somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বরী ------ ঘটনার অন্তরালে ৩ :: তানবীরা তালুকদার

কাদম্বরীর মৃত্যুর পর তার আশেপাশের সমসাময়িক ঘটনার টুকরো গুলো জোড়া দিলে একটা সামগ্রিক ছবি তৈরী করা হয়তো সম্ভব হবে। হয়তো কোন একটি মনোপীড়া থেকে নয়, সম্মিলিত কয়েকটি মানসিক ধাক্কা তার পক্ষে সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কষ্টের ঝরনাগুলো হঠাৎ আঘাতে নিজেকে হারিয়ে দুকূল প্লাবিত করে চলে গেলো। জ়্যোতিরিন্দ্র বেশ খাম খেয়ালী মানুষ ছিলেন। কিছুটা সংসার উদাসীনও ছিলেন। নতুন নতুন নাটক, গান লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, নিজের যা ভালো লাগতো তাকেই প্রাধান্য দিতেন। তারউপর সত্যেন্দ্রনাথ - জ্ঞানদানন্দিনী তখন কোলকাতায় ফিরে এসেছেন। তাদের সাহচর্য, তাদের ছেলেমেয়েদের সাহচর্য তাকে কিছুটা স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে সরিয়েও এনেছিল। জ্ঞানদানন্দিনীর উগ্র আধুনিক চলাফেরার প্রতি জ়্যোতিরিন্দ্রের মোহ জন্মেছিল। তিনি অনেকটা সময়ই সেই বাড়িতে পরে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথের ভাতিজি ইন্দিরা কাদম্বরীর মৃত্যু সম্পর্কে লিখেছেন, “জ্যোতিকাকামশাই প্রায়ই বাড়ি ফিরতেন না। তার প্রধান আড্ডা ছিল বিজিতলাওয়ে আমাদের বাড়ি। আমার মা জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে ওর খুব ভাব ছিল”। এরই মধ্যে একদিন অভিমানীনি কাকীমা তাকে বলেছিলেন তাড়াতাড়ি ফিরতে। গানে গানে আড্ডায় আড্ডায় সেদিন এত দেরী হয়ে গেলো যে কাকাবাবুর আর বাড়িই ফেরা হলো না। প্রবল অভিমানে কাকীমা ধ্বংসের পথ বেছে নিলেন।

আবার রবীন্দ্রনাথের ছোটবোন বর্নকুমারীকে প্রশ্ন করে অমল হোম শুনেছিলেন, তখনকার দিনের বিখ্যাত অভিনেত্রী মতান্তরে নটী বিনোদিনীর সাথে জ়্যোতিরিন্দ্রের ভীষন অন্তরংগতা জন্মেছিলো। জ়্যোতিরিন্দ্রের কোটের পকেট থেকে কাদম্বরী বিনোদিনীর কয়েকটি চিঠি পান, যেগুলো তাদের মধ্যের অন্তরংগতার স্বাক্ষরই বহন করে। সেই চিঠিগুলো পেয়ে কাদম্বরী সংসারে নিস্পৃহ সময় কাটান বেশ কিছুদিন এবং তার পর পরই আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গিয়েছিলেন, এই চিঠি গুলোই তার মৃত্যুর কারন, মহর্ষির আদেশে সেই চিঠিগুলো ও সাথে কাদম্বরীর লেখা আত্মহত্যার স্বীকারোক্তিটি নষ্ট করে ফেলা হয়। কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছেন যে, তিনি ঠাকুরবাড়ির একজন বিশ্বস্ত ব্যাক্তির কাছে শুনেছেন, যে মহিলার সাথে জ়্যোতিরিন্দ্রের অন্তরংগতা জন্মেছিল তিনি অভিনেত্রী নন, কিন্তু তার কারনে আগেও একবার কাদম্বরী আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছিল। তবে তৎকালীন রুচি ও রীতির পরিপ্রেক্ষিতে জ়্যোতিরিন্দ্রের কোন থিয়েটারের অভিনেত্রী কিংবা নটীর সান্নিধ্যে আসাও বিরাট কিছু ব্যাপার নয়।

নিঃসন্তান কাদম্বরীর মধ্যে একটি সন্তানের জন্য তীব্র আকাংঙা ছিল। তিনি শিশুদেরকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। জানকীনাথ ও স্বনর্কুমারীর ছোটমেয়ে ঊর্মিলাকে নিজের কাছে রেখে সন্তান স্নেহে মানুষ করছিলেন তিনি। তার কাছেই ঊর্মিলা বড় হচ্ছিল তার মেয়ে হয়ে। একটু বড় হয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করার দুমাসের মধ্যেই তেতলার সিড়ি থেকে একা নামতে গিয়ে ঊর্মিলা পড়ে যায় এবং মারা যায়। এই ঘটনাটি কাদম্বরীর কোমল মনে যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করেছিল। তারপরেও সংসারের কাজকর্ম, স্বামী সেবা, সংগীত, সাহিত্য চর্চা ইত্যাদি দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে, ভুলে থাকতে চাইলেও শেষ রক্ষা তিনি করতে পারেন নি। সে সময়ই সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনীর কোলকাতার বাসায় , রবীন্দ্রনাথ ও জ়্যোতিরিন্দ্র তাদের বেশীরভাগ সময় কাটাতেন। এরি মধ্যে আবার রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করাতে কাদম্বরীর নিঃসংগতা প্রচন্ড বৃদ্ধি পায় যা থেকে তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ও আত্মহত্যার পথটিকেই বেছে নেন।

বাড়িতে কাপড় নিতে আসত বিশ্বেশ্বরী তাতিনী বা বিশু তাতিনী। সেই বিশুকে দিয়েই লুকিয়ে আফিম এনে, খেয়ে তিনি মনের জ্বালা জুড়ান। কাদম্বরীর মৃত্যু নিয়ে তৃতীয় কোন অনুমানের চেয়ে, পারিপ্বার্শিকতার বিচারে বর্নকুমারী বর্নিত কিংবা ইন্দিরার লেখা ঘটনাগুলোই বড় বেশী বাস্তব। কিশোর রবীন্দ্রনাথ জানতেন তার নতুন বৌঠানের সেই গোপন মনোকষ্টের কথা। তার “তারকার আত্মহত্যা”তে তিনি লিখেছেন,

“যদি কেহ শুধাইত, আমি জানি কী যে সে কহিত
যতদিন বেচে ছিল, আমি জানি কী তারে দহিত”

সমসাময়িক অনেক কবিই কাদম্বরীর অকাল মৃত্যুকে নিয়ে জ়্যোতিরিন্দ্রের উপর যথেষ্ট বিরক্ত ছিলেন। তাদের অনেকেই সে সময় জ়্যোতিরিন্দ্রকে ব্যংগ করে অনেক কবিতা লিখেছিলেন। তাদের কেউ কেউ কোন রাখ ঢাক ছাড়াই স্ত্রীকে অবহেলার জন্য জ়্যোতিরিন্দ্রের সমালোচনা করেছিলেন। কাদম্বরীর কাছ থেকে আসন উপহার পাওয়া কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী জ়্যোতিরিন্দ্রের পরনারী আসক্তি নিয়ে শালীনতার আড়াল না রেখেই লিখেছিলেন,

“পুরুষ কিম্ভুতমতি চেনে না তোমায়, মন প্রান যৌবন
কি দিয়া পাইবে মন, পশুর মতন এরা নিতুই নতুন চায়।“

সেসব কবিতা, রচনা, সমসাময়িক ব্যাক্তিদের সাক্ষ্য, আলোচনা ইত্যাদি থেকে ধারনা করা যায় কাদম্বরীর মৃত্যুর সাথে রবীন্দ্রনাথের বিয়েকে জড়িয়ে যে অনুচিত কল্পনা করা হয় তার আসলে কোন ভিত্তি নেই।

(চলবে)
০৭.০৭.০৮
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28823219 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28823219 2008-07-23 04:25:54
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বরী ঘটনার অন্তরালে ২
ছাদের উপর কাদম্বরীর সাজানো বাগানে সন্ধ্যাবেলা বসত পরিপাটী গানের আসর। মাদুরের ওপর তাকিয়া, রুপোর রেকাবে ভিজে রুমালের ওপর বেলীফুলের গোড়ের মালা, গ্লাসভর্তি বরফপানি, বাটা ভর্তি ছাচি পান সাজানো থাকতো সবার জন্য। কাদম্বরী সেজে গুজে বসতেন সেখানে, জ্যোতিরিন্দ্র বাজাতেন বেহালা, রবীন্দ্রনাথ ধরতেন গান, যার আবেশ হয়তো সে ছাদকে অতিক্রম করে আরো চারধার ছুয়ে যেতো, “ফুলের বনে যার পাশে যাই, তারেই লাগে ভালো .........”। কিশোর রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক সৌন্দর্য চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে এই পরিবেশ, এই সৌন্দর্য দৃষ্টি কল্পনার একান্ত প্রয়োজন ছিল, যা আমরা পরে রবীন্দ্রনাথের লেখায় ফিরে ফিরে দেখতে পাই। কাদম্বরী নিজেও ভালো গায়িকা ছিলেন, বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের পৌত্রী তিনি, গান ছিল তার রক্তে। তিনি আসার সাথে সাথে তিনতলায় শুধু পিয়ানো আসেনি, জ্যোতিরিন্দ্রের আর রবীন্দ্রনাথের অনুশীলনও শুরু হয়ে গিয়েছিল। শুধু গানই ছিলো না, সেখানে বসত রীতিমতো সাহিত্যপাঠের আসর। আসরে যোগ দিতেন বাড়ীর অনেকে, বাইরে থেকে আসতেন অক্ষয় চৌধুরী ও তার স্ত্রী শরৎকুমারী, জানকীনাথ, আর মাঝে মাঝে আসতেন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। জ্যোতিরিন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও স্বর্নকুমারী ছিলেন এই সভার স্থায়ী সদস্য। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী’র কবিতা কাদম্বরী খুব ভালোবাসতেন। তাকে প্রায়ই দাওয়াত করে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতেন তিনি, কবির নিজের কবিতার কয়েকটি লাইন লিখে, আসন বুনে কবিকে উপহার দেন কাদম্বরী দেবী।

কাদম্বরী একজন সুঅভিনেত্রীও ছিলেন। নাট্যরসিক জ্যোতিরিন্দ্রের মন আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল গুনবতী স্ত্রীকে পেয়ে। একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে মাটির উঠোনে জ্যোতিরিন্দ্রের লেখা প্রহসন “এমন কর্ম আর করব না”তে প্রথম অভিনয় করলেন কাদম্বরী। রবীন্দ্রনাথ নায়কের ভূমিকায় ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রথম বিলেত যাত্রার আগে এই প্রহসনটি সফলভাবে অভিনীত হয়। এরপরে “বসন্ত উৎসব” , “মানময়ী”তেও কাদম্বরী ভাল অভিনয় করেছিলেন। কাদম্বরীর প্রধান পরিচয় তিনি অসাধারন একজন সাহিত্য প্রেমিক ছিলেন। তিনি শুধু সময় কাটাবার জন্য বই পড়তেন না, তিনি এক কথায় সেগুলোকে উপভোগ করতেন। তবে নিজে পড়ার চেয়ে শুনতে ভালোবাসতেন বেশী। দুপুরে রবীন্দ্রনাথ পড়ে শোনাতেন তাকে, হাত পাখা নিয়ে হাওয়া করতেন কাদম্বরী। “ভারতী” পত্রিকা নিয়েও তার ভাবনা ছিল। ছাপার হরফে “ভারতী”তে কোথাও তার নাম নেই সত্যিই কিন্তু তিনিই ছিলেন ওই পত্রিকার প্রান। তিনি মারা যাওয়ার পর সেটা আরো প্রকট হয়ে সকলের কাছে ধরা পড়ে। দ্বিজেন্দ্রনাথ সম্পাদক, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দেখাশোনা করতেন, রবীন্দ্রনাথ লিখতেন তাহলে কাদম্বরী কি করতেন? শরৎকুমারীর ভাষায়, তিনি ছিলেন “ফুলের তোড়ার বাধন”। সবাইকে একসঙ্গে তিনি বেধে রাখতেন, সবার অলক্ষ্যে। বাধন যেদিন ছিড়ল, সেদিনই সবাই সেটি অনুভব করল।

রবীন্দ্রমানস গঠনে এই নারীর দান চিরস্মরনীয়। তার কবি হয়ে ওঠার মূলে আন্তরিক চেষ্টায় ছিলেন কাদম্বরী। কাদম্বরী সব সময় রবীন্দ্রনাথকে উসকে দিতেন, “ রবি সবচেয়ে কালো দেখতে, গলার যে কি অবস্থা, ওর চেয়ে সত্য ভালো গায়, ও কোনদিন গাইতেই পারবে না”। আরো বলতেন, “কোনকালে বিহারী চক্রবর্তীর মতো লিখতেও পারবে না”। রবীন্দ্রনাথের তখন শুধু চেষ্টা থাকতো কি করে এমন হবেন যে, বউদিদি আর কোন দোষ খুজে পাবেন না তার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ তখন বুঝতে পারতেন না, সেই সাধনাটিই করছে কাদম্বরী, যাতে কেউ কোনদিন রবীন্দ্রনাথের দোষ খুজে না পায়। যখন রবীন্দ্রনাথ এটি উপলব্ধি করলেন তখন চিরতরে হারিয়ে গেছেন বউদিদি। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার প্রদীপে তেল সলতে লাগিয়ে আলো জ্বালাবার কাজ তখন সারা। কিন্তু প্রিয় বউদিদি তখন চির অন্ধকারে, হয়তো তাই কবির কন্ঠে বাজে,

নয়ন সমুখে তুমি নাই
নয়নেরই মাঝখানে নিয়েছো যে ঠাই

রবীন্দ্রনাথের বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তার অকাল মৃত্যু হয়। ঘটনাটা আকস্মিক হলেও অভাবনীয় নয়। তীব্র অভিমানীনি কাদম্বরী এর আগেও আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। তিনি প্রচন্ড ইন্ট্রোভার্ট, সেন্টিমেন্টাল ও স্কিজোফ্রেনিক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়তো তার মন বেদনার একটা কারন ছিল কিন্তু সেটার কারন বালিকা মৃনালিনী ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে কাদম্বরীর বিপুল উৎসাহ ছিল। কিন্তু তারপর আকস্মিকভাবেই তিনি চুপ করে গেলেন, কেনো? তাহলে কি পাত্রী নির্বাচন নিয়ে মতান্তর হয়েছিল তার কারো সাথে? ভবতারিণীকে মৃনালিনী করে তোলার ভার নীপময়ী মতান্তরে জ্ঞানদানন্দিনী পেলেন কেনো? প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যুর কারন হচ্ছে, মহিলাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পরিনাম”। সম্ভবত জ্ঞানদানন্দিনীর সাথেই তার মতান্তর হয়। হয়তো আরো কারন ছিল। কিন্তু বহিঃপ্রকাশ ঘটল এই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এই সুরসিকা, রুচিশীলা, প্রতিভাময়ী নারীর জীবনেও শান্তির অভাব ছিল। সন্তানহীনতার ব্যাথা তার এই অভিমানকে হয়তো আরো তীব্র করে তুলেছিল। সেকালে বন্ধ্যা নারী ছিলেন উপেক্ষার পাত্রী। সমাজে সংসারে কোথাও তার তেমন কোন কদর ছিল না। কাদম্বরীও ঠাকুরবাড়ীর বৃহৎ সংসারে তার নিজের যথার্থ স্থানটি কখনও পাননি। নিজের এই মর্মজ্বালার কথা তিনি কাউকে প্রকাশ করে বলতেও পারেন নি। এই জন্য কাদম্বরীর মৃত্যুর পর সমসাময়িক অনেক লেখক কবিই তাদের লেখায় জ্যোতিরিন্দ্রকে দায়ী করেছিল। নিঃসন্তান স্ত্রীর শুন্যতা ভরিয়ে দেয়ার জন্য স্বামীর যতোখানি মনোযোগের প্রয়োজন ছিল তিনি হয়তো তা ছিলেন না।

(চলবে)
০৪.০৭.০৮
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28818847 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28818847 2008-07-10 13:52:15
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাদম্বরী ------ ঘটনার অন্তরালে :: তানবীরা তালুকদার
মানুষের সাথে মানুষের অনেক ধরনের সম্পর্ক থাকে। নর ও নারীর সম্পর্ক ও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়। একটা সময় হয়তো ছিল নর - নারীর মধ্যে সামাজিক লেখা পড়ার বাইরে অন্য কোন ধরনের সম্পর্কের কথা ভাবাই যেতো না। সভ্যতার সাথে যুগে যুগে মানুষ তার সম্পর্কগুলোকে আলাদা নাম দিতে ও ব্যাখা করতে শিখেছে। তারপরও একটা কথা থেকেই যায়। সব সম্পর্ককেই কি সব সময় ভাষায় ব্যাখা করা যায়? নাকি সব ভালোলাগাকেই চিরাচরিত নাম ভালোবাসা বা প্রেমের আবরনে মুড়িয়ে দেয়া যায়? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আলোচনা হলে অনেক সময়ই অনেকে তার বৌদি কাদম্বরী দেবীকে তার সাথে জড়িয়ে এক ধরনের রসাত্মক আলোচনা করতে পছন্দ করেন। তাদের মধ্যে একটা অন্য ধরনের সম্পর্কের ইঙ্গিতও দেন। আসলেই কি সেই ধরনের কিছু আদৌতেও তাদের মধ্যে ছিল? ভালোলাগা মানেই কি কোন ধরনের আলাদা বা নিষিদ্ধ সম্পর্ক?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের পরিবার একেতো ব্রাক্ষ ছিলেন তারমধ্যে আবার পিরালী। তাদের সাথে বিয়ের সম্পর্ক করতে সামাজিকভাবে অনেকেই সাহস পেতেন না। সেজন্য বাংলাদেশের যশোরের দিকে, যেখানে ঠাকুর পরিবারের জমিদারী ছিল, তার আশে পাশের গ্রামের সাধারন ঘরের মেয়েদের দেখে বউ বানিয়ে আনা হতো। কিন্তু কাদম্বরী যশোরের সেরকম রায় বংশের মেয়ে ছিলেন না। তিনি ছিলেন কোলকাতার মেয়ে। যদিও তাদের আগে থেকেই ঠাকুর বাড়ির সাথে বিয়ের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। শুধু জোড়াসাকোর ঠাকুরবাড়ি নয়, পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর বাড়ির সাথেও তাদের আত্মীয়তা ছিল বিয়ের সূত্র ধরে। তারপরও কাদম্বরীর সাথে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এর বিয়েতে জ্যোতি এর দাদা সত্যেন্দ্রনাথ কিছুতেই রাজী ছিলেন না। কাদম্বরীর দাদা একসময় কাদম্বরীর বাবা ও কাকাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন। কাদম্বরীর দাদা তাদের বাড়ীর সন্দেশ খেয়ে বলে দিতেন কোনটি বাসি আর কোনটি নয়, সে সন্দেশ পরীক্ষকের নাতনী হবে তার আদরের ভাই জ্যোতির বউ? জ্যোতি তখন বিলেত যাবেন পড়তে। ফিরে এসে এই ছোট্ট খুকীর সাথে মানিয়ে নিতে পারবেনতো? শেষে না দুটি জীবন নষ্ট হয়ে যায় এই ভাবনায় তিনি কাতর ছিলেন। কিন্তু এতদসত্বেও তিনি কিছুতেই গুরুজনদের মত পরিবর্তন করতে পারলেন না।

আট বছরের খুকী মাতঙ্গিনীর সাথে জ্যোতির বিয়ে হয়ে গেলো। ঠাকুরবাড়ীতে বহু বউদেরই আগের নাম বদলে দেয়া হতো। মাতঙ্গিনী হারিয়ে গেলেন কাদম্বরীর মধ্যে। যখন কাদম্বরী বউ হয়ে ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করেন, ঠাকুরবাড়ীর সে বছরের হিসেবের খাতায় লেখা আছে তার জন্য সে বছর বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগ কেনা হয়েছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে কিছুটা গোড়া থাকলেও পরে দাদা সত্যেন্দ্র ও বৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর প্রভাবে সাবেক সংস্কার ত্যাগ করে কাদম্বরীকে ঘোড়ায় চড়া ও শিখিয়ে ছিলেন। গঙ্গার ধারে নির্জন শিক্ষা শেষ হলে প্রতিদিন তারা দুজন গড়ের মাঠে ঘোড়ায় চড়ে হাওয়া খেতে বের হতেন। সেই সময় কাদম্বরীর অশ্বারোহন রীতিমতো আলোড়ন জাগিয়ে ছিল কোলকাতার সমাজে। সাধারন নারীদের চোখে তিনি একে দিয়েছিলেন দুঃসাহসের মায়াঞ্জন। তিনি পশ্চিমিধারায় চলা মেয়ে নন, রীতিমতো সুপুরী কাটতেন, প্রতিদিন তরকারী কাটার আসরে তিনি উপস্থিত থাকতেন, বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে দেখাশোনা করতেন। কারো জ্বর হলো শিয়রে কাদম্বরী, কারো অন্য সমস্যা ছুটলেন কাদম্বরী। গৃহস্থালী কাজের প্রতি কাদম্বরীর প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। সদ্য মাতৃহারা দেবর বালক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও তিনি পরম স্নেহে সেসময় তার কাছে টেনে নেন, অথচ কতোই বা বয়স কাদম্বরীর তখন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে বয়সে তিনি মাত্র এক বছরেরইতো বড়।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের যা কিছু সুন্দর তার সব কিছুর সাথে জড়িয়ে আছেন কাদম্বরী। তিনি এ বাড়িতে এসে তিন তলার ছাদে গড়ে তুললেন “নন্দন কানন”। পিল্পের উপর বসানো হলো সারি সারি পাম গাছ, আশে পাশে চামেলী, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, করবী, দোলনচাপা। তার সাথে এলো নানা রকম পাখী। ঘর সাজানোর দিকে প্রথম থেকেই কাদম্বরীর প্রখর দৃষ্টি ছিল। দেখতে দেখতে ঠাকুরবাড়ির চেহারা তিনি পালটে দিলেন। কিশোর রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধকে তিনি সবচেয়ে উচু তারে বেধে দিয়েছিলেন, যা থেকে রবীন্দ্রনাথ আর কখনো সরে আসতে পারেননি। মাত্র কয়েক বছরেই প্রায় অশিক্ষিত এই বালিকাটি ঠাকুর পরিবারের মতো বিখ্যাত পরিবারের সাহিত্যের প্রানকেন্দ্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে কিছুতেই অংশ গ্রহন করতেন না। অপরকে প্রেরণায় উজ্জীবিত করাই ছিল তার ব্রত। যেটাকে প্রচলিত অর্থে বলা হয় রোমান্টিক সৌন্দর্যবোধ, তা কাদম্বরীর পুরোমাত্রায়ই ছিল। হয়তো ঠাকুরবাড়ীতে অনুকুল পরিবেশ পেয়ে তা তরতর করে বেড়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল কিন্তু তার ভিতরে তিনি সেটা বহু আগে থেকেই লালন করতেন। নইলে এ বাড়ির প্রানপুরুষকে জাগিয়ে দিতে তিনি যতোটা সফল হয়েছিলেন, অন্যকেউই তা পারেননি। কাদম্বরীকে নিয়ে এতো বেশী আলোচনার কারন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং। কিশোর রবীন্দ্রনাথের মানসিক গঠনে কাদম্বরীর ভুমিকা অসামান্য। তার অকালমৃত্যু রবীন্দ্রনাথের মনের মধ্যে গভীর ছাপ রেখে যায়, যা তার অসংখ্য গল্পে, কবিতা, গানে তিনি প্রকাশ করেছেন। যারা অনেক কিছু কল্পনা করতে ভালোবাসেন তাদেরকে সেসব কল্পনা করার রাস্তা তৈরী করে দিয়েছেন কবি নিজেই। তিনি নিজেও জানতেন সেকথা। যার জন্যে তিনি কৌতুক করে শেষ বয়সে লিখেছিলেন, “ভাগ্যিস নতুন বৌঠান মারা গিয়েছিলেন, তাই আজোও তাকে নিয়ে কবিতা লিখছি, বেচে থাকলে হয়তো বিষয় নিয়ে মামলা হতো” ।

(চলবে)

তানবীরা তালুকদার
০২.০৭.০৮
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28816377 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28816377 2008-07-03 12:48:35
লজ্জাবতী লতা :: যুথিকা বড়ুয়া যুথিকা বড়ুয়া

লজ্জাবতীর মুখখানি ঘোমটায় ঢাকা
সেজেছে কনের সাজ, লাগছে ভারি ন্যাকা।
লজ্জায় হলো গাল লাল টুকটুক্
উরু উরু মন তার দুরু দুরু বুক।
ছাদনা তলায় যাবে আজি হবে পতীর মিলন
প্রেমের কুঁড়ি ফুটবে যখন কাঁপিবে হৃদয়স্পন্দন।
লজ্জাবতী লতা যাবে শ্বশুড়বাড়ী
কেমনে সে কইবে কথা এই চিন্তায় মরি।
হাসাহাসি কানাকানি করছে যে সবাই
লজ্জাবতীর লতার কেমন হলো জামাই।
শ্বশুড়বাড়ি গেল চলে লজ্জাবতী লতা
মায়ের চিন্তা দূর হলেও লাগছে ভীষণ ব্যথা।
লজ্জাবতী আসবে ফিরে বরের হাতটি ধরে
অবাক চোখে দেখবে সবাই রাখবে তারে ফিরে।
লজ্জাবতীর আসল নাম বেবী টুনটুনি
বছর ঘুরতেই হলো সে, একটি ছোট্ট শিশুর জননী।

যুথিকা বড়ুয়া : কানাডা প্রবাসী লেখক ও সঙ্গীত শিল্পী।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28814785 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28814785 2008-06-29 01:14:24
কইতে নারি সই :: তানবীরা তালুকদার
কইতে নারি সই


ঘুমের মধ্যে বার বার মাথাটা এপাশ ওপাশ করছে বালিশে , একটা কিসের যেনো ছটফটানী ঘেমে যাচ্ছে সুমনা। তৃষনায় বুকটা শুকিয়ে জিহবা পর্যন্ত আড়ষ্ট হয়ে আছে। কি যেনো একটা স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে যা নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না কিন্তু ঘুমের মধ্যেই মনে মনে ওর একটা অনুভূতি হচ্ছে যে সুখকর কোন স্বপ্ন এটা নয়। সারা শরীর শক্ত হয়ে আছে নড়তে চড়তে পারছে না। অস্বস্তিতে ধড়ফড় করতে করতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো সুমনার। মুখের মধ্যে একটা ভীষন তেতো স্বাদ, গা টা গুলিয়ে গুলিয়ে উঠছে। এমনিতেই যখন ওর পীযুষের সাথে দেখা করার কথা থাকে টেনশনে কদিন আগে থেকেই ও ঘুমাতে পারে না, খেতে পারে না। অতিরিক্ত আনন্দ থেকে কেমন যেনো ঘোরের মধ্যে চলে যায়, অচেনা একটা ভয় লাগতে থাকে। সারাক্ষন মনে হয় এই বুঝি সবার কাছে ধরা পড়ে গেলো, সবাই যেনো ওকে সন্দেহের চোখে দেখছে। বুঝে ফেলছে কেনো সুমনা এতো চঞ্চল, গোপন খুশীটি এবার ধরা পড়ে যাবে। যদিও সুমনা আনন্দ লুকিয়ে সবার সাথে প্রচন্ড স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, যেমন রোজ কলেজে যায় তেমন কলেজেই যাচ্ছে আজ ভাবটা ধরে রাখে, আজ কোন বিশেষ দিন নয়, বিশেষ কেউ আসার কথা নয় তার কাছে সেই মুখোভাবটা প্রচন্ড ভাবেই ফুটিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু আজকের অনুভূতিটা সেরকম সুখ মাখানো কষ্টানুভুতি নয়। মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা যেনো মাথার শিরা সব এখুনি ফেটে রক্ত পড়বে। মাথা তুলে বসতে পারছে না এতো ভার লাগছে উপড়ের অংশটাকে। কাতর গলায় আর না পেরে মাকে ডাকল, মা ও মা শুনে যাও, শুনছো?

মা তখন সবে ঘুম থেকে উঠে স্নিগ্ধ ভোরের আমেজ গায়ে মেখে রোজকার সকালের প্রাত্যহিক কাজের তদারকী করছেন। কারো ঘুমের যাতে অসুবিধে না হয় সেজন্য মা প্রায় নিঃশব্দ পায়ে চলাফেলা করলেও তার চলাফেরার একটা মৃদ্যু মিষ্টি আওয়াজ সুমনা ঘুম থেকে রোজই টের পায়। ভোরের দিকে তখন ঘুমটা হালকা হয়ে আসে, সামান্য সে যতো সামান্যই হোক, নড়াচড়া অনুভব করা যায়। কিন্তু ভোরের আলসেমী গায়ে মেখে সুমনা বেশীরভাগ সময়ই শুয়ে থাকে, উঠে না বেলা না চড়লে। এতো ভোরে সুমনার গলা পেয়ে অবাক হয়ে মা সুমনার কাছে এলেন। এসেই আতকে উঠে বললেন কি হয়েছেরে তোর? এমন চোখ - মুখ লাল কেনো? সুমনা বলল, বুঝতে পারছি না তো মা। মা এসে কপালে হাত রাখলেন। প্রায় অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠলেন, একি গাতো দেখি জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কি করে হলো? ক্লান্ত গলায় সুমনা বলল, জানি না। একগ্লাস পানি দাও না, মা বড্ড তেষ্টা পেয়েছে। মা পানি এনে সুমনাকে খাইয়ে আদর করে কপালে হাত বুলিয়ে শুইয়ে দিতে যেয়ে আবার চিৎকার করলেন একিরে কপালে এটা কি? সুমনারও কি রকম একটা অস্বস্তি মতো লাগছিল ব্যাথা ব্যাথা কপালে, কিন্তু এতো আলসেমী লাগছিল যে হাত দিয়ে সেটা ধরে দেখার ইচ্ছেও করছিল না। মা বুঝে গেলেন সুমনার পক্স হয়েছে। বললেন, নাস্তা বানিয়ে দিচ্ছি, খেয়ে শুয়ে থাকো, কোথাও যেতে হবে না কদিন, পড়া, কোচিং সব বন্ধ। বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ শোনা মাত্র সুমনার ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় সজাগ হয়ে উঠল। আজ তাকে যেকোরেই হোক বেরোতেই হবে, তারপর তিন মাস না বেরোলেও চলবে। কিন্তু সে কথাতো আর মাকে বলা যায় না। তাই সে সমানে মাকে বলে যাচ্ছে, এমনিতেই একটু গা টা গরম হয়েছে, জ্বর টর কিছু নয়তো। সে দিব্যি ভালো আছে। মা বেশী ভাবছে ওকে নিয়ে, আজ কোচিং এ স্যার জরুরী কিছু
পড়াবেন, কিছুতেই তা মিস করা যাবে না। কিন্তু মা অভিজ্ঞ চোখে দেখে বললেন, তোর জামাটা ওপরেতোলতো দেখি পেটটা একটু। জামা উপড়ে তুলতেই দেখা গেলো পেটের মধ্যে তিনটে , চারটে




পানিওয়ালা বড় বল হাসি মুখে সুমনার দিকে তাকিয়ে আছে। মা নিশ্চিত করে দিয়ে গেলেন যে পক্সই হয়েছে, নট নড়ন - চড়ন, এই অবস্থায়।

পাড়ার কোচিং এ পড়তে যেয়ে পীযুষের সাথে আলাপ সুমনার। যদিও কথা বলতে তেমন কিছুই হয়নি কখনও তার সাথে, শুধু দূরে থেকেই দুজন দুজনকে দেখেছে। চোখে চোখ রাখার বাইরে আলাপ বেশী দূর এগোয়নি তখনও। কিন্তু একদিন সুমনা অবাক হয়ে লক্ষ্য করল পী্যুষ না আসলে পড়ায় মন বসছে না সুমনার। বার বার দরজার দিকে চোখ চলে যায় এই বুঝি এলো, এই বুঝি এলো। পরে আর থাকতে না পেরে বন্ধুদের জিজ্ঞেসই করে ফেলতো পীযুষ এলো না আজ? পীযুষেরও প্রায় সেরকমই অবস্থা। দু পক্ষের ইচ্ছায় মন দেয়া নেয়া হয়ে গেলো অতি দ্রুত। আস্তে আস্তে পড়া শেষ করে খুব ভালো রেজাল্ট করে পী্যুষ বড় শহরে পড়তে চলে গেলো। আর রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে হওয়ায় ভালো রেজাল্ট সত্বেও সুমনার বাইরে যাওয়া হয়নি পড়তে, এখানেই নিজের শহরে সুমনা রয়ে গেলো। যোগাযোগ বলতে চিঠি আর মাঝে মধ্যে লুকিয়ে ফোন। আগে যেখানে রোজ দেখা হতো সেটা এখন কখন সখনোতে পৌছে গেছে। অথচ সারাদিন সুমনা তার ভাবনাতেই ব্যাকুল থাকে। দিন যায় রাত যায় তার পী্যুষের কথা ভেবে ভেবেই। এমনিতে সময়গুলোকে কি অসহ্য লম্বা লাগতে থাকে সারাবেলা সারাক্ষন, কিন্তু যে একবেলা পীযুষের সাথে সুমনার দেখা হয় সেই সময়টা যেনো হাওয়ার ভর দিয়ে পংঙ্খীরাজ ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে থাকে। চোখের পলক ফেলার আগে, পীযুষের বুকে মাথা গুজে দুদন্ড নিঃশ্বাস নেয়ার আগেই শেষ ঘন্টি বেজে উঠে। সুমনা কতো কি ভেবে রাখে পীযুষ এলে কি বলবে, কোন গল্পটা এখনও ওকে করা হয়নি কিন্তু পীযুষ সামনে এলে ও সব ভুলে যায়। আনন্দে সুমনার মাথাটাই এলোমেলো হয়ে যায়, স্বাভাবিক বুদ্ধিটাও কাজ করে না তখন যেনো।

সেই ভীষন প্রতীক্ষিত সময়ে পক্সের কথা শুনে সুমনা ব্যাকুল হয়ে কাদতে লাগল। সুমনার কান্না দেখে বাড়ির সবাই অবাক। সবাই ভাবছে সুমনা বুঝি পক্সের জন্য কেদে আকুল হচ্ছে। সুমনা গড়পড়তা বাংগালী মেয়েদের তুলনায় বেশ সুন্দরী। সাধারন বাংগালী মেয়েদের থেকে বেশ লম্বা, ছিপছিপে একহারা গড়নের, গোলগাল মিষ্টি পান পাতা মুখের ফর্সা সুমনার সুন্দরী হিসেবে পাড়াময় খ্যাতি আছে। বাড়ির লোকেরা ভাবছে, পক্স হয়েছে, মুখে দাগ পড়বে, সৌন্দর্য নষ্ট হবে সেই দুঃখে বুঝি সুমনা কেদে যাচ্ছে, কিন্তু সুমনা কাউকে কি করে বলে আজ পাক্কা তিনটি মাস পর পীযুষ বাড়ি আসছে, সুমনার সাথে দেখা করতে। সবাই জানে পীযুষ ওর বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে বাড়ী আসছে কিন্তু সুমনাতো জানে কার জন্য পীযূষ এতো ঝক্কি নিয়ে বাড়ী আসছে ,তিন তিনটি মাস দেখা হয়নি দুজনার। আবার চলে যেতে হবে তাকে আজ রাতের ট্রেনেই। আজ চলে গেলে আবার কতোদিন দেখা হবে না দুজনার। সবাই স্বান্ত্বনা দিচ্ছে কাদিস না, পক্সের দাগ থাকে না, নখ দিয়ে না খুটলেই চলে যাবে দেখিস কদিনের মধ্যেই। আবার ওকে নিশচিত করার জন্য অব্যর্থ উপকারী সব ওষুধের নাম করছে, ডাবের পানি দিয়ে খুব ধুলেই পক্সের দাগ থাকে না কিংবা বেসন এর উপকারিতা অনেক ইত্যাদি ইত্যাদি। সুমনা না পারছে কইতে , না পারছে সইতে। কাউকে বলতে না পেরে আরো জোরে জোরে কাদতে লাগল, ওদিকে পীযুষযে তার অপেক্ষায় তাদের সেই প্রিয় বড় বড় জারুল গাছের ছায়া দিয়ে ঢাকা জায়গাটাতে , নদীর পাশটাতে উচাটন মন নিয়ে বসে আছে গো ..................।।


তানবীরা তালুকদার
২৬.০৬.০৮
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28814590 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28814590 2008-06-28 14:28:54
সৃষ্টিতত্ত্বের গালগপ্প বনাম বিবর্তনের শিক্ষা-২ :: তানবীরা তালুকদার মেহুল কামদার
অনুবাদক: তানবীরা তালুকদার

পূর্ববর্তী পর্বের পর ...
সারা বিশ্ব জুড়ে আমাদের পূর্ব পুরুষদের করা আপ্রান চেষ্টা থেকে এটা স্পষ্টতঃই বোঝা যায় যে, জীবনের সৃষ্টি কিংবা এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি কি করে হলো সেটা বুঝতে এবং জানতে তারাও খুবই আগ্রহী ছিলেন এবং এ নিয়ে তারা বিস্তর চিন্তা ভাবনাও করেছেন। আদিম যুগের মানুষেরা বিজ্ঞান কিংবা শিক্ষার জ্ঞান ছাড়া বাধাহীন কল্পনা শক্তির দ্বারা উদ্ধুদ্ধ হয়ে আশে পাশের পরিবেশ বা পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে যা তাদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হতো তারা সেভাবেই তার একটা ব্যাখা দাড় করাতো। যখন তারা মাটির ঘরে বসবাস করতো, পশু দিয়ে টানা বাহন ব্যবহার করতো, সেই সময়ের মানুষদের পক্ষে আজকে আমাদের কাছে যা খুবই নৈমিত্তিক বা সহজ কাজ তা তাদের কল্পনায়ও অসাধ্য ঘটনা ছিল। পাখির মত উড়ে বেড়ানো নিয়ে মানুষেরা কল্পণাপ্রবন ছিল প্রথম থেকেই- আদিম মানুষদের কল্পনায় প্রথমে উড়ন্ত দেবতা তৈরী হতো তারপর তাদের উপকথায় প্রবশ করত তাকে উড়ানোর কৌশলগত রঙ বেরঙ-এর গল্প । বর্বর যুগে নানা জরা ব্যাধি এবং যুদ্ধ বিগ্রহের কারনে মানুষের জীবন স্বল্পস্থায়ী হতো, প্রতি দিনের জীবন যুদ্ধের যন্ত্রনাগুলো ভুলে থাকার উপায় ছিল পরকালের সু্খ শান্তির গল্প শোনা। এবং যখন এই প্রশ্নটি আসতো কিভাবে মানুষের এবং অন্যান্য প্রানীর সৃষ্টি হলো তখন মানুষের একজন স্বর্গীয় সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি করতে হতো যিনি এই বিদ্যমান সমস্ত কিছুই সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ কিরকম হবে এতো দূর মানুষ কল্পনা করতে পারেনি তাই সে তার নিজের পছন্দের সৃষ্টিকর্তার অবয়ব তৈরী করে নিয়েছে। আরবীয় ধর্মগুলোতে পরিস্কারভাবে সৃষ্টিকর্তার অবয়বের ইঙ্গিত আছে, যেখানে হিন্দু ধর্ম, প্রাচীন মিশরীয় ধর্ম, গ্রীস এবং রোমের ধর্মগুলো এতো প্রাঞ্জলভাবে এনিয়ে কিছু বলেনি, কিন্তু আছে তাদের পরিপূর্ন নিজস্ব আদলে যুদ্ধরত রাজার মতো দেবতা, আদালতের গল্পসহ পৌরনিক কাহিনী, উপপত্নী, ক্রীতদাস, বিদূষক এবং তাদের সময়ে মানুষকে শোষন করার অন্যান্য সকল ফাকিবাজী গল্প।
এইসব পৌরনিক গল্পগুলোতে পরিবর্তন আসতে অনেক সময় লেগেছে, ঐশীগ্রন্থ গুলো পরিবর্তন হতে পারেনি কারন তাদের ধর্মে পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। তাদেরকে পরিপূর্ন বলে ধরে নেয়া হয় সেখানে কোন প্রশ্ন করার এমনকি কিছু কিছু জায়গায় ভাষার ব্যাখা নিয়েও কথা বলার সুযোগ নেই, আগের শতাব্দীগুলো থেকে এ ধরনের বেশ কয়েকটি উৎপথগামী ঘটনার কথা জানা যায়। আর এখন, মানুষের জ্ঞানের উৎকর্ষতা সীমাহীন। বিজ্ঞানী জেমস হাটনের ভূতাত্ত্বিক গবেষনা এবং চার্লস ডারউইনের বিবর্তনের উপর গবেষনা শীঘ্রই সবাইকে যথাযথ বিবরনের সাথে জানাবে, কিভাবে প্রথমে জীবনের উদ্ভব হলো এবং তাদের নিখূত গবেষনার সেই পদ্ধতি যার দ্বারা বিজ্ঞানীরা সমস্ত ঘটনাগুলোকে এক সাথে যৌক্তিকভাবে সারিবদ্ধ করে সবার সামনে আনেন, যদিও তারা ধর্মের লোকজনের কারনে আতংকিত থাকেন, বিশেষ করে গীর্জার অনুসারীদের দ্বারা। ইশ্বর তার কল্পনা থেকে মানুষের সৃষ্টি করেননি, বরং মানুষ পৃথিবীতে এসেছে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় - এ ধরনের সত্য কথায় চার্চের গুরুত্ব কমে যায়। যারা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্রীতদাস বানিয়ে রেখে শোসন করে চলেছে যুগ যুগ ধরে আর জোর করে পয়সা কড়ি হাটিয়ে নিচ্ছে - মানুষের কাছে তাদের আসল রুপও প্রকাশ পেয়ে যায়। মোটামুটি পরিস্কার করেই, এরা জনগনকে বোঝায় যে ধর্ম বইতে যা লেখা আছে, তাই সত্য। পৃথিবীর বেশীরভাগ লোকই আগে ক্রিশ্চিয়ান বাইবেলের অনুসারী ছিলেন, তারা একটি বাস্তব দৃষ্টিকোন থেকে সকলেই ভুল ছিলেন। অনেক আগে ক্রিশ্চিয়ান সমাজ বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে তার সৌরজগত সম্পর্কে দেয়া মতামত প্রত্যাহার করার জন্য জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু পরে ইংল্যান্ড রোম, স্পেনকে এ নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্কের আহ্ববান জানিয়েছে এবং পরে ফ্রান্সকে বাধ্য করেছে নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সমাধান হিসেবে নিতে, তখন কোন চার্চের সাহস হয়নি এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করতে। তবে এক্কেবারে প্রথম দিকে, ইংল্যান্ডের সরকারী প্রটেষ্টান্ট চার্চ এর তরফ থেকে বাধা দেয়ার জন্য প্রচন্ড চেষ্টা করা হয়েছিল, বিশপ্ স্যাম উইলবিফোর্স চেষ্টা করেছিল ডারউইনের এবং তার অনুসারী বিজ্ঞানীদেরকে টমাস হাক্সলি’র মুখোমুখী করতে , যেখানে হাক্সলিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সে কি উত্তরাধিকার সুত্রে তার মায়ের বংশের নাকি বাবার বংশের বানরকুল থেকে জন্মগ্রহন করেছে। হাক্সলের জবাব ছিল খুবই নেতিবাচক, তিনি বললেন, আমি এমন একজন শিক্ষিত ব্যক্তি যিনি তার প্রাকৃতিক শক্তি, বাগপটুতাকে, পক্ষপাতদুষ্ট, মিথ্যাকথন এর কাজে ব্যবহার করে তার ঔরসথেকে জন্ম নেয়ার পরিবর্তে বরং একটি শিম্পাঞ্জী থেকে জন্মগ্রহন করতে পছন্দ করব। সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলো এ নিয়ে বিশাল বিশাল কার্টুন ছাপে সে সময় এই বলে যে, হাক্সলি বলেছেন, তিনি বিশপ হয়ে জন্ম নেয়ার পরিবর্তে একটি শিম্পাঞ্জী হয়ে জন্মগ্রহন করতে চেয়েছিলেন। এরপর আর কোন চার্চ বিবর্তনবাদীদের বিরক্ত করার কোন স্পর্ধা দেখায়নি। তারা বরং বিবর্তনবাদকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য অনেক ধরনের প্যাচানো ঘোরালো পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। প্রথমে তারা, মৃত্যুশয্যায় ডারউইনের ক্রিশ্চিয়ান হয়ে যাওয়ার মিথ্যে গুজব রটিয়েছেন, তারপর তারা বিবর্তনবাদ পড়ানোর উপরে বিভিন্নভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের চেষ্টা চালিয়েছেন, এবং অবশেষে তারা পরিপূর্ন প্রতারনামূলক ধর্ম তত্ব “ইন্টিলেজেন্স ডিজাইন” নিয়ে এসেছেন, এবং আবারো চেষ্টা চালাচ্ছেন এ্যামেরিকার উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে বিবর্তনবাদের পরিবর্তে এটিকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পড়ানোর জন্য। এবং কিছু কিছু আরব দেশ সহ বিভিন্ন জায়গায় বিবর্তনবাদ পড়ানো বন্ধ করার ব্যাপারে চার্চগুলো সফলও হয়েছে বিশেষ করে আরবের উপসাগরের পরামর্শ দাতা দেশগুলো তাদের দেশের স্কুলগুলোতে বিবর্তনবাদ পড়ানো নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
যদিও শেষ পোপ দ্বিতীয় জন পল স্বীকার করেছেন যে, বিবর্তনবাদ ছিল বিজ্ঞানের সঠিক তত্ব, এবং তার উত্তরসূরী বেনডিক্ট তার সাথে একমত, তারপরো দুজনে মিলে সৃষ্টি তত্বের গল্পের “নৈতিকতা” প্রচার করে বিরাট হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন চারধারে। যেনো লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর হওয়া অত্যাচারের ইতিহাস, অতীতে চলা গীর্জার স্বৈরতন্ত্র বাইবেলের ব্যখ্যা যার পর নাই 'নৈতিক', আর অন্যদিকে জীববিজ্ঞানীদের সতর্ক এবং শ্রমসাধ্য বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, যারা ডারউইনের বিবর্তনের তত্বকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরো গবেষনা করে চলছেন এবং মুল উৎসের দিকে ক্রমস ধাবিত হয়ে অন্তিম রহস্যের সমাধানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন - তাদের সবকিছুই কোন না কোনভাবে অনৈতিক। যেনো বিজ্ঞানের বাস্তব শিক্ষা, কিংবা বিবর্তনবাদ সত্য হলেও বাইবেল ছাড়া কোন না কোনভাবে “অনৈতিক”। এই হলো পরোক্ষ ভাবে বিবর্তনবাদকে গ্রহন করার সেই নমুনা যেখানে তারা সারাক্ষন বোঝাতে চাইছেন বিবর্তনবাদকে ধর্মের সাথে মিশিয়ে পড়াতে হবে, রাজনৈতিকভাবে এদেরকে দুমুখো সাপ বলা ই বোধ হয় সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত হবে।
ধর্মের যুক্তিনুসারে এদের কথাগুলো প্রশ্নের অতীত, এর বিরুদ্ধে যেকোন ধরনের সমালোচনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বেশীরভাগ ঐশী গ্রন্থগুলোতেই যারা এর বিরুদ্ধাচারণ করবে তাদেরকে ভয়ানক হুশিয়ারী দেয়া আছে, প্রায়শই দেখা যায় ধার্মিকগন এসব কল্পকাহিনীতে এতোটাই জড়িয়ে যান যে যারা তাদের এই মৌলবাদী মতের সাথে একমত পোষন করে না, তাদেরকে খুন, অত্যাচার এমনকি পঙ্গু করে দিতেও দ্বিধা বোধ করেন না। যেসব পরিস্থিতিতে তারা এধরনের কিছু করতে অপারগ হয়, যেমন এ্যামেরিকার কিছু উচ্চ শিক্ষিত ভদ্র এলাকায় সেখানে তারা আইনের আশ্রয় নিয়ে আইনের মুগুর দিয়ে বিজ্ঞানকে থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যি হলো বিজ্ঞানের গবেষনা কোন স্থির হয়ে থাকা জড় বিষয় নয়, আর বিজ্ঞানীদেরকে তাদের গবেষনার পক্ষে যুক্তি প্রমান দাড় করাতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়, যেখান থেকে নতুন সম্ভাবনার উদয় হবে। বিজ্ঞানীদের শিক্ষা, গবেষনা ও তথ্যের প্রতি যে উদ্দীপনা দেখা যায় ঠিক সেই রকম উদ্দীপনা মৌলবাদীদের মধ্যেও দেখা যায় লোককে বিশৃংখল, বিভ্রান্ত ও মিথ্যের দিকে নিয়ে যেতে। আমরা একটা চলমান এলোপাতাড়ি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছি এই তথ্যটি জানার পর পৃথিবীর প্রতি আমাদের দ্বায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। দীর্ঘ জৈব-রাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়ার ফলে এক সময় প্রানের সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন ধরনের অবিমৃশ্যকারীতা আবার এটাকে শেষও করে দিতে পারে। বিবর্তনের এই জ্ঞানই আমাদেরকে পৃথিবী, পরিবেশ কিংবা জীবনকে সম্মান করতে শিখায়। বিজ্ঞানীদের কিংবা মানবতাবাদীদের পরকালের নরকের ভয়ে কিংবা স্বর্গলাভের আশায় “নৈতিক” জীবন যাপনের দরকার নেই। যেহেতু কোন সৃষ্টিকর্তাই নেই, তাই সাধারন মানুষের নৈতিক জীবন যাপনের ভার তার নিজের উপর। স্বর্গ বলতে যেহেতু কিছু নেই, তাই জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য আনন্দ উচ্ছাসে জীবন ভরিয়ে তোলার খুবই দরকার আছে, এবং যখন আমরা জানব কিভাবে আমরা এই সুন্দর জীবন পেয়েছি সেটাকে আরো বেশী করে উপভোগ করব। ডারউইন দিবস সেই জন্যই সমস্ত পৃথিবী জুড়ে উৎসব করার মতো একটি সেক্যুলার দিবস কারন এই দিনের মাধ্যমেই সমস্ত কুসংস্কার, বর্বরতা এবং মাথার উপর জোর করে চেপে থাকা অজ্ঞতার অবসান জানানো হয়েছে।

তানবীরা তালুকদার
০৩.০৬.০৮



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28813908 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28813908 2008-06-26 14:33:57
সৃষ্টিতত্ত্বের গালগপ্প বনাম বিবর্তনের শিক্ষা :: তানবীরা তালুকদার মেহুল কামদার
অনুবাদক: তানবীরা তালুকদার



অনেক অনেক বছর আগে ভারতে আমার ছোট্টবেলার এক ঘটনা। আমি তখন আমার দাদাবাড়িতে। খুব কষ্ট করে আমার দাদা বাড়ি তথা তার চশমার শোরুম-এর ছাদে উঠেছিলাম। এমনি এমনি ছাদে উঠিনি, মনে ধান্দা ছিলো একটা। ভাবছিলাম, সেদিনের ইতিহাস ক্লাশে পড়ানো আর্কিমিডিসের একটা পরীক্ষা হাতে নাতে করা যায় কিনা। আসলে স্কুলের স্যার সেদিন আমাদেরকে আর্কিমিডিস কিভাবে সূর্যরশ্মির সাহায্যে “পার্শিয়ান নৌযান পুড়িয়ে” দিয়েছিলেন সে সম্বন্ধে পড়িয়েছিলেন। আর বলেছিলেন আমরা নিজেরাই চশমার কাচ ব্যবহার করে একই পদ্ধতিতে ছোট কাগজ পোড়াতে পারব। আমি দোকানে রাখা বিশাল বাক্স থেকে খুজে পেতে দশ ডাইঅপ্টারের একটি কাচ বের করে নিলাম এবং সেটা নিয়ে মাদ্রাজের তীব্র রোদ উপেক্ষা করে বাইরে চলে এলাম হাতে একটা শক্ত কাগজ নিয়ে। তখনও আমি স্কুলের পোষাক পাল্টায়নি, আমি প্রচন্ড মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম কাচের ভেতর দিয়ে সূর্যরশ্মিকে কাঁচের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীভূত করে কাগজটাকে পুড়িয়ে দিতে। কিছুটা সময় অপেক্ষার পর আমি দেখতে পেলাম, কাগজের মাথায় যেখানে আলো পড়েছিল সেখানটায় একটা কালো দাগ পড়েছে, এবং একটা মৃদু ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠছে। আলোক রশ্মির দ্বারা কাগজটা পুড়েছে। এটা আমার জন্য একটি দম বন্ধ করা মুহুর্ত - আমি কাচের ভেতরের রশ্মির সাহায্যে আস্তে আস্তে বোর্ডের উপড় আমার নাম লেখার চেষ্টা করছিলাম, প্রথম তিনটা অক্ষর লেখা হতেই আমি আনন্দে আমার হাতের কাপুনি এবং আমার উত্তেজনা টের পেতে লাগলাম। ঠিক সেসময় আমার মা আমাকে ছাদের লাগোয়া রান্নাঘর থেকে ডাক পাড়লেন, “মেহুল, তুমি এই রোদের মধ্যে ছাদে বসে কি করছ”? আমি মায়ের দিকে না তাকিয়েই সানন্দে চিৎকার উত্তর দিলাম, “আমি কাচ দিয়ে সূর্যের আলো দিয়ে কাগজে আমার নাম লিখছি”। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই মা দৌড়ে এসে খপ করে আমার হাত থেকে সব কেড়ে নিলেন। আমি হতভম্ব চোখে তাকিয়ে মাত্র জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম আমি কি কিছু ভুল করেছি, ঠিক তখনই আমার গালে কষে একটা চড় পড়ল। চড়ের সাথে বলা মায়ের কথাগুলোও এখনও আমার মনে আছে, যদিও গুজরাটি থেকে অনুবাদ করলে ভাষাটা অনেকটাই তার মাধুর্য্য হারাবে। তিনি আমাকে বললেন, “সূর্য দেবতা রেগে যাবেন”, আম সজল নেত্রে মাকে বল্লাম, সূর্য রশ্মি ব্যবহার করলে সূর্যদেব যদি রেগেই যেতেন তাহলে তিনি পার্শিদের বিরুদ্ধে গ্রীকদের যুদ্ধে তাদেরকে জেতার জন্য রশ্মি দিয়ে সাহায্য করতেন না। প্রায় সাথে সাথেই আর একটি চড় অবধারিত ভাবে গালে নেমে এলো। আমি বুঝতে পারলাম ধর্মীয় অতিকথা নিয়ে প্রশ্ন করা বিপদজনক - যা আমি সেই কিশোর বয়সে বুঝেছি অনেকেই তা হয়ত তাদের জীবন দিয়ে শিখেছেন।
তারপরও ধর্মকথা আমাকে প্রবল ভাবে আকর্ষন করে। মায়ের কাছে প্রত্যকে বার চড় খাওয়া মানেই ভারতের সংস্কৃতিতে দাদীর কাছে প্রত্যেকবার আদর পাওয়া। আমাদের দাদী যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন আমাদেরকে গান গেয়ে ভোলাতেন আর যখন বড় হলাম তখন গল্প বলে ভোলাতেন। দাদীর বিশাল গল্পের ভান্ডারে আমাদের প্রত্যেকেরই পছন্দের আলাদা গল্প ছিল, এবং দাদী খুব খুশি মনেই সে সব গল্প আমাদেরকে বারবার শুনিয়ে যেতেন। দাদীর গল্প আমাকে এতোটাই মুগ্ধ করেছিল যে অনেক অনেক বছর পড়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য পড়তে আগ্রহী হই। যাক সেটা অন্য আর একটি গল্প। কিন্তু যখন মুক্তমনাতে ডারউইন ডে’র উপর লেখা দেয়ার জন্য সবাইকে আমন্ত্রন জানানো হলো, আমি অতি সহজেই সেটিকে এড়িয়ে যেতে পারতাম এই ভেবে যে এই বিষয়ের উপরতো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমি পড়িনি। যে এ্যামেরিকায় বাস করে অতীতে ইহুদী-খ্রীষ্টানদের মধ্যে ধর্মের রূপকথাকে কেন্দ্র করে (যাদের অধুনা অবতার হলো “Intelligent Design” বা 'সৃষ্টির বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্প') স্মরন রাখার মতো যুদ্ধের কথা জেনেছি, এবং তাদের সে যুদ্ধ এখনো নানাভাবে দেখছি, বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির আলোকে এই সৃষ্টিতত্ত্বের উপকথাগুলো নিয়ে আলোচনা করাটা আমার জন্য বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
বিভিন্ন দেশের শত শত উপকথার নানা রকম তথ্য দিয়ে শত শত ওয়েব সাইট তৈরী হয়েছে। যেমন আশা করা যায় কেউ কেউ আছেন ধর্মের গল্প গুলো শুধু শুনেছেন এবং সেই শোনা গল্পগুলোই মানব জাতীর জন্য লিখে ফেলেছেন, আবার কারো কারো কাছে হয়তো এই গল্পগুলো শুধুই উপভোগ্য কল্পিত গল্প মাত্র, বিভিন্ন যুগের গল্প গুলোকে এক সাথে জোড়া দিলে মানুষের চিন্তা ভাবনার বিকাশের স্তরগুলো পাওয়া যায়। তাদের কথানুযায়ী ধর্মের উপকথা থেকে মূল বক্তব্য নেয়া প্রয়োজনীয় বলে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এমন কোন আজগুবী ওয়েব সাইট থেকে গল্প নেবো যারা এই গল্পগুলোকে সত্যি বলে প্রমান করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। কোন নিরশ্বরবাদী কিংবা স্বাধীন চিন্তা ভাবনার ওয়েব সাইট থেকে যদি তথ্য সংগ্রহ করি তাহলে হয়তো তাদের তথ্যে লেখায় আমার নিজস্ব চিন্তা ভাবনার ছাপ পড়ে যেতে পারে। আর যে ওয়েব সাইট গুলো বিশ্বাস করে যে এই গল্প গুলো ভবিষ্যতের কোন একটি বিরাট ইঙ্গিত বহন করছে তারা অনেক রঙ চঙ দিয়ে সেই গুলোকে বিস্তারিত ভাবে পরিবেশন করেছে।
ইহুদী-খ্রীষ্টানদের মিথ দিয়েই শুরু করি। বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন যাকে এই সংখ্যাটি উৎসর্গ করা হবে তার মতবাদের সাথে প্রথমেই যাদের মতবাদের সরাসরি দ্বন্দ্ব - তারা হলেন মূসা- খ্রীষ্টের অনুসারীরা। বাইবেলের সৃষ্টি তত্বের জেনেসিস অধ্যায়টি মনোযোগ দিয়ে পড়লে এটি খুব সহজেই বোঝা যায় -
শুরুতেই স্রষ্টা প্রথমে স্বর্গ তৈরী করেছেন আর পৃথিবী। পৃথিবী তখন ছিল আকারহীন এবং অকার্যকর একটা জায়গা। এর মুখায়ব ছিল অন্ধকারে ঢাকা। স্রষ্টার চিন্তা তখন পানির দিকে ঘুরল। স্রষ্টা তখন বললেন, আলো হোক, জগত আলোয় ভরে উঠল। স্রষ্টা আলো দেখে মুগ্ধ হলেন, তিনি অতঃপর আলোকে অন্ধকার থেকে আলাদা করলেন। আলোকে স্রষ্টা নাম দিলেন দিবা আর অন্ধকারকে নাম দিলেন রাত্রি। আর সন্ধ্যা এবং সকাল হলো দিনের প্রথম সূচনা। তারপর তিনি বললেন সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে একটি মহাকাশ তৈরী হোক, এবং এরপর পানি পানি থেকে পৃথক হোক। এরপর তিনি মহাকাশ তৈরী করেন, তারপর তিনি মহাকাশের উপরের পানি থেকে নীচের পানি আলাদা করেন। এবং এভাবেই এই জগতের সৃষ্টি হয়েছে।
অ্যাপাচি রূপকথার সাথে এই রূপকথার গল্পের পার্থক্য কতো :
শুরুতে কিছুই ছিল না, না পৃথিবী, না আকাশ, না চাদ, না সূর্য, শুধুই অন্ধকার ছিল চারিধারে। হঠাৎ করে অন্ধকার থেকে একটি হালকা গোলাকার সমতল একটা চাকতি বেরিয়ে আসল, যার এক পাশ হলুদ আর অন্যপাশ সাদা, মধ্যকাশে ঝুলন্ত অবস্থায় এটিকে দেখা গেলো। সেই পাতলা গোলাকার চাকতির মধ্যে একজন শুভ্র সফেত পোষাক পড়া দাড়িওয়ালা স্রষ্টা বসে আছেন । যেনো এইমাত্র তিনি লম্বা ঘুম থেকে দুইহাতে চোখ মুখ কচলে উঠে বসলেন।
যখন তিনি অসীম অন্ধকারের দিকে তাকালেন, উপড়ে আলো জ্বলে উঠল। তিনি নীচের দিকে তাকালেন সেখানেও আলোর সমুদ্র তৈরী হলো। পূর্ব দিকে তিনি অত্যন্ত দ্রুত উজ্জল হলুদাভ প্রত্যুষ তৈরী করলেন। পশ্চিম দিকের চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে দিলেন অনেক রঙের আনাগোনা। নানা রঙের মেঘও ছিল অবশ্য।
আর কারা এসব রুপকথায় বিশ্বাস করে বলে আপনি ভাবছেন :
লক্ষ্য লক্ষ্য অগনিত বছর ধরে যে অন্ধকার ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যখন স্বর্গ - মত্য কিছুই ছিল না, শুধু ছিল সীমাহীন স্বর্গীয় বিধি বিধান। তখন দিন আর রাত ছিল না, সূর্য বা চাদ ছিল না। যেনো স্রষ্টা সীমাহীন এক অতল নিদ্রায় তলিয়ে ছিলেন। সৃষ্টির কোন সংজ্ঞা ছিল না, কোন বানী ছিল না, আলো - বাতাস কিছুই ছিল না। জন্ম, মৃত্যু বা পরকালের জীবনের কোন অস্তিত্ব ছিল না। কোন মহাদেশ, কোন অঞ্চল, কোন বহতা নদী বা সাত সমুদ্রের সীমারেখা ছিল না। ইহকাল - পরকাল, স্বর্গ - মর্ত্য, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সময়ের কোন কিছুরই কোন অস্তিত্ব ছিল না। জন্ম - মৃত্যু তখন আসেওনি, ফিরেও যায় নি।
(এটা শিখ সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে নেওয়া হয়েছে)

(চলবে)
তানবীরা তালুকদার
৩০. ০৫. ০৮
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28813907 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28813907 2008-06-26 14:32:38
হেনস্থা :: তানবীরা তালুকদার
একদা সান্ধ্যকালে আমার আজাইরা গফসফে বিরক্ত হইয়া হিমু আমাকে কহিল, গালগল্প বাদ দিয়ে একটা লেখা লেখেন। আমি তখন হিমুকে তীব্র বেদনার সহিত জানাইলাম, হিমু, আমিতো রচনা লিখিতে চাই কিন্তু কি নিয়া রচনা লিখিব তাহা খুজিয়া পাইতেছিনা। হিমু ততোধিক বিরক্ত হইয়া কহিল, নৃত্যশিল্পী হিসেবে আপনার জীবনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাগুলো লিখিয়া ফেলুন। কিভাবে পচা ডিম খাইয়া খাইয়া আপনি ডিমের স্যালাদ বানাইতে শিখিলেন সেইটা লিখিয়া ফেলেন। প্রথমে আমি বালক ভাবিয়া তাহার কথা আমলে নেই নাই। কিন্তু আজ প্রত্যুষে অফিসে বসিয়া পত্রিকা পাঠ করিতে করিতে, আমার মনে গভীর ভাবের উদয় হইল। ভাবিলাম বেশীর ভাগ বাঙ্গালীই বিখ্যাত হয়েছেন মরনের পরে। তো সে সময়তো আমার এখনও ফুরাইয়া যায় নাই। মরনের রিস্ক আমাকে নিতেই হবে, অন্য সকল মানব এর মতো। তখন দেখা যাইবে আমার নৃত্যদৃশ্যের ভিডিও ক্লিপ হয়তো ইউনিভার্সেল ষ্টুডিওতে রাখা আছে, আমার লেখাগুলো রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত চিঠির বইয়ের পাশেই গাদা গাদা করিয়া বিক্রিত হইয়া চলিতেছে। একবার কিছু মনে হইলে তাহা আমার মাথায় প্যারেকের মতো গাথিয়া যায়, কিছুতেই মাথা ঝাকাইয়া সেই প্যারেক আমি নাড়াইতে পারি না। জীবনে যদি তাহারে মালা নাহি দিতে পারো টাইপের আবেগে আমি কম্পিত হইয়া ঠিক করিয়া ফেলিলাম লিখিয়াই ফেলাইবো আমার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা সমূহ। আমি তাহার সাথে আরো একটি ব্যাপার লক্ষ্য করিলাম যে বিশেষ বিশেষ ভাব আমার শুধু শুক্কুরবারেই উৎপন্ন হয়, এর কারন দুইটা হইতে পারে, শুক্কুরবারে অফিস ঠান্ডা থাকে বিধায় ভাব উদয় হওয়ার সুযোগ হয়, দ্বিতীয়তঃ হইতে পারে, পরের দুই দিন বেলা করিয়া ঘুম থেকে উঠিতে পারিব সেই আনন্দ আমাকে বিভোর করিয়া রাখে, যাহা হয়তো ভাব উৎপাদকের প্রভাবক হিসেবে কাজ করিয়া থাকে।

তো যখন আমি আমার অতীব দুঃখের সেই ইতিহাস রচনা করিতে লাগিলাম, কিভাবে পচা ডিম হইতে ডিমের স্যালাদ, সেই স্যালাদ দিয়া স্যান্ডউইচ বানাইতে শিখিলাম ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার দুই নয়ন অশ্রুজলে ভাসিয়া যাইতে লাগিল সেই সাথে ভাসিতে থাকিল আমার কাগজ - কলম সব। লিখিতে লিখিতে তখন মনে হইল কি হইবে আমার দুঃখের কথা লিখিয়া সমস্ত পাঠককে গড়াগড়ি দিয়া কাদাইয়া? কেউ আমার প্রতিভার দাম দিলো না সেই কষ্ট আমার বুকেই থাকুক। সকলের সম্মিলিত কাদাকাটিতে কাজের কাজতো কিছুই হইবে না, মাঝখান থাকিয়া বসুন্ধরা টিস্যুর অপ্রত্যাশিত ব্যবসা অন্যসকল সমস্যার উদয় করিবে। মার্কেটিং এর লোকজনকে অযথায় ঘুরিতে হইবে মার্কেট সার্ভে করিয়া উহার কারন বাহির করিবার জন্য। নতুন বিজনেস টার্গেট স্থির করিতে হইবে উহার পর আবার কেউ টিস্যু না কিনিলে টার্গেট ফেল হইলে উনাদের চাকুরী নিয়া টানাটানি লাগিবে। এছাড়াও শ্রমিকগনকে হয়তো ওভারটাইম খাটিতে হইতে পারে যাহাতে হঠাৎ করিয়া স্ত্রীর মনে সন্দেহ দানা বাধিতে পারে, স্বামী কিসের বাহানায় এতো রাত্রি করিয়া বাড়ি ফিরিতেছে? দাম্পত্য কলহ কখনও কখনো কঠিন আকার ধারন করিতে পারে, বধূ রাগ করিয়া পিত্রালয়ে আশ্রয় গ্রহন করিতে পারে।

অতোশতো ভাবিয়া ঠিক করিলাম মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা বাদ দিয়া বরং নৃত্যশিল্পী জীবনের হেনস্থা গুলিই লিখিয়া ফেলি। কাছাকাছিইতো ব্যাপারটি। যাহা ভাবিলাম তাহাই করিলাম। আমাদের ধর্মপ্রান প্রবাসী বাংলাদেশীরা বিভিন্ন কারনেই তাহাদের বাড়িতে ঘন ঘন মিলাদ মাহফিলের দাওয়াতের আয়োজন করিয়া থাকেন। ছেলে - মেয়ের জন্মদিন, নিজেদের বিবাহ বার্ষিকী, ছেলে -মেয়ের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া ইত্যাদি উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করিয়া এগুলি আবর্তিত হইয়া থাকে। বাংলাদেশ থেকে সব হারাইয়া বিদেশে আসিয়া ধর্মটাকে তাহার অতীব কষিয়া আকড়াইয়া ধরেন, কিছুতেই যেনো ছুটিয়া যাইতে না পারে। হারাম - হালাল, শুয়োরের চর্বি, পশ্চিম দিক - পূর্ব দিক এইসব নিয়া মহা ব্যস্ততার মধ্যে তাহারা কালাতিপাত করেন। বাংলাদেশের বেশীরভাগ লোকজন ব্যবসা করেন কিংবা রেস্টুরেন্টে কাজ করেন বিধায় দাওয়াত গুলো সাধারনতঃ রবিবার দুপুরে হইয়া থাকে। আমি মিলাদ মাহফিলের দাওয়াত তেমন একটা পছন্দ করি না। সারাক্ষন সবার সামনে একখানা ভালো মানুষী মুখোভাব ধরিয়া রাখিতে হয়, এই দুনিয়া কয়দিনের, হইয়া যাইবে ফানা টাইপ। কিন্তু আসলে এতো ভালো মানুষতো আমি আর না। আর আমার নিকট দুনিয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা জায়গা, তাহা যে কয়দিনেরই হোউক না কেনো। পরেরটা পরে দেখিবো। আমার রবিবারের মধ্যানহ ভোজের নিমন্ত্রন তেমন একটা পছন্দের তালিকায় পড়ে না। লক্ষী, অন্নপূর্নারা যেমন সকালে ঘুম থেকে উঠিয়া তাহাদের তিন সন্তানকে আপাদমস্তক সাজাইয়া লইয়া বেলা বারো ঘটিকার মধ্যে নিমন্ত্রন বাটিতে উপস্থিত হইতে পারেন, আমি তাহা মোটেও পারি না। আমি শনিবারে রাতে ছায়াছবি দেখিয়া কিংবা কোথাও বলো তা - রা - রা মার্কা পার্টি করিয়া কিংবা কাহারো সাথে অন্তর্জালে আলাপ - সালাপ করিয়া রাত্রি তিন ঘটিকায় শুইতে যাই। ফলে পরদিন বেলা দশটার আগে আমার তথা আমার বাড়ির কারোই নিদ্রাভংগ হয় না। এরপর উঠিয়া গড়াইয়া প্রাতঃরাশ সারিয়া আমার মেয়েকে কোন রকমে একটু - আধটু ঠিক ঠাক করিয়া লইয়া নিমন্ত্রন বাড়ি যাইতে যাইতে বেলা দ্বিপ্রহর গড়াইয়া যায়। আগে যদিও অন্যান্য ভাবী স্থানীয়রা নিজেদের পরম দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য ভাবিয়া, আমাকে সৎ পথে আনার জন্য এই সমস্ত লইয়া আমাকে বহু টিটকারী করিয়াছেন, এক কন্যায় এই অবস্থা আরো দুই চারিটি হইলে কি অবস্থা আমার হইবে তাহার বিশদ রম্য আলোচনা করিয়া ইদানীং তাহারা ক্ষান্ত হইয়াছেন। কারন কাজের কাজ কিছুই হয় নাই, মাঝ থাকিয়া আমি দুইটার বদলে আড়াইটায় পৌছানো শুরু করিয়াছি।

আমি যখন পৌছাই তখন সাধারনতঃ মিলাদ শেষ হইয়া হুজুর মোনাজাতে পৌছান। আমি ঢুকিয়া সবার সাথে কুশল আদান - প্রদান করা পর্যন্ত মোনাজাত, যাহার বাড়িতে দাওয়াত কিংবা যাহা উপলক্ষ্য বা যাহাকে উপলক্ষ্য করিয়া মিলাদ তাহার শান্তি কামনার মধ্যেই থাকে। আমি এক ধারে আসন গ্রহন করিবার কিছুক্ষন পর হইতেই মোনাজাতের / নার্গিসের মোড় ঘুরিতে থাকে। তখন উহা অযাচিত অপ্রাসংগিকভাবে নাচ - গান, বিভিন্ন বেদাতী কাজের উপর পড়িয়া যায়। হুজুর আখিরাতে তাহাদের কিরকম ভয়ানক শাস্তি হইবে উহার বিস্তারিত বিবরন দিয়া চিৎকার করিয়া কাদিতে থাকেন। হাশরের মাঠে তাহাদেরকে (আমাকে) কিভাবে কতো ডিগ্রী তাপমাত্রায় বারবিকিউ করা হইবে তাহার রোমহর্ষক বর্ননা থাকে। আশে পাশের সবাই সেই বর্ননা শুনিয়া আর কল্পনায় আমার গ্রীল্ড অবস্থা দেখিয়া শিহরিয়া শিহরিয়া উঠিতে থাকেন। আর আল্লাহর কাছে আমাদের মতো পাপী তাপীর জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করিয়া ডুকরাইয়া ডুকরাইয়া কাদিয়া উঠেন। আমি এক পাশে নির্লিপ্ত মুখ করিয়া বসিয়া দুই হাত মোনাজাতের ভঙ্গীতে উপড়ে তুলিয়া রাখি, চোখে মুখে এমন একটা ভাব ধরিয়া রাখার চেষ্টা করি, এই পাপী আমি না আর রান্নাঘর থেকে আসা সমস্ত সুখাদ্যের ঘ্রান নিতে থাকি। আর ভাবি কখন এই নিদারুন বোরিং মোনাজাত শেষ হইবে আর আমরা ভালো মন্দ কয়টা খাইতে পারিব অন্তত আমার যে উদ্দেশ্য এখানে আসা তাহা পূরন হইবে। যদিও এর মধ্যে হুজুর আমাকে আশা প্রদান করিয়া বারংবার বলিতে থাকেন, আল্লাহ মহান, তিনি মাফ করনেওয়ালা, ভুল স্বীকার করিয়া, তওবা করিয়া, বোরখায় ঢুকিয়া গেলে পরকালে একটা হিল্লা হইলেও হইতে পারে।

এহেন নিদারুন আমার আবার মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় নৃত্য পরিবেশন করার দাওয়াত আসে। এইখানে বসবাস করা বাংগালীদের ছেলে মেয়েরা স্কুল আর মসজিদের বাইরে গানের ক্লাশে কেউ কেউ গেলেও, নাচের ক্লাশের সহিত মোটামুটি তেমন কারোই সংযোগ নাই। তো এইবার পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটি সবে ধন নীলমনি আমাকে বেলজিয়ামে নৃত্য পরিবেশন করিতে আবার আমন্ত্রন জানাইলো। আমাকে “ফরেনার ক্যাটাগরী’তে ক্যাটাগরাইজ করা হইলো । হাজার হোক নেদারল্যান্ডসের লোক ব্যাকারনগতভাবে ও রাজনৈতিকভাবে বেলজিয়ামে ফরেনারতো বটেই। আমি পৌছানোর পর আয়োজক বাহিনীর একজন আমাকে অত্যন্ত গর্বের সহিত বাংলাদেশ হইতে আসা ফরেন (বাংলাদেশী ) আর্টিস্টদের কাছে লইয়া গেলেন। লুক্কায়িত মণোভাবটা এমন কাদের কাদের এনেছি দেখো। একজন খুব বিখ্যাত !!! কারো কাছে লইয়া গিয়া খুবই গর্ব ভরিয়া আমাকে পরিচয় করাইয়া দিইয়া তারপর আমাকে কহিলেন, উনাকেতো নিশ্চয় চিনেন। আমি অত্যন্ত লজ্জায় মরমে মরিয়া গিয়া বলিলাম, জ্বী না। আয়োজক সাহবে অবাক হইয়া আকাশ হইতে ভূমিতে পতন করিয়া বলিলেন, কেনো? টিভি দেখেন না? আমি আরো কুন্ঠিতভাবে বলিলাম, আমার বাংলা টিভি নাই। তিনি হুঙ্কার দিয়া উঠিলেন, কেনো নাই? আমি মিনমিনে গলায় বলিলাম, আমরা দিন আনি, দিন খাই, মজদুর মানুষ। আমাদের টিভি দেখিবারতো সময় নাই। উনি আমার মূর্খামিতে চরম বিরক্ত হইয়া রাগান্বিত ভঙ্গীতে চলিয়া গেলেন। আমি অন্য বিখ্যাত লোকদের সাথে আরাম করিয়া বসিয়া মাগনায় পিয়াজু, চা, সিঙ্গারা খাইতে ছিলাম। আমাকে একা পাইয়া তখন বাংলাদেশ থেকে আগত একজন বিখ্যাত শিল্পী মাগনার নসিহত দিলেন। এইযে দেশ, সংস্ক্রতি ভুলিয়া পয়সার পিছনে ছুটছি, কয়েকদিন পর টের পাইবো মজা। সন্তান যখন পুরো বেলজিয়ান (আমার বেলায় ডাচ হইতো উনি উত্তেজনায় খেয়াল করেন নাই) কিংবা বিদেশী হইয়া যাইবে। আখিরাতের কথাতো ভাবি না। ঝারি খাইয়া ভাবছিলাম কহিব নাকি, ওরে অবার্চীন দেশী বানানোর এক মাত্র উপায় কি শুধু দেশী টিভি দেখা? তাহাই যদি হয় তাহলে আমার কন্যা ডাচ বা বন মানুষ হইয়া যাক। বাংলা টিভি দেখিয়া আমার সন্তান কি মানুষ হইবে তাহা আর ব্যাখা করিয়া বলার অপেক্ষা রাখে না। যা আমার অনুষ্ঠানের ছিরি। সঠিক উচ্চারনে বাংলা কহিতে পারে এমন কয় জন আসে টিভিতে? তাহারা আবার নিজেদেরকে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে দাবী করে। কিন্তু সাহস করিয়া কহিতে পারিলাম না কিছুই, মনে মনেই কহিলাম। কে জানে আবার না উঠাইয়া দেয় ।

এরপর দেখিলাম বিখ্যাত লোকদের ঘিরিয়া ছবি তোলার হিড়িক লাগিয়া গেলো। যাহাদের অনুদানে এই অনুষ্ঠান হইতেছে তাহাদের স্ত্রী - সন্তানরা সাজঘরে আসিয়া নামী দামী শিল্পীদের সাথে ছবি তুলিতে লাগিলেন। নামী দামী শিল্পীরাও আরো ফরেন ট্যুরে আসিবার লোভে তাহাদের এক্সক্লুসিভ শাড়ির মায়া ভুলিয়া, বাচ্চাদের কোলে বসাইয়া, ভাবীদের কাধে জড়াইয়া ধরিয়া ছবি উঠাইতে লাগিল। ট্যুর থাকিলে শাড়ীও থাকিবে ইহা পাগলেও বুঝে। ইহা দেখিয়া আমিও উত্তেজিত হইয়া কাহাকে দিয়া আমার স্বামীকে ডাকাইয়া আনাইলাম। তিনি তখন বাইরে দাড়াইয়া অন্যদের সাথে বিড়ি ফুকিয়া ফুকিয়া জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছিলেন। এই কারনে ডাকাইতে তিনি যারপর নাই বিরক্ত হইয়া, অন্যদের নজর বাচাইয়া কঠিন একখানা লুক দিলেন আমাকে। তারপর কিড় কিড় করিয়া কহিলেন, যাহাতে আমি ব্যাতীত অন্য কেউ শুনিতে না পায়, এই সমস্ত ছবি দিয়া কি হইবে? আমিও আবদার করিয়া কহিলাম, কি হইবে আর কি হইবে না তাহা আমি জানি না। সব্বাই তুলিতেছে, আমরাও তুলিব। টিভি না থাকার ভুলতো হইয়াই গেছে, ছবি না থাকার ভুল করতে আমি আর রাজী না। ছবি তোলা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার পর যথারীতিতে যথাগতিতে অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হইয়া গেলো।

পুনশ্চঃ জনতার মুখে খবর পাইলাম আমার বাসায় বাংলা টিভির কানেকশন নাই এই খবর পাইয়া, বাংলা টিভি, এটিএন, চ্যানেল আই ইত্যাদি যাহারা এই অনুষ্ঠান কভার করিয়া ছিল তাহারা বৈশাখী রিপোটিং এ আমার একখানা নৃত্যের ক্ষুদ্রাংশ প্রতিশোধ স্বরূপ বারং বার প্রচার করিয়াছেন। যাহারা আমার নৃত্যাংশ দেখিয়াছেন তাহারা বিমলানন্দে আমাকে দূরালাপনীতে এই খবর জানাইলেন। ভাবখানা এই রকম, হাশরের মাঠে আমার রোষ্ট হওয়াটা এইবার একদম রিকনফার্ম। আমার খুবই জিজ্ঞেস করিতে ইচ্ছে করে তাহাদেরকে, যাহারা দেখিয়াছেন, হাশরের মাঠে তাহাদের জন্য কি বিধান থাকিবে? রবি ঠাকুরের মতে অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে .........। যদিও মালাউনের কবিতা নিয়া তাহারা ব্যস্ত না। তদুপরি কথাতো একটা থাকিয়াই যায়, যাহারা সারাদিন টিভির সামনে বসিয়া নানা রকম অনুষ্ঠানাদি উপভোগ করেন আর আজান দিলে কোনরকমে যাইয়া নামাজ সারিয়া আসেন কারন মনোযোগ দিয়া নামাজ, ইবাদত সারিতে গেলে ওইদিকে আবার সিরিয়াল চলিয়া যাইবে, তাহাদের জন্য কি বিধান আছে? প্রায়ই দেখা যায়, নামাজ আদায়ের পাচ মিনিট সময়ের মধ্যেই অনেকেই ছেলে - মেয়েকে চোখ রাঙ্গাইয়া শাসন কিংবা তরকারী গরম করার মতো কথাগুলো বলিয়া ফেলেন। তাহাদের বিধান কি ???


তানবীরা তালুকদার
২৩.০৫.০৮
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28809429 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28809429 2008-06-14 14:27:59
শেষ বিকেলের রোদ সহমরনে :: -আল নোমান শামীম
শেষ বিকেলের রোদ সহমরনে
আল নোমান শামীম

বাসরীয় সন্ধা,
তারও একটু পর,
হিমেল হাওয়াদের উড়াউড়ি, অকারন লাজে কিশোরীর মতো,
ঘাসের বনে নিশ্চিত আশঙ্কা এক্ষুনি টুপকরে ঝরে পড়বে শীতের ওমেরা,
যেখানে অভিমানি আকাশ মুখ লুকিয়েছে মেঘেদের কোলে, সেখানে
মন্থনে উঠে আসে কালো ঘুঙুর সন্ধার সেতারে ভেসে তিলোক কুমুদে,
আমি বলে দিতে পারি,
বিপ্র হবে সাধনা পুজারীর,
তোমার পিঠের নরম জমিনে, আজ সুরেরা করবে বাসনা রাইকিশোরীর,
সেখানে ঘাসের ছোঁয়ায় ঘাস ফরিঙেরা করবে বাসর সজ্জা,
নিক্কনে বলে দিতে পারি, তোমার শিহরিত পল্লবের রোমধনু
দ্রৌপদীর আঁচলে বসাবে পুরুষের সাতকাহন,
তারওপর,
কোনো এক সান্দ্র পুবালি বা’য়ে
তোমার কোমড়ে উঠে আসা ধনুকের টানটান উচ্ছাস,
কোনো পারিজাত নিটোল পুকুরের ছায়ায় আমার নিশ্বাসে
স্বপ্নের পরিপাটি বুঁননে আঁকবে প্রেমের কুটীরখানি, পিছলে
পড়া শরতের জোৎস্নার আলো,
আমি আসমুদ্র তৃ-ায়
সাধকের ধ্যানে কাটাই লক্ষ আলোকমৃত্যু, তোমার নাভীমুলে, কাব্যের
ঝংকারে কি তীব্র খুঁজে বেঁড়াই উপমার নিকোনো উঠান, অমর্ত্য
জলের ছবিতে বিদগ্ধ হয় অস্রু, আমি ক্রমশই টের পাই-
একই রুদ্রাক্ষে বেঁধে রাখা যাবে না অভিমানি মেঘেদের নুপুরের নিক্কন,
দ্রৌপদীর আঁচল, শরতের প্রশান্ত প্রহরের স্থির প্রতিচ্ছবি।

অতঃপর -
প্রমোদ বিলাসে তোমার ওষ্ঠে কেঁপে ওঠে টলটলে দীঘি,
প্রণয়ের ঝড় শেষে, সিঁথিতে নাচে শেষ বিকেলের রোদ সহমরনে,
ধবলকান্তি কাশফুলে কেবলই একতারার বিনম্র একাগ্রতা এখন-
এই বাসরীয় সন্ধায়।


২৯-০৫-২০০৮



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28806492 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28806492 2008-06-05 14:47:02
ছুটির ফাঁদে :: যুথিকা বড়ুয়া সঞ্জয় আর মালবিকা, ওরা নিঃসন্তান। দুজনেই অর্থ উপার্জন করে। স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ছোট্ট ছিমছাম নির্ঝঞ্ঝাট সুখী পরিবার সঞ্জয়ের। পেশায় একজন মেডিক্যাল ডাক্তার! চাইল্ড্ স্পেশালিষ্ট! আর স্ত্রী মালবিকা, হাইস্কুলের শিক্ষয়িত্রী। শহরের নিড়িবিলি রেসিডেন্সি এলাকায় অট্টালিকার মতো শ্বেতপাথরের মোজাইক করা বিশাল বাড়ি তাদের! বাড়ির সদর দরজার ওপরে নেইম প্লেটে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করে লেখা, “শান্তি কুটির।”
কর্মজীবনে মানব সেবাতেই দিন আর রাত পোহায় সঞ্জয়ের! দিনের শেষে ক্লান্ত সূর্য্যমিামা কখন যে অস্তাচলে ঢলে পড়ে, সন্ধ্যে পেরিয়ে বাইরের পৃথিবীটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়, মালুমই হয়না! অবিরাম রুগীর সেবা-শুশ্রূষা করতে করতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের আনন্দ-উচ্ছাসে একেবারে ভাটাই পড়ে গিয়েছিল সঞ্জয়ের!
সেবার সামার ভেকেশনে মনস্থির করে, রুটিনমাফিক কর্মজীবন থেকে কিছুদিনের জন্য বিরতি নিয়ে সমুদ্র-সৈকতে যাবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, তার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে! তিনি বাতের ব্যথায় নড়তেই পারেন না কোথাও! সকাল সন্ধ্যে দুইবেলা পালা করে লোক আসে ওনাকে মাসাজ করতে। সারাদিন বেশীর ভাগ সময়ই তিনি শুয়ে বসে কাটান! তার দেখভালের জন্যও একজন বিশ্বস্থ কাউকে দরকার! কিন্তু স্বেচ্ছায় সঞ্জয়ের এতবড় একটা দায়িত্ব নেবে কে! তা’হলে!
শুনে সঞ্জয়ের বাল্যবন্ধু ভাস্কর বলল, -‘আরে এয়ার, ডোন্ট ওরি! ম্যায় হুঁ না!’
প্রভুভক্তের মতো আনুগত্য হয়ে মাথাটা সামনে ঝুঁকিয়ে দিয়ে বলে, -‘বান্দা হাজির দোস্ত! বিপদের সময়ই বন্ধুর পরীক্ষা হয়! মাসিমাকে নিয়েই যতো ভাবনা তো, নিশ্চিন্তে থাক্! ওনার দেখাশোনা আমিই করবো! তুই শুধু বাড়ির চাবিটা আমায় সঁপে দিয়ে যা ব্যস, কেল্লাফতে!’
অপ্রত্যাশিত বন্ধুর আশ্বাস পেয়ে সানন্দে খানিকটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল সঞ্জয়। চোখের তারাদু’টি চক্ চক্্ করে উঠল ওর। দীর্ঘদিন পর ঠোঁটের কোণে মালবিকার মুচকি হাসির ঝিলিকটাও আরো উদ্ধত করে করলো ওকে। স্বহাস্যে ভাস্করের পিঠে আলতোভাবে একটা চড় মেরে বলে,-‘ইয়ে হুই না বাত! সত্যি মাইরি, আমায় বাঁচালি তুই!’
পঁঞ্চাশের উর্দ্ধেঃ বয়স সঞ্জয়ের। মুশকিল আসান হতেই শুরু হয় অবকাশ যাপনের প্রস্তুতিপর্ব। ঘুম ভাঙ্গতেই চোখ মেলে দ্যাখে, ঊষার প্রথম সূর্য্যরে নির্মল হাস্যেৎজ্জ্বল একটি আনন্দময় সকাল। যেন সমস্ত মানুষগুলিকে অকুন্ঠভাবে আহ্বান করছে, স্বতঃস্ফূর্ত মনে উল্কার মতো দ্রুত কক্ষচ্যুত হয়ে আনন্দময় কোনো এক প্রান্তরে চলে আসার জন্য।
সবুর সয়না সঞ্জয়ের। সেদিন সকালেই উৎসাহে-উদ্দীপণায় দায়িত্বের বোঝা ভাস্করকে প্রগাঢ় বিশ্বাসে সঁপে দিয়ে বেরিয়ে আসে বাইরের পৃথিবীতে! সাময়িক অবসর নিয়েই স্বস্ত্রীক রওনা হয়ে গেল সমুদ্র-সৈকতে! কিন্তু মঞ্জুর হলো না বিধাতার! মাঝপথে গিয়ে তাদের বিশাল যাত্রীবাহী টুরিষ্ট বাসটা হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিকটে পড়ে একটি নোংরা কর্দমাক্ত খাঁদের গভীরে! আর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আত্মচিৎকার। কাঁন্নার রোল। প্রাণ হারায় অনেকে! কেউ গুরুতরোভাবে ঘায়েল হয়ে অর্ধমৃত অবস্থা! আর কেউ প্রাণে বেঁচে গেলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বিকলাঙ্গ অবস্থায় প্রায় নমাস চিকিৎসাধিনে পড়েছিল, স্থানীয় হাসপাতালে! সেখানেই এ্যাড্মিটেড ছিল মিষ্টার এ্যান্ড মিসেস সঞ্জয় রায় চৌধুরী! তাদের সঙ্গে কোনপ্রকার আইডেন্টিটি কার্ড কিংবা বাড়ির ঠিকানা ছিলনা যে, এতবড় একটা মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদটা তাদের আত্মীয়-পরিজনের কাছে গিয়ে পৌঁছাবে।

একেই বলে নিয়তির নিমর্ম পরিহাস! ওদের সুখের সংসারে কার যে নজর পড়েছিল, একদিন সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে ফিরে এসে নিজের বাড়িই আর খুঁজে পায়না সঞ্জয়! সারাপাড়া পরিক্রমা করে ও’ বারবার একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়! আর মনে মনে ভাবে, এ কি, আমাদের ‘শান্তি কুটির’ গেল কোথায়! এ তো দেখছি, ‘ভবানী ভবন’ লেখা! কি আশ্চর্য্য, বাড়ির নক্সাটাও সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে যে! কিন্তু তাই বা সম্ভব হয় কি করে!
ইতিপূর্বে এক বয়স্ক ভদ্রলোক ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, -‘কাকে চাই?’
অপ্রত্যাশিত হঠাৎ অচেনা লোকের মুখদর্শণে হকচকিয়ে যায় সঞ্জয়। ভবানী ভবনের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে বলে, -‘আপনি, আপনাকে তো চিনতে পারলাম না! আপনি কে হে মশাই!’
ঠোঁট চিবিয়ে চিবিয়ে ভবানিচরণ বললেন,-‘আজ্ঞে আমি হইলাম ভবানীচরণ দাস। এ বাড়ির মালিক। নুতন কিনছি!’
আঁতকে ওঠে সঞ্জয়। -‘বলেন কি মশাই, আপনি এ বাড়ির মালিক! এ চত্তরে আগে তো কোনদিন দেখিনি! মশাই আপনার মস্তিস্ক, শরীরের তাপমাত্রা সব ঠিক আছে তো!’
শুনে রেগে লাল ভবানীচরণ। চোখমুখ রাঙিয়ে একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। তোতলাতে শুরু করেন। সঞ্জয়ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। থানা পুলিশের হুমকি দিতেই লেগে যায় তুমুল ঝগড়া। অথচ তখনও কল্পনাই করতে পারেনি, যে নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশী, সেই ছোট্ট বয়স থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা বাল্যবন্ধু ভাস্কর মিত্র, যার উপর বাড়ির সমস্ত দায়-দায়িত্ব সঁপে দিয়ে গিয়েছিল, সে-ই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে! ভাবতে পারেনি, জীবনের সাঁঝবেলায় এসে ওরই বিশ্বস্থ বন্ধু ভাস্কর, নিষ্ঠুরের মতো এতবড় কঠিন আঘাত হেনে প্রৌঢ়ত্বে নিঃশ্ব করে দিয়ে ওকে একেবারে পথে বসিয়ে দিয়েছে!
দুই দুটো জলজ্যান্ত প্রাণী হঠাৎ নিখোঁজ হবার পর সারা পাড়ায় যখন হৈচৈ পড়ে গেল, আত্মীয়-স্বজনরাও যখন অনুসন্ধানে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনি সঞ্জয়ের হৃদয়-প্রাণ ‘শান্তি কুটির’ সবার অলক্ষ্যে বেনামে বেচে দিয়ে, সঞ্জয়কে বেঘর, নিরাশ্রয় করে দিয়ে, পলাতক দাগী আসামীর মতো রাতারাতি শহর ছেড়ে অন্যত্রে গিয়ে আত্মগোপন করে তারই বিশ্বস্থ বন্ধু ভাস্কর মিত্র! যা ঘূণাক্ষরেও পাড়ার কেউ টের পায়নি!
ততদিনে সঞ্জয়ের গর্ভধারিনী বৃদ্ধা মায়ের বুঝতে আর বাকি থাকেনা। তার একমাত্র পুত্র সন্তানকে হারানোর শোকে কাতরতায় তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েন। তার শূন্য বুক দুইহাতে চাপড়াতে চাপড়াতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় যে চলে যায়, আর ফিরে আসেনি। হয়তো পথেঘাটে কোথাও মৃত্যুবরণ করেছে, কে জানে!
বিকৃতি চেহারা আর বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে উচ্ছাসহীন, আবেগহীন মালবিকা নিথর নির্জীব প্রাণীর মতো অন্যমনস্ক হয়ে উইলচেয়ারে বসেছিল। একেই আচমকা জীবনে অনাকাঙ্খিত বিপদের সম্মুখীন হয়ে পঙ্গুত্বের গ্লানিতে মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে! তন্মধ্যে দুঃস্বপ্নের মতো অবিশ্বাস্য এবং সর্বস্বান্ত নিঃশ্ব হয়ে যাওয়ার দুঃসংবাদ শুনে মাথায় যেন বজ্রাঘাত পড়ে। এ কি সর্বণাশ হলো তাদের! আনন্দমুখরিত চঞ্চল প্রবাহিত জীবনটা ওদের হঠাৎ কেন বিনা নোটিশে থেমে গেল!

অবসন্ন ব্যাথাতুর দেহটা বহন করবার মতোও শক্তি নেই মালবিকার। বুকের ভিতরের সমস্ত ব্যাথা, কষ্টগুলি বুক ফেটে দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় ঝড়তে থাকে! পারেনি সম্বরণ করতে! ক্ষোভে দুঃখে শোকে বিহ্বলে হঠাৎ সঞ্জয়কে জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজে হু হু কেঁদে ওঠে!
বেদনাহত বিমূঢ়-ম্লান সঞ্জয়, পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে! স্ত্রীকে শান্তনা দেবার মতো একটা শব্দও উচ্চারিত হলোনা ওর! কি বলে শান্তনা দেবে! কখনো কি ভেবেছিল, জীবন জোয়ারে সুখের তরীতে ভাসতে ভাসতে একদিন আচমকা অতল তলে তলিয়ে যাবে! যেখানে কূল নেই! কিনারা নেই! বেঁচে থাকারও কোনো অবলম্বণ নেই! জীবন নদীর খেয়া পুনরায় বাইতে শুরু করলেও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো প্রাণবন্ত মালবিকার চোখের তারাদু’টিতে কখনো আর খুশীর ঝিলিক দেখা যাবেনা। কিছুই আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ফিরেও আসবে না কোনদিন! শুধু নীরব নির্বিকারে বুকের মাঝে জমে থাকবে না বলা কিছু কথা। কথার আলাপন। আর অহরহ কানে বাজবে, খুশীর বন্যায় প্লাবিত করে ভ্রমরের মতো ভেসে বেড়ানো মালবিকার গুনগুন গুঞ্জরণে অপূর্ব সুরের মূছর্ণা।
স্ত্রীর অলক্ষ্যে পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে সঞ্জয় দেখল, বিষন্নতায় ছেয়ে গিয়েছে মালবিকার শরীর ও মন! ক’মাসেই অনেক বুড়িয়ে গিয়েছে। চোখমুখও শুকিয়ে মলিন হয়ে পুতুলের মতো দেখাচ্ছে ওকে! কি যেন ভাবছে মালবিকা!
সঞ্জয় তক্ষুণি বিড় বিড় করে ওঠে মনে মনে,-‘কিচ্ছু ভেবো না মালবিকা, আমি অঙ্গীকার বদ্ধ! আমার অকুণ্ঠ হৃদয়ের উজার করা নীরব ভালোবাসায় প্রিয়তমার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দৃঢ় অঙ্গীকারে আমার বুকের সমস্ত কষ্টগুলি লুকিয়ে থাকবে, ক্ষণিকের একফালি অনিন্দ্য সুন্দর হাসির আড়ালে।’
হঠাৎ মালবিকার গভীর সংবেদনশীল দৃষ্টি বিনিময় হতেই বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল সঞ্জয়ের। ওর ভারাক্রন্ত হৃদয়ে ক্ষণপূর্বের সেই যন্ত্রণাদায়ক গহীন বেদানুভূতির তীব্র দংশণে মস্তিস্কের সমস্তস্নায়ূকোষগুলিকে যেন কুরে কুরে খেতে লাগল! অত্যন্ত পীড়া দিলো মুমূর্ষ্য হৃদয়কে! হতাশায় বিশুস্ক বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল। অনুতাপ আর অনুশোচনার অন্ত নেই। হারিয়ে ফেলেছে মনের সমস্ত শক্তি! বুকের পাঁজরখানাও ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে গিয়েছে ওর! মালবিকার মুখপানে চোখ তুলেও আর তাকাতে পারেনা! ওর প্রিয়তমা ওর প্রিয়তমা পত্নী, অর্ধাঙ্গিনী মালবিকাই ছিল, চির অম্লান, চির সজীব, স্নিগ্ধ শান্ত কোমনীয় এক উদ্বিগ্ন যৌবনা অনন্যা! প্রেমের মহিমায় দ্বীপ্ত মমতাময়ী বিদূষী রমণী। ওর হৃদয়হরিনী। সঞ্জয়ের নিবেদিত প্রাণ, শক্তির উত্স! ওর প্রেরণা, ভাই-বন্ধু-প্রেয়সী, সব!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28806127 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28806127 2008-06-04 12:38:44
কম্পিউটার ভুল করে না :: আইয়ুব আহমেদ দুলাল আইয়ুব আহমেদ দুলাল

কম্পিউটারে ভুল হতে পারে অপারেটিংয়ের জন্য, কম্পিউটারের জন্য নয়
যতোদূর মনে পড়ে, ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম অবজেকটিভ টাইপ পদ্ধতি শুরু হয়েছিল। তারপর কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষার খাতা চেক করা শুরু হয়েছিল। পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষেত্রে প্রথম যখন এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল ঠিক সেই সেশনে বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী ফেল করেছিল। আসলে তারা ফেল করেনি, তাদের ফেল করা হয়েছিল। আবার ফেল করা অনেকেই পাস করেছিল, এমনকি স্ট্যান্ডও করেছিল।
দেশের প্রথম সারির খ্যাতনামা বেশ কয়েকটি স্কুলের শত শত ছাত্রছাত্রী সেবার রাস্তায় নেমে তাদের জীবনের ওপর অত বড় একটি কলঙ্ক চিহ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার নিমিত্তে সুব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছিল। প্রেসক্লাবের সামনে রাস্তায় গড়াগড়ি গিয়ে কর্তৃপক্ষের আক্কেলের ওপর চোখের নোনাজল ফেলে তাদের বিবেকের অস্থি-মজ্জা ধুয়ে দিয়েছিল। তাদের খাতা আবার যাচাই করার দাবি করেছিল। সেই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা কর্তৃপক্ষের বশংবদ সেই ব্যক্তিদের যখন ওই ঘটনার কারণ জানতে চেয়েছিলেন তখন তারা দন্ত প্রদর্শন করে বলেছিলেন কম্পিউটার নাকি ভুল করেছে। অনেক জ্ঞানীগুণী বুদ্ধিজীবী মহল সেদিন মাথা নিচু করে নিয়েছিলেন। প্রতিবাদ করার বা তাদের বিকৃত মস্তিস্কে খোঁচা মেরে ফুটো করে জ্ঞান ঢুকিয়ে বা শিখিয়ে দেয়ার মতো মানসিকতাও তারা হারিয়ে ফেলেছিলেন। কারণ তারা জানেন, আহাম্মকের কথার প্রতিবাদ করলে নিজেকেই আহাম্মক হতে হয়। তারা জানতেন, কম্পিউটার কখনো ভুল করে না। ভুল তথ্যের জন্য কম্পিউটার আবিষ্কার হয়নি। বরং যে কম্পিউটার অপারেট করে সে ভুল করে, তার ভুল হয়। সে যে ফর্মুলা প্রয়োগ করবে বা নির্দেশনা দেবে কম্পিউটার সেই অনুযায়ী কাজ করে বা করবে। এমনকি সিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো ফর্মুলা প্রয়োগ হলে কম্পিউটার তা সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ দেবে। সব মিলিয়ে কম্পিউটার ভুল করেছে- এটা কোনোভাবেই বলা যায় না। বললে তা হবে চিরন্তন মিথ্যা।
যাহোক সেই প্রসঙ্গটা হয়তো পুরনো। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডি প্রসঙ্গটা বর্তমানে দেশে হটকেক। ন্যাশনাল আইডি প্রস্তুতিকরণ পদ্ধতি পরিপ্রেক্ষিতে ওপরের ঘটনা পুনরাবৃতি করলাম মাত্র। ভোটার আইডি বা ন্যাশনাল আইডেনটিটি পদ্ধতি বাস্তবায়ন পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষের একটা মহৎ ও বৃহৎ উদ্যোগ। নিঃসন্দেহ প্রশংসার দাবিদার এবং আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকায় লেখা আসছে, সেই আইডি কার্ডে নাকি তথ্য প্রদানে অনেক ভুল রয়েছে। যেমন- বানানে ভুল, পিতার জায়গায় স্ত্রীর নাম, ছেলের জায়গায় বাড়ির নাম, প্রকৃত নামের বিকৃতি, ছবি, ঠিকানা ঠিক থাকলেও নাম ভিন্ন, রাজশাহীর জায়গায় কুমিল্লা, স্ত্রীর নামের জায়গায় অন্য মহিলার নাম ইত্যাদি ভুল তথ্য ছাপা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট লোকজন কি বলবেন, কম্পিউটার ভুল করেছে? এ যুক্তি এখন আর মার্কেটে চলবে বলে মনে হয় না।
এখন প্রায় সব শিক্ষিত মানুষই কম্পিউটার প্রযুক্তি সম্পর্কে কমবেশি জ্ঞাত। তবুও শোনা যায় কর্তৃপক্ষের লোকজন নাকি বলছেন, সিস্টেমে সমস্যা ছিল। আমার প্রশ্ন হলো, সিস্টেমে যদি সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে ফাইনাল প্রিন্ট হলো কেন? এখনকার প্রযুক্তি নড়বড়ে নয়, অনেক উন্নত। সেই ১০-১৫ বছর আগের মতো চিন্তা করে ফর্মুলা বসাতে হয় না। সবই সেট করা আছে (অপারেটিংয়ের ক্ষেত্রে)। ডাটা এন্ট্রির সময় অপারেটর কিংবা নেপথ্যের কারিগররা দেখতে পাননি কেন? একজন ব্যক্তি সামনে বসে অপারেটরকে তার পুরো নাম, ঠিকানা সঠিকভাবে লিখে দেয়ার পর অপারেটর সেই ডাটা প্রোগ্রামে এন্ট্রি করে ওকে করেছেন। প্রোগ্রাম সেটা গ্রহণ করেছে এবং নিশ্চয়ই একটি মেসেজ দিয়েছে। তাছাড়া তথ্য পূরণের পর কয়েক সেকেন্ড ব্যয় করে প্রিভিউতে নাম, ঠিকানা দেখে নেয়া যেতে পারতো। প্রিভিউ দেখার অপশন বর্তমানে সব প্রোগ্রামেই আছে। যদি সিস্টেমে সমস্যা থাকবে তাহলে কম্পিউটার সেই ডাটা গ্রহণ করতো না। গ্রহণ করলেও মেসেজ আসতো। তাছাড়া সিস্টেমে যতোই গ-গোল থাকুক না কেন, শব্দের বানান তথা নাম কেন ভুল হবে? আকলিমার জায়গায় বড়জোর আখলিমা হতে পারে, কিন্তু তাহমিনা হতে পারে না। এছাড়া সিস্টেমে সমস্যা থাকলে হয়তো লাইন সামান্য আপ-ডাউন হতে পারে অথবা ফাইল করাপ্ট হয়ে পুরো তথ্য উল্টোপাল্টা হতে পারে (অবশ্যই সেটা ধরা পড়বে এবং মেরামতযোগ্য), কিংবা পুরো তথ্যই ডিলিট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ছবি ও ঠিকানা ঠিক থেকে সোনামিয়ার জায়গায় তো লালমিয়া হতে পারে না। ভেবে দেখুন, সোবহানের জায়গায় যদি ছোবড়ান হয়ে যায় তাহলে নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো স্থানে পাবলিকে নিঃসঙ্কোচে চড় মারা শুরু করে দেবে কি না!
আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওই প্রজেক্টে বেশ অভিজ্ঞ ও দক্ষ অপারেটর, প্রোগ্রামার ও টেকনিশিয়ান কাজ করেছেন, তারা আমার চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো জানেন এবং অভিজ্ঞতা রাখেন। তারাই প্রযুক্তিগত যৌক্তিক ব্যাখ্যা ভালো দিতে পারবেন। তবে একজন প্রোগ্রামার ভালো করেই জানেন, প্রোগ্রামে সমস্যা দেখা দিলে তিনি কিভাবে বুঝতে পারবেন, কিংবা কিভাবে সমাধান দেবেন, অথবা তার ফলাফল কেমন হবে। তার কাজ শুধু প্রোগ্রামের দিকে নজর রাখা, কারো নামের বানান কিংবা অপারেটর কার স্ত্রীকে অন্যের স্ত্রী বানিয়ে দিয়েছে সেই দিকে নয়। আমার বিশ্বাস প্রোগ্রামাররা তাদের দায়িত্ব ঠিক ঠিকমতোই পালন করেছেন। টেকনিশিয়ানরাও তদ্রƒপ। তা না হলে অপারেটররা স্বাচ্ছন্দ্যে ডাটা এন্ট্রি কিংবা অপারেটিং করতে পারতেন না। এখানে অবশ্যই ‘সরকারি মাল দরিয়াতে ঢাল’ পন্থায় অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কাজ করেছে। মূলত দোষ চাপানোটা আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নিজে দোষ স্বীকার না করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিই। এটা মোটেও উচিত নয়। দোষ স্বীকার করাটাও একটা মহৎ গুণ। বোধগম্য হয় না, সরকারি কাজে এতো অবহেলা কেন ? কোথাও কোনো স্বচ্ছতা দেখা যায় না। অবহেলা-অযতœ মানেই যেন সরকারি। সেখান থেকেই হয়তো ওই শব্দ দুটির (অবহেলা, অযতœ) উৎপত্তি হয়েছে। তাহলে কি বিশ্বাস করা যায় যে, সরকারি বশংবদ সব কাঠের পুতুল, শুধু পয়সা দেখলে হা করে !
সব মিলিয়ে অদক্ষতাকেই দায়ী করা যায়। অথচ আমাদের দেশে অনেক ট্যালেন্ট রয়েছে। তারা গেম এবং চেটিং করে সময় কাটায়। এসব জাতীয় কাজে কলেজ, ভার্সিটি থেকেও অস্থায়ী ভিত্তিতে ট্যালেন্ট কাজে লাগানো যেতে পারতো। এতে তাদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হতো। নিজের মধ্যে কোয়ালিটি খুঁজে পেতো। সেই বিশ্বাসে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে অন্তত বিষণœœতা থেকে মুক্তি পেতো। শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে কোনো না কোনোভাবে নিজেকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতো।
জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভোটার আইডি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা একটা সিকিউরিটি। একটি মানুষের সঠিক পরিচয় বহন করে। এ পরিচয়পত্রের ভুল তথ্যের জন্য একজন দাগি ফেরারি আসামি বা ক্রিমিনালও সৎ হিসেবে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে। আবার অপরাধ না করেও একজন সৎ মানুষ ক্রিমিনাল হিসেবে ফেঁসে যেতে পারে। একজনের স্ত্রী অন্যের স্ত্রী হয়ে যাওয়ার বিষয়টা না হয় সামাজিকভাবে হাস্যকর হবে, কিংবা প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু একজন স্ত্রীলোক সেনাপ্রধানের মতো ব্যক্তির নাম ব্যবহারকারী ভুল কার্ড দেখিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে। কাজেই এ কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তেমন শিকারির শিকার হতে চাই না। কাজেই আমাদের এ দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সব কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে সচেতনভাবে সঠিক সময়ে সঠিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সর্বদা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করবেন এটাই নাগরিক হিসেবে আমাদের চিরপ্রত্যাশা।




সৌদি আবর


যায়যায়দিন
উপসম্পাদকীয়

২ জুন ২০০৮ সোমবার
২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪২৯
১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৫
বছর ০২ সংখ্যা ৩৫১


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28805491 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28805491 2008-06-02 15:57:42
কবির প্রবেশাধিকার :: আল নোমান শামীম
কবির প্রবেশাধিকার
-আল নোমান শামীম

অনেক দিন লেখালেখি করিনা। করিনা বললে ভুল হবে, করতে পারি না। করার জন্য একটা মন লাগে, একটা ব্যাপার আছে, যেটা কবি আর লেখক ছাড়া এই পৃথিবীর কেউ বুঝবে না, জানবে না। সেটা এই কবি আর লেখকদের একান্ত গোপন প্রাণ ভোমড়া। একটা অতৃপ্তি, একটা কি জেনো নেই-কি জেনো থেকেও নেই, বিলাস, বিলাসী কষ্ট, সব কিছু নিজের মতো করে দেখতে চাওয়া-সুন্দরের কাছে পরিপুর্ণ আত্মসমর্পণের নিদারুন ব্যর্থতা, কোথায় যাই, কার কাছে যাই, কোথায় গেলে পাবো শ্যামল কান্িত, কোথায় সেই পুর্ন ভুবন। এই লেখা পড়ে নিশ্চয়ই অজয়দা আর মিন্টন ভাই চিৎকার করে বলবেন, ওরে বলিস না, বলিস না, সর্বনাশ হয়ে যাবে, আমাদের ভাবনাগুলো শুনে ফেলবে সবাই, পৃথিবীর সব লোক কবি আর লেখক হয়ে যাবে, মানুষ জেনে যাবে তার সৃষ্টির রহস্য।

টিভিতে একটা নাটক হচ্ছে, আজিজ সুপার মার্কেট, সেটা দেখে অজয়দা ভীষন উচ্ছাসী, বললেন ‘ফাটায়া ফেলতাছে‘। আমিও ক্যাম্পসির চক বাজার থেকে সেইদিনই ভাড়া নিয়ে আসলাম । দেখলাম সাথে সাথে (অজয়দার অনেক কিছু আমি যাচাই বাছাই না করেই গ্রহন করি) আর ভাবলাম কবি আসলাম সানী তো আসলেই ‘ফাটায়া ফেলতাছে’। কবিরা এখনো মানুষ হয়ে উঠেনি এই পৃথিবীর, ণতৈ ঠতি ঠরৈ তডসি ওরৈলদ, কোনো কবিই কস্মিন কালে এই পৃথিবীর হয়ে ওঠেনি, বাংলাদেশের কবিরা তো নই-ই। রুদ্র মোহাম্মদ নামে আমাদের কিশোর কালে একজন কবি ছিলেন, সারাদিন সিঙ্গারা আর চা খেতেন, সাথে চলতো ধুদ্ধুমার সিগারেট, তসলিমা নাসরিনের প্রেমিক, স্বামী আবার প্রেমিক, মনে হয় প্রেমিকই ছিলেন বেশী। একদিন ডাসে আড্ডা দিচ্ছিলাম কবিতা আবৃতির ওয়ার্কশপের পর, কে একজন খোঁচা দিয়ে বললো, ওই দেখ কবি রুদ্র। আমি দেখলাম আর সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম, সারা জীবন শুধু কবিতাই লিখবো আর রুদ্র মোহাম্মদের মতো করে চুল রেখে সে যেভাবে সিগারেটে টান মেরে মাথার চারিদিকে ধোঁয়ার মেঘেদের শাসন করছে, সেভাবে শাসন করবো। কিশোর বয়সের অনেক স্বপ্নই মনে হয় শুধুই স্বপ্ন দেখা, এখনো সেই ওয়াদা আমার রাখা হয়ে উঠেনি, আমি এখন লেখালিখিই করিনা।

সময়ের অপেক্ষা তো অনেক হলো, খুব মন খারাপ হলে, মন ভ’রে এক নিশ্বাসে কোনো গভীরতর অরন্যে চলে যেতে ইচ্ছে করে, ঘুঁম ঘুঁম চাঁদে, অথবা, ধলেশ্বরীর তীরে হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে জলের দিকে তাকিয়ে অনুক্ষন দীর্ঘক্ষন। এক জেলে দেখেছিলাম, নৌকার কিনারে দাঁড়িয়ে সাধুর মৌন ধ্যানে মগ্ন, মাছ মারার জাল ফেলে জলের দিকে তাঁকিয়ে আছে অনন্তকাল, কবি। একদিন যাত্রাবাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলাম, মোড়ে, রাত ১টা হবে(আসলে সকাল) , আবাহনী-মোহামেডানের খেলা ছিলো, খেলা শেষে পলটনে বন্ধুর বাড়ি আড্ডা দিয়ে জুড়াইনে বাসায় ফিরছি, মোড়ে কোনো রিক্সা নেই, আমার মতো দেরী করে ঘরের ফেরারী কয়েকজন, হঠাৎ দেখলাম একটা নতুন রিক্সা তুমুল বেগে মোড় ঘুরে জুড়াইনের দিকে যাচ্ছে। সবাই হাত উঠালো আগে আর পরে, রিক্সাওয়ালার এই দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই মোটেই, সে চলেছে যেনো কোনো দ্বিগ্বিজয়ে, কে থামাবে তাকে, কার এতো স্পৃধা থামিয়ে দেয় তার বিজয় রথ! তারপরও সবার মতো হাত উঠালাম এই ভেবে যে সে থামবে না, কিন্তু সে একটু ধীর হয়ে গেলো আমার সামনে এসে (তখোন ভাবলাম আমি ছিলাম সবার শেষে, তাই বোধ হয়), ঘাড় নেড়ে সম্রাটের মতো হুকুম করলো আমাকে উঠে পড়তে। আমি কাল বিলম্ব না করে টারজানের মতো লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম বিজয়রথে, পিছনে ফিরে সবার দিকে তাকিয়ে অট্রহাসি দিয়ে দিতে ভুললাম না মোটেও। এদিকে আমার বিজয়রথ চলছে তো চলছেই, জুড়াইনের কাছে আসতেই আমি বললাম, কতো দিবো, সম্রাট সে কথায় কান না দিয়ে বেদ বাক্যের মতো উচ্চারন করলো, স্লো করতাছি, নাইমা যান। আমি নেমে গেলাম আর সেই বিজয়রথ আমাকে পরিত্যাগ করে না থেমে দ্বিগুন উল্লাসে রেলগেট পাড় হয়ে গেলো, কবি, আরেকজন, যে সবার কিন্তু কেউ তার নয়।

আরেকদিন, অফিস ছুটির সময় হলো, আমি নটরডেম কলেজের রয়্যাল একাডমিতে ইংলিশ শিখছি, অস্ট্রেলিয়াতে আসবো। ক্লাশ শেষে কোনো রিক্সা না পেয়ে হেঁটেই চলে এলাম মতিঝিলের শাপলা চত্বরে, এসে দেখি এলাহি অবস্থা। ঘর ফিরতে মানুষের লম্বা অপেক্ষা। বাসগুলোর পাদানিতেও যায়গা নেই। পুরো চত্বরে একটা মাত্র রিক্সা দাড়িয়ে আছে সাধকের মতো, এমন কেউ নেই যে তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে না, ভাই যাবে? রিক্সাওয়ালার সেদিকে খবর নেই, সে তখন যাত্রী সিটে বসে তার বসার যায়গায় পা দিয়ে উন্নাসিকের দৃস্টিতে দেখছে মানুষের ব্যস্ততা, কিন্তু চারপাশের কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না, লোকের অনুরোধ আর অনুনয় তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে চর ভাঙ্গার আগের বিশাল গৃহস্থের দিনগুলোয়, আজ এই সময়ের জন্য সে রাজা, সে আজ মতিঝিলের এইসব অতি সাধারন মানুষদের অনায়াসে দান করে করে দিতে পারে সোনালী, পুবালী এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও, আরেকজন কবি, পৃথিবীকে যে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা রাখে অনায়াসে, অতি তুচ্ছতায়।

আমি প্রতিষ্ঠার জন্য, সামান্য পয়সার জন্য, তুচ্ছাতিতুচ্ছ ডলারের নেশায় আমার সারাজীবনকে পরিত্যাগ করেছি, আমার আর কবি হয়ে উঠা উঠেনি, রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুললাহর মতো আমার ভ্যাগাবন্ড হয়ে উঠা উঠেনি, চাঁদ প্রতিদিন উঠে সব সুন্দরের জন্য, প্রতিদিন, তবে মাঝে মাঝে অমাবস্যাও চলে আসে। আমার জীবনে অমাবস্যা ১১ বছরের, বন্ধাত্বের। ‘আজিজ সুপার মার্কেট‘ নাটকে কবি আসলাম সানি যখন চটপটির ঘুমটি ঘরে বসে উপজাতি কবির কবিতাটি শুনে উচ্ছসিত হয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করে তাকে দেন, তখন মনে হয় কবি আসলাম সানির কাছে একটা মহাসমুদ্র আর একটা নৌকা আছে, তিনি অতি দয়ালু মহাপুরুষ, এই উপজাতি কবিকে নিয়ে তিনি তার সাম্রাজ্য দেখাতে নিয়ে যাবেন পরের অভিযানে।

লেখাটি শেষ করছি কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুললার জীবনের শেষের দিকের একটা ঘটনা দিয়ে। কবি খুব অসুস্থ, ডাক্তার বলে দিয়েছেন, তোমার দুটি পছন্দ, জীবন অথবা সিগারেট, বেছে নাও। কবি সিগারেট বেছে নিলেন অন্য কিছু চিন্তা না করেই, অবলিলায়। জীবনকে কি তুচ্ছই না তিনি করলেন, দ’ুপয়সার দামে মাপলেন না জীবনকে। যে কটি দিন বাচবেন, নিজের সাম্রাজ্যে নিজের সময়ে নিজের মতো করে। কবি হওয়া, কবি হয়ে উঠা কি আজন্ম বিশ্বাস নাকি সমর্পন বিশ্বাসের কাছে, এটা জেনে যে, কবিরা মানুষ হিসেবে বিলাসী ব্যর্থ। পৃথিবীতে আমরা কতোজন আছি তা করতে পারি, হাজারো মানুষের ভিড়ে কি করে হঠাৎ অনায়াসে হয়ে যেতে পারি সবচেয়ে একা, সবচেয়ে আলাদা, চোখ বুজে হারিয়ে যেতে পারি সুখ, হতাশা, বিশ্বাস আর অতৃপ্তির জগতে, যেখানে প্রবেশধিকার শুধু কবিদের, শুধু মাত্র কবিদের।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28805198 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28805198 2008-06-01 17:07:12
বিজ্ঞানের অংগনে যখন ধর্মের প্রবেশ দুটোর যৌক্তিক পার্থক্য কি এতো সহজ? :: তানবীরা তালুকদার রির্চাড ডকিন্স
অনুবাদক: তানবীরা তালুকদার


পুর্ববর্তী পর্বের পর ...
বিজ্ঞানের অংগনে ধর্ম
আমরা নৈতিকতার মূল্য নিয়ে আলোচনা করতে করতে মূল বিষয় থেকে দূরে সরে এসেছি। এখন আমি আমার মূল আলোচনা বিবর্তনবাদে ফিরে যাবো দেখব পোপ আমাদের প্রত্যাশানুযায়ী বিজ্ঞান-মনস্কতার ঝান্ডা উর্ধ্বে তুলে ধরতে পেরেছেন কিনা। “Pontifical Academy of Sciences” কে তার বিবর্তনবাদের উপর দেয়া বানীটি শুরুই হয়েছে নেতিবাচকভাবে দুমুখো ভাবধারার কথা দিয়ে যার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বিতীয় জন পলের আগের উক্তির সাথে মিল রাখা। আরো সন্দেহজনক হলো বারোতম পিয়াসের একটি উক্তির অন্তর্ভুক্তি -যিনি অন্যান্যদের তুলনায় বিবর্তনবাদের প্রতি খুবই বিরূপ। এখন পোপ এলেন আরো কঠিন কাজ করতে, বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমানের সাথে “ঐশী প্রত্যাদেশের” মিলন ঘটাতে।

ধর্মগ্রন্থে বলা হয়, মানুষের সৃষ্টি হয়েছিল সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে এবং তার অবয়ব থেকে ... যদি মানুষ পুর্ববর্তী কোন জীবন থেকে তৈরী হয়ে থাকে তাহলে তার ঐশ্বরিক আত্মা সাথে সাথে সৃষ্টিকর্তা তৈরী করে দেন...... তারফলে তারা মনে করে জীবন্ত প্রানীর সব শক্তির আবির্ভাব হয় আত্মা থেকে, আর বিবর্তনবাদ শেখাচ্ছে পুরো উল্টোটা - আত্মা ছাড়াই কিভাবে প্রাণের বিকাশ আর বিবর্তন হতে পারে - নাকি নিছক দৃষ্টি আকর্ষন করার মত ব্যাপার কেবল এটা, মানুষের সৃষ্টির সাথে সম্পূর্ন সামঞ্জস্যহীন ...... এ দ্বিমুখী দন্দ্বে আমরা মানুষেরা নিজেরা অস্তিত্বের প্রশ্নে মনস্তাত্বিক একটা বিভ্রমের মধ্যে পড়ে যাই, যেটাকে অস্ত্বিত্বের বিষয়ে একটা বিরাট ফাকও বলা যেতে পারে।
এ ব্যাপারে পোপকে একটা বাহবা দিতে হয় যে তিনি তখন অনুধাবন করেছেন যে সম্পূর্ন দুই মেরুতে অবস্থিত দুটো বিপরীতধর্মী ব্যাপারকে তিনি জোর করে এক করতে চাইছেন - "যাহোক এ ধরনের অস্ত্বিত্বর বিষয়ে অবস্থান না গ্রহন করাটাই কি বাস্তবে পদার্থ এবং রসায়নের জগতে বিবর্তন এর উপর গবেষনার মূল ধারা নয়?'

ভয়ের কিছু নেই। অস্পষ্টতা আর নানাপদের আগডুম বাগডুম মুক্তির উপায় বাৎলে দিচ্ছে:

'জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে পদ্ধতি বহু বার ব্যবহার করা হয়েছে তার দ্বারা দুটো ভিন্নধর্মী মতামতকে এক করা সম্ভব হয়, যাদের এক হওয়াকে আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব বলে মনে হয়। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষন বর্ননা এবং পরিমাপের মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন দিক স্পষ্ট করে ব্যাখা করে এবং সময়ের সাথে সাথে আরো নির্ভুল ভাবে একে জীবনের সাথে যুক্ত করে। আধ্যাত্মিক সাধনার বিশেষ মূহুর্তকে এভাবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করা যায় না, তথাপি এটা একটা গবেষনামূলক স্তরের আবিস্কার -যা মানব জীবনের সাথে সম্পর্কিত অনেক নিদির্ষ্ট মূল্যবান জিনিসের প্রতি ইঙ্গিত করে।'

সোজা ভাষায় বলতে গেলে, বিবর্তনবাদের নিদির্ষ্ট একটা লক্ষ্যে পৌছার একটা সময় এলো যখন সৃষ্টিকর্তা মানুষের আত্মাকে পূর্ববর্তী প্রানীর বংশের মধ্যে অন্তর্গত এবং সঞ্চারিত করলেন। (কখন? দশ লক্ষ বছর আগে? বিশ লক্ষ বছর আগে? Homo erectus আর জ্ঞান সম্পন্ন Homo sapiens মানুষের মধ্য? নাকি Homo sapiens মানুষ আর H. sapiens sapiens - মানুষের মধ্যে?) হঠাৎ করে আত্মা সঞ্চারনের অবশ্যই দরকার আছে, নইলে তো মানবজাতির জন্য অতি প্রয়োজনীয় ধর্মের ভিত্তিই ধ্বসে পড়ে। তুমি আহারের জন্য প্রানী হত্যা করতে পারো, কিন্তু ভ্রুন হত্যা কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধীতে আক্রান্ত মানুষের যন্ত্রনাহীন মৃত্যু তাদের দৃষ্টিতে অযৌক্তিক জীব হত্যা, কারন -এক্ষেত্রে মহামূল্যবান 'মানব জীবনের' প্রশ্ন জড়িত।

ক্যাথলিজমের জাল কেবল নৈতিক বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবলে ভুল হবে। ক্যাথলিক ধর্মানুসারীরা বিশ্বাস করে আধুনিক সভ্য Homo sapiens মানুষের সাথে অন্য সমস্ত 'ইতর প্রানী জগতের' একটি বিরাট বিভেদ আছে। আর বিজ্ঞানের চোখে এই বিভেদ একেবারেই ভ্রান্ত। বলা নিষ্প্রয়োজন, আজকের যুগে আকস্মিক ভাবে কোন ধরনের অমর আত্মার মাধ্যমে প্রানের বিকাশের কথা বিবর্তনবাদের কাছে বৈজ্ঞানিক ভাবে অগ্রহনযোগ্য।

আরো সাধারনভাবে বলতে গেলে, এটা বলা খুবই অযৌক্তিক, যেমন গুল্ডস এবং অন্যান্যরা বলে থাকেন, যে 'ধর্ম নিজেই বিজ্ঞানের অংগন থেকে দূরে অবস্থান করে, এবং শুধু নৈতিকতা আর মূল্যবোধের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে।' ঈশ্বার নামকএকটি অলৌকিক সত্ত্বা দ্বারা সৃষ্ট এবং তার দ্বারা বিরাজিত মহাবিশ্ব, প্রকৃতগতভাবে এবং গুনগতভাবে ঈশ্বরবিহীন মহাবিশ্ব থেকে আলাদা হওয়ারই কথা। আর সেই বিভেদটিই হলো অপরিহরনীয় বৈজ্ঞানিক পার্থক্য। ধার্মিকেরা যে সত্ত্বার অস্তিত্বের দাবী করে, তা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাদের বৈজ্ঞানিক দাবীকেই উপস্থাপন করতে চায়।

প্রধান প্রধান রোমান ক্যাথলিক চার্চগুলোর বেশীর ভাগই এই ধরনের দাবীর প্রতি আস্থাশীল। বিনা ঔরসে কুমারীর মাতার সন্তান প্রসব, কুমারী মেরীর সশরীরে স্বর্গপ্রবেশ, সমাধি থেকে যীশূর পুনরুত্থান, মৃত্যুর পরে আমাদের আত্মার জবাবদিহিতা, -এগুলো ভুল হোক, ঠিক হোক - যথার্থ বৈজ্ঞানিক দাবী। হয় যীশূর একজন সত্য সত্যই বাবা ছিলেন নতুবা নয়। যথার্থ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার মাধ্যমেই এর জবাব মিলতে পারে। এটা কোন “নৈতিকতা” কিংবা “মূল্যবোধের” প্রশ্ন নয়, এটা হলো বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা তথা সত্যান্বেষী মননের প্রশ্ন। আমাদের কাছে এটার জবাব দেয়ার মতো সাক্ষ্যপ্রমান হয়তো নেই কিন্তু এটি যে একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন -এতে তো কোন সন্দেহ নেই। তবে বিজ্ঞান যদি অদূর ভবিষ্যতে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো কোন প্রমান খুঁজে পায়, আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন, ভ্যাটিকান সেটিকে উচ্চারনও করতে দেবে না।

যখন মাতা মেরী মারা যান, হয় তখন তার দেহ বিনষ্ট হয়ে গেছে, নতুবা তার দেহ এই পৃথিবী থেকে স্বসরীরে স্বর্গে তুলে নেয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত রোমান ক্যাথলিক চার্চ এর অনুমান, সম্প্রতি ১৯৫০ সালে তারা অধ্যাদেশ জারি করেছেন, যেখানে তারা বলেছেন স্বর্গ জিনিসটার সত্যিকারের 'ভৌগলিক অস্তিত্ব' বাস্তবিকই আছে, নইলে একজন রমনীর শরীর কিভাবে সেখানে গেলো? আমি একথা এখানে বলছি না যে, কুমারী মাতাকে নিয়ে অনুমিত এই মতবাদ আসলেই মিথ্যা, (যদিও আমি বিশ্বাস করি এটি অবশ্যই মিথ্যাই হতে হবে)। আমি শুধু এই যুক্তিই খন্ডন করতে চাচ্ছি যে, যারা বলেন এ ধরণের দাবী বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বাইরে রাখতে হবে। বরং, এই কুমারীর এই গল্পটি সত্য কিনা তা বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে নির্ণয় করা যেতে পারে - এটি তাই পরীক্ষণযোগ্য একটি বৈজ্ঞানিক তত্ব। আমাদের শারীরিক ভাবে মৃত্যু হলে আমাদের আত্মার জবাবদিহি করতে হবে কিনা কিংবা সেই সাথে ফেরেশতাদের দ্বারা বিচারপর্বের গল্প, স্পষ্টতই মাদার মেরীর সাথে যুক্ত হওয়ার অলৌকিক গল্পসমূহ, এবং এধরনের অন্যান্য সব গল্পসমূহ-এর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

প্রায়শই খুব অসৎ মতবাদ অবলম্বন করে বলা হয় যে কোন ধর্মীয় দাবীই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বাইরে। অন্যদিকে এরাই আবার অতি প্রাকৃতিক রং-বেরং-এর গল্প সমূহ, এবং মৃত্যুর পরের জীবনের কথা বলে সাধারন মানুষদেরকে অভিভূত করার চেষ্টা থাকেন, নিজের দল ভারী করে গোপন উপায়ে জেতার চেষ্টা, কিংবা উপসনালয় বৃদ্ধির চেষ্টা থাকেন। এটাই তাদের বৈজ্ঞানিক শক্তি যা তাদেরকে এ সমস্ত গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উপস্থাপন করার সার্মথ্য দেয়। এবং একই সময়ে সে সব বিষয়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যা, বৈজ্ঞানিক গবেষনা কিংবা নুন্যতম সমালোচনাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় - 'এগুলো ধর্মের বিষয়, বিজ্ঞানের এখান থেকে দূরে থাকা উচিৎ।' কিন্তু তুমি গাছেরটাও খাবে - তলারটাও কুড়োবে - এ তো হতে পারে না। অন্তত ধর্মের তাত্বিক আর আত্মপক্ষ সর্মথনকারী্দের এই দুমুখো নীতিকে আমাদের কখনোই প্রশ্রয় দেওয়া উচিৎ না। দূভার্গ্যবশতঃ তারপরো, আমাদের মধ্যে অনেকেই, এমনকি যারা ধর্মে বিশ্বাস রাখেন না তারাও অম্লান বদনে তাদেরকে একাজ গুলো অহরহই করতে দেই।

আমার মতে, সনাতন কট্টর মৌলবাদীদের বিপক্ষে পোপকে দলে টেনে আত্মপ্রসাদ লাভের একটা প্রচেষ্টা। এতে অবশ্য খুশী হবার মত কারণ আছে - যারা ক্যাথলিক ধর্মের প্রবক্তা যেমন মাইকেল বিহেদের পায়ের তলা থেকে আস্তে আস্তে মাটি সরে যাচ্ছে। তারপরেও যদি আমাকে বলা হয় সত্যিকারের সনাতন ঈশ্বর-বিশ্বাসী, ধর্মগ্রন্থ মেনে চলা সৎ ধার্মিক আর অন্যদিকে কপট, দুমুখোস্বভাবের, গোঁজামিল দেওয়া বক-ধার্মিকদের মাঝ থেকে কাউকে গ্রহণ করতে, আমি জানি আমাকে কোনটা গ্রহন করতে হবে।

তানবীরা তালুকদার
০৫.০৫.২০০৮
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28805137 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28805137 2008-06-01 14:26:23
কবির প্রবেশাধিকার :: আল নোমান শামীম
কবির প্রবেশাধিকার
-আল নোমান শামীম

অনেক দিন লেখালেখি করিনা। করিনা বললে ভুল হবে, করতে পারি না। করার জন্য একটা মন লাগে, একটা ব্যাপার আছে, যেটা কবি আর লেখক ছাড়া এই পৃথিবীর কেউ বুঝবে না, জানবে না। সেটা এই কবি আর লেখকদের একান্ত গোপন প্রাণ ভোমড়া। একটা অতৃপ্তি, একটা কি জেনো নেই-কি জেনো থেকেও নেই, বিলাস, বিলাসী কষ্ট, সব কিছু নিজের মতো করে দেখতে চাওয়া-সুন্দরের কাছে পরিপুর্ণ আত্মসমর্পণের নিদারুন ব্যর্থতা, কোথায় যাই, কার কাছে যাই, কোথায় গেলে পাবো শ্যামল কান্িত, কোথায় সেই পুর্ন ভুবন। এই লেখা পড়ে নিশ্চয়ই অজয়দা আর মিন্টন ভাই চিৎকার করে বলবেন, ওরে বলিস না, বলিস না, সর্বনাশ হয়ে যাবে, আমাদের ভাবনাগুলো শুনে ফেলবে সবাই, পৃথিবীর সব লোক কবি আর লেখক হয়ে যাবে, মানুষ জেনে যাবে তার সৃষ্টির রহস্য।

টিভিতে একটা নাটক হচ্ছে, আজিজ সুপার মার্কেট, সেটা দেখে অজয়দা ভীষন উচ্ছাসী, বললেন ‘ফাটায়া ফেলতাছে‘। আমিও ক্যাম্পসির চক বাজার থেকে সেইদিনই ভাড়া নিয়ে আসলাম । দেখলাম সাথে সাথে (অজয়দার অনেক কিছু আমি যাচাই বাছাই না করেই গ্রহন করি) আর ভাবলাম কবি আসলাম সানী তো আসলেই ‘ফাটায়া ফেলতাছে’। কবিরা এখনো মানুষ হয়ে উঠেনি এই পৃথিবীর, ণতৈ ঠতি ঠরৈ তডসি ওরৈলদ, কোনো কবিই কস্মিন কালে এই পৃথিবীর হয়ে ওঠেনি, বাংলাদেশের কবিরা তো নই-ই। রুদ্র মোহাম্মদ নামে আমাদের কিশোর কালে একজন কবি ছিলেন, সারাদিন সিঙ্গারা আর চা খেতেন, সাথে চলতো ধুদ্ধুমার সিগারেট, তসলিমা নাসরিনের প্রেমিক, স্বামী আবার প্রেমিক, মনে হয় প্রেমিকই ছিলেন বেশী। একদিন ডাসে আড্ডা দিচ্ছিলাম কবিতা আবৃতির ওয়ার্কশপের পর, কে একজন খোঁচা দিয়ে বললো, ওই দেখ কবি রুদ্র। আমি দেখলাম আর সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম, সারা জীবন শুধু কবিতাই লিখবো আর রুদ্র মোহাম্মদের মতো করে চুল রেখে সে যেভাবে সিগারেটে টান মেরে মাথার চারিদিকে ধোঁয়ার মেঘেদের শাসন করছে, সেভাবে শাসন করবো। কিশোর বয়সের অনেক স্বপ্নই মনে হয় শুধুই স্বপ্ন দেখা, এখনো সেই ওয়াদা আমার রাখা হয়ে উঠেনি, আমি এখন লেখালিখিই করিনা।

সময়ের অপেক্ষা তো অনেক হলো, খুব মন খারাপ হলে, মন ভ’রে এক নিশ্বাসে কোনো গভীরতর অরন্যে চলে যেতে ইচ্ছে করে, ঘুঁম ঘুঁম চাঁদে, অথবা, ধলেশ্বরীর তীরে হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে জলের দিকে তাকিয়ে অনুক্ষন দীর্ঘক্ষন। এক জেলে দেখেছিলাম, নৌকার কিনারে দাঁড়িয়ে সাধুর মৌন ধ্যানে মগ্ন, মাছ মারার জাল ফেলে জলের দিকে তাঁকিয়ে আছে অনন্তকাল, কবি। একদিন যাত্রাবাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলাম, মোড়ে, রাত ১টা হবে(আসলে সকাল) , আবাহনী-মোহামেডানের খেলা ছিলো, খেলা শেষে পলটনে বন্ধুর বাড়ি আড্ডা দিয়ে জুড়াইনে বাসায় ফিরছি, মোড়ে কোনো রিক্সা নেই, আমার মতো দেরী করে ঘরের ফেরারী কয়েকজন, হঠাৎ দেখলাম একটা নতুন রিক্সা তুমুল বেগে মোড় ঘুরে জুড়াইনের দিকে যাচ্ছে। সবাই হাত উঠালো আগে আর পরে, রিক্সাওয়ালার এই দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই মোটেই, সে চলেছে যেনো কোনো দ্বিগ্বিজয়ে, কে থামাবে তাকে, কার এতো স্পৃধা থামিয়ে দেয় তার বিজয় রথ! তারপরও সবার মতো হাত উঠালাম এই ভেবে যে সে থামবে না, কিন্তু সে একটু ধীর হয়ে গেলো আমার সামনে এসে (তখোন ভাবলাম আমি ছিলাম সবার শেষে, তাই বোধ হয়), ঘাড় নেড়ে সম্রাটের মতো হুকুম করলো আমাকে উঠে পড়তে। আমি কাল বিলম্ব না করে টারজানের মতো লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম বিজয়রথে, পিছনে ফিরে সবার দিকে তাকিয়ে অট্রহাসি দিয়ে দিতে ভুললাম না মোটেও। এদিকে আমার বিজয়রথ চলছে তো চলছেই, জুড়াইনের কাছে আসতেই আমি বললাম, কতো দিবো, সম্রাট সে কথায় কান না দিয়ে বেদ বাক্যের মতো উচ্চারন করলো, স্লো করতাছি, নাইমা যান। আমি নেমে গেলাম আর সেই বিজয়রথ আমাকে পরিত্যাগ করে না থেমে দ্বিগুন উল্লাসে রেলগেট পাড় হয়ে গেলো, কবি, আরেকজন, যে সবার কিন্তু কেউ তার নয়।

আরেকদিন, অফিস ছুটির সময় হলো, আমি নটরডেম কলেজের রয়্যাল একাডমিতে ইংলিশ শিখছি, অস্ট্রেলিয়াতে আসবো। ক্লাশ শেষে কোনো রিক্সা না পেয়ে হেঁটেই চলে এলাম মতিঝিলের শাপলা চত্বরে, এসে দেখি এলাহি অবস্থা। ঘর ফিরতে মানুষের লম্বা অপেক্ষা। বাসগুলোর পাদানিতেও যায়গা নেই। পুরো চত্বরে একটা মাত্র রিক্সা দাড়িয়ে আছে সাধকের মতো, এমন কেউ নেই যে তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে না, ভাই যাবে? রিক্সাওয়ালার সেদিকে খবর নেই, সে তখন যাত্রী সিটে বসে তার বসার যায়গায় পা দিয়ে উন্নাসিকের দৃস্টিতে দেখছে মানুষের ব্যস্ততা, কিন্তু চারপাশের কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না, লোকের অনুরোধ আর অনুনয় তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে চর ভাঙ্গার আগের বিশাল গৃহস্থের দিনগুলোয়, আজ এই সময়ের জন্য সে রাজা, সে আজ মতিঝিলের এইসব অতি সাধারন মানুষদের অনায়াসে দান করে করে দিতে পারে সোনালী, পুবালী এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও, আরেকজন কবি, পৃথিবীকে যে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা রাখে অনায়াসে, অতি তুচ্ছতায়।

আমি প্রতিষ্ঠার জন্য, সামান্য পয়সার জন্য, তুচ্ছাতিতুচ্ছ ডলারের নেশায় আমার সারাজীবনকে পরিত্যাগ করেছি, আমার আর কবি হয়ে উঠা উঠেনি, রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুললাহর মতো আমার ভ্যাগাবন্ড হয়ে উঠা উঠেনি, চাঁদ প্রতিদিন উঠে সব সুন্দরের জন্য, প্রতিদিন, তবে মাঝে মাঝে অমাবস্যাও চলে আসে। আমার জীবনে অমাবস্যা ১১ বছরের, বন্ধাত্বের। ‘আজিজ সুপার মার্কেট‘ নাটকে কবি আসলাম সানি যখন চটপটির ঘুমটি ঘরে বসে উপজাতি কবির কবিতাটি শুনে উচ্ছসিত হয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করে তাকে দেন, তখন মনে হয় কবি আসলাম সানির কাছে একটা মহাসমুদ্র আর একটা নৌকা আছে, তিনি অতি দয়ালু মহাপুরুষ, এই উপজাতি কবিকে নিয়ে তিনি তার সাম্রাজ্য দেখাতে নিয়ে যাবেন পরের অভিযানে।

লেখাটি শেষ করছি কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুললার জীবনের শেষের দিকের একটা ঘটনা দিয়ে। কবি খুব অসুস্থ, ডাক্তার বলে দিয়েছেন, তোমার দুটি পছন্দ, জীবন অথবা সিগারেট, বেছে নাও। কবি সিগারেট বেছে নিলেন অন্য কিছু চিন্তা না করেই, অবলিলায়। জীবনকে কি তুচ্ছই না তিনি করলেন, দ’ুপয়সার দামে মাপলেন না জীবনকে। যে কটি দিন বাচবেন, নিজের সাম্রাজ্যে নিজের সময়ে নিজের মতো করে। কবি হওয়া, কবি হয়ে উঠা কি আজন্ম বিশ্বাস নাকি সমর্পন বিশ্বাসের কাছে, এটা জেনে যে, কবিরা মানুষ হিসেবে বিলাসী ব্যর্থ। পৃথিবীতে আমরা কতোজন আছি তা করতে পারি, হাজারো মানুষের ভিড়ে কি করে হঠাৎ অনায়াসে হয়ে যেতে পারি সবচেয়ে একা, সবচেয়ে আলাদা, চোখ বুজে হারিয়ে যেতে পারি সুখ, হতাশা, বিশ্বাস আর অতৃপ্তির জগতে, যেখানে প্রবেশধিকার শুধু কবিদের, শুধু মাত্র কবিদের।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804805 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804805 2008-05-31 15:06:35
অনিবার্য যিসাস :: আবু মকসুদ
অনিবার্য যিসাস

‘সাকিনা আমার বোন এজিদের দুশমনী এখনও সতেজ’ এই আপ্তবাক্য উচ্চারণে চারিদিকে এক নীল বেদনা ছড়িয়ে পড়ে। এই বেদনা চাতক পাখির আর্তনাদ হয়ে অতঃপর মরুভূমির তপ্ত বালু চিরে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে থাকলে ‘যিসাসের আগমন অনিবার্য’ কাব্য গ্রন্থটি পাঠের অপরিহার্যতা ঘোষণা করে। আমরা সেই পথ ধরে হাঁটতে থাকি আর একজন কবির চোখের ভেতর ঝুলে থাকা হিংস্র পৃথিবীকে অবলোকন করি। আমাদের অগ্রজ কবি আল মাহমুদের ভাষায়Ñ কবিতা কালের অক্ষর। অন্তত নিজের কবিতার ক্ষেত্রে সেই স্পর্ধিত উচ্চারণটি তিনি রেখেছেন। সত্তর দশকের কবি ফরীদ আহমদ রেজা Ñ ‘যিসাসের আগমন অনিবার্য’ গ্রন্থের লেখক। আমরা এই কবিকে চিনি কোলাহলের বাইরে নিবৃত্তচারী হিসেবে। তার লেখা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা নেই বললেই চলে। নতুন কবিতাও তেমন চোখে পড়ে না। তবে সম্প্রতি এই কবি একটি কবিতাবিষয়ক ‘কবিতা’ পত্র সম্পাদনা করছেন। সেই কবিতাপত্র নিয়ে এক আড্ডায় তিনি চিন্তক মন্তব্য ছুঁড়ে দেনÑ ‘কখনো মনে হয় সব কটি কবিতাই একটি কবিতা।’ তাঁর কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে এই বিষয়টি মাথায় রাখার চেষ্টা করবো।
ফরীদ আহমদ রেজার কবিতায় আল মাহমুদের সেই কালকে ধারণ করার চিহ্নগুলো স্পষ্ট দেখতে পাই। সেই অনুপাতে বিচার করলে গত দু’দশকে বাংলা কবিতা থেকে ‘যিসাসের আগমন অনিবার্য’ গ্রন্থের কবিতাগুলো সহজেই চিহ্নায়ন করা যায়। অনেক বিষয়ে তিনি প্রচলিত ধারায় আমাদের অব্যস্ত দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দেখতে বাধ্য করেন। অনেকের চেয়ে আলাদা এ জন্য যে তিনি কেবল ‘মৃতমিথ্’ দিয়ে কবিতার ভেতর অহেতুক আঁধার সৃষ্টি করে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি। তার কবিতায় সমকাল ও অতীত বিশ্বের আতঙ্কজনক চরিত্রের ভয়ঙ্কর দন্তগুলো বের হয়ে এসেছে। আমরা দেখতে পাই, অনাকাঙ্খিত সংঘাতময় পৃথিবী তাকে হতাশ করেনি বরং জাগিয়ে তোলার, সামনের দিকে অগ্রসর হবার চেতনা শব্দের শরীর বেয়ে শাখা পল্লব বিস্তার করেছে। নারকীয় দৃশ্যাবলি তাকে হতাশ করে না বলেই যিসাসের আগমন বার্তাটি আমাদের ভেতরকার বিশ্বাসের দেয়াল বেয়ে, আমাদের গুন্ঠিত স্বপ্নের ধূসর চাঁদর সরিয়ে বেড়ে ওঠতে থাকে। এই গ্লোবাল বিশ্বাস-মিথ দিয়ে কবি একটা ঐক্যের সন্ধান খোঁজে আনেন। আমাদের কৌতুহল থাক বা না থাক যিসাস অনিবার্য হয়ে ওঠেন পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে। এক্ষেত্রে এই গ্রন্থের নামকরণ অনেক দীর্ধমেয়াদী তাৎপর্য বহন করে। গ্লোবাল বললাম এ জন্য যে, বর্তমান পৃথিবীর প্রধান তিনটি ধর্মাবলম্বী মানুষই তার প্রতি এক বা অন্যভাবে বিশ্বাস রাখেন, অর্ঘ্য দেন, মান্য করেন। ‘যিসাস’ না হয়ে ‘মুসা’ হতে পারতো, ‘যিশু’ হতে পারতো। হয়নি যে কারণে সেখানে আমরা কবি চিন্তার ধারণ ক্ষমতা আবিষ্কার করি এবং ঔদার্য্য মনেবৃত্তিও সেখানে লক্ষ্যণীয়। কবির শব্দবারান্দায় যে উপযুক্ত ধ্বনি-গুঞ্জন বেজে ওঠে, সেই গুঞ্জনকে কবি আপন করে নেন সকলের জন্য। ‘যিসাস’ শব্দকে তিনি এভাবেই আমাদের জন্য ধ্বনিগুচ্ছে তুলে দিয়েছেন যা শাশ্বত ব্যঞ্জনাকে জাগ্রত করে, তাড়িত করে। শান্তির জন্য যার আগমন, স্বভাবগত কবি শান্তির সেই প্রতীককেই কবিতার উপজিব্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ফরীদ আহমদ রেজার কবিতার স্বভাব ও ভাষার রূপ কেমন? এক সঙ্গে সেই বিষয়টি তুলে ধরলে দেখা যাবে তাঁর কবিতা পাঠককে পোড়ায় না। কোথাও দহন নেই যা সারাক্ষণ বিষন্নতা এনে দেয়, ব্যথা-বেদনা আছে কিন্তু অগ্নিখরা তৈরি করে না। বিপ্লব আছে, দাবানল নেই। প্রেম আছে অশ্লীল নয়, স্নিগ্ধ। যাতনা আছে, হতাশা নয়। যৌবন আছে, ভাসিয়ে নেয় না Ñ দৃঢ় হতে বলে। মায়া আছে, ভোলায় না Ñ উজ্জীবিত করে। ক্রোধ আছে, হিংসা বা হিংস্রমতবাদ নেই। এই বিষয়গুলো তার কবিতার স্বভাব-চরিত্র, ভাষা ও রূপ। এ সমস্ত তাঁর কবিতার ভেতর কীভাবে সমান্তরাল হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে, কয়েকটি চরণে চোখ রেখে খোঁজার চেষ্টা করবোÑ
আদম ঈভের প্রভু শোন শোন অšে¦ষণার বাণী
আদম ঈভের প্রভু শোন শোন প্রার্থণার গান
সোনাদানা বালাখানা সুন্দরীর বিদ্যুৎ চমক
পৃথিবী জঠর তুলে নাও দাও শুধু মাটির মানুষ
মানুষের জন্মদানে দূর হোক পৃথিবীর অপয়া লানত।
(প্রভু আমায় মানুষ দাও)
মানুষের জন্মদান পৃথিবীতে সবচে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। কবি এর মাধ্যমে পৃথিবীর অপয়া লানত দূর করতে চান। কবির প্রার্থীত চিন্তায় কবি হয়ে ওঠেন শান্তির অšে¦ষক। অপয়া পৃথিবীর ধ্বংশ কামনা করে কেবল মানুষের জন্য একটি শান্তির ডেরা কামান করেছেন। পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে তিনিও বিপ্লব চেয়েছেন। প্রেম ও প্রার্থনায় সে বিপ্লব সঙ্গীত হয়ে বেজেছে।
... ... ...
ভেঙেছে গড়েছে কত কল্পণায় তোমার আদল
অজস্র কুন্তলরাশি তিল টোল চিবুক কপোল।

তোমাকে দেখেছি আমি চেতনার বিরান সড়কে
মড়ক জোয়ার তুমি প্রাণ দিয়ে রুখে দিতে পার
হতাশার বাঁকে বাঁকে সমস্যার পরতে পারতে
তোমার পরশ দিবে সুখময় সাহস আশ্বাস।

বিশ্বাসে আস্থায় তুমি পূন্যময় আত্মার বৈভব
অঢেল ফলন দিয়ে ভরে দিবে হৃদয় পৃথিবী।
(নীলুর জন্য কবিতা-৩)
‘বিরন সড়ক’ তার আগে যোগ হয়েছে ‘চেতনার’। কেবল বিরান সড়ক আমাদেরকে একটি চিত্রকল্প দেয়মাত্র। তেমন কোনো সংবাদ বহন করে না। এ শুধু নির্মোহ সংবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। এর সঙ্গে সংযুক্ত ‘চেতনার বিরান সড়ক’ প্রতিজ্ঞা তৈরি করে যার অর্থ অনেক গুরুত্ববহ বলে নির্মোহ থাকার অবকাশ থাকে না। একইভাবে পরবর্তী চরণে Ñ ‘মড়ক জোয়ার’ ব্যবহৃত হয়েছে যা কাব্যে একই দ্যোতনা ও অর্থবহন করে।
কবির প্রিয়সী নারীর মুখ যখন প্রতীকি রূপে আসে, সেই মুখ আরাধ্যচেতনা তৈরি করে। সেই মুখ কবির একার থাকে না, হয়ে ওঠে সকলের। আমাদের যাপিত জীবনের ভেতর দিয়ে এ ধরণের একটি আদল প্রতিদিন প্রকাশ পেতে থাকে। যারা একে আবিষ্কার করেন তারাই কবি, তারাই কবিতার বাতাবরণ নমস্যমানব।
কবি তো রাজনীতিক নন। রাজনীতি কবির বিষয় হতে পারে। সে বিষয়ও আবার শিল্প-সত্ত্বা থেকে বড় করে তুলতে নারাজ Ñ এখানেই বিষয়ে ফরীদ আহমদ রেজা স্বভাবকবি হয়ে ওঠেন। সত্তর দশকের অনেক বাংলা কবিতা রাজনৈতিক শ্লোগানসর্বস্ব হয়ে উঠেছিল। ৯০ বা শূন্য দশকে এসে অনেকেই আবার অতিমাত্রায় রাজনীতি বিমূখ। এ দু’য়ের কোনোটাই ফরীদ আহমদ রেজার কবিতাকে গ্রাস করতে পারেনি। পৃথিবীর অনেক বড় মাপের কবি/লেখক/দার্শিনিককে আমরা পাই যারা রাজনীতিক ছিলেন না। কিন্তু রাজনীতি তাদের বিষয় ছিল। রাজনীতির দুষ্ট ক্ষত তাদের গিলতে পারেনি। বিষয়ে-চিন্তায় তারা তা পরিপুষ্ট করেছিলেন/করছেন। দার্শনিক জ্য পল সার্ত্র দর্শনগতভাবে কমিউনিস্ট ছিলেন কিন্তু কমিউনিস্ট রাজনীতির সদস্য ছিলেন না। ম্যাক্সিম গোর্কিকে পৃথিবীর পাঠকদের কাছে কমিউনিস্ট লেখকরা ইজমের সার্থে একজন ‘কমরেড’ হিসেবেই পরিচয় করিয়েছিলেন। লেখক গোর্কিকে মানুষ ঠিকই আবিষ্কার করতে পেরেছে যার জন্য তার রাজনৈতিক পরিচয় দরকার ছিল না। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যও ছিলেন না। দর্শনগতভাবে তিনিও ছিলেন মানবকল্যাণ চিন্তার ধারক। লেখকের কাছে যখন রাজনীতি বিষয় হয়ে ওঠে রাজনীতি সুস্থ ধারায় বিকশিত হতে থাকে। লেখক যখন রাজনীতির জন্য ওয়ে ওঠেন তখন লেখকের চিন্তা-চেতনায় মুক্তভাবনা বাধাগ্রস্থ হয়। ফরীদ আহমদ রেজার লেখক সত্ত্বার ভেতর এই কারিগরী চিন্তাটি কাজ করেছে যা শিল্প-সাহিত্যের জন্য নিয়ামক। তাঁর কবিতার ভেতর দলীয় রাজনীতি কাজ করেনি কিন্তু রাজনীতি আছে। সে রাজনীতিটা কি? Ñ প্রতিনিয়ত মানুষের লাগি কল্যাণকর পৃথিবীর জন্য প্রার্থনা।
হলুদ পাতাগুলো ঝরে পড়ে সবুজের কান্না বুকে নিয়ে
পৃথিবীটা এখনো বন্ধ্যা হয়ে যায়নি
তোমাদের আঙ্গিনা জুড়ে সেই সৈনিকদের গুটানো তাবু
যারা নিজ হাতে নিজেদের সবগুলো আকাঙ্খার নৌকোয় আগুন দিয়েছে
পালাবার কোনো পথ খোলা রাখেনি।
(অঙ্গীকার)
অথবা
পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাস ঢেউ তুলে পতেঙ্গা বন্দরে
অযুত কোরবানী বুকে সুনীল সাগর আজো জীবন্ত উদ্দাম
আহত আত্মার মুখে বিশ্বাসের গান
আমাকে দিয়েছে এক অগ্নিঝরা অঙ্গীকার
চট্টলার সমুদ্র সৈকত ...
(ওরা একদল যুবক)
কিংবা
কৃষকের মনগুলো চৈত্র উদাস
নায়ের বাদাম তুলে ভাটিয়ালী নেই
এ কেমন বাংলাদেশে তুমি গান গাও
কোথায় পেয়েছো তুমি এমন প্রত্যয়?

তোমার গানের সুরে ঘুমন্ত সহিস
জাতীয় সঙ্গীত মুখে চোখ তুলে চায়।
(নীলুর জন্য কবিতা-১)

‘... ঘুমন্ত সহিস/ জাতীয় সঙ্গীত মুখে চোখ তুলে চায়।’ অসম্ভব ঘন-আবেগময় কবিতাটি সকল গ্লানি ধুয়ে-মুছে দিয়ে যায়। কখন কবি হয়ে ওঠেন হরিয়াল কৃষকের স্থাবর-অস্থাবর। ‘তোমার গানের সুরে ঘুমন্ত সহিস/ জাতীয় সঙ্গীত মুখে চোখ তুলে চায়’ Ñ কান সতর্ক করে শুনি অন্য এক মুরলিয়া বাঁশি। এ বাঁশি অর্ফিয়্যুসের বিষের বাঁশি নয়। বালুকা প্রান্তরে কিংবা চৈত্রের রৌদ্রখরায় ফেটে পড়া পলিমাটির রাখালিয়া সজনের মিঠা সুর ভেসে আসে। আর মুহূর্তে দুপুরের অপেক্ষমান একগুচ্ছ পলক হাওয়া মধুর এক দোলনচালে জাগিয়ে দিয়ে যায়। এ উপলব্ধি কবির নয়, পাঠকের। ধ্র“পদি কবিতা এমনই বহুমাত্রিক ভাবনাকে সংজ্ঞায়িত করে। এর পূর্বেউচ্চারণরণ Ñ ‘এ কেমন বাংলাদেশে তুমি গান গাও/ কোথায় পেয়েছো তুমি এমন প্রত্যয়?’ আমরা প্রত্যক্ষ করি যে, এমন প্রত্যয় না হলে ঘুমন্ত সহিস কী করে চোখ তুলবে আগামীর জন্য? কবি এই বোনেদী কবিতার নাম দিয়েছেন ‘নীলুর জন্য কবিতা’। শেষ পর্যন্ত একজন নারীই কবির জন্য হয়ে ওঠেন গোপন চাবি অথবা চালিকা শক্তি।
বিশ্বাস হলো এক ধরনের প্রত্যয়-দৃঢ়তার নাম। সকল অমঙ্গল-অসুস্থতার বিরুদ্ধে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে যাবার যে প্রেরণা তারই পরিপূর্ণ অর্থ Ñ বিশ্বাস। একজন বিশ্বাসী মানুষই পূর্ণ আস্থা তৈরি করতে পারেন। কবি ও কবিতার চরিত্রে এই সামঞ্জস্য না থাকলে আমরা কী করে তাকে পরিপূর্ণ কবি বলবো? এই বোধ নিয়েই একজন ফরীদ আহমদ রেজা অগ্রসর হয়েছেন, কবিতার শরীরে হাত রেখেছেন। ভাষা ও চিন্তায় যা তিনি প্রকাশ করেন ব্যক্তিচরিত্রেও তা তিনি লালন করার কথা বলেন। সাধারণত এই সামঞ্জস্যতার প্রয়োজন মনে করেন না অনেক কবি। কেন করবেন না? কবিতা তো কেবল পূন্যবানদের জন্য, নিষ্পাপ মানুষের জন্য। এ ক্ষেত্রে প্রাবন্ধিক সালেহা চৌধুরীর মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণÑ ‘মন নিষ্পাপ না রেখে কবিতা লেখা যায় না। কবিতা সত্য বলে, মিথ্যা নয়।’ হ্যাঁ, কবি তো শেষ পর্যন্ত সত্য-সন্ধানে ব্রতী থাকেন। অতএব আজকের কবি কী করে লালন করবেন অন্ধকার কিংবা নিজের বৈপরিত্যের অসঙ্গতি জীবন। বরং অন্ধকার জগৎ টেনেহিঁচড়ে ছুঁড়ে দেবেন জনসম্মুখে। অন্তত আমাদের শাশ্বত কবিতা সে শিক্ষাই দেয়। তাঁর কবিতার ধরণ এবং ব্যক্তিত্বের ঋজু এই ইঙ্গিতই বহন করে। আরও যে সব বিষয়ে ফরীদ আহমদ রেজার কবিতাকে আলাদাভাবে চেনা যায় Ñ তাঁর কবিতার ভেতর তথাকথিত জাতীয়তাবাদী মনেবৃত্তি কাজ করেনি। অন্য এক মানবিক সত্ত্বার পরিভ্রাজক হন তিনি যা বিশ্বায়ন হতে উদ্বুদ্ধ করে। বৈচিত্র কৃষ্টির ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করতে শিখায়। আরও চমৎকার বিষয় হলো যে এই কবির কবিতায় তৈলচিত্র নেই, বরং অঙ্কন, রেখাচিহ্ন, বয়াতীর উপলব্ধি, সুস্থ্য সংস্কারের বন্ধনগীত চিত্রায়িত হয়েছে দানাবাঁধা গদ্যে। একটি অলৌকিক চশমা দিয়ে তিনি জগৎটাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তথাকথিত আধুনিক বা ভদ্র-শিক্ষিতদের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা বর্ণবাদ কিংবা উপনেবেষিক মনোবৃত্তি মানুষকে কতো ছোট করে রেখেছে এসব বিষয় হয়ে ওঠে তার দীর্ঘ কবিতা ‘অলৌকিক চশমায়’। অংশ বিশেষ হলোÑ
ইদানীং এক জোড়া চশমা নিয়ে আমি খুব বিব্রত
এ যেন আমার কাছে এক কাশ্মীর সমস্যা
চশমাখানা আমার দাদার
এ চশমা চোখে দিলে পৃথিবীর রূপ বদলে যায়
মনে হয় আফ্রিকার কোনো এক গভীর অরণ্যে চলে এসেছি
হিংস্র পশুদের সাথে বসবাস করছি
এবং মাৎসন্যায় নীতিই যেখানে আইন ...
.....
আব্বার ইন্তেকালের সময় আমার চোখে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরণের চশমা
ওফদে ফিলিস্তিনের হাইয়া আলাল জিহাদ আমার রক্তে তখন স্পন্দন তুলছে
জাবালুততারিকে পৌঁছে যাওয়ার বজ্র শপথে উজ্জীবিত
আবু আয়ূব আনসারীর স্মৃতিধন্য সুপ্রাচীন নগরীর তরুণদের সাথে
আমি রাখিবন্ধনে আবদ্ধ
দাদার চশমার কথা আমার মোটেই মনে ছিল না
এমনকি পাঠশালার সে মেয়েটির কথাও আমি ভুলে গিয়েছিলাম
আমার নাদান সহপাঠিরা যাকে চশমা নামের কারণে অযথাই উত্যক্ত করতো
ফার্সিতে চশমা মানে প্রস্রবন একথা আমার জানা ছিল বলে কি না জানিনা
আমি তার সকল নিষ্পাপ চোখে
সবসময় ঝর্ণার উচ্ছলতা স্বচ্ছলতা এবং প্রবাহ প্রত্যক্ষ করেছি
কিন্তু কোনোদিন তার পক্ষ হয়ে
ছেলেদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস দেখাতে পারিনি
কথাটামনে হলে আজো আমার পৌরুষ এবং তারুণ্যের সকল সাহসী সমাচার
লজ্জাবতী লতার মতো হাত পা ছেড়ে দিয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে চায়
সেনি আব্বার ব্যবহৃত জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে
একখানা পুরানো চশমা আমার নজরে পড়ে
নিতান্তই কৌতুহল বশে চশমাখানা চোখে দিয়ে আমি অবাক
এই তো সেই অলৌকিক চশমা
যা চোখে দিলে মানুষের মনের ভাষা তার চেহারায় ভেসে ওঠে
কাউকে কিছু না বলে চশমাখানা বুক পকেটে রেখে দিলাম
তখন হঠাৎ করে নিজেকে খুব দামী লোক বলে মনে হয়েছে ...
...
দানবীর হাতেমতায়ী জনদরদী রাজনীবিদি এবং আলখেল্লা পরা ধার্মিক
এ চশমা চোখে এঁটে আমি এদের কারো মুখোমুখি হতে পারি না
কারণ তখন তাদের মুখাবয়ব শৃগাল কুকুর নেকড়ে অথবা অন্যকোনো শ্বাপদ বা সরীসৃপের আকৃতি ধারণ করে
সেদিন গিয়েছিলাম এক ইন্টারভিউ দিতে
শেষ প্রশ্ন ছিল ইকুয়াল অপরচুনিটিজ বলতে আমি কি বুঝি
প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে কি ভেবে চশমাখানা চোখে লাগিয়ে নিলাম
বিস্ময়ে চেয়ে দেখি আমার সামনে ক্ষুধার্ত এক নেকড়ে বসে আছে
সাথে সাথে আমার ঈশপের নেকড়ে ও মেষ শাবকের গল্পটি মনে পড়ে গেল
চোখ থেকে চশমা নামিয়ে রেখে বললাম
ঘড়ির কাঁটাকে যদি দু’শ বছর পিছিয়ে দিতে পার তা হলেই আমি
ইকুয়াল অপরচুনিটিজ এবং এর নামে পরিচালিত সকল ভণ্ডামীর স্বরূপ
তোমাকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হব ...
...
বন্ধুর জবাবে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো গোটা পৃথিবীর মানচিত্র
স্পষ্ট হয়ে ওঠলো পলাশী থেকে এজিয়ান সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত সকল রক্তপাতের ব্যাকরণ
জরু আর জমির দখল নিয়ে আদিম সমাজের যুদ্ধ
এবং আধুনিক সভ্যতার ইতিহাস একই সমতলে এসে দাঁড়ালো
মানবিক আচরণ শুধু মানুষের নিকটই আশা করা যায়
জানোয়ার চাটবে জানোয়ারের রক্ত এ খবর কোনো সংবাদ শিরোনাম হতে পারে না ...
...
বন্ধুর ঘর থেকে বের হয়ে দেখি সামনেই কালের সাক্ষী টেমস নদী
সুবোধ বালিকার মতো ধীর শান্ত
লন্ডন শহরে এখন বাস আর নদীর গতি সমান
আমাকে আরো দ্রুতগতিতে সামনে যেতে হবে
দাদার চশমাখানা পকেট থেকে বের করে মাঝ গাঙ লক্ষ্য করে ছুড়ে মারলাম
তারপর বৃটিশ পার্লামেন্ট বাঁয়ে রেখে নিকটবর্তী টিউব স্টেশনের দিকে আস্তে আস্তে পা বাড়ালাম।
গল্পের ভেতর দিয়ে কবিতাটি অংগ্রসর হয়েছে। সঙ্গত কারণেই দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক অংশ বাদি দিয়েও দীর্ঘ হয়ে গেছে।
আমরা দেখতে পাই জনদরদী রাজনীতিবিদ এবং আলখেল্লা পরা ধার্মিকদের কীভাবে চিনিয়ে দেয় একটি প্রতীকি চশমা। এই চশমার অন্য নাম যুক্তি-জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি-বিচক্ষণতা। এসব থাকলে বস্তুগত চশমাটির খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না।

ফরীদ আহমদ রেজার কবিতায় মুক্তযুদ্ধ-দেশপ্রেম এসেছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। ‘একটি হৃদয়ের জন্যে’ কবিতার শুরুটা এভাবেÑ ‘উচুঁতে উঠলেই পৃথিবীর সব কিছু ছোট হয়ে আসে/ অনেকের চোখে পথচারী হাভাতের দল যেমন/ কথাটা প্লেনের জানালা দিয়ে ভেসে আসে/ বলিনি কখনো Ñ কেমন জানি লজ্জাবোধ জাগেÑ ...’ অতঃপর বিভিন্ন উপমা-উৎপ্রের্ক্ষা ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ভূ-গোল ও মানুষ ওঠে আসে কবিতার শরীর বেয়ে। ডিসেম্বর মাস, বাঙালির বিজয়-আনন্দ-বেদনার মাস। এ মাসে বাঙালি অনেক কিছু হারিয়ে সত্ত্বার পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই দিনের ১৯৮২ সালে কবিতাটি রচিত হয়। এই কবিতার মাধ্যমে একটি পরিবার, আমাদের সকলের পরিবার হয়ে যায়। আমরা কোনোভাবে এর দুঃখ-বেদনা থেকে আলাদা হতে পারি না। সমস্ত বাংলাদেশে কবি একজন জননীর মাতৃহৃদয়, উদার মন কুচি কুচি করে ছড়িয়ে দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। দুই প্রতিপক্ষ সন্তানের জন্য তিনি সমান প্রার্থনা করেন অথচ যুদ্ধক্ষেত্রে তারা দু’জনই একে অন্যের হন্তারক। কবি আবিষ্কার করেন, একজন মা যা পারেন আর কেউ তা পারে না Ñ এই চিরসত্য চরিত্রের উপখ্যান গেঁথে আছে এই একটি মাত্র কবিতার অঙ্গে অঙ্গে।
... একজন মামা নিখোঁজ এগারো বছর
বড় ভাই ওপারে জীবন দিয়েছে
মা পরের বাড়িতে কাজ করে
একদিন মিলিটারীদের জন্য চা তৈরি করেছেন
এবং
দেবরের হাতে গলার হার তুলে দিয়ে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন।

মা তুমি এক হৃদয় দিয়ে এতো কিছু ধারণ করলে কী করে?
দুই প্রতিপক্ষের জন্যে এক সাথে প্রার্থনা করতে তুমি কোথায় শিখেছো?
তোমার হৃদয়খানা আমাকে একটু ধার দিবে মা?
আমি রূপসার তীরে তীরে কর্ণফুলী সুরমা ঘুরে
পৃথিবীর সকল দুখী আর পাপীদের জন্যে
তোমার ভালোবাসা প্রার্থনা পূর্ণ করে দেবো কথা দিলাম মা!
(একটি হৃদয়ের জন্যে)
দুয়েকটি কবিতা বাদে এই কবির ভাষা আজকের শূন্য দশকের নয় Ñ ষাটের নাগরিক ভাষা। এ ভাষায় রয়েছে নাটকীয় কথন। শামসুর রাহমানীয় ঘরণায় যে ভাষা বেড়ে ওঠেছে ফরীদ আহমদ রেজা ভাষাগতভাবে তাদের সমগোত্রীয়। সঙ্গত কারণে তার ভাষা আমাদের তাঁতায় না Ñ ড্রয়িং রুমের কথন হয়ে ফুলদানী, চায়ের পেয়ালায় ওম-তাপ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

ফরীদ আহমদ রেজার উল্লেখযোগ্য কবিতার অংশ বিশেষ :

সূর্যমুখী ফুলগুলো ভোর রাতে আমাকে এখানে ডেকে এনেছে
সকাল বিকাল ওরা আমাকে প্রলুব্ধ করে
আঘাত করে আমার চোখে আমার বুকে
তুমি কবাট খুলে দেখেছো এক জোড়া চোখে তৃষ্ণার্ত দীপ্তি।
... ...
আলো দেখে যারা মুখ লুকিয়ে চলে
গাহসী উচ্চারণ শুনে যারা কেঁপে উঠে চুপসে যায়
ঘরমুখো বৈরাগীদের পাশাপাশি পৃথিবীর পণ্যশালায়
দিগন্তজোড়া প্রসারিত দৃষ্টি নিয়ে
সূর্যমুখী ফুলের তীর্যক দৃষ্টি দারুন এক বিস্ময়।
(উদ্যত বিস্ময়)

আমাকে দিয়েছে এক অগ্নিঝরা অঙ্গীকার
চট্টলার সমুদ্র সৈকত
বাকলিয়া ... আলকরম ... শুলক বহর।
(ওরা একদল যুবক)

অথচ এখানে
গজারের চোখগুলো যুদ্ধক্লান্ত সৈনিকের মতো
ধুতরা ফুলের ঘ্রাণে তন্দ্রাতুর সোনালী মাগুর
নীল সাদা কপোতেরা দল বেঁধে উড়ে
পার হয় গম্বুজ ... কীনব্রিজ ... শহর ... নগর
ম্রিয়মান ঝর্ণার স্বর
চারপাশে বাউল ... মস্তান ... স্মৃতিফলক
গোবিন্দের দালানের খসে পড়া ইট থেকে
নতুন প্রাসাদ জাগে ...
উঁচু ... আরো উঁচু হয়।

সমস্ত নগর জুড়ে শুয়ে আছেন পিতা-পিতামহ
স্মৃতিসৌধে চারাগাছ গজিয়েছে সবুজাভ পাখা মেলে
উদার নীল আকাশের নিচে।
... ...
শেখ ঘাটের পথ ধরে যুবকেরা উঠে এসো
খেয়াতরীর অপেক্ষায় নয়
হাতছানি দিয়ে ডাকে সুউচ্চ মিনার।
(উত্তর পুরুষ)

যে ঘরে রমণী নেই সে ঘর বিরান বসতি
নারীর পরশহীন বাসগৃহ অপয়া অশুচি
রমণী বিহীন ঘর অনুর্ভর তাই সেথা প্রবেশ নিষেধ।
(নারী)

রূƒপসা এবং তার বোনদের কাছে ভালোবাসা জমা আছে
উজান পথে বাংলাদেশ-ভারত-মানস সরোবর পৌঁছে যেতে পারি
যদি তুমি কথা দাও সারথি হবে।
(রূপসা এবং তার বোনেরা)

আমার বিশ্বাস
নিভৃতে কথা বলে আমার পাপের পথে
ওরাইতো দাঁড়াবে একদিন।
(স্বজন)

একজন পক্ককেশী বৃদ্ধার কাছে গেলে অথবা না গেলে
বুকটা আমার খা খা করে
বেদনা আমাকে তার কাছে টেনে নিয়ে যায়
বেদনার ভার নিয়ে ফিরে আসি বার বার
কেননা তার ইয়াকুতকে ফিরিয়ে আনা যাবে না
এবং কেননা তার ইয়াকুতের সাথে আমার সখ্যতা ছিল
... ...
কিন্তু পৃথিবীটা হঠাৎ বদলে গেল
কলমা জিজ্ঞেস করে যারা মুসলমান বাছাই করতো
সেই জালিমরা তাকে পাঠিয়ে দিল আরেক পৃথিবীতে
যেখানে যাওয়ার পাথেয় সংগ্রহে
তার উদ্যম ছিল অন্যদের কাছে ঈর্ষার বিষয়।
... ...
আমাকে তার কথা বলতে হবে
কারণ তার স্বজনেরা তাকে ভুলে গেছে
তার কোনো ঔরসজাত নেই
এবং আমি যখন নতুন পৃথিবী গড়ার কথা বলি
তার কণ্ঠ আমার কানে বাজে
(আম্মা আমি ফিরে এসেছি)

দোলনা থেকে শিশুরা ইরানী যুবক হয়ে মাঠে নামে
সকল শাহদের সিংহাসনে ধ্বস নামে
গৌড়গোবিন্দের দালানের মতো
এবং ওমর
একজন ফাতিমার কাছে বিপ্লবের মেনিফেস্টো পেয়েছিল।
(একটি মেহদী রাঙা হাত)

পুশচেয়ার থেকে শিশুরা
লাফিয়ে নামছে যেন আফগান শার্দুল

এবং থর থর করে কাঁপছে গোটা পুঁজিবাদী সভ্যতা।
(যিসাসের আগমন অনিবার্য)

এক জোড়া চোখ চাই এমন সতেজ
ভষ্ম হবে মানুষের পশু
পৃথিবীর পুনর্জন্ম উপহার দিবে

জ্যোতিহীন চোখগুলো সূঁচবিদ্ধ হোক।
(চোখ)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804796 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804796 2008-05-31 14:14:25
পরমাত্মায় অন্তর্লীন কবি আহমদ ময়েজ মুখোমুখি আবু মকসুদ মুখোমুখি আবু মকসুদ
নব্বই দশক থেকে বাংলা কবিতার ভূগোলে অনেক বিবর্তন ঘটেছে। এই দশকের কবিতায় প্রাকৃত-অপ্রাকৃত-অতিপ্রাকৃত দৃশ্যপটের সংযুক্তি হলেও বদলে গেছে ব্যক্তি মানুষের জীবনের অভিব্যক্তি। কবিতায় দেখা দিয়েছে ভাবপ্রবণতা, উদ্বুদ্ধকরণ, মানসিক বেদনার উপস্থাপন, জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেয়ার ঐকান্তিক অভিলাস। বিষয়বৈচিত্রে পিপাসার্ত মনে আকাঙ্খা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে নব্বই দশকের কবিতা। কবি আহমদ ময়েজ এই বদলের একজন সহযাত্রী।
আহমদ ময়েজ কি কেবল নব্বই দশকের কবি? তার শুরু দেখতে পাই আশির দশকে। নব্বই থেকে তার স্ফুরণ ঘটেছে, তিনি হয়ে ওঠেছেন আরো সচেতন। আমাদের পরিচিত সাহিত্যিক পরিমণ্ডল জুড়ে তার অবস্থান Ñ স্বকীয়তায়-নিজস্বতায়। এই কবির শিকড় প্রোথিত বয়েসী-বটবৃক্ষে, পিতামহ মরমি মজিরের মরমিয়া সঙ্গীতের সার্বজনীনতা, মাধুর্যতার ধারাবাহিকতায় তিনি পরিস্ফুট। কবি হিসেবে তিনি একজন সংবেদনশীল বংশীবাদক, নির্জনতা তাঁর কবিতার দৃশ্যমান অনুসঙ্গ, তাঁর কবিতা আমাদের ভেঙে ফেলে, নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে, পাখির পালকে তুলে দেন অপূর্ব এক সুর। আবার কখনও বার বার নোঙর ফেলার বেদনায় তিনি আহত।
এই কবির শিল্পের রস সঞ্চারণের অনেক ধরণের মাধ্যম দেখা গেলেও মরমিয়া ঐতিহ্য ধারণ করে তিনি নবতরে শিল্পের ভেতর জীবনকে দেখার চেষ্টা করেন। আমরা তা আস্বাদন করে তৃপ্ত। মানুষের চরমক্লান্তিÍ কিংবা স্বস্থির নিঃশ্বাস, অন্তরাত্মার আকাঙ্খা বা পরমাত্মার প্রতি অন্তর্লীন আগ্রহকে কবিতা শিল্পে রূপান্তরিত করে তিনি সুন্দরের পরাকাষ্টা তৈরি করেন। আমরা জানি কবিতা নির্বাসিত সুন্দর, যার পরিপূর্ণ কায়া কারো পক্ষেই ধরা সম্ভব নয়। আহমদ ময়েজ সুন্দরের খোঁজে বস্তুবিশ্বে নান্দনিকতার সেতু বানান। আমরা এই বানানো সেতুর নাম দিতে পারি কবিতা।
বাসভূমি’র নিয়মিত লেখক লন্ডন প্রবাসী কবি সম্পাদক আবু মকসুদ এর মুখোমুখি বসে তিনি নিজের কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, গল্পও এসেছে। স্বার্থবাদী রাজনীতির প্রতি ক্ষোভ, একরৈখিক-অসহিষ্ণু-উদ্ধতপনার বিপরীতে প্রেমময় ভাবনা নিয়ে খোলাখোলি কথা বলেছেন। স্বাক্ষাৎকারটি ‘শব্দপাঠ’ এর সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।
আপনার কবিতার কৌশলগত দিক বলুন। কোন-ভাবের ভেতর দিয়ে আপনি অগ্রসর হন কিংবা যে দর্শন আপনাকে স্পর্শ করেছে Ñ বাউল জগৎ, তা কি প্রকৃত-অর্থে বস্তুতগত জীবন ধারণ করে?
বস্তুবাদীরা বুদ্ধি করে কবিতা লেখেন Ñ তারা এর কৌশলগত নাম দিয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তিক কবিতা। বাউলরা বস্তুবাদী নন। তাদের ভাব চাই, বস্তুও চাই। ভাব দিয়েই বস্তুকে ধরার চেষ্টা করেন। আর কবিতায় কেবলমাত্র দর্শন থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কবিতা দর্শনের জন্য লেখা হয় না। দর্শন ফলাতে হলে দর্শনের ভাষা ভিনড়ব, একটি সুশৃঙ্খল যুক্তি-চিন্তার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। আজকাল প্রায়ই বলতে শুনি, কবিতায় দর্শন থাকতে হবে, না হলে কবিতা হবে না। এসব ফালতু উদ্দ্যতপনা। দর্শন কিসে নেই? কবিতাচর্চায় সুনির্দিষ্ট বিষয় বলে কিছু নেই। দর্শন আসতেই পারে, তেমনি চিত্রকল্প, উপমা-উৎপ্রেক্ষা Ñ এসব কবিতার অলঙ্কার হিসেবেই গণ্য করা হবে। কেবল এসব থাকলেও কবিতা বলা যাবে না। কবিতার প্রধান বিষয় এবং শুদ্ধতা হলো ছন্দ ও ভাষা। এ দুয়ের কমতি হলে কবিতাকে দুর্বল করে ফেলে। এমনকি বক্তব্যও এক্ষেত্রে গৌন। সব কিছুর সমন্বয় ঘটলে সার্থক কবিতা বলেই উলে-খিত হবে।
আপনার মেঘের পোয়াতি মেয়ে নিয়ে কথা বলতে চাই ...
এটা একটা মুহূর্তমাত্র। জোড়াসন্তানের পিতৃত্ব পাবার পর কিছুদিন এই ঘোরের ভেতর ছিলাম। ঐ সময় এক বৃষ্টিভেজা রাতে বার্মিংহাম শহরে রাত্রি যাপন করি। মোষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। কবি সৈয়দ মবনুর বাসায়। লেপ দিয়ে মাথামুড়ে শুয়ে আছি। হামাগুড়ি দিয়ে বৃষ্টির শব্দ তুষকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। সেই ধ্বনি আমাকে পোয়াতি করে তুলে। আর মাথার ভেতর মরমি মজিরের একটি লাইন বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে Ñ ‘মৃদঙ্গে উঠিছে ধ্বনি, শুন
তার পদধ্বনি রে, সেই ধ্বনিরই কম্পন আমার হিয়াতে শুনিলাম, আমার মন মন রে কেনে বা তারে চিনিলাম?’ সেই সঙ্গে আমি জোড়া-জোড়া পা, লক্ষকোটি পায়ের আওয়াজ শুনতে পাই। ভাবুন একে তো ধ্বনি, তার উপরে জেনে ফেলার যন্ত্রণা আমাকে আকুল করে তোলে। এক ইন্দ্রজালকে ছিনড়ব করে অন্যএক রক্তমাংস-চিত্রের ভেতর ঢুকে পড়ি Ñ তাহার বিচরণভূমি অরণ্য নগর/ কেউ তাকে বধ করো না, রঙিয়ো চোখ/ সে আমার গহন মেঘদূত।
আপনার কবিতা ‘বৃক্ষের গুরু’ Ñ সেখানেও ফকিরী চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন ...
হ্যা, অনেকটা তাই। হাজারো কোলাহলের ভেতর নিজের মধ্যে একা হয়ে যাওয়া এ রকম একটি মুহূর্তে জানতে পারি, এ পথ আমার নয়/ অচেনা। আমি তো স্বার্থমুখী মানুষ। নগরের চৌকস কলাকৌশল জেনে গেছে যে জীবন, তার দ্বারা স্বার্থের উর্ধ্বে উঠা বড় কঠিন। অন্য অর্থে বলা যায়, আধুনিক মানুষ বলতেই স্বার্থবাদী। এই স্বার্থ ভিনড়ব অর্থে ভিনড়ব দ্যুৎনায় প্রবাহিত। হিসাব-নিকাস কষে যে জীবন মধুচন্দ্রিমা ভোগ করে, সেখানে সিক্তআবেগ অনুপস্থিত থাকে। একটা উদাহরণ দেই। আধুনিক নাগরিক-মানুষ কানড়বাটাকেও লুকিয়ে রাখে, এমনকি নিজের নিকটতম মানুষের মৃত্যুর সময়ও তারা হিসাব করে কাঁদে, সেটাই আধুনিক ভদ্রতা। একজন প্রকৃত আবেগঘন মানুষ সেটা পারে না। সত্য সে লুকাতে পারে না Ñ আপনা থেকে গড়িয়ে পড়ে। এ জন্যই আধুনিক জীবনকে তুচ্ছ করে বৃক্ষের গুরু কবিতায় পিতৃপরিচয় এসেছে এভাবেÑ ‘নমশুদ্র আমি তোমার সন্তান/ হে পিতা/ একবার শুধু কও, নদী কেন এতো বাঁক নেয়?’ এবং সেটা বাউল কিংবা ফকিরী-চিন্তা হলেও আমার গ্রহণ করতে আপত্তি নেই। এর পিছনে আরও কিছু ঘটনা প্রবাহ রয়েছে। আমার পিতা ছোট বেলা আমাকে একটি শাস্তি দিয়েছিলেন। আমাদের গ্রামের একজন শিক্ষক ছিলেন যার পূর্বপুরুষ জমিদারদের রাইয়ত (প্রজা) ছিলেন। গ্রাম্যভাষায় যাদের গোলাম বলা হয়। ছোট বেলা একদিন সকালে আরবি পড়া থেকে বাড়ি ফিরে দেখি আমাদের চেপ্টা-বারান্দায় একটি হাতাওয়ালা চেয়ারে শুভ্র দাড়ি-গোফ, কাধঝাকানো চুলওয়ালা একজন লোক বসা, পরনে লাল শাল্লু। আর আব্বা তার সঙ্গে গভীরভাবে কথা বলছেন। আমি পাশকাটিয়ে ঘরে ঢুকতেই আমাকে আব্বা ডেকে এনে বললেন Ñ মুরুব্বীকে সালাম করতে হয়, উনাকে পায়ে ধরে সালাম করো। দীর্ঘদিন পর আমাকে এর ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়েছিল। এই শাল্লু পড়া ভদ্রলোক মনের দুঃখে শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে ব্রতচারী জীবন গ্রহণ করেছিলেন। তিনি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন বটে, কিন্তু পূর্বপুরুষ যেহেতু জমিদারদের রাইয়ত ছিলেন সেহেতু কোনো সৈয়দ সাহেবের বাড়ি (উলে-খ্য, অধমের গ্রামের বাড়ি জগনড়বাথপুর থানার সৈয়দপুর গ্রামে) তিনি বসার জন্য চেয়ার বা ভদ্রগোচের সম্মানটুকু পেতেন না। অথচ যে বাড়িতে বেড়াতে গেলেন সেই বাড়িতে হয়তো তার ছাত্রছাত্রীও আছে। শিক্ষকের এহেন অপমান একজন ছোট্ট ছাত্রের সামনে অত্যন্ত অসহনীয় বেদনার বিষয়। যে ছাত্র স্কুলে গেলে তাকে সালাম করছে অথচ তারই বাড়ি তিনি বংশনাক্রমিক গরিবীজীবনের অপরাধে সামান্যতম বসার আসনটুকু পাচ্ছেন না, সেই ছাত্রকে তিনি কী শিক্ষা দেবেন। এই বেদনায় ভদ্রলোক ব্রতচারী জীবন গ্রহণ করেছিলেন। আমার বৃক্ষের গুরু কবিতাটি সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সনিড়ববেশিত হয়েছে।
‘একদা জেনেছি এও, প্রাণের বিনাশ নেই/ দীর্ঘ ঘুমের শেষে ফিরে আসে অনন্ত ধারায়’ Ñ আপনি পরজনমে বিশ্বাসী।
বিশ্বাস শব্দটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। কোনো মানুষই সবকিছুতে বিশ্বাস রাখে না। আবার কোনো মানুষই সব কিছুতে অবিশ্বাসও রাখে না। অর্থাৎ কেউই পূর্ণ নাস্তিক নয় বা আস্তিকও নয়। যে যেটা বিশ্বাস করে সেই বিষয়েই সে আস্তিক। তবে বিশ্বাস শব্দ আমার কাছে এক প্রত্যয়, দৃঢ়তার নাম Ñ ঋজু শক্ত করে দাঁড়াবার নাম। মানুষের কাছে এটি থাকতে হয়, নাহলে মেরুদণ্ডহীন স্থূল-মানবে পরিণত হতে হয়। অনেকে আবার উদ্দ্যতপনাকে ঋজুতা ভেবে গুরুজনের সঙ্গে বেয়াদবী করেন। আল-াহ-বিশ্বাসে চমৎকার ব্যাখ্যা করেছেন বাউল শাহ আবদুল করিম। কবিবন্ধু এটিএম কায়সারের মাধ্যমে শোনা। তার ব্যাখ্যা হলোÑ ‘শক্তিরবিনাশ নেই Ñ আল-াহরও বিনাশ নেই, শক্তি ছাড়া সবকিছু অচল। শক্তিসর্বত্র বিরাজমান। শক্তিছাড়া এ দেহও অচল ... ।’ আমার শেষ কথা, বিশ্বাসের জন্য এতো যুক্তির প্রয়োজন লাগে না। না হলে একে আত্মবিশ্বাস বলা যেতো না। বিশ্বাস ঘনভালোবাসার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
.. তাহলে বলতে পারি আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী।
না, ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস নেই। ঈশ্বরকে আমি চিনি না, তার সাথে আমার পরিচয় ঘটেনি। বরং প্রভুর প্রেমময় জগৎ আমাকে স্পর্শ করে।
প্রভু-ঈশ্বর কি এক নয়?
না, চিন্তাগত-ভাবগত দিক থেকে অনেক দূরত্বে অবস্থান করে। আপনি লক্ষ্য করবেন কোনো কোনো লেখক সচেতনভাবে ঈশ্বর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। প্রগতিশীলরা একটু বেশী। রাশান বইগুলোর অনুবাদে দেখতাম স্রষ্টার স্থলে ঈশ্বর শব্দ ব্যবহার করা হতো। এখনও এই ধারার লেখকরা ইংরেজি/আরবী/ফারসি সাহিত্যের অনুবাদে খোদা/আল-াহ/প্রভুর স্থলে ঈশ্বর শব্দ ব্যবহার করেন Ñ তারা বোধহয় ঈশ্বরকে প্রগতিশীল মনে করেন। আমার কাছে ঈশ্বর পুরুষবাদী-কর্কষ শব্দরূপে প্রতিয়মান। তার আয়েশের জন্য, খায়েশের জন্য একজন ঈশ্বরীও লাগে। তাছাড়া এধরণের শব্দের অর্থ একটি অবকাঠামো তৈরি করে দেয়। স্রষ্টা চিন্তার ক্ষেত্রে আমি এই অবকাঠামোগত ঈশ্বরের ভেতর তিষ্টাতে পারি না। বরং নিরাকার শব্দের ভেতর নিজেকে স্থাপন করা যায় Ñ লেখক হিসেবে আমার জন্য ঐ জায়গাটুকু নিরাপদ।
প্রান্তের রেখা ধরে ঘোড়াটি মিলিয়ে যায় ...
আর ব্যাখ্যা চাইবেন না।
কেন?
আসলে কবিতার ব্যাখ্যা হয় না। জোর করে বলতে গেলে এর স্বাদ বিনষ্ট হয়।
গল্পের কথা বলি, কবিতা লিখছেন আবার গল্পও, তবে আপনার গল্পে গল্প নেই ...
কী নেই আর কী আছে সেটা আমার ভাবার বিষয় নয়। কবিতায় যা পারি না তা গল্পে বলার চেষ্টা করি। গল্পে যেটা বলতে চাই না কবিতায় সেটা আড়াল করি। মূলত আমার গল্প-কবিতার গল্প এরকমই। শরৎচন্দ্রকে কে বলেছিলÑ আপনি এতো কাহিনী লিখেন ...। শরৎবাবু উত্তরে বলেছিলেনÑ আমি কোনো কাহিনী লিখিনি, যা অঙ্কণ করেছি তা কেবলই চরিত্র।
বিলেতের প্রসঙ্গে আসি। বাঙালি যেখানে যায় সেখানে তার সাহিত্য-সংস্কৃতি-পত্রিকা-প্রকাশনা নিয়ে হৈচৈ করে। এর ভালোমন্দে যাচ্ছি না। আপনি একটি কাগজের সাহিত্য সম্পাদক। সেই আলোকে এখানকার লেখালেখি সম্পর্কে আপনার মতামত চাই।
আমার মতামত দিয়ে লেখার মান বাড়বে না। আসলে আমরা অনেকেই একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে বাঙালিপনায় মেতে আছি। ঘোর কেটে গেলে মানুষটা একেবারে শূন্য হয়ে যায়। কাউকে শূন্য করে দেয়ার অধিকার আমার নেই। তারপর কিছু রাজনীতিও আছে, এর সঙ্গে কিছু লেখালেখিও আছে। দুয়ের চাপে ব্যক্তিমানুষটির অবস্থা একেবারে গোবেচারা। এই সবকিছু নিয়ে আমরা বাঙালি Ñ এভাবে বিষয়টি মানতে পারি না। যে ধীমান ব্যক্তিটির কথা ভাবি, এসব চর্চার ভেতর তো এর জন্ম হয় না। তাহলে আমরা কোন্ প্রজন্মে এসে মাথা উঁচিয়ে বলবো Ñ আমি বিশ্বমায়ের সন্তান?
সমালোচক মনজুরুল আজিম পলাশ লিখেছেন, আপনি পড়েন কম ভাবেন বেশি। অমরনাথ চক্রবর্তী আপনার কবিতার সুর নিয়ে কথা বলেছেন। সংক্ষিপ্ত লেখায় তিনি সেই সুরকে, সেই গীতকে সনাক্ত করেছেন ভিনড়ব জগতের বাসিন্দারূপে। একটি আপনার লেখা বিষয়ে গভীর অনুসন্ধিৎসু। অন্যটি কল্পনা প্রসুত হলেও এর সঙ্গে আপনার মতামত জানা প্রয়োজন।
প্রথমে বলি মনজুরুল আজিম পলাশ ঠিকই বলেছেন। আমি বেশি পড়তে পারি না। ভালো একটা লেখা পড়তে গিয়ে এতো আপ্লুত হই যে ভাবনায় পড়ে যাই। এর ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। অমরনাথ
চক্রবর্তী সঙ্গীত বুঝেন ভালো। অবশ্য তাঁর মূল বিষয় দর্শন। অত্যন্ত প্রাজ্ঞপুরুষ এই ভদ্রলোক এই বৃদ্ধ বয়সে তারুণ্যের সুর খোঁজতে চেষ্টা করেছেন মাত্র। আমার কবিতার ভেতরের একটি বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। আমি নিজেও এই সুরকে এতো করে দেখার চেষ্টা করিনি। অথচ বিষয়টি ঘটে গেছে। এছাড়াও ‘বিমূর্ত’ বিষয়ের ভেতরও তিনি বস্তুনিষ্ঠ বিষয় খোঁজে নিতে পেরেছেন নিজের যোগ্যতা বলে। তাঁর ‘শুদ্ধ-সুদূরের কবি আহমদ ময়েজ’ মন্তব্য আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।
কবিতার আঙ্গিক নিয়ে কোনো ভাবনা নেই কেন?
ভাবনা কিছুটা আছে। আঙ্গিক ভাঙা কঠিন বলেই এ পথে আমাদের উৎসাহ কম। বরং ভাষা-শৈলী দিয়ে চমক লাগাবার কসরৎ করছি বেশি।
তাহলে কী আমরা কিছুই করছি না, নিরন্তর কেবল কাগজই ভরে যাচ্ছি?
চেষ্টা তো আছে। নতুন কিছু হচ্ছে না। সবচে বেশি করছি আস্ফালন। নিজেই নিজের কাজকে বলছি ‘বিরল’ ঘটনা। এগুলোর মাধ্যমে অহঙ্কার, দাম্ভিকতাকে কেবল প্রশ্রয়ই দেয়া হচ্ছে। এসব প্রকৃত চিন্তাধারার লেখকের তেমন ক্ষতি করতে পারে না। কিছু সময় ব্যয় হয় মাত্র। জোর করে কবিতা চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। পাণ্ডিত্য-দাম্ভিকতা দিয়ে নন্দনচর্চায় শাসন করা যায় না। এর জন্য বিশাল ব্যক্তিত্ব ও মন দরকার। আলিঙ্গন করতে হবে। না হলে মানুষে মানুষে ‘সিনাসাক’ হবে কী করে।
আপনার কবিতা বাউল আশ্রিত?
এটা কী দোষের কিছু? তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ থেকে জয়ঘোস্বামী কেউ কি বাউল-মরমি-ফকিরী জগৎকে অস্বীকার করতে পেরেছেন? অনাদিকাল থেকে মানুষের ভেতর বাউল প্রকাশ-অপ্রকাশ হয়ে বিরাজিত। আপনি নিজেকে একজন কোনো না কোনোভাবে বাউল। যে কাজটি আপনি নিঃস্বার্থভাবে সম্পাদিত করলেন সেই অংশটি বাউল এবং এটি প্রকাশিত। যে কাজটি নিঃস্বার্থরূপে নিরুপন ভাবনার মধ্যে রয়ে গেছে অথচ যেকোনো কার্যকারণে কাজটি সম্পাদিত হচ্ছে না সেই ভাবনার অংশটুকুও বাউল এবং অপ্রকাশিত।
আপনি এতো রাজনীতি বিমুখ কেন? আপনার কবিতায় রাজনীতি নেই।
রাজনীতি আমার কবিতায় আছে, তবে স্থূলভাবে নেই। কারণ রাজনৈতিক শ্লোগান রাজপথের জন্যে Ñ কবিতার জন্যে নয়। তবে কবিতায় যখন মানুষের কথা আসে এবং রাজনীত যখন মানুষের কল্যাণচিন্তা থেকে উৎসারিত হয় তখন কবি এবং রাজনীতিক একই সমতলে এসে দাঁড়ান। আমার রাজনীতি দলকেন্দ্রীক নয়। প্রত্যেকটি মানুষই সচেতন-অবচেতন মনে রাজনীতির অধীন। এই গ্রহের একজন সদস্য হিসেবে আমাকেও রাজনীতি সচেতনতার ভেতর থাকতে হয়। বাংলাদেশের মতো একটি সদ্য স্বাধীনদেশের মানুষ হিসেবে রাজনীতি আরও বেশি স্পর্শ করে। অথবা দেশের যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে একজন সচেতন কবির নীরবতা অসঙ্গতীপূর্ণ। যেনতেন ইস্যু ধরে লম্পঝম্প আমার ধাতে নেই। প্রসঙ্গত বলা যায়, সম্প্রতি আপনারা আমাকে ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদে’র বিচারের জন্য বিবৃতিতে অংশ নিতে অনুরোধ করেছিলেন। বিষয়টি ছিল বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে নালিশজাতীয় চাপ। আমার বুঝে আসে না, হঠাৎ করে এই সরকারের কাছে নালিশ করার গুরুত্বটা কোথায়? এই সরকারের আলাদা বৈশিষ্ট্যই বা কী? এতোকাল কি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় ছিল না? তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করার কথা ভাবলেন না কেন? উদ্দেশ্য ছাড়া মানুষ হঠাৎ করে দেশপ্রেমিক হয় না। দেশপ্রেমিক মানুষ একটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠে। প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক আমিও চাই এবং এ নিয়ে যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনীতি করেন, কেবল ক্ষমতায় যাবার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে হাজারও মানুষের দেশপ্রেমকে প্রশড়ববিদ্ধ করেন, তাদের সেই রাজনৈতিক ব্যবসাটা বন্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু বিচারটা করবে কে? বিষয় হলো পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি সবসময়ই যার যার স্বপক্ষের হাত ধরাধরি করে অগ্রসর হয়। বর্তমান সরকার কোন পক্ষের? তারা যাদের আশির্বাদপুষ্ট, যারা বিশ্বব্যাংক তথা আমেরিকার স্বাথর্ সংশি-ষ্টতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ করেন তারা কী করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করবেন? তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও
যুদ্ধাপরাধীদের স্বার্থ তো একই যায়গায় প্রোথিত। তারাও তো তথাকথিত রাজনীতিবিদদের মতো এই বিষয়টি নিয়ে বানিজ্যে মেতেছেন Ñ মানুষের স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়ার মাধ্যমে। তারা যে স্বচ্ছ নন তা দিব্যি চোখে দেখা যাচ্ছে। অপরাধীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজানো কোনো নীতিনৈতিকতার ভেতর পড়ে না। এতোদিন ভেবেছিলাম প্রকৃত রাজনৈতিক অপরাধে অপরাধীদের ধরে নিয়ে বিচারের মুখোমুখি করবেন। এখন বুঝতে পারছি তা কেবল বাহবাহ কুড়ানোর জন্য। নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী অপরাধীর উপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। আবার সরকারের মত ও পথের সঙ্গে একমত হয়ে আত্মসমর্পণ করলে, তাকে সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এই খেলা আমরা বুঝি। আর তাদের (এই সরকারের) দেশীয় শক্তিকোথায়? তথাকথিত সুশীল সমাজ, বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিবিদ-সাংবাদিক যারা বামেও আছেন ডানেও আছেন আবার ধর্মেও আছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তো বন্দুকওয়ালারা আছেনই। তারা কী করছেন? তারা দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতাদের ঠেকানোর নামে পুরোদেশকে রাজনীতিশূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের ভেতর সৎ-অসৎ ব্যবসায়ীর হিসাব কষতে গিয়ে অর্থনীতির প্রধান শক্তিকে অকেজো করে দিচ্ছেন। অতএব রাজনীতি সচেতনতার কারণেই আমি এদের কাছে নালিশ বা আবেদন জানাতে পারি না। তারা নিজেরাই স্বচ্ছ নন। আপনার নিশ্চয় মনে আছে বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর যখন ঘৃণিত হামলা চালানো হলো সেদিন তাৎক্ষণিক তাকে নিয়ে সাহিত্য সাময়িকী সংখ্যাটি করতে গিয়ে সম্পাদকীয় নোটে উলে-খ করেছিলাম, ‘অন্ধকারের বিষধর সাপ রক্তের হুলিখেলা বড় বেশি ভালোবাসে, ভালোবাসুক Ñ তবু অসুন্দরের কাছে কোনো নালিশ নয় আজ। চাই না দয়া-দাক্ষিণ্য। বাংলাদেশের অসুস্থ-ভঙ্গুর রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে ভাষাবিজ্ঞানী, কবি হুমায়ুন আজাদের জন্য কোনো নালিশ বা কোনো ধরণের প্রার্থনা জানাতে চাই না। আমাদের আছে কেবল ঘৃণা Ñ অহংবোধ আর দম্ভের বিরুদ্ধে ঘৃণা। যদি জেগে উঠে কোনো দিন এই দেশ, এই কাল, আর কোনোদিন যদি আসে কোনো নতুন পাখি Ñ নতুন ভৈরবী নিয়ে, তার জন্য তোলা রইলো বিচারের আরজিপত্র।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে বদরুদ্দিন ওমরের একটি কথা স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছেনÑ যুদ্ধাপরাধী মীমাংসিত একটি বিষয়। বর্তমান সময়ে যারা যুদ্ধাপরাধী কে বা কারা তা নিয়ে হৈ চৈ করছেন তারা দৃষ্টিকে অন্যতর দিকে নিবদ্ধ করতে প্রয়াসী।
আমাদের বুঝতে হবেÑ ভালো-মন্দ যাই হোক স্বচ্ছ রাজনীতি দিয়েই অসৎ রাজনীতিকে ঠেকাতে হবে। এর বিকল্প কখনই বন্দুকের নল হতে পারে না।
আমার কবিতায় রাজনীতি সচেতনতা আছে। তবে সেটা কোন রাজনীতি, রাষ্ট্রের জন্য না দলের জন্য। একজন প্রকৃত কবিকে যদিও রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয় তথাপি একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রের আকাঙ্খা, মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষের ভেতরকার ক্রোধ নিবারণ এবং সহনশীল মানসিকতার চাষ করতে প্রয়াসী হওয়া একজন সত্যিকার কবির কাজ। এ পথে অগ্রসর হতে হয় ধীর লয়ে।
আপনি প্রায়ই বলেন লেখ্যচিন্তার সঙ্গে ব্যক্তিচরিত্রের মিল থাকতে হবে। আমরা যা বলি বা ভাবি তা কি লালন করি?
করা উচিৎ। নিদেনপক্ষে চেষ্টা থাকতে হবে। এটা হলো নুন্যতম মনুষ্যচরিত্র। দ্বৈতচরিত্র দু’মুখো সাপের মতো। তার বর্জ্যরে দুর্গন্ধ নিয়ে সে চিন্তিত নয়। এধরণের লোক সবসময় কলহ নিয়েই ব্যস্ত বিধায় তাদের মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা নেই।
আপনার সম্পাদিত ভূমিজ-এ উলে-খ করেছিলেন Ñ চিন্তার ঐক্য চাই। বিশেষ করে পৃথিবীর বিভিনড়ব জায়গায় বাঙালি লেখদের চিন্তার সমন্বয়ের প্রতি জোর দিয়েছেন। প্রশড়ব হচ্ছে চিন্তার ঐক্য কখনও কি সম্ভব?
কেন নয়, রাষ্ট্রের অবকাঠামো কি চিন্তার ঐক্য নয়? আমাদের বিভিনড়ব উৎসব-পর্ব-ঈদ এগুলো কি? এই যে আপনারা ত্রয়ীসম্পাদক মিলে শব্দপাঠ বের করেন এটাতো আপনাদের চিন্তার সমন্বয়। এই বিষয়কেই আমি আরও বৃহৎ-অর্থে বলার চেষ্টা করেছিলাম। মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যেনো আমরা একই গ্রন্থিতে দাঁড়াতে পারি।
ছোটকাগজে ‘পাণ্ডুলিপি’ বের করার ধারণা খুব বেশি দিনের নয়। এখন তো যত্রতত্র। পাণ্ডুলিপি হিসেবে ‘বিমূর্ত চরণে রাখি কালের ক্ষমা’ অনেক দেরিতে বের হয়েছে। গ্রন্থাকারে কবে দেখতে পাবো?
‘বিমূর্ত চরণে রাখি কালের ক্ষমা’ পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারও অনেক মূর্ত-বিমূর্ত কারণও রয়েছে। সেদিকে আর নাই বা গেলাম। এটা আগামী দিনের জন্য সঞ্চিত-অভিজ্ঞতা হিসেবে তোলা থাক। গ্রন্থের পূর্বে পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অর্থই হলো পাঠককে আলোচনার সুযোগ করে দেয়া। বিচক্ষক সমালোচকই পারেন একজন লেখকের অপূর্ণতাকে ধরিয়ে দিতে। ‘বিমূর্ত চরণে রাখি কালের ক্ষমা’পাণ্ডুলিপির উপর আলোচনা হয়েছে/হচ্ছে। এর জন্যই অপেক্ষা করা ...। গ্রন্থের জন্য আমার কোনো তাড়া নেই।
এখানে, এই প্রবাসে বাঙালিদের মধ্যে আপনার প্রিয় কবি কে?
সিনেমার নায়ক/নায়িকাদের যেভাবে প্রশড়ব করা হয়, আপনার প্রিয় অভিনেতা/অভিনেত্রী কে অনেকটা সেরকম হয়ে গেল না? বলতে পারতেন কার কার কবিতা ভাবায় বেশি। না আমার কোনো প্রিয় কবি নেই। প্রিয় কবি হতে হলে তার সবকটা কবিতাই ভালো লাগতে হবে। দেখা গেছে আপনার কবিতা যখন পড়ি তখন অনেক অংশই ভালো লাগে না। কিন্তু এর একটি শব্দ কিংবা অপূর্ণ একটি বাক্য হঠাৎ ঝলসে উঠেছে Ñ ঐ জায়গাটাই আমার ভালোলাগার জায়গা। ঐ ভালোলাগাকে আমি নিজের সঙ্গে সারাদিন বিভিনড়বভাবে ব্যাখ্যা করি। আবার যে কবিতাটির চিন্তাভাবনা একটি জায়গায় এসে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় তার সঙ্গে আমি বসবাস করতে পারি না।
আহমদ ময়েজ-এর ‘বিমূর্ত চরণে রাখি কালের ক্ষমা’র পাণ্ডুলিপি থেকে নির্বাচিত কবিতা
দূরগামী
উঠানভর্তি সূতানলি
কৌটা কৌটা নীল বিষ
আকণ্ঠ পান শেষে
গুড়ারোদ চাষ করে চৈতি খরা।
সরাও পথের কাঁটা
বহুদূর দেখিবারে চাই।
তোমাদের দিন শেষ-ক্ষীণ এক শব্দ শুনি
ভেঙে পড়ে নদী আইল
মাতম মাতম করে উপচে পড়ে
সোমত্ত বয়স।
আঁধার জড়িয়ে রাখে রাতের কপাট
আন্ধা প্রকোষ্ঠ চিরে স্বপড়বরা জেগে ওঠে
পুষ্পিত আত্মার চারুবাক।
তখন স্পর্শ শেষে নিমগড়ব শরীর
উগরে দেয় জলের দাপট।
কারো কারো ধ্যান ভাঙে Ñ
ধাঙর হাওয়ার ঘ্রাণে;
আমি তো ঘুমের ভেতর জেগে রই
আগত দিনের টানে।
বৃক্ষের গুরু
মনভৃঙ্গার চরণ ধুয়ে কী স্বাদ পেয়েছো তুমি
এ পথ আমার নয়
অচেনা।
অগাধ ভজন-স্তুতি কোন পাত্র ধরিবে বলো?
কখনও বৃন্দাবন কখনও রসুল
দুই হস্ত ধরেছে শরাব Ñ দৃষ্টির অতল সাগর।
চাণক্য-পথিক যে-জন সেও জানে, বাতিঘর কোনখানে
কার স্পর্শে বলো অযামিনী পেয়েছিল মানবজীবন?
সারল্য কিনেছে ঝুড়ি, ফলহীন বৃক্ষের খোলস।
নমশূদ্র আমি তোমার সন্তান
হে পিতা
একবার শুধু কও, নদী কেন এতো বাঁক নেয়?
সৃষ্টির অহং যার সে নয় বন্ধু আমার
প্রার্থনা শুধু জানিবার।
যে বালি নিজেই একা শুয়ে রয়, উদাস করে শূন্য উদ্যান
কেন আর শঙ্কা দিয়ে করো তার ভীতির সঞ্চার।
জগৎ পিতা সে যদি তোমারই হয়
তবে আর হাস্য করে কার লাগি তাম্বুল যোগাও!
দেহজ বন্দর ঘুরে পঞ্চঘোর খুলে দাও
স্তনের চাবি সে তো নাভিমূল-
বলেছিল বৃক্ষের গুরু।
পথের অসুখ ...
আমি তো আজন্ম সই পথে পথে ঘুরি। বাঁধি গান
সড়বাত হই। ফেরার আশায় দেহজ নৌকা বানাই
শব্দফেরি শেষ হলে বিনম্র ধ্যানে অঙ্গ মাড়াই
এই কাঙাল শরীরে আজও তাম্র মাটির টান
ধ্যানী মানুষের রক্তস্রোত উতাল করিয়া তোলে
ধ্বনির গীতল হাওয়ায় উতরোল নিঃশ্বাস
মনোজ কপাট ভাঙে আচানক, মায়ার বিশ্বাস
দু’হাত বাঁধে। এলাচি-বাদাম দোর খুলে Ñ
সহসা হেসে ওঠে। এ-কোন সর্বনাশী চিরে বুক
এ-কম্পন থেমে গেলে চোখের ভাষায় শব্দ ফোটে
কী মায়া লুকিয়ে রাখো এই পথে? পথের অসুখ
যারে পায়, তার কি কপালে আর মায়াঘর জোটে?
নিম গাছ ঠিকানা জানি, ঐখানে ছিল এক ঘর
ও মন কীসের টানে ভাসো দূর চাড়াল নগর।
মেঘের পোয়াতি মেয়ে
মেঘের পোয়াতি মেয়ে বর্ষা
তাহার বিচরণভূমি অরণ্যনগর
কেউ তাকে বধ করো না, রাঙিয়ো না চোখ
সে আমার গহন, মেঘদূত
মেঘের বার্তাবাহক সকল কোমের।
এতো কানড়বা বুকে নিয়ে ভরসায় হাঁটে ...
ধুলার পৃথিবী পায় চরণ-নূপুর
সিড়বগ্ধ শরীরে খেলে বীজগান
ভরাট মাটির গন্ধ
সরিষাদানার গন্ধ
মেঘবতী রচনা করে অসংখ্য পায়ের আওয়াজ।
জোড়া-জোড়া পা
লক্ষ কোটি পা
মন্ত্রমুগ্ধ করে বেড়ে ওঠে
আমাদের ঘরে।
মেঘের শরীরে আজ জ্যোৎসড়বা-প্লাবন
শৈত্যপ্রবাহ-দিনে বর্ষা ঘুমায় চাঁদ ও তারার দেশে।
ক্রুদ্ধ বাতাস
কেউ কি জানে কোথায় হারিয়েছে এই পথ
পথের অন্ধকারে অগিড়ববিষ রুয়ে দিলে
মৃত্যুর নীরবতা পান করে পাখির নিঃশ্বাস
পিপাসায় ক্ষীণ আজ অরণ্য-প্রাচীন।
একদা জেনেছি খুব Ñ
প্রান্তের রেখা ধরে ঘোড়াটি মিলিয়ে যাবে
সে কি ছিল কালের বাহন, নিয়ে যাবে বাড়ির পথে?
তারও যে পিপাসা বাড়ে, পিপাসায় আয়ু মরে
মিথ্যার চাদরে ঢাকে ধুলার কেশর।
একদা জেনেছি খুব, রক্তই ফিরিয়ে দেবে রক্তের দাম
রক্ত কি মানুষের ঠিকানা দেবে, এই বলে
কেউ কেউ সনড়ব্যাসী হয়।
আমাকে সনড়ব্যাস করো না হে কালের বাহন
ক্রোধের আগুনে আমি মরিতে চাহি না;
মানুষ বিনাশী বড়
বিনাশের মাল্য কিনে সাম্রাজ্য বাড়ায়
জল ও মৃত্তিকায় চির ধরে
রাতের অন্ধকারে উড়ে যায় বালিহাঁস,
ঠিকানার খোঁজে ...
একদা জেনেছি এও, প্রাণের বিনাশ নেই
দীর্ঘ ঘুমের শেষে ফিরে আসে অনন্ত ধারায়
আগুনের খোলে আজ এ কেমন স্বপড়ব ঘুমায়
অগিড়ববিষ জড়িয়ে রাখে রাতের ডানায়
হায় রে সময় Ñ
ডানাভরা আগুন নিয়ে মৃত্যুর ঠিকানা খোঁজে ক্রুদ্ধ বাতাস ...
ক্ষয়িষ্ণু সময়
তিনতক্তা চিনিলা মরম, আমি নাই
আমার গলই খায় মরুর ছত্রাক
নিরাগ মানুষ আমি ভজন শোনাই
অবেলায় ফুটে রই রাতের মন্দ্রাক।
গৈরিক আকাশ নামে কলবের পারে
এখানে প্রাখর্য নেই : রুহের তাগিদ
ফতুয়া খুলেছি কবে সেতারের তারে
আনকোরা হাত ছোঁয় হইতে আবিদ।
ঘুণপোকা বাসা বাধে মগজের কোষে
মগজ খুবলে খায় ক্ষয়িষ্ণু সময়
বিবাদে রক্ত ঝরায় মানুষ ও মোষে
ভাসানে তুলিয়া দেই খোদার প্রণয়।
যতো দূর সরে যাই পেরিয়ে আঁধার
অগাধ চৈতন্য আনে গার্হস্থ্যবিদ্যার।
সনাতন
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ঢেউ বাড়ে, ঢেউয়ের কাহিনী তুমি লিখে রাখো
গাঙ-ঢেউ-বিল-ঢেউ পাহাড় শিথান করে সমুদ্র দেখো
গাঙচিল তোমারে দেখে, তখন গল্প শুরু :
এমত প্রারম্ভকালে শেষটুকু লিখে রাখো ...
Ñ কী করে জানলে এসব
জলের ভাসানে ভাসে বেহুলার ভেলা
তাহার দরদ লিখে প্রকৃতি-মানুষ
উজানে সরোদ নেই, গীত নেই ধুলার হাওয়া
এ নিয়ে রচিবে কেবা সাতভাই চম্পা আর পারুল-কাহন
ধান-দুব্বা তুলে রাখে জননী আমার
টঙঘরে তোলা রয় লাঙল পিতার
এসব উজানে নেই, খড়কুটা মাথায় বাঁধে উজানি ছাওয়াল
কচি-মুখ ম্লান দেখে তারে কিছু দয়া করে দিনের মজুর
রোজ আনে রোজ খাটে
তাই নিয়ে সওদা করে উজানের ঘাটে।
ভাটির জলের টানে পঞ্চ-কথা লেখা রয়;
মানুষ তোবায় এসব তরুমনে Ñ তরুমন গোপনে বাড়ে
এসব কি রচিবার কথা, বপিত রয়েছে যাহা আদিম পুরাণে?
কেউ কেউ বিছরাইয়া মরে, চোখে গেঁথে নতুন ভাষা
মিথ্যা মাদুলি কি চিনিতে পারে রুহের কম্পন?
কী করে নাগ পোষে কামরূপ-নারী?
ভেদ ও রাগিনী যার ইন্দ্রিয় শে-াক
এসব মরমকথা নিয়ত বাড়ে আগুনকোণা গ্রামে
এসব রূপকথা পাচার হয় বহু দূর উজানে উজানে
ভাটি আর ভাটি নেই, দিন দিন উজানই বাড়ে
সনাতন মাঝি : বাস্তুভিটা ছেড়ে আরও ভাটিতে নামে।
কমলা-কমলা ভোরের মানুষ
দৈব-দয়ায় ভালোবেসেছিলে, দিয়েছিলে দূরপাহাড়ের গল্প
ঢালুপথে অন্ধকার ঘাসটুকু আমার Ñ
বছরের তিনশ পয়ষট্টি ভোর তোমাকে দিলাম
আমি তো ভাঙ খেয়েছি Ñ এ নিয়ে আর ভান করো না
কিংবা তুকমার বিচির মতো ভিজিয়ো না ফণিমনসার মন;
কাঁটাভরা অঙ্গ নিয়ে জীবন গেলো
তবু তারে ভালোবাসে কমলা-কমলা ভোরের মানুষ
আস্তিক মনুষ্যপ্রদীপ
এ কোন ভাষায় তুমি পূনর্বার আরক্ত করো
এ কোন মধ্যরাতে ঘুঘুর ডাক?
পাখিদের ভাষা আমি বুঝি, তুলে আনি নয়নকুঞ্জে
চৈতন্যের কোলাহলে একটি ধ্বনির গুম্বিরা তোমার নগড়বতাকে ঢেকে দিতে পারে
এক ব্রতচারীর ওম-তাপে একদিন পৃথিবী নামক গ্রহটির অস্তিত্ব অনুভব করি
তখন ধ্বনির গুঞ্জনে
চারদিক আলোকিত করে
আমার শৈশবের উঠোনজুড়ে ফুটেছিল অসংখ্য মনুষ্যপ্রদীপ
এভাবে মানুষের গুল্মের ভেতর পার হয় অখণ্ড সময়
একদিন অনুভব করি আমার বামপাশের একটি হাড় খসে গিয়ে
নাই হয়ে যায়
হাওয়ার জন্য আদমের এ কেমন রোদন, বিষণড়ব নিনাদ
আমি জানি না।
শুধু জানি চন্দ্রধূলা বুকে নিয়ে নিমাই সনড়ব্যাস
নাভির চাক্কি কুণ্ডলে হাত রেখে অনুভব করে
আস্তিক মনুষ্যপ্রদীপ
আস্তিক মনুষ্যপ্রদীপ
আস্তিক মনুষ্যপ্রদীপ।
সোহিনীর কণ্ঠে শোনা ভয়হীন প্রার্থনাগীত
জলদ গম্ভীর এক ফেরারি আত্মা প্রশড়ববাণে বিদ্ধ হলে
পারুবনে উড়ে আসে ভাঁজহীন তুলসিপত্র
আমরা পড়তে পারি না, আমাদের চোখ খুবলে খায়
দখিনের খবিস হাওয়া।
পথের দাগ মুছে দিতে উদ্যত নগড়ব সময়।
সহসা খুলে যাও উজ্জ্বল দিন
বোয়ামে তুলে রাখি মুঠিভরা চাঁদনী আলো;
কাল ফেরি হবে বাদুড়পাড়ায়।
দায়হীন সঙ্গ আর চাই না Ñ এই বলে অন্ধকার দিয়েছি ঠেলে,
জাফপাথরের ক্লেদ কী করে দেবে সখি
আমাদের সূর্যের দিন?
পেলব স্তুতি শোনে ক্লান্ত পথিক
এবে বলি, দায়হীন শব্দের ফেনা
তারচে অনেক ভালো, সোহিনীর কণ্ঠে শোনা
ভয়হীন প্রার্থনাগীত।
নগর ও সন্তান
শীতের চা গরম ভোর, একটি ফ্যাকাসে নোট ধরিয়ে দিয়ে বললে Ñ
শেক্সপিয়ারের এই পুরাণ নগরীতে আমরা ক-দিনের অতিথিমাত্র
এই বেহায়া নগরী ছেড়ে আমরা একদিন চলে যাবো।
অথচ ঋভু এই নগরটিকে ভালোবাসে
তাশমিত এর আদলে একটি পিরামিড বানাবার স্বপড়ব দেখে
ওরা আমাদেরই সন্তান
এই জনপথ আমাদেরও স্বপড়ব বোনে।
স্মৃতির বয়ান
কোলাহল থেমে গেলে পাতার শব্দ শুনি
পায়ে পায়ে শুকনো পাতা হেঁটে যায়
এমন চাতাল সময় কার লাগি চরণ বোনো
ধ্রুপদী মেঘের প্রার্থনা শেষে
কোনো এক রমণীয় হাত
বাতাসেই লিখে রাখে স্মৃতির বয়ান
স্মৃতিরা বিন্যাস হয় মাঠময়
ফুটে রয় ঘাসফুল
নাকফুল দিইনি বলে
কালের সাক্ষী থাকো বনের ঘুঘু
আজীবন রোদন ঝরুক বনজ গৃহে
চন্দ্রলেখা দিন ও বিরতির কোলাহল
ক.
আহারে লক্ষ্মী মায়া, কেঁদো না
বিধৌত বনভূমি : চিকন হয়ে নেমে আসে পায়রার ধ্বনি।
করকমল শান্ত করো
ছারপোকাদের কলহে আজ তক্তপোষ ভারাক্রান্ত।
যে-জল উপচে পড়ে নিজেই গড়ায়
সে-জল তোমার নয়, পথের কণ্টক।
ভৈরবরাগিনী শেষে Ñ
চন্দ্রলেখা-দিন পাঠ করে কামিনীর বন
তোমার চরণযুগল সড়বাত হোক শিশিরদানায়।
যে-জন দিবস জানে
তার কি ভয় ধরে, বিদগ্ধ সময়?
দুর্জন কেবলই হল্লা করে : আফিমের টান।
চপল হাওয়ার ঘ্রাণে সুখ চায় Ñ ক্লান্ত বাটামুখ
স্পর্শ হয়নি আজও, ধর্মের সুখ।
খ.
পাণ্ডুলিপি গুটিয়ে রয় মেঘভার বক্ষ নিয়ে
অবিন্যস্ত অক্ষরগুলো পারদদানার সাথে মিশে যায়
পলকহীন দৃষ্টি আজ বলে ওঠে Ñ
ওগো মেঘ আর কাঁদায়ো না তারে।
ক্লেদ ও ঘৃণার ভার
দু-পায়ে মাড়িয়ে হাঁটা Ñ জিরোবার ঠাঁই নেই কোনো
এই ব্রহ্মসভায় তুমি চিরদিন একা
মধ্যপথে যাত্রাবিরতির কোলাহল
ঝরাপালকের মতো শুয়ে থাক।
বুকের ভেতর নড়ে ওঠে চৈতী পারু
স্রোতের চিহ্নটুকু মনে রেখো
এ পথ তুলে দেবে জারি-মানুষের গান Ñ
যে পায়ে লেগে রয় পাতার সঙ্গীত।
সাগিড়বক পুরুষ বলে আল্পথ সমানে ভাঙ্গি।
চৈতী কি দহনের কাল?
পারুদের টুপাভাত গন্ধ ছড়ায়
পুটিমাছ ধরব বলে আমরাও গেয়েছিলাম
জলের সঙ্গীত
দলবাঁধা সখিগান মিইয়ে যায়
পুবের বেতগোটা বনে
কে ভেঙেছিল দোয়েলের বাসা
আমি নই।
আমাদের রোদনটুকু মিইয়ে যায়
দোয়েল-মায়ের সকরুণ ডাকে।
বৈতল দিনের ডাক মনে রেখো
এই পথ তুলে দেবে রাগীদুপুরের কষাঘাত
যে-পায়ে লেগে রয় ধূলাভর্তি সর্ষের মাঠ।
কাঁটাভর্তি নায়ের পেট
টাকি মাছের লম্ফঝম্প, নিয়ে যাই দূরের গঞ্জে
তখনও ভাঙেনি হাট
জোনাকজ্বলা সন্ধ্যায় বাড়ি এলে
বুকের ভেতর নড়ে ওঠে চৈতী-পারু
তাহাদের স্বপড়বটুকু লিখে রাখি
অকাল বেলায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804657 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804657 2008-05-31 01:30:33
নীলিম করকা :আইয়ুব আহমেদ দুলাল
নীলিম করকা

(১)
পুরানো ঢাকার রাস্তায় এতো জ্যাম সিহাব রিক্সায় বসে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে গেছে। কিছুক্ষন পর পর রিক্সা একটু এগিয়ে যায় আবার দাঁড়িয়ে থাকে অনেক সময় ধরে। পাশেই একটি ঘোড়ার গাড়ী। পুরানো ঢাকার ঐতিহ্য ঐ ঘোড়ার গাড়ী। তবে বর্তমানে রাস্তায় গুটিকয়েক দেখা যায়। ঘোড়াগুলোও পুরানো। জরাজীর্ন, রোগাক্রান্ত। সিহাব দেখল ঘোড়ার গাড়ীতে চলমান দুইটি ঘোড়ার মধ্যে একটি হাড্ডিসার, আরেকটি মোটামুটি নাদুস-নুদুস ও পরিচ্ছন্ন। পিছনে এক গুচ্ছ লেজ, বেশ ভালই দেখাচ্ছিল।
‘ বাহ্, ঘোড়াটার লেজতো বেশ সুন্দর ! - সিহাব বলল।
‘ হ ভাই, এমন সুন্দর ঘোড়া পুরান ঢাহায় অহন আর নজরে পড়ে না। যেইগুলো আছে হেইগুলো দ্যাখ্লে মনে অয় সোমালিয়াত্তন আইছে। - রিক্সাচালক বলল।
সিহাবের খুব হাসি পেল।
‘ তুমি আবার সোমালিয়া চেনো নাকি ?
‘ চিনুম না ক্যান ? ঐ দ্যাশে অহন দুর্ভিক্ষ ছলতিছে, টিভিতে দেহিছি। অভাবী মানুষগুলাইন কত কষ্টে আছে! দেখ্লে মনে অয় হ্যারা পিথিবীর বাইরে অন্য কোনহানে বাস করে।
‘ কেন, তোমার এমন মনে হয় কেন ?
‘ হুনেন ভাই, পিথিবীতে থাকলে তো কেউ না কেউ তাগরে দেখ্তো।
‘ অবশ্যই দেখে, কেউ না কেউ তো দ্যাখে।
‘ দ্যাহে না ভাই, দ্যাহে না, বুঝাই যায়। এই দুন্যেত কেউ কারোরে দেহে না। সবাই যার যার ধান্দায় থাহে।
‘ কে বলল তোমাকে ? মানুষইতো মানুষের জন্যে।
‘ ভাই, ঐ কথাগুলাইন আম্নেগ বইয়ের ভিত্তে রাহেন। মানুষ যদি মাইনষের লাইগাই অইতো তাইলে বুশ খান্কির পোলায় সাদ্দামের গোয়ায় বাঁশ না দিয়া ঐ অভাবী মানুষগুলার মাথার উপর বাঁশের মাছা’তো বানাইয়া দিবার পারে। পারে না কন্ ?
‘ হ্যা পারে। কিন্তু মাঁচায় থাকলে হবে, খাওয়া লাগবে না ? খাবার দেবে কে ?
‘ ক্যা, ব্লেয়ার ছোদানীর পোলায় কী করবো ? হ্যায় দিতে পারবো না ?
রিক্সাচালকের কথা শুনে অবাক হল সিহাব। একজন খেটে খাওয়া লোক। রিক্সাচালনা যার পেশা। সারাদিন সে ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে সংসারের ব্যয়ভাব যোগান দেয়। তার চিন্তাধারা রিক্সা আর সংসার এই দুইয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। তারওতো সংসারে অভাব কম নয়। অথচ তার চিন্তাশক্তি ছড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। একেই বলে মনুষ্যত্ব। প্রকৃত অর্থে যাদের থাকা উচিত তাদের নেই কেন? এটা সকলেরই প্রশ্ন। রিক্সাওলার অকপট প্রকাশ ভঙ্গিতে সিহাব তখনো মিটিমিটি হাসছিল।
জ্যাম একটু হাল্কা হওয়া মাত্র আইল্যান্ড থেকে একসারি সরে গিয়ে দুই তিনটা রিক্সা ওভারটেক করে এগিয়ে গেল ঐ ঘোড়ার পাড়ীটি। ফলে সিহাব ঐ গাড়ী থেকে আরো দুইতিনটা রিক্সার পিছনে পড়ে গেল।
এক পর্যায়ে যানজটের মধ্যে রিক্সার ফাঁক দিয়ে ঐ পরিচ্ছন্ন ঘোড়াটির লেজ তার নজরে পড়ল। তার কাছে বেশ ভালই লাগছিল। যানযট পুনরায় কিছুটা হাল্কা হলে রিক্সাচালক সুযোগ বুঝে ফাঁকফোকড় পেরিয়ে চার-পাঁটটা রিক্সা পিছনে ফেলে সামনে চলে গেল। সিহাব ব্যাপারটা বেশ এন্জয় করল। পিকুলিয়র টাইপের রিক্সাচালক। ভালমন্দ নানান কথা তার মুখে শোভা পাচ্ছিল। হঠাৎ সে পিছন ফিরে সিহাবের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘ভাই, এই দ্যাহেন ঘোড়ার লেজ।
সিহাব ফিরে তাকাল। লক্ষ্য করল ঐ ঘোড়ার লেজের দিকে। কিন্তু হায়! তাকিয়ে দেখে ওটা ঘোড়া নয়, একজন রূপসী রমনী। তার চুলগুলো ঐ ঘোড়ার লেজের মতই। পার্থক্য করা কঠিন। খুব আপসোস হল। মনে প্রশ্ন জাগলো- কেন মেয়েরা নিজেদের চুলগুলোকে রাঙিয়ে ঘোড়ার লেজের মত করে ফেলে। কেমন দেখায়! রাঙানো ঐ চুলগুলোকে কী রঙে প্রকাশ করা যায়! বাংলায় বললে বাদামী আর ইংরেজীতে ব্রাউন, মেহেদী কালারও বলা যায়, তবে গোবরে কালার বললে পারফেক্ট হয়। যেভাবেই বলা হোক না কেন, আসলে কেমন দেখায় ? মেহেদী লাগিয়ে চুলের প্রকৃত রংটাকে পরিবর্তন করে ফেলে। সে ক্ষেত্রে সাদা চুলটাকে ভাল মানায়, বিশেষ করে বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের পাকা চুল।
মুসলমানদের জন্যে মেহেদী ব্যবহার করা একটা উত্তম কাজ। তবে শরীরের বিশেষ কয়েকটি স্থানে, যেখানে ব্যবহার করলে আদব কায়দা ও পবিত্রতা ঠিক থাকবে। হয়ত কোথাও লেখা নেই, তবুও সুন্নত বললে বোধহয় ভুল হবে না এবং ওয়াজে হুজুরদের মুখে সুন্নত হিসাবেই বলতে শুনেছি। কারণ নবী করিম (সঃ) দাঁড়িতে ও চুলে মেহেদী ব্যবহার করেছিলেন। সেই হিসাবে আমরাও ব্যবহার করতে পারি। তবে কালো চুলে বা কালো দাঁড়িতে ব্যবহার করলে তেমন একটা বুঝা যায় না। সাদা হলেই ভাল দেখায়। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান যুগের মেয়েরা পবিত্রতা রক্ষা করে মেহেদী ব্যবহার করেনা। তারা ব্যবহার করে ওয়েষ্টার্ন ষ্টাইল হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করার জন্যে। অর্থাৎ আধুনিক হওয়ার অপচেষ্টা মাত্র। তাই তারা চুলে, হাতে, এমনকি পায়েও মেহেদী ব্যবহার করে থাকে। মুলতঃ পায়ে মেহেদী ব্যবহার করা মোটেই উচিত নয়। এটা কমনসেন্সের বিষয়। যা নবী করিম (সঃ) এর দাঁড়িতে শোভা পেয়েছিল, তা কীভাবে মুসলিম উম্মার পায়ে স্থান পায় বোধগম্য নয়।
শোনা যায়, প্রকৃতির অবদান কালো চুলে যদি মেহেদীর রঙটা ফুটে না ওঠে তাহলে বিউটি পারলারে ব্যবহৃত হয় ¯িপরিট জাতীয় এক ধরনের কেমিক্যাল। যা চুলে লাগানো মাত্রই ধোঁয়া উঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশ করে ফেলে। অর্থাৎ চুলের প্রকৃত কালারটাকে পুঁড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর ব্যবহার করে এক ধরনের রঙ। সেই রঙ দিয়েই সাজে বিভিন্ন স্টাইলে। পরনের পোশাক যদি হয় লাল তাহলে মেচিং করে চুলের রঙটা করা হয় লালসে। যদি নীল হয় তাহলে চুলের রঙ নীলসে করা হয়। ব্রাউন কালার সব পোশাকের সঙ্গেই চালিয়ে নিতে হয়, কিছুই করার থাকে না। কারণ ওটা ফিক্সড কালার। সেক্ষেত্রে প্রকৃত রঙ কালো আর থাকে না।
পশ্চিমা দেশের মেয়েদের চুল বাদামী, চেহারা সাদা। মানে- ত্বক লালসে কিংবা দুধে আলতা অথবা সাদাও বলা যায়। প্রকৃতিগতভাবেই এর উৎপত্তি। তাদের পোশাক-আশাক কৃষ্টি-কালসার সেই রকম। বাদামী চুল ও খোলামেলা পোশাক তাদেরই মানায়। বাঙালী মেয়েরা যদি কৃত্রিম ভাবে ঐ বেস ধারন করে তাহলে কতটুকু মানানসই হয়, একটু বিবেক খরচা করলেই বোঝা যায়। তাছাড়া ফর্সা মেয়েরা যদি চুল লালসে বানাতে পাটা-পুতার সহায়তা নিয়ে সাজুগুজু করে তাহলে মোটামুটি ভালই দেখায়। কিন্তু পাইকারী হারে যদি সবাই ঐ বেস গ্রহন করে বা অফর্সা ত্বকের মেয়েরাও যদি ঐ বেস নেয় তাহলে কেমন দেখায় ? মূলতঃ অনিজিনালের কোন বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে নিগ্রোরাই নিশ্চিন্ত।
বড় বিচিত্র আমাদের দেশের নারীরা। তারা স্বাধীনতা চায়। পশ্চিমা দেশের পোশাকে সুন্দরী প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়। এ কেমন সুন্দরী ? যে যত খোলামেলা ও স্বল্প পোশাক পরিধান করে উম্মুক্ত মঞ্চে নিজের দেহকে প্রদর্শন করবে সেইই নাকি সুন্দরী। সব অবিচার মেনে নিচ্ছি আমরা। অথচ এই নারীদের মর্যাদা অনেক। সব ধর্মই নারীকে মর্যাদার আসন দিয়েছে। একজন নারীই হচ্ছেন মা, বোন, প্রেমিকা, স্ত্রী অথবা মেয়ে। মেয়েরা হচ্ছে পুরুষের অঙ্গ থেকে তৈরী। তাদের স্থান পুরুষের হৃদয়ে, হৃদপিন্ড জুড়ে। হৃদয়ের ঐ সিংহাসনটা একজন নারীর জন্যে নির্মিত। নারী হচ্ছে পুরুষের প্রেরণা। একজন পুরুষের জীবনে কোন বিশেষ নারীর আবির্ভাব না ঘটলেও একজন মায়ের আবির্ভাবতো ঘটেই। কারণ তিনিও একজন নারী। মায়ের প্রেরনাই প্রথম। সুতরাং নারী ছাড়া পুরুষ অচল। তাইতো যুগে যুগে এই পৃথিবী জুড়ে কবি, সাহিত্যিকরা যতটুকুই অবদান রেখে গেছেন তার সবটুকুই ঐ নারী বা মেয়েদের নিয়ে। অথচ ক’জন নারী আছেন যারা পুরুষদের নিয়ে কাব্য বা সাহিত্যচর্চা করেছেন ? হ্যা করেছেন, তবে সেটা পুরুষ প্রজাতি থেকে মুক্তি চেয়ে, স্বাধীনতা চেয়ে। অথচ তারা একটুও অনুভব করেন না যে, একজন পুরুষের যেমন নারী প্রয়োজন তেমনি নারীর জন্যও পুরুষ প্রয়োজন। একজন পুরুষ ব্যতিত কোন নারী নারীই নয়। পুরুষ আছে বলেই নারীদের এতো মূল্যায়ন। পুরুষ আছে বলেই নারীরা তাকে ভালবাসার লোভ দেখিয়ে ভেড়া বানিয়ে মজা নেওয়ার সুযোগ পায়। যেন কিচ্ছু বোঝে না।
ঘুরে ফিরে সিহাবের ঐ একই আপসোস। মেয়েদের চুল কেন ঘোড়ার লেজের মতো ? কালোর মাঝে খারাবী কোথায় ? এক সময় এই চুলকেই কালো করার জন্যে মেয়েরা সাধনা করতো। চুলের যতেœ বিভোর থাকতো। লম্বা ঘন কালো চুলের জন্য বান্ধবীদের মাঝে প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যেতো। লম্বা চুলো বান্ধবীকে দেখলে অন্য বান্ধবীরা হিংসা করতো। ঘন কালো কেশের নিমিত্তে প্রচার মাধ্যমগুলোতে বেশী বেশী বিজ্ঞাপন প্রচার হত। বিভিন্ন ধরনের প্রসেস ও তেলের বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। সেসব বিজ্ঞাপনে মেয়েদের জন্যে লোভনীয় বিষয় ছিল ‘ঘন কালো কেশ’। সেই কেশ নিয়েই শিল্পীরা গেয়েছেন বিভিন্ন গান- মেঘ কালো আঁধার কালো, আর যে কলঙ্ক কালো------ তার চেয়ে কালো কন্যা তোমার মাথার চুল--- / তোমার কাজল কেশ ছড়ালে বলে এই রাত এতো মধুর --- / কবি লিখেছেন- চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা --- ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমানে মেয়েদের মান্কি কালার চুল নিয়ে কী লিখবেন বা কী গাইবেন বিশেষজ্ঞ শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকরাই ভাল জানেন। তবে নুতন করে কালো কেশ নিয়ে যদি কাব্য করা হয় তাহলে বর্তমানের সাথে তার তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যাবেনা। ফলে বিষয়টা হাস্যকর হয়ে যাবে। তবে বাঙালী মেয়েরা যতই মডার্ন হতে চাক্ না কেন- তা সবসময়ই বেমানান দেখাবে। কারণ বাঙালী নারীরা চিরকালই বার’হাত কাপড় আর ঘন কালো কেশেই মানানসই।
(২)
অফিস থেকে বেরিয়ে রিক্সার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিল সিহাব। একটি রিক্সাও যেতে রাজী হয়নি। বাবুবাজার থেকে ইসলামপুরের রাস্তাটি পুরোপুরি জ্যাম। ফাঁকফোকড় দিয়ে একটি মানবদেহ এগিয়ে যাবে সেই অবস্থাও নেই। রাস্তার পাশে শ্রমিকেরা কাপড়ের গাইট যত্রতত্রভাবে রেখেছে। রিক্সা-ভ্যান অথবা পিক-আপ ভ্যানে উঠানামা করছে। মাটির সাথে লাগোয়া ঠেলাগাড়ী তো আছেই। যাও একটু আধটু ফাঁকফোকড় রয়েছে তাতে রিক্সা ডুকিয়ে বানিয়ে রেখেছে ফাকাক্কা বাঁধ। কোন রকমে জ্যাম অতিক্রম করে সিহাব পাটুয়াটুলী হয়ে সদরঘাট মোড়ে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে গিয়েও গন্তব্যে পৌছার মত কোন যানবাহন পায়নি। গাড়ীর আওয়াজ আর রিক্সার টুংটাং শব্দে রীতিমত অতিষ্ট। ধুলোবালিতো আছেই। সিহাব নাকে রুমাল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষন পর পর টেম্পো আসলেও জায়গামত পৌঁছার আগেই ফুল হয়ে যায়। হঠাৎ সিহাবের লক্ষ্য স্থির হয়ে গেল। চেনা চেনা মনে হল মহিলাকে।
‘ খালাম্মা স্লামালিকুম, কেমন আছেন ?
‘ ভাল। কিন্তু ----
‘ চিনতে পারেন নি ! আমি সিহাব, গোপীবাগ আপনাদের বাসার কাছে--।
‘ ও হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। কেমন আছ বাবা ?
‘ জ্বি ভাল। এটা কে, স্বর্না নাহ্ ?
‘ হ্যাঁ।
‘ ওয়াও, বড় হয়ে গেছো ! কেমন আছ ?
‘ জ্বি ভাইয়া, ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন ?
ওরা খিলগাঁও যাবে। সিহাবের গন্তব্য গোপীবাগ। কিন্তু যাওয়ার মত কোন বাহন ছিলনা। স্বর্নাদের বাসা আগে গোপীবাগেই ছিল। ঠিক সিহাবদের পাশের ফ্ল্যাটে। প্রয়োজনের তাগিদে তারা বাসা পরিবর্তন করে চলে গেল খিলগাঁও তালতলা। অনেকদিন পর দেখা হল।
এবার সিহাব পড়ল আরেক ঝামেলায়। এতসময় ধরে একটা রিক্সাই পায়নি। এখন খুঁজছে দুইটা।
‘ খালাম্মা, কোথা থেকে এলেন ?
‘ বুলবুল ললিতকলা একাডেমী থেকে।
‘ ও, স্বর্না এখনো গান শিখছে ? ভাল, খুব ভাল। ধরে রাখতে পারলে একদিন কাজে লাগবে। এতো ধৈর্য্যইবা কয়জনের আছে। চালিয়ে যাও। ছেড়ো না, একদিন ইন্শাল্লাহ সফল হবে।
‘ তুমি কোন ক্লাসে পড় ?
‘ নাইনে।
‘ ভেরী গুড।

স্বর্না সিহাবের অনেক জুনিয়র। চোখের সামনেই বড় হয়েছে। কিন্তু বয়ঃসন্ধি ও বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে ওর চেহারা, চাহনী, গড়ন সব কিছুর মাঝে একটা পরিবর্তন এসেছে। যা খুবই আকর্ষনীয় এবং নজর কাড়ার মত। কিন্তু সেই একই অবস্থা। চুলগুলো রাঙা। একদম গোবরে কালার।
হঠাৎ গুলিস্থানের দিক থেকে একটা ট্যাম্পো এলো। একদম খালি। সিহাব বুঝে উঠার আগেই স্বর্না ও তার মা লাফিয়ে উঠে গেল। সিহাবকে একটু যুদ্ধ করেই উঠতে হয়েছে, কারণ ততক্ষনে যাত্রীদের গুতাগুতি শুরু হয়ে গেছে। ট্যাম্পো প্রায় ঘন্টাখানিক লাগিয়ে গুলিস্থান এসে পৌছাল। তারপর ওরা একটি রিক্সায় করে খিলগাঁও চলে গেল। যাওয়ার সময় সিহাবকে বাসার লোকেশন দিয়ে গেল।
সিহাব নিজেও গান গাইতো। তার টিচার ছিলেন ওস্তাদ আকতার সাদমানী। কিন্তু সেকথা তাদের বলেনি। সিহাব রিক্সায় চড়ে গোপীবাগের দিকে যেতে লাগল। হঠাৎ স্বর্নার ডাগর ডাগর চোখ এবং গালে টোল পড়া হাসি নজরে ভেসে উঠল। তার মনে পড়ল সেই গানটি যা সে গেয়েছিল তারই বান্ধবী, অর্থাৎ সিহাবের ছোট বোনের জম্মদিনে। তখন সে পড়তো ক্লাস সিক্সে- ‘আমার গানের মালা আমি করবো কারে দান’। স্বর্না যখন গান গাইছিল তখন সিহাব মাথাটা এগিয়ে দিল। সবাই হেসে উঠল। পরে হাসির জন্যে স্বর্না আর গাইতেই পারেনি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804650 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804650 2008-05-31 01:14:06
কি আশায় বাঁধা এ খেলাঘর : যুথিকা বড়ুয়া

শুধু অর্থ-বিত্ত-ঐশ্বর্য্যইে নয় পূর্ণ মান-মর্যাদায় সুখ-স্বাচ্ছন্দ ও আনন্দময় জীবন কে না চায়! আর তার জন্য আমাদের কত সাধনা, কত আরাধনা, কত বলিদান তার ইয়ত্তা নেই! কিন্তু তারপরেও সবার ভাগ্যে তা জোটেনা। বিশেষ করে যারা বলির পাঁঠার মতো নিজেকে বাজী রেখে দৈনন্দিন জীবনের সংঘর্ষে চরম ব্যর্থতায় নানা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে প্রতিটি মুহূর্ত্যে লাঞ্ছিত, প্রবঞ্চিত, প্রতারিত ও নিপীড়িত হয়ে কর্মহীন অনিশ্চিত জীবনের প্রবল যন্ত্রণায় বেমালুম বদলে যাচ্ছে! বদলে যাচ্ছে, তাদের ধ্যান-ধারণা, মন-মানসিকতা। কলুষীত করছে তাদের মনোবৃত্তিকে। যখন লোভ-লালসায় নানান প্রলোভনের হাতছানি উপেক্ষা করতে না পেরে নিজের সততা ও সত্যকে বিসর্জন দিয়ে মিথ্যার কাছে আত্মবিক্রয়, লোভের কাছে নতিস্বীকার এবং ভোগের কাছে বশ্যতা স্বীকার হয়ে অর্থ-ঐশ্বর্য্য, মান-মর্যাদা এবং প্রতিষ্ঠার পিছনে ক্ষুধার্ত হায়নার মতো হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এমন এক অন্ধ গলিতে গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে শ্রদ্ধা-ভক্তি, øেহ-মমতা-ভালোবাসা কিছুই নেই! নেই জীবনের আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং মানবতা! চারিদিকে মনোহরণকারী শুধু রূপ-রং-রস আর অমৃতের ভান্ডার! যার অন্ধমোহে মোহাণ্বিত হয়ে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ে সহজ সরল কতগুলি নীরিহ মানুষ! যার ফলে সুশীলসমাজ থেকে চ্যুত এবং প্রিয়জনের সংস্পর্শ থেকে বিতাড়িত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে বদলে যাচ্ছে ফুলের মতো বহু অসহায় নারীর জীবন!
আসলে সেটা মরীচিকা ছল, ক্ষণিকের মোহ! চোখের রং মুছে গেলেই কূয়াশার মতো শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া! হাত বাড়ালেই সব শূন্য! আর এই শুন্যতাবোধটুকুই যখন চৈতন্যোদয় হয়, ভরা পেয়ালার অমৃত মধুর সুরাও তখন তিক্ত-বিষাক্ত হয়ে ওঠে। অর্থহীন মনে হয়। অবাঞ্ছিত মনে হয়। যখন সর্বহারার শোকে বেদনায় হাহাকার এবং তীব্র আর্তনাদ বাইরের পৃথিবীতে পৌঁছাবার মতো কোনো রাস্তাই আর থাকেনা!

মাস কয়েক আগে এক জলসায় গিয়েছিলাম। ঘরোয়া পরিবেশ হলেও চোখধাঁধানো ঝাঁড়বাতির ঝিকিমিকি আলোর কণায় বেশ রোমান্টিক লাগছিল। তখনও থোকায় থোকায় লাল-নীল-হলদে রং-বেরংএর বেলুন আর সুবর্ণ আলোর মালায় চলছিল ডেক্রেশনের পর্ব। তার ঠিক ঘন্টাখানিক পরই শুরু হয়, প্রসাধনের বাহার ছড়িয়ে, আতরের গন্ধ উড়িয়ে, বাহুবেষ্টিত যুগলবন্দী কপোত- কপোতীর আগমন। হাসি-কলোতান। কথোপকথনের গুঞ্জরণ। বেশ আনন্দোৎচ্ছলসমারোহে ছেয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল, এক মনোরম রোমাঞ্চকর পরিবেশ! ক্ষীণ শব্দে গ্রামোফোন রেকর্ডে বাজজিল, পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অপূর্ব মূর্ছণা! আগন্তুক অথিতিরাও উন্মত্ত চিত্তে কুশল বিনিময়ে মর্শগুল তখন! পাশেই বিরাটাকারের একটা বিস্তৃত টেবিল জুড়ে সাজানো ছিল, রকমারি আহার-আয়েশের চমৎকার বন্দোবস্ত! তার সাথে হুইস্কি, বিয়ার এবং সফ্ট ড্রিংক্স!
হঠাৎ দেখি, ধুমকেতুর মতো এক উর্বশী যুবতী রমণী আর্বিভূত হয়েই ডাগর চোখের অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে কাকে যেন খুঁজজে! তার চেহারায় আর চটকদারী বেশভূষায় মনে হয়েছিল, কোনো এক স্বপ্নপরী, স্প্যানিশ কন্যা! তার পরই দেখি, চোখেমুখের বিচিত্র ইশারায় কিসের একটা সংকেত প্রেরণ করতে করতে গ্লাসে বিয়ার ঢালছে। ঢেলেই ফিল্মি হিরোহীনদের মতো রহস্যাবৃত চোখের চাউনি মেলে, প্রাণবন্ত চঞ্চলতায় তার অনাবৃত দুধসাদা মসৃণ নিতম্বখানি দুলিয়ে, ইউরোপীয় ষ্টাইলে প্রসন্ন মেজাজে ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিয়ে পান করতে লাগল! ওর গা-ঘেষে দাঁড়ানো মাথায় পাগড়ী পড়া লম্বাটে সুঠাম সুদর্শণ চেহারার এক তরুণ যুবককেও দেখা গিয়েছিল! সেও দেখি, উচ্ছাসে একেবারে উতল! ৫৫৫ সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করেই পুরুষালী ইমেজে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তার মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি মেলে আস্বাদন করছিল, হৃদয়াকর্ষক সৌন্দর্য্যরে পারিজাত উক্ত উর্বশী রমণীর উপচে পড়া যৌবনের রূপ আর রস। কিন্তু মন্ত্রের মতো হঠাৎ চোখের পলকে ওরা যে কোথায় উধাও হয়ে গেল, আর দর্শণ পাওয়া যায়নি সেই রাতে!

তার মাস ছয়েক পরের ঘটনা। দৌড়ে যাচ্ছিলাম বাস ধরবো বলে! ইতিমধ্যে ট্রাফিক সিগ্নালটা গ্রীণ লাইট পড়তেই বাসটা পাস করে বেরিয়ে গেল। আর তৎক্ষণাৎই মহিলা কণ্ঠস্বর শুনে আমি থমকে দাঁড়াই। -‘ইধার আও ব্যাহেন, ব্যয়ঠো!’
পিছন ফিরে দেখি, সেই উর্বশী রমণী! নির্জীব প্রাণীর মতো বিমূঢ়-ম্লান মুখে বাসষ্টপীজের ছোট্ট শ্যাল্টারে বসে আছে একা। আশে-পাশে কেউ নেই। চারিদিক নিঝুম, গাঢ় নিস্তব্ধ! মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। আবছা অন্ধকার। বৃষ্টিও পড়ছিল তখন গুরি গুরি! চোখে চোখ পড়তেই ঠোঁটের কোণে বিষন্ন হাসি ফুটিয়ে বলল, -‘হায়, হাউ আর ইউ? পহেচানা? ম্যায় সুলোচনা! এয়াদ হ্যায়?’

লক্ষ্য করলাম, জরা জীর্ণের মতো নিথর নিস্তেজ শরীর! চোখমুখ শুকিয়ে একেবারে গর্তে ঢুকে গিয়েছে! কঙ্কালের মতো শরীরের হাঁড়গুলিও বেরিয়ে এসেছে সব! সাজ-সজ্জার বালাই নেই! কেশবিন্যাশ এলোমেলো। প্রসাধনের অবস্থাও তদ্রুপ। দামী হলেও মলিনতার ছাপ ছিল প্রকট!
বিস্মিত হয়ে বললাম, -‘এ কি, তুমি এখানে? তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছেনা! এ অবস্থা কেন তোমার? থাকো কোথায় তুমি?’
ইত্যবসরে নাকের ডগা দিয়ে তীব্রবেগে পাস হয়ে গেল আরো দু’টো বাস। অথচ বাড়ি ফেরার কোনো তাগিদবোধই করলো না সুলোচনা! মনে হচ্ছিল, প্রবল ঝড়ের মুখে উড়ে আসা মুমূর্ষ্য পাখীর মতো নির্জনে চুপটি করে বসে আছে! সংসারে ওর কেউ নেই! বাড়ি না ফিরলেও খোঁজও করবে না কেউ ওর!
হ্যাঁ, ঠিক তাই! ওর সন্নিকটে এগিয়ে আসতেই হু হু করে কেঁদে ওঠে সুলোচনা। তারপর ধীরে ধীরে সাশ্র“নয়নে উন্মোচন হতে লাগল, ওর প্রবঞ্চিত জীবনের করুন কাহিনী!

প্রায় বছর ছয়েক আগে নব পরিণীতা সুলোচনা এ্যামিগ্রান্ট হয়ে কানাডায় পারি দিয়েছিল, স্বামী পঙ্কজের হাত ধরে! ওরা জাতিতে মারাঠী। কোলকাতায় একই কলেজে পড়তো দুজনে! শহরের উচ্চবিত্ত সনামধন্য সম্ভ্রান্ত বাঙালি পরিবাবের জ্যেষ্ঠপুত্র পঙ্কজ ছিল, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। মা-বাবার অসম্মতে সুলোচনার সঙ্গে কোর্ট ম্যারেজ করেই পাড়ী জমায় কানাডার ভ্যাঙ্কুবার শহরে। তখন কচি বয়স সুলোচনার! উচ্ছাসে উতলা। আকস্মিক নিজস্ব গন্ডী ছেড়ে বাইরের রঙ্গিন পৃথিবীতে পর্দাপণ করে একেবারে ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিল! ভেবেছিল, আকাশের চাঁদটাই পেয়ে গিয়েছে হাতে! আর নাগাল পায় কে! খুশীর পাল তুলে মুক্ত-বিহঙ্গের মতো বাধ্যবাধকতাহীন জীবন জোয়ারে একাই ভাসতে লাগল! বিদেশী পর্যটকদের মতো প্রচন্ড বিস্ময় নিয়ে শহরের বিভিন্ন মনোহরণকারী দর্শণীয় স্থানগুলি এক এক করে প্রদক্ষিণ করতে লাগল। যখন রামধনুর মতো ওর হৃদয়াকাশে আবির্ভূত হয়েছিল চিরঞ্জিত সিং! ততদিনে পঙ্কজের কাঙ্খিত বাসনাগুলিও একে একে সব পূরণ হতে লাগল! মর্যাদাসম্পন্ন উচ্চপদস্থ চাকুরী, দেশীয় ষ্টাইলে সান্দার বাড়ি, এ্যাম্বাসেডর গাড়ি, অর্থ-বিত্ত-ঐশ্বর্য্য, বিলাসবহুল দ্রব্য-সামগ্রী, দামী শাড়ি-গহনা! যখন স্বর্গসুখ ছিল সুলোচনার হাতের মুঠোয়! ইতিমধ্যেই পঙ্কজের আশাতীত চরম সাফল্যের সুসংবাদে সমস্ত মান-অভিমান অপসারিত করে ওর মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই চলে আসে কানাডায়। যা স্বপ্নেও ভাবেনি কোনদিন! তখন আর কি! বেশ আনন্দেই দিন কাটছিল ওদের!
কিন্তু বিধিই বাম! আকস্মিক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্কজের অপমৃত্যুতে সুলোচনার জীবন নদীর খেয়া বইতে লাগল অনিশ্চিত মোহনার দিকে! যা কখনো কল্পনা করেনি! অচীরেই জীবনে ঘনিয়ে আসে আমাবশ্যার মতো ঘোর অন্ধকার রাত! সদ্য স্বামী হারার শোকে কাতর, মুহ্যমান সুলোচনার অমানবিকভাবে শুরু হয়, শ্বাশুড়ীর নির্যাতন আর দুর্ব্যবহার! সেই সঙ্গে মিথ্যে কলঙ্ক, অপবাদ! ডাইনি, রাক্ষসী, কুলাঙ্গার! নিষ্ঠুরের মতো বলতো, -‘কিসের সম্পর্ক! কোনো অধিকার নেই তোর! দূর হয়ে যা তুই এ বাড়ি ছেড়ে!’
অথচ একবারও ভেবে দেখল না কেউ, অকাল বৈধব্যে তারুণ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে বাইশ বছরের একটি যুবতী মেয়ে একা কোথায় যাবে! কিভাবে জীবনযাপন করবে! কোন্ সাহারায় ও’ বেঁচে থাকবে! আর ঠিক তখনই সাহার্য্যার্থ্যরে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে চিরঞ্জিত সিং! সুকৌশলে এবং বুদ্ধিরচাতুর্য্যে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে সুলোচনার অন্ধকার জীবনে আলোর পথ দেখাতে ওকে নিয়ে এলো টরন্টো শহরে! যদিও অন্তরাত্মা সায় দিচ্ছিল না কিন্তু সহজ সরলমনা সুলোচনা বিবেকের দংশণে নিজেকে শান্তনা দিয়ে মনে মনে ভাবল, দিনকাল বদলে গিয়েছে। বদলে গিয়েছে মানুষের রুচী! সতীদাহর প্রথাও কবে নিষিদ্ধ এবং উচ্ছেদ করে দিয়েছেন রাজা রামমোহন রায়! তরুণ বৈধব্যের পূণর্বিবাহের রেওয়াজও প্রচলিত বহুকাল আগে থেকে! পাপ-পূণ্যের দোহাই দিয়ে নিজের সাধ-আহাল্লাদ বিসর্জন দেবার চেয়ে জীবনকে নতুন রঙ্গে, নতুন ঢঙ্গে সাজিয়ে তোলার এই সুর্বণ সুযোগ!
কিন্তু মেয়েদের মন বড়ই নাদান! মতলোবি পুরুষমানুষের ভন্ডামী সহসায় মনের আয়নায় ধরা পড়েনা! উপরন্তু দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আবেগের বশীভূত হয়ে ভালো-মন্দের যাচাই না করেই অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ভালোবাসার অতল সমুদ্রে। যার কূল নেই, কিনারা নেই! নেই বাঁচবার কোনও পথ!
সুলোচনা গিয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে! অপরাহ্নে ফিরে এসে দ্যাখে, ওর ঘরের দরজাটা খোলা। ভাবল, চিরঞ্জিত এসে গিয়েছে! কিন্তু ঘরের ভিতর ঢুকেই মাথায় যেন ওর বজ্রাঘাত পড়ে! ঘরের জিনিসপত্র সব শূন্য! কিছু নেই। কখন যে চিরঞ্জিত এসে ওর জামা-কাপড়, টাকা-পয়সা, সুলোচনার কানাডিয়ান সীটিজেনশীপ পেপার, পাসপোর্ট, ল্যান্ডিং পেপার সব হাতিয়ে নিয়ে গিয়েছে, সুলোচনা ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি। এমনকী ওরা যে বাসায় থাকতো, অনির্দিষ্টকালের জন্য সেটিও অন্যের মালিকাধিনে এমন চুক্তিবদ্ধ করে গচ্ছিত রেখে গিয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ-এ সুলোচনার কোনো অধিকার না থাকে! যার লিগেল কোনো প্র“ফই ছিলনা! সেই সঙ্গে একটা সুঁতো পর্যন্তও ছিলনা সুলোচনার! পড়নের কাপড় আর হাতের বালাদু’টিই ছিল ওর একমাত্র সম্বল!
কিন্তু তারপরেও বেহায়া, বিরহ-কাতর সুলোচনার নিস্পাপ মন, চিরঞ্জিতের পথ চেয়ে বসেছিল। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ওর, চিরঞ্জিত ফিরে আসবেই! কিন্তু চাকুরীর ইন্টাভিউ দেবার বাহানায় সেই যে ঊষার প্রারম্ভে ঘন কূয়াশাচ্ছন্ন মেঘলাকাশের ছায়ায় গা-ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, আর ফিরে আসেনি চিরঞ্জিত! অথচ মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধান! বাড়ি থেকে বেরিয়ে কদ্দূর গিয়ে থমকে দাঁড়ায় চিরঞ্জিত। পিছন ফিরে বেশ কিছুক্ষণ সুলোচনার মুখপানে পলকহীন নেত্রে তাকিয়েছিল। ভেবেছিল, কোন প্রয়োজনেই বোধহয়! কিন্তু চোখের দৃষ্টিটা অন্যদিনের তুলনায় একটু ব্যতিক্রম মনে হতেই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল সুলোচনা। আর তক্ষুণি কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মুখ ঘুরিয়ে ওর সম্মুখেই মায়ার মরীচিকার মতো চোখের নিমেষেই মিলিয়ে গেল ঘন কূয়াশায়। তখন একবারও কি ভেবেছিল সুলোচনা, চিরঞ্জিত সিং ওর জীবন থেকে বিদায় নিয়ে চিরদিনের মতো অদৃশ্য হয়ে গেল!
সুলোচনা আজ পথের ভিক্ষীরি। অনুতাপ আর অনুশোচনার জ্বলন্ত আগুনে জীবনে চাওয়া-পাওয়ার স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্খা, কামনা-বাসনাগুলি আজ জ্বলে পড়ে সব ছাই হয়ে গিয়েছে! মরে গিয়েছে ওর বেঁচে থাকার সাধ! শুধু প্রাণটা নিয়েই এতিমের মতো নিগৃহীত ও নীপিড়ীত হয়ে, শহরের অখ্যাত পল্লির অলি-গলিতে পড়ে থেকে অস্তগামী সূর্য্যরে মতো প্রহর গুনছে শুধু মৃত্যুর অপেক্ষায়!


সমাপ্ত

যুথিকা বড়ুয়া : কানাডা প্রবাসী লেখিকা ও সঙ্গীত শিল্পী।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804648 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804648 2008-05-31 01:11:30
কান্নার রঙ্গ :: তানবীরা তালুকদার
যুদ্ধ পরবর্তী সর্বাংশে ভঙ্গুর সদ্য ভূমিষ্ট দরিদ্র শিশু রাষ্ট্র বাংলাদেশে সমস্যার তখন কোন অন্ত ছিল না, যেদিকেই চোখ যায় চতুর্দিকে হানাদারদের ফেলে যাওয়া ধ্বংসের ছায়া। অধিকাংশ জনগনই ছিলেন তখন স্বজন হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত, সাথে ছিল নিজেদের মধ্যে লালন করা বিভীষিকাময় স্মতি আর নিজেদের বাড়িঘরে হানাদারদের রেখে যাওয়া ধ্বংসের চিহ্নের মধ্যে শোকে মূহ্যমান। যেদিকে চোখ যায়, ধুসর চারিধার। সবারই জীবন লালিত হচ্ছিল অসংখ্য সমস্যার মধ্যে। এরমধ্যে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক নির্যাতিতা নিপীড়িতা নারীদের সমস্যা ছিল আরো হৃদয়বিদারক। যারা ঢাকতে পারতেন এই লজ্জা, অপমান তারা কোনরকমে ঢেকে রাখলেন আর যারা পারলেন না তারা মরমে মরে রইলেন বাকশক্তিহীন হয়ে। অতি আদরের যে মেয়েটি একবেলা রাগ করে ভাত না খেলে বাবা সে অভিমান সহ্য করতে পারতেন না, তার সাধ্যের মধ্যে থাকা সবকিছু করে ফেলতেন মেয়ের রাগ ভাঙ্গানোর জন্য, সেই মেয়েটি মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে হয়ে গেলো মৃত, কিংবা চলে গেলো এমন কঠিন কোন দূরত্বের ব্যবধানে যা কখনও ঘোচানো যায় না। মৃত মানুষের নাম উচ্চারন করে কেউতো কাদে কখনও কখনও, কিন্তু তাদের নাম উচ্চারনও নিষিদ্ধ হয়ে যায় নিয়তির কোন নির্মম টানে। কাদলেও নিঃশব্দ, কেউ যেনো জানতে না পারে, এমন ভাব করতে হবে যেনো মেয়েটি এই বাড়ীতে কখনই ছিল না কিংবা সে পৃথিবীতে কখনই জন্মায়নি। সেই হতভাগীদের অতি ভালোবাসার পরিবার পরিজনরা তাদের এই দুঃসময়ে তাদের কাছে টেনে নেয়ার বদলে বরং হয়ে ওঠে অপরিচিত মুখ। একদিন যার সাথে অনেক ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি বিনিময় হয়েছিল সে আজ অনেক অচেনা, অসংখ্য স্বপ্ন নিয়ে বড় ওঠা চির পরিচিত সেই আঙ্গিনা আজ তার জন্য বন্ধ। যুদ্ধ করে সবাই পেলো স্বাধীন বাংলাদেশ আর তারা হারালো সমস্ত কিছু। পরিবার, পরিজন, বন্ধু, সমাজ, ভালোবাসা, স্নেহ, ঘর, স্বপ্ন সব। রাষ্ট্র তাদের ‘বীরাঙ্গনা‘ খেতাব দিয়ে তার দায়িত্ব শেষ করল। কিন্তু এই বীরাঙ্গনাদের এবং তাদের গর্ভে থাকা অনাহুত শিশুদের সামাজিক, অর্থনৈতিক পুর্নবাসনের কোন দায়িত্ব তারা নিল না, তৈরী হলো না রাষ্ট্রের তরফ থেকে তাদের জন্য কোন আশ্রয়কেন্দ্র। বুদ্ধিজীবিরা তাদের দায়িত্ব শেষ করলেন হূদয়বিদারক উপন্যাস, গল্প আর নাটক রচনার মধ্যেই। তারা সোচ্চার হননি এইসব হতভাগীদের সমাজে পুর্নবাসনের দাবীতে মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের দাবীর শ্লোাগান নিয়ে। আজও ভাবলে গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে, দেশের জন্য নিষ্পেষিত, বিলীন হওয়া এইসব সৈনিকদের প্রতি সমাজ, পরিবার কতোটা নিষ্ঠুর ছিল।

সে সময়ে অনেক বিদেশী সংস্থা বাংলাদেশে যুদ্ধ পরবর্তী পুর্নবাসনে সহায়তা করছিল। যারা রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট নির্মান, আহত সৈনিকদের চিকিৎসা দেয়াসহ নানা পুর্নবাসন পরিকল্পনার সাথে সাথে এই সম্যাটিকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলো এবং সেইসব নারীদের এবং শিশুদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পুর্নবাসনের প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিল অভিবাসন। ইউরোপের অনেক সংস্থায়ই তখন যুদ্ধে যে সব শিশুরা তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছে, অনেকে যারা বাবা-মাকে খুজে পাচ্ছে না, অনেকে যারা অনাহুতভাবে বা সামাজিক বীধি ছাড়া সমাজে এসে পড়েছে, অনেক দরিদ্র পিতামাতা যারা যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে ক্ষুধার জ্বালায় সন্তান বিক্রি করছে কিংবা অসুস্থ ক্ষুধার্ত সন্তানকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে গেছে তাদের পুর্নবাসনের, অভিবাসনের ব্যবস্থা করেছিল । যে সমস্ত ঘটনা দেশের লোককে কাদাতে পারেনি সে সমস্ত ঘটনায় অনেক অচেনা বিদেশীরা চোখের জল ফেলে ছিলেন ভাবতেও কেমন একটা অচেনা অনুভূতি হয় সমস্ত শরীরে। ইউরোপে তখন অনেক শিশুদের আগমন হয় বাংলাদেশ থেকে। এরমধ্যে ডেনমার্ক, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এ সবচেয়ে বেশী শিশু আসে। রাজনীতি সম্পর্কে আমার খুব একটা আগ্রহ বা জ্ঞান কখনই ছিল না কিন্তু পত্রিকা পড়ার সুবাদে আর নেতাদের কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে অনেক জিনিসই না চাইলেও চোখে পড়ে যায় অনেক সময়। পত্রিকার খবরনুযায়ী যে সময় রাজধানী ঢাকাতে অনেকেই ধন সম্পদের পাহাড় গড়ার মহড়া দিচ্ছিলেন ঠিক সে সময়েই অনেকে সামান্য খাবারের বিনিময়ে সন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন বিদেশীদের কাছে চিরজনমের মতো, সারাজীবনে হয়তো বুকের মানিককে আর একটিবারও দেখতে পাবেন না এ নিদারুন সত্য জানা সত্বেও। কি বিচিত্র এই সভ্যতা। অবশ্য এখেলা আমাদের দেশে হরদমই ঘটে যাচ্ছে আজোও। এক শ্রেনী দেশে পয়সা খরচ করে আনন্দ পান না বিধায় ইন্দোনেশিয়া থেকে লাসভেগাস পর্যন্ত যান ক্যাসিনো খেলতে আর তার বাড়ীর পাচ কিলোমিটারের মধ্যেই হয়তো অন্য একজনকে দেখা যায় খাদ্যের অভাবে কুখাদ্য খেয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যেতে, কিংবা অভাব ঘোচানোর জন্য প্লেনের চাকা ধরে বিদেশ যাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় মৃত্যুবরন করতে। এই লেখাটি তেমন কোন হতভাগ্য জীবনটিকে কেন্দ্র করেই চলবে।

আবীর চাকুরীর সুবাদে নেদারল্যান্ডসে আছে একা, মাত্র কমাস আগে দেশ থেকে এসেছে। এক শীতের সন্ধ্যায় এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই পরিচয় হয় ২২ বছর আগে মাত্র পাচ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা বেবুলের সাথে। আবীর বাংলাদেশ থেকে এসেছে এবং বাংলাদেশী জেনে বেবুলের আগ্রহের সীমা ছিল না তার সাথে কথা বলার। দুজন তখন রেস্টুরেন্টে দাড়িয়ে টেলিফোন নাম্বার আর ঠিকানা বিনিময় করলেও ব্যস্ততার কারণে তেমনভাবে আর যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি দুজনের মধ্যে। তাছাড়া দুই বিপরীত লিঙ্গের স্বাভাবিক সঙ্কোচতো ছিলই। তার কিছুদিন পর আবীর ছুটিতে দেশে এসে, বিয়ে করে এবং প্রায় তার সাথে সাথেই বউকে নিয়ে নেদারল্যান্ডসে এলো। আবীর বউকে নিয়ে মাঝে মাঝে সেই রেস্টুরেন্টে খেতে যেতো বাড়ীর কাছে বলে। তখন হঠাৎ একদিন আবীর গল্পচছলে তার বউ মোহরকে বেবুলের কথা বলল। মোহর শুনে যোগাযোগ করতে খুবি আগ্রহ প্রকাশ করল কিন্তু ততদিনে আবীর বেবুলের কনটাক্ট নাম্বার হারিয়ে ফেলেছে। দিন যায় দিন আসে। আবীর আর মোহরের সেই রেস্টুরেন্টে হঠাৎ একদিন আবার বেবুলের সাথে দেখা হলো। আবীর বেবুলকে প্রথম চিনতে না পারলেও বেবুল তাকে চিনতে পেরেছিল সাথে সাথেই। আবার নতুন করে যোগাযোগ এবং আলাপ-পরিচয়। মোহরকে দেখে বেবুলও একটু স্বস্তি বোধ করছিল। বিদেশী ছেলেদের সম্পর্কে ধারণা সবসময় খুব ইতিবাচকতো নয় এদের। অনেক ঠেকেই শিখেছে। এবার ঠিকানা বিনিময় করতে গিয়ে দেখা গেলো মোহররা বেবুলের খুব কাছাকাছিই থাকে, প্রায় ধরতে গেলে একই কম্পাউন্ডের মধ্যে। এবার আর মাঝখানে বিরতি পড়ল না। সদ্য দেশ থেকে আগত কাজ-কর্মহীন, বন্ধু-বান্ধবহীন মোহর একা একা থাকে এই ফিলিপস সিটির ফ্ল্যাটে। স্বামী মহাব্যস্ত তার চাকরী আর পড়াশোনা নিয়ে। টিভি ছাড়লেই শুধু ডাচ, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, টার্কী ভাষার অনুষ্ঠান আর তার সাথে আছে বিবিসির খবর, সিএনএন এর খবর। মোহরের কাছে তখন টিভি থাকাও যা না থাকাও তাই। যে এম,টিভি দেখার জন্য এক সময় দেশে হেদিয়ে মরে যেতো সেই এম,টিভি হল্যান্ডে এসে পানসে হয়ে গেলো। তখনো ই-মেল আর ইন্টারনেট এতো সুলভ হয়ে ওঠেনি নেদারল্যান্ডসে আর বাংলাদেশেতো আরোই দূরের ব্যাপার ছিলো সেগুলো। চিঠি আসতো মাসে দুটো কি তিনটা। খবরের কাগজ নেই, আড্ডা নেই, টেলিফোন দূর্মুল্য। সেই দুঃসময়ে এক কম্পাউন্ডের মধ্যে ‘বেবুল‘কে পেয়ে মোহর হাতে চাদ পাওয়ার চেয়েও বেশী কিছু বোধহয় পেয়ে ছিলো । হোক না গায়ের চামড়া ব্যতীত পুরো ডাচ তবুও কখনোতো বাংলাদেশ থেকে এসেছিলা।

মোহর তখন ডাচ স্কুলে যায় আর তার সদ্য শেখা ডাচ প্র্যাকটিস করার জায়গা হলো বেবুল, আর সারাজীবন ডাচ বলায় অভ্যস্ত বেবুলের ইংরেজী প্র্যাকটিসের জায়গা হলো মোহর। বেবুলের বন্ধু পিট তখন আমষ্টারডামে চাকরী করছে আর বেবুল এখানকার ইউনির্ভাসিটিতে গ্রাফিক্স আর্ট এ্যান্ড ডিজাইনিং এর উপর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে। দুপক্ষের প্রবল আগ্রহ এবং নিসঙ্গতার কারণে প্রবল বন্ধুত্ব তৈরী হলো অতি দ্রুত। প্রায় অলিখিত একটি চুক্তি তৈরী হলো, সারা সপ্তাহ ওরা মোটামুটি একসাথে কাটায় আর উইকএন্ড এলেই ছুটি কারণ দুজনের বরই তখন বাড়ি থাকে। মোহর এর একমাত্র কাজ তখন ডাচ স্কুলে যাওয়া আর বাসায় এসে হোমওর্য়াক করা। তারপর দোকান থেকে ভাড়া করে নিয়ে আসা হিন্দী ফিল্ম দেখা আর মাঝে মাঝে রান্না করা। আর বেবুলের কাজ তখন মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রচুর ছবি আকা আর চাকরীর ইন্টারভিউ দেয়া মাঝে মাঝে। প্রায় রোজ মোহর স্কুল থেকে ফিরলে তার কিছুক্ষন পর একটি টেলিফোন আসতো বেবুলের, তুমি কি ব্যাস্ত ? আমি কি আসতে পারি? মোহর তখন বেবুলকে বাঙ্গালী কায়দা শিখালো যে রোজ ফোনের দরকার নেই, যখন আসতে ইচ্ছে হবে এসে কলিং বেল চাপবে। বেবুল একটু ভয় পেলো যদি মোহর ব্যস্ত থাকে কিংবা বিরক্ত হয়, মোহর বলল, তাতেও সমস্যা নেই, আমরা এতে অভ্যস্ত। কিন্তু বেবুল ডাচ সিস্টেম চালু রাখায় অগত্যা মোহর বাঙ্গালী সিস্টেম চালু দিলো। যেদিন বেবুল আসতো না কোন কারণে সেদিন মোহরই যেতো বাঙ্গালী সিস্টেমে টেলিফোন ছাড়া। এরপর বেবুলও বাঙ্গালী সিস্টেম আরম্ভ করল কোন নোটিস ছাড়াই কলিংবেলে হাত দেয়া। মাঝে মাঝেই একসাথে সিনেমা দেখতে যাওয়া কিংবা শপিং করতে যাওয়া হতো। দেশে বৃষ্টি পড়লে বাড়ী থেকে বেড়োনো নিষেধ, এমনকি মাঝে মাঝে বৃষ্টির কারণে দেশে স্কুল পর্যন্ত ছুটি হয়ে যেতে দেখা অভ্যস্ত মোহর বেবুলের পাল্লায় পড়ে বরফের মধ্যে সাইকেল চালিয়ে ওর সাথে সাত / আট কিলোমিটার দুরে রঙ্গের দোকানে রং কিনতে গেলো। গৃহকর্মে নিদারুন অপটু মোহর ফার্নিচার রং করাও শিখে গেলো ডাচ ললনার পাল্লায় পড়ে। বাড়িতে ফোনে বলল। কেউ বিশ্বাসই করতে পারলো না, ভদ্রলোকের মেয়ে বাড়ি বসে রং মিস্ত্রীর কাজ করছে !!! ঠিকমতো ডালে সম্বার দিতে পারে না, ছয় মাস আগে ঢাকা থেকে নাকের জল চোখের জলে এক হয়ে যাওয়া মোহর এখন চেয়ার রং করছে বললেই হলো আর কি? কিন্তু কি করে কাউকে বোঝাবে এগুলো গল্প মনে হলেও আসলে সত্যি। প্যানকেক খাওয়ার কতোরকম ডাচ পদ্ধতি আছে তাও শিখতে শিখতে মোহর ওজন বাড়িয়ে ফেললো নিজের। একসাথে বরফ নিয়ে খেলা করতে করতে এক সময় অনেক দূরের অচেনা এই দেশটিও আস্তে আস্তে নিজের হতে শুরু করল মোহরের কাছে তখন। আর এই পরদেশটিকে আপন করিয়ে দেয়ার পেছনে অনেক অবদান আছে সেই দূর নিজের দেশ থেকে কখনও প্রায় তাড়িয়ে দেয়া সেই মেয়েটির ............

(চলবে)

তানবীরা তালুকদার
জুলাই ২০০৬।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804636 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28804636 2008-05-31 00:43:15
বিজ্ঞানের অংগনে যখন ধর্মের প্রবেশ - দুটোর যৌক্তিক পার্থক্য কি এতো সহজ? দুটোর যৌক্তিক পার্থক্য কি এতো সহজ?
রির্চাড ডকিন্স
অনুবাদক: তানবীরা তালুকদার

এক ধরনের কাপুরষোচিত বোধশক্তিজনিত মানসিক শিথিলতা কিংবা আপোষকামিতার কথা বাদ দিলে বিচারশক্তিসম্পন্ন যুক্তিবাদী লোকদের সিদ্ধান্তগুলো বরং যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত ধর্মের বিরুদ্ধেই যায় (এখানে সাম্প্রতিক যুগের Scientology(1) অথবা Moonies(2) -এগুলোর কথা বিচার্য্য নয়)। স্টিফেন জে গুল্ড তার প্রাকৃতিক ইতিহাস কলামে পোপের বিবর্তনবাদ এর প্রতি আচরণ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা প্রবলভাবে তার আপোষকামী মনোভাবকেই প্রকাশ করে -
“বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে কোন সংঘাত নেই, সঠিক শিক্ষার অভাবে সেসব ক্ষেত্রে সহজেই পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আমি বিশ্বাস করি, আমার সমস্ত অন্তকরন দিয়ে, একটি সম্মানজনক, একটি ভালোবাসাময় চুক্তি (আমি এটাকেই গুরুত্ব দেই ) ...।"
যহোক, কি সেই দুটো সহজ দৃষ্টিতে পার্থক্যময় ক্ষেত্র, যাকে গুল্ড 'অসম্পৃক্ত স্বতন্ত্র বলয়' (Nonoverlapping Magisteria, সংক্ষেপে NOMA) নামে অভিহিত করেছেন - আর ধারনা করেছেন এদুটোকে আমাদের সমান উষ্ণভাবে সম্মান আর ভালোবাসা দিয়ে বুকে ধারণ করে রাখতে হবে? গুল্ড আরো বলেছেন, 'বিজ্ঞানের জ্ঞান শুধু ভৌত বাস্তবতার আলোকে প্রায়োগিক বিশ্বকে ধারণ করে। আর ধর্মের জ্ঞান মানুষের নৈতিক চিন্তা আর মূল্যবোধের ধারনাকে প্রসারিত করে।' কিন্তু সত্যই কি তাই?
নৈতিকতা কারা ধারণ করে ?
আসলে ব্যপারটা কি এতোই সরল? কিছুক্ষনের মধ্যেই আমি সে আলোচনায় যাবো যেখানে আসলে পোপ বিবর্তনবাদ বলতে কি বুঝিয়েছেন তার ভিত্তি তুলে ধরব এবং এরপর তার চার্চের অন্যসব স্বীকৃতির ব্যাপারেও কিছু কথা বলব। দেখবো আসলেই এগুলো এতো পরিস্কারভাবে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যাখা দেয় কি না। প্রথমেই সংক্ষিপ্ত আকারে ধর্মের সেই দাবী নিয়ে আলোচনা কারা যাক- যেখানে বলা হয় ধর্ম বিশেষ দক্ষ ভাবে আমাদের নৈতিকতা সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে। এ ধারনাটি অনেক সময় অনেক অবিশ্বাসী লোকও সাদরে গ্রহন করেন, ধারনা করা হয় সভ্যতার সাথে সাথে "মাথা নুয়ে" তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীর সর্বোচ্চ যুক্তিকে স্বীকার করে নেয়া - সে যতো দুর্বল যুক্তিই হোক না কেন।
প্রশ্ন হলো, “কোনটি ভুল এবং কোনটি ঠিক?” এটি একটি সত্যিকারের কঠিন প্রশ্ন যেটার উত্তর বিজ্ঞান হয়ত দিতে পারে না। নৈতিকতার অবয়ব দিয়ে কিংবা পূর্ববর্তী নৈতিক বিশ্বাস দিয়ে, গুরুত্বপূর্ন এবং কঠিন সব লৌকিক নৈতিক দর্শনের নিয়মানুবর্তিতা দিয়ে একজনকে হয়তো চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, বিজ্ঞান এবং যৌক্তিক কারনের সাহায্যে এর সাথে জড়ানো সংশ্লিষ্ট গোপন বিশ্বাসকে, অলক্ষ্যনীয় সামঞ্জস্যহীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। কিন্তু চুড়ান্ত নৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তি মানুষের অন্য কোন জায়গা থেকে আসা উচিৎ, অনুমান করা যায় যুক্তি-তর্কের উর্ধ্বের কোন দৃঢ় প্রত্যয় থেকে। বিশ্বাসীদের দাবী অনুযায়ী এটা হয়ত আসে ধর্মের মাধ্যমে- মানে ঈশ্বর, ধর্মগুরু, সনাতন ঐতিহ্য, এবং একটি ঐশী বইয়ের মাধ্যমে এই নৈতিকতার টনিক বিতরন করা হয় - মানবজতির হেদায়েতের উদ্দেশ্যে।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে, যে আশাটা ধর্ম দিতে পারে সেটা উষর প্রস্তরখন্ড ছাড়া কিছু নয়, সেখানে থেকে উৎপন্ন হওয়া বালির ভিত্তি সম নৈতিকতাগুলো একেবারেই নিস্ফলা। সত্যি বলতে কি- প্রাত্যহিক জীবনে কোন সভ্য মানুষই ধর্মগ্রন্থকে নৈতিকতার চূড়ান্ত বাহন হিসেবে পালন করে না। বরং আমরা নিজেদের পছন্দনীয় স্লোক বা আয়াত ধর্মগ্রন্থ থেকে বেছে নেই (যেমন, 'ধর্মে কোন জবরদস্তি নেই', 'প্রতিবেশীর প্রতি ভাল ব্যবহার কর' -এধরনের হিতোপদেশ সমূহ), এবং সানন্দে অশোভন অংশটুকু বাদ দিয়ে দেই (যেমন বেগানা নারীকে বেত্রাঘাত, বা তাদের ব্যাভিচারের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যা, স্বধর্মত্যাগীদের মুরতাদ আখ্যা দিয়ে হত্যার আইন চালু করা, প্রতিপক্ষের বংশধরদেরকে শাস্তি দেয়া ইত্যাদি)। পুরনো বাইবেলের যে সৃষ্টিকর্তা তিনি নিজেই এক নির্মম, প্রতিহিংসাপরায়ন, নিজের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী, নারী পুরুষের মধ্যে অযৌক্তিক বৈষম্য সৃষ্টিকারী এবং ভয়ংকর রক্তপিপাসু এক চরিত্র, আজকের সমাজে কোন ব্যাক্তি তাকে আর্দশ চরিত্র বলে মেনে নেবে না। হ্যা, অবশ্যই আমাদের আজকের সভ্যতার অর্জনের আলোকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের রীতিনীতিকে বিচার করা খুবই অনুচিত । আর সেটাই আমার “আসল” কথা! ষ্পষ্টতই, আমাদের কাছে নৈতিকতার কিছু চূড়ান্ত বিকল্প উৎস আছে, যা আমাদের সুবিধামতো ধর্মগ্রন্থকে পদদলিত করে হলেও সামনে এগিয়ে যায়।
সেই বিকল্প উৎসটিকে মনে হয় খুবই উদার মতের শালীন ধারার এবং প্রাকৃতিক ন্যায় বিচারক যা ইতিহাসের সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়, যখন যেই ধর্ম প্রচারক থাকে তার প্রভাবনুসারে নিয়মিত পরিবর্তন হতে থাকে। সত্যি কথা বলতে কি, তা খুব কঠিন কিছু না। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে, এমনকি আমাদের মধ্যে যারা খুব ধার্মিক তারাও এটাকে ধর্মগ্রন্থের চেয়ে বেশী মূল্য দিয়ে থাকি। প্রাত্যহিক জীবনে আমরা সবাই কম বেশী ধর্মগ্রন্থকে অবহেলা করে থাকি, সে সমস্ত বানীগুলোকেই উদ্বৃত্ত করা হয় যেগুলো আমাদের উদার মানসিকতাকে ধারন করে আর যেগুলো করে না সেগুলোকে সযত্নে সজ্ঞানে এড়িয়ে যাওয়া হয়। আর যেখান থেকেই সেই উদারতা আসুক না কেনো, এটা আমাদের সবার জন্যই গ্রহনযোগ্য সে আমরা ধার্মিক হই কিংবা না হই।
অনুরূপভাবে, যীশু খ্রীষ্ট কিংবা গৌতম বুদ্ধের মতো মহান সব ধর্ম শিক্ষকরা, তাদের নিজেদের চারিত্রিক ভালো গুন দ্বারা আমাদেরকে অনুপ্রানিত করেন, তাদের ব্যাক্তিগত চরিত্রের দৃঢ়তা ও নৈতিকতাকে গ্রহন করার জন্য। কিন্তু আমরা আবার সেই ভালো কয়েকজন ধার্মিক নেতার মধ্যে থেকেই বাছাই এবং পছন্দের কাজটা করছি, জিম জোন্স অথবা চার্লস ম্যানসন এর মতো পাজী ধার্মিক নেতাদের বাদ দিয়ে। কিন্তু আমরা আর্দশ হিসবে জওহারলাল নেহরু কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নীতিবান নেতাদেরও তো গ্রহন করতে পারি। প্রথাগতভাবে, যেহেতু যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে তাই ভালো কি মন্দ সে বিচার না করে, আমরা আমাদের নৈতিকতা আর শালীনতার বিচার এবং প্রকৃতি থেকে আহরিত জ্ঞান দিয়ে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেই কোনটা গ্রহন করব আর কোনটা বর্জন করব।
(চলবে )

তথ্যসূত্র (অনুবাদকের সংযোজন)

1. এল. রন। হার্ভাড Sceintelogy এর প্রবক্তা। ১৯৫০ সাল থেকেই তিনি এ নিয়ে কাজ শুরু করেন যা তিনি ১৯৫২ সালে জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। ১৯৫৩ সালে তার এ মতবাদকে তিনি ধর্মের নাম এবং রূপ দেন। ১৯৬০ সালে তিনি Sceintelogy কে এই বলে সংঙ্গায়িত করেন, এ ধর্মনীতির মূল হলো, বিশ্বাস, আচরন আর ঐতিহাসিক পটভূমি আর ধর্মনীতি শব্দটি নিজেই নিজেকে প্রতিফলিত করে। Sceintelogy চার্চ এর অনুসারীরা এ ধর্ম সর্ম্পকে বলেন, “সত্যের শিক্ষা হলো এ ধর্মের মূল কথা”। মূল শব্দটি নিজেই ল্যাটিন শব্দ scientia এর জোড়া যার মানে হলো “জ্ঞান, দক্ষতা” অর্থ্যাৎ এর মূল ক্রিয়াপদ হলো জানা।
2. সান মুংগ মুন Moonies ধর্মের প্রবক্তা। ইউনিফিকেশন কমিউনিটি চার্চ থেকে ১৯৭০ সালে এ ধর্মের যাত্রা শুরু। এ ধর্মালম্বীরা নিজেদেরকে চাদের সন্তান মনে করেন। ১৯৭৪ সালে মেডিসন স্কয়ার গার্ডেন চার্চের এক সমাবেশের মধ্য দিয়ে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এ ধর্মালম্বীদের সাধনার তিনটি স্তর থাকে, Moonies থেকে সাধনার মাধ্যমে SUNNIES। এবং SUNNIES এর সাধনা থেকে পাওয়া শক্তি ও ভক্তি তাকে KINGIES এর বা সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাবে, যা সাধনাকে পরিপূর্ন করবে।

তানবীরা তালুকদার
১৭.০৪.০৮

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28803918 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28803918 2008-05-28 19:57:00
মুজিব ইরম বিরচিত দীর্ঘ কবিতা :: কবিবংশ
কবিবংশ

এ পদ্য তোমার জন্যযে-তুমি ডেকেছো ভোর-রাতে। এ পদ্য তোমার জন্যযে-তুমি ডাকিবে সন্ধ্যা-রাতে।

যে-বাঁশি বাজিলো ধীরে হিয়ার ভিতরদিনকানা, রাত্রিকানাভুলে থাকা দায়। কে তুমি বংশীবাদক এই দেহভাণ্ডে থাকো, কী নামে বাঁশির ছিদ্র থমকে থমকে ওঠে ? তুমি বুঝি একি নামে জগতে বিরাজো ? তুমি বুঝি চেনা নামে আরিপরি খোঁজো ? এত যে বাজলো নাম এত এত লয়ে, এত যে ছড়ালো নাম পাশে কিংবা দূরে, কী আর হয়েছে তাতেবলো দেখি বলো ? কেনো তবে দিনেরাতে নামেনামে ডাকো ? এমনি মারিছো বাণ, জানি না রে আজকোন বা বাঁশের বাঁশি ওষ্ঠে বেঁধে রাখি ! অবেলা হয়েছে বেলা, কিসে ভয়-ডর ? অপথে উঠেছে ধ্বনি, সুরে ভাঙ্গে ঘর।...কেনো যে বুঝোনি সেই, ফেলিয়াছো দিন যেই, অপথের মাঝে। ডেকেছে কতো না ছায়া, এনেছো অচিন মায়া, কাঁটাবিদ্ধ তা যে ! সেই কবে যাত্রাদিনে, রেখে আসা বৃক্ষ-মূলে, ধরে রাখি মন। এত পথ হেঁটে এসে, পক্ষিকুল ভালোবেসে, আগলে রাখি বন। ভুলেও থাকি না আজ, সেই যে দিয়েছো কাজ, দেহভাণ্ড ভরে। যা কিছু গিয়েছে ধীরে, পাশ কেটে চোখ বোজে, কান্না অবসরে। এ-মনে হয়েছে রোগ, তারে তুমি বলো সুখ, মনে শান্তি পায়। তুমি এ-সংসারে দেবী, অধমের মন সেবী, ভরেছো আশায়।...হেঁটে হেঁটে আজ বুঝি ক্লান্তি নামে পথের ধুলায়তবে কি রে মন তুমি শস্যবিদ্যা ভুলেছো হেলায় ?...ডেউয়া ফলের জলে মুছে দেই কতো হস্তলিপি, আরো কতো নিরাকার তৈরি করি বালির সমাধি। কাটাকুটি জলেস্থলে কয়লায় ধুয়েছে দেয়াল, হাওয়ায় ভেসেছে কতোমগ্ন থেকে রাখিনি খেয়াল। থুতু ঘষে নাই হয় কতো কিছু সরলে গরল, পাতাপত্রে আঁকাআঁকি বুঝিনি তা বয়স তরল। আর কতো বেহিসাবী আর কতো ওলট-পালটশস্য কি ভিজেছে রো,ে জেগেছে কি পুবের হালট ? জানা নাই, নাই শোনা, প্রশ্নে প্রশ্নে করি দোনোমনো, বয়স বাড়েনি আজো স্লেটে লিখি হাঁটু ভাঙ্গা তনু।...কী মাত মাতিনু আর ভুলে যাই কথার ধরণ, যতনে লুকানো দাগ স্পষ্ট হয় ব্যথার স্মরণ। মুরব্বি মহান যারা তারা দেখি বলাতে অসীম, জগত-বাখানে তারা তুচ্ছ করে মাতের আফিম। আকারে প্রকারে খুলে মোহ-ভর্তি কথার সিন্দুক, মোহমুগ্ধ সুরে দেখি তুষ্ট করে যতেক নিন্দুক। গোষ্ঠী ও ঘরের শত্র“ গুণমুগ্ধ হয়তো পরের, তুষ্ট হয়ে ফিরে চলে বক্ষভরা কুহক সুরের। এসব কমতি নিয়ে মাঠে কেনো এসেছিলে তুমি ? দিনেদিনে আরো বেশি কথা বন্ধ বোবা-দগ্ধ-ভূমি। খুঁজে খুঁজে নি-মাতের পদ ছুঁয়ে নেই মুরিদানি, বংশের কলঙ্ক-কালি মুছে দিতে আসে কোন জ্ঞানী ?...বাছনা বেয়ে জেগে উঠি শিমের নিঃশ্বাস। দোআঁশ মাটির টানে অন্তর অধীন, প্রাণ ঢেলে অপ্রাণের বাড়াও উত্তাপ। আমাকে সজীব করোওগো অগ্নিময়ী, লকলকে প্রাণবায়ু সাকারে আকার, ফোটে পুষ্প-ফনা-মদ মত্ত চুপিসারে, বিষবাষ্পে রংহীন পাতা-পুষ্প-লতা, বাখাল বাঁশের আগা পেঁচিয়ে সঙ্গীন, সবুজে অবুঝ ঋণ আভোগ আফিম। কে ধরে লতানো লতা ঝাঁকে মেশা কুঁড়ি ? এতটা মোহন ডাকে বায়ু বাষ্পানলে, কঞ্চিভরা প্রাণবায়ু তোমার অধীন। এই পত্রে লিখা হোক বাঁচা-মরা-ঋণ, মাচাং ভরিয়া ফোটে তুঁহু রাঙ্গা দিন।...বারমাসে তের ফুল ফুটে থাকে ডালে, নগরে নগরে ঘুরি নিজস্ব অনলে। বারমাসে তের ফল ধরে থাকে ডালে, তবুও কিসের নামে অশান্তি বিরাজে ? নবান্নে আসিও তুমিতুমি সেই তাপ, তাড়িও দেহের গুণে বিষের প্রলাপ। বারমাসে তের রূপ অগ্নিফোটা রাত, আমাদের ঘর হোক পদ্যপারিজাত।...এ-পদে কি মিশেছে আজ শুরুর সঙ্গীত ? কোথায় পথের শুরু, কোথা সেই গীত ?...বাজিল মুরলী ডাক দূর-দূরবাসে, এ-বাঁশি পদের নামে ঘরহীন করে। অন্তরে সরল বাঁশি গরল উগারে, কুলবান কুলহারা নাশিল পরাণে। মাগি ভিক্ষা দ্বারে দ্বারে যদি বা বিরল, সুরের কদম্ব-তলে মিলায় অতল। নগরে নগরে ঘুরি শব্দসঙ্গ যাচি, তবু কি কালার বাঁশি শুদ্ধ করে আঁখি ? যারা যারা এই পথে ধরেছিলো সুর, তারা কি রে সেই তাপে ধরে আছে ঘোর ? আর কেবা জানে বলো, আর কেবা জানেগোবিন্দ দাসের মন জানে বুঝি মানে ? ইরমে কান্দিয়া কয়ওগো অগ্নিময়ী, উঠেছি তোমার নায়ে ধরো আশাবরী।...কে করিবে দূতিয়ালি হায়, কুলাচার্য ইরমের বাণী ! গোষ্ঠিকথা লিখিয়াছি যতো কুলজি-গ্রন্থের অভিধানেএই সেই কারিকা পুরাণ, রচিবারে মহাবংশাবলী, আমাকে কি কুলপতি দলে, কবিবংশ নাম ধরিবারে, তুলে নিবে তুমি কবিশ্বরী ?...বাতাসে উড়িছো তুমি শিমুলের তুলা, নিশ্চয় রহিলো বন্ধু নিতি আত্মভোলা। বাতাসে উড়িছো তুমি আমনের নাড়া, আসে না আসে না বন্ধুকেনে এত তাড়া ? বাতাসে উড়িছো তুমি ঝরে-পড়া ফুল, কেনো এত তার নামে ওঠে হুলুস্থুল ? এক নামে ডাকো তারে এক নামে ডাকো, আসিবে আসিবে করি বুকে আশা বাঁধো। নতুন নামের গুণে যদি দয়া হয়, এ-ঘরে চান্দের আলো হয়িবো উদয়। কেনো এত ভাবো তুমি কেনো এত ভাবো, তোমার সোদর ভাই আইনুদ্দীনে কয়বন্ধুয়া আসিবে করি মোর মনে লয়।...ভিজেছে পাহাড়, পাতাবৃক্ষফুল, এমনি বারিষা মনে কতো দূরে তুমি থাকো ওহে জলেশ্বরী ? নগরে নগরে বুঝি আর-জন্মে যোগি হয়ে ঘুরি ? কবে থেকে তার শুরুবলো তবে বলো ওগো গেরুয়া ধারিণী, ও আমার যুগল যুগিনী !...কিন ব্রীজ পাড়ি দিয়ে যে-দিন নগরে তুমি অজু সেরেছিলে, লিখিয়েছিলে মুরারি চাঁদে নাম, তোমার অপেক্ষা করে আলী আমজদ-এর ঘড়ির কাঁটায় সময় আটকে ছিলো বহুদিনসেই থেকে তুমি বুঝি পাখিডানা পেলে ? এত এত পাখি পুষে কাটালে প্রহরতোমার নিজস্ব পাখি বংশ ভুলে কেনো তবে অ-রূপ ধরেছে ? তুমি তো বৈতল নও জালালী নগরেএ-পাখি তোমারে চিনেনামের দোহাই, কেনো তবে উড়ে আসো, ভুলে থাকো মনু ও খোয়াই ?...যেখানে যাওয়ার জন্য একদিন নেমে আসি পথে, যাত্রা কি ফুরালো মন, যাত্রা কি ফুরায় কোনোদিন ? এত পথ এসে দেখি যাত্রা আজও ফুরালো না, হায় ! কোথাও আচমকা শুধু তোমার স্মরণ রেখা এঁকে, ভুলে থাকি কথাগুচ্ছ, দিনে দিনে ক্লান্তি শুধু বাড়ে। শিখিনি কিছুই বুঝি ? বৃথা বুঝি নামাবলি জপা ? কে বলে এমন কথাবাড়েনি কি চক্রহারে দেনা ? যে-চারা রুয়েছি সেই ফেলে আসা বিষের নগরতা-ও কি ফলেছে বৃথা, ধরে থাকি বিম্ব-কাক-ফল ? নতুন নগরে লগি গাড়া হলো বেশদিন শেষে, সেখানেও বৃক্ষ আজি নিজনামে পুষ্পধ্বনি ফোটেতুমি কি বাজাও বলো নগরে নগরে এই নাম ? গড়ে তুলি তিলে তিলে দেহচর্বি জ্বেলে কবিবংশ, হয়েছি অনেক শেষে কাদাসিক্ত শুভ্র রাজহংস।...এ-বংশে জন্মেছে যারা, ভুলে যাই তারা কারা, আর যতো পন্থহারা নামতাদের চরণ-মাঝে বাঁশুরি-বাদ্য কি বাজে, সেই নামে সিদ্ধ সাজে ধাম ?...একদা বংশের বাতি জ্ঞানদাস জ্বালে, বিদ্যাপতি-বংশগীত রাধা রাধা বলে। চণ্ডিদাস জ্ঞাতি হয় এই যমুনায়, পদে পদে ওঠে সুর কৃষ্ণ নাম গায়। আমি কি বংশের বাতি এই তরিকায়, ক্ষমা কি করিবে আদি গুরু কাহ্নপায় ? এমন জাতের কথা কভু নাহি শুনি, নিজবংশ ছেড়েছুড়ে পরবংশ ধরি। এমন বাঁশির কথা কেনো তুমি তোলো, কদম্ব তরুর তল নগরে বিচারো ? আড়বাঁশি ছিদ্র-কানা কবি কবি বলে, এই শব্দ ঘর-কানা যমুনার জলে। এই দেহ রাধা সাজে এই দেহ গীত, এই মন কানু বিনা বুঝে কি সঙ্গীত ? এমন লজ্জার ভার কার কাছে রাখি, বেনামে নামের ধ্বনি পরনিন্দা মাখি। সকলে শুনিলো ডাক ভুলে গেলো সবি, পশিলো হিয়ার মাঝে শব্দ-বাক্য-ছবি। নিরানন্দ থাকি শুধু নিরানন্দ থাকিভুলে যদি সাদাপাতা পড়ে থাকে খালি ? এই ভয় ওঠে মনে এই ভয় ওঠে, না-জানি গীতের ঢেউ পদে নাহি জুটে ! শ্রী ইরম ঘর হারা বৈতল স্বভাবেকে এসে গাইবে গীত এমন অভাবে ?...এ-দেহ রাধিকা রূপছিদ্রবাঁশিএ-দেহ কানাই, শব্দ-ব্রহ্ম-সখা তুমিআড়বাঁশিনিয়ত বাজাই। এ-বংশে হাছন কাঁদেচরণ ধরিতে তার সাধ, এ-বংশে করিম কাঁদেওরে, পাইমু নি তার লাগ ! শাহনূর দগ্ধ হলে চাইর প্রহর রাত্রি ফানা হয়, বানেশ্রী ছাড়িলে কাঁদে মনোপাখি বন্ধু সমুদয়। যমুনা যমুনা সুরবাঁশি তবে কার নাম জপে, ধামাইল উঠেছে কি দূরে রাধারমণের নামে ? এ-বংশে আমি কি আছিআমি কি ছিলাম কোনো কালে ? আমি কি থাকিবো রোজসহি দিলেচরণে নূপুর-ধ্বনি হয়ে ? শা’নূর আমার ভাই বানেশ্রী বিচারেত্যাগিলে কদমহাটা নালিহুরী কাঁদে।...পঞ্চবটী বনে বুঝি পাখি ডেকে ওঠে, কবির ঘুমন্ত গ্রামে মগ্নছায়া জোটে। লতায়-পাতায় জ্ঞাতি আদি কবি নাম, কুলজি রচিতে বসি তাহাকে প্রণাম। আরেক প্রণাম আমি তোমাকে জানাই, যে-তুমি হালতী হলে নিরলে জাগাই। পদে পদে ওঠে নাম পদে দেখা পাই, কোন সুরে বন্ধু ভজি তুমি বলো চাই ? কী করে অধরা ধরো পন্থধারা পাও, কী করে বন্ধুরে খোঁজো আমারে বাতাও। ঘরের বাগিচা-পাশে ভ্রমর-বাখান, তোমার কণ্ঠে জাগায় দেহাতি আজান। ডাকিলো ভজিলো দিলে ধরে দমে-দম, তোমারে খুঁজিলো এত কেনো যে ইরম ! তুমি কি দিয়েছো ভর, তুমি কি অভয় ? তবে তো কপালে কিছু ঘটিবে নিশ্চয়।...এ-দেহ ভুলে থাকি, এ-দেহ পুষে রাখি, অন্তর অধীনতায়, লুপ্তনাম ভোরে হাঁকি, যা কিছু রোদে মাখিবলো, তা কি রক্ষা পায় ?...পিরাকী-ফকিরী ধরে এ-বংশে লিখেছো যে-নাম, ভালোবেসে এই রাতে বলে রাখি তোমাকে প্রণাম।...তোমাকে রাখিয়া দূরে বাঁশি আর বাজে না গো রাই ! সোয়া ও চন্দন ঘষে দূরদেশে রাত্রি ঘন হয়, দেখে এ-নন্দন, উঠে যে কান্দন, গীতের মহিমা মনে হয়। যাতি-যূথি-চম্পাবতী, ভোর নামে জংলী নদী মনু ও দলাই, এত যে প্রণাম, শুনিয়া সুনামআমারে কি প্রাণ বন্ধুয়ার মনে নাই ?...নিমায়া-নিঠুর অতি কেনো থাকি দূরে ? যাতি-যূথি-পুষ্প গাঁথি মালতি মালায়, বিনিসুতা আড়ি দিয়ে ভূতলে গড়ায়। সোয়া ও চন্দনে ঘষি দেহ ফর্সা করেতুমি নি বলিবে মন কারে বিচারিলে ? পথে পথে কোন ধন হাছিল করিলে ? প্রশ্ন কেনো করো তুমি ওহে মূঢ় মন, তোমার কপালে তীর বিঁধেছে কখন ? যথাতথা যাও তুমি নিজের গরজে, কাজা করো ভোর-সন্ধ্যা-নিশুতি-ফরজে।...এ-আয়াত রচিয়াছি তুমিহারা দিনে, এদিলে জিকির ওঠে সিনাভরা ওমে। এই হাত ধরো তুমি এই হাত ধরো, অপথে জীবন গেলে সোজা পন্থ ধরো। কে দেবে পথের দিশা, সে যে আজ দূরেমনেতে বিষের ঝড় নেমেছে অঘোরে।...তারে তুমি দেখে রেখো ও আমার নিমের বাতাস। দখিনা বাতাস আসে, কে করে নিষেধ তারেপাখি, পাখিরে আমার, উঁচা ডালে বসে তুমি কেনো ডাকো দুপুরবেলায় ? কতো মন পুড়ে গেলোকোকিল-স্বভাবে কেনো, রাত্রি তুমি ডেকে আনো ? কান্নাসুরে দুপুর এলায় তার চুল, ঘনকালোশিমুল তুলায়। বাউলের পাখি তুমি, বিরহে তোমারে নমি, সে যেনো শোনে না এই আদিম শিলায়, কী করে ধরেছে ক্ষয়, জলে ভিজে, রোদে পোড়ে, ভুলে থাকা বৃষ্টি-জলোচ্ছ্বাস। কে আজ আনবে তুলে, হাহাকার দূর করেএমন আলোয় ?...শিখেছি তোমার কাছে পাল তোলা নাওয়ের স্বভাব। সুর, তা-ও তুমি দিলে বেসুরের মাঝে। লইবো না কেনো তবে মুরিদী শপথ ? তা-ও যদি তুমি দাওনা-হয় আমাকে আজ গীতেই ভাসাও।...আর কী এমন দাবি কহিবার আছে ! মিসকিনেরে দিয়েছো লিল্লা ছায়াঘন রাতের সৌরভ। এইবারছদকা করো দেবী চক্ষুভরা ঘুম, এই এতিম ফকির দাঁড়িয়েছি তোমার দরজায়। খতমে সেফার গুণে মনে যদি বরিষন নামেছদকায়ে জারিয়া ভেবে দান করো মনের জৌলুস। দানে জানি কমতি নাইকবে তুমি কাঙ্গালেরে খয়রাত করেছিলে দেহভরা ঘুমের গৌরব ?...গোষ্ঠীভরা এত এত মৌলানা-হাফেজ, এত এত বুজুর্গ-আলেম, বিজ্ঞ মুহাদ্দিসসকলেই পেয়েছে কি তোমার রহম ? সেফা করো ওগো দেবীভিক্ষা মাগে অন্ধ কবিয়াল, জগত ভ্রমিয়া শেষে আর কেবা হয়েছে মাকাল !...তোমার বাড়িতে এই চৈত্রমাসে ফুটে আছি অস্থির মুকুল। নিমগাছে ধরেছে কি নয়াপাতা ছায়াছিদ্র ফুল ? আমলকি গাছে বুঝি রাঙ্গাপাতা হয়েছে ব্যাকুল ? তার পাশে ছিলো সে যে লিচু আর পড়শী বকুলগোলাপজামের ফুল শুভ্র রূপে বেঁধেছে কি চুল ? বন আলো জাগলা হলে গৃহকাজে শান্ত হয় মনআমের বউলে বুঝি ডেকে আনে ভ্রমর-গুঞ্জন ? তোমার বাড়িতে আজ নিম হয়ে ফুটে আছি বনাজী কুসুমতবু তুমি ভয়ে কেনো নিজেই হয়েছো এত অস্থির অঘুম ?...উদ্ধত ভঙ্গিমা নিয়ে জেগে ওঠে দুধমরিচের ডালচৈত্রমাসি রোদে। এমন গর্বিত গ্রীবাকম্পন বিধুর মন মজে থাকে শুভ্র ইশারায়। রুয়েছো মনের টানতুঁতফল ডেকে আনে পক্ষিকুল, নামেতে ইরম। উঠানে উঠানে থাকি নীল মরিচের গাছ, বারোমাসি বেগুনের ঝোপ। একবার শুশ্রƒষায় জলছিটা দাওএ-জীবন ধূলিশূন্য হোক, অপেক্ষা ঝরুক।...তুমি এসে বসে থাকো আজসময় সামান্য অতি হায়, আজ চন্দ্র অস্ত যাবে ঠিকতোমার মহিমা-রাঙ্গা পায়।...দীর্ঘ-দীঘির সমান নীরব ক্রন্দনতুমি কি দেখোনি প্রাণ, উচাটন নিশিভর পতিত বাথানে ? কিসের রাখালি তবেঘাসে ঘাসে কিসের বন্ধন ? দূরে দিন উঠিয়াছে বিষণœ-বিপুলমন তুমি ভিজে থাকোএ-দেহে বিঁধেছে আজ রোদের ত্রিশূল। বিস্তৃত বিরাণ-মাঠে কার নামে জয়ধ্বনি ওঠে ? দূরের কুটুম ডাকে, এই নামে পুষ্পধ্বনি ফোটে।...তোমার নিমের ডালে ধরে আছে নামহীন কুঁড়ি, তারপাশে ফোটা-ফুল আর কিছু পাতা-পুষ্প-ডাল, তারা কি দুপুর-বেলা রোদে ভিজে হয়েছে বেহাল ? চৈত্রের এমন রূপ গাছে গাছে আকাল সুন্দরী। আহারে গর্জনশীল ভয় নিয়ে আসো কেনো তুমি ? দূরবাসে পড়ে থাকি, একা থাকে আমার ঘরণী। দূরত্ব প্রগাঢ় হলে কেঁপে ওঠে বিরহ ধমনীকেনো তবে এই বেলা কাঁপে পাতা কাঁপে বৃক্ষ-ভূমি ? বন্ধ করো ওহে মেঘ অচিরাৎ তোমার নর্তন, করেছে আদেশ এই মধ্যরাতে পদগ্রস্থ কবিতুলে আনো শান্ত ঢেউ, হোক তবে সুরের মন্থন, আঁকা হবে মৃদু-মন্দ হাওয়া-রাঙ্গা সুখরাত্রি ছবি। আমার রমণী দূরে আঁকে দিলে ঘর-প্রতিচ্ছবি, তার তরে মধ্যরাতে তুলে রাখি দেহের চন্দন। এই ঘরে আছো তুমি, এই ঘর তোমার স্মারক, তোমার চরণ-জলে দূর হোক মারি ও মরক।...তুমি যে ডেকেছো কাছে অচিন প্রলাপে, তুমি যে ঘিরেছো ধীরে বিভূর বিলাপেকী করে ধরেছি বক্ষে জলে-ঢাকা রাত, প্রলাপে-বিলাপে তুমি এনেছো প্রভাত। আঙ্গিনা ভরেছে ধীরে রাত্রি-ফোটা ফুলেআর কি কাটাবো পাশ স্পর্শ-মায়া ভুলে ? তুমিই ধরেছো সখি এই দুই হাত, এ-জীবনে বেঁধে রাখি সুরের রাকাত। একদিন ভুল করে জেগে দেখি রোদ, পড়ছে অচিন রাগে অধরা দরুদ। সেই থেকে মনে ধরি দিলে থাকি বাঁধা, তোমার হাসির নামে শুধু সুর সাধা। তুমি যে থাকিবে পাশে মোহমুগ্ধ দিনে, আমাকে বাঁধিও তবে জন্মমৃত্যু-ঋণে।...যা কিছু একদা ছিলো সমান বয়সী, সেও বলে নির্দ্বিধায় গম্ভীর হয়েছি। তুমিও পরেছো শাড়ি স্বর্ণলতা নাম, কেনো যে আড়াল করো বিদগ্ধ প্রণাম। সন্ধ্যা হতে বাকি নাই, কে আজ হাঁকায় ? ধরে আছো এই হাত শান্ত যমুনায়। ভুল সুরে ভুল পথে হয়েছি চাতক, আসন্ন শিশুর নামে রচিও জাতক। যদি চায় ক্লান্ত পাখি ছায়ার আশ্রয়, পাতার মহিমা ধরোডালের অভয়। কতো নাম মুছে গেলো কতো নাম ভাসে, এই বার্তা গীত হোক খড়ে আর ঘাসে। এই বংশ গীত হোককবিবংশ গীত, তুমিও ধরিও হাতবাজুক সঙ্গীত।...এ-এক বংশের গান, যে-সুরে ধরেছে মান, মিয়া মালহার রাগে। ভুলে গেছি দিনকাল, যতনে বিরাগে প্রাণ, শুধু বিরজনে জাগে। কেনো যে ভুলেছি আজ নিজস্ব-জগতএ-পথে কি ধূলি ওড়ে শস্যের শপথ ? কেনো তবে এসেছি এ গন্তব্য সীমায়বলো তুমি ধূলিপত্র শস্য কোথা হায় !...চৈত্রের তাণ্ডব শেষে তপ্তদিনে নিমেষে নেমেছেবোশেখের সদ্যজলে স্বচ্ছতোয়া ঘাসের প্রপাত। উজান স্রোতের প্রেমে যুদ্ধে কাঁপে দেহজীর্ণ মিনএমন কাতর দেহে সইবে কি তোড়ের আঘাত ? ছিলো তার নিস্তরঙ্গ কোনো এক জলার বসত, ডেকেছে তর্পণ দিনে জলসিক্ত উজানি সাকিন। পাথরে পাথরে ওঠে যাত্রাধ্বনি নিথর নিক্কণ, কে তবে দেহাতি ডাক গেয়ে ওঠেআশা বড়ো ক্ষীণ ? পরে আছি রাঙ্গাবাস দূরান্নয়ী মিন যথা দশা, যাত্রী সহচরে যারা ক্লান্তি ধারি উজান সঙ্গীন। শুনিয়া দেওয়ার ডাক মর্মে গাঁথি নব্য জলাভূমি, একাকী উজান গামি থাকি রোজ মেঘের অধীন। আছো কি তুমিও পাশে, যে তোমার করি আরাধানা ? উজাইয়ের মাছ জানি স্থলস্রোতে করিও ভজনা।...তোমাকে রেখেছি, অজানা ডেকেছি, এসেছি এত যে দূর। ভুলে-ভালে দিন, হয়েছে বিলীনতবু কি ভাঙ্গিলো ঘোর ? গুহাগাত্রে নামাবলি, এঁকেছিলে তুমি বুঝি, জন্মে-জন্মে এই পথে, তারে দেখি তারে খুঁজি। ভুলে-যাওয়া নাম ধরে, যে ডাকিতো ঘরে ঘরে, ফুটে ফুল পন্থহারা যতোতুমি না ভজেছো তারে, কেনো তবে দোলাচলে, নিজ-ছায়া ভেবেছো আহত? দূরের অতিথি হয়ে যেই গাই নিজগুণগান, এখানেও বংশ-মাঝে ফুটে দেখি অবুদ্ধ বাগান।...বন্দনা করেছি দিনযে-দিন হয়েছে ভুলে কেবলি আহত, যা কিছু হয়েছে ঋণতুলে রাখি মধ্যদিনে শিরদাঁড়া নত। এ-বংশে দিয়েছি বাতি, খুঁজে আনি আঁতিপাতি, মূলসুদ্ধ আধা-অন্ধকার। তুমি এসে বসো পাশে, তোমাকেই নৌকা ভেবে, করি আজ শব্দ পারাপার।...পারাপারে দিন যায় পারাপারে রাততুমি কি বেভুলে তারে পরাও প্রভাত ? জেগে জেগে রাত যায় ঘুমে ঘুমে দিনচক্রবৃদ্ধি হারে বুঝি বাড়ে শুধু ঋণ !...আলো-বিদ্ধ রাত্রি নামে কাছে। ডানা নাড়ে øিগ্ধ সুরে, কী যে রাত কী যে ভোরে, জন্মদাগ ঋণ পড়ে আছে। যদি থাকে মনঃস্তাপ, না করিও ভুলে মাফ, বংশ রক্ষা কুল রক্ষা রেখেছি অধীন। ভেলকিবাজি দেখে-টেখে, অযথা গন্তব্য রেখে, ঘুমঘোরে পড়ে থাকি, বেহুদা যেদিন। এ-দেহ ভুলে থাকি, এ-দেহ পুষে রাখি, অন্তর অধীনতায়। লুপ্তনাম ভোলে হাঁকি, যা কিছু রোদ মাখি, তা কি রক্ষা পায় ? মধ্যঘোরে তুমি উঠে, ডাক দিলে নিদ্রা টুটে, এ-নিদ্রা লখাইর বাসর। কী করে ভাঙ্গিবে ঘোর, এ-কর্ণে বিঁধেছে সুর, এ-চক্র নিজস্ব আছর।...পথে পথে হলো দেখা, তুমিই দিয়েছো ব্যথা, আবার নিয়েছো বুকে তুলে। ডেকে ডেকে নাম ধরে, এ-নামের শান্তি ঝরে, একদা জাগিও সন্ধ্যা হলে। তোমাকে ডেকেছি ভোরে, অনেক পৃথিবী ঘুরে, তুমিই দিয়েছো যতো তৃষ্ণা-নিবারণ। কেনো তবে এই নামে, তৃষ্ণা জাগে বারেবারে, তোমার নামের সুরে কণ্ঠ আহরণ।...লিখি রোজ পদ যতো তোমার নামের, যদি কিছু হয় ভুল, ছিন্ন করি জাতিকুল, ক্ষমা করে দিও তুমি বিক্ষিপ্ত দিলের।...আজ দিন ভালো লাগে, আজ দিন চেনা লাগে, তুমি বড়ো হাসি-হাসি তাই। কাল দিন ভালো রবে, কাল দিন নয়া হবে, তোমার চোখেতে টের পাই।...পুষি অন্ধ আঁখি, ভোরে জাগা পাখি, বাঁধি সুরের রাকাত। তুমি কি ধরিবে, এ-হাত বাঁধিবে, যদি মিলায় সাক্ষাৎ ? সেই সব কথা, ছিলো যথাতথা, বলে কাটাবো প্রহর। তুমিও শুনিবে, এ-সুর ধ্বনিবে, গাবে কীর্তন-আখর। তুমিও জ্বালিও, বংশের চেরাগ, এই মায়ামগ্ন-ঘরে। তুমিও পুষিও, বসন্ত বেহাগ, যতো বৃষ্টি-ঝঞ্ঝা-ঝড়ে।...ধরে আছি বংশবিদ্যা, আমাকে বাতাও তুমি এমন তরিকাম্লান করে পৃথিবীর তাবৎ কুলীন, হয় যেনো সিলসিলা স্বরূপে হাজির। একদিন গীত হবে এ-বংশের বাতুনি জিকির।...আর কি নিদানি থাকি, আর কি বেদ্বীন, এই কর্ণে পশেছে যেই মীরার ভজন ? সাক্ষী জ্ঞাতি এই দিলে নানক-কবীর, এ-রক্তে মিশেছে কোন হাওয়ার দূষণ ! রচিলে তুলসি দাস বংশবাতি জ্বলে, লালনের ঘর জোড়ে পড়শি বিরাজে। এ-ভিটা কি খালি থাকে, থাকে কি অধীন ? জালাল ধরেছে গীত সন্ধ্যা ফানা করে। জগত মজেছে ঘুমে দীর্ঘ চুপিসারে, চণ্ডিদাস বিপ্রলব্ধা রাধিকা ভজেছে। সেই সুর ওঠে না কি, সেই সে-বিরহ ? দোলে নৌকা নীলাম্বরী আত্মসমাহিত। এ-দিন কাহারে দানি, কে সে তুমি দেবী ? ভারতচন্দ্রে পদে দিয়েছিলে ভর। রোসাঙ্গ রাজের সভা পদ্মাবতী রূপে, আলাওল আনে বুঝি বংশের ঝলক ? আমি এক দীনহীন সভাসদগণে, কী করে কী লিখি আজ রূপের বাহান ! লিখেছে অতীত কবি জ্ঞানদাস নাম, সেই বাণীতুঁহু বিনে আন নাহি জানি, তাহার পদের নামে জানাই প্রণাম।...এ-নাদ তোমার মাঝে শান্ত-সমাহিত, এ-নাদ তোমার নামে স্তব্ধ অনাহত। ত্রিস্বরে বিবাগী মন সপ্তমে বিলায়, তোমাতে বিলীন নাদ ব্রহ্মরূপ পায়। তুমি দেবী ধরো হাত ক্লান্তি-নামা রাতে, আহত বারিষা নামে গম্ভীর বিহাগে।...তোমাকে নিয়ত জপি চৌত্রিশ প্রকারে, তোমাকে প্রত্যহ গড়ি মন্ময় আকারে। পরমগীতের ধ্বনি এই দেহে বাজে, তুমি কি উছিলা করে এ-হাত ধরিবে ? ওহো দেবী পরমার্থ অধমের ধন, তোমাকে জপিতে দিলে মলিন বদন। নিজের চৌহদ্দি রেখে অচেনা ভূগোল, কে দিলো কপালে তোলে এমন আগল ? ক্ষিদীর্ণ বিনীত ডাক তোমার বচন, জীবন-জীবিকা করে পেয়েছে ক’জন ? কাদা-মাঝে হংস যথাশিখিয়েচো তুমি, কর্দমাক্ত দেহভাণ্ড যাচে জলাভূমি।...গহন জলান্ধ-জলে হিজল সুরতরঙ্গের মাতম ওঠে নদীয়ার ঘাটে। আর নি উঠিবে সুরমদির মন্দিরা কাঁদেরাই বিরহিনী, কদম্ব তরুর ডালহস্তদ্বয় ডুবিয়েছি বাঁশুরির ডাকে। আমারে তরাও তুমিবিনোদিনীবৃন্দাবনে আহাজারি নামে ! আঁখি যুগলের মাঠেশব্দাক্রান্ত জ্বরেবংশের রাখালি করি রাত্রি ঘন হলে।

মোনাজাত : কহে শ্রী ইরম, কুলহারা মন, পদে কি গছিবে হায় ! যতনে পরাও সুরের মহিমা, ধরেছি গীতের পায়।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28803916 http://www.somewhereinblog.net/blog/ovicnet/28803916 2008-05-28 19:50:34