আগের পর্বগুলোর লিঙ্কঃ প্রেম প্রচেষ্টা - পর্ব ১, প্রেম প্রচেষ্টা - পর্ব ২
অনামিকার সহিত পরিচয় হইলো। এইবার কন্যা বিরস মুখে জিজ্ঞাসা করিলো, "কি বলিবেন বলেন"। শুনিয়া আমি তো ভ্যাবাচেকা খাইয়া গেলাম। আরে, ইহা বলে কি! প্রেম করিবার জন্যে দিন রাত জাগিয়া কত্তো পরিকল্পনা করিলাম, ইহা কি রাস্তায় দাড়াইয়া দুই মিনিটে খোলাসা করিবার বিষয়? বলিলাম এইভাবে হইবে না, কোথাও বসিয়া বলিতে হইবে। শুনিয়া কন্যা বড়ই বেজার হইলো। ভাবখানা এমন যে "কথা শুনিতে আসিয়া এই কি ফ্যাসাদে পড়িলাম!" অতএব আমি এবং আমার দোস্ত আলোচনায় বসিলাম কোথায় যাওয়া যায় উহা লইয়া। আর কন্যা তাগাদা দিতে লাগিলো জলদি সিদ্ধান্ত লইতে। তাহার নাকি বাড়ি ফিরিতে দেরী হইয়া যাইতেছে। আমরা দেখিলাম কন্যার বাড়ি গিয়া এই ব্যপারে আলোচনা করা যাইবে না। ইহাতে কন্যার হাড়-হাড্ডি উহার অভিভাবকের দ্বারা মেরামতির যথেষ্ট সম্ভাবনা রহিয়াছে। দোস্তের বাড়িতেও খুব একটা সুবিধা হইবে বলিয়া মনে হইলো না। ফাস্ট ফুডের দোকানে বসিয়া আলোচনার তো প্রশ্নই উঠে না। এইদিকে কন্যার বারংবার তাগাদায় আগুপিছু কিছু না ভাবিয়াই আমি প্রস্তাব করিয়া বসিলাম যে আমার বাসায় গিয়া আলোচনা করা যাইতে পারে। ভাবি নাই কন্যা কোনমতেই হুট করিয়া স্বল্পপরিচিত কাহারও সহিত তাহার বাসায় যাইতে রাজি হইয়া যাইবে। কিন্তু দেখিলাম কন্যা রাজ্যের বিরক্তি লইয়া, যেন একান্তই না পারিতে রাজি হইতে হইতেছে এমন একটা ভাব করিয়া রাজি হইয়া গেলো। অতএব কি আর করা, তিনজনে গম্ভীর মুখে পদযাত্রায় রওয়ানা হইলাম আমাদের গন্তব্য অভিমুখে।
বাড়ির গেইট দিয়া ঢুকিয়া যখন দ্বিতীয় তলা অভিমুখে সিড়ি ভাঙ্গিতেছি, টের পাইলাম নিচতলায় ততোক্ষণে জোর কানাঘুসা শুরু হইয়া গিয়াছে। বাড়িতে ঢুকিবার মুখেই একতলায় তখন এক গুপ্তচর প্রবৃত্তির পরিবার বসবাস করিতো। উহাদের পবিত্র কর্মই ছিলো এক বাড়ির খবর লইয়া মুখরোচক গল্প বানাইয়া তাহাকে বিনামূল্যে দশ বাড়ি বিতরণ করা। সেইক্ষেত্রে আমি এক অপরিচিত কন্যা লইয়া বাসায় যাইতেছি, উহা তো এমনিতেই যথেষ্ট মুখরোচক। যাই হোক, আমি কন্যা লইয়া বন্ধুসমেত বাসায় ঢুকিয়া সটান আমার বেডরুমে চলিয়া গেলাম। রুমে ঢুকিয়া কন্যা উহার বোরখার অবগুন্ঠন খুলিলো। কুন্তল একরাশ দীঘল কেশের সহিত তাহার সৌন্দর্যের প্রস্ফুটনে যেন সেইসাথে আমার ঘুপচি রুমখানাও আনন্দে ঝলমল করিয়া উঠিলো। অতঃপর শুরু হইলো আমাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক।
আমি কন্যাকে জিজ্ঞাসা করিলাম অমুক নামের কাহারও সহিত তাহার পরিচয় আছে কিনা। সে গম্ভীর মুখে উল্টা জানিতে চাহিলো পরিচয় থাকিলে কি করিতে হইবে? আমি আমতা আমতা করিয়া বলিলাম, না মানে ইয়ে, তোমার মাধ্যমে উহার সহিত আমি পরিচিত হইতে চাই। কেন? উহার সহিত আমি বন্ধুত্ব করিতে আগ্রহী।
ব্যস, শুরু হইয়া গেলো কন্যার নাতিদীর্ঘ বর্ক্তৃতা। বর্ক্তৃতার মূল বিষয় হইতেছে যে একটি পুরষের সহিত একটি কন্যার কখনো কোন বন্ধুত্বের সম্পর্ক হইতে পারে না। হইলে একমাত্র প্রেম হইতে পারে, এবং উহা স্বর্গীয় ব্যপার। চেষ্টা করিলেই প্রেম করা সম্ভব নহে। এই জন্যে উপরওয়ালার কাছে কান্নাকাটি করিয়া দোয়া করিতে হইবে। কেবলমাত্র উপরয়ালার ইচ্ছা থাকিলেই কাহারও জীবনে সত্যিকারের প্রেম আসিতে পারে।
আমার হইতে ছয় বছরের ছোট কাহারও কাছ হইতে প্রেম বিষয়ক এহেন তাত্ত্বিক বানী শুনিয়া আমি তো বেশ থতমত খাইয়া গেলাম। হায় সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেমাগী কন্যা!! কি বলিবো বুঝিয়া পাইতেছিলাম না। ভাগ্যিস তখুনি বন্ধ দরজা কিঞ্চিত্ ফাঁক করিয়া জুলুজুলু দুইখানা চক্ষু দরজার ফাঁক দিয়া উঁকি দিলো রুমে। এবং আমাদের শ্যেনদৃষ্টিতে ধরা পড়িয়া গেছে টের পাইয়া একরাশ দুষ্টুমিভরা হাসি লইয়া চক্ষুর সহিত চক্ষুর মালিকের বিশাল বপুও রুমে প্রবেশ করিলো। আর এইভাবেই মাতৃদেবীর আগমনে বিব্রতকর পরিস্থিতি হইতে উদ্ধার পাওয়ায় আমি হাফ ছাড়িয়া বাঁচিলাম। বুঝিলাম একতলার গুপ্তচরদের বদৌলতে কন্যার সংবাদ তা হইলে এতোক্ষণে আমার জননীর কর্ণ পর্যন্ত গোচরীভুত হইয়া গিয়াছে। আমার জননী তো রুমে ঢুকিয়া কন্যা আবিষ্কার করিতে পারিয়া খুশিতে গুলগুলা হইয়া গেলেন। বিজয়িনীর হাসি দিয়া আমার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাইলেন যেন, "হেহ হেহ! আমাকে ফাঁকি দিয়া কই যাইবা? আমি ঠিকই কন্যার খবর পাইয়া গিয়াছি!" কি আর করা, মাতৃদেবীর সহিত কন্যার পরিচয় করাইয়া দিলাম। বলিলাম যে ইহা আমাদের এক বান্ধবী হয়। আমার ছোট ভাইয়ের বদৌলতে সন্তানদের বান্ধবী থাকা এবং উহাদের মাঝে মধ্যে বাসায় আগমন আমাদের বাসায় নতুন কিছু নহে। অতএব এরপর কিছুক্ষন চলিলো বান্ধবীর আপ্যায়ন পর্ব। সেইসাথে বহুবিধ সামাজিক আলাপচারিতা। অবশেষে যখন বিদায় লইবার সময় আসিল, ঘর হইতে বাহির হইতে হইতে হঠাত্ করিয়া কন্যার চোখে ধরা পড়িয়া গেলো আমার গল্পের বইয়ের ভান্ডারখানা। ব্যস আর যায় কোথায়, সাথেসাথেই সে তাহার কাঠিন্যের খোলস ভাঙ্গিয়া ছোট্ট বালিকার ন্যায় তিড়িংবিড়িং করা শুরু করিয়া দিলো। বুঝিলাম আমার মতো এই কন্যাও গল্পের বইয়ের এক কঠিন পোকা। অতএব তাহাকে দেখাইতে লইয়া গেলাম লিভিংরুমের সেলফে আমার আরও বিশাল বইয়ের ভান্ডারখানা। একসাথে কয়েক হাজার গল্পের বই দেখিয়া তো তাহার চক্ষু ছানাবড়া। দেখা যায় যেই বইয়ের নাম বলে, উহাই আমার ভান্ডারে রহিয়াছে। এর পরে কি হইলো তাহা তো অতি সহজেই অনুমেয়। একগাদা বই বগলদাবা করিয়া, এবং ভবিষ্যতে এইরকম আরও বই উহাকে নিয়মিত প্রেরণ করিবার কথা আদায় করিয়া খুশিমনে কন্যা অবশেষে তাহার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলো। নিচে নামিয়া তাহাদিগকে যখন রাস্তা পর্যন্ত আগাইয়া দিয়া আসিতেছি, দেখিলাম একতলার বিভিন্ন ঘরবাড়ির দরজা জানালা দিয়া কয়েক ডজন চক্ষু আমাদিগকে অনুসরন করিতেছে। মনে মনে ভাবিলাম কন্যার সংবাদ চতুর্দিকে এমন দ্রুত পাচার করিবার মতো এইরকম একটা ঢোলী ফ্যামিলি কাছাকাছি থাকিতে সবাইকে কোন সংবাদ দিতে হইলে আমাদিগকে কখনো কষ্ট করিয়া খুব দূরে কোথাও যাইতে হইবে না।
যাই হোক, এই কন্যাকে লইয়া ঘটনা এইখানেই শেষ হইলো না। তবে এখনও মাঝে মধ্যে ভাবি যে ঘটনা এইখানে শেষ হইলেই বুঝি উহা সকলের জন্যে ভাল হইতো। দিন কয়েকের মধ্যেই অনামিকার সহিত আমার গল্পের বই লেনদেন লইয়া গোলমাল বাধিয়া গেলো।
অনামিকার কাছ হইতে গল্পের বইয়ের লম্বা একখানা ফর্দ লইয়া একদিন আমার দোস্ত বাসায় আসিয়া হাজির হইয়াছিলো। আমি ফর্দের সহিত মিলাইয়া আমার ভান্ডার হইতে বইগুলা খুঁজিয়া বাহির করিতেছিলাম, আর পাশে বসিয়া আমার দোস্ত তাহার দুঃখের কথা কীর্তন করিতেছিলো। তাহার দুঃখের কোন সীমা ছিলো না। সেইদিনের সেই পুঁচকে অনামিকা নাকি তাহাকে নিয়মিত তুই-তোকারি করিয়া কথা বলে। মনুষ্য হিসাবে যে ন্যূনতম একখানা সম্মান তাহার পাওনা, উহাও নাকি তাহাকে ঠিকমতো প্রদান করা হইতো না। শুনিয়া বন্ধুর দুঃখে আমিও বেশ কাতর হইয়া পড়িলাম। অতএব একগাঁদা বই দোস্তের হাতে ধরাইয়া দেয়ার সাথে সাথে ছোট একখানা চিরকুটও ধরাইয়া দিলাম, যাহাতে লেখা ছিলো "বই লইবার পূর্বশর্তঃ আমার দোস্তকে যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করিতে হইবে"। তাহাকে শিখাইয়া দিলাম এক সাথে সব কয়টা বই কন্যাকে হস্তান্তর না করিয়া দুই-চারদিন পর পর কয়েকটা করিয়া প্রদান করিতে। এবং প্রতিবার প্রদানের সময় যেন চিরকুটখানাও একবার করিয়া তাহাকে প্রদর্শন করানো হয়। শুনিয়া দোস্ত তো মহা খুশি হইয়া আমার বুদ্ধির তারিফ করিতে করিতে বিদায় লইলো। আমিও ভাবিলাম যে এইবার কন্যা কিছুটা টাইট হইবে।
কিন্তু পরদিনই দোস্ত উসকুখোসকু উদ্ভ্রান্ত চেহারা লইয়া আবার ফিরিয়া আসিলো। বুঝিতে বাকি নাই তাহার উপর দিয়া ছোটখাট একখানা ঝড় বহিয়া গিয়াছে। তাহার করুণ বর্ণনা শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম ওই চিরকুটখানা কন্যাকে দেখাইতে গিয়াই যতো বিপত্তি হইয়াছে। কন্যা নাকি চিরকুট পড়িয়া পুরা আগুন হইয়া গিয়াছিলো। তাও যেই সেই আগুন না। যাহাকে বলে একেবারে বুনসেন বার্নারের নীলাভ আগুন। বই তো কন্যা সব সাথে সাথেই ফেরত দিয়া দিয়াছে, এবং বলিয়াছে যে আর কখনো আমার কাছ হইতে সে বই লইয়া পড়িবে না। সেই সাথে ঝারি খাইতে খাইতে আমার দোস্তের অবস্থাও পুরা কাহিল। সে স্বীকার না করিলেও বুঝিলাম যে ঝারির সহিত যথেষ্ট পরিমান উত্তম মধ্যমও তাহার কপালে জুটিয়াছে। কি আর করা, দুই দোস্ত গালে হাত দিয়া বসিয়া বিষন্ন মনোভঙ্গিতে কন্যাজাতির এহেন অবমাননাকর আচরণ এবং আমাদের পুরুষ জাতির অসহায়ত্বের কথা ভাবিয়া বেশ কিছুক্ষন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিলাম।
ভাবিলাম কন্যার সহিত সম্পর্ক বুঝি এইখানেই শেষ হইলো। অবশ্য ইহাতে বেশ কিছুটা নিরাপত্তাও বোধ করিতেছিলাম। বন্ধুর কাছে কন্যা আমার সম্পর্কে যেইসব কটুক্তি করিয়াছে বলিয়া শুনিয়াছি, তাহাতে ইহা নিশ্চিন্ত যে তাহার সামনে পুনরায় পরিয়া গেলে আমার নিজের অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক থাকিতো না।
এইভাবে বেশ কিছুদিন পার হইয়া গেলো। সব ভুলিয়া সামনের কোরবানীর ঈদ লইয়া আমরা সকলে ব্যস্ত হইয়া পড়িলাম। প্রতিদিনই আমি এবং দোস্ত বসিয়া বসিয়া পরিকল্পনা করিতে লাগিলাম যে এইবারের ঈদে বিশেষ কি করা যাইতে পারে যাহাতে ইহা অন্যান্য আর দশটা ঈদ হইতে আলাদা হিসাবে স্বাক্ষরিত হইয়া থাকিবে। এমনি একদিন দোস্ত আসিয়া হাজির হইলো। তাহার জ্বলজ্বলে চক্ষু এবং মুচকি মুচকি হাসি দেখিয়াই বুঝতে পারিতেছিলাম যে কোন বিশেষ সংবাদ আছে। জানিতে পারিলাম অনামিকা প্রস্তাব করিয়াছে যে এই ঈদে সে তাহার এক বান্ধবী লইয়া আসিবে, এবং আমার দোস্ত আমাকে লইয়া যাইবে। অতঃপর আমরা জোড়ায় জোড়ায় রিকশা করিয়া সারা দিন অনির্দিষ্ট ভ্রমন করিবো। শুনিয়া আমি তো পুরা টাশকি খাইয়া গেলাম! কয়েকবার দোস্তকে জিজ্ঞাসা করিয়া নিশ্চিত হইয়া লইলাম দোস্তের সহিত আমাকে নিয়া যাইতে বলিয়াছে, নাকি অন্য কাউকে। এর পর ঈদের আগে পর্যন্ত বাকি কয়দিন কিভাবে স্বপ্নে কাটাইয়া দিলাম তাহা আমি নিজেও ঠিকমতো বলিতে পারিবো না। যতোই ভাবি যে সারা দিন আমার সহিত রিকশার হুডের নিচে এক কন্যা থাকিবে, ততোই রোমাঞ্চে শিহরিত হইয়া উঠি। আহা, অনামিকার বান্ধবী না জানি দেখিতে কেমন!
যাই হোক, দেখিতে দেখিতে ঈদের দিনটি আসিয়া গেলো। আমি খরগ হস্তে কোরবানীর গোস্তের সহিত যুদ্ধে অবতীর্ণ না হইয়া কোট-টাই পরিয়া যথাযথ মাঞ্জার সহিত ফুলবাবু সাজিয়া সকাল সকাল সকলের চোক্ষের আগোচরে গৃহ ত্যাগ করিলাম। যেই মার্কেটের সামনে আমাদের সকলের একত্রিত হইবার কথা ছিলো, নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছু পূর্বেই সেইখানে হাজির হইয়া গেলাম। রিকশায় বসিয়া গল্প করিতে করিতে টুক টুক করিয়া খাইবো, এই ভাবিয়া একগাঁদা চকোলেট কিনিয়া পকেট ভারি করিয়া ফেলিলাম। মনের সুখে বেশ কিছু গোলাপ ফুলও কিনিয়া লইলাম যাহাতে প্রত্যেকের হস্তে একখানা করিয়া ফুল শোভা পায়। অতঃপর শুরু হইলো তাহাদের জন্যে প্রতীক্ষার পালা। সময় পার হইয়া আধা ঘন্টা যায়, এক ঘন্টা যায়, এইভাবে দুই ঘন্টার উপরে অতিক্রান্ত হইয়া গেলো, তথাপি কাহারও কোন দেখা না পাইয়া আমি মেজাজ খিচঁড়াইয়া বসিয়া রইলাম। ইতিমধ্যে দোস্ত আসিয়া ঘোষনা দিলো যে কিছুক্ষনের মধ্যে বাকিরাও আসিয়া যাইবে। আরও কিছুক্ষন যাইবার পরে দেখি যে টুক টুক করিয়া বোরখাওয়ালী হাটিয়া আসিতেছে। দেখা গেলো তাহার মুখও প্রচন্ড বেজার। তাহার বান্ধবী নাকি কি কারনে আসিতে পারে নাই। তাহারও আসিবার কোন শখ ছিলো না। কিন্তু কথা দিয়া ফেলিয়াছে, সেই জন্যেই না পারিতে বাধ্য হইয়া আসিলো।
কি আর করা, আমরা তিনজনেই এক রিকশায় করিয়া অবশেষে ভ্রমনে রওয়ানা হইলাম। যাইতে যাইতে একসময় আমি আর দোস্ত মিলিয়া ঠিক করিলাম যে এয়ারপোর্টের ওইদিকে গিয়া ঘুরিয়া আসিবো। শুনিয়া কন্যা মুখ বাকাইয়া কহিলো সকলেই নাকি শুধু ওইখানেই বেড়াইতে যায়। কিন্তু সে নিজেও আর ভাল কোন জায়গার প্রস্তাব করিতে না পারায় আমরা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যেই চলিতে লাগিলাম। চলিতে চলিতে আমাকে লইয়া লেখা কন্যার একখানা কবিতাও পড়িয়া ফেলিলাম। (অবশ্য পরে জানিতে পারিয়াছিলাম যে ইহা অন্য কবিতা হইতে টুকলিফাই করা)। এবং এইভাবেই একসময় এয়ারপোর্টে আসিয়া হাজির হইলাম। ওইখানের পার্কে ঘুরিতে গিয়া দেখি যে আরও অনেক কপোত কপোতী জোড়ায় জোড়ায় মনের সুখে ঘাসের উপরে বিচরণ করিতেছে। আমরাও কিছুক্ষন এইদিকে সেইদিকে টু টু করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইলাম। এক গাছ তলায় গিয়া কিছুক্ষন বসিয়াও রহিলাম তিনজনে মিলিয়া। তারপরে বাদামওয়ালাদের যন্ত্রনাতেই হোক বা অন্য কোন কারনেই হোক, একসময় কন্যা বিরক্ত হইয়া উঠিয়া কহিলো এইবার সে বাসায় ফিরিয়া যাইতে চায়। কর্ত্রীর ইচ্ছায় কর্ম। অতএব আমরা আরেক রিকশা করিয়া এইবার উল্টা পথে রওয়ানা হইলাম।
ভ্রমনের শুরু হইতেই সারাটা পথ আমি যথেষ্ট হিসাব করিয়া কথা বলিতেছিলাম। কখন কি বলিতে এই কন্যার মেজাজ সপ্তমে চড়িয়া যাইবে, কেউ তো তাহার কোন গ্যারান্টি দিতে পারে না। কিন্তু ফিরতি পথে যখন ভাবিতেছিলাম সব বুঝি এইবার ভালয় ভালয় শেষ হইলো, তখুনি বিপত্তি বাঁধিয়া গেলো। চলিতে চলিতে হঠাত্ এক সময় মনে হইলো আমার কাধে যেন কিসের খোঁচামতো কিছু লাগিতেছে। পার্শে আড়চোখে তাকাইয়া দেখি যে কন্যা তাহার বোরখার নেকাব ঠিক করিবার জন্য উহা হইতে সেফটি পিন খুলিয়া খুলিয়া সেইগুলিকে নিজের মনে করিয়া আমার কোটের কাধে বিঁধাইয়া রাখিতেছে। আমার কোটের এহেন অবৈধ পাবলিক ব্যবহার সহ্য করিতে না পারিয়া আমিও আবার চুপিচুপি সেইগুলো কোট হইতে খুলিয়া কন্যার অগোচরে আমার দোস্তের হস্তে পাচার করিয়া দিলাম। একসময় কন্যা যখন টের পাইলো যে তাহার সেফটি পিনগুলা আমার দোস্ত বেদখল করিয়া ফেলিয়াছে, তখন আবার সেইগুলাকে পুনঃদখলে আনিবার প্রচেষ্টায় কন্যা এবং আমার দোস্তের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হইয়া গেলো। তাহাদের কথা শুনিয়া রিকশাওয়ালার সাথে সাথে আমিও যে যথেষ্ট মজা পাইতেছিলাম তাহা অস্বীকার করিবো না। কিন্তু আমার দোস্ত যখন যুদ্ধের এক পর্যায়ে অস্ত্র হিসাবে তাহাকে কাজের বুয়া রহিমা বলিয়া সম্বোধন করিয়া বসিলো, সব ভুলিয়া আমিও তাহাকে সাপোর্ট দিয়া ফেলিলাম। ব্যস, আর যায় কোথায়। প্রচন্ডভাবে বিস্ফোরিত হইয়া কন্যা চুপ মারিয়া গেলো। চুপ তো একেবারেই চুপ। বাকি পথ আর কোন কথাই বলিলো না। আর এইভাবেই শেষ হইলো আমাদের প্রমোদ ভ্রমন।
যাই হোক, মজার ঘটনা এই পর্যন্তই। এইবার বাকি ঘটনা সংক্ষেপে শেষ করিতেছি। ঈদের পরপরই আমি চলিয়া গেলাম উত্তরবঙ্গে বেড়াইতে। ফিরিয়া আসিয়া দোস্তের কাছ হইতে শুনিলাম কন্যার বৃত্তান্ত। এবং সে আমার প্রেমে কঠিন হাবুডুবু খাইতেছে শুনিয়া বড়ই ভ্যাবাচেকা খাইয়া গেলাম। ইহা কিভাবে সম্ভব হইলো?! কন্যা নাকি বলিয়াছে ঈদের ঐ রিকশা ভ্রমনই তাহার এই পরিণতির পিছনে মূল ভুমিকা রাখিয়াছে। এখন সে কি করিবে জানে না। আমার সম্পর্কে সে আবেগঘন আরও যা যা বলিয়াছে তাহা শুনিয়া আমিও কি করিবো ঠিক বুঝিয়া পাইতেছিলাম না। যুক্তিজ্ঞান বলিতেছে যে এইরকম একখানা কন্যা কপালে লাখে একজনের জুটিতে পারে। এই কন্যা যাহাকে ভালবাসিবে তাহাকে পাগলের মতোই সারাজীবন ভালবাসিবে। কিন্তু আমার মন বলিতেছে যে যুক্তি দিয়া প্রেম করিতে হইলে উহাকে ঠিক প্রেম বলিয়া মানিয়া লওয়া যায় না। মনের মাঝে কল্পনা দিয়া যেই কন্যার প্রতিমূর্তি লালন করিয়া আসিয়াছি এতোদিন, তাহার সাথে যেন এই কন্যাকে কোনমতেই মিলাইতে পারিতেছিলাম না। অতএব সিদ্ধান্ত লইতে খুব খারাপ লাগিলেও আমার দোস্তকে আমি এই ব্যপারে নেতিবাচক মনোভঙ্গি জানাইয়া দিলাম। এবং এই অবস্থাতেই দেশ ত্যাগ করিয়া কয়েক সপ্তাহের জন্যে ইন্ডিয়া চলিয়া গেলাম আমার ডিপ্লোমার ফাইন্যাল পরিক্ষা দিবার নিমিত্তে। ফিরিয়া আসিয়া শুনিলাম অনামিকার বিবাহ ঠিক হইয়া গিয়াছে। কিছুদিনের মধ্যেই শুভ পরিণতি হইয়া যাইবে। আগেও তাহার জন্যে অনেক ভাল ভাল প্রস্তাব আসিতেছিলো। কিন্তু কন্যা রাজি হইতো না। এইবার প্রস্তাব আসিতেই সে কিছু না দেখিয়া এক বাক্যে রাজি হইয়া গিয়াছে। শুনিয়া আমি কেবল দোস্তের কাছ হইতে ইহাই জানিতে চাইলাম যে পাত্রকে কন্যা পছন্দ করিয়াছে কিনা। যখন শুনিলাম যে পাত্রি নিজেই পাত্র দেখিয়া পছন্দ করিয়াছে, তখন যেন আমার মন হইতেও বড় একখানা ভার নামিয়া গেলো। অবশ্য পরে জানিতে পারিয়াছিলাম যে বিবাহের সময় নাকি কন্যা কোনমতেই কবুল বলিতেছিলো না। কয়েক ঘন্টা কান্নাকাটির পর্ব চলিবার পরে যখন আমার দোস্ত তাহাকে আলাদাভাবে ডাকিয়া লইয়া জানিতে চাহিলো এহেন বালিকাসুলভ আচরণের কারন কি, তখন সে নাকি ইহাই বলিতেছিলো যে পাত্র তাহার কোনমতেই পছন্দ হয় নাই। সেই সাথে আর কি কি বলিয়াছিলো তাহা অবশ্য আমার দোস্ত আর কখনোই আমাকে ঠিকমতো জানায় নাই।
এইভাবেই অনামিকা তাহার জিদকে আকড়াইয়া ধরিয়া নিজের পরিণতি বাছিয়া লইলো। তবে আমার বিশ্বাস যে পরিণতিতে সে সুখিই হইয়াছে। কারন যে অন্যকে সুখ বিলাইতে পারিবে, সেই একমাত্র পরিণতিতে সত্যিকারের সুখী হইতে সক্ষম। আর আমি নিশ্চিন্ত যে এই কন্যা যেই কোন অবস্থায় যেই কাউকে পূর্ণ সুখী করিবার যোগ্যতা রাখে।
এখন আপনাদের মনে হয়তো প্রশ্নের উদয় হইতে পারে, যেই কন্যার সহিত পরিচিত হইবার নিমিত্তে অনামিকাকে লইয়া এতো কিছু কান্ড হইলো, সেই কন্যার কি হইলো। সত্য বলিতে কি তাহার যে পরে কি হইলো তা আমি নিজেও আর খবর রাখি নাই। অনামিকার সহিত এইরকম একখানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়া অতিক্রান্ত হইবার পরে আমি ইহা স্পষ্ট উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলাম যে প্রেম কখনো এইভাবে প্রেমে পরিবো পরিবো করিয়া করা যায় না। প্রেম আসলেই এক স্বর্গীয় উপাদান। ইহা কোনকিছু হিসাব করিয়া আসে না, আর একবার যখন আসে তখন সবকিছু তার নিজের মতো করিয়াই সে পরিচালনা করে। ইহাকে কখনো নিজের মতো করিয়া পরিচালনা করা যায় না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

