
সেদিন ব্লগার শফিকুল ভাই একটা পোস্ট দিলেন তার মেয়ের অংক ভীতি নিয়ে। আমাদের এক ভাতিজী সুমাইয়া অংক ভয় পাচ্ছে, সাথে শফিকুল ভাইজানও চিন্তিত। উনার পোস্ট দেখে আমার নিজের অংক শিখার কাহিনী লিখতে মন চাইল। তাই শুরু করলাম।
ক্লাস সেভেন পর্যন্ত আমি কোন গোনার মত কোন ছাত্রই ছিলাম না। বাবা-মা আমাকে নিয়ে হতাশ ছিলেন যদিও কিন্তু বিশেষ কোন উদ্যোগ নিতে দেখিনি আমার ভবিষ্যত উদ্ধারে। স্কুলের পড়তাম, বাসায় টিচার আসত এই পর্যন্ত। বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে পড়তে হবে এমনটা আমি নিজেও ভাবিনি কখনও, আর দশজনের মতই স্কুলে যেতাম, টুকটাক হোম ওয়ার্ক করতাম, পরীক্ষা দিতাম। ভাল রেজাল্ট যেমন কখনও করি নাই, তেমনি যারা ভাল রেজাল্ট করত তাদের খবরও রাখি নাই কখনও। ফেল করিনি কখনও, বেশি না পেলেও অন্তত ৩৩ পেয়েছি সবসময়। যদিও টিচাররা বলতেন ৩৩ পাওয়ারা আসলে ৩০/৩১ পাওয়া, দয়া করে পাশ করানো হয়েছে। তবে হ্যা, ক্লাস ফাইভের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় আমি অংকে ৯৫ পেয়েছিলাম। কিভাবে তা আমিও জানি না!!! এরপর থেকে আবার সেই টাইনা-টুইনা পাশের খেলা।
ক্লাস সেভেনে উঠলে আমাদের ভাইবোনের জন্য নতুন টিচার রাখা হল, সুশীল কুমার সাহা। অতিশয় বৃদ্ধ এই শিক্ষক, তখন সবে মাত্র কলেজের শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। সপ্তায়ে পাঁচদিন পড়াতেন, দুই ঘন্টা করে। সব বিষয় পড়াবার কথা থাকলেও উনি মূলত অংকই পড়াতেন। পড়াতেন বলাটা ভুল উনি অংক করিয়ে যেতেন।
প্লাসে প্লাসে প্লাস, প্লাসে মাইনাসে মাইনাস, মাইনাসে মাইনাসে প্লাস এইসব টুকটাক বলে উনি অংক করানো শুরু করতেন। উনি একএকটা লাইন বলে যেতেন আমি লিখে যেতাম। প্রথম দুই মাসেই উনি পুরো বইয়ের অংক শেষ করিয়ে ফেললেন। বই শেষ হবার পরে স্যার প্রতিদিন এসেই সংবাদপত্র চাইতেন এবং আমাকে অংক করতে দিতেন। প্রতিদিন এক একটা অনুশিলনী করতে হত। যেহেতু একবার শুধু স্যারে কথা শুনে অংক তুলে গিয়েছি, তাই নিজে নিজে অংক করা সম্ভব ছিল না। আমি আগে করা খাতা পায়ের উপর রেখে দেখে দেখে অংক করে যেতাম। স্যার দেখতেন, যদিও কিন্তু কিছু বলতেন না কখনই এবং এভাবেই চলতে থাকল। প্রথম সাময়িক, দ্বিতীয় সাময়িক গেল রেজাল্ট আগের মতই থাকল। যেহেতু বাবা মা লেখাপড়া নিয়ে তেমন চিন্তিত ছিলেন না, তাই গায়ে লাগে নাই। বার্ষিক পরীক্ষায় অংক পরীক্ষা দিতে গেলাম। বরাবরের মত পরীক্ষা দিয়েও আসলাম। পরীক্ষার রেজাল্ট ছিল আমি অংক সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছি। এরপর আমি সবসময়ই অংকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছি। দেখে দেখেই হোক না দেখে দেখে, প্রতি সপ্তাহে পাঁচদিন দুইঘন্টা বা তার বেশি সময় ধরে স্যার পাশে বসে আমাকে অংক করিয়েছেন। স্কুলে, এককথায় বলতে গেলে বইয়ের সব অংক আমার মুখস্তই থাকত।
ক্লাস টেনে উঠবার পরে স্কুলের এক স্যারের কাছে কিছু দিন পড়েছিলাম। স্যারের নামটা মাথায় কোথাও আটকে গেছে, মনে করতে পারছি না, প্লিজ আমাকে অকৃতজ্ঞ ভাববেন না। এমন আমার সাথে প্রায়ই হয়। সেই স্যার অংকের কোন চ্যাপ্টার শুরুর আগে তার পেছনে কথা বুঝাতেন। যেমন, সমীকরণ করাতে গিয়ে, প্রথমেই শুরু করতেন নানা পদি চলক, সমীকরন কি, কেন ইত্যাদি কথা। সবসময়ই তিনি অংক করাতে গিয়ে বাস্তব জীবনের উদাহরণ টেনে আনতেন। এখনও মনে আছে, গ্রাফ করাতে গিয়ে স্যার বলেছিলেন, ‘একটা ছবি হাজার কথা বলে। কাউকে খুজতে গেলে তার চেহারার হাজারটা বর্ণনা দেবার চাইতে, একটা ছবি দেখানোই যেমন যথেষ্ট। তেমনি সমীকরণ নিয়ে হাজার কথা বলার চাইতে তার গ্রাফ দেখিয়ে বুঝানোই সহজ’। আমি তখন একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি যে, অন্য সবার চাইতে আমি স্যারের কথা গুলো স্পষ্ট ভাবে বুঝেছি। কারন বইয়ের অংক যেহেতু সব মুখস্তই ছিল, তাই নিয়ম জানার-বোঝার পরেই, অংক করতে হবে এমন কোন টেনশন আমার ছিল না। স্যার মাঝে মাঝে আমাদের অংক করতে দিতেন যেগুলো বইতে থাকত না, আমি সবসময়ই অন্যদের চাইতে বেশি অংকই করতে পারতাম। কারন হয়ত আমার বইয়ের অংকগুলোর নিয়ম প্রায় মুখস্তই ছিল।
দুইজন শিক্ষকের কাছ থেকে অংক শিখে আমার ধারনা এমন যে, স্কুলের বাচ্চাদের বইয়ের অংকগুলো করিয়ে, প্রতিদিন দেখে দেখে প্রাকটিস করালে এক সময় এমনি এমনি শিখে যাবে। তখন অংকের নিয়ম শেখালে খুব সহজে ক্যাচ করতে পারবে এবং যথার্থ অংক শিখবে। প্রথমেই নিয়ম শিখিয়ে তারপর নিজে নিজে সমাধান করতে দিয়ে অহেতুক কোমল মনে অংকভীতি সৃষ্টি করার কোন অর্থ নেই। পরবর্তীতে ছাত্রছাত্রী পড়াতে গিয়ে (টিউশুনি) আমি দেখেছি, বুঝিয়ে বুঝিয়ে অংক করালে ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে খুব মজা পেলেও তারা অংক করতে পারে না তেমন। প্রথমেই নিজে নিজে অংক করতে দিলে ভয় পাবে এবং অবশেষে পরীক্ষায় ডাব্বা মারবে।
আমার নিজের শিক্ষা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, যেকোন খারাপ ছাত্রছাত্রীর লেখা পড়ায় উন্নতি ঘটাবার সহজ উপায় হচ্ছে তাকে অংকে ভাল নম্বর পাওয়ানো। কারন অন্য বিষয়গুলোতে কিভাবে পড়লে, বা পড়ালে নিশ্চিত ভাল নম্বর পাবে, সেরকম কোন স্টান্ডার্ড পদ্ধতি নেই। কিন্তু সারা বছর প্রতিদিন পাশে বসে দুই একঘন্টা দেখে দেখে অংক করানোটাতো সম্ভব। এভাবে সে আর কিছু না পারলেও যেই অংকগুলো প্রতিদিন করছে সেগুলোতো পারবে। অংকে কয়েকবার ভাল নম্বর পেলে ছাত্রছাত্রীরা ভাববে, অংকে ভাল নম্বর পেলে অন্য বিষয়ে কেন পেতে পারি না? আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং নিজের ভেতর থেকেই চেষ্টা আসবে। আর যে নিজে থেকে চেষ্টা করে সে কখনই ব্যর্থ হয় না।
(বিদ্র: লেখাটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা। বিদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমার কোন ধারণা নেই)
পোস্টের সাথে সম্পর্কহীন মন্তব্য এখানে করুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

