somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখা আতুঁড় ঘর /৩

০৪ ঠা মে, ২০০৯ রাত ৮:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানা ক্যাম্প আই টি আই তে আমি 'ট্র্যাকটর মেকানিক' ট্রেড এ ভর্তি হলাম । আমার জন্য অনেক অপশন খোলা ছিলো । কিন্তু বন্ধুদের দেখাদেখি এটাই আমি বেছে নিলাম ।তার আরো একটা কারণ ছিলো যে আগের বছর এই ট্রেডে প্রচুর চাকরি হয়েছে । সবারই পোষ্টিং হয়েছে আন্দামানে । এই খবরটাই আমাকে বেশ উৎসাহিত করলো । শুনছি আন্দামানও নাকি একটা ছোট পূর্ববঙ্গ । ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে নাকি পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের আন্দামানে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে । তখনকার ঐ বয়সে এই সব সিদ্ধান্ত কত সহজ ভাবেই না নিতে পারছিলাম ।

মানা ক্যাম্প দুধনৈ এর মতো ট্র্যানজিট ক্যাম্প নয় । এখানে যারা ক্যাম্পে আছে তারা স্থায়ী ভাবেই আছে । এখানে হাঃ সেকেন্ডারি স্কুল আছে বাংলা মাধ্যমের । আছে হাসপাতাল । আছে নানারকম হাতের কাজ শেখার কেন্দ্র । আছে অনেক উন্নয়ন মূলক কাজকর্ম । আর আছে সর্বোপরি এই আই টি আই । যেখান থেকে প্রতিবছর অন্ততঃ হাজার খানেক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেরিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে । আসলে সমগ্র কর্মকান্ডটি এত বিশাল যে বুঝে উঠতে সময় লাগে ।

প্রথমদিন রায়পুর স্টেশনে যে মিলিটারি ট্রাকের আমরা দেখা পেয়েছিলাম তা থেকেই শুরু হয়েছিলো একটা মিলিটারি ব্যাপারের । পরে লক্ষ্য করলাম গোটা ক্যাম্পটির পরিচালন ভার অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারিদের উপর ।তাদের অধিকাংশ আবার বাঙালি । সর্বোচ্চ পোষ্টে একজন অবঃ কর্ণেল , তাকে বলা হয় ক্যাম্প কমানড্যান্ট । আমাদের আই টি আই এর প্রিন্সিপাল একজন অবঃ মেজর । আমাদের হোষ্টেল সুপারও একজন অবঃ ক্যাপ্টেন । প্রথম থেকেই তার দাপটে আমরা অস্থির । বিশেষ করে আমরা যারা নতুন পশ্চিম বঙ্গ থেকে গেছি , তাদের দেখলেই ওনার সম্ভাষণ ছিলো --- ইউ ব্লাডি নক্সালাইট কাম হিয়ার । ডোন্ট থিন্ক ইট ইজ ইউর বেঙ্গল ----। কারণে অকারণে নক্সালাইট ব্লাডি রাস্কেল স্টুপিড ----শুনতে শুনতে প্রথমে খারাপ লাগলেও পরে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম । আড়লে মুখ টিপে আমরা হাসাহাসিও করতাম । মাঝে মাঝেই উনি নাইট ভিজিট করতেন হোস্টেলে । সেদিন বেশ হৈ চৈ হতো । কারণ আমরা অনেকেই বাজার থেকে সাইকেল ভাড়া নিয়ে রাতে নাইটশো সিনেমা দেখতে রায়পুর চলে যেতাম । তখন অনুপস্থিত যারা, তারা যে কেউ বাইরে যায়নি এটা প্রমাণের ভার থাকতো বাকিদের উপর । সে নিয়ে কত যে তাৎক্ষণিক গল্প বানাতে হতো তার শেষ নেই । মজার ব্যাপার ছিলো যে এত রাগি আর ক্ষ্যাপা মানুষটি আমাদের দুর্বল গল্পগুলোও বিশ্বাস করতো । আসলে তখন পশ্চিমবঙ্গে নক্সাল আন্দোলনের বিস্ফোরণ শুরু হয়েছে । পাশাপাশি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের অশান্ত অবস্থার খবরো আসতে শুরু হয়েছে । এসব কারণেই হয়তোবা বাঙালিদের উপর বাঙালি হয়েও মানুষটির আস্থা কমে গিয়েছিলো।

মানা ক্যাম্পের বাজারটি ছিলো আমাদের কাছে মরুদ্যান বিশেষ ।এদিকে আই টি আই'তে সকাল আট'টায় প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস শুরু। চলতো বার'টা পর্যন্ত । তারপর লাঞ্চ । আবার দু'টা থেকে থিওরি ক্লাস । চলতো বেলা পাঁচটা পর্যন্ত । তারপরই আমাদের অনাবিল আনন্দ । কে কত আগে পারে বাজারে গিয়ে হাজির হতে । বিকেলের টিফিন যার যার পয়সা দিয়ে ওখানেই করতে হতো । সেই কারণে দোকানদারদের সংগে ভাব হতে সময় লাগতো না । তারাও সব পূর্ববঙ্গীয় । আমাদের অনেকেরই ধারণা ছিলো যে খদ্দের ধরার জন্য প্রথমেই তারা দেশের বাড়ির কথা জিগ্‌গেস করতো । কোন জেলায় বাড়ি আছিলো । কবে আইছ । বাড়িত কেডা কেডা আছে--ইত্যাদি । অবশ্য তা না , সবটাই যে খদ্দের ধরার জন্য তা নয় । এটা একটা দস্তুর ছিলো তখনকার সময় । এখনও আছে । পূর্ববঙ্গীয়রা উদ্বাস্তু হয়ে যেন এক বৃহত্তর আত্মীয়তায় জড়িয়ে পড়েছিলো একইরকম ভাগ্য বিপর্যয়ের সূত্রে ।

আমরা সব অসচ্ছল পরিবারের । টাকাপয়সার টান থাকতই । তাই দোকানে দোকানে যার যার খাতির অনুযায়ী বাকি খাতা খুলে ফেলা হলো । আসলে এই দোকান গুলো হয়ে উঠেছিলো আমাদের একপ্রকার আশ্রয় কেন্দ্র । ওখান থেকেই আমার মত নবিস তরুণরা যুবক হওয়ার তালিমও পায় । সেই তালিম যারা দিত তারা আমাদের স হপাঠি হলেও তারা অনেকে পাকাপোক্ত বয়স্ক যুবক ছিলো । দেখতাম বাজারের মধ্যবয়সী দোকানদারদের সংগে তাদের বেশ খাতির । আর খাতিরের কথাবার্তা যখন হতো তখন আমাদের সেখানে থাকা চলতোনা ।

আমি তবু এদের কাছেই প্রথম জানতে পারি যে গত ২০/২৫ বছর যাবৎ এই মানা ক্যাম্প হয়ে অনেক দেশছাড়া মানুষ মহারাস্ট্র, মধ্যপ্রদেশ,উড়িষ্যার প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে । তখন এটা ট্র্যানজিট ক্যাম্প ছিলো । তাদের পুনর্বাসন দেয়া হতো । শোনা যায় ঘরদোর টাকাপয়সা ছাড়া কৃষিজমি হিসেবে যে জমি অনেকেই পেয়েছে তাতে তার লাঙলই নাকি ছিলো ঐ জমির জীবনে প্রথম চাষ । লাল কাঁকুড়ে উষর এই জমিই নাকি উদ্বাস্তু কৃষকের হাতে পড়ে শস্য সবজির মুখ প্রথম দেখে । অবশ্য সব ক্ষেত্রেই যে সাফল্যের বিস্ময় তৈরী হয়েছিলো তা নয় । পরে জেনেছি পুনর্বাসনের নামে অনেক দুর্নীতি এই সব বৃন্তচ্যুত মানুষদের চিরকালের মত হারিয়ে যেতেও সাহায্য করেছে । (ক্রমশঃ)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০০৯ রাত ৮:৪১
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×