনা।আশেপাশের জগত দেখতে পায় দুইজন দুর্ভাগা মানুষ একটি নোংরা চায়ের দোকানের ভাঙ্গা বেঞ্চে বসে চোখ মোছার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।কিন্তু কেউ দেখতে পায়না, এই মানুষগুলো আজ বড় অসহায়।একজন মানুষের ভালোবাসাগুলো যখন চোখের সামনে ধুকে ধুকে ক্ষয়ে যায়, তখন সেই যাতনা বুকে কত মর্মর ধ্বনি তোলে তা দেখার সামর্থ্য আছে কজনের?
গভীর রাতে আমার ছোট মামা ফোন করে।মামার কথা বলার ক্ষমতা আরো হ্রাস পেয়েছে, এখন আরো ফ্যাসফ্যাসে শোনায়।মামা ফোন করে বলে, “নীতুকে স্যরি বলেছিলি?”
আমি চুপ করে থাকি।কিছু শুনতে না পেয়ে মামা বলে, “তোর মন খারাপ নাকিরে বেটা?”
আমি মামাকে বলি, “মামা দশ লাখ টাকা লাগবে।দিতে পারবা?”
মামা কাশতে কাশতে বলে, “কেন লাগবে?এত টাকা দিয়ে তুই কি করবি?গাড়ি কিনবি?”
আমি মাথা নেড়ে বলি, “না মামা।কাজী ভাইয়ের ছেলেকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাবো মামা।ওর বুকে অনেক বড় অসুখ”।
মামা হাসতে হাসতে বলে, “এত টাকা কোথায় পাবোরে বল্টু?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, “তাও ঠিক মামা।তুমি চিন্তা করোনা।আমরা কালকে গ্রামে একটা নাটক করবো।মধুসূদন দত্তের বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো।টিকিটের দাম রাখছি দশ টাকা।যেভাবেই হোক টাকার ব্যবস্থা করে ফেলবো”।
মামা শান্ত হয়ে বলে, “বল্টু এই ইচ্ছাটা কখনো নষ্ট করিসনা।কারো জন্য কিছু করার ইচ্ছা সবার থাকেনা।তুই বেটা অনেক বড় হ।অনেক অনেক বড়”।


তিনদিন পর মামার একটা চিঠি আর সাথে ৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার একটা চেক আসে।মামা চিঠিটা লিখেছিলো আমাকে।আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সেই চিঠি পড়িঃ

“বল্টু, তোর মনে আছে তুই অনেক ছোট ছিলি যখন তখন আপুর কাছে প্রায় এসে ঘ্যানর ঘ্যানর করতি চুইংগাম খাওয়ার জন্য।আপু যখন তোকে টাকা দিতোনা তখন আমি তোর জন্য দুটাকা চুরি করে এনে দিতাম।তুই কখনো চুইংগাম একা খেতিনা, আমাকে অর্ধেক দিতি।আমি এখনো যখন বাড়ির কথা মনে পড়ে তখন একটা করে চুইংগাম কিনে অর্ধেক খাই আর অর্ধেক ফেলে দেই।তোদের অনেক মনে পড়ে।আপুকে বলিস আমাকে যেন মাফ করে দেয়।
মামা তুই এতগুলা টাকা চাইলি, আমার হাতে তো তখন এত টাকা ছিলোনা।নিজের চিকিৎসার কিছু টাকা ছিলো ওটাই পাঠিয়ে দিলাম।আমি আসলে এখন জানি, আমার আয়ু বেশিদিন নাই।তাই কাব্যর জীবন আমার থেকে অনেক অনেক মূল্যবান।কাজী ভাইকে বলিস, তার কবিতাগুলা সময় পেলে এখনো আমি আবৃত্তি করি।প্রতিবার পড়ি আর মনে ভাবি, এমন ভুয়া কবিতা মানুষ লিখে কিভাবে?এটাও তাকে বলবি।
মামা তোর নীতুকে আন্টিকে একবার বলিস আমাকে ক্ষমা করে দিতে।একদিন গভীর রাতে আমি তাকে ওয়াদা করেছিলাম কতগুলো স্বপ্নের কথা বলে।আমি তার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারিনি।তাকে বলিস আমাকে যেন আর মনে না রাখে”।

সেদিন ছিলো ঈদের আগের দিন, চাঁদ রাত।আমি আমার মোবাইলে আমার অনেক কষ্টে জমানো পাচশো টাকা ভরে নীতু আন্টির বাসায় গেলাম।নীতু আন্টির স্বামী দু বছর হলো মারা গেছেন।কি এক অদ্ভুত কারণে তার শ্বশুরবাড়িতে তাকে জায়গা দেয়া হয়নি।তাই এখন সে তার মায়ের সাথে থাকে।আমি যখন নীতু আন্টির বাসায় গেলাম তখন নীতু আন্টির মা ঘুমিয়ে পড়েছে।আমি নীতু আন্টিকে বললাম, “আন্টি আপনার একটা ফোন আছে”।
নীতু আন্টি কি বুঝলো জানিনা।আমাকে শান্ত কন্ঠে বললো, “ফোনটা দাও।ওর সাথে কথা হয়না অনেকদিন”।

আমি তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে মামার কাছে ফোন দিলাম লুকিয়ে।ক্রিং ক্রিং করে ফোন বেজে যখন মামা ফোনটা ধরলো তখন কানাডায় গভীর রাত।কিন্তু আমি বুঝতে পারি মামা ঘুমাতে পারছেনা।মামা এসময় জেগে জেগে কি করে তা অবশ্য আমি জানিনা।আমি নীতু আন্টিকে ফোনটা দিলে আন্টি ফোনটা নিয়ে তারা বাড়ির পিছনে গাছপালার আড়ালে চলে যায়।আমি জানি কারো কথা গোপনে শোনা খুব গর্হিত কাজ, কিন্তু তবুও আমি কান পেতে থাকি।আমি শুনতে পাই নীতু আন্টি বলছে, “তুমি আমার কাছে কেন ক্ষমা চাও?তোমার তো কোন দোষ নাই।আর তোমার কথা শোনা যায়না কেন?তোমার কি হইছে?অয়ন তোমার কি হইছে?”
নীতু আন্টি চিৎকার করে কাদে, আমিও কাদি।আমার কান্না দুটি কারণে। প্রথম কারণ, আমার মামা যাকে আমি সারাজীবন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মনে করে এসেছি সে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে কোন ভালোবাসা না পেয়েই হয়তো বিদায় নেবে খুব তাড়াতাড়ি।

আরেকটা কারণ সুখের কারণ।আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, কাব্য কাজী ভাই আর লীনা ভাবীর কোলে উঠে প্লেনে করে চিকিৎসার জন্য, এই পৃথিবীকে আরো হাজার বছর ভালোবাসার দাবী নিয়ে বেচে থাকার জন্য দূর প্রবাসে যাচ্ছে।কাজী ভাইয়ের চোখে নিশ্চয়ই তখন অনেক আনন্দজল থাকবে।কাব্য যখন বড় হবে তখন নিশ্চয়ই সে মানুষকে অনেক ভালোবাসবে।কারণ এই পৃথিবীর মানুষ তাকে ভালোবেসেছিলো।

গল্পটির সব চরিত্র কাল্পনিক, শুধু কাব্য চরিত্রটি ছাড়া।কাব্য নামের একটি ছোট্ট শিশু সত্যি বড় কষ্টে আছে।আমি যতবার শিশুটির মুখ দেখতে পাই, ততবার ভাবি আমরা এত ক্ষুদ্র কেন?প্রিয় কাব্য এই গল্পটা তোমার জন্য।আমি একটাবারও ভাবতে পারিনা যে তোমার মায়াকাড়া চোখগুলো দিয়ে তুমি পৃথিবীকে দেখতে পাবেনা।তোমার নিষ্পাপ মন নিয়ে তুমি আরো অনেক বছর সকল ভালোবাসা পেয়ে বেচে থাকো এই কামনা করি।যারা সত্যিকারের কাব্যর কথা জানতে চান তারা হয়তো নিচের লিঙ্কে যেতে পারেনঃ

কাব্য

সবশেষেঃ কাব্যকে নিয়ে লিখা পোস্টটা এখন হারিয়ে গেছে।কাব্য যেন হারিয়ে না যায়, তাই লেখাটা ব্লগে দিলাম।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29441848 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29441848 2011-09-01 20:39:21
নীল
আমি হাসি, তানজিয়া বিরক্ত হয়।প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে সে হারুনকে বলে, “এত বিয়া করার শখ কেন তোমার হারুন?”

হারুন পিছনে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, “আফা আমার তো অনেক ফ্রেমিকা।দুই চারডারে বিয়া না করলে বাচুম কেমনে”।

আমি জিপের জানালা খুলে বৃষ্টিতে হাত বাড়িয়ে তানিজিয়াকে বলি, “হৃদয়ের দাবি বুঝলা?এসব তুমি বুঝবেনা, বাচ্চা মেয়ে”।

তানজিয়া আমার দিকে একটা ঠোট বাকানো হাসি দিয়ে এমন ভাবে তাকালো যেন আমি এক অদ্ভুত চিড়িয়া।তারপর নিজের আড়ং থেকে কেনা লাল ব্যাগটা থেকে একটা কলা আর বনরুটি বের করে খেতে খেতে বললো, “আমার একটা দুই বছরের মেয়ে আছে অর্ক।আমি নিশ্চিত সে তোমার থেকেও বুদ্ধিমান।কারণ তুমি মাঝে মাঝে যেমন ছাগলের মত উদ্ভট কথা বলো, আমার মেয়েটাও এমন বলেনা”।

আমি হা হা করে জোরে জোরে হেসে উঠলাম।কিছু বললাম না।মেয়েটাকে আমি যথেষ্টই পছন্দ করি(প্রেম নয়), তাছাড়া ওকে জ্বালাতন করার মত মন মানসিকতা আমার নেই।সে কোন কথায় কি মনে করে বসে বলা যায়না।
যাই হোক।পাঠককে আমাদের অভিযানের উদ্দেশ্য জানানো দরকার।আমি একজন ছোটখাট চাকুরিজীবি, আর তানজিয়া কিছুদিন আগে ইন্টার্ণ শেষ করে এখন পূর্ণ ডাক্তার।আমাদের পরিচয় ব্লগিং করতে যেয়ে।কোন এক সোশ্যাল কাজ করতে গিয়ে পরিচয়টা আরো ভালো হয়।এই মেয়েটা খুব সোসিওপ্যাথ ক্যাটাগরীর, আমি অস্বীকার করবোনা যে আমি ওই রকম নই।আর তার জন্যই হয়তো আমাদের মাঝে একটা ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে।আমি আমার জবের বাহিরে অনেক কিছু করতে পারিনা, বা করতে চাইনা।কিন্তু মাঝে মাঝে আমি ইচ্ছা করেই শহুরে ব্যস্ততার বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে একটু শ্বাস ফেলতে চাই, সবুজের মাঝে বাচতে, টলটলে নদীর জলে নিজেকে হারিয়ে হারিয়ে খুজতে।এমনটা খুব বেশি হয়না।অফিস থেকে দুদিন ছুটি নিয়ে হয়তো বেড়িয়ে পড়ি।এ ব্যাপারগুলো আগে হতোনা, হতোনা যতদিন না তানিজয়ার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো।ওর সাথে পরিচয় হয়েই কিনা আমার মধ্যে এমন অনেক ভাবনা আসা শুরু করলো।কারণ মেয়েটা এত সুন্দর করে বিভিন্ন জায়গার বর্ণনা করে, আমার চোখে মুখে তখন লোভ ছড়িয়ে পড়ে সৌন্দর্যকে দেখার, জানার এবং উপলব্ধি করার।এক্ষেত্রে সঙ্গী হিসেবে এই অসাধারণ দৃঢ় মানসিকতার স্নিগ্ধ মেয়েটিকেই আমি বেছে নেই।অথবা সেও হয়তো আমাকেই বেছে নেয়।ওর কথা নাহয় একটু একটু বলি।

তানজিয়ার কথা বলতে গেলে প্রথমে যেটা বলতে হয় তা হলো ওকে প্রথম দেখেই মনে হয় এই মেয়েটার সাথে প্রেম করা যাবেনা।সে বন্ধু হিসেবে চমৎকার, প্রেমিকা বা বউ হিসেবে নয়।এই ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল।তানজিয়া বন্ধু হিসেবে মোটেই চমৎকার নয়। সে একটু রুক্ষ, কিছু সময় বদমেজাজী এবং আগেই বলেছি আপনাদের, সে সমাজ সংসার বিবর্জিত টাইপ একজন মানুষ।কিন্তু একটা কথা বলতেই হয়, আমি তানিজিয়াকে অনেক সম্মান করি।ওর জীবনের অল্প বিস্তর যা জানি তা জেনে এবং খানিকটা অনুধাবন করতে পারি বলেই হয়তো এই সম্মানের উৎসটা অনেক গভীর।তানিজয়া এটা বুঝে, আর এইজন্যই ও জানে আমি ওকে কখনো এমন কিছু বলবোনা যাতে ওর সম্মানে আঘাত লাগে।আর আমি আসলে তেমন কিছু ভাবতেই পারিনা।প্রেম বিয়ে জাতীয় ব্যাপারগুলোতে আমার কেন যেন আগ্রহ কাজ করেনা।

তানিজিয়া যখন সেকেন্ড প্রফ শেষ করে, ওর বিয়ে হয়ে যায়।এক বছর আদিব নামক চমৎকার একটি মানুষের সাথে অসাধারণ কিছু মুহূর্ত পার করে একদিন সব শেষও হয়ে যায়।আদিব ভাই তখন বরিশাল মেডিকেলে কর্মরত।আর তানিজিয়া সলিমুল্লাহ মেডিকেলে পড়ছে।সেসময় ও ওর থার্ড প্রফ নিয়ে প্রচন্ড ব্যাস্ত।একদিন তানজিয়াকে আদিব ভাই ফোন করে বলে, “তোমাকে অনেক দেখতে ইচ্ছা করছে।সারা রাত তোমার হাত ধরে গল্প করবো।শর্ত একটাই, তুমি চুপ করে শুনবে”।

তানিজয়া ঘ্যানর ঘ্যানর করা শুরু করে, বলে তার পরীক্ষার কথা।আদিব ভাই দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে, “ঠিক আছে আসবোনা।দু মাস পর প্রফ শেষ হলেই না হয় তোমাকে আবার জ্বালাবো”।

তানিজিয়া চুপ করে থাকে।পরে বলে, “জ্বি না জ্বি না।আজকেই আসতে হবে।যেভাবেই হোক।আমি কালকে হল থেকে বাসায় ফিরবো এবং তোমার সাথে অনেক অনেক গল্প করবো।কত কিছু বলা হয়নাই”।

আদিব ভাই রওনা দিয়েছিলো তার ভালোবাসার মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলার জন্য, তাকে একটাবার বলার জন্য আমি তোমাকে ভালোবাসি।কিন্তু সেই তৃষ্ণা বুকে নিয়েই তিনি হারিয়ে গেলেন।২৬শে জানুয়ারী ২০০৯ সালের এক গভীর রাতে একটি লঞ্চ ডুবে গিয়েছিলো, আর সেই লঞ্ছে আদিব ইউসুফ নামে একজন সাধারণ মানুষ হারিয়ে যায় চিরতরে তার ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে।তানজিয়া তার লাশটাও দেখতে পায়নি।দিনের পর দিন সে কেদেছিল, নিজেকে দায়ী করে চিৎকার করে কেদেছিলো।আমাদের আশেপাশের জগতটা বড়ই নিষ্ঠুর, তারা কেউ এই কান্নায় সাড়া দেয়নি।তাই তানিজিয়াকে একা একা পথ চলতে হয়েছে।আর সে হারিয়েও যায়নি। সে এগিয়ে গেছে, ডাক্তারী পাশ করেছে। প্রতি বৃহস্পতিবার আর শুক্রবার বিনা ভিজিটে বাড্ডায় একটা ছোট্ট ক্লিনিকে প্রসূতি মায়েদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।তানজিয়াকে কেউ যখন জিজ্ঞাসা করে, “তুমি ভালো আছো তো?”

তানজিয়া মুখে রাগ রাগ ভাব ফুটিয়ে বলে, “খারাপ থাকবো কেন?”

আমি যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম তখন বলেছিলো, “ভালো নেই অর্ক।প্রতিরাতে ও স্বপ্নে এসে আমাকে বলে, এত ঘুমাও কেন?জেগে উঠো, আমাদের না কত কত গল্প!”

যাই হোক মূল কথায় ফিরে আসি।আজকে আমাদের এই ভ্রমনের উদ্দেশ্য দুটি।এক, লালন সাই এর মাজার দেখবো।আর দুই, যমুনায় জেগে ওঠা চর হালুদিয়ায় এক মহাপুরুষের সাথে সাক্ষাত করবো।মহাপুরুষের নাম কবির ভাই।তার সাথেও আমার পরিচয় ব্লগিং করতে যেয়েই।কবির ভাইয়ের বয়স ৩৮ এর কাছাকাছি।উনি রাশিয়া থেকে পি.এইচ.ডি করে বাংলাদেশে এসে বিয়ে করেন।দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিয়ের দুই বছরের মাথায় তার স্ত্রী ভেগে যায়।কার সাথে এটা কবির ভাই নিজেও জানেনা বলেই অবগত হয়েছিলাম।এরপর মনের দুঃখে কবির ভাই কিছুদিন উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরে ফিরে এই চরে এসে আশ্রয় নেয়।তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত জায়গা থাকতে এই চরে কেন?উনি বলেছিলেন, “নদীর পাশে থাকতে ভালো লাগে।এই নদী যেমন স্রোত হারিয়ে ফেলেছে, এখানকার মানুষগুলোও তেমনি।এদের কোন আশা নেই, চিন্তা নেই।দু বেলা খাওয়া আর রাতের বেলায় একটু শোয়ার জায়গা হলেই তারা শুকুর আলহামদুলিল্লাহ বলে”।

কবির ভাই একটা ছোট্ট বেড়া দিয়ে বাধানো স্কুল বানিয়েছেন চরের বাচ্চাদের জন্য।সেখানকার ঝাড়ু দেয়া থেকে শুরু করে শিক্ষকতা সবই তার কাজ।সমস্যা একটাই বাচ্চারা পড়তে চায়না।তারা স্কুলে আসে কবির ভাইয়ের মুখ থেকে রুপকথার গল্প শুনতে।গল্প শেষ হলে যেই কবির ভাই পড়াশোনা শুরু করতে চায়, যে যেখানে পারে ছুটে পালায়।পালানোর আগে একটু ছোট্ট গুড়িগুলো কবির ভাইয়ের হাতে পায়ে কামড়ায় যায়।কবির ভাই তাকে কামড় দেয়ার রহস্য আজো উদ্ধার করতে পারেনি বলেই জানতে পেরেছিলাম।

আমরা যখন লালন সাইয়ের মাজারে পৌছালাম তখন টকটকে ভোর।মাজারে যেয়ে বড়ই কষ্ট পেলাম।গাজার গন্ধে টিকা যায়না।যখন আমরা মাজারে পা দিলাম, লাল কাপড় মাথায় দিয়ে তার খাদেমরা আমাদের দিকে ভয়ংকর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে ছিলো।কেন যেন সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে মন চাইলোনা।লালনের মত করে গুনগুন করে আবৃত্তি করছিলাম, “সব লোকে কয় লালন কি জাত এ সংসারে, লালন বলে জাতের কি রুপ দেখলাম না এক নজরে”।

হালুদিয়া চরে যখন পৌছালাম তখন কয়েকটা ১০-১২ বছরের কিশোর চরের বালি দিয়ে ঘর বানাচ্ছিলো।আমি মনোযোগ দিয়ে তাই দেখছিলাম।কবির ভাইয়ের চিৎকারে আমার ধ্যানমগ্ন হলো।কিশোরগুলো কবির ভাইকে দেখে ভেংচি কেটে ভৌ দৌড় দিলো, কবির ভাই ওদের পিছনে ছুট লাগালেন আর আমরা কবির ভাইয়ের পিছে।কবির ভাই একটু দৌড়িয়ে থামলেন, একটু বিশ্রাম নিয়ে বললেন, “সবকয়টা বিচ্ছু।পিটায়ে ছাল চামড়া এক করে দিবো”।এরপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অর্ক সিগারেট আনছো?”

আমি মাথা নাড়ি দু পাশে।পাশে তানিজিয়াকে দেখায় বলি, “ম্যাডাম বলছে সিগারেট স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর।তাই যখন কিনতে গেলাম সে বাধা দিছে এবং বলছে যে সিগারেট কিনবে আর যে খাবে দুইজনেরই ব্যাক্কেল দাত ভাঙ্গার ব্যবস্থা করা হবে”।
কবির ভাই তানজিয়ার দিকে তাকায় ঢোক গিললো।তানিজিয়া অন্যদিকে তাকিয়ে ছবি তুলছিলো।আমি তানজিয়ার দিকে তাকিয়ে তার অদ্ভুত উদাসীনতা দেখছিলাম।

কবীর ভাই আমাদের জন্য চরটা ঘুরে দেখানোর ব্যবস্থা করলো।চরের মানুষগুলোকে জানার ও চেনারও ব্যবস্থা করলো।মানুষগুলো বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসেছে।সবাই বড়ই চালু প্রকৃতির।কিন্তু তারা ভালো মানুষ, অন্তত আমার এমন মনে হয়েছিলো।চরের মাঝে একটা ছোট্ট নদীর ধারা বয়ে গেছে।সেটা পার হওয়ার জন্য আমাদের একটা সাকোতে উঠতে হবে।আমি এ ব্যাপারটায় খুব অস্বস্তি বোধ করলাম।মনে আছে ৯৮ এর বন্যায় সাকোতে উঠতে যেয়ে চিৎপটাং খেয়েছিলাম।কিন্তু আজকে সাথে তানজিয়া আছে, কবির ভাইও ফরফর করে পার হয়ে গেলো সাকো।তাই আমি অনেক সাহস বুকে নিয়ে সাকোর কাছে গেলাম।তানজিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আমার হাত ধরে পার করতে পারবা?এমন সাকোতে উঠার অভ্যাস নাই। ভয় লাগে”।

আমি হতচকিত হলাম এবং নিজেকে সামলিয়ে সাকোতে উঠে এক হাতে সাকোর বাদিকে ধরে আরেকটা হাত তানজিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেই।যেইমাত্র সে আমার হাতটা ধরলো আমার পুরো শরীর কেপে উঠলো এবং আমি বুঝতে পারলাম আমার হৃদয়ের পুরোটা এই উদাসীন মেয়েটাকে দিয়ে বসে আছি।আই এম জাস্ট এ স্টুপিড।তানজিয়া কি কিছু টের পেল?আশা করি না।

দুপুরবেলা কবির ভাই নিজে আমাদের জন্য নদীর টাটকা শিং মাছের ভর্তা, ছোট ছোট করে কাটা আলুর ভাজি, গাঢ় মুগ ডাল আর কচি লাউ এর স্যুপ জাতীয় কি যেন এনে দিলো।আমি খাচ্ছি আর মনে মনে বলছি, কবির ভাই আপনি মহান।আমাদের সাথে আরো কিছু ছোট বাচ্চা খাচ্ছিলো।এর মধ্যে একটা বিড়াল ছানার মত।বয়স বেশি হলে ৫ হয়েছে, সারা মুখ মাখিয়ে ভাত খাচ্ছে।আমি বললাম, “কিরে বেটি এমন করে ভাত খায় কেউ?”

পিচ্চি আমার দিকে রাগ রাগ করে তাকিয়ে বলে, “খিদা লাগে না?”
আমার চোখে পানি এসে গেলো।কবির ভাই হেসে বললেন, “এইগুলা আমার এক একটা বাচ্চা।একটারও মা বাপ নাই, কোথা থেকে আসছে আল্লাহ মাবুদ জানে।ওদের খেতে দেখলেই কি যে শান্তি লাগে অর্ক, তুমি বুঝবেনা”।

আমি কিছু বলিনা, কবির ভাই হয়তো বুঝবেওনা আমার আজকে একবেলা এই দেবশিশুদের সাথে বসে দু মুঠো ভাত খেয়ে কি অসাধারণ অনুভূতি হলো।সন্ধ্যার একটু আগে আগে আমরা রওনা দেবার আগে কবির ভাই আমাকে ডেকে বললেন, “অর্ক তোমার ভাবী চিঠি লিখেছে।আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি ভালো আছি নাকি”।

আমি মাথা নিচু করে বলি, “ভাইয়া ভাবীকে চলে যেতে দিলেন কেন?”

কবির ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “দু বছর ওর সাথে ছিলাম।মেয়েটা এত ভালো ছিলো যে কখনো বলতেও পারেনি যে সে আরেকজনকে ভালোবাসে।আমি বারবার ভাবতাম সে আমার সাথে সহজ নয় কেন?আমাকে আপন ভাবেনা কেন?কাছে আসেনা কেন।নিজে নিজে বের করে জানলাম ছেলেটার কথা।ও অভিমান করে আমাকে বিয়ে করেছিলো, সেই অভিমানটায় ও নিজে কতটা পস্তাচ্ছিলো তা আমি ভালো করেই জানি।আমি নিজেই ওকে বলেছি নিজের জীবন নতুন করে শুরু করতে।আমার আর কোন উপায় ছিলোনা ছেলে”।

আকাশের চাঁদ যখন তার সবটুকু জাদুকরী স্নিগ্ধতা নিয়ে আমাদের গায়ে এসে পড়লো, তখন আমি তানজিয়ার দিকে তাকিয়ে তাকে দেখছিলাম।সে ঘুমিয়ে আছে।মাথায় ওড়না দিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।এই মেয়েটাকে আমি কখনো বলতে পারবোনা আমি তাকে কতটা চাই।কারণ আমি ওকে অসম্মান করতে পারবোনা।ও প্রচন্ড কষ্ট পাবে যদি আমি কখনোও ওকে এমন কিছু বুঝাতে চাই।আমরা বন্ধু, ভালো বন্ধু।এইখানে এসবের স্থান নেই, অন্তত ওর কাছে নেই।সে আবিদ ভাইকে অনেক ভালোবেসেছিলো আমি তা জানি।মাত্র দু বছর হলো ওর জীবনে সেই ভয়ংকর দিনটি এসেছিলো।ও সেইদিনের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা নিয়ে আজো বেচে আছে, সেখানে আমার কোন স্থান নেই।একদম নেই।


রাত একটু গভীর হলে তানজিয়া ঘুম থেকে জেগে উঠলো।আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “অর্ক ক্ষিদা লেগেছে।গাড়িটা কোথাও থামায় কিছু কিনে খাওয়া যায়না?”
আমি মাথা নাড়ি।হারুনকে বলি কোন একটা ভালো হোটেল দেখে গাড়ি থামাতে।হঠাৎ করে একটা দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ পাই।তানজিয়ার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম ওর খুব মন খারাপ।আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনা, গাড়ির জানালা খুলে বাহিরে তাকিয়ে এমন ভাব করি যেন কিছু খেয়াল করিনা।তানজিয়া আমাকে বলে নিজে থেকেই, “এই রাস্তা দিয়ে জানো এর আগেও পার হয়েছিলাম।ওইযে সামনে একটু গেলেই একটা ছোট্ট ব্রিজ পড়বে, বেন্টিংটনের ব্রিজ।আমি আদিবের হাত ধরে ব্রিজের উপর দিয়ে হেটে হেটে পার হয়েছিলাম”।

আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, “বাকি জীবনটা কি এভাবেই কাটাবে?”
তানজিয়া জিজ্ঞেস করে, “কিভাবে?”

আমি কিছু বলিনা।একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আকাশের চাঁদ দেখি।তানজিয়া বলে, “আমার বাসায় আমাকে বিয়ে দিতে যাচ্ছে আবার।আমার ভাইয়ার এক বন্ধু অনেকদিন পর ইউ.এস.এ থেকে এসেছে আমাকে বিয়ে করার জন্য।লোকটা আমাকে আদিবের সাথে বিয়ের অনেক আগে থেকে পছন্দ করতো।ভালো লোক ছিলো, কিন্তু আমার ওভাবে কখনো ভাল লাগেনি।আমার কাউকেই ভালো লাগেনা অর্ক।আম্মু আব্বু অনেক কষ্ট পায় তাই আমি কিছু বলিনি”।

আমি হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি।আজই প্রথম জানলাম এই মেয়েটাকে ছাড়া আমার জীবনটা কতটা অসম্পূর্ণ, আর আজই সে এভাবে হারিয়ে যেতে চাচ্ছে।আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “চলো ভালো হোটেল পাওয়া গেছে, কিছু খেয়ে নেয়া যাক”।

অনেক ভোরে যখন ঢাকা পৌছালাম তখন চারদিকে ভয়ংকর কুয়াশা।সূর্যটা খুব লালচে মনে হলো, যেন কোন নিষ্ঠুর সীমার তার ত্রিফলার কুৎসিত আঘাতে সূর্যের বুকে আঘাত হেনেছে বারংবার।আমি চোখ ফিরিয়ে নেই।তানজিয়ার বাসার সামনে গাড়ি থামলে আমি ওকে বলি, "শুভ সকাল তানজিয়া ম্যাডাম।গাড়ি থেকে ঝটপট নেমে প্রস্থান করুন।আমাকে দ্রুত বাসায় ফিরে বিশাল ঘুম দিতে হবে”।

তানিজয়া দাত বের করে বিশাল হাসি দিয়ে বললো, “তোমাকে অজস্র ধন্যবাদ।এক কাপ চা খেয়ে যেতে পারো চাইলে।আম্মু তোমাকে দেখতেও চেয়েছিলো”।

আমি হেসে বলি, “স্যরি আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইনা এটা আন্টিকে জানায় দিয়ো।আই প্রেফার টু বি এলোন”।
তানজিয়া গম্ভীর মুখে বললো, “জানি।আমার বিয়ে হয়েছিলো, ছোট্ট একটা মেয়ে আছে।এইজন্যই তো হা?”

আমি একটা অদ্ভুত কাজ করলাম তখন যেটা আসলে ওই পরিস্থিতে শোভনীয় নয়।কেন করলাম তাও জানিনা।আমি তানজিয়ার হাত ধরে বললাম, “না সেজন্য নয়।তুমি চাওনা এই জন্য”।

তানজিয়া হাতটা আস্তে করে সরিয়ে নিলো আর আমিও ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে জোরে জোরে হেসে দিলাম।এরপর বুঝলাম এতে আরো ব্যাপারটা অদ্ভুত দাড়াচ্ছে।তাই শেষমেষ ওকে বললাম, “তানজিয়া যাই।আন্টির সাথে আরেকদিন না হয় দেখা হবে”।

তানজিয়ার হতভম্ব দৃষ্টিকে পেছনে ফেলে আমি সামনে এগিয়ে যাই।হারুন জিজ্ঞেস করে, “স্যার কোথাও নাইমা নাস্তা করবেন।সামনে আল কারীম হোটেল আছে।ওইহানে ভালো খাসীর মাংসের ভুনা এখন পাওয়া যাইবো”।


আমি তানজিয়ার সাথে দু মাস লজ্জায় কথা বলিনাই।আমার বারবার মনে হচ্ছিলো ও কিছু একটা বুঝে গেছে।আমি নিজের উপর প্রচন্ড ঘৃণা বোধ করছিলাম।কেন আমার তাকে ভালোবাসতে হবে?কেন তাকে এভাবে আমি অসম্মান করবো?নিজেকে প্রতিদিন আমি ধিক্কার দিয়েছি।যখন দু সপ্তাহ যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর ও ফোন করেছিল আমার নাম্বারে আমি কেন যেন ফোনটা ধরিনি।আমার ইচ্ছা করেনি একদম।তাই একদিন যখন ও আমার বাসায় এসে পড়লো সরাসরি আমি প্রচন্ড বিরক্তি বোধ করেছিলাম।হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলাম, “তানজিয়া আমি একটু অসুস্থ ছিলাম বেশ অনেকদিন, তাই যোগাযোগ করতে পারিনি”।

তানজিয়া মিষ্টি হেসে বললো, “কোন ব্যাপার না।তোমাকে একটা ভালো খবর দিতে এলাম।আমার সামনের মাসে দ্বিতীয় বিয়ে হতে চলছে।তোমাকে আসতে হবে।আমি আমার কোন বন্ধুকে এভাবে নিজে যেয়ে দাওয়াত দেইনাই।তোমাকে দিলাম, তাই আমার সম্মানটা রক্ষা করো।ঠিক আছে?”

আমি ওর অদ্ভুত মায়াকাড়া চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আচ্ছা”।

অনেক অনেক রাতে আমার হাতে একটা নীল রঙের সুপ্রভাতের ছবি আকা কার্ড।আমার ছোট্ট ঘরের চারদিকে নীল রঙ্গা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে তা একটুও কার্পণ্য করেনা।আমি মুগ্ধ চোখে তানজিয়ার বিয়ের কার্ডের দিকে তাকিয়ে থাকি, ওতে আকা সবগুলা আলপনা কেমন যেন জীবন্ত হয়ে আমাকে ভেতরে ঢুকে উকি দেয়।আমার ভেতরে ধক করে উঠে যতবার ভাবি এই মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলবো আমি। কয়েক মুহূর্ত পর সে হারিয়ে যাবে কোন এক অজানা বাহুডোরে।হয়তো সে অনেক সুখী হবে, আমার করা হাজার প্রার্থনার থেকেও সুখী।তার চোখে হয়তো আকা হয়ে থাকবে নতুন ভালোবাসার গল্প, একটা নতুন স্বপ্নের সাতরঙ্গা রংধনু।ভাবতে অনেক অনেক কষ্ট লাগে যখন মনে হয় সেই সাতটি রঙ্গে একটাও আমি হতে পারবোনা।আমি তবুও কার্ডটাকে আমার পাশে নিয়ে শুয়ে থাকি।বালিশের অসমান উচু নিচু ধাপগুলো পেরিয়ে আমার দৃষ্টি বারবার কার্ডের উপর পড়ে।আমি ভিতরে খুলে দেখার সাহস পাইনা, একদম না।
*******************************************************************

আমার খুব কল্পনা করতে ইচ্ছা করে তানজিয়া এসে একদিন অর্কর হাত ধরে বলবে, “চলো আবার কোথাও ঘুরে আসি”।কিন্তু এমনটা হয়না, কেন যেন হয়না।সবসময় আমি এই বিশাল বিশাল স্বপ্নময় প্রেমের গল্প লিখি, আজকে একটা বাস্তব গল্প লিখলাম।এমন বাস্তব গল্পে, ভালোবাসাগুলো কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে থাকে।তাদেরকে ছোয়া যায়না, শুধু অনুভব করা যায়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29436761 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29436761 2011-08-22 17:10:02
অহনার ভালোবাসা
অহনার বরের নাম ফয়সাল।ফয়সালের সাথে অহনার একবার দেখা হয়েছিলো, শুধু ওই একবারের দেখাটিও হতোনা যদি অহনা জানতো ফয়সাল তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে।অহনার সাথে যখন ফয়সালের দেখা হয় তখন সে ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসে চা আর সিঙ্গারা খাচ্ছে।তার মুখ ভরা তখন ক্যন্টিনের ঝাল সিঙ্গারা।হঠাৎ ফয়সাল তার সামনে বসে বললো, “আস্তে আস্তে খান।গরম চা হঠাৎ করে খেলে হার্টে ধাক্কা লাগে”।

অহনা হা করে তাকিয়ে ভাবছিলো কি করবে।ট্রেডিশনাল মেয়েদের মত সে কিছুই বললোনা, চুপ করে উঠে যাচ্ছিলো।ঠিক তখন তার মনে হলো, ছেলেটা তার কাজিনের বন্ধু।একবার তাদের বাসায় এসেছিলো।তখন লজ্জায় কথা বলতে পারেনি।অহনা বুঝতে পারছিলোনা সে এখন কি করবে।অবশেষে সে নিজেই বললো, “ভাইয়া কেমন আছেন”?

ফয়সাল মুচকি হেসে বললো, “বাহ আপনি তো দেখি আমাকে মনে রেখেছেন।অনেক ধন্যবাদ সেজন্য।কেন আপনার সাথে এখন আমার দেখা হলো তা কিন্তু জিজ্ঞেস করলেন না”।

অহনা বিব্রত বোধ করলো বেশ।আজকে তার সাথে এক বিশেষ মানুষের দেখা হওয়ার কথা।এসময় একটা উটকো ঝামেলা তার একদম ভালো লাগছেনা।সে ভদ্রতা বজায় রেখে বললো, “ভাইয়া আমার একটু কাজ আছে।আমি যাই।পরে দেখা হবে”।

ফয়সাল চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলো।অহনার পাশে বসে সে বললো, “পাচ মিনিট সময় দিন।আপনার সাথে একটু কথা আছে”।

অহনা অত্যন্ত বিরক্ত হলো, এমন পাচ মিনিট সময় তার কাছে অনেকে চেয়েছে এবং পরে তাকে নিজেদের অসীম ভালোবাসার গল্প ব্যাখ্যা করেছে।অহনার কোন সমস্যা ছিলোনা যদিনা সেটা পাচ মিনিটের জায়গায় ৫০ মিনিট, কখনোবা ৩-৪ ঘন্টাও হয়ে যেত।কন্ঠে অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে সে ফয়সালকে বললো, “আমার তাড়া আছে।একটু তাড়াতাড়ি বলুন”।

ফয়সাল হাসিমুখেই বললো, “আপনার কাজিন ইমতি আজকে বিয়ে করতে যাচ্ছে।সে চাচ্ছিলো যেন আমি আপনাকে নিয়ে কাজী অফিসে যাই।আপনাকে আমি পিক করতে এসেছিলাম, এত বিরক্ত হবেন জানলে আসতাম না।আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন আমি আপনার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে প্রস্তাব দিতে আসছি”।

অহনা একটা বিষম ধাক্কা খেলো ওর কাজিনের বিয়ের কথা শুনে।এটা সে একেবারে আশা করেনাই।তার কাজিন হলো ফার্মের মুরগী টাইপ ছেলে।তার একটাই কাজ, বিশাল বড় একটা চশমা পড়ে মোটামোটা বই পড়া আর একটু পরপর বলা, “আম্মু ক্ষিদা লাগছে।কিছু খাইতে দাওনা কেন”?

সে ফয়সালকে বললো, “মেয়েটা কে”?

ফয়সাল বললো, “আমাদের এক ক্লাসমেট।আজকে সকালে মেয়ে এসে ইমতিকে বললো যে সে ইমতিকে ভালোবাসে।যদি ইমতিও তাকে পছন্দ করে এখনি যেন তাকে বিয়ে করে।আর ইমতিও মেয়েটাকে বহুদিন ধরে ত্যাক্ত করছিলো প্রস্তাব দিতে দিতে।মেয়ে আজকে ওকে শিক্ষা দিতে এমন করলো বলতে পারেন।ইয়েস, বাট টু সে দ্যা ট্রুথ, মেয়ে ওকে আসলেও ভালোবাসে।কিন্তু ও একটু মোটকা তো তাই সময় নিচ্ছিলো”।

অহনা মেজাজ খারাপ করে বললো, “কাজী অফিস চলেন।আজকে ওর ছাল চামড়া আমি তুলবো”।অহনা ইমতির বিয়েতে শেষ পর্যন্ত সাক্ষী হয়েছিলো এবং বিয়ের পর কাদতে কাদতে বলেছিলো, “ভাইয়া তুই সুখে থাকিস।এই নে পাচশো টাকা।ভাবীকে আইসক্রীম খাওয়াইস”।ইমতি রাগ করে বলেছিলো, “যা বেটি ফকিরা”।

ফয়সাল তার কিছুদিন পর বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়।অহনা সেদিনই তার সাথে দূরালাপনে বলেছিলো, “আপনি কাজটা ঠিক করেননি”।অহনা কেন এমন বলেছিলো এবার সে গল্পে আসা যাক।

অহনাদের থেকে এক ব্যাচ আগের একটা ছেলের জন্য অহনা সব ভালোবাসা জমা করে রেখেছিলো এবং অদ্ভুত হলেও সত্য সেটা ওই ছেলেটাও হয়তো জানতোনা।অহনা কেন যেন ছেলেটাকে বলতে পারেনি।অহনা ঠিক করেছে ছেলেটাকে কখনোও সে বলবেনা তার ভালবাসার কথা, তার সব লুকিয়ে রাখা চাওয়া পাওয়ার অনুভূতিগুলো।কেন বলবে সে?কি করে বলবে সে?এসব ভাবতে ভাবতে প্রায় রাতেই সে দুঃস্বপ্ন দেখে।সে স্বপ্নে দেখতে পায় তার সাথে আরেকটি ছেলের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।তার হাতে একটি বিষ খাওয়ার শিশি।ঘুম ভাঙ্গলে সে ভয়ঙ্কর রেগে যায় নিজের উপর। এমন বাংলা সিনেমা টাইপ জিনিসপত্র কেন সে স্বপ্নে দেখে সে নিজেও জানেনা।

অহনা কেন ছেলেটাকে অনেক চেয়েছিলো তা কি সে জানে?মজার ব্যাপার হলো এটাও সে জানেনা।তার সাথে অর্কর প্রথম দেখা মধুর ক্যান্টিনের পাশে যে আকাবাকা গলিটা মেইন রোডের দিকে বেরিয়ে যায় ঠিক সেখানে।তার সাথে ছিলো তখন তার ক্লাসমেট ইলা।ইলা আর অর্কর মধ্যে পরিচয় ছিলো কারণ তারা দুজনই ছবি আকতো।অনেক জায়গয়ায় তাদের দেখা সাক্ষাত হয়েছিলো।ইলার ছবি আকার জগতে অর্কর একটা বিশাল ভূমিকা ছিল।জলরঙ্গে কিভাবে জীবনকে মেটাফোরিক সামেশনে দেখা যায় এটা অর্কর থেকে বেশি কে জানে! ইলা সেটা শিখার অনেক চেষ্টা করেছে অর্কর থেকে।কিন্তু ওটা সবাই পারেনা যে।ইলাও পারেনি এবং অনেক সময় গভীর রাতে অহনাকে সে ফোন করে বলে, “অর্ককে বুঝায় বল আমার সাথে প্রেম করতে।আমি ওর সাথে সারাদিবস ছবি আকা শিখবো”।

যেদিন অহনা প্রথম অর্ক এর বাসায় গিয়েছিল, তখন তারা অনেক গল্প করেছিলো।হাসিনা আপা ও খালেদা দাদুকে নিয়ে।দুজনেই মনের সুখে এই দুই মহিয়সী নারীর গুষ্টি উদ্ধার করেছিলো।অর্ক এত সুন্দর করে গালি দিচ্ছিলো, অহনা তাৎক্ষণিক তার প্রেমে পড়ে যায়।অর্কের প্রিয় উক্তি ছিলো, “এই জীবনে প্রেম করিনাই কোন নারীর সাথে তার কারণ একটাই, এই দুই দেশনেত্রী/জননেত্রী।মেয়েদের দেখলেই ভয় লাগে যে এদের মাঝেই এই মহান নারীরা লুকিয়ে আছে নাকি আবার”!

এগুলো ও জোকস করে বলতো।অহনাকে সে প্রায় সময় বলতো, “আমি তোমার সাথে প্রেম করতে চাই”।অহনা বলতো, “কোন এক বৃষ্টিস্নাত জোসনা রাতে হাতে একগুচ্ছ কদম ফুল নিয়ে যেদিন বলতে পারবেন সেদিন শুধু আমার থেকে কিছু উত্তর পাবেন”।

অহনা অনেক অনেক দিন অপেক্ষা করেছে সেই জোসনা রাতের জন্য।কিন্তু কখনো তা আসেনি।কারণ তখন অর্ক ছবি আকে, শুধুই ছবি আকে তার তুলিতে জীবনের রঙ মিশিয়ে।তার কি কখনও সময় হবে এটুকু ভাবার যে তার জন্য অহনার মত একটা সাধারণ মেয়ে পড়ার টেবিলের ছোট্ট বিড়ালমুর্তির ঘড়িটা নিয়ে বসে বসে খেলা করে একজোড়া অশ্রুভেজা নয়ন নিয়ে? অহনা একদিন অনেক অনেক রাগ করে অর্ককে ফোন করেছিলো, “আপনি কিছু বুঝেন না কেন”?

অর্ক অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলেছিলো, “কি বুঝতে চাইবো?আমার কি কিছু বোঝার আছে তোমার থেকে”?

অহনা কিছু বলেনাই।ফোনটা রেখে দিয়েছিলো।এটা দুমাস আগের ঘটনা, এরপর অর্কর সাথে তার আর কখনো কথা হয়নি।অহনা অভিমান করেছিলো এবং এজন্য সে কাদতো কারণ তার মনে হতো যার জন্য অভিমান করেছে সে, সেই তো জানেনা কেন এত অভিমান। কেন তাকে এবং তার অনুভূতিকে এমন অপমান করলো ছেলেটা?

অহনাকে বিয়ের জন্য তৈরী করা হচ্ছে।তাকে হালকা নীল, মাঝে কালো আর লালের সূক্ষ হাতে করা কাজের আল্পনাময় শাড়ি পড়ানো হচ্ছে।তার ভয়ংকর গম্ভীর মুখ দেখে সবাই একটু বিমর্ষ।কেউ জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছেনা আজ অহনার বিয়ে, অথচ সে কেন এতো মলিন হয়ে আছে।পাঠক আপনারা খেয়াল করবেন, মেয়েদের বিয়ের দিনে তাদের বিয়ের সাজে না সাজালেও বলে দেয়া যায় সেইই আজকের বিশেষ নারীটি।যাদের মধ্যে এই ব্যাপারটি নাই, তাদের জন্য বুঝতে হবে তাহারা এই বিয়ের জন্য আগ্রহী নয়।অহনার চোখে এমন এক ভয়ংকর শূণ্যতা লুকিয়ে ছিলো যা সবার মনে কাটা বিধিয়েছিলো।অবশেষে তার ছোট বোন ইনা তাকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, আপু তুই কি বিষ খাবি?অহনা কিছুই বলেনি।তার দুচোখ বেয়ে শুধু অম্লজল ঝরে পড়েছিলো বোধ করি।

মধ্যবিত্ত ঘরের এক অতি সাধারণ মেয়ের ভালোবাসার মূল্য কি আমরা জানি?তার গভীরতা পরিমাপ করার যন্ত্র কি আবিষ্কৃত হয়েছে?বোধ করি না।তারা সর্বদাই অবহেলিত, তাদের ভালোবাসাগুলো প্রায়ই মুখ থুবড়ে পড়ে।প্রায় সময় তা কেউ ছুয়ে দেখেনা, যারা ছুয়ে যেতে যায় তাদের অনেকেই হারিয়ে যায় নয়তো ধোকা দিয়ে যায়।প্রিয় অহনা, আপনার ভালোবাসার মূল্য আপনি বুঝে পাননাই এইজন্য লেখক দুঃখিত।

সাতবছর পর কোন এক কাকডাকা ভোরে অহনা ঢুলুঢুলু চোখে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায়, আকাশটা অনেক অভিমান করে আছে।অহনা আলতো পায়ে চুপি চুপি হেটে জানালার পাশে যখন দাড়ালো, তখন তাকে ভড়কে দিয়ে একটা ছোট বর্জপাত হলো।অহনা প্যারিসের প্লাযা এথিনি হোটেলের এক চমৎকার স্যুটে বৃষ্টির প্রতীক্ষায় গভীর আগ্রহ নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকলো।ফয়সাল তখন তার সাথে নেই, ব্যবসায়িক কাজে সকালবেলাতেই সে বের হয়ে গেছে।অহনা কিছুক্ষণ চুপ করে কি যেন ভাবলো, তারপর পোশাক বদলিয়ে তড়িঘড়ি ক্রে হোটেল থেকে বের হয়ে আসলো বৃষ্টি দেখার জন্য।মন্টেইন এর প্রশস্ত গলি দিয়ে সে গুটি গুটি পায়ে হাটতে হাটতে একটা চমৎকার ক্যাফেটেরিয়া পেয়ে গেলে সেখানে এক কাপ কাপুচ্চিনো পানের প্রবল আকুতি হলো তার।ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরে ঢুকে সে মুগ্ধ হয়ে গেলো।ফ্রান্সের জাকালো হোটেল আর রেস্টুরেন্টের ফাকে এত চমৎকার একটা ছিমছাপ কফি খাবার জায়গা থাকতে পারে সে ভাবেনি।কত রকমের বাহারী বোতল আর তাতে ভরা আদিম সুধা তাকে আরো মুগ্ধ করলো।ভেতরে ঢুকে সে ছোট্ট এক কোণে বসে পড়লো।
একটু পর যখন তার সামনে কফি আসলো সে খেয়াল করলো কফি নিয়ে আসা ছেলেটা অর্ক।অর্ক মুচকি মুচকি হেসে বললো, "সখি যাতনা কাহারে বলে গানটি কি শুনেছো মেয়ে?"

অহনা মাথা নাড়লো।এর অর্থ দুরকমই হতে পারে। অর্ক কোন এক অর্থ ধরে নিয়ে বললো, "আমার এক্সিবিশনে আমি সারাদিন এই গানটাই বাজাচ্ছি।বোকা ফ্রেঞ্চরা গানের কথা কিছুই তো বুঝেনা, শুধু আমাকে এসে বলে অদ্ভুত আদিম সংগীত।আফসোস তারা আমাদের মহাকবিকে চিনতে পারেনি।আমি মনে করি এদের জীবন শুধু এই একটি কারণে অর্ধেকটাই বৃথা।"

অহনা জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কেমন আছো?কেন আমার সাথে এখন দেখা করলে?"

অর্ক হাসছে, শুধু হেসেই যাচ্ছে।হাসি থামিয়ে অনেক কষ্টে বললো, "তোমাকে রাজকুমারীদের মত লাগছে।তুমি আগে এত সুন্দর ছিলেনা।এইজন্য চাইলেও আগে বলতে পারিনি, তোমাকে আমি কতটা চাই।আচ্ছা বলবে কি, তুমি এভাবে হারিয়ে গেলে কেন হঠাৎ করে?আমি তো শুধু বুঝতে চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে কতটুকু বুঝেছো?"

অহনা অত্যন্ত বিরক্ত হলো, "তুমি এতদিন পর এইসব বলছো কেন?আমি তোমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী নই।ভালো থাকো।"

এই ঘটনার পর তারা প্রতিটি সুন্দর ভোরে এক সাথে চা পান করতো।তাদের গল্পের বিষয় ছিলো দেশ, দেশের মানুষ, দেশের সংস্কৃতি এবং সবকিছু ছাপিয়ে ভালোবাসা।অহনা গত সাত বছরে একবারের জন্যও যেই মানুষটাকে ভুলতে পারেনি, প্রতিটি নিঃশ্বাসে যাকে একবার করে ভালোবেসেছে, যেই মানুষটা তার অনুভূতিগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলো তার প্রতিটি আবেগী অনুভূতির অদবদলের অপর প্রান্তে থেকে আজ তাকে আবার সে নতুন ভাবে আবিষ্কার করলো।ক্যাফে মন্টেইনের ছোট্ট ওই কোণায় তারা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কত আবেগ, কত অনুভূতির খেলা করতো তা পাঠককে জানানোর ভাষা আমার ক্ষমতায় নেই।

সন্ধ্যার দিকে ফয়সাল যখন তাদের স্যুটে আসলো, অহনার তখন প্রচন্ড মন ভালো।আজকে অর্ক তাকে স্প্যানিশ গিটার বাজিয়ে একটা গান শুনিয়েছে। সে তখনো ওই একটাই গান গেয়ে চলছে।কিন্তু ফয়সালকে দেখে হঠাৎ করে সব সুর যেন কেটে পড়লো।গান থামিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো, "কিছু খেয়ে এসেছো?"

ফয়সাল মাথা নাড়লো, তার হাত থেকে একটা ছোট্ট পুতুল উকিঝুকি মারছে।ওটা অহনার জন্য।ফয়সাল অহনার পাশে বসে ওর হাতে পুতুলটা দিয়ে বললো, "এটা ১৬০০ শতকে বানানো।ইউরোপের দিকে ওই সময় কিছু প্রাচীন সাধু বাস করতো যারা নিজেরাই নিজেদের পূজা করতো।তারা বলতো, সৃষ্টিকর্তা তাদের অন্তরে বাস করেন।এই মূর্তিটা তাদেরই বানানো।আমি তোমার জন্য আনলাম।তোমার এন্টিক জিনিস ভালো লাগে তো?"

অহনা মাথা নেড়ে বললো, "না ভালো লাগেনা"।

অহনার কথায় হয়তো একটু রাগ ছিলো যেন যা শুনে ফয়সাল ঘাবড়ে গেলো কিছুটা।আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কখনও আমি কিছু দিলে পছন্দ করোনা।এর কারণ কি আমি তোমার অপছন্দ?অথবা আমার পছন্দগুলো খুব খারাপ?"

অহনা ফয়সালের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, "আমি তোমাকে সবসময় বলে এসেছি আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারবোনা।আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করেছি তোমার সাথে থেকে শুধু শুধু আমি দুজনের জীবন নষ্ট করতে পারবোনা।আমি মনে করি, আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত।অনেক হয়েছে তাই না?"

ফয়সাল অহনার মাথায় হাত দিয়ে বললো, "এই কথাগুলো সাহস করে বলতে পারার জন্য ধন্যবাদ।হ্যা আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম।অহনা, আমাকে তুমি ক্ষমা করো তোমাকে বিয়ে করার জন্য।একটাবারো যদি আমি বুঝতাম, তুমি আর কাউকে চাও আমি তোমার জীবন এভাবে নষ্ট করতাম না।আমার থেকে যা যা সাহায্য দরকার তুমি চেয়ে নিও।"

অহনার মেজাজটা অত্যন্ত খারাপ হলো।ফয়সাল নামের এই মানুষটা তার সাথে কখনো ঝগড়া করেনাই।অহনা জানে ফয়সাল তাকে অনেক ভালোবাসে, যতটা সে বাসে অর্ককে।আজকে অহনা এভাবে ফয়সালের ভালোবাসাকে অপমান করলো, ফয়সাল একটুও রাগলো না কেন?অহনার খুব ঝগড়া করার ইচ্ছা ছিল।তবে সে মনে হয় কিছুটা সুখীও হলো।সে আবার অর্ককে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করবে, আবার ভালোবাসতে শিখবে।দুনিয়া কি ভাবলো না ভাবলো তাতে তার কি?

ফয়সালের থেকে যেদিন বিদায় নেওয়ার সময় হলো, অহনা তখন দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে ফয়সালের কাছে এসে বললো, "আমি স্যরি।আমি তোমার কাছে হাজার বছর কৃতজ্ঞ থাকবো ফয়সাল।তুমি এই যে আমাকে মুক্তি দিলে, আমার ভালোবাসার কাছে যেতে দিলে এতোটা ত্যাগ স্বীকার কেউ করেনা।তুমি অনেক ভালো মানুষ।থ্যাঙ্কস, থ্যাঙ্কস, থ্যাঙ্কস।"

ফয়সাল তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে,মাঝে মাঝে বৃষ্টির ঝাপটা তার সাথে লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে।অহনার কথা শুনে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "অহনা তুমি কি জানো আমি আর তুমি কেন ফ্রান্সে এসেছি?"

অহনা কৌতুহলী হয়ে ফয়সালের দিকে তাকিয়ে বললো, "একথা কেন জিজ্ঞেস করছো এখন এই সময়?"

ফয়সাল অহনার খুব কাছে দাঁড়িয়ে বললো, "আমাদের বিয়ের পর তুমি একদিন অর্কর সাথে দেখা করার জন্য বাসা থেকে কিছু না বলে চলে গিয়েছিলে।আমি তোমার পিছে পিছে গিয়েছিলাম।যখন তুমি ওর সাথে টি.এস.সির গোল চত্ত্বরে বসে ছিলে,আমার অনেক রাগ হয়েছিলো।আমি তোমার কাছে দৌড়িয়ে গিয়েছিলাম।তোমাকে বলেছিলাম, আমাকে ভালোবাসা কি খুব কষ্টকর ছিলো?তুমি আমার উপর প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে অর্কর হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছিলে মনে আছে?"

অহনা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলো, মূর্ছা যাওয়ার আগে তার শুধু মনে পড়লো একটি রক্তাক্ত মুখের কথা, অনেকগুলো মানুষ আর তার চিৎকার করার কথা।ওই রক্তাক্ত মুখটা তার সারা জীবনের ভালোবাসার মুখটির, তার সবগুলো অনুভূতির ছন্দবদ্ধ প্রকাশ ওই মুখে লুকিয়ে আছে।শেষবার সে মুখটি ছুয়ে দিয়েছিলো তার সব ভালোবাসা দিয়ে।ভয়ংকর চিৎকার করেছিলো যখন সে বুঝতে পারলো তার ভালোবাসার মানুষটি হারিয়ে গেছে চিরতরে, আর কখনো ওর ছবিগুলোর দিকে চেয়ে তার সুন্দর হাতটি ছুয়ে দিতে পারবেনা।ফয়সালের সাথে বিয়ের পর সে হঠাৎ একদিন অর্কর দেখা পায় তাদের বাড়ির সামনে।অর্ক সেদিন তার হাত ধরে বলেছিলো, "অহনা আমার সকল ছবিতে যে জিনিসটি আমি খুজে পাইনা তা তোমার মধ্যে বারবার দেখি জানো।তুমি এভাবে হঠাৎ করে বিয়ে করলে কেন?আমি তোমার জন্য কত স্বপ্ন দেখেছি তুমি জানোনা।"

অহনার যখন জ্ঞান ফিরলো তখন মধ্যরাত্রি।চারদিকে বিখ্যাত ইউরোপিয়ান নিস্তব্ধতা আর শুধুই একটি কোণায় ফয়সাল অহনার মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।অহনা উঠে বসলো, তার পুরো মাথা কেমন যেন আবদ্ধ হয়ে আছে।ফয়সালের দিকে তাকিয়ে বললো, "কতবছর ধরে এমন চলছে?"

ফয়সাল অহনার থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে বললো, "যখন থেকে ওই এক্সিডেন্টটি হলো,তুমি কখনো মেনে নিতে পারোনি।আমি তোমাকে নিয়ে অনেক অনেক জায়গায় ঘুরেছি, অনেক সাইকোলজিস্ট, নিউরোলজিস্টের কাছে গিয়েছি।কেউ আমাকে হয়তো ভরসা দিয়েছে, কেউ আমাকে সোজাসুজি বলে দিয়েছে তুমি আর সুস্থ হবেনা।প্রতি বছর দু তিনবার এমন হয়।তুমি সব ভুলে যাও।আমি তোমাকে সব মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি"।

অহনা প্রচন্ড রেগে গেলো কেন যেন হঠাৎ।ফয়সালের দিকে আগুনচোখে তাকিয়ে বললো, "কেন আমাকে বারবার মনে করিয়ে দাও।আমি অর্ককে কল্পনায় দেখি তাও তোমার ভালো লাগেনা।"

ফয়সাল মৃদু কন্ঠে অহনার পাশে বসে বললো, "তুমি অর্ককে দেখতে পাও যা শুধুই কল্পনা।তুমি যে অবাস্তব জগতে বাস করছো তা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়।আমি তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছি ওইদিনের মত আবার দেখতে চাই।কোন সমস্যা নাই, তুমি আমাকে ভালোবাসো অথবা না বাসো।আমি শুধু তোমাকে সুস্থ দেখতে চাই।"

অহনা মাথায় হাত দিলো যন্ত্রণায়।ফয়সালকে জিজ্ঞেস করলো, "আমি কি সবসময় এভাবেই আবার সব কিছু মনে করতে পারি?আবার কি আমি ভুলে যাই সব?আবার কি তুমি এভাবেই আমার পাশে বসে এভাবেই বুঝাও?"

ফয়সাল মাথা নাড়লো।সাথে বললো, "আমি নিশ্চিত জানি একদিন তুমি আবার সুস্থ হয়ে যাবে।"

অহনা অসহায়ভাবে ফয়সালের দিকে তাকালো।তাকে জিজ্ঞেস করলো, "আমি কখন আবার সব ভুলে যাবো?"

ফয়সাল বললো, "হয়তো কালকেই।হয়তো আবার কাল সকালে আমার তোমার পিছু পিছু যেতে হবে তোমার প্রিয় ক্যাফেতে।"

অহনা না চাইলেও কেন যেন জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কেন এতটা বছর ধরে আমার পাশে ছিলে?"

ফয়সাল মাথা নিচু করে বসে থাকলো।এই কথাটা অহনা তাকে কখনোও জিজ্ঞেস করেনি।ফয়সাল নিজেকে গুছিয়ে বললো, "অহনা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসিতো, তাই আমার কিচ্ছু আর করার নাই, বিশ্বাস করো।আমি পারলে তোমার সাথে অর্কর আবার দেখা করিয়ে দিতাম।তুমি তাকে ভালোবাসবে, তুমি অনেক অনেক সুখী হবে এর থেকে বেশি কিছুই চাইনা।আর একটা উদ্দেশ্যও আছে।বলবো?"

অহনা ফয়সালের পাশে বসে তার হাত ধরে বললো, "কি?"

ফয়সালের চশমা বারবার ভিজে যাচ্ছে অনেক অনেক আবেগে।সে তবুও বললো, "প্রতিবার যখন তুমি আবার সত্যিকারের জগতে ফিরে আসো, আমি বারবার ভাবি তুমি হয়তো একটাবারের জন্য অর্ককে ভুলে যাবে।আমার কথা একবার ভাববে।একটাবারের জন্য আমার তোমার জন্য যে ভালোবাসা ওটা চোখে পড়বে।কখনো এমন হয়নি, কখনো না।আমি তবুও আরো ১০০ বছর অপেক্ষা করবো তোমার জন্য।তুমি বুঝবে আমার ভালোবাসা শুধু এটার জন্য।অহনা, আমি হাল ছাড়বোনা।"

অহনা ফয়সালকে শক্ত করে ধরে রাখে।তার কানে কানে বলে, "কাল আমি হয়তো সব ভুলে যাবো।কিন্তু একটা জিনিস কখনো ভুলবোনা।যদি মরে যাই তবুও না।যে ভালোবাসায় তুমি আমাকে আগলিয়ে রাখছো সেটা আমার হৃদয়ে তুমি এমন ভাবে গেথে দিয়েছো সেটা আমার মত একটা মেয়ের সাধ্য কি ভুলার বলো? আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা তা তো জানিনা, কিন্তু তোমার মত একজনের জন্য আমার হাজারটা জীবনের ভালোবাসাও কম পড়ে জানো।আমি এখন শুধু একটা জিনিসই চাই।সব ভুলে গেলেও তোমাকে আর ভুলতে চাইনা।আমার মনে পড়ে জানো, প্রতিবার তুমি এভাবে আমার পাশে বসে বলো, আমি সুস্থ হয়ে যাবো।প্রতিবার আমি তোমাকে একটু একটু করে ভালোবেসেছি জানো।যেই ভালোবাসায় তুমি আমার জন্য প্রার্থনা করো, সেই ভালোবাসার কিছুটা আমি তোমাকে যদি দিতে পারতাম আর কিছু চাইতাম না।"


ফয়সাল প্রচন্ড কাদছে অহনার হাত ধরে।বাহিরে ঝমঝম বৃষ্টি তার কান্নার শব্দকে মুছে দিতে পারলোনা।ফয়সাল জানেনা পরেরদিন সকালে অহনা সব ভুলে যাবে কিনা, ফয়সাল জানেনা এই ভালোবাসার অনুভূতিটুকু অহনার মাঝে আর থাকবে কিনা?ফয়সাল শুধু জানে আজকে এতগুলো বছর পরে তার ভালোবাসার শব্দগুলো অহনার হৃদয়কে ছুয়ে দিয়েছে।হয়তো কাল সব অহনা ভুলে যাবে, হয়তো তার অনুভূতির সব সুরগুলো কালকে আর অহনার হৃদয়ে বাজবেনা।তবুও সে আজীবন অহনাকে তার ভালোবাসার কথা বলে যাবে।হয়তো একদিন কোন এক মহাকালে, অহনা শুধুই তাকে ভালোবাসবে, তারা তাদের নতুন ভালোবাসার নীড় গাথবে পবিত্র অনুভূতির মায়াজালে।ফয়সাল সেদিনের অপেক্ষায়, লেখক নিজেও।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29431971 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29431971 2011-08-14 18:34:43
তিস্তা
আক্কাস মোল্লা খুটিয়ে খুটিয়ে আসফাক মিয়াকে লক্ষ্য করে, এরপর দাড়িতে হাত বুলিয়ে শুদ্ধ ভাষায় জিজ্ঞেস করে, “কোথা থেকে আসা হইছে বাজান”?
আসফাক মিয়া কিছু বলেনা, মাথা নাড়ায় শুধু লজ্জায়।
আক্কাস মোল্লা একটু বিরক্ত হলো।তার ইচ্ছা হচ্ছিলো পানের পিক সরাসরি আসফাক মিয়ার মুখে মারে।বহু কষ্টে নিজের ইচ্ছা দমন করে সে আসফাক মিয়ার দিকে গরম চোখে তাকিয়ে বলে, “আইসো আমার বাড়িত আইসো, হামরা বাড়ি আজিক বিয়ে হচ্ছি”।

সেইযে আসফাক মিয়া আক্কাস মোল্লার বাড়ি আশ্রয় নিলো, দু বছর পেড়িয়ে গেলেও সে আর কোথাও যায়নি।আক্কাস মোল্লার বড় মেয়ে, মেজ মেয়ের বিয়ে থেকে শুরু করে ছোট্ট পাচ বছরের ছেলের পুকুরে ডুবে মরে যাওয়ার সব কিছুর সাক্ষী আসফাক মিয়া।আক্কাস মোল্লারই সবচেয়ে ছোট মেয়ে নূরজা বেগম আসফাক মিয়ার কাছে লজিং পড়তো।নূরজা প্রায় দিন আসফাক মিয়ার কাছে বসে গল্প শুনতো নানান দেশের, নানান রঙ্গের।আসফাক মিয়াকে সে একদম পছন্দ করতোনা।কেমন যেন একটা বিরাট চশমা পড়তো, আর বড়ই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতো।নূরজা যখনই মুই, হামারা এমন ভাষা ব্যবহার করতো, আসফাক মিয়া তার চশমা খুলে রাগ করে বসে থাকতো।তখন নূরজা বেগম রাগ ভাঙ্গাতে নানান ছড়া গান গাইতো।আসফাক মিয়া গুনগুন করে কি ভাষায় কি কি সব আবোলতাবোল সুর করে গান গাইতো যেন মাঝে মাঝে।নূরজা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতো মনোযোগ দিয়ে।একদিন আসফাক মিয়া নূরজাকে পাকড়াও করে একটা গান শিখিয়ে দেয়, ইংরেজী ভাষার গান।মাত্রই দু লাইন শিখে নূরজা, ওটাই সে তার বাবা মা, বোন আর খেলার সাথীদের শুনিয়ে শুনিয়ে অবাক করে দেয়।

কোন একদিন আক্কাস মোল্লা তার বউয়ের কাছে বলে, “হামার বেটির নিকাহ করাই দিতাম চাই হামনের আসিনে, কিতা কও?”
রহিমন বিবি মাথা নাড়ে, না নেড়েও উপায় নাই।তার জামাইকে সে যমের মত ভয় পায়, অথচ তার বিবাহ ৩০ বছর পার হয়েছে, কিন্তু আক্কাস মোল্লা কোনদিন তার সাথে একটুও গলা উচু করে কথা বলেনি।কখনো দ্বিতীয় বিয়ের কথাও চিন্তা করেনি।প্রতি হাটবারে আক্কাস মোল্লা রহিমন বিবির জন্য এক আনার বাতাসা নিয়ে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে দেয়।রহিমন বিবি লজ্জার মাথা খেয়ে বাতাসা লুকিয়ে লুকিয়ে মুখে দেয় স্বামীর সামনে।আক্কাস মোল্লার বুকে অনেক ঠান্ডা বাতাস বয় যখন এভাবে প্রকান্ড লজ্জা নিয়ে তার বউ বাতাসা খায়।একদিন রহিমন বিবি জিজ্ঞেস করে, তার জন্য আল্লাস মোল্লা বাতাসা নিয়ে আসে কেন?আক্কাস মোল্লা কিছুই বলেনা।গভীর রাতে কোন একদিন উঠোনের ধারে আক্কাস মোল্লা মাথা নিচু করে কেমন করে যেন বসে ছিলো।রহিমন বিবির বুকটা খান খান হয়ে যায়, জীবনে সে যে কাজ করেনি সেদিন সেটাই করলো।স্বামীর পাশে বসে তার কাধে হাত দিয়ে মুখপানে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “পান খাইবাম?”
আক্কাস মোল্লা তার বউয়ের হাত ধরে বলে, “হামার মাতায় হনেক বাতাসা খাতিম চাইতো।আব্বায় না দিতো।মাজানরে বড় দিকবার শখ লাগিম”।

কোন এক আশ্বিনে সত্যি সত্যি নূরজার সাথে আসফাক মিয়ার বিয়ে হয়ে গেলো।নূরজার কান্নাকাটি দেখে তার মা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলে, “অং করিসনা”।

ছোট্ট নূরজা তার সব খেলার সাথী ছেড়ে বিয়ে বসে যায়, তার কিশোরী মনে তখন তার নিজ হাতে বানানো ছোট্ট পুতুলের জন্য কত শত অভিমান।এই পুতুলটাকে সে প্রতিরাতে কত্তবার বুকে জড়িয়ে বলেছে, “তুই হামার বিয়া করবি?” এই বিশাল চশমা পড়া আসফাক আলীকে সে বিয়েই করতে চায়না, একদমই না।
বাসর রাতে আসফাক আলী নূরজাকে বলে, “বাড়ী যেতে মন চাচ্ছে।আমার সাথে যাবে?”
নূরজা আসফাক আলীর সাথে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করে, নাহলে লোকটা রাগ করে।সে মাথা নেড়ে বলে, “না যাবুনা”।
আক্কাস মোল্লা যখন জানলো আসফাক আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র এবং তার বাবার বাড়ি সে সময়ের বৃহত্তর ঢাকা শহরে তখন সে একটুও অবাক হলোনা।সে আগেই বুঝেছিলো এই ছেলে অনেক শিক্ষিত।আক্কাস মোল্লার মনটা বেজার হলো যখন আসফাক আলী বললো সে নূরজাকে এখানেই রেখে যাবে। পরে সব গুছিয়ে নিয়ে তাকে নিয়ে যাবে।আক্কাস মোল্লা মাথা নাড়ে, কিছু বলেনা।

আসফাক আলী যখন চলে যাচ্ছিলো, তখন নূরজা তার খেলার সাথীদের সাথে তিস্তার উদভ্রান্ত স্রোতে পা ডুবিয়ে বসে ছিলো।চারপাশে ভয়ংকর রোদ, কিন্তু নদীর পারটা কেমন মন খারাপ করা শীতল হয়ে আছে।হলদে ডানার চিল আর হরিয়াল পাখির আনাগোনায় মুখরিত তিস্তায় এক অদ্ভুত সময় তখন বয়ে চলছিলো নদীর স্রোতের সাথে।ঠিক সে সময় রহিমন বিবি এসে নূরজাকে বলে, “তুর জামাই যায়গা, দেকা করি আয়”।

নূরজা কিছু বলেনা, প্রচন্ড অভিমান হয় তার। তার বদ স্বামী আরেকবার জিজ্ঞেস করতে পারতোনা তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা।এমন কেন মানুষটা।এর থেকে তার পুতুলগুলা কত ভালো, যখন ইচ্ছা তাদের সাথে থাকা যায়, খেলা করা যায়, সাজিয়ে গুছিয়ে বিয়ে দেয়া যায়।নূরজা বেগম রাগ করে তার মাকে বলে, “পারবাম না”।
এরপর ভৌদোড় দেয়, তিস্তাকে পেছনে ফেলে সে আসফাক মিয়ার কাছে ছুটে যায়।আসফাক মিয়ার কাছে যেয়ে বলে, “আমারে রাখি যাবা”?
আসফাল মিয়া বলে, “হা”।

অভিমানে রাগে নূরজা বেগম হাতের পুতুল ছুড়ে মারে আসফাক মিয়ার মুখে। আসফাক মিয়ার চোখের চশমা পড়ে ভেঙ্গে যায় বউয়ের ভালোবাসার আঘাতে।ঝমঝম ট্রেনের থার্ডক্লাস কামরার দরজা ঝুলে যখন আসফাক মিয়া আর নূরজা বেগম আক্কাস মোল্লা আর তার বউ রহিমন বিবির থেকে বিদায় নিচ্ছিলো, তখন তাদের মধ্যে এক স্নিগ্ধতা কাজ করছিলো।আসফাক আলী চশমাহীন প্রায় অন্ধ চোখে একটা হাত নাড়াচ্ছিলো আর একটা হাত দিয়ে নূরজাকে ধরে রেখেছিলো।মেয়েটা বড়ই অশান্ত, কখন আবার ছু্টে পালিয়ে যায় অথবা কোন অদ্ভুত কর্ম করে বলা যায়না।এই হাত আর ছাড়া যাবেনা, জীবনেও না।

নূরজা বেগম পুরনো ঢাকার যে হিন্দু এলাকায়(বউবাজার) তার স্বামী আসফাক আলীকে নিয়ে থাকতো, সেখানে আর কেউ ছিলোনা।আসফাক আলীর মা মারা গিয়েছিলেন অনেক আগেই।আসফাক আলীর কট্টর মুসলিম পিতা নবাব আলীমুদ্দি খা তার ছেলের জ্ঞানচর্চায় কখনো বাধা না দিলেও খুব বেশি পছন্দও করতোনা।যখন সে তার ছেলের বিয়ে ঠিক করে, তার ছেলে আসফাক তখন পালিয়ে যায় নবাববাড়ী ছেড়ে।আলীমুদ্দি খা কষ্ট পায়নি, একেবারেই না।সে জানতো এমন কিছু একটাই হবে।ছেলেটা তার মায়ের অভ্যাস পেয়েছে।আলীমুদ্দি খানের স্ত্রী তাকে একদমই পাত্তা দিতোনা, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেয়নি।আলীমুদ্দি খা তাই সবসময় তার স্ত্রীকে খুব ভয় পেয়েছে, সবসময় ভেবেছে তার স্ত্রী তাকে ফাকি দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে একদিন।তার বিশাল ছমছমে ঐতিহ্যময় বাড়িতে সে একা বাস করবে, সম্পূর্ণ একা।একা থাকতে সবাই ভয় পায়।আলীমুদ্দি খাও ভয় পেয়েছিলো।তাই যখন তার সন্তান পালিয়ে যায়, সে খুব বেশিদিন সেই ভয় নিয়ে বাচতে পারেনি।

আসফাক মিয়ার স্ত্রী নূরজা ওই ছমছমে বাড়িতে একা একা বাস করে, রাত দিন গুনগুন করে গান গায়।কিন্তু সেই গান কেউ শোনার নাই, শুধু মাঝে মাঝে আসফাক মিয়া তার বিদ্যা চর্চার ফাকে ফাকে নূরজার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শোনে।মন দিয়ে শোনে।তার বড্ড ভালো লাগে নূরজার আপন মনে সুর নিয়ে খেলা করার ব্যাপারটা।আসফাক আলী বুঝতে পারে সে তার স্ত্রীর প্রেমে পড়েছে।কিন্তু সেই সময়ে একথা বলার সাহসিকতা সে রাখতোনা।

তাদের আট বছরের সংসারে দুটি ফুটফুটে ছেলে হয় যার মধ্যে একজন ছিলো প্রতিবন্ধী।এটা নিয়ে আসফাক আর নূরজার কোন দুঃখ ছিলোনা।আসফাক তার দুই ছেলেকে কখনো কাছে ডেকে নিতোনা।দূর থেকে আদর করতো।ছোটকাল থেকে সে তার বাবা মা কারো আদর পায়নি তাই হয়তো সে আদর করতেও শেখেনি।শুধু যখন রেডিও শুনতো অথবা কলের গান তখন দুই ছেলেকে দুপাশে বসিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতো।রাতে যখন ঘুমাতে যেতো সবাই, আসফাক মিয়া তার দুই বাচ্চাকে ঘুমের ঘোরে জড়ায় ধরে চুমু খেতো।মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেলে নূরজা আর বাচ্চাদের মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে কি যেন খুজতো।
হঠাৎ করে কোন রকম পূর্বলক্ষণ ছাড়াই একদিন সে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়।নূরজা পাগলের মত প্রলাপ বকে আসফাকের এহেন অবস্থা দেখে।আশেপাশের সব চাকরবাকর তাকে বুঝাতে চায়, কিন্তু সে কিছুই বুঝতে চায়না।আসফাক যে তার সবচেয়ে আদরের পুতুল, ওকে ছাড়া বাচবে কি করে?আসফাক মিয়ার জ্ঞান ফিরে আসলে সে তার স্ত্রীকে খোজে, দুই সন্তানকে খোজে।নূরজার দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার চশমাটা ভেঙ্গে দিছিলা কেন?”
নূরজা এখন শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে।কাদতে কাদতে বলে, “ওটা তোমাকে ভাল লাগতোনা”।

আসফাক মিয়া আচ্ছা বলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, রেখে যায় শুধু তার গোপন সব ভালোবাসা।অনেকে ভেবেছিলো নূরজা এরপর হয়তো ভেঙ্গে পড়বে, কিন্তু তা হয়নি।নূরজা শক্ত হৃদয়ে হাল ধরে সংসারের, তার দুই আদরের ছেলের।আসফাক আলীর বিশাল সম্পত্তির প্রতি তার কোন লোভ ছিলোনা।সে ওসব খেয়ালও রাখতোনা।তার মনোযোগ ছিলো আদরের দুই সন্তানের জন্যই শুধু।মাঝে মাঝে শুধু মনে হতো সোনাদির কথা, তিস্তা পারের ওই হলদে চিলের কথা।রাতে বারবার তার মায়ের বাড়ির বাতাবি লেবুর গন্ধ পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে যেতো তার।২১ বছরের নূরজার মন ছটফট করতো নাড়ির টানে, তিস্তা পাড়ের মাটির সোদা সোদা গন্ধ তার হৃদয়কে আকড়ে রেখেছিলো।অনেক কিছু ভেবে একসময় সে সিদ্ধান্ত নেয় ফিরে যাবে আবার তার প্রিয় ছোট্ট গ্রামে।১৯৪৯ সনের মাঝামাঝির দিকে যখন পশ্চিম জার্মানী তাদের সংবিধান নতুন করে প্রণয়নে ব্যস্ত, অথবা বিবিসি তাদের আগমন বার্তা সবাইকে জানান দেয় সেই সময় তরুনী নূরজা শহুরে বেড়াজাল ভেদ করে সোনাদি নামে এক আদুরে ঝিরিঝিরি হাওয়ার ছোট্ট গ্রামে ফিরে আসে।সঙ্গে তার দুই কলিজার টুকরা – আশরাফ ও আলীউল।

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের গল্পে যাওয়া যাক।আশরাফ এরই মধ্যে তার মা নূরজাকে না বলে একদিন বাসা থেকে পালিয়ে চলে যায় যুদ্ধে।পালিয়ে যাওয়ার কারণ তার মা তাকে কোনদিন যুদ্ধে যেতে দিবেনা।২৫ বছরের তরুণ আশরাফ যুদ্ধে যাওয়ার ৬৫ দিনের মধ্যে শহীদ হয় চিটাগাং সমুদ্র বন্দরে।দিনটি ছিলো আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ, সারা দেশে তখন থমথমে মৃত্যুর গন্ধ।সেক্টর দশের খালেদ ও আশরাফ বিখ্যাত অপেরেশন জ্যাকপটের(যা চট্রগ্রামে সংগঠিত হয়েছিলো) দুই সহযোদ্ধা তখন একের পর এক পাকিস্তানী জাহাজে বোমা ফেলছে।একসময় খালেদ আশরাফকে বললো, “একটু থামো”।

আশরাফ চুপ করে বসে পড়ে খালেদের পাশে।হঠাৎ করে খালেদ চিৎকার করে কাদতে থাকে।আশরাফ খালেদের কাধে হাত রাখে। তাকে বলে, “খালেদ ভাই ভাবী আর আপনার বাচ্চা ভালোই আছে।আমি বেচে ফিরতে পারলে নিজে আপনাকে নিয়ে ভাবীর রান্না খাবো।টোকনকে কোলে নিয়ে গান গাইবো।বহুদিন গান গাইনা বুঝলেন, কতদিন হয়ে গেলো মাকে দেখিনা।আমার অসুস্থ ভাইটাকে নিয়ে মা কি আমার উপর রাগ করে আছে নাকি জানিনা”।

খালেদ কাদতে কাদতে বলে, “তোর ভাবীকে একটা টাকাও দিয়ে যাইতে পারিনাইরে ভাই।আমার ৪ বছরের বাচ্চাটা কি খায় আল্লাহ মাবুদ জানে।সুমনা ওর বাবার বাড়ি কি যেতে পারছে নাকি তাও জানিনা।যা কিছু হোক, আমার বাচতেই হবে”।
আশরাফের চোখে জল ঝিকমিক করে।খালেদকে বলে, “খালেদ ভাই যদি বাচতে না পারি আপনি দয়া করে আমার মায়ের কাছে যায়েন।মাকে বলবেন তার ছেলে প্রতিদিন নামায পড়েছে, অনেক যুদ্ধের মধ্যেও সে মার সেলাই করা শার্টটা যতন করে গায়ে দিয়েছে।একটুও কোথাও ছিড়েনি”।
খালেদ মাটির দিকে তাকিয়ে বলে, “বলবো”।


খালেদ যখন প্রচন্ড জ্বর আর একটা রাইফেল নিয়ে আশরাফের বাসায় আসে তখন নূরজা কুরআন শরীফ পড়ছিলো দুরুদুরু বুকে।আলীউল চুপ করে শুয়ে শুয়ে শুনে, সে কথা বলতে পারেনা।খালেদ দরজার বাহিরে আস্তে করে টোকা দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।দুদিনের আগে তার আর জ্ঞান ফেরেনি।যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সে দেখতে পেলো তার মা তার কপালে হাত বুলাচ্ছে।চোখ বুজে হঠাৎ করে বুঝলো, কিছু একটা ভুল হয়েছে।তার মা বহু আগেই মারা গিয়েছিলো একদিন হঠাৎ করে।
কোন একদিন পুকুর পারে খালেদকে নিয়ে যখন তার মা রান্নার পানি নিচ্ছিলো, হঠাৎ করে পিছলিয়ে পড়ে গেলো।ব্যস সেখানেই শেষ।তার বাবা তিনমাস পর নতুন বিয়ে করে।নতুন মা তাকে অনেক ভালোবাসতো, নিজের ছেলের মত দেখতো।কি করে যেন নতুন মাও তিন বছর পর মারা যায়।এরপর সে আর কোন মাকে পায়নি।

খালেদ যখন ভরদুপুরে ঘুম থেকে জেগে উঠলো, সে মনে করতে পারলো আশরাফের কথা।আশরাফকে কবর দেয়ার সময় সারা আকাশ জুড়ে কালো মেঘ ছিলো।কবর দেয়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি খালেদের শরীরে লেগে থাকা আশরাফের রক্তগুলো ধুয়ে মুছে দিলো।খালেদ আশরাফের কবরের সামনে চুপ করে বসে বসে ভাবছিল তার পরিবারের কথা।সুমনা এখন কই আছে?কি করছে?
নূরজা খালেদের মাথায় হাত দিয়ে বললো, “বাবা এখন ঠিক আছো?”
খালেদ উঠে বসে, মাথা নাড়ায়।নূরজা বেগমের দিকে তাকিয়ে ভাবে তার ছেলের কথা কি করে বলবে।কিন্তু তাকে তো বলতেই হবে।সে শান্ত কন্ঠে বলে, “আমি আশারাফের বন্ধু”।
নূরজা বেগমের হাতের বাটি পড়ে যায়, চোখ দিয়ে অশ্রুর বাণ বয়ে যায়। খালেদের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার কলিজার টুকরাটা কি আছে?”
খালেদ মাথা নাড়ায়, “আম্মা কাইদেন না।ও আছে এই মাটিতেই, ওরে কেউ কখনো মরে যাইতে দিবেন না।আপনি দেখে নিয়েন।একবার দেশটা স্বাধীন হইতে দেন, আমি ওর গল্প জনে জনে সব্বাইরে জানাবো।আপনি শান্ত হোন”।

কোন মাকে এসময় কে শান্ত করতে পেরেছে? আলীউল প্রতিবন্ধী, কিন্তু সে বুঝতে পারে তাই ভাই আর নেই।বোবা কান্নায় সে তার মায়ের কাছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে যায়।মাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করে, “ভাইয়া নাই?”
নূরজা বেগম মাথা নাড়ে শুধু।ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাদে।ওই কান্না হয়তো আমরা দেখতে পাই, কিন্তু মায়ের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয় সন্তান হারানোর ওটা কি আমরা কখনো বুঝতে পারি?খালেদও বুঝতে পারেনা, শুধু চোখ দিয়ে খানিকটা জল গড়িয়ে পড়ে।তার যাওয়ার সময় হয়েছে, বিদায় নিতে হবে।পায়ের এক পাশে গুলি লেগে সে প্রায় পঙ্গু হয়ে গেছে।এই যুদ্ধের ভয়াবহতায় তার হৃদয়ের প্রায় অংশই বিকলাঙ্গ হয়ে গেছে, আজকাল সে শুধু বুলেটে লেগে থাকা রক্তের গন্ধ পায়।খালেদ ঠিক করে, কালই সে রওনা দিয়ে দেবে।তাকে ঢাকা যেতে হবে সুমনাকে খুজতে।আচ্ছা ওরা কি এখনো আগামসী লেনের ২৭ নম্বর বাড়িতে আছে?খালেদের মাথা ঘুরে, সে শুয়ে পড়ে আবার।

সন্ধ্যার দিকে খালেদের ঘুম ভেঙ্গে যায় মিলিটারী বুটের ঠকঠক আওয়াজে।চোখ মেলে সে দেখতে পায় ভয়ংকর ফর্সা এক জানোয়ারের মুখ।আশেপাশে আরো দুটো জানোয়ারের পদচারণা লক্ষ্য করে সে।খালেদের হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি।সে আশেপাশে তাকিয়ে নূরজা বেগমকে খুজছিলো।মাথা ডানপাশে ঘুরিয়ে দেখতে পেলো নূরজা বেগম আলীউলকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে গুটিশুটি মেরে পড়ে আছে।এক রাজাকারকেও দেখতে পেল খালেদ।এই রাজাকারের নাম মইত্যা রাজাকার।সোনাদি গ্রামের সবাই তাকে প্রবল ভালোবাসতো।ভালোবাসার কারণ মইত্যা রাজাকার খুব সুন্দর করে পুথি পড়তে পারতো।যখন কমলা সুন্দরীর পুথি গুনগুনিয়ে সে সবাইকে শোনাতো লোকজন চোখ বড় বড় করে শুনতো, কেউ বা কাদতো কমলার দুঃখ সইতে না পেরে।মিলিটারী গ্রামে হানা দেওয়ার পর থেকে মতি মিয়ার চালচলন বদলে গেছে, সে এখন বিহারী ভাষায় কথা বলে, গান গায়।পাক জানোয়ার দেখলে উর্দু ভাষায় বলে, “সাব আচ্ছা হ্যায় হাল?”
মতি মিয়া পাকসেনাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “ইয়ে সাব আচ্ছে লোক হ্যায়।কোয়ি মুক্তি নেহি হ্যায়”।

ক্যাপ্টেন হায়দার আলী মুচকি হাসি দিয়ে নূরজা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে, “আম্মাজী আপকা এক বেটা মুক্তি থা, ও মার গায়া?”
নূরজা কিছু বলেনা, তার চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ে।সে ভয়ে ভয়ে আলীউলকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
হায়দার আলী আলীউলকে দেখিয়ে বলে, “ইয়ে আপকা দুসরা বেটা হ্যায়?বাতে নেহি কারতে?”
নূরজা বেগম ভয় পেয়ে গুমড়িয়ে কেদে ফেলে।আজকে যদি এই ছেলেকেও হারাতে হয় তবে সে কি নিয়ে বাচবে?
মতি মিয়া হায়দার আলীর দিকে তাকিয়ে বলে, “তো চালে সাব।ইস গাও মে কোয়ি মুক্তি নেহি হ্যায়।সাব আচ্ছা হায়”।

হায়দার আলী ভয়ংকর চোখে মতি রাজাকারের দিকে তাকায়।মতি মিয়ার চালাকি সে ভালোই ধরতে পেরেছে।এই গ্রামে আসার পথ থেকে মতি মিয়া তাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখেছে এই বলে যে এই গ্রামে কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই।সে চট করে একটা সিদ্ধান্ত নেয়।সকাল থেকে একটাও গুলি খরচ হয়নি তার।তার প্লাটুনের সৈন্যরাতো তাকে কাপুরুষ ভাববে যদি একটাও কাফের না মারতে পারে।সে আস্তে আস্তে হেটে ঘরের বাহিরে বের হয়ে আসে।চাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “উস আওরাতকো ছোড়কে সাবকো মার দো।মাতিকে সিনেমে দো গুলি চাহিয়ে”।

হায়দার আলীর দুই সৈন্য মাথা নাড়িয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে।খালেদ তখন বিছানার উপর বসে আছে।সে সুমনার কথা ভাবে, টোকনের আদুরে মুখটার কথা ভাবে।তারপর সে দেখতে পায় দুই পাক জানোয়ার তাদের বেয়নেট উচিয়ে ধরেছে আলীউলের সামনে। নূরজা বেগম চিৎকার করে কাদে।এক সৈন্যের পায়ে ধরে আকুতি জানায়, এক মায়ের তার সন্তানকে বাচানোর আকুতি।খালেদের মাথায় দ্রুত চিন্তা ঘুরে।ভাঙ্গা পা নিয়ে সে ধপ করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে বিছানার নিচে ঢুকে পড়ে।এরপর কেউ কিছু বুঝার আগে দুটি গুলির আওয়াজ শোনা যায় যা নিখুতভাবে দুই পাক জানোয়ারের বুকের মাঝে ছেদ করে বেরিয়ে যায়।খালেদ খোড়াতে খোড়াতে বেরিয়ে আসে বাড়ির বাহিরে।হায়দার আলী হতচকিত হয়ে তখন মুখে সিগারেট ঝুলিয়ে আছে।খালেদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নাই।খালেদ খুব দ্রুত হায়দার আলীর কাছে পৌছিয়ে তার রাইফেলটা তাক করে মাথা বরাবর।হায়দার আলী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।মতি মিয়া তখন খালেদের পাশে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলছে, “হালায় এখন ইন্দুরের লাহান কাপতেছে”।
হায়দার আলী আসলেও কাপছিলো, সে বুঝতে পারছিলোনা কি করবে।এই তো মৃত্যু তার সামনে।খালেদ ভাঙ্গা গলায় বলে, “One day this country will be independent, one day the people of this country will breath in the air.But you Pakistani bitches will never be able to breathe in your lifetime.The curse of life will never stop haunting you”

শুকনো বাতাসে একটা গুলির আওয়াজ হয়, হায়দার আলী গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।তার সারা মুখে প্রচন্ড যন্ত্রণার চিত্র দেখে খালেদের আরো ঘৃণা হয়।সে খুড়িয়ে খুড়িয়ে ঘরে ঢুকে।নূরজা বেগমের পাশে যেয়ে বসে।নূরজা বেগমকে বলে, “আম্মা কিচ্ছু হয়নাই।সব ঠিক আছে।এখন গোছগাছ করেন তাড়াতাড়ি, আমার সাথে ঢাকায় যাবেন।সময় বেশি নাই, তাড়াতাড়ি ভাগতে হবে”।

যুদ্ধের বাকি চার মাস নূরজা বেগম ঢাকার আগামসী লেনের ২৭ নং বাড়িতে যেয়ে থাকে।ওটা খালেদের বাড়ি, কিন্তু খালেদ তাদের সাথে থাকেনা।খালেদ নাওয়া খাওয়া ফেলে তার ভাঙ্গা পা নিয়ে যুদ্ধের শ্বাপদশঙ্কুলতা ভুলে গিয়ে তার আত্নার বাধন খুজে বেড়ায়, কোথাও সে তাদের খুজে পায়না।কোথাও না।সুমনা আর টোকন যুদ্ধের ভয়াবহতায় হারিয়ে গেছে নাকি সে বুঝে উঠতে পারেনা।মাঝে মাঝে সে তার বাসায় এসে ওদেরকে খুজে।নূরজা বেগম খালেদকে বোঝায়, সান্তনা দেয়।কিন্তু খালেদ কিছু বুঝে উঠতে পারেনা।সে দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে রাস্তায় যায়, হঠাৎ হঠাৎ রাস্তায় বসে পড়ে।গড়াগড়ি খায়, কান্না করে চিৎকার করে।তখন যুদ্ধ চলছে, তখন মানুষ মৃত্যর গন্ধ বাতাসে শুকে বেড়াচ্ছে।খালেদের সরব কান্না কেউ দেখতে পায়না, কেউ না।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চারদিকে যখন নতুন পাখির ডাক শোনা যায় খালেদ তখন বাসায় ফিরে আসে।জানুয়ারীর ২২ তারিখের এক সন্ধ্যায় যখন খালেদ তার বাসার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন মাগরিবের আযান দিচ্ছে।খালেদ দরজা ঠকঠক করার আগেই নূরজা বেগম দরজা খুলে দেয়।খালেদকে দেখে সে হাসে, তার হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে।খালেদের মাথায় হাত দিয়ে বলে, “বাবা তোমার মাথাটা একটু ঠান্ডা করে বসো।আজকে তোমার একটা বিশেষ দিন।একবারে উত্তেজিত হয়োনা।ওই দেখো তোমার সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে”।

খালেদ আস্তে আস্তে মাথে তুলে তাকায়।তার সামনে সুমনা আর টোকন দাঁড়িয়ে আছে শান্ত হয়ে।টোকন, তার আদুরে ছেলেটা মায়ের আচল ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে তার বাবাকে দেখছে।টোকন কি একটু ভয় পাচ্ছে নাকি খালেদ জানেনা।খালেদ হাউ মাউ করে কান্না শুরু করে।সুমনা খালেদের কাছে ছুটে আসে।তার চোখে অশ্রু টলমল করে অভিমানের কাব্য লিখে।সুমনা তার সবচেয়ে কাছের মানুষের সবচেয়ে কাছে যেয়ে বলে, “তুমি কেন আসোনি আমাকে খুজতে?”
খালেদ তখন কিছু শুনতে পায়না।সে দু হাত বাড়িয়ে রাখে সুমনা আর তার সন্তানের জন্য।কেউ তার কাছে আসেনা এক পলকের জন্য।একটু পর খালেদের বুকটা ভরে যায়,তার আত্না পূর্ণ হয় কাছে মানুষের গায়ের গন্ধে।কত যুগের কত অপেক্ষা শেষ হয় এই আবদ্ধ বাহু গাথুনীতে তা কি কেউ বুঝতে পারে?নূরজা বেগম চেয়ে চেয়ে এই পবিত্র ভালোবাসার রুপ দেখে।তার চোখ দিয়ে অন্যরকম অশ্রু বয়ে যায়।নামাজের সময় চলে যাচ্ছে, তাই সে নামাজে বসে।নামাজ শেষ মোনাজাতে হাত তুলে পরম করুণাময়কে জিজ্ঞাসা করে, “আমার সন্তানকে ভালো রেখেছো কি খোদা?”


নূরজা বেগম আবার ফিরে আসে তিস্তার পাড়ে।তার জীবনের শেষ সময়টুকু এইখানেই সে কাটিয়ে দিতে চায়।বিকেলের মিঠা হাওয়ায় সে তিস্তার শোভিত রূপ উপভোগ করে।হঠাৎ করে বয়ে যাওয়া হাওয়ায় সে তার স্বামী আসফাক আলীর গন্ধ শোকার চেষ্টা করে।বৃথা চেষ্টা।সেই কত কত বছর আগে তার প্রিয় মানুষটিকে সে হারিয়েছে, এরপর তার আদরের সন্তানটাও কোথায় যেন আজ।স্মৃতির পাতায় সে হাতড়ে বেড়ায় তার ভালোবাসার মুখগুলিকে।যারা তিস্তার পাশ দিয়ে হেটে যেতো, তারা অবাক হয়ে এই বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে থাকতো।জ্বলজ্বলে চোখে এই বৃদ্ধা বিশাল পাকুড় গাছের নিচে বসে কি যেন খুজতো।কেউ তার কাছে যেতোনা।
নূরজা বেগমকে খালেদ একটা চিঠি দিয়েছিলো, আশরাফের চিঠি।আশরাফ এই চিঠিটা তার মাকে লিখেছিলো।নূরজা বেগম চোখে দেখতে পায়না ঠিকমত, তবুও সে বারবার শত কষ্ট হলেও চিঠিটা পড়ে।আশারাফের চিঠিতে লিখা ছিলোঃ

“মা আমার মা, তোমাকে কত ভালোবাসি আমি তা এই দূরে এসে বুঝতে পারি।মা একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি কখনো, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা মেয়েকে ভালোবাসতাম।সে ভালোবাসতো কিনা জানিনা।মেয়েটার নাম ছিলো নাসরিন।আমি তাকে একটা বিশাল চিঠি লিখে আমার ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলাম।মা জানো, মেয়ে ওই চিঠি পেয়ে আর আমার সামনে কখনো আসেনি।আমাকে দেখলে দূর থেকে কেমন করে জানি হাসতো, তারপর ভেগে যেত।
মা আমাকে তুমি মাফ করে দিয়ো।আমি তোমাকে বলার সাহস পাইনি, আর বললে তুমি কি আমায় আসতে দিতে যুদ্ধে?মা এই যুদ্ধে যদি অনেকের মত হারিয়ে যাই, তাহলে শুধু একটা কষ্টই থাকবে মনে।তোমার কোলে আর শুয়ে থাকতে পারবোনা, তোমার মাখানো ভাত খেতে পারবোনা।মা আমি এখন ঠিকমত দু বেলা খেতে পাইনা, কিন্তু যখন খাই তখন বারবার মনে করি যে এই ভাতটা তুমি রাধছো, তখন আমার পেট ভরে যায় মা ওই পোকায় ভরা ভাত খেয়েও।মা বিশ্বাস করো এই যুদ্ধটা করি তোমার জন্য।স্বাধীন দেশের লাল সূর্যের ছায়া যখন তোমার প্রিয় তিস্তার জলে পড়বে তখন তোমার থেকে বেশি কে সুখী হবে বলো তো?মা আমার ভাইটাকে দেখে রেখো, ওকে অনেক মনে পড়ে।ওকে যেভাবেই হোক একটা গান শিখায় দিয়ো, দেশের একটা গান।আমি ফিরে আসতে চাই মা, যুদ্ধ আর ভাল লাগেনা।তোমাদের পাশে বসে আমি আবার দুপুরে পেট ভরে ভাত খেতে চাই, তোমার কোলে শুয়ে শুয়ে ছোটকালের গল্পগুলো আবার শুনতে চাই।মা কবে ফিরে আসতে পারবো আমি জানিনা।কিন্তু হয়তো সেটা বেশি দেরী নেই।আমি ফিরে আসবো মা তোমার কাছে দেখো”।

নূরজা বেগমের মনে এই চিঠি পড়ে আশার উদ্রেক হয়।এই বুঝি তার ছেলে ফিরে এলো, এই তো তার দুরন্ত ছেলেটা মনে হয় দৌড়িয়ে তার দিকেই দু হাত বাড়িয়ে ছুটে আসছে। নূরজা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিস্তার পাড়ে বসে তার ছেলের জন্য সিন্ধুসম ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করেছে।সূর্য ডুবেছে, আবার হাজির হয়ে প্রভাত রাঙ্গিয়েছে।কিন্তু দেশের সূর্যসন্তান তার মায়ের বুকে ফিরে আসতে পারেনি।আসুন মাকে ভালোবাসা জানাই।

********************************************************************
বিশাল ঝামেলা করে গল্পটা লিখা শেষ করলাম। শেষ করতে পারলাম বলে যারপরনাই খুশি।গল্পটা লিখার সময় বারবার মনে হয়েছে, ওই সময়টা কি ধরতে পেরেছি? উত্তর পেয়েছি না না এবং না।সেই স্নিগ্ধ সময়টা উপলব্ধি করার সামর্থ্য আমার মত ছোট্ট লেখকের নেই বোধহয়।তবুও আশা রাখি একদিন হয়তো পারবো।আমি সেই একটি বিশেষ দিনের অপেক্ষায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29424477 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29424477 2011-08-02 17:40:26
সম্পর্ক আফসার হাসিমুখে মেয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করে বললো, “চল বেটি আজকে তোকেও খাসির পা খাওয়াবো”।

আফসারের বাসার নিচে বিখ্যাত মায়ের দোয়া হোটেল অবস্থিত যার মালিক খবির উদ্দিন।আজকে যখন আফসার খবির উদ্দিনের দোকানে গেলো তখন খবির উদ্দিন ঘোৎ ঘোৎ করছে।কারণ একটু আগেই তার হোটেলের এক বয় দুটো গ্লাস একসাথে ভেঙ্গে ফেলেছে।ভেঙ্গে ফেলেই তার কাজ শেষ হয়নাই, খবির উদ্দিনের কাছে এসে বলেছে, “ওস্তাদ গেলাসগুলা কুফা ছিলো।যেইসব কাস্টোমাররে এই গেলাসে পানি দিছি ওগো হোগগলে টিপস না দিয়া ভাইগ্যা গেছে”।
খবির উদ্দিন চুপ করে বয়ের কথা শুনলেন এবং হাসিমুখে বললেন, “ঠিক আছে বাবা মন দিয়া কাজ কর”।
খবির উদ্দিনের এত ভালো আচরণের কারণ আজকে শুক্রবার।সে জুম্মাবারে সবার সাথে মৃদু কন্ঠে, আদব লেহাজ রেখে কথা বলে।আফসার যখন খবির উদ্দিনের সামনে গেলো তখন খবির উদ্দিন তার পান খাওয়া দাত সব বাহির করে বলে, “মামণিরে নিয়া আসছেন এইজন্য অন্তর থেকে শুকরিয়া জানাই।মামণির লেইগ্যা হোটেল ফ্রি।আর আপনে আইজকা বাকির কথা মাথায় আইন্যা শরম দিয়েন না”।
আফসার মৃদু হেসে বললো, “না আজকে আপনার আগের মাসের সব বিল দিয়ে দেবো।এখন আমার মেয়ের জন্য চমচম আর আমার জন্য পরোটা, খাসীর পায়া রেডি করেন”।

খবির উদ্দিনের হোটেল থেকে খাওয়া দাওয়া শেষ করে যখন আফসার বাসায় যাচ্ছিলো তখন পথে মাইশার সাথে দেখা।মাইশা আফসার যে বাসায় ভাড়া থাকে সে বাসার বাড়িওয়ালার মেয়ে।ভদ্রলোক এই মেয়েটাকে খুব ভয় পায়।কারণ মেয়েটা তাকে দেখলেই এমন একটা বিরক্তি ভাব নিয়ে কথা বলে আফসার লজ্জায় মরে যায়।এবং মেয়ের মুখেরও কোন ব্যালেন্স নাই।উইদআউট ব্রেক, সে এমন এমন সব ভয়ংকর অপমানজনক কথা বলে আফসারকে, আফসারের মনে হয়, হে খোদা কেন এই সুন্দর দুনিয়াতে পাঠালে?
আজকে মাইশা বেশ সাজুগুজু করেছে এবং আফসারকে দেখে অমন বিরক্তি ভাবও প্রকাশ করলোনা।বরং হাসিমুখে বললো, “আফসার ভাই আজকে আমার ডেট আছে বুঝলেন, কিন্তু সমস্যা হলো পকেটে টাকা নাই।খুবই লজ্জার মধ্যে আছি।দেখা গেলো, যার সাথে ডেট করতে গেলাম তার অর্থনৈতিক সমস্যা আছে।তখন তো আমি বিপদে পড়ে যাবো।আর আপনি তো জানেন আজকালকার ছেলেরা বেশিরভাগ আপনার মত বদলোক।পয়সাকড়ি পকেটে রাখেনা তাই না?”

মাইশার অপমান আফসার গায়ে মাখলোনা।মাত্র ইউনিতে থার্ড ইয়ারে পড়ে এই মেয়ে, এর কথা যদি গায়ে মাখে তাহলে তো সমস্যা।সে শুধুই গোবেচারা গাভীর মত হাম্বাহীন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
মাইশা বললো, “ইয়ে মানে কাল তো দু তারিখ ছিলো।আপনি তো বেতন পেয়েই গেছেন, তাই ভাবছিলাম আপনার থেকে কিছু টাকা নিয়ে যাই।প্রতিবার ভাড়া দেয়ার সময়তো দুই একটাকা কমই দেন, সেগুলো জড়ো করলে পাচ-ছশো টাকা তো হবেই।ওইটাই নাহয় দেন।আল্লাহর কাছে আমি আর আমার ডেট পার্টনার দুহাত তুলে প্রার্থনা করবো”।
আফসার আমতা আমতা কন্ঠে বললো, “আমি তো সবসময় এক তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করে দেই, আর কখনো একটা টাকাও কম দেইনা আর কি”।

মাইশা ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, “ফকিন্নীর মত আচরণ করবেন না।সামান্য কিছু টাকা চেয়েছি।নাহয় ধার দিন।আছে তো”?
আফসার ভদ্রলোকের মত পকেট থেকে একহাজার টাকার একটা নোট বের করে মাইশার হাতে দিয়ে দিলো।এই মাসে তার হয়তো এজন্য ধূমপান অর্ধেক করে ফেলতে হবে।কিন্তু কিছু করার নাই।এই মেয়ের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে ধূমপান বন্ধ করে দিতেও রাজি আছে।
দুপুরে খাওয়ার আগ দিয়ে মাইশা আফসারের দরজায় ধাক্কা দিলো।আফসার মাইশাকে দেখে হতভম্ব।তোতলিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি যাওনাই প্রেম করতে?”

মাইশা তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে বললো, “বদলোক আমি প্রেম করতে না ডেট করতে যাবার কথা বলেছিলাম।দুটা ডিফারেন্ট আছে।আর হঠাৎ করে কেন যেন মনে হচ্ছিলো আজকে আপনার বদমেয়েকে নিয়ে কোথাও যাওয়া দরকার।ওর চেহারা তো আপনি ফ্যাকাশে বানায় দিছেন ঘরে রাখতে রাখতে।নিতির দিকে তাকিয়ে মাইশা চোখ নাচিয়ে বললো, কিরে বেটি যাবি নাকি?”
নিতি দুহাত বাড়িয়ে মাইশার কোলে উঠে বললো, “মামনি কোথায় যাবা?”
নিতি মাইশাকে মামণি ডাকে, কেন ডাকে তা আফসার বুঝেনা।যখন বিপাশা আফসার ও তার মেয়েকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, তখন মাইশার এইচ.এস.সি পরীক্ষা চলছে।মাইশা সব পড়াশোনা বাদ দিয়ে নিতিকে নিজের মেয়ের মত মানুষ করেছে।এখনও করছে। আফসার যখন অফিসে চলে যায় তখন মাইশা ও তার মা যখন যে বাসায় থাকে তার কাছে নিতিকে দিয়ে আফসার নিশ্চিন্তে অফিস করে।
মাইশা আফসারের হাতে হাজার টাকার নোটটা ধরিয়ে দিয়ে বললো, “আপনি ফকির গোছের মানুষ।আমি আমার হাতে এই টাকা নিয়ে তাই নষ্ট করলাম না।কিন্তু আজকে আমাকে আর নিতিকে নিয়ে যখন বাহিরে ঘুরতে যাবেন তখন অবশ্যি এই পুরা টাকাটা খরচ করবেন।আমি তিনদিন ধরে প্ল্যান করে আসছি, আজকে কোথায় কোথায় যাবো, কোথায় কোথায় খাবো”।

আফসার মাইশার কথা কিছুই বুঝলোনা।তার না আজকে ডেট করতে যাওয়ার প্ল্যান ছিলো।তাহলে এইসব ঘুরাঘুরির কথা চিন্তা কেন করবে তিন দিন ধরে?তবে অবশ্যই সে বোকার মত মাইশাকে একথা জিজ্ঞেস করলোনা।শুধু আমতা আমতা করে বললো, “আমার কি যেতেই হবে?”
মাইশা বললো, “হ্যা যেতে হবে।আমরা দুই তরুণী তো একা একা কোথাও যেতে পারবোনা।আমাদের প্রটেক্ট করবে কে?”
নিতির দিকে তাকিয়ে মাইশা বললো, “কথা ঠিক আছেনা বেটি?”
নিতি কিছু না বুঝেই মাথা নাড়ায়।

বিকাল চারটার দিকে তিনজনের দলটি ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে পৌছালো, আজকে এখানে একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান আছে মাইশার কিছু বন্ধুর।তার বন্ধুরা আজকে সন্ধ্যাবেলা মোম জ্বালিয়ে রবি ঠাকুরের প্রেমের গান গাইবে।সিড়ির উপর বসে মাইশা ও আফসার অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখতে লাগলো।নিতি একটু সামনে মাইশার বন্ধুদের কোলে কোলে ঘুরছে।আফসারকে চমকে দিয়ে মাইশা হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলো, “বিপাশা ভাবীকে এখনো মিস করেন?”

আফসার কিছু বলেনা।চুপ করে থাকে।এমন ভাব করলো যেন সে কিছু শুনেনি।তার মনে পড়ে বিপাশাকে সে যেদিন বিয়ে করলো তার সমস্ত আত্না জুড়ে একটা ভয়ংকর আলোড়ন চলছিলো।ভার্সিটি লাইফে এই মেয়েটাকে সে পাগলের মত ভালোবাসতো।আরেকজন এই মেয়েটাকেই ভালোবাসতো।তাদের আরেক ক্লাসমেট ফজলু।ফজলুকে বিপাশা সংক্ষেপে বলতো জুলু।জুলু সাহেবকে বিপাশা তার সমস্ত কিছু দিয়ে ভালবাসলো।সমস্যা হলো যখন ফজলুর বাসা থেকে বিপাশাকে মেনে নেয়নি।ফজলু যেদিন এই কথা জানায়, সাথে সাথে বিপাশা আফসারের কাছে এসে বলে, “অনেক ভালোবাসাবাসি করছো, এইবার চলো মোরা বিয়ে করি”।

আফসার হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো।এই মেয়েকে সে কখনো জানায়নি, এবং অন্য কাউকেও কখনো বলেনি যে বিপাশাকে সে পাগলের মত ভালোবাসে।মেয়েটা কি করে বুঝলো সে জানেনা।তারা সেদিনই বিয়ে করলো।আফসারের তখন নতুন একটা ছোটখাটো কোম্পানীতে চাকরী হয়েছে।কোনরকমে টেনেটুনে তারা একবছর পার করলো।ভালোবাসাহীন এক বছর।সেই এক বছরে বিপাশা প্রতিদিন কেদেছিলো ফজলুর কথা ভেবে।ফজলু মাঝে মাঝে আফসারের বাসায় আসতো।যখন আফসার বাসায় থাকতোনা ঠিক তখনই আসতো।আফসারের সাথে যদি কোনভাবে ফজলুর দেখা হয়ে যেতো ফজলু তখন হাসিমুখে বলতো, “দোস্ত ভাবীর সাথে প্রেম করতে আসছি”।
আফসার হাসিমুখে বলতো, “এখন বাসা থেকে বের হ।আমি এখন তোর ভাবীর সাথে প্রেম করবো”।
একদিন আফসার যখন বাসায় আসে, তখন ফজলু গম্ভীর হয়ে আফসারের দিকে তাকিয়ে বললো, “দোস্ত এমন একজনের সাথে কেন জীবন পার করছিস যে তোকে ভালোবাসেনা, আরেকজনকে ভালোবাসে?”
বিপাশার হাতে তখন একটা ট্রাভেল ব্যাগ গুছানো।ফজলুর দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি একটু নিচে যাও আমি আসছি”।
বিপাশা কান্নাভেজা কন্ঠে তাকে বলেছিলো, “আমার মেয়েটাকে আমি রেখে যাচ্ছি তোমার কাছে।অনুগ্রহপূর্বক তুমি ওকে কখনো কষ্ট দিয়োনা”।
আফসার শান্ত কন্ঠে বলে, “তোমার মেয়ের জন্য তোমার কষ্ট হবেনা?সাধারণ কুকুর বিড়ালেরও বোধ করি তাদের সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় ভালোবাসা আছে”।
এতোটা কঠিন কথা আফসারের মুখে শুনে বিপাশা একটু ঘাবড়ে গেলো।আফসার নিজেই আবার বললো, “রাগ করোনা বিপাশা।তুমি যার জন্য এতকিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছো, একবার ভেবে দেখো কতটা সুখী হতে পারবে?”

বিপাশার চোখে তখন ফজলু আর তার ভালোবাসা, আফসারের কথা কিছুই তার মাথায় আসেনি।সে চলে গিয়েছিলো, হারিয়ে গিয়েছিলো এবং আফসারের তাতে সেদিনের পর কখনো কোন দুঃখবোধ হয়নি।
অনেকদিন পর ফজলু আফসারকে ফোন দিয়েছিলো। তাকে ফোন করে বললো, “দোস্ত সুখী হতে পারিনাই”।
আফসার হাসতে হাসতে বলেছিলো, “ভাবী টাইপ কাউকে ভাগায় নিয়ে কোন নির্লজ্জ সুখী হইছিলো বলে শুনিনাই”।

ফজলু ফোন রেখে দিয়েছিলো।তারও অনেকদিন পর বিপাশা তাকে একটি চিঠি লিখে।চিঠিতে লিখা ছিলোঃ
“আফসার আমি যে অপরাধ করেছি তা ক্ষমার অযোগ্য এটা আমি জানি।তুমি আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছিলে আমি তা আজকে বুঝতে পারি।একটাই অনুরোধ করবো, নিতিকে তুমি কখনো বলোনা আমার কথা।কোনদিন না”।
চিঠিটা পাওয়ার পর আফসার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেদেছিলো।বিপাশার জন্য না, তার মেয়ের জন্য।আফসারের বাবা মা নেই অনেক আগে থেকে।এই একটা মেয়ে তার জীবনের সবকিছু, তার একটাই কষ্ট সে মেয়েটাকে মায়ের ভালোবাসা দিতে পারেনাই।

মাইশা আফসারের কাধে ধাক্কা দিয়ে বলে, “আফসার ভাই কোথায় হারিয়ে গেছেন?বলেন না, ভাবীকে মিস করেন এখনো?”
আফসার কিছু বলেনা আবারও।মাইশা জিজ্ঞেস করে আবার, “ভাবীকে আপনি কি ভালোবাসছেন কখনো?ভালোবাসলে এমন হলো কেন?ভাবী প্রতিদিন আমার সাথে এসে গল্প করতো।কখনো মনে হয়নাই সে অনেক সুখী।আপনি তাকে অনেক ভালোবাসেন নাই কেন?”
আফসার মাইশার দিকে তাকিয়ে বলে, “মেয়ে একটা ঘটনা বলি।বিপাশা যেদিন আমার কাছে বিয়ের কথা বলতে আসে, তখন নিতির বয়স এক মাস তার মায়ের পেটে।এই ব্যাপারটা সে আমাকে হাসতে হাসতে বলে।আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম কি জানো?আমি বলেছিলাম, কোন সমস্যা নাই, আমার ছেলেমেয়ের অনেক শখ।মাইশা তুমি কি তোমার উত্তর পেয়েছো?”

মাইশা কিছু না বলে আফসারের দিকে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি দিলো, তার পর নিতির কাছে দৌড়ে গেলো।কারণ নিতি তখন পেট চেপে ম্যা ম্যা করছে। এটা তার বাথরুম ধরেছে বুঝানোর সংকেত।

রাত দশটার দিকে যখন বাসায় ফিরলাম, হঠাৎ করে দেখি নিতির গায়ে প্রচন্ড জ্বর।আফসারের মাথা ঠিক থাকেনা যখন মেয়ের কোন সমস্যা হয়। সারারাত সে মেয়ের পাশে বসে রইলো।মেয়ে কোন কথা বলেনা, কিছু খায়না।সকালবেলা সে ঠিক করলো অফিসে যাবেনা।তার কলিগ মাসুম ভাইকে ফোন করে বললো, ভাইজান আমি দুদিনের ছুটি নিতে যাচ্ছি।মেয়েটার শরীর খুব খারাপ।
মাসুম সাহেব চিন্তাযুক্ত কন্ঠে বললেন, “কোন সমস্যা নাই।দুদিন না চারদিন ছুটি নেন।বসরে আমি টাইট দিয়্যা রাখবো”।
মাইশা আজকে বাসায় নেই।নাহলে হয়তো আফসার ওকে ডেকে আনতো নিতির জন্য।ভরদুপুরে যখন আফসার ভাবছিলো মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে তখন হঠাৎ নিতি চিৎকার করে কাদলো, “আব্বু আব্বু”।
আফসার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কাদতে কাদতে বললো, “মা কি হইছে তোর?মা চল ডাক্তারের কাছে যাই”।

আফসার অর্ধপাগলের মত রাস্তায় বের হলো মেয়েকে নিয়ে।মেয়ে কাল রাত থেকে কিছু খায়না।সকাল থেকে ১০২ জ্বর।তার মাথা তো ঠিক থাকারও কথা নয়।রাস্তায় একটা সি.এন.জিকে জোর করে আটকিয়ে শিশু হাসপাতালের দিকে রওনা দিলো।তার সমস্ত শরীর দিয়ে তখন দরদর করে ঘাম বের হচ্ছে।আফসার দরিদ্র মানুষ, তার সামর্থ্য নাই মেয়েকে নিয়ে বড় হাসপাতালে যাওয়ার।এই দুঃখে তার বুক ফেটে কান্না আসতে চায়।সে বারবার মেয়ের মুখ তার বুকে চেপে বলে, “মামণি তোর কিচ্ছু হবেনা।আব্বু আছেনা?আব্বু আছেনা?”
মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে করাতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।তাও হতোনা যদিনা হাসপাতালে তার ভার্সিটির বন্ধু মিশুর বউ মিমি ডাক্তার না হতো।মিমি আফসারকে খুব কঠিন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “মেয়ের তো মনে হয় ফুড পয়জনিং হয়েছে।একটু খেয়াল রাখতে পারেন না কি খাওয়াচ্ছেন না খাওয়াচ্ছেন”।
আফসার বললো, “ভাবী কাল রাতে চাইনীজ খেতে গিয়েছিলাম।মনে হয় সেখান থেকে কিছু হয়েছে”।

মিমি কপালে হাত দিয়ে বললো, “আপনার মত দুষ্টু লোকদেরই আল্লাহ বাচ্চা কাচ্চা দিলো।আমি আর আপনার ফাজিল বন্ধু অনেক চেষ্টা করেও এখনো আল্লাহর সদয় দৃষ্টি পেলাম না।এটাই আফসোস।শুনেন মেয়ে ঠিক হয়ে গেলে আমি আর আপনার কাছে দিবোনা।বিপাশা নাই, কিভাবে না জানি আপনি ওকে মানুষ করছেন।আমি ওকে রেখে দিবো ওকে?”
আফসার মিমির হাত ধরে বলে, “ভাবী মেয়েটা ছাড়া আমার কেউ নাই।একটু ঠিক করে দেন”।

মিমি চোখ মুছতে মুছতে বলে, “মেয়েটা আমারও।আর আল্লাহর কাছে যেয়ে বলেন, আমার কাছে কিছু বলবেন না।আমি কেউ না ঠিক করার”।
রাত আটটার দিকে আফসার হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করলো।এইসময় মাইশা দৌড়ায় দৌড়ায় হাসপাতালে আসলো।এসেই কাউকে কিছু না বলে আফসারকে জিজ্ঞেস করলো, “আমার মেয়ে কই?”

আফসার হাত দিয়ে নিতির ওয়ার্ড দেখিয়ে দিলে মাইশা কোন কথা না বলে দৌড় দিয়ে নিতির কাছে গেলো।আফসারও পেছন পেছন গেলো।সিগারেট আর পান করা হলোনা।নিতি তখন ঘুমাচ্ছে।মাইশা কিছুই কেয়ার করলোনা, সে নিতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, “মা তোর কি হইছে?আমার সাথে কথা বল”।
আফসার মাইশাকে বলে, “ও ঘুমাচ্ছে।কিভাবে কথা বলবে?”
মাইশা কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আপনি এতো খারাপ কেন?কাল থেকে এই অবস্থা, একবারও জানাতে পারলেন না?”

আফসার কোন উত্তর খুজে পাচ্ছিলো না।একটু পর মাইশার বাবা মা এলে মাইশা একটু স্বাভাবিক হয়ে বারান্দায় যায়।আফসার ওর কাছে স্যরি বলতে ওর পিছু নেই।মাইশা আফসারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে বলে, “আপনার কি মনে আছে আফসার ভাই, কোন একদিন গভীর রাতে আমি আপনার বাসায় গিয়ে আপনাকে প্রপোজ করেছিলাম?আপনাকে কাদতে কাদতে বলেছিলাম, আমাকে বিয়ে করুন”।
আফসার বিব্রত বোধ করলো, তার ব্যাপারটা মনে আছে।এটা আজ থেকে দু বছর আগের কথা।সে কখনো এমন কিছু চিন্তা করেনি আগে।সে সেদিন মাইশাকে বলেছিলো, “বাসায় যাও”।

মাইশা অসম্ভব কষ্ট পেয়েছিলো।একমাস বিছানায় জ্বর নিয়ে পড়ে ছিলো।এরপর যখন আফসারের সাথে দেখা হলো, সে আফসারকে বলেছিলো, “আপনাকে ভয় দেখিয়েছিলাম।আপনি এত ভীতু?”

মাইশা তার দিকে গাঢ় চোখে তাকিয়ে বললো, “আবার বলছি আপনি আমাকে বিয়ে করবেন?আপনাদের ছাড়া আমি বাচবোনা।আমার কিচ্ছু চাইনা আপনার কাছে।আমি আপনাকে কোন গালাগালি করবোনা।খোচাবোনা, বাজে বাজে কথা বলে যন্ত্রণা করবোনা।আপনি শুধু আমাকে বিয়ে করেন”।

আফসার বিশাল যন্ত্রণায় পড়লো।সে কিছু বললোনা।পাচ মিনিট ভ্যাবলার মত মাইশার দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু।মাইশা কিছু না শুনে চলে গেলো নিতির পাশে।নিতি একটু চোখ মেলে আব্বু আব্বু করে ডাকছিলো।আমি পাশে যেয়ে বসলাম।মাইশার বাবা জহির সাহেব তার স্ত্রীকে নিয়ে বাহিরে চলে গেলো।যাবার আগে জহির সাহেব আফসারকে বললেন, “বাবাজী একটু বাহিরে এসেন,আপনার সাথে কথা আছে”।
আফসার বুঝতে পারলো, তারা হয়তো তাদের মেয়ের এহেন আচরণ প্রত্যাশা করেনি।কিছু কঠিন কথা শোনার অপেক্ষায় রইলো আফসার।
নিতি মাইশার কোলে যেয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ছিলো।আফসারের আঙ্গুলগুলো ধরে সে বারবার নাড়াচ্ছিলো।ঘুম ঘুম কন্ঠে সে বলছিলো, “আব্বু বাসায় যাবো”।
মাইশা নিতিকে জড়ায় ধরে বলে, “তোকে আমার বাসায় রেখে দিবো বুঝলি।তোর আব্বু পচা”।

আফসার কিছু বলেনা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।মেয়ে ঘুমিয়ে গেলে, আফসার মেয়ের মাথায় চুমু দিয়ে বাহিরে আসে জহির সাহেবের সাথে কথা বলতে।জহির সাহেব তখন তার বউয়ের হাতে বানানো পান খাচ্ছেন।আফসারকে দেখে পানের পিক ফেলে বললেন, “বাবাজী আপনি কি ঠিক করেছেন এভাবেই জীবন চালাবেন?মেয়েটার আজ যে অবস্থা দেখলাম, আপনি বোকাসোকা মানুষ এই মেয়েকে একা একা মানুষ করবেন কি করে?”

আফসার মাথা নাড়ে।জহির সাহেব বলেন, “আমার মেয়েটা আপনার বাচ্চাকে ছাড়া কিছু বুঝেনা।সে আজকে বাসায় কি পাগলামী করছে এটা না দেখলে বুঝানো যাবেনা।শুধু মেয়ে না, মেয়ের মাও একই রকম পাগল আপনার মেয়েটার জন্য।আমি তাই অনেক চিন্তা করে ভাবছিলাম, আপনার আপত্তি না থাকলে আমি আমার মেয়ে আর আপনাকে নিয়ে ভালো কিছু ভাবি।কি বলেন?”
আফসার মূক হয়ে গেলো জহির সাহেবের কথা শুনে।সে মাইশাকেও কিছু বলতে পারেনি, তার বাবাকেও না।

তিন বছর পর কোন একদিন নিতিকে কোলে নিয়ে মাইশা আফসারের সামনে এসে বলে, “আমার বদ স্বামী, তুমি কি আজকের এই মহান শুক্রবারে আমাদের কোথাও ঘুরাতে নিয়ে যাবে?”
আফসার হাসিমুখে বললো, “হুমম।জায়গা ঠিক করো”।
মাইশা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো, “নাহ আজকে বাহিরে যাবোনা।আজ বাহিরে তুমুল বৃষ্টি হবে আমি দেখতে পাচ্ছি।আজ আমরা খিচুরী খাবো ডিমের ভর্তা দিয়ে।তারপর সন্ধ্যায় তুমি আমার আর আমার মেয়ের জন্য রবি ঠাকুরের গান গাইবে”।
আফসার ঢোক গিললো।সে তার এই জীবনে কোনদিন রবি ঠাকুর কেন বদি ঠাকুরের গানও গায়নি।কিন্তু মাইশার এইসব অদ্ভুত দাবী তাকে মেনে নিতে হয় সবসময়।মা মেয়ে তাকে খুব যন্ত্রণা করে কথা না শুনলে।তাই সে মাথা নাড়ে, ভালোবাসা নিয়ে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29418574 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29418574 2011-07-23 18:56:54
আঁধারে স্বপ্ন; আর সূর্যের গল্প
সুবোধবাবু বহু চিন্তা করেও বুঝতে পারছেন না এত রাতে তার বাড়ির আঙ্গিনায় এভাবে একটা মৃত মেয়ে পড়ে আছে কেন?লাশটা এলোই বা কোথা থেকে?২৫শে আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষ রাত, কিন্তু অদ্ভুত ভাবে আকাশে অনেক অনেক তারা।কেন যেন তার মনে হচ্ছে আকাশটা লাল হয়ে আছে।এর মাঝে এভাবে একটা মৃত তরুনী মেয়ের লাশ যে কারো বুকে কাপন ধরিয়ে দিতে যথেষ্ট।সুবোধবাবু তার কেরানী আসলাম আলীকে চিৎকার করে ডাক দিলেন।কিন্তু গলা থেকে একটা ধাতব জন্তুর মত কন্ঠ বের হয়ে এলো।আসলাম আলী যে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তা অধ্যাপর সাহেব দেখেননি বোধ করি।আসলাম আলী কঠিন স্বরে বললো, “জ্বী স্যার”?

সুবোধবাবু আরেকটি ধাক্কা খেলেন, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আসলাম লাশটি কিভাবে এখানে এলো”?
আসলাম মিনমিন করে বললো, “স্যার আমি জানিনা।লাশটা কি ফেলে দিয়ে আসবো পাশের পুকুরে?শুধু শুধু ঝামেলা নিবেন না কাধে।মানুষজন পরে কটু কথা বলবে।ওই দেখেন মেয়ের শাড়ির অনেকটা কিন্তু ছেড়া।ছি ছি”!
সুবোধ বাবু মাথা নেড়ে শান্ত স্বরে বললেন, “যাও মাওলানা সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসো।রহমত সাহেবকে খবর দাও।করুণাময় এই তরুনীর আত্নাকে শান্তি দিক”।

আসলাম তার মুখের খোচা খোচা দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে হেটে চলে গেলো।এতো রাতে মাওলানা সাহেবের বাসায় যাওয়াটা একটু ঝামেলার।গহীন বনের মধ্য দিয়ে হেটে যেতে হয় পুরো রাস্তা।সে বুঝে পায়না এতো জায়গা থাকতে ঈমাম সাহেব কেন এমন গহীন অরণ্যে থাকে।মনে মনে সে ঈমাম সাহেবকে দুটো গালি দিলো।

রহমত সাহেব সদরে থাকে, সে এই গ্রামের বিশিষ্ট মুরুব্বী।কোন রকম সমস্যা হলেই তাকে জানানো হয়।রহমত সাহেবের একটাই বদ অভ্যাস।প্রতি বছরে এক বিশেষ দিনে উনি ভয়ংকর মদ্যপান করেন এবং চিৎকার করে বলেন, “ওরে মনে লীলাখেলা চলেরে, বাদ্য কাহা হ্যায়”! বেশ কয়েকটি বিয়েও করেছেন তিনি।আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো তার সব বউদের মাঝে অস্বাভাবিক মিল মহব্বত আছে।আসলাম আলীর ছোট মাথায় এই ব্যাপারটা আসেনা।সে নিজের একটা বউই ঠিকমত চালাতে পারেনা, এই বদমাইশ ব্যাটা এতোগুলা বউ একসাথে ফিট করে রাখলো কি করে?
নীলচে ভোরের আলো সুবোধ বাবুর আঙ্গিনায় যখন দুষ্টু খেলায় মগ্ন তখন রহমত আলী সহ গ্রামের আরো কিছু মুরুব্বী গভীর চিন্তায় পড়ে আছে।মাওলানা সাহেব হঠাৎ করে সবার চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে বললেন, “আমি জানাজা পড়ায় দিতে চাই দ্রুত।বেগানা মহিলার লাশ এভাবে এতক্ষণ ফালায় রাখা ঠিক না”।
রহমত আলী হাসিমুখে বললেন, “ওহে মূর্খ মাওলানা এইটা যে মুসলমানের লাশ কেডায় কয়েছে”?
সুবোধবাবু নিজে থেকে এবার বললেন, “মেয়েটার গলায় একটা তাবিজ আছে।তাছাড়া হিন্দু ধর্মের হলে শাখা থাকতো হাতে।এই বয়সের একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ারও কথা ছিলো।কিন্তু মেয়েটার মাথায় কোন সিদুর নেই।আপনারা অনুগ্রহপূর্বক মেয়েটাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।এভাবে তাকে অপমান করবেন না আর”।

মাওলানা সাহেব একঘন্টার মাঝে দাফন কাফনের ব্যবস্থা করে ফেললেন।কবর দিয়ে যখন সুবোধবাবুর কাছে ফিরে এলেন তখন অধ্যাপক সাহেব একটা বিশাল বই নিয়ে পড়ছেন।হালকা কাশি দিয়ে ঈমাম সাহেব ঘরে ঢুকলেন। সুবোধবাবু তখন নিবিড় মনোযোগ দিয়ে জীবনতত্ত্ব নিয়ে একটা বই পড়ছিলেন।ঈমাম সাহেব মৃদু হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এত বইপত্র কি পড়েন”?
সুবোধবাবু বই হাতে নিয়েই বললেন, “আমি পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছি।কিন্তু আজকাল প্রাণ রহস্য নিয়ে পড়াশোনা করেও বেশ আগ্রহ পাই।হাতে যে বইটা তা হলো ডারউইনের বিবর্তনবাদ।মানব জাতির বিবর্তন ও প্রাণতত্ত্ব নিয়ে বইটায় খুব চমৎকার আলোচনা আছে।আপনি চাইলে একদিন বইটার সারসংক্ষেপ আপনাকে শুনাবো”।
ঈমাম সাহেব আত্নতুষ্টি নিয়ে সুবোধবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জনাব।আপনার থেকে জ্ঞানের অনেক আলো পাই বলেই বারবার ছুটে আসি।সেদিন আমাকে আপনি নিউটন সাহেবের কি যেন সূত্র বুঝিয়েছেন তা আমি আমার মক্তবের ছেলেপেলেকে বুঝিয়ে বললাম।মনে খুব শান্তি পেয়েছি।এখন একটা খোয়াইশ নিয়ে আপনার কাছে এসেছিলাম”।
সুবোধ বাবু ভ্রু কুঞ্চিত করে ঈমাম সাহেবকে বললেন, “বলে ফেলুনতো কি উপকার হয় আপনার আমার দ্বারা”।
ঈমাম সাহেব মাথার টুপি খুলে ফু দিয়ে ঝেড়ে বললেন, “আমার বাসায় একদিন আপনাকে নিয়ে যেতে চাই।আপনাকে নিজ হাতে কিছু রান্না করে খাওয়ানোর বাসনা বহুদিনের।কিন্তু বলি বলি করেও বলা হয়নি।আমার দাওয়াত কবুল করলে অশেষ মেহেরবাণী হবে”।
সুবোধবাবু হাসিমুখে বললেন “অবশ্যি যাবো, আমি যতদূর জানি আপনার রান্নার হাত অনেক ভালো।সবাই বেশ প্রশংসা করে।যেদিন বলবেন সেদিনই যাবো”।

গভীর রাতে সুবোধবাবু যখন ঘুমিয়ে পরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঠিক সে সময় একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো।কালরাতের মৃত মেয়েটা সুবোধ বাবুর পড়ার টেবিলের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।সুবোধ বাবু প্রথমে দেখেও না দেখার ভান করলেন।কিন্তু একটু পর যখন মেয়েটার চোখে তার চোখ পড়লো, উনি ভয়ংকর ধাক্কা খেলেন। এই চোখ তো মৃত মানুষের চোখ নয়।জ্বলজ্বলে সেই ভালোবাসাময় চোখের দিকে তাকিয়ে উনি ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার জন্য কি করতে পারি”?
মেয়েটা ফিক করে হেসে দিয়ে বললো, “জল খাবো”।
সুবোধ বাবুর বয়স ৫৩ বছর, তার জ্ঞান হবার পর থেকে এমন অদ্ভুত কিছু কখনো সে দেখেনি জানেনি।তার প্রচন্ড মাথা ধরে গেলো, এবং হঠাৎ করে সে বুঝতে পারলো সে জ্ঞান হারাতে যাচ্ছে।কিছু বোঝার আগেই সে কখন তার প্রিয় আরাম কেদারা থেকে পড়ে গেলো, নিজেও বুঝতে পারলোনা।রাত তিনটায় যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন চারদিকে অন্ধকার।ঘরের কুপিবাতি কখন নিভে গেছে কে জানে।ঘরের জানালাটা খোলা আর সেই খোলা জানালা দিয়ে হুহু করে বাতাস ধেয়ে আসছে।সুবোধবাবু চোখ মেলেই দেখলেন সেই মেয়েটা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।উনি ব্যাপারটা শান্তভাবে নেয়ার চেষ্টা করলেন।পদার্থবিদ্যার সূত্র অনুযায়ী একই বস্তু কখনো একই সাথে দুটি অবস্থানে বিরাজ করতে পারেনা।যাকে গতকাল ভোর সকালে কবর দিয়ে আসা হয়েছে সে কি করে এখন তার পাশে আছে সে পদার্থবিদ্যার হাজার সূত্র দিয়েও বুঝতে পারলেননা।আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে আরেকটি মেয়ে যে দেখতে হুবহু কালকের তরুনীর মত এখন তার সামনে বসে আছে?এসব ভাবতে ভাবতে উনি উঠে বসলেন।মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে জানতে চাচ্ছিনা।এত রাতে এভাবে আমার গৃহে আপনাকে দেখলে আমার এবং আপনার কারো জন্য ভালো হবেনা তা কি বুঝতে পারছেন”?
মেয়েটা গম্ভীর হয়ে বললো, “আপনি ছাড়া আমাকে আর কেউ দেখতে পাবেনা।আপনি যে এতোটা ভীতু তা কিন্তু আমি আগেই বুঝেছিলাম।কাল আমার লাশ দেখে এভাবে চিৎকার করলেন কেন”?

সুবোধ বাবু আবার জ্ঞান হারালেন।তার জ্ঞান ফিরলো যখন তখন চারদিকে মধ্যদুপুরের সূর্য।উনি ঠিক করলেন আজ আর স্কুলে যাবেন না।কিছুক্ষণ গীতা পাঠ করে মনটাকে শান্ত করার প্রাণপন চেষ্টা করলেন। মন শান্ত হলো এবং বিকালে তিনি চমৎকার একটা ঘুম দিলেন।সন্ধ্যারাতে যখন ঘুম ভাঙ্গলো, তখন আসলাম সুবোধবাবুর পাশে বসে আছে।আসলামের বসার ভঙ্গিটা অনেকটা মহাত্না গান্ধীর মত।মাথাটা ন্যাড়া করে হাতে একটা লাঠি ধরিয়ে দিলেই হবে।আসলাম সুবোধবাবুকে জাগ্রত হতে দেখে বিছানা থেকে উঠে বসলো।আসলামের চোখে পানি দেখে সুবোধবাবু ভ্রু কুঞ্চিত করলেন।আসলামকে বললেন, “আমার আলমারীর উপরে কিছু টাকা আছে নিয়ে যাও”।
আসলাম চোখ মুছতে মুছতে বললো, “স্যার টাকা লাগবেনা আর।আমার মেয়েটা মারা যাওয়ার আগে আপনাকে দেখতে চাইছিলো।আমারে বলে, বড়আব্বু কই?আমি কিছু বলতে পারিনাই।আপনারে দৌড় দিয়ে ডাকতে যাবার আগেই আজরাঈল সাহেব কাজ সেরে ফেলছেন।স্যার একবার চলেন, মেয়েটার মাথায় একটু হাত দেবেন।আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করতাছি তাই দাফন দেইনাই”।

সুবোধবাবু গায়ে একটা শাল জড়িয়ে শীতল আবহাওয়ায় বের হয়ে গেলেন।শরতে এমন ঠান্ডা পরতে তো কখনো দেখেননি।আসলামের মেয়েটার নাম সুমি।সুবোধবাবু সুমির মাথায় হাত বুলালেন।ঈশ্বরকে মনে মনে জিজ্ঞেস করলেন, “ভগবান তোমাতে সবার আশ্রয় যদি রয়, ধরিত্রী বানাইলে কেন”?তার চোখের পাতা বারবার ঘোলাটে ভারী হয়ে যাচ্ছে।এই মেয়েটাকে কি তিনি আরো অনেক আগে কোথাও দেখেছেন?কেন যেন মেয়েটাকে তার লিয়েনা এর মত লাগছে।তার আদরের মেয়ে লিয়েনা।সুবোধবাবুর আশেপাশে হঠাৎ করে কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেলো।তিনি মনে মনে বললেন, “মামণিরা তোমরা যেখানেই থাকো অনেক ভালো থাকো।ভগবান তোমাদের ছোট্ট দেহ রবিকরের গাথুনীতে বেধে রাখুক, স্বর্গ সঞ্চালিত হোক প্রতিটি মনে”।

গভীর রাতে যখন সুবোধবাবু ঘরে পৌছালেন, সারা ঘরে কেমন একটা বদ্ধ হাওয়া।তার খাটে বসে ছিল সেই তরুনী মেয়েটা, কিন্তু আজ মনে হলো মেয়েটার মনটা বেশ বিষন্ন।সুবোধবাবু নিজের অজান্তেই বললেন, “মা আপনার মনটা খারাপ কেন”?
তরুনী মেয়েটা বললো, “আপনি আমার একটা উপকার করবেন?একটু কষ্ট হবে, তবুও বলছি”।
সুবোধবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তিনি কি সম্পূর্ণ মানসিক রোগী হয়ে গেছেন? রাত বিরেতে এক মৃত তরুনী তার কাছে এসে সাহায্য চাচ্ছে।তিনি হতাশ হয়ে বললেন, “আমি তো মা কারো উপকার করার সামর্থ্য রাখিনা।ভগবান চাইলে হবে।তুমি কি চাচ্ছো, বলো দেখি কিছু করতে পারি কিনা”।
তরুনী মেয়েটি ফিক করে হেসে দিয়ে বললো, “একটা ঠিকানা দিচ্ছি।সেখানে যেতে হবে।সেখানে গেলে আপনি একটা ছোট্ট ছেলে আর তার বাবাকে পাবেন।আমার তাদেরকে কিছু কথা বলা দরকার।আপনি আমার হয়ে তাদেরকে বলবেন”?

সুবোধবাবু তিনদিন পর পাবনা জেলার নূরপুর গ্রামে রওনা দিলেন।মেয়েটার দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী যখন মীনাক্ষালয়ে পৌছুলেন তখন তার পুরো শরীর জুড়ে ভয়ংকর জ্বর।বাড়ির দরজায় আস্তে করে ধাক্কা দিলেন।অনেকক্ষণ পর খুব বৃদ্ধ একজন বের হয়ে এলেন দরজা খুলে।কারো দিকে না তাকিয়ে সোজাসুজি বললেন, “মজিদ ভেতরে আও বাজান”।
সুবোধবাবু কিছু না বলে ভেতরে ঢুকলেন।বিশাল বড় দালান, মাঝে হিন্দু বাড়ির মত একটা ছোট্ট তুলসী গাছ প্রস্তর দিয়ে বাধানো।একটা ছোট্ট টিমটিমে হ্যাজাক বাতি জ্বলছে উঠোনের দক্ষিণ কোণায়।সুবোধবাবু কাশি দিয়ে বললেন, “আম্মাজী আমি মজিদ না।আমি সৌরভের কাছে এসেছি।আমি তার একজন সুহৃদ, তার সাথে একটু দেখা করতে চাই”।
বৃদ্ধ মঞ্জিলা বেগম পিছন ঘুরিয়ে তাকিয়ে বললেন, “বাবাজী আমি তার দাদী।তারে তো সকালেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।কোতোয়ালীতে তারে আটকায় রাখছে পুলিশ।আমার নাতবউরে নাকি খুন করছে সৌরভ।খুন করলে লাশ কই?ওর চাচায় জমি চায়, আমার নাতি বলিছে যে তার জমিজমার দরকার নাই।সব ওর চাচারে দিয়া দিবুই।কিন্তু আমার হারামী পোলা ফাসায় দিছে।আমার নাতিটা বাবা বিলাত থেকে পড়ায় আনছি।সোনার টুকরা পোলা।ওর বাপ মা কেউ বাইচা নাই।আমি কেমনে এখন বাচি, কেমনে ওর পোলাটারে বাচাই।আমার বাবুরে দেখবা একটু?সারাদিন কিছু খাওয়াইতে পারতাছিনা”।

সুবোধবাবু যখন বাবুর সামনে গেলেন, তখন তার বুকে হঠাৎ করে ধক করে উঠলো গভীর মমতায়।বাবুর গালে তখন অশ্রুজল শুকিয়ে আছে।সুবোধবাবু তার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “বাবা তোমাকে তোমার মা কতটা ভালবাসে তা কি জানো?সে তোমার জন্য ভগবানের সাথে আড়ি নিয়ে ধরনীতে এসে অপেক্ষা করে তোমাকে দেখতে”।
চার বছরের ছোট্ট বাবু তখন এত কিছু মনে হয় না হৃদয়ঙ্গম করতে পারলো, শুধু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেদে বললো, “মার কাছে নিয়ে যাবে?আমাকে কেউ খেতে দেয়না”।

সুবোধবাবু যখন সদর থানায় পৌছালেন, তখন সৌরভ চুপ করে গরাদের এক কোণে বসে কি যেন গাইছে।সুবোধবাবু যখন তার সাথে দেখা করার অনুমতি পেলেন তখন প্রায় ভোর হয়ে যাচ্ছে।নীলচে ভোরের আলোয় উনি সৌরভকে বললেন, “বাবা তোমার একটা চিঠি আছে”।
বুক পকেট থেকে চিঠিটা বের করে সুবোধবাবু সৌরভের হাতে ধরিয়ে দিলেন।সৌরভ সুবোধবাবুর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে নিজের কাছে রাখলেন।সুবোধবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “জন ডেনভারের Love Me গানটা শুনেছেন? আমার খুব প্রিয় একটা গান।আজকে বারবার লিরিকসগুলো ভুলে যাচ্ছি।চিঠিটা কি আপনাকে সুমি দিয়েছে?কবে দিয়েছে”?
সুবোধবাবু বললেন, “চিঠিটা পড়ে দেখো।সে তোমার সর্বপ্রকার মঙ্গল কামনা করে”।

গভীর রাতে সৌরভ যখন গানের লিরিকস মনে করতে পারলো, শুধু তখনি চিঠি পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো।চিঠিটা খুলে সে পড়লোঃ

“প্রিয়,
লন্ডনের ল স্কুলে তুমি আর আমি যখন একসাথে পড়তাম, তখন আমি প্রায় দিন তোমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কি ভাবতাম জানো?তোমাকে কখনো বলিনি, কিন্তু আমি তোমাকে সাদা তেলাপোকা ভাবতাম।হঠাৎ করে একদিন দেখি তুমি ক্লাসে নাই।পুরো ক্লাস আমি অস্থির হয়ে ছিলাম।ক্লাস শেষে ফ্লোরা আমার কাছে এসে বলেছিলো, আমি কাদছি কেন?আমি তাকে বলেছিলাম, আমি ভালোবাসতে শিখে গেছি মেয়ে।আমি তোমার মত একটা সাদা তেলাপোকাকে ভালোবেসেছিলাম আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে।আমরা বিয়ে করলাম, একত্র হলাম, আমাদের ছোট্ট একটা বাবু হলো।আমরা কত সুখী ছিলাম।তুমি কেন আমাকে তোমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলে সৌরভ?আমার কখনো ইচ্ছা করেনি।হাই স্ট্রিট পার্কের আমাদের ছোট্ট এপার্টমেন্টের আমরা কত সুন্দর জীবন কাটাচ্ছিলাম মনে পড়ে?আচ্ছা এ বছরই তো বাবুকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা।সব শেষ হয়ে গেলো, সবকিছু।
জানো আমি যখন শখ করে তোমার জন্য নীল রঙের শাড়িটা পড়ে ছিলাম হঠাৎ করে কে যেন আমার গলাটা চেপে ধরে।আমি ভেবেছিলাম তুমি।কিন্তু ওটা যে ভালোবাসার হাত ছিলোনা। আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম যখন শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করেছিলাম।আমার জন্য না জান, আমি কষ্ট পেয়েছিলাম তোমার জন্য, আমাদের বাবুর জন্য।প্রিয়, আমি জানি তুমি আমার কাছে খুব তাড়াতাড়ি আসবে।অনেক তাড়াতাড়ি।আমাদের বাবুর জন্য তুমি চিন্তা করোনা।যে মহামানব তোমাকে চিঠি দিয়ে গেছে, সেই আমাদের বাবুকে আমাদের স্বপ্ন দিয়ে মানুষ করবে।তুমি দেখো আমাদের বাবু একদিন অনেক বড় হবে।আমি তুমি হয়তো ছুতে পারবোনা ওকে, একটুও আদর করতে পারবোনা।কিন্তু আমরা ঈশ্বরের সাথে প্রতিদিন ঝগড়া করবো, তাকে যন্ত্রণা করবো অনেক অনেক যেন আমাদের সব প্রার্থনার বিনিময়ে হলেও আমাদের বাবুকে কোন কষ্ট না দেয়।
প্রিয় আমি তোমার জন্য প্রতিদিন কষ্ট পাই।শুধু তোমার জন্য আমি ফিরে এসেছি বিশ্বাস করো।তোমার কি মনে পরে যখন আমাদের বাবু হবে, তখন তুমি প্রতিদিন আমার হাত ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে।আমি কত রাত তোমার কাধে মাথা দিয়ে চাদটা দেখেছি।আমার কখনো ঘুম পায়নি।কখনো একটুও না।আমি যে তোমার ভুলভাল সুরে গাওয়া গানগুলো কান পেতে শুনতাম।প্রিয়, যেভাবে থাকি, যেখানেই থাকি আমি তোমার, আর তুমি শুধু আমার।আমি সবকিছু ধ্বংস হওয়ার লক্ষ বছর পরেও তোমার কাধে মাথা দিয়ে ভালোবাসার গান শুনবো”।

সৌরভ বারবার চেষ্টা করেও চোখ থেকে চশমা খুলতে পারলোনা।চশমার কাচ অশ্রুধারায় ভেসে গেছে।সে চিঠিটি আর পড়তে পারছেনা।আলতো করে শুধু বলছে, “আমায় ক্ষমা করো”।


সুবোধ বাবু একা বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে, আশেপাশে মানুষজন কেউ নেই তেমন।ভোর তখন উঠি উঠি করছে।হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখতে পেলেন সেই তরুনীকে।পাঠক তরুণীর নাম যে সুমি তা আশা করি ধরতে পেরেছেন।সুবোধবাবুর কাছে সুমি কিছু বলতে চায়।সুবোধবাবু বললেন, “মা আমি তোমার কথা রেখেছি।এখন ফিরে যাবো আবার”।
সুমি কান্নাভেজা কন্ঠে বললো, “আপনি একা যায়েন না।আমার একটা কথা রাখবেন, আর একটা মাত্র কথা”।
সুবোধবাবু বললেন, “মা আমি বাবুকে দুদিন পরে এসে নিয়ে যাবো।আমি তাকে নিজের সন্তানের মত মানুষ করবো, তুমি চিন্তা করোনা”।
সুবোধবাবুর মনে হলো সুমি অনেক কাদছে।তিনি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।সুমি নিজে থেকেই বললো, “বাবা আপনি আমার জন্য এত কিছু কেন করলেন”?
সুবোধবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মা আমি যখন রাশিয়াতে পিএইচডি করছি তখন এক সহপাঠিনীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।আমরা বিয়ে করেছিলাম, আমাদের একটা মেয়েও ছিলো।লিয়েনা নাম রেখেছিলাম আমাদের ছোট্ট মেয়েটার।মা মেয়ে, দুজন একদিন হারিয়ে যায় চিরতরে।আমি একা হয়ে পড়ি।আমার মেয়েটা হয়তো তোমার মত ছিলো, একেবারে তোমার মত।তুমি ভুল ভেবেছিলে, আমি তোমার মৃতদেহ দেখে ভয়ে চিৎকার করিনি।মনে হয়েছিলো, আমার মেয়ে এখানে কি করে এলো”।
সুমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে কাদতে বললো, “আব্বাজী আমার ছেলেটা যেন কোন কষ্ট না পায়, ওকে অনেক ভালোবাসা দিবেন।ওকে একজন মানুষ বানাবেন আপনার মত।ও খেতে চায়না একেবারে, একটু কষ্ট করে হলেও খাওয়াবেন ঠিকমত।আমি আর আপনাকে বিরক্ত করবোনা।আর আমাকে আসতেও দেবেনা ঈশ্বর।আপনি সৌরভের যখন ফাসি হয়ে যাবে তার আগে ওকে এসে বলবেন, আমি ওর জন্য দু হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করছি।বাবা আমি যাই”।

সুবোধবাবু খেয়াল করলেন, হঠাৎ করে প্রভাকর তার সমস্ত রূপ নিয়ে তার সামনে হাজির হয়েছে।তিনি মুগ্ধ হয়ে জগতের রূপ আবার দেখলেন।মনে মনে বললেন, “মা তোমার আত্নাকে ঈশ্বর শান্তি দিক, পরম ভালোবাসায় নিজের বুকে আগলে রাখুক”।



২০ বছর পর কোন এক সকালে বাবু এসে সুবোধবাবুর চশমা হাতে নিয়ে তাকে পড়িয়ে দিলেন।তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা আপনি এতো বই পড়েন কেন”?
সুবোধবাবু চশমার কাচ মুছতে মুছতে বললেন, “তুমি যেমন অনেক গান শোনো, আমিও অনেক বই পড়ি।এখন পড়ছি, বিগ ব্যাং থিওরী।বারবার পড়ি তবুও ভালো লাগে”।
বাবু হঠাৎ করে সুবোধবাবুর পাশে বসে বললেন, “বাবা আজকে একট বিশেষ দিন মনে আছে”?
সুবোধবাবু বাবুর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “আমি সকালে তোমার বাবা মায়ের গোরে প্রার্থনা করে এসেছি।তাদেরকে তুমি মনে করে কষ্ট পেওনা।তাদের আত্না তাহলে কষ্ট পাবে”।
বাবু সুবোধবাবুর হাতটা ধরে বললেন, “ওরা তো আপনার মাঝে লুকিয়ে আছে বাবা।যে ভালবাসায় আপনি আমাকে মানুষ করেছেন, আমি জানিনা আমাকে এত ভালোবাসা কি তারাও দিতেন”?
সুবোধবাবু ঝাপসা চোখে বললেন, “বাবারে তোমাকে তারা অনেক অনেক ভালোবাসে।তুমি আরো বড় হও, অনেক অনেক বড়।তাদের স্বপনের থেকেও বড়”।

সুবোধবাবু খুব বিচলিত হয়ে পড়লেন।বয়সের জন্য আজকাল প্রায়ই তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।বাবু কি আবার দেখে ফেললো তার ভালোবাসার জল?লজ্জা বড়ই লজ্জা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29408429 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29408429 2011-07-06 22:27:06
আমি তোমার জন্য লিখি
ঈশিতা কবে থেকে জানতো আমি ওকে পছন্দ করি আমি জানিনা।কিন্তু ও জানতো, ও আমাকে এই জন্য একসময় এড়িয়ে চলতো।আমি বুঝতাম না তা, অন্তত ওর হাতে প্রচন্ড আঘাত পাওয়ার আগ পর্যন্ত বুঝতাম না।আমি ওর সাথে আজকের আগে শেষ যেদিন কথা বলেছিলাম সেদিন বলেছিলাম, “তুমি আমার হবে”?

ঈশিতা বলেছিলো, তোমার লজ্জা করেনা?

ঈশিতা আমাদের পাশের বাসায় থাকতো।আমি তখন মাত্রই ক্লাস টুতে পড়ি।একদিন ও আমাদের বাসায় এসে আমার কান ধরে টানতে থাকে। আমি ভয়ে কেদে দেই, ও তখন নিজেও কেদে দেয়।আমি জিজ্ঞেস করি তুমি কাদো কেন?ও বললো, “ভয় পেয়েছি”।

ওই যে সেদিন ওকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিয়ে বলেছিলাম, “কেদোনা আমি আছিনা”?এরপর থেকে ওর সেই হাত আর ছাড়িনি।এমন কখনো কি হয়েছে, আমি ওর পাশে ছিলামনা যখন ওর মনে মেঘ জমেছিলো? আমার মনে পড়েনা।আমি ঈশিতাকে সবসময় আগলে রেখেছিলাম সব অন্ধকার থেকে।

ঈশিতা যখন ক্লাস টেনে উঠলো, তখন আমি হঠাৎ একদিন দেখলাম ও কার সাথে যেন অনেক কথা বলে ফোনে।আমি একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “তুমি কার সাথে কথা বলো ঈশি”?

ও আমাকে ইতস্তত করে বলেই ফেললো, যে ওর একজন ভালোবাসার মানুষ হয়েছে। ওর ওই ছেলেটাকে অনেক ভালো লাগে।আমি প্রচন্ড অভিমানী ছিলাম, অনেক।আমার এই কথাটা শুনে হঠাৎ করে মনে হয়েছিলো সব কিছু ফাকা হয়ে গিয়েছে।আমি কিছু বলিনি ওকে।নিজের রুমে ঢুকে ভয়ংকর কাদলাম।ছেলে মানুষের কাদতে নাই, আমি তাই কান্না থামিয়ে ওকে বিশাল একটা চিঠি লিখলাম।তাতে একশোবার লিখলাম, ভালো থেকো ওই ছেলেকে নিয়ে। আমি হারিয়ে গেলাম এক গভীর ঘোরে।
সুররিয়েলস্টিক ছবির দিকে আমার ভয়ংকর মোহ কাজ করতো, লেমন ইয়েলো আর পারপেল রং মাখিয়ে আমার ঘরের দেওয়ালটায় অসাধারণ কিছু চিত্রকর্ম করেছিলাম।আব্বু আম্মু যখন প্রথম দেখলো আমার আর্ট, তারা আমাকে বেশ প্রশংসা করেছিলো।আমি প্রতিটা ছবিতে ইউনিকর্ণ আকতাম যাতে এক চমৎকার রাজকুমারী খেলা করতো।নিঃসন্দেহে ওটা ঈশিতা ছিল।আর আমি ওকেই শুধু ভাবতাম আমার প্রতিটা ছবি আকার সময়।সেদিনের পর একদিন ঈশিতা আমার রুমে এসে বললো, “তুমি ওভাবে চলে গেলে কেন সেদিন?আমি জানি তুমি আমাকে চাও”।

আমি হেসে বললাম, “আচ্ছা এই ছবিটা কেমন?এইযে দেয়ালের একদম শেষ মাথায়”।
ও আমাকে পাত্তা না দিয়ে বললো, “অর্ক সবাইকে ভালোবাসা যায়না।আমার ওকে অনেক ভালো লাগে কেন জানো”?
আমি বললাম, “না”।
ও ওর মাথা বিরক্তি দিয়ে নাড়িয়ে বললো, “কারণ ওকে ভালোবাসা যায়।আমি ওকে ভালোবাসতে পারি।ওটা ভেতর থেকে আসে।সবার জন্য আসেনা”।

আমি খপ করে ঈশিতার হাত ধরলাম।আমি জানিনা তখন আমার কেমন অনুভূতি কাজ করছিলো।আজো আমি সন্দিহান সেটা রাগ ছিলো না ভালোবাসা, প্রচন্ড রকমের ভালোবাসা। আমি ওর হাত এত শক্ত করে ধরেছিলাম যে ও ব্যাথায় চিৎকার করে উঠলো।আমি সাথে সাথে ছেড়ে দিলাম।ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কাকে ভালোবাসতে পারো আর কাকে না পারো আমি তা জানিনা।আমার জানার ইচ্ছাও নাই।তুমি আমার কাছে আর কখনো এসোনা”।

ঈশিতা প্রচন্ড অভিমানী মেয়ে, আমি জানি।ও আমার দিকে এতোটা ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে রইলো হঠাৎ, আমি প্রচন্ড অসহায় বোধ করলাম। আমার মনে হতে লাগলো, আর কখনো আমাদের দেখা হবেনা।ঈশিতা কি জানতো আমি অনেক অভিমানী ছিলাম। ও যখন আমাকে কাদতে কাদতে বলেছিলো, “আমি তোমাকে অনেকবার বুঝিয়েছি, তুমি বুঝোনাই।এইজন্য এখন কি সেটা আমার দোষ”?

আমি বললাম, “তুমি কিভাবে আরেকজনকে ভালোবাসলা আমি জানিনা।আমার কোন সমস্যা নাই ঈশি।তুমি অনেক ভালো থেকো।তোমার ওই প্রেমিক পুরুষকে নিয়ে অনেক আনন্দে জীবন কাটাও”।
ও আমাকে আর কিছু না বলে চলে গেলো।আমি বুঝতে পারলাম যাকে আমি আজ পর্যন্ত কখনো এতোটুকু কষ্টও দেইনি সে আজ আমার দ্বারাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলো।কারণ আমি ওর অনেক কাছের বন্ধু ছিলাম, সবচেয়ে কাছের।তাকে আজ আমি এভাবে কষ্ট দিলাম, কিন্তু তখন এমন এক ঘোলাটে সময় পার করছিলাম যে ওভাবে খেয়ালই করতে পারিনি।
সেদিন রাতেই আমি ওকে ফোন করলাম।ওকে বিধ্বস্ত একজন সবহারানো মানুষের মত বললাম, “তুমি আমার হবে?”
ও বললো, “তোমার লজ্জা করেনা”?
ওর কন্ঠে তখন প্রচন্ড রাগ, প্রচন্ড অভিমান।আমি টের পাই সে আমার নয়।সে আমার কখনো ছিলোইনা।আমি হারিয়ে যাই অনেক দিনের জন্য।

প্রায় দশ বছর আগে ২০০১ সালের ২২শে জুন আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই ভালোবাসার মানুষের থেকে, কখনো আর ফিরে আসতে চাইনাই।আসার কথাও না।আমার আদরের একমাত্র ছোট্ট বোনের বিয়ে তাই অনেকদিন পর আবার দেশে আসা।মাঝের সময়টাই লস এঞ্জেলস ছিলাম, পড়াশোনা যতটা না করেছি তার থেকে বেশি ছবি একেছি আর ছবি তুলেছি।আমাকে আমার নেটিভ বন্ধুরা বলতো, গ্রেট ভিঞ্চি।পাঠক আপনারা কি খেয়াল করেছেন, ভিঞ্চির বেশিরভাগ ছবিতে ইনক্লুডিং লাস্ট সাপার একটা অপরাবাস্তব ব্যাপার আছে।আপনাকে তা ছুয়ে দিতে চাইবে, কিন্তু আপনি তাকে হাজার চেয়েও ছুইতে পারবেন না।

আমি যখন দেশে আসলাম, তখন আমার বাসায় প্রচন্ড কান্না।হঠাৎ করে আমি কেন চলে গিয়েছিলাম তখন তা কেউ জানতোনা।আমার ছোট্ট বোনটা ভাইয়াকে দেখে জড়ায় ধরে ভয়ংকর কান্না শুরু করে।ও আমাকে গালে বারবার চুমু দিয়ে বলে, “আমার ভাইয়া”।
আমি চোখ থেকে পানি ফেলতে ফেলতে বলি “দেখ আমি কত খারাপ মানুষ।এমন একটা বোনকে রেখে কতদিন দূরে পড়ে ছিলাম”।
ঈশিতার সাথে দেখা রাতের বেলায়।ওরা তখনো আমাদের পাশের বাসায় না থাকলেও একই এলাকায় থাকতো।আমি জানিনা ও কেন এসেছিলো বাসায়।কিন্তু যখন ও আমাকে স্যরি বললো, আমি বুঝতে পারলাম আমার ভালোবাসাগুলো মরে যাইনি।কিন্তু আমি ওকে আর আগের মত ভালোবাসতে পারিনা।

আমি যখন ওকে বললাম আমি ওর জন্য লিখি, এমনকি এখনো ওর জন্য ছবি আকি তখন সে খুব অবাক হলো বলে মনে হয়নি।আমি ওকে একসময় জিজ্ঞেস করলাম ওর ছোট্ট ছেলেটার কথা।ওর ছেলের নামটা খুব সুন্দর।ইনিত।ছেলেটাকে ও সাথে নিয়ে এসেছিলো।আমি ইনিতকে এক গাদা চকোলেট দিলাম, ওকে অনেক আদর করলাম।ইনিত তার মার মত হয়েছে পুরোপুরি।কিন্তু ও ওর মায়ের মত বোকা হয়নি।দুবছরের একটি ছেলে এতো সুন্দর করে কথা বলে, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি।

আমি আর ঈশিতা একসময় সবার থেকে কিছুটা আলাদা হয়ে গেলাম হঠাৎ করে।ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আমার বর্তমান জীবনের কথা।আমি কবে বিয়ে করছি তা যখন জিজ্ঞেস করলো, তখন আমি ওকে বললাম তুমি যেদিন দ্বিতীয় বিয়ের প্ল্যান করবে।

হ্যা আমার এটা বলা ঠিক হয়নি।ও মাত্র দেড় বছর হলো স্বামী হারিয়েছে।আর আমি অনেকটা কৌতুকের সুরে বলতে চেয়েছিলাম।কিন্তু কিভাবে যেন কথাটা এমন শুনালো যেন আমি অনেক আবেগের প্রগাড়তা তুলে ধরেছি এক অসহায় নারীর সামনে।

ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো, তার আগেই আমি বললাম “হ্যা আমি জানি আমি এমন একজন যাকে ভালোবাসা যায়না।ঈটজ ওকে।আমি স্যরি।আমি শুধু একটু কৌতুক করলাম”।

আমার কথা শুনে ঈশিতা একটু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলো যেন।আমি জানতে চাইলাম ওর স্বামী সজল মারা যাওয়ার পর ও কেমন করে জীবন কাটাচ্ছে?ওর মুখের অবয়ব একটুও পরিবর্তন হয়না।কিন্তু কিছু বলেওনা। শুধু যাই বলে চলে গেলো।আমি অনেক কষ্ট পেলাম, আমার মনে হলো আমার অনেক কিছু বলার ছিলো ওকে।এই মেয়েটা যাকে আমি একসময় পাগলের মত ভালবাসতাম সে আজ জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক অসহায় নারী।আমার দম আটকে চাইলো যখন মনে হলো ও কি এভাবেই দীর্ঘ জীবনটা কাটিয়ে দেবে?

মাকে যখন বললাম আমি ওকে বিয়ে করতে চাই, তখন মা একটু রাগ করলো।কিন্তু খুব বেশি না।মা জানে আমার কথা, মা বুঝে আমি কেন হারিয়ে গিয়েছিলাম।বাবাকে মা বুঝাতে পারবে আমি জানি।আমি ভয় পাচ্ছিলাম ঈশিতা কি করে তা ভেবে।হয়তো সে আমাকে ফিরিয়ে দেবে আবার, হয়তো সে আমাকে প্রচন্ড ঘৃণা করবে।কিন্তু আমি ওকে চাই, আজো চাই, পাগলের মত চাই।আমি বিশ্বাস করিনা কেউ কাউকে এতো বেশি চাইতে পারে।

মা যেদিন ওদের বাসায় প্রস্তাব নিয়ে গেলেন সেদিন রাতেই ও আমাকে ফোন দিলো। আমাকে ও প্রথম কথাটা জিজ্ঞেস করলো, “আমাকে অসহায় ভাবো অনেক না?অসহায় একজন নারীকে সাহায্য করতে হবে, তার পাশে দাঁড়িয়ে তার জীবন পার করাতে হবে এজন্য এই কাজ করলা?”
আমি বললাম, “না। আমি অসহায় জীবন যাপন করছি। আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে ভাবিনাই এই দশ বছরে।আমার তোমাকে দরকার জীবন পার করতে”।

ঈশিতা অত্যন্ত কঠিন ভাবে আমাকে বললো, “আমি তোমাকে কখনো ভলোবাসিনাই। ভালোবাসবোও না।আমি যাকে একবার ভালোবেসেছিলাম তাকে বিয়ে করেছি এবং তাকে নিয়েই আমি আমার জীবন পার করে দেবো।হয়তো সে পৃথিবীতে নাই, কিন্তু আমার মধ্যে সে আছে, ইনিতের মধ্যে আছে।তুমি যা করছো এটা ঠিক করোনাই। একদম না”।

আমি ফোনটা রেখে দিলাম।সারা রাত বারান্দায় বসে ভাবলাম, কি অপরাধ করেছিলাম জীবনে।এই মেয়েটাকে আমি কখনো কেন ভুলতে পারলাম না।কেন তাকে ছাড়া আমি আর কিছু ভাবতে পারলাম না? আমি আগেও তার সাথে বন্দী ছিলাম, আজও সেখানে, ঠিক সেখানেই বন্দী হয়ে আছি।অনেক চিন্তা করে ঠিক করলাম, ওর সাথে দেখা করবো। ওকে দুঃখিত বলবো, এরপর সব ছেড়ে চলে যাবো।

অনেক সকালে ওকে ফোন দিলাম, ওকে শুধু বললাম শেষ একবার ওর সাথে দেখা করা যাবে কিনা?আমি আর ওকে কখনোই চাইবোনা এরপর।ও অনেকক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো না।আমি ফোন রেখে দিলাম।
হ্যা আমি সব হারিয়েছি আগেই, আজ আবার সব হারালাম।তাতে কিইবা আসে যায় কার?আমি নির্লজ্জের মত একজনকে বারবার চেয়েছি এবং প্রতিবার সে হারিয়ে গেছে।আমি জানি আজকের পরও আমি তার জন্য অপেক্ষা করবো।ঈশিতা কি কখনো আমার অনুভূতি ছুয়ে দেখতে পাবে?একটাবারের জন্য।

যাওয়ার আগে ঈশিতাকে একটা চিঠি লিখে গেলাম।চিঠিটা অনেকটা এমন ছিলোঃ

"প্রিয় ঈশিতা, কি কারণে তুমি আমাকে সব সময় দূরে দূরে রেখেছো আমি জানিনা।তুমি কি আমার থেকে কখনো দূরে ছিলে? একেবারেই না।কিন্তু আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি,তুমি জানো আমি তোমাকে যতটা ভালোবাসি আর কেউ তা বাসেনা, বাসতেও পারবেনা।তুমি দশ বছর আগে এটা বুঝতে পারোনি।আর আজকে বুঝলেও ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছো।ঈশিতা তুমি বুঝতে পারছো যে আমি তোমাকে বুঝতে পারি। আমি তোমাকে প্রতিটা মুহূর্তে অনুভব করি এটা কি জানো? তুমি আমি যখন বন্ধু ছিলাম, তখন তোমার কি মনে পড়ে আমি তোমার হাত ধরে সবসময় ঘুরতাম।তুমি তো কখনোও আমার হাত ছাড়োনি তখন?এখন কি এতোই বড় হয়ে গেলাম আমরা যে একজন আরেকজনকে একটু কাছে রাখতে পারিনা। ঈশিতা তুমি আমাকে যত দূরে রাখো, আমি তোমাকে প্রতিটা মুহূর্তে ভালোবাসবো।তুমি যতবার আমাকে অবজ্ঞা করবা ততবার আরো বেশি করে ভালোবাসব।আমি আমার সব ভালোবাসা তোমাকে দেবো।আমি আমার সব গুলা অনুভূতি তোমাকে দেবো ছুয়ে দেখতে।তুমি আমাকে আরো হাজার বছর দূরে রাখলেও। দশ বছর আগেও তুমি চেয়েছিলে তাই দূরে চলে গিয়েছিলাম,আবারো যাবো।কিন্তু মনে রেখো আমি তোমার কাছেই থাকবো, তুমি আরো দশবার প্রেম করলেও, একশোবার বিয়ে করলেও"।

আমি তখন ফ্লোরিডায় একটা আর্টওয়ার্ক নিয়ে পাগলের মত ব্যস্ত।ঠিক সে সময় আমাকে অবাক করে দিয়ে ঈশিতা ফোন করে বললো, “কবে আসবে”?
আমি বললাম, “তুমি আমাকে হারিয়ে ফেলেছো।এখন আমি এক আমেরিকান মেয়ের সাথে প্রেম করছি।তার সাথেই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেব বলে ঠিক করেছি”।
ঈশিতা আমাকে আবার বললো, “কবে আসবে”?

তাকে আমি না করতে পারিনি।কখনো পারবোনা এটা সেও জানে।আমি আমার তল্পিতল্পা গুছিয়ে রওনা হলাম।আর্ট ওয়ার্কের গুষ্টি কিলাই।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29406223 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29406223 2011-07-02 23:35:10
দুষ্টু রাজকন্যা ও তাকে নিয়ে পলায়ন অবশেষে রাজকন্যার তার অমৃতবাণী দ্বারা আমাকে মুগ্ধ বিমোহিত করলেন।এমনই মুগ্ধ বিমোহিত করলেন যে আমার কানে তব্দা খেয়ে গেলো।নাক দিয়ে কানের গরম ধোয়া বের করতে করতে বললাম, “এত বাজে গালাগালি কোথা থেকে শিখছো।খবরদার আমাকে গালি দিবেনা।আমার আরো ভালবাসা বেড়ে যায় তোমার জন্য”।
রাজকন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার পাগল করা হাসিটা দিয়ে বললেন, “আমি তোমাকে গত তিন বছর ধরে বলছি আমার ব্যাপারে আশা করে লাভ নাই।আমার তোমাকে ভালো লাগেনা।কখনোই লাগেনাই”।
“তাহলে এই তিন বছর আগের এক বছর যে প্রেম প্রীতি ছিলো ওইটা কি ছিলো?”
“ওইটা কিছু ছিলোনা।তখন আমি বুঝার চেষ্টা করছি তুমি কেমন?তোমার সাথে আমার ম্যাচ করবে কিনা"।তার সরল সোজা উত্তর।
আমি মেজাজ খারাপের চরম পর্যায়ে যেয়ে বললাম, “ধুর মাইয়া তোমাকে ভালবাসিনা।রাখলাম ফোন।সন্ধ্যার দিকে ফোন দিলে ফোনটা ধরো”।
রাজকন্যা হাসতে হাসতে বলে, “কেন এমন করছো অর্ক।আর কাউকে পছন্দ করতে পারোনা?”
আমি টানা একমিনিট নিশ্চুপ থেকে ফোনটা রেখে দিলাম।পাঠক মজার কথা বলি, আমি রাজকন্যা নামে যে মেয়েটাকে পাগলের মত ভালোবাসি তাকে কখনো মোবাইলে ফোন করিনা।আমার কাছে মোবাইল জিনিসটা ফাজলামির উপকরণ মনে হয়।বাসায় এখনো সরকারী ফোন সার্ভিস আছে এবং ওইটাই ব্যবহার করি।বিশ্বাস করেন আর নাই করেন, অনেক গুড ফিল হয় তাতে।

রাজকন্যার সাথে প্রেম প্রীতি শেষে থিসিস কর্মে মনযোগ দিলাম।কামরুল স্যার ঝাড়ি দিয়ে লাস্ট উইকে বলছিলো যদি নেক্সট বুধবারের মধ্যে ADC দিয়ে টেম্পারেচার কন্ট্রোলার বানাতে না পারি তাহলে সে আমারে থিসিস ফেল করায় দিবে।যদিও ইঞ্জিনিয়ারিং লাইফে জীবনেও শুনিনাই থিসিসে কাউকে ফেল করানো হয়।আমি এইসব সাত পাচ ভাবতে ভাবতে মাইক্রোকন্ট্রোলার দিয়ে কিভাবে কনভার্টার বানানো যায় চিন্তা করতেছি।মাথায় তখন রাজকন্যার কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।আমরা অনেক ভালো একটা প্রেম করেছিলাম তিন বছর আগে।কিন্তু আমি তাকে কখনো বুঝাতে পারিনাই তাকে আমি কতটা চাই।এইজন্যই কি সে হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে?বুঝতে পারিনা, বুঝতে চাইনা।শুধু জানি তাকে দরকার, অনেক দরকার আমার জীবনে।আমি তাকে আজ প্রায় এক মাস পর ফোনে পেয়েছি।আমি সবসময় বুঝতে চেয়েছি সে আমকে কেন ঘৃণা করে।কেন আমার সাথে কথা বলতে চায়না।আমি চলে যাওয়ার পর সে আরো দুইজনের সাথে এফেয়ার করেছিলো।আমি তবুও তাকে ভালোবাসি, কেন বাসি জানিনা।বুঝিনা, কাউকে তা বলতেও চাইনা।

সন্ধ্যায় তাকে ফোন করে পাওয়া যাবেনা জেনেও আমি বারবার ফোন দিলাম।প্রতিবার তার বাসার কাজের মেয়ে ফোন ধরলো এবং শেষবার আমাকে বললো, “ভাইজান আপামণি বাসায় আছে কিন্তু ফোন ধরবোনা।উনি আমারে বলতে বলছিলেন যে উনি বাসায় নাই।কিন্তু আমি সইত্যবাদী”।
আমি বিশাল ঝাড়ি দিয়ে বললাম “মর”।

মেজাজটা খারাপ করে যখন বাহিরে বের হলাম ধোয়া টানতে তখন বাহিরে ঝমঝময়ে বৃষ্টি।মাথার মধ্যে একটা পাগলা বুদ্ধি আসলো।আমি রিকশা ডাক দিলাম।বললাম কলাবাগান লেক সার্কাস যাইতে।রিকশাওয়ালা ভাড়া জিজ্ঞেস না করে আমাকে তুলে নিয়ে জোরে টান দিলো।সে বুঝতে পারছে আমার মাথায় এখন পাগলামী ভর করছে।আমি বৃষ্টির মধ্যে ভেজা সিগারেট টানতে টানতে যখন রাজকন্যার বাসার সামনে আসলাম সে তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে রেলিং দিয়ে হাত বের করে বৃষ্টির পানি ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।আমি হাত নাড়লাম যাতে অবশ্যই সে বিরক্ত হলো বলে বুঝতে পারলাম।কিন্তু আমি মূক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাজকন্যার পলেস্তরা খসে পড়া, বিবর্ণ বাড়ির ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি তাকে এবং শুধুই তাকে।

সময় চলে যায়, আমিও বদলিয়ে যাই।রাজকন্যা হারিয়ে যায় কোন সে অবগাহনে আমি তা জানিনা, একসময় জানার চেষ্টাও আর করিনাই।আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ভালোবাসেনা তাকে জোর করে কাছে আনা যায়না।যাকে ভালোবাসি এতোটা তাকে আর কষ্ট দেবো কেন?আমি তার থেকে নিজেই হারিয়ে যাই।মনে আছে শেষবার ফোন করে চিৎকার করে কাদতে কাদতে বলেছিলাম, “তুমি আমাকে ভালোবাসলানা কেন?আমি হারায় যাবো তোমার থেকে, সারাজীবনের জন্য।তুমি আমাকে ভালোবাসলানা কেন???”

আমরা মনুষ্য জাতি ভালবাসা ছাড়া কেন বাচতে পারিনা তা আমি বুঝিনা।একসময় কি বিজ্জানীরা এমন কিছু আবিষ্কার করবেন যাতে হৃদয়ের অনুভূতিগুলো গুড়িয়ে মুচড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়া যাবে চিরতরে, নতুন করে ইনস্টল করা যাবে নতুন কোন ভালোবাসাকে।

চার বছর কিভাবে কিভাবে যেন কেটে গেলো।আমি এখন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে ডিপার্টমেন্ট হেড হয়ে বসে আছি।আমার সামনে কোন লক্ষ্য নাই, আমি অন্ধ মোষের মত দৌড়িয়ে বেড়াচ্ছি আর মানুষকে দৌড়ানি দিচ্ছি।জীবনে কেউ এসেছিলো নাকি জানতে চাচ্ছেন তো?হ্যা এসেছিলো এবং সে আছে এখনো।তার নাম আত্রলিতা, দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপের একটি চমৎকার দেশ গ্রীস দেশের মেয়ে।মধ্যসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ ক্রীটে তার বসবাস বিশাল বড় একটা পরিবার নিয়ে যাতে ভালোবাসাবাসির কোন শেষ নেই।আমার সাথে কিভাবে কিভাবে যেন ইন্টারনেটে পরিচয় হলো বছর দুই আগে।একসময় ছবি শেয়ারিং, প্রায় দিন ভয়েস চ্যাট এবং অবশেষে একজনের আরেকজনের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ।আমি তাকে বেশ পছন্দ করি কিন্তু ভালোবাসিনা বলেই মনে হয়।তবে তাকে ছাড়া আমার চলেওনা।সারাদিন এস.এম.এস চলতে থাকে এবং নিয়মিত সে আমার সাথে ঝগড়া করে।মজার ব্যাপার হলো, সেও প্রায়ই আমাকে গালাগালি করে তবে গ্রীস ভাষায়।সব কিছুই ঠিকমত চলছিলো এবং চলতো যদি না আবার রাজকন্যা উদয় হতো।

শনিবার সকালবেলা ঘুম থেকে একটু দেরীতে উঠলাম কারণ অফিস থেকে দুদিনের ছুটি নিয়েছি।কিছুদিন থেকেই শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা।ইচ্ছা ছিলো একটু কক্সবাজারে বেড়াতে যাবো, কিন্তু মাত্র দুদিনের জন্য যাওয়ার কোন মানে হয়না।সকালে যখন নাস্তা করছি অপরিচিত নাম্বার থেকে মোবাইলে ফোন এলো।ফোন ধরে হ্যালো বলার আগেই বুঝতে পারলাম রাজকন্যা।কিভাবে বুঝলাম জানিনা।আমি চুপ করে ফোন ধরে রাখলাম।ওই প্রথম আমাকে বললো, “কালকে আমার বিয়ে”।
আমি বললাম, “কনগ্র্যাটস।শুনে অনেক খুশি হলাম”।
ও কিছুক্ষণ ইতিস্তত করে বললো, “আমি আসলে তোমার কাছে ফোন করছিলাম আগের ব্যাপারগুলো নিয়ে কিছু বলতে”।
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “আগের ব্যাপারগুলো নিয়ে কিছু বলার দরকার নাই।আমি ভুল করছিলাম তোমাকে বহুদিন বিরক্ত করে।যখন বুঝলাম তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনাই আমি তোমার থেকে দূরে চলে গেছি।তবে আমি এখনও লজ্জা পাই যখন মনে হয় আমার করা পাগলামীর কথা।আমি দুঃখিত”।
রাজকন্যা চুপ করে শুনে কি যেন বলতে যেয়েও বললোনা।আমার সেটা বোঝার আগ্রহ হচ্ছিলোনা।ও আমাকে আবার বললো, “কাল আমার বিয়ে।আমি এখনও আগের বাসাতেই আছি”।
আমি জোরে জোরে হাসতে হাসতে বললাম, “তুমি কি আমাকে নিমন্ত্রণ করতে চাচ্ছো?”
ও ইতস্তত করে বললো, “তা না”।

হঠাৎ করে কি যেন হলো, আমি চিৎকার করে বললাম, “তাহলে কি আবার নতুন করে খেলতে চাচ্ছো?তোমার মনে পড়েনা আমি তোমার জন্য কত কষ্ট পাইছিলাম?তোমার মনে আছে তোমার বাসার সামনে আমি দিনের পর দিন দাঁড়ায় থাকছি একবার তোমাকে দেখার জন্য।তুমি কি করছিলা মনে আছে?আমাকে একবার পাত্তা দাওনাই।তোমার জন্য আমি আমার বাবা মা বন্ধু বান্ধব সবার থেকে অনেক অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম।তোমাকে ছাড়া আমি কোন কিছু ভাবতাম না তুমি জানোনা, তুমি জানতানা?এখন কি বুঝাতে ফোন করছো?”
আমি অপর পাশ থেকে মৃদু কান্নার শব্দ শুনতে পাইলাম।আমার মেজাজটা তাতে আরো খারাপ হলো।আমি আরো জোরে চিৎকার করে বললাম, “খবরদার মেয়ে কান্নাকাটি করবানা।ফাইজলামি করতে ফোন করছো?আমার সাথে যখন ১ বছর ২ মাস প্রেম করছিলা তখনও তো ফাইজলামি করছিলা তাই না?আমি ছাগল এর পর তুমি ১০-১২ টা প্রেম করলেও তোমার পিছে লেগে ছিলাম।আমি তোমাকে ভুলে গেছি যেদিন তুমি আমার বাসায় ফোন করে আমার মা বাবার কাছে কমপ্লিন করছো।আমার আব্বু আম্মু কতটা কষ্ট পাইছিলো জানো?”
ও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে কাদতে বললো, “আমি স্যরি, আমি স্যরি।আমি বুঝিনাই”।
আমার আরো মেজাজটা গরম হলো।আমি রাজকন্যাকে বললাম, “এখন ফোন করছো কেন?কি মনে করছিলা আমি মরে গেছি?নাকি আবার কোন রকম মানসিক যন্ত্রণা করতে ফোন করছো?তুমি আমাকে কোন যন্ত্রণা দিতে পারবেনা, কারণ আমি তোমাকে এখন আর কেয়ার করিনা”।
ও এমনভাবে ফুপিয়ে কাদছিলো আমার ঝাড়ি খেয়ে যে মুখ থেকে কিছু বের হচ্ছিলোনা।শুধু আবাছাভাবে বুঝলাম, ও আমাকে বারবার স্যরি বলছে।আমি মেজাজ গরম করে ফোন রেখে দিলাম।ফোন রাখার আগে বললাম, “ভুল করেও আর ফোন দিবানা”।

আমার মাথাটা প্রচন্ড ঘুরাচ্ছিলো।অনেক বেশি চাপ পড়েছে মাথায়।আমি বসে থাকতে পারছিলাম না।আবার বিছানায় যেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।ঘুম থেকে যখন উঠলাম, তখন মাথায় বারবার একটা চিন্তাই ঘুরছে ও আমাকে ফোন করছে কেন?মাথাটা হালকা হলে বুঝলাম ও কি চাচ্ছে।
আমি আমার ডেস্কটপ খুলে, আত্রলিতা কে ছোট্ট একটা মেইল লিখলামঃ
“প্রিয় আত্রলিতা, তোমার ধারণা সঠিক।আমি কখনো তোমার কথা শুনতে চাইনাই।কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তুমি সঠিক বলেছিলে।আমি আমার ভালোবাসাটা লুকিয়ে রেখেছিলাম শুধু।হারিয়ে যেতে দেইনাই।কিছুক্ষণ পর আমি রাজকন্যার বাড়িতে যাবো এবং তাকে একটা চড় দেবো।
প্রিয়, আমাকে ক্ষমা করো।হৃদয়খানি তো একটাই, একে ভাঙ্গবো কি করে?সব যে একখানেই জড়ো হয়ে থাকে।ভালো থেকো”।
আমি আমার অনেক আগের নীল পাঞ্জাবী পরে খোচা খোচা দাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে রিকশায় উঠে বললাম, “চল মামা লেক সার্কাস যাই”।
দরজা খুললো আত্রলিতার বাবা।আমি সালাম দিয়ে বললাম, “আঙ্কেল কেমন আছেন?”

ওর বাবা আমাকে চিনতো যখন আমি ওর সাথে এফেয়ারে ছিলাম।আমাকে দেখে এখন কি চেনার কথা?উনার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো চিনতে পারছেন।আমাকে অমায়িকভাবে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা কেমন আছ?”
আমি হাসি হাসি দিয়ে বললাম, “খারাপ নাই, কিন্তু খুব বেশি ভালো নাই”।
আঙ্কেল আমাকে ঘরে নিয়ে গেলেন।দেখলাম ওদের ঘরে বিয়ের প্রস্তুতি চলছে।ওর কাজিন, মামা চাচায় ঘর ভর্তি।সবাইকে সালাম দিলাম, ছাগলের মত ওর কাজিনগুলাকেও সালাম দিলাম।সবাই মনে হলো আমাকে দেখে কিছুটা বিরক্ত।এই বিয়েবাড়ির ঝামেলায় অপরিচিত মানুষ দেখলে মনে হয় সবাই একটু বিরক্ত হয়।সবশেষে রাজকন্যার দেখা পেলাম।ও ওর রুমে সাজগোজ করছিলো।আমার কন্ঠ শুনে বের হয়ে আসলো মনে হয়।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে ভিলেন টাইপ হাসি দিলাম।ফরিদী ভাইও লজ্জা পাবে এমন হাসি শুনলে।আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম রাজকন্যার মুখ রক্তশূণ্য হয়ে গেলো।আমি ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেটা এখনো খোলা।পাঠক আমি সেইসময় যা করেছিলাম তা হয়তো শুধুমাত্র মুভিতেই সম্ভব।আমি অর্ধউন্মাদ একজন রাজকন্যার দিকে তাকিয়ে বললাম, “বেটি দৌড়া”।

দৌড় দিয়ে যখন পিছনে তাকালাম দেখি আমাদের দিকে ওর বাসার সব মানুষ মুখ হা করে তাকিয়ে আছে।কেউ যেন বুঝতেই পারছেনা কি করতে হবে।রাজকন্যা সবাইকে সরো সরো বলে যখন দৌড় দিয়ে আমার হাত ধরলো আমি ওকে শক্ত করে ধরে উসাইন বোল্টের গতিতে ভৌ দৌড় দিলাম।
রাস্তায় যেয়ে প্রায় চলন্ত একটা সি.এন.জিতে উঠে ওকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম, “এই কয়দিনে আর কয়টা প্রেম করছো?”
ও আমার দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো, “এখন না বললে হয়না?”
আমি বললাম, “না বললে গাড়ি থেকে ফেলে দিবো”।
ও কান্নাভেজা ভরাট চোখে বললো, “আমি তোমাকে ছাড়া কারো সাথেই কখনো প্রেম করিনি।যাদের কথা তুমি শুনছো ওইগুলা তোমাকে দূরে রাখার জন্য।তোমার বাসায় যখন ওই ঘটনার পর ফোন দিয়েছিলাম তখন আর পাইনাই।এরপর জানলাম তোমরা এখন আর ওই বাসায় থাকোনা।কিছুদিন আগে বহু কষ্টে তোমার সেলনম্বর পেলাম।আমি শুধু একবার তোমাকে জানাতে চেয়েছিলাম যে তোমাকে ছাড়া কখনো কাউকে ভালোবাসিনাই”।
আমি মেজাজ গরম করে বললাম, “আমাকেই যখন ভালোবাসছিলা তখন এমন করছিলা কেন?এত পেইন দেয়ার অর্থ কি?”
ও মাথা নিচু করে বললো, “জানিনা আমার কি হয়েছিলো।যখন দেখলাম তুমি আমাকে ঠিকমত ভালোবাসার কথা বলোনা, একটুও কেয়ার করোনা তখন মনে হইছিলো তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসো নাই। আর আমিও অনেক কিছু বুঝিনাই”।
আমি ওকে আসলে কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।জাস্ট বললাম, “তুমি একটা উজবুক”।
ও আমাকে শক্ত করে ধরে বললো, “জানি।আর তোমাকে একটা মিথ্যা কথা বলছি।আসলে আমার আজকে বিয়ে হচ্ছিলোনা।বিয়ে আমার বড় বোনের হচ্ছিলো।কিন্তু তোমাকে মিথ্যা না বললে তুমি এভাবে এসে আমাকে নিয়ে যাবেনা তাই এমন মিথ্যা বলা।স্যরি”।

আমি আমার গাধার মত বড় বড় কান নিয়ে তখন এই ভয়ংকর মেয়ের পাশে বসে রাগে গজগজ করছি।মনে মনে শুধু এটুকুই ভাবছি, মানুষ এত ভালোবাসে কেন??

****************************************************************
উৎসর্গঃ একজন প্রিয় ব্লগারকে কথা দিয়েছিলাম তার জন্য একটি গল্প লিখবো, কথাটা রাখলাম।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29390963 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29390963 2011-06-03 23:02:41
এভরিথিং উইল বি পারফেক্ট
আসলে এই বুদ্ধিটা আমি পেয়েছিলাম প্রথম আমাদের বাসার কাজের ছেলে মদিনার কাছ থেকে।হ্যা নামটা ঠিকই শুনেছেন, মদিনা।আমি বহুবার তাকে চড় থাপ্পড় দিয়েও এই নামের তাৎপর্য বাহির করতে পারিনি। মদিনা ছোটকাল থেকেই চৌর্যবৃত্তি নামক মহান পেশার কারিগর।কিভাবে মানুষের অজান্তে পকেট মারতে হয় তা ওই আমাকে হাতে কলমে শিখিয়েছে।গত ছয়মাস ধরে আমি তাই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে এই কাজই করে আসছি।দুইএকবার ভয়ংকর মার খেয়েছি, দুদিন রেস্ট নিলে আবার সব ঠিক হয়ে যায়।আমার চেহারায় একটা ইনোসেন্ট ভাব থাকাতে আমি প্রায়ই ছাড়া পেয়ে যাই।

আমি জন্মের পর থেকে আমার এক চাচার বাসায় মানুষ।আমার চাচা একজন বিশাল দিল দরিয়া মানুষ।আমার মত একটা বাড়তি প্রানীকে তিনি বছরের পর বছর থাকতে পড়তে দিচ্ছেন এইজন্য আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া জানাই।সমস্যা একটাই প্রতি মাসের এক তারিখে চাচা মদ খেয়ে বাসায় এসে আমাকে বেদম মার মারেন।মার দিয়ে বাপের নাম যে আসলেও ভুলিয়ে দেয়া যায় সেটা আমি চাচার মাধ্যমে ছয় বছর বয়স থেকেই শিখতে পেরেছি।আমার চাচি অবশ্য ভালো মানুষ।উনার রাগ পেলে আমাকে রান্নাঘরে তেল গরম করে একটু হা্তে পায়ে ছিটিয়ে দেয়।বিশ্বাস করুন আমার এখন আর কোন রকম জ্বালা যন্ত্রণা হয়না সেজন্য।মাঝে মাঝে একটু বাথরুমে যেয়ে কান্নাকাটি করলেই এভরিথিং ইজ পারফেক্ট।

আমার বাবা মায়ের কথা একটু বলা দরকার।বাবা অনেক আগেই ভেগে গেছে আমার জন্মদাত্রীকে ফেলে রেখে।মা আমাকে দুদিন নিজের কাছে রেখেছিলেন, তারপর নিজেও আরেকজনকে বিয়ে করে এখন লন্ডনে আছেন আমার সৎবাবাকে নিয়ে।আমার সৎবাবা দেখতে শুনেছি বেশ চমৎকার।উনি অবশ্য জানেন না আমার ব্যাপারে কিছু।কারণ মাকে যখন বিয়ে দেয়া হয় তখন বলা হয়েছিল যে মায়ের পূর্বের স্বামী যৌতুক নিয়ে পালিয়ে গেছে বিদেশে, আর কখনোই দেশে আসবেনা।এখন মজার কথা বলি।আমি আমার মাকে জীবনেও নিজ চোখে দেখিনাই।হ্যা একটা ছবি আছে অবশ্য।ছবিটা আমি যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছি।আমার চাচার বড় ছেলে প্রায়ই আমার একমাত্র সম্বল ছেড়া কালো ব্যাগটিতে অনুসন্ধান চালান।একবার ছবিটা তার হাতে পড়লে হয়তো নিয়ে আর ফেরত দেবেন না।আমার মা দেখতে কিন্তু ভয়ানক সুন্দরী ছিলেন।লোকমুখে শুনেছি উনি আমাকে সবসময় প্রচন্ড ঘৃণা করতেন। কারণ্টা ছিলো আমার বাবা।উনি কখনোই আমার বাবাকে বিয়ে করতে চাননি, কারণ মা আরেকজনকে ভালোবাসতেন।যাকে ভালোবাসতেন তাকেই অবশ্য পরে বিয়ে করেন।আমি সেজন্য বড়ই আনন্দিত, আহলাদিত।বাংলা সিনেমায় যখন নায়ক নায়িকা ভিলেনকে সাইজ করে মিলিত হয় আমি অজান্তেই তালি বাজাই।সেকারণেই আমার মায়ের প্রতি আমার কোন রাগ ছিলোনা।মাঝে মাঝে শুধু মনে হতো, আমার জন্য একটু চকোলেট বিস্কুট লন্ডন থেকে পাঠালে এমন কি ক্ষতি হতো?শুনেছি লন্ডনী চকোলেট গুলোতে নাকি আফিম থাকে।

আসল গল্পে ফিরে আসি।আমার পকেট মেরে জমানো সর্বমোট অর্থের পরিমাণ ৩০,৫৯৪ টাকা।আমার কাছে সেটা অনেক টাকা।তবে যখন আরো কিছু টাকা হবে তখন নীতুকে একটা গিফট কিনে দেব।গিফট আমি ঠিক করে রেখেছি, একটা বিশাল বড় হীরার আংটি।আমি জানি হীরার আংটি কোথায় পাওয়া যায়।কিছু টাকা জমিয়ে ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চেষ্টা করবো।একবার কোথাও যদি ভর্তি হতে পারি টিউশনী করে ঝাক্কাস একটা জীবনে পেয়ে যাবো।নীতুর সাথে মনের সুখে রিকশায় ঘুরে করনেলী আইসক্রীম খাবো আর প্রেম করবো।নীতু অবশ্য আমাকে কখনো পাত্তা দেয়নাই।অবশ্য পাত্তা দেবে কি করে, আমি তো কখনো ওর সামনে যেয়ে দাড়ানোর সাহসই পাইনাই।নীতু আমার চাচার মেজ মেয়ে যে কিনা আমার সমবয়সী তার খুব ক্লোজ বান্ধবী।নীতু যখন বাসায় আসে তখন আমি ওকে প্রায়ই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি।কিন্তু কখনো সামনে যেতে পারিনাই।অতটুকু সাহস করতে পারিনি কখনোই।

এইসব প্রেমের গল্প বাদ দেই।আজকে সকালে যে আচানক ঘটনা হয়েছে সেটাই আপনাদের একটু বর্ণনা করি।আমার মাতাজী বহুদিন পর বাংলাদেশে আসেছেন এবং উনার ব্যস্ত সময়ের খানিকটা আমাকে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।এই ব্যাপারটা যখন চাচা আমাকে ব্যাখ্যা করলো তখন আমি একটু টাশকি খেলাম, একটু লজ্জাও পেলাম।আমার মায়ের মত এলিগান্ট একজন মহিলার সামনে একটা ভালো জামাও পড়ে যাওয়ার মত সামর্থ্য আমার নাই। আরো ভয়ানক ব্যাপার হলো আমার মায়ের সাথে তার ছেলে মেয়েরাও হয়তো থাকবেন।ওরা নিশ্চয় আমাকে খুব ছ্যা ছ্যা করবে।ভাবছি পকেট মেরে জমানো টাকা দিয়ে কিছু ভালো জামাকাপড়, একটা ভালো ব্র্যান্ডের সেন্ট কিনবো।যাই হোক এইসব আগ পিছ ভাবতে ভাবতে রাস্তায় বের হলাম।গেটের বাহিরেই দেখি পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। সামনে এসে আমার হাতে একটা সিগারেট দিয়ে বললো, “ভালো পোলার মত টান মার নাইলে আইজকা গলাটা নামায় দিমু”।

আমি পলাশের গালে ফটাস করে একটা চড় মেরে বললাম, “দূর হ হারামজাদা।মেজাজটা বিলা হয়ে আছে।আমার আম্মা আইতাছে সামনের সোমবারে”।

পলাশ গাল ডলতে ডলতে ফিক করে হেসে বললো, "দোস্ত তোর তো তাহলে কেল্লা ফতে।নতুন জামা কাপুড় পাইবি, লন্ডনী চকলেট, সাঙ্গেলাস...আমারে কিছু শেয়ার দিস।রুমানার সাথে সামনের সপ্তাহে ডেটে যামু।"

আমার বন্ধু পলাশের ব্যাপারে কিছু বলা দরকার।সে একজন ভয়ংকর চামবাজ ছেলে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ফাস্ট বয় (সে বলে, আমি বিশ্বাস করিনা), কিন্তু তাকে আমি পড়াশোনা করতে দেখিনা।তার প্রধান কাজ বিড়ি টানা আর রুমানা নামে তার ক্লাসমেটের সাথে প্রেম করা।তার জীবনে অন্যতম কষ্ট আমি বিড়ি খাইনা।আমি খাইনা কারণ নীতু একদিন আমার চাচাতো বোনকে বলছিলো তার বর্তমান লাভারকে নাকি সে চড় মেরেছে কারণ ওই ছেলে তার সামনে সিগারেট টানার চেষ্টা করেছিলো।বলা যায়না, নীতু যদি কখনো আমাকে পছন্দ করে ফেলে তাই এইসব ধোয়া খাওয়ার চিন্তা বাদ দেওয়াই ভালো।

পলাশকে নিয়ে আমি বসুন্ধরা সিটিতে গেলাম এবং আমার কিছু চুরি করা টাকার সদ্বব্যবহার করে বাসায় ফিরলাম।সমস্যা হলো যখন রাস্তায় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো আর আমি কাউয়াভেজা হয়ে বাসায় ফিরলাম।বাসায় এসে দেখি সুমন ভাই আমার অসহায় মা বাবা ও তাদের ২৮ বংশের নাম ধরে গালাগালি করছে।ঘটনা অতি সামান্য, তার রুম থেকে এক প্যাকেট বেনসন চুরি গিয়েছে।আমি হলাম এই বাসার প্রতিষ্ঠিত চোর।কিছু হারিয়ে গেলেই সর্বপ্রথম ধোলাইটা আমাকেই খেতে হয় এবং আমি এজন্য সবসময়ই প্রস্তুত থাকি।তাই আমাকে যখন কুকুরের মত মারা হলো তখন আমি কিছুই মনে করিনাই।সব ভুলে গিয়ে যখন রাতে আমার ছোট্ট বিছানায় ঘুমুতে গেলাম তখন সারা শরীর কেপে জ্বর এসেছে।আমি তখন মনে মনে এক প্যাকেট বেনসনের দাম হিসাব করতে লাগলাম।একেবারেই ঘুম এলোনা।

আজ সোমবার, আমার মাতাজী আমার সামনে বসে আছেন।আমি ভদ্র ছেলের মত তার পাশে যেয়ে বসে রইলাম।বুঝতে পারছিনা কি বলা উচিত।উনিই নিজে থেকে আমাকে বললেন, “তুমি শুনেছি এইচ.এস.সিতে গোল্ডেন ফাইভ পেয়ে পাশ করেছো।কোন ভার্সিটিতে ভর্তি হওনি কেন?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “জ্বী।পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করেনি।এইবছর কোন একজায়গায় ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করবো”।

আমার মা মাথা নেড়ে বললেন, “তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম “জ্বী।আপনি আমার বাবার ব্যাপারে এত খারাপ কথা কেন সবাইকে বলেছেন?”

আমার মা বেশ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো।কিছুই তার মুখ থেকে বের হলোনা।আমি নিজে থেকে বললাম, “আপনি সবাইকে বলেছেন আমার বাবা আপনাকে ভালবাসতোনা।উনি আপনার থেকে ভেগে গেছেন তাই না?”

আমার মা চিৎকার করে বললো, “তোমার কি তাতে কোন সন্দেহ আছে?তোমার বাবার মত খারাপ মানুষ খুব কম আছে দুনিয়াতে”।

আমি মাথা নিচু করে বললাম, “আপনি কখনোই আমার বাবাকে ভালোবাসেন নাই।উনাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করেছেন।উনি আপনাকে অনেক ভালবাসতেন কিন্তু আপনার থেকে উনি কিছুই পান নাই।শেষদিকে উনি মানসিক রোগী হয়ে পড়েছিলেন।একদিন উনি কোথায় যেন হারিয়ে যায়।কেউ কিন্তু তার খোজ নেয়নাই।কারণ আপনি সবাইকে বলেছেন সে পালিয়ে গেছে।তাই না?”

আমার মা আমার দিকে বড় বড় চোখ নিয়ে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “এইসব তোমাকে কে বলেছে?”

আমি আলতো করে হাসি দিয়ে বললাম, “আমি সব জানি।তবে আমি আপনার প্রতি কোন দাবী রাখিনা।আপনাকে আমার বাবার সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে নানাজান অপরাধ করেছিলেন।সেই অপরাধ আপনি পরে শুদ্ধ করেছেন।মাঝে দিয়ে শুধু আমার...”

বুক ফেটে কান্না আসছে, কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে আমি চলে গেলাম সেখান থেকে।সেইদিন আমি আর চাচার বাসায় ফিরে যাইনাই।পরেরদিন সকালে যখন বাসায় যাই আমার চাচা আমার হাতে মায়ের দেয়া একটা চিঠি দিয়ে যান।চিঠিতে সংক্ষেপে লিখা,
“তোমার বাবা একজন অসামান্য চিত্রশিল্পী ছিলেন।আমি তার সাথে অন্যায় করেছি,তোমার সাথেও করেছি।পারলে আমাকে ক্ষমা করো”।

আমি মনে মনে বললাম, আপনাকে আমি কখনো মনেই রাখার চেষ্টা করিনা, ক্ষমা করবো কি?

তখন চারদিকে কেমন যেন একটা শান্ত হাওয়া বইছে।আমি ছাদে যেয়ে সেই শান্ত হাওয়ার মাঝে নিজেকে বিস্তৃত করে দিলাম।আশেপাশের কোন ছাদে কেউ নাই, ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি ঝরছে আর আমি একাকী একটি বালক সেই প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম।কোথায় তা জানিনা।

নীতুকে আমি আমার কাজিনের মাধ্যমেই সাহস করে প্রেমপত্র দিলাম।আমার কাজিন মেয়েটা খুব ভালো এবং চাচার বাসায় ওই একজন যে আমাকে সবার মত তুচ্ছ করেনা।আমার নিজের বোন থাকলে হয়তো এভাবেই আমাকে ভালবাসতো।যাই হোক, ওকে যখন আমি প্রেমপত্র হাতে ধরিয়ে দিলাম তখন সে হাসতে হাসতে আমাকে বললো, “ভাইয়া তুই জানিস না ওর লাভার আছে?”

আমি বললাম “তাতে কি?যদি আমার জন্য তাকে ছেড়ে দেয়?”

ও হাসতে হাসতে বললো, “আচ্ছা দেখা যাবে।আমি তোমার বাণী ওকে পৌছায় দিবো”।

সেদিন নীতু যখন চাচার বাসায় এলো তখন দুই বান্ধবী দরজা আটকিয়ে কি ভয়ংকর জোরে হাসাহাসি করতে লাগলো তা বলে বোঝানো যাবেনা।আমি অত্যন্ত বিব্রত বোধ করলাম।পরে আমার কাজিন এসে আমাকে বললো, “ভাইয়া তুমি ছাদে যাও।ও তোমার সাথে ছাদে কথা বলবে”।
আমি ছাদে যেয়ে আধঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর নীতু এসে আমার সামনে দাড়ালো।সাথে অবশ্য আমার কাজিনও ছিলো।কাজিন আমাদের সামনে এসে বললো, “তোরা একটু কথা বল।আমি আমাদের আমগাছটা একটু দেখে আসি”।

নীতু মুচকি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললো, “আমি না আপনাকে খুব মদন টাইপ ভাবতাম।আপনার চিঠি পেয়ে ধারণা ভেঙ্গেছে”।
আমি ছাগলের মত কান খাড়া করে তার কথা বুঝার চেষ্টা করতে লাগলাম।আমার গা কেন যেন ভয়ে কাপছে।
নীতু আমাকে বললো, “আমার তো আসলে একটা এফেয়ার আছে।তিন বছরের এফেয়ার।এইটা আপনি জানতেন না?”
আমি হেসে বললাম “জানি তো”।
নীতু তার ভ্রু কুচকিয়ে আমাকে বললো, “আপনি তো তাহলে বড়ই ফাজিল প্রকৃতির লোক”।
আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।নীতু আমাকে বললো, “আমার বয়ফ্রেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে,সে বেশ ভালো ছাত্র।আমার আব্বা আম্মাও তাকে বেশ পছন্দ করে।আমিও তাকে অনেক পছন্দ করি”।
আমি অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন পছন্দ করেন?
নীতু প্রানোচ্ছল হাসি দিয়ে বললো, “সে ভালো ছেলে।আচ্ছা আপনি আমাকে কেন পছন্দ করেন?”

আমি হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম নীতু আমাকে নিয়ে জাস্ট জোকস করছে।আমার কাজিন সুমির উপর খুব মেজাজ গরম হলো।আমি নীতুকে একটু অভিমান করেই বললাম, “পছন্দ করি কেন তা তো জানা নাই।বেশি পছন্দ করি বলেই হয়তো আপনার এফেয়ার আছে জেনেও এই পর্যন্ত আগালাম।আপনি আমাকে পছন্দ করেন না সেটা আগেই জানি”।
নীতু বললো “আমি সরি”।

আমি অনেক সহজ হয়ে গেলাম।আমি তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, “কোন ব্যাপার না”।

যখন ছাদ থেকে নিচে নামছি তখন শুনতে পেলাম নীতু আর আমার কাজিন বেশ শব্দ করে হাসছে।আমিও হাসলাম নিজের প্রতি।আমার মত একজন আশ্রিত মানব এভাবে প্রেম প্রীতির শখ করে কিভাবে ভেবে হাসি পেলো।আমি কি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম?

রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি পলাশের সাথে।ব্যস্ত সড়ক, কঠিন রৌদ্র।আমি অপেক্ষা করছি রুমানার আসার জন্য।রুমানা এলে পলাশকে বিদায় দিয়ে চারুকলায় যাবো।মধুর ক্যান্টিনের ছোট্ট দুটো মিষ্টি আর মাখন দেয়া পাউরুটি খাবো।আজকাল ভয়ংকর একটা রোগ বাসা বেধেছে আমার শরীরে।সবসময়ই গায়ে জ্বর থাকে, গলা শুকিয়ে মনে হয় চৌচির হয়ে যাবে।কিন্তু জল খেতে ইচ্ছা করেনা।দুপুরের রোদে পুড়তে পুড়তে রুমানাকে একটা রিকশায় করে আসতে দেখলাম।মেয়েটা আমাকে দেখেই এমন একটা বিরক্তির ভাব দেখালো যে আমি পলাশকে কিছু তেমন না বলে উল্টোদিকে হাটা শুরু করলাম।হাটতে হাটতে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি।নিজের মনে নিজে নিজেই বলছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।এভরিথিং উইল বি পারফেক্ট।

******************************************************************
গল্পটা কেন লিখালাম বুঝলাম না।এই গল্পটা লিখার সময় দুবার লোডশেডিং এর শিকার হয়েছি,তবুও পুনরায় লিখেছি।আজকে শেষ করতে পারলাম বলে আনন্দিত।প্রিয় পাঠক, আমার এই আলুথালু গল্পগুলো আপনার বিরক্তি উদ্রেক ঘটালে দুঃখবোধ জানালাম।

আরো জানাই, এই গল্পটা যেদিন থেকে লিখা হচ্ছে সেদিন থেকে লেখকের মেজাজ অত্যন্ত বিলা হয়ে আছে।লেখকের শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস মেসেজ "কারে যেন সাইজ করতে ইচ্ছা করতেছে"।তাই কি থেকে কি লিখা হলো বুঝলাম না।আবারো দুঃখিত।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29385896 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29385896 2011-05-23 23:23:29
রাত্রি রাত্রি আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কিছু বলার নাই?ঝগড়া করবেনা?”
আমি অনেক কষ্ট করে হলেও তাকে বলতে পারলাম, “এই অধিকারটুকু আমার নাই। তুমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছো আমি তোমাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি”।
রাত্রি হেসে বললো, “তুমি অনেক ভালো মানুষ এটা কি জানো?”
আমি নীচের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তাকে বললাম, “হ্যা”।
রাত্রি কথা শেষ করে রান্নাঘরে চলে গেল সকালের নাস্তা বানানোর জন্য।তাকে অনেক ক্লান্ত মনে হলো।কিন্তু আমি জানি সে এখন আমার মত একটা মূক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন করে হাসতে শিখবে। ভাবছি হয়তো আর বছর খানেক পরে সে কোন এক ঝরঝরে সংবেদনশীল পুরুষের হাত ধরে ঘুরে বেড়াবে কোন এক শপিং মলে।তাকে আহলাদ করে বলবে, এটা ওটা কিনে দিতে।সে অনেক ভালোবাসা পাবে, পাবে বেচে থাকার নিঃশ্বাসটুকু।আচ্ছা তখন যদি ভুলক্রমেও আমার সাথে দেখা হয়ে যায়, আমি কি করবো বলুন তো?এই কথা ভেবেই আমার নিঃশ্বাসটুকু আটকে আসতে চায়।আমি সেই চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত করে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা করি।জানি আজকে অফিসে যেতে দেরী হয়ে যাবে।মুর্শেদ ভাই কি ডেকে আমাকে ঝাড়ি দেবে? যেহেতু দেরী করার কোন মিথ্যা কারণ বলতে পারবোনা,তখন কি করবো?

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে প্রধাণ সড়কে এসে পড়লাম জানিনা।চারাপাশে অনেক গাড়ি ঘোড়া।আমি ক্লান্ত বিরক্ত এবং পরিশ্রান্ত।জঞ্জাল নগরীর চলমান যন্ত্রগুলোকে পাশ কাটিয়ে নিজেই এক যন্ত্রবন্দী হয়ে মোহাম্মদপুর অফিসে রওনা হলাম।
অফিসে এসে দেখি মানুষজন আমাকে দেখে বেশ বিরক্ত, দু একজন হাসিমুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে “কি অর্ক ভাই,ভাবীর সাথে ঝগড়া করে আসলেন নাকি?”
আমি হাসিমুখে বললাম, “আপনাদের ভাবী আমাকে বেলই দেয়না,ঝগড়া করবে কি?”

আমার পিওন আসলাম সামনে এসে বিশাল দুঃসংবাদ দিলো।আমাকে মুর্শেদ ভাই ডেকেছে।আমার হার্টবিট বেড়ে গেলো।বিশাল ঝাড়ির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম আমি।মুর্শেদ ভাইয়ের অফিসে যখন গেলাম তখন উনি হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কাকে যেন বকাঝোকা করছেন।আমাকে দেখে হাসিমুখে ফোনটা রেখে দিলেন পরে আবার কথা বলার আশ্বাস দিয়ে।বুঝলাম কথা হচ্ছিলো নীনা ভাবীর সাথে।মুর্শেদ ভাই আজকে হলুদ রংয়ের হিমুটাইপ শার্ট পরে এসেছেন। নীনা ভাবীর সাথে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন উনি প্রায়ই আমাকে বলতেন “অর্ক দোস্ত তুই যাই করিস হলুদ জামা পড়ে আমার সামনে আসবিনা”।আমি কাকতালীয় ভাবে মুর্শেদ ভাই আর তার বিয়ের দিনে হলুদ একটা স্ট্রাইপ শার্ট পড়ে গিয়েছিলাম। নীনা ভাবী আমাকে বিয়ের মঞ্চের সামনে দেখে অত্যন্ত কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরাসরি বললেন, “তুমি এখান থেকে না গেলে আমি বিয়ে করবোনা”।আমি অবাক হলাম, তবে তার কথা শুনে নয়।তার অভিমান ভরা তুমি সম্বোধনের ডাক শুনে।আশিক আমাকে ভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষেই জানিয়েছিলো যে নীনা ভাবী আমাকে নাকি পাগলের মত ভালোবাসে।তাহলে কি ও সেদিন সত্যি কথাটাই বলেছিলো?আচ্ছা তাহলে যখন মুর্শেদ ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম, যখন মুর্শেদ ভাইয়ের হয়ে তার ঘটকালী করেছিলাম তখন কিছু বলে নাই কেন?আমি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে চলে এসেছিলাম।আজকে মুর্শেদ ভাইয়ের হলুদ জামা দেখে হাবিজাবি কথাগুলো মনে হয়ে গেলো।মুর্শেদ ভাইয়ের কন্ঠ শুনে আবার জগতে ফিরে আসলাম।দুরুদুরু বুকে মনে হলো, মুর্শেদ ভাই কি এইসব জানে?

“অর্ক আজকে তোমাকে একটা বিশেষ খবর দেব।আমি তোমাকে এই অফিস থেকে বের করে দিবো ভাবছি।কেমন হবে?”
আমি বোকার মত বললাম, “জ্বী”।
মুর্শেদ ভাই সজোরে হাসতে হাসতে বললেন, “পরের মাস থেকে তুমি চাটগার হালিশহর প্রজেক্টে ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করবে।না করে লাভ নাই।আমি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবোনা এটা তো জানোই,তাই না অর্ক?”
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।মুর্শেদ ভাই জানেন আমি কখনো না শব্দটা বলতে পারিনা।আমাদের কন্সট্রাকশন কোম্পানীর সাথে সাবডিলারশীপে যারা কাজ করে তাদের সাথেও আমি মিনমিন করে কথা বলি।এইতো সেদিন শাহ সিমেন্টের লোক আমাকে ঝাড়ি দিয়ে বললো আমি নাকি কোন প্রকৌশলীই না, কারণ তাদের মত ভালো সিমেন্ট কোম্পানীকে আমি একসেপ্ট করিনি।আজকে যখন এমন একটা প্রমোশন পেলাম, তখন আমি তাকে সামান্য ধন্যবাদটাও কি করে দেব খুজে পাচ্ছিলাম না।চলে যাওয়ার আগে শুধু তাকে বললাম, "জ্বী চলে যাব চাটগা ৩১ তারিখেই"।

বাসায় যখন ফিরে আসলাম তখন পুরো বাসায় আমি একা, ঠিক একা যে তা নয়। আমার ছোট্ট বেডরুমে একটা জ্বলজ্বলে চিঠি যাতে লেখা “ভালো থেকো।রাতের খাবার বাহিরে রাখা আছে, ঠান্ডা হয়ে গেলে গরম করে নিয়ো”।
আমি গোসলের পানি গরম করে ঠান্ডা ভাত তরকারীই খেয়ে নিলাম, কারণ সারাদিন অফিসের কাজের ঝক্কির পর এত শক্তি ছিলোনা আবার সবকিছু গরম করার। আজকের রান্নাটা খুব সাধারণ ছিলো।হঠাৎ করে দেখি পাশে রাত্রি বসে আছে। কি অদ্ভুত আমি আগে কেন খেয়াল করিনি।ও আমাকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো, “খাবার ভালো হয়েছে?মাছের কাটা বেছে দিবো?”
আমি বলি “না না ঠিক আছে। আমি বেছে নিতে পারবো”।
রাতে যখন ঘুমাতে গেলাম তখন রাত্রিকে সারাটি ঘর খুজেও পেলাম না।বুঝতে পারলাম সে হয়তো কোন কারণে রাগ করে ছাদে চলে গেছে।আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।সকালে অফিস আছে যে!
সকালে যখন অফিসে যাচ্ছিলাম তখন কোন কিছু খেলাম না।রাত্রি কেন যেন নাস্তা বানায়নি আজকে।অফিসে যাওয়ার আগে ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম।কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে আছে বড় বড় চোখ করে।ভাবলাম কিছু বলবে কিন্তু কিছুই বললোনা।রাস্তায় যখন বের হলাম তখন মনে পড়লো, কালই চলে যেতে হবে চাটগা।আমি তো রাত্রিকে কিছুই জানালাম না এখনো।

মুর্শেদ ভাই আমার কাধে হাত দিয়ে বললেন, “আমি যাচ্ছি তোমার সাথে কাল।তোমার জন্য একটা ছোট্ট বাসা ঠিক করা আছে।আস্তে আস্তে মালামাল শিফট করে নিও”।
আমি মাথা নাড়লাম যার অর্থ ধন্যবাদ।আমি জানিনা মুর্শেদ ভাই কেন আমাকে পছন্দ করেন এতোটা।
আজ একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বের হলাম।রাত্রির জন্য কিছু ফুল কিনতে হবে, সাথে ওর প্রিয় আইসক্রিম।আজকে ওর সাথে সারারাত গল্প করবো,আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন আকবো।যা আগে করিনি তার সবকিছু করবো।প্রিয় রাত্রি, আমি কি তোমাকে ভালবাসি? তুমিই বলে দাও।

বাসায় যখন পৌছালাম, তখন দেখি কেউ নেই বাসায়।আমি অপক্ষা করতে থাকি রাত্রির নিঃশ্বাসের আওয়াজ শোনার জন্য।সারাটি ঘরে কোথাও রাত্রির অস্তিত্ব অনুভব করতে না পেরে আমি কেন যেন হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে যাই।আমি বসে পড়ি মেঝেতে আর ভাবতে থাকি কখন আবার সে পাশে এসে বসবে।আমার মাথায় হাত দিয়ে বলবে, “খাবেনা?”
রাত কয়টা বাজে তা আমার মনে নেই, শুধু মনে আছে রাত্রির হাতের স্পর্শ।ও আমাকে ফিসফিস করে বলছে, “তুমি কখন খাবে?”
আমি শান্ত কন্ঠে বললাম, “খাবোনা”।তারপর সে কোথায় যেন চলে গেল।আমি আবার ঘুমিয়ে গেলাম।ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারলাম আমার মাথাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি রাত্রি বাসায় নেই সেই দিনের পর থেকেই। কিন্তু ওর অনুপস্থিতি আমি মেনে নিতে পারছিনা।তাই ওকে আমার আশে পাশে কল্পনা করে নিচ্ছি।কিন্তু যখন ওকে দেখতে পাই এতটা বাস্তব মনে হয়।আমি ঘুমের মধ্যেই ভয় পেয়ে যাই।প্রচন্ড ভয়।

মুর্শেদ ভাই প্রচন্ড জোরে গাড়ি চালাচ্ছে মাতাল হয়ে, আমি একটু বিরক্ত তার এই আচরণে।আজকে আমার ঢাকা অফিসে শেষ দিন উপলক্ষে উনি আমাকে নিয়ে সেলিব্রেশন করলেন ঢাকা ক্লাবে।জনি ওয়াকার এক বোতল খালি করে আমাকে রাগত ভংগীতে বললেন, “ছাগল তুমি লালপানি খাওনা কেন”।
আমি হেসে বললাম, “পানির কোন রঙ নেই”।
আমি বুঝতে পারছিনা মুর্শেদ ভাই কেন এত রেগে আছে। আমার দিকে বারবার তাকিয়ে হাসছে আর কি যেন বিড়বিড় করে বলছে।আমরা এখন ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি।উনি হঠাৎ করে গাড়ি থামিয়ে আমাকে বললেন, “যাও শুশু করে আসো।আমার গাড়ি নোংরা করবানা”।
আমি বললাম, “ভাইয়া আপনি বোধহয় নিজের জন্য থামিয়েছেন”।
মুর্শেদ ভাই লজ্জা পেয়ে হেসে বললেন,”মাথাটা ঠিক নাই অর্ক।মাইন্ড করোনা।আসো একটু গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশের প্রকৃতি দেখি”।
আমি গাড়ি থেকে নেমে উনার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।উনি ওম শান্তি বলতে বলতে গাড়ির কাছে ফিরে এসে আমার জিজ্ঞেস করলেন, “নীনার সাথে তোমার কয় বছর এফেয়ার ছিলো?”
আমি বললাম, “আমার ছিলোনা।উনি হয়তো আমাকে পছন্দ করে থাকতে পারেন”।
উনি হেচকি দিয়ে বললেন, “মহিলা জাতটা ভালো না অর্ক।আমি পাচ বছর বিয়ে করলাম, সে আমাকে একদিনের জন্যও ভালোবাসেনাই।তুমি কি জোর করে ওকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিছো?”
আমি কিছু না বলে গাড়িতে বসে বললাম, “ভাইয়া দেরী হচ্ছে।চলেন”।
মুর্শেদ ভাই আবার গাড়ি স্টার্ট করে রওনা হলেন।আমি হঠাৎ করে উনাকে বললাম, “ভাইয়া আমার মাথা আজকাল খারাপ হয়ে গেছে”।
মুর্শেদ ভাই হেসে বললেন, “তোমার বউ কি তোমাকে ছেড়ে দিছে?”
আমি বললাম, “হ্যা।আপনি কি করে জানলেন?”
“নীনা বলছে।রাত্রি ওকে মাঝে মাঝে ফোন করে।বউ ছেড়ে দিলে সবারই মাথা খারাপ হয়ে যায়, সো ইটজ নট আনইউজাল”।
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। হঠাৎ করে বললাম, “গাড়িটা ঘোরান।আমি চিটাগাং যাবোনা”।
মুর্শেদ ভাই বললো, “সামনে একটা বিখ্যাত বিরানী হোটেল আছে,ওখান থেকে বিরানী খেয়ে তারপর ব্যাক করবো।ওকে?”


রাত্রি চারটা বেজে বিশ মিনিট তখন।আমি রাত্রির মায়ের বাসায়। ওর মা বাবা সবাই খুব অবাক হয়েছে।একটু পর রাত্রি এসে আমার পাশে বসলো।তার চোখে তখনো অনেক ঘুম এবং বিরক্ত ভাব। সে প্রথমেই আমাকে বললো, “আমি যাবোনা”।
আমি বললাম, “যেতে হবেনা। ওই বাসায় যেতে আমারও ইচ্ছা করেনা।আমি তোমার সাথে এখানে থাকি?”
আমার কথা শুনে রাত্রি কি অবাক হলো? ও আমাকে শান্ত হয়ে বললো, বাথরুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।এরপর কিছু খেয়ে তারপর কথা বলো।আমি ওর হাত শক্ত করে ধরে চুপ করে বসে রইলাম।হঠাৎ করে ও অনেক কাদলো, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদলো।আমাকে জিজ্ঞেসা করলো, “তুমি জানতেনা আমাকে কত ভালবাসো?”
আমি ওর দু হাত ধরে বললাম, “নাহ!এখন যেহেতু জানি তোমাকে আর ছাড়বো না”
রাত্রি অঝোরে কাদতে থাকলো। আমি ওকে থামালাম না।শুধু কাছে টেনে নিয়ে বসে থাকলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29372750 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29372750 2011-04-30 23:29:39
কয়েকজন উদ্ভ্রান্ত মনুষ্যের ভালবাসার জন্য লড়াই
তবে কিছুদিন আগে বিশেষ কারণে অফিসে যেতে আমার বেশ ভাল লাগতো।ফিটফাট হয়ে অফিসে যেতাম। আগের মত খোচাখোচা দাড়ি, কোচকানো শার্ট আর ধুলোমাখা জুতো ব্যবহার করতামনা।কারণ আমার ছিলো জিলেট!যাই হোক এই ফিটফাট থাকার ভাণ বেশিদিন ধরে শুরু হয়নি।এই আগের বছরের মাঝামাঝি থেকে।অফিসে ঢুকে তখন আর হায় না তুলে হাই দিতাম।কিন্তু কেন এত কিছু? বলতে লজ্জা লাগছে, তাও বলেই ফেলি।বুদ্ধিমান পাঠক ঠিক ধরেছেন – নারীঘটিত ব্যাপার স্যাপার আর কি!সেই প্রিয়মুখটির জন্য এত কিছু করেছিলাম কিন্তু প্রথম ৪২টি দিন পার হয়ে গেলেও তার সাথে আমার সরাসরি একবারও কথা হয়নি।মাঝে মাঝে শুধু যখন তার ডিপার্টমেন্টের পাশ দিয়ে যাবার সময় আড়চোখে তাকানোর চেষ্টা করতাম, কিন্তু সাহস হয়্নি।সবসময় বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে Introvert একজন মানুষের জন্য এটাই হয়তো স্বাভাবিক, কিন্তু আমি নিজেকে বদলাতে চাইতাম।

আমি যখন তাকে প্রথম দেখি তখন বিকাল ৩টা বেজে ৩৫ মিনিট।তাকে আমার অফিসের এইচ.আর অফিসার পরিচয় করাতে নিয়ে আসলো।স্বভাবমতই আমি তার দিকে না তাকিয়েই হ্যালো বললাম।সে তবুও ভদ্রতা বজায় রেখে আমাকে বললো, “আশা করি আপনার থেকে পরে অনেক সহযোগিতা পাবো”।আমি তার কন্ঠ শুনে কয়েকটা বিট মিস করি এবং তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করি।আফসোস কিছুই মুখ থেকে বের হয়নি।আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে কেন এমন হলো। উত্তরটা আমি নিজেও জানিনা।তবে কারো কারো কন্ঠে এমন কিছু থাকে যা আপনাকে অন্যরকম কিছু একটা অনুভূতি দিয়ে হৃদয়ে আঘাত করার জন্য যথেষ্ট। আমি তখন ভয়ংকর একটা ভালোলাগা টাইপ হ্যালুসিনেশনের মধ্য দিয়ে আতিক্রান্ত হচ্ছিলাম।

অবশেষে তার সাথে আমার কথা হলো একদিন, কোন এক অফিসের অনুষ্ঠানে। আমি সেদিন সাহস করে তার পাশে যেয়ে বসলাম।সে নিজে থেকেই বললো “কেমন আছেন?”
আমি সাহস করে সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে বললাম “ভালো”।

ব্যস শুরু হলো, কথার পর কথা,এই গল্প সেই গল্প। অবশেষে ফোন নম্বর শেয়ারিং।আমার নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়েছিলো।সে রাতেই তাকে এস.এম.এস পাঠালাম, “ঠিকমতো বাসাত পৌছুতে পেরেছেন কি?” সে জবাব দিলো সাথে সাথে, “না পারিনি।কি যেন একটা অনুষ্ঠানে ফেলে রেখে এসেছি।দেখুনতো আপনার কাছে কিনা”।আমি প্রতিউত্তরে বলেছিলাম, “হ্যা আমার কাছে।ওটা ফেরত পাবেন না”।
উইকএন্ডে আমি তার হাত ধরে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে ফাউল ফারুকীর ফাউল ভিডিও নাটক দেখলাম।কিন্তু জানেন কি থার্ড ক্লাস সেই ভিডিও নাটকটি আমার কাছে ফাস্ট ক্লাস লেগেছিলো।কারণ আমি একবারও ওতে মনোযোগ দেইনি।আমি শুধু পাশের প্রিয়নারীর প্রতিটি প্রশ্বাসের ধ্বনি শুনতে চাচ্ছিলাম।হৈমন্তীর অপুর মত বলতে চাইলাম, “আমি তাহাকে পেয়েছি”।আরো বললাম, “সবটুকু পেয়েছি”।
তার নামটাই এখনো বলা হলোনা, নবনীতা।এত সুন্দর নাম কয়জনের ভাগ্যে জোটে বলুনতো? আমরা একসাথে অফিসের ক্যান্টিনে লাঞ্চ করতাম, বিকেল হলে একসাথে চা খেতে ছটপট করতাম।আমি অনেক সুখী ছিলাম, অনেক সুখী।সমস্যাটা হলো যেদিন সে আমাকে বললো, সে আমার জন্য সিরিয়াস না এবং তার বাসায় বিয়ে ঠিক করেছে তার জন্য।যখন সে আমাকে এই কথাগুলো বললো আমি তাকে বলেছিলাম “এমন তো হওয়ার কথা না তাই না?”
সে আমাকে জগতের সবচেয়ে পরিচিত অথচ সবচেয়ে কর্কশ কথাটি বললো, “আই এম স্যরি”।

ব্যস সব শেষ! এক পলকে এক ঝলকে আমার আশেপাশের সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেলো।আমি চাকরীটা ছেড়ে দিলাম।বাসায় বললাম ভালো লাগেনা এই চাকরী করতে।কোন ভবিষ্যৎ নাই। এভাবে মিথ্যা কথা বাবা মাকে কি করে বলেছিলাম তা আজ বুঝে পাইনা।অনুগ্রহ পূর্বক আপনারা নবনীতাকে নিয়ে খারাপ কিছু ভাববেন না।সে যা করেছে ঠিক করেছে, কোন ভুল হয়নি।আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত ঘরের একটা মেয়েকে যখন তার বাবা মা বিয়ের কথা বলে, কয়টা মেয়ে পারে মুখ ফুটে তার পছন্দের কথা বলতে? আমি এতটা অবুঝ ছিলাম না যে তার স্যরির পিছনে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা বুঝবোনা। প্রিয় পাঠক যারা কখনোও কারো কাছে প্রত্যাখান হয়েছেন তাদের জন্য বলছি, ভালোবাসা ও ভালোবাসার মানুষকে ছোট করবেন না।নাহলে নিজেই নিজের কাছে একসময় হয়তো আরো ছোট হয়ে যাবেন।যে ধোকা দেয়, সে নিজেকেই নিজে ধোকা দিলো বলে বিশ্বাস করি।
আমি তাকে ক্ষমা করেছিলাম, কারণ আমি তাকে ভালবাসতাম।একবারও ওর ওপর রাগ হয়নি, এমনকি সেদিনও নয় যেদিন ওর বিয়ের নিমন্ত্রণ পেলাম।সেদিন তাকে হাসতে হাসতে বলেছিলাম,
“রবির করোচ্ছটায় আমি তোমার উষ্ণতা খুজে ফিরি
তাহাতে গ্রহণকালে ডেকোনা আমায়
দোহাই তোমায় অনুরোধ করি”

এরপর আমি ওর সাথে আর যোগাযোগ করিনি বা করতে পারিনি। সেদিনটাই আমার ওই অফিসের শেষদিন ছিলো।
********************************************************************
শুভ ভাইয়ের গল্প শুরু করা যাক।উনার সাথে ভার্সিটি পাসের পর আবার কথা হলো মাস তিনেক আগে।মনে আছে ভার্সিটিতে পড়ার সময় উনি প্রায়ই আয়েশ করে বিড়িতে টান দিয়ে বলতেন, “এদেশটা গেলো রে! পুরাই গেলো!” আমি এবং উনার বাকি শিষ্যরা সুর মিলিয়ে বলতো “গেলো গেলো!”

সেই শুভ ভাই হঠাৎ করে তিন মাস আগে ফোন দিয়ে বললো, “অর্ক দৌড় দিয়ে নীলক্ষেত মামুর হোটেলে চলে আয়।ইফ ইউ আর অনলি ইন আন্ডারগার্মেন্ট কাম উইথ ইট”। বুঝলাম যেতেই হবে, নাহলে পরে বাসায় এসে হাউকাউ করে ঝামেলা বাধাবে।আমি জানালাম, “জাস্ট টু মিনাটস”।

ঘটনা আসলেও সিরিয়াস ছিলো।সেই সময় ফেলানী হত্যা কান্ড নিয়ে প্রচুর লিখালিখি চলছে পেপার পত্রিকায়।শুভ ভাই চুপ করে বসে থাকবেন তা সম্ভব না। উনি উনার সকল শিষ্যকে নিয়ে আজকে মৌন মিছিল বের করবে বলেই আমার এখানে আসা।শুভ ভাইয়ের ডাকে তার ভক্তকূল অনেকেই এসে পড়েছে নীলক্ষেত মোড়ে।আমি অবাক হয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি কি ভয়ংকর চাপা ক্ষোভ নিয়ে আজ সবার ফেলানীর জন্য প্রতিবাদ জানাতে এসেছে।শুভ ভাই সবাইকে নিয়ে কার্জন হলের সামনের রাস্তায় চলে আসলো।তার হাতে ঝুলছে তারই লেখা প্লাকার্ড।একটা প্লাকার্ডে লিখা
“আমি এই হত্যার বিচার চাইনা, আমি আমার বোনকে ফেরত চাই”

আমাকে দেখে শুভ ভাই এগিয়ে এসে বললো, “অর্ক তোদের একটা বিশাল সমস্যা হলো তোরা নিজেকে ছাড়া আর কিছু ভাবিস না।তোরা সব ফার্মের কুচে পড়া লাল মুরগী।আশেপাশে তাকায় দেখ কি হচ্ছে! চোখটা খোল।ফেলানী কে জানিস?”
আমি মাথা নাড়িয়ে বলি, “পেপারে যা জেনেছি ওটুকুই শুভ ভাই”।
শুভ ভাই রক্ত গরম চোখে তাকিয়ে বললো, “তোদের দিয়ে কিছু হবেনা বুঝলি।তোরা রাজনীতি করিস তো নিজের পকেট ভরতে, মিছিল করিস ফ্রি লাঞ্চ খাইতে।সামনে থেকে দূর হ”।

আমি একেবারে মাইন্ড খাইনি।কারণ এমন অপমানের সাথে আমি পরিচিত।আর যে মানুষটা এই কথাগুলো বললো উনি আমার কাছে দেবতাতুল্য। আমার মত আত্নকেন্দ্রিক Utopian মানুষ যার অন্যের কথা ভাবার আগে নিজে সুস্থ আছে কিনা চিন্তা করে তার জন্য উনার চিন্তাধারার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব না।আমার মনে পড়ে কোন এক টার্মে যখন রেজাল্ট বেশ খারাপ হয়েছিলো আমি মনের দুঃখে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম।সেসময় শুভ ভাই একদিন গভীর রাতে বিরাট বড় একটা লাঠি হাতে নিয়ে আমার রুমে আসে এবং কথা নাই বার্তা নাই বেদম একটা বাড়ি দেয় পশ্চাতদেশে।আমি ওমাগো বলে লাফ দিয়ে সরে গেলে উনি দাত কিড়মিড়িয়ে বলেন “ভান করো বাবু?চল নিচে যায়া খাওয়া দাওয়া করবি।কালকে তোরে দিয়ে মিছিলের লিড দেওয়াবো।আই ওয়ান্ট ইউ টু বি দ্যা প্রটাগোনিস্ট আফটার আই ম্যারী ইশা”।

ঘটনা হলো শুভ ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড ছিলো ইশা।এই মেয়ে যেদিন শুভ ভাইয়ের ভালবাসার ঘ্যানরঘ্যানরে বিরক্ত হয়ে উনাকে হ্যা বলে, সেদিনই স্পষ্ট বলে দেয় “শুভ যা ফাজলামী করার করে নাও, বিয়ের পর যদি ভুল করে এইসব আউলফাউল কিছু বলো তবে তোমার জীবন আমি পঙ্গু করে দিবো আই সয়্যার”।শুভ ভাই তাই সবাইকে বলতো, ইশার সাথে বিয়ে হলে উনি এইসব রাজনীতি, মিছিল মিটিং ছেড়ে দেবে।মেয়েটাকে উনি আসলেও ভালবাসতো।ইশা আমার ক্লাসমেট ছিলো এবং আমি ওকে অনেক ভয় পেতাম।শুভ ভাই একবছর সিনিয়র ছিলো, তবুও ওকে ভয় পেতো।

শুভ ভাইয়ের লাশ নিয়ে যখন আমরা ঢাকা মেডিকেলে দৌড়াদৌড়ি করছি তখন ইশা চুপ করে বসে ছিলো।আজকের মৌন মিছিলে সে শুভ ভাইয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো।যে রাবার বুলেটটা শুভ ভাইয়ের মাথায় আঘাত করে সেটা ও মিছিলে কেন যেন খুজে বেড়াচ্ছিলো।আমি অত্যন্ত ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহ নিয়ে ওয়ার্ডের মেঝেতে শুয়ে পড়ি। আমার চোখ দিয়ে তখন আগুন গরম ফল্গুধারা উৎসারিত হচ্ছে।রাগে হাত পা কাপছে আবার কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে।আমার পাশে আমার বন্ধু উৎস। ও বারবার বলছে সব ঠিকাছে, সব ঠিকাছে।আমরা কতিপয় ভগ্ন হৃদয়ের নরনারী তখন অভিশপ্ত পৃথিবীর বর্বরতার শিকার।

পরবর্তী কয়েকটা দিন খুব ব্যস্ততার মাঝে গেলো।আমরা কয়েকজন মিলে আবার কিছু পরিকল্পনা করলাম।কেউ কেউ ভয় পেয়ে চলে গেলো।আমরা বাধা দেইনি।ইশাকে জিজ্ঞেসা করেছিলাম ও চলে যেতে চায় কিনা(জানিনা ওর পরিবার ওর এসব ব্যাপার জানতো কিনা! যদিও তারা রাজশাহীতে থাকতেন, কিন্তু মেয়ের খোজ কি নিতেন না? )। ও বললো, “অবশ্যি চাই।কিন্তু যাবোনা”।ওকে আবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, নতুন করে প্লাকার্ড বানালে কি লিখবো তাতে।ও বলেছিলো, “ফেলানীকে ফিরিয়ে দাও”।আমরা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ও পরের দিন আমাদের কয়েকজনকে (মূলত আমরা গুণে গুণে ১৩ জন ছিলাম সবাই চলে যাওয়ার পর)শুভ ভাইয়ের লেখা ডায়েরীর একটা পাতা পড়ে শোনায়ঃ

পেপারে যখন দেখলাম ফেলানীকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, আমার তখন মনে হলো আজ আবার মানব জাতির মৃত্যু হলো।আমি লজ্জা পাচ্ছি এখন নিজেকে মানুষ ভাবতে।আমার যে বোনকে এভাবে কাটাতারে ঝুলায় রাখা হয়েছে, তার মাথায় একবার হাত বুলিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে বোন আমায় মাফ কর।১৫ বছরের একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে গুলি করে ঝুলিয়ে রাখাটা আমি কল্পনা করতে পারছিনা।প্রিয় ফেলানী, আমার বোন আমি কথা দিচ্ছি আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমি এর প্রতিবাদ জানাবো।যতদিন না এর বিচার হবে ততদিন আমি তোমার জন্য লড়ব।আমি কথা দিচ্ছি আমি সবার মত কিছুদিন পর তোমাকে ভুলবোনা।আমি কথা দিচ্ছি তোমার সাথে এই নির্মমতার জন্য যারা দায়ী তাদের মুখে একবার হলেও থুতু দেবো। আসলে নিজেকেই নিজের থুতু দিতে ইচ্ছা করছে।কারণ আমিও যে এ ঘটনার সাক্ষী।বোন আমায় ক্ষমা কর”।

ইশা এটুকু পড়ে কান্নাভেজা কন্ঠে আমাদের বললো, “তোমরা সবাই চলে গেলেও আমি একা ফেলানীর জন্য লড়বো।আমি যদি ফেলানীর জন্য বিচার পাই, তবে তা শুভর জন্যও পাবো”।

আমরা প্ল্যাকার্ড লিখা শুরু করি, আমরা এখন অন্য মানুষ।আমরা ৫২র রফিক, ৭১এর মোস্তফা কামাল।আমরা লড়তে জানি, এবং আমরা জানি আমরা কেন লড়ছি।সেদিনের পর আমরা বহুবার রাস্তায় দাঁড়িয়েছি, গলা উচু করে চিৎকার করে মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা মানুষকে জেগে ওঠার আহবান জানিয়েছি।মার খেয়েছি, শরীরের রক্ত দিয়েছি, কিন্তু থেমে থাকিনি।

আজকে আবার আমরা লড়তে যাবো, এই লড়াই মানুষের জন্য মানুষের। এই লড়াই আবার সবাইকে একবার জাগানোর জন্য। এই লড়াই নিজেকে জাগানোর জন্য।যে আমি দুদিন আগে নবনীতার ভালবাসায় পৃথিবী ভুলে আপন ভালবাসায় মত্ত হয়ে ছিলাম, সেই আমি আজ জীবনের জন্য লড়ছি।মনুষ্য জীবন।আমি শুভ ভাইকে মনে মনে বারবার বলছি, “শুভ ভাই আপনি যে ভালোবাসায় মানুষের জন্য যুদ্ধ করছেন সেই ভালবাসা একদিন আমি সবার কাছে পৌছিয়ে দেব”।

সন্ধ্যার দিকে আমার রক্তাক্ত মাথা চেপে ধরে যখন মেডিকেলের বিছানায় শুয়ে আছি তখন পাশে বসে থাকা মধ্যবয়স্ক এক মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “কেন এসব করো”।আমি অর্ধচেতনা নিয়ে বললাম “আপনাদের জন্য”।
আমার আশেপাশের সব কিছু বারবার অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ করে লক্ষ্য করি ইশা আমার মাথার পাশে বসে আছে। আমাকে মুখ শক্ত করে বললো, “তুমি এভাবে চলে গেলে হবেনা। আরো অনেক কিছু করার বাকী আছে”।আমি ওর হাত ছুয়ে বললাম, “জানি।কিছু হবেনা”। ইশা আমাকে বললো, “তুমি সবসময় এমনভাবে আমার সাথে থেকে যুদ্ধ করবে”?

আমি দুর্বল কন্ঠে বললাম “হ্যা”।

আমরা এখনও লড়ছি,এবং আমরা লড়ে যাবো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29361143 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29361143 2011-04-11 23:22:10
প্রিয়তা আপনাকে চাই; প্রতিক্ষণ,সারাক্ষণ
আমি মুখে স্বাভাবিক ভদ্রতা বজায় রেখে হালকা হেসে বললাম, “প্রতিদিন সকালে যখন ঘুম থেকে উঠি তখন আমি অন্য এক জগতকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারি। ওই জগতের নেশায় বলতে পারো ঘুম আমাকে তাড়াতাড়ি মুক্তি দেয়।কিন্তু তুমি এত সকালে কি করছো?”

তিথি কোন কথা বলেনা।আমার দিকে কেমন যেন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে কি কি ভাবে।তার হাতে ধরা ছোট্ট জেলীর কৌটা থেকে ক্রীম নিয়ে মুখে ছোয়ায়।তারপর আবার তার ভ্রূ জোড়া বাকিয়ে আমার দিকে কেমন করে যেন তাকায়।আমার এসব ভালো লাগেনা, কখনো ভালো লাগেনি।আমি জানিনা সে কেন এটা বোঝেনা।তাকে একজন ক্লাসমেটের বেশি আর কিছু কখনোই মনে হয়নি, হবে বলেও মনে হয়না।তিথী আবার আমাকে জিজ্ঞেস করে, “কিছু খাবে?আমার স্টকে কিছু ভাপা পিঠা আছে।নিয়ে আসবো?”

আমি কফিতে আরেকটা চুমু দিয়ে বললাম, “না”।"

কফি শেষ হলে তিথীর থেকে বিদায় নিয়ে আমি ক্যাম্পাস দিয়ে হাটতে থাকি।মাথায় এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ওর কথা যার জন্য বহুদিন হলো আমি রাতে ঘুমাতে পারিনা।ওর শেষ চিঠিটা আমাকে আবার পড়তে হবে।আচ্ছা আমি কেন চিঠিটাকে শেষ চিঠি বলি?ওটা কি ওর প্রথম দেয়া চিঠিও ছিলোনা?ও তো শুধু ওই একটাই চিঠি আমায় দিয়েছিলো।নিজেকে তুচ্ছ লাগছে, অনেক তুচ্ছ।আমি অনুভব করতে পারি, আমার চোখ আবার ভিজে যাচ্ছে।আমি বুঝতে পারিনা, আজকাল আমি এমন হয়ে গেছি কি করে! আমি জানিনা কবে আমার মুক্তি হবে, আমি এখন সব হারিয়ে জীবনের আলো খুজছি।

ওকে প্রথম দেখি ২০০৯ সালের শেষ দিকে।বন্ধুরা মিলে কাবাব খাবো বলে সন্ধ্যালগ্নে ধানমন্ডি পুরনো স্টারের সামনে জড়ো হবে বলে প্ল্যান করেছি।আমি একটু আগেভাগেই এসে পড়েছি।হঠাৎ করে মাথার ওপর দিয়ে মনে হলো অনেকগুলো পাখি উড়ে গেলো।আমি মুখ তুলে আকাশের দিকে চাইতেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর পবিত্র মুখটি আমার নজরে এলো।আমি তাকিয়ে রইলাম সে অপ্সরার দিকে সর্বোচ্চ একাগ্রতা নিয়ে।আমি কি তখন এই পৃথিবীতে ছিলাম? ছিলাম কি প্রাচীন শহর ঢাকার এক ক্ষুদ্র কোণে যেখানে ভালোবাসা ফেরি হয় দিনে দুপুরে, রাতের আধারে, কিন্তু কেউ তা একবারো হৃদয় দিয়ে ছুয়ে দেখেনা অথবা তাকে যত্ন করে একটিবারো হৃদয়ে লালন করেনা।আমি তখন স্টার কাবাব নামক খাদ্যবিলাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রকান্ড অট্টালিকার সর্বোচ্চ স্তরে বাস করা এক সাদা পরীর উদাসীনতা উপভোগ করছি ঝরে যাওয়া লাল সূর্যের দিকে।

এরপর বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমি টানা এগারো মাস প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে সেই সুউচ্চ অট্টালিকার পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করেছি।কখনো হয়তো তার দেখা পেয়েছি, কখনো পাইনি।অবাক করা ব্যাপার হলো সে কখনো আমাকে একটিবারও তাকিয়ে দেখেছে বলে মনে হয়নি।সে শুধু সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতো আর কি যেন ভাবতো।তাকে আমি কখন কিভাবে ভালবেসে ফেলেছি জানিনা।অনেক সস্তা শোনাচ্ছে হয়ত আমার অনুভূতি, কিন্তু আমি এর থেকে ভালোভাবে এই কথাটা আর বলতে পারতাম না।আমার উচ্চরিত ভালোবাসা শব্দটা আজকালকার ফাস্টফুড শপে বসে মুরগীভাজা খাওয়া অথবা বোটানিক্যাল গার্ডেনে বসে বিশেষ ভালোবাসার চর্চা থেকে অনেক অনেক আলাদা।আমি তাকে পাওয়ার জন্য ভালোবাসিনি, তাকে ছুয়ে দেখার জন্যও নয়।আমি ভালোবেসেছি তাকে ভালোবাসার জন্য।তাকে আমি মনে মনে ডাকি “প্রিয়তা” বলে। “প্রিয়তা” শব্দের অর্থ কি জানিনা, কেন এই নামটাই মনে হয়েছে তাও জানিনা।শুধু মনে পড়ে তাকে দেখার পর প্রথম রাতে যখন উদভ্রান্তের মত ঘুমাতে যাই তাকে ভাবতে ভাবতে, আমি মনে মনে বলেছিলাম “প্রিয়তা আপনি ভালো থাকুন, জগতের সকল শোভিত পুষ্প তার সুবাস নিয়ে আপনাকে জড়িয়ে ধরে থাকুক।অম্লান থাক আপনার শুভ্রতা।”

আসল ঘটনায় ফিরে যাই।এগারো মাস অপেক্ষার পর হঠাৎ করে একদিন প্রিয়তা আমার দিকে তাকালো।কিন্তু কেন যেন মনে হলো তার দৃষ্টিতে অনেক অনেক কান্না জমে ছিলো।আমি তার চোখে চোখ রাখতে পারিনি।আমি হতবিহবল হয়ে ভাবছিলাম, কিছু কি ভুল হলো? একটু পর একটা ছোট্ট মেয়ে আমার হাতে এসে একটি চিঠি দিয়ে গেলো, দু পাতার একটি চিঠি।দুপাতার সেই একটি চিঠি যা আমার জীবনকে আমূলে বদলে দিলো।সেই চিঠি আমি সারাদিন হাতে নিয়ে বসে ছিলাম,আমি সারাটি রাত কেদেছি ওই চিঠি পড়ে। রাতে যখন আমার আব্বা আম্মা খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছিলো আমি তখন নিশ্চুপ ছিলাম আর ভাবছিলাম কেন এমন হলো?সেই চিঠির শেষবাক্যটি ছিলো, “আর কখনো আসবেন না এখানে, কোনদিন নয়।”

আমি গত দু বছরে আর কখনো ওদিকে যাইনি, কখনো আর যাবোনা।
আমার ক্লাসমেট ঈশিতার বিয়ে আজ।আমি অনেকদিন পর সামাজিক হওয়ার আশায় তার বিয়েতে দেখা দিলাম। বন্ধুরা আমাকে আজকাল কবি বলে ডাকে।বড় বড় চুল আর শশ্রুমন্ডিত মুখমন্ডল আমার কবি পরিচয় দেয় বৈকি, কিন্তু কবিতার ক-ও যে আমি জানিনা তা তাদের বুঝায় কে?ঈশিতার বাবা মা আমাকে দেখে একটু ভড়কেও গেলো মনে হলো।ঈশিতার বাবা আমাকে আড়ালে ডেকে বললেন, “বাবা অর্ক, তোমার বয়সে আমি দশটা ছ্যাকা খেয়ে দুট প্রেম করতে পেরেছিলাম।তোমরা ইয়ং জেনারেশন এত সহজে ভেঙ্গে পড়ো কেন?চিয়ার আপ।”

আমি হাসিমুখে বললাম, “অবশ্যই আঙ্কেল।আমি সবসময়ই চিয়ার্ড আপ হয়ে আছি।দাড়ি রেখেছি বিপ্লবী ভাব ধরার জন্য, আর কিছু না।”
আঙ্কেল হা হা করে সজোরে হেসে দিলেন।আমিও ওই সুযোগে কেটে পড়লাম।ঈশিতার সাথে দেখা করতে যাবো তার আগেই তিথী সামনে উপস্থিত।আমাকে দেখে যেন স্বস্তি পেলো এমন ভাব করে বললো, “একটু ওদিকে যাবে?”
আমি বললাম “ঠিক আছে।”
আমি যখন তিথীকে নিয়ে বিয়েবাড়ির হট্টগোল থেকে বেরিয়ে একটা নিশ্চুপ কোণে যেয়ে বসলাম তখন টপটপ বৃষ্টির ফোটা আমাকে ঘিরে ধরলো।আমি অত্যন্ত বিরক্ত তিথীর সাথে এই সময় একা একা হাটাহাটি করার জন্য।বুঝতে পারছি যে “না” শব্দটা আপ্ত করার জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে।নীরবতা প্রথম ভঙ্গ করলো তিথী নিজেই।আমাকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “তোমার আমাকে এত বিরক্ত লাগে কেন?”
আমি বললাম “আমার কাউকেই ভালো লাগেনা তিথী।”
“মেয়েটা কে জানতে পারি?”তিথী আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

আমি কিছু বললাম না।আমার কিছু বলার ইচ্ছাও নাই।আমি তিথীর থেকে দূরে যেতে চাচ্ছি।আবার অনেক খারাপ লাগছে।তিথী নামের মেয়েটা আমাকে ভার্সিটির প্রথম দিন থেকে অন্যভাবে দেখে আমি জানি।আমাকে আমার বন্ধুরা অনেকবার বলেছে যে এত ভালো একটা মেয়েকে আমি কেন এভাবে অবহেলা করি।আমি বন্ধুদেরকে বলি “ওকে অবহেলা করার মত যোগ্যতা আমার নাই।ওকে ওইভাবে দেখার মত ক্ষমতাও নাই”।"

আমার মনে আছে টানা তিনদিন ক্লাসে যাইনি বলে একদিন তিথী আমার এক বন্ধুকে নিয়ে আমার বাসায় চলে এসেছিলো।আমাকে দেখে তার চোখে যে জল এসেছিলো, সেই জলেমগ্ন ভালোবাসা উপেক্ষা করার মত শক্তি কোথায় পেয়েছি জানিনা।একবার সে আমাকে কি যেন একরকম পিঠা খেতে সেধেছিলো।আমি না করায় হঠাৎ করে সে অনেক রেগে গিয়েছিলো মনে পড়ে।সবগুলো পিঠা নিয়ে ফেলে দিয়েছিলো পাশের ডাস্টবিনে।আমি ভয় পাচ্ছি আজকে আবার কি করে বসে।
তিথী হঠাৎ করে আমার একটা হাত ধরে ফেলে।আমি ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে দাড়াই।ও আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমার আমাকে অনেক নির্লজ্জ মনে হয় তাই না?”

আমি নির্বিকার হয়ে বললাম, “না”।

তিথী আমার হাত আরো শক্ত করে ধরে বলে “আমি তোমাকে ছাড়া কখনো আর কাউকে চাইনি, বিশ্বাস করো।আমি তোমাকে বলছিনা তোমার আমাকে ভালোবাসতে হবে।কখনো বলবোও না।আমি শুধু বুঝতে চাই, কেন তুমি আমাকে এত অবহেলা করো?”

আমি অন্ধকার ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাড়িয়ে ভেজা ভেজা রাস্তায় চাদের জ্বলজ্বলে ভাস্কর্যের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকি। আমি তিথীকে বলি প্রিয়তার কথা।আমি আর কখনো কাউকে তার কথা বলিনি।আজ বললাম আরেক নারীকে যে আমায় ভালোবাসে, হয়তো অতটাই যতটা আমি প্রিয়তাকে বেসেছি।একটা অদ্ভুত কথা বলি শুনুন।আমার প্যান্টের ডান পকেটে আমি এখনো প্রিয়তার চিঠি রেখে দিয়েছি।আমি কখনো চিঠিটাকে হাতছাড়া করিনা।করবোও না।তবে আজ তিথীকে পড়তে দেবো।তিথীকে চিঠিটা যখন দিলাম তখন বুকে সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা হচ্ছিলো।তিথী চিঠিটা পড়তে থাকেঃ

“আমি জানিনা আপনি কে।তবে বোধহয় বুঝতে পারি কেন এভাবে প্রতিদিন আমার বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখেন।আমি যখন প্রথম আপনাকে দেখি তখন অনেক ভালো লেগেছিলো কেউ আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকে ভেবে।পরে অনেক কষ্ট হয়েছিল যখন মনে হয়েছিলো আমি আপনাকে কখনো সম্পর্কে জড়াতে পারবোনা।কারণ আমার অনেক সমস্যা আছে।আমি জন্ম থেকে কথা বলতে পারিনা এবং কানে শুনতে পাইনা।ভালো ভাবে বললে আমি বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী।একারণে আমাকে আমার আব্বু আম্মু কোথাও নিয়ে যায়না, কেউ আমাকে ছোটকাল থেকে একবারো হয়তো ভালোবাসেনি।আমি প্রায় দিন, প্রায় রাতে কারো একটি ভালোবাসার কথা শোনার চেষ্টা করি, কাউকে একবার আমার অনেকগুলো জমে থাকা কষ্টের কথা বলার চেষ্টা করি।কিন্তু পারিনা।আমি প্রায় দিন তাই উপরে বসে থাকা সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্ন করি, আমাকে কেন দুনিয়াতে পাঠানো হলো?যদি পাঠানোই হলো তবে কেন অনুভূতি দেয়া হলো?এই অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারার যন্ত্রণা কি তিনি বুঝতে পারেন? আমি কখনো কারো কাছেই এর সদুত্তর পাইনি।

আমি আপনাকে এই কথাগুলো বললাম কারণ আমি চাইনা আপনি আমার জন্য কখনো কষ্ট পান।আপনি কি জানেন আমি যে আড়াল থেকে সবসময় আপনাকে গভীর মমতা নিয়ে দেখি?আমার অনেক ভালো লাগে যখন দেখি আপনি রোদ-বৃষ্টি সব ভুলে গিয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন।আমি মনে হয় আপনাকে অনেক ভালোবেসেও ফেলেছি।যাকে আপনি ভালোবাসেন তাকে কি কখনো আপনি কষ্ট দিতে পারবেন?আমি যে আপনাকে ভালোবাসি একথা বলার সামর্থ্য আমার নাই, আমি আপনার থেকে ভালোবাসি কথাটা শোনার ক্ষমতাও রাখিনা।আমি প্রায় রাতে অনেক অনেক কাদি জানেন।আপনার আমার জন্য অপেক্ষারত ওই চোখে যে ভালোবাসা আমি দেখি তাকে আমি কখনোই ভুলতে পারবোনা।কিন্তু আপনাকে নিজের সাথে জড়াতেও তো পারবোনা।
আমার একটা কথা রাখবেন?আপনি আর এদিকে আসবেন না।আপনাকে দেখলে আমার এখন প্রতি রাতে মরে যেতে ইচ্ছা করে।আমি একগাদা ঘুমের ওষুধ জমা করে রেখেছি।যেদিন আর সহ্য হবেনা সেদিন সবার থেকে বিদায় নেবো।আমার কথা ভুলে যান।আর কখনো আসবেন না এখানে, কোনদিন নয়।”

তিথী আমাকে চিঠিটা ফেরত দিলে আমি তাকে বললাম, “তিথী জানো আমি আর কখনও ওদিকে যাইনি।আমি চাই সে বেচে থাকুক।তার দুচোখ দিয়ে সে পৃথিবীটা দেখুক।সে একদিন বুঝতে পারুক এই সুন্দর পৃথিবীটা শুধু শুনতে পারা বা বলতে পারার জন্য নয়।পরম করুণাময় তার অপার সৌন্দর্যচেতনা দিয়ে এই পৃথিবীকে ছবির মত সাজিয়ে রেখেছেন।আমি চাই প্রিয়তা যেন তা অনুভব করে, দু চোখ ভরে শুষে নেয় সবকিছু”
তিথী আমাকে সে রাতে আর কিছু বলেনি।ভার্সিটির বাকী সময়েও আর কখনো কোন কথা বলেনি। একবারের জন্যও না।আমিও আর কখনো এগিয়ে যাইনি।

তিথীর সাথে আবার আমার কথা হলো কনভোকেশনের সময়।ও নিজেই আমাকে হাত দিয়ে ডাকলো।হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছো?
আমিও একইভাবে জবাব দিলাম “ভালো।”
তিথী অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করলো।তারপর বললো, “তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করেছে সবসময়।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম “কি কথা?”

তিথী খুব সিরিয়াস হয়ে আমাকে বললো “তুমি প্রিয়তাকে এভাবে একা ছেড়ে দিলে কেন?”

আমি মূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।মুখে কোন কথা আসছিলোনা।গত সাড়ে তিন বছরে যে ভাবনা একবারও মাথায় আসেনি তা আজকে এভাবে তিথীর একটা প্রশ্নে জোরেশোরে বের হয়ে আসলো।আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম।ঘড়িতে তখন দুপুর ২টা বেজে ১০ মিনিট।আমি দৌড়িয়ে একটা সিএনজিতে উঠলাম।ডেস্টিনেশনঃ ধানমন্ডি স্টার।পথে যেতে যেতে বারবার ভাবছিলাম একটাই কথা, আমি এত বোকা কেন?
আমি আবারো প্রিয়তার বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি।আমি জানি ও আসবে।ওকে আসতেই হবে।আমি জানি প্রিয়তা আমাকে দেখে দৌড়িয়ে আমার কাছে ছুটে আসবে।আমি যদিও জানি ও কিছু শুনতে পাবেনা তবুও বলবো, “আমি আমার জীবনের সবকিছু দিয়ে আপনাকে চাই, সবকিছু দিয়ে”।
আমি জানি প্রিয়তা কিছু না শুনেও অনুভব করবে আমার বলা প্রতিটা ভালোবাসার কথা।আমি জানি ও সজোরে মাথা নেড়ে কান্না ভেজা নয়নে আমাকে জানাবে সেও আমাকে চায়।অনেক অনেক।
********************************************************************

প্রিয়তা এসেছিলো কিনা জানিনা।না এসে থাকলে হয়তো অর্ক নামের সেই ছেলেটা এখনো ধানমন্ডি স্টার কাবাবের সাথে লাগোয়া লাল বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থাকে কারো অপেক্ষায়।আর যদি প্রিয়তা এসে থাকে, প্রার্থনা করি যেন তারা নিজেদের ভালোবাসাগুলো বুঝে নিতে পারে।
********************************************************************

আমি নিশ্চিত জানি, আমার এই সস্তা লেখা অত্যন্ত কষ্ট করে যারা শেষ পর্যন্ত পড়বেন তারা অনেকেই হয়তো অতি বিরক্ত হবেন এবং আমার মুন্ডুপাত করবেন। তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।লেখাটা বহুদিন ধরে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো।অবশেষে তাকে কীবোর্ডের কী টেপাটেপি করে প্রকাশ করতে পারার জন্য আমি যারপরনাই আনন্দিত।আপনাদের জানাতে চাই, আমি সস্তা মাপের লেখক হলেও আমার লেখায় বর্ণিত ভালোবাসার কথা সস্তা নয়।আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি পবিত্র ভালোবাসার থেকে মূল্যবান কিছুই এই জগতে নাই।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29320668 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29320668 2011-02-05 12:59:58
ডায়েরীর পাতা থেকেঃ যুদ্ধশিশু এরিনা ও তার বীরাঙ্গনা মায়ের যন্ত্রণা গাঁথা এপ্রিল ১৭, ১৯৯১

আমি যেদিন প্রথম জানলাম আমার খুব তাড়াতাড়ি মৃত্যু হতে যাচ্ছে, সেদিন আমার একবারও কান্না আসেনি।আমি আসলে হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম এই জীবনের প্রতি।প্রতিদিন সকালে উঠে আমি নিজের দিকে তাকাতাম আর মনে হতো, ছি! এই আমার পরিচয়।তবুও বেচে থাকতে হয় বলে, আমি এরিনা একজন বাঙ্গালী আমেরিকান এই ব্যস্ত নিউইয়র্ক শহরে শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে বেচে আছি।আমার ফস্টার গার্জিয়ান রোমা একজন ইতালীয়ান সম্ভ্রান্ত বংশের নারী যে জীবনে কখনো বিয়ে করেনি।কেন যেন তার সাথে আমার কখনো সেভাবে কথা বলা হয়না সেই ছোট্ট বেলা থেকে।তবে অত্যন্ত মহৎ যে কাজটা সে করেছে, তা হলো আমাকে বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি সে শিখিয়েছে।আমাকে একজন আদর্শ নারী হিসেবে বড় হয়ে উঠার শিক্ষা দিয়েছে।আরেকটি মহৎ কাজ সে করেছিলো ১৯৯০ সালের ২৪শে ডিসেম্বর।আমাকে রাত্রি ১১টার কিছু পর তার রুমে ডেকে নিয়ে সে বলেছিলো,

“এরিনা তুমি জানো তুমি বাংলাদেশী একটি মেয়ে।আমি তোমাকে শুধুই দত্তক নিয়েছিলাম।তোমাকে আমি এতদিন বলেছিলাম তোমার বাবা মা কেউ বেচে ছিলোনা তাই তোমাকে আমি একটি এতিমখানা থেকে তুলে নিয়ে এসেছি।কিন্তু আসলে ব্যাপারটি সত্যি নয়।বুঝতে পেরেছো?”
আমি তাকে মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলাম, “সত্যিটা কি বলবে মা?”

“এরিনা আমি খুব দুঃখিত তোমাকে সত্যি তথ্যটা জানাতে হচ্ছে বলে।তুমি একজন যুদ্ধশিশু।৭১ সালে তোমাদের দেশে পাকিস্তানীরা যে অত্যাচার চালিয়েছিলো তারই ফসল তুমি।তোমার মাকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম।ইউএসএ থেকে যে মেডিকেল টিম ৭২ সালে বাংলাদেশে গিয়েছিলো তার একজন সদস্য ছিলাম আমি।তোমার মা তোমাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে আমি তোমাকে এই দেশে নিয়ে আসি।তুমি তো জানো আমি অনেক একাকী।তাই কোন প্রতিষ্ঠানে না দিয়ে আমি নিজেই তোমাকে দত্তক নেই।”

মা যখন আমাকে এই কথাগুলো বলছিলো আমি তখন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে।আমার চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিলো।মা আমার দিকে সমবেদনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার বললো, “এরিনা তুমি কি তোমার মায়ের নাম, ঠিকানা জানতে চাও?”

আমি নিজেকে সামলিয়ে বললাম “হ্যা”।"

এরিনা টিভির দিকে তাকিয়ে বললো, “তোমার মা অসাধারণ রুপবতী একজন নারী ছিলেন।কিন্তু তার পরিবার ছিলো অত্যন্ত দরিদ্র।তোমার মায়ের নাম ছিলো ইরিনা।তুমি কি বুঝতে পেরেছো কেন তোমার নাম আমি এরিনা রেখেছি?”

আমি মাথা নাড়লাম।মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “শেষবার যখন তোমার জন্মদাত্রী মায়ের সাথে আমার কথা হয় তখন সে সুইডিশ একটি ফার্মাসিকিউটিক্যাল ফার্মে চাকরী করতো।তাকে তোমাদের দেশের মানুষ আসলে বাচতে দিচ্ছিলোনা।তাই আমি নিজেই তাকে সুইডেনে আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।সে আমার অত্যন্ত ভালো বান্ধবী ছিলো।তবে তার সাথে আমার প্রায় অনেকবছর হলো যোগযোগ নেই।আমি চেষ্টা করবো তার ঠিকানা তোমাকে যোগাযোগ করে দিতে”।

আমি তখন কান্নার দমকে বারবার কেপে উঠেছিলাম।মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।আমি তাকে শুধু একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, “সে কি কখনো আমার কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো?”
মা আমাকে বললো, "না"

আজ আর লিখতে ইচ্ছা করছেনা।

মে ২১, ১৯৯১

পালক মা আমাকে আমার আসল মায়ের ঠিকানা যোগাড় করে দিয়েছে।আমি কাল সুইডেন যাবো, আমার জন্মদাত্রীর সাথে দেখা করবো।আমি জানিনা সে আমাকে দেখে কি বলবে?তবে আমার পালক মাকে আমি বলে এসেছি যেন আমার জন্মদাত্রী না জানতে পারে আমি তার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।

আমি দিন দিন আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছি।মা অবশ্য জানেনা আমার শরীরে যে লিউকেমিয়া নামে একটি রোগ বাসা বেধেছে।আমি শুধু শুধু তার ঝঞ্ঝাটহীন জীবনে ঝামেলা করতে চাইনা।তবুও মাঝে মাঝে সে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, "তোমাকে কেমন অসুস্থ দেখাচ্ছে।তুমি চাইলে আমাকে বলতে পারো তোমার কি হয়েছে?"

আমি ওকে জানাই, "আমি অনেক ভালো আছি মা।"

আমি অবাক হই যখন ভাবি আমার জীবনের পরিবর্তনগুলোর কথা।মাত্র চার মাসের ব্যবধানে আমি জানতে পারলাম আমি একটি অবৈধ জন্মগ্রহণকারী মেয়ে, আমি জানতে পারলাম এই অসহ্য পৃথিবীতে আমার আয়ু আর মাত্র কিছু দিন।আমি কি অপরাধ করেছি জীবনে জানিনা।আমার এই ১৮ বছরের জীবনে কারো মনে কষ্ট দিয়েছি বলে মনে পড়েনা।আমার হাইস্কুলের যত বান্ধবী আছে তারা সবাই নিজেদের বয়ফ্রেন্ড নিয়ে ব্যস্ত।যা খুশি করে বেড়ায়, বয়ফ্রেন্ড নিয়ে উইকেন্ডে ফরেস্ট ক্যাম্পিং, নায়াগ্রা ফলস ঘুরে বেড়ানো সবই তারা করে।কিন্তু আমি কখনো কেন যেন কাউকে আমার বয়ফ্রেন্ড বানাতে পারিনি।এমন না যে কাউকে আমার পছন্দ হয়নি, বা কেউ আমাকে পছন্দ করেনি।আমার একটি ছেলেকে অনেক ভালো লেগেছিলো।ওর নাম ছিলো ফয়সাল।বাংলাদেশী একটু মোটাসোটা একটা ছেলে।কিন্তু তাকে কখনো জানানোর সুযোগ হয়নি।হয়তো ইচ্ছাও করেনি।

আমি একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।আমি আমার মারা যাওয়ার আগেই আত্নহত্যা করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।আমি জানি আমার মৃত্যুতে কারো কোন যায় আসবেনা।

মে ২৪, ১৯৯১

আমি কিছুক্ষণ আগে ক্লারার সাথে ফোনে কথা বললাম।সে আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী এবং সেই একমাত্র মানুষ যাকে আমি আমার সবকিছু বলি।ক্লারা ফোন করে কান্নাকাটি করলো অনেকক্ষণ।ফোন রাখার আগে আমাকে বললো, "ওয়াই আর ইউ ডুইং দিজ টু ইউরসেলফ?আই কান্ট বিয়ার দিজ এনিমোর! আই এম নট গোয়িং টু টক উইথ ইউ এনিমোর।নেভার এভার এগেইন।"

আমার এই আমেরিকান বান্ধবীর যে ভালোবাসা নিয়ে আমার সাথে কথা বলে আমি জানিনা মৃত্যুর পর এই ভালোবাসার কতটুকু আমি সাথে নিয়ে যেতে পারবো।আজকে আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে খেয়াল করলাম আমি অনেক বড় হয়ে গেছি।আমি মাত্র ১৮ বছর বয়সে এত বড় একটি রোগ শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি, অথচ কাউকে একবারও বলিনি।কারো কাধে মাথা দিয়ে একবারও কাদিনি।এই আমি আজ একা একা ভীন দেশে আমার জন্মদাত্রীর সাথে দেখা করতে এসেছি।
তার সাথে আমার দেখা হয়েছে।কথাও হয়েছে।কিন্তু সে জানেনা আমি কে।আমার জন্মদাত্রী ২৬,৬৭০ বর্গকি.মি. এর নড়বট্টেন স্টেটের ছোট গ্রাম গ্যামেলস্টেডে একটি ওষুধের দোকানে চাকরী করে।তাকে যখন আমি প্রথম দেখি তখন এমনিতেই চোখ দিয়ে একগাদা পানি বের হয়ে গিয়েছিলো।কি অদ্ভুত সুন্দর একটা নারী।কত সুন্দর তার আকাবাকা চোখগুলো।আমি যখন তার পাশে গিয়ে দাড়াই সে আমার দিকে একবারও তাকায়নি।আমি মাথা ব্যথার জন্য কিছু ওষুধ তার কাছে চাইলে সে আমার দিকে না তাকিয়েই সেগুলো আরেকজনকে দেয়ার নির্দেশ দেয়।শুধুমাত্র যখন আমার কন্ঠস্বর শুনলো তাকে একটু কনফিউজড মনে হয়েছিলো।
এখন লিখতে খুব কষ্ট হচ্ছে।বোধহয় বমি করবো।ডাইরী তোমাকে শুভরাত্রি।

৩১ মে ১৯৯১

কালকে বেশ কিছু অসাধারণ ব্যাপার আমার সাথে ঘটেছে।আমি কাল সাহস করে আমার জন্মদাত্রীর সামনে যেয়ে দাড়াই।না তার ওষুধের দোকানে আমি যায়নি।আমি তার ছোট্ট বাসায় সন্ধ্যাকালে যখন পৌছাই, তখন রক্তস্নাত সূর্য চারপাশ কমলা রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দিয়ে রেখেছিলো।দরজার কড়া নাড়ার পর সেই এসে দরজা খুলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।আমি তাকে শান্ত স্বরে বাংলায় বললাম, "আমি কি ভেতরে আসতে পারি?"

আমার জন্মদাত্রী আমাকে একটা কথাও জিজ্ঞেস করলোনা।শুধু দরজার সামনে থেকে সরে এসে আমাকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিলো।আমার মনে হলো, যেন সে সব বুঝে ফেলেছে।আমি তাকে বেশ অনেকক্ষণ নীরবতার পর নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি জানেন তো আমি কে?"

উনি কিছু বললেন না।শুধু ধপ করে বিছানায় পড়ে গেলেন।
আমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে থাকলাম।আমি কি জানতাম যে আমার হৃদয়ে এত কষ্ট বাসা বেধে ছিলো?আমার মনে হচ্ছিলো আজ অশ্রুজলে সবগুলো কষ্ট বের করে দিবো, নাহলে যে আমার মুক্তি নেই।আমি তাকে দৃঢ় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি কেন একবারও আমার কথা জানতে চাননি?এত ঘৃণা কেন আমার প্রতি আপনার?এত ঘৃণা কেন?"

আমার দিকে তাকিয়ে এবার সে কেদে দিলো।আমাকে বললো, "তুমি কেন আমার কাছে এসেছো?তুমি তো আমার ভালোবাসার চিহ্ন নও, তোমাকে দেখে আমার শুধু অসহ্য লজ্জা, নির্মমতা আর পাশবিকতার কথা মনে পড়ে।আমি তোমাকে ভালোবাসিনা, তুমি সামনে থেকে চলে যাও।আর কখনো আমার কাছে আসবেনা।তুমি আমার ভালোবাসার কেউ না।
আমার বুকের মধ্যের কষ্টগুলো দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো।কিন্তু আমার এই ১৮ বছরের ছোট্ট জীবনে আমি কখনো কাউকে জোর দিয়ে কিছু বলতে পারিনি, কারো কাছে ভালোবাসার দাবী জানাতে পারিনি।আজও পারলাম না।আমি আমার কান্নার স্রোতধারা থামাতে না পেরে সেই বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম।কেউ কি বুঝবে তখন আমি কতটা অসহায় বোধ করছিলাম?কতটা ঘৃণা নিজের প্রতি আমার হচ্ছিলো?কেউ না বুঝলেই ভালো।কারণ ওটা যে সহ্য করার মত নয়।

জুন ৩ ১৯৯১

গতকাল আমার জীবনে আবার চমকপ্রদ ব্যাপার ঘটেছে।সকালবেলা আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার পালক মাতা আমার ভাড়া করা হোটেলের ছোট্ট রুমে আমার পাশে বসে কাদছে।আমি তাকে দেখে নিজেও কেদে দিলাম।আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "মা তুমি কি জানো আমি মরে যাচ্ছি?আমি সর‌্যি মা তোমাকে আগে জানাইনি।"

মা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, "তোমার মেডিকেল রিপোর্ট আমার হাতে না আসলে কখনো জানতাম না এরিনা।তুমি আমাকে না জানিয়ে ঠিক করোনি।"

আমি তাকে বললাম, "আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।"

এরিনা আমাকে অনেক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, "মামণি তুমি জানো আমি যখন তোমার বয়সী তখন চারদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা আর পাশবিকতা ছড়িয়ে পড়েছে।আমি তখন এক আমেরিকান সৈনিকের প্রেমে পড়েছিলাম।আমরা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একসাথে ভালোবাসা বন্টন করেছি।একসময় যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় তখন সে আমার থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বলেছিল মাসখানেকের মধ্যে ফিরে আসবে।কিন্তু সে আসেনি।আমার ভালোবাসা তার প্রতি তবুও আজো একটুও কমেনি।একটুও না।ওর ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে যখন আমার একটি মেয়ে হয়েছিলো, সে ছিলো দেখতে ঠিক তোমার মত।একেবারে তোমার মত চোখ, তোমার মত নাক।কিন্তু বিধাতা তাকে জন্মের ৭২ ঘন্টা পর তার বাগানে নিয়ে যান।আমি একা হয়ে পড়েছিলাম, ভীষণ একা।তোমাকে যখন আমি প্রথম দেখি, আমার প্রচন্ড লোভ হয়েছিলো তোমাকে কাছে রাখার জন্য।অনেক।মামণি তুমি কি জানো আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি?আফসোস আমি তোমাকে জন্ম দেইনি।"

আমি কোন কথা না বলে আমার পালক মায়ের বুকে নিজেকে লুকিয়ে রাখলাম।মা ইতালীয় ভাষায় কি বললো, আমি বুঝতে পারছিলাম না।শুধু বুঝলাম সে বলছে "আমার এত্ত ছোট্ট মামণিকে ছাড়া আমি কি করে বাচবো?"

আমি খুব অবাক হয়েছি গতকাল।আমি মারা যাচ্ছি বলেই কি আমার পালক মা তার অসীম ভালোবাসা আমাকে জানান দিলো?আমি আগে কেন কখনো বুঝিনি, সে আমাকে এত ভালোবাসে?

৯ জুন ১৯৯১

সকালবেলা আমার পালক মা আমাকে জানালো আজ আমার জন্মদাত্রী আমার সাথে দেখা করতে আসবে।আমি হতবাক হয়ে গেলাম এবং ভাবতে লাগলাম, তাকে কি আমার আর কিছু বলার বা বোঝানোর বাকি রয়ে গেছে?আর সে নিজে থেকে কেন আবার কষ্ট পেতে আমার সাথে দেখা করতে আসবে?

১০ জুন ১৯৯১

গতকাল আমার আসল মা আমার সাথে যখন দেখা করতে আসলো আমি তখন বমি করে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ছিলাম।সে আমার বিছানায় আমার পাশে বসে আমার কপালে হাত রাখলো। আমি চোখ খোলার শক্তিটুকুও পাচ্ছিলাম না।আমার মার দুফোটা গরম অশ্রু হয়তো আমার কপালে এসে পড়লো।আমি কেপে কেপে উঠলাম।মা আমাকে বললো, "আমার সোনা তুই আমাকে মাফ করে দিস।আমি তোকে সত্যি কথা বলি শোন।তুই যখন জন্ম নিলি, আমি জ্ঞান হওয়ার পর প্রথম যখন তোর মুখ দেখলাম তোকে তখন অনেক ভালোবেসে ফেলছিলাম।আমি ভেবেছিলাম তোকে অনেক ঘৃণা করবো আমি।কিন্তু এত্ত ছোট একটা শিশু তাও আমার রক্ত মাংশের গড়া, আমি তাকে কি করে ঘৃণা করি? আমার সোনা তুই কি বুঝবি একজন মা তার সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানকে কোন অবস্থায় আরেকজনের হাতে তুলে দেয়?আমার অনেক কষ্ট হয়েছিলোরে।কিন্তু আমার কিছু করার ছিলোনা মা।আমি জানতাম তোকে আগলে রাখা আমার মত একজন সাধারণ বাঙ্গালী নারীর জন্য সম্ভব না।কেউ তোকে বাচতে দিবেনা।
জানিস মা যখন যুদ্ধের সময় ওই পিশাচ গুলো প্রতিরাতে আমার আত্নাকে আঘাত দিয়ে মেরে ফেলতো তখনো এত কষ্ট হয়নি যতটা হয়েছিলো তোকে আরেকজনের হাতে তুলে দিতে।মা আমি তোকে প্রতিদিন ভোলার চেষ্টা করেছি। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে তোর ওই জন্মের পর দেখা আমার মত চোখগুলো কত কত আমার বুকে আঘাত করতো তুই বুঝবিনা।মা আমাকে ক্ষমা কর।আমি সাহসী ছিলাম না।আজকে আমাকে খোদা শাস্তি দিচ্ছে দেখ।আজ যখন তোকে কাছে পেলাম তখন তুই আমাকে রেখে চলে যাচ্ছিস।আমি কি পাপ করেছি জীবনে যে আমার সাথে ..."

আমার মা অজ্ঞান হয়ে গেলো একটু পর।আমি আমার দু পাশে আমার আপন মা আরেক পাশে আমার আরেক আপন মা যে আমাকে বড় করেছে তাদেরকে একসাথে দেখে ভাবতে লাগলাম, কে আমায় বেশি ভালোবাসে?তারপর ভাবলাম, আমি কত বোকা!আমার তো ভাবা উচিত আমি কত ভাগ্যবান যে আমার চলে যাওয়ার সময় দু দুটো মা একসাথে পেয়েছি।বিধাতা তোমাকে ধন্যবাদ।

৮ জুলাই ১৯৯১

আমি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছি।হয়তো আজকের পর আমি আর লিখতে পারবোনা।এখন আমি নিউইয়র্কে আমার দুই মায়ের একগাদা ভালোবাসা নিয়ে সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকি।গভীর রাতে আমি অনেক কষ্ট হলেও উঠে বসে জানালার কাছে যাই।আমি আকাশের তারা গুনি।আমি জ্বলজ্বলে তারাগুলো দিয়ে আমার সুন্দর নামটি লিখার চেষ্টা করি।একটু পর আবার ঘুমাতে চলে যাই।ঘুমুবার আগে আমার পাশে বসে থাকা বা শুয়ে থাকা মায়েদের দিকে তাকিয়ে বলি, "মা তোমাদের অনেক ভালোবাসি।"

ডায়েরীতে আর কোন লেখা পাওয়া যায়নি।

********************************************************************
আমি বলতে চাই- কোন গল্প, সাহিত্য অথবা উপন্যাস দিয়ে ৭১ এর সেই ভাগ্যহারা নারীদের অথবা সেই সময়ের ভাগ্যহারা যুদ্ধশিশুদের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।তবুও বারবার ইচ্ছা করে তাদের কষ্টগুলো একটু করে ছুয়ে দেখতে।আমার এই লিখা ওই ছুঁয়ে দেখারই ফসল হয়তো।ক্ষমা চাই, আমার লিখার অক্ষমতা কাউকে পীড়া দিয়ে থাকলে।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29257723 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29257723 2010-10-19 14:08:27
নিষ্পাপ দুটি শিশুর মৃত্যু, লজ্জিত আমি; আপনারা?
"স্যার, রাস্তা ভরা জাম।আইতেন কেমনে টাইম কইর‌্যা?"

আলমগীর আলী কালামের কথায় কান দেয়না।সে আবার হাই তুলে মনে মনে গালি দেয় নিজের ভাগ্যকে।সদরঘাটে টার্মিনালে তার ময়ুর-১ এবং ময়ুর-২ নামে দুটি লঞ্ছ চলে যার একটি গতকাল দুই শিশুকে চাপা দেয়।দুটি শিশুই মারা যায়, আর তাই আজ আলমগীর আলী ক্ষতিপূরণ দিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বাড়ি নিজামবাগে যাত্রা করেছে।খুব বেশিদিন হয়নি তার লঞ্ছটি সে চালু করতে পেরেছে-হবে হয়তো বছর দুই।এর মধ্যেই বহুবার ঝামেলার শিকার হয়েছে আলমগীর আলী।

"ফকিরা, লঞ্চটা বেইচ্যা দিমু ভাবতেছি,এই ছোটলোকের ব্যবসায় আমার পোষায়না।"

ফকির আলী গাড়ির পিছনে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।মালিকের কথায় ধড়পড় করে জেগে উঠে মাথা নাড়ায় জোরে জোরে।বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে, "কথা হাচা।আপনের মত বিরাট মানুষ এইসব ফকিন্নীগো ব্যবসা কইরা টিক্যা থাকতে পারবেন না।"

"হুনলাম, ওসি নাকি আমার লগে দেহা করবার চাইছে।কত চায়?", আলমগীর আলী জিজ্ঞাসা করে।

"হেয় ২০ হাজার চাইতাছে।আপনে দশ হাজার হাতে ভইর‌্যা দিয়েন।" ফকির মুখ গোমড়া করে বলে যেন টাকাটা তারই যাচ্ছে।

এভাবে কথা চলতে চলতে একসময় তারা নিজামবাগের ওই ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে পৌছায়।টিনশেড বাড়ি, যার ভাঙ্গাচোরা গেটের বাহিরে নোংরা সাইনবোর্ডে লিখা আছে আনোয়ার হাজির বিতান। আলমগীর আলী গলায় কাশি দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে যায়।বাহিরে ভেতরে তখন বহু মানুষের ভীড়।যে শিশু দুটি মারা গেছে তাদের নাম নাসিমা ও আল আমিন।এর মধ্যে নাসিমার লাশ সে বাড়ির উঠোনে দেখতে পায়।তাকে দেখে গুটি কয়েক এলাকার মানুষ সালাম দেয়। কামরাংগীচরের ওসি হাত কচলিয়ে তার কাছে এসে বড় করে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে, "শরীরটা ভালো নাকি স্যারের?"

আলমগীর আলি চোখ থেকে চশমা খুলে পাঞ্জাবীর কোণা দিয়ে মুছে ওসির দিকে তাকায় বলে, "শরীর ভালো নাই, মনটাও ভালো নাই।মাসুম বাচ্চাগুলা এইভাবে মইর‌্যা গেলো, কলিযায় একটা বিরাট বাড়ি খাইছি।"

ওসি কামরুল আশেপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে।তারপর ফিসফিস করে বলে, "আল্লাহর মাল আল্লায় নিছে,তাড়াতাড়ি কিছু দান খয়রাত দিয়া সুরাহা কইর‌্যা এইখান থিকা চইল্যা যান।পাবলিক সেন্টিমেন্টের একটা ব্যাপার আছে কিন্তু।"

আলমগীর আলী মুখ বাকিয়ে মাথা নাড়ায়।লাশের পাশে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা অদ্ভুত ভাবে গোঙ্গাচ্ছে।সে বুঝতে পারে এইটাই সন্তানদের মা।একটু বৃদ্ধ করে একটা লোক মেঝেতে শুয়ে বুকে হাত দিয়ে আছে।কিছুক্ষণ পরপর কাশছে আর বলছে, "কি হয়্যা গেলো রে।"

ওসি মানুষজন সরিয়ে আলমগীর আলীকে এগিয়ে নিয়ে যায় লাশের কাছে।লাশ দেখিয়ে বলে, "এই মেয়েটার নাম ছিলো আর এই মহিলা হইলো এর মা।এর নাম মরিয়ম।আরেকটা ছেলে যে মারা গেছে তার লাশ হাসপাতাল থেকে আসতাছে খুব দ্রুত।"

ওসি মরিয়মের কাছে যেয়ে বলে, "মরিয়ম স্যার আসছে।একটু উনার সাথে কথা বলো।উনি লঞ্চের মালিকপক্ষের লোক।"

মরিয়ম আলমগীর আলীর দিকে তাকায়, তারপর আবার সন্তানের লাশের দিকে চেয়ে থাকে।১২ বছরের নাসিমা, তার আদরের বড়মেয়ে বিকৃত অবস্থায় তার পাশে বসে আছে।মা মরিয়ম তার মমতার হাত দিয়ে মৃত নাসিমার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।সে নিশ্চুপ নিষ্পলক।যে মা খনিকের মধ্যে দুই ছেলেমেয়েকে হারিয়ে ফেলে তার মুখে ভাষা থাকার কথাও নয়।

আলমগীর আলী মরিয়মের কাছে এগিয়ে এসে বলে "আম্মাজী আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে আসছি।যে ডেরাইভার লঞ্চ চালাইতাছিলো তারে আমি নিজে জেলে ভইরা আসছি।আপনার সন্তানগোরে তো ফিরায় আনতে পারবোনা।পারমু শুধু আপনাগো পাশে একটু দাড়াইতে।আমি হাতজোড় কইর‌্যা ক্ষমা চাইতাছি, আপনে আমারে মাফ দেন।"

বৃদ্ধ আনিস মিয়া, সন্তানদের বাবা তার রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে স্ত্রী মরিয়মের পাশে বসে।মরিয়ম আর তার স্বামী আলমগীর আলীর কথায় তার দিকে খানিকটা চাহনী দেয়।আনিস মিয়াই বলে, "আমার পোলাটা ওর বুইজানরে দেখতে গ্রামে যাইতাছিলো।এই মাসুম পোলারে আল্লা কিলায় নিয়া গেলো।"এটুকু বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আনিস মিয়া।

আলমগীর আলী আনিস মিয়ার মাথায় হাত দিয়ে বলে, "বাইজান খোদায়ে পাকে যা লিখা রাখছে তা তো চেঞ্জ হইবোনা।আপনে আমি খালি হাত তুইল্যা উনার কাছে চাইবার পারি।এই মাসুম বাচ্চাগুলার জন্য জান্নাত ফরয।ওরায় আল্লার ঘরে খারাপ নাই, চিন্তা কইরেন্ন্যা।"

আনিস মিয়া কাদতে কাদতে হাত তুলে উপরে, "আল্লা আমার বাচ্চাগুলানরে দেইখো,আমার বাচ্চাগুলান দেইখো।"

আশেপাশের অনেক মানুষের চোখের কোণায় পানি জমে।একে একে অনেকে শান্তনা দিতে এগিয়ে আসে মরিয়ম আর আনিস মিয়ার দিকে।কিন্তু তাদের মুখে কোন ভাষা নেই আজ।

আলমগীর আলী সব মিটমাট করে যখন এক ঘন্টা পরে বাসা থেকে বের হচ্ছিলো, তখন ওসি কামরুল সাহেব আবার হাত কচলিয়ে কচলিয়ে তার কাছে আসে।

"স্যার ফকিন্নীর পোলা মাইয়া, তাই পার পায়া গেলেন।আপনার লঞ্চটাও বাচলো।মামলা খাইলেন না আর কি।"

আলমগীর আলী বিজ্ঞের মত মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তার পেট্রল নিশান গাড়ির সামনের সীটের দরজা খুলে বসতে যায়। ওসি তার পেছনের এক কনস্টেবলকে ডেকে নিয়ে এসে আলমগীর আলীর সামনে দাড় করিয়ে বলে, "এর হাতে কিছু দিয়া দিয়েন।আপনাদের জন্য এত কিছু করি, আপনারা যদি একটু না দেখেন তাইলে কেমনে চলবো বলেন?"

আলমগীর আলী ফকিরের দিকে আড়চোখে তাকায়। ফকির একটা খয়েরি মোটা খাম বের করে চোখ নিচে নামিয়ে কনস্টেবলের হাতে গুজে দেয়।ওসি কামরুল হাসিমুখে বলে, "স্যার ভালো থাকবেন।ফকিন্নীর পোলা-মাইয়া ঘন্টায় ঘন্টায় পয়দা হয়।ওগো নিয়া মন খারাপ কইরেন না।"

আলমগীর আলী দাত বের করে কামরুল ওসির দিকে তাকিয়ে বলে, "কথা সত্য বলছেন ওসি।আপনেও কি কোন ফকিন্নীর পোলা ছিলেন?নাইলে আপনাগো মত আমাগো রস খাওয়ার লোক এত পয়দা হইলো কুথা থিকা।"

কামরুল ওসি তার হলুদ দাত বের করে বলে, "সালাম স্যার ভালো থাইকেন।"

আলমগীর আলী ওয়ালিকুম বলে গাড়ীতে উঠে বসে দ্রুত কামারাঙ্গীচরের সেই সব হারানো পরিবারের আবাসস্থল থেকে দূরে চলে যায়।

মরিয়ম তখনো নাসিমার লাশ নিয়ে বসে আছে।সারাটি দুপুর, বিকাল অনেক কেদে তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে।আনিস মিয়ার বুক ধড়পড় করে, তবুও সে হাক ডেকে কাদে।একটু পর তার ছেলে, নয় বছরের আল আমিনের লাশ বাড়ির উঠোনে নাসিমার পাশে আশ্রয় নেয়।মরিয়ম একবার আমিনের লাশ আরেকবার নাসিমার লাশের দিকে তাকায়।তার আরেক মেয়ে হাসিনা তখন তার কাধে মাথা দিয়ে কাদে।বড় ছেলে মনির বাবার পাশে বসে আছে মাথা নিচু করে।তার গায়ে ছেড়া নীল জামা, তার ভাইটিও একই রকম একটা নীল জামা পড়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলো।তাদের একমাত্র ও আদরের ফুফু মিনা যাকে তারা বুইজান বলে তাকে দেখার জন্য।বুইজানের অনেক অসুখ।ঈদের দিনেও সে ঘর থেকে বের হতে পারেনি।কিন্তু আজ সেও মনিরদের বাসায় বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে।

মাগরেবের নামাজের পর মরিয়ম আবার জোরে জোরে কাদতে থাকে।মিনা মরিয়মকে জড়ায় ধরে সান্তনা দিতে যায়, কিন্তু নিজেই কেদে আকাশ বাতাস ভারী করে।সে আনিস মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, "ও ভাইজান আমার আমিন আর নাছিমার এইডা কি হইলো।ঈদের আগের দিন আমারে ফোন কইরা কইছিলো, বুইজান ঈদের খাবার রাইখ্যা দিয়ো।আমি তোমার শেমাই খামু পরের হপ্তাহর রবিবার আয়া।আমি এই শরীল লয়া ওগো লিগা রান্না কইরা রাখছিলাম রে ভাইজান।আমার পোলাডা খাইবার পারলোনারে।"

আনিস মিয়া কিছু বলে না।তার চোখ আকাশের দিকে, সে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন খোজার চেষ্টা করে।

মরিয়ম, আনিস মিয়ার পরিবার আলমগীর আলীর কাছে থেকে হাজার বিশেক টাকা পায়।পার পিছ সন্তানের জন্য ১০ হাজার করে।এর বিনিময়ে তারা ময়ুর-২ লঞ্চের নামে কেস করবেনা বলে চুক্তি হয়।আরেকটি লঞ্চ কোকো-১ তার থেকে আরো কিছু টাকা কম দিয়ে একই রকম চুক্তি করে।তাদের লঞ্চের কোন ভুল হয়নাই এ কারণেই তারা কিছু অর্থ কম দিয়েছিলো বলে জানা যায়।প্রশ্ন হলো, নাসিমা আর আমিনের মত শিশুদের মূল্য পার পিছ দশ হাজার আপনার কাছে কতটা যুক্তিযুক্ত?

হয়তো দুদিন পর গভীর রাতে মরিয়ম আবার চিৎকার করে কাদবে।হয়তো বিলাপ করে বলবে, "আমার পোলাডার দাম দশ হাজার টাকা?এই টাকা নিয়্যা আমার পোলারে কেউ দিয়া যাইবোগো?"

হয়তো বৃদ্ধ আনিস মিয়া সেই হাজার বিশ টাকা দিয়ে কেনা ভাতের হাড়িতে চোখ দিয়ে বলবে, "এই ভাত খামুনা।"

নাকি দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত মরিয়ম আর আনিস মিয়া সব ভুলে আবার আগের সেই ক্ষয়ে যাওয়ার জীবনের পুনরাবৃত্তির পথে এগিয়ে যাবে?



নাসিমা আর আমিনের দিকে তাকিয়ে দেখবেন কি একবার।আমি সেই নিষ্পাপ শিশুগুলোর মায়াভরা চোখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু দেখতে পাই।নাসিমার চোখে আমি অসম্ভব স্বপ্ন লালন করা একটি ছোট্ট শিশুকে দেখতে পাই।আল আমিনের চোখের দিকে তাকিয়ে আমি দেখতে পাই একটি দুরন্ত, খানিকটা দুষ্ট বালককে যার মাঝে আছে পড়াশোনা করতে না পারার দুঃখ, দেখতে পাই এই নয় বছর বয়সেই জুতার কারখানায় দিনভর পরিশ্রম করার ক্লান্তির গল্প।

তবে দুজনের চোখের মাঝেই একটা সাধারণ অনুভূতি আমি খেয়াল করি।কিসের যেন অভিমান! যে অভিমান অফিসে ইজি চেয়ারে বসা প্রফেশনাল আমার চোখে একফোটা পানি জমা করে।
আমি ভাবতে চেষ্টা করি যে সময় ময়ুর – ২ নামক লঞ্চটি এই মাসুম শিশুগুলাকে ধাক্কা দিয়েছিলো তখন তারা কি ভাবছিলো?আর আমি লজ্জা পাই, যখন মনে হয় এই শিশুগুলোর মত আরো শিশুগুলোর জন্য আমার কিছু করার নাই।
********************************************************************
আমার আজকের লিখায় অধিকাংশ নাম এবং পুরো ঘটনার সবটুকু সত্য(ঘটনাটি আজকের দৈনিক পত্রিকা থেকে জেনেছি)।কিছু কাল্পনিক তথ্য শুধু লিখার খাতিরে প্রবেশ করাতে হয়েছে।আজকে আমার এই লজ্জা দিবসে আপনাদেরও একটু লজ্জা দেয়ার বাসনা হলো তাই আমার এই লেখা।যাই হোক, ঘটনা শেষ।আসুন আবার আমরা আস্তিক নাস্তিক, সামু আমু নিয়ে মাতামাতি শুরু করি।ভালো থাকুন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29242344 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29242344 2010-09-20 13:49:58
একজন আধুনিক ও গালিবিদ নারীর ছ্যাকা/প্রেম কাহিনী
আসলে আমি নিজেও মনে হয় একটু নির্লজ্জ হয়ে গেছি।প্রতিদিন ক্লাসে আসার পর থেকে বাসায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওর গালি খেতে খেতে আমি অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।ও যখন আমাকে গালাগালি শুরু করে আমি সুন্দর করে তা হজম করি এবং মাঝেসাঝে প্রতিবাদ করতে যেয়ে একটু মিউ ধ্বনি দেই-এই আর কী।তবে মেয়ের দিল একেবারে হুইল পাউডারের মত সাদা।ব্রেক টাইমে প্রায়ই সে আমাকে এইটা সেইটা খাওয়ায়।যদিও এইখানেও ঘটনা আছে।সে আমাকে যাহাই খাওয়ায়, বলে ওইটা তার নিজের হাতে বানানো।কিন্তু ওগুলা যে ওদের কাজের বুয়া বা বাসার পাশের খাবার দোকান থেকে কেনা এইটা আমি বাথরুম করতে যেয়ে ভালোই বুঝতে পারি।সমস্যা একটাই, মেয়েকে আমি বেশ ডর খাই।তবুও কিভাবে যেন আমরা বেশ ভালো বন্ধু।

পাঠকেরা, সারা জীবন হয়তো শুনে আসছেন লেকচার ক্লাসে মেয়েরা সবচেয়ে মনযোগী হয়।স্যারের লেকচার সুন্দর করে খাতায় তোলার জন্য মেয়েদের কোন বিকল্প নেই।কিন্তু মিথিলার কেসটা একটু ডিফারেন্ট।সে আমারে দিয়ে লেকচার লেখায় নেয় আর নিজে ঘুমায়।

আজকে শ্রাবণ বারিধারা মাথায় করে ক্লাসে এসে এমন ঘুম পেলো যে আমি লেকচার তোলার কথা ভুলে ক্লাসের পিছনে যেয়ে নাক ডাকা শুরু করলাম।লেকচার শেষ, ঘুমও শেষ।মিথিলা আমারে এসে বলে, “দেতো তোর খাতাটা।কি অগামগা লিখছিস দেখি”"।

আমি অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে বললাম, “মিথিলা দোস্ত আজকে তো কিছু তুলিনাই।ঘুম থেকে উঠছি মাত্র"”।

মিথিলা আমার দিকে নরম সরম দৃষ্টি দিয়ে বললো “লোভী কুকুর, তুই আরেকবার আমার সামনে আসিস।তোর এত ঘুম পাইলে আগে জানাস নাই কেন?আমি নিজেই আজকে লেকচারটা তুলতাম”"।

আমি ওকে মিউ মিউ করে বললাম, “গালি দিসনা।ক্ষিদা লাগছে, কিছু আনছিস বাসা থেকে বানায়?”
মিথিলা বিরক্ত হয়ে আমার সামনে থেকে দূরে সরে গেলো এবং একটু পর খাবার নিয়ে এসে বললো, “নে খা! খা!”

আমি আরাম করে খাবার খেয়ে থ্যাঙ্কস জানিয়ে ওর কুশলাদি জানতে চাইলাম।কালকে নাকি সে আবার গিফট পেয়েছে।এবার ওকে একটা ছোট্ট টেডি বিয়ার পাঠিয়েছে।আমি তো হাসতে হাসতে মারা।ওকে বললাম, “তুই এই বুইড়া বয়সে টেডি দিয়ে কি করবি?আমাকে দিয়া দে।আমি আমার ছোট্ট কাজিনরে দিয়া দিবো”"।

মিথিলা ভেংচি দিয়ে বললো, “যাহ! কি সুন্দর টেডি দিছেরে।আমার খুব পছন্দ হয়েছে।যাই বলিস না কেন ছেলে আমার পছন্দ বুঝে”"।
আমি বিচকা হাসি দিয়ে বললাম, “চল কোন ছেলে এটা বের করি।তারপর ধইরা তোর সাথে বিয়ে করায় দেই”।
মিথিলা লাজুক হয়ে বললো, “দেখনা আমার প্রাণসখাকে একটু খুজে পাস কিনা”"।

এমন সময় রিয়াদ ক্লাসে ঢুকে মিথিলা আর আমার কাছে এসে বললো, “দোস্তরা চাঙ্কু খবর আছে।আমার তো ফিট হয়া গেছে”"।
মিথিলা ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, “ওই মেয়ে তোরে পছন্দ করলো?তোর মত ছেলের কি আছে?”
রিয়াদ ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললো, “ওই ইনসাল্ট করবিনা।আমি টাইগার খাই, আমি স্মার্ট"”।

এরপর তিনজনে মিলে হাসাহাসি হই হুল্লোড় করে কাহিনী বের করলাম।ঘটনা খুব সাধারণ।রিয়াদ বহুদিন ধরে এক মেয়েকে পছন্দ করে।মেয়ে ওদের পাশের বিল্ডিং এ থাকে।প্রায়ই রিয়াদ জানালা দিয়ে উকিঝুকি মেরে মেয়ের কোমল মুখদর্শন করার ব্যর্থ চেষ্টা নেয় কিন্তু বদলে মেয়ে তার জানালার পর্দা টেনে দেয়।মাঝে মাঝে লুইচ্চা, হারামজাদা, ছ্যাচ্চোর বলে প্রশংসা বাণীও শুনতে পায়।কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে মেয়ে ওকে খুব কড়া কথা বলে।ও যখন উকি ঝুকি মারছিলো, তখন মেয়ে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে চিক্কুর দিয়ে বলে “এই পিচকি তোমার লাজ শরম নাই।আরেকবার জানালা দিয়ে উকি দিলে বাসায় এসে থাবড় দিয়ে যাবো”"।

এই ঝাড়ি খেয়ে রিয়াদ তো পুরা ক্যারা খায়া বিছানায় পড়ে গেলো।সে এক বছর ধরে মেয়ের পিছনে ঘুরাঘুরি করে, মেয়ে বাসা থেকে বের হলেই তাকে দূর থেকে ফলো করে, মেয়ে ছাদে উঠলে সেও ছাদে উঠে। ছাদে উঠা নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে।কোন একদিন সে ভর দুপুরে ছাদে উঠছিলো দেখে আন্টি তাকে দরজার কাছে ধরে জিজ্ঞেস করে, “বাবা কই যাও”"।
রিয়াদ এইভাবে ধরা খাবে তা তো বুঝেনাই।সে মাথা চুলকায় বলে “আম্মা ছাদে যাই”।

মায়েদের একটা মজার ব্যাপার আছে।তারা কি করে যেন ছেলে মেয়ের চোখের দিকে তাকালেই সব বুঝে ফেলে।আন্টি, রিয়াদের বিশিষ্ট মাতা এর ব্যতিক্রম না।সে বললো, “এই ভরদুপুরে ছাদে যেয়ে কি করবা আব্বাজী”"।

রিয়াদ এমনিতে ওর মাকে প্রচন্ড ভয় পায়।সেদিন ওর আম্মা যেভাবে ইনভেস্টিগেশন শুরু করলো তাতে সে আরো ভয় পেয়ে কি উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারছিলোনা।সে তবুও কোনরকমে থতমত খেয়ে বললো, “আম্মা ছাদে চুল শুকাইতে যাই"”।

এমন হাস্যকর উত্তর শুনে ওর আম্মা কি করছিলো সেইটা আমাদের রিয়াদ বলেনাই।তবে আমরা সবাই জানি ঝাড়ু দিয়ে কুংফু খেলায় কসম খোদার, কেউ রিয়াদের আম্মাকে হারাতে পারেনা।

যাই হোক মূল গল্পে ফিরে আসি।রিয়াদ তো মেয়ের কঠিন ঝাড়ি খেয়ে চ্যাগা হয়ে বিছানায় পড়ছে।ওর আব্বা আম্মা তো কিছুই বুঝেনা।জানি শুধু আমরা ওর বন্ধুরা।পুরো চারদিন সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমার মরণ হয়না কেন বলে চিৎকার করতে থাকলো আর আমরা ওকে শান্তনা দেই, "বাস ট্রেন বারবার আসে, এদের পিছনে ছুটতে নেই"।

রিয়াদ শুধু বলে, "কিন্তু এমন এসি বাস আর লাক্সারী ট্রেন একবারই আসে গর্দ্ধভেরা"।

চার দিন কেটে যাওয়ার পর রিয়াদ যখন একটু নিজেকে সামলে নিলো, তখন তার লুইচ্চামী রোগ পুনরায় জেগে উঠে তাকে জানালার কাছে টেনে নিয়ে গেলো।সে উকি দিলো চোখ পিট পিটিয়ে, ভয়ে ভয়ে।উকি দিয়ে যা দেখলো তাতে তার আত্না খাচা ছাড়া হয়ে গেলো প্রায়।দেখে মেয়ে যুদ্ধংদেহী ভঙ্গী করে জানালায় দাঁড়িয়ে আছে।ওকে দেখে অবশ্য মেয়ে চুপ করে তাকিয়ে ছিলো।তারপর রিয়াদের থেকে যা শুনলাম তাতে মেজাজটা পুরা বিলা হয়ে গেলো।ভাবছিলাম সে আরো কিছু গালি খাবে, আমরাও একটু হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবো। কিন্তু রিয়াদ বললো যে মেয়ে নাকি ওকে দেখে বড়ই প্রেম শীতল কন্ঠে বলছে, "এই তুমি আর উকি দাওনা কেন, আমাকে কি মেরে ফেলবা?তোমার ফোন নাম্বারটা দাও তো দেখি!"

এইভাবেই আমাদের রিয়াদের অধঃপতন শুরু হলো।আমরা ওর প্রেম দেখি আর বলি, মারহাবা মারহাবা!

এইবার মিথিলার কাহিনী শুরু।আগে আপনাদের যা বলেছি তাতে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন সে কঠিন একটা চীজ।কিন্তু সমস্যা হলো মেয়ে তো, তাই প্রেম প্রীতির মত ব্যাপারগুলো কোন না কোন ভাবে মিথিলাকে হিট করবে আগেই জানা ছিলো।তাই রিয়াদের ঘটনার দু সপ্তাহ পরে যখন মিথিলা আমার কাছে এসে বললো যে সে প্রেম করছে, আমি খুব একটা অবাক হলাম না।কিন্তু ঘটনা হলো, কার সাথে।ও নিজেই বললো, ডিপার্টমেন্টের দুই বছর সিনিয়র মিশু ভাইয়ের সাথে।কিভাবে? সে জানালো, বাংলালিঙ্ক আছে না?

ঘটনা হলো, এই ছেলের প্রতি তার বহু আগে থেকেই কিছুটা দুর্বলতা ছিলো।সে আমাকে বন্ধুত্বের প্রথম দিকেই বলেছিলো যে ছেলেটিকে নাকি তার সাদা তেলাপোকার মত লাগে। আর মেয়েরা যখন কাউকে নিয়ে এমন কিছু বলে তখন বুঝে নিতে হয় ঘটনা খারাপ।১৪৩(আলাভু) এর ব্যাপার আছে।রিয়াদ একদিন মিশু ভাইয়ের সাথে ওর পরিচয় করায় দেয়।মিশু ভাই আর রিয়াদ আবার একই স্কুল কলেজের ছিলো, এই হিসেবে বেশ খাতির।আমি, মিথিলা আর রিয়াদ তিনজন মিশু ভাইয়ের কাছে প্রায়ই এই সেই নোটের জন্য যেতাম।মিথিলা অবশ্য কখনো লজ্জায় মিশু ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারতোনা।তবে এটা আমার কখনো মনে হয়নাই যে মিশু ভাইয়ের সাথে ওর সিরিয়াসলি এফেয়ার হয়ে যাবে।মিশু ভাই ওকে নাকি প্রপোজ করছে তিনদিন আগে।মিথিলা তাকে দুদিন ঝুলায় গতকাল হ্যা বলে দিছে।

আমি আর রিয়াদ বড়ই মর্মাহত হলাম।এত কিছু হয়ে গেলো, আমাদের সে কিছুই জানালোনা।তবে মুখে কিছু বললাম না।ও ওর প্রেম কাহিনী আমাদের বর্ণনা করে আমাদেরকে শেষমেষ জানালো, "দোস্তরা আজকে আমার প্রথম ডেট।তোরা একটু দোয়া রাখিস"।

আমি আর রিয়াদ একসাথে বললাম, "আগে কিছু খাওয়া"।

মিথিলা সাথে সাথে তার ব্যাগ থেকে টিফিন ক্যারিয়ার বের করে আমাদের দিকে এগিয়ে বললো, "হে হে! আমি জানি তোরা কোন জাতের ছুচো বিলাই"।

মিথিলা আর মিশু ভাই আজকে তাদের প্রথম ডেটিং করতে যাচ্ছে ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্র সরোবরে।আমি আর রিয়াদ আজকে তাই একসাথেই বাসায় ফিরছিলাম।রিয়াদ আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "দেখলি কিভাবে দুইটা সেট হয়া গেলো"।

আমি হাসিমুখে বললাম "হ্যা।মিশু ভাইয়ের মত স্মার্ট, ভালো ছাত্রের সাথে সেট হবেনা তো কার সাথে হবে"।

রিয়াদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, "তাই তো, তাই তো!কিন্তু একদিক দিয়ে তোর ভালো হলো।মিথিলাকে আর গিফট পাঠাইতে হবেনা লুকায় লুকায়।বিগ মানি সেভ হবে"

আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম "ঠিক!"

রিয়াদ মাথা চুলকাতে চুলকাতে শুধু বললো, সরি দোস্ত।


এরপর দুই সপ্তাহ কেটে যায়।মিথিলা আর মিশু ভাই বেশ ভালোই প্রেম করছে বলে মনে হলো।আমি নিজের মত করে ক্লাস,লেকচার সবই চালিয়ে গেলাম।সমস্যা হলো, যখন রাতে ঘুমাতে যাই।বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা প্রায় দুসপ্তাহ থেকে ঘুমাতে পারিনি।মনে হয় কি যেন নেই।ক্লাসে যখন মিথিলা কথা বলতে আসে আমি ওর সাথে আগের মতই স্বাভাবিক।শুধু আজকে কেন যেন মিথিলা দুপুরের ক্লাস ব্রেকে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, "কি হয়েছে তোর।চোখের নিচে তো কালি ফেলে দিছিস"।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, "কলম কিনার টাকা নাই।এই কালি দিয়েই লিখালিখি করি"।

মিথিলা আমার দিকে আবার হাসিমুখে বললো, "আজকে মিশুর সাথে কড়াই গোশতে ইফতারী করবো।হে হে।ওইখানে হালিম খুব ভালো বানায়"।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললাম, "রমজান মাসে এত খাই খাই করিস কেন"?
মিথিলা তার গা জ্বলানো হাসি দিয়ে বললো, "প্রেমে পড়েছি আমি প্রেমে পড়েছি, তাই দিনরাত শুধু খেয়েই চলেছি"।

আমি কিছু না বলে হাতের থেরাজার ইলেকট্রিক্যাল মেশিন বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।মিথিলা নিজে থেকে আবার আমাকে বললো, "কিন্তু একটা সমস্যা হইছে বুঝছিস"।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কি?"

"আমার কাছে আর গিফট আসেনা বুঝলি।আমার আগের গিফট প্রায় অনেকগুলা মিশুকে প্যাকেট করে রি-গিফট করে দিছি।এখন খুব বেশি আর বাকি নাই বুঝলি।পয়সা দিয়ে আবার গিফট কিনবো, এটা ভাবতেই বুঝছিস অনেক কষ্ট হচ্ছে।আমি বুঝতে পারছিনা ছেলে কি করে বুঝলো আমি আরেকজনের সাথে প্রেম করি?" মিথিলা প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকায়।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, "হুম!"

মিথিলা তারপর আমার দিকে চালাক চালাক দৃষ্টিতে বললো, "আমি অবশ্য খুজে বের করছি যে ওই গাধাটা তুই ছাড়া আর কেউ না"।

প্রিয় পাঠকেরা একবার চিন্তা করুন, এহেন কথা শুনে আমার অনুভূতি কি হতে পারে। লজ্জা নাকি দুঃখ, ভয় নাকি হতাশা?

সকল অনুভূতির সংমিশ্রণ নিয়ে আমি আমার পাগুলো সোজা করে দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিলাম।হ্যা আমার কাছে তখন এটাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা বলে মনে হলো।

মিথিলা আমার দিকে ভুরু নাচিয়ে আবার বললো, "দেখলি আমি কত বুদ্ধিমান?জেমসের বন্ড আমাকে পেলে সব লুইচ্চামী ভুলে প্রেম করতো বুঝলি"।

আমি চিড়িয়াখানার মন খারাপ গন্ডারের মত করে ওর দিকে তাকিয়ে কথা শুনছিলাম।

মিথিলা আমাকে কানে কানে বললো, "সত্যি কথা বলি, গিফট পাঠানোর লুইচ্চামী যে তুই ছাড়া আর কেউ করিসনা এইটা আমি অনেক আগে থেকেই জানি।কিন্তু আমি মিশু ছাড়া কাউরে চিনিনা, বুঝিওনা।সো আমাকে আবার গিফট পাঠায় হেল্প কর দোস্ত"।

রাগে তখন আমার গা জ্বলছে।ও এইভাবে কথা বলছে কি করে আমি বুঝতে পারলাম না।নিজেকে আমার একটা জোকস মনে হলো।আমি বুঝতেও পারছিলাম না। সে আমাকে অপমান করছে নাকি ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখছে।

আমি ওর দিকে জীবনে এই প্রথমবার রাগত ভঙ্গীতে তাকিয়ে বললাম, "যা ভাগ!"

ইফতারীর আগ দিয়ে রিয়াদ আমার বাসায় এলো।আমার দিকে তাকিয়ে তার সে কি হাসি।বুঝলাম মিথিলা আমার আজকের কাহিনী সব তাকে বলে দিয়েছে।আমি ওকে লাথি দিয়ে বললাম, "তোর আর তোর মিশু ভাইয়ের আমি গুস্টি কিলাই।আমার মিথিলারে নিয়ে তোরা গেম খেলিস।সময় আসুক একবার"।

রিয়াদের হাসি তো থামেনা।হাসতে হাসতেই বলে, দোস্ত তুই এমন একটা ছ্যাকা খাইলি।যায়া দেখ মিশু ভাইরে এখন মিথিলা যায়া তোর গল্প রসিয়ে রসিয়ে বলতেছে।আর তুই এমন ছাগলের মত বাসায় বসে আছিস কেন?ও প্রেম করে ফুর্তি করতেছে আর তুই এমন দেবদাস হয়ে মশা মারতেছোস।চল নিচে চল, একটু হেটে আসি"।

আমি মন খারাপ করে রিয়াদের সাথে হাটতে হাটতে গলির মাথায় এলাম।ওকে বললাম, "কি করে কি হয়ে গেলো বুঝছিস।মেয়ে এমন হুটহাট প্রেম করলো, কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না"।

রিয়াদ মুচকি হাসি দিয়ে বলে, "আরে আবাল, এইটা ২০১০।তোমার মত মজনু সেজে লাইলীর জন্য কেউ গোপনে উপহার পাঠায় প্রেম আশা করেনা।আমার মত মরদ হ"।

আমি বিরক্ত হয়ে খেকিয়ে বললাম, "কে যেন তোরে বাসায় এসে থাবড় দিবে বলছিলো"।

রিয়াদ বললো, "চুপ কর শালা।যে বলছিলো সে এখন আমার সতিসাধী বউ।আর তুই ছ্যাকা খাওয়া কলু মিয়া।বেশি কথা না বইল্যা চল মেন রোডের কফি শপে যাই।আজকে একসাথে ইফতারী করি চল"।

আমি আর কিছু না বলে ওর পিছ পিছ গেলাম।কফি শপের ভিতরে ঢুকে সে আমাকে বললো, "দোস্ত একটু দাড়া, আমি বাহির থেকে একটা কল করে আসি"।

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, "ইফতারীর আগেও বউ ছাড়া কিছু বোঝোনা"।

কফি শপের ইফতারী আমার খুব প্রিয়।প্রতি রোজাতেই আমি কফি শপে ইফতারী করি।খুব একটা ভীড় হয়না, ছিমছাম পরিবেশ।আর সব মামুগুলার সাথে বেশ ভালো খাতির আমার।সেদিন কফি শপে ঢুকে দেখি, মিথিলা বসে আছে মুখ কালো করে।বুঝলাম রিয়াদ ছাগলা মিথিলার সাথে মিলে নাটক সাজিয়েছে।

আমি মিথিলার কাছে যেয়ে বললাম, "তোর মিশু কই?"

ও আমাকে অচেনা হাসি দিয়ে বললো, "মিশু তো নাই।আজকে তোর সাথেই না হয় ইফতারী করি।"

আমি লক্ষী ছেলের মত ওর বিপরীতে বসে গেলাম।মিথিলা আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকলো।কখনো সে আমার দিকে এভাবে তাকায়নি।আমি লজ্জায় লাল্লু হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম "ঘটনা কি?"

মিথিলা তার রহস্যময়ী হাসি দিয়ে বললো, "ঘটনা হলো তুই একটা ছাগল।কিন্তু আমি তো ছাগল না, তাই না?তুমি যে আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছো তা আগেই বুঝছি।গিফটের গায়ে যখন লিখালিখি করিস, তখন একবার মনে হয়নাই যে তুই গাধার থেকেই আমি ক্লাসের লেকচার তুলি?"

আমি ক্যাবলাকান্তের মত ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।কিছুই মুখে আসছিলোনা।অবাক হচ্ছিলাম মেয়ে আমার সাথে এত স্বাভাবিকভাবে কি করে কথা বলে।

ওই আবার আমাকে বললো, "সাহসী হ বুঝলি,সাহসী হ! আমি আসলে তোকে বেল দিতাম না, কিন্তু পরে মনে হইলো এখনকার মডার্ণ যুগে সবই দুষ্টু ছেলের দল।তাই তোর মত ভ্যাবলা একটা ঝুলায় রাখাই ভালো।ভবিষ্যৎ নিরাপদ।"

আমি মূলা খাওয়া হাসি দিয়ে বললাম, "মাশাল্লাহ তোর কমন সেন্স ভালো।কিন্তু আমি এত ভ্যাবলা না তুই যতটা ভাবিস।"

মিথিলা বললো, "আমাকে ছেড়ে আর কারো সাথে টাংকিবাজী করবা নাকি?"

আমি এবার বেশ সিরিয়াসলি বললাম, "পাশের বাড়ির সুন্দরী তন্বীর কসম, আমি একজন ভালো প্রেমিক হয়ে আজীবন থাকবো"

পাঠক যে উৎকৃষ্ট গালি আমি এরপর খেয়েছি তা নাহয় উহ্য রাখি।

ইফতারী শেষে মিথিলাকে যখন বাসায় নামিয়ে আসছিলাম, তখন ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিলো।ছাতাহীন মোরা দুই এখনো না হওয়া প্রেমিক প্রেমিকা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলাম।আমি উঁকি মেরে বারবার মিথিলার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।বৃষ্টির পানিতে আমার সাড়ে তিন বছর ধরে ভালোবাসা মাখা মেয়েটি কেমন যেন আরো পবিত্র হয়ে উঠেছে।আমি শুনতে পেলাম ও আমাকে বললো, "হাতটা ধরো"।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29228879 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29228879 2010-08-24 14:48:24
সুস্মিতারা বার বার হারিয়ে যায়...
আমি যখন রাতের ঢাকার অন্ধকার ছেদ করে সুস্মিতার কাছে পৌছুলাম তখন ও নিথর হয়ে বিছানায় পড়ে আছে।ওর বাবা মা হতভম্ব হয়ে ওর পুড়ে যাওয়া শরীরের দিকে তাকিয়ে।আন্টি কিছুক্ষণ পর পর বোবা কান্নায় আঙ্কেলের পাঞ্জাবী ধরে টান দিচ্ছে আর বলছে, "এটা কি হলো!এটা কি করে হলো।আমার মেয়ে কি দোষ করছিলো।আমার একমাত্র জানের টুকরা মেয়ের সাথে কে এমন করলো।আমার ছোট্ট মেয়েটা,আমার পরানটা শেষ করে দিলোরে"।

আশেপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিলো সবার চোখে পানি।আঙ্কেল কিছুক্ষণ পর কেমন যেন একটা গোঙ্গানীর আওয়াজ তুলছে।

আর আমি! নির্বাক, অসহায়,কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি সুস্মিতার কেবিনের দরজার পাশে।ছোট্ট কাচে ঢাকা জানালা গলে ওর মায়াময় ভালোবাসার মুখটি দেখতে পাচ্ছি।কে যেন বলেছিলো, ওর মুখের এক পাশে নাকি এসিডের ছোয়া লেগে সম্পূর্ণটা জ্বলে গেছে।আমি কেন যেন তবুও ওর ওই মুখটি বারবার দেখতে পাচ্ছি যে মুখটিকে ভালোবেসেছিলাম এক সময়, প্রতিটি ক্লাসের শেষে যার বেঞ্চের পাশে কোন না কোন বাহানায় ঘুরঘুর করতাম।রাতে ঘুমের ঘোরে ফিসফিস করে সুস্মিতার সাথে কত পাচালীগাথা গেথেছি তার কি কেউ হিসাব রেখেছে?
শেষ যেদিন দেখা হলো সেটি ছিলো আমাদের সমাবর্তন।আমি নীল রঙের পাতলা ফিনফিনে একটা পাঞ্জাবী আর ভারী হৃদয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সুস্মিতাকে কিছু বলার জন্য উপস্থিত হয়েছি।সুস্মিতা আমাকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলো কি, আমার মনে পড়েনা।শুধু মনে পড়ে ওর হলদে ছটায় মাখানো সূর্য রঙ্গা শাড়ির কথা, ওর চোখজোড়া একবারো আমায় বিদ্ধ করেনি।আমি জানিনা এত ভালোবেসেও কেন সুস্মিতা কখনো তা একটুখানি একবারের জন্যও বুঝতে পারেনি।এবার শুনুন আমার বীরত্বগাথার গল্প।

আমি সুস্মিতার জন্য ছোট্ট একটি চিঠি লিখেছিলাম।ভেবেছিলাম চিঠিটা ওর হাতে পৌছিয়ে দেবো ঠিক শেষ দেখার দিনে।আমার ভালোবাসার প্রতিটি বিন্দুকণা দিয়ে ওর ছোট্ট হৃদয়ে আঘাত করবো।যদি সে আমাকে অবজ্ঞা করে, একটুখানিও প্রত্যাখান করে আমি আর কখনো ওর সামনে আসবোনা।হ্যা, আমি চিঠিটা ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম।কিন্তু কি আশ্চর্য ওকে যখন বললাম, "আমার তোমাকে কিছু বলার ছিলো,একবার চিঠিটা পড়বে?" ও কেমন যেন একটা অবজ্ঞার হাসি দিলো।আমাকে বললো, "আমি জানতাম তুমি এমন কিছু করবা"।

এরপরই আমার লজ্জাগাথা, একটা হৃদয়ের শোণিত হওয়ার গল্প, একটি ভালোবাসার মৃত্যুর ঘটনা।আমি ওকে চিঠি দেয়ার সাথে সাথে দেখলাম সে তার বান্ধবীদের ডেকে চিঠিটা আবৃত্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।নাহ! আমি কষ্ট পাইনি,আমি একটুও ঘাবড়াইনি।শুধু মনে হয় একটু রেগে গিয়েছিলাম,মনের ভেতরে যেখানে ভালোবাসা জমে ছিলো ঠিক ওখানটায়।আমি চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর ভাবছিলাম ও আর কি কি করে।আমি এখনও চিঠিটা মনে রেখেছি।কেননা ওটা সুস্মিতার হাতে দেবার আগে নিজে শত কোটিবার পাঠ করেছি, নিজের মাঝে গেথে নিয়েছি।ওকে লিখেছিলাম,

"মা যখন অনেক ছোট্টকালে মারা যায়, তখন আমি বেশ কিছুদিন সুস্থ ছিলাম না।এরপর বহু অনাদর, অযত্ন আর অবহেলায় আমি ভুলে গিয়েছিলাম নিজের সত্তা।আবার হয়তো খুব তাড়াতাড়ি অনেক বড় হয়ে গিয়েছিলাম।সমস্যা ছিলো প্রতিরাতে আমি মাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম।আমার মা মারা যাওয়ার আগে যে প্রচন্ড কষ্ট আর যন্ত্রণার শিকার হয়েছে তা আমি ভুলতে পারিনি।সুস্মিতা তুমি জানো কিনা জানিনা, যেদিন তোমাকে আমি প্রথম দেখি সেদিন থেকে ওই ভয়ংকর দুঃস্বপ্নগুলো আমার থেকে অনেক দূরে হারিয়ে যায়।তুমি মালিবাগের জোয়ার্দার লেনের যে ৭ তলা বাড়িতে থাকো তার থেকে অন্তত দু কিলোমিটার দূর থেকে আমি তোমার গায়ের ঘ্রাণ পাই।মাফ করো, কিন্তু আমি গত চার বছর ধরে প্রতিদিন তোমার বাসার সামনে যাই।তোমাকে আমি কোন প্রেম নিবেদন করতে চাইনা।শুধু বলতে চাই, আমার তোমায় দেখে এত আপন লাগে কেন? অনুগ্রহ পূর্বক ভেবোনা আমার কিছু চাওয়ার আছে।এত ভালোবাসলাম একজনকে এতগুলো বছর ধরে, শুধু চেয়েছি একবার তাকে জানাতে।ভালো থেকো"।

সুস্মিতা আমার চিঠির খানিকটা আবৃত্তি করে হঠাৎ করে কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে ওঠে।ওর বান্ধবীদের থেকে দূরে সরে যেয়ে চিঠির বাকি অংশ পড়ে আমার দিকে মনে হলো যেন করুণার দৃষ্টিতে তাকালো।তাই হয়তো এবার আমি প্রথমবারের মত অনেকখানি লজ্জা পেলাম, যেই লজ্জায় আজকের আগ পর্যন্ত আমি ওর আশে পাশে আর কখনো আসিনি।মাঝে জেনেছিলাম ওর বিয়ে হয়েছে এক অতি সুপুরুষ দেশের প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সবদিকে অনন্য এক পাত্রের সাথে। আমি কি সেদিন অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম, ঠিক মনে নেই।৮টা – ৫টা চাকরী করা এক ভগ্ন হৃদয় পুরুষের আর কতইবা কষ্ট হয় বলুনতো?বসন্ত সমীরণ যখন জানালার খিল ভেঙ্গে রাতের নীরবতা ছেদ করে আমাকে জাগিয়ে তুললো, আমি শুধু বলেছিলাম "সুস্মিতা ভালো থেকো"।

হাসপাতালে হঠাৎ করে মিলিকে দেখতে পেলাম যে ছিলো সুস্মিতার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী।আমি ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি করে হলো?
ও আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো, "তুমি কোথা থেকে?তোমাকে সুস্মিতা কত খুজেছিলো জানো?"
আমি ওর কথা শুনতে পাচ্ছিলামনা।আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, "ওর মুখে কে এসিড মেরেছে?"
মিলি খুব জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, "ওর জামাইটা না একটু মাথা খারাপ ছিলো মনে হয়।ওকে কেমন যেন কখনো বিশ্বাস করেনি।সুস্মিতা কখনো জানো, ভালো ছিলোনা।আজকে দুপুরে ওদের মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া হয়, তখন ..."

আমার মাথাটা প্রচন্ড গরম হয়ে গেলো।আমি আর কিছু শুনতে বা ভাবতে পারার মত পরিস্থিতিতে ছিলাম না।ভো ভো আওয়াজ আমার কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে, তবুও আমি কি করে যেন দাঁড়িয়ে আছি।হঠাৎ করে মিলির একটা কান্নাভেজা কথা খুব কানে বাজলো, "জানো ও চার মাসের প্রেগনেন্ট।"

একথা শোনার পর হঠাৎ করে মনে হলো আশেপাশের সব শান্ত হয়ে গেলো।আমি শুধু কাঁদতে কাঁদতে মিলিকে জিজ্ঞেস করলাম, "মানুষ এত খারাপ কেন।"

দুদিন পর সুস্মিতা যখন ঘুম থেকে জেগে উঠলো, তখন ওর সামনে গিয়ে দাড়ানোর সাহস আমি করতে পারিনি।তবুও কি করে যেন ওর বিছানার কাছে চলে গিয়েছিলাম।ওর বাবা মা আর একমাত্র ছোট বোন তখন পাশে ছিলো।আমি এক কোণে ঘাপটি মেরে বসে আছি।সুস্মিতা খুব দুর্বল কন্ঠে ওর পরিবারের সাথে কি যেন বলছিলো।একটু পর ও নিজেই আমাকে দেখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো।আমার একবারও মনে হয়নি, ও আমাকে চিনতে পারছেনা।একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আমাকে ডাকলো, অর্ক।

আমি কাছে গেলে ও আমাকে তার আরও কাছে যেতে বলে।আমি তার মুখের কাছে কান এগিয়ে নিয়ে গেলে ও আমাকে বললো, "ওদিনের পর কোথায় ছিলে?অনেক খুজেছি তোমায় জানো।আজকে যখন জ্ঞান হলো তখনো।"

আমি ধরা গলায় বললাম , "আমি আছি,থাকবো।তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠো।"

চারমাস পার হয়ে যায়।এ সময় যা হয় তা সংক্ষেপে জানাই।সুস্মিতার স্বামী ও তার পশু পরিবার নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।আমাদের ফুলিশবাহিনী বহু চেষ্টা করেও তাদের হদিশ বার করতে অসমর্থ হয়।মজার ব্যাপার হলো সুস্মিতার এ ব্যাপারে কোন আগ্রহই ছিলোনা।আমি এ চারমাস যতটা সময় পেরেছি তার পাশে থেকেছি।ওদের বাসায় গেলে ওর ছোটবোন, বাবা মা আমাকে বেশ আদর করতেন।একসময় আমি সাহস করে বলি, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই ওর জন্য এবং ওর বাচ্চাটির জন্য।এটা বলার এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের বিয়ে হয়ে যায়।কিন্তু আমি কখনোও ওকে স্ত্রী হিসেবে পাইনি।কারণ ও কখনো কোন কথা বলতোনা।কেমন যেন নীরবে জানালা দিয়ে বাহিরে চেয়ে থাকতো।আমিও ওকে ঘাটাতাম না।ওর পাশে শুয়ে শুয়ে ওকে গল্প উপন্যাস পড়ে শোনাতাম।ও চুপ করে শুনতো আর মাঝে মাঝে কেমন করে যেন কাঁদতো।

এর কিছুদিন পর হঠাৎ রাতে ও চিৎকার করে উঠে।আমি বুঝতে পারি, একটি নতুন জীবন খুব দ্রুত পৃথিবীতে আসতে যাচ্ছে।যখন ওকে নিয়ে হসপিটালের পথে, তখন ও অনেক কাঁদতে থাকে।আমাকে চিৎকার করে বলে, "আমার সন্তানকে আমাকে দেখতে দিয়োনা।আমার সামনে ওকে এনোনা।"

আমাদের একটি ছোট্ট ছেলে হয়।যখন ছেলেটিকে আমার কোলে দেয়া হয়, আমি লক্ষ্য করি ও ওর মায়ের মত হয়েছে।কি সুন্দর তার চোখগুলো, কেমন করে তাকিয়ে থাকে।গায়ে বড় বড় লোম আর মুখে লিলিপুট নাক আর এই বড় বড় কান।আমার দিকে তাকিয়ে সে হতভম্ব হয়ে কি যেন ভাবে।তারপর আমি দেখতে ভুল করেছিলাম কিনা জানিনা, সে কেমন যেন একটা দেঁতো হাসি(যদিও তার দাঁত নেই, কিন্তু এই হাসির আর কোন নাম হয়না) দেয়।আমি মহানন্দে তাকে আমার বুকের মধ্যে নিয়ে বসে ছিলাম।
আমি সুস্মিতার কাছে যেয়ে বসলে ও আমার হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, "ওর গালের ডানপাশটা ঠিকমত দেখেছো?কোন পোড়া দাগ আছে?"

আমি সুস্মিতার মাথায় হাত দিয়ে বলি, আমাদের একটা চাঁদের মত শিশু হয়েছে।তুমি সুস্থ হয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় চলো।

বাসায় আসার পরদিন সুস্মিতা আত্নহত্যা করে।এর মধ্যে একবারও সে শিশুটিকে তার কাছে আসতে দেয়নি।যখন শিশুটি ক্ষুধায় কাদছিলো তখনো নয়।আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে ও একটি ছোট্ট চিঠি রেখে যায় আমাদের সন্তানের জন্য।ও তাতে লিখেছিলো,
"আমার বাচ্চাটা,
তুই তোর মাকে ক্ষমা করে দিস তোকে ছেড়ে যাবার জন্য।কিন্তু কেউ আমার দুঃখ বুঝবেনারে।যে পোড়া যন্ত্রণা আমার শরীরে ছিলো, তার থেকে অনেক অনেক কষ্ট আমার বুকে ছিলো।আমি আর সইতে পারছিলাম না।
তোর কাছে আমার কিছুই চাওয়ার নেই।শুধু এটুকু বলবো, তুই অনেক অনেক ভালো মানুষ হবি।মানুষকে মানুষ হিসেবে বিচার করবি।আর তোর বোকা বাবাকে অনেক আদর দিবি।ওকে বলিস আমাকে যেন ক্ষমা করে দেয়।আরও জানাবি যে ভালোবাসা ও আমাকে দিয়েছে, তার কিছুই হয়তো আমি শোধ করতে পারিনি।কিন্তু ও যেদিন আমাকে প্রথম ভালোবাসার কথা জানায়, সেদিন থেকে আমি ওকে ছাড়া কাউকেই ভালো বাসতে পারিনি।
ভালো থাকিস আমার সোনা।জীবনে অনেক বড় হ।"

এর পর ছয় বছর কেটে যায়। আমি নিজের হাতে আমাদের ছেলেটিকে মানুষ করছি।প্রতিরাতে আমার ছেলেটি কাঁদে এবং আমাকে জিজ্ঞেস করে, "মা কই মা"।আমি ওকে হাত দিয়ে চাঁদ দেখিয়ে বলি ওই যে ওখানে চাঁদের দেশে পরী হয়ে আছে।

সুস্মিতাকে কবর দেয়া হয়েছিলো আমাদের গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে।আমি আমার সন্তানকে নিয়ে প্রতি বছর বিশেষ বিশেষ দিনে ওর কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।আমরা বাবা ছেলে এক সাথে অনেক কান্না করি।

আজ ৩০শে শ্রাবণ ওর চলে যাওয়ার দিন।আজও আমি আর আমার ছোট্ট ছেলেটা ওর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছি। ওকে বললাম, "প্রিয় সুস্মিতা তোমাকে আমি ক্ষমা করিনি।নিজেকেও করিনি।আমি জানিনা, আমার ভালোবাসায় কোথায় কমতি ছিলো যা তোমার কষ্টকে মুছে দিতে পারেনি।আমাদের ছেলেটিকে দেখো, ও দেখতে তোমার মত হয়েছে।পুরোই তোমার মত।ওর মুখে কোন দাগ নেই।তুমি কি জানো ও ওর ক্লাসের সবচেয়ে শান্ত ছেলে।টীচাররা বলে ও স্কুলের সবচেয়ে ভালো ছেলে, শুধু বিজ্ঞানে একটু কাঁচা আমার মত।সুস্মিতা, আমি তোমার ছেলেকে তোমার মত করেই বড় করছি।আমার আর ওর একটি ছোট্ট পরিবার গড়ে উঠেছে যাতে আদর ভালোবাসা সব ঠিক আছে, নেই শুধু তুমিই।তুমিই মনে রেখো আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করবোনা"।

আমার ছেলে আর আমার চোখে তখন এক সমুদ্র জল যে জল মুছে দেয়ার কেউ নাই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29222313 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29222313 2010-08-14 12:49:01
একটি অত্যন্ত সাধারণ ও বোকা মানুষের ভালোবাসাহীন জীবনের গল্প
তিন মাস আগে আমার স্ত্রী পরিচয় পাওয়া তিথী নামের অতি সাধাসিধে মেয়েটি আমার মায়ের থেকে বোধহয় একটু দূরে দূরেই থাকেন, আর আমার থেকে অনেক অনেক দূরে।বিয়ের আগে তার সাথে যেদিন প্রথম দেখা হয়, সেদিন এত শান্ত কোমল মেয়েটিকে কি করে যেন নিজের কাছের বলেই মনে হয়েছিলো।পরবর্তী দেখা বিয়ের পর যখন আমি বাসর ঘরে যাই।তখন তার প্রথম কথা ছিলো, “আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাইনি”।

ব্যস এভাবেই শুরু হলো আমাদের সুখের সংসার।গত তিন মাসে কোনদিন একবারের জন্যও এমন হয়নি যখন আমি তার পাশে যেয়ে একটু আকাশ পাতালের কল্পকথা গাইতে পারি।তিথী আমাকে দেখলে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করে, তখন মনে হয় আমি যেন অনেক দূরের কেউ।তাই আমি অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত বোধ করি এবং যতটা সম্ভব নিজেও ওর থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি।

মা জানেন সব কিছু, কিন্তু কখনো কিছু বলেন না।মা মনে মনে তিথীকে বেশ ভালোবাসেন আমি টের পাই।তিথীকেও দেখি মায়ের পাশে বসে মাঝেসাঝে কি নিয়ে যেন কাঁদে। আর আমি আমাদের নীরস সংসারে না পারি কাঁদতে, না পারি হাসতে।কিন্তু বিশ্বাস করুন এতে আমার মনে কোন দুঃখ নেই।আমি এভাবে বাঁচতেই শিখে গেছি সেই ছোট্টকাল হতে।বাবাকে জীবনে পেয়েছি খুব অল্প সময়ের জন্য, মা একটা বয়সের পর আমাকে আমার হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন।স্কুল কলেজের হাতেগোণা কিছু বন্ধুবান্ধব রয়েছে বৈকি যারা এখন বেশিরভাগ ইউএসএ, কানাডা অথবা যুক্তরাজ্যে পি.এইচ.ডি করছে বা করা শেষ হয়েছে।সবাই তারা ভালো আছে, অনেক ভালো।আমি শুধু রয়ে গেছি জরাজীর্ণ আবার একই সাথে অতি ব্যস্ত নগরী ঢাকার ছোট্ট এক কোণায় ভালোবাসাহীন জীবনে।মাঝে মাঝে নিজেকে শুধু প্রশ্ন করেছি, আমার জীবনে ভালোবাসারা কোথায়?মনে হয় আমাদের সবারই মনের কোণায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই উঁকি দিয়ে যায়, তাই না?

শুক্রবার দিন ভোরবেলা অফিসে আসলাম অত্যন্ত বিরক্ত চিত্তে।মরার চাকরীতে উইকেন্ড পাওয়ার সুযোগ মাঝে মাঝে জোটেনা।একারণে প্রায়ই মনে হয় ভেগে যাই বনে বাদাড়ে এইসব ফালতু চাকরী বাকরী ছেড়ে।টারজানের মত গাছে গাছে বানর হয়ে ঝুলবো আর ফলমূলের জুস খাবো।তারপর যখন আবার পরিবারের কথা মনে হয় তখন শুধুই একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলি আর ভাবি কবে একটু শান্তি পাবো।আজকে সকালে অফিসে এসেই শুনি আমার চাইনীজ বস আমাকে খুঁজছে।আমি হন্তদন্ত হয়ে বসের রুমে ঢোকার সাথে সাথে সে আমার দিকে ক্রুর দৃষ্টি দিয়ে বললো, “মাই ডিয়ার, তোমার চাকরী আর নেই।যাও রাস্তা মাপো”।

আমি সুন্দর হাসি দিয়ে বললাম, “ভাগতে পারলে ভালোই হতো স্যামি, কিন্তু তুমি তো আমাকে ছাড়বেনা। কি দরকারে খুঁজছিলে সেটা এখন বলো।”

স্যামি আমার দিকে আরো ক্রুর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে বললো, “ফেব্রুয়ারীর ৫ তারিখ তোমার কানাডায় ফ্লাইট।ছয় মাস থাকতে হবে আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং স্টেশনে।যদি না যেতে চাও তাহলে আমার টেবিলের ওপরে আরেকটা লেটার আছে, তোমার টারমিনেশন।ওইটা নিয়ে ভাগো”।

আমি একটুখানি অবাক হলাম, কিন্তু তা ঘটনার আকস্মিকতায়।তবুও স্বাভাবিক ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে বললাম, “পাসপোর্ট করা হয়নি, পরে জমা দেবো।”এটা বলে যখন চলে যাচ্ছিলাম তখন স্যামি আবার ডাকলো, "অর্ক তুমি একবারও আমাকে থ্যাঙ্কস জানালেনা।তুমি একটু অদ্ভুত, বেশি বেশি অদ্ভুত।”

আমি জানিনা আমাকে কেন সে অদ্ভুত বললো, আমার কাছে একবারও ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগেনি।অদ্ভুত লাগা শুরু হলো যখন ম্যানিটোবার উইনিপেগ শহরে যা পৃথিবীর শীতলতম শহর বলে পরিচিত সেখানে পৌছালাম।গ্লোবালাইজেশন কি সেটা কেউ বুঝতে হলে অবশ্যই তাকে এই সিটিতে আসতে হবে।চমৎকার সাজানো গোছানো শহরে সুন্দর কিছু পার্ক এবং অত্যাধুনিক মিউজিয়াম অবস্থিত যা ঘুরে ঘুরে দেখবো বলে আগেই প্ল্যান করে রেখেছি।

আমার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হলো উইনিপেগ রেইলওয়ে মিউজিয়াম থেকে ২ কি.মি. দূরবর্তী একটি ছোট্ট বাঙ্গালী এপার্টম্যান্টে।আমার পাশের এপার্টমেন্টে থাকে একটি বাঙ্গালী পরিবার যাদের আতিথেয়তায় আমি নিঃসন্দেহে বিমুগ্ধ।আমি প্রথম যেদিন আমার ফ্লাট 5Aতে থাকার জন্য উঠলাম, সেদিনই আমার সাথে একটু মোটাসোটা করে মধ্যবয়স্ক রিয়া আন্টি দেখা করতে এলেন একটা বিশাল কোম্বল আর দুইটিন বিস্কুট নিয়ে।আমার দিকে বেশ আপন আপন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বললেন, “বাবা তুমি চাইলে এই কম্বলটা ব্যবহার করতে পারো।আর কিছু কুকিজ আছে।যদি রাতে ক্ষুধা লাগে খেয়ে নিতে পারো”।

আমি এবং আমার ক্ষুধার্ত পেট অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে তাকে ধন্যবাদ জানালো।একটু পরে তার দুই মেয়ে এসে আমাকে চিড়িয়াখানার বাসিন্দা হিসেবে কেমন যেন একটা উইর্ড লুক দিলো যাতে আমি বেশ মনঃকষ্টের শিকার হলাম।মেয়েগুলার নাম খুবই সুন্দর- ত্রপী আর ত্রিপি।একজন ডাক্তারী পড়ছে, আরেকজন কেবল এ লেভেল শেষ করেছে।সেদিন রিয়া আন্টি আর ত্রপি-ত্রিপীর সাথে আর বেশি কথা হলোনা।

পরবর্তী এক সপ্তাহ খুব ব্যস্ত ছিলাম কাজে অকাজে।দুদিন ছুটি পেয়ে রিয়া আন্টির বাসায় গেলাম সামান্য কিছু গিফট নিয়ে।আন্টি তখন পিঠা বানাচ্ছে এবং তার দুই মেয়ে বসে বসে একটি এনিমেশন মুভি দেখছে।আমিও মুভি দেখতে বসে পড়লাম এবং কিছুক্ষণ পর আন্টির হাতে বানানো চমৎকার কিছু কুলি পিঠা ভক্ষণ করে মনের আনন্দে তেলতেলে হাসি দিয়ে বললাম “ধন্যবাদ”।"

এরপর কথা বলতে বলতে জানলাম, এই পরিবারটি কানাডা এসেছে ১৬ বছর আগে।আসার কিছুদিন পর আঙ্কেল হার্টের সমস্যায় পড়েন এবং দুইমেয়ে এবং তাদের মাকে একা রেখে চলে যান।আমি জানিনা কি সেই মানসিক শক্তি যার জন্য রিয়া আন্টি তার মেয়েদেরকে নিয়ে এই অপরিচিত শহরে বাস করার সাহস পেয়েছিলেন।দেশীয় সংস্কৃতি আর আচার ব্যবহার তার মেয়েদের মাঝে ছড়িয়ে দিতেও উনি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি।আমি সত্যিই ভাগ্যবান এই দূরদেশে এসে এমন চমৎকার একটি পরিবারের সান্নিধ্য পেয়েছি বলে।

সমস্যা হলো যখন আমি আরো ঘনিষ্ঠ হলাম এই পরিবারটির সাথে।জানতে পারলাম ত্রপী ডাক্তারীতে ভর্তি হওয়ার পর একটি ছেলের প্রেমে পড়ে তার জীবনের সব হারিয়ে এসেছে।অত্যন্ত লজ্জার সাথে জানাচ্ছি ছেলেটি বাংলাদেশী ছিলো।ত্রপী কি করে সেই কষ্ট আর যন্ত্রণা ভুলে জীবন চালিয়ে নিচ্ছে আমি জানিনা, অবশ্য জানার আগ্রহ আমার মধ্যে বেশ কম।এই ছোট্ট পরিবারটি নিদারুণ টানাটানির মধ্যে বেশ হাসিখুশি বলেই জানতাম।কিন্তু সত্যি বললে কি তারা আসলে ভালো নেই আমি এটা বেশ বুঝতে পারি।

ত্রিপী খুব চঞ্ছল একটি মেয়ে এবং প্রায়ই আমাকে বলে “তুমি বিয়ে না করলে তোমার সাথে বেশ প্রেম করা যেত, তাই না অর্ক”"।আমি বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি।

এভাবে করে একমাস চলে গেলো।কোন এক ছুটির দিনে আমি আমার এপার্টমেন্টের ছোট্ট জানালা দিয়ে তুষারপাত দেখছিলাম, ঠিক তখন ত্রিপি এসে দরজায় নক করলো।তার চোখ দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে ফুলে আছে।সে ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি কি একটু বাসায় আসবে?আপু না আবার ঘুমের ওষুধ খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে”"।

আমি সাথে সাথে দৌড়িয়ে ওদের বাসায় গেলাম।দেখলাম আন্টি মেডিকেল সাপোর্টের জন্য ফোনে কথা বলছে।ত্রিপি বড় বড় অসহায় চোখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আপুর কিছু হলে আমি মরে যাব”।
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “একটু ব্রেভ হও, বি পেশেন্ট।কিছু হবেনা”।

আমার ধারণা মিথ্যা ছিলো যা এর পাঁচ ঘন্টা পরে জানা গেলো।আমি এরপর কি হয়েছে তা পাঠককে জানাতে চাইনা।আমার জীবনের অন্যতম খারাপ সময় আমি তখন কাটিয়েছি।আমি ত্রপীর আত্নার জন্য প্রার্থনা করি যেন যেই কষ্ট বুকে নিয়ে মেয়েটি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো আল্লাহ যেন তা মুছে দিয়ে মেয়েটিকে জান্নাতে থাকার সুযোগ করে দেন।রিয়া আন্টি আর ত্রিপির দিকে আমি ভয়ে তাকাতাম না।যে ভয়ংকর শূন্যতা তাদের নয়নে আশ্রয় নিয়েছিলো তার গভীরতা আমার মত অনুভূতিহীন মানুষ কোনদিন খুজে পাবেনা।নিঃসঙ্গ ত্রিপীকে আমি বেশ সময় দিতাম তখন।আমি ভয় পেতাম যদি সেও তার বোনের মত কিছু করে বসে।
হঠাৎ করে একদিন ত্রিপী আমাকে বললো, “অর্ক আমি আপুর মত বোকা না।আমি জানি আমার কি করা উচিত আর কি উচিত না।Don’t Worry; ok?”

আমি তার দিকে আশ্বস্ত হাসি দিয়ে বললাম “ধন্যবাদ”।

হঠাৎ করে ওর সোনালী রঙ করা চুলের ফাঁকে মায়াময় মুখটি দেখে মনে হলো, কোথায় যেন আমি ওকে দেখেছি।উত্তর পেলাম তিন মুহূর্ত পর।ওর সাথে তিথীর মুখমন্ডলে কোথায় যেন একটু মিল আছে, সামান্য হলেও আছে।

“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন, আমার প্রেমে পড়েছো”?

ত্রিপীর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে আমি কিছুটা নয়, বেশ খানিকটাই অপ্রস্তুত হলাম এবং বললাম, “আমি ভালোবাসতে জানিনা”।

ত্রিপীর তার মুখ থেকে চুল সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আমিও জানিনা।কিন্তু তোমাকে কেমন যেন লাগে”।

আমি ওর সামনে থেকে উঠে চলে এলাম।নিজেকে বড় ক্লান্ত নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিলো।আমার অপু নামের সেই ছেলেটার কথা বার বার কেন যেন মনে পড়ছে।তিথী কি অপুর দিকে ওভাবেই তাকাতো আজকে যেভাবে ত্রিপী আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।বিয়ের রাতে যখন তিথী আমায় বলে অপুর কথা তখন আমি একটুও কষ্ট পাইনি।আমার আসলে জানতে ইচ্ছা করছিলো বারবার, সে কোন ভালোবাসার বুননে তিথী অপুকে বেধেছিলো যা ছিঁড়ে ফেলে ছেলেটি মহাকালে পাড়ি জমিয়েছে।তিথীকে বলতে ইচ্ছা করছে, প্রিয় তিথী অপুকে দেয়া তোমার ভালোবাসা সবটাই তোমার কাছে পবিত্র আত্নার দাবী হয়েই থাকুক।আমি তাতে কখনো জায়গা চাইনি, চাবোওনা।তুমি তোমার হারানো স্বপ্নগুলো নিয়ে সুখে থাকো, অনেক অনেক সুখে।

ত্রিপীর কথা ভাবছি,এই প্রথম কোন মেয়ে আমাকে বললো তার আমাকে খানিকটা হলেও ভালো লাগে।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার ডিপার্টমেন্টের বরুণা নামের একটি মেয়েকেও আমার বেশ ভালো লেগেছিলো।কি অদ্ভুত ব্যাপার, কোন একদিন আমার ক্লাসেরই আরেকটি ছেলের সাথে তার ফাটাফাটি প্রেম শুরু হয়ে যায়।ওই বয়সে সেটা হয়তো বড়সড় আঘাত ছিলো যে জন্য আমি প্রায় বছরখানেক সুস্থ ছিলাম না।বরুণাকে কেন ভালোবেসেছিলাম তাও নাহয় বলেই ফেলি।ওর নয়নজোড়া আর তার মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রগাঢ়তা আমাকে খানিকটা ভালো লাগা দিয়েছিলো, কিন্তু ভালোবেসেছিলাম ওর কাউকে পাত্তা না দেয়ার মানসিকতাকে অথবা ওর নারী হওয়ার অহংবোধকে।

সেই বরুণা,সেই ভালোলাগার মেয়েটি আমাদের ফেয়ারওয়েলের দিন আমার কাছে এসে বললো, “অর্ক তুমি এখনোও আমার দিকে কিভাবে যেন তাকাও।মজার কথা বলি, আমার তোমাকে কিন্তু কখনো খারাপ লাগেনি।এখন যে শুভ্রর সাথে আছি, তবুও তোমাকে খারাপ লাগেনা।কারণ তোমার তাকানোর মাঝে কিছু একটা আছে।এভাবে কেউ তাকিয়ে থাকলে মেয়েদের কিন্তু ঘৃণা, বিরক্তি এমন কিছু হয়না।কিন্তু ভয় হয়, প্রবল ভালোবাসার ভয়। আমার কথা বুঝেছো?”

আমি মাথা নেড়ে অনুভূতিহীন দৃষ্টি দিয়ে ওর দিকে চেয়ে থাকলাম।ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আমি জানতাম তুমি বুঝবেনা।কিন্তু একটা কথা বলে যাই, কখনো কাউকে ভালো লাগলে তাকে বলে ফেলতে শেখো।ঠিক আছে?”

আমি কিছু না বলে মাটির দিকে চেয়ে ছিলাম।কি যে মনে হচ্ছিলো নিজেও জানিনা।

ত্রিপির সাথে আমি সেদিনের পর অনেকদিন কথা বলিনি।ঠিক দেশে ফিরে যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে রিয়া আন্টি আর ওর সাথে দেখা করতে গেলাম ওদের ফ্লাটে।চলে যাওয়ার সময় ত্রিপি অনেকক্ষণ আমার সাথে এপার্টম্যান্টের পাশে লনে গিয়ে হাঁটলো।আমি বুঝতে পারছিলাম না ওকে কি বলবো।ওই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “চলে যাচ্ছো ৫ তারিখ?”
আমি হাসিমুখে তাকিয়ে বললাম, “হ্যা”।

এবার ও আমার হাত ধরে বললো, “তোমাকে সেদিন মিথ্যা বলেছিলাম।আমার তোমাকে আসলে ওভাবে ঠিক ভালো লাগেনা।মনে হয় শুধু একটু উইর্ড টাইপ।বুঝেছো না?”

আমি আবার হাসিমুখে বললাম “হ্যা”।

“কিন্তু আমার অনেক একা একা লাগে জানো?যখন মনে হয় তুমি চলে যাবে, আমি তোমাকে আর দেখবোনা, তোমার এই ঝকঝকে নীল জিন্সের জ্যাকেট আর চোখের সামনে আসবেনা তখন অনেক কষ্ট হয় জানো”।এটুকু বলে ত্রিপি আমার দিকে আবার কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকলো।আমি অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিলাম।

আগস্টের ৫ তারিখ আমি সেইন্ট এন্ড্রিউস এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।রিয়া আন্টি আমাকে বিদায় দিতে আসতে পারেননি।কিন্তু ত্রিপি ঠিকই এসেছিলো বেশ হাসিমুখে।আমার জন্য কিছু চকোলেট আর একটা সুন্দর উলের মাফলার নিয়ে যা রিয়া আন্টি বানিয়ে দিয়েছিলো।ও যতই হাসিমুখে থাকুক, আমি ওর চোখের কোণায় হীরকজলের ঝিকিমিকি দেখতে ভুল করিনি একটুও।ওর ভালো লাগার কথা জানার পর থেকে আমি যে অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হয়েছি সেটা কি কেউ জানে?মনে হয় না।
আমি যাওয়ার আগে ত্রিপির মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলো, "ভালো থেকো মেয়ে"।
ও আমার বুড়ো আঙ্গুল ছুয়ে বলেছিলো, তুমিও যাকে ভালবাসো তাকে নিয়ে অনেক ভালো থেকো।

এটুকু বলে একবারও সে আমার দিকে তাকালোনা।পিছনে ঘুরে দ্রুত পায়ে চলে গেলো, রেখে গেলো একটুকরো হতাশা।আমি সমস্ত আকাশ পথে কিছু মুখে দিতে পারিনি।আমাকে কি কেউ কখনো ভালবেসেছে?মনে হয় না।যখন কেউ এভাবে ভালবাসলো তখন আমার সামনে তিথীর শান্ত স্নিগ্ধ মুখটা বারবার ভেসে ওঠে।আমি তখন আর কিছুই ভাবতে পারিনা।আফসোস!যে তিথী আমার কাবিন করা বউ,তার হৃদয়ে আমাকে খানিকটাও আশ্রয় দেয়নি।

বাংলাদেশ পৌছালাম গভীর রাতে।মা আমাকে নিতে এসেছে।আমি বুঝিনা এত গভীর রাতে মা কেন কষ্ট করে নিতে আসলো।আমাকে দেখে মায়ের অনেকদিনের জমাট বাঁধা চোখের জল গড়িয়ে পড়লো।গাড়িতে উঠে দেখি তিথি বসে আছে।আমি বসলাম মাঝে আর দুই পাশে তিথি ও মা।মা তিথিকে বার বার বলছে, “আমার ছেলে আমার বুকে ফিরে আসছে”"।

আমি তিথির পাশে যতক্ষণ বসে ছিলাম ততক্ষণ অস্বস্তি বোধ করছিলাম।মনে হচ্ছিলো ও সামাজিকতার খাতিরে বাধ্য হয়ে এসেছে।আমার এটা ভালো লাগেনা।

বাসায় গিয়ে দেখি এলাহী রান্নাবান্না।আমার নীরস ছোট্ট বাসা আর তার মাঝে বাস করা লিলিপুট পরিবারে কেমন যেন জীবনের আলো ঝিকমিক করছে।রাতে খেয়েদেয়ে যখন ঘুমুতে গেলাম, তখন তিথি আমার পাশে এই প্রথমবারের মত বসে প্রশ্ন করলো, কেমন আছি।আমি মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইলাম খারাপ না।ও আমাকে অবাক করে দিয়ে এরপর প্রশ্ন করলো, “আপনি আমার সাথে একদিনো কথা বলেননি এই ছয় মাসে।কেন”?

আমি আমতা আমতা করে জবাব দিলাম, “তোমার হয়তো ভালো লাগতোনা”।

ও একটু চুপ থেকে হাতে কাচের চুড়িগুলো ধরে ঘুরোতে ঘুরোতে বললো, “আমার অনেক কষ্ট হয়েছে।আর এমন করবেন না”।

আমি কিছু না বলে চুপ করে বসে আছি।ও এবার আমার একদম কাছে এসে বসে বললো, “প্রমিজ করুন আর আমাকে ছেড়ে যাবেন না”।
আমি অনেক অভিমান নিয়ে বললাম “পারবো না”"।

সেদিন রাতে তিথি যখন ঘুমিয়ে পড়লো তখন আমি ভাবছিলাম ত্রিপি এখন কি করছে?আমার থেকে বছর আটেক ছোট্ট একটি মেয়ের ভালোবাসায় কতটা গভীরতা ছিলো সেটা আমি জানিনা।তার কালোর মাঝে হালকা সোনালী চুলের মাঝে দিয়ে দেখতে পাওয়া সেই মায়াভরা চোখজোড়া এখন কি লোনাজলে সিক্ত হয়ে আছে?আমি মনে মনে বলি, ত্রিপি তুমি অনেক ভালো থেকো।ধরিত্রীর সকল শোভিত পুষ্প তোমাকে তাদের সুবাসে আলিঙ্গন করে থাক।

********************************************************************
বোধহয় বছর দেড়েক আগে একটি মেয়েকে(কানাডায় বসবাসকারী) কথা দিয়েছিলাম তার মত কাউকে নিয়ে একটি লেখা লিখবো।এতদিন পরে আজ সকালবেলা মাথায় ধপ করে গল্পটি এসে পড়লো।আমার সব লেখার মত এটিতেও ভালোবাসার সূক্ষ অনুভূতিগুলো প্রাধান্য পেয়েছে বলে বোধ করি যা কিছুটা একঘেয়ে বলে মনে হয়।যারা কষ্ট করে আমার লেখা পড়লেন এবং লেখা পড়ে বিরক্তানুভূতিতে আক্রান্ত হলেন তাদের কাছে সত্যি ক্ষমাপ্রার্থী।তবে বিশ্বাস করুন, এই লেখার প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি ভালোবাসা বেশ যত্নের সাথে নিজে অনুভব করে লিখেছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29217777 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29217777 2010-08-08 16:06:11
ছোট্ট নিশি এবং তার হতভাগ্য পিতা
সেই দিনের পর আজ পাঁচ বছর হলো, আমি আবার আরিয়ার সাথে দেখা করতে এলাম।আজকের দেখা হওয়ার পূর্ব প্রেক্ষাপট পাঠককে জানানো দরকার।সেদিন ছিলো বৃহস্পতিবার।আমি প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়ম করে নীলেক্ষেত যাই কাগজ কেনার জন্য।নীলক্ষেতের তেহারীর দোকানের পাশে বীথি পেপার হাউস নামে যে দোকানটি আছে সেটি আমার গন্থব্য। তারা আমাকে বেশ সস্তায় রেডিও বন্ড কাগজ বিক্রয় করে।আমার পেশাটাও জানিয়ে দেই।আমি একজন দুইনাম্বারী লেখক।দুই নাম্বারী এ অর্থে যে আমি অন্যের লিখা অনুবাদ করি।হ্যা, নিজেরও বেশ কিছু লিখা আছে,কিন্তু সেগুলো পাঠক নজর দেয়নি।কিন্তু তবুও লিখালিখি আমার ভালোবাসা,আমার চলার পথের একমাত্র অর্থ উপার্জনের বাহন।পাঠককে আরো জানিয়ে রাখি আমার প্রাক্তন বউ আমার প্রেমে পড়েছিলো এই লিখালিখির কল্যাণেই।সেই ঘটনা আরেকদিন জানাই।

মূল গল্পে ফিরে আসি।আরিয়ার সাথে আমার মাসখানেক আগে দেখা হয় নীলক্ষেতে(শুধুই একটি কাকতাল মাত্র)।আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এই প্রথম ওর সাথে আমার দেখা।আমি জানতাম সে সাড়ে চার বছর আগে USA এর উইস্কনসিন স্টেট এর গ্রীন বে নামে ছোট্ট একটি শহরে স্থায়ী হয়েছে।ভাবিনি এভাবে দেশে দেখা হবে আবার।প্রথমে ওকে দেখে আমি অবাক হয়ে একটু ভদ্রতার হাসি দেয়ার চেষ্টা নিয়েছিলাম,কিন্তু যখন ওর ওই ঘৃণাভরা চোখের কথা মনে হলো তখন আর কিছু ভাবতে ইচ্ছা করছিলোনা।বুকটা অনেকদিন পর কেমন যেন প্রচন্ড ব্যথায় মুচড়িয়ে উঠলো।আরিয়া আমাকে দেখে নিজেই এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “কেমন আছো?”
আমি একটু হতভম্ব হয়েই ওকে জানালাম ভালো আছি।আরিয়া এরপর খুব দ্রুত একটা কাগজ বের করে একটি ঠিকানা লিখে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, “তোমার সাথে আমি নিজেই দেখা করতে চাচ্ছিলাম।তুমি আমার এই ঠিকানায় এসে একবার দেখা করে যেয়ো।”

ওই ঘটনার পর আমার মোট ২৬ দিন ১৬ ঘন্টা লেগেছে সাহস জোগাড় করে আরিয়ার সাথে দেখা করতে।আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে কেমন যেন ফুরফুরে লাগছিলো।খপাখপ একটা বিষণ্ণ নাগরিক জীবন নিয়ে কবিতা লিখে ফেললাম এবং এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম আরিয়া ম্যাডামের সাথে আজকে দেখে করবোই করবো।আমি আমার বহুমাত্রায় প্রিয় কিছুটা ছেঁড়া নীল পাঞ্জাবী পড়ে ওর বাসায় রওনা হলাম।

কাজের মেয়ের দেয়া তিক্ত চা খেয়ে মেজাজটা গরম হলেও কিছুক্ষণ পর আবার মেজাজটা ভালো হলো আরিয়াকে আসতে দেখে।আরিয়া আমার থেকে কিছু দূরত্ব নিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলো।তারপর গম্ভীর কন্ঠে বললো, “শওকত,তোমাকে জানানো হয়নি।তোমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমার একটি মেয়ে হয়েছিলো।দুঃখজনক ভাবে মেয়েটা তোমারও।আমি অনেক ভাবনা চিন্তা করে দেশে এসেছি তোমাকে এবং তোমার মেয়েকে দেখা করিয়ে দেবার জন্য।আশা করি তুমি ব্যাপারটা সহজভাবে নেবে"”।

আমি মুর্তির মত বসে রইলাম আরিয়ার পাশে বহুক্ষণ।এরপর আমার বিখ্যাত কাষ্ঠ হাসি দিলাম।আমি বুঝতে পারছিলামনা আমি কি বলবো।আমি একই সাথে অস্থির এবং ক্লান্ত অনুভব করলাম।আমি জানিনা আমার এখন সুখী অথবা দুঃখী কোনটি হওয়া উচিত।আমি শুধু আরিয়াকে শান্ত স্বরে বললাম “ধন্যবাদ আরিয়া।আমার মেয়ে কোথায়?তাকে একটু দেখতে পারি”

আরিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “না পারোনা।তবে কালকে পারবে।আমি ওকে তোমার বাসায় পাঠিয়ে দেবো কাল।তুমি দুইদিন ওকে নিয়ে তোমার কাছে রাখবে।এরপর আমার কাছে দিয়ে যাবে।আমি চিটাগং যাবো চারদিন পর।ওখান থেকেই ওকে নিয়ে একেবারে ফিরে যাবো স্টেটস এ”

আমি আরিয়ার বাসা থেকে চলে এলাম এরপর।সারাদিন পল্টন প্রেস ক্লাবের আশেপাশে প্রখর রৌদ্রছায়ায় হেঁটে বেড়ালাম।আমি অনুভূতিহীন ছিলাম।আমি একটিবারের জন্যও পেটে ক্ষুধা অনুভব করিনি।আমার মনে তখন শুধু একটিই ভাবনা, আমার মেয়েটা দেখতে কেমন।সে বাংলা জানে তো?
সারারাত না ঘুমিয়ে পরদিন সকালে চোখা লাল করে আমি আমার বাসার ছোট্ট নোংরা বারান্দা দিয়ে নিচে তাকিয়ে থাকলাম।কখন আমার ছোট্ট চার বছরের মেয়েটি আমার কাছে আসবে এই চিন্তায় বিভোর হয়ে রইলাম।আপনাদের এর মাঝে জানিয়ে দেই, কেন আমার সাথে আরিয়ার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো।

তখন আরিয়ার সাথে আমার মাত্র দুবছর হলো বিয়ে হয়েছে।আমাদের বিয়েটা ছিলো প্রেমের বিয়ে।কারো বাবা মাই কোন আপত্তি করেনি।কিন্তু বিয়ের পর দিন দিন আরিয়া বদলে যেতে থাকলো।আমার সাথে প্রতিদিন ঝগড়া করতো।ওর অভিযোগ ছিলো আমি ওকে ভালোবাসিনা,সময় দেইনা।সারাদিন লিখালিখি নিয়ে পড়ে থাকি।আমার খুব অপরাধবোধ হত।কিন্তু সংসার চালানোর জন্য প্রকাশকদের হাজার অপমান সহ্য করে আমাকে সঠিক সময়ে লিখা জমা দিতে হতো।ভালোবাসার সংসারে সুখ আসে অর্থ দিয়ে, এই ভয়ংকর সত্য বাস্তবটা আরিয়াকে কে বোঝাবে?

এক বছর পর যখন আরিয়া সন্তাসম্ভবা হয়, তখন একটু শান্ত হয় পরিস্থিতি।আমি হাফ ছেড়ে বাচি।কিন্তু দুঃসময় আমার পিছু ছাড়েনি।হতভাগ্য এই দুইনাম্বারী লেখকের জীবনে ভয়ংকর অভিশাপ হয়ে আসে যখন পাচ মাসের প্রেগনেন্ট আরিয়া ডাক্তার দেখিয়ে রাস্তায় হাটতে যেয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে এবং আমাদের শিশুটি সকল স্বপ্ন নিয়ে হারিয়ে যায়।আরিয়া দোষ দেয় আমার এবং শুধুই আমার।আমিও জানতাম যে আমিই অপরাধী, আমিই সেই পাপী যে আরিয়াকে সময় দিতে পারিনি।তার এমন অবস্থায়ও তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে পারিনি,ছেড়ে দিয়েছি মাঝপথে একা,একেবারেই একা।

এসকল কিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে দেখতে পাই আরিয়াকে একটি গাড়ী থেকে নামতে। সাথে একটি ছোট্ট দেবশিশু।আমি কোনরকমে নিচে যাই, এবং বাসার গেটের কাছে গিয়ে আরিয়া আর শিশুটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকি।আরিয়া আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে নিশির(আমার মেয়ের নাম) দিকে তাকিয়ে বলে, “মামানী এটা তোমার আব্বু।তুমি তোমার আব্বুর কাছে দুদিন থাকবে,ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াবে।আর রাত হলে আমাকে একবার শুধু ফোন দেবে।ঠিক আছে?”

নিশি বড় বড় চোখ করে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, “ঠিক নাই মা।আমি থাকবোনা বাবার কাছে।আমি তো ওকে চিনিনা।”প্রথমবার মেয়ের মুখে ফুটফুটে বাক্য শুনে আমি অত্যন্ত অবাক হয়ে গেলাম।কত সুন্দর করে আমার মেয়েটা কথা বলে।আমি কখন ওকে একটু কোলে নিয়ে আদর করবো ভাবছিলাম।কিন্তু মেয়ে আমার সাথে থাকতে রাজী হবে তো!তার এই দুর্ভাগা পিতার সাথে দুটি দিনের জন্য সে থাকবে তো!

আরিয়া তার মেয়েকে কিভাবে যেন বুঝিয়ে রাজী করে ফেললো।আমি মেয়েকে নিয়ে আমার দুইরুমের নোংরা বাসায় এনে হাজির হলাম।আরিয়া গেটের বাহির থেকেই বিদায় নিলো।যাওয়ার আগে মেয়ের যা যা লাগে সব দিয়ে গেলো।আমাকেও সাবধান করে দিলো যেন মেয়ের কোন সমস্যা না হয়।আমি জ্বি আচ্ছা বলে ওর সব কথায় সায় দিয়ে গেলাম।
ঘরে ঢুকে আমার মেয়ে প্রথম যে কথাটা বললো তা হলো, “ছি! তুমি কত নোংরা, যারা লিখালিখি করে তারা তো অনেক পরিচ্ছন্ন হয়।”আমি টাসকি খেলাম এবং বিশাল ঢোক গিললাম।মেয়ের দিকে কাচুমাচু হয়ে বললাম, “মামনি কথা সত্য।কিন্তু আমি পচা লেখক তো তাই ঘর এমন অপরিচ্ছন্ন।”

এরপর বাপ মেয়ে মিলে মিশন ঘর গোছানো শুরু করলাম।টম ক্রুসের আব্বাও এমন কঠিন কাজ করতে পারতো কিনা জানিনা।আমার মেয়েটা বিশ্বাস করুন এই চার বছর বয়সেই এত সুন্দর সুন্দর সব আইডিয়া দিতে লাগলো আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম।ঘর গোছগাছ করতে করতে দুপুর হয়ে গেলো।আমি আরিয়া জুনিয়রকে নিয়ে গুলশান-১ আলমাস গেলাম।আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ও কি খাবে। ও লজ্জায় মুখ লাল করে বললো, সব খাবো।

আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আমার মেয়েটা তার পিতার মত পেটুক হয়েছে।ওকে আমি যাই দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে খাবে কিনা, সে কুটকুট করে বলে খাবো।আমি একটু পরপর ওর দিকে তাকাই।ছোট্ট দুইফুটের আমার মেয়ে বড় বড় চোখ নিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে থাকে, আর আমাকে একের পর এক প্রশ্ন করে।আমি কখনো চিন্তাও করিনি মেয়ে এত তাড়াতাড়ি এত ঘনিষ্ট হয়ে যাবে আমার।একটু পর সে নিজ থেকেই আমাকে বললো তার পায়ে বেদনা,সে কোলে উঠে ঘুরবে।আমি ওকে নিয়ে বহু মার্কেট, বহু জায়াগায় ঘুরলাম সারা বিকাল সন্ধ্যা।গুলশানের নোংরা লেক ওর সবচেয়ে ভালো লাগলো।কি কারণে জানিনা।

রাতে যখন ডিনার করে রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম, ও আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি ভালোবাসাবাসি করি কিনা।আমি এইটুক মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে আবার ভিড়মি খেলাম।তাকে জানালাম আমাকে কেউ বেল দেয়না।আপনাদের অবগতির জন্য অত্যন্ত কষ্টের সাথে জানানো যাচ্ছে আমার মেয়ের সাথে আমার সব কথোপকথন ইংরেজীতে হয়েছিলো।সে বাংলা ভালো বলতে পারেনা।আমি যে ইংরেজীতে কথোপকথনে অভ্যস্ত তা কিন্তু নয়।কিন্তু চালিয়ে নিতে পারি।

এরপরের দিন আমি একেবারে ভোরে তাকে নিয়ে রমনা বটমূলে চলে যাই।তাকে আমাদের দেশের বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের গল্প বলি।প্রতি ১লা বৈশাখে এখানে যে অনুষ্ঠান হয় সেটা তাকে জানাই।আমার মেয়ে সব শুনে দাবী করে তাকে পহেলা বৈশাখের শাড়ী কিনে দিতে হবে।আমি তথাস্তু বলে তাকে নিয়ে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে যেয়ে একটি ছোট্ট শাড়ি কিনে দিয়ে সন্তষ্ট করি।অনেক দিন পর আমি ঢাকা শহরে স্বস্তির শ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিলাম।

কাল ও চলে যাবে একথা মনে করে রাতে প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে আমার মেয়ের সাথে নিজের হাতের খিচুরী ডিম নিয়ে ডিনার করছিলাম। নিশি মামনী হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, “বাবা, মা তোমাকে কেন ছেড়ে গেল?”
আমি নিশির দিকে তাকিয়ে দেখি সে উত্তরের জন্য চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।কিন্তু আমি কি উত্তর দিবো আমার মেয়েকে যেটা সে বুঝতে পারবে?

আমি চুপ করে খেতে লাগলাম।আমার মেয়ে আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?”

আমি চোখের জল চেপে তাকে উত্তর দিলাম, “নারে মা।আমি তোর সাথে এবার চলে যাবো আমেরিকায়।”

আমার মেয়ে হঠাৎ কেঁদে উঠে বললো, “আমাকে যখন কেউ মিথ্যা বলে আমি সেটা বুঝি।বাবা আমি তোমার জন্য প্রতি রাতে একটা করে কবিতা লিখি।আমার ক্লাসমেটদেরকে বলি আমার বাবা কবি,আমিও একজন কবি হবো।মা আমাকে প্রতি জন্মদিনে তোমার হয়ে একটা করে কার্ড দেয়।আমি তোমার দেয়া সব কার্ড ছিড়ে ফেলে দেই।কারণ তুমি পচা।কখনো তুমি আমার সাথে দেখা করোনা,গল্প বলোনা”।"

আমার চোখ ভিজে গেলো।আমি আবারো নিজেকে একজন ব্যর্থ বাবা হিসেবে আবিষ্কার করলাম।আমি জীবনের প্রতি ক্লান্ত, বিমর্ষ একজন ব্যর্থ পিতা যার নিজের সন্তানটিকে প্রতিরাতে একটু আদর করে কপালে চুমু খাওয়ার অধিকারটাও নেই।আমি নিশিকে বুকে টেনে নিয়ে বললাম, “মা আমি সত্যিই তোর সাথে নিয়মিত দেখা করবো।”

আমার মেয়েটা সারা শরীর কাঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শুধু এটুকুই বললো, “You are a liar, you are a liar”

পরদিন সকালে আরিয়া তার মেয়েকে নিয়ে চলে গেলো।আমি যাওয়ার পথে আরিয়াকে একটি চিঠি দিলাম।বারবার অনুরোধ করলাম একবার যেন সে চিঠিটা পড়ে।একটিবারের জন্য।আরিয়া কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে চিঠিটা নিলো এবং আর কিছু না বলে চলে গেলো।আমি রাস্তায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার ছেড়া নীল পাঞ্জাবী নিয়ে।আমার মেয়েটা একটা বার আমার সাথে কথা বলেনি সকালে।আমি শুধু মেয়েটাকে কোলে নিয়ে গালে একটুকরো চুমু দিতে পেরেছিলাম।একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, “প্রিয় নিশি মা, তুমি কি জানো তোমার বাবা তোমাকে কতটুকু ভালোবাসে?”নিশি আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লো।আহারে! আমার মেয়েটা এই ছোট্ট বয়সে কি যন্ত্রণা বুকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, আমি তার অভিশপ্ত পিতা শুধুই পারি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে।

আরিয়া কি আমার চিঠিটা পড়বে একটিবারের জন্য, আমি জানতাম না।আমার চিঠিতে আমি লিখেছিলামঃ

“আরিয়া, আমি অতীতে যে ভুল করেছি তার সাফাই আগেও গাইনি এখনও গাইবোনা।আমি ভুল করেছি, তোমার কাছে আমি অপরাধী।কিন্তু যে অর্থ কষ্টে আমি তখন জর্জরিত ছিলাম তার থেকে উত্থানের জন্য আমার পুরো সময়টুকু শুধু আমি লিখালিখির জন্য, তা থেকে সামান্য কিছু আয়ের জন্য দিয়েছি।আমি জানিনা তুমি কখনো বুঝেছিলা কিনা যখন প্রতি রাতে আমি তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে জোসনা থাকুক আর না থাকুক তাকিয়ে থাকতাম আমাদের ভাঙ্গা জানালার মাঝ দিয়ে বের হয়ে আসা ছোট্ট রুপালী আলোর ছটায়।তোমাকে আমি একটি কবিতাও দেইনি, যে কবিতাগুলো আমি তখন লিখতাম।আমি তোমাকে কখনো আমার ভালোবাসা জানাইনি,আজও জানাতে পারবোনা হয়ত।শুধুই বলবো, তুমি যত দূরে থাকো আমি তোমাকে প্রতি রাতে দেখতে পাই।এই পাঁচ বছরে লিখে রাখা আমার ১৮২৭টি চিঠি আমি সব তোমার মুখের দিকে চেয়ে লিখেছি।আমি আমাদের ভালোবাসার ওই ছোট্ট বাসাটি আজও ছাড়তে পারিনি।আমি ভাঙ্গা জানালাটি মেরামত করিনি।আমি এখনো রাত জেগে জানালার বাধা ভেঙ্গে বিছানায় পাঁপড়ি মেলা জোসনার আলো দেখি।

আজ এতদিন পর এই ভালোবাসার দাবী নিয়ে তোমার কাছে একটি শুধু অনুরোধ রাখবো।আমার মেয়েটাকে তুমি সারাজীবন বুকের মাঝে আগলিয়ে রেখ।কখনো ওকে কষ্ট দিয়োনা।আমি সারাজীবন অভিশপ্ত হয়ে থাকবো হয়তো আমার মেয়েকে একটি স্নেহময় বাবা দিতে না পারার জন্য।কিন্তু আমি তোমাতে বিশ্বাস রাখি।আমি জানি তুমি আমার অভাব তাকে বুঝতে দিবেনা।ওকে শুধু প্রতিরাতে একবার আমার হয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে জানিয়ো, আমার মেয়েকে আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসি।
ভালো থেকো”।"

এরপর দুমাস কেটে যায়।আমি স্বার্থপর লেখক নিজের পেটের ধান্দায় দুইনাম্বারী কাজ করে যেতে থাকি।হঠাৎ করে একদিন আরিয়ার থেকে একটা চিঠি পাই যা নিম্নরূপঃ

“শওকত, আমি জেনে খুব বিরক্ত হয়েছি যে তুমি আমার ঘুমন্ত মুখের দিকে প্রায় সময় তাকিয়ে থাকতে।হয়তো একারণেই আমি তোমার সাথে সংসার করার সময় কখনোই ঠিকমত ঘুমুতে পারিনি।আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করে ঠিক করেছি তিন দিন পর ঢাকা আসবো এবং বাকী জীবন তোমাকে এই বিরক্তিকর কর্মের জন্য শাস্তি দিয়ে যাবো।অনুগ্রহ পূর্বক তোমার ভাঙ্গা জানালা সারিয়ে ফেলো।তোমার অবগতির জন্য জানাই, নিশি আমার এই সিদ্ধান্তে একটু পর পর ফুটবলের মত লাফ দিচ্ছে আবার ভ্যা ভ্যা করে কাদছে।”

এই চিঠি পাওয়ার সময় আমি তখন নিজের স্বতন্ত্র একটা প্রেমের উপন্যাস লিখছিলাম।চিঠি পাওয়ার পর থেকে আমি বারবার লিখার পাতা ভিজিয়ে ফেলেছি।চিঠিটা একটু দেরীতে পড়লেই বোধ হয় ভালো হতো।ভুল হয়েছে!
********************************************************************
আবার একটা গল্প লিখলাম।এটাও ভালোবাসার গল্প।কিন্তু ধরনটা ভিন্ন বলেই দাবী করি।বোধ করি, আবারো একটি অখাদ্যই হয়েছে।আমি যারপরনাই আনন্দিত হবো যদি আপনারা তবুও এই লিখাটি হজম করতে পারেন।বদহজম হলে ক্ষমাপ্রার্থী।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29199373 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29199373 2010-07-14 12:22:10
নীরা আর অদিতির গল্প, তাদেরকে ভালোবাসা
ঢাকাতে আমার সেজখালা থাকেন। খালু খুলনার মংলা পোর্টে তখন বন্দর কর্মকর্তা। বাবা একদিন ঢাকায় আমাকে নিয়ে এসে খালুর সামনে এনে বললেন, “ভাইসাব, ছেলে এবার ৯২১ মার্ক নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। একটুর জন্য স্ট্যান্ড করতে পারেনাই। আপনি কি আমার ছেলের দায়িত্ব নিয়ে তাকে একটু বিশ্ববিদ্যালয়টা পার করে দিবেন?”

আমার খালু খুবই রাশভারী মানুষ।উনি কান চুলকাতে চুলকাতে বললেন, “পারবোনা।”

আমার আব্বা বললেন “আলহামদুলিল্লাহ। অর্ক তুমি এখন থেকে খালুকে বাবার মত শ্রদ্ধা করে তার পাশে পাশে ঘুরবা আর পড়াশোনা করবা।”
খালু বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মনযোগ দিয়া পড়বা।নাহলে কান টেনে ছিড়ে ফেলবো।”

এরপর আমাকে জ্বী বলার সুযোগ না দিয়ে আমার বাবার দিকে তাকিয়ে বললো, “আপনি মহা চালু মানুষ দুলাভাই। প্রতিমাসে খাবার খরচ পড়ার খরচ ৩ তারিখের মধ্যে পাঠায় দিবেন। নাহলে ৩ তারিখেই মাঝরাতে ছেলেকে আজগর পরিবহনে উঠায় পাবনা ফেরত পাঠায় দিবো।”

এখানে উল্লেখ্য আমার খালু কখনো একটি টাকাও নেয়নি বাবার থেকে। যখনই আমার বাবা কিছু দিতে চাইতেন খালু আমাকে হুংকার দিয়ে ডেকে বলতেন, বাক্স পেটরা ভর্তি করে বাবার সাথে বিদায় হও। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলতেন, "দুলাভাই, আমি যখন আপনার বাড়িতে বছরের পর বছর আপনার শ্যালিকা নিয়ে পড়ে ছিলাম তখন যা খরচ গেছে একটু কষ্ট করে জানায় দিয়েন। এখন ছেলে নিয়ে বাপ ব্যাটা বিদায়।" খালু আমার জন্য যা করেছেন তা একজন বাবার থেকে কোন অংশে কম নয়। আর আমার খালাও আমার মায়ের থেকে কোন অংশে কম ছিলেন না।

এভাবেই শুরু হলো ঢাকা শহরে থাকা। খালু মাসের দু একদিন ঢাকায় এসে থাকেন, বাকী সময় মংলায়। খালাই মূলত আমাকে দেখে শুনে রাখেন, আর আমার প্রায় সমবয়সী(বছর দেড়েক ছোট) খালাতো বোন নীরা আমাকে ত্যাক্ত বিরক্ত করেই চলে। ভাত খেতে বসলে বলে, “অর্ক তুমি এত খাও কি করে বলোতো?"”।

আমি নিজেও কিন্তু খুব একটা দুধে ধোওয়া ছিলামনা। ওকে কতভাবে যে খেপাতাম, জ্বালাতাম তা মনে পড়লে এখনো অনেক হাসি পায়। পাঠকের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, আমার আজকের এই গল্পে নীরার ভূমিকা খুব সামান্য নয়। তাকে নিয়ে আবার পরে লিখছি।এখন যেই মেয়েটিকে নিয়ে লিখবো, সে আমার থেকে বছর দুয়েক বড় ছিলো শিক্ষাক্ষেত্রে(বয়সে এক দুমাসের হয়তো ছোটবড়,আমার পড়াশোনা একটু দেরীতে শুরু হয়েছিলো)।কিন্তু সেই আমার প্রথম ভালোবাসা, এবং জীবন দিয়ে ভালোবাসা।

মেয়েটির নাম অদিতি, এবং দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সে আমার প্রথম হাউসটিউটর। তাকে ঠিক করে দিয়েছিলো আমার খালা।অদিতি থাকতো আমার খালার বাসার পাশের ফ্লাটে। খালার সঙ্গে অদিতির আম্মার দহরম মহরম অবস্থা।ওই সূত্রেই ওকে আমার জন্য শিক্ষিকা হিসেবে ঠিক করা।তাছাড়া ছাত্রী হিসেবে ওর তখন আমাদের ফ্লাটে বেশ সুনাম। অদিতি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যয়নরত। আমি যেন ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো একটি বিভাগে ভর্তি হতে পারি এটা নিশ্চিত করাই ছিলো তার দায়িত্ব।

প্রথম যেদিন অদিতি পড়াতে আসে, আমি ওর দিকে একটিবারও তাকাতে পারিনি। শুধু জ্বী ম্যাডাম বলেই শেষ। কিন্তু আমি ওর গায়ের সেন্টের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম প্রবল ভাবে। যতক্ষণ সে আমার পাশে বসে ছিলো, প্রতিটি সময় আমি অনুভব করছিলাম বিশেষ কেউ আমার পাশে বসে আছে। এভাবে ঘন্টাখানেক চলার পর ও বললো, “আচ্ছা আজকে আমি যাচ্ছি। কিন্তু যাওয়ার আগে তোমাকে কিছু কথা বলে যাবো"”।

এবার আমি প্রথমবারের মত ওর দিকে তাকালাম এবং আতেলটাইপ, ইংরেজীতে যাকে বলে উইর্ড লুক দিলাম। অদিতি আমাকে হতভম্ব করে বললো, “দেখো ছোট্ট ছেলে, আমি তোমার থেকে বয়সে অনেক বড়। তাই আমাকে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আমি জানি, আমি দেখতে বেশি ভালো। কিন্তু সেটা তোমার দেখার দরকার নেই। তুমি মফস্বল থেকে এসেছো বলে এতোটা আনস্মার্ট হয়ে থাকবে এটা ঠিক নয়। আমার কাছে যখন পড়তে আসবে তখন স্মার্ট হয়ে পড়বে এবং আমার দিকে তাকিয়ে পড়বে।আমি হলাম তোমার খালার লেভেল এর মানুষ। ঠিক আছে?”
আমি বুকে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে বললাম, “জ্বী”।

এরপর থেকে আমি পড়াশোনা করা বাদ দিয়ে দিলাম। কি হবে পড়াশোনা করে! যে অপমান আর গঞ্জনার জ্বালা আমাকে অদিতি দিয়ে গেলো তার ভার সহ্য করা অসম্ভব ছিলো। ও যখন আমাকে পড়াতে আসতো তখন সে মাঝে মাঝে পিচ্চি বলে সম্বোধন করতো। এমন একটা রুপসী মেয়ে আমাকে এভাবে অপমান করছে আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। কিছু বলতেও তো নাহি পারি!

এভাবে দু সপ্তাহ কেটে গেলে আমি একদিন অদিতির জন্য বসে আছি পড়ার ঘরে।একটু পরেই ও এসে গম্ভীর হয়ে চেয়ারে বসলো। আমি ওর দিকে তাকাতেই আমার গলা শুষ্ক হয়ে গেলো। বুকে শুকিয়ে কাঠ হয়েছে যেন। ওর সারা চোখে পানি, মনে হয় যেন একটু আগে কান্না করে এসেছে। আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না আমার কেন এতো খারাপ লাগছে! আমি জানিনা আমার কি হয়েছিলো, আমি কি করে যেন ওর হাত শক্ত করে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে?"”।

অদিতি ঝাপটা দিয়ে ওর হাত সরিয়ে নিয়ে বললো, “পিচকি তোমার সাহস তো কম না! আমাকে কি তুমি তোমার প্রেমিকা মনে করো নাকি?তোমাকে থাপ্পর দিয়ে বেক্কেল দাত ফালায় দিবো।যাও ত্রিকোণমিতি বই নিয়ে এসো।”

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হৃদয়ে স্ট্রোক খেলাম, আবার থাবড়া খাইনাই এইজন্য আকাশের দিকে মুখ তুলে করুণাময়ের দরবারে শুকরিয়াও জানালাম।অদিতি সেদিন যাওয়ার আগে আমাকে বললো, “চোখ উঠছে বুঝলে।বেশিক্ষণ আজকে তোমাকে পড়া দেখাতে পারলামনা।”

এভাবে দু-তিন মাস পার হওয়ার পর আমি দেবদাস হয়ে গেলাম এবং দাড়ি রাখা শুরু করলাম। অদিতি আমার দিকে কোন ভ্রুক্ষেপও করেনা। আমার খালা খালু ও নীরা আমার এহেন অবস্থা থেকে বলতে লাগলেন "অর্কর উন্নতি হয়েছে। পড়াশোনার চাপে হুজুর হয়ে যাচ্ছে।”আমি বহু কষ্টে কান্না থামিয়ে সব কিছু মেনে নিয়ে চলছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিলাম। অবস্থান বেশ ভালো ছিলো(না পড়ে কিভাবে এত ভালো হলো জানিনা!)। প্রথম ৫ টি বিষয়ের মধ্যে একটি পেয়ে গেলাম।অদিতি যে বিভাগে পড়ে তার থেকেও ভালো বিভাগে চান্স পাওয়ায় সে মনে হয় বেশ অবাক হলো। কারণ আমি খুবই কেয়ারলেস ভাবে তার কাছে পড়াশোনা করেছিলাম। এরপর থেকে তার সাথে একটু ভাব মারা শুরু করলাম।

ওর সাথে আমার মাঝে সাঝে দেখা হতো মধুর ক্যান্টিন অথবা অপরাজেয় বাংলার পাশে। কখনো কার্জন হলের ঘাসে ঢাকা মাঠে হেটে যেতে যেতে পাশের রাস্তায় হয়তো দেখতাম ও হেটে যাচ্ছে।আমি জানতে পারলাম, বেশ অনেকদিন ধরে তারই বিভাগের এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে সে প্রণয় সম্পর্কে আবদ্ধ।যেদিন খবরটা পেলাম সেদিন আমি সারাদিন কিছুই খাইনি। একমাস ভার্সিটিতে ক্লাস করতে যাইনি।বিশাল বড় চুল আর রবিবাবুর মত দাড়ি(জটপাকানো) নিয়ে আমি ক্লাসে আসতাম। সবাই ভাবতো, আমি বুঝি কবি হয়ে গেলাম। কিন্তু কেউ এটা জানতোনা, মনের ব্যথা আর চুলদাড়ির দৈর্ঘ্য একে অপরের সমানুপাতিক।

এভাবেই কেটে গেলো কিছুদিন। একদিন মেডিকেলের রাস্তার পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি অদিতি হেটে যাচ্ছে এবং তার মুখ দেখেই বোঝা যায় অত্যন্ত বিষণ্ণ। এর মধে তার কাছে আমার অবস্থান কিছুটা উন্নত হয়েছে। এখন সে আমার অর্ক বলে ডাকে, পিচ্চি বলে নয়। আমি ওর দিকে কাষ্ঠহাসি দিয়ে তাকিয়ে বললাম, “কেমন আছো অদিতি?”। পাঠক আপনাদের আগেই জানিয়ে রাখি ওকে আমি জীবনেও আপু জাতীয় কোন সম্বোধন করিনি। এই কারণে সে অনেক হম্বিতম্বি প্রথমে করলেও পরে আর কিছু বলেনি।

আমাকে দেখে ও একটু ভদ্রতার হাসি দেয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু পরে আবার বিষণ্ন হয়ে বললো, “জানিনা কেমন আছি!”

আমি ওকে নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে চা আর পুরীর অর্ডার দিলাম। সময়টা তখন গোধূলীবেলা। অদিতির চোখে পানি(চোখ ওঠার পর কেতর মার্কা পানি নহে), আমার দেবদাস অবস্থা। আমার মনে হয় দুজনেরই সেদিন দুজনকে বেশ আপন লাগছিলো। আমাকে অবাক করে দিয়ে ও সেদিন আমার হাত ধরে বললো, “তুমি কি আমার থেকে ছ্যাকা খেয়ে এমন চুল দাড়ি বানিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো।”

আমি স্পষ্টভাবে বললাম, “হ্যা”।

ও আমার দিকে অস্বাভাবিক একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে অপ্সরার মত হাসি দিলো। আমি পাগল হয়ে যাবো কিনা বুঝতে পারছিলাম না। বিশ্বাস করুন, নিজেকে আমি থাবড়া দিয়ে টেস্ট করেও দেখেছিলাম স্বপ্ন দেখছি কিনা!

সেদিন থেকে আমাদের প্রেম শুরু। হ্যা, একবছর ৫ মাস ৬ দিন(আমি দিন তারিখ ভালো মত গুণে রাখি) পর আমার বুকের ব্যাথা লাঘব হলো। আমি আপনাদের আমার প্রেম কাহিনীর কিছু সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিচ্ছি।

আমি প্রতিদিন ভোরবেলা শেভ করে বাসার পাশের গলিতে ফিটফাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম অদিতির অপেক্ষায়। ওর ক্লাস আমার আগে হোক অথবা পরে সবসময় আমি ওর জন্য অপেক্ষা করতাম। ও এলে আমি ওর সাথে রিকসা চেপে হুড উঠিয়ে মনে মনে শীষ বাজাতে বাজাতে ভার্সিটিতে যেতাম।সমস্যা একটাই ছিলো, আমি আবার ওর কাছে পিচ্চি উপাধিতে ভূষিত হতাম। সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিলো যখন আমি আর ও মোখলেছ মামার চটপটি খেতাম আর ওর চুল আমি নাড়াচাড়া করতাম। আমি ওর সাথে দুমাস ছিলাম, এবং এই দুমাসে কখনো ওকে স্পর্শ করিনি। শুধু ওর চুলগুলো একটু ছুঁয়ে দিতাম। ও আমার হাত মাঝে মাঝে জোর করে ধরে থাকতো।

কিন্তু কষ্ট পেতাম তখন যখন মনে হতো, ও কখনো আমার দিকে তাকায় না কেন? আমি দেখতে খারাপ ছিলাম না হয়তো। মাত্র দেড় বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি ২-৩ টি মেয়ের আগ্রহের মানুষে উপনীত হয়েছিলাম। অনেক নতুন জুনিয়র মেয়ে আমার কাছে আসতো পড়া(?!)বুঝতে। অবশ্য আমি কাউকে পাত্তা দিয়েছি বলে মনে পড়েনা। যেদিন থেকে আমি অদিতিকে দেখেছি সেদিন থেকে ওই আমার কাছে সর্বময় ছিলো।

মাস দুয়েক এভাবে রোমান্টিক আবহে কেটে যাওয়ার পর, একদিন হঠাৎ ও আমার কাছে এসে বললো, “কাল রাতে ফয়সাল ফোন করে আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। অর্ক তোমার কি মনে হয় আমার ওকে ক্ষমা করা উচিত? তুমি আবার এটা ভেবোনা আমি ওর কাছে ব্যাক করবো।”

আমি ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম, “তুমি ওর কাছে ফিরে যাও।”

আমি দেখেছিলাম অদিতি আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে ছিলো। কিন্তু আমি জানি ও মনে মনে খুশি হয়েছিলো। আমি ওর দিকে তাকিয়েই বুঝেছিলাম ও কি চায়। যদি নিজের ভালোবাসার মানুষের মনের কথা না বুঝতে পারি তাহলে কিসের প্রেমিক হলাম?

এরপর আমার জীবনের সবচেয়ে দুর্বিষহ জীবনটা আমি কাটাতে লাগলাম। বাসায় আমার খালা খালু, বাহিরে বন্ধুরা সবাই করুণা করে আমার দিকে তাকাতো।আমি বদলে গিয়েছিলাম। আমি অনেক বদলে গিয়েছিলাম। আমি কারো সাথে কথা বলিনি বেশ অনেকদিন। আমি বোকা ছিলাম, কারন ভাবতাম ভালোবাসাই জীবনের সবকিছু। এই পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ আধবেলা খেয়ে বেঁচে থাকে, বাঁচার তাগিদে মানুষ তার গায়ের পোড়া মাংশ আরো ঝলসিয়ে খেয়ে বেড়ায় আর আমি হৃদয়ের পোড়া গন্ধ ঢাকতে ব্যস্ত, অতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি তখন নগরী ঢাকার এক জরাজীর্ণ কালো পাথর যাকে লাথি মারলে সে অনেক দূরে চলে যায়, কিন্তু তবুও মরে পড়ে থাকে। হ্যা, আমি একজন মৃত মানুষের মত নিঃশ্বাস নিতাম এই কার্বন ডাই অক্সাইডের শহরে।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো সেদিনের আগ পর্যন্ত যেদিন আমি অদিতি আর ফয়সালকে চারুকলার পাশের মাঠের এক গাছপালার ছায়ার অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেললাম। অদিতি আমাকে দেখতে পেয়েছিলো কি? আমি জানিনা! আমি অতিদ্রুত সেখান থেকে হেঁটে আসলাম। একটা রিক্সা নিলাম এবং অসংবিত অবস্থায় বাসায় ফিরে আসলাম। তারপর কি হয়েছিলো জানিনা। আমি বোধহয় জ্ঞান হারিয়েছিলাম।

জ্ঞান যখন হালকা ফিরে আসে তখন অনেক রাত। খালা কাঁদতে কাঁদতে বললো, “বাবা তোর কি হয়েছে?তুই দিন দিন এমন শুকিয়ে যাচ্ছিস কেন?তোর মনে কি কেউ কষ্ট দিয়েছে রে?”। আমি নীরবে চোখের পানি ফেলি, মোমবাতির আলোয় সেই চোখের পানি জ্বলজ্বল করে উঠেছিলো কিনা কে জানে, আমি যে আঁধার কালোতেই ভবিষ্যত হারিয়ে ফেলেছি এটা ভালোই বুঝতে পারছি। শুধু একজন সব বুঝতে পেরেছিলো, ওটা ছিলো নীরা। ও সব জানতো, যদিও আমি ওকে কখনোই কিছু বলিনি। তবুও মেয়েটি সব বুঝেছিলো।নীরার গল্পের এখানেই শুরু।

৯৭ এর শেষভাগ। হাসিনা সরকার, বিএনপির হম্বতিম্বি, মুহুর্মুহু হরতালের আহবান সবকিছু ছাপিয়ে তখন ভালোবাসার আঘাত আমার কাছে আরো বড় ছিল।আমি ভার্সিটি যাইনা দুমাস হতে চলছে। এই পুরো সময়টা নীরা আমার পাশে থাকতো। ও তখন ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায়। ও আমাকে একটু পরপর বলতো, “কিছু খাবে?খাওনা কেন কিছু?"”। আমি ওর দিকে তাকিয়ে শুধুই একটা সুন্দর হাসি দিতাম।

আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, নীরাকে আমি কখনো চাইনি। কোনদিন না। কিন্তু ও আমাকে এত চায় কি করে? মেয়েটা সারাদিন আমার খাটের পাশে চেয়ার নিয়ে বসে থাকে আর একটু পরপর কাঁদে।

আমি ওকে কিছু দিতে পারিনা। কিচ্ছু না! এটা ও ভালোভাবেই জানে, তবুও কি করে ও আমাকে এভাবে চায়?এতটা চায়?

এরপর একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে অদিতি খালার বাসায় এসে হাজির হয়। আমি তখন নীরার সাথে বসে ওকে ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে চলছি। এসময় অদিতি আমার রুমে এসে আমার পাশে বসে বললো, “তোমার একি হাল! এমন কেন করছো অর্ক?”

নীরাকে আমি চোখের ইশারায় চলে যেতে বললাম। এরপর অদিতির দিকে তাকিয়ে ঝকমকে হাসি দিয়ে বললাম, “কেমন আছো অদিতি?”
অদিতি আমার দিকে বেশ দুঃখী হয়ে তাকিয়ে রইলো। আমি ওর এমন চাহনী সহ্য করতে পারছিলাম না। ও মৃদুকন্ঠে বললো, “তুমি যেতে বলছো, আমি তো নিজে থেকে কিছু বলি নাই। ”

আমি জানালার পাশে যেয়ে আকাশ দেখতে দেখতে বললাম, “তোমার থেকে আমি মিথ্যা আশা করিনা অদিতি।যাকে চাও তার কাছেই যেতে বলেছি।এখন আমার কাছ থেকে চলে যাও। আর এসোনা”।"

অদিতি বিড়বিড় করে কি যেন বলতে বলতে চলে গেলো। ভুল দেখলাম কিনা জানিনা, কিন্তু তার চোখে পানি ছিলো। লজ্জার আর দুঃখের।বিশ্বাস করুন, ওর কান্না আমার ভালো লাগেনাই। আমি নিজের কাছে লজ্জিত হয়ে পড়ি।

আমি টানা দুদিন এরপর না খেয়ে ছিলাম। আমার বাসা থেকে বাবা মা এসে পড়ে, খালা খালু আমাকে অনেক বকাঝকা করে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। আমি শুধু একটু পানি আর দুটি কলা ছাড়া আর কিছুই খাইনি দুদিন ধরে।

একদিন গভীর রাতে আমার প্রচন্ড জ্বর। আমি মনে প্রাণে অদিতিকে চাচ্ছিলাম, আবার তার চুলগুলো একটু ছুঁয়ে দেখতে। তার পাশে বসে অনাগত ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে।কিন্তু ও নেই, ও কোথাও নেই। আমি হাত বাড়িয়ে ওকে যখন ছুঁতে গেলাম তখন অস্বাভাবিক মমতায় কে যেন আমার মাথায় হাত রেখে কাঁদছিলো।নীরার চোখের পানি আমার কপাল ভিজিয়ে দিলো। ও আমার হাত যেভাবে শক্ত করে ধরে রেখেছিলো সেভাবে কেউ কখনো আমাকে ধরেনি। ও ওর মাথাটা কাত করে আমার কানের কাছে এসে বলছিলো, “তোমার জন্য জীবন দেবো অর্ক, একটু ভালো হয়ে যাওনা।”ওর সারা দেহ তখন থরথর করে কাঁপছিলো। আমি ওর হাত ধরে শুধু বলেছিলাম, “লাগবেনা”।"

আজ ১২ বছর হলো নীরার হাত একবারের জন্যও ছাড়িনি। আসলে মেয়েটি ছাড়তে দেয়নি, যে ভালোবাসার দাবীতে সেদিন ও আমার হাত ধরে ছিলো সেই দাবী অগ্রাহ্য করার মত ক্ষমতা কারো আছে বলে বোধ করিনা। আমার খালা খালু যেদিন আমার সাথে ওর সম্পর্কের কথা জানলেন সেদিন আমি অনেক লজ্জা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে তারা অনেক ভালোবাসতেন।

নীরা স্ট্যান্ড মার্ক নিয়ে পাশ করে আমার বিভাগেই ভর্তি হলো। আমি পাশ করার পর ওর সাথে জোর করে আমার পরিবার বিয়ে করিয়ে দেয়। আমাদের ছোট্ট একটি মেয়ে আছে। মেয়ের নাম আমি পাঠককে বলবোনা। কারণ আমি ওই নাম নিয়ে অত্যন্ত মনোকষ্টে আছি এবং ছিলাম। আমার মেয়ের নাম আমি রাখবো, সে জায়গায় নাম রাখলো তার মা। আমি মেনে নেইনাই, নিবোওনা।

আর অদিতি, ওর কথা অনেকদিন জানতাম না। মাঝে মধ্যে রাস্তায় দেখা হয়েছে। এরপর ওই এলাকা ছেড়ে অনেকদিন হলো চলে এসেছি। ২০০৮ এর শেষের দিকে বোধ করি একবার দেখা হয়েছিলো। আমি তখন নীরা আর আমার কন্যামাকে নিয়ে ধানমন্ডির শর্মা প্যালেস এ ফিশ শর্মা খাচ্ছি। ও পিছন থেকে এসে হাসিহাসি মুখে বললো, “কেমন আছো অর্ক?”
আমি হাসিমুখে বলেছিলাম, “ভালো আছি, সংসারী আছি। তুমি?”

ও সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বললো, “জানি না তো!”


সেদিন রাতে নীরাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিলে আজকে?”
ও রিনিঝিনি কন্ঠে হাসতে হাসতে বললো, “যে আমার তাকে নিয়ে ভয় পাবো কেন? আমার না হলে সেইরাতে আমি তোমার হাত না ধরে উত্তম মাধ্যম দিয়ে অদিতির কাছে পাঠিয়ে দিতাম”।"
আমি গভীর আবেগে ভাবি, বাহ! ও যে আমার মত করেই ভাবে!

********************************************************************

যারা কষ্ট করে এই রোমান্টিক লিখাটি পড়েছেন, তাদেরকে আমার সমবেদনা জানাই।আমি লেখক নই আগেও বলেছি।আজও এই লিখাটি অফিস ফাঁকি দিয়ে লিখেছি। আমার মনে হয় এখনকার সময়ে এমন লুতুপুতু আবেগী গল্প একেবারেই মূল্যহীন। তাও কেন যে এমন কিছু লিখলাম জানিনা! হয়তো একথা ভেবে যে, এই কাষ্ঠ সময়ে আমার এই তুচ্ছ লিখা যদি ভুল করেও কাউকে একটু আবেগ ধরিয়ে দিতে পারে!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29181047 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29181047 2010-06-20 13:59:35
আধ ঘন্টায় প্রেম, অতঃপর বিয়ে...
আমি হাসিমুখে লোকটার দিকে তাকিয়ে দশটি টাকা বাড়িয়ে দিলাম।কিন্তু লোকটা অনেকক্ষন নিশ্চুপ থেকে টাকার দিকে তাকিয়ে থেকে আমার দিকে বিমর্ষ চাহনী দিলো।আমি তাই টাকাটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে তাকে মিষ্টি হাসি উপহার দিলাম।

“বিয়া করছেন?”
“না, আজকে বাসায় যেয়ে মেয়ে দেখতে যাবো।”

সেদিন ছিলো ১৪১৬ সনের ৯ই বৈশাখ, একটি বৃষ্টির দিন।সারাদিন আকাশ কালো করে ঝমঝম বারিধারা।আমি অফিসের সামনের বাস স্ট্যান্ডের ছাউনীতে বসে আছি শেষ বিকেলে।রাস্তা ছিমছাম ফাকা হয়ে আছে।কেমন যেন মোহ ধরিয়ে দেয়া এক নীরবতা চারদিকে।সিদ্দিক নামে ১০ বছরের টোকাই ছেলেটি তার সব দন্ত বাহির করে রাস্তার এপার ওপার হো হো করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি আজকে আমার মার সাথে মেয়ে দেখতে যাবো।আমি অনেকদিন ধরে বাসায় বিয়ে করবো বলে মা বাবার কান ঝালাপালা করে ফেলেছি।এমন নয় যে আমার পছন্দের কোন পাত্রী আছে।কিন্তু জীবনের ২৬টি বসন্ত আমাকে প্রেম থেকে বঞ্চিত করেছে,আর বঞ্চনার জীবন কাটাতে চাইনা।মূলত বিয়ের ভাবনাটা এসেছে আমার বন্ধু মাজেদের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে।৩ বছর প্রেম করে বিয়ে করা বন্ধু আর তার বউয়ের আনন্দ দেখে আমার মনে হয়েছিলো, কি পাইলাম এ জীবনে!
সেই থেকেই আমি দিনরাত বিয়ের স্বপ্ন দেখি।

আজকে এই পড়ন্ত বিকেলে যখন বাসস্ট্যান্ডে নিশ্চুপ বসে আছি তখন বারবার মনে হচ্ছে, আহা! পাশে যদি একজন প্রেয়সী থাকতো।গুন গুন করে হাবিবের দ্বিধা গানটা গেয়ে যাচ্ছি।কিছুক্ষণ পর আমার পাশের গাঁজাখোরের নাম জানতে পারলাম।হালিম মিয়া তার জীবন কাহিনী যা বর্ণনা করলো তার সারমর্ম হলো, সে একজন কবিরাজ ছিলো।তার গ্রাম শিলাইকন্দতে।সে বহু নাম কামাই করলেও একবার ভুল ওষুধ দিয়ে ধরা খায়।পরে তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে গ্রামছাড়া করে এলাকার লোকজন।সেই দুঃখে হালিম মিয়া এখন গাঁজা খায় আর গান বানায়।
“একটা গান শুনবেন?” হালিম মিয়া জানতে চাইলো আমার কাছে।আমি উদাসীন হয়ে উত্তর দিলাম, "শুনি"।

হালিম মিয়া উকিল মুন্সীর বিখ্যাত গানটা “আমার গায়ে যত দুঃখ সয়” গাইতে থাকে আর আমি তন্ময় হয়ে তার কর্কশ কন্ঠে একটি গানের অপমৃত্যু প্রত্যক্ষ করি।কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার একটুও খারাপ লাগছিলোনা।আমি, টোকাই সিদ্দিক এবং হালিম মিয়া তখন ছমছমে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।আমাদের কাছে তখন সব কিছুই আনন্দের।বৃষ্টির ঝাপটা আমাদের ভালো লাগে, মাটির সোঁদা গন্ধে আমরা পাচ্ছি জান্নাতের সুবাস।

“শুনুন”, হঠাৎ করে এমন রমনী কন্ঠের ডাক শুনে আমি থমকিয়ে গেলাম।কি যেন হলো জানিনা, আমি ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটিকে দেখতে পারছিলাম না।বুকটা কেমন ধক ধক করছিলো।কি অদ্ভুত কান্ড দেখুন তো!

“জ্বী বলেন”, সিদ্দিক আমার হয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো।মেয়েটির মুখ না দেখেও আমি বলে দিতে পারি যে আমার এই আচরণে সে আহত হয়েছে।

“আমি মতিঝিল যেতে চাচ্ছি এখান থেকে,কোন সিএনজি স্টেশন কি আশেপাশে পাওয়া যাবে অথবা কোন বাস ওদিকটায় যায় বলতে পারেন?”।

আমি মেয়েটির কথা শুনেই বুঝেছিলাম যে তার গন্তব্যে যাওয়াটা জরুরী।আমার নিজগন্তব্য হলো উত্তরা,কিন্তু জানিনা কি মনে করে আমি মেয়েটিকে বললাম, “আমিও মতিঝিলে যাবার জন্য দাঁড়িয়ে আছি"”।

অবশেষে আমি তার দিকে তাকালাম এবং পাগল হলাম।সাদা এপ্রোন পরা একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট, মায়াময় চাহনী আর কত সাদাসিদে কথাবার্তা।আমি প্রেমে পড়লাম বা প্রেম আমার উপর পড়লো।

কিন্তু আমি এখন আর ওই বয়সে তো নেই যখন একটি মেয়ের দিকে লুলহাসি দিয়ে তাকানো যায়, তাকে বলা যায় “জানেন বাংলালিঙ্কের নতুন অফারে আপনি আমাকে অথবা আমি আপনাকে ফোন করলে যা বিল হবে তার দ্বিগুন আমাদের একাউন্টে জমা হবে।ভালো না?”

আমি বুঝতে পারছিনা আমার এভাবে আকস্মিক প্রেমে পরার কারণটা কি!প্রকৃতির কোন খেলা নাকি সত্যি আমার মেয়েটিকে ভালো লেগে গেলো।যেটাই হোক, যেভাবেই হোক আমি এই মেয়েটির সাথে সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়াতে যাই, তার হাতের ভালোবাসা মাখা সকালের নাস্তা আর শীতের পিঠা খেতে চাই।

“আমি এখন কি করে যাবো বলতে পারেন?”
“আপনি একটু অপেক্ষা করুন, হয়তো একটা বাস পেয়ে যাবেন।আমি নিজেও অপেক্ষা করছি”
“ও আচ্ছা”

আমি আবার নিশ্চুপ,মেয়েটিও নিশ্চুপ।সিদ্দিক কৌতুহলী হয়ে আশেপাশে ঘুরঘুর করছে।হালিম মিয়া আবারো গান গাওয়া শুরু করলো।আমি মনে প্রাণে চাচ্ছি মেয়েটিও যেন প্রকৃতির একটি অংশ হয়ে যায়।আমার বুকে তখন তোলপাড় চলছে।আমার তাকে কিছু একটা বলতে হবে।কিন্তু আমি কি বলব!!

“ভাই আমার বয়স ২৬ বছর।আমার বাসা থেকে আমাকে বিয়ের জন্য খুব চাপ দিচ্ছে।কিন্তু আমার না আপনাকে দেখে খুব ভালো লেগে গেছে।আমি আর কাউকে বিয়ে করতে চাইনা।আমি বলছিনা আপনার আমাকে পছন্দ করতে হবে।কিন্তু আমি আপনাকে পছন্দ করে ফেলেছি।চাইলে আপনি আমাকে এখন থাপ্পর মারতে পারেন অথবা ইগনোর করতে পারেন,কিন্তু তবুও আমি আপনার পিছ পিছ ঘুরবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি"”। এই কথাগুলো আমি একটুও বিরতি না দিয়ে টানা মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে বললাম এবং চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

“আমাকে পছন্দ করলে ভাই বলছেন কেন?”

এই কথা শুনে আমি আবার মত্যে নেমে আসলাম।চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি মেয়েটি বিরক্ত চেহারা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি এবার সেই আগের মত লুলহাসি দেয়ার চেষ্টা করলাম,কিন্তু ভয়ে সম্ভব হলোনা।আমি অপেক্ষা করছি সে আবার কি বলে।কিন্তু সে আর কিছুই বললোনা।এভাবে অনেকক্ষন চুপ করে থাকতে থাকতে আমি হতাশ হয়ে নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দিতে লাগলাম এই ছাগলের মত কাজ করার জন্য।সিদ্দিক আর হালিম মিয়া অন্য দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে আর আমি বোকার মত মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছি।

“আমি দুঃখিত”,এটুকু বলে আমি আবার ভাল ভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছু শোনার অপেক্ষায়।

“আপনি মদন এবং একটা ছাগল।ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ফলো করে বাসার ঠিকানা নিয়ে পরে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে পারতেন,তাই না? এই যে আমাকে এইসব বললেন এখন আমি তো আপনাকে খারাপ ছেলেও ভাবতে পারতাম"”।

আমি জ্ঞানী মানুষের মত মাথা দুলিয়ে আস্তে আস্তে বললাম “তা ঠিক, তা ঠিক”।

“আপনাকে দেখেই অবশ্য মদন মদন লাগে,আমি মদন টাইপ কারো সাথে প্রেম বিয়ে করতে চাইনা, সরি।আর তাছাড়া এখন আমার প্রফ চলছে, ৩ দিন পর কম্যুনিটি মেডিসিনের ভাইভা।এইসব প্রেম প্রীতি পরীক্ষার পর”।

“আফা এখন আপাতত উনাকে চিন্তা করবেন বইল্যা ঝুলায়া রাখেন।লোকটা ছাঘলের মত দেখতে হইলেও মনটা কিন্তু মাশাল্লাহ মাম ওয়াটারের মত পরিষ্কার”

হালিমের কথা শুনে মেয়েটি উফ! বলে একটা বিরক্তির শব্দ করলো।আমি চরম আশাহত হয়ে আশেপাশে তাকাতে থাকলাম।একবার মনে হল একটা দৌড় দেই যেদিকে দুচোখ যায়।আরেকবার মনে হলো, দেখিনা যদি ভালো কিছু হয়।

আচমকা লক্ষ্য করলাম মেয়েটি মিটি মিটি হাসছে।একটু পরই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কি করেন?”

আমি বললাম “আমি চাকরী করি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে।পাশ করেছি তড়িৎ প্রকৌশলে বছর দুই আগে।জীবনে কখনো প্রেম করিনি”

মেয়েটি “আচ্ছা” বলে একবার মাথা ঝাকালো শুধু।আমার মনে হচ্ছিলো আমি ভাইভা দিচ্ছি মঈন স্যারের সামনে।উনি আমাকে কঠিন কঠিন প্রশ্ন করছেন ইমপিডেন্স ডাম্পিং, রেজনিং নিয়ে আর আমি উলটপালট উত্তর দিয়ে চলছি।এখনও বৃষ্টি ঝমঝম করে পড়ছে,এখনো আকাশে ছাইরাঙ্গা আধার।ওদিকে ২৭ তম জৈষ্ঠে দেখা পাওয়া প্রেম আমাকে মূঢ় করে রেখেছে।

“ঠিক আছে, আপনাকে আসলে খারাপ লাগেনাই।আপনি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দেখতে পারেন।আমার প্যারেন্টস যদি রাজী থাকেন আমি একটা থট দেব"”।

এইবার আমি সার্থক লুল হাসি দিলাম।কারণ আমি সফল হয়েছি।ঠিক সেই সময় আমাদের অবাক করে দিয়ে একটা সি.এন.জি এসে আমাদের কাছে দাঁড়ায় এবং মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, “কোথা যাবেন স্যার”?

সি.এন.জিওয়ালার হাসি আমার কাছে তখন জর্জ ক্লুনির হাসির থেকেও মধুর লাগলো।আমি মেয়েটিকে যার নাম পরে জেনেছিলাম নাইরী তাকে নিয়ে মতিঝিলের দিকে রওনা দিলাম।এক বছর আগে এই দিনে আমার মত বোকাসোকা একটি লোক আধ ঘন্টার মাঝে একটি ডাক্তারী পড়া মেয়েকে পটিয়ে সারা রাস্তা হাত ধরে মতিঝিল যাত্রা করে।

আমার মা নাইরীকে খুব পছন্দ করেছিলো।নাইরী আমার মা বাবার সাথে সবচেয়ে বেশি গল্প করে তার অতীত প্রেমের অভিজ্ঞতা নিয়ে।কোন একদিন সে আমার মাকে জানায়(যা আমি লুকিয়ে লুকিয়ে শুনে ফেলি), “মা বুঝলেন, আপনার ছেলে যেইদিন আমাকে অফার দেয় আমি ওইদিন একটা ব্রেক আপ করে আসছি।বান্ধবীদের জিদ করে বলে আসছি আর প্রেম করবোনা।সরাসরি বিয়ে।আপনার ছেলে কত ভাগ্যবান দেখছেন।”

আমার মা জিজ্ঞেস করেছিলো, “তুমি কি ভাগ্যবতী”
“মা আমি পৃথিবীর ৩জন ভাগ্যবতী স্ত্রীর মধ্যে একজন।আপনার ছেলেকে সারাদিন আমি যা-তা বলি কিন্তু সে কোনদিন একটা রা করেনাই।”
“বাকী দুটো কে মা?”
“আপনি আর আমার মা”

আমি সেদিন বাথরুমে যেয়ে আবেগের বশে দুই ফোটা অশ্রু বিসর্জন করেছিলাম।

এতকিছু আজ আপনাদেরকে জানালাম কারণ আজকে আমাদের সেই অবিশ্বাস্য বৃষ্টিস্নাত দিনটির বর্ষপুর্তি।আমি জানি কেহ সেদিনের কথোপকথন বিশ্বাস করতে চাইবেন না।আমিও সেদিনের পরে আর বিশ্বাস করিনি।বাংলা সিনেমার গরু নাকি গাছে উঠতে পারে।আমার ওইদিনের গল্প যাকে বলি সেই বলে, আমার গল্পের গরু নাকি পাখা ঝাপটিয়ে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে বললেও বেশি গাঁজাখুরি শোনাবেনা।

সেদিনের পর মাত্র ১ মাসের মধ্যে আমাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো।আমি সারারাত ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।সে অবশ্য আরামে ঘুমিয়ে কাটিয়েছিলো।এই এক বছর সে আমাকে বহু যন্ত্রনা দিয়েছে কিন্তু কোনদিন মনে কোন আঘাত দেয়নি।তাকে কখনো আমি কাদতে দেখিনি শুধু একদিন ছাড়া যেদিন আমাদের অনন্ত মারা যায়।

অনন্ত আমাদের প্রথম স্বপ্নশিশুর নাম।জন্মের দুঘন্টার মধ্যেই সে মারা যায়।নাইরী যখন জানতে পারলো অনন্ত বেঁচে নেই ও চুপ করে উপরে তাকিয়ে ছিলো।আমিও একটুও কাদিনি।এরপর যখন আমরা বাসায় ফিরে আসি সেদিন রাতে হঠাৎ ওর হাতের স্পর্শ পাই কাধে।জেগে উঠে বসলে ও আমার দিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে বলে “অনন্ত নাই”। আমি সারারাত ওকে ধরে ছিলাম।মেয়েটি কাঁদলো, সারাটি রাত কাঁদলো।আমি বাঁধা দেইনি, সান্তনাও দেইনি।

আমি ঘুমাতে যাবার আগে একটি নিয়ম সবসময় অনুসরণ করি।আমি একবার ওর হাত ধরে বলি, “তোমাকে ভালোবাসি"”।এখনো পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম হয়নি।

********************************************************************
অনেকদিন পর ব্লগে কিছু লিখলাম।আজ অফিসে এসে দেখি কোন কাজ নেই।তাই ঝটপট একটি গল্প লিখা।লিখার পর নিজে পড়ে দেখার সময় নিম্নমানের হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।এই নিম্নমানের লিখা পড়ে যে যাই ভাবুন না কেন সবাইকে ধন্যবাদ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29139804 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29139804 2010-04-22 13:27:23
ভাই হারানো একজন মানুষের আরেক না দেখা ভাইয়ের দুঃসময়ে পাশে থাকার একটি আহবান...
সেদিনই আম্মু রাত্রে হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে দেখে,আমার ছোট্ট ভাইটি অস্থির হয়ে নড়াচড়া করছে।খুব জোরে কাঁদতেও পারছেনা।আম্মু ভয়ে চিৎকার শুরু করে।সবাই ছুটে আসে।ডাক্তার-নার্স ধরে নিয়ে আসা হয়।বারবার মুর্ছা যায় আমার মা।ডাক্তার সবাইকে জানায় অক্সিজেন লাগবে,কিন্তু তাদের কাছে এই মুহূর্তে অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই।দ্রুত জোগাড় করতে হবে।আমার বাবা পাগলের মত ছুটে যান।সারা রাত্রি জাগ্রত আমার দাদু নানু ক্লিনিকের ডাক্তারদের বকাঝকা করতে একবার নিচে যান,আবার উপরে ছুটে আসেন ভাইয়ার অবস্থা দেখতে।

ভোরের আযান দেওয়ার আগে আমার ভাইয়া দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।আমার শক্ত দাদুর চোখে কেউ পানি দেখেনি সহজে।সেদিন দাদু চোখ ভরা জল নিয়ে ভাইয়ার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো আর আমার হতভম্ব বাবার দিকে তাকিয়ে বলছিলো,"আমার নাতি কই?"আমি জানিনা সেদিন পৃথিবীর সবচেয়ে শোকার্ত ওই পরিবারের কান্নার শব্দ আযানের পবিত্র আওয়াজকে ছাপিয়ে গিয়েছিলো কিনা,কিন্তু আমি জানি সেই কষ্টের অনুভূতি সর্বশক্তিমানের দরবারে একটু হলেও গুঞ্জন তুলেছিলো।

আব্বু-আম্মু ভাইয়া চলে যাওয়ার পর অনেকদিন স্বাভাবিক ছিলেননা।প্রথম সন্তান হারানোর যে শোক তা কি কখনো কেউ ভুলতে পারে?আমার বাবা যখন ভাইয়ার নিথর দেহকে দাফন করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন,ওই ভার কিভাবে সহ্য করেছিলেন তাও আমি জানিনা।আমার নানু আমার আম্মুকে সান্তনা দিতেন।আমার আব্বা গভীর রাতে বাথরুমে যেয়ে চোখের পানি ফেলতেন।দাদু আব্বুর দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে চুপ করে কি যেন ভাবতেন।আর আমার মা...উনি কিছুই বলতেন না।ফ্যাল ফ্যাল করে তার বানানো কাঁথার দিকে,ছোট্ট উলে বোনা গরম কাপড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।কবরে দাফন করার পর আবার বাবার কাছে যখন জিজ্ঞেস করা হয় সাইনবোর্ডে কি নাম লিখা হবে ছেলের,আমার বাবা তখন দাদুর দিকে তাকিয়ে থাকেন শুধু।

আম্মুকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করি ভাইয়া দেখতে কেমন হয়েছিলো।তখন আম্মুজান কোথায় যেন হারিয়ে যান।কিছুক্ষন পর বলেন,"আমার ছেলেটা হইছিলো পুরো আমার মত।কত বড় বড় চোখ।কিন্তু মনে হয় একটূ খাটো হতো।"আর কিছু আম্মু কখনো বলেন না।ভাইয়ার কোন স্মৃতি নেই আমাদের কাছে।আম্মুর কাছে সে আজ শুধুই এক দেবশিশু যে সবাইকে মজা দেখিয়ে ভেগে গেছে।সবাই যার যার মত ব্যস্ত।মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য আসা সেই বড় বড় আঁখির ছোট্ট শিশুটির কথা কার ভাবার সময় আছে?আমি শুধু মাঝে মাঝে চিন্তা করে আনন্দ পাই,ভাইয়া যদি বেঁচে থাকতো তাহলে কি কি হতো?মনে মনে বলি, "ভাইয়া তুমি যেখানেই থাকো,মঙ্গলময় যেন তাঁর রহমতের বারিধারায় সর্বদা তোমাকে সিক্ত করে রাখেন।"

প্রার্থনা করি যেন কোন পিতাকে তার নিজের মৃত সন্তানের বোঝা কাঁধে তুলতে না হয়,কোন মমতাময়ী মা যেন চোখের সামনে তার ছোট্ট সদ্য জন্ম হওয়া শিশুটির কষ্ট পেয়ে মৃত্যু না দেখেন।
********************************************************************
আজকে আমার লিখার উদ্দেশ্য কাউকে কোন দুঃখ মনে করিয়ে দেয়া নয়।অথবা নিজের দুঃখ জানানোও নয়।আমি আজ লিখছি একজন মানুষের জন্য।মানুষটির নাম শাম্মা।প্রশ্ন করতে পারেন,শাম্মা ভাই আমার কে?এর উত্তর হলো, উনি আপনার যা হোন আমারও তা হোন।আমি উনাকে কখনো দেখিনি,কখনো উনার সাথে কথা বলিনি।সত্যি বললে, ফারহান ভাই একটি পোস্টে উনার কথা বলার পর আমি এই মানুষটির কথা জানি।আমি জানতে পারি জানতে পারি কাঁচাপাকা চুলের মানুষটি একজন পুরকৌশলী।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা এই মানুষটি অনেক প্রকৌশলীর মত দেশ ত্যাগ না করে দেশেই পড়ে ছিলেন।উনার কাছে দীক্ষা নিয়ে অনেকেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল বিদ্যা পড়ার সুযোগ পেয়েছেন এটাও নিশ্চিত বলতে পারি।যে কোচিং সেন্টারে উনি শিক্ষক ছিলেন,আমি সেখানে বেশ কিছুদিন ক্লাস করেছিলাম।হয়তো উনার ক্লাসও পেয়েছি।এইটুকুই শুধু চেনা জানা যা হলেও হতে পারে।

আজকে আমি এই সাদাসিদে হাস্যমুখী মানুষটির জীবনের বর্তমান দুঃসহ সময়ের কথা বলবো।এই মানুষটি গত ২১ অক্টোবর মালিবাগের কাছে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।হাস্যমুখী মানুষটিরে হাসি মুছে গিয়েছে কিনা জানিনা,কিন্তু মানুষটি আজ তার একটি পা হারাতে বসেছে।তার ডান পাটি ভেঙ্গে হয়েছে তিন টুকরো।

এই মানুষটি আমার পড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়।এই মানুষটি আমার কোন আত্নীয়ও নয়।আমি জানি,উনি একজন মানুষ।আপনার আমার মত সাধারণ একটা বাঙ্গালী।সকালে উঠে হাই তুলে দাঁত মাজেন,বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা হলে সব কাজ-চাকরী ফেলে টিভির সামনে বসে বলেন "মার সাকিব"।কিন্তু আর মাত্র কিছুদিন পর হয়তো এই সুন্দর দিনগুলো উনার কাছে আসবেনা।হয়তো উনি নিথর দেহ নিয়ে বসে থাকবেন ঘরের এক কোণে।আনন্দ উল্লাসে মুখর হওয়ার আগে খেয়াল করবেন, তার একটি পা নড়ছেনা।রাস্তা ঘাটে স্ক্র্যাচ নিয়ে হাটবেন,কেউ কেউ করুণার দৃষ্টি নিয়ে তাকাবেন,মুখে বলবেন "আহারে!"।

আমাদের এই ছোট্ট ব্লগ পরিবারের আমি একজন খুব পুরোনো নই এমন একজন সদস্য।আমি এই ব্লগটিতে সক্রিয়ভাবে আছি হয়তো বছরখানেক হবে।কত রকম কত কিছু দেখলাম।মানুষের কুৎসিত রুপটা জানার সাথে সাথে অদ্ভুতভাবে এটা বুঝতে শুরু করলাম,যে যাই বলুক ৭১ এ জন্ম নেয়া এই শিশু দেশটিতে কিছু অসাধারণ আত্না শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন।আমি এই পবিত্র মানুষগুলোকে ব্লগে পেয়ে যারপরোনাই আনন্দিত।তাদের পবিত্রতার সন্ধান পাই যখন উপমা,নাহিদার জন্য একসাথে সবাই এগিয়ে আসেন।শ্রদ্ধেয় মনজুরুল ভাই,জ্বীনের বাদশা ভাই সবাই এটা সেটা নানান পরিকল্পনা হাতে নেন।তাদের মত মানুষগুলোর জন্য আজকে আমার এই লেখা।

যেদিন নাহিদার মৃত্যুর খবর জানতে পাই,নিজেকে অনেক ক্ষুদ্র মনে হয়েছিলো।আমার মনে হয়েছিলো,আমি কি আরো সাহায্য করতে পারতাম না?নিজেকে অনেক ছোট লেগেছিলো বিশ্বাস করেন।মৃত্যু সংবাদের ব্লগটি দেখে আমি বেশ কিছুক্ষণ নিথর হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি।তাই আজকে যখন শাম্মা ভাইয়ের জন্য অর্থ সাহায্য দরকার,তখন আমি কেন চুপ করে বসে থাকবো?আজ যখন ফারহান ভাই আমাকে ফেসবুকে জিজ্ঞেস করলেন, "শাম্মা ভাইয়ের জন্য কিছু জোগাড় হলো"...আমি তখন খুব লজ্জিত বোধ করেছি।তখন মনে হয়েছে আমার ক্ষমতায় যা আছে তাই না হয় করি।ফারহান ভাই "একজন বড়ভাইকে বাঁচাতে সাহায্য চাই" এই শিরোনামে দুদিন আগে পোস্ট দিয়েছিলেন।লিখাটা হয়তো সবার চোখে আসেনি।তাই আমি আবার আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ করবো, একবার লিখাটি পড়ুন।

যিনি আমার লিখাটি এখন পড়ছেন তাকে একবার অনুরোধ করবো নিজের পা গুলোর দিকে তাকাতে।অনুভব করুন তো,এই পা গুলোর একটিও যদি হারিয়ে যায় তখন সেই অসহায় পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার কথা।এই মানুষটি হয়তো আপনার কেউ নয়,আবার এই মানুষটি হয়তো আপনার আমার চোখের সামনে একদিন গটগট করে হেঁটে চলা হঠাৎ চোখে পড়া মানুষটি।আমাদের এই ব্যস্ত দুনিয়ায় কেউ কারো কথা ভাবিনা,নিজেকে নিয়ে সদা ব্যস্ত আমরা কখনো হয়তো নিজেকে জিজ্ঞেসটাও করিনা কেমন আছি আমরা।আমার এই লিখাটি ওই মানুষগুলোর ব্যস্ত জীবনের অল্প কিছু মুহূর্ত চাওয়ার জন্য লিখা।আপনি শাম্মা ভাইকে তার পঙ্গুত্ব থেকে বাচাতে পারবেন কিনা এটা চিন্তা নাহয় নাই করুন,একবার কি ওই না দেখা মানুষটির অসহায় মুখটি ভাবতে পারবেন?পারবেন কি হাসপাতালে পড়ে থাকা শাম্মা ভাই আর তার পরিবারের দুঃসহ চিত্রটি কল্পনা করতে?শেষবার ভাবুনতো,আল্লাহ না করুক যদি আপনার এমনটি হতো তবে নিজের নিঃসহায় অবস্থার আশাহীন ভবিষ্যতটি কেমন হতো?

কতজন কতটাকা দিলে কত টাকা হবে আমি জানিনা।আমি জানি শাম্মা ভাইকে পঙ্গুত্বের অসহায় আগামী থেকে বাঁচাতে আমরা যে যাই পারি তাই নিয়ে যদি এগিয়ে আসতে পারি তবেই আবার এই মানুষটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।একজন,অন্ততঃ একজন মানুষও যদি আমার এই লিখাটি পড়ে তার জন্য এগিয়ে আসতে রাজী হোন,তাহলে পোস্টটির উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে।সেই একজন বা বহুজনকে আবারো অনুরোধ এই লিখাটিপড়ুন।কিভাবে এই ভাইকে সাহায্য করা যায় তা বিস্তারিত লিখা আছে ওই পোস্টে।আপনি সাহায্য করুন আর না করুন এই সাদাসিদে মানুষটির কথা,তার অসহায় মুখটির কথা চিন্তা করুন যা আপনার আমার আশায় তাকিয়ে আছে হাসপাতালের করিডোরে।

আপনাদের সুবিধার জন্য আমি আরেকবার উনাকে অর্থ সাহায্য পাঠানোর ঠিকানাটি জানিয়ে দিয়ে রাখছিঃ Kazi Reshad Islam A/C no- 101-102-12687 Eastern Bank Ltd Dhanmondi Branch, Dhaka-1205 Mobile no - +880 1819 202020 মেইল--


[বহুদিন আগে এভাবেই আরেকজন হবু স্থপতির মায়ের চিকিৎসার জন্য ক্লাস ডায়াসে দাঁড়িয়ে সবাইকে আহবান জানিয়েছিলাম "মাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন"।জবাবে একজন জিজ্ঞেস করেছিলো,আমার কমিশন কত।এর পর থেকে আর কখনো কাউকে কারো সাহায্যের জন্য আবেদন জানাইনি।ভেবেছিলাম আর কখনোই এসবে নিজেকে জড়াবোনা।আজকে হঠাৎ করে কেন যেন শাম্মা ভাইয়ের দুর্ঘটনার কথা মনে করে নিজের পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেওয়া ভাইটির কথা মনে হলো।আমার ভাইটি হয়তো শাম্মা ভাইয়ের বয়সী হতো।তাই সবকিছু ভুলে শাম্মা ভাইয়ের মত তরতাজা যুবককে নিষ্ঠুর পৃথিবীর নোংরা রূপদর্শন থেকে মুক্তি দিতে একটি সাহায্য পোস্ট লিখে ফেললাম।কেউ সাহায্য পোস্টে বিরক্ত হলে তার জন্য বলছি,আমার প্রতি আরো বেশি বিরক্তি প্রদর্শন করুন,কিন্তু এই মানুষটির জীবনটা নষ্ট হতে দিয়েন না।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29034425 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29034425 2009-10-30 01:37:35
একটি ভ্রুনহত্যার গল্প এবং আমার নিজের প্রতি ঘৃণাবোধ...(কাল রাতে করা এই পোস্টটি সামুর বাগে খেয়ে ফেলায় আবার রিপোস্ট করতে হলো)
আসল কথায় ফিরে আসি।আমি খালার ফোন ধরে সালাম দিতেই খালা কান্না কান্না কন্ঠে আমাকে অনেকগুলো কথা একসাথে বলতে লাগলেন।অস্পষ্টভাবে যা বললেন তাতে আমি যা বুঝলাম তা হলো,রিমি হাসপাতালে।আজকে ওর abortion করা হয়েছে।সমস্যা হয়েছে ওর জ্ঞান এখনো ফেরেনি।

রিমির পরিচয় দেয়া দরকার।রিমি আমার খালার পালিত কন্যা।ওকে দত্তক নেয়ার ঘটনাটা খুবই বিচিত্র।খালার সন্তান মারা যাওয়ার পর খালা একটু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলেন।তখন ঘরের কাজের জন্য একজন বুয়া রাখা হয়।বুয়ার মাসখানেক আগে একটা মেয়ে হয়েছিলো।খালা বুয়ার বাচ্চাকে নিজের খাটে শুইয়ে ঘুম পাড়াতেন,কোলে নিয়ে রাখতেন,এমনকি খাইয়েও দিতেন।খালু এই ব্যাপার নিয়ে মহা পেরেশান ছিলেন।আমার আম্মাকে প্রায় বলতেন "আপা বুয়ার বাচ্চার জন্য আমি আজকাল ঘুমাইতে পারিনা,আমাকে আপনার বোন সোফায় ঘুমাইতে বলে নিজে বাচ্চারে আমাদের খাটে রেখে দেয়।বলেনতো এইটা কিছু হইলো?"।

দুঃখজনকভাবে বুয়া কাজ করার দুইমাস পরে তার শরীরে লিউকিমিয়া ধরা পড়ে।খালা শুধু বুয়ার কন্যাসন্তানটির জন্য হলেও বুয়ার অনেক চিকিৎসা করিয়েছিলেন।কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। মৃত্যুর কয়েকঘন্টা আগে হঠাৎ করে বুয়া খুব হাসতে শুরু করে।একসময় খালার হাত ধরে বলে,"আপনে কিন্তু ওর মা আছেন,আপনারে কীরা দিয়া গেলাম"। আমার মমতাময়ী খালা এভাবেই রিমিকে পান। রিমি আর আমার বয়স প্রায় সমান।খুব বেশি হলে বছরখানেক ছোট হবে।ওর আপন মা মারা যাওয়ার পর খালা কখনো ওকে এতটুকু কষ্ট দিয়ে মানুষ করেননি।আমরা এবং খালার আত্নীয়স্বজনদেরকে খালা প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন,উনাকে যদি কেউ আপন মনে করে তাহলে এই বাচ্চাকেও আপন ভেবে নিতে হবে।একবার আমার এক মামা কিছু একটা বলেছিলেন,মুনিয়া খালা চোখের পানি নাকের পানি এক করে তাকে ত্যাজ্য করেন।ওই মামা পরে রিমির জন্য ১০ কেজি চমচম কিনে খালার বাসায় রওনা হোন।খালা তো তার দরজা খুলেননা কোনভাবেই।পরে খালুজান অনেক কষ্টে খালাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মামার সাথে ভাব করায় দেন।খালা শর্ত দিছিলেন,মামা যেন তার বাসায় কখনো মিষ্টি ছাড়া না আসে।আমরাও মামার বদৌলতে প্রায়ই চমচম খেয়ে তৃপ্তিভরা ঢেঁকুর তুলতাম।উল্লেখ্য রিমির প্রিয় খাবার ছিলো চমচম।

সবই ঠিক ছিলো,শুধু সমস্যা ছিলো খালুজান।খালা মনে করতেন খালুজান রিমিকে আপন মেয়ের মত ভালোবাসেননা।যদিও রিমি কখনো অভিযোগ করেনি,বরং খালুর সাথে দেখতাম তার বেশ ভালোই ভাব।খালু তার এই পালক কন্যাকে কখনো একবারের জন্যও সামান্য ধমক দেয়নি।তবুও খালা রিমিকে নিয়ে খালুজানকে প্রায়ই বকাঝকা করতেন।

সেই রিমির চার মাস আগে আকদ হয়ে গেছে আর আজকে কি ভয়ঙ্কর কথা শুনলাম।আমি খালাকে হাসপাতালের নাম জেনে এখুনি আসছি কথা দিয়ে ফোন রাখলাম।এর এক ঘন্টা পর আমি মনোয়ারা হাসপাতালে রিমির কেবিনের পাশের খোলা বারান্দায় দাঁড়ানো।আমার পাশে রিমির জামাই মুখ কাঁচুমাঁচু করে বসে আছে।আমি তাকে মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম, abortion এর সিদ্ধান্ত কেন নিলো! উনি আমার দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে বললো, "এখনো তো ঘরে তুলে নেইনি।আম্মা বলছে অনুষ্ঠান করে বউ ঘরে নেবেন।তাই অনুষ্ঠানের আগে বাচ্চা হয়ে গেলে সমস্যা।এইজন্যই আর কি..."।আমি এহেন জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম।তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও আর ইচ্ছা হলোনা।খালা আর খালুর পাশে যেয়ে দাঁড়ালাম। খালা তখন অঝোরে কাঁদছে মেয়ের পাশে বসে।খালু খালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চুপ করে।আমাকে দেখে খালা কাছে টেনে এনে বসালেন।তারপর কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, "তোমার খালুজানরে জিজ্ঞেস করো সে কেন কিছু করলোনা।এখন আমার সাথে আহলাদ দেখায় বলে মেয়ের কিছু হবেনা।কোনদিন এই লোক মেয়েটাকে নিজের মেয়ে ভাবেনাই।" খালু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ায় বলে, "আমি কি করবো?তোমার মেয়ের জামাই এমন সিদ্ধান্ত নিলে ওদের মধ্যে আমি কি কিছু বলার হক রাখি?" খালা এবার রেগে গেলো, "তুমি আমার সামনে থেকে দূর হও।তোমার মুখ দেখাও পাপ"। খালু আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন,তারপর কেবিনের বাহিরে হাঁটা দিলো।খালা আমাকে এরপর জিজ্ঞেস করলো,নাস্তা করছি নাকি।হালকা পাতলা কথা বললো।

এর একটু পর রিমির প্রথমবারের মত সেদিন জ্ঞান ফিরলো।খালা হন্তদন্ত হয়ে রিমির মাথার কাছে যেয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, "মা এখন কেমন লাগতেছে?ব্যাথা আছে?"। রিমি একটা কেমন অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে খালার দিকে তাকালো।তারপর খেব মৃদু কন্ঠে বললো, "আম্মু ভাইয়াকে অনেকদিন পর দেখলাম।ও তো বোনের কথা একবারও ভাবেনা।" আমি রিমির দিকে হাসি দিয়ে তাকিয়ে বললাম, "সময় পাইনারে।বাসাতেও আজকাল থাকিনা তেমন"। রিমির চোখ দিয়ে দেখলাম টপ টপ করে পানি পড়ছে।আমাকে কান্না কান্না গলায় বললো, "ভাইয়া জানিস ডাক্তার না মানা করছিলো বাচ্চাটাকে না মারতে,আমি সকালে আসলে ডাক্তার আমাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখায় আমার বাচ্চার ছোট্ট মুখখানা,তার হৃদপিন্ডের ধুক ধুক শুনায়।জানিস ভাইয়া অনেক ছোট্ট ছোট্ট হাত ছিলো।এমন কেন হলো রে?আমার বাচ্চাটা কি কোনদিন আমাকে মাফ করবেরে ভাইয়া?আমি অনেক কাঁদছিলাম যেন বাচ্চাটাকে না মারে,কিন্তু আমার কথা কেউ শুনেনাই।ভাইয়া আমার বাচ্চাটা এখন কই আছে বলতো?বেহেশতে না ভাইয়া?"

আমি চোখের পানি ঢাকার জন্য কেবিনের বাহিরে চলে আসি।পিছনে শুনলাম খালা অঝোরে কাঁদছে।বাহিরে এসে শার্টের কোনা দিয়ে চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ।একটু স্বাভাবিক হলে পিছন ফিরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলাম।আমার খালুজান হাসপাতালের করিডোরের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।আমি উনার কাছে আস্তে আস্তে হেঁটে গেলাম।দেখলাম উনি রিমির আসল বাবা ফরিদ উদ্দিন সাহেবের কাঁধে হাত দিয়ে কান্নাভেজা চোখে এক গাদা কথা বলছেন। "বুঝলা ফরিদ আমার মেয়েটাকে যখন স্কুল থেকে নিয়ে আসতাম তখন প্রায় সে মিস্টির দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতো।প্রতিদিন আমরা মিস্টির দোকানে যেয়ে একসাথে চমচম খেতাম।ওর জন্য প্রতিরাতে চমচম কিনে আনতাম।ওর মা ঘুমায় থাকতো,তখন আমি ওকে কোলে করে নিয়ে বারান্দায় ঘুরতাম আর মিস্টি ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুখে দিতাম।ও আমার কোলেই খেতে খেতে ঘুমায় পড়তো।আজকে আমার এই মামুনীটা এভাবে হাসপাতালে শুয়ে আছে আর আমি ওর জন্য কিছু করতে পারছিনা।" ফরিদ সাহেব মাথা নিচু করে খালুজানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিইয়ে বললো, "কাইন্দেন না।আমাগো মাইয়ার কিছু হইবোনা।"

আমি এই দুই অশ্রসজল পিতার ভালোবাসার দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখলাম।কিছু সময় মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে যায়।আমারো ঠিক এই মুহূর্তে এমনটাই মনে হচ্ছিলো।কত কথা মনে পড়ে গেলো।আমার এস.এস.সি,এইচ.এস.সি পরীক্ষার সময় রিমি প্রতিদিন বাসায় এসে এটা-ওটা রান্না করতো।আমাকে বলতো, "আমার ভাইয়া হলো সবসময় ফাস্ট।তাই এখন পরীক্ষার জন্য ওর খাবারও হবে ফাস্টক্লাস।" আমি এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে বললাম , "বোনরে আমি কোনদিন ফাস্ট হইতে পারিনাই।কিন্তু তুই সবসময় বোন হিসেবে আমার কাছে ফাস্ট ছিলি"।

আরেকবার চোখে পানি মুছতে মুছতে খালার চিৎকার শুনতে পারলাম।আমি হুড়মুড় করে কেবিনের দিকে দৌড় দিলাম।দেখি রিমির শরীর কেমন কুঁকড়িয়ে যাচ্ছে।হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।ডাক্তার ডেকে আনা হলো।রিমির জামাই আফসার সাহেব ছুটাছুটি করতে থাকলেন।ডাক্তার সবাইকে রুম থেকে বাহিরে যেতে বললে আমরা কেবিনের বাহিরে জমায়েত হলাম।আমার খালা অঝোর ধারায় তখন কাঁদছে। "আমার মেয়েটার এমন সর্বনাশ হয়ে গেলো আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম না।কেমন ছেলের কাছে বিয়ে দিলাম।আজকে বিয়ে বাঁচাতে মেয়েটাকে মনে হয় মেরেই ফেললাম।"...খালার এইসব কথা শুনে রিমির জামাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো।আমি উনাকে যেয়ে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে লাগলাম, "বউ বলে কি রিমির সাথে যা ইচ্ছা করার অনুমতি পায়া গেছেন।ওরে মানুষ মনে হয়না?নিজের বাচ্চারে এভাবে মারতে ঘৃনা হলোনা?" আমি এই কথা বলে সোজা হাসপাতালের বাহিরে চলে আসলাম।আমার কিচ্ছু তখন ভালো লাগছিলোনা।কি অসহ্য এই মানব জীবন।আমরা মানুষগুলো দিন দিন কেমন যেন অমানুষ হয়ে যাচ্ছি।আজকে রিমির সাথে যা হয়েছে,সামাজিকতার দায়ে না জানি আর কত মেয়ের সাথে এমন হয়ে চলছে প্রতিদিন।

রাত আটটার দিকে রিমির কেবিনে আমরা সবাই।অতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য ওর অবস্থা তখন মুমূর্ষ।সেই সময় পান খেতে খেতে আবির্ভাব ঘটে রিমির শ্বাশুরীর।উনি রিমির কপালে হাত দিয়ে বলেন, "এখুন কিমুন আছে মাইয়া?" খালা কটমট চোখে তাকিয়ে বলেন, "আমি যদি আগে জানতাম আপনারা আমার মেয়ের সাথে এই কাজ করবেন তাহলে..." ।রিমির শ্বাশুরী খালার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে বলেন, "আমি কি জানতাম আপনার বাসায় আমার পোলা যায়া থাকে?আর মাইয়া তো বড় হইছিলো।তার বুদ্ধি থাকলেইতো পোয়াতি হওয়া লাগতোনা।আমার পোলাটাও যে বেকুব এইটাও খাটি সত্য।" রিমির আসল পিতা ফরিদ সাহেব মহিলার দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বললো, "আমার স্যান্ডেলটা কিন্তু চামড়ার না প্লাস্টিকের।মুখে পড়লে দাগ যাইবোনা।আমি যদি বুজতাম আগে,আমার মাইয়ারে বিয়া বইতে দিতামনা।আপনার পোলারে থুতু দিয়া আসতাম।" রিমির শ্বাশুরী এই কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।তিনি সাথে উঠে উঠে দাঁড়িয়ে গজগজ করতে করতে হাঁটা দিলেন।পিছন থেকে তার ছেলে "আম্মা আম্মা" করে নপুংশকের মত হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে গেলো।

রাত্রি নয়টায় রিমির জ্ঞান কিছুটা ফিরে আসে।সে "আব্বু আব্বু" বলে ডাকা শুরু করে।খালুজান রিমির খাটের পাশে বসে শক্ত করে ওর হাত ধরে আছেন যেন কেউ তার মেয়েকে তার থেকে কেঁড়ে নিতে না পারে।রিমি খালুজানের আঙ্গুলগুলো আস্তে আস্তে দুর্বল ভাবে ধরে মৃদু কন্ঠে খালুকে আরো কাছে আসতে বললো।ওর দুর্বল গলার স্বর আমরা ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলাম।কেমন যেন তীব্র হয়ে তা কানে বিঁধছে। "আব্বু তুমি যে আমাকে মার থেকে বেশি ভালোবাসো এটা আমি কিন্তু জানি।তোমার মনে আছে আমি যখন ছোট্ট কালে টাইফয়েড জ্বরে অজ্ঞান হয়ে ছিলাম,তখন তুমি সব কাজ রেখে সারাদিন আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছিলে?যে ভালোবাসা তুমি আর আম্মু আমাকে দিছো আমি হাজার জনমেও এর ঋণ শোধ করতে পারবোনা।আমি মারা গেলে তুমি কিন্তু আম্মুর অনেক খেয়াল নিবা।তুমি আর ভাইয়া ছাড়া আম্মুজানের কেউ নাই।আর আব্বু আমার বাচ্চাটা খুব সুন্দর হইতো জানো।ওর তো বয়স দুই মাস হয়ে গেছিলো।আমার মনে হতো,ও হালকা নড়াচড়াও করতো।আমি ওর সাথে প্রতিদিন রাতে কত কথা বলছি।গতরাতে ও আমাকে স্বপ্নে বলছিলো আম্মু আমার হার্ট ধুকধুক করে।তুমি বেশি নড়াচড়া কইরোনা ঘুমের সময়।"

আমার খালাখালু অসহায় চোখে রিমির পাশে বসে তার কথা শুনছিলো।রিমি শ্বাস টেনে টেনে এতগুলো কথা অনেক কষ্ট করে কিভাবে বললো জানিনা।আমি নিজের চোখের পানি আটাকাতে পারছিলাম না।সবাই রিমিকে বলছিলো ও যেন চুপ করে থাকে।ওর কিচ্ছু হবেনা।কিন্তু আমি জানতাম,অনেক আগেই জানতাম এই নোংরা পৃথিবী ওর জন্য না।

আমার জানাটা মিথ্যা ছিলোনা।রাত তিনটায় রিমি মারা যায়।দিনটি ছিলো ১৯শে অক্টোবর,২০০৮।মারা যাওয়ার আগে সে শেষবার আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, "ভাইয়া আমার বাবুর কাছে যাচ্ছিরে"। আমি এখনও রিমিকে অনেক মনে করি।আমার বোনটা কোথায় আছে,কেমন আছে জানিনা।কিন্তু আমি সবসময় প্রার্থনা করি যেন আমার সকল পুণ্য ও আর ওর অনাগত সন্তানটি পায়।ওর স্বামীকে আমরা কখনো ক্ষমা করিনি।অবশ্য সেও রিমিকে কবর দেয়ার পর থেকে কখনো আর আমাদের সামনে মুখ দেখায়নি।শুনেছি ভদ্রলোক(?) এখন সুইডেনে আছে।আরেকটা বিয়ে যে করেছে এটা না বললেও চলে। আর আমার মুনিয়া খালা সারাদিন তার বাসার বারান্দায় বসে থাকেন।কারো সাথে তেমন কথা বলেননা।শুধু আমি বাসায় গেলে আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন,"তোরা সব এমন কেন?"।এরপর কান্নাকাটি করেন অনেক, যা আমি সহ্য করতে পারিনা বলে নিজেই দুফোঁটা চোখের জল ফেলে বাসা থেকে বের হয়ে আসি।পিছনে শুনতে পাই আমার খালু গম্ভীর কন্ঠে বলতে থাকেন, "কাইদোনা মুনিয়া।আমার মেয়েটা কষ্ট পাবে"।

[লিখায় বর্ণিত ভ্রুণহত্যার ঘটনাটি কল্পিত নয়।নামগুলো আর কিছু চরিত্র পালটে দিয়েছি।গল্পের রিমি মারা গেলেও বাস্তবের রিমি বেঁচে আছে।কিন্তু যে মানসিক যাতনার সে স্বীকার হয়েছে তাকে বেঁচে থাকা বলে কিনা বলতে পারছিনা।তার গুণধর স্বামীও তাই পার পেয়ে গেছেন এবং আপাতত ইউরোপে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছেন।Abortion এর জন্য আমাদের দেশে অনেক মায়ের মৃত্যু ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।আমার জানামতে ব্যাপারটা খুবই কমন।এই লেখাটা সেই মা আর তাদের অনাগত সন্তানের জন্য।আরো বলে নিচ্ছি গল্পতে বর্ণিত অর্ক আমি নই।অর্ক সেই মানুষটি যার থেকে পুরো ব্যাপারটি জানা গেছে।রিমি ও তার অনাগত সন্তানের জন্য সবাই আশা করি একবারের জন্য হলেও প্রার্থনা করবেন।লেখার সময় আমার নিজের প্রতি বেশ ঘৃণাবোধ হয়েছে।কারণ এই নোংরা সমাজের আমিও এক অংশ।] ******************************************************************** সবশেষে আমার কিছু একান্ত দুঃখবোধ ব্লগ সম্পর্কিত।কাল রাতে পোস্টের নিচের অংশে এডিট করতে গিয়ে ফিরে এসে দেখি আমার লিখা গায়েব হয়ে গেছে।এমনকি ড্রাফটেও নেই।আমি ব্লগে সমস্যা অংশে যেয়ে তাদের কাছে মেইল করলাম আমার পোস্টটি ফিরিয়ে আনার।দুপুর ১২টার দিকে তারা আমার পোস্ট ফিরিয়ে দেয় মন্তব্য সহ কিন্তু তা ছিলো সম্পূর্ণ পোস্টের অর্ধেক।বাকি অর্ধেক কোথায় গেল জানিনা।তাই আবার পোস্ট এডিট করতে গেলাম এবং বিরক্তিকর ভাবে আবার পোস্ট উধাও।এ ব্যাপারে তাদের কাছে সমাধান চেয়ে মেইল করলাম,কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার তাদের কোন সাড়াশব্দ পেলামনা এই অব্দি।এভাবে এতগুলো মানুষের মন্তব্য এবং আমার লিখাটি উধাও হয়ে গেলো দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছি।আমি জানিনা ব্লগের মডারেটররা কেন এই সমস্যাগুলো থেকে নিজেদের দূরে রাখেন।আমি কাল রাতে করা আমার পোস্টটি ব্লগে প্রকাশ করতে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়েছি।পাক্কা দুঘন্টা লেগে গেছে লিখাটি ব্লগে আনতে।আমার জানা মতে বাংলা ব্লগের মধ্যে এই ব্লগের ব্যবহারকারী সর্বাধিক।কিন্তু এই যদি হয় ব্লগের হাল আর মডারেটরদের সেবার হাল,তাহলে আপনার আমার মত ব্লগাররা কেন এই ব্লগে আসবেন আর লিখা দিবেন? আমি কালকে রাতে যারা পোস্টে মন্তব্য করেছেন তাদের কাছে অত্যন্ত দুঃখিত।যারা আমাকে দোষারোপ করেছিলেন "অর্ক" মনে করে তাদের জন্য লিখার শেষ অংশে সারকথায় কিছু এডিট করে দিয়েছি।আমার এই পোস্টটি লিখার উদ্দেশ্য ছিলো ভ্রুণহত্যার ব্যাপারটি মানুষের সামনে তুলে আনা।বারবার পোস্ট মুছে যাওয়ায় বিরক্ত হয়েছেন তাদেরকে সামহোয়ার ইন ব্লগের মডারেটরদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করার নিতান্ত কাতর অনুরোধ জানাচ্ছি।ম্যাভেরিক ভাইয়ের ব্লগে গিয়েও একইরকম সমস্যা তার ক্ষেত্রেও হয়েছে বলে শুনেছি। সবশেষে একটাই প্রশ্ন ব্লগের এহেন বাঘ ভালুক থেকে আমাদের বাঁচার উপায় কি বলতে পারেন? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29028609 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29028609 2009-10-19 19:22:26
একটা ভ্রুণ হত্যার সত্য গল্প এবং আমার নিজের প্রতি ঘৃণাবোধ...
আসল কথায় ফিরে আসি।আমি খালার ফোন ধরে সালাম দিতেই খালা কান্না কান্না কন্ঠে আমাকে অনেকগুলো কথা একসাথে বলতে লাগলেন।অস্পষ্টভাবে যা বললেন তাতে আমি যা বুঝলাম তা হলো,রিমি হাসপাতালে।আজকে ওর abortion করা হয়েছে।সমস্যা হয়েছে ওর জ্ঞান এখনো ফেরেনি।

রিমির পরিচয় দেয়া দরকার।রিমি আমার খালার পালিত কন্যা।ওকে দত্তক নেয়ার ঘটনাটা খুবই বিচিত্র।খালার সন্তান মারা যাওয়ার পর খালা একটু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলেন।তখন ঘরের কাজের জন্য একজন বুয়া রাখা হয়।বুয়ার মাসখানেক আগে একটা মেয়ে হয়েছিলো।খালা বুয়ার বাচ্চাকে নিজের খাটে শুইয়ে ঘুম পাড়াতেন,কোলে নিয়ে রাখতেন,এমনকি খাইয়েও দিতেন।খালু এই ব্যাপার নিয়ে মহা পেরেশান ছিলেন।আমার আম্মাকে প্রায় বলতেন "আপা বুয়ার বাচ্চার জন্য আমি আজকাল ঘুমাইতে পারিনা,আমাকে আপনার বোন সোফায় ঘুমাইতে বলে নিজে বাচ্চারে আমাদের খাটে রেখে দেয়।বলেনতো এইটা কিছু হইলো?"।

দুঃখজনকভাবে বুয়া কাজ করার দুইমাস পরে তার শরীরে লিউকিমিয়া ধরা পড়ে।খালা শুধু বুয়ার কন্যাসন্তানটির জন্য হলেও বুয়ার অনেক চিকিৎসা করিয়েছিলেন।কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। মৃত্যুর কয়েকঘন্টা আগে হঠাৎ করে বুয়া খুব হাসতে শুরু করে।একসময় খালার হাত ধরে বলে,"আপনে কিন্তু ওর মা আছেন,আপনারে কীরা দিয়া গেলাম"। আমার মমতাময়ী খালা এভাবেই রিমিকে পান। রিমি আর আমার বয়স প্রায় সমান।খুব বেশি হলে বছরখানেক ছোট হবে।ওর আপন মা মারা যাওয়ার পর খালা কখনো ওকে এতটুকু কষ্ট দিয়ে মানুষ করেননি।আমরা এবং খালার আত্নীয়স্বজনদেরকে খালা প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন,উনাকে যদি কেউ আপন মনে করে তাহলে এই বাচ্চাকেও আপন ভেবে নিতে হবে।একবার আমার এক মামা কিছু একটা বলেছিলেন,মুনিয়া খালা চোখের পানি নাকের পানি এক করে তাকে ত্যাজ্য করেন।ওই মামা পরে রিমির জন্য ১০ কেজি চমচম কিনে খালার বাসায় রওনা হোন।খালা তো তার দরজা খুলেননা কোনভাবেই।পরে খালুজান অনেক কষ্টে খালাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মামার সাথে ভাব করায় দেন।খালা শর্ত দিছিলেন,মামা যেন তার বাসায় কখনো মিষ্টি ছাড়া না আসে।আমরাও মামার বদৌলতে প্রায়ই চমচম খেয়ে তৃপ্তিভরা ঢেঁকুর তুলতাম।উল্লেখ্য রিমির প্রিয় খাবার ছিলো চমচম।

সবই ঠিক ছিলো,শুধু সমস্যা ছিলো খালুজান।খালা মনে করতেন খালুজান রিমিকে আপন মেয়ের মত ভালোবাসেননা।যদিও রিমি কখনো অভিযোগ করেনি,বরং খালুর সাথে দেখতাম তার বেশ ভালোই ভাব।খালু তার এই পালক কন্যাকে কখনো একবারের জন্যও সামান্য ধমক দেয়নি।তবুও খালা রিমিকে নিয়ে খালুজানকে প্রায়ই বকাঝকা করতেন।

সেই রিমির চার মাস আগে আকদ হয়ে গেছে আর আজকে কি ভয়ঙ্কর কথা শুনলাম।আমি খালাকে হাসপাতালের নাম জেনে এখুনি আসছি কথা দিয়ে ফোন রাখলাম।এর এক ঘন্টা পর আমি মনোয়ারা হাসপাতালে রিমির কেবিনের পাশের খোলা বারান্দায় দাঁড়ানো।আমার পাশে রিমির জামাই মুখ কাঁচুমাঁচু করে বসে আছে।আমি তাকে মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম, abortion এর সিদ্ধান্ত কেন নিলো! উনি আমার দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে বললো, "এখনো তো ঘরে তুলে নেইনি।আম্মা বলছে অনুষ্ঠান করে বউ ঘরে নেবেন।তাই অনুষ্ঠানের আগে বাচ্চা হয়ে গেলে সমস্যা।এইজন্যই আর কি..."।আমি এহেন জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম।তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও আর ইচ্ছা হলোনা।খালা আর খালুর পাশে যেয়ে দাঁড়ালাম। খালা তখন অঝোরে কাঁদছে মেয়ের পাশে বসে।খালু খালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চুপ করে।আমাকে দেখে খালা কাছে টেনে এনে বসালেন।তারপর কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, "তোমার খালুজানরে জিজ্ঞেস করো সে কেন কিছু করলোনা।এখন আমার সাথে আহলাদ দেখায় বলে মেয়ের কিছু হবেনা।কোনদিন এই লোক মেয়েটাকে নিজের মেয়ে ভাবেনাই।" খালু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ায় বলে, "আমি কি করবো?তোমার মেয়ের জামাই এমন সিদ্ধান্ত নিলে ওদের মধ্যে আমি কি কিছু বলার হক রাখি?" খালা এবার রেগে গেলো, "তুমি আমার সামনে থেকে দূর হও।তোমার মুখ দেখাও পাপ"। খালু আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন,তারপর কেবিনের বাহিরে হাঁটা দিলো।খালা আমাকে এরপর জিজ্ঞেস করলো,নাস্তা করছি নাকি।হালকা পাতলা কথা বললো।

এর একটু পর রিমির প্রথমবারের মত সেদিন জ্ঞান ফিরলো।খালা হন্তদন্ত হয়ে রিমির মাথার কাছে যেয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, "মা এখন কেমন লাগতেছে?ব্যাথা আছে?"। রিমি একটা কেমন অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে খালার দিকে তাকালো।তারপর খেব মৃদু কন্ঠে বললো, "আম্মু ভাইয়াকে অনেকদিন পর দেখলাম।ও তো বোনের কথা একবারও ভাবেনা।" আমি রিমির দিকে হাসি দিয়ে তাকিয়ে বললাম, "সময় পাইনারে।বাসাতেও আজকাল থাকিনা তেমন"। রিমির চোখ দিয়ে দেখলাম টপ টপ করে পানি পড়ছে।আমাকে কান্না কান্না গলায় বললো, "ভাইয়া জানিস ডাক্তার না মানা করছিলো বাচ্চাটাকে না মারতে,আমি সকালে আসলে ডাক্তার আমাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখায় আমার বাচ্চার ছোট্ট মুখখানা,তার হৃদপিন্ডের ধুক ধুক শুনায়।জানিস ভাইয়া অনেক ছোট্ট ছোট্ট হাত ছিলো।এমন কেন হলো রে?আমার বাচ্চাটা কি কোনদিন আমাকে মাফ করবেরে ভাইয়া?আমি অনেক কাঁদছিলাম যেন বাচ্চাটাকে না মারে,কিন্তু আমার কথা কেউ শুনেনাই।ভাইয়া আমার বাচ্চাটা এখন কই আছে বলতো?বেহেশতে না ভাইয়া?"

আমি চোখের পানি ঢাকার জন্য কেবিনের বাহিরে চলে আসি।পিছনে শুনলাম খালা অঝোরে কাঁদছে।বাহিরে এসে শার্টের কোনা দিয়ে চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ।একটু স্বাভাবিক হলে পিছন ফিরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলাম।আমার খালুজান হাসপাতালের করিডোরের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।আমি উনার কাছে আস্তে আস্তে হেঁটে গেলাম।দেখলাম উনি রিমির আসল বাবা ফরিদ উদ্দিন সাহেবের কাঁধে হাত দিয়ে কান্নাভেজা চোখে এক গাদা কথা বলছেন। "বুঝলা ফরিদ আমার মেয়েটাকে যখন স্কুল থেকে নিয়ে আসতাম তখন প্রায় সে মিস্টির দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতো।প্রতিদিন আমরা মিস্টির দোকানে যেয়ে একসাথে চমচম খেতাম।ওর জন্য প্রতিরাতে চমচম কিনে আনতাম।ওর মা ঘুমায় থাকতো,তখন আমি ওকে কোলে করে নিয়ে বারান্দায় ঘুরতাম আর মিস্টি ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুখে দিতাম।ও আমার কোলেই খেতে খেতে ঘুমায় পড়তো।আজকে আমার এই মামুনীটা এভাবে হাসপাতালে শুয়ে আছে আর আমি ওর জন্য কিছু করতে পারছিনা।" ফরিদ সাহেব মাথা নিচু করে খালুজানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিইয়ে বললো, "কাইন্দেন না।আমাগো মাইয়ার কিছু হইবোনা।"

আমি এই দুই অশ্রসজল পিতার ভালোবাসার দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখলাম।কিছু সময় মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে যায়।আমারো ঠিক এই মুহূর্তে এমনটাই মনে হচ্ছিলো।কত কথা মনে পড়ে গেলো।আমার এস.এস.সি,এইচ.এস.সি পরীক্ষার সময় রিমি প্রতিদিন বাসায় এসে এটা-ওটা রান্না করতো।আমাকে বলতো, "আমার ভাইয়া হলো সবসময় ফাস্ট।তাই এখন পরীক্ষার জন্য ওর খাবারও হবে ফাস্টক্লাস।" আমি এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে বললাম , "বোনরে আমি কোনদিন ফাস্ট হইতে পারিনাই।কিন্তু তুই সবসময় বোন হিসেবে আমার কাছে ফাস্ট ছিলি"।

আরেকবার চোখে পানি মুছতে মুছতে খালার চিৎকার শুনতে পারলাম।আমি হুড়মুড় করে কেবিনের দিকে দৌড় দিলাম।দেখি রিমির শরীর কেমন কুঁকড়িয়ে যাচ্ছে।হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।ডাক্তার ডেকে আনা হলো।রিমির জামাই আফসার সাহেব ছুটাছুটি করতে থাকলেন।ডাক্তার সবাইকে রুম থেকে বাহিরে যেতে বললে আমরা কেবিনের বাহিরে জমায়েত হলাম।আমার খালা অঝোর ধারায় তখন কাঁদছে। "আমার মেয়েটার এমন সর্বনাশ হয়ে গেলো আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম না।কেমন ছেলের কাছে বিয়ে দিলাম।আজকে বিয়ে বাঁচাতে মেয়েটাকে মনে হয় মেরেই ফেললাম।"...খালার এইসব কথা শুনে রিমির জামাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো।আমি উনাকে যেয়ে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে লাগলাম, "বউ বলে কি রিমির সাথে যা ইচ্ছা করার অনুমতি পায়া গেছেন।ওরে মানুষ মনে হয়না?নিজের বাচ্চারে এভাবে মারতে ঘৃনা হলোনা?" আমি এই কথা বলে সোজা হাসপাতালের বাহিরে চলে আসলাম।আমার কিচ্ছু তখন ভালো লাগছিলোনা।কি অসহ্য এই মানব জীবন।আমরা মানুষগুলো দিন দিন কেমন যেন অমানুষ হয়ে যাচ্ছি।আজকে রিমির সাথে যা হয়েছে,সামাজিকতার দায়ে না জানি আর কত মেয়ের সাথে এমন হয়ে চলছে প্রতিদিন।

রাত আটটার দিকে রিমির কেবিনে আমরা সবাই।অতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য ওর অবস্থা তখন মুমূর্ষ।সেই সময় পান খেতে খেতে আবির্ভাব ঘটে রিমির শ্বাশুরীর।উনি রিমির কপালে হাত দিয়ে বলেন, "এখুন কিমুন আছে মাইয়া?" খালা কটমট চোখে তাকিয়ে বলেন, "আমি যদি আগে জানতাম আপনারা আমার মেয়ের সাথে এই কাজ করবেন তাহলে..." ।রিমির শ্বাশুরী খালার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে বলেন, "আমি কি জানতাম আপনার বাসায় আমার পোলা যায়া থাকে?আর মাইয়া তো বড় হইছিলো।তার বুদ্ধি থাকলেইতো পোয়াতি হওয়া লাগতোনা।আমার পোলাটাও যে বেকুব এইটাও খাটি সত্য।" রিমির আসল পিতা ফরিদ সাহেব মহিলার দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বললো, "আমার স্যান্ডেলটা কিন্তু চামড়ার না প্লাস্টিকের।মুখে পড়লে দাগ যাইবোনা।আমি যদি বুজতাম আগে,আমার মাইয়ারে বিয়া বইতে দিতামনা।আপনার পোলারে থুতু দিয়া আসতাম।" রিমির শ্বাশুরী এই কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।তিনি সাথে উঠে উঠে দাঁড়িয়ে গজগজ করতে করতে হাঁটা দিলেন।পিছন থেকে তার ছেলে "আম্মা আম্মা" করে নপুংশকের মত হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে গেলো।

রাত্রি নয়টায় রিমির জ্ঞান কিছুটা ফিরে আসে।সে "আব্বু আব্বু" বলে ডাকা শুরু করে।খালুজান রিমির খাটের পাশে বসে শক্ত করে ওর হাত ধরে আছেন যেন কেউ তার মেয়েকে তার থেকে কেঁড়ে নিতে না পারে।রিমি খালুজানের আঙ্গুলগুলো আস্তে আস্তে দুর্বল ভাবে ধরে মৃদু কন্ঠে খালুকে আরো কাছে আসতে বললো।ওর দুর্বল গলার স্বর আমরা ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলাম।কেমন যেন তীব্র হয়ে তা কানে বিঁধছে। "আব্বু তুমি যে আমাকে মার থেকে বেশি ভালোবাসো এটা আমি কিন্তু জানি।তোমার মনে আছে আমি যখন ছোট্ট কালে টাইফয়েড জ্বরে অজ্ঞান হয়ে ছিলাম,তখন তুমি সব কাজ রেখে সারাদিন আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছিলে?যে ভালোবাসা তুমি আর আম্মু আমাকে দিছো আমি হাজার জনমেও এর ঋণ শোধ করতে পারবোনা।আমি মারা গেলে তুমি কিন্তু আম্মুর অনেক খেয়াল নিবা।তুমি আর ভাইয়া ছাড়া আম্মুজানের কেউ নাই।আর আব্বু আমার বাচ্চাটা খুব সুন্দর হইতো জানো।ওর তো বয়স দুই মাস হয়ে গেছিলো।আমার মনে হতো,ও হালকা নড়াচড়াও করতো।আমি ওর সাথে প্রতিদিন রাতে কত কথা বলছি।গতরাতে ও আমাকে স্বপ্নে বলছিলো আম্মু আমার হার্ট ধুকধুক করে।তুমি বেশি নড়াচড়া কইরোনা ঘুমের সময়।"

আমার খালাখালু অসহায় চোখে রিমির পাশে বসে তার কথা শুনছিলো।রিমি শ্বাস টেনে টেনে এতগুলো কথা অনেক কষ্ট করে কিভাবে বললো জানিনা।আমি নিজের চোখের পানি আটাকাতে পারছিলাম না।সবাই রিমিকে বলছিলো ও যেন চুপ করে থাকে।ওর কিচ্ছু হবেনা।কিন্তু আমি জানতাম,অনেক আগেই জানতাম এই নোংরা পৃথিবী ওর জন্য না।

আমার জানাটা মিথ্যা ছিলোনা।রাত তিনটায় রিমি মারা যায়।দিনটি ছিলো ১৯শে অক্টোবর,২০০৮।মারা যাওয়ার আগে সে শেষবার আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, "ভাইয়া আমার বাবুর কাছে যাচ্ছিরে"। আমি এখনও রিমিকে অনেক মনে করি।আমার বোনটা কোথায় আছে,কেমন আছে জানিনা।কিন্তু আমি সবসময় প্রার্থনা করি যেন আমার সকল পুণ্য ও আর ওর অনাগত সন্তানটি পায়।ওর স্বামীকে আমরা কখনো ক্ষমা করিনি।অবশ্য সেও রিমিকে কবর দেয়ার পর থেকে কখনো আর আমাদের সামনে মুখ দেখায়নি।শুনেছি ভদ্রলোক(?) এখন সুইডেনে আছে।আরেকটা বিয়ে যে করেছে এটা না বললেও চলে। আর আমার মুনিয়া খালা সারাদিন তার বাসার বারান্দায় বসে থাকেন।কারো সাথে তেমন কথা বলেননা।শুধু আমি বাসায় গেলে আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন,"তোরা সব এমন কেন?"।এরপর কান্নাকাটি করেন অনেক, যা আমি সহ্য করতে পারিনা বলে নিজেই দুফোঁটা চোখের জল ফেলে বাসা থেকে বের হয়ে আসি।পিছনে শুনতে পাই আমার খালু গম্ভীর কন্ঠে বলতে থাকেন, "কাইদোনা মুনিয়া।আমার মেয়েটা কষ্ট পাবে"।

[লিখায় বর্ণিত ভ্রুণহত্যার ঘটনাটি কল্পিত নয়।নামগুলো আর কিছু চরিত্র পালটে দিয়েছি।গল্পের রিমি মারা গেলেও বাস্তবের রিমি বেঁচে আছে।কিন্তু যে মানসিক যাতনার সে স্বীকার হয়েছে তাকে বেঁচে থাকা বলে কিনা বলতে পারছিনা।তার গুণধর স্বামীও তাই পার পেয়ে গেছেন এবং আপাতত ইউরোপে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছেন।Abortion এর জন্য আমাদের দেশে অনেক মায়ের মৃত্যু ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।আমার জানামতে ব্যাপারটা খুবই কমন।এই লেখাটা সেই মা আর তাদের অনাগত সন্তানের জন্য।আরো বলে নিচ্ছি গল্পতে বর্ণিত অর্ক আমি নই।অর্ক সেই মানুষটি যার থেকে পুরো ব্যাপারটি জানা গেছে।রিমি ও তার অনাগত সন্তানের জন্য সবাই আশা করি একবারের জন্য হলেও প্রার্থনা করবেন।লেখার সময় আমার নিজের প্রতি বেশ ঘৃণাবোধ হয়েছে।কারণ এই নোংরা সমাজের আমিও এক অংশ।] ******************************************************************** সবশেষে আমার কিছু একান্ত দুঃখবোধ ব্লগ সম্পর্কিত।কাল রাতে পোস্টের নিচের অংশে এডিট করতে গিয়ে ফিরে এসে দেখি আমার লিখা গায়েব হয়ে গেছে।এমনকি ড্রাফটেও নেই।আমি ব্লগে সমস্যা অংশে যেয়ে তাদের কাছে মেইল করলাম আমার পোস্টটি ফিরিয়ে আনার।কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার তাদের কোন সাড়াশব্দ পেলামনা এই অব্দি।এভাবে এতগুলো মানুষের মন্তব্য এবং আমার লিখাটি উধাও হয়ে গেলো দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছি।আমি জানিনা ব্লগের মডারেটররা কেন এই সমস্যাগুলো থেকে দূরে থাকেন।আমি কাল রাতে করা আমার পোস্টটি ব্লগে প্রকাশ করতে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়েছি।পাক্কা দুঘন্টা লেগে গেছে লিখাটি ব্লগে আনতে।আমার জানা মতে বাংলা ব্লগের মধ্যে এই ব্লগের ব্যবহারকারী সর্বাধিক।কিন্তু এই যদি হয় ব্লগের হাল আর মডারেটরদের সেবার হাল,তাহলে আপনার আমার মত ব্লগাররা কেন এই ব্লগে আসবেন আর লিখা দিবেন? আমি কালকে রাতে যারা পোস্টে মন্তব্য করেছেন তাদের কাছে অত্যন্ত দুঃখিত।যারা আমাকে দোষারোপ করেছিলেন অর্ক মনে করে তাদের জন্য লিখার শেষ অংশে সারকথায় কিছু এডিট করে দিয়েছি।আমার এই পোস্টটি লিখার উদ্দেশ্য ছিলো ভ্রুণহত্যার ব্যাপারটি মানুষের সামনে তুলে আনা।বারবার পোস্ট মুছে যাওয়ায় বিরক্ত হয়েছেন তাদেরকে সামহোয়ার ইন ব্লগের মডারেটরদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করার নিতান্ত কাতর অনুরোধ জানাচ্ছি।ম্যাভেরিক ভাইয়ের ব্লগে গিয়েও একইরকম সমস্যা তার ক্ষেত্রেও হয়েছে বলে শুনেছি। সবশেষে একটাই প্রশ্ন ব্লগের এহেন বাঘ ভালুক থেকে আমাদের বাঁচার উপায় কি বলতে পারেন? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29028188 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29028188 2009-10-19 01:03:52
প্রকৌশল শিক্ষা গ্রহণ এবং তার পরবর্তী চাকরী বাজারে যেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন... (" style="border:0;" />) ক্লাশ করার পর মনে হত কখন বাসায় যাবো একটু বিশ্রামের জন্য।এর মাঝেও কিভাবে যেনো আমরা বেশ অসাধারণ একটা ডিপার্টমেন্টাল ডে আয়োজন করে ফেলেছিলাম ২০০৬ সালে(এর পরে আর এমন জমকালো আয়োজন করার অনুমতি দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ!!!)।একই সাথে পত্রিকা,কনসার্টের জন্য স্পন্সরশীপের টাকার ব্যবস্থা...বহু ঝামেলা করে অবশেষে মাইলসের সাফিনের সাথে স্টেজে উঠে গান গাওয়া,ছবি তোলা।ওইদিন ভোলার মত নয়।যাই হোক অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলে ফেললাম।আসল কথায় আসি।

আমরা বন্ধুবান্ধব সপ্তাহ শেষে যখন হোস্টেলে বা অন্য কোথাও আড্ডা দিতাম তখন প্রায় সময় একে অপরকে জিজ্ঞেস করতাম,পাশ করে কি করবো।আমরা আলোচনা করতাম আমাদের সিনিয়ররা এখন কে কোথায় কি করছে।আমাদের আগে বের হওয়া মাত্র দুটি ব্যাচের এখন প্রায় অনেকে স্কলারশীপ,ওয়েভার নিয়ে দেশের বাহিরে আছে।যারা দেশে আছে তাদের বেশিরভাগ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াচ্ছেন।কিন্তু আমাদের কারো কাছেই মনে হতোনা ওই পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব কারণ খুব ভালো জিপিএ কারো ছিলোনা।আমরা হতাশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিষমমাত্রায় চিন্তায় ছিলাম।এক ভাইয়ার সাথে কথা হলো লেভেল থ্রিতে থাকার সময়।উনি ৪-৫ মাস হলো চাকরী বাজারে বিচরণ করছেন।উনার থেকে চাকরী বাজারের বেশ ভয়াবহ কিছু অভিজ্ঞতার কথা শুনতে হলো।স্কলারশীপের রাস্তা শুনলাম প্রায় বন্ধ।ডিপ্রেশন চলছে সবজায়গায়।ইউ.এস.এর আশা করা খুব কঠিন,কানাডা কিছু দিচ্ছে কিন্তু স্কোর ভালো থাকতে হবে আন্ডারগ্র্যাডে।আমার কুখ্যাত ইউনির টিচাররা জিপিএ জিনিসটাকে নিজেদের পকেটের টাকা মনে করেন।তড়িৎ প্রকৌশলে জিপিএ এমনিতেই অন্যান্য বিভাগ থেকে বেশি উঠে বলেই জানি।কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য,বিভাগের শিক্ষকরা এই মতবাদটাকে কিভাবে ভুল প্রমাণ করা যায় সেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।তাই সাড়ে তিন জিপিএ নিয়ে বের হওয়া ছাত্র শতকরায় ৩৩ ভাগ মাত্র!অথচ এই ছেলেগুলা এস.এস.সি, এইচ.এস.সিতে ডাবল ফাইভ নিয়ে এইখানে ভর্তি পরীক্ষা দিতে সুযোগ পাইছিলো।স্যাররা একবারও ভাবতেন না আমরা সামনে যেয়ে কি করবো এই খারাপ ফলাফল নিয়ে।তবুও আশার ব্যাপার হলো,কিছু স্যার অনেক লিবারেল ছিলো।একটা ঘটনা না বলে পারছিনা।পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স কোর্স নিয়েছিলেন আমাদের এক কুখ্যাত স্যার।ফাইনালে আমরা দেখতে পাই স্যার তার সেকশনের চার সেটের এক সেট সিলেবাস বহির্ভুত দিয়েছেন।পরে কেউ জিজ্ঞেস করার সাহস না পেলেও আমি একদিন উনাকে ব্যাপারটা মিনমিন করে বললাম, "স্যার ডিসি টু ডিসি কনভার্টারের এই জায়গাতো বাদ দিতে বলছিলেন।"স্যার তার দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিলো, "বইয়ে তো হালকা পাতলা থিওরী দেয়া আছে।পাশ করতে হলে তো পুরা বই পড়তে হবে,নাহলে তো কচুর ইঞ্জিনিয়ার হবা।এইখানকার নাম খারাপ করবা।"দুঃখের ব্যাপার তার পরের টার্মে আমরা আবার উনাকে পেয়েছিলাম এবং উনি একই ভাবে আরো কঠিন করে প্রশ্ন করে পরবর্তীতে আমাদের দুই একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পরীক্ষা কেমন দিয়েছি।এমন কিছু শিক্ষকের সাথে কোর্স করলে অবশ্যই আপনাকে ভাবতে হবে পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন কি না!বুয়েটের লেকচারার কিছু অসাধারণ শিক্ষক যেমন মাহবুব স্যার,জালাল স্যার এবং আমার অতি প্রিয় মিখাইল ও রেজোয়ান স্যার ছিলো বলে বেঁচে গেছি।তাদের সাথে আনন্দদায়ক কোর্স করে ভালোমানের জিপিএ তুলতে পেরেছিলাম নাহলে অবশ্যই টারজান ভাইয়ের আদর্শ অনুকরণ করতাম<img src=" style="border:0;" />।

যাই হোক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথামালা শেষ করে চাকরীর ব্যাপারে আসি।পাশ করে টানা দুইমাস থিসিস নিয়ে কুকুরপাগলের মত খেটে সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করলাম কি করবো।বন্ধুরা অনেকেই IELTS,GRE এর জন্য কোচিং করছে।বড়ভাই যারা বাহিরে পড়ছেন তাদের সাথে কথা বললাম।ইউকের কুইন মেরীর এক ভাই বললেন,আর যাই করো ইউকেতে ফান্ডিং আশা করোনা।কানাডা,ইউএসএ ভাইয়েরাও একই কথা বললো,স্কলারশীপ এখন শুধু স্বপ্নে পাওয়া যায়।তাদের কথাবার্তা শুনে ভাবলাম আপাতত বাদ দেই।পরে একেবারে না পাইলে আরব দেশের কিং ফয়সাল ইউনির কথা ভাবা যাবে<img src=" style="border:0;" />।শুনেছিলাম বার্কলির মত জায়গার প্রফেসররা নাকি ক্লাস নেয়।এখন আপাতত একটি চাকরীর কথাই নাহয় ভাবা যাক।তাই বড় ভাইদের থেকে সাহায্য নিয়ে একটা সুন্দর(?!) জীবন বৃত্তান্ত বানিয়ে ফেললাম।ঘাটাঘাটি শুরু করলাম বিডিজবস,প্রথম আলোজবস।অনেকের থেকে জানলাম এইসব সাইট ভুয়া,এখান থেকে কোন চাকরী হবেনা(উল্লেখ্য আমি চাকরী কিন্তু সেখান থেকেই পেয়েছি)।পারলে লিঙ্ক ধরো।এই একটা ব্যাপারে আমার একটু এলার্জী আছে।আমার আম্মা আমাকে পাশ করার পর লজ্জা দিয়ে একদিন বলেছিলেন,পাশ করার পর নিজের যোগ্যতা থাকলে যেন ওটা দেখায় চাকরী নেই।তাই লিঙ্কচিন্তা বাদ দিয়ে আমি একের পর এক চাকরীর জন্য সিভি পাঠানো শুরু করি।ফলাফল প্রায় শূন্য।বন্ধুবান্ধবের অবস্থায়ও একইরকম।তবে ক্লাসের তিন পোলাপাইন কিভাবে যেন ইউকের একটা স্কলারশীপ ম্যানেজ করে ফেলে।আমার এক কাছের বন্ধু পোল্যান্ডে চলে যায় ট্রেনিং নিতে।জিপিএ খুব ভালো ছেলেপেলে সাউথইস্ট,প্রাইম এশিয়া এমন আরো কিছু জায়গায় পড়াতে চলে যায়।কিন্তু বেশিরভাগ পোলাপাইনের অবস্থা আমার মত।লিঙ্ক নাই,মামা চাচার জোর নাই।এর মধ্যেও দুই একজনের টেলিকমে কিভাবে যেন হয়ে যায়(লিঙ্ক ছাড়া ওইখানে আজকাল শুনছি ডাকটাও দেয়না)।আমি এবং আমার কাছের বন্ধুবান্ধব চাকরী তো দূরের কথা,ডাকটাও পাইনা।যারা গত এক দুই বছরের মধ্যে প্রকৌশল পাশ করেছে তারা বেশ ভালো করেই জানেন চাকরী বাজার কতটা জঘন্য এবং করুণ।এই মন্দার সময়েও আমি ফেব্রুয়ারীতে পাশ করার পর থেকে এখনো পর্যন্ত্ গুণে গুণে সাতটি জায়াগায় ডাক পেয়েছিলাম(একটিতে আমি ইনশাল্লাহ চাকরী করতে যাচ্ছি সামনে)।সৌভাগ্যক্রমে সাতটি ছিলো বেশ ভালো প্রতিষ্ঠান,কিন্তু সেখানে যে অভিজ্ঞতাগুলো হয়েছে তা নিতান্তই দুঃখজনক।কয়েকটির অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করা দরকার।ফারহান ভাইয়ের এই সংক্রান্ত একটি লিখা দেখেই মূলতঃ এই ব্লগটি আমার লিখা হলো।আসুন দু একটা শুনা যাক।

প্রথমবারে ডাক পেয়েছিলাম একটি বিখ্যাত ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল কোম্পানিতে যাদের IPS আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি।জানলাম আমার একটা লিখিত পরীক্ষা নেবেন তারা।গেলাম পরীক্ষা দিতে।আগেরদিন বেশ কিছু পড়াশোনা করে গেছিলাম।তারপরো আমি বেশ দ্বন্দে ছিলাম কারণ আমাদের একেবারে পাশাপাশি বুয়েটের একটি ব্যাচ বের হয়েছে যারা আবার আমাদের থেকে এক বছর সিনিয়র।উনাদের সাথে কম্পিট করে চাকরী পাওয়াটা খুব সহজ ছিলোনা।এছাড়াও আই.ইউ.টি,কুয়েটের ছিলো যারা আমাদের কিছুদিন আগে বের হয়েছিলো।জীবনে প্রথম চাকরী বাজারে পদক্ষেপ এবং সেখানে গিয়ে দেখলাম সব ইউনির থেকেই কম বেশি এসেছে।বুয়েটের এক ভাইয়ার সাথে বসে পরীক্ষা দিলাম,বেশ খাতির হলো।কিন্তু আমি পরীক্ষাটি দিয়েছিলাম MBA Admission Test এর অনুরুপ একটি প্রশ্নে।আমি জানিনা কোম্পানীগুলো ইঞ্জিনিয়ার চাইলে সেই যোগ্যতা না দেখে ইংরেজী ভাষার পরীক্ষা নেন কেন?আমি সেখান থেকে ডাক পাই আবার ১০ দিন পর।মোট দশজনকে ডাকা হয় ভাইভাতে এবং আমার সাথের যারা তারা সবাই আমার থেকে কমপক্ষে এক বছরের সিনিয়র ব্যাচ।আমি অবশ্যই ঘাবড়ে গেছিলাম এবং ভাইভা খুব সুবিধার না হলেও খারাপ দেয়নি হয়তো।তবুও ভাইভা দিয়ে বেশ মন খারাপ,কারণ আশানুরুপ হয়নাই।এর আরো ১০ দিন পর বুয়েটের সেই ভাই আমাকে ফোন করে জানায়,কোম্পানী নাকি সেকেন্ড ইন্টারভিউ কল করছে এবং এইবার সে ডাক পেয়েছে।আমি বুঝে নিলাম ফাস্ট ব্যাচের থেকে মনে হয় কাউকেই পছন্দ হয়নাই।কিন্তু না!ধারনা ভুল,পরে জানতে পাই যাদের প্রথম বার ডাকা হয়েছিলো তাদের থেকেই শুধু দুইজন নেয়া হয়।একজন ছিলো চুয়েটের আরেকজন আহসানুল্লাহর।আসল ব্যাপারটি এখন বলা দরকার।চাকরী বাজারে কতটা দুর্নীতি হয় তা আগে শুনে এসেছিলাম।হাতে নাতে ভাইভা দেয়ার পর বুঝেছিলাম।আমি যখন ভাইভার জন্য ডাক পাই তখন চুয়েটের যিনি সিলেক্ট হয়েছিলেন উনি ভাইভা দেয়ার আগে হাতে শুধু মাত্র একটি বই নিয়ে অত্যন্ত হাসিমুখে পড়ছিলেন।বইটি ছিলো হারুনুর রশীদ স্যারের পাওয়ার ইলেক্ট্রনিকস।উল্লেখ্য যে ভাইভাতে যিনি প্রধান প্রশ্নকর্তা ছিলেন তিনি আমাকে ইন্টারভিউতে সরাসরি বলেছিলেন,"আপনাকে আমি হারুনুর রশীদের পাওয়ার ইলেক্ট্রনিকস থেকে প্রশ্ন করছি,সব উত্তর তো পারা উচিত।"হয়তো ব্যাপারটা একটি কাকতাল মাত্র।

এরপর আরেকটি বিখ্যাত কোম্পানীতে ডাক পেলাম।ভাইভাতে আমাকে যিনি প্রশ্ন করছিলেন উনি আমার সামনেই দেখলাম উনার অধস্তন এক কর্মচারীতে গাধা,গরু বলে গালি দিচ্ছেন।পরে জানলাম সেই কোম্পানীতে ১২-১৪ ঘন্টা গরুর মত খাটতে হবে আর বেতন দেবে ১০হাজার টাকা।দুই ব্যাচে ভাগ করে পরে উনারা লিখিত পরীক্ষা নিয়েছিলো যার একটি ব্যাচে আমার ইউনির বন্ধু ছিলো তিনজন।আর একটি ব্যাচে ছিলেন আমি আর আমার খুব ক্লোজ এক বড় ভাই যিনি আমাদের সাথেই বুয়েট থেকে পাশ করেছিলেন।আমার বন্ধুরা বললো তাদের পরীক্ষা খারাপ হয়নাই।প্রশ্ন ভালোই হয়েছে।কিন্তু আমাদের প্রশ্ন অত্যন্ত বাজে হয়েছিলো।তড়িৎ প্রকৌশলী নেয়ার জন্য উনারা যে প্রশ্ন বানিয়েছিলেন তাতে যন্ত্রকৌশলের উপাদান ছিলো বেশি।আমার ওই বড় ভাই পরে বলেছিলেন উনি ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং করে এসেছেন বলে উত্তর করতে পেরেছেন।আমি কষ্ট পাইনি পরীক্ষা ভালো হয়নি বলে কারন এখানে বেতন আর খাটুনির কথা শুনে সিরিয়াসলি পরীক্ষাই দেয়নি।আর তাছাড়া তখন কোম্পানী বলেছিলো ১০০ জন নাকি ইঞ্জিনিয়ার লাগবে।এজন্য আমি ভেবেছিলাম কোথাও না হলে এখানে তো হচ্ছেই।মজার ব্যাপার কোম্পানী পরে পরীক্ষা দিতে আসা ৫০-৬০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন নিয়েছিলো,যার তিনজন আমার বন্ধুরা ছিলো আর একজন ওই বড় ভাই।আরো মজার হলো ওই পরীক্ষায় সর্বাধিক নম্বর পেয়েছিলো আমার এক বন্ধু যার জিপিএ ছিলো সবচেয়ে কম ক্লাসে।মারহাবা! চাকরীক্ষেত্র আসলেও অনেক বিচিত্র এবং কঠিন এক জায়গা।

এর বহুদিন পরে একটি বায়োমেডিকেল কোম্পানীতে ডাক পাই।সেখানে লিখিত পরীক্ষায় বেশ ভালো ভাবেই টিকে যাই।এরপর যখন ভাইভাতে ডাকা হয় তখন আমাকে নিম্নোক্ত শর্তসমূহ দেয়া হয়ঃ
১.ছয় বছরের কন্ট্রাক্ট করতে হবে।
২.তাদের নিকট আমাকে ৫ লাখ টাকার একটি চেক লিখে দিতে হবে।যদি কোম্পানী ছেড়ে যাই তাহলে তারা সেই চেক দেখায় আমাকে আদর করে ফেরত নিয়ে আসবে অথবা শ্বশুরবাড়ি পাঠাবে।
৩.বেতন বেশি না।৮-১০ দিতে পারি।আরো কমও দিতে পারি।বছর শেষে ১০০০ টাকা বেড়ে যাবে।

এই বায়োমেডিকেল কোম্পানীতে ডাকার আগে আমার আরেকটি জায়গায় ইন্টারভিউ হয়েছিলো যেখানে কোম্পানীর ভিপি একজন চাইনিজ আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলো।ওখান থেকে আমি বেশ ভালো ইন্টারভিউ দিয়ে আশাবাদী হয়েছিলাম আবার ডাক পাবো।কিন্তু আমি মে মাসে দেয়া ইন্টারভিউতে দুই মাস কেটে গেলেও আর ডাক পাইনি।পরে আমাকে ডাকা হয় বায়োমেডিকেল আর চাইনিজ কোম্পানী দুটো থেকেই একসাথে।চাইনিজে যখন ডাক পাই তখন মনে হচ্ছিলো হয়তো আমার ওখানে হয়ে গেছে।তাই ভাবলাম বায়োমেডিকেল কোম্পানীতে একটু মজা করা যায়।সেখানে আমি সহ ফাইনালী সিলেক্টেড তিনজন মিলে লাস্ট ইন্টারভিউতে বেশ মজা করে সালাম দিয়ে চলে এসেছিলাম।এই কোম্পানী আমাদের প্রতিবার ইন্টারভিউতে ডাক দিয়ে ২-৩ ঘন্টা বসিয়ে রাখতো(আমাদেরকে অবশ্য এনার্জী বিস্কিট খাওয়ানো হয়েছিলো)।

যাই হোক,ইতোমধ্যে চাইনিজ কোম্পানীর ইন্টারভিউ দুইবার পেছালো,কারণ চায়না ভিপি খুব ব্যস্ত।তবে শেষে ঠিকই হয় এবং জানতে পারি আমি তাদের সাথে কাজ করার জন্য নির্বাচিত হয়েছি।কোম্পানীর ভিপি আমার সাথে কিছুক্ষন চমৎকার ইংরেজীতে(অনেকে বলেন চাইনীজরা ইংরেজী ভালো বলতে পারেন না,কিন্তু উনি এবং কোম্পানীর বাকী চাইনীজরা কিন্তু বেশ শুদ্ধভাবে বলতে পারেন আমার দেখা অনুযায়ী) তার কোম্পানীর কথা বললেন।দেরী করে ডেকেছেন বলে দুঃখিত বললেন।করমর্দন করে বিদায় নেওয়ার পর যখন গুলশানের রাস্তায় তখন তেমন কোন আনন্দ অনুভূতি হচ্ছিলোনা।হয়তো এম.আই.এস.টির যান্ত্রিক জীবনের সাথে মিশতে গিয়ে নিজেও তেমন হয়ে গেছি,অথবা পাশ করার পর জীবনের আসল ও বাস্তব রুপ দেখে আমি এখন অনুভূতিহীন।

আমি চাকরীক্ষেত্রে আসার পর যে জিনিসটি খুব ভালো ভাবে শিখতে পাই তা হলো,কে কোথায় কোন ইউনিতে পড়েছে তা হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানী ছাড়া কোথাও গুরুত্ব পায়না।লিখিত পরীক্ষাগুলো আপনার নিজের যোগ্যতা দিয়ে দিতে হবে।এই ব্লগে অনেক সরকারী-বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্ক এসেছে।কিন্তু বাস্তবে চাকরী জীবনে এসব কিন্তু খুব একটা প্রভাব পায়না।সবচেয়ে বড় ব্যাপার চাচা-মামা।তারপরও যেসব প্রতিষ্ঠান সৎভাবে কর্মী নেয় তারা নীতিবোধ জিনিসটা বেশ প্রাধান্য দেয়।আমাদের এই ছোট্ট দেশে অনেক বড় বড় দুর্নীতি হয়।আমরা তাই যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন পাশ করছি তারা যদি সেই দুর্নীতি আর দুর্নীতিবাজদের মুখে লাথি মেরে সৎ উপায়ে চাকরী করতে নামি তাহলে মনে করতে পারেন আপনি দেশকে এক পা এগিয়ে নিয়ে গেলেন।আমি আজ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি,আমি কোন দুই নাম্বারী করে,বন্ধুবান্ধব অথবা মামা চাচা দিয়ে চাকরী পাইনি,নিজের যোগ্যতা দিয়ে পেয়েছি।আমাদের সবার মনে যদি এই প্রতিজ্ঞা থাকে অবশ্যই দেশ সঠিক পথে এগিয়ে যাবে।এই ব্লগ থেকে একটি জিনিস আমি শিখতে পেরেছি,যে যাই বলুক,আমাদের বেশিরভাগের মনে দেশপ্রেম ভালোভাবে বিদ্যমান।তাই আমরা যারা ভবিষ্যতে চাকরী ক্ষেত্রে যাবো তারা নিজেদের কাছে নিজেরাই প্রতিজ্ঞা করি,অন্তত এক্ষেত্রে আমরা এক নাম্বার হয়ে থাকবো।আগে নিজেকে বদলাতে হবে,তাই না?

[লিখা বড় হয়ে গেছে বেশ।আমি সেজন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।আমি সব লিখাতেই বলি,লেখক হওয়ার মত গুণ আমার নেই।তাই গুছিয়ে ছোট করে লিখা সম্ভব হয়নি।তবে বিশ্বাস করতে পারেন যা অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে তার সামান্যই লিখেছি।লিখায় আঘাত প্রাপ্ত হলে অগ্রিম দুঃখ প্রকাশ করছি।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29006862 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/29006862 2009-09-08 16:52:18
নিজের জন্য একটি লিখা আর সবার কাছে একটি জিজ্ঞাসা,"এই ব্লগে কি নোংরা গালি খেতে আসি?"
আজকে হঠাৎ করে খেয়াল হলো,বেশ অনেকদিন হয়ে গেলো আমি এই ব্লগে আছি।ব্লগ পরিবেশ আমার কাছে বেশ সুস্থই মনে হতো আজকের আগে।এখানে বেশিরভাগ ব্লগলেখককে আলোচনা-সমালোচনা করতে দেখেছি,যুক্তিময় বক্তব্যের সাবলীলতা সবসময় আমাকে মুগ্ধ করেছে।আমি কৃতজ্ঞ অনেক ব্লগারের প্রতি যাদের থেকে অনেক কিছু জানতে পেরেছি,শিখতে পেরেছি।আমার প্রাক্তন স্কুলের জুনিয়র সিনিয়র অনেককেই পেয়েছি,এবং বিশ্বাস করতে পারেন মনে হয়েছে এটা যতটা না একটি ভার্চুয়াল জগৎ তার থেকে বেশি একটি ব্লগ পরিবার।

খারাপ অভিজ্ঞতা কি হয়েছে?অবশ্যই হয়েছে।আমার একটি লিখা ছিলো বিডিআর বিদ্রোহের ব্যাপারে যেখানে একজন ব্লগারের থেকে মন্তব্য পেয়েছি ,এই লোকরে(আমি) ঝগড়া সভা, চুলোচুলি- লাঠালাঠিতে বেশী মানায়”।আমি হতভম্ব হয়েছিলাম,কিন্তু পাল্টা জবাব দেয়নি।কেন?কারন আমি এটা মানি যে এটা একটি ভার্চুয়াল পরিবেশ হলেও শ্রদ্ধা,সম্মান এই শব্দগুলো এখানে অমূলক হয়ে যায়নি।যিনি আমাকে এমন উপাধি দিয়েছিলেন তার লিখা আমি বেশ কিছু পড়েছি এবং নিঃসন্দেহে উনি যথেষ্ট জানেন এবং বোঝেন।উনি আমার বয়োজ্যেষ্ঠও বটে।তাই একজন অনুজ হিসেবে তার এহেন মন্তব্যের প্রতিবাদে কিছু বলিনি।কিন্তু প্রায় সময় ভেবেছি,যিনি আমাকে চেনেননা,জানেননা উনি আমার লিখায় বা মানুষকে দেয়া মন্তব্যে এমন কি পেলেন যে কারণে গুন্ডা বলে উপাধি দিলেন?

আরেকটি অভিজ্ঞতা বলি।অন্য ইউনির এক সিনিয়র ভাই(এখানে ব্লগিং করেন) আমার ইউনির এক আপুর সাথে কোন এক জায়গায় কর্মরত ছিলেন।ওই আপুকে উনি মেইলে একটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন যা তার পছন্দ হয়নি এবং তাই পরবর্তীতে এটা নিয়ে বাক-বিতন্ডা হলো।ওই আপুর আচরণটা নিঃসন্দেহে শোভন মূলক ছিলোনা,কিন্তু এই একজনের জন্য আমার ইউনি হয়ে গিয়েছিলো একটি খারাপ ইউনি এবং এটি নিয়ে উনি সরাসরি একটি ব্লগও লিখেছিলেন।কারণ আমার ইউনির এক মেয়ে পুর্ণেন্দু পত্রী নামে কোন কবিকে চেনেন না।পোস্টটি এবং মন্তব্যগুলো দেখে আমি যথেস্ট অবাক হয়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম,তার মানে কি এই একটি প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী একজন কবিকে জানেননা তাই বোঝা যায় ইউনির পরিবেশ ছোট এবং ওখানে যারা পড়াশোনা করে তারা সব ক্ষুদ্র মানসিকতার অধিকারী?জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়েছিলো উনাকে,উনি যেখানে পড়েন ওইখানে আমার যেসব বন্ধু বান্ধব আছে তাদের কাছে আমি এই কবির নাম জিজ্ঞেস করে যখন জানতে পারলাম এরা কবির নাম আজই প্রথম আমার কাছে শুনলো তখন উনার ইউনি কি একই মানদন্ডে দাঁড়িয়ে গেলো না?এই ব্লগে পাবলিক প্রাইভেট সব ইউনির মানুষ আছে।নিজের ইউনি যতটাই খারাপ হোক এহেন মন্তব্য গ্রহণ করার মানসিকতা কি কারো আছে?ওই সিনিয়র ভাইয়ের যেমন নেই,আমারো নেই।কিন্তু আমি উনাকে অবশ্যই কিছু জবাবে বলিনি।কেন?তা বলতে চাইনা।

আজকে এই ব্লগটি যে কারণে লিখা সেটি এখন বলি।কিছুদিন আগে টুয়েন্টি টুয়েন্টি বিশ্বচাম্পিয়নশীপে যখন বাংলাদেশ হেরে যায় তখন মেজাজ খারাপ হয়ে লিখেছিলাম,যে দলে আশরাফুল রুবেলের মত প্লেয়ার খেলে তাদের কাছে আমরা এত জয়ের আশা করে কষ্ট পাবো কেন।ব্লগ বলতে আমি যা বুঝি,এখানে মানুষজন নিজের কথা,তার দৃষ্টি ভঙ্গির কথা লিখবে।আমিও লিখেছি আমার যা মনে হয়েছে।তাই দুদিন আগে যখন ২ সপ্তাহ ৪ দিন বয়সী “মাদকতা” নামের একজন ব্লগার বললেন এমন লেখা ছাগলা মার্কা পোলাপান লেখে,তখন বুঝতে পারছিলাম না ব্লগ শব্দের অর্থ পালটে গেলো নাকি!এমন অপ্রীতিকর শব্দের ব্যবহার কি কোন অর্থে সমালোচনার মধ্যে পড়ে?উল্লেখ্য এই ব্লগারকে আমি চিনিনা,জানিওনা।আর আমি নিজের লিখা নিজে লিখবো,উনার ইচ্ছা হলে লিখা নিয়ে কথা বলতে পারেন,সমালোচনা করতে পারেন।কিন্তু এহেন শব্দের ব্যবহার আশা করিনা।উনাকে তাই প্রতিউত্তরে উনার ব্লগে বলেছিলাম, "“ভাই সাংবাদিক মানুষের তো ভাষায় কিছু শালীনতা থাকে জানতাম।অবশ্য পরিবার থেকে ভদ্রতা না শিখে আসলে যেই পেশাতেই থাকুন মুখ দিয়ে(পড়ুন লিখার হাতে) শুধু ময়লাই আসবে।আপনাকে আমি চিনিনা জানিনা,আচমকা এসে অশালীন মন্তব্য করলেন।আপনার টাকায় তো ব্লগিং করিনা,নিজের পয়সায় করি।আমার লিখার স্বাধীনতা আছে,আমি লিখবো।মন্তব্যে শিষ্টাচার বজায় রাখতে না জানলে আপনাকে অনুরোধ করছি অন্তত আমার ব্লগে এসে হাবিজাবি মন্তব্য(পড়ুন ময়লা) না করার জন্য”"।
আমি আশা করেছিলাম তার সাথে এই মন্তব্যের পর আর কোন কথা হবেনা।কিন্তু কি সেলুকাস ব্যাপার উনি আজকে দেখলাম আমার আরেকটি ব্লগে এসে মন্তব্য করলেন, “"ফুটপাতের পোলার কাছে ভালো কিছু আশা করা যায়........
খা_কির পোলা
আমার ব্লগে ফাউল কথা লিখছস ক্যান
_গীর পোলা...... ”"
Click This Link
এই ব্লগে লিখালিখি করি খুব বেশিদিন না।ব্লগের মাঝে বর্তমান জীবনের অনেকটা অংশ ব্যয় করে যাচ্ছি।আগেই বলেছি চমৎকার কিছু মানুষের চমৎকার লিখাগুলো মুগ্ধ হয়ে পড়তে এখানে আসা হয়।তাই এমন অশ্লীল নোংরা মন্তব্য দেখে আজকে ভাবতে বসে গেলাম, “এই ব্লগে কি এইসব গালাগালি শুনতে আসি?”।ধর্ম থেকে শুরু করে অনেক বিতর্কিত বিষয় নিয়ে এই ব্লগে লিখালিখি দেখেছি,প্রায় লিখাই পড়া হয়েছে এবং বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি ব্যক্তিগত রেষারেষি,বাজে গালাগালি এইগুলো কখনো করেনি।নিজের সাফাই গাইছিনা,বলতে চাই আমি ব্লগ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।যে যতটাই বিতর্কিত লিখা লিখুক,আমার সামর্থ থাকলে আমি আলোচনা সমালোচনা করবো,তাকে খোচা দিয়ে কটুক্তি করে আঘাত করার মানসিকতা নাই।আশা করি কখনো হবেওনা।তারপরেও এমন মন্তব্য কেন পাবো এই ব্লগ থেকে আমি বুঝতে পারছিনা।ব্লগের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী,গালাগালি করতে পারবোনা তাই যে যেমন এসে আমার লিখায় পরিবার তুলে গালি দেবে এটাই কি এই ব্লগে থাকার শর্ত?

লিখাটা নিজের জন্য লিখেছি।যদিও আমি এখানে সক্রিয় ৮-৯ মাসের বেশি নয় কিন্তু ১ সপ্তাহ আগে দুই বছর পুর্তি করেছি এখানে আগমনের।বর্ষপুর্তিতে অনেককে দেখেছি নিজেকে নিয়ে লিখে।আমিও লিখলাম,নিজের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা,একান্তই কিছু মনের কথা।অনেকের খারাপ লাগলে তাই প্রতি লিখার শেষে যেমন দুঃখিত বলে নেই,আজকেও বললাম।আমি মানুষ এবং মানুষ মাত্রই ভুল।তাই আমার লিখার কোথাও কোন অনুভূতি বা একান্ত কথার প্রকাশে ভুল হলে কিংবা কারো আঘাত লাগলে আমি দুঃখিত।এই ব্লগে আমি জানিনা এহেন আচরণের পর কতটুকু স্বস্তিবোধের সাথে লিখতে পারবো কিন্তু আমি আসবো।আপনাদের মত কিছু চমৎকার মানুষের লিখা পড়তে।অনেক কিছুই জানার বাকী আছে।আসবো আমার প্রাক্তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় ভাই,ছোট ভাই সবার কুশলাদি জানতে।লিখায় কিছু আবেগ এসে পড়লে আমি আবারও ক্ষমাপ্রার্থী।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/28982699 http://www.somewhereinblog.net/blog/ohoritblog/28982699 2009-07-23 21:52:54