যে কোন ভাষার খুব সম্ভবত কবিতাগুলোই তার প্রাণ, ঠিক যেমন আমাদের বাংলা ভাষায়। এই প্রাণের ছোঁয়া থেকে বহুদিন দূরে ছিলাম, এখনো কতটা কাছে এসেছি জানি না। আজকের এই পোস্ট আমার কবিতা পড়ার উপর।
আমার কবিতা পাঠ শুরু সেই ছোট্ট বেলা থেকে। তখন যা পড়তাম তাকে হয়ত কবিতা বলা হয় না, বলে ছড়া। আজকালের বাচ্চারা এগুলোকে বাংলা রাইমস্ নামে চেনে। এরপর শুরু হয় স্কুল পর্যায়, সেই সাথে পাঠ্য বইয়ের কবিতা। সেগুলো পড়তাম শুধু পরীক্ষায় নম্বর তুলতে। আমার মনে পড়ে না স্কুলের কোন কবিতা পড়ে আমি মজা পেয়েছি বা বুঝেছি। কবিতার বই বা পেপারে ছাপা বাচ্চাদের কবিতা আমি কখনই পড়তাম না। তখন অবশ্য পেপারও পড়া হত না। ক্লাস এইট থেকে খুব পেপার পড়া শুরু করি। পেপারে সাহিত্যের পাতা দেখতাম কবিতা ভরা। কবিতা বলতে আমি বুঝতাম, “সাধারণ কথা ছন্দে ছন্দে বলা”। ছন্দ ছাড়া কতগুলো লাইন কি করে কবিতা হয় তা আমার মাথায় ধরত না। তাই আগ্রহও পাই নাই, আর পড়িও নাই।
খুব সম্ভবত ক্লাস সিক্স-সেভেনের পরে পরীক্ষায় আর কবিতা মুখস্ত লিখতে হত না, শুধু বড়, ছোট প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা লিখতে হত। গাইড বই থেকে খুব কষ্ট করে সেগুলো মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় বমি করার বৃথা চেষ্টা করতাম এবং ব্যর্থ হতাম বার বার। ক্লাস টেন-এ বুঝলাম ৫০ টা অবজেকটিভ ঠিক উত্তর দেবার জন্য বইপড়াটা জরুরি। তখন আবার কবিতা পড়া শুরু, প্রতি কবিতার পেছনের মর্মার্থটুকুও পড়তাম। তবে আমার কাছে একমাত্র নজরুলের ওমর ফারুক কবিতা ছাড়া আর কোনটাই ভাল লাগে নাই। প্রথমত, ঐ কবিতায় ছন্দ ছিল, দ্বিতীয়ত ছন্দে ছন্দে মূলত খলিফা ওমরের (রাঃ) কিছু কাহিনী ছিল যা আমার জানা। অতএব, কবিতা বলতে আমি যা বুঝতাম সেটা ওমর ফারুক কবিতার ক্ষেত্রে ভালই মিলে যায়। ছন্দে ছন্দে কাহিনীর বর্ণনা। বিনা বাক্য ব্যয়ে স্বীকার করব, এসএসসিতে আমি কোন কবিতাই বিন্দু মাত্র বুঝি নাই ঐ একটা ছাড়া। কলেজের সিলেবাসে যেই কয়েকটা কবিতা ছিল তার মাঝে সাজেশন ভিত্তিক কয়েকটা পড়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথে “সোনার তরী” কবিতার মর্মার্থ ভালই লেগেছিল। তবে, আমি এটা ভেবে পেলাম না ঐ কথা গুলো সরাসরি একটা ছোট্ট প্রবন্ধে লিখলেই তো হত। আবজাব রূপক এনে এত প্যাচানোর কি ছিল! এসএসসিএর পরে কবিতা হতে মুক্তি লাভ হয় এবং কবিতা জীবনে আর কখনই আমার পড়তে হবে না তা নিশ্চিত হয়ে যাই।
সেই সাথে কবিদেরও আমার কাছে খুব হাস্যকর এক প্রাণী মনে হত বরাবরই। যারা একটা অপ্রয়োজনীয় কাজ করে যাচ্ছে আর নিজেদের স্পেশ্যাল ভাবছে। কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পন হলেও কবি ও তার কবিতা উভয়ই আমার কাছে তাচ্ছিল্যের বিষয় ছিল। আমাদের এক সহপাঠিনী ও আমারই খুবই ভাল বান্ধবি কবিতা লিখে এবং আবৃত্তিও করে। ছন্দহীন কবিতার ন্যাকা ন্যাকা ভাবে আবৃত্তি খুব সহজ একটা জিনিস আমার মেজাজ খারপ করা ও মাথা ব্যাথা শুরু করাবার জন্য। আমার ধারনা ছিল আজকালের যে কোন প্যারাগ্রাফকেই কয়েকটা লাইনে ভেঙে, ঐ ন্যাকা আবেগে আবৃত্তি করলেই তা কবিতা হয়ে যায়। আমরা দুই একজন বন্ধু মাঝে মাঝে সংবাদপত্রের নিখোঁজ সংবাদ, খুনের কাহিনী, রাজনৈতিক পবন্ধ এমনকি টেলিভিষনের পোগ্রামসূচী ইত্যাদিকে আবৃত্তির ঢং-এ পড়তাম এবং প্রমান করতাম আজকাল কবিতা লেখা আর বিশেষ কোন গুন নয়।
এভাবে চলতে চলতে একদিন আমার অভ্র দিয়ে বাংলা টাইপিং-এর সাথে পরিচয়। প্রথম প্রথম খুব মজা পেতাম। একরাতে এক বান্ধবির সাথে কথা হচ্ছিল মেসেঞ্জারে, তার জন্য কিছু একটা গুগলে খুজতে খুজতে এসে পড়লাম এই সামহোয়্যারে। আগ্রহ বসত পড়ে ফেললাম, বিহংগদার একটা কবিতা “প্রিয় গড যদি কিছু মনে না করেন”। ভাল লাগল, ছন্দ তেমন ছিল না কিন্তু অর্থ বুঝতে পারলাম খুব সহজে। বান্ধবিকেও দিলাম, তার ভালও লাগল। এভাবেই একসময় এই ব্লগে থিতু হয়ে বসল “বিবর্তনবাদী”(যদিও আমার ব্লগে আগমনের কাহিনী আরো ব্যাপক এবং তা পরে একদিন লেখা হবে)। পানিতে ডুব দিলে যেমন পানি কিছুটা হলেও গিলতে হয়, তেমনি ব্লগে ঘোরাঘুরি করতে করতে কবিতাও কিছু পড়া হয়। বেশিরভাগ ছন্দহীন এসব কবিতা কখনই ভাল লাগত না। তবুও কিছু প্রিয় ব্লগারের কবিতার পোস্টে প্রায়ই না বুঝেই “ভাল হয়েছে”, “প্লাস”, “দারুন”, “চলুক” জাতীয় কমেন্ট ফেলে আসতাম। এসব ফাঁকা কমেন্টস করতে কখনই ভাল লাগত না। একদিন ঠিক করলাম এখন থেকে কবিতা গুলো পড়েই কমেন্ট করব। এক লাইনও যদি বোঝা সম্ভব হয় তবে সেই লাইনটাই তুলে দিয়ে সাথে গতানুগতিক কমেন্ট জুড়ে দেব। সেই শুরু।
যতদূর মনে পড়ে আমার প্রথম উপলব্ধি করে পড়া কবিতা সাজি আপুর লেখা। ওনার মেয়েটার স্বাধীনতা ও শো-কেসে সভ্যতা কবিতা দুটি সব সময় মনে থাকবে। প্রথম প্রথম নিবেদীতা, নাদান, মুকুল ভাই, কালপুরুষসহ কয়েকজনের কবিতা ভাল লাগত। পরে পড়ি চিটি (হামিদা আকতার), ভাঙা-চাঁদ, খোলাচিঠির কবিতা। এখন আমাদের কবি আব্দুলও ভাল কবিতা দিচ্ছেন। নাদানের একটা কবিতা পড়ে নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিল যে আমি কবিতা লিখতে পারি না। নাদান ভাইয়ের কবিতার কমেন্টেও তা বললাম। উনি বললেন, লিখা শুরু করেন হয়ে যাবে। সেই দিনই বা তার পরের দিন রাতে উত্তরা থেকে ফার্মগেইটের দিকে যাচ্ছিলাম। ঠিক সামনের সিটে একটা মেয়ে এসে বসল, যার নাকটা খুব ভাল লাগল। বাস যাত্রা শেষে ঘরে ফিরে ঠিক করলাম ঐ মেয়ের সুন্দর নাকটাকেই স্মৃতিতে সতেজ রাখব তাকে নিয়ে কবিতা লিখে। সেই প্রথম কবিতা লেখা, যা আমার কাছে এককালে অকল্পনীয় ছিল। যদিও এরপর কাব্য চর্চা আর বেশি দূর এগোয় নি, কিন্তু আমার কবিতা না পড়ার অভ্যাসটা গেছে। এখন কবিতা পড়ি, ভালই লাগে। তবে হ্যা, সেটা বল্গের বাইরে বেশি দূর এগোয় নি। কিছু দিন আগে বন্ধুরা কবিতা বিষয়ক আলোচনা করছিল, আমিও সেখানে যোগ দিলাম। লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়েই ওদের বলতে হল, “Actually, কবিতা is not a bad thing”। আমার দ্বারা অতীতে নির্যাতিত কবিরা খানিক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন। পরে তারা কমেন্ট করলেন, “নিশ্চয়ই নতুন করে প্রেমে পড়েছি”। এখানে একটা কথা উল্লেখ করতে হয়, আমার প্রিয়াকে প্রেম নিবেদনের কিছুদিন পরেই জানিয়ে দিয়েছিলাম তার জন্য আর যাই করি না কেন কবিতা লেখা সম্ভব না। বিধায় চার বছর পরে “Actually, কবিতা is not a bad thing” উচ্চারণ করা আমার জন্য বিপদের কারনই হতে পারত। যদিও তেমন কিছু হয়নি। আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বর্তমানে আমার প্রিয় কবিকে? উত্তর হবে, সুলতানা শিরীন সাজি, বিহংগ, কালপুরুষ। যদিও এদের ব্লগ জগতের বাইরে কেউ চিনে না, তবুও আমি দুই একজনকে এমনি উত্তর দিয়েছি।
এবার আসি বিখ্যাত কবিদের কথা। রবীন্দ্রনাথের “শেষের কবিতা” উপন্যাস পড়েছিলাম, কিন্তু তার কবিতা গুলো বাদে। ব্লগে আসবার পরে সেই বই আবার হাতে নিতে হয়ে ছিল এবং কবিতা পড়াও হয়েছিল। নজরুলের প্রেম বিষয়ক একটা বইতে “বর্ষা বিদায়” কবিতাটি এর রচনার পেছনের ঘটনা সহ উল্লেখ থাকায় পড়ে বুঝতে কোন সমস্যা হয় নাই। খুব ভালও লাগল। ঢাবিতে আমাদের এক অধ্যাপক জসীমুদ্দিনের “কবর” কবিতাটাকে জীববিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে মজা করে তুলে ধরেছিলেন। সেটাও ভালই লাগে।
এই আমার কাব্য চর্চার দৌড়। ভবিষ্যতে আরো চলবার আগ্রহ আছে। ব্লগেই প্রচুর কবিতা পাব পড়ার জন্য। আরো বিশ্বাস আছে নিজে যাই লিখি না কেন, কোন না কোন ব্লগ বন্ধু “ভাল হয়েছে”, “প্লাস”, “দারুন” বা “চলুক” জাতীয় মন্তব্য আমার দিকে ছুড়েই দেবেন। সেটাই হবে আমার কাব্যচর্চা এগিয়ে নেবার জ্বালানী।
তবে হ্যাঁ, কবিকুলের কাছে আমার একটা প্রার্থণা, অতীতের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ক্ষমা করবেন। এখন আমি বিশ্বাস করি, কবিতায় অল্প পরিসরে এমন সব ভাব প্রকাশ সম্ভব যা হাজার পাতার উপন্যাসেও হয়ত সম্ভব নয়। আপনারাও স্বীকার করবেন, বিবর্তনবাদীর খানিকটা বিবর্তনতো অবশ্যই ঘটেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



