দেশবাসীর হয়ত মনে আছে কে এই নানক! পুরোনাম জাহাঙ্গীর কবির নানক। বরিশালের ছেলে নানক। গত ২৫ ফেব্র“য়ারির ঘটনার পর এই নামটি বেশ আলোচনায় উঠে আসে আরও একবার। খুলনা বি.এল কলেজের আদুভাই খ্যাত নানক তখন থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছেন বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে। ছাত্রলীগের নিরঙ্কুশ মতার লোভে নিজেকে আদুভাই হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সম হন তিনি। ঘটনাক্রমে একদিন আমার রুমে (বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে) একটা ছেলে আসেন। দেখতে কালো এবং লম্বা। আমার আতিথ্যে পাঠানোর কারণটা জানতাম না। একটু একটু করে তার সাথে ঘনিষ্ঠ হলাম। জানলাম সে আমার এখানে ক’দিন পালিয়ে থাকতে চান। তার এমন অকপট কথাবার্তায় আমি খুব চমকে গেলাম। এরপর সে জানায় নানক বাহিনীর ভয়ে তাকে ক’দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। নানক বাহিনীর অনেক গল্প সে রাতে মনদিয়ে শুনি। থ্রিনট থ্রি রাইফেল থেকে শুরু করে সব ধরণের অস্ত্রচালনায় নানকের সমক হয়ত পুলিশ বাহিনীতেও নেই। যেমনি সাহসী, তেমনি নিষ্ঠুর। অপারেশনে ব্যর্থ হওয়ায় একে খুঁজেফিরছে। দলের পোলাপানদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে শ্যুট এ্যাট সাইট! বলে। লোকটি তার হাতের জিনিসটা দেখিয়ে বলে, ভয় পাইয়েন না, কাটিজ নাই। জীবনের ভয়ে এইটা নিয়ে পালাইছি, খালি হাতে জীবন দেয়ার চে লড়াই করে মরতে চাই।
আমি যে ভয় পাই না সেটা জেনেই আপনাকে আমার এখানে পাঠানো হইছে।
হ্যাঁ, আমি শুনছি আপনি বেশ ভালো... .. চালাইতে পারেন। আন্ডার গ্রাউন্ডের ট্রেনিং।
ওসব বাড়িয়ে বলা কথা। আমি ছুঁয়েও দেখি না।
শাহীন ভাইকে চেনেন?
আকাশ শাহীন?
ও চেনেনতো!
না, নাম শুনছি। সর্বহারা না কী যেন করে!
পুরা ডাকাইত। লিড দেয় তরিকুল আর নানক
তলের খবর?
আরে না মিয়া, সবাই জানে।
তরিকুল কোন দলের?
দু’জন দুইদলের, তারপরও...কামের সময় এক
আকামের সময়..
কম্পিউটারে গান দেখতে দেখতে কথা এগিয়ে চলছে।
আপনি ফেইল করলেন কীভাবে? অভ্যেস নাই?
আরে কী কন
(তার বাহাদুরির গালগপ্প শুনলাম)
হায়দার নামের এক শিবিরের ক্যাডারকে মারতে গিয়া কট খাইছে।
শিবিরতো আরও বড় অস্ত্রবাজ!
আরে না মিয়া, এসব ফাও! কিছু আছে, তবে ওদের অন্যকিছু আছে, আমি হায়দারকে মেরে ফেলার অর্ডার পাইছি, এটা ওরা জেনেগেছে। তারপরও ওদের মধ্যে কোনও নড়াচড়া দেখলাম না। রাত বারোটার পর গেলাম অপারেশনে। গিয়ে যখন হায়দারের রুম পর্যন্ত পৌঁছলাম দেখি সে নির্বিকারভাবে টেবিলে বসে কোরানশরীফ পড়ছে...
আমার মধ্যে বিশ্বাস করার মতা কম।
যাই হোক!
নানকের প্রসঙ্গে আসি। বি.এল থেকে বেরিয়ে এবার আসেন ঢাকায়। মোহাম্মদপুর আদাবরে যুবলীগে জয়েন করেন অস্ত্রপ্রশিক হিসেবে। ভালোই প্রভাব বিস্তার করেন। নেতৃত্ব পান। এবং সাংসদ নির্বাচিত হন। আওয়ামীলীগের বক্তার ভাষায়: হাসিনার কোনও লাশের প্রয়োজন হলেই ডাক পড়ে নানকের।... শ্র“তিটি বিশ্বাস্য কতটুকু জানি না। তবে এবারের ঘটনায় আমরা কী জানলাম?
গত ২বছর নানক বিশেষভাবে পালাতক ছিলেন। এসময় তিনি ডিএডি তৌহিদের বাসায় বেশ নিরাপদেই লুকিয়ে ছিলেন। সরষের ভিতর ভুত কথাটি বহুকালের সত্য উপলব্ধি।
মইন উ আহমেদ খালেদার আস্থাভাজন একজন বর্ণচোরা! তিনি ইতোমধ্যে হাসিনারও পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে সম হন; ২৫ তারিখের ঘটনার পর। খালেদা ও চারদলের সাহচর্যে এসে জেনেগেছেন ভেতরকার ঢের গোপনীয়তা। খালেদাকে বারবার মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে দিয়ে হাজির করেন একপ্রকার বিরোধিতাহীন-প্রতিরোধবিহিীনভাবে নির্বাচনে। এতোরকম নির্যাতন-জেল-জরিমানার পরও খালেদাবাহিনী প্রায় নীরবই ছিলেন! কেন? কেবল এই লোকটির আশ্বাসে, ম্যাডাম মুখ কামড়ে পড়ে থাকুন বিজয় আপনারই হবে..দ্যাখেন কী হয়।.. জাতীয় কথায় আস্থা খোঁজেন সরলবিশ্বাসী জিয়ার পতœী খালেদাও। জিয়ার প্রাণবিসর্জনের পেছনে যে কারণটি ছিল এবারের খালেদার পতন এবং সেনাবাহিনীর আত্মদান একই সূতোয় গাঁথা। জিয়ার চারপাশের যে বিশ্বস্ত! বাহিনী ছিল তারাই জিয়াকে টেনে নিয়েছেলেন অধপতনে। অনেক বিশ্বস্ত মানুষকে এড়িয়ে জিয়া ওইসব তথাকথিত বিশ্বস্ত বুদ্ধিজীবিদের কথায় চলতে শুরু করলেন। তবু দেশপ্রেমিক জিয়া নিজের বিবেচনায় ফারাক্কা বাঁধ এর প্রতিরোধে শুরু করলেন ব্যারেজ প্রকল্প! প্রতিবেশী দেশের রাহুগ্রাসে পড়লেন অনিবার্যভাবে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে যুগে যুগে। এবার যখন ট্রিপল টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, চলছে বিরোধিতা ঠিক তখন সরকারের হাতে এলো ব্লাক লিস্ট। এই লিস্ট তৈরীতে বিশ্বস্ত অনুচরের ভুমিকা রাখলেন মইন উ আহমেদ। যিনি জানেন বিএনপি-ইসলামঘেষা সেনা অফিসারদের কথা। যার কিয়দংশ জানান দেন হাসিনা তনয় জয়। সেনাবাহিনীতে ইসলামপন্থীদের প্রভাব বেড়েছে।
হাসিনা বরাবরই সেনাবাহিনীকে ভয় করে এবং ঘৃণাকরে চললেও এবার মইন উ কে পাশে পেয়ে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। কিন্তু বিএনপি আমলের প্রমোশন পাওয়া সেনাপ্রধানকে এতো সহজে তো বিশ্বাস করা যায় না। তাই বিশ্বস্ততার প্রমাণস্বরূপ কয়েকটি শত্র“লাশ চেয়ে বসলেন হাসিনা। মইন উর পে কাজটি সরাসরি করা সম্ভব ছিল না। তাই সব পথ বাতলে দিলেন। সব ভারতবিরোধী অফিসারগুলো এবং ইসলাম ও বিএনপিপন্থী পরীতি জাঁদরেল অফিসারদের একে একে তড়িৎ গতিতে এনে ফেলা হলো একই পরিমণ্ডলে। জানানো হলো সবচে বেশি দেশপ্রেমীদের আসলে বিডিআরে থাকা উচিৎ তাহলেই দেশের সীমানা রা সম্ভব! ভিন্ন পরিকল্পনা তখনও সবার ভাবনার অন্তরালে।...
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর দিনণ ঠিক করা হলো দাদাবাবুদের সাথে পরামর্শ করে। যদি বাংলাদেশের কোনও গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের ফোনে আড়িপাতার অধিকার দেওয়া হয়ে থাকে এবং অন্তত যদি এমন কোনও রেকর্ড বাইরে প্রকাশ করা যায় তাহলে এ সত্যও একদিন বেরিয়ে পড়বে। ভারত সম্পূর্ণ প্রস্তুত যদি বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কমান্ড অগ্রাহ্য করে তখন দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা অ্যাডভান্স হবেন।
আর এ কাজটিকে সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা হিসেবে ডাকা হলো নানককে। নানক একদিকে নাটক করবে অন্যদিকে সেনাবাহিনীকে ঠাণ্ডা করবে সরকার এবং বর্ণচোরা মইন উ। যে সরকারকে বলেন সরকারের প আর সেনাদের বোঝাতে সম হয়েছেন সে তাদেরই।
নানকের নাটকের জন্য বলির পাঠা হিসেবে ত্যাগ করতে রাজি হলেন ডি.এ.ডি তৌহিদ। অল্পজ্ঞানীদের সর্দারদের কখনও বেশি জ্ঞানী হতে হয় না। অল্পজ্ঞানী তৌহিদ সেরকম এক বলির পাঠা। যে নানকের সমঝোতা নাটকের নটী। মইন উ যুদ্ধনীতি হিসেবে সেনাবাহিনীর লোকদের বুঝাতে পারলেন যে যুদ্ধেও শত্র“দের সবদিক থেকে পরিবেষ্টিত না করে একটি পালানোর দরজা খোলা রাখতে হয়, যাতে শত্র“ দেয়ালে পীঠ ঠেকে যাওয়ার মতো মরণকামড় দিতে না পারে। বরং বিড়ালের মতো পলায়ন করে। সত্যিই তাই হলো। হাজার হাজার বিডিআর পালাল সেই সুযোগে...
মায়ের দরদ নিয়ে নানকের পর এগিয়ে গেলেন সাহারা খাতুন। দেশবাসীর ভাবা উচিৎ কেন উনি গেলেন। আপনারা হয়ত মহাভারতের শিখণ্ডীর কথা জানেন! আমাদের ব্যাখ্যায় সে ছিল হিজরা, যাকে মারা নিষেধ। যার কোনও পরিবার নেই, পরিজন নেই, সন্তান নেই সে গেলো মাতৃদরদ নিয়ে? হাস্যকরই বটে।
এদের তিনজনই জীবন দেবার আশঙ্কাতেই সেখানে গিয়েছিলেন। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলোই ব্যবহার হয় বাঙালির ঘরে। নানক যেসব অপকর্ম করেছে যে কোনও মুহূর্তে সে আইনের হাতে ধরা পড়তে পারে, জয়নাল হাজারির মতো তারও বর্ণাঢ্য কীর্তি? আছে। র্যারের হাতে ক্রসফায়ারে যাওয়া তার সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাকে দলে রাখা এখন বিষফোঁড়ার মতো। হাসিনা তার গুডউইল নষ্ট হতে দেবেন না, একে সরিয়ে দিতে পারলেই বেঁচে যান। এমন লোককে পাঠানোর দুটো সুবিধা এরা বাঁচলেও যা মরলেও তা। আর সেদিন সাহারা খাতুনের কিছু হলেও হাসিনার কাছে কৈফিয়ত চাইবার মতো কেউ ছিল না সাহারার। সাহারার পারিবারিক অব¯থা সাহারা মরুভূমির মতোই হাহাকারে ভরা।
হাসিনা জীবনের অপচয় ঘটতে দেননি, কথাটাকি সত্য নয়?
নানকের নাটকের ইতি কিন্তু শেষ হয়নি। আমরা কিছু করার চেষ্টা করছি সেনাবাহিনী তোমরা থামো। ভিতরে কিছু হয়নি... নাটকে সে সফল তারপর সংসদে আরেকধাপ ভাষণ দিয়ে নিজের মূল্যবান জীবন বিসর্জনের গল্প দিয়ে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করতে চাইলেন জাতিকে, তার জীবন যে কতো মূল্যবান তাতো হাসিনার কথায়-কাজেই ভালোভাবে জানাগেলো।
ট্রিপল টি বাস্তবায়নের জন্য এ ছাড়া আর কোনও পথ ছিল না। কারণ ডিজি শাকিল কর্ণেল গুলজারের মতো সর্বেেত্র সফল অফিসাররা বেঁচে থাকলে কোনওদিনই তা সম্ভব নয়। ডিজি শাকিলের প্রবন্ধে(নয়াদিগন্ত) তা হয়ত আপনারা জেনেছেন। অতএব তাদের সরিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় নাই। আর কী দিয়ে হাসিনা দাদাদের ঋণ শোধ করবেন?
তবে এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন সব সরকারই তাদের নিজ নিজ আমলে, তারও কারণ ছিল ভারতকে দিচ্ছি দিচ্ছি ভাব করে শান্ত রাখা। প্রতিবেশীকে খেপিয়ে দেশ চালানো সম্ভব নয় এটা জানেন তারা। তবে চেষ্টা ছিল নিজেদের স্বার্থ কতোটা রা করা যায়..
আপাতত মইন উ কে নজরবন্দী রাখা না হলে সরকার বেকায়দায় পড়বে। সেনাবাহিনী সংগঠিত হতে পারলে হাসিনার টনক নড়বে আশা করতে পারতাম। তবে সার্বণিক ভারতীয় সুবিধাবেষ্টিতদের সঙ্গে পেরে ওঠা হয়ত আর সম্ভব নয়। তবে বাঙালি বীরের জাতি। যদি বুঝতে পারে, এসব সরকারী নাটক তাহলে এ জাতির স্বাধীনতা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
আমরা সেই জাগৃতির জন্য চাই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা।
পুনশ্চ: দ্রুত বিচারের নামে তৌহিদকে সরিয়ে দেওয়া হলে অনেক রহস্যই অজ্ঞাত থাকবে এ জাতির!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


