somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার হাওড় ভ্রমন

২৩ শে জুলাই, ২০১৯ সকাল ৮:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একবার কল্পনা করুন তো, আপনি বিস্তৃর্ণ জলরাশি মাঝে কোন এক ট্রলারের ছাদের উপর শুয়ে আছেন আকাশের দিকে তাকিয়ে । আকাশে পূর্নিমার চাঁদটা আলো দিয়ে চারিদিক আলোকিত করে ফেলেছে । চাঁদের আলোতে পাশের পাহাড় দেখতে পাচ্ছেন, পাহাড়ের ছায়া এসে পড়েছে পানিতে । অদ্ভুদ এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে চারিদিকে । আর পাশের নৌকা থেকে ঢোল আর হারমোনিয়ামের সুরে শিল্পের কন্ঠে গান ভেসে আসছে ! পূর্নিমার চাঁদ, পাহাড় জলরাশি আর শিল্পীর গান এই তিনের মাঝে আপনি !
কল্পনা করতে পারছেন ?

উহু, আমি জানি আপনি এই কম্পিউটার মনিটর কিংবা মোবাইলের স্ক্রিন সামনে ধরে এই দৃশ্য কোন দিন কল্পনা করতে পারবে না । আপনার কল্পনা শক্তি যতই ভাল হোক না কেন আপনার পক্ষে এই দৃশ্য কল্পনা করা সম্ভবই না যদি না আমি বাস্তবে নিজে এই স্থানে উপস্থিত না হয়ে থাকেন ।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেশের বিভিন্ন স্থানে আমার ঘুরাঘুরি অভিজ্ঞতা হয়েছে । একেবারে আরামদায়ক ভ্রমন থেকে কোমর পানিতে চলাচল করা, কিংবা এসি কামরা থেকে বাঁশের মাঁচায় বালিশ ছাড়া শুয়ে রাত পার করা, এমন সব ধরনের ট্যুরই আমি করেছি । সেই ট্যুরের খাতায় এই আরেকটা ভ্রমন অভিজ্ঞতা যুক্ত হল ।

টাঙ্গুয়ার হাওড়ে যাওয়ার ইচ্ছে অনেক দিনের । দুইবার চেষ্টা করেও যাওয়া হয় নি । এবারও প্রবল বৃষ্টির ভয়ে সেটা বাতিল হয়ে যাচ্ছিলো প্রায় তবে শেষ পর্যন্ত হাজির হলাম সুনামগঞ্জ । রাতে ঢাকা থেকে ১২টার দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হয় । আমাদের বলতে ট্যুরন্ত ট্রাভেলার্স গ্রুপের যাত্রা । মোট ২৬ জন রওয়ানা দেই । সকালে সুনামগঞ্জ । সেখান থেকে বড় ট্রলার ভাড়া করে আমাদের হাজির হই ট্যাকের হাটে । এই যাত্রাটা ছিল অনেক লম্বা । চারিদিকে যতদুর চোখ যায় কেবল পানি আর পানি । সেই পানির মাঝে আমার ট্রলার ভেসে চলেছে । মাঝে মাঝে কোন বাজার দেখতে পাচ্ছি । কিছু দুর গিয়ে হয়তো দেখা যাচ্ছে এক খন্ড জমির বুকে কয়েকটা বাড়ি ভেসে আছে । ঘাটে নৌকা বাঁধা । ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পানিতে সাঁতার কাটছে । আমাদের দিকে হাত নাড়াচ্ছে । যতই তাকিয়ে থাকি বিরক্তি কিংবা ক্লান্তি আসে না । বারবার কেবল তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে ।

হাওড়ের মাঝেই ট্রলার চলতে চলতে দুপুরের খাওয়া দাওয়া সারতে হয় আমাদের । তারপর ওয়াচ টাওয়ার নামের একটা স্থানে গিয়ে পানিতে নামা হয় । এই ওয়াচ টাওয়ার পাশে আবার ছিল শোয়াম্প ফরেস্ট । এটা একটা বাগানই ছিল । বর্ষার পানি এসে গাছ গুলোর কান্ড ডাল পালা ডুবিয়ে দিয়েছে । তার মাঝে মাঝ দিয়ে ছোট ছোট নৌকা ভ্রমন করা যাচ্ছে ।

রাতে আমরা পৌছে যাই ট্যাকের হাটে । স্থানীয় বাজারে হাটা চলি করি কিছু সময় । চা খাওয়া হয় । রাতে আবারও ফিরে আসি ট্রলারে । এই ট্যাকের ঘাটে আমাদের মতই আর কত ট্রলার এসে হাজির হয়েছে রাত্রীযাপনের জন্য। আমাদের ট্রলারটা নিয়ে যাওয়া হয় ঘাট থেকে বেশ খানিকটা দুরে । তারপর সেখানে শুরু হয় সাথে করে নিয়ে আসা শিল্পীর গান । পূর্নিমার রাত, রাতের নির্জনতা ভেদ করে, ঢোলের আওয়াজ আর শিল্পীর কন্ঠে গান - সত্যি বলতে আমার জীবনে এর থেকে চমৎকার অভিজ্ঞতা আর আছে কি না আমার ঠিক এই মূহুর্তে মনে পড়ছে না । আমি এক মনে গান শুনতে থাকি আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে । আমার ঘোর লেগে যায় । যান্ত্রিক জীবনের সব ক্লান্তি, হাঁপিয়ে ওঠা মন সব ধুয়ে মুছে পরিস্কার হয়ে ওঠে । বারবার মনে হতে থাকে এই বেঁচে থাকা কি অদ্ভুদ সুন্দর !


ট্যাকের ঘাটের একদম কাছেই নীলাদ্রী লেক । সকালে সেখানেই কিছু সময় হাটাহাটি । নৌকাতে করে লেক ভ্রমন । তারপর সকালের নাস্তা শেষ করে আবারও ট্রলার ভ্রমন । সেখান থেকে আমরা হাজির হলাম শিমুল বাগানে । শিমুল বাগান থেকে বারেক টিলা তারপর সেখানে ট্রলার থামিয়ে গোসল । দুপুরে খাওয়া শেষ করে আবারও সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়া । আবারও চারিদিকের সেই সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে ফিরে আসা ।

এই মোটামুটি দুই দিন আর এক রাতের হাওর ভ্রমন । এই দুইতিন পুরোটা সময়ই আমরা ছিল ট্রলারে হাওড়ের মাঝে । ট্রলারেই খাওয়া দাওয়া ট্রলারেই ঘুম আর অন্য সব কাজ কর্ম সব কিছুই এই ট্রলারে । এই অভিজ্ঞতা আমার একেবারে নতুন । এর আগেও নদী ভ্রমন করেছি কিন্তু পুরোপুরি ট্রলারে বসবাস একেবারেই এই প্রথম ।

তাছাড়া এইবার আরেকটা নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এইবারই কোন অচেনা গ্রুপের থাকে কোথাও ঘুরতে গিয়েছি । এর আগে যত স্থানে ঘুরতে গিয়েছি তার সবই ছিল পরিচিত মানুষজনের সাথে । কিন্তু এইবার ট্যুরন্ত ট্রাভেলার্স নামে একটা ফেসবুক গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে হাজির হয়েছিলাম । সাথে ছিলো আমার পরিচিত দুইজন বন্ধু । এইবারই যেহেতু প্রথম ছিল এমন অভিজ্ঞতা তাই এক্সপেক্টেশন জিরো নিয়ে হাজির হয়েছিলাম । কিন্তু গ্রুপ ওর্গানাইজারদের ব্যবস্থপনা আমাকে খুবই সন্তুষ্ট করেছে । এই ট্যুর টা কোন আরামদায়ক ভ্রমন ছিল না । ইভেন্টের শুরুতেই পুরো ট্যুরে কি কি হবে আর কি কি হতে পারে সেই সম্পর্কে পুরোপুরি বর্ণনা দেওয়া ছিল । আমরা তাই মানসিক ভাবে প্রস্তুতিই নিয়ে গিয়েছিলাম যে এই ব্যাপার গুলোই আমাদের সাথে হবে । যেমন আমরা জানতামই যে আমাদের রাতে ঘুমাতে হবে ট্রলারের ভেতরে । সেখানে আরামদায়ক মেট্রেস পাওয়া যাবে না কোন রকম তোষক কিংবা কেবল চাদর বিছিয়েই ঘুমাতে হবে । এই সব কিছু আগে থেকেই আমাদের জানানো হয়েছিলো ।

গ্রুপ লিডার রিয়াদ ভাই আর আসিফ ভাইয়ের কথা না বললেই না । শান্ত স্বভাবের হাসিখুশি রিয়াদ ভাই যা যা বলেছিলেন তার থেকেও বেশি করেছেন আমাদের জন্য । মাত্র এক দিনের পরিচয়ে রিয়াদ ভাইয়া যতটা আন্তরিকতা আমাদের সাথে দেখিয়েছে যে মনে হয়েছে এই মানুষটার সাথে আমাদের মোটেই একদিনের পরিচয় নয় । যেন কত দিন ধরে আমাদের চেনা জানা । বলবো না যে ট্যুরে আমাদের জন্য খুব আরাম আয়েশের ব্যবস্থা ছিল কিন্তু ঐ প্রত্যন্ত অঞ্চলে এভেইলএবেল সবোর্চ্চ আরাম সব থেকে বেশি সুবিধার ব্যবস্থা রিয়াদ ভাই আমাদের জন্য করেছেন । যারা দল বেধে ঘুরে বেড়ান এবং যারা ট্যুরের দায়িত্যে থাকেন তারা জানেন যে একটা ট্যুর ওর্গানাইজ করা এবং সেটা সামলানো কতটা ঝামেলার কাজ । এমন কি পরিচিত সব মানুষকে ট্যুরের মাঝে সন্তুষ্ট করা কতখানি কষ্টের কাজ । সেখানে ২৬ জন অপরিচিত মানুষকে সামলে নিয়ে যাওয়া আবার ঘুরিয়ে নিয়ে আসা সহজ কোন কাজ নয় ! ভবিষ্যতে রিয়াদ ভাইয়ের সাথে আরও ট্যুর দেওয়ার ইচ্ছে রয়েছে ।

রিয়াদ ভাইদের একটা ফেসবুক গ্রুপ আছে ট্যুরন্ত ট্রাভেলার্স নামে । ট্যুরন্ত এই পর্যন্ত ৪৫টারও বেশি ট্যুর ওর্গানাইজ করেছে । তার ভেতরে ১৫টার মত দেশের বাইরের ট্যুর । প্রায় প্রতিমাসেই ভাইয়াদের একটা কিংবা দুইটা ট্যুর প্লান থাকেই । যারা ঘুরতে পছন্দ করেন তারা এখানে যুক্ত হয়ে যেতে পারেন । সকল খোজ খবর নিয়ে ব্যাটে বলে মিল্লেই দুইচার দিনের ছোট ট্যুর দিয়ে আসতে পারেন । অত্তত এই টুকু জোর দিয়ে বলতে পারি যে পুরো ভ্রমন জুড়ে ট্যুরন্ত আপনাকে এভেইলএবেল সর্বোচ্চ সুবিধা সরবারহ করবে।


ট্যুরন্ত ট্রাভেলার্স গ্রুপ
তাদের ফেসবুক পেইজ


ট্যুরের কিছু ছবি



হাওড়ের বুকে সুর্য অস্ত যাচ্ছে


যাত্রার শুরুতে


যাত্রা পথে


যাত্রা পথে


যাত্রা পথে


যাত্রা পথে



নীলাদ্রী লেক



বারেক টিলা থেকে ভিউ



চারিদিকের পানি মাঝে একটুকু ঘর


বাঁশ নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে


নিঃসঙ্গ একলা মাঝি



আমাদের টিম লিডার রিয়াদ ভাই গভীর চিন্তায় মগ্ন


আমাদের ভ্রমন সঙ্গী পানিতে লাফ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত


সব শেষে আমি




সবার ভ্রমন আনন্দময় হোক !
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০১৯ সকাল ৮:৪৭
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শুভ জন্মদিন প্রিয় ত্রিরত্ন।

লিখেছেন এস.কে.ফয়সাল আলম, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:৩৫



আজ যখন ঢাকাগামী ট্রেনের সিটে বসে মোবাইল থেকে এই পোষ্ট লিখছি, তখনও প্রিয় সামু ব্লগ দেশের বেশিরভাগ ISP তে ব্লক! ব্লগের সেই চিরচেনা দিনগুলি আস্তে আস্তে যেন স্মৃতিগত হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুই পাগলের ঝগড়া

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:৫৫


শহীদ্লু ইসলাম প্রামানিক

দুই পাগলে গাছের নিচে
করছে বাড়াবাড়ি
হায়! হায়! হায়! করছে একজন
আরেকজন আহাজারী।

এমন সময় এক পাগলে
দিল গালে চড়
শব্দ হওয়ায় আরেক পাগল
পেল ভীষণ ডর।

ডরের চোটে বলছে পাগল,
এমন করলি কেন
এটম বোমের মতই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে কূটনামীগুলো করলে আপনি ক্ষমতা লাভ করবেন ! :P

লিখেছেন রাকু হাসান, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১০:৪১




সব কিছুই একটা নিয়মের মধ্য থেকেই করতে হয় । কূটনামী কিংবা ক্ষমতাবান হওয়ারও কিছু নিয়ম আছে ।
সেগুলো নিয়েই আজকের পোস্টে গোপন সূত্র শেয়ার করবো ;) । যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কুটুম

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ১৭ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ১১:২৬



শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমার বেহালার সুর শুনতে ইচ্ছে করে। বেহালা যে আমি খুব ভালোবাসি তা নয়। তবে শেষ রাত সময়টা রহস্যময়। এ সময় মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পছন্দ-অপছন্দের ভার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলফোর রোড টু কাশ্মীর ! : সভ্যতার ব্লাকহোলে সত্য, বিবেক, মানবতা!

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪০

ফিলিস্তিন আর কাশ্মীর! যেন আয়নার একই পিঠ!
একটার ভাগ্য নিধ্যারিত হয়েছিল একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে; আর অন্যটি অতি সম্প্রতি ২০১৯ এ!
বর্তমানকে বুঝতেই তাই অতীতের সিড়িঘরে উঁকি দেয়া। পুরানো পত্রিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×