কৈশোরে আস্তিক ছিলাম এটা নির্দ্ধিধায় বলতে পারি। এটা ঠিক নিজের ইচ্ছায় নাকি পারিবারিক চাপ সেটুকু বিশ্লেষন করার মত জ্ঞান তখনো হয়নি। তবে ঈদ এলে আনন্দের সীমা থাকতোনা এটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। এটাও মনে আছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে বেশি পরিচিত হবার চেয়ে নতুন কেনা জামা-কাপড়ের প্রতিই ছিল অধিক আকর্ষন। তথাপিও বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজে যাবার স্মৃতি এখনো মনের মনিকোঠায় ঘুরে বেড়ায়।
ঠিক কখন আস্তিক্য আমার চেতনায় আকার পায় তা বলা শক্ত, তবে স্মৃতির সড়ক ধরে যত পিছনে যাই মনে পড়ে, বাবার শতভাগ আস্তিক্যের কথা। মনে হয় শৈশবের সেই দূরন্তপনা দিনগুলোতে আমার আল্লাহ প্রার্থনা যেটুকু ছিল তা বাবার শাসনের জন্যই। নিয়মিত নামাজ পড়া, রমজানে রোজা রাখা-স্কুলের গৎবাঁধা নিয়মের মতো এটাও ছিল নিত্যদিনকার রুটিন। শৈশব, কৈশোরের গন্ডি পেরিয়ে যৌবনে পদার্পন করেছি। বাবাও গত হয়েছেন অনেক আগে। এখন ভাবনার খিঞ্চি মগজে দোলা দিয়ে যায়। এখন আর ঈশ্বর, দেব-দেবী, আত্মা, প্রেত, পরকাল ইত্যাদির কিংবা মানুষী কল্পনাজাত নয় এমন কোনো অতিপ্রাকৃতের অস্তিত্বের প্রতি ঠিক যেন আস্থা রাখতে পারিনা। এসবে কেন জানি আমার অনীহা। এবং যদিও বহু শুভাকাঙ্খীর মুখে বারবার শুনেছি-বিপদে পড়লে আল্লাহকে গভীরভাবে স্মরণ করলে বিপদ কেটে যায় (নাকি নিজ চেষ্টায় বিপদ থেকে উদ্ধার হয়)। বিপদে পড়ে সালাতুল তাসবীহ নামাজ টানা দু্ই মাস পড়েছিও (এই নামাজ নাকি মৃত্যুর আগে একবার হলেও পড়তে হয় এবং নামাজটি পড়তে এক-একবার দেড় থেকে দুই ঘন্টা সময় লাগে)। এত কিছু করার পরও অদ্যাবধি আমার লোকায়ত প্রতিন্যাসে শৈথিল্য ঘটেনি। আমি যেমন ছিলাম তেমনই রয়ে গেছি। অথচ আমার পরিশ্রম কিংবা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছিনা। তাই এখন আর আজ্ঞাবাদের বিদগ্ধ প্রলোভন আমাকে বিন্দুমাত্রও আকৃষ্ট করেনা।
অথচ যে পরিবারে আমি জন্মেছি এবং যে পরিবেশে আমার শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে সেখানে ধর্ম বিশ্বাসে অভ্যস্থ হওয়া আমার জন্য খুব স্বাভাবিক ছিল। মা হচ্ছেন পুরো ধার্মিকমনা। ইহকাল এবং পরকালের দাবির মধ্যে সুস্থিতি রচনায় তার আছে সহজ নৈপুণ্য। সংসারকে বশ করেছেন তিনি গৃহস্থালি কাজ এবং সেবার সূত্র: আর আজানের ধ্বণি শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওযু করে জায়নামাজে বসে আল্লাহর প্রার্থনায় মগ্ন হওয়ার মধ্যেই জাগতিক সুখ খুঁজে বেড়ানো তার রোজনামচা। আমরা ছয় ভাই-বোন আর আত্মীয় অভ্যাগতদের বিচিত্র দাবি-দাওয়া মিটিয়ে যেটুকু বাড়তি সময় তার মিলত তা ছিল নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঠাসা। তবে মা কখনোই আমাদের বাধ্য করেনি এসবের দিকে। শুধু বলতো-''বাবারে নামাজ কলমা পড়, দেখবি একদিন শান্তি মিলবে।'' অপরদিকে বাবা ছিলো কঠোর ধার্মিক। পড়াশোনার ফাঁকে নিয়মিত নামাজ পড়ছি কিনা সেটার খোঁজ নিতে কখনোই ভুলতেন না তিনি।
শৈশবে ধর্ম বিশ্বাসের ভিন্ন রূপগুলি সম্পর্কে তেমন জ্ঞাতও ছিলামনা। যদিও গ্রামের অর্ধেকটাই ছিল হিন্দুদের রাজত্ব তথাপিও দাদী কিংবা মায়ের মুখে আল্লাহ এবং তার নবী, রাসুলদের গুণগান, ধর্মী ঐতিহাসিক ঘটনাবলী-এসব কল্পকাহিনী শুনতে খুবই মজা পেতাম। মূলত তখন থেকেই মনে বেঁধে ছিল ধর্ম চর্চা। শৈশবে আমার আস্তিক্যের পেছনে আরো একটি কারণ আছে। বাবা হচ্ছেন মুন্সী বংশের সন্তান। ধর্ম বিশ্বাস তার মনে বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। বাবার মুখে শুনেছি সুগম্ভীর কণ্ঠে কোরান পাঠ। খোলা বারান্দায় প্রত্যুষের অপসৃয়মান অন্ধকার: বাবার ভাষ্কর লোভন দেহের আর্জবে প্রথম আলোর রেকাঙ্কন: তার বিশুদ্ধ উচ্চারণে কোরানের উদাত্ত তরঙ্গ ধ্বনী। অর্থ না বুঝেও অনুভব করতাম এমন এক উপস্থিতির যা মধূময় এবং অসংকুচিত, প্রোজ্জ্বল, সয়ম্ভর এবং নির্ভীক।
গ্রামীন পরিবেশে বড় হয়েছি। এবং বড় হবার সাথে সাথেই ধর্মের ব্যাপারে আমার মন অনুসদ্ধিৎসু হয়ে উঠে। কারণ পরিবেশের মধ্যে দেখতাম ধর্মের দুই সমান্তরাল ধারা। ভোরে ঘুম থেকে জেগে নামাজ পড়ে কোরান শিখতে মক্তবে না গেলে বাবার হাতে মার খেতে হতো। পিঠের চামড়াকে সুস্থিতি রাখতে কাক ডাকা ভোরে ছুটতাম মক্তবের উদ্দেশ্যে। মক্তব থেকে ফিরে ফের স্কুলে ছুটে চলা। স্কুল থেকে ফিরে কিছুটা বিশ্রাম। খেলাধুলার দিকে ঝোঁক ছিল খুব। পাশের বাড়ি ছিল হিন্দুদের। বন্ধু-বান্ধবও ছিল বেশ কয়েকজন। পুজা-পার্বণে নিমন্ত্রনও পেতাম তাদের কাছ থেকে। বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তাদের সঙ্গেই চলে যেতাম পুজো দেখতে। বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন সার্বজনীন পূজা-পার্বণের প্রাচুর্য। হিন্দু পড়শীদের মধ্যে অনেকেই আবার ছিলেন মাদুলী-তাবিজের চলন্ত বিজ্ঞাপন। পূজো মন্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে পুরোহিতের মুখে শুনেছি শনি, সত্য নারায়ণ এবং লক্ষীর পেঁচালী, গ্রহস্বস্তয়নের মন্ত্র। আমি কেবলই মুগ্ধ হতাম। হিন্দুদের উলু ধ্বণীর মধ্যে শক্তির পরিচয় কতখানি ছিল জানি নি: কিন্তু তাতে যূথচারিতা এবং সংবদনের প্রকাশ ছিল সুস্পষ্ট এটা বুঝতে পারার মত জ্ঞান তখন হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আমাদের গ্রামে কখনো হয়নি। বয়স্কদের মুখে শুনেছি গ্রামে ছিল হিন্দু-মুসলমানের বন্ধু ভাবাপন্ন মনের কথা।
অপরপক্ষে পারিবেশিক অন্য ধারাটির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে নিতান্ত অল্প বয়সে। এটির প্রধান সূত্র ছিল সঙ্গীত। বড় আপু রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে ভালোবাসতো। আপুর পাশে বসে আমিও ছিলাম তার বিমুগ্ধ শ্রোতা। রবীন্দ্রনাথের গানে পূজা, প্রেম এবং প্রকৃতিকে আলাদা করা যায় বটে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা পরস্পরে অনুস্যূত। তার গল্প, উপন্যাস, নাটক এমনকি কবিতার সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যায় রব্যন্দ্রসঙ্গীতে ধর্ম চেতনার অভিস্রবন প্রায় অনবচ্ছিন্ন।ঔপনষদিক ব্রহ্ম থেকে পৌরাণিক শিব, বৈষ্ণবের রাধা কৃষ্ণ থেকে বাউলের মনের মানুষ তার বিভিন্ন গানে পরিস্রুত, কখনো কেলাসিত, কখনো পরস্পরে অভিসারী, কখনোবা পর্যাবৃত। পিতা, প্রভু, সখা, প্রেমিক, কবি, নর্তক, রহস্যময়ী-নানারূপে তার দেবতা তার কল্পনায় প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছিল এবং সুরের পরিণাহে সেইসব রূপ নাস্তিক্যের চেতনাতেও অর্ন্তলিখিত হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মের শোভন এবং সহিঞ্চু রূপ রবীন্দ্র রচনায় ফুটে উঠে। অন্যদিকে নজরুল ছিলেন সাম্যবাদী। তার কবিতা ও গানে সাম্যের উদাত্ত আহবান ছিল। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক সঙ্গে কাজ করার আহবান ছিল। তথাপিও তার রচনায় একটা বিষয় সু-ষ্পষ্ট: সেটা হচ্ছে ধর্ম। ধর্মী গাম্ভীর্যতাকে তিনি কখনো আলাদা করতে পারেননি। হয়তো তিনি আস্তিক ছিলেন বলেই সেটা করার চেষ্টাও করেননি।
ধর্মের প্রতি অনুরাগ দেখিয়ে যৌবনে একটি না একটি ধর্মী বিকল্প অবলম্বন করা আমার জন্য কঠিন নয়। এমনকি-আর দশ জন মুসলমানের মত আমিও বিকল্পবোধকে অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন বিশ্বাসের মধ্যে অপাটবমুক্ত বিহারের কৌশল অর্জন করতে পারি। নিজের নির্জ্ঞান নিজে বিশ্লেষন করতে পারি এমন সামর্থ আমার নেই। সুতরাং আমির আস্তিক্যের পেছনে যদি কোনো গূঢ়রহস্য থেকে থাকে তার নির্দেশ আমি দিতে পারবোনা। তবে যতটুকু বুঝতে পারি আমার মধ্যে জিজ্ঞাসাবোধ অত্যন্ত প্রবল এবং ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি আমার জিজ্ঞাসার প্রধান কারন সম্ভবত আমার মধ্যে এই বিপ্রতীপ প্রশ্নশীলতার উপস্থিতি। ধর্ম বিশ্বাসে সব প্রশ্নেরই উত্তর মেলে, কিন্তু মাঝে মাঝে আমার মনে হয় সেসব উত্তরের মাঝে না আছে সু-সংগতি, না যায় তাদের মেলানো দৈনন্দিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে। ধর্মীয় উত্তর প্রশ্নোর্ধতা দাবী করে এবং এই দাবীকে মেনে নেয়া আমার কাছে সংগত মনে হয়না।
অবশ্য ধর্মের কোনো সামান্যাভিধান পাওয়া শক্ত এটা আমার নজরে আসে এবং একদিকে এটা নিয়ে ইতিহাস ঘাটা এবং অন্যদিকে পারিপার্শ্বিক আলোচনা থেকে এ তথ্য আরো বেশি স্পষ্ট হয়েছে যে, সমাজ সভ্যতার মতো ধর্মীয় রূপও বিচিত্র। প্রতিটি ধর্মের শাখা প্রশাখাও বহু এবং বিভিন্ন ধর্মী সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি প্রত্যক্ষ। এই বৈচিত্র লক্ষ্য করার পর সম্ভবত বলা চলে যে, অধিকাংশ নারী-পুরুষ যাকে ধর্ম বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন তার কয়েকটি সাধারণ লক্ষন আছে। মুলত লক্ষনগুলো স্পষ্ট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে কি কারনে মানুষ নাস্তিক হয় তার কিছুটা উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত মনে হয় আমার কাছে। নাস্তিকেরা কি কারনে ধর্ম বিরোধী তার পরবর্তী লেখাগুলোতো তুলে ধরার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি এটা আমার জিজ্ঞাসাবোধের আকাঙ্খাও বটে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

