আমার ট্রেড অনুযায়ী মানা ক্যাম্পে থাকার কথা এক বছর । এক বছরের জন্য আমাদের সবাইকে দুই সেট করে ঘন নীল রংএর পোশাক দেয়া হলো । পোশাকটার নাম 'ডাংরি' । জামা প্যান্ট একসংগে জোড়া । সাইজ বেঢপ হলেও তা আমরা কাটিয়ে ফিটিং করে নিলাম । জামা প্যান্টের অভাব এতে কিছুটা মিটলো ।
তখনকার মধ্যপ্রদেশে এই ছোট্ট খন্ড বাংলা ভুবনটি আমাকে বেশ করে যেন জড়িয়ে ধরলো । সমস্ত পূর্ববঙ্গীয় ভাষার এক অদ্ভুত মিশ্রণ সেখানে কানে বাজে । ক্রমে আমিও সেই ভাষায় অভ্যস্থ হয়ে উঠতে লাগলাম । আমাদের হোস্টেলের ব্যারাক আর ক্যাম্পবাসীদের ঘরের ব্যারাকগুলো একটা বড় রাস্তার এপার ওপার । বাজারে যাতায়াতে অনেক সময় আমরা ওদের এলাকার ভেতর দিয়েই যাই । যদিও এটা আমাদের জন্য নিষেধ । তবু যাই । প্রথমে না বুঝলেও পরে বুঝতে পারছিলাম এই যাতায়াতের নেপথ্যে থাকতো কয়েকজন কিশোরী । ধীরে ধীরে দেখা গেল যাওয়া আসার পথে বন্ধুরা কেউ কেউ প্রায়শঃই পিছিয়ে পড়ে। সেই সুযোগে কথা বলে কেউ কোনো কিশোরীর সংগে । আমরা যারা এবিষয়ে তখনও যোগ্য হইনি বা পশ্চাদপদ, তারা অপার বিস্ময়ে এই দৃশ্য দেখে হোস্টেলে ফিরে ভীষণ সিরিয়াস হয়ে আলোচনা করতে বসি ।
সাধারণতঃ বাজার থেকে আমাদের ফিরতে হতো সান্ধ্য রোলকলের আগে । হোস্টেলের সামনের খোলা জায়গায় সবাই কয়েকটা লাইন করে দাঁড়াতাম । অনেকটা মিলিটারি কায়দায় । সেখানে নাম ডাকা হতো । নাম ডাকার পর সেই ক্ষ্যাপা হোস্টেল সুপারের ভাষণ, নির্দেশাবলী । সব শেষে চিঠি বিলি । স্টুডেন্ট ক্যাপটেন চিঠি বিলি করতো নাম ডেকে ডেকে । মাঝে মাঝে আমার চিঠি আসতো । একবার মেজদার চিঠি পেলাম । সেই চিঠি পেয়ে আমার চোখে একটু জল এসে গিয়েছিলো । আসলে মনে পড়ছিলো মেজদার সেই খুব ভোরে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার দৃশ্য ।
সেবার ঠাম্মা মারা যাওয়ার পর পর আমাদের সংসারের হাল ভীষণ খারাপ হয়ে পড়েছিলো । বড়দা আর টানতে পারছিলোনা । মাঝে মাঝেই ছোলা(বুট) সেদ্ধ খেয়ে দুপুর কাটতো । চাল যোগাড় হলে রাতে সামান্য ভাত । দুধনৈ ক্যাম্প থেকে আমি চলে আসার বছর দু'এক পর ঠাম্মা আর মেজদাও চলে এসেছিলো শিলিগুড়ি । উদ্দেশ্য ছিলো মেজদার কলেজে ভর্তি হওয়া । ভর্তি হয়ে প্রি ইউনিভার্সিটি পাশও করে গেল ।পরের বছর ভর্তি হলো ডিগ্রিতে। যেহেতু এটা নাইট কলেজ ছিলো তাই পাশাপাশি চাকরির চেষ্টাও চলতে লাগলো । কিন্তু কিছুতেই আর কিছু হলোনা । দেশ জুড়ে সেই ষাটের দশকে চলছিলো মারাত্মক খাদ্য সংকট এবং আর্থিক মন্দা । মনে হয়েছিলো মেজদাও বোধ হয় সেই অবস্থার শিকার হয়েছিলো । তা ছাড়া ঠাম্মা মারা যাওয়ার পর মেজদাও যেন কিছুটা ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছিল । তখন আমি আর মেজদা এক বিছানাতেই ঘুমোতাম । একদিন ভোরের দিকে টের পেলাম আমার মুখে কারোর হাত বোলানো । টের পেলাম আমার মুখে হাত বুলিয়ে মেজদা ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে চলে যাচ্ছে । দরজার ফাঁকা দিয়ে লক্ষ্য করলাম মেজদা চলে যাচ্ছে । ভেবেছিলাম বোধ হয় কোনো কাজে কোথাও যাচ্ছে । কিন্তু রাতেও মেজদা না ফেরাতে বড়দা খোঁজ খবর শুরু করলো । কিন্তু না, এক দুই করে প্রায় দিন দশেক কেটে গেল । কোনো খবরই নেই । অবশেষে এগার দিনের মাথায় একটা চিঠি এলো বড়দাকে লেখা । আমরা সেই চিঠি না দেখলেও আশ্বস্থ হলাম ।
পরে জানা গেলো মেজদা আবার দেশে ফিরে যাবে বলে শিলিগুড়ি থেকে দিনহাটা গিয়েছিলো । ঘটনাচক্রে সেখানকার এক মিষ্টির দোকানের মালিক তাকে এই কাজ করতে বারণ করে, এবং নিজের কাছে রেখে দেয় । আর এখান থেকেই তার জীবনেরও মোড় ঘুরে যায় । দোকান মালিকের বাড়িতে তার ছেলে মেয়েদের পড়ানোর বিনিময়ে থাকা খাওয়া ঠিক হয় । পাশাপাশি ওখানেই কলেজে পড়া এবং বি কম পাশ করা । একসময় ওখান থেকেই সরকারী পরিবহনে কন্ডাকটারের চাকরী পাওয়া । এই সময়টায় আমি মানা ক্যাম্পে ।
মেজদার সেই চিঠিতে আমাকে টাকা পাঠানোর কথা লেখা ছিলো । তার দিন পনেরর মধ্যে আমি একটা দশ টাকার মানি অর্ডার পেলাম । মেজদার পাঠানো । তারপর থেকে যতদিন ছিলাম মেজদা প্রতিমাসেই দশ বা পনের টাকা করে পাঠাতো । তা দিয়ে আমিত তখন রীতিমত সচ্ছল ।
আই টি আই এর পড়াশুনো আমার কাছে খুব সামান্য মনে হতে লাগলো । ঠেকে যাই শুধু হাতেকলমের কাজে । গিয়ার বক্স, স্টিয়ারি, এফ আই পি, রেডিয়েটর---হেন তেন নিয়ে ঠায় রোদের মধ্যে--ইনস্ট্রাকটরটা আবার পাঞ্জাবী, কথায় কথায় গালি দেয় । তারমধ্যে আমরা শিখে ফেললাম ট্র্যাকটর চালানো । পেছনে যন্ত্রের লাঙল নিয়ে চালাতে গিয়ে হিমশিম । তাও হয়ে গেল । একসময় হয়ে গেল লাইসেন্সও ।
এবার আমাদের প্রোজেক্ট ট্যুর । যাওয়া হবে কোরবা,ভিলাই । আবার সেই ছাউনি দেয়া মিলিটারি ট্রাক । তাতে করে একদিন বেরিয়ে পড়লাম প্রথমে কোরবার উদ্দেশ্যে । ওখানে বিশাল বিশাল নানা রকম প্রোজেক্ট তৈরী হচ্ছে । ভারতে পঞ্চাশ ষাট দশকে ভারী শিল্প স্থাপনের জোয়ার ছিলো । তারই অঙ্গ ছিলো এটা । সেখানে একদিন এক কারখানার ভেতর আমাদের নিয়ে গিয়ে ভারি অটোমোবাইল সম্পর্কে বোঝানো হচ্ছিলো । ঘুরে ঘুরে এদিক ওদিক তাকিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম একজন বয়স্ক শ্রমিক ওয়েলডিংএর কাজ করছেন । আমি তাকে গিয়ে আমার ভয়ংকর হিন্দিতে কিছু জিগ্গেস করি । করাতে তিনি মুখ না তুলেই বললেন--হ হ হিন্দি কইবার লাগতনা--দ্যাশ আছিলো কই--কুন জিলা--মানা ক্যাম্প থন আইছো--হ্যা বুজতাছি--। বলতে বলতে তিনি উঠে দাঁড়ালেন । সরাসরি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন--রাগ করোনিত ভাই । দেশের বাংলাটা কইতে মাঝে মাঝে খুব মন চায় । লও একটু চা খেয়ে আসি । তারপর চা খেতে খেতে বললেন তার দেশছাড়ার কথা । তিনিও মানা আই টি আই এর দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র । ট্রেড ছিলো 'ওয়েল্ডার' ।
প্রোজেক্ট ট্যুরের পর আর বেশী দিন বাকি নেই কোর্স শেষ হতে । ক্যাম্পের দিনও বেশ কেটে যাচ্ছে । কিন্তু নিজের রাজ্য নিয়ে প্রত্যেকেরই ততদিনে বেশ আতংক তৈরি হয়ে গেছে । আতংকের নাম নক্সালবাড়ি । এদিকে উৎপাতের শেষ নেই । হঠাৎ একদিন হোস্টেলে হৈ চৈ । কী না হোস্টেলের কোনো এক ব্যারাকের দেয়ালে কাগজের পোস্টার সাঁটানো হয়েছে এই লিখে যে ---" নক্সালবাড়ির লাল আগুনে সারা দেশ জ্বলছে জ্বলবে"। কে বা কারা এই কাজ করেছে তখনও জানিনা । কিন্তু ক্ষ্যাপা হোস্টেল সুপার কাউকেই ছাড়ছেনা । আঙুল তুলে তুলে যাকে যখন সামনে পাচ্ছে শাসাচ্ছে---দেখে নোবো তোমরা কে কত বড় নক্সাল । সিক্স আওয়ারস্ টাইম দিলুম এর মধ্যে যদি কালপ্রিট আমার কাছে সারেন্ডার না করে আই উইল পুট ইউ অল আনডার লোকাল পোলিশ কাস্টডি ।---মাগো, আমরা সব ভয়ে কাঠ । সুপারের সামনে যেতে কেউ সাহস পাচ্ছেনা । অবশেষে সবাই মিলে গিয়ে আমরা ক্ষমা চেয়ে বললাম যে আমরা এক্ষুনি ওটা মুছে দিচ্ছি ।
এই বলে সেদিনের মতো ছাড়া পেয়ে গেলাম । কিন্তু এই পোস্টারের হোতা কে তা আমরা খুব সহজেই জানতে পেরে গেলাম । তাকে আমরা এর জন্য কিছু বলার আগেই সে-ই আমাদের হুমকি দিয়ে রাখলো যে গোপনীয়তা ভঙ্গকারীরও নাকি প্রাণদন্ড প্রাপ্য । আমরা ভয়ে কাঠ ।(ক্রমশঃ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

