১৯৬৪ সালেরই কথা । তখনও কিছুটা পা'ফোলা পেট ফোলা । আর তা নিয়েই আমি মেজদার সংগে এক বৃষ্টি ভেজা সকালে আসাম মেল থেকে নামলাম শিলিগুড়ি জংশন স্টেশনে । সেদিন যেন অনেকটা প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই এই শহরে আসা । হ্যাঁ সামান্য চিকিৎসাতেই সুস্থ হোয়ে উঠলাম । মেজদা ক'দিন পর আবার ক্যাম্পে ফিরে গেল । কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর মনে মনে একটা আতংকও তৈরি হচ্ছিল । কারণ আমাকে যদি আবার সেই ক্যাম্পে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয় ! অবশ্য শেষ পর্যন্ত তা আর বলা হয়নি । আমি থেকেই গেলাম । ক্রমে আবার ফুলদার ছায়াসঙ্গী হয়ে পড়লাম ।
শিলিগুড়ি শহরে আমি উদ্বাস্তু বালক । যা দেখি সব কেমন অচেনা ঠেকে । প্রথম মুষ্কিল হলো ভাষা নিয়ে । শিলিগুড়িতে যদিও চলতো একটা মিশ্র পূর্ববঙ্গীয় ভাষা, তবু আমি কাঠ বাঙ্গাল হিসেবে ধরা পড়ে যেতাম কথা বলতে গেলেই। আপ্রাণ চেষ্টা তখন থেকেই চলছে তার রূপান্তরের । ধীরে ধীরে সেটা একটা পর্যায়ে এলেও এখনো বোঝা যায় আমি বাঙ্গাল । অবশ্য বয়সের পরিণতির সংগে সংগে আমার বাঙ্গাল পরিচয় আমার কাছে কিছুটা গর্বেরও হয়ে উঠতে লাগলো । আর ততদিনে আমার উচ্চারণ ধরে যারা উপহাস,ব্যাঙ্গ করতো তাদেরও এর স্বাভাবিকতা বোঝার বয়স হয়ে গেছে । যদিও তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলো পূর্ববঙ্গ জাত মা বাবার সন্তান । কিন্তু আগে আসা আর পরে আসাটা এপারে আসা পূর্ববঙ্গীয়দের মধ্যে একটা শ্রেণীবিন্যাস ঘটিয়ে দিয়েছিলো । মোটামুটি ৩৭ থেকে ৪৭ একটা, যারা খুবই বর্ধিষ্ণু ।তারপর পরপর ৪৭ থেকে ৫৭, ৫৭ থেকে ৬৭ এবং সবশেষে ৬৭ থেকে ৭০ । আর্থিক সামাজিক এই শ্রেণী বিন্যাস ক্রম নিম্ন গামী । যদিও শেষ হয়না এরপরও
যাক্ শহরটি আমাকে বেড়ে উঠার সুযোগ দিল । আমাকে ছুঁড়ে ফেলেনি । জীবন যাপন শুধু সাংঘাতিক অভাব অনটনের । বয়সটা যেহেতু কম তাই সব অভাবকেই স্বাভাবিক মানিয়ে নিতে হচ্ছিল । কিছুদিনের মধ্যেই এর মধ্যেই ভীষণ অনটনের মধ্যে মারা গেলেন ঠাম্মা । ততদিনে আমার ঠাম্মা নির্ভরতা অনেকটা কম । তবু তাঁর মৃত্যুতে শোকের মধ্যেও মনে হলো যেন এই মৃত্যু আসলে তাঁর মুক্তি । বছর দুই যাবৎ শয্যাশায়ী তাঁর কষ্ট যেন আর সহ্য হচ্ছিলোনা ।
আশ্চর্য্য ঠাম্মা মারা যাওয়ার পর আমরা ছোট দুই ভাই প্রথম জানতে পারলাম এই ঠাম্মা আমাদের সৎ ঠাকুমা । আরো জানা গেলো যে দাদু এই দ্বিতীয় বিয়ে যখন করছেন তখন বাবার বয়স পাঁচ/ছয় । একটি মাত্র সন্তানই ঠাম্মার হয়েছিলো এবং সে কয়েকমাস বয়সেই মারা যায় । আর তার কিছুদিন পর মারা যান আমার দাদু । আগের পক্ষের দুটি শিশু সন্তান নিয়ে আমার এই ঠাম্মার বলতে গেলে তার্রপর প্রকৃত সংসার জীবন শুরু হয় ।
স্কুল কলেজ আমার যথা নিয়মে চলতে লাগলো । বাবার লেখা চিঠি মাঝে মাঝে আসে ।
তখনকার চিঠি পত্র পূর্বপাকিস্তান থেকে ইন্ডিয়াতে আসতে মনে হয় সেনসর হতো । কারন খামের চিঠির মুখ প্রায়শঃই খোলা থাকতো । অনেক চিঠি আসতোই না । লক্ষ্য করতাম যে দেশের পরিস্থিতি বিষয়ে কোনো খবরই থাকতোনা । অথচ খবরকাগজে তখন অনেক কিছু লেখা হচ্ছে । দেখতে দেখতে ৬৯--৭০--৭১ এর ভয়ংকর দিন সব এগিয়ে আসতে লাগলো । আমার বয়স তখন খুব জটিল ১৭/১৮ । এ বাংলায় নক্সাল রাজনীতির অস্থিরতা আর ওপার বাংলায় স্বাধীনতার যুদ্ধ । আর পরিবারটি তখনও দুই বাংলায় দ্বিখন্ডিত ।
(ক্রমশঃ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

