somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসলামে আধুনিকতাবাদ - ১

৩০ শে মে, ২০১০ দুপুর ২:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আস সালামু আলাইকুম

মূল: জামাল-আল-দীন জারাবযো

আধুনিকতাবাদ কি এবং এর উৎপত্তি

সমকালীন “আধুনিকতাবাদী আন্দোলন” [বা Modernist Movement’’] যে দশর্নের অনুসারী, সেই দর্শন আমাদের হিজরী ৩য় শতাব্দীর একটি গোষ্ঠীর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই গোষ্ঠীর নাম: মু’তাযিলা। যদিও তারা কুর’আন ও সুন্নাহকে অস্বীকার করত না - কিন্তু তারা তাওইল করত - আল্লাহর রাসূল (সা.) ও তাঁর সাহাবারা যেভাবে কুর’আনরে ব্যাখ্যা দিয়েছেনে তা বাদ দিয়ে নিজের বিচার-বুদ্ধি অনুযায়ী কুরআ’নরে ব্যাখ্যা দিত (অর্থাৎ কুর'আনের মনগড়া ব্যাখ্যা দিত) । তারা না’কল (text বা রাসূল (সা.)-এঁর দিক-নির্দেশনা ) অপেক্ষা ‘আক্বল (reason - নিজ বুদ্ধমিত্তা)-এর প্রাধান্য দিত। কালের পরিক্রমায় এই গোষ্ঠীর বিলুপ্তি ঘটেছে।

সেই ‘‘মু’তাযিলা’’ গোষ্ঠীর সাথে হালের মুসলিম বিশ্বের “আধুনিকতাবাদী আন্দোলন”-এর কোন প্রত্যক্ষ যোগসাজস না থাকলেও, তাদের চিন্তাধারা ও আদর্শে মিল পাওয়া যায়। এমনিতে “আধুনিকতাবাদী আন্দোলন”-এর সূচনা হয় ইউরোপে। সে সময় স্পেনে বিজ্ঞানচর্চার রেনেসাঁ চলছিল। দেখা গেল এতদিন ধরে চার্চ যেসব আচার-অনুষ্ঠান পালন করছে, তার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিই নেই। তাই মানুষের মাঝে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগল। তারা ধর্ম থেকে দূরে সরে যেতে লাগল।
এই ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্যই আধুনিকতাবাদের উৎপত্তি হলো। ধর্ম সম্বন্ধে আধুনিকতাবাদের মূল কথা হলো - ‘‘ধ্রুব-সত্য (বা absolute truth) বলে কিছু নেই। তাই ধর্মও কোন অপরিবর্তনীয় জিনিস নয়। বরং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ধর্মকে আরো পরিশোধন, পরিমার্জন করা প্রয়োজন’’। তাই ইহুদি ও খ্র্রিস্টান আধুনিকতাবাদীরা তাদের ধর্মকে আরো আধুনিক করার চেষ্টা করলো এবং নতুন নতুন আচার-অনুষ্ঠানের সূচনা করল। উদাহরণস্বরূপ ১৯০০ সালের দিকে প্রথম চার্চে গান- বাজনার সূচনা হয়। এভাবে ধর্মে নতুন নতুন অনুষ্ঠানের সূত্রপাত করে তারা মানুষকে আবার ধর্মমুখী করার চেষ্টা করল। তারা বলল: ‘‘যেহেতু বাইবেলে স্রষ্টা এবং মানুষ উভয়ের কথাই স্থান পেয়েছে, তাই বাইবেলে কোন পরম সত্য (absolute truth) নেই। আর বাইবেলের ততটুকুই সত্য, যতটুকু যুগের সাথে তাল মেলাতে সক্ষম’’

দুর্ভাগ্যক্রমে মুসলিমরা ইউরোপীয়দের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। সুতরাং মুসলিমদের সামনে তিনটি রাস্তা খোলা ছিল:
(১) ইউরোপীয়দের ন্যায় ধর্মবিমুখ জীবন যাপন করা
(২) পুরোপুরি সত্য-ধর্ম ইসলাম অনুযায়ী জীবন যাপন করা
(৩) ইসলাম ধর্মের আধুনিকীকরণ করে তার নতুন রূপ দেয়া এবং এই পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত আধুনিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুসরণ করা।


যারা তৃতীয় রাস্তাটি বেছে নিয়েছিলেন তারাই [Islamic Modernism-এর বা] “ইসলামী আধুনিকতাবাদের” সূচনা করেন। প্রধানত তুরস্ক (তুরস্ক তখন ব্রিটিশদের কর্তৃত্বাধীন) ও মিশরে (যেহেতু আল-আযহার তখন ইসলামী শিক্ষার মূলকেন্দ্র ছিল) এই ইসলামী আধুনিকতাবাদের সূচনা হয়। এরা ইসলামের সকল বিধি-নিষেধকে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা দ্বারা বিচার করা শুরু করল। আধুনিকতাবাদীদের এই চিন্তা-চেতনার ত্রুটিগুলো নিম্নরূপ:

(১) সবকিছু নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা বিবেচনা করে।
(২) নিজেদের বিবেক-বুদ্ধির সাথে কোন দর্শন মিলে গেলে তারা তা অনুসরণ করে। অন্যথায় তা পরিত্যাগ করে ।
(৩) সকল ওহী (Revelation) তারা “‘আক্বল” দ্বারা বিচার করে - নিজেদের ‘আক্বলের সাথে না মিললে তারা ওহীকে প্রত্যাখ্যান করে।


অথচ, “আহলুস সুন্নাহ ওয়া আল-জামা‘আহ” ঠিক বিপরীত মত পোষণ করে। আহলে সুন্নাহ ওয়া আল জামা‘আর মতে, কোন ব্যক্তি যদি সঠিকভাবে তার ‘আক্বল ব্যবহার করে, তবে সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবে যে, কুর’আনই হলো [absolute truth বা] নিরঙ্কুশ সত্য এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। সঠিক আক্বলের অভাবে কোন ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে উপনীত নাও হতে পারে। তাই কুর’আন ও সুন্নাহকে আমাদের ‘আক্বলের উপর প্রাধান্য দিতে হবে।

আমেরিকায় আধুনিকতাবাদের প্রভাব

[মুসলিম] আধুনিকতাবাদীরা বলে, পশ্চিমা জগত তথা গোটা বিশ্বে আজ আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মকে তাই পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলাতে আরও সভ্য হতে হবে। আধুনিকতাবাদীদের এই ধারণা আজ গোটা আমেরিকায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে, কারণ:

(১) হয়তোবা আধুনিকতাবাদীদের যুক্তি খন্ডন করার মত ‘আলেম নেই -অথবা- থাকলেও তারা তা করতে পারছেন না, কারণ সাধারণ জনগণ আধুনিকতাবাদীদের পক্ষে।
(২) এর দ্বারা অন্যান্য দেশের মুসলিমরা খুব সহজেই আমেরিকান সমাজের সাথে একাত্ম হতে পারে। তাদেরকে মুসলিম হিসেবে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। এমনকি নব্য আমেরিকান মুসলিমদেরকে তাদের পূর্বের জীবনের অনেক অনৈসলামিক কাজ বা আচরণও ত্যাগ করতে হয় না।
(৩) আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলো, তাদের সাহিত্য ও গুণীজনেরাও এই মতবাদকে সমর্থন করে।


ইউসুফ আলীর তাফসীর আমেরিকায় খুব জনপ্রিয়, যদিও তিনি ‘আক্বলকে নাকলের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। আমেরিকায় প্রচলিত সীরাত [রাসূল (সা.)-এঁর জীবনী] গ্রন্থগুলোও এখানে উল্লেখযোগ্য: আধুনিকতাবাদীদের কোন গ্রন্থে রাসূল (সা.)-এঁর মর্যাদাকে সাধারণ মানুষের সমান বলা হয়েছে। আবার কোন গ্রন্থে বলা হচ্ছে যে, সুন্নাহ্ থেকে শরীয়াহর কোন বিধি-নিষেধ আসতে পারে না এবং অনেক ক্ষেত্রে হাদীসও উপেক্ষা করা যায় - কারণ রাসূল (সা.) যখন কোন ইজতিহাদ করছেন, তখন আল্লাহ্ তার ভুল শুধরে দেননি [নাউযুবিল্লাহ্]।

ফিকাহ শাস্ত্র্রেও আধুনিকতাবাদীরা অনেক দূর এগিয়েছে। তারা সুদকে হালাল করেছে। তাদের মতে, রজঃস্রাব অবস্থায় মেয়েরা সালাত আদায় করতে পারে। মুসলিম মহিলা আজ কাফির পুরুষকে বিয়ে করতে পারে। তারা বলে যে, রাসূল (সা.)-এঁর মৃত্যুর ১৫০ বছর পর মেয়েদের মুখ ঢাকার প্রচলন হয়েছে [বাস্তবে রাসূল (সা.) এর জীবদ্দশায়ই এর প্রচলন ছিল], মেয়েদের সর্বদা মসজিদে সালাত আদায় করা উচিত (যদিও হাদীসে মেয়েদের ফজর ও ইশা’র সালাতের বর্ণনা পাওয়া যায়, কারণ এই দুই সময়ে তাদের সহজে চেনা যাবে না)। তারা আরও বলে যে, “নারী নেতৃত্বাধীন কোন জাতি উন্নতি করতে পারবে না” - এই হাদীসটিও বর্তমানে অচল। তারা বলে যে, সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যতীত বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই আধুনিকতাবাদীরা আজ অনেক বেশী প্রভাবশালী ও সক্রিয়। আর তাদের কাজে সমর্থন যোগাচ্ছে আমেরিকান পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, সভা-সমিতি ও সাহিত্যকর্ম।

[চলবে.......... ইনশা'আল্লাহ্!]
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১০ দুপুর ২:১৯
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×