-পিয়াল ভাই, যদি কিছু মনে না করেন একটা অনুরোধ করি।
-সিউর, এত ফর্মালিটির দরকার নাই তো। কইয়া লান।
-বস, আপনে সামহোয়ারে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মুভমেন্টে ইনভলভড হইয়েন না।
-ক্যান! কি সমস্যা!!
-ব্যাপারটা হইলো অনেকেই আপনারে পছন্দ করে না। বিশেষ কইরা যৌবনজ্বালার ব্যাপারটার পর আপনার ইমেজ অনেকখানি টারনিশড। আপনি থাকলে প্রথম কথা রুচিশীল ব্লগার বিশেষ কইরা মেয়ে ব্লগাররা কেউ আসবো না, দ্বিতীয় হইলো রাজাকার পার্টি আপনারে ইঙ্গিত কইরা খোঁচাইবো ব্যাপারটারে। ফলে, পুরা ইস্যুটা মাইর খাইবো। অন্যভাবে নিয়েন না, এইটাই সত্যি। এইটা আমার ধারণা না। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার পর এইটাই দেখলাম মূল সুর। অনেকে বিব্রত।
আচ্ছা! মেসেঞ্জারে কথাগুলা পইড়া আমি আমার ২০০৮ সালের এচিভমেন্ট সম্পর্কে অবগত হইলাম। এর আগে সচলায়তনে এই ইস্যুতে একটা লেখায় ব্লগার জ্বিনের বাদশাও একই ইঙ্গিত দিছিলেন। তার কথা এই ঘটনায় মেয়ে ব্লগারদের আমি দূরে সরাইয়া দিলাম। সেখানেই অনেক ঘনিষ্ঠজন ঘোষণা দিয়া আমার লগে সম্পর্কচ্ছেদ করছেন। সো আমি এখন না ঘরকা না ঘাটকা হয়া গেলাম।
আনন্দ-বেদনার কাব্য
বছরের শুরুটা বেশ আনন্দঘনই ছিলো। যথারীতি দৈন্যদশার মধ্যে দিয়া জানুয়ারি কাটলো। ফেব্রুয়ারিতে আসলো রাজকন্যা। আমার উত্তর প্রজন্ম, আত্মজা। মেয়ে বাবার জন্য যথেষ্ট লাক নিয়া আসছিলো। এক সপ্তাহের মাথায় পদোন্নতি। আরও নানান সুযোগ ক্যারিয়ার উপরে নেয়ার। কিন্তু লাক ধইরা রাখতে হয়। আমি পারি নাই। মাঝে মেয়ে আমার থিকা দূরে ছিলো মাস তিনেক। এই বিচ্ছেদকালটা আমার গোটা জীবনটা ওলটপালট কইরা দিছে। এতটাই যে আমার মনে হইছে গৃহবাস আমার জন্য না। একদমই শামুক হয়া গেলাম। সেইখান থিকা আস্তে আস্তে যখন স্বরূপে ফিরলাম, দেখি অনেক না হইলেও দেরি হয়া গেছে। চাকুরি নাই। যেই অভাবের কারণে সংসারে ভাঙন ধরছিলো, সেটা এখনও বজায় আছে। আমি চাকুরি খুঁজি না কেনো- এই নিয়া মা এবং বৌর কাছে নিয়মিত জবাবদিহীতা করতে হয়। কম্পিউটারের সামনে বইসা লেখালেখি যে কারও চাকুরি হইতে পারে সেই কাহিনী তাদের কারো কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
অচেনা বন্ধু, (অ)চেনা শত্রু
আমার খোলসবন্দী অবস্থা থিকা স্বাভাবিকতায় ফেরানোর জন্য একজন মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। তার ঋণ কোনো কালে শোধ করা সম্ভব না। কারণ আমি যেই মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়া দিনপাত করছি- সেই অবস্থা খোদা না করুক তার কোনোদিনও হবে না। বাচ্চার দুধ কিনার টাকা নাই, টাকা পাঠাইয়া দিছেন। কেমনে কি, জিজ্ঞাসও করে নাই। জিনিসটা যাতে ভিক্ষার মতো না দেখায় সেই জন্য কিছু কাজ দিছেন করতে। আমি সেগুলা করি নাই। তারপরও তার অনুযোগ নাই। তার হাসির ইমোটিকন যখনই এন্টার দেন, আমি তখনই লজ্জায় কুকড়াইয়া যাই। আমার জন্মযুদ্ধটা হাতছাড়া হয়া গেছে জাইনা আমারে দুইটা ডোমেইন উপহার দিছে। লেখে- চিন্তা কইরেন না মিয়া! অথচ এই লোকটারে আমি কোনোকালে গনাতেই ধরি নাই। আবার যার উপর আমার অগাধ ভরসা ছিলো, যারে নিয়া কেউ কটু কথা বললে আমার 'জিভ টাইনা ছিড়া লামু' অনুভূতি হইতো। বছরের শেষে আইসা তার ভিন্নরূপ দেইখা আমি চরম আতঙ্কিত। আতঙ্কিত আমার ভরসার উপর। আমার বিশ্বাসের উপর। আমার মানুষ চেনার যোগ্যতার উপর। পিঠে ছুরি খাইলে কেমন লাগে, সেই কষ্টটা যে খায় সে বুঝে। এসব লিখ্যা প্রকাশ করা যায় না।
আলোচিত-সমালোচিত
রিসেন্টলি এক ব্লগার এক জায়গায় মন্তব্য করছেন, ভাই আপনিতো সেলিব্রিটি হয়া গেলেন। আপনারে নিয়া যেই হারে পোস্ট পড়তেছে। তারে মজা কইরা বলতে চাইছিলাম- আমি তো আগের থিকাই সেলিব্রিটি। তবে এইবার নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় কইরা আবার লাইম লাইটে আসছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়া আমার প্যাশনের কথা অনেক বন্ধু ব্লগারই লিখছেন তাদের আন্দাজে। ব্যাপারটা কেমন আসলে আমি নিজেও বুঝি না। শুধু খেয়াল আছে কয়দিন আগে যখন ওয়ার ক্রাইমস ফাইলস থিকা যুদ্ধাপরাধী ফরিদউদ্দিনের নামটা বাইর করার জন্য ডিভিডিটা চালাইতেছি, আমার কোলে থাকা রাজকন্যা তখন কি কারণে কান্না শুরু করছে। আমি তার মুখ চিপা ধরছিলাম। আমার মা একটা সেন্ডেল নিয়া আমারে দমাদম মাইর। আমি নাকি পাষণ্ড পিতা। হইতে পারে। এই ব্যাপারগুলা নিয়া কাজ করার সময় আমার মধ্যে অন্য একটা অনুভূতি কাজ করে। যতবারই মুক্তিযুদ্ধের আলোচিত কিছু পড়ি, আমার চোখে পানি আইসা পড়ে। কেনো আসে জানি না। তবে আসে। আবার এই আমিই আমার স্বাভাবিক যাপনে চরম স্বেচ্ছাচারী। যা মনে চায় তাই করি। এইসব নিয়া কাজ করলে যে আলাদা একটা ইমেজ নিয়া চলতে হবে, চরিত্র হতে হবে ফুলের মতো পবিত্র- এই চিন্তাটা মাথাতেই আসে না। আমি যা করি নিজের তাগিদে করি। মানুষ যেহেতু আমারে অনাহারের সময় ভাত খাওয়ায় না বা আমি তাদের বাড়িতে খাইতে যাই না- তাই তাগো মনের মতো ভাবমূর্তির কথা ভাবি না কখনও। তারপরও সমাজ বইলা জিনিস আছে একটা। আমি চূড়ান্ত অসামাজিক। আমার তাই কোনো গ্রহণযোগ্যতা নাই।
যার কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিয়া চিন্তিত, সে এখন আমারে আর দূরে ঠেলে না। সামহোয়ারের প্রতিটা নিন্দাপোস্ট তারে আমি পড়াইছি। তারপর জিজ্ঞাস করছি- তার কি মনোভাব। সে বলে- আমার ভরসা আছে তোমার উপর। যৌবনযাত্রা বিষয়ক পুরা ব্যাপারটা সে আগাগোড়া জানে। তার মাঝে বিন্দুমাত্র খচখচি দেখি না।
নিরাপত্তাহীনতা
গত জোটসরকারের সময় প্রথম আলোয় কার্টুন আইকা গ্রেপ্তার হইছিলো আরিফ। মুক্তি পাওয়ার পর থিকাই তারে ট্রাক করতেছিলাম। তার সাক্ষাতকারটা বেশ আলোচিত হইছিলো। বাংলা ভার্সনটা ছাড়ছিলাম শুধু সামহোয়ারে আর ইংরেজিটা ই-বাংলাদেশে। বিডি নিউজে আমার একটা উপকার হইছে যে বাংলা-ইংরেজী দুই ভাষাতেই লেখালেখি করার সক্ষমতা হইছে আমার। বাংলাদেশ সফরে আসা ভারতীয় জেনারেল জ্যাকবের সাক্ষাতকারটা নিয়া যেমন তৃপ্তি পাইছিলাম, সেরমই সন্তুষ্টিই ছিলো আরিফেরটা কইরা। যদিও ওর নিরাপত্তার জন্যই আমি হরকাতুল জিহাদের জায়গায় জেএমবি লিখতে বাধ্য হইছিলাম। এই নিরাপত্তার জন্য আমি একমাস পর ওর সাক্ষাতকার ছাড়ছি। এরপর ফোন আসা শুরু হইলো আর উড়াধুরা ই-মেইল। মাইরা লামু, কাইটা লামু টাইপ। এমনই নাম্বার, ওয়ান টাইম ইউজ করে মনে হয়। বৌ-বাচ্চার কথা ভাইবা বাসায় থিকা অফিস করার সিদ্ধান্ত নিলাম। যুদ্ধাপরাধী প্রার্থীদের নিয়া কাজ করার সময়ও একই ঘটনা ঘটছে। ঝামেলা ওইটাই। আমি আমারে নিয়া কোনোকালেই ভাবি নাই। কারণ আমি মারা গেছি অনেক আগে, এইটা আমার বোনাস লাইফ। রাজকন্যা আর ওর মারে নিয়া খারাপ লাগে। আমি মরলে ওরা পথে বসবো, কারন তাগো জন্য আমি কিছুই করি নাই।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই
বছরের শুরুতে গত সালতামামিটা লেখছিলাম দারুণ এক অর্জনের পর। সেটা ছিলো ব্লগ রাজাকারদের বিরুদ্ধে দারুণ এক বিজয়। এ বছরটাও সেই অর্থে শুরু করতেছি আরেকটা হাই নোটে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের শেষ ফ্রন্টিয়ার। আমি নিজেরে একজন সৈনিক হিসেবে প্রবোধ দিই, হয়তো এইটাই আমার ফ্যান্টাসি। আমার ডেডিকেশন নিয়া অনেকের সংশয়। কিন্তু আমার বিবেকের কাছে আমি পরিষ্কার। ওইটাই সবচেয়ে বেশী দরকারী ঠেকে, আর কিছু না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আসছে। অনেকেই অনেক কথা বলতেছে। হয়তো যুদ্ধাপরাধীদের গায়ে টোকাও দিতে পারবে না কেউ। কিন্তু বিবেকরে আমি প্রবোধ দিতে পারুম হয়তো- আমি চেষ্টা করছিলাম। তুমি জানো আমি চেষ্টা করছিলাম। আমার সাধ্য যতখানি, তার পুরাটা দিয়া আমি চেষ্টা করছিলাম। নতুন বছরে সেই শপথ নিই- চেষ্টা করবো, সেই জন্য শেষ পর্যন্ত যাবো। যতদূর যেতে পারে একজন সক্ষম মানুষ। সামহোয়ার, যৌবনযাত্রা নিয়ে ভাবি না। আমি চিরকাল একলা লড়ি, এবারও একলা লড়বো।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



