somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বড় হব, অ..নে...ক বড় (২)

২৫ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে উঠলাম, কিন্তু বড় হলাম না (ম্যাচিউর অর্থে), কারো চোখেই না। সারাদিন খেলাধুলার ফাঁকে ফাঁকে যেটুকু সময় পেতাম লেখাপড়া আর দুষ্টুমি করেই কাটাতাম। ও আচ্ছা বলা হয়নি ক্লাস সেভেনে থাকতেই ক্রিকেট আমার জান-প্রাণ হয়ে উঠেছে। কলেজে ওঠার আগেই লেখাপড়ার চেয়ে খেলাটাকেই আমার বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হত। মনে আছে এসএসসি পরীক্ষার আগের দিন মাঠে খেলতে গিয়েছিলাম আর এক সিনিয়র খেলোয়ার আমাকে বলেছিলেন যে আমাকে খেলায় নেয়া হবে না কারণ আমি পরীক্ষায় ফেল করব তারা নিশ্চিত, কিন্তু দোষটা হবে তাদের। কিন্তু পাশ করেছিলাম কিভাবে যেন এবং তখনকার দিনে অনেক ভাল একটা রেজাল্টও হয়েছিল। কিন্তু কলেজে উঠে ক্রিকেট আর গেল না। ক্লাস মিস করতাম না ঠিকই কিন্তু খেলাও মিস করতাম না কোনটাই। প্রতিদিন ক্লাস শেষে বাসায় গিয়ে চারটি খেয়ে উঠেই সাইকেল আর ব্যাগ নিয়ে স্টেডিয়াম যতবার সম্ভব পুরো স্টেডিয়াম চক্কর তারপর অনেকক্ষণ ফিল্ডিং প্র্যাকটিস অল্প একটু ব্যাটিং-মন ভরত না কোচ ভাইয়ার উপর দারূণ রাগ হত। কিন্তু করার থাকতো না কিছুই। প্র্যাকটিস শেষে শেষ বিকেলে প্রাইভেট পড়ে তারপর বাসায়। আর ছুটির দিন হলে তো কোন কথাই নেই। সকালে এক ম্যাচ বিকেলে এক ম্যাচ। পড়ার সময় একটা কিছু হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করার অভ্যাস ছিল- তা কলম কিংবা পেপার ওয়েট যাই হোক না কেন। এক পর্যায়ে সেই জায়গাটিতে উঠে এসেছিল ক্রিকেট বল। পড়ার সময় চোখের সামনে ভাসত বলটা কোন লেংথে আসলে কোন শট খেলতে হবে কিংবা অন দ্য রাইজে খেলতে হলে ব্যাকফুট নাকি ফ্রন্টফুটে বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে। স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়াটাও একসময় গৌণ হয়ে উঠেছিল, টাকাটা প্রতি মাসেই দিতাম কিন্তু পড়াটা অল্পই পড়তাম। সবার যখন কোর্স শেষ হয়ে যাওয়ার পথে তখন সবার হাত পা ধরে নোট নিয়ে কোনমতে সামলিয়ে উঠতাম। রেজাল্ট খুব খারাপ না হলেও বাসায় জিজ্ঞাসা করলে খুব ভাল বলাটা একধরণের মিথ্যেই বলা হত।

কলম খেলা কলেজেও চালু ছিল। লেইজার মানেই কলম হাতে ডায়াসের পাশের টেবিলের চারদিকে আমরা চারজন। এত কিছুর মাঝে দু’একজন ফ্রেণ্ড যে আমাদের ক্লাসের কোন কোন মেয়েকে পছন্দ করার কাজটিও সেরে ফেলেছে তা চোখেই পড়েনি। আমার মধ্যে তখন একটু লম্বা হবার ভাব দেখাচ্ছিল। খুব কম বয়স দেখা যায় এরকম দু’একজনের সাথে মাঝে মাঝে সামান্য কথা হলেও সেটুকুই সব। আমার তো সময়ই নেই, ভাববার কিংবা সময় কাটাবার। বসতাম সেকেন্ড বেঞ্চে যাতে লেকচার শোনা যায় আবার প্রয়োজনীয় দুষ্টুমিও করা যায়, স্যারের চোখে ধরা না দিয়েই। আমাদের ক্লাসে বেশ কয়েকজন নিনজা থাকলেও তাদের একই রকম মনে হত। এক নিনজার চোখ দুটো আমার খুবই ফেবারিট ছিল (সুন্দর চোখের প্রতি আমার দুর্বলতা বরাবরের)। হঠাৎ একদিন দেখি এক নিনজার মুখ খোলা। আমার তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। এত সুন্দর ও! রোলকলের সময় ওর নাম কি তা জানার জন্য উদগ্যীব হয়ে থাকলাম। কানিজ ফাতেমা না কি যেন নাম বললেন স্যার। আমার স্কুলের ক্লাসমেট ফাতেমা আপাকে নাম জিজ্ঞাসা করায় জানাল ওর ডাক নাম কণা (ওর সাথে কেমন যেন খাপ খেয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেন একখন্ড শিশির কণা)। অন্যান্য সময় অত না ভাবলেও ক্লাসে আসলে ঠিকই ওর দিকে চোরাচোখে তাকাবার চেষ্টা করতাম। হঠাৎ চোখাচোখিও হত। আমি কি আর জানতাম, ও শহরের মেয়ে- স্কুলে থাকতেই ঢাবির এক ছেলের সাথে ইটিস-পিটিস করত! একদিন দেখলাম যমুনার ধারে এক ছেলের সাথে মোটর সাইকেলে ঘুরতে-বোরকা ছাড়া। হালকা কষ্টিত হলাম। তারপর আর ওর দিকে তাকাতাম না। ও-ও খুব বেশি ক্লাসে আসত না। বিয়ে নাকি হয়ে গিয়েছিল (পরে মাস্টার্সে পড়ার সময় ক্যাম্পাসে ওকে শেষ দেখেছিলাম- ঠিক আগের মতই আছে শুধু সাথে বছর পাঁচ ছয়েকের একটি ছেলে)।

আজব এক জীবন কাটিয়েছি কলেজে। সারাদিন শুধু খেলাধুলা। ক্রিকেট ছাড়াও সন্ধায় লাইটিং করে ব্যাটমিন্টন।

বড় আমার কোনদিনও হওয়া হয়ে উঠল না। সেই ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময়ই টারজানকে দেখতাম- একই সাথে পড়ি, আমার চেয়ে বড়জোর এক-দু বছরের বড় হবে অথচ তাতেই ওর ব্যাক্তিত্ব এসে গিয়েছিল চলনে-বলনে, কথাবার্তায় এমনকি তাকানোর ভঙ্গিতে পর্যন্ত। আম্মু বলত ইশ্ আমার যদি এরকম একটা ছেলে হত শান্ত-শিষ্ট, লক্ষীমন্ত! দুরন্তপনার জন্য মার হয়তো খাইনি কিন্তু এত বেশি বকা শুনেছি সবার কাছে কোন কোন সময় আমার মনে হত সত্যিই তো কেন আমি এত দুরন্ত! কেন একটু লক্ষী হইনা! মায়ের শখ তার একটা লক্ষী ছেলে থাকবে অথচ একটাই ছেলে তার তাও আবার বদমাইশের হা্িড্ড!! খারাপও লাগত, ভাল হয়ে যাওয়ার তাগাদা আসত ভেতর থেকে। কিন্তু তা মুহুর্তের জন্য। রাতে চিন্তা করলে পরদিন সকালেই সব বেমালুম ভুলে গিয়ে আবারও ব্যাট হাতে রওনা। দুপুরের খাওয়ার সময়টুকুতে মা তার সব উষ্মা ঢালার চেষ্টা করতেন-অনেক দিনই না খেয়ে উঠে যেতে হয়েছে রাগ করে। মা এতে অনেক কষ্ট পেত। খানিক পরেই এসে বলত, “ভাত খেলিনা, কয়েকটা পিঠা বানিয়ে দেই? এরকম করিস কেন তুই তো আমার একটাই ধন, লেখাপড়া না করলে কি করবি বড় হলে? তোকে নিয়ে সবার কত আশা, সব নষ্ট করে দিবি?” কেঁদে ফেলতাম, সরি বলতাম তক্ষুণি ভাত খেতে বসতাম আবারও। সাথে জোর করে মাকেও বসাতাম- আমি খাইনি বলে বেচারি নিজেও খেতে বসতে পারেনি। কিন্তু ভালটাই হওয়া হল না। রাতে পড়তে বসে (পড়ার একটাই সময় ছিল- সাবইকে দেখতাম দিনে-রাতে পড়তে আমার তো সময়ই ছিল না) বইয়ের নীচে গল্পের বই লুকিয়ে রাখতাম। মা মাঝে মাঝে ইনকোয়ারিতে এসে ধরে ফেলত। চিমটি কাটতো আচ্ছা করে, কিন্ত আমার গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। একসময় খড়ি দিয়ে দু’একটা লাগাত (খুব বেশি জোরে না অবশ্য মা আমাকে জোরে মারার কথা চিন্তাও করতে পারত না, মারটা ছিল আদরের মার কিন্ত যাতে একটু হলেও লাগে সেরকম)। কিন্তু কার কি কটা বই ছিড়বে, কটা চিমটি কাটবে আর কত মারবে!! আমাদের প্রতিবেশিনী এক আন্টি বলতেন মিলন তুই হইলি গণ্ডার। শেষ পর্যন্ত মা একটা উপায় বের করেছিল গল্পের বই কেড়ে নেয়ার-সুড়সুড়ি দেয়া। একটাতেই কাত হতাম আমি। ছোট বোনটিকে দিয়ে এটার প্র্যাকটিস করে এক সময় সুড়সুড়িও গায়েব করে ফেলেছিলাম।

সবকিছুর অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল পরীক্ষায়। পরীক্ষার মাত্র দু’-এক সপ্তাহ আগে আমার টনক নড়ল যে আমি এত অল্প সময়ে এত বড় সিলেবাস শেষ করব কিভাবে। অনেক চেষ্টা করে গুছিয়ে আনলাম। পরীক্ষাও দিলাম...পাশও করলাম। কিন্তু এসএসসি-র তুলনায় রেজাল্ট এমনই যে আব্বা বললেন একে দিয়ে কিছু হবে না। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে চাষবাস করার পরামর্শ (বাসা থেকে বের করে দেয়া আর কি) দিলেন তিনি।

বের হয়ে যেতে হল বাসা থেকে-মাকে কাঁদিয়ে। নিজের বড় হওয়ার স্বপ্নটার গলায় পা দিয়ে। খানিকটা যেন মনে হল আমার বড় হওয়া শেষ হয়ে গেল এখানেই।

কিন্তু ফিরতে হল আবারও। বড় হতে হবে যে!! অ..নে..ক বড়!!!



৮টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×