somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আঁতুড় ঘর(৩)

১৪ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার প্রথম শহর নেত্রকোনা আর মনতোষ ছিলো প্রায় একই রকম প্রাণপ্রিয় । মনতোষ আর আমি ছিলাম পাড়া প্রতিবেশী, সহপাঠী এবং ছায়াসঙ্গী । মনতোষ আজন্ম শহুরে বুদ্ধিমান, সর্বোপরি স্মার্ট । আমার মত একজন অনুগামী পেয়ে তার তখন বেশ রমরমা । টারজানের গল্প শুনিয়ে আমায় সে তাক লাগিয়ে দিত । কিন্তু আমার অবস্থাও বোধহয় বুঝতে পারতো সে । ফলে প্রায় প্রতিবারেই সিনেমার গল্প শোনার শেষটায় আমার জন্য একটা আশ্বাস থাকতো যে শিগ্‌গিরই সে তার বাবার কাছ থেকে আমার জন্যও একটা পাস জোগাড় করে আমাকে নিয়ে যাবে । দোতালায় দামী সিটে আমরা পাশাপাশি বসে টারজানের কোনো সিনেমা দেখবো । এই আশ্বাসে আমি তখন প্রায় ঘোরের মধ্যে আছি । মনতোষের সঙ্গে দেখা হলে প্রথমেই জিজ্ঞাস্য থাকতো যে পাস কতদূর ।

আর ঠিক এই সময়েই মনটা একদিন সামান্য চট্‌কে গেল । বাদলা নামে আমাদের আরেক বন্ধু আমায় একা পেয়ে জিগ্‌গেস করলো--এই মনতুইষ্যা তরে কী দিব কয়রে ? আমি বললাম--ক্যান্‌ , সিনামা দেহনের লাইগ্যা পাস দিব আমারে । শুনে বাদলার কী হাসি । বলে--হ ওতো আমরারেও কত পাস দিছে ---তরেও দিব বইয়া থাক্‌---তুই একটা গাইয়া বলদ আছস্‌ এহনো ।
শুনে মনটা দমে গেলেও আশা ছাড়তে পারলামনা । কারণ ইতিমধ্যে আমি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সেখানেও বিষয়টা বন্ধুদের বলে দিয়ে এসেছি।এখন আমি নিরুপায় । তাই মনতোষের সঙ্গ ছাড়িনা । ভাবি বাদলার কথা সত্যি না হোক । তাই ওদের বাড়ীতেও যাই । আড়চোখে ওর বাবাকেও দেখি । বেশ ভারী বলিষ্ট চেহারা । গেম টিচার । বাড়ীতেই ব্যায়ামাগার । সেখানে তার ব্যায়াম করা দেখি । ভাবি এই হয়তো বলবে ---এই কইরে লইয়া যা পাস, ইভ্‌নিং শোতে যাইছ্‌ । কিন্তু না এমনটা আর হয়না । মনতোষও যেন কিছুটা অস্বস্থিতে । আমার মুখোমুখি হলেই এখন যেন প্রসঙ্গান্তর চায় ।
তো এরমধ্যেই একদিন মনতোষ বলল সে হালখাতা খেতে যাবে । হালখাতা কী ? কিন্তু সেটা জিগ্‌গেস করতেও ভ্য় । শুনে শুধু বললাম--ও। মনতোষ বলল--আমার লগে যাইতে পারছ্‌ । কিন্তু ঢুকতে অইব লগে লগে । এ আর এমন কী । হালখাতা নামক অজানা খাদ্যবস্তু খাওয়া ত যাবে । শুনে আমি রাজি ।
যেতে যেতে আমরা একটা দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম । ওটা আসলে একটা ফটো স্টুডিও । ওটার সামনে দিয়ে অনেক যাতায়াত করেছি। কিন্তু আজ দোকানের চেহারা অন্যরকম। বেশ ভিড় । ভালো জামা কাপড় পরা লোকজন সব সামনে । একটা সুন্দর পর্দা ঠেলে কেউ ঢুকছে, কেউ বেরোচ্ছে । একফাঁকে চোখে পড়ে গেছে ভেতরে স্কুলের মতো বেঞ্চিতে বসে সব হলদে রঙের সরবত খাচ্ছে কাঁচের গেলাসে । সামনে প্লেট ভর্তি রসগোল্লা ।
কতক্ষণ পার হয়েছে জানিনা । হঠাৎ পাশে চেয়ে দেখি মনতোষ ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে । লগে লগে হয়নি । একটু তফাৎ হয়ে গেছে । তবু আমি আর দেরী না করে পা বাড়ালাম । প্রায় পর্দাটার কাছাকাছি পৌঁছেও গেছি । কিন্তু পর্দার পাশে যে একজন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তা এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি। আর সে ই আমার একটা হাত ধরে ফেললো । বলল--এই যাচ্‌ কই---। আমি ভয়ে মনতোষের নামটাও বলতে পারলামনা । শুধু একবার লোকটার পাষাণ মুখটা দেখেই গলা শুকিয়ে গেল । অবশ্য উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে এক হ্যাঁচ্‌কা টানে আমাকে যাতায়াতের পথ থেকে সে সরিয়েও দিল । শোনলাম শুধু---যা বাইরা ।
আমি একরকম প্রত্যাখ্যাত হয়ে দূরে এসে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছি। মনতোষ ফিরে এলে একসঙ্গেই ফিরব । ক্ষোভে দুঃখে অপমানে এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি যে আমি খালি পা'য়েই চলে এসেছি ।

এরপর মনতোষের দেখা সাক্ষাৎ কম হতে থাকলো । ঠিক এরকম সময়েই একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখা । মনতোষ বেশ বড়দের মত আমাকে একটু আলাদা ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রায় কানে কানে বলল--আইজ রাইত রায়ট অইব ।
বলেই ও আবার সবার সঙ্গে মিশে গিয়ে হাঁটতে লাগলো । আমিও বেশ বোঝার ভান করে হাঁটছি । মনে মনে ভাবছি 'রায়ট' কী? বড়দের মুখে মাঝে মাঝে শুনেছি বটে, কিন্তু কী সেটা ? যাত্রাপালা না রামমঙ্গল ? প্রশ্ন করার সাহস নেই । আবার ভাবছি সিনেমার পাস জোগার করতে না পেরে হয়তো আমাকে অন্য কিছুর কথা বলে ভোলাতে চাইছে ।
কিন্তু বাসায় ঢুকে বুঝলাম 'রায়ট' কী । প্রশ্নটা বড় পিসিকে করতেই এক ধমক---দুরু যা পোলা--দামরার লাহান ছেরা রায়ট জানছ্‌ না! আইজ আর বাইরাত যাইছনা কই ।
সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরেদোরে বেশ থম্‌থমে অবস্থা তৈরী হয়ে গেল । দরজা জানালা বন্ধ । বন্ধ বাইরের গেট । কাকু, যে কিনা রাত দশটার আগে ফেরেনা , সেও আজ ঘরে এই সময় । গম্ভীর মুখ । বড় মেজ ছোট, তিন পিসি ই তখন যুবতী । বিবাহযোগ্যা । বড়পিসি একটু সাহসী মনে হলো । আর ছোটজন সবচেয়ে ভীতু । সে নাকি এই খবর শুনে দুপুর থেকেই কাঁদছে । ঘরে আমাকে নিয়ে পাঁচ জন । কাকু ছাড়া যুবক নেই কেউ ।
খবরটা শহরে দুপুরেই ছড়িয়েছে । তাই বিকেল বিকেল রাতের রান্না হয়ে গেছে এবং সেটা শোবার ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে । পাশাপাশি অন্যবাসার সঙ্গে জানালায় মুখ লাগিয়ে খুব ধীরে খবর আদানপ্রদান চলছে । সেই দায়িত্বে কাকু আর বড় পিসি । মাঝে একবার যেন শুনলাম--অন্যের পোলা,কী অইব কে জানে !
পরিবেশ যেন খুব দ্রুত আমাকেও টেনে নিল । এতক্ষণ কিছুটা চঞ্চলতা থাকলেও এই সময় বিছানায় উঠে ছোট পিসির গা'ঘেঁসে বসে পড়লাম । বুঝলাম আমাকে নিয়ে বড় পিসি আর কাকু কিছু বলাবলি করছে।

এই কাকু পিসিরা আমাদের দূর সম্পর্কের । তখনকার রীতি অনুযায়ী শুধুমাত্র অনুরুদ্ধ হয়েই পড়ুয়াদের থাকাখাওয়া দেওয়া হতো । শুনেছি আমাদের ভাটিদেশের গ্রামের বাড়িতেও একসময় এমন একাধিক ছাত্র থেকে পড়াশুনা করতো । তখন আমাদের গ্রামের স্কুল নাকি জুনিয়র হাই স্কুল ছিল । অথচ আমরা যখন পড়ছি তখন তা প্রাইমারী হয়ে গেছে । কারণ একসময় নাকি ছাত্র মাস্টার দুটোরই আকাল হয়েছিলো ।

তখন বোধ হয় রাত আটটা সাড়ে আটটা হবে । এতক্ষণ যখন যেকোনো, এমনকি পাতাপড়ার শব্দেও চম্‌কে যাচ্ছিলাম আমরা, ঠিক তখনই টিনের গেটের আওয়াজ হলো । পরপর কয়েকটা । আমরা কেউ সারা না দেওয়াতে আবার । ছোট পিসি যেন কঁকিয়ে উঠলো । সঙ্গে সঙ্গে আমিও ।
দেখলাম একলাফে কাকু হাতে একটা দা'ও নিয়ে ব্ন্ধ দরজার দিকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো । গড়গড়ে চাপা গলায় শুধু বললো --চু--প ।

আশ্চর্য্য, এতক্ষণ আমরা যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছিলামনা ।হঠাৎই কানে এলো ---শেফালী---ওশেফালী । এক মহিলা কণ্ঠের ডাক ।
তৎক্ষণাৎ শেফালী, অর্থাৎ আমার বড় পিসি বলে উঠলো--আরে এইদু আমরার মনসুরের মা'র গলা । ছুট্টুদা গেট টা খুইল্যা দ্যাওগা শিগ্‌গির ।

একটু পরেই ঘরে ঢুকলেন দুইজন মানুষ । একজন মনসুরের মা, যিনি এসেই তার প্রিয় সই শেফালীকে জড়িয়ে ধরে ঘরের একদিকে টেনে নিয়ে গিয়ে কীসব বলতে শুরু করলেন। আরেকজন মনসুরের আব্বা, যাকে পাড়ার বড়রা বলে দুলু মিঞা,আর আমাদের মত ছোটোরা বলে দুলু স্যার।
আমাদের গোটা বিশেক বাড়ীর পরেই তাদের বাড়ী । বড়পিসির বানানো আম মাখা নিয়ে আমি যেমন মনসুরদের বাড়ী গেছি, তেমনি মনসুরের মা'ও আমাকে দিয়ে এবাড়ীতে পাঠিয়েছেন মুক্তাগাছার মন্ডা । সপ্তাহান্তে দুলু স্যার যখন বাড়ী আসতেন এসব তিনি তাঁর কর্মস্থল থেকে নিয়ে আসতেন ।
আজ তিনি এসেই ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলেন। বসেই একবার চারদিক তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন--হুনেন মনুবাবু , আইসাই হুনলাম এইহানের অবস্তা । মনসুইরার মা'য় কয় অহনি লওন , সইয়ের বাড়িত জাই, বইন কয়ডারে দেইখ্যা আয়ি। কী সব হুনতাছি দুফুর থাইক্যা ----------।

মনুবাবু মানে আমার কাকা । মনসুরের আব্বার বক্তব্য হলো যে উনি জীবিত থাকতে আমরা শুধু না এই নিউটাউনে কোনো রায়টকারী ঢুকতে পারবেনা । আর কথা হইলো যে নেত্রকোনা শহরে ঐ রহম পাজি লোক কুথায় দেখলেন আপনেরা ? আমি নিউটাউনের সবাইরে লইয়া কাইল মিটিং করব--তো আফনেরা যারা হিন্দু আছুইন পিছাইবেননা কইলাম---------------------।
যাউক অনেক কথা কৈলাম । অহন খাইন দাইন---কই গো, লও যাই অহন। বলে উনি উঠলেন । যাওয়ার সময় আমায় ভরসা দিলেন,পিঠে হাত দিয়ে আদর করলেন ।

প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনাটি যেন আমার বয়স বাড়িয়ে দিল । ছোট পিসির কোলে মুখ গুঁজে আমি কখন যেন ঘুমিয়েও পড়লাম ।(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:২৭
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×