somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুমায়ুন আহমদ, মধ্যাহ্ন এবং দেশভাগ

০৯ ই জুন, ২০১০ রাত ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হুমায়ুন আহমেদের লেখার থিম কি ? হুমায়ুন আহমেদের লেখায় আনেক বিষয় ঘুরেফিরে আসে । জোস্না, আতিপ্রাকৃত বিষয়াবলী,প্রেম, বিজ্ঞান, কুসংস্কার, যুক্তি,পরকিয়া, বহুগামিতা তার লেথায় বিভিন্নভাবে এসেছে ।
বয়সকালে হুমায়ুন আহমেদ আরেক শাদি করেছেন । পাত্রি তার মেয়ের বান্ধবী । এ ঘটনা তার আনেক ভক্তকে হতাশ করেছে । কারণ, হুমায়ুন আহমেদ সমাজের যেসব আসংগতির কথা তার লেখায় তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন, ভক্তরা হয়ত সেই অসংগতি তার মধ্যে আশা করেনি । কবি ইয়েটস মানুষের অনেক কর্মের স্বিবরোধীতা সম্পর্কে লিখেছেন :
Those that I fight I do not hate
Those that I guard I do not love;
তবে, লেখকরে কাজ হচ্ছে লেখা । তার লেখনীর সমস্ত আদর্শকে যে তার মধ্যে ধারণ করতে হবে এমন দাশখত তিনি দেননি ।


অনেক ব্লগার হয়ত ভাবছেন আমি হুমায়ুন আহমেদের বিয়ে-শাদির কথা টেনে আনছি কেন, মতলবটা কি ? কারণ আছে বৈকি । লেখক বইটা উংসর্গ করেছেন "মমতাময়ী শাওনকে" । পাঠকরা আবার বলবেন না-তো এ হুমায়ুনের বুড়ো বয়সের ভিমরতি ।

হুমায়ুন শুরূ করেছেন কবিগুরূকে দিয়ে । বইয়ের প্রচ্ছদে রয়েছে রবিঠাকুরের চার লাইন :
তুমি জ্যোতির জ্যোতি, আমি অন্ধ আধারে
তুমি মুক্ত মহীয়ান, আমি মগ্ন পাথারে ...
তংকালিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চমংকার বর্ণনা আছে বইটিতে বেশ কয়েক জায়গায় । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বর্ণনা এসেছে এভাবে "ব্রিটিশ সিংহ কিছুটা নরম হয়েছে এটা বোঝা যাচ্ছে । প্রখম মহাযুদ্ধ শুরূ হয়েছে । ব্রিটিশ সরকারের ভারতবাসীর সমর্থন দরকার । তাদের ভাবভংগি দেথে মনে হচ্ছে, তারা যুদ্ধে জিতলে কিছুটা ছাড় দেবে " ।
দ্বিতীয় যুদ্দের খণ্ডচিত্র এসেছে বিভিন্ন বর্ণনায় । ফিল্ড মার্শাল রোমেলের সাথে যুদ্ধে জিতে মন্টোগোমারীর পাগলা পানির গ্লাস ঠোকাঠুকর বর্ণনা আছে বইতে ।
কোলকাতার কিছু মুসলমানের আবেগজনিত শ্লোগান এসেছে এই বইয়ে :
কানমে বিড়ি
মু মে পান
লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান ।
পাকিস্তানের জন্য সাধারণ মুসলমানদের আবেগ প্রকাশ পেয়েছে উপরের শ্লোগানে । এজন্য একটি হাইপোথিসিস আছে, "দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্মের সুত্র ধরেই বাংলাদেশের জন্ম "।
অবশ্য, ভারতের পেটের ভেতর থেকে কেউ বেরোতে পারেনি । বরং সিকিমসহ আনেক ছোট রাজ্য ভারতের পেটের ভিতর ঢুকে গেছে ।
বইতে সোরোওয়ার্দি সম্পর্কে ধনু শেখের মুখ দিয়ে বলা হয়েছে , তিনি আমাদের কাটাকুটি নেতা ।হুমায়ুন কি সোরোওয়ার্দির সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে ইজ্ঞিত দিতে চেয়েছেন ? হোসেন শহীদ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতক দিক্ষাগুরূ ।হুমায়ুন আহমেদের সাহসিকতা এক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ।
মধ্যাহ্নের প্রধান চরিত্রগুলো হচ্ছে নিম্নবর্ণিত মানুষগুলো:
অম্বিকা ভট্রাচার্য
অম্বিকা হচ্ছেন লোভী ব্রাক্ষ্মণ যিনি সুবিধা অনুযায়ী বিধান দেন । জাত-পাতের ভেদাভেদ মেনে চলেন তিনি অস্ভবরূপে । হরিচরণ তার কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তার জবাব, "উচু বংশের কেউ যদি দেবদেবী কোলে নেয়া দেখে, তাহলে তার জন্য উত্তম । সৌভাগ্য এবং রাজানুগ্রহ । নিম্নবংশীয় কেউ দেখলে তার জ্ন্য দূর্ভাগ্য । সে হবে অপমানিত । রাজরোষের শিকার । তার ভাগ্যে অর্থনাশের যোগ ও আছে । " তবে, হরিচরণের ক্ষেত্রে তার কথা ফলেনি । হরিচরণ সাময়িক দূর্ভোগে পড়লেও আখেরে তার ভাল হয় । পক্ষান্তরে, অম্বিকার জীবনই কাটে রাজানুগ্রহ তালাশ করে ।
জুলেখা
জুলেখাকে দেখে ছদ্মবেশী বিপ্লবী শশী মাস্টর কবিতা লেখন:
এক জোড়া কালো আখি এত মূল্য তারি...
অথচ ভাগ্যের ফেরে এই জুলেখার স্থান হয় নিষিদ্ধ পল্লীতে । বিশ্বের অন্য প্রান্তে তারই সমবয়সী মাদাম কুরি সেসময় নোবেল জেতেন ।
হরিচরণ
হরিচরণ হচ্ছেন উপন্যাসের আদর্শ চরিত্র । বিপত্নিক এই লোকটি জাত-পাতের উর্ধে উঠে মানুষের সেবা করেন । এজন্য হিন্দুরা তাকে সমাজচ্যুত করে । তিনি মারা গেলে ধনু শেখের চক্রান্তে তাকে দাহ না করে কবর দেওয়া হয় কারণ শেখ দাবি করে মরার পূর্বে হরিচরণ ইসলাম গ্রহন করেন ।
জহির
জহির সুলেমান মিস্ত্রির পোলা । ছোটকালে দিঘিতে ডুবে সে মরতে বসেছিল । হরিচরন পানিতে ঝাঁপিতে পড়ে তাকে উদ্ধার করেন ।
শশাংক পাল
শশাংক পালের পরিণতি হয় বড় করূণ । যে হরিচরণের সাথে তিনি টাকা নিয়ে বিট্রে করেন, সেই হরিচরণই পরবর্তীতে তার জমিদারি কেনেন । ভোগী জমিদারের পিউর সংস্করণ হচ্ছেন শশাংক পাল ।
মাওলানা ইদরিস
ইদরিস হচ্ছেন সাধাসিধে ভান মানুষ । কোরানের হাফেজ হতে গিয়ে তিনি কয়েকবার ফেল মারেন । এক সময় তার মধ্যে পাগলামির লক্ষণ দেখা দেয় ।
ধনু শেখ
ধনু শেখের চরিত্র সম্পর্কে এক কথায় বলতে হলে তারই একটি উক্তি যথেষ্ট । যখন তাকে লঞ্চের হিন্দু নামকরণ সম্পর্কে নিবারণ জিজ্ঞেস করেন, তখন সে জবাবে বলে, "বাতাস বুইজ্যা পাল তুলছ্বি । হিন্দু যাত্রি বেশি । সেই কারণে হিন্দু নাম ।"
লাবুস
লাবুস হচ্ছে জুলেখার ছেলে ।
করিম
মাওলানা করিম ইদরিসের জায়গায় ইমাম নিযুত্ত হন । শেষের দিকে তিনি মজনুন হয়ে যান ।
শরিফা
শরিফ প্রথমে করিমের স্ত্রী ছিল, পরে করিম তাকে তালাক দেয় এবং ধনু শেখ তাকে বিবাহ করে । শরিফা হচ্ছে আতরের নয়া মা, আতর হচ্ছে ধনু শেখের মেয়ে । আতর শরিফাকে তার পিতার হাত থেকে মুত্ত করতে তাকে সেতাবনগরে শরিফার এক ফুফুর কাছে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে । কিন্তু, সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং শরিফার স্থান হয় রঙিলা বাড়িতে ।
শ্রীনাথ
শ্রীনাথ বান্ধবপুরে সাম্প্রদায়িক পদাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি করে । এজন্য ধনু শেখের নির্দেশে তার লোকজন শ্রীনাথকে মেরে ফেলে ।
মণিশংকর
মনিশংকার শ্রীনাথের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে । নমশুদ্রের এক দলকে নিয়ে সে ধনু শেখের দলকে ঠেকিয়ে দিয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধ করে ।

চরিত্র চিত্রণে দক্ষতার পাশাপাশি হৃমায়ুন গণিতের বিভিন্ন বিষয়াবলী নিয়ে এসেছেন উপন্যাসের বিভিন্ন পর্বে । ফিবেনাচ্চি রাশিমালার (১ ১ ২ ৩ ৫ ৮) নিয়মে শিবশংকর যেভাবে হরিচরণের কবর ঘিরে চক্কর দেয় তা ব্যাখ্যা করেছেন ।

পরিশেষে, হুমায়ুন ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখায়ও তার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন । কতিপয় জায়গা ছাড়া তার ফিচকেলি ছিল সমগ্র উপন্যাসে অনুপস্থিত । উপন্যাসটি পড়লে আপনি হুমায়ুনকে স্যালুট দিবেন নিশ্চয় ।

পূণশ্চ: হুমায়ুন আহমদ শাওনকে বিয়ে করার পর যাযাদি'তে "হুমায়ুননামা" প্রকাশিত হয় । পাঠকদের সুবিধার্থে তা লেখার সাথে স্ক্যান করে সংযোজিত হল ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১০ সকাল ১১:৪৬
২৪টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×