গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা ৪টা ছুঁই ছুঁই। কাওরান বাজার গরম। এই তীব্র শীতেও খেটে খাওয়া মানুষের অবসর নেই এতটুকু। একের পর এক ট্রাক আসছে। অধিকাংশ ট্রাকে সবজি। ট্রাকের চার পাশে টুপরি/বড় ধামা হাতে অল্পবয়সী-মাঝবয়সী অসংখ্য শ্রমিক। ওরা মালামাল টানে। নিমিষেই যেন ট্রাক খালি। বিনিময়ে ওদের হাতে আসে অতি সামান্য মজুরি।
এক কিশোর পাতলা জামা গায়ে দুই হাত সামনে এনে থর থর শীতে কাঁপছে। ওর পায়ের সামনে টুপরি। কয়েক মিনিটের মধ্যে বেশ ক’জন দাঁড়াল ওর সামনে। প্রত্যেকের হাতে টুপরি।
সারারাত কাজ করার পর ভোরের আকাশ ওরা দেখে না। দু’ চোখে রাজ্যের ঘুম। একটু ঘুমুতে মন চায়। স্বাভাবিক চাওয়া। কোথায় ঘুমাবে ওরা? কাওরানবাজারের ভিতরে আর মূল রাস্তার ফুটপাথই ওদের বিছানা। সেখানে, ইট-পাথর সরিয়ে কোনরকমে হাত গুটিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘাড় কাৎ করে ওদের শরীর। কিছুক্ষণের মধ্যেই শান্তির (!) ঘুমরাজ্যে চলে যায় ওরা। অন্যদিকে ..?
সকালবেলা। কাওরানবাজারের মূল রাস্তায় চলাচল শুরু করেছে হরেক রকমের গাড়ি। দ্রুতবেগে, হর্ণ বাজিয়ে ছুটে চলেছে। অন্যদিকে ফুটপাথের ওপর সারি সারি শুয়ে আছে বিভিন্ন বয়সী শ্রমিক। কোনরকমে একটা ছেঁড়া চাদর গায়ে জড়িয়ে মাথার নিচে ইট বা কাঠ দিয়ে অদ্ভুত নিশ্চিন্ত ঘুম ওদের। দ্রুতবেগে চলাচল করা গাড়িগুলো একটু অসতর্ক হলেই থেতলে যাবে ওদের শরীর। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ফুটপাথ ছেড়ে অন্য কোথাও ঘুমানোর জায়গা নেই ওদের।
অল্পবয়সী এক ছেলে। মাথায় মাফলার। গায়ে শতছেঁড়া চাদর। দেখলেই বোঝা যায়, রাতজাগা দু’চোখ তার।
ঐ সর, এই হানে আমি ঘুমামু? কীরে, হুনছ না?
হুনতাছি? সরমুনা? দূরে ঘুমা?
না, আমি সবসময় এইহানে ঘুমাই?
আইজ আরেক জায়গায় ঘুমা?
প্যাঁচাল পারিছ না?
দ্যাখ, শরীর ভালা না। কথা না হুনলে কিন্তু ...?
অন্য ছেলেটি শোয়া থেকে উঠে বসে। বলে, আমি সরমু না? আয়, সামনে আয়? দেহি, তুই ক্যামনে ঘুমাস?
দরাম করে একটা ঘুসি বসায় অন্য ছেলের ঘাড়ে।
কুত্তার বাচ্চা, তর মারে...। আইজ তর একদিন কী আমার একদিন?
ছেলেটি একটা ইটের টুকরো হাতে নিয়ে অন্য ছেলেটিকে মারার জন্য এগিয়ে যেতেই একজন পথচারী ছেলেটির হাত ধরে গালে জোরে একটা থাপ্পড় বসায়। বলে, ঐ ঝগড়া করস ক্যান?
এইডা আমার ঘুমানোর জাগা? আমি ঘুমামু না?
পথচারী অবাক হয় ছেলেটির কথা শুনে। বলেন, ঘুমাবি ভাল কথা, তাই মারামারি করতে হইবো? যা, ঘুমানোর জায়গায় যা?
এমন সময় হৃষ্টপুষ্ট চেহারার এক তরুণ আসে ওদের সামনে। বলে-
ঐ চল, ঘুমান লাগবো না? দু’জনেই চল?
কই যাইমু?
আমার লগে আয়?
আগে ঘুমাইয়া লই? পরে কাম করুম?
একজন আয়?
দু’জনই চুপ করে থাকে। কথা বলে না। তরুণ আবার বলে, ঐ যাবি না?
কইলাম তো ঘুমাইয়া লই?
কাম করার পর ঘুমাইস? বিছানা দিমু?
কত ট্যাকা দিবেন?
১০০?
আগে দ্যান?
নে?
আমারে দিবেন না?
তুই ৫০ নে? আগের ট্যাকাতো পাই?
পরে নিয়েন? এহন ১০০ দ্যান?
ল? কামে চল?
মনে আছে, আইজ কী করবি?
হ, আছে?
তরা দুইজনেই থাকবি? নাস্তা কইরা হেই জায়গায় আইয়া পড়িস।
আইচ্ছা?
অন্য টোকাই বলে-ভাই, ভেজাল হইবো না তো?
ঐসব আমি দেখুম? কোন সমস্যা হইবো না? আর কিছু হইলে ‘ভাই’ তো আছেই?
দেইখেন?
ছেলেটি বিরক্ত হয়। বলে- যা কই, তাই কর? বেশি কথা বলিস না?
এমন সময় ‘করাৎ’ শব্দ করে একটি মাইক্রোবাস থামে ওদের সামনে। গাড়ির ভিতর থেকে হাত দিয়ে ওদেরকে যেন কেউ ইশারা করে। দৌঁড়ে দুই টোকাই শ্রমিক গাড়িতে ওঠে বসে। মাইক্রোবাসটি মূল সড়কে এসে মিশে যায় গাড়ির স্রোতে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

