আমার সাধ্য নেই পিঙ্ক ফ্লয়েড সাথে বাউল ভক্তিদাসের কোনো তুলনা বের করার। গোষ্ঠ গোপালের সাথে কিভাবে আমি রিচার্ড মার্কসের তুলনা করবো। আমাদের নগর সভ্যতা আমাদের গায়কদের/নায়কদের মধ্যে এনেছে সামাজিক বৈষম্য। অচেতন ভাবেই আমাদের বোধের মধ্য থেকে বিতাড়িত হয়েছে, শেকড়ের গাথূঁনি। গ্রামীন সংস্কৃতিকে খেত হিসাবে খেতাবিত করে জাতের উঠার আপ্রাণ চেষ্টায় মাসকারায় ঢাকা পড়েছে কাজল কালো চোখ। জীবনভর জীবন ব্যয় করে, অনাহার-অর্ধাহারে, সংসার-লোভ-লালসা ছেড়ে কাচাঁ সড়কের উপর কিংবা রেললাইনের ধারে জমায়েত জনতার দিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য যারা গাইলেন-জীবনের কথা, মানুষের কথা, দেশ প্রেমের কথা-তাদের আমরা কোথায় রেখেছি। এটা কি আমাদের সচেতন অবহেলা? নাকি সময়ের নির্মম বাস্তবতা?
লিংকসহ বিখ্যাত কিছু মাটি ও মানুষের গান নিয়ে কথা বলবো আজ।
সাজু, তারপর জসিম উদদীন আর কিছুদিন আগে পৃথিবী ছেড়ে গেলেন নায়ক রুপাই। নিশ্চয় নকঁশী কাঁথার মাঠ-এর কথা মনে পড়ছে আপনাদের। এই করুণ কাহিনীকে অবলম্বন করে পাগল বিজয় সরকার লিখেছিলেন এবং বাণী চক্রবর্তী গেয়েছিলেন-
‘‘নকঁশী কাঁথার মাঠের লোকে আজো শুনতে পায়-সাজুর ব্যথায় রূপাই মিয়া বাশঁরী বাজায়”
জীবনের প্রতিষ্ঠা আর নুন্যতম বেচেঁ থাকার প্রয়োজনে বৃহত্তর সিলেট থেকে কোলকাতায় চলে গেলেও যিনি ভুলে যাননি, হাওড়ের তাজা মাছ, সুনামগঞ্জের কুড়া আর হবিগঞ্জের কইতরকে। নিজের ভিতর দেখেছেন এই বাংলাদেশকে। ক্লান্ত নগর জীবনের নিঃসঙ্গ রাতে বাউল স্বাগতদাস গেয়ে উঠেন-
‘‘…………………………… বাধঁতে সুখের ঘর-ডানা ভেঙ্গে পড়লাম আমি কোলকাতার ’পর।
দাদীর বিয়ে হয়েছিলো গরুর গাড়ীতে করে-এই গল্প শুনতে শুনতে খুব ইচ্ছা হতো গরুর গাড়ীতে গ্রাম ঘুরবো, হয়নি। কিন্তু বন্ধ চোখে গরুর গাড়ীর অসাধারণ একটি দৃশ্য চোখে পড়ে বাউল পরীক্ষিত বালার এই গানটি শুনে-
‘‘কৃষান কন্যা কলসি কাখে জল আনতে যায়, ঘোমটার ফাঁকে নতনা দিয়ে বারেক ফিরে চায়।”
ডিজিটাল প্রেমিক হতে পারেননি বাউল আমির উদ্দিন কিন্তু তার প্রেম নিশ্চয় কম ছিলোনা। বিরহ যন্ত্রনাবিদ্ধ বাউল অতি সাধারণ ভাবে নিজের কষ্টগুলোকে কিভাবে প্রিয়তমাকে বুঝাতে চাচ্ছেন, শুনুন তার কাছ থেকে-
‘‘বলে আমি আমির উদ্দীন, রয়েছি তব অধীন”
তবুও এই বাংলার ফ্যাশনেবল প্রেমিকদের বিরহ শেষ হয়না-অনিবার্য্য হিসাবেই থেকে যায় হৃদয়ে। অবশ্য যাদের হৃদয় আছে তাদের কথাই লিখলেন রাধারমন। অসাধারণ এই গানটি গাইলেন কালা মিয়া বাউল-
‘‘প্রাণতো বাঁচেনা শ্যাম, তুমি বিনে”
বাংলার ঘরে ঘরে নির্যতিত আমাদের কন্যা/ভগিনী বেহুলারা জীবনভর সাজাভোগ করছে নদের চাঁদের ভুলের মাশুল দিতে। কোনো অপরাধ ছাড়াই কেন বেহুলাকে বিধবা হতে হবে? লখীন্দরদের বাচাঁতে, নিজেকে সবল প্রমান করতে সকল বেহুলাকে জাগিয়ে দিতে। ক্ষণজন্মা বাউল গোষ্ঠ গোপাল গেয়ে উঠেন-
‘‘ঘুমাইও না আর বেহুলা, জাইগ্যা দেখো রে”
বিবাহের জন্য আমাদের পাত্রদের বাহারী যোগ্যতাকে কিভাবে মূল্য দিবে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা চরিত্রহীন হলেও নেতা>মন্ত্রী হয়ে কিভাবে যোগ্যতার প্রমান দেয়া যায়-বাউল স্বপনবসুর কাছ থেকেই শুনুন-
‘‘এমনিতে ভালো ব্রাম্মণছেলে, মাঝে মাঝে একটু পেয়াজ খায়”
এই লম্পট যখন রাজনীতিবিদ হয়, তখন সাধারণ মানুষকে কিভাবে বিভ্রান্ত করে, আমাদের ভারতবর্ষের নেতাদের সার্বিক চরিত্র বুঝানোর জন্যই স্বপন বসু গেয়ে উঠেন-
‘‘ওরে ভাইরে ভাই, মোর মতন আর দেশপ্রেমিক নাই,
অথচ মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে আমি/আমরা কি করলাম নিজের জন্য কিংবা দেশের জন্য। কিন্তু অতি সাধারণ বাউল হারাধন দাস তার দায়িত্ববোধ আর বিবেকের দায় নিয়ে গেয়ে উঠেন-
‘‘বাল্যকাল গেলো খেলাতে, যৌবনকাল গেলো রসে”
যে গান শুনে আমাদের নানারা প্রেমে পড়েছিলেন, শব্দহীন কেবল চেয়ে থাকার প্রহর গুলো তাদের কাটতো স্বপ্না চক্রবর্তীর কোকিল কণ্ঠ শুনে। স্বপ্না যেন নানী হয়ে গেয়ে উঠেন-
‘‘আমি তোমারই নয়নে নয়ন রাখিয়া, সবই যে যাই ভুলে”
প্রচারবিমুখ অমর পাল সাতক্ষীরা বর্ডার পার হয়ে নিরবে সিডর আক্রান্ত বাংলাদেশীদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য দিয়ে ফিরে যান ভারতে, অথচ তখন মিলারা ফ্যান্টাসীতে উদ্দাম নৃত্যরত। অমর পালের কন্ঠে কেবল কীর্তনই যেন মানায়। বন্দনা সঙ্গীত নিয়ে কৃষ্ণকে স্মরণ করে তিনি গেয়ে উঠেন-
‘‘জাগো জাগো জাগো হে নগরবাসী।”
কিন্তু এ নগর জীবনে অতিষ্ট বাউল বাড়তি জনসংখ্যার দিকটি তুলে ধরেণ একটি নিত্য যন্ত্রনার মেশিন হিসাবে, তবুও আমাদের সংগ্রাম চলছে, চলবে-
‘‘আমি বনগাঁ লোকালের ডেইলি প্যাসেঞ্জার”
সাধক তার সাধনার শেষ পর্যায়ে এসে সন্দেহ পোষন করেন ভগবানের অস্তিত্ব নিয়ে। জানাতে চান নিজের সীমাবদ্ধতার কথা। নিজের অক্ষমতাকে স্বীকার করে গেয়ে উঠেন-
‘‘আমি দেখিনি নয়নে, শুনেছি শ্রবণে, তুমি আছো কিনা আমার জানা নাই।
এই পোস্টটিতে প্রত্যেকটি গানের লিংক দেওয়া হলো। যদি পোস্টটি গ্রহণযোগ্যতা পায় তাহলে আগামীতেও এরকম মাটির গান নিয়ে পোস্ট দেওয়ার আশা আছে। ব্লগারদের মতামত প্রত্যাশা করছি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


