জাফর ইকবালকে নিয়ে প্রায়ই একটা কথা শোনা যায়। এই বিষয়ে উনি চুপ কেন? এ বিষয়ে উনি কিছু লিখছেন না কেন? কেউ কেউ আরো এক কাঠি সরেস। তাদের বক্তব্য হলো যেহেতু উনি লিখছেন না সুতরাং উনি দুষ্কৃতিকারী। উনি এসকেপিস্ট। শুধু তাই নয় উনি ভন্ড, আওয়ামী লীগের দালাল এমনকি চরিত্রহীন,লম্পট ও। কি অদ্ভূত মানসিকতা! কাউকে অসম্মান করতে পারাকে এরা হয়তো প্রতিভা বলে গণ্য করে।
এই সমালোচকদের মূল অংশটি মূলত তার লেখার ভক্ত। এরা তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে “উনি নিশ্চুপ কেন” টাইপ লেখা শুরু করেন এভাবে , “ স্যার আমি আপনার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত, আপনার সব লেখা আমার কাছে আছে ইত্যাদি।” দু একজন তার উপন্যাসের দু একটা চরিত্রের ও রেফারেন্স দেন। পরক্ষণেই তারা তাকে আবার এক্সপেক্ট করেন তাদের পাশে, তাদের আন্দোলনে। কিছু একটা লিখে দিতে বলেন । যেন জাফর ইকবাল একজন ফরমায়েশী লেখক। তার আর কোন কাজ নেই। কোন ব্যক্তিগত জীবন নেই।অন্য কোন ব্যস্ততা থাকতে নেই।
তাতে সমস্যা নেই। আমাদের ঘুন জর্জরিত বুদ্ধিজীবি সমাজে হয়তো তার বিকল্প আর কোন আশ্রয় আমাদের নেই তাই আমাদের সব প্রত্যাশা তার কাছে। জন প্রতিনিধিদের উপর মানুষের কোন আশা নেই। তাই হয়তো এদেশের মানুষ যখন সত্যি সত্যি অসহায় হয়ে পড়ে তখন তার মত একজন লেখক ও শিক্ষক হয়ে ওঠেন ভরসার প্রতীক। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হলো উনি কোন সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে কিছু না লিখলেই সবাই এমন ভাব করতে থাকে, এমন সব কথা বলতে থাকে মনে হয় যেন উনি সেই অপরাধীর প্রত্যক্ষ সহযোগী।( সম্প্রতি ‘পরি মল’ প্রসঙ্গে এরকমই কিছু লেখা দেখেছি ব্লগে।)
আরেকটি দল আছে যারা তাঁর কঠোর সমালোচক। সুযোগ পেলে ব্যাক্তিগত আক্রমন করতেও এদের বাধেনা। সুযোগ পেলেই এরা তার চরিত্র হনন করে বিমল আনন্দ পায়। এরা কারা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়না। বিভিন্ন সময়ে জাফর ইকবালের শানিত লেখনী দ্বারা এদের স্বার্থ সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখানে আমি তার লেখক সত্ত্বার মূল্্যায়ন করতে চাই না।কারণ অনেক ভাল লেখকই আসলে ব্যক্তিগত জীবনে সৎ নন।সেই গ্যারান্টিও আমরা চাইনা। একজন আদর্শবান শিক্ষক হিসেবে ডঃ জাফর ইকবালকে আমরা দেখি আমাদের স্বার্থান্ধ, মুনাফালোভী, সুবিধাবাদী সমাজকাঠামোর ভেতরে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে। উনি আমেরিকার খুব নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। চাকরি ও করেছেন বেল কমিউনিকেশনস এর মত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। এই পর্যায়ে যাওয়ার পর আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই দেশে ফেরেন না। উনি ফিরেছেন। শুধু তাইনা তিনি দেশে ফিরে যোগ দিয়েছেন ঢাকার বাইরের সেই সময়ের নতুন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সবাই জানেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উনি কি পরিমান নিগ্রহের স্বীকার হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে।তবু তিনি চাকরি ছাড়েন নি।রঙ্গীন মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যমের পাদপ্রদীপে থাকা অবস্থায় ও তিনি ভুলে যান নি তার শিক্ষক সত্তা। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলে কত বেতন পেতেন সেটা সবাই অনুমান করতে পারি, তার পেছনে টাকার বস্তা নিয়ে এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষরা যে ছোক ছোক করেন তাও বুঝতে পারি। তবু তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েননি। এই বয়সে ঢাকা-সিলেট এর ভ্রমণ ক্লান্তিও তিনি উপেক্ষা করেছেন।আসুন শুধু এই কারণে তাকে একটা স্যালুট দেই।
এক জাফর ইকবাল এর পক্ষে আর কত সম্ভব! বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের দায়িত্বে থাকলে তো আর কোন দিকে তাকাতে পারার কথা না।তিনি তো আর পূর্ণকালীন কলমজীবি না।তার ছাত্রদের কাছে শুনেছি তিনি ক্লাশ ফাঁকি দেন না। কোর্স শেষ না হলে তিনি সন্ধ্যায় ক্লাশ নিয়ে পুষিয়ে দেন। তার মত শিক্ষক কজন আছেন। নিশ্চয়ই মাঝে মাঝেই তাকে বিদেশও যেতে হয়্। তবু তিনি যে লেখেন এই তো বেশী।
এখন কথা হলো তার উপর প্রত্যাশা করা কি অন্যায়? না অন্যায় নয়। কারণ তার উপর্ই প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু প্রত্যাশার চাপে তাকে পিষ্ট করা অতঃপর তার নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কতটা যৌক্তিক? কেউ কেউ বলছেন তিনি পার্টিজান বুদ্ধিজীবি, তিনি আওয়ামীলীগের বিপক্ষে কিছু লেখেন না। এই কথাটির মধ্যে কতটুকু সততা আছে? ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামীলীগ সরকারের সময় তিনি সব রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধেই কলম ধরেছিলেন। সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামকরণ নিয়ে তৎকালীন স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাথে বেশ বড় একটা ঝামেলায় জড়িয়েছিলেন। সে সময় আওয়ামী লীগ আর মৌলবাদীরা এক হয়ে গিয়েছিল তার বিরুদ্ধে। বিদেশে তেল গ্যাস বিক্রি নিয়ে এই দেশে সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে জোরালো কলামটি লিখেছিলেন। শেষের দিকে তার একটা কলামকে তো আওয়ামী লীগের ভরাডুবির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে ধরা হয়। সেই যে শূন্য দিয়ে গুন করলে সব শূন্য হয়ে যায়…..বিষয়ক কলামটি।
জাফর ইকবাল ইদানীং কেন আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কিছু লিখছেন না সেটা অনেকের প্রশ্ন। আচ্ছা তিনি যদি এই সব কলাম লেখাই ছেড়ে দেন তাকে কি দোষ দেওয়া যায়? এদেশে এখন এক জটিল সমীকরন তৈরী হয়েছে। এদেশে আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করা মানে যুদ্ধাপরাধী আর তাদের দোসরদের সাহায্য করা। এটাই বাস্তবতা।এ এক চরম দূভাগ্য। জাফর ইকবালরা কোথায় যাবেন? আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো।
আমি বরং প্রশ্ন করি, কি হয় কলাম লিখে?
এই সমাজে একদিন জাফর ইকবালরাও ক্লান্ত হয়ে যাবেন। তাদের মত তীব্র আশাবাদীরাও হতাশ হতে পারেন ……বিচিত্র কিছু নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



