somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখা আঁতুড় ঘর /৪

০৭ ই মে, ২০০৯ রাত ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার ট্রেড অনুযায়ী মানা ক্যাম্পে থাকার কথা এক বছর । এক বছরের জন্য আমাদের সবাইকে দুই সেট করে ঘন নীল রংএর পোশাক দেয়া হলো । পোশাকটার নাম 'ডাংরি' । জামা প্যান্ট একসংগে জোড়া । সাইজ বেঢপ হলেও তা আমরা কাটিয়ে ফিটিং করে নিলাম । জামা প্যান্টের অভাব এতে কিছুটা মিটলো ।

তখনকার মধ্যপ্রদেশে এই ছোট্ট খন্ড বাংলা ভুবনটি আমাকে বেশ করে যেন জড়িয়ে ধরলো । সমস্ত পূর্ববঙ্গীয় ভাষার এক অদ্ভুত মিশ্রণ সেখানে কানে বাজে । ক্রমে আমিও সেই ভাষায় অভ্যস্থ হয়ে উঠতে লাগলাম । আমাদের হোস্টেলের ব্যারাক আর ক্যাম্পবাসীদের ঘরের ব্যারাকগুলো একটা বড় রাস্তার এপার ওপার । বাজারে যাতায়াতে অনেক সময় আমরা ওদের এলাকার ভেতর দিয়েই যাই । যদিও এটা আমাদের জন্য নিষেধ । তবু যাই । প্রথমে না বুঝলেও পরে বুঝতে পারছিলাম এই যাতায়াতের নেপথ্যে থাকতো কয়েকজন কিশোরী । ধীরে ধীরে দেখা গেল যাওয়া আসার পথে বন্ধুরা কেউ কেউ প্রায়শঃই পিছিয়ে পড়ে। সেই সুযোগে কথা বলে কেউ কোনো কিশোরীর সংগে । আমরা যারা এবিষয়ে তখনও যোগ্য হইনি বা পশ্চাদপদ, তারা অপার বিস্ময়ে এই দৃশ্য দেখে হোস্টেলে ফিরে ভীষণ সিরিয়াস হয়ে আলোচনা করতে বসি ।

সাধারণতঃ বাজার থেকে আমাদের ফিরতে হতো সান্ধ্য রোলকলের আগে । হোস্টেলের সামনের খোলা জায়গায় সবাই কয়েকটা লাইন করে দাঁড়াতাম । অনেকটা মিলিটারি কায়দায় । সেখানে নাম ডাকা হতো । নাম ডাকার পর সেই ক্ষ্যাপা হোস্টেল সুপারের ভাষণ, নির্দেশাবলী । সব শেষে চিঠি বিলি । স্টুডেন্ট ক্যাপটেন চিঠি বিলি করতো নাম ডেকে ডেকে । মাঝে মাঝে আমার চিঠি আসতো । একবার মেজদার চিঠি পেলাম । সেই চিঠি পেয়ে আমার চোখে একটু জল এসে গিয়েছিলো । আসলে মনে পড়ছিলো মেজদার সেই খুব ভোরে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার দৃশ্য ।

সেবার ঠাম্মা মারা যাওয়ার পর পর আমাদের সংসারের হাল ভীষণ খারাপ হয়ে পড়েছিলো । বড়দা আর টানতে পারছিলোনা । মাঝে মাঝেই ছোলা(বুট) সেদ্ধ খেয়ে দুপুর কাটতো । চাল যোগাড় হলে রাতে সামান্য ভাত । দুধনৈ ক্যাম্প থেকে আমি চলে আসার বছর দু'এক পর ঠাম্মা আর মেজদাও চলে এসেছিলো শিলিগুড়ি । উদ্দেশ্য ছিলো মেজদার কলেজে ভর্তি হওয়া । ভর্তি হয়ে প্রি ইউনিভার্সিটি পাশও করে গেল ।পরের বছর ভর্তি হলো ডিগ্রিতে। যেহেতু এটা নাইট কলেজ ছিলো তাই পাশাপাশি চাকরির চেষ্টাও চলতে লাগলো । কিন্তু কিছুতেই আর কিছু হলোনা । দেশ জুড়ে সেই ষাটের দশকে চলছিলো মারাত্মক খাদ্য সংকট এবং আর্থিক মন্দা । মনে হয়েছিলো মেজদাও বোধ হয় সেই অবস্থার শিকার হয়েছিলো । তা ছাড়া ঠাম্মা মারা যাওয়ার পর মেজদাও যেন কিছুটা ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছিল । তখন আমি আর মেজদা এক বিছানাতেই ঘুমোতাম । একদিন ভোরের দিকে টের পেলাম আমার মুখে কারোর হাত বোলানো । টের পেলাম আমার মুখে হাত বুলিয়ে মেজদা ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে চলে যাচ্ছে । দরজার ফাঁকা দিয়ে লক্ষ্য করলাম মেজদা চলে যাচ্ছে । ভেবেছিলাম বোধ হয় কোনো কাজে কোথাও যাচ্ছে । কিন্তু রাতেও মেজদা না ফেরাতে বড়দা খোঁজ খবর শুরু করলো । কিন্তু না, এক দুই করে প্রায় দিন দশেক কেটে গেল । কোনো খবরই নেই । অবশেষে এগার দিনের মাথায় একটা চিঠি এলো বড়দাকে লেখা । আমরা সেই চিঠি না দেখলেও আশ্বস্থ হলাম ।
পরে জানা গেলো মেজদা আবার দেশে ফিরে যাবে বলে শিলিগুড়ি থেকে দিনহাটা গিয়েছিলো । ঘটনাচক্রে সেখানকার এক মিষ্টির দোকানের মালিক তাকে এই কাজ করতে বারণ করে, এবং নিজের কাছে রেখে দেয় । আর এখান থেকেই তার জীবনেরও মোড় ঘুরে যায় । দোকান মালিকের বাড়িতে তার ছেলে মেয়েদের পড়ানোর বিনিময়ে থাকা খাওয়া ঠিক হয় । পাশাপাশি ওখানেই কলেজে পড়া এবং বি কম পাশ করা । একসময় ওখান থেকেই সরকারী পরিবহনে কন্ডাকটারের চাকরী পাওয়া । এই সময়টায় আমি মানা ক্যাম্পে ।

মেজদার সেই চিঠিতে আমাকে টাকা পাঠানোর কথা লেখা ছিলো । তার দিন পনেরর মধ্যে আমি একটা দশ টাকার মানি অর্ডার পেলাম । মেজদার পাঠানো । তারপর থেকে যতদিন ছিলাম মেজদা প্রতিমাসেই দশ বা পনের টাকা করে পাঠাতো । তা দিয়ে আমিত তখন রীতিমত সচ্ছল ।

আই টি আই এর পড়াশুনো আমার কাছে খুব সামান্য মনে হতে লাগলো । ঠেকে যাই শুধু হাতেকলমের কাজে । গিয়ার বক্স, স্টিয়ারি, এফ আই পি, রেডিয়েটর---হেন তেন নিয়ে ঠায় রোদের মধ্যে--ইনস্ট্রাকটরটা আবার পাঞ্জাবী, কথায় কথায় গালি দেয় । তারমধ্যে আমরা শিখে ফেললাম ট্র্যাকটর চালানো । পেছনে যন্ত্রের লাঙল নিয়ে চালাতে গিয়ে হিমশিম । তাও হয়ে গেল । একসময় হয়ে গেল লাইসেন্সও ।

এবার আমাদের প্রোজেক্ট ট্যুর । যাওয়া হবে কোরবা,ভিলাই । আবার সেই ছাউনি দেয়া মিলিটারি ট্রাক । তাতে করে একদিন বেরিয়ে পড়লাম প্রথমে কোরবার উদ্দেশ্যে । ওখানে বিশাল বিশাল নানা রকম প্রোজেক্ট তৈরী হচ্ছে । ভারতে পঞ্চাশ ষাট দশকে ভারী শিল্প স্থাপনের জোয়ার ছিলো । তারই অঙ্গ ছিলো এটা । সেখানে একদিন এক কারখানার ভেতর আমাদের নিয়ে গিয়ে ভারি অটোমোবাইল সম্পর্কে বোঝানো হচ্ছিলো । ঘুরে ঘুরে এদিক ওদিক তাকিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম একজন বয়স্ক শ্রমিক ওয়েলডিংএর কাজ করছেন । আমি তাকে গিয়ে আমার ভয়ংকর হিন্দিতে কিছু জিগ্‌গেস করি । করাতে তিনি মুখ না তুলেই বললেন--হ হ হিন্দি কইবার লাগতনা--দ্যাশ আছিলো কই--কুন জিলা--মানা ক্যাম্প থন আইছো--হ্যা বুজতাছি--। বলতে বলতে তিনি উঠে দাঁড়ালেন । সরাসরি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন--রাগ করোনিত ভাই । দেশের বাংলাটা কইতে মাঝে মাঝে খুব মন চায় । লও একটু চা খেয়ে আসি । তারপর চা খেতে খেতে বললেন তার দেশছাড়ার কথা । তিনিও মানা আই টি আই এর দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র । ট্রেড ছিলো 'ওয়েল্ডার' ।

প্রোজেক্ট ট্যুরের পর আর বেশী দিন বাকি নেই কোর্স শেষ হতে । ক্যাম্পের দিনও বেশ কেটে যাচ্ছে । কিন্তু নিজের রাজ্য নিয়ে প্রত্যেকেরই ততদিনে বেশ আতংক তৈরি হয়ে গেছে । আতংকের নাম নক্সালবাড়ি । এদিকে উৎপাতের শেষ নেই । হঠাৎ একদিন হোস্টেলে হৈ চৈ । কী না হোস্টেলের কোনো এক ব্যারাকের দেয়ালে কাগজের পোস্টার সাঁটানো হয়েছে এই লিখে যে ---" নক্সালবাড়ির লাল আগুনে সারা দেশ জ্বলছে জ্বলবে"। কে বা কারা এই কাজ করেছে তখনও জানিনা । কিন্তু ক্ষ্যাপা হোস্টেল সুপার কাউকেই ছাড়ছেনা । আঙুল তুলে তুলে যাকে যখন সামনে পাচ্ছে শাসাচ্ছে---দেখে নোবো তোমরা কে কত বড় নক্সাল । সিক্স আওয়ারস্‌ টাইম দিলুম এর মধ্যে যদি কালপ্রিট আমার কাছে সারেন্ডার না করে আই উইল পুট ইউ অল আনডার লোকাল পোলিশ কাস্টডি ।---মাগো, আমরা সব ভয়ে কাঠ । সুপারের সামনে যেতে কেউ সাহস পাচ্ছেনা । অবশেষে সবাই মিলে গিয়ে আমরা ক্ষমা চেয়ে বললাম যে আমরা এক্ষুনি ওটা মুছে দিচ্ছি ।

এই বলে সেদিনের মতো ছাড়া পেয়ে গেলাম । কিন্তু এই পোস্টারের হোতা কে তা আমরা খুব সহজেই জানতে পেরে গেলাম । তাকে আমরা এর জন্য কিছু বলার আগেই সে-ই আমাদের হুমকি দিয়ে রাখলো যে গোপনীয়তা ভঙ্গকারীরও নাকি প্রাণদন্ড প্রাপ্য । আমরা ভয়ে কাঠ ।(ক্রমশঃ)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০০৯ রাত ১২:০৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×