ছোট বেলায় আমরা বইয়ে পড়েছি এবং শুনেছি হ্যামেলিনের বাশিওয়ালার গল্প। এখন পর্যন্ত আমরা শুধু এটিকে একটি রূপকথা বলেই জানি। অনেকেই হয়তো জানেন না বাস্তবে এমন একটি ঘটনার কথাও শুনা যায়।
বিস্তারিত:
জার্মানির লোয়ার সাক্সনি প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আকাবাকা ওয়েজার নদীর তীরে অবস্থিত ছবির মত সুন্দর একটি শহর হ্যামেলিন। সেই শহরের ছোট্ট্র একটি রাস্তার নাম ”বুঙ্গে লোজেন স্ট্রীট বা নো ড্রাম স্ট্রীট” গত প্রায় সাতশ বছর ধরে এই রাস্তায় সকল ধরনের গান কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষেধ। কারন ১২৮৪ সালে এই রাস্তায় এক রহস্যময় বাশিওয়ালার পিছু নিয়ে ১৩০টি ছেলেমেয়ে হারিয়ে যায় যাদের কোন খোজ-খবর আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এটি একটি রহস্য যে ১৩০টি শিশু কোথায় হারিয়ে গেল?? বেচে থাকলে তাদের কেউ কেউ না কেউর তো এই শহরে ফিরে আসার কথা।
নো ড্রাম স্ট্রিটে একটি পুরাতন কাঠের ফলকে লিখা আছে ”১২৮৪ সালের জন ও পল দিবসে তারিখটি ছিল ২৬শে জুন, সেই দিন হ্যামেলিনে জন্মগ্রহণকারী ১৩০টি শিশু হরেক রংয়ের পোশাক পরা এক বংশীবাদকের পিছু নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়” লেখা থেকে বুঝা যায় ১২৮৪ সালের ২৬শে জুন এই শহরে দু:খজনক ঘটনা ঘটেছিল।
হ্যামেলিনের যাদুঘরে এই শহরটি সম্পর্কে অনেক অদ্ভূত এবং অসাধারণ কাহিনীর বিভিন্ন স্মারক পাওয়া যায়। শুধু সেই রহস্যময় বাশিওয়ালা সম্পর্কিত বই ও পান্ডুলিপি আছে সাড়ে তিনশ এর মতো। পঞ্চদশ শতকের একটি পান্ডুলিপি থেকে আন্দাজ করা যায় একজন বংশীবাদক সত্যি সত্যিই ছিলেন। পান্ডুলিপিতে ৩০ বছর বয়সী এক সুদর্শন তরুনের কথা বলা হয়েছে যে একটি রূপালী বাশি বাজিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করতো। যে শিশুই তার বাশি শুনেছে সেই তার পিছু নিতো। ফ্রাউ ভন লুডে নাম্নী নামের এক মহিলা নিজ চোখে এই ঘটনা দেখেছিলেন। শিশুরা নিখোজ হওয়ার পর তাদের বাবা-মারা কোথাও খোজ বাকি রাখেন নি কিন্তু তাদের কোন হদিশ পাওয়া যায়নি।
আরেকটি বই থেকে জানা যায় যে, ১৩০০ খৃস্টাব্দের দিকে হ্যামেলিনবাসীরা তাদের মার্কেট চার্চে একটি স্মারক জানালা স্থাপন করে। ওই জানালার গায়ে লিখিত বিবরনীতে বলা হয় যে, "কোপেন অবধি সবধরনের বিপদই শিশুরা অতিক্রম করেছে এবং তারপর তারা অদৃশ্য হয়ে যায়” আরেক লেখায় জানা যায় যে, এই জানালায় একদল শিশুর মধ্যে রঙ্গীন পোশাক পরা একটি বয়সী লোকের ছবি ছিলো। এই লেখায় বাশি বা কোনধরনের সঙ্গীতযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। শোনা যায় এই স্মারক জানালাটি ১৭০০ শতকে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
এসব বিবরনী থেকে নতুন প্রশ্ন এসে যায় যে, বংশীবাদক কি তরুন ছিলেন না বয়সী?? তার সাথে বাশি ছিল নাকি না?? তাহলে তার সাথে ইদুরের সম্পর্ক কি?? এর উত্তর পওয়া যায় ১৯৫২ সালে আকা একটি জলরংয়ের ছবিতে। ছবিতে দেখা যায় একেবারে সামনের দিকে একজন অপেক্ষাকৃত বয়স্ক লোককে-বেশ তাগড়া স্বাস্থ্য মুখে গোফ, দেখতে হৃদয়বান বলেই মনে হয়। পরনে বহুবর্ণ পোশাক। ছবিতে তার পিছনে দুটি বেকগ্রাউন্ড দেখা যায়। একটিতে সে শিশুদের নিয়ে পাহাড়ের সামনে, পাহাড়ে গায়ে একটি বিরাট ফাটল হা হয়ে আছে, আরেকটিতে বংশীবাদককে ওয়েজার নদীতে একটি নৌকায় দেখা যাচ্ছে, তার বাশির সূরে ঝাকে ঝাকে ইদুর পানিতে লাফিয়ে পড়ছে। কোন কোন মধ্যযুগীয় প্রতীকে মানুষের আত্মাকে বুঝাতে ইদুর বুঝাতো। তাহলে কি এই পেইন্টিং অপহৃত ১৩০ জন শিশুর কথাই বলছে?? এবং রূপকভাবে এও বলছে যে ওই শিশুরা আসলে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছিল!!!
মধ্যযুগে ইউরোপে ইদুরের আধিক্য ছিল সাধারণ ব্যাপার। তেমনি ছিল বিস্ময়কর ইদুর মারার গল্প। এমনকি হতে পারে কোন রেটক্যাচার ইদুরদের নদীতে ডুবিয়ে মেরে ছিল?? অসম্ভব না।
এমনও হতে পারে সেই বাশিওয়ালা বাশির সূরে ইদুরদের সম্মোহিত করেছিল। আধুনিক বিজ্ঞান বলে এটি অসম্ভব নয়। উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ দিয়ে ইদুরকে সম্মোহিত করা সম্ভব। হ্যামেলিনের যাদুঘরে একটি টিনের বাশি রক্ষিত আছে, এক ইংরেজ রেটক্যাচার এটি ব্যবহার করতো। এর তীব্র এবং তীক্ষ্ম আওয়াজের মাধ্যমে সে হাজার হাজার ইদুর তাড়িয়ে নিয়ে যেত ফাদের মাঝে।
সুতরাং এমনও হতে পারে কোন এক রেটক্যাচার হ্যামেলিনে এসেছিলো। সে তার কাজ শেষ করার পরেও শহরবাসী তাকে প্রাপ্য অর্থ দেয়নি। ঐ সময় শহরের কোন শিশুও হারানো গিয়েছে হয়তোবা। যার দায় ভার সবাই বাশিওয়ারার উপর চাপিয়ে দেয়। এবং মানুষের মুখে মুখে তাই তিল থেকে তরমুজ হয়ে যায়। সাধারণত লোক-কাহিনীর বেলায় তা হয়ে থাকে।
৩০০ বছর আগের পন্ডিতেরা অবশ্য একটু ভিন্ন ধারনা পোষন করেন। মধ্যযুগের বিভিন্ন পান্ডুলিপিতে দেখা যায় জার্মানদের আরো পুবদিকে স্লাভ ভূখন্ডে চলে যেতে বলা হচ্ছে অনেকটা এভাবে ”দেশটি ভারী চমৎকার মাংস, মধু, হাঁস-মুরগী ও আটা-ময়দার ভরপুর। কাজেই স্যাক্সন ও ফ্রাঙ্কোনিয়ানরা, তোমরা এখানেই এসো”
তাহলে কি হ্যামেলিনের শিশুরা ওই স্লাভ ভূখন্ডেই গিয়েছিলো?? বিশেষজ্ঞ ও পন্ডিতেরা খুঁটিনাটি তথ্য নিয়ে ভিন্নমত পোষন করলেও এই ব্যাপারে সবাই একমত যে শিশুরা পুবদিকেই গিয়েছিলো।
ত্রয়োদশ শতাব্দির অতিরিক্ত জনসংখ্যা পীড়িত শহরগুলিতে ”ইস্ট বা পুবদিক” ছিল একটি প্রতিশ্রুতিময় শব্দ। অন্যদিকে স্লাভ ও জার্মান লর্ড বা জমিদাররা জার্মানদের পুব দিকে যেতে সহায়তা করতেন যে তারা হয়তো রাশিয়ান তাতারদের হামলা থেকে বাচতে সহায়তা করতে পারে। ফলে ঝাকে ঝাকে জার্মানরা বসতি স্থাপন করতে লাগলো স্লাভ অঞ্চলে। প্রিন্স ও নোবলরা এদের প্রায়ই পৃষ্ঠপোষকতা করতো। কারন জার্মানীর সীমান্তবর্তী শহরগুলির সঙ্গে এর ফলে তারা বানিজ্য করার একটি বাড়তি সুবিধা পেত। এবং সে সময় এক ধরনের আদম ব্যাপারী বা রিক্রুটিং এজেন্টের দলও গড়ে উঠে। এ থেকে একজন গবেষক বলতে চাইছেন যে, হ্যামেলিনের বাশিওয়ালা আসলে একজন আদম ব্যাপারী বা রিক্রুটিং এজেন্ট। যে ১৩০ জন তরুন এবং কিশোরকে সমৃদ্ধির দেশ স্লাভ ভূখেন্ডে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করেছিলো।
২৬শে জুন, ১২৮৪ হ্যামেলিন শহরে ছিলো ধর্মীয় ছুটির দিন। বহুবর্ন পোশাক পরে বাশি বাজিয়ে প্রানবন্ত এক রিক্রুটিং অফিসার হয়তোবা আপনমনে ব্যস্ত ছিলো আপন কাজে। তবে সে যাদের জমায়েত করেছিলো তারা হয়েতোবা লোক-কাহিনীর শিশুরা নয় বরং তারা ছিলো শহরের কর্মহীন কিশোর যাদের এ্যাডভেঞ্চারের প্রতি ঝোক ছিলো।
এমন একটি কিংবদন্তী কেন হ্যামেলিনেই ঘটলো?? তাহলে কি ওই শিশুদের ভাগ্যে ভয়ানক কিছু ঘটেছিলো?? এর একটি সম্ভাব্য জবাব পাওয়া যায় হ্যামেলিনের অবসরপ্রাপ্ত স্কুল মাস্টার ডোবারটিনের কাছে। জীবনের বেশীরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন হ্যামেলিনের নিখোজ শিশুদের নিয়ে পড়াশোনা করে। তার দৃঢ় ধারনা, হ্যামেলিনের সেই শিশুরা উত্তর-পূর্ব দিকে চলে যায় এবং একটি জাহাজে আরোহন করে। জাহাজটি পোমেরানিয়ান উপকূলের কোপান নামক গ্রামের কাছে সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়। কোপান গ্রামটি বর্তমানে পোলান্ডের
অন্তভূক্ত। এই কোপানই হচ্ছে মধ্যযুগের বিভিন্ন ফলকে কথিত কোপেন পাহাড়। হ্যামেলিনের লোকেরা দুটি নামকে গুলিয়ে ফেলে। বহু প্রাচীন নথিপত্র ঘেটে এসব তথ্য উদ্ধার করেছেন ডোবারটিন। এসব নথিপত্রে কাউন্ট নিকোলাস ভন স্পিয়েজেলবার্গ নামক এক জার্মান উপনিবেশ-স্থপয়িতার বিবরণ পাওয়া যায়। হ্যামেলিনের আশে পাশে এই লোকটির বিভিন্ন সম্পর্ক সূত্র ছিলো। স্পিয়েজেলবার্গকে শেষ দেখা যায় বালর্টিক সাগর তীরবর্তী জার্মান বন্দর স্টেটিন এ, ৮ জুলাই ১২৮৪ সালে, হ্যামেলিনের শিশুরা অদৃশ্য হওয়ার ১২ দিন পর। অবাক ব্যাপার হলো স্টেটিন বন্দরের সাথে হ্যামেলিনের দূরত্ব ১২ দিনের। আর কোপান হচ্ছে বালর্টিক অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী জার্মানদের যাতায়াতের পথে ছোট একটি বন্দর। আরো জানা যায় স্পিয়েজেলবার্গের সাথে তার দুই ভাইও ছিলো। তাদের কাউকেই হ্যামেলিনের ওই ঘটনার পরে কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি কোপানেও তারা পৌছাননি অর্থাৎ তারা মাঝপথে অদৃশ্য হয়েছেন। অনেকের ধারনা তারা জাহাজ ডুবিতে মারা গেছেন এবং তাদের সাথে হ্যামেলিনের ১৩০ শিশুও পানিতে ডুবে মারা যায়।
তাহলে কি নিকোলাস ভন স্পিয়েজেলবার্গই সেই রহস্যময় বংশীবাদক?? তিনিই জলরংয়ে আকা সেই বংশীবাদক??
ডোবারম্যান বলেন, সেটাই যথার্থ উত্তর মনে হয়। তিনি একজন জার্মান অভিজাত শ্রেণীর লোক ছিলেন। তার পরনে জমকালো পোশাক ছিলো। তার সাথে বাদকদল থাকাও অস্বাভাবিক না। কালক্রমে সেই বাদকদল পরিনত হয়েছে একজন বাশিওয়ালা। অবশ্য ডোবারটিনের এই তত্ত্বের সাথে অনেকেই একমত না। কিন্তু এর চেয়ে শক্ত কোন তত্ত্ব উপস্থাপন না করা পর্যন্ত স্পিয়েজেলবার্গই সেই রহস্যময় বংশীবাদক।
আরো বিস্তারিত
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



