somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি পাক কদমবুচী অনুষ্ঠান

২৪ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাবিব ভাইর কলটা ঘুম চোখেই রিসিভ করেছিলাম। টানা প্রায় দু’রাত খাটুনির পর ঘুম। সেটা পুরোপুরি পাকার আগেই মুঠোফোনের চিৎকার। হাবিব ভাইর জন্য মোবাইলে স্পেশাল রিংটোন সেট করা। আর উনার ডাকে পারলে কবর থেকে উঠে আসবে ভক্তরা, আমি তো স্রেফ বিছানায়। ‘কিরে পিলু, এখনও ঘুমে নাকি! জলদি ওঠ। মুখ ধুয়েই বংশাল থেকে ১০ নাম্বার বাসে উঠবি। নামবি মৌচাক, সেখান থেকে রিকশা করে মগবাজার ওয়ারল্যাস। বলবি কাজী অফিস। ওইখানে কিবরিয়া ভাইর বিয়ে। সাক্ষী সংকট। এক দৌড়ে পৌছবি। নাস্তা উনিই করাবেন।’ রায় হয়ে গেছে, আপিল চলবে না। অগত্যা ওই ঘুমালু চোখ নিয়েই ব্রাশে সেভিং ক্রিম মেখে দাঁতে লাগাই। লাভের মধ্যে ঘুমটা পালায়। সপ্তাহখানেকের দাড়ি গালে, কিন্তু সময় নেই হাতে। বেছে একটা ফুল স্লিভ শার্ট কবজি পর্যন্ত বোতামবন্দী করি। ইন করি না। নর্মাল একটা প্যান্ট। বর্ষার পানিতে রাস্তাঘাট বেহাল। তাই গোড়ালী পর্যন্ত ভাজ করে নেই। তারপর হুকুম মতো পৌঁছে যাই মগবাজার ওয়ারল্যাস। পুরো কাহিনী বদলে যায় এরপর থেকে।

কাজী অফিস একটা গলির মধ্যে। সেখানে দেখি বেজায় ভিড়। তরুণ-যুবকদের বেশ জমজমাট সমাবেশ। এরাও বোধহয় বিয়ে খেতে এসেছে। কি আশ্চর্য্য। আমার সঙ্গে তাদের পোষাকেও ভারী মিল। ফুলস্লি­ভ শার্ট, গোড়ালি পর্যন্ত গোটানো প্যান্ট। রিকশা থামাতেই দেখি সবগুলো মুখ আমার দিকেই ফিরে তাকালো। ভাড়া চুকিয়ে একজনকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম. ‘ভাই, কাজী…।’ কথা শেষ করতে পারলাম না। সমস্বরে চিৎকার উঠলো, ‘গাজী গাজী, আগায়া।’ তারপর আমাকে চ্যাংদোলা করে দেখি তারা এগিয়ে চললো। ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরুল না। পাশে দেখি মিছিল হচ্ছে, প্রথম লাইনটা বুঝলাম না, পরেরটা পরিষ্কার, “আমরা সবাই গাজী হবো।”
সামনে একটা একচালা বিশাল ভবনের মতো। তাতে সামিয়ানা টাঙানো। বিশাল এক টেবিলে মুরুব্বী গোছের কয়েকজন বসে আছে। তাদের পেছনে উর্দূতে কিছু লেখা। উর্দূই, কারণ আরবী হলে জের, জবর থাকত। আর নিচে বাংলায় লেখা ‘গাজী ভাইয়ের পাক কদমবুচী অনুষ্ঠান’। আমাকে দেখেই হাততালিতে ফেটে পড়ল গোটা সমাবেশ। একদল যুবক বেশ সুরেলা একটা গান গাইলো বাদ্যবাজনা ছাড়া, কথাগুলোয় বেশ জোশ আছে। এরপর মাইকে এলেন এক মুরুব্বী, ততধিক জোশিলা গলায় বলে চললেন, “উপস্থিত বেরাদেরান, আমাদের গাজী ভাই এসে গেছেন। সেই গাজী, যিনি আমরা যা ঠারেঠোরে গোপনে করে যাচ্ছিলাম, একদম এক লাথিতে করে দেখিয়েছেন। তার সেই লাথিতে এই পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস আবার নতুন গতি পেলো। এই গতিই ইতিহাসের চাকাকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাবে ঠিক যেখানে আমরা তাকে চেয়েছিলাম। বলুন মারহাবা।”

শুরু হলো মারহাবা। এদিকে আমি ভাবছি পূর্ব পাকিস্তান এলো কোত্থেকে। এই লোকগুলো অবশ্য বেশ উর্দূ বলে। পুরানো ঢাকার ছেলে আমি, বাসা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের পাশে। সুইপারদের কথা শুনে অভ্যস্ত। তাই এদের কথা বুঝতে অসুবিধা হলো না। সেই লোক এদিকে বলে চলেছে, “কিসের মুক্তিযোদ্ধা? সুন্দরী মেয়ে আর ধনসম্পদের লোভে যারা ডাকাতিতে নেমেছিলো, এরাই সব মুক্তিযোদ্ধা। আসলে সব প্রতিবেশী দেশের দালাল। কিন্তু এই দেশের মানুষ বুঝে গেছে সত্যিকার দেশপ্রেমিক কারা। আমাদের হাতে এই দেশের অর্থনীতির চাবিকাঠি। কল ঘুরিয়ে দিলে সব না খেয়ে মরবে। সব কিনে ফেলেছি। তাই মুক্তিযোদ্ধা আর যুদ্ধাপরাধী বলে এত বছর পর দেশকে দুই ভাগ করার ষড়যন্ত্র সফল হবে না। তাছাড়া এই যে আমাদের তরুণ মুজাহিদরা, এদের জন্ম তো একাত্তরের অনেক পরে। এদের কেনো রাজাকার বলে গালি দেয়া হয়? তারা আমাদের ভাষায় কথা বলে তাই? কাভি নেহী। সব গাজী ভাইয়ের মতো লাথি মেরে চুপ করিয়ে দেয়া হবে। সেদিন সেই সাহসী ঘটনার পর উনি ডায়েরিয়ার কারণে আর আমাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। অধ্যাপক সাহেব থেকে শুরু করে জেল খেটে আসা আমাদের নেতাও উনার বদন মুবারক দেখার জন্য আকুল হয়ে আছেন। আজ তার পাক কদমকে কদমবুচী করে তারা শ্রদ্ধা জানাবেন।”

এইবার আমার মাথা খারাপ অবস্থা। কোথায় এলাম! এযে সব বড় বড় খুনীরা বসে আছে। একজন দুজন নয়, হাজারে হাজারে লাখে লাখে মানুষের রক্ত এদের হাতে! ভাবনার সুযোগটাও পেলাম না। ‘আইয়ে জনাব’ বলে আমাকে ঠেলে সেই টেবিলের উপর তুলে দেয়া হলো। পাকা দাড়ি এক লোক আমার দিকে চেয়ে কেঁদে দিলেন। উনি নাকি অধ্যাপক। কোন কলেজের নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জানি না। জানালো না কেউ। ‘তু আব তাক কাহা থি মেরে লাল- কই ছিলে তুমি? ২৬টা বছর ধরে অপমান সহ্য করে যাচ্ছিলাম। সেই ৮২ সালে বায়তুল মোকাররমে জুমা বারে গিয়েছিলাম পালেস্টাইন সংহতি দিবসে। আমাকে জুতাপেটা করলো বাঙালীরা। তারপর থেকে দিন গুজরান করেছি প্রতিশোধের জন্য। তুমি সেই কাজ করেছো বাপজান। বলেই আমার পা টা নিয়ে চাকুম-চুকুম করে চুমু দিতে লাগলেন। আমার তো সুরসুরি লাগছে, সেই সঙ্গে প্রবল ঘৃণা।

টেনে সরাতে হলো না, কেড়ে নেওয়া হলো। বলতে গেলে তার কাছ থেকে টেনে নিয়ে গেলো আমার পা’টা তার পাশের জন। চেহারাটা বেশ চেনা চেনা লাগলো। টিভিতে দেখেছি মনে হয়। ‘ইয়া হাবিবি, হে বন্ধু তুমনে তো কামাল কার দিয়া। এই দেখো আমার দাড়ি। দেখো দেখো। টেনে ছিড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেয়াদব ছেলেগুলা। সরকারে আসার পর গিয়েছিলাম সেখানে, মারধোর বাকি রাখে নাই। আর মুঠো ধরে টেনে ছিড়েছে মেরা মেহেদী লাল বাল। সেই থেকে এই দুপাশে টাক পড়ে গেছে, আর দাড়ি উঠে না। আমি জুলফি বড় করে সেই টাক ঢেকেছি। অধ্যাপক সাহেবের জুতাপেটার দিনও আমি পাশে ছিলাম। ভয়ে যেতে পারিনি কাছে, আমাকেও যদি মারে। সেই মারটা ঠিকই খেলাম। তুমি তার শোধ নিলে।’ বলেই সেই চুমু খাওয়া। এবং একইভাবে তার কাছ থেকে কেড়ে নিলো তৃতীয় জন। আমি যাতে পড়ে না যাই সে জন্য দেখি আমার বগলের দুপাশ ধরে আছে দশাসই দুই পালোয়ান কিসিমের যুবক। তারাই আগলে আমাকে আরো কাছে নিয়ে গেলো তৃতীয় জনের। তিনি বললেন, “আলবদরের কমান্ডার ছিলাম, তারপরও আমার লোম স্পর্শ করতে পারে নাই কেউ এতদিন। কিন্তু সেদিন প্রেসক্লাবে আমাকে দৌড়ানি দিলো কিছু দু®কৃতিকারী- গন্ডগোলের সময় এরা বন্দুক নিয়া মানুষজনকে ভয় দেখাতো। এই বুড়ো বয়সে কি বেইজ্জতি। তুমি বদলা নিয়েছো যুবক।’ তারপর কদমবুচী চলতেই থাকলো। লাইন ধরে লোকজন আমার পা ছোয়, কেউবা চুমু খায়। আর বলে মারহাবা। পাকসারজমিন পয়েন্দাবাদ।’

ঝামেলা থেকে কিভাবে বাঁচা যায় ভাবছি। বিয়ে খেতে এসে কোন গাড্ডায় পড়লাম! যা বুঝলাম গাজী নামে কোনো এক যুবকের সঙ্গে আমাকে মিলিয়ে ফেলেছে এরা। আর সেই লোক কোনো এক মুক্তিযোদ্ধাকে লাথি মেরে উধাও হয়েছিল। তার সম্বর্ধনা আমি নিচ্ছি। এখন এই গাড্ডা থেকে বেরুতে হবে। ভেবে পেলাম একটা উপায়। সেই বক্তৃতাবাজ লোকটাকে বললাম ‘আমি কিছু বলতে চাই।’ উনি বেশাক, বেশাক বলে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিলেন। হাতে নিয়ে বললাম, ‘বেরাদেরান। আজকে আমার খুব খুশী লাগছে যে আমি আমার শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পেরেছি। আর অধ্যাপক সাহেবের মতো মহান দেশপ্রেমিক লোক আমার কদমবুচী করে আমাকে যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তাতে আমি আপ্লুত। উনার শিক্ষাকেই ধারণ করে আমরা আজ এতদূর এসেছি। এই যে দেশটা, এই ভৌগলিকভাবেই লুটপাট করার দেশ। দিনেমার, বর্গী, ইংরেজ সবাই লুটেছে। তাছাড়া ধর্মীয় দিক থেকেও এরা ঠিক পাক্কা ইমানদার না। তাই এর সঠিক নিদান দিতে পারে একমাত্র আমাদের নেতারাই, তাদের দিক নির্দেশিত পথেই এই দেশের সঠিক রিয়াসাত।’ মারহাবা, মারহাবা সমস্বরে রব উঠে চারদিক থেকে।

‘আমার একটা আরজি ছিলো অধ্যাপক সাহেব’, বলে তার দিকে তাকাই। উনি ‘বেশাক, আজ তেরা হার চাহা পুরি হোগি মেরে লাল, যা চাইবে তাই পাবে।’ বললাম, ‘আমার ডায়েরিয়া পুরাপুরি সারেনি। তাই বাড়ি যেতে হবে। আমি আবার বাড়ির টাট্টিখানা ছাড়া আর কোথাও পায়খানা করতে পারি না। তবে তার আগে আমি সেদিনের সেই কীর্তিটা আবার করে দেখাতে চাই। আপনি রাজী হলে…।” উনি গদগদ চেহারা নিয়ে নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই বলে উঠে পড়লেন টেবিলে। বললেন, ‘আমি মুক্তিদের মতো জয় বাংলা বলতে থাকব, আর তুমি লাথি মারবে।’ ‘জয় বাংলা!” বলে আমি গদাম এক লাথি কষিয়ে দিলাম তার পাছাতে। তারপর বললাম, ‘হোজুর বেশ বেগ পেয়েছে, তাই তাড়াহুড়ায় মারলাম, জয় বাংলাটাও আমিই বলে দিলাম। ইতিহাস নিশ্চয়ই জায়গামতো যাবে।” মারহাবা, মারহাবা শুনতে শুনতে বেরিয়ে পড়লাম।
একটা হোটেল খুজে বের করতে হবে। খিদে পেয়েছে।

লেখাটা আমার ব্লগে প্রকাশিত

২০টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×