ডিসক্লেইমার: আমার কিছু একান্ত ব্যক্তিগত ভাবের বহি:প্রকাশ। কারও মন খারাপ করে দিতে পারি, তাই প্রথম পাতায় প্রকাশ করিনি। তারপরও যদি কেউ পড়ে থাকুন তো আমি দায়ী নই-লেখক।
প্রিয় বৃষ্টি,
নিশ্চয় অবাক হয়ে ভাবছিস এতোদিন পর কেন হঠাত তোকে চিঠি লিখতে বসেছি, না? কিইবা বলব? আসলে কি জানিস, আমরা মানুষরা মাঝেমাঝেই কেমন অদ্ভুত আচরণ করে বসি- তুই তো বুঝবিনা- তুই এই মানবারণ্যে থেকেছিলিই বা কয়দিন, আর মানুষের দেখেছিসই বা কি?
থাক, এসব প্যাঁচাল তোর আদৌ বোধগম্য হবেনা, তাই এসব না বলে সহজ ভাষায়ই বলি, তোকে চিঠি লিখার কারণ টা - এই ব্লগে আমার আসা হয়েছিল কিছু পড়ার জন্য- আর অনেক দিন পর পর কিছু হাবিজাবি লেখার চেষ্টাও যে করিনা তা নয়। তো তেমন ব্লগ থেকে ব্লগে ঘুরতে ঘুরতেই সেদিন ব্লগার “এই আমি মীরার” ব্লগে প্রথম বারের মত গিয়েছিলাম- ওর প্রিয় পোস্টে দেখলাম ওর বোনের একটা পোস্ট- “ষোড়শী হয়েই গেলি তবে”। সেই পোস্টটা পড়ার পর থেকেই ভাবছি আজ এই দিনটিতে তোকে একটা চিঠি লিখব- তুই যদি থাকতি তো নিশ্চয় আমিও আজ ব্লগ লিখতাম- “টিনএজার হয়েই গেলি তবে”- তাই না? আর তুই কি করতি- তুইও হয়ত কমেন্ট করে যেতি- “আপুনি তুমি এতো ভাল কেন?”
আচ্ছা আর কি কি করতি তুই, আমাদের ফাঁকি দিয়ে এভাবে চলে না গেলে? কত বড় হতিরে? নিশ্চয় অনেক বড় হয়ে যেতি তুই- হয়তোবা দৈর্ঘে-প্রস্থে-রূপে -গুণে আমাকেও ছাড়িয়ে যেতি- আর আমিও ব্লগে লিখে হাসতাম- কিভাবে তোকে দেখে সবাই আমার চেয়ে বড় মনে করে! আর আমিও তের বছর আগের শীত কনকনে একটা শেষ রাতে চাচীদের কোলাহলে ঘুম থেকে উঠে একটি ছোট কাথার কুন্ডলি দেখে ভীষণ রকম অবাক হওয়ার গল্প করতাম ব্লগারদের সাথে। আর তুই হয়ত সেকালের বাচ্চাদের অজ্ঞতা কিংবা নির্বুদ্ধিতার গল্প শুনে হাসতি মুখ টিপে। আমাদের বলা হয়েছিল আমরা নাকি আকাশ থেকে টুপ করে আম্মুর কোলে পড়েছি- আর আমরাও সব ঠিক ঠিক মেনে নিতাম। কখনো প্রশ্ন করতাম- আমি কার কোলে পড়েছিলাম? বড় আপু বলেছিলেন আমি নাকি বড় ফুপ্পির কোলে পড়েছিলাম। আবার প্রশ্ন করতাম “তাহলে আমার আম্মু বড় ফুপ্পী না হয়ে আম্মু হল কেন?আমি নাকি আম্মু আম্মু বলে যার কোলে উঠে যাব- তিনিই আমার আম্মু। সেই আট বছর বয়সেও ঘুম থেকে উঠে তোকে কোলে নিয়ে আমি ভেবেছিলাম এই বুঝি তুই আকাশ থেকে পড়েছিস! আমার সে কি আনন্দ- আমি সদ্য জন্ম হওয়া একটি বাবুকে কোলে নিয়ে অনেকক্ষন ধরে বসে থেকেছি- আমার বন্ধুদের মাঝে সেটা অনেক বড় গর্বের বিষয় বটে!
সেই সেদিন থেকে তোকে নিয়ে কত্ত কিছুই না ভেবে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম তুই কখনো আমাকে আপু হিসেবে পাবিনা- স্রেফ বন্ধুর মত হব আমরা দুজন।আর আমার আপুরা যেভাবে আমার উপর হুকুম করে, আমার সাথে বড়গিরি ফলায়- আমি এর কোনটাই তোর সাথে করতে দেবনা- আরো কত কিছু…
আজ যদি সত্যি তুই থাকতি- আমি কি এই ভাবনার মত আচরণ করতাম তোর সাথে? হয়তবা আমিও বড়ত্ব জাহিরের সুযোগটা পেয়েও এততো সহজে ছেড়ে দিতাম না- কি বলিস? তুই কি সেদিন, সেই পিচ্চি কাঁথার ভিতর থেকে আমার মনের গহীনে লুকে থাকা এই ফন্দী ফিকির বুঝে গিয়েছিলি নাকিরে? তাই কিরে তুই ফাঁকি দিয়ে চলে গিয়েছিস এততো আগে-আমাদের সব্বাইকে ফেলে? কই আমরা তো তোর এই গোপন ফন্দী বুঝতে পারিনি- কেমন গর্দভই না, আমরা সবাই!
আগের কথা বাদ দে- বর্তমানে আসি চল। কি করছিস রে তুই? খেলছিস নিশ্চয়- ফেরেশতারা তোর সাথে কি কি খেলে রে? আমাদের বললেও আমরা নিশ্চয় বুঝবনা এসব। নিশ্চয় ওপারেতে অনেক আনন্দের খেলা আছে- আমাদের ভিডিও গেম কিংবা কম্পিউটার গেমের চেয়ে অনেএক আধুনিক- নারে? আমাদের কল্পনার ত্রিসীমানার বাইরে, নারে? আচ্ছা তুই কি কখনো গোল্লাছুট কিংবা হাডুডু খেলে দেখেছিস? আমার এই চিঠিটি যদি কখনো পাস তো আমার একটি অনুরোধ অবশ্যি রাখবি রে বোন- তুই অবশ্যই ফেরেশতাদের বলবি তোর সাথে এই সব প্রাচীন গ্রাম্য খেলাগুলো খেলতে- জানিস এই সবের স্বাদ একেবারেই আলাদা। না খেললে কখনো বুঝবি না- তাই বললাম। আরো একটা খেলা আছে- ফুল টোক্কা-এইটাও কিন্তু দারূন মজার! না খেললে মিস করবি বলে দিচ্ছি কিন্তু।
আচ্ছা, তুই থাকলে কি আমি আজও তোর সাথে খেলাধুলা করতাম? আমার তো মনে হয় আমি করতে চাইতাম ঠিকই, কিন্তু তুই রাজি হতি না। তুই বলতি “ছিঃ আপুনি-তুমি এখনো সেই বাচ্চাটাই রয়ে গেছো” আর আমি ভাবতাম “তুই এমন কি বড় হয়েছিস রে- খালি ভাব দেখাস! আরো কিছু বড় হ, তারপর বুঝবিনে -নিজেকে ছোট ভাবার মজাটা কত্ত!”
জানিস, আজ তুই থাকলে আমি তোকে কি উপহার দিতাম? একটি চিঠি লিখতাম তোকে-যাতে আমার টিন বেলার “সাতকাহন” - সব তোকে জানাতাম। এই পৃথিবীটা অনেক অনেক জটিল জায়গারে, তুই এতোদিনে থাকলে হয়তো তার ছিটে ফোটা বুঝতে পারতি। আজ হয়তো আমার দেখা এই পৃথিবীর কিছু জটিল বৈশিষ্ট্য তোকে জানাতাম ।আমি তো কখনোই চাইতাম না, আমি যা সাফার করেছি তুইও তাই করিস। তোকে হয়তো চাইতাম পৃথিবীর সব জটিলতা, পংকিলতা, কষ্ট, দুঃখ থেকে আগলে রাখতে, আর সব আনন্দ তোর সাথে ভাগাভাগি করে নিতে। হাসছিস নারে? ভাবছিস- খুব ভালো তো লেকচার শুনাচ্ছ- কিন্তু বাস্তবতা কি হত,উপরওয়ালাই জানেন!
কি এমন অভিমান ছিল রে তোর? কেনরে তুই অমন ভয়ানক অসুখটুকু বাধঁতে দিলি তোর শরীরে। পৃথিবীর এই পংকিলতার কথা কি তোকে কেউ আগেভাগেই কানে কানে জানিয়ে দিয়েছিল নাকি? নাহয় তিনটি দিনেই তুই এই পৃথিবীর প্রতি বিমুখ হলি কি কারণে রে? তখনও আমরা, এই অবুঝ, গর্দভ আমরা জানতেই পারিনি- তোর আসা তো স্রেফ কিছুদিনের জন্য-তুই কেবলই তোর আদর আদর মুখখানা দেখিয়ে আমাদের মাঝে মায়া লাগিয়ে দিতে এসেছিলি। অমন নিঠুর তুই-একদিন দুইদিন নয়, মায়া লাগাতে থেকে গেলি তিনটি বছর!! তোর এই তিনটি বছর কি যে কষ্টে ছিলি আমরা কখনো জানতে পারবনা। এতো সব কষ্ট সয়েও তুই থেকে গেলি, আমাদের মায়া লাগাতে, আমাদের হৃদয়ে ঝড় বইয়ে দিতে। এই কি তোর “নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভংগ”??
আচ্ছা, আমাদের কথা বাদ দে, আম্মুর জন্য তোর হৃদয় একটিবারও কি কাঁপলনা? যে কয়টা দিন ছিলি, আম্মুটাকে তুই আষ্টেপৃষ্টে বেধে ফেলেছিলি-আম্মুর প্রতিটি নিঃশ্বাসের গভীরে ঢুকে-৩ বছর ১৮ দিনের প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মিলি সেকেন্ড আম্মুকে যেই গভীর মমতার বাধনে বেঁধেছিলি- একবারও কি তোর কাঁপেনি- এই মায়া, মমতার একরত্তিও দাম না দিয়ে এভাবে পালাতে? নাকি তুই মুখ টিপে হাসছিস- পরকালেই এর দাম দিবি বলে? তাই যেন হয় রে- তাই যেন হয় বোন।
আব্বুর সেই কথাটা এখনও কানে বাজে- উনি তোকে শেষ বারের মত দেখতে পারেননি। তুই কেমন চোরের মত পালিয়েছিলি(এটা কেন করলি বল তো? ফেরেশতারা কি তোর জন্য খেলার পসরা সাজিয়ে বসেছিল। এমন নিঠুর তুই, আব্বুর জন্যও অপেক্ষা করতে পারলিনা)। আব্বু ঢাকা থেকে এলেন, ততোক্ষনে কারা জানি তোকে পাঠিয়ে দিল সেই শেষ ঠিকানায়-তোর চিরকালের খেলার মাঠে।
আর আব্বু শুধু বললেন- তিনি আমাকে আরও ছয়জন সুস্থ সবল সন্তান দিয়েছেন-একজনকে নিলে আমি কি অভিযোগ করতে পারি?
আজ অনেক অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এতো সব বলে আর কি হবে রে। সখ ছিল তোর সাথে কত্তরাত ভোর করে দেয়া গল্প বলতে, কিংবা তোর কাঁধে বৃষ্টি ঝরিয়ে আমার দুঃখগুলো ঝরিয়ে দিতে,অথবা তোর কষ্টগুলো এভাবেই নিজের কাঁধে তুলে নিতে।ইচ্ছে ছিল তোকে উত্সর্গ করে গান গাইতাম- মৌসুমী ভৌমিকের ঐ গানটা-
“তোরই জন্য গল্প লিখেছি যত, তোরি জন্য গান, তোকে ঘিরেই খেলা...... তোকেই দিচ্ছি আমার সকল ছেলেবেলা-......টক নুন টক তেতুল আঁচার আছে রাখা, তোরই জন্য আমার বয়ামে তেলে মাখা, তোরি জন্য জল ছপ ছপ ভেজা জুতো- আমার স্কুলে না যাওয়ার পুরনো সেই ছুতো......তোকে ভাবতেই আমার বড় হবার ব্যথা-তোকে বলে দেব আমার গোপন যত কথা...এই সব আমি তোকেই দেব তোকে দেব-তোর ছেলেবেলা তোর কাছ থেকে চেয়ে নেব......”
সত্যি কি আমরা তোর কথা ভেবেই প্রতিটি হাড়ি পাতিল, লেগোর টুকরো অমন গুনে গুনে যত্ন সহকারে রেখে দিয়েচিলাম? আজও সব আছে রে- তোর হাতের ছোঁয়া পায়নি বটে- তবু আছে-যদিও তেমন যত্নে আর নেই। আমরা আর যত্ন করে রেখে দিইনা- কার জন্য রাখব রে? এই নির্জীব বস্তুগুলোও আমাদের মায়া বুঝে, শুধু তুই বুঝলিনা......।
তুই কি পড়তে শিখেছিস, আমার চিঠি কখনো পড়বি? না পড়লেও কি- তোকে আমি বলতে পারছি- এই সব। হোক না পাগলামি, কিংবা ছাগলামি। আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসেনা। তুই নিঠুর হতে পারিস- পালিয়ে যেতে পারিস দূর দূরান্তে- শুধু আমরা কিছু বললেই দোষ নারে? কেন যে বড় হলাম, কেন যে তোর মত ছোট্টটি থাকতেই পালিয়ে যেতে পারলাম না......।
তবু লিখলাম , তোকেই লিখলাম। কেউ পড়ুক চাইনে, তুইও হয়তো পড়বিনা কখনো- তবু মনের কথাগুলো যে এভাবেই উতলে উঠতে চায়।
ভাল আছিস, থাকবি জানি। তা আর নতুন করে বলতে হবে নারে। অনেক অনেক কষ্টের কথা আজ অনেক দিন পর বললাম- তোকে খুব কষ্ট পাইয়ে দিইনিতো? তা যদি হয় তো এই আপুনি তোর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী রে। তুই মাফ করে দিস রে বোন। যা, তোর খেলার সময় আর নষ্ট করতে চাইনে। মনে থাকবে তো?গোল্লাছুট, হাডুডু, ফুলটোক্কা-আরো আছে, এখন মনে আসছেনা-ওদের কাছে জেনে নিস। যা, খেলতে যারে।
তুই তো বৃষ্টি হয়েই এভাবে আমাদের সবার চোখে অনবরত ঝরে পড়বি.........
তোরই,
আপুনি।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

