১৫ ই নভেম্বর, বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার সময়, বাসে ছিলাম। বাসায় যাচ্ছি। বিবিসির বাংলা খবর শুনছি লেটেস্ট আপডেট জানার জন্য। ঢাকায়ই ত থাকি, এজন্য আক্রান্ত হবার চিন্তা নেই। কিন্তু সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু আমার বাড়িতে বাকি সবার জন্য। সবাই চট্টগ্রামে। আবার আত্মীয়-স্বজনের বিশাল একটা অংশ থাকে হালিশহরে। সমুদ্র থেকে বেশ কাছে ঐ আবাসিক এলাকা। সাইক্লোন নিয়ে বেশী ভয় না থাকলেও জলোচ্ছাসে সবারই আতংক। এসব হাবিজাবি চিন্তা করতে করতে রেডিও শুনছিলাম।
বিবিসির মানসীর হেডলাইনে বাংলাদেশের সাইক্লোন! বিভিন্ন রকম খবর আসছে, মানুষের জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম চলছে। বিভিন্ন জায়গা হতে বিভিন্নরকম খবর আসছে, এতবড় দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু আশাহত হতে হল পরিসংখ্যান শুনে। দক্ষিণে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষ সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু অরক্ষিত আরও প্রায় ৩০ লাখ!!! সেন্টার গুলো প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। এদের কি হবে? কোথায় দাঁড়াবে? পাহাড়ের রুপ ধারণ করে যখন জোয়ারের পানি দ্রুত বেগে আসবে তখন তারা কিসের আশ্রয়ে ভেসে থাকবে? ছোট ছোট শিশুদের কি হবে?
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষ্ঞ নাঈম ছিলেন বিবিসি স্টুডিওতে। অনেক মতামত দিলেন, আমাদের দুর্যোগ মোকাবেলা করার অবকাঠামো খুবই দুর্বল। সামান্য ঝড়েই বাসা বাড়ি তছনছ হয়ে যায়। সাইক্লোন সেন্টার অপ্রতুল। তাছাড়া সাইক্লোন সেন্টার থাকলেও লোকজন আসতে চায় না। এটা ছিল একটা ভয়ংকর তথ্য। মানুষ জীবণের ঝুঁকি নিয়ে কেন বাসায় থেকে যেতে চায়? এর বেশ কিছু কারণ পাওয়া গেল। প্রথমত, মানুষ নিজের আবাস ছেড়ে বিপদের মাঝে সাধারণত কোথাও যেতে চায় না; এটা বিশেষ করে এ অঞ্চলের মানুষের বৈশিষ্ট্য। ২য়ত, সবচেয়ে দুর্বলতা আমাদের যে সিগনালিং সিসটেম, সেখানে! সাধারণত ১০নং সংকেতের ১০ ঘন্টা পর সাইক্লোন আঘাত করার কথা। কিন্তু ২৪ ঘন্টা অতিক্রম করার পরও যখন ঝড় আঘাত করেনি, ততক্ষনে মানুষ আবার বাসায় ফেরা আরম্ভ করেছে। এটা একটা চিন্তার বিষয়। সুনামির সময়ও একি অবস্থা হয়েছিল। আন্দামান থেকে বিপদ সংকেত তুলে ফেলার পরও আমরা আরো প্রায় ১ দিন সংকেত দিয়ে রেখেছিলাম, এতে করে বিপদ সংকেতের প্রতিক্রিয়া মানুষের মাঝ থেকে উবে যায়। তাছাড়া আমাদের সিগনালিং এ আরও সমস্যা আছে, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রায় ৭০০ জেলে সমুদ্রে ছিল। তাঁদের আগে থেকেই সর্তক বার্তা দেয়া যায় নি বা ফিরিয়ে আনির উদ্যোগ নেয়া হয় নি। এখন পর্যন্ত তাঁদের ভাগ্যে কি ঘটেছে কেউ জানেনা!
৯১ এর কথা মনে পরে যায়, তখন আমি চট্টগ্রামে। আমাদের বাসার কাজ চলছে। নানর বাড়ি ছিলাম। সেটা ছিল টিনের। ঝড়ের কি ভয়ংকর রূপ!!!!! না দেখলে বর্ণনা করা যায় না! কি বিকট শব্দ!!! সবকিছু সে ভেঙে তছনছ করে ফেলতে চায়! মনে হচ্ছিল সেই টিনের বাড়িটিকে সে দু'হাত দিয়ে ক্রমাগত আছাড় দিচ্ছে! বাতাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ মনে হচ্ছিল বাসার বাহিরে লক্ষ কোটি সাপ অপেক্ষা করছে, শুধু অপেক্ষা, বের হলেই বিষদাঁত বসিয়ে দেবে! বাড়িতে অনেক পুরোনো গাছপালা থাকার কারণে মনে হয় সেবার বেঁচে গিয়েছিলাম, আল্লাহর অশেষ রহমত!
সন্দ্বীপে যেসব আত্মীয় ছিল, তাঁদের করুণ কাহিনি লিখতে পারবনা। সে ক্ষমতা আমার নেই। শুধূ শুনেছি, কিভাবে মায়ের হাত ছুটে শিশু হারিয়ে গেছে কালো পানিতে। ঝড় নিয়ে গেছে গহিন সমুদ্রে। উলঙ্গ নারীর লাশ ঝুলে ছিল গাছের ডালে। অনেকর লাশ পাওয়া গেছে ১০-১২ দিন পর, পঁচা, গলিত, মাছে খাওয়া! ঝড়ের পরে ডায়রিয়ায় মারা গেছে আরও কয়েক হাজার মানুষ! কি দুঃখ, কি করুণ অবস্থা, বেঁচে থাকার আকুতি! লিখে শেষ করা যাবে না!
তারপরও উপকূল, দ্বীপ বা চরাঞ্চলের মানুষেরা আবার জেগে উঠে! স্বপ্ন দেখে বেঁচে থাকার, জীবণকে সাজানোর! বুকে সাহস নিয়ে তারা সংগ্রাম শুরু করে!
এসব ভাবতে ভাবতে একটা গানের লাইন মনে পরেঃ
"তীর হারা এ ঢেউয়ের সাগর পারি দেব রে,
আমরা কজন, নবীন মাঝি হাল ধরেছি, শক্ত করে রে!"
এখন সময় নবীন মাঝিদের শক্ত করে হাল ধরার!
হাল ধরতে হবে শক্ত করে। বেঁচে থাকতে হবে, স্বপ্ন নিয়ে...!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

