সারমর্ম হিসেবে বলতে গেলে, এ মচ্ছবটাই চলছে বাংলাদেশের দুটি শেয়ার বাজারে। মূল্যমানের বাস্তবতার সীমানা পেরিয়ে প্রায় সব শেয়ারই উর্ধাকাশে ধাবমান, মাধ্যাকর্ষন বল অতিক্রম করে কখন 'স্যাটেলাইট' হয়ে যায় সেটা দেখার অপেক্ষায়! আর আলসে বাংগালীর রাতারাতি বড়লোক হওয়ার (এবং অনায়াসে ধরা খাওয়ার) এ রকেটে জ্বালানী দিচ্ছে খোদ এস ই সি, সরকার ও সুপ্রীম কোর্ট। যথাসময়ে তথা ব্যবস্থা না নিয়ে বা অসময়ে তথা ব্যবস্থা নিয়ে!
মার্জিন লোন:
এমনিতে নাচুনে বুড়ি আরো পড়ল ঢোলে বাড়ি। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মার্জিন লোন নিয়ে এটাই এক কথায় প্রকাশ। হাতে গোনা শ খানেক কোম্পানির বাজারে যেখানে এমনিতে টাকার গাট্টি হাতে হাজারো ব্যক্তি ও সংস্থা ঝাঁপিয়ে পড়েছে, সেখানে কোন আক্কেলে এখনো শেয়ার ব্যবসা করতে আসা 'দরিদ্র' ইনভেস্টরকে 'ধার' দেয়ার তথাকথিত মার্জিন লোন বহাল থাকে? শিকেয় তোলা থাক এনএভি কত হলে মার্জিন লোন কত হবে এসব বাহুল্য আলোচনা। সুস্থ বাজার চাইলে এক্ষুনি 'মার্জিন লোন' নামক থার্ড ক্লাস লোন বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমা থেকে তুলে দিতে হবে।
প্রাতিস্টানিক বিনিয়োগকারী:
এটা খুবই অদ্ভুৎ ব্যাপার যে- ব্যাংক ও লিজিং ফার্মগুলো সমানে শেয়ারমার্কেটে টাকা ঢালছে অথচ তারা নিজেরাই শেয়ার মার্কেট থেকে এই বলে টাকা সংগ্রহ করেছে যে তাদের পূঁজির অভাব/ বা তা আরো বাড়ানো দরকার! শুধু তাই না ব্যাংক, বীমা, মার্চেন্ট ব্যাংক, এসেট ম্যানেজমেন্ট ব্যতীত নানাবিধ অ-আর্থিক ধাঁচের ফার্মও নিজেদের স্ট্রং ট্রেজারী ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে বাড়তি টাকা শেয়ার বাজারে ঢালছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকাও নানাবিধ আর্থিক কোম্পানিরে ট্রেজারীর চোংগা হয়ে কিয়দাংশ শেয়ারে চলে আসছে- যা মৌলিক শিল্পোন্নয়ের জন্য বরাদ্ধকৃত ছিল! যেহেতু কোন ব্যক্তি/ সংস্থারই এখন পর্যন্ত শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করার কোন আইনগত বাধা নেই তাই কাল হয়তো দেখা যাবে, আন্জুমানে মফিদুল ইসলাম ও শেয়ারবাজারে টাকা ঢালছে।
লোনের টাকা শেয়ারে:
টার্ম লোন, সিসি লোন, পার্সোনাল লোন, এমনকি কল মানির টাকাও নাকি শেয়ারে। আগে শুনতাম, গত পরশু বিশ্বাস করলাম। ঘটনাটা খোলাসা করি। অফিসে খানিকটা ব্যস্ত ছিলাম। দুপুর ১টা প্রায়। অজ্ঞাতনামা নাম্বার থেকে কল। স্টান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের সেলসম্যান। মরিয়া হয়ে একটা পার্সনাল লোন দেয়ার জন্য পীড়াপিড়ি। আমি কোনোভাবেই রাজি হইনা। টাকা দিয়ে আমি কি করব এমন প্রশ্নের জবাবে সে খুব কনফিডেন্টলি বলল- স্যার শেয়ার মার্কেটে রাখলেও অনেক লাভ! মাথা ঝিমঝিম করে উঠল! এস সি বির গলাকাটা কিস্তি লোন নিয়ে আমি আগ্নেয়গিরিতে রাখব! তবে চেনাজানা ব্যবসায়ীরা বলল- ব্যবসা করার মত ঢের টাকা তাদের কাছে আছে। লোনের টাকাটা দরকার হয় কিছু শেয়ার নয় ক'শতক জমি কেনার বাজেটে টান পড়েছে বলে!
সাপ্লাই সাইডে কি অবস্থা:
ব্যবসা করতে পুঁজি দরকার। আর বড় ব্যবসা করতে বড় পুজিঁর দরকার। নিজের সাধ্যে না কুলোলে ভাই বেরাদরের কাছে হাতপাতা। তবে তার একটা সীমা আছে। সীমার বাইরে লাগলে ব্যাংক ঋন- যার আবার মোটা অংকের সুদ এবং জমি বন্দকের মত গলার কাঁটা আছে। শেয়ার বাজার ব্যাংকের একটি উত্তম বিকল্প। কোনো রকম সুদ এবং বন্ধক ছাড়া বিরাট অংকের টাকা ধার পাওয়া যায়। কুফলও আছে- ৩ মাস পরপর হিসাবনিকাশ দিতে হয় আমজনতার কাছে, অনেক গোমর আর গোমর থাকেনা। তাই বাংলাদেশের বেশীরভাগ গ্রুপ অব কোম্পানিজ/ মাল্টিন্যাশনাল এখনো বাজারে আসেনি, আসতে চায়ওনা। অপরদিকে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা যেমন যার যার ইচ্ছা, তেমনি আমার বাপ-দাদার প্রতিস্টিত কস্টকর ব্যবসার ভাগ আমি রহিম করিমকে দিব কি না সে ও আমার ইচ্ছা! তাই কাউকে এ ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি করাও হবে অন্যায্য। সুতরাং সাপ্লাই সাইডে রাতারাতি কোন চেন্জ সম্ভবনা।
গন্তব্য কোথায়:
কোন একটা কোম্পানি সারাবছর সাধ্যমত ব্যবসা করে যদি কিছু লাভ থাকে তা শেয়ারপ্রতি বন্টন করলে যে অর্থ কামাই হতে পারে তাই হবে/হওয়া উচিত একটা শেয়ারের বাজারমূল্যের মৌলিক ভিত্তি। লালবাত্তি বা হায়হায় কোম্পানির শেয়ারের দাম হবে নেগেটিভ! কিন্তু বর্তমানে 'আরো বেশী' দামে বিকোবে এহেন কূধারনায় সবাই মিলে বল্গাহীনভাবে সব শেয়ারের দাম বাড়িয়েই চলছেন। নবাগত মক্কেলের স্রোতে যেদিন ভাটার টান পড়বে সেদিনই আর ক্রেতা পাওয়া যাবেনা 'আরো অধিক' দামে কাল্পনিক এ রসগোল্লা বেচার জন্য। তখন দাম গোত্তা খাবে। ভয় পেয়ে হরিদাস পালেরা একযোগে তা বেচতে চাইবে। দাম আরো পড়বে!!! তখন শুরু হবে আরেক ক্রন্দন মর্সিয়া। ক্ষু্দ্র বিনিয়োগকারিদের মিছিল! এস ই সির গালে গালে! জুতা মার তালে তালে!!! সত্যিই সেলুকাস। বিচিত্র এ বংগদেশ!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

