তবে এই নিয়ে সচেতন হওয়াটা যতটা জরুরী, তারও বেশী জরুরী আসলে প্রতিরক্ষাবুহ্য। আইন মন্ত্রী কয়দিন আগে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েছেন যে সরকার ১৬ ডিসেম্বরের আগেই বিচার শুরু করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবং এই ঘোষণা বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ এবং প্রথম গ্রেফতারটির সঙ্গে সঙ্গেই যে প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে তার ব্যাপ্তি এবং ভয়াবহতা হতে পারে নানামুখী। মুহুর্মুহু বোমাবর্ষনে কাঁপতে পারে জনপদ, হতে পারে আশঙ্কাজনক হারে বেসামরিক প্রাণহানী, বিডিআরের মতো সামরিক বাহিনী থেকে বিদ্রোহ হতে পারে, সরকারের পদস্থদের উপর হতে পারে আত্মঘাতী বোমা হামলা, রাস্তায় নামতে পারে স্বাধীনতাবিরোধীদের পোষ্যরা। সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া থেকে এক কাপড়ে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে তাবৎ প্রবাসী বাঙালীকে। এবং এর সবই ঘটবে একটি মাত্র উস্কানিতে- সরকার ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছে, গ্রেপ্তার করছে ইসলামপন্থী রাজনীতিকদের।
এই উস্কানিটার প্রভাব কতখানি ব্যাপক হতে পারে তা বুঝতে আমাদের ক্যালেন্ডারের পাতাগুলোয় পিছিয়ে যেতে হবে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নি সংযোগে সহায়তার অভিযোগ উঠেছিলো তারা সবাই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সদস্য। মূলত মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামের সদস্যরাই এর দায়ে অভিযুক্ত। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ডিসেম্বরের শুরুতেই ‘এই দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হলো’ বলে ঘোষণা দেন। স্বাধীনতার পর এই ঘোষণা আসে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর। সে বছর ঘোষিত বাংলাদেশের সংবিধানের ১২ ও ৩৮তম ধারায় সব ধরণের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। ইসলাম রক্ষার নামে বাঙালী নিধন ও জিহাদের নামে তাতে সহায়তার বলি ৩০ লাখ লাশ আর ২ লাখ বীরাঙ্গনার ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতায় ধর্মনিরেপক্ষতাই হয়ে ওঠে আমাদের বড় আত্মপরিচয়।
ধর্মব্যবসায়ীদের কপাল পোড়ানো এই সাংবাধানিক মূলনীতি তারা মোটেই মেনে নেয়নি। জামাতের আমির গোলাম আযম তখন সৌদি আরবে অতিথি। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা এই যুগান্তকারী তত্বের প্রসাদে সৌদি বাদশা ফয়সাল কনভিন্সড। বাঙালীরা হজ্ব করত পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু সৌদি আরবে তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেলে স্বীকৃতি ও এই প্রসঙ্গে দাবি শুনে ফয়সাল শর্ত দেন- বাংলাদেশের নামের আগে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র লাগাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী এমআর আখতার মুকুলের ‘মুজিবের রক্ত লাল’ বইটিতে বিস্তারিত বর্ণনা আছে সে সাক্ষাতের। বিরক্ত বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন খোদ সৌদি আরবই তো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ব্যবহার করে না। এ ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান দেশ হিসেবে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ দেন তিনি যারা সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরেপক্ষতাকে মূলনীতি মেনেছে।
ব্যর্থ বঙ্গবন্ধু যে ঘোষণা দিতে রাজী হননি তাই দিয়েছিলেন মেজর শরিফুল ইসলাম ডালিম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ বেতারে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সগর্ব ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করেন তিনি। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এসে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাতিল করে সংবিধানের সুন্নতে খতনার দায়িত্ব সারেন। ফের ধর্মব্যবসার সুযোগ মেলে ইসলামী আফিম বিক্রেতাদের। আরে এর সবচেয়ে বড় ফায়দা লোটে জামাতে ইসলামী। গোলাম আযম থেকে শুরু করে তাবৎ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা সদর্পে জেকে বসে বাংলার প্রান্তরে। ’৭৭ সালে মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক দিন বলে স্মরণীয় ৭ মার্চে সেই রেসকোর্স ময়দানেই তারা বিশাল জমায়েতে দাবি তোলে জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত বদলের। এরপর গোটা দেশের রাজনীতিতে এখন দুটো ধারা। একদলের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বিপক্ষে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে ইসলাম পন্থা যার কলকাঠি সেই যুদ্ধাপরাধীদের হাতেই। জুমআর নামাজের মোনাজাতে উচ্চারিত হয় ‘হে আল্লাহ ভারত ও ইহুদি নাসারাদের ষড়যন্ত্র থেকে ইসলামকে রক্ষা করো, সকল ইসলামপন্থীদের রক্ষা করো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে তাদের বেইজ্জত করার ষড়যন্ত্র তুমি বেকামিয়াব করে দাও হে মালিক’। কয়জন আমার মতো সঙ্গে সঙ্গে হাত নামিয়ে নেয়ার মতো কবিরা গুনাহ করতে পারে!
সেই শকুনগুলোই সময়ের পরিক্রমায় এখন দারুণ শক্তিশালী। একাত্তরের চেয়ে কম ধারালো নয় তাদের হিংস্র নখ ও দাঁত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া ৩৭৫ জন বিচারকের মধ্যে ২১১ জনই ইসলামী ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ’তিনেক প্রভাষকের এক তৃতীয়াংশও তাই। জামাতের পরিকল্পিত জনশক্তি বিনিয়োগ হয়েছে পুলিশ, বিডিআর ও সেনাবাহিনীতে। বড় বড় ব্যাংক ও এনজিওর মাধ্যমে তাদের অর্থশক্তি এবং শেকড় অনেক গভীরে ঢুকে গেছে। বৈদেশিক অফুরন্ত অনুদান তো আছেই। আছে একাধিক টিভি চ্যানেল ও সংবাদ পত্র। আর ব্লগের কথা নাই বা বললাম।
একদম ভেতরের একটা খবর দিয়ে লেখাটার ইতি টানি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়কে নানাভাবেই বিতর্কিত করে যাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী প্রচারযন্ত্র ও পোষা বুদ্ধিজীবিরা। এদেশের সদ্যভোটার হওয়া তরুণরা যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেই নৌকায় ভোট দিয়েছে তার কোনো স্বীকৃতিই নেই সেই অপপ্রচারণায়। সরকার তাই আন্তরিকভাবেই চাইছে একটা গনজোয়ার। চাইছে মানুষ বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামুক। জনগনের এই আবেগটাকেই তারা সহযোগ হিসেবে মানতে চাইছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে। এর সবচেয়ে বড় দিকটা হলো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, তাদের পৃষ্ঠপোষক আন্তর্জাতিক শক্তিকে দেখিয়ে দেওয়া যে এই দাবি বাঙালীর প্রাণের দাবি। খবরটার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। বাতিল করে দেওয়া যায় আরেকটি আওয়ামী বাহানা হিসেবে। সেই হিসেব নিকেশে না গিয়ে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করাটাই সঙ্গত- আমাদের কি উচিত যুদ্ধাপরাধীদের শিগগির বিচার অনুষ্ঠানে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা? উত্তর যদি হ্যা হয়, নিশ্চিত জানবেন মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ঋণ পরিশোধে আপনাকে উদ্যোগী হতে বলছে আপনার বিবেক। তৈরি থাকতে বলছে হায়েনাদের প্রতিক্রিয়ার প্রতিরোধে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ ফ্রন্টিয়ারে। স্বাধীনতার শুদ্ধিতে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৯:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


