somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার ধর্ম জিজ্ঞাসা : আমি আস্তিক নাকি নাস্তিক? (পর্ব-২)

১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১ম পর্ব- Click This Link
ধর্মের সঙ্গে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সম্পর্ক এবং সংগঠনের সহাবস্থান

ধর্মের রূপ বৈচিত্রের পাশাপাশি প্রায় সব ধর্মের কেন্দ্রেই কতকগুলি স্বকীয় প্রত্যয় বর্তমান এবং প্রত্যেক বিশেষ বিশেষ ধর্মের অনুরাগিরা দাবী করে থাকেন যে, তাদের ধর্মের স্বকীয় প্রত্যয়গুলি অপ্রত্যর্ক, অনপেক্ষ, সর্বজনীন এবং স্বয়ংসিদ্ধ। আমি দেখেছি এই দাবীর সমর্থনে কোনো যুক্তি প্রমান মেলেনা; যখন কেউ কেউ যুক্তি খাড়া করাবার চেষ্টা করেন তখন বিশ্লেষন করলেই চোখে পড়ে তা যুক্তি নয়, যুক্তাভ্যাস মাত্র। তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আবিস্কার, উদ্ভাবনের সূত্রে আমাদের জ্ঞান গত ৩/৪ হাজার বছরের মধ্যে অনেক পরিবর্তিত এবং পরিস্রুত হয়েছে। কিন্তু এই বিশ্ব জগতের আড়ালে তার স্রষ্টা, শাসক বা নিয়ামক হিসাবে ঈশ্বর, আল্লাহ বা যিহোবা নামে যাকে বিভিন্ন ধর্মে কল্পনা করা হয়েছে তার সম্পর্কে ধর্ম বিশ্বাসীদের প্রধান নির্ভর আপ্তবাক্য। শুধু বিনা বিচারে ঈশ্র, আল্লা বা যিহোবার অস্তিত্ব মেনে নেওয়াই যথেষ্ট নয়; তারি সঙ্গে ধার্মিকেরা দাবী করেন যে বেদ অভ্রান্ত, বা গীতা কৃষ্ণরুপী ঈশ্বরের নিজস্ব বানী, বা যিহোবা মোজেসকে অথবা আল্লাহ মুহাম্ম (সঃ) কে বেছে নিয়েছিলেন তার নির্দেশ প্রচারের জন্য; বা যীশু ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র, বা চৈতন্য, রামকৃষ্ণ প্রভৃতি ব্যক্তি এক-একটি আবতার পুরুষ ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমনকি ঈশ্বর, আল্লাহ বা যিহোবা জাতীয় কাউকে যিনি আত্মসমর্পনে টানেন নি, সেই বুদ্ধ এমন পূন্যজ্ঞান অর্জন করেছেন বলে দাবী করা হয়ে থাকে যে জ্ঞান প্রশ্নাতীত এবং প্রমানাতীত।

এখন এই ধরনের দাবী মেনে নিলে তারই অনুসিদ্ধান্ত হিসাবে আরো অনেক দাবী স্বীকার করতে হয়। ধর্মের যারা প্রবর্তক এবং প্রচারক প্রমান নিরপেক্ষ প্রাধিকারের সূত্রে অতিপ্রাকৃত যে কোনো ঘটনাই তাদের ক্ষেত্রে সম্ভব। লে ভক্তদের কাছে বুদ্ধ হয়ে উঠেন রহস্যাবৃত এক জাদুকর, মোজেস অনুচরদের নিয়ে হেঁটে সাগর পাড়ি দেন, কৌমার্য অক্ষত রেখেই মেরী জন্ম দেন যীশুকে, মুহাম্মদ (সাঃ) স্বশরীরে বেহেশত ঘুরে আসেন, কৃষ্ণ একই সঙ্গে বহু নারীতে উপগত হন, রামকৃষ্ণ ভক্তকে বিশ্বরূপ দর্শন করান, অরবিন্দ মৃত্যুর পর তার নাভী থেকে অলৌকিক জ্যোতি উৎসারিত হতে থাকে, সাঁইবাবা হাত ঘুরিয়ে আংটি, ঘড়ি জাতীয় নাড়ু দেখান। অতিপ্রাকৃত আর আপ্তবাক্যকে মেনে নিলে তখন আর আভ্যন্তরীন সংগতি কিংবা প্রতিসঙ্গের প্রশ্ন তোলা চলেনা। এটাই ধর্ম বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নাস্তিকের প্রধান দার্শনিক আপত্তি নয়; সম্ভবত তার প্রধান আপত্তি ধর্ম বিশ্বাসে প্রশ্নোর্ধ্বতার দাবী সম্পর্কে। জিজ্ঞাসার সূত্রে বিজ্ঞানের উদ্ভব ও বিকাশ; সেই জিজ্ঞাসাকে ধর্ম বিশ্বাস রুদ্ধ করে বলেই নাস্তিকের বিচারে ধর্ম ক্ষতিকর। প্রকৃত বস্তু বা ঘটনায় অপ্রকৃতের আরোপ বা উৎপ্রেক্ষন ধর্ম মাত্রেরই বৃত্তি। এর ফলে সত্য-অসত্যের ভেদ অস্পষ্ট হয়ে আসে। প্রকল্পের বিচার ও পরীক্ষা নিস্প্রয়োজন হয়ে পড়ে। জ্ঞানের বিকাশ ব্যাহত হয়। অন্তত গোঁড়া নাস্তিকেরা তাই বিশ্বাস করে।

ধর্ম যদি শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃত এবং আপ্তবাক্যের প্রশ্নোর্ধ্বতা দাবী করতো তাহলে মানুষের ইতিহাসে তার প্রভাব হয়তো এতটা মারাত্মক হতোনা। দাবীকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ক্ষমতা প্রয়োজন এবং এই ক্ষমতার অন্যতম প্রধান সূত্র হচ্ছে সংগঠন। কোনো একটি ধর্মের মুল প্রত্যয়গুলি যখন আকার পায় তিনি যখন লোকালয়ে সেই প্রত্যয়গুলি প্রচারে উদ্যোগি হন তখন তার কিছু ভক্ত এবং অনুরাগি জোটে এবং স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের নিয়ে একটি ধর্মীয় সংগঠন গড়ে উঠে। এই সংগঠন নানা ধরণের হতে পারে। সেই ধর্মের প্রভাব ব্যাপক হবে কি হবেনা এবং তা হতে কতটা সময় লাগবে; তার হিসেব নিকেশ করতে গেলেও তথ্য জানা দরকার। কিন্তু মোটামুটি বলাচলে যেসব প্রত্যয়ীরা সম্প্রচারে সম্পূর্ণ বীতস্পৃহ এবং সেকারণে পর্বতে, গহবরে বা অরণ্যে অথবা মরুভুমিতে স্বেচ্ছায় বাস করেন, তাদের ধর্ম ব্যাপক কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কিনা সন্দেহ। অন্যদিকে অধিকাংশ প্রভাবশীল ধর্মের প্রচার প্রতিপত্তির ভিত্তি হচ্ছে সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠাতা যদি নিজে সংগঠক না হন তাহলে তার অন্তত কয়েকটি তেমন ভক্তের প্রয়োজন ঘটে যারা তাকে ওজস্বী ভাষায় বহুজনের সামনে উপস্থাপিত করবেন এবং যাদের সংগঠনের সামর্থ অসামান্য।

ধর্ম যখনই সংগঠনভিত্তিক হয়ে উঠে তাতে কতগুলি লক্ষন ফুপতে থাকে যাদের কোনো যুক্তিতেই সমর্থন করা কঠিন। যে ব্যীক্তর অভিজ্ঞতা, কল্পনা এবং প্রত্যয় সমষ্টির উপাদানে একটি বিশেষ ধর্ম রচিত হয়েছিল তার প্রাধিকারকে বিচারবোধ করবার প্রয়োজনে তার উপর দেবত্বারোপ অবশ্যম্ভাবী। ধর্মের সঙ্গে দর্শনের এটাই অন্যতম পার্থক্য। বুদ্ধ নিজে নির্বাণের কথা বললেও চেলারা ধর্মের সঙ্গে তার এবং সংঘের শরণ নিয়েছেন। তার জীবনে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সমাবেশ মুখ্যত ভক্তদের প্রয়োজনেই কল্পিত। অপরপক্ষে, সক্রেটিসের ক্ষেত্রে দেবত্বারোপ বা তার জীবনে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সমারোহ প্রয়োজন হয়নি। কারণ তিনি কোনো ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নন এবং প্লোটো তার গুরুর প্রাধিকারের ভিত্তিতে কোনো ধর্মীয় সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগী ছিলেন না। উপমহাদেশে ব্রাহ্মধর্ম যে বিশেষ জন সমর্থন পায়নি তার অন্তত একটি কারণ রামমোহন মহাব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ হয়েও কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি দাবী করেন নি এবং তার প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ সত্ত্বেও তার ভক্তরা কোনো সংগঠন গড়ে তোলায় ব্যতিব্যস্ত ছিলেন না। অন্যদিকে রামকৃষ্ণে দেবত্বারোপ করে বিবেকানন্দ, মুহাম্মদ (সঃ) কে দেবত্বারোপ করে অনেক পীর-আউলিয়া ইতিহাস প্রসিদ্ধ হয়ে গেছেন এবং সংগঠন তৈরি করে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজ নিজ ধর্মের বার্তা। অর্থাৎ ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিজেরা স্বঘোষিত বিশ্লেষক হিসাবে ধর্মের শাখা প্রশাখা বের করেছেন এবং সেটা ছড়াচ্ছেন বিশ্বব্যাপি; যা মানব কল্যানে হিত নয় বৈপরীত্য ডেকে আনছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৫৬
১৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×