somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... আজ ২৫ মার্চ, চেতনাকে ঝালাই করে নিতে আবার পড়ুন সেই কালোরাতে ইথারে খুনীরা যা বলেছিলো....

সেই কালোরাতে ইথারে খুনীরা যা বলেছিলো...২

ডক্টর মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেইন : যার কাছে বাঙালীর অসীম কৃতজ্ঞতা

অধ্যাপক ড. নুরুল উল্লাহর সাক্ষাতকার

‘অপারেশন বিগ বার্ড’- যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুকে

দেখুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যার ভিডিও ফুটেজ



ঘৃণা করুন পাকিস্তানী খুনে, লুটেরা ও তাদের এদেশী দোসর জামাত-শিবিরসহ সকল স্বাধীনতাবিরোধীকে। আওয়াজ তুলুন এই পাপের ক্ষমা নাই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29123174 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29123174 2010-03-25 17:23:16
জামাত শিবিরের অতি দেশপ্রমের নেপথ্যে....
এসব লেখা ইদানিং রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এইসব কপিপেস্ট ব্লগ, একাধিক নিকে লেখা ব্লগই লিঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোতে। তাদের কথা, বাংলাদেশে মানবাধিকার চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে। আর মূল ইস্যুটা অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এনিয়ে সামুর পুরাতন ব্লগারদের একজন (এবং ছাগুবৃদ্ধিতে বিরক্ত হয়ে ব্লগ ছাড়া) আড্ডাবাজের একটা পোস্ট পড়ে রীতিমতো শিউরে উঠলাম। ওয়াশিংটন ডিসিতে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করেছে জামাত শিবিরের ভাড়াটে লবিইস্টরা। আড্ডাবাজ লিখেছেন :

....মার্কিন মুল্লুকের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে যুদ্ধাপরাধী জামাতীরা সেখানকার ইসলামী সংগঠনগুলোর ব্যানারে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী অত্যাচারের ফিরিস্তি দিয়ে হিলারী ক্লিনটনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।.... ...আজকাল কোন কিছুতে আশ্চর্যান্বিত হই না। এর আগের দিনের দৈনিকের শিরোনামটা আবারও চোখে ভাসল যে জামাতীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে ১০০ কোটি টাকা দেশে বিদেশে লগ্নি করেছে।.... ....সকালে অফিসে যেতে যেতে বন্ধু আসিফের ই-মেইল আমার কম্পিউটারে এসে যোগ হয়। রাজাকার জামাতীরা খুব দ্রুত প্রেস রিলিজও বের করেছে " আমেরিকান মুসলিম টাস্কফোর্স অন সিভিল রাইটস এন্ড ইলেকশন" নামের গোত্রহীন এক সংগঠনের ব্যানারে। আমেরিকার মুসলিম সংগঠন ইসনা, কেয়ার, উম্মাহ যারা ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থে কাজ করে বলে দাবী করে তারা এবার সফলভাবে যুদ্ধাপরাধী জামাতীদের পকেটস্থ হলো। মুসলিম উম্মাহ ইমিগ্রান্ট জামাতীদের আমেরিকান সংগঠন বলেই খ্যাত যেখান থেকে জামাতী নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয় ও সাংগঠনিকভাবে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয় বলেও বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। নয়ন চৌধুরী () নামে এই পেইড ভলিন্টিয়ার অবশ্য প্রেস রিলিজ বিতরণ করেছে। প্রেস রিলিজে যা লেখা ছিল তা হচ্ছে:


The American Muslim Taskforce on Civil Rights and Elections (AMT), a coalition of major national Islamic organizations, hold a news conference today at the National Press Club in Washington, D.C., to call for an end to human rights violations in Bangladesh.

At the news conference, American Muslim leaders called for "among other things" an end to extra-judicial arrests and killings, ensuring multiparty democracy, stopping abuse of the police, judiciary and administration to subdue the opposition, restoration of the rule of law, and immediate release of all those who have been unlawfully detained.

AMT is an umbrella organization that includes American Muslim Alliance (AMA), American Muslims for Palestine (AMP), Council on American-Islamic Relations (CAIR), Islamic Circle of North America (ICNA), Muslim Alliance in North America (MANA), MAS-Freedom, Muslim Student Association-National (MSA-N), Muslim Ummah of North America (MUNA), and United Muslims of America (UMA). Its observer organizations include American Muslims for Civic Engagement (AMCE), Islamic Educational Council of Orange County (IECOC), the Islamic Society of North America (ISNA), and Muslim Public Affairs Council (MPAC).

Nihad Awad of CAIR , Imam Mahdy Bray of MAS-FF, Dr. Sulayman Nyang of MACC-PAC, Selim Akhtar of AMT, Dr. Abul Kashem of BAIS discussed wide spread human right violations, suppressing opposition and wrongful accusation and persecution of Islamic leaders in the name of so-called "war crime issues"“ was addressed. Deputy Ambassodor of BD in Washington DC was in the audiance, along with some local Awami League leaders.

প্রেস রিলিজের শেষ দু'লাইন পড়ে আমার আক্কেল গুড়ুম। মাথামোটা আওয়ামী কর্মী আর বাংলাদেশ দূতাবাসের উপপ্রধানও না-কি সেখানে হাজির ছিল। এরাই বুদ্ধির ঢেঁকি!!! আমি প্রেস রিলিজটা পড়ে বন্ধু আসিফকে ফোন করি: আচ্ছা বাংলাদেশ মিশন বা অন্য কেউ এই অপপ্রচারের প্রতিবাদ করে কি পাল্টা কোন প্রেস রিলিজ দিয়েছে? ফোনের অন্য পাশ থেকে আসিফের খিকখিক হাসিতে আমার মেজাজ বিগড়ে যায়। জামাতীরা মার্কিন মুল্লুকে "সেইভবিডিডট কম" বলে ওয়েবসাইট দিয়ে শুরু করেছে অপপ্রচার। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোট সরকারের অনেক সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কি কোন প্রশ্ন থাকবে? যুদ্ধাপরাধী রাজাকার জামাতীদের রক্ষায় কড়ি আর বড়ি নিয়ে নেমেছে তখন সেখানকার মিশনের সরকারী কর্তাব্যক্তিরা আর মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিরা বসে বসে আঙ্গুল চুষছে। অনেক সময় মনে হয়, হয়তো সর্ষের ভেতরই ভূত থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘন্টি যতো বাজবে, দেশে বিদেশে জামাতী বান্দরদের আস্ফালন ও নর্তন-কুন্দনও ততো বাড়বে। গোলাম আজম, নিজামী, সাঈদী সহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের অপকর্মের ডোশিয়ার হিলারী ক্লিনটন আর আমেরিকান মিডিয়ার কাছে কারা পাঠাবেন? যেসব ইসলামী সংগঠনের ব্যানারে এই সংবাদ সম্মেলন হলো তাদের কাছে কেউ কি লিখবেন? সম্ভবত: কেউ না। এভাবেই যুদ্ধাপরাধী জামাতীরা শেষ পর্যন্ত আশ্রয় প্রশ্রয় পাবে। ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরুবে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির সবচেয়ে বড়ো দূর্বলতা হচ্ছে তাদের দূর্বল নেটওয়ার্ক। না হলে এতোক্ষণে আসিফ আবার ফোন করে বলতো: " আগামীকাল সকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে ওয়াশিংটন ডিসি'র প্রেসক্লাবে এক পাল্টা সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের ইসলাম মুখোশধারী যুদ্ধাপরাধীদের অপকর্মের সচিত্র প্রতিবেদন দিয়ে হিলারী ক্লিনটনের কাছে পাল্টা প্রতিবেদন পাঠানো হবে। এছাড়া, ইসলামী বেনারের আড়ালে আমেরিকায় ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির উত্থানে উৎকন্ঠা প্রকাশ করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত দাবী করা হয়েছে"।....


আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো ধোয়া তুলসীপাতা এটা আমি বিশ্বাস করি না। ইদানিং দেশের আনাচেকানাচে তাদের নিয়ে প্রকাশিত খবরাখবর অসত্য, এ দাবিও আমি করবো না। কিন্তু সেসব প্রকাশে জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের পেইড ব্লগাররা যেরকম তৎপর, তাতে সন্দেহ হতেই পারে ডালমে কুচ কালা হ্যায়। আর সেটা যে কি তাই জানা গেলো আড্ডাবাজের মাধ্যমে। তাই বন্ধুরা আর দেরী নয়, সময় হয়েছে এবার সরকারকে চাপে ফেলার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে হবে দ্রুত, এটাই হতে হবে এখন একমাত্র প্রায়োরিটি। এটা শেষ করে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে ভাবেন গিয়া, আগে ইতিহাসের আবর্জনা পরিষ্কার করাটা জরুরী।

শুয়োরের বাচ্চাদের প্রেস রিলিজ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29121945 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29121945 2010-03-23 17:13:06
খোকার গল্প (আমরা যাকে শেখ মুজিব নামে চিনি) : তার বাবা-মায়ের মুখে
ইদানিং বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে অনেকের উইকি ঘেটে পাল্টা পোস্ট দেওয়া বাতিক দেখে ভাবলাম আগে দেখি উইকি কি বলছে : শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার (যিনি আদালতের হিসাব সংরক্ষণ করেন) ছিলেন এবং মা'র নাম সায়েরা খাতুন। চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। তার বড় বোন ফাতেমা বেগম, মেজ বোন আছিয়া বেগম, সেজ বোন হেলেন ও ছোট বোন লাইলী; তার ছোট ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের।

গুরুত্বপূর্ণ যেটা, বঙ্গবন্ধু মোটেও শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের প্রথম সন্তান নন। তার আগে আরো দুজন জন্ম নিয়েছেন। তার একজন ভাইও আছেন শেখ আবু নাসের নামে। যিনি তার সঙ্গেই মারা গেছেন। আর ১৫ আগস্টের ঘটনাবলী সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল তারাও এটা জানেন যে ভুলে নাসেরের লাশকেই বঙ্গবন্ধুর লাশ বলে কফিন মুড়িয়ে দাফন দিতে যাচ্ছিলো খুনীর দল। কারণ দুজনের চেহারার অবিশ্বাস্য মিল। তো সব মিলিয়ে সাদা পালে একটা কালো ভেড়ার গল্প পাত পায় না।

যাক সেসব কথা। শোনা যাক বঙ্গবন্ধুর বাবা-মায়ের মুখেই কেমন ছিলেন তাদের খোকা (আমরা যাকে মুজিব নামে চিনি), কবে কোথায় জন্ম তার, কি ছিলো তার স্বভাব :

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29121627 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29121627 2010-03-23 01:01:32
ছোট্ট আয়েশার চিঠি : লন্ডনে মুজিব ও ভুট্টো


১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। লন্ডনে এটি ছিলো বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রেস কনফারেন্স। মুক্তি পাওয়ার পর প্রথম। একটি স্বাধীন দেশের কর্ণধার হিসেবে প্রথম। সেই প্রেস কনফারেন্সেই সেই ভরা মজলিশে বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশদের কাছে দাবি জানালেন, আমাদের এতগুলো বছর শোষণ করেছো, অনেক নিয়েছো, এবার তার থেকে কিছু ফেরত দাও আমাদের। আমার দূখী দেশটায় এখন কিছু নেই, আছে শুধু লাশ আর ভুখা মানুষের দল...



ঠিক সপ্তাহ দুয়েক আগে (১৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১) পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে একটি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাতকারে বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকারই করেননি। বাংলাদেশকে কেউ স্বীকৃতি দিলে সেটা হোস্টাইল অ্যাক্ট বলে গন্য করবে পাকিস্তান- সোজাসাপ্টা কথা তার। পাকিস্তান ভাঙ্গেনি, পাকিস্তান ভাঙবে না- এই জাতীয় প্রলাপ বকে গেছেন। দুটো ফুটেজই তুলে দিলাম। মার্চ আমাদের চেতনার মাস। ভুট্টোর চেলাদের থেকে দূরে থাকার, তাদের অপপ্রচারে কান না দেওয়ার মাস। তাদের মুখে ঝামা ঘষে দেওয়ার মাস। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29121544 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29121544 2010-03-22 21:21:33
দ্বিতীয় বিপ্লব বা বাকশাল : শুনুন বঙ্গবন্ধূর মুখেই কয়দিন আগে একটি পোস্ট এলো গরম কফির। সেখানেও একই জিজ্ঞাসা। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম এ নিয়ে লেখার। তাগিদটা অবশ্য আগে থেকেই ছিলো, বাকশাল কি এবং এ সম্পর্কে জানার। স্বাধীনতাবিরোধী জামাত শিবির ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা বরাবরই বঙ্গবন্ধুকে তাচ্ছিল্য করতে বাকশাল শব্দটা ব্যবহার করে। নিশ্চিত জানি তারা অনেক কিছুর মতোই শুধু শব্দটাই জানে, এর সম্পর্কে তারা কিচ্ছু জানে না। শুধু মুখস্ত বুলি আউরে যায়। দুঃখজনকভাবে এই জানার ঘাটতিটা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির মাঝেও প্রবল। এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের অনেকেই দেখেছি এই বিষয়ে নূন্যতম জ্ঞান রাখেন না বলে বাকশালকে আওয়ামী লীগের বিষফোড়া এবং শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ঐতিহাসিক ভূল বলে মানেন। সত্যিই কি তাই?

গরম কফির পোস্টেই বলেছিলাম যে আমি সে সময়ের (স্বাধীনতার পরপর) বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ধারাটা বোঝার চেষ্টা করেছি, জানার চেষ্টা করেছি। শেখ মুজিব ঠিক কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন সেটা অনুধাবনের চেষ্টা করেছি। শেষ মেষ যা দাঁড়ালো তাতে বাকশালের ওপর আলাদা একটা বইই লিখে ফেলার মতো উপকরণ আমার হাতে। পক্ষে বিপক্ষে, প্রচার-অপপ্রচার, দোষত্রুটি, মূল্যায়ন সব মিলিয়ে। তারপর মনে হলো এত কষ্ট করবো! ঘুরেফিরে এটা তো আওয়ামী ধ্বজাধারী মার্কা পোস্ট বলেই রায় দেবে ছাগুর দল। ধুসর গোধুলী চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়ে একবার বলেছিলো যে কাফেররা নবীজীর সব কথা শুনতো আর শেষমেষ বলতো মোজেজা দেখাতে। আর তারপর তাদের আগের সিদ্ধান্তই বহাল- মোহাম্মদ তুমি দেখি মস্ত জাদুকর!

কিন্তু আমি তো ছাগুদের জন্য পোস্ট লিখি না। লিখি তাদের শিং ভাংতে, তাদের অপপ্রচারে, ম্যাতকারে যেন বিভ্রান্ত না হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম। এ লেখাটা সে কাতারেরই। দুটো দুর্লভ উপাত্ত এই পোস্টে আমি ব্যবহার করেছি। বাকশাল সম্পর্কে আমি বা আপনি বলার চেয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নিঃসন্দেহে খোদ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য। আবীর আহাদ নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক বাকশাল কর্মসূচী ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যে একটি সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর। এখানে সেই সাক্ষাতকারটির নির্বাচিত অংশবিশেষ তুলে দিলাম। পাশাপাশি রয়েছে একটি ভিডিও ফুটেজ। এটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে দেওয়া বক্তৃতাটি জনসম্মুখে বঙ্গবন্ধুর শেষ বক্তৃতা। আর এখানেই তিনি বিশ্লেষণ করেছিলেন তার দ্বিতীয় বিপ্লবের পরিকল্পনার। নেট স্পিডের কারণে অনেকেই হয়তো টানা দেখতে পারবেন না, সেক্ষেত্রে অডিও টেপটি শোনার অনুরোধ রইলো। বক্তৃতাটির পুরো টেক্সটির পিডিএফ ভার্সানও আপলোড করেছি। সঙ্গে বাকশালের কমিটি গঠনের পর এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতাটিও। এই জিনিসগুলো মনযোগ দিয়ে পড়লে, বাকশাল কি ভয়ানক জুজু ছিলো সেই ভ্রান্তিটা অন্তত কাটবে পাঠকের। গালি দিবেন ভালো কথা, কাকে কেনো দিচ্ছেন, সেটা জানা থাকবে না কেনো!

তারপরও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা না বললেই নয়। এতে বুঝতে সুবিধে হবে পাঠকের। মৃত্যুর আগপর্যন্ত এমনিতেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাই আলাদা করে তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার দরকার ছিলো না। যে গণতন্ত্র হত্যার কথা বলে কুমিরের কান্না কাঁদে কেউ কেউ, তার জবাবটাও মুজিব সাক্ষাতকারে দিয়েছেন। তবে তাকে সপরিবারে হত্যার পেছনে এটাকে যতই অজুহাত হিসেবে দেখানো হোক, আসলে কেনো হত্যা করা হয়েছে সেটা তো এখন পরিষ্কার (যদিও মুজিব তাকে হত্যার আশঙ্কা জানিয়ে গেছেন এই সাক্ষাতকারে)। দেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে, সেটা না পেরে ঢালাও ভাবে সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের গণ ফাঁসি আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিদের পুনর্বাসন। নৃশংস সেই হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতে কতই গল্পই না বানালো খুনী আর নেপথ্যের কুশীলবরা। বাকশাল তারই একটি, আর এটাই সময় এ নিয়ে মিথ ভাঙার। স্বাধীনতা যদি বিপ্লব হয়, সেই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় এসেছিল বাকশাল। হঠাৎ করে নয়। প্রথম বিপ্লব, স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মুক্তি। দ্বিতীয় বিপ্লব অর্থনৈতিক মুক্তি, সাধারণ মানুষের। চীন-রাশিয়া বাদ দিলাম, কিউবায় ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর ইমাম খোমেনীও বিপ্লবের রেশ বজায় রাখতেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থাই চালিয়ে গেছেন। এদের কাউকে নমস্য মানেন? তাহলে মুজিবের কি দোষ? শুরু থেকেই না করা? একটা ছোট্ট তথ্য দিয়ে মূল পোস্টে চলে যাচ্ছি। বাকশালে অবলুপ্ত দলগুলোর মধ্যে তালিকার প্রথম নামটি জানেন তো- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

বাকশাল প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাতকার

বঙ্গবন্ধু, আপনার রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূলনীতি বা লক্ষ্য কি?

আমার রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা ধ্যান ও ধারণার উৎস বা মূলনীতিমালা হলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার মূলনীতিমালার সমন্বিত কার্যপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি শোষণহীন সমাজ তথা আমার দেশের দীনদুখী শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবি মেহনতী মানবগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের সমষ্ঠিগত প্রকৃত ‘গণতান্ত্রিক একনায়কতান্ত্রিক’ শাসন প্রতিষ্ঠাকরণই আমার রাজনৈতিক চিন্তাধারার একমাত্র লক্ষ্য।

বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কি একযোগে বা পাশাপাশি চলতে পারে?

যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে তাকে সংখ্যালঘু ধনিক শোষকদের গণতন্ত্র বলাই শ্রেয়। এর সাথে সমাজতন্ত্রের বিরোধ দেখা দেয় বৈকি। তবে গণতন্ত্র চিনতে ও বুঝতে আমরা ভুল করি। কারণও অবশ্য আছে। আর তা হলো শোষক সমাজ গণতন্ত্র পূর্ণভাবে বিকাশলাভ করুক তা চায় না। এবং গণতন্ত্রকে কিভাবে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ারে পরিণত করা যায়- এখানে চলে তারই উদ্যোগ আয়োজন। এভাবেই প্রকৃত গণতন্ত্রকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। সাধারণ অজ্ঞ জনগণই শুধু নয়- তথাকথিত শিক্ষিত সচেতন মানুষও প্রচলিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে সঠিকভাবে বুঝতে অক্ষম। এরা ভাবে যে ভোটাভুটিই হলো গণতন্ত্র। একটু তলিয়ে দেখে না প্রাপ্তবয়স্ক মোট জনসংখ্যার কত পার্সেন্ট ভোট দিলো, কোন শ্রেনীর লোকেরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলো, কারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলো, ক্ষমতাসীনরা কোন পদ্ধতিতে তাদের শাসন করছে, সাধারণ জনগণ কতোটুকু কি পাচ্ছে। সুতরাং আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি- প্রচলিত গণতন্ত্রের বদৌলতে সমাজের মাত্র ৫% লোকের বা প্রভাবশালী ধনিকশ্রেনীর স্বৈরাচারী শাসন ও বল্গাহীন শোষণকার্য পরিচালনার পথই প্রশস্ত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রচলিত গণতন্ত্রের মারপ্যাচে সমাজের নিম্নতম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শাসন ও প্রভাব প্রতিপত্তি, সর্বপ্রকার দূর্নীতি শোষন অবিচার অত্যাচার ও প্রতারণায় সমাজের সর্ববৃহত্তম অজ্ঞ দুর্বল মেহনতী কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানব গোষ্ঠীর (শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ) মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রকৃত গণতন্ত্র বলতে আমি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বুঝি, যে ব্যবস্থায় জনগনের বৃহ্ত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের বৃহত্তর কল্যাণের নিমিত্তে তাদের জন্য, তাদের দ্বারা এবং তাদের স্বশ্রেণীভুক্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সরকার প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে তাদেরই প্রকৃত শাসন ও আর্থসামাজিক মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা প্রচলিত গণতান্ত্রিক উপায়ে অর্জিত হতে পারে না। কারণ প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে চলে অর্থ সম্পদের অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতা। এক্ষেত্রে দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে এ জাতীয় আর্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া কোনো প্রকারেই সম্ভব না। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিই এদেরকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের কার্যকরী নিশ্চয়তা দিতে পারে-তাদের আর্থ সামাজিক মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এজন্য আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্রের আরেক নাম সমাজতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যেই প্রকৃত গণতন্ত্র নিহিত। এজন্যেই আমি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের ভেতর কোনো বিরোধ নেই।

অনেকে বলেন ‘বাকশাল’ হলো একদলীয় বা আপনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার একটি অপকৌশল- এ সম্পর্কে আপনি পরিষ্কার মতামত দিন।

সাম্রাজ্যবাদের অবশেষ পুঁজিবাদী সমাজসভ্যতা ও শোষক পরজীবিদের দৃষ্টিতে ‘বাকশাল’ তো একদলীয় শাসনব্যবস্থা হবেই। কারণ বাকশাল কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে আমি সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি বহুজাতিক পুঁজিবাদী শোষক, তাদের সংস্থা সমূহের লগ্নিকারবার এবং তাদের এদেশীয় সেবাদাস, এজেন্ট, উঠতি ধনিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া শোষণ ও অবৈধ প্রভাবপ্রতিপত্তি-দুর্নীতি-প্রতারণার সকল বিষদাঁত ভেঙ্গে দেবার ব্যবস্থা করেছি। এজন্য তাদের আঁতে ঘাঁ লেগেছে, বাকশাল ও আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীশক্তি শাসকরা এদেশে গোপনে অর্থ যোগান দিয়ে তাদের সেবাদাস ও এজেন্টদের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক কার্যক্রমকে বানচাল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সভাসমিতি এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আমার সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন থানায় তাদের ভাড়াটে চরদের দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, গণহত্যা, অসামাজিক কার্যকলাপ ও সাম্প্রদায়িক তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের ষড়যন্ত্রের খবরা-খবর আমার কানে আসছে।

প্রচলিত গনতান্ত্রিক বৈষম্য, শোষণ-দূর্নীতিভিত্তিক সমাজকে, দেউলিয়া আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, জরাজীর্ণ প্রশাসন ও অবিচারমূলক বিচার ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করে একটি শোষণহীন, দূর্নীতিহীন, বৈষম্যহীন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক সাম্যবাদী সমাজ বিপ্লবের পথ রচনা করেছি। এই সমাজ বিপ্লবে যারা বিশ্বাসী নন, তারাই বাকশাল ব্যবস্থাকে একদলীয় স্বৈরশাসন ব্যবস্থা বলে অপপ্রচার করছেন। কিন্তু আমি এ সকল বিরুদ্ধবাদীদের বলি, এতোকাল তোমরা মুষ্ঠিমেয় লোক, আমার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ দুখী মেহনতী মানুষকে শাসন ও শোষণ করে আসছো। তোমাদের বল্গাহীন স্বাধীনতা ও সীমাহীন দূর্নীতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিসম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতার হোলিখেলায় আমার দুখীমানুষের সব আশা-আকাংখা-স্বপ্ন-সাধ ধুলায় মিশে গেছে। দুখী মানুষের ক্ষুধার জ্বালা ব্যথা বেদনা, হতাশা-ক্রন্দন তোমাদের পাষাণ হৃদয়কে একটুও গলাতে পারেনি। বাংলার যে স্বাধীনতা তোমরা ভোগ করছো, এই স্বাধীনতা, এই দেশ, এই মাটি ঐ আমার দুখী মেহনতী মানুষের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন সংগ্রাম এবং জীবন মৃত্যুর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে তোমাদের অবদান কতটুকু আছে, নিজেদের বুকে একবার হাত দিয়ে চিন্তা করে দেখো। বরং অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছো। বিদেশী শাসক-শোষকদের সহায়তা করেছো। নিজের ঘরে থেকে ভাইয়ের ঘর পুড়িয়েছো, মানুষকে হত্যা করেছো। মা-বোনদের লাঞ্ছিত করেছো, আরো কি না করেছো! এসবই করেছো ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের ঘৃন্য লক্ষ্যে।

আমার দেশের মাত্র ৫ পার্সেন্ট লোক ৯৫ পার্সেন্ট লোককে দাবিয়ে রাখছে, শাসন-শোষণ করছে। বাকশাল করে আমি ওই ৯৫ ভাগ মানুষের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যবস্থা করেছি। এতকাল মাত্র ৫ ভাগ শাসন করেছে, এখন থেকে করবে ৯৫ ভাগ। ৯৫ ভাগ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে ৫ ভাগকে মিশতে হবে। আমি মেশাবোই। এজন্য বাকশাল করেছি। এই ৯৫ ভাগ মানুষকে সংঘবদ্ধ করেছি তাদের পেশার নামে, তাদের বৃহত্তর কল্যাণে, তাদের একক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশালে। মূলত বাকশাল হচ্ছে বাঙালীর সর্বশ্রেণী সর্বস্তরের গণমানুষের একক জাতীয় প্লাটফর্ম, রাজনৈতিক সংস্থা, একদল নয়। এখানে স্বৈরশাসনেরও কোনো সুযোগ নেই। কারণ বাঙালী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বা সমষ্ঠিগত শাসন ব্যবস্থায় কে কার উপর স্বৈরশাসন চালাবে? প্রত্যেক পেশার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে শাসন পরিষদ গঠন করা হবে। কোনো পেশা বা শ্রেণী অন্য পেশার লোকদের ওপর খবরদারী করতে পারবে না। যে কেউ যিনি জনগনের সার্বিক কল্যাণের রাজনীতিতে তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তিনি এই জাতীয় দলে ভিড়তে পারবেন।

যারা বাকশালকে একদলীয় ব্যবস্থা বলেন, তাদের স্মরণ করতে বলি, ইসলামে ক’টি দল ছিলো? ইসলামী ব্যবস্থায় একটি মাত্র দলের অস্তিত্ব ছিলো, আর তা হলো খেলাফত তথা খেলাফতে রাশেদীন। মার্কসবাদও একটি মাত্র দলের অনুমোদন দিয়েছে। চীন, রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রে কতটি করে দল আছে? এইসব ইসলামী রাষ্ট্রসমূহকে বাদ দাও, ওখানে মহানবীর ইসলাম নেই। বস্তুত প্রকৃত গণতন্ত্র বা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই একটি একক জাতীয় রাজনৈতিক সংস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। একটি জাতীয় কল্যাণের অভিন্ন আদর্শে, ব্যাপক মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে একটি মাত্র রাজনৈতিক সংস্থার পতাকাতলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু বহুদলীয় তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় কোনোভাবেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সেখানে বহুদলে জনগণ বহুধা বিভক্ত হতে বাধ্য। আর বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত, পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বসংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানির রাজনীতি দিয়ে জাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কোনোভাবেই অর্জিত হতে পারে না। ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয় না। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও তাই বলে।

বঙ্গবন্ধূ, বাকশালের মূল লক্ষ্য বা এর কর্মসূচী সম্পর্কে কিছু বলুন

বাকশালের মূল লক্ষ্য তো আগেই বিশ্লেষণ করেছি। তবে এক কথায় আমি যা বুঝি তা হলো একটি শোষণহীন, দূর্নীতিমুক্ত সমাজ ও শোষিতের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠাকরণ। বাকশাল কর্মসূচীকে আমি প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছি। এক. রাজনৈতিক, দুই. আর্থসামাজিক, তিন. প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা

এক. রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক পেশাভিত্তিক লোকদের জাতীয় দল বাকশালে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা রেখেছি। এবং পর্যায়ক্রমে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় দলের একাধিক প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। জনগণ তাদের মধ্যে থেকে একজনকে নির্বাচিত করবেন। প্রেসিডেন্ট জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। জাতীয় দলের সদস্য যে কেউ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। প্রেসিডেন্ট পদাধিকার বলে জাতীয় দলের চেয়ারম্যান হবেন। প্রেসিডেন্ট জাতীয় সংসদের আস্থাভাজন একজনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে মন্ত্রীদের নিয়োগ করবেন। সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের অনাস্থায় প্রেসিডেন্টকে অপসারিত করতে পারবেন। মন্ত্রীসভা প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় সংসদের কাছে দায়ী থাকবেন। স্থানীয় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সর্বস্তরের জনগণের প্রতিনিধিত্ব প্রত্যক্ষভাবে বজায় থাকবে।

দুই. আর্থসামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক বহুমূখী গ্রাম-সমবায় প্রকল্প। এর মাধ্যমে গ্রামীন আর্থব্যবস্থায় উন্নয়ন বা স্বনির্ভর-স্বাধীন গ্রামীন ব্যবস্থা, বিশেষ করে ভূমিসংস্কারের প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসন তথা কৃষকদের হাতে জমি হস্তান্তর, উৎপাদন বৃদ্ধি ও সাম্যভিত্তিক বন্টন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। ভারী শিল্পকারখানা, পরিত্যক্ত সম্পত্তি, বৈদেশিক বানিজ্য, ব্যাংক, বীমা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি জাতীয়করণ করে জনগণের যৌথ শেয়ার মূলধনে নতুন নতুন কৃষিজাত শিল্প ও অন্যান্য শিল্প কলকারখানা ও সংস্থা প্রতিষ্ঠা। সীমিত ব্যক্তিমালিকানাকে উৎসাহদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থাসমূহ যাতে জনসাধারণ ও তাদের শ্রমিকদের শোষণ করতে না পারে তার ব্যবস্থা থাকবে।

তিন. প্রশাসনিক কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়, কর্পোরেশন ও বিভাগগুলোর পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠন তথা মাথাভারী প্রশাসনের উচ্ছেদ সাধন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জেলা গভর্নর ও থানা প্রশাসনিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ, মহকুমা ও বিভাগীয় প্রশাসনকে তুলে দেয়া হচ্ছে। জেলা ও থানাগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ সদস্যদের ভোটে থানা পরিষদ গঠিত হবে। তবে থানা পরিষদের প্রশাসক/চেয়ারম্যান ও জেলা গভর্ণর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। থানা প্রশাসক/চেয়ারম্যানরা ও জেলা গভর্ণররা জনগণ, স্ব স্ব পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের কাছে দায়ী থাকবেন। গ্রাম সমবায় পরিষদ থানা পরিষদের কাছে, থানা পরিষদ জেলা পরিষদের কাছে দায়ী থাকবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ, থানা পরিষদ, জেলা পরিষদ- এরপরই থাকবে জাতীয় সরকার। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে জাতীয় সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বিপুলভাবে বিকেন্দ্রিকরণ করে প্রশাসনকে জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র, স্টিলফ্রেম গতানুগতিক বা টাইপড চরিত্রকে ভেঙ্গে গুড়ো করে দেবার ব্যবস্থা নিয়েছি। সরকারী কর্মচারীরা এখন থেকে জনগণের সেবক।

বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টকে রাজধানীতে বহাল রেখে হাইকোর্ট বিভাগকে আটটি আঞ্চলিক বিভাগে বিকেন্দ্রিকরণের ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে সুপ্রিমকোর্টের অধিবেশন বছরে অন্তত একবার করে প্রতিটি আঞ্চলিক বিভাগে (হাইকোর্ট) বসবে। জেলা আদালতসমূহ বহাল থাকবে। প্রতিটি থানাতে থাকবে একাধিক বিশেষ ট্রাইবুনাল। প্রত্যেকটি আদালতে যে কোনো মামলা ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মিমাংসা করতে হবে। গ্রামে থাকবে একাধিক শালিস বোর্ড। শালিস বোর্ড গঠিত হবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে। শালিস বোর্ড চেয়ারম্যান থাকবেন সরকার নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটরা। এভাবে সুষ্ঠু, ন্যায় ও দ্রুততর গণমুখী বিচারকার্য সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রিকরণ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু, অনেকে বলেন, আপনি নাকি কোনো একটি পরাশক্তির চাপের মুখে বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাকশাল কর্মসূচী দিয়েছেন এবং এ ব্যবস্থা নাকি সাময়িক কালের জন্য করেছেন- এ বিষয়ে আপনি অনুগ্রহ করে কিছু বলবেন কি?

কারো প্রেশার বা প্রভাবের নিকট আত্মসমর্পন বা মাথা নত করার অভ্যাস বা মানসিকতা আমার নেই। এ কথা যারা বলেন, তারাও তা ভালো করেই জানেন। তবে অপপ্রচার করে বেড়াবার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই, তাই উনারা এ কাজে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। করুন অপপ্রচার। আমি স্বজ্ঞানে বিচার বিশ্লেষণ করে, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, আমার দীনদুখী মেহনতী মানুষের আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে আমি বাকশাল কর্মসূচী দিয়েছি। আমি যা বলি, তাই করে ছাড়ি। যেখানে একবার হাত দেই সেখান থেকে হাত উঠাই না। বলেছিলাম এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো, মুক্ত করেছি। বলেছি শোষণহীন দুর্নীতিমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলা গড়বো, তাই করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। কোনো কিন্তুটিন্তু নাই, কোনো আপোষ নাই।
বঙ্গবন্ধু, বাকশাল বিরোধীমহল অর্থাৎ ঐ ৫% সংখ্যায় অতি নগণ্য হলেও তাদের হাতেই রয়েছে বিপুল সম্পদ। তাদের সাথে রয়েছে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী শক্তির যোগসাজশ। তাদের পেইড এজেন্টরাই রয়েছে প্রশাসনিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার কেন্দ্রে। তাদের কায়েমী স্বার্থের উপর আপনি আঘাত হানতে যাচ্ছেন, এই অবস্থায় তারা চোখ মেলে, মুখ গুজে বসে থাকবে বলে আপনি মনে করেন? তারা তাদের অবস্থান নিরাপদ ও সংহত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে না?

আমি জানি তারা বসে নাই। ষড়যন্ত্র চলছে। প্রতিদিনই ষড়যন্ত্রের উড়ো খবর আমার কাছে আসে। সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহীরা এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। গোপন পথে অঢেল অর্থ এ কাজে লাগাবার জন্য বাংলাদেশে আসছে। সুকৌশলে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ চলছে। অপপ্রচার চলছে। আমি জাতির বৃহত্তর কল্যাণে এ পথে নেমেছি। জনগণ সমর্থন দিচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্র করে, বাধার সৃষ্টি করে, হুমকি দিয়ে আমাকে নিবৃত্ত করা যাবে না। আমার কাজ আমি করে যাবোই।

হয়তো শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। পরোয়া করি না। ও মৃত্যু আমার জীবনে অনেকবার এসেছে। একসিডেন্টলি আজো আমি বেঁচে আছি। অবশ্যই আমাকে মরতে হবে। তাই মৃত্যু ভয় আমার নেই। জনগন যদি বোঝে আমার আইডিয়া ভালো, তাহলে তারা তা গ্রহণ করবে। আমার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে। আমার একটা বড় স্বান্তনা আছে, যুদ্ধের সময় আমি জনগনের সাথে থাকতে পারিনি। জনগণ আমারই আদেশ ও নির্দেশে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজকের এই শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্র বা অর্থনৈতিক মুক্তির বিপ্লবে আমি যদি নাও থাকি, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার বাঙালীরা যে কোনো মূল্যে আমার রেখে যাওয়া আদর্শ ও লক্ষ্য একদিন বাংলার বুকে বাস্তবায়িত করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ।

শেষ কথা : বঙ্গবন্ধুর এই আশা পূরণ হওয়ার নয়। সমাজতন্ত্র এখন ইতিহাসের পাঠ্যক্রমে চলে গেছে, আর বাঙালী এই তন্ত্রের উপযুক্তও নয়। আমি গরীব পছন্দ করি, কারণ গরীব থাকলে আমার নিজেকে ধনী মনে হয়। দয়াভিক্ষা করতে পারি। আমি ৫ ভাগ সুবিধাবাদীর দলে থাকতে চাই। বাকশাল স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে অনিবার্য ছিলো, আমার কাছে মনে হয়েছে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। না হলে, বঙ্গবন্ধুকে মরতে হতো না।

সম্পূরক :
২৬ মার্চ, ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, এই বক্তৃতাতেই বাকশালের রূপরেখা জানিয়েছিলেন তিনি

বক্তৃতার বিস্তারিত : মোবাইলে তুলে পিডিএফ বানিয়েছি, তবুও পড়তে সমস্যা হবে না

বাকশাল কমিটিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29119969 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29119969 2010-03-20 03:18:10
শেখ মুজিবের নির্বাচিত বক্তৃতা ও ধর্ম নিরপেক্ষতা

(আমরা আজ প্রয়োজন হইলে জীবন বিসর্জন দিব-যাহাতে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের একটি কলোনিতে বাস করিতে না হয়। যাহাতে তাহারা একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে সম্মানের সহিত মুক্ত জীবন যাপন করিতে পারে, সেই প্রচেষ্টা আমরা চালাইব-
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)



আজ ৭ মার্চ। এদিন মুক্তিকামী জনতার মহাসাগরকে সামনে রেখে মহাকাব্যিক এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই বক্তৃতা নিয়ে অনেক কাটাছেড়া হয়েছে। কেউ এর শেষে কাল্পনিক পাকিস্তান জিন্দাবাদ যোগ করেও প্রমাণ করতে পারেননি। জ্বলজ্যন্ত টেপ যেখানে বর্তমান, তারপরও তারা অন্য লোকের শ্রুতিকথার ওপর নির্ভর করে। শামসুর রাহমান, হাবিবুর রহমান, হুমায়ুন আহমদকে টানে। সর্বশেষ যা দেখলাম একজন এতে ধর্মনিরপেক্ষতার আদলে ধর্মহীনতার সংগ্রাম খুজে বেরানোর চেষ্টা করেছেন এবং না পেয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে ৭ মার্চের ভাষণ মোটেই ধর্মহীনতার সংগ্রাম নয়। মানে উনি একটি পুকুর পারে গিয়ে ঠিক করেছেন এখানে উনি তিমি মাছ খুজবেন, এবং খুজে দেখলেন ওখানে তিমি মাছ নেই। তারপর লিখলেন যে পুকুরে তিমি মাছ থাকে না, যারা বলে তিমি মাছ থাকে তারা ঠিক বলে না। উজবুক বুদ্ধিবৃত্তিতা আর কি‍! তবে অভিসন্ধিটা কিন্তু পরিষ্কার। মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতার অন্যতম স্তম্ভ ধর্ম নিরপেক্ষতাকে আক্রমণ। পজেটিভ, নিউট্রাল ও নেগেটিভ নামে তিনটে সুইচ। নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ মানে যখন পজিটিভ নেগেটিভ কোনোটাই না, তখন যারা এর মাঝে নেগেটিভ আবিষ্কার করেন তারা গোটা ব্যাপারটাই অস্বীকার করেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির শুরু থেকেই মুজিবকে ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে পাকিস্তানীরা। তা ধরে রেখেছে তাদের উত্তরসূরী জারজরাও। এবার আসি ধর্মের রাজনীতি ও ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতামালায় কবে কি বলেছেন। এটি সেই অর্থে তার বক্তৃতার নির্বাচিত সংকলন :

১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ ৬-দফা প্রসঙ্গে তার ভাষণ :

আমার প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা,
আমি পূর্ব পাকিস্তানবাসীর বাঁচার দাবীরূপে ৬-দফা কর্মসূচী দেশব্যাপী ও ক্ষমতাসীন দলের বিবেচনার জন্য পেশ করিয়াছি। শান্তভাবে উহার সমালোচনা করিবার পরিবর্তে কায়েমি স্বার্থবাদীদের দালালেরা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করিয়াছে। অতীতে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর নিতান্ত সহজ ও নায্য দাবী যখনই উঠিয়াছে, তখনই এই দালালরা এমনিভাবে হৈচৈ করিয়া উঠিয়াছেন। আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী, পূর্ব পাক জনগণের মুক্তি-সনদ একুশদফা দাবিযুক্ত নির্বাচন প্রথার দাবী, ছাত্র-তরুণদের সহজ ও স্বল্পব্যয়ে শিক্ষা লাভের দাবী, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার দাবী ইত্যাদি সকল প্রকার দাবীর মধ্যেই এই শোষকের দল ও তাহাদের দালালেরা ইসলাম ও পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করিয়াছেন। ...
১৯৭০ সালের নভেম্বরে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ :

...আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য লেবেল সর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রাসুলে করিম (স.) এর ইসলাম। যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চণার পৃষ্টপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদেরই বিরুদ্ধে। যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সে দেশে ইসলাম বিরোধী আইন পাশের সম্ভাবনার কথা ভাবতে পারেন কেবল তারাই ইসলামকে যারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফায়স্তা করে তোলার কাজে। ...

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি, পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর রেসকোর্সে ভাষণ :

সকলে জেনে রাখুন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ। ইন্দোনেশিয়া প্রথম এবং ভারত তৃতীয়। বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি কোনো বিশেষ ধর্মীয় ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।

১৯৭২ সালের ৭ জুন, রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ :

বাংলাদেশ হবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্ম নিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। খ্রিস্টান তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্ম নিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আল বদর পয়দা করা বাংলার বুকে আর চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।
১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদে (জাতীয় সংসদে) ভাষণ :

আমাদের আদর্শ পরিষ্কার। এই পরিষ্কার আদর্শের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এই আদর্শের ভিত্তিতে এই দেশ চলছে। জাতীয়তাবাদ-বাঙালী জাতীয়তাবাদ, এই বাঙালী জাতীয়তাবাদ চলবে বাংলাদেশে। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার আকাশ-বাতাস, বাঙালীর রক্ত দিয়ে গড়া বাংলার জাতীয়তাবাদ। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনসাধারণের ভোটের অধিকারকে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে, যেখানে শোষনহীন সমাজ থাকবে। শোষক শ্রেণী আর কোনোদিন মানুষকে শোষণ করতে পারবে না। সমাজতন্ত্র না হলে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ ৫৪ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে বাঁচতে পারবে না। সেজন্যই অর্থনীতি হবে সমাজতান্ত্রিক, আর হবে ধর্ম নিরপেক্ষতা। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে না, বাংলার মানুষ এটা চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। যদি কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ তাকে প্রত্যাঘাত করবে। এ বিশ্বাস আমি করি।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে ভাষণ :

জনাব স্পিকার সাহেব, ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবও না। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের কারো নেই। হিন্দু তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাঁধা দেওয়া ক্ষমতা নেই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের কেউ বাঁধাদান করতে পারবে না। খ্রীস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাঁধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানি, ধর্মের নামে অত্যাচার, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যাভিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে।

ধর্ম অত্যন্ত পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলবো, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি, সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করছি। যদি কেউ বলে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নাই, আমি বলবো সাড়ে সাতকোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটি কয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তাহলে তা করতে হবে।

১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ভাষণ :

আর একটা জিনিস। রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে , যারা সাম্প্রদায়িক, তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে, সে কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আপনারা যারা এখানে মুসলমান আছেন তারা জানেন যে, খোদা যিনি আছেন, তিনি রাব্বুল আলামিন, রাব্বুল মুসলেমিন নন। হিন্দু হোক, খৃষ্টান হোক, মুসলমান হোক, বৌদ্ধ হোক, সমস্ত মানুষ তার কাছে সমান। সেজন্যই এক মুখে সোস্যালিজম ও প্রগতির কথা আরেকমুখে সাম্প্রদায়িকতা চলতে পারে না। সমাজতন্ত্র, প্রগতি আর সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলতে পারে না।


এরপরও যারা জল ঘোলা করতে চান, তাদের অভিসন্ধিতে খোদার লানৎ পড়ুক।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29111805 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29111805 2010-03-07 16:34:28
মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী : একটি সভ্য সংসদও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিলো
মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যক্তিপর্যায়ে এটা আপনাকে আমার তৃতীয় খোলা চিঠি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি এবং সারাদেশে ছাত্রলীগের নৈরাজ্যের সমালোচনার পর এবার নির্বাচিত সাংসদদের অসভ্যতার বিরুদ্ধে কিছু কথা বলতে চাই। কথাগুলো আমার নিজের নয়, কথাগুলো আপনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, যাকে জাতির পিতা মানি। ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল ওই সংসদভবনে, স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদের অধিবেশনে তার মুখ থেকে এসব কথা বের হয়েছিলো। জানি প্রটোকলের দেয়াল ভেঙ্গে এসব কথা আপনার কানে কখনোই পৌছাবে না, আপনার চোখে পড়বে না এই চিঠি। তারপরও নিজের বিবেককে স্বান্তনা দিতে লিখছি।

তার আগে ব্যক্তিগত কিছু কথা বলার সুযোগ ছাড়ছি না। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে নিজের ভোটটি নিজে দিতে পারার সেই সৌভাগ্যবানদের একজন আমি। চোখ বেধে মার্কার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত বলেই হয়তো কাকে নির্বাচিত করছি সে ব্যাপারে অন্ধ থাকি। এ আমার পাপ হয়তো। কারণ দীর্ঘদিন আগে সেই স্বৈরাচারের আমলে যখন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মাঠে ঘাটে কর্মীদের, দলের দুঃখে-দুর্দিনে পাশে থাকা নেতাদের এড়িয়ে ব্রিফকেস ভর্তি টাকার মালিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি জন্ম নিলো, সেদিন থেকেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সর্বনাশের সূচনা। কারণ তখন বিপন্ন নেতারাও বুঝে গেল যে কোনো মূল্যে টাকা কামাতে হবে। কোটি টাকা চাঁদা, কোটি টাকা নির্বাচনী ব্যয় উশুলের সেই সংস্কৃতিতে কিছু বর্বর, কিছু অশিক্ষিত আনকালচার্ড কুথও আমাদের সর্বোচ্চ আইন পরিষদের দায়িত্বে এলো। এরা ক্যাডার দিয়ে এমপি হোস্টেলের রুম দখল, ন্যাম ভবনের ফ্লাট, শুল্কমুক্ত গাড়ি আর নির্বাচনী এলাকায় ঠিকাদারীর কমিশন ছাড়া সাংসদদের কোনো অধিকার বোঝে না। এরা সংসদে বক্তৃতা বলতে বোঝে দলীয় নেতা কিংবা নেত্রীর তোষামুদি। একদিন সাধারণের কাতারে বসে টেলিভিশন দেখবেন, নিশ্চিত আপনি বিব্রত হবেন, আপনি লজ্জিত হবেন। এজন্য হবেন কারণ আপনাকে আমি পাশ থেকে প্রম্পট করার জন্য মোহাম্মদ নাসিমের মতো নেতাকে প্রকাশ্য জনসভায় বকা দিতে দেখেছি। সম্ভবত সিরাজগঞ্জে যমুনা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিলো সেটি। একজনকে বক্তৃতা পাশ থেকে কথা শিখিয়ে দেয়ার মতো অসভ্যতা যখন অপছন্দ করতে পারেন, এইসব তোষামুদিও আপনার অসহ্য লাগা উচিত। কারণ স্বাধীনতার প্রজন্ম হিসেবে এটাই দেখে এসেছি বঙ্গবন্ধুর ঘাতকই শুধু নয়, বঙ্গবন্ধুকে গালি দেনেওয়ালাদের চেয়ে তার ভাবমূর্তির বেশী সর্বনাশ করেছে এইসব তোষামোদের দল। এই তোষামুদির সংস্কৃতি প্রশ্রয় দেন বলেই, আজ আমাদের সংসদে গালি গালাজ আর ধর-শালাও শুনতে হয়। অথচ আপনি সেই পিতার কন্যা যিনি তার শাসনামলে স্রেফ দূর্নীতির অভিযোগে ৪৬ জন নির্বাচিত সাংসদকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। এইসব তোষামুদি বন্ধ করুন। সাংসদদের টু দ্য পয়েন্ট কথা বলার নির্দেশ দিন। দেশ, তার নির্বাচিত এলাকা, তার ভোটারদের সমস্যা দিয়ে কথা বলতে বলুন। আমরা বাঙালীরা অন্যের প্রশংসা সইতে পারি না। আমাদের গা জ্বলে। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর মতো আপনাকেও সাধারণ মানুষের শত্রু বানাচ্ছে তোষামোদকারীরা মাখনমাখানো কথা বলে। বিশ্বের কোনো সভ্য দেশে এসব হয় কিনা জানি না, এসব মানে এইসব তোষামুদি। সাংসদদের বাধ্যতামূলকভাবে এসব উন্নত দেশের অধিবেশনগুলোর কালচার শিখে আসা উচিত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবার যাই জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর সেই বক্তৃতায়, যা কার্যবিধিতে এখনও আছে কিনা আমার জানা নেই, তার নাম, স্মৃতি, কথা গুম করার সেই নীলনকশায় এখনও আছে কিনা তা। নীচের কথাগুলোই তার বক্তৃতায় বলেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী :

জনাব স্পিকার সাহেব, আপনার দৃষ্টি আকর্ষন করতে বাধ্য হচ্ছি। আমাদের ভুললে চলবে না এবং সদস্য ভাইদের আমি বলি যে, আমরা গণপরিষদের সদস্য। সদস্যদের একটা বিধি প্রণালী আছে, এর বাইরে প্রশ্ন করবার অধিকার নাই। এটা পার্লামেন্টারি কনভেনশন। আমি আপনার মাধ্যমে আমার সহকর্মীদের অনুরোধ করবো, দেখবেন, শেখবার চেষ্টা করবেন। আমরা বহুদিন পার্লামেন্টারি কাজ করতে পারিনি, আমাদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে।

১৯৫৮ সালের ‘মার্শাল ল’ জারির পরে পার্লামেন্ট হয়নি। সেজন্য আমরা সুযোগ পাইনি পার্লামেন্টারি রাজনীতি কাকে বলে এবং গণপরিষদ কাকে বলে তা শেখার। সেইজন্য আমাদের কিছু অসুবিধা হয়। তাই বহুদিন পর সদস্যরা এসে কথা বলতে চায়, যদিও সেটা অনেক সময় বিধি বা রুলসের বাইরে হয়। আমি আপনার মাধ্যমে অনুরোধ করব যখন একজন কথা বলেন, তখন অন্য কারো বাধা দেওয়া উচিত নয়, এরূপ নিয়ম নাই। আমি আপনার মাধ্যমে জানাতে চাই যে গণপরিষদ একটা সুপ্রীম বডি, আমাদের ব্যবহারে বাইরে এমন কিছু প্রকাশ হওয়া উচিত নয় যাতে জনসাধারণের কাছে আমাদের ইজ্জত নষ্ট হয়। আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই যে, যেসব রুলস রেগুলেশন এবং বিধি আছে, তা আপনি অনুসরণ করেন। আমি এই হাউজের পক্ষ থেকে কথা দিচ্ছি, আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করব।

মেম্বারদের আরেকটা বিষয়ে হুশিয়ার করতে চাই। স্পিকার যখন কথা বলেন, তখন আর কোনো মেম্বারের অধিকার নাই কথা বলার। বললে আপনি মেহেরবানি করে তাকে পরিষদ থেকে বের করে দিতে পারেন।

অধিবেশনের সমাপ্তি বক্তৃতা থেকে সংযুক্তি : জনাব স্পিকার সাহেব, আমি আপনার মাধ্যমে পরিষদ সদস্যদের আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি আশা করি আপনারা কিছু মনে করবেন না, অনেকদিন পর আমরা এখানে বসার সুযোগ পেয়েছি। তাই আমরা পরিষদ বিধি না মেনে অনেক কথা বলে ফেলেছি। কিছুদিন আপনাকে এটা সহ্য করতে হবে। কারণ সদস্যরা বহুদিন পর এখানে বসবার সুযোগ পেয়েছেন। সকলে এখন পর্যন্ত সব জিনিস দেখার সময় পান নাই- গণপরিষদ কার্যপ্রণালী বিধিতে কি আছে, তাও দেখবার সময় পান নাই। তাই মাঝে মাঝে দুয়েকটা কথা এদিক-ওদিক বলে ফেলেছেন।

আমি আপনার মাধ্যমে গণপরিষদ সদস্যদের বলতে চাই যে, আপনারা কটাক্ষ করে কাউকে কিছু বলবেন না। কারও প্রতি কটাক্ষ করে কথা বলা উচিত নয়। কোন সদস্য অন্য কোন সদস্যকে সম্বোধন করে কথা বলতে পারেন না। সকল মেম্বারকেই জনাব স্পিকারকে সম্বোধন করতে হবে- এটা সকল সদস্যের জানা দরকার।

আমি আবার সদস্যদের অনুরোধ করছি। আপনারা কারো প্রতি কটাক্ষ করে এই পরিষদে কোন কথা বলবেন না। আমার আর একটি আবেদন এই যে, আপনারা যে গণপরিষদের সদস্য একথা যেন ভুলে না যান। আমি আপনার মাধ্যমে সদস্যদের আরো বলতে চাই যে, পরিষদে একজন কথা বলতে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে আর পাঁচজন দাঁড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন না। এতে পরিষদের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে এবং এর দ্বারা প্রমাণিত হবে, আমরা পরিষদ সদস্য হবার যোগ্য নই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। চিঠির শেষে এটুকুই বলতে চাই বঙ্গবন্ধুর অনেক অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আপনার। কিন্তু উপরের বক্তৃতায় পরিষ্কার উনি একটি সভ্য সংসদে সভ্য সাংসদও দেখতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্নটা বাস্তবায়ন করা যায় না?
একজন লজ্জিত নাগরিক, একজন বিব্রত ভোটার
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29110553 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29110553 2010-03-05 16:01:11
একাত্তরের চিঠি : ইন্দিরা গান্ধীকে মওলানা ভাসানী (ভারতের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের কনফেডারেশন!)

প্রচলিত গুজব, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ভারতে বন্দী ছিলেন। গুজবটা যারই সৃষ্টি হোক, বা যারাই (পড়ুন স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি) এর ফায়দা লুটুক, খোদ ভাসানীও কখনই এই দাবী করেননি। বরং এই প্রসঙ্গে জাতিসংঘে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকা বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে লিখেছেন : আমার শেষ জীবনের শেষ কাজ স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠাকল্পে যতদূর পারি ক্ষুদ্রশক্তিতে কাজ করিতেছি। হিন্দুস্তান সরকার আমাকে কারাগারে বা অন্তরীণ রাখিয়াছে ইহা মোটেই সত্য নহে। আমি যখন যেখানে থাকি খুব গোপনে অবস্থান করি। প্রকাশ্য ঘোরাফেরা বা সাক্ষাত করা আমার পক্ষে এই অবস্থায় মোটেই সম্ভব নহে।

তবে এই পোস্টের আলোচ্য বিষয় ঠিক এই চিঠি নিয়ে নয়। আর সেই প্রসঙ্গে আসার আগে মুক্তিযুদ্ধকালে ভাসানীর অবস্থান নিয়ে কিছু তথ্য অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিটি দাবি এবং কর্মসূচীর প্রতি আকণ্ঠ সমর্থন জুগিয়ে গেছেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান যার আরেক নাম রেড মাওলানা (সমাজতান্ত্রিক অর্থে)। যুদ্ধের শুরুতে তিনি নিরাপদ থাকলেও এপ্রিলে বাধ্য হন শরণার্থী হতে। ৪ এপ্রিল ‘কাফের ভাসানী’র খোঁজে সন্তোষে হামলা চালায় পাক বাহিনী। ভাসানী পালান এবং নানা কৌশলে পাকিদের নজর এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত একটি কোষা নৌকায় করে ১০ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ পৌঁছান। ১৫ এপ্রিল সীমান্ত পাড়ি দেন তিনি এবং আসামের গোয়ালপাড়া জেলার শিশুমারীতে আশ্রয় নেন। আসামের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে তার আসার এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্য চান। ১৭ এপ্রিল একটি বিমানে করে ভাসানী কলকাতায় যান। শুরুতে পার্ক সার্কাসের পার্ক স্ট্রিটের কোহিনুর প্যালেসের পাঁচ তালায় ভাসানী ও তার সহকর্মীদের থাকতে দেওয়া হয়। একই ভবনে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের পরিবারও থাকতেন।



২১ এপ্রিল চীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুং, প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে ভাসানী চিঠি লেখেন। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত এসব চিঠিতে বাংলাদেশে ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি পাকিস্তানকে সব ধরণের সহায়তা থেকে বিরত থাকার আবেদন ছিল। ৯ সেপ্টেম্বর গঠিত মুজিব নগর সরকারের ৮ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি ছিলেন ভাসানী। কলকাতায় কিছুদিন থাকার পর তিনি আসামে যাওয়ার ইচ্ছে জানান। সেখানে চর ভাসানে তার অনেক মুরীদান। আসামে যাওয়ার আগে কুচবিহারের পুন্ডিবাড়ি এবং রাণীক্ষেতে কিছুদিন থাকেন। এরপর দেরাদুনে থাকতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখান থেকে তাকে দিল্লীর অল ইন্ডিয়া ইনস্টটিউট অব মেডিকেল হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেরে ওঠার পর যমুনা নদীর তীরে এক বাংলোয় বিশ্রামে থাকেন ভাসানী। ২২ জানুয়ারি দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত এখানেই ছিলেন।



এবার আসা যাক আলোচ্য চিঠিতে। চিঠি এখানে একটি নয় দুটি। একটি ভাসানীর নিজের হাতে লেখা, অন্যটি তার ডিকটেশনে লিখেছেন ব্যক্তিগত সচিব সাইফুল ইসলাম। প্রথমটি সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ এবং অন্যটি অক্টোবরের শুরুতে। দুটো চিঠিই পুরো পড়ার পর পাঠকের মনে নানা প্রশ্ন জাগতে বাধ্য। মওলানা আসামের মানুষ, তিনি ইন্দিরার অনুগ্রহে শেষ জীবনটা জন্মস্থানে কাটানোর ইচ্ছে জানাতেই পারেন। কিন্তু ভারতের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের কনফেডারেশন গঠনের ব্যাপারটা আমার মাথায় একদমই ঢোকেনি। প্রবাসী মুজিব নগর সরকারের তরফে এমন কোন প্রস্তাবনার কথা কখনোই শোনা যায়নি। বরং স্বাধীনতার পর মওলানার ‘হক কথা’, জাসদের ‘গণমুক্তি’ কিংবা এনায়েতুল্লাহ খানের ‘হলিডে’ পত্রিকায় ভারতের কাছে দেশ বিক্রি এবং তাজউদ্দিন সরকারের ৭ দফা চুক্তির অপপ্রচার ছিল। এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দিন বলেছিলেন ‘কেউ প্রমাণ দিতে পারলে আমি ফাঁসিতে চড়বো’ আর মুজিবের উক্তি ছিল ‘আমার দেশের মানুষ খেতে পায় না, ব্যাংকে কোন টাকা নাই, কিন্তু আপনাদের পত্রিকা বের করার খরচটা কে জোগায় এটা যদি সাহস করে বলতেন। আমরা জানি কিন্তু আপনাদের মুখে শুনতে চাই।’

দ্বিতীয় চিঠিতে এটা অবশ্য পরিষ্কার যুদ্ধাকালীন পরিকল্পনাদিতে আওয়ামী লীগ তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখায় রুষ্ট ছিলেন তিনি। পুরা ব্যাপারটায় ইন্দিরার হস্তক্ষেপের আকুতিও স্পষ্ট। প্রসঙ্গত বলতে হয় ৩০ ও ৩১ মে কলকাতার বেলেঘাটায় প্রবাসী বামপন্থীদের দু’দিনব্যাপী সম্মেলন হয় কমরেড বরদা চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে। আটটি বাম দলের এই সম্মেলনে ১ জুন ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ গঠন করা হয় যার সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয় মওলানা ভাসানীর নাম। কিন্তু এই কমিটির কোন বৈঠক কিংবা কার্যক্রমে ভাসানী অংশ নেননি, সমর্থনও জানাননি। এবার চিঠিতে আসা যাক। সাধুভাষায় লিখিত এই চিঠিটির মূল খসড়া মওলানার নিজের।

প্রিয় শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী, প্রধানমন্ত্রী আমার আন্তরিক আশীর্বাদ ও ভালবাসা জানিবেন। আমার পত্রের উত্তর মি. কাউলের মেসেজে বিস্তারিত অবগত হইয়া যারপরনাই খুশি হইলাম। আমার বাল্যজীবনের আদর্শ ৮৯ বছর যাবত অটুট রাখিয়াছিলাম। স্বৈরাচার এহিয়া সরকারের অমানুষিক অত্যাচারে উহা লঙ্ঘন করিতে হইল। বর্তমানের রাজনীতিবিদ কংগ্রেসের কর্মীদেরকে যে যাহাই বলুক কিন্তু তাহাদের মত বিলাসিতাশূন্য জীবনযাপন ও নির্মল চরিত্র অনেকেরই নাই। আমি চিরদিন সাধারণ গৃহে সাধারণভাবে নির্জন পল্লীতে থাকিয়া দেশের সেবা করিয়াছি। কিন্তু এবারই তাহার ব্যতিক্রম হইল। গত ৭ মাস শহরে প্যালেসেস সার্কিট হাউস বাস-আহারাদি বিলাসপূর্ণ। তাই আমার মৃত্যুকাল পর্যন্ত যাহাতে বাল্যজীবনের আদর্শ বহাল থাকে তাহারই জন্য ৫ একর জমি ও সাধারণ ধরনের ৪ খানা ঘরের ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। আমার প্রথম পুত্রের মৃত্যু হয় ধুবড়ীর গ্রামে। তাই আমার বৃদ্ধা স্ত্রীর আশা তাহার শেষ দাফন ধুবড়ীর কোন গ্রামে হয়। আমার শেষ সংগ্রাম বাংলাদেশকে স্বাধীন করা, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ভারতের সহিত কনফেডারেশন। এই তিন কাজের সাধন ইনশাল্লাহ আমার জীবিতকালে দেখার প্রবল ইচ্ছা অন্তরে পোষন করি।

বাধা যতই আসুক, আমার আন্তরিক আশা ও বিশ্বাস আপনাদের আশীর্বাদে অবশ্যই পূর্ণ হইবে। আমার আন্তরিক আশীর্বাদ আপনার আদর্শানুযায়ী সমাজতন্ত্র শুধু ভারতে নহে এশিয়া আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হইবে। যখন দরকার মনে করেন দিল্লীতে ডাকাইলেই হাজির হইব। আপনার বিশ্বস্ত মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

৩ অক্টোবর দেরাদুন থেকে যে চিঠিটি মওলানা লিখেছেন তার মুসাবিদা সাইফুল ইসলামের। হুবহু তা তুলে ধরা হলো :



আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নিকট হতে:
ক্যাম্প দেরাদুন

বরাবর
মিসেস ইন্দিরা গান্ধী,
প্রধানমন্ত্রী,
ভারত সরকার,
নতুন দিল্লী।
তারিখ ৩ অক্টোবর ১৯৭১

সম্মানীয়া মহাদয়া, আপনার জন্য আমার অশেষ ভালোবাসা ও আশীর্বাদ গ্রহন করবেন। পুনরায় আপনার অমূল্য সময় হতে কয়েক মিনিট অপচয় করার কারণে আশা করি আপনি নিজ গুণে ক্ষমা করবেন। আপনার সরকার সাধ্যমতো উত্তম চিকিৎসা করা স্বত্বেও পুরানো জ্বালাটা অনুভব করছি। কয়মাস পেরিয়ে গেছে আমি আমার স্ত্রী এবং নাতনিদের কোন সংবাদ জানি না। তাদের কোন প্রকার খবরাখবর না জানায় আমার বেদনাদায়ক অনুভব আপনি বুঝতে পারছেন- এ সম্পর্কে আমি নিশ্চিত। বাংলাদেশের প্রথম কাতারের নেতারা যারা স্বাধীনতার জন্য কাজ করছেন তাদেরও সততা সম্পর্কে আল্লাহই জানেন। আমি পুনরায় ওয়াদা দিচ্ছি আওয়ামী লীগ যতক্ষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়বে আমি তাদের সমর্থন দিয়ে যাব। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমি যখন কলকাতায় ছিলাম তখন কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা আপনার বরাবরে একটি লেখা টাইপ করে নিয়ে এসেছিলেন যে, অসুস্থতার দরুন আমি আপনার সাথে দেখা করতে সক্ষম হব না। চিঠির পুঙ্খানুপুঙ্খ না পড়ে কেবলমাত্র বিশ্বাসে তাতে সই দিয়েছিলাম। ওর পিছনে কি মতলব আছে আমি তা জানি না। তারা ওয়াদা করেছিলেন যে, ঐ চিঠির কপি আমাকে দেবেন। কিন্তু তারা কথা রক্ষা করেননি। আমার রাজনৈতিক জীবনে আমি ১১ বছর যাবত আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলাম এবং স্বাধীনতাউত্তরকালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করে ৮ বছর যাবত তার সভাপতি ছিলাম এবং আমি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও কৃষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এই পদে গত ১২ বছর যাবত কাজ করে যাচ্ছি। দীর্ঘকাল এই রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতির কাজে আমার পরিচালনায় কম করে হলেও ১৬ জন সেক্রেটারি কাজ করেছেন। কিন্তু আমি গ্রামেই বাস করি। ফলে জরুরী রাজনৈতিক চাহিদা মোকাবেলা করার জন্য আমার সাদা প্যাডে বহু সই তাদেরকে দিয়েছি। এসব আমি ভালোভাবে উপলব্ধি করছি তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে আমার সরল বিশ্বাসের বহু মওকা গ্রহণ করেছে। ফলে আমার রাজনৈতিক সহযোগিতার উপর আমার বিশ্বাস চলে গেছে। এই কারণে আমার মানবিক বেদনার জন্যই এইসব অবান্তর কথা আপনাকে লিখছি। বিশ্বশান্তি, নিপীড়িত মানুষের মুক্তি এবং আল্লায় বিশ্বাসীসহ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আপনার মহৎ সংগ্রাম আপনি অব্যহত রাখবেন বলে আমি আশা ও বিশ্বাস করি। এবং আমি খোলামনে আপনার প্রতি সকল বিশ্বাসের স্বীকারোক্তি করছি। যদি কোন বিষয়ে আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করি তবে ব্যক্তিগতভাবে আপনার সাথে সাক্ষাত করে সেই পয়েন্ট আলোচনা করব। আপনার মূল্যবান উপদেশ ব্যতীত আমি কোন সিদ্ধান্ত নেব না কোন কাজ করব না। যদি আমার বিরুদ্ধে আপনার কাছে কোন রিপোর্ট পেশ হয়ে থাকে তবে বিশ্বাস করুন আমি জীবনে কাউকে ঠকাইনি। এবং শেষ জীবনেও ঠকাব না। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি সক্রিয়ভাবে কাজের সাথে জড়িত আছি। আপনি যদি আমাকে সক্রিয়ভাবে কাজের সাথে জড়িত রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন তবে আমি সুখী ও আনন্দিত হব। বৃদ্ধ বয়সের জন্য অনুগ্রহ করে আমাকে অবহেলা করবেন না। যদি কাজ করার এই আজীবন অভ্যাস হতে দূরে রাখা হয় তবে আশঙ্কা করছি তা আমার স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য কিছুদিন পূর্বে মি. ডিপি ধরের নিকট কিছু লেখা পাঠিয়ে তা ইংরেজি, বাংলায়, চীনা, আরবি, উর্দু, ফরাসি, রাশিয়ান, জার্মান প্রভৃতি ভাষায় ছাপিয়ে এ সকল দেশে বিতরণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। অনুরোধ মোতাবেক কাজ হলে আমি সুখি হব। রমজান মাসে আমি পশ্চিমবঙ্গ অথবা আসামের কোন স্থানে থাকতে চাই। পবিত্র মাস শেষে আমি আবার এখানে ফিরে আসতে চাই।
আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, বাংলাদেশে স্বাধীনতা অর্জন এবং ভারতের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের কনফেডারেশন গঠন করার লক্ষ্যে আমি আমার সংগ্রাম অক্ষুন্ন রাখব।

এই বুড়ো বয়সে স্ত্রী ও নাতনিদেরকে নিয়ে আসামের ধুবড়ী মহকুমার যে কোন স্থানে বাস করার জন্য যদি আপনি পাঁচ একর জমিসহ ক’টি টিনের ঘরের ব্যবস্থা করে দেন তাহলে এই বদান্যতার জন্য আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকব। আসামের আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে আমি কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করব না। আপনার এবং আসাম সরকারের নিকট আমি এই প্রতিজ্ঞা করছি। ছয়মাস যাবত আমার থাকা, খাওয়া, পরার জন্য আপনার উপর নির্ভরশীলতার দরুন অত্যন্ত লজ্জাবোধ করছি। যদি ধুবড়ী থাকতে আমাকে অনুমতি দেয়া হয় তাহলে সরকারী তহবিল হতে আমার জন্য অর্থ খরচের দরকার পড়বে না। যেই আমাকে প্রো-চাইনিজ বলে আপনার কাছে চিহ্নিত করতে অপচেষ্টা করুন, ইনশাল্লাহ আমি ভারত ও আপনার অবাধ্য হবো না। সর্বাধিক সম্মান সহকারে, আপনার বিশ্বস্ত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী


তথ্যসূত্র :
সাইফুল ইসলাম : স্বাধীনতা-ভাসানী-ভারত
সৈয়দ আবুল মকসুদ : মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী
সিরাজউদ্দীন আহমেদ : মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29105678 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29105678 2010-02-26 00:51:14
হায় সামু! হায় ছাগু!! হায় এ-টিম!!!
একসময় স্বাধীনতা বিরোধী পক্ষের ব্লগার এবং স্বাধীনতা বিরোধী পোস্ট বন্ধের জন্য এ-টিম নামে একটা ব্লগার গ্রুপ তৈরি হইছিলো। ছাগুপার্টির যম আছিলো তারা। যেসব ছাগু সামু ছাড়ছিলো তারাই দেখি এখন সুপার একটিভ। সেইসব স্বাধীনতা বিরোধী পোস্টই এখন নতুন মোড়কে পেশ হয়। এ-টিমের অবস্থানে যেসব সুশীলের জ্বলুনি উঠতো, যারা দল বাইধা কর্তৃপক্ষরে বুঝাইছিলো যে এরা ঝামেলা, এরা সাইটের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর এগোরে দল বাইন্ধা ব্যান করা হোক, সেইসব সুশীল এখন প্রথম আলো ব্লগের মতো অন্য ব্লগের ভাবমূর্তি বাড়াইতে ব্যস্ত। এইসব ছাগলামি তাগো চোখেই পড়ে না। তাদের নিজেদের পোস্টও দেখি বিপন্ন।

হাসি পায় না, দুঃখ হয়। আফসোস হয়। জানি কমরেডরা আর ফিরবো না। আমারে একাই লড়তে হইবো শত বাধা শত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে একলা হইয়া। খালি মিস করি সেইসব লড়াকু যোদ্ধাদের। আর লানত সেইসব সুশীলদের যারা ছাগুগো ফাকা মাঠ তৈরি কইরা দিয়া নিজেরা কাট মারছে। যুদ্ধ চলবে, একলা হইলে একলাই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29104185 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29104185 2010-02-23 22:36:03
আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত বানিয়ে সে টাকায় চলছে ইসলামী বিপ্লব-২ আগের পর্ব

এরশাদের শাসন আমলে বাংলাদেশে হেরোইনের প্রসার। ঢাকায় শুরুতে এই হেরোইনের বিক্রিটা সীমাবদ্ধ ছিলো অল্প কিছু জায়গায়। আসক্তদের মধ্যে চালু রসিকতাটা ছিলো- রাজার নেশা কিনতে যাইতে হয় ফকিরনিগো কাছে। মোহাম্মদপুর টাউন হল, জেনেভা ক্যাম্প ও মীরপুর-বিক্রেতারা সব বিহারী। বিশাল বস্তিগুলোতে সহজলভ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত এগুলোই ছিলো ডেন। এবং পরেরদিকে পাইকারি আড়ত। অদ্ভুত সব কায়দায় এদেশে হেরোইন ঢুকতো। বিমানবন্দরে যেসব বড় চালান ধরা পড়েছিলো তার মধ্যে ছিলো চাঞ্চল্যকর মাধ্যমের কয়েকটি ছিলো টুথপেস্ট, বিদেশী পুতুল, সিগারেটের কার্টন। (১০)

বলা হয়ে থাকে বড় চালান পার করার জন্য এসব কয়েক কেজির চালান ইচ্ছে করেই ধরিয়ে দেওয়া হতো। বাহক হিসেবে বহু পাকিস্তানী এখনও ঢাকা কারাগারে পচে মরছে। পরে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে আফ্রিকান কিছু যুবক যারা স্রেফ টাকার লোভে পাকিস্তান থেকে এসব নিয়ে এদেশে আসতো। স্মরণে পড়ছে চট্টগ্রামে জাহাজে করে একটি বিশাল চালন আটকের কথা, যার নেপথ্যে রওশন এরশাদ এবং জনৈক কানা ফকিরের যুক্ত ছিলো বলে শোনা যায়। জাহাজটি ছিলো সালা্হউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। (১১)

বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর সঙ্গে শুরুতেই এই মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্ঠতার প্রমাণ মেলেনি। তবে চোরের সাতদিন গৃহস্থের একদিন। ২০০৬ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্যে সাড়ে ২২ কেজি হেরোইন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় বদরুদ্দোজা চৌধুরী নামে এক ব্যক্তিকে। বিডি ফুডস নামে একটি কোম্পানির এই মালিক জামাতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার ছেলে হাসান শাহরিয়ার চৌধুরী দৈনিক নয়া দিগন্তের পরিচালক মন্ডলীর সদস্য এবং দিগন্ত টিভিতেও তার অংশীদারিত্ব রয়েছে। সবজী, টিস্যু পেপার, কসমেটিকসের মধ্যে করে এসব হেরোইন পাচার করতো তার কোম্পানি। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে তারা এসব চালান নিয়ে আসতো। এই পাচারে ব্যবহার করতো এমদাদ ট্রেডার্স এবং জামিল ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং কোম্পানি নামে দুটো ভুয়া কোম্পানিকেও। (১২)

(চলবে)

সূত্র :
১০/১১ : ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
১২ : Click This Link
Click This Link




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29096377 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29096377 2010-02-13 01:28:52
আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত বানিয়ে সে টাকায় চলছে ইসলামী বিপ্লব

শিরোনামটায় ভড়কালেন! ভড়কানোর কিছুই নেই। আজ এই ২০১০ সালে এসে বাংলাদেশে মাদকাসক্তি একটি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌছেছে। খুব কম পরিবারই আছে যেখানে মাদক ছোবল দেয়নি। এমন ভাগ্যবান পরিবার কম, যাদের কোনো সদস্য মাদকের নেশায় উম্মত্ত হয়ে জিম্মি করে রাখেনি তাদের। হালের ক্রেজ ইয়াবা হলেও পরিসংখ্যানে এখনও সবচেয়ে ক্ষতিকর মাদক হিসেবে বর্তমান হেরোইন। ব্রাউন সুগার এবং ইনজেকশন ফরমে এটা আসক্তদের প্রিয় গভীর নেশা এবং স্বল্প দামের কারণে। ৪০০ টাকার ইয়াবা কিংবা ৬০০ টাকার ফেন্সিডিলের বদলে ১০০ টাকা খরচ করেই তারা চলে যাচ্ছে নেশার রাজ্যে। এই নেশার টাকা যোগাড় করতে তারা কি করে এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। পরিচিত বা বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়দের দেখেই মোটামুটি এ ব্যাপারে কম বেশী সবাই জানেন। এই যে চুরি ছ্যাচরামি করে, ডাকাতি-ছিনতাই করে, ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে মাদকাসক্তরা নেশার রাজ্যে ঘোরাফেরা করে যাচ্ছে- টাকাটা যাচ্ছে কোথায়? উত্তরটা শিরোনামেই দিয়েছি। এ টাকা কাজে লাগছে ইসলামী বিপ্লবের পুঁজি জোগাতে।

হেরোইন একটি কেমিক্যাল ড্রাগ। মূল উৎস পপি। আর এর চাষাবাদ এশিয়াতে তিনটি অঞ্চলে। লাওস, বার্মা এবং আফগানিস্তান। শীতল যুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে শায়েস্তা করতে এশিয়াতে যে গোপন যুদ্ধ চালিয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার উপজাত হয়েই পপির প্রসার। ভিয়েতনামে নিজেদের অব্স্থান সংহত করতে ষাটের দশকে লাওসে মং (hmong)উপজাতিদের কাজে লাগিয়েছিলো সিআইএ। বিনিময়ে তাদের একমাত্র অর্থকরী ফসল পপির উৎপাদন ও বিপননে সহায়তার চুক্তিতে যেতে হয়েছিলো তাদের। আশির দশকে আফগানিস্তানে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। রাশিয়াকে হটাতে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের হাতকে শক্ত করার রাস্তা নেয় তারা। মাধ্যম হয় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। মুজাহেদিনদের জন্য বরাদ্দ অনুদানের ২ বিলিয়ন ডলারের অর্ধেক পান হেকমতিয়ার যার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে আফগানিস্তানের বেশীরভাগ আফিম ক্ষেত্র। (১) এসব আফিম চলে যেত পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্তবর্তী প্রদেশের ল্যাবরেটরিতে। সেখানে তৈরি হতো হেরোইন। এরপর বাজারজাত হতো। বাজার? খোদ পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ। সঙ্গে প্রতিবেশী ইরানও। (২)

আবাদী অঞ্চলগুলো আশির দশকের শুরুতেই কব্জায় নিয়ে এসেছিল মুজাহেদিনরা। কৃষকদের বিপ্লবী কর হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে পপি চাষের নির্দেশ দেয় তারা। ’৮১ সালে ২৫০ টন থেকে উৎপাদন ১০ বছরের মাথায় ২০০০ টনে উত্তীর্ণ হয়। (৩) মুজাহেদিনদের কাজ ছিলো সীমান্ত পার করে পাকিস্তানে নিয়ে আসা। সেখানে আইএসআই’র জেনারেল ফজলে হকের রক্ষাকবচে থাকা পাকিস্তানী হেরোইন রিফাইনারদের কাছে এসব বিক্রি করতো তারা। ফজলে হক একই সঙ্গে নর্থওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সের গভর্নরও। ধারণা করা হয় ১৯৮৮ সালে শুধু খাইবার জেলাতেই হেরোইন তৈরির রিফাইনারির সংখ্যা ছিলো একশ থেকে দুশোটি। (৪)

আশির দশকেই পাকিস্তানের উত্থান বিশ্বের সবচেয়ে বড় হেরোইন প্রস্ততকারী দেশ হিসেবে। ইউরোপ বা অন্যান্য বাজার ধরার আগে ঘরেই শুরু হয়ে যায় এর বিপনন। ৮৫ সালে পাকিস্তানে হেরোইন আসক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ লাখেরও বেশী। (৫) বাংলাদেশেও ওই একইসময় হেরোইন আঘাত হানে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেই জানি সে সময় প্রতিটি গাজার আখড়ায় ফ্রিতে হেরোইন বিলি করা হতো এবং শিখিয়ে দেওয়া হতো সেবন প্রণালী। মাসখানেকের এই বিনিয়োগ যথেষ্ট ছিলো ঢাকার বুকে কয়েক হাজার হেরোইন আসক্ত তৈরি করতে।
আফগানিস্তান থেকে রাশিয়ানদের পশ্চাদপসারণ এবং খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থও ফুরোয়। কিন্তু হেরোইন ব্যবসা থামেনি। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে আফগানিস্তান বিশ্বের ৭৫ভাগ হেরোইনের যোগানদাতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে। ‘৯৯তে তাদের কাঁচা আফিম উৎপাদন ছিলো ৪ হাজার ৬০০ টন! (৬) এই হেরোইনের টাকাই বিনিয়োগ হতে থাকে জঙ্গীবাদে। নিজেদের গৃহযুদ্ধ তো আছেই। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে শুরু করে বলকান রাজ্যগুলোতেও কাঁচা আফিমের পয়সায় ভিত্তি পায় ইসলামী বিপ্লবের নামে সন্ত্রাস। কাশ্মীর, কসোভো, চেচনিয়াতে ধর্মের আফিমে বুঁদ জঙ্গীরা নব উদ্যোমে ঝাপায়, আর সেটাকা জোগান দিতে হেরোইনের নেশায় বুঁদ হয়ে ঝিমাতে থাকে উপমহাদেশের কয়েক প্রজন্মের কিশোর, তরুণ, যুবারা। অতিষ্ঠ ইরান ১৯৯৮ সালে বন্ধ করে দেয় সীমান্ত। এর আগে সাত বছরে তারা আটক করে ১৯৭ মেট্রিক টন হেরোইন। (৭)
আসক্তিতেই থেমে থাকে না বিপদ। সঙ্গে আসে এইডসও। বাংলাদেশে আক্রান্ত এইডস রুগীদের একটা বড় অংশই ইনজেকশনের মাধ্যমে হেরোইন নেয়ার কারণে তালিকাভুক্ত। বাকিদেশগুলোতেও একই অবস্থা। ২০০১ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে প্রথম ইনজেকশনে নেশা নিয়ে অভ্যস্তদের মাধ্যমে মহামারী আকারে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়ার শংকা জানানো হয়। মধ্য এশিয়ায় সংখ্যাটা দশ লাখেরও বেশী বলে জানানো হয়। (৮)

এদিকে হেরোইনের টাকায় রমরমা অবস্থায় চলে যায় আইএসআই। আশির দশকে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ জোগান আসতে থাকে হেরোইন বিক্রির খাত থেকে। সুবাদেই ধ্বসে যায় তাদের গণতান্ত্রিক বুনিয়াদ যার ফলে পতন হয় বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরীফের সরকারের। আইএসআই আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, সামরিক বাহিনীতে বাড়ে তাদের প্রভাব। আর কাশ্মীর ও আফগানিস্তানে চালাতে থাকে ইসলামী জঙ্গীদের সহযোগিতা। ভাগের টাকায় বাদ পড়ে না বাংলাদেশের জামাতে ইসলামীও। (৯)
(চলবে)

ছবি : হাসান বিপুল তথ্যসূত্র :
১. John F. Burns, “Afghans: Now They Blame America,” New York Times Sunday Magazine, February 4, 1990, 37; Lawrence Lifschultz, “Dangerous Liaison: The CIAISI
Connection,” Newsline (Karachi), November 1989, 52–53.
২/৫.Pakistan Narcotics Control Board, National Survey on Drug Abuse in Pakistan (Islamabad: Narcotics Control Board, 1986), iii, ix, 23, 308.
৩.U.S. Central Intelligence Agency, “Memorandum, Subject: Iran — An Opium Cornucopia,”
September 27, 1979; U.S. Department of State, Bureau of International Narcotics Matters, International Narcotics Control Strategy Report (Washington, D.C.: U.S. State Department, February 1984), 4; U.S. Department of State, Bureau for International Narcotics and Law Enforcement Affairs, International Narcotics Control Strategy Report, March 1998 (Washington, D.C.: U.S. State Department, 1998), 23; Geopolitical Drug Dispatch, “Afghanistan: Aiming to be the Leading Opium Producer,”
no. 3 (January 1992), 1, 3.
৪.Kathy Evans, “The Tribal Trail,” Newsline (Karachi), December 1989, 26.
৬.U.S. Department of State, International Narcotics Control Strategy Report, March 2000, 56; United Nations, United Nations International Drug Control Programme,
Afghanistan: Annual Survey 2000 (Islamabad: UNDCP, 2000), 15.
৭. Rashid, Taliban, 122, 124; United Nations, United Nations Office for Drug Control and Crime Prevention, Pakistan Regional Office, Strategic Study #2: The Dynamics of the Farmgate Opium Trade and the Coping Strategies of Opium Traders
৮. New York Times, November 29, 2001.
৯. Miriam Abou Zahab, “Pakistan: d’un narco-Etat a une ‘success story’ dans la guerre contre la drogue?” Cahiers d’études sur la Méditerranée orientale et le monde turcoiranien 32 (July-December 2001):147–53; Rashid, Taliban, 121–22; M. Emdad-ul Haq, Drugs in South Asia: From the Opium Trade to the Present Day (New York: St.Martin’s Press, 2000), 213.

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29095128 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29095128 2010-02-11 06:36:33
ছবি ব্লগ : দ্বিতীয় জন্মদিনে রাজকন্যা

গত শুক্রবার দু'বছর পা দিলো রাজকন্যা। উদযাপনটা ঘরোয়া ছিলো না, আমরা বন্ধুর ব্লগারদের পিকনিকে সেদিন সামিল ছিলো সেও। রীতিমতো বেলুন ফুলিয়ে, কেক কেটে বন্ধুরা পালন করেছিলো রাজকন্যার দ্বিতীয় জন্মদিন। কেক কাটার পর ছুরিটাকে কেড়ে নিয়ে প্রথম কেকের টুকরোটা নিজেই মুখে পুরেছে ছোঁচাটা।



গোটা পিকনিকে সে একবারও আমার কোলে উঠেনি। তার প্রিয় তালিকায় ছিলো অচেনা বাঙালী ওরফে হাসান রায়হান, শওকত হোসেন মাসুম, বিষাক্ত মানুষ আর মাথামোটা। পরে কারণ খুঁজে পাওয়া গেলো। এরা সবাই চশমা পড়ে, আর ফ্রেমটা ওর মায়ের সঙ্গে মিলে বলেই নানা বাড়ির লোক বানিয়ে নিয়েছে এদের। মোটের উপর দারুণ কেটেছে ওর দিনটা।


ফেসবুকে ছবিগুলো পেতে দেরি হলো বলেই পোস্টটা দেরীতে এলো।

ছবি : মাসুম ভাইর কোলে, জন্মদিনের কেক, বেলুন দেখে খুশী রাজকন্যা]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29093390 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29093390 2010-02-08 14:19:35
হয়ে গেলো চার বছর!!! http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29089481 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29089481 2010-02-01 14:14:29 দ্য আদার কনসার্ট ফর বাংলাদেশ : যেটার কথা কেউ বলে না!

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বলতেই আমাদের চোখে ভাসেন জর্জ হ্যারিসন। যুদ্ধপীড়িত বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে আয়োজন করেছিলেন অসাধারণ সেই আসরের। অনেকেরই হয়তো জানা নেই ঠিক মাস দেড়েক পর ইংল্যান্ডের কেনিংটন ওভালে হয়েছিলো এমনই আরেকটি রক কনসার্ট। আর সেটার উদ্দেশ্যও ছিলো বাংলাদেশের জন্য তহবিল সংগ্রহ।



ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন যেমন ইউএস ওপেনের ভেন্যু, কেনিংটন ওভাল তেমনি ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী টেস্ট ভেন্যুগুলোর একটি। সারে কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হাতে এর মালিকানা। ১৯৭১ সালের দিকে আর্থিক দুর্দশা চলছিলো সারের। সুবাদেই তারা তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দিচ্ছিলো মাঠ। ১৮ সেপ্টেম্বর সেখানে এক রক কনসার্ট আয়োজনের জন্য সারের অনুমতি চায় বাফেলো কনসার্ট লিমিটেডের রিকি ফার। এজন্য ক্লাবকে দেওয়া হয় ৩ হাজার পাউন্ড। কনসার্টের প্রমোটার ছিলেন হার্ভে গোল্ডস্মিথ। আর মূল উদ্যোগটি ছিলো ‘কস্তুর’ নামে একটি দাতব্য সংগঠনের। কেন্টের ব্রোমলিভিত্তিক (জায়গাটার নাম সম্ভবত পেঞ্জ) এই সংগঠনটি বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য নানা ভাবে সাহায্য তুলছিলো।



‘গুডবাই সামার’ নাম দিয়ে এই কনসার্টের টিকেট ধরা হয়েছিলো সোয়া এক পাউন্ড। বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট লেখা ছিলো বাংলাদেশের শরণার্থীদের কথা। আগের দিন মাঝরাত পর্যন্ত কাউন্টার খোলা থাকলেও টিকেট বিক্রি হয়েছিলো মাত্র ১০ হাজার। কিন্তু কনসার্টের দিন পাল্টে যায় ছবি। ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার হলেও ওভালে সেদিন দর্শক হয়েছিলো প্রায় ৪০ হাজারের মতো।



হওয়ারই কথা, কারণ বিজ্ঞাপনে নাম ছিলো দ্য হু’র- সে সময় রক অ্যান্ড রোলে কাঁপানো এক নাম। আরো ছিলো দ্য ফেস, যার ভোকাল ছিলেন তখন রড স্টুয়ার্ট। এছাড়া আমেরিকা, দ্য অ্যাটমিক রুস্টার, মট দ্য হুপল, লিন্ডিসফার্ন, গ্রিজ ব্যান্ড, ককাইজ, ইউজিন ওয়ালেস ও কুইন্টএসেন্স অংশ নিয়েছিলো সকাল ১১ টা থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই অনুষ্ঠানে। আর এর সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন টেড ডেক্সটার- সে সময়ের বিখ্যাত ডিস্ক জকি ও এমসি। ফার অবশ্য চেষ্টা করেছেন বড় ব্যান্ডগুলোকে টানতে। কিন্তু দরদামে বনেনি।



খ্যাতির দিক দিয়ে বাকি ব্যান্ডগুলো অনেক পিছিয়ে থাকায় শেষ পর্যন্ত ফেস এবং হু’কেই টানতে হয়েছে গোটা কনসার্ট। হু গেয়েছে তাদের কালজয়ী সব গান যা তখন ছিলো মাত্র রিলিজড। এর মধ্যে ছিলো লাভ এইনট ফর কিপিং, মাই জেনারেশন, সি মি ফিল মি, বেইবি ডোন্ট ইউ ডু ইটের মতো হিট সিঙ্গেলস। এখানে কুইন্টএসেন্সের কথা বলতে হয় একটু। মূলত ভারতীয় বংশোদ্ভুতদের নিয়ে গড়া এই রক ব্যান্ডটি সে সময় বেশ নজর কেড়েছে।



অনুষ্ঠানের আগেই উদ্যোক্তারা জানিয়ে দিয়েছিলো তারা ১৫ হাজার পাউন্ড দেবে। এর তিনগুনেরও বেশী অর্থ উঠলেও তারা প্রতিশ্রুতির বেশী আর হাত খোলেনি। কস্তর নীল প্লাস্টিকের কিছু বাক্স বানিয়ে দর্শকদের মধ্যে পাঠিয়েছে বাড়তি কিছুর আশায়। অনেকগুলো বাক্স ফেরেইনি। তবে এসবের মধ্যে আলাদা করে বলতেই হয় রড স্টুয়ার্টের কথা। চিতা বাঘের সঙ্গে মিলিয়ে হলুদ ফোঁটা কাটা জ্যাকেট আর প্যান্ট পড়ে গান গেয়েছেন তিনি। এক পর্যায়ে জ্যাকেটটি খুলে দেন নিলামে বিক্রি করতে। আর সে বাবদ ৫০০ পাউন্ড যোগ হয় তহবিলে।



‘দ্য হু’ আলাদা পিএ সিস্টেম ব্যবহার করেছিলো। এজন্য তাদের অংশটুকু আরো বেশী উপভোগ করতে পেরেছে দর্শকরা। এর আগে সাউন্ড সিস্টেমে অসন্তুষ্ট রড স্টুয়ার্ট একটি গান গেয়েই ফিরে যান। সাফ জানিয়ে দেন ত্রুটি না সারালে গাইবে না ফেস। আধঘণ্টা পর সমস্যা মিটলে স্টেজে ফেরেন তারা। এর বাইরে দর্শকদের মধ্যে ড্রাগসের ব্যবহারও বেশ সমালোচিত করেছে কনসার্টটিকে। দর্শকদের থেকে গায়করাও কম যাননি। হু যথারীতি তাদের গিটার ভাঙ্গার রীতি চালিয়ে গেছে।



তবে কনসার্টটিকে রক অ্যান্ড রোলের পাগলপনার টালিখাতায় যোগ করার কৃতিত্বটা কিথ মুনের। হু’র ড্রামার এসেই ক্রিকেটার সাজা ডেক্সটারের হাতের ব্যাট কেড়ে নেন। সেটা দিয়ে ড্রামও বাজান খানিকক্ষণ। শেষদিকে সঙ্গীরা যখন গিটার আছড়াচ্ছেন, কিথ ভাঙ্গেন তার ড্রাম। ভাঙ্গেন মানে সেটার মধ্যে গিয়ে পড়েন। সারা স্টেজে এমনভাবেই ছড়িয়ে যায় তা যা দেখে ডেক্সটার বলে উঠেন : "As you can see, an encore is impossible. We have drums everywhere." সেটি ছিলো আসলে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা।



শেষ কথা : কনসার্টটি পুরোটাই রেকর্ড করা হয়েছিলো ভবিষ্যতে এলবাম ও ফিল্ম করার আশায়। কিন্তু অংশগ্রহণকারী ব্যান্ডগুলোর সঙ্গে রয়ালটি নিয়ে না বনায় শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায় পরিকল্পনা। টেপগুলো স্মৃতি হয়ে হয়তো পড়ে আছে কোনো বেসমেন্টে। কদরহীন, অনাদরে।

ছবি: কনসার্টের প্রকাশনার মলাট, বিজ্ঞাপন, কনসার্টের সময় দর্শকপূর্ণ ওভাল, মট দ্য হুপল, দ্য ফেস, হু, কিথ মুনের ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে ড্রাম বাজানো
ভিডিও : এটি আসলে দ্য ফেসের মে বি আ’ম এমেজড গানটির সময় দর্শকদের মধ্যে থেকে ধারণকৃত অডিওট্র্যাক, রড স্টুয়ার্টের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29088736 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29088736 2010-01-31 07:09:38
দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ : কিছু অজানা অধ্যায় ১ With sadness in his eyes,
He told me that he wanted help,
Before his country died,
Although I couldn't feel the pain,
I knew I'd have to try,
Now I'm asking all of you,
To help us save some lives (Bangladesh: George Harrison)
............................................
শুরুর কথা :
অনেক আগে কোনো এক পোস্টে রাগিবের একটি মন্তব্য মনে গেঁথে গিয়েছিলো। শিকাগোয় কোনো এক সরকারী দপ্তরে একবার একটা কাজে গিয়েছিলো সে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার নাগরিকত্ব জানার পর বেশ নস্টালজিক হয়ে বলেছিলেন,‘জানো,তোমার দেশের জন্য নিউইয়র্কে যে কনসার্ট হয়েছিলো,আমি সেটাতে গিয়েছিলাম,সেই কনসার্ট ফর বাংলাদেশের এলপি-টা কিনেছিলাম। তোমার দেশের স্বাধীনতায় অন্য কোনো অবদান না রাখতে পারি,এই সাহায্যটুকু করার চেষ্টা করেছিলাম।’ একজন কৃতজ্ঞ বাঙালী হিসেবে রাগিব তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলো নিশ্চিত। তবে এটা নিশ্চয়ই বলেনি-তোমার ও তোমাদের সেই আন্তরিক অনুদানের বেশীরভাগ আমার দেশের মানুষ পেয়েছে প্রায় এক যুগ পরে! ঠিক তাই। নানা আইনী ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার হতে হয়েছিলো মহৎ এই উদ্যোগ থেকে সংগ্রহীত তহবিলকে। উইকিতে ব্যাপারটা পড়ে আমাকে জানিয়েছিলেন হাসান শহীদ ফেরদৌস। ‘আমি লিখবো’- বলে আইডিয়াটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে শুরু করলাম ঘাটাঘাটি। সুবাদেই উঠে এলো এর নেপথ্যের নানা কাহিনী- বিটলসের ঘরোয়া বিবাদ, নিক্সন প্রশাসনের দমননীতি, রেকর্ড কোম্পানীগুলোর বেনিয়াগিরিসহ অনেককিছুই। সেইসঙ্গে শ্রদ্ধায় আরেকবার নত হলাম জর্জ হ্যারিসনের মহানুভবতায়। এই পোস্টটি নেপথ্যে ঘটে যাওয়া সেসব ঘটনা নিয়ে যার টাইমলাইন এক যুগেরও ওপর। যার অনেকখানি অনেকেরই অজানা।

দ্য কনসার্ট : পরিকল্পনা ও ঘাত-প্রতিঘাত

১ আগস্ট ১৯৭১। এদিন নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যুদ্ধপীড়িত বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্য করার জন্য আয়োজিত হয়েছিলো দুটো কনসার্ট। ঠিক পড়েছেন। একটি নয়, দুটো কনসার্ট। প্রতিটি চারঘণ্টা দৈর্ঘ্যের এই কনসার্টের প্রথমটি শুরু হয়েছিলো দুপুরে। দ্বিতীয়টি সন্ধ্যা ৭টায়। দূর্গত মানবতার পক্ষে এমন আয়োজন ইতিহাসে সেটাই প্রথম (তারকা উপস্থিতির বিচারে) এবং পরে ইথিওপিয়ার জন্য লাইভ এইড কনসার্টসহ অনেক উদ্যোগের পাথেয় ছিলো এটি। এবং শিক্ষাও। কি অর্থে তার ব্যাখ্যায় পরে আসছি।

কিভাবে ধারণাটির জন্ম তার অনেকরকম বক্তব্য পেয়েছি। তবে রবি শংকর ও হ্যারিসনের একাধিক সাক্ষাতকারকে আমলে নিয়ে গল্পটা দাঁড়িয়েছে এমন- ’৭০ সালে ভোলায় প্রলয়ঙ্কারী সাইক্লোনটির পরপরই বাংলাদেশের বন্যাদূর্গতদের জন্য কিছু করার কথা ভাবছিলেন রবি শংকর। ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তার ছাত্র ও বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে। হ্যারিসন অনেকদিন ধরেই ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের প্রতি অনুরক্ত, সুবাদেই সেতার শিখছিলেন শংকরের কাছে। এরপর বিটলসের নিজস্ব কোম্পানি অ্যাপেল রেকর্ডসে রবি শংকর রেকর্ড করেন ‘জয় বাংলা’ আর হ্যারিসন তার ‘বাংলাদেশ’ সিঙ্গলটি। উদ্দেশ্য গানের বিক্রি ও রয়ালটি বাবদ টাকা বন্যাদূর্গতদের জন্য ব্যয়। এই উদ্দেশ্যটা নেওয়া হয়েছিলো রেকর্ডিং শুরুর আগেই। ততদিনে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশে।

এবার অনুরোধে পরিবর্তন আনলেন শংকর। হ্যারিসনকে বললেন ছোটোখাটো একটা কনসার্ট আয়োজনের। উদ্দেশ্য ২৫-৩০ হাজার ডলার সংগ্রহ করে শরণার্থীদের সাহায্য করা। হ্যারিসন প্রস্তাবটা লুফে নিলেন তবে তার মাথায় এলো অন্য চিন্তা। বিটলসের একজন সদস্য হিসেবে নিজের তারকামান ও বাজারদর চিন্তা করে এই আত্মবিশ্বাস জন্মালো যে কমপক্ষে এক মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা খুবই সম্ভব। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনি I Me Mine, এ এই প্রসঙ্গে হ্যারিসন লিখেছেন- 'The Beatles had been trained that if you're going to do it, you might as well do it big, and why not make a million dollars?''

জুনের শুরুতে প্রস্তাবটি নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করলেন হ্যারিসন। ফোন করতে লাগলেন গায়ক-বাদক বন্ধুবান্ধবকে। ভেন্যু ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন খালি পাওয়া গেলো ১ আগস্ট, আগে বা পরের সব তারিখ বুকড। তবে এব্যাপারে একটি চমকপ্রদ তথ্য জানা যায় কনসার্ট ফর বাংলাদেশ ফিল্মটির পরিচালক সউল সুইমার্সের ভাষ্যে। তার মতে হ্যারিসন শুরুতে ভাবছিলেন নিউইয়র্ক টাউনহল ভাড়া নেওয়ার কথা। Saul Swimmer, says Harrison initially wanted to do the show at New York's intimate Town Hall: "He didn't think he could sell out the Garden. He was very insecure."

তবে এই অনিশ্চয়তার পেছনেও কারণ ছিলো। রক অ্যান্ড রোলের ভুবনে তখন এক হুতাশকাল। বছরখানেক আগে ভেঙ্গে গেছে কিংবদন্তীর ব্যান্ড বিটলস। অংশীদারিত্ব নিয়ে মামলামোকাদ্দমাও শুরু হলো বলে। এক মোটর সাইকেল দূর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে অনেকদিন মিউজিকের বাইরে বব ডিলান। এরিক ক্ল্যাপটন ভুগছেন হেরোইন আসক্তিতে। হ্যারিসন নিজেও বছর দুয়েকের ওপর হলো পাবলিক কনসার্ট করেননি কোনো। মূলত নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদেরই আয়োজনটি সংশ্লিষ্ট করার ইচ্ছে তার। সুবাদেই আয়োজন হচ্ছে ‘হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ নামেই। বাদ পড়েননি বিটলরাও। লেনন রাজী হলেন। ম্যাককার্টনি সোজা না বলে দিলেন। রিঙ্গো স্টার জানালেন তিনি আছেন।



ম্যাককার্টনির না’য়ের ব্যাপারটা প্রাক-কনসার্ট সংবাদ সম্মেলনে বেশ স্বাভাবিক স্বরেই জানিয়েছেন হ্যারিসন। এ প্রসঙ্গে পরে এক সাক্ষাতকারে ম্যাককার্টনি বলেছেন : George invited me, and I must say it was more than just visa problems. At the time there was the whole Applething. When the Beatles broke up, at first I thought, "Right, broken up, no more messing with any of that." George came up and asked if I wanted to play Bangla Desh and I thought, blimey, what's the point? We're just broken up and we're joining up again? It just seemed a bit crazy. There were a lot of things that went down then, most of which I've forgotten now. I really felt annoyed — "I'm not going to do that if he won't bloody let me out of my contract." Something like that.

লেননের ব্যাপারটা ছিলো আরো অদ্ভুত। বিটলস ভাঙ্গার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয় ইয়োকো ওনোর সঙ্গে তার প্রেমকে। রাজী হওয়ার পর হ্যারিসন তাকে একটাই শর্ত দেন, সেটা ছিলো ইয়োকোকে ছাড়া আসতে হবে কনসার্টে। লেনন রাজী হন তাতে। কনসার্টের দু’দিন আগে হোটেলে এ নিয়ে বচসা হয় ইয়োকা আর লেননের। লেনন জানান হ্যারিসনের শর্তের কথা। কথাকাটির এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত লেনন সোজা ফিরে যান দেশে। খানিকপর হ্যারিসন তাকে রিহার্সেলের জন্য খুঁজতে এসে জানেন যে লেনন চলে গেছেন।

এনিয়ে ইয়োকো ওনোর ভাষ্যটা অন্যরকম : Then a phone call came and John picked it up. He was saying "Yeah....yeah.....yeah," I saw that he was getting very upset. He hung up the phone without saying a word. ―What was that?" "Oh, that was George." A long pause.‖ He‘s saying. 'Join the Bangladesh concert,' and all that. Dylan is coming. too. I'm not going." "Why? I think we should go. It's a charity. It's for a good cause." I said. ―We‘re not doing it." "Why?" "Because it's George's little thing. We‘ll do our own. you and me." "I think we should
go", I said. "Does it matter that it's George's?" John was getting angrier and angrier. I was getting angry. too. I thought John was being big-headed about it.... There is a twist to the story of "that morning." I heard much, much later, that George Harrison told John to come alone to the Bangladesh show, without me, that is. Was that the real reason John did not want to do the show? I guess I will never know.

পরে প্লেবয়কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে চ্যারিটি কনসার্ট ব্যাপারটাকে স্রেফ ধান্দাবাজি বলে অভিহীত করেছেন লেনন। তার ভাষায় I don't want to have anything to do with benefits. I have been benefited to death... Because they're always rip-offs. I haven't performed for personal gain since 1966, when the Beatles last performed. Every concert since then, Yoko and I did for specific charities, except for a Toronto thing that was a rock-'n'-roll revival. Every one of them was a mess or a rip-off. So now we give money to who we want. আর বাংলাদেশ কনাসর্ট সম্পর্কে তার মন্তব্য : Bangladesh was caca.
PLAYBOY: You mean because of all the questions that were raised about where the money went?
LENNON:Yeah, right. I can't even talk about it, because it's still a problem. You'll have to check with Mother [Yoko], because she knows the ins and outs of it, I don't. But it's all a rip-off. So forget about it.

সাক্ষাতকারে লেনন যে আইনী জটিলতা ও ঝামেলার কথা বলেছেন তা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হবে পরের পর্বে। তবে পুরো কনসার্ট আয়োজনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো বিটলসের ম্যানেজার এলান ক্লেইনের। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে শার্ক নামে কুখ্যাত এই লোকই কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নিয়ে যাবতীয় কেলেঙ্কারীর নেপথ্যে। সে প্রসঙ্গেও পড়ে আসছি। তবে লেননের এই প্রত্যাখ্যানের জবাব হ্যারিসন দিয়েছিলেন ’৭৪ সালে ১৪ ডিসেম্বর। ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনেই একটি কনসার্টে হ্যারিসনকে অংশ নিতে অনুরোধ জানান লেনন, জবাবে হ্যারিসন একটু তিক্ত স্বরেই বলেন-‘যখন তোমাকে আমার দরকার ছিলো, তখন কোথায় ছিলে?’ অবশ্য কনসার্টে ঠিকই অংশ নেন হ্যারিসন।



২৮ এপ্রিল ক্লেইনের এবিসিকেও অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে কনসার্ট সম্পর্কে ঘোষণা দেন হ্যারিসন। অবশ্য তার আগেই, জুলাইয়ের শুরুতেই একটি ছোটো বিজ্ঞাপন ছাপা হয় নিউইয়র্ক টাইমসের পেছন পাতায়। ‘হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ দুটো কনসার্ট আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য। বিটলদের সম্ভাব্য রিইউনিয়নের আঁচ পেয়েই হোক, তারকাদের নাম দেখেই হোক, কিংবা বহুদিন পর কনসার্ট হচ্ছে এই খুশীতেই হোক- ছয় ঘণ্টার মধ্যেই দুটো কনসার্টের ৪০ হাজার টিকেট শেষ। এমনিতে সাংবাদিকরা ফ্রি টিকেট পেয়ে থাকেন, তবে তারাও এই উদ্যোগের নেপথ্য কারণ জেনে ১২ হাজার ডলার অনুদান দিলেন আয়োজকদের। যদিও সবাই যে ব্যাপারটিতে হ্যারিসনের ভালো মানুষী কিংবা মহৎ কিছুর খোঁজ পেয়েছেন এমন নয়। ইয়োকো-লেননের বাদানুবাদে যেমনটি উঠে এসেছে, তেমন ভাবনা কিন্তু অনেকেই ভেবেছেন। এনিয়ে পরে এক সাক্ষাতকারে হ্যারিসন আক্ষেপ নিয়েই বলেছেন : "The Concert for Bangladesh was just a moral stance. These kinds of things have grown over the years, but what we did showed that musicians and people are more humane than politicians. Today people accept the commitment rock and roll musicians have when they perform for a charity. When I did it, they said things like, 'He’s only doing this to be nice.'"…



সংবাদ সম্মেলনেও তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো যে দুনিয়াতে এত সমস্যা থাকতে হঠাৎ বাংলাদেশ প্রসঙ্গ তার কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে কেনো। হ্যারিসনের সোজাসাপ্টা উত্তর ছিলো তার গানের কথাগুলোর মতোই : আমার বন্ধু আমার কাছে সাহায্য চেয়েছে, আমার মনে হয়েছে আমার তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। "With all the enormous problems in the world, how did you happen to choose this one to do something about?" "Because I was asked by a friend if I would help, you know, that's all," was Harrison's reply.



যদিও সংবাদ সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যাটা আলোচিত হয়েছে, কিন্তু কনসার্টের উদ্যোগে সেই বিষয়টা সচেতনভাবেই এড়াতে চেয়েছেন হ্যারিসন। যাতে কোনো রাজনৈতিক রং না লাগে এবং নিক্সন প্রশাসন না চটে, সেজন্য বাংলাদেশের দূর্গত শিশুদের ত্রানের কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন কনসার্ট থেকে পাওয়া সব অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থী শিশুদের সাহায্যে পাঠানো হবে। এমনকি কনসার্টের পোস্টারেও ব্যবহৃত হয়েছে একটি শিশুর ছবি, রেকর্ড লেবেলেও। আর এটা নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি।


অনিশ্চয়তা কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। পিটার লেভেজলির লেখা ‘উইদ আ লিটল হেল্প ফ্রম মাই ফ্রেন্ডস’ বইতে ড্রামার জিম কেল্টনার জানিয়েছেন সময়টার কথা। গার্ডেনের এক হোটেল বেসমেন্টে দুদিন রিহার্সেল করেছেন তারা। ডিলানের অংশগ্রহণ একদমই অনিশ্চিত বলে প্রচারণায় তার নামই উল্লেখ করা হয়নি। ক্ল্যাপটন রিহার্সেলে আসা দূরে থাক,তখনও লন্ডনে। উদ্যোক্তরা শেষ পর্যন্ত তার আশা যখন ছেড়েই দেন, তখন ক্ল্যাপটন হাজির। জানা যায় তিনি হেরোইন সমস্যায় আক্রান্ত। হ্যারিসন তাকে কনসার্টে অংশ নেওয়ার জন্য হেরোইন জোগাড় করে দেন, কিন্তু সেগুলো বাজে কোয়ালিটির বলে অভিযোগ করেন ক্ল্যাপটন যা তাকে আরো অসুস্থ করে ফেলে। সব মিলিয়ে হ্যারিসন ছিলেন প্রচণ্ড নার্ভাস। পত্রিকার বাইরে কারো ধারণাই নেই বাংলাদেশ-এর বিষয়টা আসলেই কি! আর এই নার্ভাসনেস ছিলো দুপুরের কনসার্টের অনেকখানি সময় জুড়েই। সবার মাঝেই। (চলবে)



পরের পর্ব : দ্য কনসার্ট, ক্লেইন সমাচার, তহবিলের হিসেব নিকেষ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29088469 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29088469 2010-01-30 17:54:29
শহীদ আসাদ : মিছিল তরে লাশ মেলেনি, শার্ট মিলেছে...
[ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির দলিলপত্র ঘাটলে মাঝে মধ্যে মাথা খারাপ হয়ে যায়। কে যে কার মিত্র, কার ভূমিকা যে কখন প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষে যায়- তার হিসেব মেলানো আসলেই জটিল এক কাজ। যাক সে কথা। আলোচ্য ঘটনার সময়কাল ১৯৬৯, এ বছরই পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক এক গণ অভ্যুত্থান ঘটেছিলো। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমান, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ও সঙ্গীরা বন্দী। ২১ ফেব্রুয়ারি তারা বেকসুর খালাস পাওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকার রাজপথ ছিলো বারুদ আর রক্তের গন্ধে মাখামাখি। সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে আসাদ-মতিউর-সার্জেন্ট জহুরুল হক আর রাজশাহীতে ডক্টর শামসুজ্জোহা ছিলেন আলোচিত শহীদ, তবে একমাত্র নন। তাদের রক্তেই পতন ঘটেছিলো আইউব খানের, কিন্তু ২৫ মার্চ তার জায়গায় আসেন আরেক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এটি আসাদুজ্জামানের শহীদ হওয়ার দিনটির কাহিনী। ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯। গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাত্তের ভিত্তিতে এই বর্ণনায় সাহায্য করেছেন মাহবুবুর রহমান জালাল ভাই। ]

.........................................................
গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো, কিংবা সুর্যাস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়। বোন তার ভাইয়ের অম্লান শার্টে দিচেছ লাগিয়ে নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম, কখনো হৃদয়ের সোনালী তন্তুর সূক্ষতা। বর্ষিয়সী জননী, সে শার্ট উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে স্নেহের বিন্যেসে। ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দূর শোভিত মায়ের উঠোন ছেড়ে, এখন সে শার্ট, শহরের প্রধান সড়কে সড়কে, কারখানার চিমনির চুড়োয়, গমগমে অ্যাভিনুর আনাচে কানাচে উড়ছে, উড়ছে অবিরাম, আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র জলোচ্ছি্বত প্রতিধ্বনিময় মাঠে চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়। আমাদের দূর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা, সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা (আসাদের শার্ট : শামসুর রাহমান) .............................................................



আসাদুজ্জামান বেঁচে থাকলে এই বাংলা আরেকজন বিপ্লবী পেতো। সর্বহারার মুক্তির স্বপ্ন দেখা একজন বিপ্লবী। ১৯৬৮ সালে লেখা শহীদ আসাদের যে ডায়েরীটা পাওয়া যায়, তাতে তেমন ইঙ্গিতই ছিলো। এ বিষয়ে একটি পাঠচক্রের নিয়মিত সদস্য ছিলেন আসাদ। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা ও মেহনতী মানুষের সত্যিকার মুক্তির লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটির অন্যতম উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন তিনি। এইটুকু ইঙ্গিত লেখনীতে মিলে, কর্মে মেলে আরো বেশী। পাকিস্তানে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি কর্মী ও সদস্যদের নিরাপদ সাইনবোর্ড তখন মাওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মহসীন হল শাখার নেতা আসাদ কিষাণ মুক্তি আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন আরো আগে থেকেই। নরসিংদীর শিবপুর, হাতিরদিয়া, মনোহরদী অঞ্চলের নিপীড়িত কৃষকদের জাগরণে সফল সংগঠক ছিলেন ইতিহাস বিভাগের এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র আসাদ। যদিও ভিন্ন উপাত্তে তাকে এলএলবির ছাত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তার এই রাজনৈতিক পরিচয়টা উপেক্ষিত থেকে যায়। ইতিহাস বইয়ে আসাদ একজন ছাত্র, একজন শহীদ রয়ে যান। স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকলে হয়তো ক্রসফায়ারই হতো তার নিয়তি। একই মৃত্যু আরো রাজকীয় ভঙ্গীতেই বরণ করেছিলেন আসাদ ২০ জানুয়ারির সেদিনটায়।

৪ জানুয়ারি ১১ দফা দাবী ঘোষণা করেছিলো সম্মিলিত ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ (লিফলেটে উল্লেখ সংগ্রামী ছাত্র সমাজ)। ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমদ ও জিএস নাজিম কামরান চৌধুরীসহ এই সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আবদুর রউফ ও খালেদ মোহাম্মদ আলী, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন ও মতিয়া গ্রুপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ, সামসুদ্দোহা, মোস্তফা জামাল হায়দার ও দীপা দত্ত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ জানুয়ারী বটতলায় এক মিটিং শেষে ২০ জানুয়ারী সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় হরতাল ডাকেন তারা। গভর্নর মোনেম খানের প্রাদেশিক সরকার জবাবে ১৪৪ ধারা জারী করে যাতে চারজনের বেশী একত্রিত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়।

কোন আমলে ছাত্রদের ১৪৪ ধারায় বশ করা গেছে! সেদিনও যায়নি। সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হতে শুরু করেন ছাত্ররা। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকেও এসেছেন তারা। একটি সংক্ষিপ্ত ছাত্রসভা শেষে বেলা বারোটার দিকে জরুরী আইন ভাঙ্গেন ছাত্ররা। ১০ হাজার ছাত্র গগন বিদারী শ্লোগানে ধেয়ে যান ব্যারিকেডের দিকে। গোটা বিশ্ববিদ্যালয় তখন সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ইপিআরের ঘেরাওয়ে। শুরু হয় সংঘাত আর তা ঘণ্টাব্যাপী চলতে থাকে। টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের মধ্যেই ছাত্ররা কখনও পিছু হটছিলেন, কখনও এগোচ্ছিলেন। ঘণ্টাখানেক পর পুরানো কলাভবন এলাকা ছাড়িয়ে চাঁন খাঁর পুলের সামনে একটি ছত্রভঙ্গ মিছিল ফের প্রাণের ছোঁয়া পেলো। বজ্রদীপ্ত শ্লোগান দিয়ে এর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আসাদ। উদ্দেশ্য এই পকেটটি দিয়ে মিছিল রাজপথে নিয়ে যাওয়া। বেলা দুটোর দিকে একটি পুলিশ জিপ মিছিলের সামনে এসে পড়ে। একজন ইন্সপেক্টর (নাম জানা যায়নি) খুব কাছ থেকে (পত্রিকায় আন্দাজ ১০ ফুটের কথা বলা হয়েছে) গুলি করেন আসাদকে। বুকে বুলেট নিয়ে লুটিয়ে পড়েন তিনি। গুলি হয় পরপর, আহত হন আরো কয়েকজন। ক্ষিপ্ত ছাত্ররাও পিছিয়ে থাকে না। তাদের ছোড়া ইটে মাথা ফেটে যায় ইন্সপেক্টরের। পুলিশ জিপটি দ্রুত সরে যায়। চমকপ্রদ একটি ঘটনা না বলে পারছি না। পরদিন মহসীন হল থেকে এক শোকসভা শেষে ছাত্রদের মিছিল বের হয় আর তাতে সমর্থন জানায় মোনেম খান সমর্থিত এনএসএফ (ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফ্রন্ট) নেতারা। তবে হল সংসদের সভাপতি মেশাররফ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল ঘটনার জন্য দায়ী করেন ইপিআর বাহিনীকে। তারা ঘটনার প্রেক্ষিতে ডাকা সংগ্রামী ছাত্র সমাজের হরতালে পূর্ণ সমর্থনও জানায়।



এদিকে আসাদকে নিয়ে ছাত্ররা ছোটেন মেডিকেলের দিকে। এর মধ্যে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রটে গেছে গুলিবর্ষনের খবর। জরুরী বিভাগে পৌঁছানোর আগেই মারা যান আসাদ। এরপর শুরু হয় আসাদের লাশ নিয়ে এক নোংরা খেলা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্তের ঘোষণা দিলে ছাত্ররা তাতে সায় দেয়। একইসঙ্গে ঘিরে রাখে ময়নাতদন্ত কক্ষসহ গোটা মেডিকেল ক্যাম্পাস (তখন ছিলো পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল কলেজ)। সন্ধ্যায় লাশ নিয়ে মিছিলের উদ্যোগ নেয় ছাত্ররা। একইসময় মেডিকেলে আর্মড পুলিশ ও ইপিআর ঢুকে পড়ে। তাদের নেতৃত্বে ঢাকার ডিসি ও পুলিশের আইজি। আসাদের লাশ ট্রাক থেকে নামিয়ে মেডিকেলের একটি ওয়ার্ডে লুকিয়ে ফেলেন ছাত্ররা। অন্যদিকে পুলিশ গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে লাশের খোঁজে। আইজির বক্তব্য আসাদের ভাই ছাত্রদের কাছ থেকে তার ভাইয়ের লাশ উদ্ধারের জন্য পুলিশের সাহায্য চেয়েছেন।

ঘটনাটা ঘটে যখন মঞ্চে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আগমন ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স কমিটির (ডাক) নেতাদের। নুরুল আমিনের আহ্বানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ডাক সদস্যরা গণতন্ত্র পুনরূদ্ধারের জন্য আন্দোলনে নেমেছিলেন (যাদের অনেকেই পরে ইয়াহিয়ার দোসর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন) এবং আওয়ামী লীগও এদের সঙ্গী ছিলো। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ডাক নেতারা আসাদের লাশ দাবী করলে, তারা একটি মুচলেকা দাবী করেন। কর্তৃপক্ষ লাশের নিরাপত্তার দাবি করে নিশ্চয়তা চান যে লাশ আসাদের আত্মীয়দের হাতে সমর্পণ করা হবে। এই সময় ছাত্ররা সাফ জানিয়ে দেন ডাক নেতাদের তারা বিশ্বাস করেন না। আসাদের ভাই এসময় পুলিশকে ফোন করেন বলে জানা যায়।



লাশ আসাদের ভাই নিয়ে যান। ছাত্ররা তার আগে শার্ট নিয়েই বের করে মিছিল। এই মিছিল ঠেকানোর সাহস আর জান্তার হয়নি। কারণ এতে সামিল এবার জঙ্গী জনতাও। আইউবের নাম মুছে যায় মুহূর্তেই। আইউব গেট, আইউব এভিনিউর নাম বদলে হয়ে যায় আসাদ গেট, আসাদ এভিনিউ। পরদিন থেকে আবারও শুরু হয়ে যায় উত্তাল আন্দোলন, যাতে তাপ জোগায় আসাদের রক্তমাখা শার্ট।

শেষ কথা : আমি জানি না, আসাদের হত্যাকাণ্ডটি কতখানি পরিকল্পিত। জানি না এর নেপথ্যের ষড়যন্ত্রটুকু। তবে যতদিন না জানছি, তার আগ পর্যন্ত তার শার্টেই দেখে যাবো স্বাধীন বাংলার পতাকা।

ছবি: আসাদের শার্ট নিয়ে ছাত্রদের মিছিল, নিউইয়ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত খবর (নিউজ ক্লিপ দুটোয় আসাদের দুটো ছবি আলাদা সংযোজিত)






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29082584 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29082584 2010-01-20 22:43:27
ছবিপোস্ট : কোমলমতি কিশোরদের কিভাবে সন্ত্রাসী বানায় শিবির

মূল লেখাটি পড়ুন এখান থেকে

শিবিরের সত্যিকার চেহারা জানতে পড়ুন ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29081343 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29081343 2010-01-18 21:51:30
আসেন আবার পড়ি : ইসলামী ছাত্র শিবির সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি করি এইভাবে কিশোরেরা খাচ্ছে জেহাদী আফিম!!

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামাত-শিবির কেন সন্ত্রাসী সংগঠন

খুনী আল-বদরের উত্তরসূরী ছাত্র শিবির : উত্থানের ভয়াবহ দলিলপত্র

নৃশংসতা ছাত্রসংঘ বনাম ছাত্র শিবির

রাজাকার প্রজন্মের প্রতি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের আহবান- এসো সত্য ও ন্যায়ের পথে ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29081246 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29081246 2010-01-18 19:42:12
ক্ষুদিরামের দল ও ইংরেজ বধ কাব্য এটা সেই সময়ের কথন, যখন বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তান বলে আলাদা কিছু ছিলো না। অখন্ড ভারতই ছিলো মানচিত্রে, তবে ইংরেজ শাসিত। হিন্দু-মুসলমান, এই বাংলা ওই বাংলা মিলেই ছিলো বাঙালী। আর এই জাতিগত পরিচয়ে তারা সগর্বে উদ্বেলিত হয়েছিলো ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই। এদিন ফুটবল মাঠে বুট পায়ের সাহেবদের লজ্জায় ডুবিয়ে ইন্ডিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন চ্যালেঞ্জ শিল্ড (সংক্ষেপে আইএফএ) জিতে নিয়েছিলো খালি পায়ের বাঙালীদের দল মোহন বাগান। এটি সেই ম্যাচ ও তার পূর্বাপরের গল্প।

সেই রোদেলা বিকেলে গোটা কলকাতার নজর ছিলো আকাশপানে। নির্দিষ্ট করে বললে ঘুড়ির দিকে। ময়দানের তরফে কি রঙা ঘুড়ি ওড়ে! হঠাৎ গগনবিদারী এক গর্জনে যারা চোখ তুললো, তাদের মুখে মেঘ ঘনালো। আকাশে কালো ঘুড়ি। গোল খেয়েছে মোহন বাগান! ঝপ করে গোটা শহরে যেন শোকের আঁধার নামলো। সেই অনুভূতি আজ এতদিন পর ধারণ করা মুশকিল, বর্ণনাও। রেডিওতে রিলে নেই, টিভি নেই, এসএমএস নেই- সম্বল ওই ঘুড়ি। ওই ঘুড়িতেই যেনো মিশে তাবৎ বাঙালীর গৌরব, মান-সম্মাণ, ইজ্জত। আর তা রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে মোহন বাগানের নাঙা পায়ের এগারো যুবক।

ফেরা যাক আরেকটু পেছনে। না হলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে না। মোহন বাগান ফুটবল খেলছে অনেকদিন। লালমুখো সাহেবদের হারিয়েছেও। কিছুদিন আগে ঘরে তুলেছে তারা ট্রেডার্স কাপসহ ঘরোয়া কিছু টুর্নামেন্টের শিরোপা। কিন্তু সেসব প্রতিযোগে প্রতিপক্ষ ইংরেজদের শক্তিমত্তা তুলনায় নগন্যই ছিলো। আইএফএ শীল্ড হচ্ছে কুলীন টুর্নামেন্ট। মর্যাদার বিচারে এখানে অংশ নেওয়া ক্লাবগুলোর ধরণই আলাদা। প্রস্তুতি এবং আনুষঙ্গিক সবকিছুই। কিন্তু ইংরেজদের পারষ্পরিক এই মানের লড়াইয়ে আচমকা নেটিভদের মোহন বাগান যে ভাগ বসাবে এটা হয়তো খোদ গডও আগে থেকে অঙ্ক কষে রাখেননি।



সেই জুলাইয়ের শুরু থেকেই কলকাতাদের বাবুদের ঠোটের কোণ দু’কান ছুঁচ্ছিলো। ট্রামে-বাসে একটু সশব্দে আর অফিসে শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের আড়ালে, ইশারায় মুচকি মুচকি। তুমুল আলাপ পাড়ার রকে, বই পাড়ায়, কলেজে, স্কুলে। গঙ্গার ধার পেরিয়ে সে আনন্দের রেশ ছুঁয়ে গিয়েছিলো এই বাংলাকেও। এসব খবর বাতাসের আগেও যে ছোটে! ঢাকা-ময়মনসিং-চট্টগ্রাম-পাটনা-আসাম। ‘ওরে গোরাদের খবর করে দিচ্ছেরে বাঙালী!’ শিবদাস ভাদুড়ি যেন পাড়ারই শিবু, ঘরের ছেলে, আদরের ছোটো ভাই, দুষ্টু দেবর, দস্যি দাদা। অগম্য অন্দরেও পুজো চড়ে তার। ‘আরে অভিলাষ ঘোষরে চিনো না! ময়মনসিংয়ের পোলা তো! স্কটিশ চার্চে পড়তাছে। সাহেব গো যম।’ তবে এসব কথা ইংরেজদের সামনে উচ্চারণে ঝামেলা আছে। সেমিফাইনাল শেষে ট্রেনযাত্রী এক বোকা বাঙালী পাশের ইংরেজকে খেলার ফল জিজ্ঞেস করে চড় খেয়েছিলো। তবে যে খেয়েছে তার চেয়ে যে মেরেছে তার অপমানটাই বেশী বোঝা যাচ্ছিলো।

১০ জুলাই নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামলো মোহন বাগান। প্রতিপক্ষ সেন্ট জেভিয়ার্স ফেলনা টিম নয়। কিন্তু হেসে খেলে তাদের হারালো ৩-০ গোলে। দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি হলো রেঞ্জার্সের। এখানে বলে রাখা ভালো, দলে একমাত্র বুট পড়া খেলোয়াড় ছিলেন লেফট ব্যাক সুধীর কুমার চ্যাটার্জী। পদবীতে চ্যাটার্জী থাকলেও তিনি খৃষ্টধর্মে কনভার্টেড ছিলেন। খালি পায়ে খেলার সবচেয়ে বড় অসুবিধা টের পাওয়া যায় বৃষ্টিভেজা ম্যাচে, কাদা মাখা মাঠে। রেঞ্জার্স এই সুবিধাটাই পেলো ১৪ জুলাইয়ের সে খেলায়।তবুও বিরতির আগেই অধিনায়ক শিবদাসের দু গোলে লিড মোহন বাগানের। ওহ, টুর্নামেন্টের ম্যাচের দৈর্ঘ্য সম্পর্কে আগে বলাই হয়নি। ৫০ মিনিটের ম্যাচের মাঝে ৫ মিনিট ছিলো লেবু-পানি খাওয়ার ছুটি। বিরতির পর তুমুল বৃষ্টিতে সমস্যায় পড়লো মোহন বাগান। সিদ্ধান্ত নিলো ডিফেন্সিভ খেলার। আর তা আত্মঘাতি হতে যাচ্ছিলো আরেকটু হলেই। ইংরেজ রেফারি পক্ষপাতিত্বের নিদারুণ এক উদাহরণ রেখে টানা তিনটি পেনাল্টি দিলেন রেঞ্জারদের। দক্ষতার উত্তুঙ্গে উঠে অসাধারণ শৈলীতে প্রতিটিই ঠেকালেন গোলকিপার হীরালাল মুখার্জী। শেষ দিকে রেঞ্জার্স এক গোল শোধালো বটে, তাতে ফলাফল বদলালো না। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেলো মোহন বাগান।



১৯ জুলাই রাইফেল ব্রিগেডের বিপক্ষে সে ম্যাচে একেবারে ম্যাড়ম্যাড়ে পারফরম্যান্স মেরুন-সবুজ জার্সিদের।তবুও জয় এনে দিলেন ভাদুড়ি ভাইদের ছোটজন- বিজয়দাস। গোলটির উৎস ছিলেন শিবদাস। মোহন বাগানের সত্যিকারের পরীক্ষা নিলো দমদমের ফার্স্ট মিডলসেক্স রেজিমেন্ট। ২৪ জুলাইয়ের সেমিফাইনালে ডালহৌসি মাঠ লোকারণ্য। শুধু কলকাতা নয়, বাঙালী ছুটে এসেছে সকল প্রান্ত থেকে। পরদিন ‘দ্য ইংলিশম্যান’ পত্রিকা লিখলো “ Calcutta has never seen such a crowd at a football match. The crowd was of such proportions that all existing arrangement were swept away and from as far behind as was possible, right up to the very touch lines, the spectators swarmed and actually fought for places.” মিডলসেক্স কিপার পিগটের নৈপূণ্যে ভাস্বর সে ম্যাচে প্রথমেই পিছিয়ে পড়লো মোহন বাগান। বিরতির পরপরই শিবদাসের গোলে সমতা। সেটা আর হেরফের হতে দিলেন না পিগট।


২৬ জুলাই ফিরতি ম্যাচ। দর্শক আগেরবারের মতোই। আর তাদের তোড়ে বারপোস্ট ভেঙ্গে খেলাই বন্ধ থাকলো কিছুক্ষণ। এদিন শুরুতেই পিগটকে বসিয়ে দিলেন অভিলাষ। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে ‘দ্য ব্ল্যাক জায়েন্ট’ নামে ত্রাস সঞ্চার করা এই ফরোয়ার্ডের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়ে মাঠ ছাড়লেন পিগট। সুবিধাটা পুরোপুরি নিলো মোহন বাগান। শিবদাসের পাসে হাবুল সরকার গোলের খাতা খুললেন। অধিনায়কের পা থেকে এলো দ্বিতীয় গোল। দারুণ এক ফ্রি কিকে মিডলসেক্সের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন কানু রায়। গোটা ভারতকে নাড়া দিয়ে মোহন বাগান ফাইনালে! এর আগ পর্যন্ত তাদের গর্বের সবেধন নীলমনি হয়ে ছিলেন নোয়ানগড়ের মহারাজা রণজিৎসিংজী (রঞ্জি)। ইংল্যান্ডে ক্রিকেট খেলছেন,নেভিল কার্ডাস তার সম্পর্কে লেখেন- "the Midsummer night's dream of cricket" কিন্তু মোহন বাগান ভিন্ন জিনিস। বাংলার একদল দামাল খেলার মাঠে ছিড়েখুড়ে ফেলছে ইংলিশদের!এদের গায়ে রাজরক্ত নেই। এরা যে সাধারণ্যের প্রতিনিধি। অন্য জাতের বিপ্লবী।



২৯ জুলাই ময়দান নামেই খ্যাত ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব গ্রাউন্ড সয়লাব, যেদিক চোখ যায় শুধু মানুষ। ফাইনাল সামনে রেখে বিশেষ ট্রেনসার্ভিস চালু করেছে ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে। রাজনগর ও বরানগর থেকে মানুষ আসছে বাড়তি স্টিমারে। শ্যামবাজার-চিতপুর থেকে ট্রাম বোঝাই হয়ে আসছে তারা। সকাল এগারোটার মধ্যেই পরিপূর্ণ চারধার। টিকেট কালোবাজারীদেরও বুঝি সোনালী একদিন ছিলো এটি। দুই রূপীর টিকেট দেদরসে চললো ১৫ রূপীতে। শুধু কি টিকেট। এক টুকরো আলুর দম বিকোলো এক পয়সায়। সে আমলে অনেক টাকা! দর্শক শুধু বাঙালী নয়, ইংরেজও। তাদের মধ্যে মহিলারাও আছেন। ময়দানের একপাশ ক্লাবের সদস্যদের জন্য বরাদ্দ, অন্যপাশ বুকিং করেছে বিএইচ স্মিথ কোম্পানি। বাকি দুপাশ ফাকা সাধারণের জন্য। আশেপাশের উচু কোনো স্থাপনা বাদ নেই যেখানে লোক নেই। চড়া দামে বিক্রি হ্চ্ছে বিশেষ কাঠের বাক্স- উপরে দাড়িয়ে খেলা দেখা যাবে। দর্শক সংখ্যা আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ। তাদের অনেকেই মাঠের এত কাছাকাছি থেকেও আসলে কিছুই দেখছে না। অগত্যা ঘুড়িই ভরসা।



মোহনবাগানের সেই দুর্জয় এগারোতে ছিলেন : হীরালাল মুখার্জী (কিপার), ভুতি সুকুল (রাইট ব্যাক), সুধীর কুমার চ্যাটার্জী (লেফট ব্যাক), মনমোহন মুখার্জী (রাইট হাফ), রাজেন্দ্রনাথ সেন গুপ্ত (সেন্টার হাফ), নীলমাধব ভট্টাচার্য্য (লেফট হাফ), জ্যোতিন্দ্রনাথ রায় (কানু) (রাইট আউট), শ্রীশচন্দ সরকার (হাবুল) (রাইট ইন), অভিলাষ ঘোষ (সেন্টার ফরোয়ার্ড), বিজয়দাস ভাদুড়ি (লেফট আউট), শিবদাস ভাদুড়ি (লেফ্ট ইন)। প্রতিপক্ষ ইস্ট ইয়র্কশায়ার সম্পর্কেও কিছুটা জানানো দরকার। সেবারের টপ ফেবারিট ক্যালকাটা ক্লাবকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে এসেছিলো তারা। সার্জেন্ট জ্যাকসনের নেতৃত্বে এই ম্যাচে খেলেছেন : মার্টিন, হেয়উড, স্কেলি, চার্চ, ডিকসন, হেওয়ার্ড, ক্রেসি, ক্লুকাস, নীল এবং হুইটবি।



ঠিক সাড়ে পাঁচটায় ম্যাচ শুরুর বাশী বাজালেন রেফারী এইচজি পুলার। আক্রমন-পাল্টা আক্রমনে এগিয়ে চললো খেলা। কিন্তু গোল পেলো ইস্ট ইয়র্কশায়ার। বল ক্লিয়ার করতে লাফিয়ে উঠেছিলেন সেন্টার হাফ রাজেন, গিয়ে পড়লেন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক জ্যাকসনের ঘাড়ে। ফাউল। আর ফ্রি কিক থেকে গোল করলেন জ্যাকসন নিজেই। কলকাতার খবর আগেই লিখেছি। মাঠের এক পাশে হুল্লোরে মেতেছে ইংরেজরা, আর অন্যপাশে একদম শ্মশানের নীরবতা। আকাশে কালো ঘুড়ি, ম্যাচে এক গোলে পিছিয়ে মোহন বাগান। বিরতির পর প্রতিপক্ষ দেয়ালে বারবার আছড়ে পড়লেন হাবুল, কানু আর ভাদুড়ি ভাইয়েরা। কিন্তু গোল আর আসে না। শুধু বাংলা নয়, গোটা ভারত তখন প্রার্থনায়। তিন বছর আগে হাসতে হাসতে ফাঁসিতে চড়া ক্ষুদিরামের দল কি হেরে যাবে!

মিনিট দশেক বাকি থাকতে হাসলেন ভাগ্যদেবী। কানুর বাড়ানো বল ধরে প্রচণ্ড শটে বল জালে জড়ালেন শিবদাস। সমতা এলো, আর পাল্টে গেলো মাঠের দৃশ্যপট। এবার উদ্দাম নাচছে নেটিভরা, অন্যপাশ গুম। আকাশে বিশাল সব লাল-সবুজ ঘুড়ি। নব উদ্যোমে এবার মাঠ মাতালো মোহন বাগান। প্রতিপক্ষকে তটস্থ করে একের পর এক হানা। শেষ বাশীর মিনিট দুয়েক আগে শিবদাসের আরেকটি ডিফেন্স চেরা পাস পায়ে পেলেন অভিলাষ। গোল! এ পর্যন্ত যদি পড়ে থাকেন, পরের দৃশ্য আর বলতে হবে না নিশ্চয়ই। নতুন যোগ যেটুকু- গোটা কলকাতা জুড়ে আতশবাজী ফুটছে। এটি শুধু ভারতীয়ই নয়, কোনো ইউরোপীয় দলকে হারিয়ে কোনো এশিয়ান দলের প্রথম কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট জয়। ম্যাচ শেষে ফিটনে চড়ে গোটা কলকাতা ঘুরলেন ওরা এগারোজন। ছেলেরা পারলে ঘোড়া হটিয়ে নিজেরা গাড়ি টানে। টিপু সুলতান মসজিদের সামনে মোড় ঘুরতেই মিছিলে সামিল মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের ভক্তরা। এই জয় যে পরাধীনতার বিরুদ্ধে গোটা বাঙালীর জয়। পরদিন ‘দ্য মুসলমান’ পত্রিকা লিখলো-"The members of the Moslem Sporting Club were almost mad rolling on the ground on the victory of their Hindu brethren."



এই বিজয়ের খবর যে শুধু ভারতই জানলো তা নয়। খবর ছাপা হলো ইংল্যান্ডের পত্রপত্রিকায়ও। বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের পাঠানো ক্যাবলগ্রামে লেখা হলো : “ For the first time in the history of Indian football, an Indian team, the Mohun Bagan consisting purely of Bengalis, has won the Indian Football Association Shield crack teams of English Regiments.”
“ At the final today there was a scene of extraordinary enthusiasm and it is estimated that 80,000 Bengalees were gathered on the Calcutta maidan. The vast majority saw nothing of the game….They were informed of its progress by flying kites.” “ When it was known that the East Yorkshire Regiment had been beaten the scene beggared description. The Bengalis tearing off their shirts and waving them.” বুঝতেই পারছেন লর্ডসে ইংরেজদের ভব্যতায় আঘাত দিয়ে জামা খুলে পতাকা বানানো বাঙালী সৌরভই প্রথম নন। এ দৃশ্য তারা আগেও দেখেছে কলকাতায়। ৪ আগস্ট ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান লিখলো : “ A team of Bengalees won the Football Association Shield in India after defeating the crack teams of three British Regiments amidst the applause of 80,000 of their countrymen. There is no reason of course of being surprised. Victory of Association Football goes to the side with the greatest physical fitness, the quickest eye, and the keenest wit.”



একমাত্র চৌরঙ্গীর সাহেব পাড়া বাদে সে রাতে ঘুমোয়নি কলকাতা।এরপর সে বিজয় গাথা নিয়ে অনেক কিছুই হয়েছে। নাটক, গান, স্তুতি। সর্বশেষটি ১৯৮৯ সালে ভারত সরকারের প্রকাশিত একটি ডাক টিকেট। জন্ম নিয়েছে অনেক লোকগাথাও। এর মধ্য সবচেয়ে চমকপ্রদটি এরকম : জয়ের পর মোহন বাগানের তাবুতে এক সাধু কিসিমের লোক এলেন। ট্রফি বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামের ওপর উড়তে থাকা ইউনিয়ন জ্যাকের দিকে আঙুল তুললেন। বললেন- ওটা নামবে কবে? কে একজন উত্তর দিলো- মোহন বাগান আবার যেদিন আইএফএ শিল্ড জিতবে।১৯৪৭ সালে তাদের দ্বিতীয় শিরোপাটি জিতেছিলো মোহন বাগান।

ছবি : মোহন বাগানের সেই দুর্জয় একাদশ, ফাইনালের দুইদল, দর্শকদের একাংশ, ট্রফি নিয়ে শিবদাস ও শৈলেন বোস, মোহন বাগানের শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ডাকটিকেট।







]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29080017 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29080017 2010-01-17 02:16:49
দ্য ম্যাচ অব ডেথ : ফুটবল যখন যুদ্ধ

ব্রাজিল নিয়ে যতই গলা ফাটাই না কেন, আমার কাছে এখনও ফুটবলের শেষ কথা ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ওই একজন বাদে আর্জেন্টিনার প্রতি আমার পক্ষপাতের দ্বিতীয় কোনো ওজর নেই। লিওনেল মেসির খেলা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করি বটে, ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে আবার বদলে যায় হিসাব। ফুটবল আমার কাছে বরাবরই প্রিয় বিনোদন। ৯০ মিনিটের ওই উত্তেজনা উইলো ব্যাটের ঠোকাঠুকিতে কখনোই মেলেনি। সেই ছোটবেলা থেকেই শুরু। স্কুলের বাটা কেডসটা মাসও টিকতো না, কদিন পরই ফুটো হয়ে বেরিয়ে যেতো বুড়ো আঙুল। এবং ম্যারাডোনাই প্রথম আর্জেন্টাইন নন যিনি আমাকে ফুটবল শৈলী দিয়ে ইমপ্রেস করেছেন। ’৭৮ বিশ্বকাপ আমার প্রথম। বাবার চাকুরী সুবাদে তখন ইরানে, আর আলী পারভীনের নেতৃত্বে সেবার খেলছে তারাও। লম্বা চুলের মারিও ক্যাম্পোসের আর্জেন্টিনাই ঘরের মাঠে কাপ রাখলো। কিন্তু আমার নজর কাড়লেন ওসভালদো আর্দিলেস। দারুণ এক্রোব্যাটিক ব্যাক ফ্লিপে ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে বল নিয়ে যাওয়ার জাদুকরী দেখে আমি স্তব্ধ। কত যে প্র্যাকটিস করেছি এরপর। কিন্তু পারিনি।



এতো বড় ভূমিকা দিয়ে শুরু এই লেখায় আর্দিলেসের আগমন আসলে অন্য একটি কারণে। ক’দিন আগেই একজন ব্লগারের একটি ম্যুভি রিভিউ পড়েছিলাম। বাংলা একটা সিনেমা এসেছে ‘জাগো’ নামে, যার পুরোটাই ফুটবলকেন্দ্রিক। অনেকটা ‘চাক দে’ ধাঁচের (ট্রেলার দেখে আমার তাই মনে হয়েছে)। সেখানেই সম্ভবত পড়েছিলাম এ ছবি নির্মাণে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে প্রেরণা মেনেছেন পরিচালক। মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুটবল খেলে আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন আদায়ের লড়াইয়ে নামা এই যোদ্ধাদের নিয়ে অনেক আগে লিখেছিলাম একবার । মিত্রদেশ ভারতে শরণার্থী স্বাধীন বাংলা ফুটবল একাদশ শতভাগ সফল হয়েছিলেন তাদের মিশনে। কিন্তু প্রদর্শনী ম্যাচও কিন্তু ম্যাচই। আর তা সত্যি জীবন মরণ যুদ্ধের রূপ নেয় যখন প্রতিপক্ষ থাকে সত্যিকার শত্রুরাই। পেলে, আর্দিলেস, ববিমুরের মতো কিংবদন্তী ফুটবলাররা তারই সেলুলয়েড রূপ দিয়েছিলেন ভিক্টরি (আরেকটি নাম এস্কেপ টু ভিক্টরি) নামের ছবিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানদের বিপক্ষে মিত্রবাহিনীর সদস্যদের একট ফুটবল ম্যাচকে ঘিরে আবর্তিত যার কাহিনী।


জন হিউস্টন পরিচালিত এই ছবিতে আরো আছেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন, মাইকেল কেইন, ম্যাক্স ফন সিডো। গল্পটা সংক্ষেপে এমন যে, নিজেদের ভাবমূর্তি বাড়াতে জার্মান প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় বিভিন্ন বন্দী শিবিরের ফুটবলারদের নিয়ে গড়া একটি দলের সঙ্গে নিজেদের জাতীয় দলের একটি ম্যাচ খেলাবে। ভেন্যু প্যারিস। এদিকে ফরাসি স্বাধীনতা যোদ্ধাদের যোগসাজশে পালানোর পরিকল্পনা আটে দলটি। পক্ষপাতদুষ্ট রেফারিংয়ের সেই ম্যাচের বিরতিতে পালানোর কথা তাদের। ম্যাচে তারা পিছিয়ে ১-২ গোলে। কিন্তু হঠাৎই কয়েকজন সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে জোর দেয় এই বলে যে ম্যাচটা তারা জিতবে। আর্দিলেসের সেই জাদুকরী ব্যাক ফ্লিপ, ইনজুরি থেকে জোর করে ফের খেলতে নামা পেলের দুর্দান্ত এক ব্যাকভলির গোল দিয়ে ম্যাচে ফেরে মাইকেল কেইনের দল। একটি গোল অফসাইডে বাতিল হওয়ায় ম্যাচ ড্র থাকে ৪-৪ গোলে। শেষ মিনিটে রেফারি পেনাল্টি দেয় জার্মানদের। কিপার স্ট্যালোন সেভ করে ফলাফল অক্ষুন্ন রাখেন। এরপরই হয় পিচ ইনভেসন। দর্শকরা মাঠে নেমে পড়ে, আর তাদের আড়ালে পালায় ফুটবলাররা। ইপসউইচ টা্উনের ফুটবলারদের ব্যবহার করে সত্যিকার ফুটবলের আবহ আনা শটগুলোর রূপকার পেলে। স্ট্যালনকে ট্রেনিং দিয়েছেন গর্ডন ব্যাঙ্কস (’৬৬ বিশ্বকাপে পেলের নিশ্চিত এক গোল বাঁচিয়ে হিরো হয়ে গিয়েছিলেন এই ইংলিশ কিপার)।



এই ছবিটির প্রেরণা কিন্তু একটি সত্যি ঘটনা। মৃত্যুর হুমকিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে যার রূপকার ছিলেন একদল রুশ ফুটবলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ ইউক্রেনের কিয়েভে জীবনবাজি রেখে ফুটবল ম্যাচ জিতে ছিলেন তারা। ‘ডেথ ম্যাচ’ নামে খ্যাত এই কিংবদন্তীতে ম্যাচ শেষে সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলে জার্মানরা। যদিও সত্যিটা অন্যরকম। ১৯৪১ সালের ২২ জুন সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করে জার্মানরা। কিয়েভের বেশীরভাগ ফুটবলারই যোগ দেন যুদ্ধে। কিয়েভ পতনের পর অবরুদ্ধ ফুটবলাররা একটি ফুটবল দল গড়েন এফসি স্টার্ট নামে। এতে ডায়নামো কিয়েভের খেলোয়াড় ৮ জন আর বাকিরা তাদের শহুরে প্রতিদ্বন্দ্বী লোকোমটিভ কিয়েভের। ১৯৪২ সালের ৭ জুন স্থানীয় লিগে অপ্রতিরোধ্য এক যাত্রা শুরু হয় স্টার্টের। ৭-২ গোলের জয় দিয়ে অভিষেক হয় কিংবদন্তীর সেই অভিযাত্রার। মূলত বিভিন্ন গ্যারিসনের জার্মান সৈন্যদের বিনোদনের সেই লিগে স্টার্টই ছিলো একমাত্র স্থানীয় দল। আর তারা জিততেই থাকে। ২১ জুন হাঙ্গেরিয়ান গ্যারিসনকে তারা হারায় ৬-২ গোলে। পরের ম্যাচে রুমানিয়ান গ্যারিসনকে দেয় গুনে গুনে ১১ গোল। একে একে ধরাশায়ী হয় মিলিটারি রেলরোড ওয়ার্কার্স টিম (৯-১), পিজিএস (৬-০), এমএসজি ওয়াল (৫-১, ৩-২), ফ্লাকেল্ফ (৫-১)। মূলত শেষ ম্যাচের পরই টনক নড়ে জার্মান হাই কমান্ডের। ঠিকমতো খেতে না পারা, অনুশীলন করতে না পারা একটা দলের কাছে এমন গো-হারা হারাটা শুধু তাদের আভিজাত্যে আঘাতই নয়, একইসঙ্গে সম্ভাব্য জাতীয়তাবাদী উন্মেষের শংকাও। ব্যাপারটা যতি টানার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।




ফ্লাকেল্ফ মূলত জার্মান বিমানবাহিনীর দল। আগের ম্যাচের হারের বদলা নিতে তারা পাল্টা ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ দেয় স্টার্টকে। ৯ আগস্ট জেনিট স্টেডিয়ামে ঠিক হয় ম্যাচ অনুষ্ঠানের। একজন গেস্টাপো অফিসার রেফারি হিসাবে দায়িত্ব নেয়। আর স্টার্ট খেলোয়াড়দের বার্তা পাঠিয়ে দেওয়া হয় এই ম্যাচ না হারলে পরিণামে মৃত্যু অপেক্ষা করবে তাদের। নিয়তি বরণ করেই মাঠে নামে অকুতোভয় ফুটবলাররা। শুরুতেই তারা নাজি স্টাইলে স্যালুট দিতে অস্বীকৃতি জানায় ম্যাচে দর্শক হয়ে আসা সেনা কমান্ডারদের। যথারীতি বাজে রেফারিং এবং তুমুল ফাউলের মধ্য দিয়ে শুরু করে ফাকেল্ফ। এগিয়েও যায়। ইভান কুজমেঙ্কোর দারুণ এক ফ্রি কিকে গোল শোধায় স্টার্ট। এরপর ম্যারাডোনা স্টাইলে প্রতিপক্ষের প্রায় সব খেলোয়াড়কে কাটিয়ে দলকে এগিয়ে নেন গঞ্চারেঙ্কো। বিরতিতে ২-১, এরপর দুদলই দুটো করে গোল করে। একদম শেষ মিনিটে ওলক্সি ক্লিমেঙ্কো ঠিক গঞ্চারেঙ্কোর স্টাইলে বল নিয়ে ড্রিবল শুরু করেন। গোলকিপারকেও কাটিয়ে বল জালে পাঠানোর বদলে, ঘুরে দাড়িয়ে ফের মাঠে ফিরিয়ে দেন। জার্মানদের অপমানের ষোলকলায় জ্বালিয়ে স্টার্ট ম্যাচ জেতে ৪-৩ গোলে।



এক সপ্তাহ পর রুখের বিপক্ষে ৮-০ গোলে জেতে স্টার্ট। নরক ভেঙ্গে পড়ে তারপর। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের গ্রেফতার করে গেস্টাপো। অভিযোগ স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগসাজশ। অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান মিকোলা করোতকিখ। বাকিদের পাঠানো হয় সিরেতস বন্দি শিবিরে। সেখানে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় ডেথ ম্যাচের দুই গোলদাতা কুজমেঙ্কো ও ক্লিমেঙ্কো এবং গোলকিপার মিকোলা ট্রুসেভিচকে। পরের বছর ১৬ নভেম্বর স্থানীয় এক পত্রিকায় ফুটবলারদের হত্যাকান্ডের খবর ছাপায়। পুরো ঘটনা প্রকাশ্যে আসে অনেক অনেক পরে। ১৯৫৮ সালে জীবিত খেলোয়াড়দের একজন পেত্রো সেভেরভ ইভনিং কিয়েভ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন লেখেন- ‘দ্য লাস্ট ডুয়েল’। পরের বছর একই নামে একটি বই বেরোয় তার নামে। পরে ঘটনাটি নিয়ে দুটো ছবি তৈরি হয়, 'থার্ড টাইম' এবং 'দ্য ম্যাচ অব ডেথ'। 'এস্কেপ টু ভিক্টরি' এই কাহিনীর প্রেরণায় চতুর্থ ছবি। অন্যটি হাঙ্গেরিতে নির্মিত। ১৯৮১ সালে এই বীর যোদ্ধাদের সম্মানে জেনিথের নাম বদলে রাখা হয় স্টার্ট স্টেডিয়াম।



শেষ কথা : ঠিক কাছাকাছি একটা ঘটনা আমাদের এই উপমহাদেশেও ঘটেছিলো, অবিভক্ত ভারতে। বুট পড়া ইংরেজ ফুটবল দলগুলোর বিপক্ষে খালি পায়ে খেলে আইএফএ শিল্ড জিতে নিয়েছিলো বাঙালীদের নিয়ে গড়া মোহনবাগান। সে গল্প না হয় আরেকদিন হবে।


ছবি: জাগো'র স্ক্রিনশটের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা ফুটবল একাদশের দুটো ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

ভিডিও : ভিক্টরি ছবির ট্রেলার এবং শেষ ম্যাচটির দৃশ্য
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29079265 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29079265 2010-01-16 00:17:05
সম্পর্ক

(ন জাতু কামঃ কামানামুপভোগেন শাম্যতি
হবিষা কৃষ্ণবর্ত্মেব ভূয় এবাভিবর্ধতে।।)



তোমার মন খারাপ- জানতেই
আমার সপ্তাহ পার হয়ে যায়
শেভ করিনি, কিংবা উড়ুক্কু চক্রাবক্রায়- দেখতে
তুমিও তাকাও ভিন্ন চোখের শার্সিতে
আমাদের কুশলাদী থেকে সবকিছু
এইভাবে পরজীবি
বাহকের মর্জিতে ওঠে নামে খবরের দাম

অথচ প্রবল নৈকট্যের তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ
তুমি আমি বিলক্ষণ বুঝি তা
তবুও রাধা মলাট বন্দী থাকে
মোহন বাঁশীতে আকুল কুঞ্জবনে ধায়

গতিহীন জলাশয়ে শ্যাওলা-পানা
সমুদয় চাওয়া পাওয়া ঢোকে গিলে
আমরা প্রান্তিক থেকে যাই
প্রাকৃত নই, প্রকৃত হই না।। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29069130 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29069130 2009-12-31 17:50:07
আসেন হাদীস পড়ি শেষ জমানায় কিছু প্রতারক সৃষ্টি হবে। তারা ধর্মের নামে দুনিয়া শিকার করবে। তারা মানুষের নিকট নিজেদের সাধুতা প্রকাশ ও মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য ভেড়ার চামড়ার পোষাক পড়বে (মানুষের কল্যাণকারী সাজবে)। তাদের রসনা হবে চিনির চেয়ে মিষ্টি। কিন্তু তাদের হৃদয় হবে নেকড়ের হৃদয়ের মতো হিংস্র। (তিরমিজী)

বলেনতো আলোচ্য হাদীসে কাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হইছে?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29068339 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29068339 2009-12-30 16:17:16
নিশ্চয়ই জনাব আল মাহমুদ শেখ মোহাম্মদ আলী আমানের চেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা...

...এই কারণে শেখ মোহাম্মদ আলী আমানের জোটে লাথি, আর আল মাহমুদের ৫০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট। থুঃ আল মাহমুদ থুঃ, থুঃ দিলাম তোর মতো মুক্তিযোদ্ধার মুখে, থুঃ,

ধিক যারা এই নিমকহারামকে কবি বলে রেয়াত দিতে চায়, কবিতার কসম দিয়া বলি, নিশ্চিত জানি- কবিরা বেঈমান না, অতীতে থাকে না, ভবিষ্যতেও না; কবিরা পাষন্ড না, কবিরা রক্ত মাড়িয়ে খুনীর হাত ধরে কুর্নিশ করে না...


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29068043 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29068043 2009-12-30 00:55:43
আন্তর্জালে জামাত-শিবির : স্বাধীনতাবিরোধী প্রচার ও প্রতিরোধের চার বছর
খুব সহজ একটা পরীক্ষা দিয়ে ব্যাপারটা যাচাই করে নিতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি পোস্ট লিখুন। কিংবা সেটাও ঝামেলার মনে হলে মুক্তিযুদ্ধের কোনো একটি পোস্টে ঢু মারুন। পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় অবধারিত মন্তব্য দেখবেন শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা কিংবা ছাত্রলীগের সমালোচনায়, নিদেনপক্ষে ভারতের। লেখককে নিশ্চিতভাবেই পোস্টের সঙ্গে নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক অনেক বাকোয়াজি সইতে হবে। সেখানে পাল্টা কিছু বলার পর আপনি আওয়ামী লীগ সদস্য হিসেবে চিহ্নিত হবেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা দলটির মতো আপনারও পৈত্রিক সম্পত্তি বলে মশকরা চলবে। খুব খেয়াল করে দেখলে বুঝতে পারবেন এসব মন্তব্যের গোপন বার্তাটা- মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপারটা একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ মাত্র। এর সঙ্গে জড়িতরা কেউই সৎ নন। ভারতের সমর্থনে পাকিস্তান ভাঙ্গার সফল চক্রান্তটি সেরে, বাকশালের ব্যানার টানিয়ে দেশটা লুটেপুটে খেয়েছে তারা। বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবেই তারা এসব বলে যা অন্য পাঠকদের মননে সূক্ষভাবে বিভ্রান্তি ঢোকানোর অপপ্রয়াসমাত্র। এই স্লো পয়জনিংটা পরিকল্পিত এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্যরা করে আসছে। দলটির নাম জামাতে ইসলামী। এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরাই মূলত বেশী একটিভ। তা স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির চরিত্রহানী করে তাদের কি লাভ? স্রেফ নিজেদের স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি হিসেবে চিন্হিত হয়ে যাওয়ার প্রতিষেধ হিসেবে, কবচ হিসেবে ব্যবহার। ওই খারাপ লোকগুলো স্রেফ রাজনৈতিক বিরোধীতার জন্য তাদের নুরানী চেহারার মুমিন নেতাদের মিছেমিছি রাজাকার বলে গালি দেয়- এই তত্বটা জায়েজ করা।

খ.

বছর চারেক আগে পরিস্থিতি এর চেয়েও খারাপ ছিলো। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি কারণ এই নোংরামীর এই জঘন্য কীর্তিকলাপের স্বাক্ষীদের অন্যতম আমি। বাংলা কম্যুনিটি ব্লগের যাত্রাশুরুর সঙ্গে সঙ্গেই যেমন ইচ্ছে যা খুশী বলার মঞ্চটা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে নামে জামাতিরা। কাব্য চর্চার জন্য বেছে নিয়েছিলাম ব্লগকে, প্রথম পোস্টের পরই ঘাট মানতে হলো। মুক্তিযোদ্ধারা খারাপ, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত কেনো রবীন্দ্রনাথ লিখবে, বদলানো দরকার, একুশে ফেব্রুয়ারী-ষোলই ডিসেম্বর শহীদ মিনার আর স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া বেদাতি কাজ- হিন্দুয়ানি। মাথাটা স্রেফ খারাপ হয়ে গেলো। কবিতা শিকেয় রেখে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক পোস্ট নামাতে শুরু করলাম। কিন্তু সবকিছুর জন্যই এদের হাস্যকর জবাব তৈরি থাকে। মতিউর রহমান রেন্টু, মেজর ডালিম, মেজর জলিলের বই থেকে উদ্ধৃতি। মওদুদীর পর এসবই যেনো সহীহ মুক্তিযুদ্ধনামা। মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলো স্বাধীনতা না, তাই আত্মসমর্পণ করেছে; স্বাধীনতার আসল স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা ভাসানী, তাকে ভারতে বন্দী করে রেখেছিলো আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী নেতাদের ফুর্তির ফুটেজ দিয়ে জহির রায়হান স্টপ জেনোসাইড বানিয়েছিলেন, তাই তাকে মেরে ফেলে র, হুমায়ুন আহমদের উপন্যাসের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ মুজিব ৭ মার্চ জিয়ে পাকিস্তান বলেছেন- এলাহী সব আবিষ্কার। পাকিস্তানীরা কেনো ওসমানীর কাছে সারেন্ডার করলো না- প্রশ্নের শেষ নেই। শুধু মুক্তিযুদ্ধ? এরপর স্বাধীন দেশে শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন, ডালিমের বউকে রেপ করেছেন, সুলতানা কামালকে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছেন, দেশে দুর্ভিক্ষ আর মুজিবের ছেলেরা সোনার মুকুট পরে বিয়ে করে, সিরাজ শিকদারকে মারার পর সংসদে দাড়িয়ে মুজিব দম্ভোক্তি করে- কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

গ.

প্রত্যেকটি অপপ্রচারের জবাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটির। তাতে কি ভবি ভোলে! আরে ফিরোজ কামাল যে ইতিহাস লিখে গেছেন তার কাছে অমি রহমান পিয়ালের পোস্ট তো নস্যি। রেন্টু জানেন আওয়ামী লীগের হেসেলের খবর, সেটা আমরা কিভাবে জানবো! কিন্তু জামাতিরা থামে না। তবে গতি কমে, থমকায়। প্রতিরোধে যোদ্ধা বাড়ে। জন্ম নেয় এ-টিমের মতো কালজয়ী যোদ্ধাদল। ব্লগে ব্লগে নীতিমালা আসে, স্বাধীনতা বিরোধী পোস্ট করা যাবে না। সরাসরি হাবিজাবি লেখা তাই বন্ধ। তবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসে। অন্যভাবে, সূক্ষ কৌশলে। এবং ইতিহাস হাতড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করি- এই সব ইংরেজিতে আরো আগে থেকেই চালাচ্ছিলো তারা। ইসা খা, তাজ হাশমী এবং মুফাখ্খারুল ইসলাম ইত্যাদি পোষা বুদ্ধিজীবিদের ব্যবহার করে। ফিরোজ কামালরা অনুবাদক মাত্র। আর সেগুলোই চলে কপি পেস্ট। দায়িত্ব নিয়েই বললাম কপি পেস্ট। না হলেও ১০টি পোস্ট দেখেছি আমি শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে। ১৯৭৬ সালের টাইপোটা আর সংশোধন হয় না। সেইসব লেখনীরও প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু প্রচারে আসেনি। বাংলায় হিসেবেটা পুরোপুরি উল্টো, উল্টে গেছে পাশার দান। জামাতি প্রচারণা হালে পানি পায় না তুমুল প্রতিরোধে। শুরুতে ধীর গতিতে হলেও এখন সরাসরি-উদ্দাম-গদাম। প্রমাণ তারা হাড়ে হাড়ে পেয়েছে গত নির্বাচনে। তারুণ্য তাদের বিচার দাবি করেছে ব্যালটে। এই মনোভাবে আন্তর্জলে জামাতি নেতাদের মুখোশ খোলা কার্যক্রমের অবদান মোটেও কম নয়, হেলাফেলার নয়।

ঘ.

এর প্রেক্ষিতটা যাচাই করতে গিয়ে উপলব্ধি করলাম আসলে প্রোপোগান্ডাটুকু একদম শুরু থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে জামাতে ইসলামী ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো। শুরুতে নিজেদের পিঠ বাচাতে, সেনা শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় পায়ের নীচে জমিন পেতে ও তা শক্ত করতে এবং এরপর ক্ষমতায় যাওয়ার মোক্ষ নিয়ে। জবান বদলায়নি- এতই শক্ত ঈমান এসব বেঈমানের। এখন সেই একই সর্বরোগহরা মহৌষধীর প্রয়োগ যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকাতে। আওয়ামী লীগ জামাতকে নির্মূল করতেই নাকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওয়াজ তুলেছে- এটা একটা রাজনৈতিক চাল মাত্র। সব দলেই যুদ্ধাপরাধী আছে, শেখ হাসিনার বেয়াইও রাজাকার- বোলের শেষ নেই। কমনসেন্স বলে স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী দল মুক্তিযুদ্ধে মাত্র চারটি। মুসলিম লিগ, জামাতে ইসলামী, নেজামী ইসলামী ও পিডিপি। এর মধ্যে বাকিগুলোর অস্তিত্বমাত্র নাই জামাত ছাড়া। অন্যগুলো বিলীন এখানে ওখানে, শুধু মাত্র জামাত মুক্তিযুদ্ধ সময়কার বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী আলবদর হাইকমান্ডের পুরোটার নেতৃত্বে এবং বিশ্বাসঘাতক শিরোমনি গোলাম আযমের পিরানীতে এককভাবে সক্রিয়। তো এদের লাইন ধরে বিচার করা হলে যদি জামাতের বারোটা বাজে, সেটার দায় কার? তাদের প্রতিটি মিথ্যার স্বরূপ উম্মোচিত হচ্ছে, মানুষ জানছে সত্যিটা। বিভ্রান্তি কেটে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মে। এজন্য অন্তর থেকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন সেইসব লড়াকু যোদ্ধাদের- যারা ভার্চুয়াল জগতে জামাত ঠেকানোকেই ধর্ম মেনেছেন। সমুন্নত রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা, লাল- সবুজের মান।


ঙ.

ব্লগার দেশীপোলার কাছে ঋণী ছিলাম। খুব ছোট্ট কিন্তু বাস্তবসম্মত একটা জিজ্ঞাসা ছিলো তার। ইন্টারনেটে জামাতি প্রচারণা ও পরিকল্পনার বিষদ তুলে ধরে জানতে চেয়েছিলেন, চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্তর প্রজন্ম যারা এই রাজনীতিতে আছে তাদের সংশোধনের উপায় কি? শেকড় শক্ত করতে জামাতের দীর্ঘ যে বিনিয়োগ নানা খাতে সেগুলোরই বা গ্রহণযোগ্য মোকাবেলা কি? তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়া হয়নি, ভেবে পরে বলবো বলে চলে এসেছিলাম। আজ এই পোস্টটা লিখতে গিয়ে তার কথা স্মরণে এলো। উত্তরটাও। শাদ্দাদের বেহেশত নিয়ে একটি গল্প আছে ইসলামী গ্রন্থে যা অনেকটা এরকম : ধনের বলে ক্ষমতাবান এই বাদশাহ বিশাল এক সূরম্য প্রাসাদ বানিয়ে তাতে ভোগ বিলাসের সব হালনাগাদ উপকরণ জুগিয়ে তা বেহেশত বলে দাবি করেছিলো। সুবাদেই নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি তার। ক্ষমতাবানদের অনুসারী জোটে, কিছু বিভ্রান্তও অনুগামী হয়। এক সময় ঐশীবলে ভেঙ্গে যায় সে প্রাসাদ, অনুসারীরাও বুঝে যায় এ আদতে এক ইউটোপিয়া ছিলো মাত্র। মোহ ভাঙ্গে তাদের। একইভাবে ধর্মের গন্ধম খাইয়ে জামাত যে বিশাল কর্মী সমর্থক গোষ্ঠীর অনুগামীতা পেয়েছে, তা একটা বড় ধাক্কা খাবে যদি এর মূল নেতৃত্ব এই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী প্রকারান্তরে যুদ্ধাপরাধী বলে প্রমাণিত হয়। শাস্তি পায়। ইতিহাসের এই ফাকা জায়গাটা চটজলদি পূরণ হয়ে গেলে আগামী প্রজন্মে এর সদস্যভুক্তি প্রজননভিত্তিকই হবে, অন্যভাবে নয়। আন্তর্জালে প্রতিরোধের সাফল্য তাই এবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অনুদিত হোক।

(লেখাটি আমার ব্লগেও প্রকাশিত)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29066083 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29066083 2009-12-26 21:23:15
মেজর জলিলের গ্রেপ্তার : দ্য আদার ভার্সান মেজর জলিলের গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল সেই গ্রেপ্তারে তার সঙ্গী এবং ৯ নম্বর সেক্টরের স্টাফ অফিসার ওবায়দুর রহমান মোস্তফার বক্তব্যকে। কাহিনীর এবার আরেকটি সংস্করণ জানা যাক। বক্তা নজরুল ইসলাম। কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের সদর দপ্তরে উনি যুদ্ধকালে জন সংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। ওসমানীর সঙ্গে ওঠা বসা, যুদ্ধের পরও তার অধীনে চাকরি করেছেন। ১৬ ডিসেম্বর ওসমানীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতির সবচেয়ে তথ্যসমৃদ্ধ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাটা তিনিই দিয়েছিলেন।

নজরুলের বয়ান মানলে আগের পোস্টের অনেক ঘটনাই অস্বীকার করতে হয়। আবার তার বক্তব্য অনেকখানি শ্রুতিনির্ভর হওয়াতে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। মানে শুনেছি দিয়ে বলেছেন, যা ইতিহাসের জন্য বিপজ্জনক একটি প্রবণতা। এবং তার ভাষ্যের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি হচ্ছে জলিলকে নাকি বন্দী করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। আগেই বলেছি, ওসমানীর ঘটনায় তার বক্তব্য ছিলো সরাসরি উদ্ধৃতি, ওসমানীর সঙ্গে তার আলাপ সরাসরি কোট করছেন। আর এই ক্ষেত্রে শোনা কথায়। তবে নজরুল জলিলের সঙ্গে তার সখ্যতার কথাই বলেছেন। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে জলিল ও তার সেক্টর সবচেয়ে বেশী লাইনেজ পেতেন কলকাতার কাছাকাছি থাকায়। অন্য সেক্টর কমান্ডারদের এনিয়ে একটু অসূয়া ছিলো যার উল্লেখ করেছেন তিনি জিয়ার একটি ঘটনা দিয়ে। যাহোক, ফিরে আসি মূল কাহিনীতে।

ঢাকা পতনের আগে দেশের বিভিন্ন অংশ মুক্ত হতে শুরু করে। মুজিব নগর সরকার সেখানে বেসামরিক প্রশাসন কায়েম করার উদ্যোগ নেয়। খুলনা পতনের পর এই ব্যাপারেই জলিল সংক্রান্ত জটিলতার সূত্রপাত। একাত্তরের রণাঙ্গন ও অকথিত কিছু কথা বইটি থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করা যাক (পৃ: ১৯৪) : এসময় মুজিব নগর সরকারের সদর দফতরে এবং আমাদের অর্থাৎ জেনারেল ওসমানী সাহেবের দফতরে সেনা অফিসারদের মধ্যে একটি কথা শুনেছিলাম। কথাটি এরকম : মুজিব নগর সরকার খুলনা মুক্ত হওয়ার পর খুলনায় বেসামরিক প্রশাসন স্থাপনের জন্য একজন ডিসি বা জেলা প্রশাসক নিয়োগ করে পাঠান। খুলনা মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনা-বরিশাল অঞ্চলের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল তার সেক্টরের অফিস পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের হাসনাবাদ থেকে খুলনায় স্থানান্তর করেন। খুলনা সার্কিট হাইজে তিনি সেক্টরের সদর দপ্তর স্থাপন করেন। তার অধীনস্থ বাহিনী সার্কিট হাইজের প্রহরায় নিয়োজিত। তিনিও সেখানে বেসামরিক প্রশাসন চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। এ সময় মুজিবনগর থেকে সরকার নিযুক্ত ডিসি গিয়ে খুলনায় হাজির হন সরকারী সনদপত্রসহ। কিন্তু সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল নাকি মুজিবনগর সরকারের প্রেরিত বেসামরিক আমলার কাছে খুলনার বেসামরিক শাসনভার হস্তান্তর করতে দিতে রাজী হননি। এমনকি নবনিযুক্ত ডিসিকে খুলনা সার্কিট হাউজে অবস্থান করতে দেননি। খুলনার নবনিযুক্ত ডিসি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফিরে এলেন মুজিবনগরে। রিপোর্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কাছে। প্রধানমন্ত্রী ভীষণ ক্ষেপে গেলেন এসব খবর শুনে। তিনি ডেকে পাঠালেন জেনারেল সাহেবকে। সব শুনে জেনারেল ওসমানী মেজর জলিলকে বলে পাঠান যে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক সরকারের একটি বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলা হবে। তোমরা সব ব্যারাকে চলে যাবে। সিভিল এডমিনিস্ট্রেশনের সঙ্গে তোমাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। সামরিক বাহিনী দিয়ে দেশ শাসনের চিন্তা আমাদের মাথা থেকে দূর করতে হবে। উই আর নট পাকিস্তান, রিমেম্বার ইট।

নোট : ওসমানী নিজেও ছিলেন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একজন, সামরিক বাহিনীতে তার অধিভুক্তি ছিলো সাময়িক সামরিক জরুরীবস্থার প্রেক্ষিত মাত্র। স্বাধীনতার পর সশস্ত্র বাহিনীতে তাকে কোনো পদ দেওয়া হয়নি। মোস্তফার বয়ানে ডিসি প্রসঙ্গে এটুকুই আছে যে খুলনা মুক্ত হওয়ার পর তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় বেসামরিক কার্যক্রম অব্যহত রাখার জন্য ডেপুটি কমিশনারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে। তিনি রূপসা নদী সংক্রান্ত বাংলো থেকে ডিসিকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসেন, ভদ্রলোক '৭৫ পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রনালয়ের সচিব হয়েছিলেন। পরে যৌথ বাহিনীর নির্দেশ মতো পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে খলনার বেসামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলা হয়। আগের পোস্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এখানে ধরে নেওয়া যায় যে হয়তো মঞ্জুরই ওসমানীর নির্দেশনা নিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলেন জলিলের সঙ্গে। তবে প্রমাণহীন উপসিদ্ধান্তে আমার যথেষ্টই আস্থাহীনতা।

পরের বক্তব্য এরকম : শুনেছি জেনারেল সাহেব মেজর জলিলকে এভাবে ধমকিয়ে সব বুঝিয়ে বলেন। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন খুলনায় ডিসি পাঠানোর জন্য। প্রধানমন্ত্রী জেনারেল ওসমানীর কথামতো আবার ডিসি পাঠালেন। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। মেজর জলিল মুজিবনগর সরকারের ডিসির কাছে খুলনার বেসামরিক শাসনভার তুলে দিতে রাজী হননি। বরং মেজর জলিল মুক্ত খুলনায় তার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরো জোরদার করে তুলেছিলেন। মুজিবনগর সরকারের ডিসি তার কাছে কোনো পাত্তা না পেয়ে ফিরে এসেছিলেন। মুজিবনগর সরকার ও জেনারেল ওসমানী রেগেমেগে আগুন। পারেন তো, মেজর জলিলকে এখনই গ্রেপ্তার কর শায়েস্তা করেন। এমনই অবস্থা।
এরপর লেখকের সঙ্গে জলিলের সখ্যতার বিবরণ ও ওসমানীর প্রসন্নতার বর্ণণা রয়েছে কয়েকটি অনুচ্ছেদে। গ্রেফতারের বর্ণনাটি এরপর : শুনেছি অবাধ্যতার কারণে মেজর জলিলকে খুলনা থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় গ্রেফতার করার হয়েছিলো। ভারতীয় সেনাবাহিনী তার কাছ থেকে সব অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছিলো। মেজর জলিলকে বন্দী করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। মেজর জলিলকে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গ্রহণ করা হয়নি। মেজর জলিলের গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে আমি এরকমই শুনেছিলাম। পরে রাজনৈতিক অঙ্গনে মেজর জলিলের গ্রেফতার সম্পর্কে অনেক রাজনৈতিক রং চড়ানো হয়েছিলো। তবে মেজর জলিলকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে আমাদের মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে জেনেছিলাম যে, মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রশাসনের উপর বাংলাদেশ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনীরও কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের কারা প্রশাসনের উপর। বাংলাদেশে গ্রেফতারকৃত মেজর জলিলকে কার হেফাজতে রাখা হবে ভারতীয় সেনাবাহিনী তার কোনো গ্যারান্টি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পায়নি। তাই মেজর জলিলকে গ্রেফতারের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে নেয়া হয়েছিলো। জেনারেল ওসমানী অবাধ্যতার কারণে এবং সামরিক ডিসিপ্লিন ভঙ্গের কারণে তার প্রিয় মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিলের উপর ভীষণ চটে গিয়েছিলেন। মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দও এ ধরণের কথিত আচরণের কারণে এই সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধার উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলেন। এ কারণে পরবর্তীতে মেজর জলিলকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আর গ্রহণ করা হয়নি। তবে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে মেজর জলিলের অপরিমেয় ত্যাগ ও অমূল্য অবদান বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

শেষ কথা : মূলত মুজিবনগর প্রশাসন ও ওসমানীর যুদ্ধকালের নানা কথা নিয়েই নজরুল ইসলামের স্মৃতিকথাটি। জলিল এখানে সামান্য চরিত্র মাত্র। শোনা কথা নির্ভর এই বক্তব্য পাঠক কতখানি গ্রহণ করবেন সেটা তার নিজের উপর। আমি শুধু মূল ঘটনার আরেকটি ভার্সন তুলে ধরলাম মাত্র।
হঠাত চোখে পড়লো ব্লগার শওকত হোসেন মাসুম এ নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন অনেক আগে এই বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন আরেকটি সূত্র উল্লেখ করে। সেটিও সংযোজিত করা হলো:
এই ব্লগে এসে জানলাম মেজর জলিল নিয়ে নানা তথ্য। জামাতিদের খুব প্রিয় চরিত্র এই জলিল। জলিল নাকি যুদ্ধের পর ভারতীয় লুটপাটের বিরোধীতা করায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তবে মেজর (অব.) জলিল জামাতীদের প্রিয় আরেকটি কারণে, সেটি হল শেষ সময়ে এসে তার ইসলাম প্রীতির কারণে।

জলিল কেন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তার একটি বর্ণনা আছে 'এক জেনারেলের নীরব সাক্ষী: স্বাধীনতার প্রথম দশক' নামের বইটিতে। লেখক, মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (বি.) বীরবিক্রম। এই বইটিতে তিনি দুইটি গালগল্প বা মিথের জবাব দিয়েছেন। একটি হলো জলিলের গ্রেপ্তার এবং অন্যটি ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে শেখ কামালের গুলিবিদ্ধ হওয়া।

এথম পর্বে জলিল নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। আসুন দেখি বইটিতে কি লেখা আছে। বইটিতে আরও কিছু মন্তব্য আছে সেটার গুরুত্বও তম নয়।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একপাশে (বর্তমান পুলিশ নিয়ন্ত্রণ ক) অস্থায়ী অফিস চালু করি। কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকা শহর ও আশপাশ এলাকা থেকে বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ, আর্মির গাড়ি ইত্যাদি উদ্ধার করি এবং সেগুলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে আসি।
ডিসেম্বরের মাসেরই শেষের দিকে মেজর জলিলকে খুলনা থেকে ধরে এনে বন্দি করার জন্য আমার কাছে হস্তান্তর করা হয়। তৎকালীন ক্যাপ্টেন কে এস হুদা (পরে কর্ণেল এবং ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানে নিহত) তাকে ধরে নিয়ে আসেন। মেজর জলিলের বিরুদ্ধে উচ্ছৃঙ্খলতা ও অন্যান্য সামরিক শঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল। খুলনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক জলিলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ এবং গ্রেপ্তার সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। যদিও প্রচার করা হয় যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক অস্ত্রশস্ত্র লুটতরাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জলিলকে আমি পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকে চিনি। গ্রেপ্তারের পর তাকে আমার অস্থায়ী অফিসের পাশে আমার অধীনে প্রহরায় রাখা হয়। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে আমার আলাপ হতো। জলিল আমাকে বলতো, 'আর্মিতে থেকে কী লাভ হবে? বড়জোর জেনারেল হবেন। তার চেয়ে বরং চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসুন। তা না হলে যারা ভারতের কলকাতা ও আগরতলায় শরনার্থী ছিল এবং যারা নয় মাসের যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল না তারাই দেশ শাসন করবে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ভাঙ্গিয়ে। তাই সব মুক্তিযোদ্ধাদের উচিৎ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়া।'
লে. কর্ণেল তাহেরের সভাপতিত্বে ১৯৭২ সালে জলিলের কোর্ট মার্শাল হয়েছিল। কিন্তু জলিলের কোনো শাস্তি হয়নি। তবে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে তিনি জাসদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।



ছবি : একজন সেক্টর কমান্ডারের স্যালুট গ্রহণ করছেন ওসমানী, তার পেছনে এডিসি শেখ কামাল]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29064624 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29064624 2009-12-24 02:52:56
মেজর জলিল : ইগোর লড়াইয়ে বলি এক সাহসী সেক্টর কমান্ডার স্বাধীন দেশের নতুন বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাক বন্দীদশা থেকে দেশে ফেরার সপ্তাহ খানেক আগের কথা। ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। যশোরে ঢোকার মু্খের সড়কে সশস্ত্র একদল মুক্তিযোদ্ধার ঘেরাওয়ে পড়লো দুটো গাড়ি। একটি টয়োটা করোনা ও একটি মাইক্রোবাস- আরোহীরা যা তা গোত্রের কেউ নন। করোনায় ছিলেন মেজর জলিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক। তার সঙ্গী ১৬ জনের সবাই নামকরা মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ১৭ ডিসেম্বর খুলনায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করেছিলো এদের হাতেই। মিত্রবাহিনীর সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়ক জেনারেল দলবীর সিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন মেজর জলিল। দিনটি নিয়ে তার একটি স্মৃতিকথা এর আগে ব্লগে তুলে দিয়েছিলাম।

ফিরে আসি সেই গ্রেপ্তারে। অনেকদিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই গ্রেপ্তার, এবং এর প্রেক্ষিত নিয়ে রয়েছে অসংখ্য বিভ্রান্তি। স্বাধীনতা বিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধের যে কটি বিষয় নিয়ে সুকৌশলে তাদের অপপ্রচার চালিয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম এবং তালিকার ওপরের দিকেই। সবচেয়ে বড় হচ্ছে খোদ মেজর জলিলের অনেক আত্মকথাই (যা ইতিমধ্যে কয়েকজন পোস্ট করেছেন) ঘটনাটির রাজনৈতিক রং রাঙানিদুষ্ট। এর মধ্যে অন্যতম ভারত বিরোধীতা এবং এখন পর্যন্ত আমার ধারণা সবাই জানে এবং বিশ্বাস করে যে ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের প্রতিবাদ করার কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মেজর জলিল। স্বাধীন বাংলাদেশের তার ওপর সব নিগ্রহের পেছনে এটিই একমাত্র কারণ। সঙ্গতকারণেই এটি আমার অন্যতম একটি আগ্রহের বিষয় হয়ে ছিল অনেকদিন ধরেই। এ ব্যাপারে অথেনটিক একটি সোর্স আমি খুঁজছিলাম। পেয়েওছি, তারপরও কিছু পয়েন্টে নিশ্চিত হওয়ার একটা তাগিদ ছিলো। সেই সন্তুষ্টির পরই আমার মনে হয়েছে এই বিতর্কে জল ঢালার এটাই উপযুক্ত সময়। শুরু গ্রেফতারের তারিখ নিয়ে। যদিও খোদ জলিলের রচনাবলী তুলে দিয়েছেন একজন ব্লগার আর তাতে উল্লিখিত হয়েছে ৩১ ডিসেম্বরের কথা। অন্যদিকে এই পোস্টের তথ্যসূত্র অনুসারে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার এক সপ্তাহ আগে হয় ৩ জানুয়ারি। ওই একই পোস্টে জলিল তার সঙ্গী ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধার কথা উল্লেখ করেছেন, সংখ্যাটা জানা গেছে ১৬।

এ ব্যাপারে আমরা স্বাক্ষ্য মানতে যাচ্ছি ওবায়দুর রহমান মোস্তফাকে। পেশায় সুপ্রীমকোর্টের এডভোকেট এই ভদ্রলোক মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি বই লিখেছেন- মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টর ও আমার যুদ্ধকথা। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ৯ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তরের স্টাফ অফিসার ছিলেন। পদের কারণেই মেজর জলিলের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হতে হয়েছে তাকে। এবং সেদিনের সেই গ্রেপ্তারের শিকার মুক্তিযোদ্ধাদের একজন ছিলেন তিনি। টয়োটা করোনায় মেজর জলিলের ডানপাশেই বসা ছিলেন। ভদ্রলোক তার স্মৃতিকথাটিকে একটি ডায়িং ডিক্লেয়ারেশন বলে উল্লেখ করেছেন বইয়ের ভূমিকাতেই। জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌছে যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুপূর্ব স্বীকারোক্তি। এবং ঘটনাকাল ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তার বক্তব্যকে গ্রহণ না করার কোনো কারণই ব্যক্তিগতভাবে আমি পাইনি।

সেই বিচারে পুরো অধ্যায়টি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী অত্যন্ত কলঙ্কজনক একটি ঘটনা। আর শুধু ভারতীয় বাহিনীকে এতে জুড়ে দেওয়া আসলে নেপথ্যের সত্যটুকু থেকে নজর সরানোর জঘন্য একটি প্রয়াস মাত্র। আবার জলিলের স্মৃতিকথায় দেখা গেছে তাদেরকেই দুষতে, এই অবস্থানের পেছনে তার পরবর্তীকালের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাব কতখানি সেটাও বিবেচ্য। প্রসঙ্গতই বলতে হয় দূরত্বগত নৈকট্যে আর সব সেক্টর কমান্ডারের চেয়ে জলিলই ছিলেন ভারতীয় বাহিনীর সবচেয়ে কাছাকাছি। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়ই তিনি বাড়তি সুবিধাদি পেয়েছেন। এমনকি মে মাসের শুরুতে সুন্দরবনের বুড়ি গোয়ালিনী রেঞ্জে পাক বাহিনীর এমবুশে দু লঞ্চ বোঝাই অস্ত্র খোয়ানোর পর কলকাতায় ভারতীয় সেনা সদর ফোর্ট উইলিয়ামে মেজর জলিলকে সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও সে দায় থেকে তিনি মুক্তি পান। এবং পরবর্তী সময়ে জেনারেল অরোরার আস্থাভাজনদের একজন ছিলেন খুলনা মুক্ত হওয়া পর্যন্ত। তাহলে জলিল কার রোষের শিকার? দুঃখজনক উত্তরটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি খোদ কর্ণেল ওসমানীর অপ্রিয়ভাজন ছিলেন তিনি। ওসমানী জলিলের ওপর বিতৃষ্ণা প্রকাশে ঘুটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন মেজর জয়নাল আবেদীন ও কর্ণেল মঞ্জুরকে (প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সেনাসদস্যদের হাতে নিহত)। জলিলের গ্রেপ্তারের ঘটনায় নেতৃত্ব দেন মঞ্জুর তার অধীনস্থদের দিয়ে এবং বন্দী করে নিয়ে যান যশোর সার্কিট হাউজে। আর ওসমানীর রোষের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে নয় নম্বর সেক্টরের অগণিত দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধার পদকবঞ্চিত থাকা, যেখানে মুক্তিযুদ্ধে একটিও গুলি না ছুড়ে কলকাতার সদর দপ্তরে ফাইলপত্র নাড়াচাড়ার দায়িত্বে থাকা মেজর নুরও (বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামী) বীরত্বের খেতাব পেয়েছেন স্রেফ সেনাপতির আস্থাভাজন হওয়ার কার‌ণে।

এই দ্বন্দ্বের শুরু কিন্তু অনেক আগে থেকেই। তেলিয়াপাড়ায় এক কনফারেন্সে মেজর জিয়া, মেজর খালেদ মোশাররফসহ সেক্টর কমান্ডাররা ওসমানীর যুদ্ধ পরিচালনায় যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সুবাদে তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেছিলেন ক্ষুব্ধ ওসমানী। পরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ তাকে বুঝিয়েসুজিয়ে রাজী করান সিদ্ধান্ত পাল্টাতে। ওসমানী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তার যুদ্ধজ্ঞান কনভেনশনাল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ওই শুরুতে হালকা অস্ত্র, অল্প প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে পাকিস্তানী সেনাদের মতো একটি সুপ্রশিক্ষিত ও ভারী অস্ত্র সজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সামনা সামনি লড়াইয়ে নামা ছিলো আত্মহত্যারই নামান্তর। গোটা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের ভিত্তি ছিলো হিট অ্যান্ড রান। গেরিলা যুদ্ধের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি এটি। নয় নম্বর সেক্টর প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত পাড়ির সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোর একটি হিসেবে দাড়িয়ে গেছে ততদিনে। অল্প দিনের ট্রেনিং নিয়ে গেরিলাদের দেশের ভেতরে অপারেশনের এই পদ্ধতি সামরিক বাহিনীতে ইনডাকশন বলে পরিচিত।



ওসমানী জলিলের গেরিলা ওয়ারফেয়ার পদ্ধতির ওপর নাখোশ ছিলেন, তবে পদ্ধতিটির সাফল্য, ভারতীয় সেনাসদরের আনুকুল্য ও সংবাদ মাধ্যমে প্রচারণার কারণেই সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছিলেন না। তারপরও একদিন কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তরে ডেকে পাঠানো হয় জলিলকে। তার সঙ্গী ছিলেন মোস্তফা এবং সেক্টর এডজুটেন্ট ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক। ওসমানী জলিলকে সরাসরি নির্দেশ দেন ইনডাকশন বাদ দিয়ে রেগুলার রেজিমেন্টেড পদ্ধতিতে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধের। জলিল তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন এবং ভারতীয় সেনা সদরের মাধ্যমে এ ব্যাপারে ওসমানীর প্রভাবমুক্ত থাকলেন। জলিলের যুদ্ধপদ্ধতি নিয়ে ওসমানী প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখান পারুলিয়া ব্রিজ ধ্বংসের পর। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পারুলিয়া ব্রিজ পরিদর্শনে এসে এটি ধ্বংস করা উচিত হয়নি বলে মত দেন তিনি, আর এজন্য সবার সামনেই দূর্ব্যবহার করেন মেজর জলিল, সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হুদা এবং অপারেশনটির দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন বেগের সঙ্গে। জলিলের কোনো যুক্তিই মানতে অস্বীকার করলেন ওসমানী।

জলিল এরপর টের পেতে শুরু করলেন নোংরা এক ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে হঠাত ওসমানী নির্দেশ দিলেন পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা মেজর জয়নুল আবেদীনকে নয় নম্বর সেক্টরে সহঅধিনায়ক করা হয়েছে, তার সঙ্গে যেন জলিল দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেন। ডিসেম্বরের শুরুতে এলো নতুন ফরমান। মঞ্জুর একই সঙ্গে ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টর সুপারভাইজ করবেন যশোরের হেডকোয়ার্টার থেকে। কিন্তু যুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে, ভারতীয় বাহিনী প্রকাশ্যেই লড়াইয়ে নেমেছে। খুলনা মুক্ত করার অভিযানে জয়নুল আবেদীনকে গল্লামারিমুখী মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার করে পাঠানো হয়। অন্যদিকে মঞ্জুর তার একমাত্র সুপারভাইজেশনটি চালান সদ্যমুক্ত কালীগঞ্জের উকসা বিওপি ঘুরে দেখে। নয় নম্বর সেক্টরে তার দ্বিতীয়বার আগমনটিই জলিলের গ্রেপ্তারে মূখ্য ভূমিকা রাখে। খুলনা পতনের পর সার্কিট হাউজে অস্থায়ী সদর দপ্তর করে নয় নম্বর সেক্টর, আর এর অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধারা থাকার জন্য বেছে নেন খুলনা শহীদ হাদিস পার্কের উত্তরে খান এ সবুরের প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড ক্লাবে। ১৯ ডিসেম্বর মঞ্জুর খুলনা আসেন এবং সার্কিট হাউজে ঢুকে জলিলকে খবর পাঠান। সেই সময় কিছু বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাতকার দিচ্ছিলেন তিনি। তাকে অপেক্ষায় রাখার এই ধরণটা পছন্দ হয়নি মঞ্জুরের, বরং ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন তিনি। যাওয়ার আগে বলে যান- ওকে এজন্য উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে। কদিন পর জলিল বরিশাল গেলেন, সেখানে হেমায়েতউদ্দিন মাঠে তাকে গণসংবর্ধনা দেয়া হলো। যাওয়ার আগে ক্যাপ্টেন নুরুল হুদাকে ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে যান। ফিরে এসে শুনলেন জয়নুল আবেদীন জলিলের পরিবর্তে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দাবি করে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং মঞ্জুর এসে এই দায়িত্বের পক্ষে তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে গেছেন।

নতুন বছর চলে এসেছে ততদিনে। ফেরার পর সেরাতে ইউনাইটেড ক্লাবে জরুরী এক সভায় মিলিত হলেন জলিল ও তার যুদ্ধকালীন বিশ্বস্ত সাথীরা। সিদ্ধান্ত হলো বঙ্গবন্ধু দেশে না ফেরা পর্যন্ত মঞ্জুরের সঙ্গে কোনো ধরণের দ্বন্দ্বে যাবেন না তিনি। বৈঠকেই ফোন এলো মঞ্জুরের। জেনারেল ওসমানী নাকি জরুরী তলব দিয়েছেন সব সেক্টর কমান্ডারকে ঢাকায়। এজন্য পরদিন জলিল যেন যশোর থেকে নির্দিষ্ট কার্গো বিমানে মঞ্জুরের সঙ্গী হন, তাকে সকালেই রিপোর্ট করতে বলা হলো। জলিল বাকিদের সঙ্গে আলোচনা করে জানালেন যে তার সঙ্গে আরো লোকবল থাকায় সড়কপথেই তিনি ঢাকা যাবেন। পরদিন সকাল আটটায় যশোর রোড ধরে ঢাকা রওনা দিলেন জলিল। তিনি ও তার সঙ্গী সবাই সশস্ত্র। মাইক্রোবাসে জলিলকে এসকর্টের দায়িত্ব নেন ক্যাপ্টেন সুলতানউদ্দিনের নেতৃত্বে ১০ জনের একটি দল। তার সঙ্গীদের অন্যতম ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। বেনাপোলমুখী ও যশোরের প্রবেশমুখের সংযোগকারী রাস্তাটিতে জলিলের করোনা থামানো হলো। দুপাশের ঝোপে ১৫ থেকে ২০টি লাইটমেশিনগান ধারী মুক্তিযোদ্ধা- সবাই ৮ নম্বর সেক্টরের। একটু পিছিয়ে পড়া মাইক্রোবাসটি আসার পর গোলাগুলির একটি সম্ভাবনা তৈরী হলেও জলিল ‘সুলতান ডোন্ট ফায়ার’ বলে থামিয়ে দেন। এরপর ১৭জন বন্দীকে নিয়ে যাওয়া হয় যশোর সার্কিট হাউজে, একটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হয় সবাইকে। । খানিকপর মঞ্জুর আসেন। দরজা খোলার পর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় জলিল ও তার মাঝে। কেন, কার হুকুমে এমনটি করার সাহস হলো তোমার- জলিলের প্রশ্নের জবাবে মঞ্জুর ইংরেজিতেই জানান-জেনারেল ওসমানীর নির্দেশে। এরপর জলিলকে বাকিদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়।



চমকপ্রদ কিছু তথ্যের সন্ধান মিলে এরপর। মোস্তফা জানাচ্ছেন বরিশালের বাসিন্দা ও ৮ নম্বর সেক্টরের সহঅধিনায়ক মেজর কেএন হুদা (‘৭৫এর ৭ নভেম্বর নিহত) পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে তাদের আশ্বস্ত করেন জলিল ছাড়া বাকিদের আটকাদেশ সাময়িক। আর জলিলের বিরুদ্ধে সেনাবিধি অনুসারে হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্য, বিদ্রোহ এবং খুলনা পতনের পর লুটতরাজ পরিচালনার পাশাপাশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তার বিভিন্ন বিরোধীতামূলক বক্তব্য ও পদক্ষেপের অপরাধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অর্থাৎ কোর্ট মার্শালে বিচার করা হবে। গোটা কাহিনীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জলিলের অবস্থান এই একবারই পাওয়া গেছে। তার গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে প্রহরার কোনোটাতেই আর কোনো উল্লেখ নেই তাদের। তবে এই ব্যাপারে ভিন্ন সূত্রে একটি উল্লেখ পাওয়া যায় যে আত্মসমর্পনের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপারে জলিল অবস্থান নেন এই বলে যে জেনারেল ওসমানীর নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত এসব অস্ত্র যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে। ঘটনায় ফেরা যাক। এরপর একজন ম্যাজিস্ট্রেট আসেন বন্দীদের সঙ্গে পাওয়া জিনিসপত্রের সিজার লিস্ট করতে। সবার ব্যাগেই কাপড় ও গুলি ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি। এরপর আসে জলিলের ব্যাগ খোলার পালা। তার অনুপস্থিতিতে এই ব্যাগ খোলার ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদের পরও সেনাসদস্যদের উপস্থিতিতে তালা ভাঙা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ব্যাগের ওজন সন্দেহজনক বলে রায় দেন তার আগে। খোলার পর এতে পাওয়া যায় বিখ্যাত সমরনায়কদের লেখা গেরিলা যুদ্ধের মোটা মোটা সব বই, যা কলকাতা থেকে ফেরার পথে বিভিন্ন বুকস্টল থেকে কিনে আনতেন জলিল। হতভম্ব ম্যাজিস্ট্রেট এরপর স্টাফ অফিসার মোস্তফাকে জানান, তাকে বলা হয়েছিলো মেজর জলিল ও তাদের সঙ্গীরা খুলনা থেকে লুট করা ব্যাগ ভর্তি সোনাদানা, অলঙ্কার ও টাকা পয়সা নিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথ তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে!

এর মধ্যে খবর আসে জয়নুল আবেদীন সদর দপ্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আর নয় নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা যশোর আক্রমণ করে তাদের কমান্ডারকে উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সদ্য স্বাধীন দেশে দুটো সেক্টরের মধ্যে সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি চিরকুটের মাধ্যমে ঠেকানো হয়। এর মধ্যে দেশে ফিরলেন বঙ্গবন্ধু। তার আগমনী সরাসরি সম্প্রচারিত হয় রেডিওতে। ওসমানীর নেতৃত্বাধীন সব সেক্টর কমান্ডারের নাম উল্লেখিত হয়, জলিলের জায়গায় নেওয়া হয় জয়নুল আবেদীনের নাম। ১৭ দিনের বন্দীদশা শেষে অবশেষে জলিলের সঙ্গীদের মুক্তি দেওয়া হয়। মঞ্জুরের সাক্ষর করা এক চিঠিতে সবাইকে দুই সপ্তাহের ছুটি দিয়ে অফিসারদের আবার চাকুরিতে যোগ দিতে বলা হয়। মেজর জলিলকে ইতিমধ্যে স্থানান্তর করা হয় ঢাকা রেসকোর্সের আর্মি ক্যাম্পে। সেখানেই নির্ধারিত হয় উর্ধ্বতনদের সঙ্গে অহমের লড়াইয়ে বলি সাহসী এই সেক্টর কমান্ডারের নিয়তি। সে এক অন্য গল্প।

ছবি :
মেজর জলিল : ঝাকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো এক সেক্টর কমান্ডার

সাতক্ষীরা রোডের পারুলিয়া ব্রিজ পরিদর্শনে মুখোমুখি ওসমানী ও জলিল, ব্রিজ ধ্বংসের জন্য প্রকাশ্যেই তার সমালোচনা করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি

খুলনা পতনের পর সার্কিট হাউজের সামনে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মেজর জলিল

তথ্যসূত্র : মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টর ও আমার যুদ্ধকথা : ওবায়দুর রহমান মোস্তফা (স্টাফ অফিসার, সেক্টর নয়)
ভাস্কর প্রকাশনী, প্রকাশ ৩১ অক্টোবর ২০০৭





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29062130 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29062130 2009-12-20 06:19:37
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে একটাই ইনডেমনিটি : সেটা মুক্তিযোদ্ধাদের

১৯৭৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাসহ সকল অপরাধকে ক্ষমা করা হয়েছে , তাদের বিরুদ্ধে কোনোমতেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলা যাবে না এই আদেশ বলে। এই আইনে লেখা হয়েছ :

1
1. (1) This Order may be called the Bangladesh National Liberation Struggle (Indemnity) Order, 1973.



(2) It shall come into force at once and shall be deemed to have taken effect on the 26th day of the March, 1972.


2
2. No suit, prosecution or other legal proceeding shall lie in any Court against any person for or on account of or in respect of any act done during the period from the 1st day of March, 1971 to the 16th day of December, 1971, in connection with the struggle for national liberation or for maintenance or restoration of order up to the 28th day of February, 1972.
3
3. A public prosecutor shall, upon the Government certifying that a case against any person in the service of the Republic or against any other person for or on account of or in respect of any act done by him during the period from the 1st day of March, 1971, and the 28th day of February, 1972, is an act done in connection with national liberation struggle or for maintenance or restoration of order, apply to the court and upon submission of such application the court shall not proceed further with the case, which shall be deemed to be withdrawn, and the accused person shall forthwith be discharged.

4
4. The Government may make rules for carrying out the purposes of this Order.
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে মরিয়া জামাত-শিবিরের পেইড ব্লগাররা প্রোপোগান্ডা ছড়াচ্ছে রক্ষী বাহিনী নিয়ে, তাদের নাকি সকল আইনের উপর রেখে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছিলো মুজিবের শাসনামলে। ডাহা মিথ্যে বলছে এইসব বাংলাদেশ বিদ্বেষী মোনাফেকরা। জামাতি টাকায় (শুকরশাবক মোশতাক আহমেদের ভাগিনা) দৈনিক আমার দেশে ফালতু সব আইনের কথা তুলছে এই শুয়েরের দল।
রক্ষীবাহিনী বিষয়ে একটা আইনই আছে , তা সেনাবাহিনীতে তাদের আত্তিকরণ আইন। যা প্রণীত হয়েছিলো ৯ই অক্টোবর ১৯৭৫, যদিও তা কার্যকর ধরা হয়েছে সে বছরের ৩রা সেপ্টেম্বর থেকে। মুজিব নিশ্চয়ই কবর থেকে উঠে এসে সেই আইন জারি করেননি। নিজেরা গর্দভ, পাবলিকরেও ভাবে তাই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29047651 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29047651 2009-11-22 04:28:43
আমি বাঙালী, আমি মানুষ, আমি মুসলমান- একবার মরে, দুইবার না… আমি হাসতে হাসতে যাবো, আমার বাঙালী জাতিকে অপমান করে যাবো না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না, এবং যাবার সময় বলে যাবো- জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালী আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।

পাকিস্তানী ঘাতকেরা সেবার পারেনি। পেরেছে আরো বছর চারেক পর। ১৫ আগস্ট এক নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে আমরা হারিয়েছি আমাদের জাতির পিতাকে। দু'মেয়ে ছাড়া ওই নির্মম মৃত্যুযজ্ঞে তার সঙ্গী হয়েছিলো গোটা পরিবার। দীর্ঘ প্রশাসনিক কবচে খুনীরা সদম্ভে ঘুরে বেড়ালেও একসময় শেষ হয়েছে খেলা। ধরা পড়েছে অনেকেই, ফাসির দড়ির অপেক্ষায় সময় কাটছে তাদের। বাকিরা পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে কেউ লিবিয়ায়, কানাডায় কিংবা পুনঃ নাগরিকত্বের স্বদেশে। হত্যা মামলার রায় নিয়ে নতুন কি আর বলবো। তার চেয়ে উদযাপন করি ঐতিহাসিক কিছু উপাত্ত দিয়ে। যেসব জারজ ও তাদের উত্তরসূরীরা তার মহানুভবতার সুযোগে বেচে গিয়ে এখন তাকেই গালি দেয়, তার নিন্দা করে তাদের জন্য একদলা থু থুর বেশী কিছু বেরোয় না আমার মুখ দিয়ে।

দেশে ফেরার ক'দিন পর ব্রিটিশ টিভি সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন, যা সম্প্রচারিত হয়েছিলো জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই। দূর্লভ এই সাক্ষাতকারটির ঐতিহাসিক মূল্যমান অনেক। এখানেই বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা তিরিশ লাখ বলে উল্লেখ করেছিলেন। খুনে পাকিস্তানীদের গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে বিশ্ব নেতৃত্বকে আহ্বান জানিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের।



গাড়ীতে শুরু, গণভবনের লনে শেষ হওয়া এই সাক্ষাতকারে দূর্দান্ত কিছু কথা বলেছিলেন। পাকিস্তানীদের অভিশাপ, নিরন্কুশ ক্ষমতা দূর্নীতির জন্ম দেয় এমন একটি প্রশ্নের জবাব, যু্দ্ধাপরাধ, দেশ গড়া নিয়ে তার অভিমতের পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবন, বাঙালীর প্রতি তার মমতার অসাধারণ এক প্রামান্য দলিল এটি। দৈর্ঘ্যের কারণে দু পর্বে ভাগ করেছি, ওজন কমাতে কনভার্ট করেছি ফ্লাশ ভিডিওতে। সঙ্গে আরো দুটো ফুটেজ। একটি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগে শেষ জনসভায় দেওয়া ব্ক্তৃতার অংশবিশেষ। অন্যটি তার হত্যাকারীদের নেতৃত্বে থাকা কর্ণেল ফারুক ও রশীদের একটি সাক্ষাতকারের ফুটেজ। ১৯৭৬ সালের আগস্টে সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে সংঘটিত গণহত্যার সংবাদ বিশ্বকে জানান দেওয়া বিখ্যাত এই সাংবাদিককে দেওয়া এই সাক্ষাতকারে মুজিব হত্যায় জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমেদের ভূমিকা নিয়ে কয়েক ছত্র অমূল্য বয়ান রয়েছে খুনীদের তরফে।

ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতকার ১ম পর্ব :



ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতকার ২য় পর্ব :



বঙ্গবন্ধুর শেষ জনসভার ফুটেজ ও বক্তৃতার অংশ :



খুনী ফারুক-রশীদের সাক্ষাতকারের অংশবিশেষ :



পত্রিকার ক্লিপিংসের জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা সুশান্ত দাসগুপ্ত

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29047048 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29047048 2009-11-21 02:41:40
সামহোয়ার ক্লাসিক : কার্টুন কেলেঙ্কারি ও ছাগুদের ম্যাতকার (ইতিহাসের পাতা থেকে) পড়ুন স্ট্যানলি কুবরিকের সেই ক্লাসিক পোস্ট

সামহোয়ারে নাস্তিক-আস্তিক লড়াই বেশ পুরানো। আমি নিজেও এতে অংশ নিছি অনেকবার। তবে ট্রাজেডি হইলো ব্লাসফেমীর অপরাধে এই ব্লগে ব্যান হওয়া এখন পর্যন্ত একমাত্র ব্লগার আমি (যদিও মাল্টিপল নিক এবিউজরে কারণ হিসেবে দেখানো হইছিলো)। অমনিবাস নিকের প্রোফাইলে ভুলে আমি ডেনিশ কার্টুনগুলার একটা ইউজ করছিলাম, ছাগুগো জঙ্গীবাদি উগ্রতার জবাব দিতে। একজন ধরাইয়া দেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে উইথড্র করছি, পরে ভুল স্বীকার করছি। কিন্তু সামুতে আগুন লাগায়া দিলো ছাগুরা, আমারে সেই প্রথম তারা বাটে পাইছিলো, তাই সুযোগটা ছাড়ে নাই। পরে সেই ব্যান উঠছে যদিও, তবে এইটা প্রমাণ হয়া গেছিলো যে এইসব ধর্মানুভূতি এইসব জামাত শিবিরের পেইড ব্লগাররা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। কারণ আমার অপরাধ দেখাইতে গিয়া তারা সেইম কার্টুন লাল রংয়ে রাঙাইয়া পোস্টে পোস্টে ব্যবহার করছে, তখন নবীজির অবমাননা হয় নাই।

এরপর সেইম গ্রুপটাই প্রথম আলোরে এক হাত নিতে কার্টুনিস্ট আরিফরে নিয়া সামুতে আগুন লাগাইয়া দিছিলো। এই ব্যাপারে কমরেড স্ট্যানলি কুবরিক একটা সামারি পোস্ট করছিলেন। সেইটার লিংক দিলাম। আর সামুর স্টিকি পোস্টে বুদ্ধিজীবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাজা অনেক ছদ্মবেশী ছাগুর লেঞ্জা বাইরাইয়া পড়ছে। সাধারণ ব্লগারদের কাছে তাদের আসল রূপটা উন্মোচিত, যা আমরা অনেকে বইলাও প্রমাণ করতে পারতেছিলাম না। এই সুবিধাটুকু কইরা দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষরে প্রাণঢালা অভিনন্দন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29042486 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29042486 2009-11-12 21:06:08
আমি হয়তো জানিই না আমার ফাঁসির আদেশ হয়ে গেছে!
দুপুর নাগাদ খোকনের ফোন এলো। বিডিনিউজে আমার প্রাক্তন সহকর্মী। আরিফের ফোন নম্বর খুজছে। কার্টুনিস্ট আরিফ । কি ব্যাপার! জানালো, যশোরে না কোথায় নাকি কোনো এক আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছিলো, সেটার রায় বেরিয়েছে। আদালতের রায়ে তাকে দুই মাসের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। আসামী পলাতক বলে তার অনুপস্থিতিতে এই রায় দেওয়া হয়েছে।

অদ্ভুত একটা দেশ! ছয় মাসের ওপর একটা ছেলে ফালতু একটা অভিযোগে জেল খাটলো। উচ্চ আদালত তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ধর্মদ্রোহিতা থেকে বেকসুর খালাস দিলো। সেখানে নতুন করে নিম্ন আদালতে তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে একই অভিযোগে। এমন এক মামলায়, যার কথা আরিফ জানেই না। মানে কি! আমার নামে পাবনায় কিংবা টেকনাফে একটা মামলা হলো খুনের, আমি জানিও না। বিচারে আমার ফাসি হয়ে গেলো। হঠাৎ একদিন পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করবে। পেপারে আসবে খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ফেরারী আসামী গ্রেফতার। আমার ফাসি হয়ে যাবে! এর প্রতিকার কি? উচ্চ আদালতের সঙ্গে প্রান্তিক নিম্ন আদালতগুলোর সমন্বয় হবে কিভাবে? কিভাবে হেনস্থা থেকে বাচবে সাধারণ মানুষ?

প্রসঙ্গত প্রায় একই ধরণের কার্টুন ছাপা হয়েছিলো জামাতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রকাশনা কিশোর কণ্ঠে যা এক্সপোজ করেছিলেন মেহরুল হাসান সুজন ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29042376 http://www.somewhereinblog.net/blog/omipialblog/29042376 2009-11-12 16:53:10