অন্যরকম ঢাকা
১৭ ই জুন, ২০০৯ রাত ১:৫৯
বিলেতের ইংলিশ চ্যানেল, লন্ডনের টেমস্ নদীর নাম সেই ছোটবেলা থেকে শুনেছি। ব্রজমোহন নামের এক ব্যক্তি সাঁতার কেটে ঐ বিলাতি চ্যানেল অতিক্রম করেছিলেন। বিশ্বের অনেক নামী দামী শহর গড়ে উঠেছে কোন না কোন নদীর তীরে। শহরবাসী তাদের সেই সব নদীগুলোকে সাজিয়ে রেখেছেন ছবির মত। সকালে তার তীর ঘেষে চলে তাদের হাটা হাটি, মন খারাপ হলে একাকী নদীর সাথে কাটানো আরো কত কি! সমুদ্র তীরে বিস্তৃত সমুদ্রের বিশালতা মানুষের মনকে নাকি প্রসারিত করে দেয়। সংকীর্ণ চিন্তা ছাপিয়ে বিশালতা জায়গা করে নেয়। অস্থির মন হয় শান্ত। সব নগরের নাগরিক এই সুযোগ পায় না। প্রশস্ত নদীই তাদের সমুদ্রের অভাব মেটায়।
নগর জীবনে বিশালতার স্থান কোথায়? মুখ তুলে কোথাও তাকালে দৃষ্টি কতটুকুই বা প্রসারিত হবার সুযোগ পায়? যে দৃষ্টি কখনও বিশালতার ছোঁয়া পায় নি, সে হয়ত বুঝবে না এর গুরুত্ব। কিন্তু, যে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে একদিন দাঁড়িয়েছিল তার কাছে বিশালতার তৃষ্ণা থাকবে সবসময়। ২০০৮ এর শুরুতে সমুদ্রের বিশালতার ছোয়া পেয়েছিলাম সেন্টমার্টিনে। ফিরতে না ফিরতেই মন জানান দিল তার অতৃপ্তির কথা। কিন্তু হায়! আমি যে ঢাকায় থাকি। তাই বলে কি হাল ছেড়ে দেব? না! হার মানা হারের প্রতি আগ্রহ আমার নাই। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বন্ধুরা তাই বেড়িয়ে পড়তাম বিশালতায় সন্ধানে। কোথায় আর যাব, রাস্তায় হাটা হাটি। প্রতিদিন যেতাম নতুন নতুন পথে, চিনতাম নতুন নতুন রেস্তোরা, নতুন নতুন খাবার। চার দেওয়ালে ঘেরা রুমের চাইতে একদিকে প্রসস্ত রাস্তাই বা কম কিসে!!
এভাবে হাটতে হাটতে একরাতে নতুন এক পথ ধরলাম। কিছুদূর গিয়ে অন্যরকম এক জগতের সন্ধান মিলল। নদীর তীর ঘেষে লম্বা প্রশস্ত রাস্তা, পাশে বড়বড় গাছের কাঠের গুড়ি, তাকে তাকে সাজানো। তারই সামনে একটা অন্য রকম ব্রীজ। ব্রীজটা অন্যরকম এই অর্থে যে এটা নদীর এপার ওপারে না মিলিয়ে নিজেও তীর ঘেষে চলে গেছে। আমাদের ঢাকায় এরকম সময় কাঁটাবার জায়গা আছে জানা ছিল না। রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম, নির্জন অন্ধকার!! মাঝে মাঝে দু একটি গাড়ি দেখা যায়। একপাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ঢাকার বুড়িগঙ্গা, অন্য পাশে পুরোনো দিনের ঢাকার আমেজ। আজ হতে চারশ বছর আগে নদী পথে ইসলাম খান যখন ঢাকাতে আসেন ঢাকার এই এলাকাই তার চোখে প্রথম বাঁধে। তিনি সিদ্ধান্ত নেনে এখানেই মোঘল বাংলার রাজধানী স্থাপনের।
নদী, নিস্তব্ধতা, নির্মল বাতাস এই তিনের সংমিশ্রন এই শহরে পাওয়া আর আলাদিনের চেরাগ পাওয়া একই মনে হল। সব সুন্দরের সাথে আল্লাহ কিছু না কিছু অসুন্দর মিলিয়েই দেন। এখানে আছে ময়লা পানির একধরনের গন্ধ। তবে তা এতটা প্রকট না যে আমাদের দূরে সরিয়ে দেবে। সেই থেকে প্রতি সন্ধ্যায় পৌছে যাই সেখানে। ইদানিং খুব বাতাস বয়, নদীর পানিও বেড়েছে। ভাল লাগে। রাতে যাই, তাই ছবি তুলতে পারি না। পূর্ণিমার রাতে জায়গাটা অন্যরকম হয়ে যায়। নিজেকে আর ঢাকাবাসী মনে হয় না। কাঠ ব্যবসায়ীদের ফেলে রাখা বিশাল বিশাল কাঠের গুড়ির উপর নদীর এক তীরে বসা আমরা অন্য দিকে জাহাজ বানাবার ডকইয়ার্ড। ওপারের একটা ঘাটের নাম "সাগর"। এপারে বসে ওপার হতে মাঝে মাঝে আসা অক্সি এসিটিলিন শিখার আভাস পাওয়া যায়। ডান দিকে তাকালে দেখি বুড়িগঙ্গার উপরের আলুবাজার ব্রীজ বেয়ে চলে যাচ্ছে কতগুলো গাড়ি। বামে তাকালে দেখি বুড়িগঙ্গার পোস্তাগোলা ব্রীজের লাইটপোস্টগুলো। একই সাথে বুড়িগঙ্গার উপরের দুটি ব্রীজ আর একটি ব্রীজের উপর দিয়ে দেখা।
সেখানে আর একটি বিশেষ নজরকাড়া ব্যাপার আছে, সেটা হল র্যাব ১০ এর হেডকোয়াটার। অন্য র্যা ব অফিসগুলোর চাইতে এই হেডকোয়াটারটা আলাদা। যে জানে না তার চোখে কখনই র্যাবের অফিসটা আটকাবে না। সাধারন একটা বাড়ি, ফটক সবসময় বন্ধ। সামনে নেই কোন গাড়ি বা কালো র্যাব পাহাড়ারত। শুধু একটা সাইনবোর্ডে লেখা "র্যাব ১০", নিচে একটা সিসিটিভির ক্যামেরা।
প্রথম দিকে হেটে হেটে জায়গাটার সন্ধান পেয়েছিলাম। যেদিন হাটতে ইচ্ছে করত না আমরা রিক্সা নিতাম। প্রতিদিনই রিক্সাওয়ালার সাথে ঝামেলা বাধত, কারন আমরা ঠিক করে বলতে পারতাম না কোথায় যাব। রিক্সাওয়ালার ভাব বুঝে আন্দাজের উপর ভাড়া ঠিক করতাম। কখনও ঠকতাম আমরা, কখনও বা রিক্সাওয়ালা। একদিন আমরাও চিনে গেলাম। টিকাটুলির বলধা গার্ডেনের মোড় থেকে ফরাশগঞ্জ কাঠপট্টি যাব, বললেই ১৫/২০ টাকায় পৌছে যাওয়া।
মাঝে মাঝে আমি একাকী ঘুরতে বের হই, একেবারে নিসঙ্গ। অনেকের মাঝে একা একা ঘুরতে ভাল লাগে। সেরকমই এক বিকেলে গিয়েছিলাম সেখানে, কিছু তোলা ছবি দিলাম। জায়গাটাতে স্থানীয় ছেলেপুলেরা ছাড়া অন্যরা যায় বলে মনে হত না। ইয়ুটিউবে মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর 'থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার' নাম্বার মুভিতে জায়গাটার একটা দৃশ্য আছে। আমাদের রাজধানীর ভারী জীবনকে একটু হালকা করার অনেক উপকরণ এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমরা চাইলে সেগুলোকে গুছিয়ে নিতে পারি, গড়তে পারি আমাদের এক অন্যরকম ঢাকা।
থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার মুভির এই এলাকাটা বুড়িগঙ্গার তীরে
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): ফরাশগঞ্জ, ঢাকা, বুড়িগঙ্গা ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার কথা বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ১২:১৩ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
আমিনুল ইসলাম বলেছেন:
হায়রে বুড়িগঙ্গা, হায়রে তুরাগ
লেখক বলেছেন: দুইদিন পরে বলব, হায় হায় মেঘনা, হায় হায় সুরমা কুশিয়ারা
লেখক বলেছেন: ![]()
রুবাইয়াত ইসলাম সাদাত বলেছেন:
দীর্ঘশ্বাস!!!!
লেখক বলেছেন: দীর্ঘশ্বাস!!!!
সাঈফ শেরিফ বলেছেন:
আমি যেটা জানি ব্রজমোহন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন যেটি কিনা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মাঝে। টেমস তো লন্ডন শহরের উপর দিয়ে যাওয়া আলাদা একটি নদী। নিজের স্মৃতিতে যা আসে ওটিকে আকারে ছোটই নদী বলা উচিত, আমাদের এক কালের যমুনার মত বিশাল নয় কখনই।
লেখক বলেছেন: উপস্ টেমস আর ইংলিশ চ্যানেল গুলিয়ে ফেলছিলাম। ধরিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ
প্রজন্ম বলেছেন:
ভাই টেমস নদী আমাদের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে পাশে ছোট আর ভাই পানির কথা কি বলব একেবারে ঘোলা। তবে পার্থক্য এটুকুই এরা নদীটাকে সুন্দর রাখতে চেষ্টা করে সবাই।
লেখক বলেছেন: আমাদের বুড়িগঙ্গাটাকেও চাইলে সুন্দর করে রাখা যায় ।
লেখক বলেছেন: ![]()
সহেলী বলেছেন:
আর হায় হায় বলতে চাই না । বলতে চাই আহা ! নদী বাচানোর যে রকম আন্দোলন , পরিকল্পনা শুরু হয়েছে -- আশায় বুক বাঁধি ।
লেখক বলেছেন: আশায় বুক বাধি
লেখক বলেছেন: আসলেই
সোহানা মাহবুব বলেছেন:
ছবিগুলো মন খারাপ করে দিল।ঢাকাকে খুব ভালবাসি,দিন দিন এর দীনতা মন খারাপ করে দেয়।
লেখাটা খুব ভাল লাগলো।
ভাল থাকবেন।
লেখক বলেছেন: আপনিও ভাল থাকুন।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














