আমার এক কিউট কাজিন আছে, যার গাড়ি ভীষণ প্রিয়। যে কোন গাড়ি দেখেই সে তার মডেল বলে দিতে পারে। একদিন আমি তারে নিয়ে এক গাড়ি বিষয়ক এক্সপার্টসহ ধানমন্ডি স্টার কাবাবের সামনে রাস্তার আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রায় ২০ মিনিট রাস্তা দিয়ে যত গাড়ি গেল সব গুলোর মডেল জিজ্ঞাসা করলাম। সে সবগুলোর উত্তর দিল এবং সঠিক। মাত্র ৬/৭ বছর বয়সে ছেলেটা কত গাড়িই না চেনে, যেখানে আমি নিতান্তই অজ্ঞ। বাহন বলতে আমি শুধু চিনি গাধা-ঘোড়া, ঠেলাগাড়ি, সাইকেল রিক্সা, বেবিট্যাক্সি, প্রাইভেট কার, জীপ, বাস ট্রাক। বাহনের শ্রেনীবিন্যাসে আমি এই ছক অতিক্রম করতে ব্যর্থ। তার মানে এই নয় যে গাড়ি নিয়ে আমার কোন স্বপ্ন নেই। আজ বন্ধুদের সেই গল্প বলতেই লিখতে বসা।
ছোট বেলায় একবার কোন এক হিন্দি সিনেমায় ঘোড়া দেখে, ঘোড়ার জন্য খুব শখ করেছিলাম। সিনেমা দেখতে দেখতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করলাম একটা ঘোড়ার জন্য। অনুরোধ এই জন্য যে আবদার করবার সাহস ছিল না কখনই, এখনও নেই। ধারণা করে ছিলাম বরাবরের মত বাবা হয়ত সরাসরি না বলবে, অথবা একটা ধমক ছুড়ে দেবে। কিন্তু সেদিন বাবা খুব আদর করে বলল, একমাস পড়েই ঘোড়া কিনে দেবে। আমার আনন্দ আর দেখেকে! ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ দেখেই ছুটে গেলাম আমাদের কাজের মেয়ে ময়নার কাছে। ওকে বললাম, জানিস আমাকে বাবা একমাসে মাঝেই ঘোড়া কিনে দেবে। জেগে জেগে অনেক স্বপ্ন দেখে ফেললাম, ঘোড়া নিয়ে। স্বপ্নের ঘোড়াটা ছিল কাল। ভেবেছিলাম বাসা পর্যন্ত ওর পিঠে চড়েই আসব, তারপর পাঁচতলা সিঁড়ি উঠবার সময় নেমে পড়ব। ঘোড়াটাকে ব্যালকনিতে রাখবার প্লান ছিল। তাকে কি খাওয়াব তা নিয়ে ভাববার সময় করে উঠতে পারিনি। দিন গুনতে গুনতে একদিন ঘোড়ার স্বপ্ন কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। কবে যে সেই একমাস শেষ হয়েছিল জানি না। তবে বাবাকে ধন্যবাদ, সেদিন যদি ধমক দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিত তবে হয়ত সুন্দর সেই স্বপ্ন গুলো দেখতে পারতাম না।
এরপর স্কুলে সাধারণ জ্ঞান বই হতে জানলাম, পৃথিবীর সবচাইতে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশে কক্সবাজারে। আবার দেখা শুরু হল আমার স্বপ্ন দেখা। এবারের ঘোড়াটা ছিল ধবধবে সাদা। সমুদ্র আমি দেখেছি অনেক অনেক পরে। কিন্তু সেই বয়সেই স্বপনেই সেই সাদা ঘোড়া ছুটিয়ে ঘুরে আসতাম সেই ১১১ কি.মি. সমুদ্র সৈকত। আজও অনুভব করতে পারি স্বপনের সেই ঘোড়া ছুটানো, পাশে সাদা ঢেউ খেলানো সৈকত, আর আমায় ছুঁয়ে যাওয়া নির্মল বাতাস।
একবার বাবার সাথে শীতলক্ষা নদীতে নৌকা চড়তে গিয়েছিলাম। তখন আমাদের পাশ দিয়েই কয়েকটি স্পিড বোট ছুটে গেল। আমাদের নৌকাটা ছিল ছোট। স্পিডবোটের ঢেউয়ে নৌকাটা খুব নড়েছিল সেদিন। আমায় নিয়ে বাবা এত ভয় পেয়েছিল যে আর কখনই আমাকে সহ নৌকায় উঠে নি। কিন্তু আমার মনে সেদিন একটা স্পিড বোটের স্বপ্ন গেঁথে গেলো। সময়ের সাথে সেই স্বপনের গাঢ়ত্বও ফিকে হয়ে গেল একদিন।
ছোট বেলার অনেক স্বপনই একদিন ফিকে হয়ে আসে। তবু কিছু সত্যিকারের ঘটনা তাজা স্বপ্ন হয়ে রয়ে যায় অনেক অনেক দিন। সেগুলোকে বাস্তবে সত্যি করবার আকাঙ্খা আজীবন টিকে রয়। এমনই এক স্মৃতি নিয়ে আমি আজও চলছি। সে কবেকার কথা আমার মনে নেই। তবে খুব সম্ভবত ক্লাস থ্রিতে পড়ি। স্কুল হতে বাসায় ফিরছিলাম রিক্সায় একাকী। এটা সে সময়ের কথা ওয়ারী হতে নারিন্দার রিক্সা ভাড়া ছিল তিন টাকা, যা এখন মিনিমান ১০/১২ টাকা। রিক্সা টিপু সুলতান রোডে উত্তরা ব্যাংকের মোড়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকে ছিল। রিক্সার ঠিক পেছনেই ছিল একটা সিলভার কালারের একটা জীপ। ছোট্টবেলার আমার সেই মনে গাড়িটা খুব বাঁধল। বারবার পেছনে ফিরে চাইছিলাম। ব্যাপারটা রিক্সাওয়ালার চোখ এড়াল না। উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোন ক্লাসে পড়”। উত্তর দিলাম, “ক্লাস থ্রি”। উনি বললেন, “খুব ভাল করে অনেক অনেক লেখাপড়া কর। লেখাপড়া করে একদিন এইরকম একটা গাড়ি কিনবা”। রিক্সায় বসে অন্য দিকে অনেকেই উঁকিঝুঁকি দেয় কিন্তু, সেইদিনের সেই রিক্সাওয়ালা কি করে আমার সেই ছোট্ট মনের বড় আশা বুঝে গেল তা আজও আমার কাছে রহস্য। এত সহজে আমার মনের আকুতি কেউ বোঝেনি কখনও।
রিক্সাওয়ালার কথায় আমি হঠাৎ খানিকটা লজ্জা পেলাম। লজ্জার হাসি মুখে নিয়ে তাকে কথা দিলাম নিশ্চয়ই কিনব একদিন সেই রকম একটা গাড়ি। আমার সেদিনের তাকে দেওয়া সেই কথার মাঝে এক ধরনে কমিটমেন্ট ছিল, যা আজও আছে আমার কাছে। পরে রাস্তায় বাবাকে দেখিয়ে জেনেছিলাম সেটি ছিল পাজেরো জীপ।
~স্বপ্ন দেখি একদিন আমি ঠিকই গাড়ি কিনব নিজের কামাই করা অর্থ দিয়ে। হয়ত সেই পাজেরো জীপের চাইতে অনেক দামী গাড়ি কিনবার সামর্থ হবে কোন একদিন। কিন্তু, আমি সেই রিক্সাওয়ালাকে দেওয়া কমিটমেন্ট আজও ভুলি নি, ভুলবও না কখনও। সেটাই আমার স্বপন বাহন। ~
(শামীমের একটা পোস্টে গাড়ি বিষয়ক সুন্দর কিছু লেখা পড়েই এই পোস্ট, তাই এই পোস্ট তাকে উৎসর্গ করলাম)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

