।। ইত্তেফাক রিপোর্ট ।।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে পর্যায়ক্রমে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে নেপথ্যে সক্রিয় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক’জন শিক্ষক এবং ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা। তারা নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শের ভিত্তিতে আন্দোলনকে ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে টাকা-পয়সার যোগান দিয়েছে কারাগারে আটক বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিমের লোকজন। এছাড়া পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী দু’টি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের পরিবেশিত সংবাদ ও টক শো’র মাধ্যমে সুকৌশলে আন্দোলনকে উস্কে দেবার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া শিক্ষক ও ছাত্র নেতারা জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানায়। সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র আন্দোলন শুরুর অনেক আগে থেকেই এ ধরনের একটি ঘটনার প্লট তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড: আনোয়ার হোসেন। এ লক্ষ্যে তিনি কিছুদিন আগে থেকেই সমমনা কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আসছিলেন। নিজে আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেও এক পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপি’র শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গেও পরোক্ষ যোগাযোগ গড়ে তোলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁকে সহায়তা দেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সে অনুযায়ী ড: আনোয়ার হোসেনকে পরামর্শ দিতেন তিনি। এছাড়া ড: আনোয়ার হোসেন শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন তার কয়েকজন আইনজীবীর মাধ্যমে।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে গোয়েন্দা সূত্রটি আরও জানায়, মাঠে ফুটবল খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনাটি যখন মিটমাট হয়ে যায়, ঠিক তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সদরুল আমিন, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক হারুন ব্যাপারটিকে সর্বাত্মক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করার লক্ষ্যে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান ও ইন্ধন যোগাতে থাকেন। ২১ আগস্ট শিক্ষক সমিতির জরুরী সাধারণ সভায় জনৈক সেনা সদস্যের সঙ্গে একজন ছাত্রের মারামারির ঘটনাকে আলোচনার বাইরে রেখে তারা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার দাবিতে বক্তব্য দেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে তারা জনগণকে সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড় করাবার চেষ্টা করছিলেন। ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে হকার্স, রিক্সাওয়ালা ও নিম্ন আয়ের লোকদের যুক্ত করার সব রকম প্রয়াসই তারা চালিয়েছেন।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিমের লোকজনের মাধ্যমে এ কাজের জন্য প্রচুর পরিমাণ টাকা ছড়ানো হয়।
সূত্রটি জানায়, ২১ আগস্ট শিক্ষক সমিতির সভায় পরিকল্পিতভাবে এমন কিছু এজেন্ডা প্রস্তাব করা হয়, যার সঙ্গে সরকার পতন আন্দোলনের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। প্রস্তাবিত এজেন্ডায় ছিল ঘটনার নিন্দা, দোষীদের শাস্তিদান, ঘটনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, ২২ আগস্ট দুপুর ১২টার মধ্যে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার, ছাত্র আন্দোলনের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ ও একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলন জোরদারকরণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশের আইজির পদত্যাগ এবং অবিলম্বে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার। এসব এজেন্ডার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো কিছু শিক্ষক সামগ্রিক আন্দোলনে সামিল হন। এদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক হোসেন মনসুর, অধ্যাপক নূরুর রহমান খান, ড: মিজানুর রহমান, ড: জিনাত হুদা, ড: তাজমেরী, অধ্যাপক ফখরুল আলম, অধ্যাপক আব্দুস সামাদ, অধ্যাপক জিএম চৌধুরী, ড: নিমচন্দ্র ভৌমিক, অধ্যাপক ভট্টাচার্য প্রমুখ। সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় ইন্ধন যুগিয়েছেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী।
গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, সরকার ২২ আগস্ট দুপুর ১২টার মধ্যে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার ও ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের ঘোষণা দেয়ার পর ২১ আগস্ট রাতেই ছাত্র আন্দোলন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু ব্যাপারটি অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও ড: হারুনদের পরিকল্পনার বিপরীতে ঘটতে থাকায় তারা মৃতপ্রায় আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করতে নানামুখি চেষ্টায় লিপ্ত হন। ২২ আগস্ট বেলা ১১টায় তারা অপরাজেয় বাংলার সামনে ছাত্র-শিক্ষক সমাবেশ ও মৌন মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-শিক্ষককে জড়ো করা হয়। এরপর মৌনমিছিল শেষে শহীদ মিনারে দেয়া বক্তৃতায় ড: আনোয়ার ও সদরুল আমিন দাবি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আহবান জানান। এমনকি তারা জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার এক দফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও ডাক দেন।
শহীদ মিনার থেকে শিক্ষিকদের নেতৃত্বে মিছিল শুরু হলেও কিছুদূর গিয়ে শিক্ষকরা মিছিলের সামনে থেকে সরে যান। এরপর ছাত্ররা মিছিল থেকে পুলিশের উদ্দেশে বৃষ্টির মত ইট-পাটকেল ছুঁড়তে শুরু করে। মূলত এখান থেকে গোলমাল মারাত্মক আকার ধারণ করে এবং ঘটনা খুব দ্রুত ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় একইসঙ্গে ঢাকার বাইরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়। মূলত আগের দিন রাতেই ড: আনোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক হারুন টেলিফোনে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষকের সঙ্গে এ ধরনের ছাত্র বিক্ষোভের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। সে অনুযায়ীই প্রায় একই সঙ্গে সবগুলো প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ শুরু হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



