প্রত্যেক মেয়ের জীবনেই সংসার একটা বড় অংশ। বিয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে একটা মেয়ে সংসার জীবনে প্রবেশ করে।অবশ্য তার ও আগে বাবার বাড়িতে হাতে খড়ি হয় তার সংসার সামরানোর অভিজ্ঞতার। একজন মেয়ে হিসাবে আমি ও সংসার জীবনে প্রবেশ করেছি প্রায় পাঁচ বছর আগে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মাত্র ২য় বছর পার করেছি। দূর্ভাষী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য একটি বিষয়ে তখন ফাইনাল দিয়েছে। তাকে আমার ও পছন্দ ছিল তাই বাবা মা যখন তা বিষয়ে মতামত চাইল তখন কোন কিচু না ভেবেই সরাসরি মত দিলাম। ডিসেম্বর ২০০৫ এর ১৭ তারিখে আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো সামাজিক ভাবে।
দূর্ভাষী আমার পূর্ব পরিচিত হলেও ১ম দিন খুব ভয়ে ভয়ে কাটতে লাগল। কিন্তু ১ম দিনেই দূর্ভাষী আমার ভয়কে সাহস পরিনত করে দিল। না সদিন আমাকে দূর্ভাষীর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হয়নি। ও বলেছিল আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বের সেখানে কেউ মাথা নীচু করুক ও সেটা চায় না। এরপর কয়েকদিন ওদের বাড়িতে থেকে ফিরে এলাম বাবার বাড়িতে, কিন্তু সময় যেস কাটে না!
দূর্ভাষী তখন সাতক্ষীরায় চাকুরী করে। প্রতিদিন সকালে উঠে দু'জনে মিলে নাস্তা তৈরী, তারপর খেয়ে দেয়ে ও আমাকে মোটরসাইকেল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নামিয়ে দিয়ে তারপর অফিস এ যেত আবার রাত নয়টার মধ্যে বাসায়। আমার ভাবলে ও কষ্ট হত প্রতিদিন আপ ডাইন প্রায় ২০০ কিলোমিটার মোটর সাইকেল চালিয়ে ওকে অফিসে যাওয়া আসা করতে হত। কিন্তু কোন দিন বাসায় ফিরতে আগ্রহের কমতি দেখি নি। ফিরে এসে আবার দু'জনের রান্না করার পালা, আমি কোনদিন রান্না করে রাখলে সেদিন বাসায় কেয়ামত হয়ে যেত। অভিযোগ একটাই পড়াশুনা ছেড়ে কেন আমি রান্না করতে গেছি।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোন সপ্তাহে দু'জনে মিলে চলে যেতাম ওদের গ্রামের বাড়ি আবার কোন সপ্তাহে আমার বাবার বাড়ি।
এভাবে মোটামুটি সূখে কাটতে লাগল আমাদের জীবন। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে দূর্ভাষী ঢাকায় ভাল জব পেয়ে গেল, তাই সাতক্ষীরার চাকুরী ছেড়ে মার্চে জয়েন করল ডি.নেট এ। তখন আমার থিসিস চলছে। সত্যি বলতে কি ও যখন বলল ও ঢাকায় আসছে আমার অবস্থা তখন কাহিল, কারন ওর সহযোগীতা ছাড়া থিসিস শেষ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দূর্ভাষী আমাকে বুঝাল কোন চিন্তা নেই, মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে দুরত্ব কোন বষয় না। ডি.নেটে জয়েন করার পর প্রতি সপ্তাহে ও খুলনায় আসত। আমার পড়াশুনা শেষ হলে আমি ভাবলাম এবার হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, কিন্তু আমি ভাবি এক হয় আর এক। তিনি গো ধরলেন, আর ও পড়তে হবে। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি করে দিলো। আমি ঢাকায় আসি ফেব্রুয়ারী ২০০৯ এ। তারপর ঢাকার বাসায় দু'জনে টুনাটুনির মত সংসার করি। শ্বাশুড়ি মাঝে মধ্যেই চলে আসেন আমার খোজ খবর নিতে।
এবার আমাদের পরিবারের অন্যদের কথায় আসি। আমার শ্বাশুড়ি, বয়স হয়েছে কিন্তু কোন কাজ পূত্রবধুদের জন্য কখনও ফেলে রাখেন না। বরং সবাইকে নিয়ে সুন্দরভাবে কাজটি শেষ করার ব্যবস্থা করেন। আজ পর্যন্ত তিনি আমাকে কখন ও নাম ধরে ডাকেন নি বা বৌমা বলে ও ডাকেন নি। তার একটাই সম্বোধন মা!
দূর্ভাষীর বড় ভাই ভাবী ও তাদের ২ মেয়ে ১ ছেলে। বড় মেয়ে এবার ক্লাস থ্রি তে কিন্তু মজার ব্যাপার হলো সে কখন ও কোন বিষয়ে তার বাবা মার কাছে কোন যআব্দার করে না। যা প্রয়োজন তার চাচা এবং চাচী মার কাছে চাইবে। আমরা বাড়িতে গেলে সারাদিন আমাদের কাছে এমনকি রাতে সে ঘুমাবে ও আমাদের কাছে। অন্য দু'জন ও তার থেকে কম যায় না। দূর্ভাষীর বড় ভাই এর কাছ থেকে পাই বড় ভাইয়ের অকৃত্রিম স্নেহ। আমার ঢাকায় থাকি তারা গ্রামে, কিন্তু ভাইয়া কখন ও শুধু ভাবীর জণ্য কোন কিছু কিনবে না। আমার জন্য ও কিনবে ঠিক একই জিনিস। ভাবী ও খুবই সহজ সরল মানুষ, বড় বোনের মত গাইড করেন, মজা করেন যেন একই সঙ্গে বড় বোন এবং বান্ধবী।
দূর্ভাষীর একটা মাত্র বোন, বয়সে ওর ছোট। বিযে হয়েছে, এক ছেলে এবং এক মেয়ে। মেয়ে বড়। বাচ্চারা মামা-মামী বলতে অজ্ঞান। আমার ননদ যেমন আমার ছোট বোন তেমনি বান্ধবী। ননদের স্বামী কখন ও বাজে কোন রসিকতা তো দূরে থাক রসিকতাই করে না। তার মতে আমরা তার যগুরুজন আমাদের সম্মান তাকে রাখতে হবে এবং খুব বেশী সচেতন সে এ বিষয়ে।
দূর্ভাষী নিজে আমার প্রতি শুধু না সকলের প্রতি খুব বেশী কেয়ারিং। এত ব্যস্ত থাকে তারপর আমার জন্য কখন কি করতে হবে কখন ও আমার বলার প্রয়োজন হয় না। এইতো আজ আমার মাঠ প্রশিক্ষনের প্রথমদিন ছিল, অফিসের নাম জানি কিন্তু পথ ঘাট কিচুই চিনি না। গতকাল বিকালে আমাকে সাথে নিয়ে সে সব চিনিয়ে নিয়ে এসেছে, তারপর ও আজ আমার কেমন যেন টেনশন হচ্ছিল, কিন্তু ওকে কিছু বলিনি। সকালে উঠে বলল ব্যস্ত তৈরী হয়ে নাও আমি তোমার সাথে যাচ্ছি এবং নিজের অপিসে ফোন করে বলল অফিসে আসতে ঘন্টা দেড়েক দেরী হবে। তারপর আমাকে সংগে নিয়ে পৌছে দিয়ে এল এবং তারপর নিজের অফিসে গেল। অফিস থেকে নিয়ম মাফিক প্রতি ঘন্টায় ফোন করেছে, লাঞ্চ করেছি কি না জেনেছে
সত্যি এমন সংসার, স্বামী, শ্বাশুড়ী, ভাসুর, জা, ননদ ও বাচ্চাদের পেয়ে আমি আমার বাবামা ভাই, ভাবী, ভাইপো-ভাইঝিদের একেবারে ভূলে গেছি।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৯ বিকাল ৫:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


