এই আলোচনাটার অবতারণা করছি এটা ধরে নিয়ে যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই বলতে যুদ্ধাপরাধের বিচারই বুঝেন, অন্য কিছু মিন করেন না, তাদের একটা আভ্যন্তরীণ আলোচনা হিসাবে। যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার বলতে র্যাডিক্যাল ইসলাম বা "সন্ত্রাসবাদ" মোকাবিলাও বুঝেন, সেই লক্ষ্যে একধাপ আগানো বা এক দড়িত ফাঁসিতে দেবার মত বুঝেন - এমন বুঝ আছে আমাদের সমাজে। কিন্তু সেদিক থেকে এই আলোচনাটা তোলা হয়নি। "যুদ্ধাপরাধের বিচার" - এই বিচার বলতে আমরা কী বুঝছি তাই এর আলোচনার বিষয়। পাঠক আশা করি এই বিবেচনা মাথায় রেখে সেদিক থেকেই পড়বেন ও অংশগ্রহণ করবেন।
"যুদ্ধাপরাধের বিচার" - এই বিচার বলতে আমরা কী আসলে বিচার বুঝছি না বলতে চাচ্ছি জামাতের সাথে রাষ্ট্রে থাকতে চাই না। জামাত চিন্তা, জামাত ব্যক্তি -এই দুই অর্থে জামাত রাষ্ট্রে না থাক, এমন একটা ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যে থাকতে দেখেছি। কোন রাজনৈতিক চিন্তা যে মাথা করছে ঐ মাথাকে তলোয়ার দিয়ে কুচি কুচি করে কাটলেও ঐ চিন্তাকে বিনাশ করা যাবে না এটা আমরা বুঝি। চিন্তাকে একমাত্র চিন্তা দিয়েই মোকাবিলা পরাস্ত করা সম্ভব। তবু এক ধরণের জামাত খতমের (elimination) এর ধারণা আমাদের মধ্যে কাজ করে। আবার "বিচার"বলতে বিচার যতক্ষণ মানে করছি ততক্ষণ কিন্তু এর মানে ১৯৭১ সালে জামাতের নেতাদের আইনের দৃষ্টিতে (রাজনৈতিক নয়) যা ক্রিমিনাল অপরাধ (তা যুদ্ধাপরাধ হতে পারে, কোলাবরেশন হতে পারে, হতে পারে মানুষ খুনের ৩০২ ধারার মামলা) তা আদালতে প্রমাণ করে শাস্তি বিধান। তাহলে মানে দাঁড়াল, কোন রাজনৈতিক কারণে জামাতের কোন নেতা ঐ ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে, ঐ রাজনীতিটা ভাল না মন্দ, ন্যায্য কি অন্যায্য এগুলো আদালতের বিচার্য বিষয় নয়। যে কারণেই করুক ঐ ক্রিমিনাল অপরাধ ঘটেছে কিনা, অপরাধী কীনা - সেটাই আদালতের বিচার্য বিষয় হবে। তার মানে এই বিচার প্রক্রিয়ায় জামাত সদস্যের রাষ্ট্রের আইনে একটা ক্রিমিনাল অপরাধ হয়েছে কীনা তার বিচার হবে, রাজনৈতিক দল হিসাবে জামাতের বা তার রাজনীতির কোন বিচার এখানে হবে না। বিচার্যও নয়। দেখা যাচ্ছে বিচার বলতে আমাদের অনেকের মনে জামাত খতমের (elimination) এক ধরণের যে ধারণা পুষে রাখতে দেখছি তা সবচেয়ে অনুকুল পরিস্হিতিতেও পূরণ হবে না। কারণ বিচার মানে খতমের (elimination) নয়।
অনেকের ধারণা খতমের (elimination) এর চেয়েও আরও একধাপ এগিয়ে। লিখে মনের আকাঙ্খা প্রকাশ করে বলছেন, "জামায়াত শিবিরকে চিরতরে মুছে দিতে হবে, রাজাকার এবং তাদের উত্তরসূরীদের বিরুদ্ধে "এথনিক ক্লিনজিং" চালানো আমাদের ফরজ কাজ", "নিঃশর্ত বিচারহীন জবেহ চাই" ইত্যাদি। এই লেখক "এথনিক ক্লিনজিং" কথাটা যেখান থেকে শুনেছেন বা শিখেছেন আমি নিশ্চিত ওর আশপাশে কথাটা নিজেই যে একটা ওয়ারক্রাইম বা যুদ্ধাপরাধ এধারণা সেখানে ছিল। এই বাঙালি জাত্যাভিমানী (recist) শব্দ ও ধারণা ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবি করছে এমন ভাবনাও তাহলে সমাজে আছে। অথচ খোদ নিজেই যে নতুন একটা ওয়ারক্রাইম বা যুদ্ধাপরাধ করছে, এর স্বপক্ষে বিচারের নামে প্রতিশোধ, ঘৃণা, প্রতিহিংসা ছড়াচ্ছে সে খবর নাই। চিন্তাভাবনাহীন এক উন্মাদ অবস্হা। বিচার মানে প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা নয়। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সাইকি কারও থাকতে পারে সেক্ষেত্রে এটা একটা জিঘাংসাই বিচারের সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই।
আমার ভয় আশঙ্কা এখান থেকে। বিচার মানে কী? কী চাচ্ছি, কী পেলে সন্তুষ্ট হব, জানি না।
অন্য দিকে, আরও এক আশঙ্কা। এটা একটা বিচার প্রক্রিয়া। হতেও তো পারে সর্ব্বোচ্চ আদর্শ পরিস্হিতি থাকা সত্ত্বেও কোন আইনি টেকনিক্যাল কারণে যদি অপরাধ প্রমাণিত না করা যায়, ফেল করে - তাহলে কী হবে? বিচার চেয়ে যে আবেগী জনমত তৈরি হচ্ছে বিচারের বলতে যে প্রতিশোধ, ঘৃণা, প্রতিহিংসা বুঝে, খতমের (elimination) বুঝে, এমনকি "এথনিক ক্লিনজিং"ও বুঝছে - এর কী হবে? বিচার মানে কী? কী চাচ্ছি, কী পেলে সন্তুষ্ট হবে, যার স্পষ্ট ধারণা নাই - বিচারে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্তি না ঘটলে তাদের আবেগের উপর যে শক পড়বে তা তাঁরা কিভাবে সামলাবেন? না কী নিজেকে এই শোক থেকে বাঁচাতে, জীবিত রাখতে নিজেই বিচার হাতে তুলে নিবেন? রাস্তায় রাস্তায় যাকে জামাত বা দোষী বা দায়ি মনে হবে নির্বিচারে খুনোখুনিতে মত্ত হবে, পিটিয়ে লাশ বানাবে, লাশের উপর নেচে জিঘাংসা প্রকাশ করবেন? একটা দাঙ্গা গৃহযুদ্ধময় পরিস্হতি কী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে - জানি না। এক '৪৭ এর দাঙ্গার ক্ষতের স্মৃতি আজও আমরা সবাইকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এতে সমাজের গাঠনিক তন্তুতে যে ক্ষত সৃষ্টি তা আজও সারে নাই। আজও আমাদের পরস্পরের মধ্যে অনেক সন্দেহ অবিশ্বাসের কারণ এটা। সে দেওয়াল আমরা আজও ভাঙতে পারিনি। আমি জানি না এই অউন্মোচিত দিকটা নিয়ে ব্লগাররা ভেবেছেন কীনা। অন্তত আলোচনায় নিলে আমাদের আবেগের ভিতরে প্রতিহিংসার বদলে বাস্তবতার ছাপ লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। এজন্য বিচার মানে কী? আমরা কাকে বিচার বলি এনিয়ে একটা আলোচনা তুললাম।
রাষ্ট্র বিচার ব্যবস্হা রাখে কেন?
আমার পোস্টে বিভিন্ন সময় আমি একটা কথা বারে বারে বলে আসছি রাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র ভাগ আছে। শত্রু-মিত্রের ভাগ ছাড়া রাষ্ট্র জন্মলাভ করে না। বা ঘুরিয়ে বলা যায় রাষ্ট্র জন্মলাভ বা গঠনের সাথে সাথে এর শত্রুমিত্রের ভেদাভেদের সীমারেখা টানা হয়ে যায়। যে জনগোষ্ঠির সদস্যরা পরস্পর নিজেদের মিত্র ভাবে তাঁরাই নিজেদের আত্মপ্রকাশ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, প্রতিনিধিত্ত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমবেত হয়ে বলপ্রয়োগে একটা রাষ্ট্র গঠন করতে উদ্যোগী হয়, রাষ্ট্র গঠন করে ফেলতে পারলে, জয়লাভ করলে এরাই রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। জনগোষ্ঠির বলপ্রয়োগের সক্ষমতা রাষ্ট্র কায়েমে সফল হবার ভিত্তি। কোন আইনি উৎসে, বা নৈতিকতার জোরে রাষ্ট্র কায়েম হয় না। তার মানে জনগোষ্ঠির সদস্য নতুন নামে নাগরিক বলে হাজির হতে পারে রাষ্ট্র গঠনে জয়লাভ করে ফেলতে পারলে তবেই। নাগরিক রাষ্ট্র কায়েমের মাধ্যমে নিজেদের আত্মপ্রকাশ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, প্রত্যেকের প্রতিনিধিত্ত্ব নিশ্চিত করাই এখানে তাঁর লক্ষ্য। এখন একাজে যাদের নিয়ে সমবেত হয়ে রাষ্ট্র গঠন করলো আর যারা এর বাইরে থেকে গেল - অন্য রাষ্ট্র, তার সদস্য, অন্য জনগোষ্ঠি সবাই - এরা সবাই নবগঠিত রাষ্ট্রের শত্রু। এটাই রাষ্ট্রের সেই শত্রুমিত্রের ভেদাভেদ সীমারেখা। এটা স্রেফ ভৌগলিক সীমারেখার মামলা নয়।
যাদের নিয়ে সবাই নাগরিক হয়ে রাষ্ট্র গঠন করলো - by default এরা সবাই রাষ্ট্রের ও পরস্পরের মিত্র, আর যাদের নিল না by default মৌলিকভাবে এরা রাষ্ট্রের শত্রু। by default মানে, রাষ্ট্র জন্মানোতে সহজাতভাবে যে মৌলিক ভিত্তি, পূর্বানুমান (premise) তৈরি হয়ে যাই তাই। এই পূর্বানুমান (premise) এর উপর রাষ্ট্র খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার এই শত্রুকে নবগঠিত রাষ্ট্র কিভাবে দেখে, মুখোমুখি হয় সেই বিযয়ে আমার আগের পোষ্ট "রাষ্ট্র ভাবনা: একাত্তরে চীন কেন আমাদের সমর্থন করতে পারে নাই" - ওখানে আলাপ করেছি তাই সে দিকে এখন আলাপ বিস্তারে নিব না। এখানে জোড় দিব রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে যাদেরকে নাগরিক মিত্রতায় দেখছি সে ব্যাপারটায়।
একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানে তুলব।
জনগোষ্ঠির সদস্য নতুন নামে নাগরিক বলে রাষ্ট্রে হাজির হলো যাদের আমি রাষ্ট্রের দিক থেকে মিত্র বলছি - এদের নিজেদের মধ্যে কী কোন পার্থক্য, ঝগড়া বিবাদ, স্বার্থ সঙ্ঘাত নাই? উত্তর হলো, অবশ্যই আছে। একই জনগোষ্ঠির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তা আছে এবং থাকবে সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবেই।
এখন মিত্রদের নিয়ে রাষ্ট্রের সমস্যা হলো দুটো। এক. নিজেদের মধ্যে পার্থক্য, ঝগড়া বিবাদ, স্বার্থ সঙ্ঘাত সত্ত্বেও নাগরিকরা সমবেত হয়ে একই রাষ্ট্রের সদস্য হওয়া মেনে নেওয়ার কারণে নিজেদের মধ্যেকার পার্থক্য, বিবাদগুলোকে আর সঙ্ঘাত করে নয়, শান্তিপূর্ণভাবে আপোষে সহনশীলতায় ধারণ করার একটা ব্যবস্হার প্রয়োজন সে অনুভব করে। দুই. নাগরিক নিজেরা কীভাবে পরিচালিত হবে এর একটা শাসন কাঠামো (কাঠামো অর্থে রাষ্ট্র) লাগবে। কিন্তু শাসন মানে কী? কে আবার কাকে শাসন করবে?
মানে হলো, প্রত্যেক নাগরিক নিজেই নিজেকে ও নিজেদেরকে পরিচালনার জন্য একটা রাষ্ট্র কাঠামো করার দরকার অনুভব করে। কিন্তু এর আবার বিপদ আছে। রাষ্ট্র কাঠামো যাকে চালাতে দিবে, কাউকে না কাউকে তো পরিচালক (রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) হতে হবে এবং সে তো কেবল নিজের সংকীর্ণ স্বার্থে রাষ্ট্র কাঠামো পরিচালনা, ব্যবহার করে বসতে পারে। এরই সমাধানও করতে, প্রধান নির্বাহী কী কী করতে পারবে না এবং তার কাজ কী কী এর একটা আগাম তালিকা তৈরি করে রাখার ব্যবস্হা করতে চিন্তা করা হয়েছে। এই তালিকাটার আনুষ্ঠানিক নাম কনষ্টিটিউশন।
কথা আরও বাড়ানোর আগে দুইটা ছোট্ট নোতকা দিয়ে রাখি। প্রথমটা: বলছিলাম, প্রধান নির্বাহী কী কী করতে পারবে না এবং তার কাজ কী কী এর একটা তালিকা আগে তৈরি করে রাখার ব্যবস্হা করা হয়। এই তালিকাটার আনুষ্ঠানিক নাম কনষ্টিটিউশন। প্রধান নির্বাহী কী কী করতে পারবে না - তালিকা বা কনষ্টিটিউশনের এই অংশটাই মৌলিক অধিকার বা নাগরিক অধিকার নামে প্রচলিত। নাগরিকের মৌলিক অধিকারের উপর হাত দেয়া, খর্ব করা বা এর বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষমতা রাষ্ট্র কাঠমোর নির্বাহী পরিচালককে দেওয়া হয়নি, নাগরিকেরা দেয়নি। বরং সকল নাগরিককে রাষ্ট্র রক্ষা করবে এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়েই তাকে রাষ্ট্র কাঠামোর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়টা: কনষ্টিটিউশনকে একটা তালিকা বলেছি বটে তবে, এটা কামাল হোসেনের মত বিদ্বান কাউকে দিয়ে লিখিয়ে প্রস্তুত করে নেবার মত কাজ নয়। কেন? কারণ, কনষ্টিটিউশনে কী লেখা হচ্ছে, এর মানে কী, কেন এটা লেখা হচ্ছে - এসব কিছু সামাজিক চেতনা আকারে সবার মাঝে প্রতিষ্ঠিত না করতে পারলে একা রাষ্ট্র বা এর প্রধান নির্বাহী এটা রক্ষা করতে পারবে না। অথবা ভবিষ্যতে প্রধান নির্বাহীর নিজেরই কনষ্টিটিউশন লঙ্ঘনও ঠেকানো যাবে না। সামাজিকভাবে নাগরিকবোধই এর সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। ফলে নাগরিকদের মধ্যে বিস্তর তর্কবিতর্ক আলাপ আলোচনার ভিতর দিয়ে রীতিমত কানে ঢুকিয়ে, সামাজিক চেতনা আকাঙ্খা আকারে ধারণাগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সামাজিক তোলপাড় লাগবে, কোন এক ব্যক্তির বিদ্বান ক্ষমতা দিয়ে কেবল কনষ্টিটিউশন লিখে রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট বা গঠন করা যায় না। আমাদের রাষ্ট্র গঠনের সময় এসব বিষয়ে নিয়ে তোলপাড় আলোচনা তোলার সুযোগ পায়নি। পাকিস্তান থেকে আলাদা হবার যুক্তি, লড়াইয়ে আমদের এতবেশি মনযোগী হতে হয়েছিল এবং ওটাই মুখ্য ইস্যু ছিল বলে - রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে একে সামাজিক আলোচনা, তর্কবিতর্কের ইস্যু করতে পারিনি। আমাদের রাষ্ট্রের এই জন্ম দূর্বলতা রয়ে গেছে বলে সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেছে বারেবার। কনষ্টিটিউশনে মৌলিক অধিকারের ধারাগুলো গায়ের জোরে স্হগিতও রাখা হয়েছে। অথচ কনষ্টিটিউশনে মৌলিক অধিকারের ধারাগুলো স্হগিতের খাস মানে হলো কনষ্টিটিউশনই আর নাই মৃত। রাষ্ট্র নাগরিকের কাছে দেওয়া ওয়াদা ভঙ্গ। ফলে প্রাকটিক্যালি রাষ্ট্রের আর অস্তিত্ত্ব থাকে না, একজিষ্ট করে না।
মূলপ্রসঙ্গে যাই আবার। আর একবার স্মরণ করিয়ে দেই, কেন এতসব নিয়ম কানুন কনষ্টিটিউশন করছি? কারণ, রাষ্ট্র মানে নাগরিকদের রাষ্ট্র। নাগরিকদের কমিউনিটি বা সাধারণ স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ত্ব পেয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের দিক থেকে নাগরিকেরা তার মিত্র। এই মিত্র নাগরিকদের পরস্পরের মাঝে আবার যে স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে একে আপোষে রাষ্ট্রে ধারণ করতে না পারলে রাষ্ট্র থাকে না। তাই স্বার্থ সঙ্ঘাতকে আপোষে রাষ্ট্রে ধারণ করতেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর নাম বিচার ব্যবস্হা।অর্থাৎ পরস্পরকে রাষ্ট্রের মিত্র জ্ঞান কারেছি বলে নাগরিকেরা পরস্পর বিচার সম্পর্কে সম্পর্কিত হচ্ছে।
তাহলে রাষ্ট্রের দিক থেকে নাগরিকেরা তার মিত্র - ফলে শত্রুর মত পরস্পরকে বলপ্রয়োগের মোকাবিলা নয়, নাগরিকদের স্বার্থ সঙ্ঘাত বিচার ব্যবস্হায় নিরসনের চেষ্টা করতে হয়।
কেন বিচার? কারণ, বিচার মানে ধরে নিয়েছি যার সাথে একই ঘর, সংসার সমাজে ও রাষ্ট্রে থাকব, যাকে নিয়ে আমার বসবাস, রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে আছি - তার সাথে আমার কোন বিরোধ দেখা দিলেও সম্পর্ক থাকবে বিচারের।
বিপরীতে একই রাষ্ট্রের কাউকে যদি শত্রু মনে করি, গণ্য করি তাহলে কী হবে? ঐ শত্রুর সঙ্গে একই রাষ্ট্রে সমান নাগরিক হিসাবে বসবাস করতে না চাই এমন যদি হয় তাহলে, সে আকাঙ্খা পূরণ বিচার করে হবে না। তাকে শত্রু ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে ও সশস্ত্র ক্ষমতা প্রয়োগ করে তা অর্জন করতে হবে। সেক্ষেত্রে আবার উপস্হিত রাষ্ট্র অপ্রয়োজনীয় হয়ে হবে। আর ঐ বলপ্রয়োগের ক্ষমতায় নতুন রাষ্ট্র কায়েম হতে পারে যেখানে যে শত্রু সে আর নাগরিক নয়। তার মানে আবার সেই পুরানো জায়গায় ফিরে আসলাম, যে আমার সম-নাগরিক সে শত্রু হতে পারে না। তার সাথে আমার বিরোধ মীমাংসার জায়গা কোর্ট, বিচার। আর আমি যাকে শত্রু মনে করি সম-নাগরিক হয়ত সে তখনও অথবা নয়; তার সাথে আমার বিরোধ মীমাংসার জায়গা আর কোর্ট বা বিচার নয় - যুদ্ধের ময়দানে, বলপ্রয়োগের ক্ষমতায় ।
রাষ্ট্রের শত্রুমিত্রের দিক থেকে রাষ্ট্র মিত্রের বিচার করে; শত্রুর বিচার করে না, যুদ্ধ ঘোষণা করে।
উপরের এই আলোচনাটা রাষ্ট্র, তার নাগরিক ও তার বিচার ব্যবস্হা কেন থাকে -সেদিক থেকে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত বিচার ব্যবস্হা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় দেখা যায় কোন বড় ঘটনায় বিচার করলে জনগোষ্ঠির এক বিরাট অংশের সাথে বাকীদের ভিতর একধরণের শত্রুতার মনোভাব তৈরি হবে, সমাজ বিভক্ত হয়ে থাকবে। এতে বিচার হবে ঠিকই কিন্তু একই সাথে সমাজের গাঠনিক তন্তুতে সে একটা দীর্ঘস্হায়ী ক্ষতও সৃষ্টি করবে, রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাবে বা দূর্বল হবে -এচিন্তা থেকে সাউথ আফ্রিকায় ট্রুথ কমিশন গঠন করা হয়েছিল। নাশনাল রিকনশিলেশন, জনগোষ্ঠির ক্ষোভ, বিচার আকাঙ্খা উপশমের একটা উদ্যোগ। ওখানে অপরাধীকে স্বউদ্যোগে খোলাখুলি অপরাধ স্বীকার করতে হয়। সে তা করতেও পারে কারণ এই স্বীকারের ফলে কোন আইনি বিচার ব্যবস্হা প্রযোজ্য হবে না এই নিশ্চয়তা থাকে। ফলে যে বিচার সমাজকে সরাসরি ভাগ করে ফেলে তা করার চেয়ে, একটা মানবিক সংবেদনশীল সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অপরাধী খোলাখুলি তার অপরাধ স্বীকার করে, তার সৎ অনুশোচনা জানায়। এটা ক্ষতিগ্রস্হ ব্যক্তিকে মানবিকভাবে স্পর্শ করে ফলে সে ক্ষমা করে দেয়। পুরো ব্যাপারটাই মানবিকভাবে ঘটে, কোন বাধ্যবাধকতা নাই। বলা ভালো বাধ্যবাধকতা আছে তবে একটাই, মানবিক মানুষ হতে চান কীনা। সাধারণত দেখা গেছে, ক্ষমার কথাটা বলার পরই অপরাধী ও ক্ষতিগ্রস্হ ব্যক্তি উভয়েই কাঁদছে, চাইকি ঐ সামাজিক আসরের সকলে কান্নার রোল তুলে ফেলে। পরিস্হিতিটা যেন এরকম, এমন কী ঘটনা আছে যে আমরা মানুষেরা পরস্পরের কাছে যেতে পারছি না। কেন আমি এমন অপরাধ করতে গেলাম আর তুমিও ক্ষতিগ্রস্হ হলে, কেন এটা আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করলো, আমার আপশোস, অনুশোচনা বোধ করছি, আমি তোমার সাথে মানবিক ঐক্যে মিলিত হবার আকুতি বোধ করছি। কিন্তু আমাদের বৈষয়িক বা অন্য কোন স্বার্থ আমাদের মানুষের ঐক্য গড়তে দিচ্ছে না। মানুষ হিসাবে এই অক্ষমতা আমরা উভয়েই অনুভব করছি, বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করছি। উভয়ে কেঁদে অন্তত সেই মানুষের ঐক্য প্রকাশ করছি।
মানুষের ঐক্য, মানবিকবোধ জাগানো, অক্ষমতার জন্য অনুশোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে একটা মানবিক সমাজের আকুতি প্রকাশ ঐ ট্রুথ কমিশনের উদ্দেশ্য।
১৯৭১ সালে আমাদের সমাজে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে আইনি বিচার করতে যেয়ে সে ক্ষত আবার না বাড়িয়ে উপশমের কথা ভেবে বাংলাদেশে কেউ ট্রুথ কমিশনের কথা ভাবলেও এরজন্য আমাদের সমাজ এখনও প্রস্তুত নয়।
আমার কামনা একটাই, মীমাংসার জায়গা কোর্ট, বিচার হোক আর যুদ্ধের ময়দানে, বলপ্রয়োগের ক্ষমতায় হোক, কী সামাজিক ক্ষত উপশমের ট্রুথ কমিশন হোক - আমরা যা চাই তা যেন ভেবেচিন্তে জেনে শুনে আমাদের আকাঙ্খা পুষে রাখি। নতুন কোন দাঙ্গার কারণ হওয়া হবে আমাদের সমাজের জন্য আত্মঘাতি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

