মধ্যবিত্ত। ব্যাপক ব্যবহৃত একটি বাংলা শব্দ। কি লিখায়, কি রূপালি পর্দায়। টিভি নাটক, উপন্যাস। সর্বত্র মধ্যবিত্তের মিছিল। সিকিপেটী, আধপেটী নিম্নবিত্তের বিস্তর কায়ক্লেশ, ইনিয়ে বিনিয়ে 'এই তো আমিও মধ্যবিত্ত'। বিনয়ী উচ্চবিত্তও নম্র ভাবে বলছেন 'আমরা মধ্যবিত্ত'। টানাটানিতে পড়া এ দু সীমারেখার মাঝখানে বিশাল জন গোস্ঠি। মধ্যবিত্ত। সর্বদা আত্ন সংকটে ভোগা মানুষের দল বিশেষ।
এরা প্রধানত নকলবাজ। তবে তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে, আয়ের ক্ষেত্রে নয়! জামা, জুতা, ফ্রিজ, টিভি, রসনা, বাসন কোসন, ফুলদানি, আলমারি, বিবাহ, জন্মদিন সবক্ষেত্রেই পাইরেটেড। 'অমুক ভাবীর বাসায় দেখে' বস্তূটার জন্য নিত্য হাপিত্যেশ। একবারও গভীরে যায়না- অমুক ভাবীদের মাসিক/বার্ষিক আয় কত? কিভাবে? খেসারত- 'ছোট কাঁথায় শীতের রাত।' পা ঢাকলে মাথা নাংগা, মাথা ঢাকলে পা নাংগা! এবং হতাশা।
চূড়ান্ত খারাপ অতিনিম্নবিত্তের মধ্যবিত্তের অভিনয়। দু:সম্পর্কীয় এক খালুকে দেখেছি 'প্রায় চাদাঁ তুলে মেয়ের বাড়িতে কোরবানির ঈদে ছাগল পাঠাতে!' এ কেমন আত্নঘাতী মেকিপনা?
বাসায় ফ্রিজ না থাকলে কি হয়? তাবৎ বিশ্বের কটি পরিবারে ফ্রিজ আছে? গ্রামের কটি ঘরে ফ্রিজ আছে? ফ্রিজে মধ্যবিত্ত আসলে কি রাখে? ৫ টা ডিম, ২ বোতল পানি, ১ বোতল কোক, ১ ফালি কুমড়া, ৪ টা আপেল আর ২৫০ গ্রাম রুই মাছ- এই ই তো! এসব জিনিস কি আসলেই ফ্রিজে রাখতে হয়? গরুর মাংসই ৩ মাস খাওয়া যায় ফ্রিজ ছাড়া! এটা মধ্যবিত্ত রাধুঁনি জানেনও বটে।
টিভিতে এমন কি বালের জিনিস দেখায় যে তা না হলে জীবন অচল হবে। ডিশের লাইন না থাকলেতো বাসায় টিভি রাখা নিরর্থক। আর সাধের ডিশ! একটানা ৩০ মিনিট কি কোন বাসায় কোন একটি চ্যানেল চলে? টেপাটেপিটাই হয় মূলত। বলি বাংলাদেশী চ্যানেল গুলোর কথা। এরকম হুবহু চরিত্রের ১২/১৩ টা চ্যানেল আর কোন দেশে আছে কিনা জানিনা। খবর, রাতের খবর, সন্ধ্যার বুলেটিন, টুকরো খবর, বাছাই করা খবর নিয়ে সাপ্তাহিক খবর, বিশ্ব খবর, খবর নিয়ে গ্যাঁজাল, অমনি অমনি গ্যাঁজাল, কখনো ২ জনে, কখনো ৪ জন, কফির মগ সমেত বা শুকনো মুখে থুতু চাটতে চাটতে, একই চেহারা সবকটি চ্যানেল। শুধু কি তা? সারাক্ষন পর্দার নীচ দিয়ে তথাকথিত হেডলাইন। গৌরনদীতে গরু ডুবি। আর বিজ্ঞাপনের জঙ্গলের মাঝে ৪/৫ মিনিট করে কি সব ধারাবাহিক নাটক।
টিভি কেড়ে নিয়েছে বই পাঠের মহান অভ্যাস ও তাৎপর্যময় পারিবারিক আড্ডা। ১ টি মানুষ বনাম ১ টি পর্দার ভয়ন্কর হেরোইনে নাগরিক মানুষ তলে তলে হয়ে পড়ছে নি:সঙ্গ। একাকী। নাগরিক শিশু ফার্মের মূরগীর চেয়েও বাজে শৈশব, কৈশোর কাটাচ্ছে। কেননা ফার্মের মুরগীরাও সঙ্গবদ্ধ জীবন যাপন করে! চিৎকার চেচামেচি করে! কোলাহল করে!
মধ্যবিত্ত চেয়ে চেয়ে দেখে ISD, scholastica, ESS etc. আর অতি ইংরেজী ভাল নয় (মতান্তরে পারলাম না ওখানে পড়াতে!) রব তুলে কোলের বাছাধনকে রেখে আসে Humpty Dumpty গোছের কিছু হিজড়া স্কুলে। জাতবেজাতের একবস্তা ভারতীয় বইয়ের ভারে প্লে/নার্সারীর নিস্পাস ভাস্তে/ভাগ্নেদের উচ্ছল শৈশব রূপ নেয় গুয়ানতানামো বে তে। ঢের ভাল সরকারি প্রাইমারি। কিন্তু ওখানে যে বস্তির ছেলেরা যায়!!
শৈশব যেনতেন হলেও মধ্যবিত্তের দুনোমনো জীবনযাপনের ফাঁপড়ে পড়া কাঠবিড়ালী চিত্র দেখা মেলে বিবাহের লগনে। পাত্র/পাত্রী বাছাই থেকে বাসর অবধি কি চাই? কাকে চাই? কেন চাই? কখন চাই? কিভাবে চাই? আর কি কি চাইয়ের? প্রশ্নমালার উত্তর মেলাতে না পারার কুরুক্ষেত্র। আর মেকি ব্যয়বাহুল্যের ভার বইতে ঋন! ব্যাংক গুলো তাই বলছে। ঋন করে ঘি খান!! বিবাহ ঋন। হানিমুন ঋন। কনডম ঋন।
এভাবেই নাস্তানাবুদ মধ্যবিত্ত। আর শক্র কেউ নয়? নিজেই?
আসলে সমাজ দু ভাগে বিভক্ত। বিত্তশালী ও বিত্তহীন। টাকা যাদের জন্য কোন Factor না তারা বিত্তশালী আর যাদের জন্য Factor তারা বিত্ত হীন। কম টাকায়ও কেউ কেউ বিত্তশালী হতে পারে, যদি তার জীবনকে সে এমন ভাবে সমীকরন টানতে পারে যেখানে টাকা নিছক ধ্রুবক।
বাদবাকী সব ভন্ডামী, মেকিপনা। শুধু শুধু জটিলতার জাল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

