আমার এ লেখার আলোচ্য প্রসঙ্গ হল মানুষ ও তার শ্রেষ্ঠত্ব। মানুষ নিজেকে সৃষ্টির সেরা জীব বলে স্বঘোষিত যে কৃতিত্বের দাবিদার হল, তা যে নিছক মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়-আমি সে কথাটাই বলতে চাইব। মানুষ কিভাবে সৃষ্টির সেরা হল? সে চিন্তা করতে পারে, ভাব বিনিময় করতে পারে বা ভাষার আদান প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটায় বলেই কি সে শ্রেষ্ঠ? আর জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীকূল তার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত? সৃষ্টির শুরুতে মানুষ যখন প্রকৃতির কাছে তার সকল অসহায়ত্ব নিয়ে সমর্পিত হল , তার মধ্যে তথাকথিত মানবিক গুণাবলী তখনও পর্যন্ত ভর করেনি। তখন মানুষ আর জন্তুর মধ্যকার বিভেদ বলতে কি তেমন কিছু ছিল? সভ্যতার উন্নয়ন, অগ্রগতি ও বিবর্তনের নামে আজকের সমাজব্যবস্থায় মানুষ যখন নিজে প্রদর্শন স্বর্বস্ব জ্ঞান বিজ্ঞানে বুঁদ হয়ে শরীরে আধুনিকতার লেবাস চড়িয়ে নিজেই জীবন্ত এক মরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর এই মহাপৃথিবীর সেরা জীব হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করছে। তখন কি মানুষের এহেন মূর্খতা দেখে জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীরাও হেসে উঠছে না বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে! আমরা তা কি করে জানব, কেননা আমরাও তো আপাদমস্তক মানবদেহ নিয়েই চলাফেরা করেছি; দ্বি-পদী ও স্তন্যপায়ী হোমোসেপিয়ান্স।
মানুষকে তার কোনো কৃতকর্মের জন্য, কোনো নিকৃষ্টতাকে নির্দেশ করার জন্য সচারচর যখন গালমন্দ করা হয় বলা হয়ে থাকে, ‘ শুয়োরের বাচ্চা’, বা ‘কুকুরের বাচ্চা’। এক্ষেত্রে আমার অভিমত এই যে, শুয়োর কিংবা কুকুরও তুলনামূলকভাবে মানুষের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ সভ্য আচরণের পরিচয় দিয়ে থাকে। কুকুর কিংবা শুকরের ভাষা মানুষের বোধগম্য নয়। ওদের কথ্য ভাষা যদি আয়ত্ত করা যেত, তাহলে হয়ত আমরাও এমনটা শুনতে পেতাম যে পশুদের সমাজে ওরা গালমন্দের ক্ষেত্রে নিজেদের গোত্রের কাউকে ‘মানুষের বাচ্চা’ বলে গালি দিচ্ছে। তখন কি আমরাও বিশেষভাবে অসম্মানিত বোধ করতাম না? কাজেই হেয়প্রতিপন্ন করতে কুকুর, শুকর, গাধা কিংবা অন্যান্য পশুপাখি কীটপতঙ্গের সাথে তুলনা করে লাভ নেই।
এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’ গ্রন্থের একটি কবিতার কথা মনে পড়ে গেল। এই গ্রন্থের ‘সমব্যথী’ শিরোনামের কবিতাটির কিছু অংশ পড়া যাক : ‘যদি খোকা না হয়ে/ আমি হতেম কুকুরছানা/ তবে পাছে তোমার পাতে/ আমি মুখ দিতে যাই ভাতে/ তুমি করতে আমায় মানা?’ এই অংশে আমরা শুনতে পাচ্ছি খোকা তার মার কাছে জানতে চাচ্ছে সে যদি মানবশিশু না হয়ে কুকুরছানা হত, তবে তার প্রতি মায়ের আচরণ কেমন হত। খোকা আরো বলছে- ‘সত্যি করে বল,/ আমায় করিস নে মা, ছল- / বলতে আমায় ‘দূর দূর দূর!/ কোথা থেকে এল এই কুকুর? / যা মা, তবে যা মা, / আমায় কোলের থেকে নামা।এখানে দেখতে পাচ্ছি খোকা কিন্তু জানে, তার মা তখন তাকে অতটা আদর যত্নে মুখে খাবার তুলে না দিয়ে দূর দূর করে তাড়িয়েও দিতে পারত। কুকুর ছানার প্রতি মায়ের এই সম্ভাব্য বৈরী আচরণকে খোকা মানতে পারছে না। তাই সে বলছে ‘আমি খাব না তোর হাতে/ আমি খাব না তো পাতে ॥’
পরের অংশে এসে খোকা নিজের অবস্থানে একটা টিয়া পাখিকে বসিয়ে রেখে দূর থেকে দেখতে চায় মায়ের মমত্ববোধের, মাতৃত্বের মধ্যেকার পরিবর্তিত রূপ। তাই সে বলে- ‘যদি খোকা না হয়ে/ আমি হতেম তোমার টিয়ে/ তবে পাছে যাই মা, উড়ে/ আমায় রাখতে শিকল দিয়ে?/ শেকলে বেঁধে রাখা টিয়া পাখির যন্ত্রণা রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন। তাই সে শিশুমনের সরল অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে মায়ের প্রতি খোকার স্বগত সংলাপে তুলে আনেন কুকুর ছানা কিংবা টিয়া পাখির মত জীবজগতে মানুষের কাছে আপাত নগন্য পশুপাখির সাথে মানব শিশুর সম্পর্কিত হবার চেতনা। সমব্যথী কবিতার শেষের স্তবকে এসে আমরা শুনতে পাই খোকা বলছে, আমায় ভালোবাসিস নে মা।/ আমি রব না তোর কোলে,/ আমি বনেই যাব চলে ॥’
যে বন থেকে মানুষ জনপদে এসেছিল একদিন, খোকা কিনা সেই আদিম প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চাইছে শেষে! রবীন্দ্রনাথ ভালোই জানতেন, মানুষর শেষ আশ্রয়স্থলটুকু কোথায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত খুঁজে নিতে হবে তাকে, সেই ইঙ্গিত আমরা রবীন্দ্র সাহিত্যে অন্যত্র বিস্তর পাই।
কথা উঠেছিল। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে। ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’ এই স্বীকৃতি তো তাকে জীবজগতের অন্য কোনো প্রাণী দেয়নি। অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীদের এ জাতীয় প্রবণতা আছে বলেও মনে হয় না। ফলে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে মানুষকে যখন উচ্ছসিত হতে দেখি, সগর্বে সে যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উচ্চশিখরে আরোহনের কথা বলে, তখনই ভয় হয়।মানুষ হিসেবে সে তার অবশ্যাম্ভাবী পতন সম্ভাবনার কথা জানে তো?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


