রিপন ফোন করে এমন ঝাড়ি দিবে..এটা জানাই ছিল শামসুর। গত কয়েকদিন যাবত সে সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে চলেছে। কেমন জানি শূন্যতা লাগে। মনে হয় কিছুদিন সবার থেকে দূরে থাকি। মোবাইল ফোনটা তাই সাইলেন্ট করে ড্রয়ারে তালা দিয়ে রেখেছিল। বের করে দেখে চার্জ শেষ হয়ে মোবাইলটা অফ হয়ে গেছে। মিসকল লিস্টে শুধু রিপনেরই বিশটা কল..। গতকাল মোবাইলটা বের করতে হয়েছে, কারণ ঐ ইন্টারভিউ...। অবশ্য মোবাইল অফ রাখায় একটা লাভ হয়েছে। ব্যালেন্স এর আয়ুটা বেড়েছে।
শামসু মোবাইলটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যে কোনো সময়ই ফোন আসতে পারে। চাকরীটা তার হয়ে গেছে....। এই চাকরীটা তার খুবই দরকার। দিন যেন চলতেই চাচ্ছে না। বাড়ি থেকে আনা টাকাতে তার চলেনা। তাই একটা টিউশনি করায়। কিন্তু ঢাকা শহরে একটা টিউশনি দিয়ে চলা খুব মুশকিল...। মাঝে মাঝে অসহ্য মনে হয়। বাবা রিটায়ার করেছেন ১ বছরের উপর। এখনও বাড়ি থেকে টাকা পয়সা আনতে হয়। তার পড়ালেখাটাও শেষ হচ্ছে না। ৪র্থ বর্ষে পড়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডগোলটা না লাগলে হয়তো আর মাসখানেকের মধ্যেই অনার্সটা কমপ্লিট হয়ে যেত। তার স্কুল কলেজের বন্ধুদের পড়ালেখা কবে শেষ। তানজিলটা চাকরী করছে কত বড় কোম্পানীতে! ওর গার্লফ্রেন্ডও আছে একটা। শালা মহাসুখে আছে। কই কলেজেতো ওর চাইতে ভালো ছাত্র ছিলো না তানজিল! বাবার টাকা আছে বলে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেই ভর্তি হয়ে গেল বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর শামসু...! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ে......। ব্যস ঐ টুকুই...। তানজিলের আজ চাকরী হয়েছে বলে তার মাটিতে পা পড়েনা। তবে এবার শামসুরও চাকরী হবে।.......পড়ালেখা শেষ হবার আগেই এভাবে চাকরী খুঁজতে হচ্ছে, ভাবতেই নিজেকে বড় অসহায় লাগলো শামসুর। ভার্সিটির রেজাল্টও তার ভালো হচ্ছে না। হলে সে থাকে না। কয়েকজন মিলে একটা বাসায় থাকে শঙ্করে। বাড়ী ভাড়ার একটা অংশ শামসুকেও বহন করতে হয়। কেন যে সেসময় হলে উঠল না। চাকরীটা তার অবশ্যই চাই।
চাকরীটা হয়ে যাবে মনে হয়। সেদিন ইন্টারভিউ বোর্ডে যা জিজ্ঞেস করেছে মোটামুটি সবগুলোরই সন্তুষ্টজনক উওর সে দিতে পেরেছে। আবার তার মনে হয় বোধ হয় হবে না। যা কম্পিটিশনের যুগ। তার চাইতে স্মার্ট অনেক ছেলে ছিল। প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়া। ভুং ভাং মারা অনেক পাবলিকই ছিলো। সেখানে সে কোন ছাড়। তার তো শার্টের ইস্ত্রিটাও ছিল না শেষ পর্যন্ত।.......আরে না। শার্টের ইস্ত্রি দেখে কি আর চাকরী হয় নাকি! তার যে যোগ্যতা আছে অন্যদের সেটা নেই।......এক আশা নিরাশার দোলাচলে দুলতে থাকে শামসু।
হঠাত করেই মনে পড়ে.......কালকে ঈদ। ভেবে মনটা খুশি খুশি লাগে। আবার খারাপও লাগে। এবার বাড়ীতে তার যাওয়া হলো না। কোরবানীর ঈদে যাবে নিশ্চয়ই। কয়েকদিন আগেই একবার বাড়ী যেতে হয়েছে...ছোট বোনটার খুব অসুখ ছিল। এত ঘন ঘন বাড়ী যাওয়ার মতো টাকা পয়সা শামসুর নাই....এটা অবশ্য আসলে ঠিক না। বাড়ী যাওয়ার টাকা তার আছে। কিন্তু আসার সময় বাবা-মার করুণ মুখের দিকে সে চাইতে পারবে না। আচ্ছা কার কাছ থেকে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে? পরিবার, বন্ধুবান্ধব, নাকি সে নিজে? থাক সেসব চিন্তা, এবার ঢাকাতেই ঈদ করবে শামসু। সকালে নামায পড়বে। দোয়া করবে যাতে চাকরীটা হয়ে যায়। সারাদিন ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াবে। এমনিতেই ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেছে। কেমন যেন শান্ত শান্ত ভাব। ঢাকা শহরটা এমনি থাকলে শামসু সারাজীবন ঢাকাতেই থেকে যেত। কি যে জাদু আছে ঢাকা শহরে..!!!
তার সাথে থাকে রোকন ভাই, রেজা ভাই, কামাল ভাই এই তিনজন। সবাই গতকালই চলে গেছেন। সে কবে যাবে জিজ্ঞেস করায় বলেছে আজ যাবে। এখন কেমন ভালো লাগছে। পুরো বাসাতে কেবল সে, একা। কেমন যেন আনন্দ আনন্দ লাগছে। আচ্ছা রাস্তায় বের হলে কেমন হয়! ঢাকা শহর কেমন খা খা করছে। তার বিশেষ কিছু কেনাকাটার নাই। একজোড়া মোজা কেনা দরকার ছিল। সেটা কেনা হয়েছে গতকাল।
শামসু রাস্তায় নেমে পড়ে। শূন্য ঢাকার সন্ধ্যার রাস্তায় সে হাঁটছে। সোডিয়াম বাতিগুলো নীরবে জ্বলছে। কিছু কি বলতে চায় বাতিগুলো। তার মতোই সবাইকে কেমন আলোকিত করে রাখার চেষ্টা। কিন্তু দামী আলোকসজ্জা, নিয়ন লাইটের কারুকাজের কাছে কেমন ম্লান মনে হয়। প্রতিদিন কত গাড়ি রাস্তা দিয়ে যায়, কত মানুষ আসে যায় প্রতিদিন, সবাইকে আলোকিত করে রাখে বাতিগুলো। কই তাদের খোঁজ তো কেউ রাখে না! শামসু উপরে লাইটগুলোর দিকে চেয়ে থাকে। কেন যেন আজ খুব সুন্দর লাগছে সোডিয়াম বাতি......
(চলবে)
আগের পর্বগুলি পড়ুন নিচের লিংক হতে....
শামসু ব্যাচেলর-১
শামসু ব্যাচেলর - ২
শামসু ব্যাচেলর - ৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

