আমার প্রিয় পোস্ট

"বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূ-খন্ডের প্রয়োজনীয়তা কার স্বার্থে?" - আমাদের স্বার্থে।

১৪ ই মে, ২০০৯ রাত ১০:৪১

শেয়ারঃ
0 0 0

["বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূ-খন্ডের প্রয়োজনীয়তা কার স্বার্থে ?" - এই শিরোনামে নিক "আগামি" একটা পোষ্ট দিয়েছিলেন গতকাল। Click This Link

"অর্থনৈতিক মুক্তি" এর দিক থেকে দাড়িয়ে দেখে এটা "কমিউনিষ্টদের" একটা বহু পুরানো সমালোচনা বা আক্ষেপ। মূল লেখা আর মন্তব্যগুলো পড়তে পড়তে লক্ষ্য করছিলাম প্রায় সবাই আক্ষেপের সুরে সূর মিলিয়েছেন। অথচ এক্ষেত্রে আমার অবস্হান সম্পূর্ণ বিপরীত। সেজন্য কিছু লিখতে একটু অস্বস্তি বোধ করছিলাম। আবার প্রসঙ্গটা সিরিয়াস আলোচনার দিকে নেবার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। পরিণতিতে এই আলাদা বিপরীত পোষ্ট। ]

নিক "আগামি", আপনার "অর্থনৈতিক মুক্তি" খোঁজা দেখে আমার মনে হয়েছে, লেখাটা একটা 'কমিউনিষ্ট' অবস্হানে দাড়িয়ে লেখা ক্রিটিক - এভাবে মনে করা যেতে পারে। আলোচনা আগাবার সুবিধার জন্য এটা ধরে নিলাম, আশা করি আপনার আপত্তি হবে না।

কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টির পাশাপাশি কমিউনিষ্ট পার্টিও কিন্তু ১৯২০ সাল থেকেই অবিভক্ত ভারতে বিরাজ করছিল এবং বিভিন্ন দল উপদল হিসাবে বিভক্ত হলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশেও আছে। আপনার "অর্থনৈতিক মুক্তি"র রাজনীতির খবর নিতে গেলে কমিউনিষ্ট পার্টিরও একটা মূল্যায়ন, পরীক্ষা আপনাকে করতেই হবে, ঠিক যেমন আপনি কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের সম্পর্কে ১৯৪৭ ও ১৯৭১ এর সংক্ষিপ্তভাবে মূল্যায়ন টেনেছেন। আপনার বক্তব্য এই মূল্যায়নের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
কমিউনিষ্ট রাজনীতিতো সবসময়ই কংগ্রেস, মুসলিম লীগের পাশপাশি হাজির ছিল। তাহলে কেন কংগ্রেস বা মুসলিম লীগই নিজেদেরকে আপনার "৯০ ভাগ" মানুষের পছন্দের দল হিসাবে জায়গা করে নিতে পারল। আর কমিউনিষ্ট পার্টিকে তা দাড়ায় দাড়ায় দেখতে হলো কেন? - এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুজতে হবে। এটা স্রেফ "১০ ভাগ যে ৯০ রে বোকা বানাইতে পারে" - একথা বলে পার পাওয়া যাবে না। "অর্থনৈতিক মুক্তির" চিন্তাভাবনাকারী কমিউনিষ্ট পার্টিও কেন "৯০ রে বোকা বানাইতে" না পারুক ৫০-৬০ ভাগ রেও কেন পারলো না? এর সদুত্তর দরকার।

আপনার 'ধনিক শ্রেণী", "নব্য ধনিক শ্রেণী", "শোষণ", "শোষক" - এই ভোকাবোলারিগুলো ভারতীয় উপমহাদেশীয় কমিউনিষ্ট পার্টির সমান বয়সী। ১৯৪৭ সালের আগে একবার আর একই কায়দায় ১৯৭১ এর আগে (সোভিয়েত ধারা বাদে) কমিউনিষ্ট পার্টি রাজনৈতিক পরিস্হিতির মূল্যায়ন করেছিল - একইভাবে একই সারসংক্ষেপ করেছিল - ভোটের আগে ভাতের প্রশ্ন সমাধা করতে হবে। এই রাজনীতি সঠিক হোক বা বেঠিক; কিন্তু মানুষ শুনেনি সেই কথা। ফলে কাজেও আসেনি। কেন?

আমি আওয়ামী লীগের সমর্থক নই। শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগও নয়, আর শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের তো প্রশ্নই উঠে না।

এখানে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন দেখলাম "৬৯ এর গণ আন্দোলন টা আবার দরকার"। এটা খুবই ভাল প্রস্তাব - সন্দেহ নাই। ঐ গণঅভুত্থান কিন্তু ছিল ভাসানী-শেখ মুজিবের আন্দোলন। মাঠের দিক থেকে দেখলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পাশপাশি শ্রমিক আন্দোলনে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কমরেড তোয়াহার (তাঁকে ভাসানী ন্যাপের নেতাও বলা যেতে পারে) ভুমিকা ছিল খুবই নির্ধারক। অভ্যুত্থানে হার মানা আয়ুব খান ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি একথা ঘোষণা দিয়ে তবেই গণঅভ্যুত্থানে বিরতি টানতে পেরেছিল। সেই সাথে ক্ষমতা হস্তান্তরের মোডালিটি বা আইনগত পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে গোলটেবিল আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিল। আয়ুব খানের এই ঘোষণার পর এই গণঅভ্যুত্থান একটা বিরতি নেয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের মোডালিটি বা পদ্ধতি ঠিক করার এই আলোচনা যেটা পরবর্তীতে ফলাফলে LFO বা "লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার" নামে পরিচিতি নেয় ও LFO এর পক্ষে প্রেসিডেন্টের ডিক্রি জারি করে একে আইনে রূপান্তরিত করা হয়েছিল; প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ১৯৭০ এর নির্বাচন (কনষ্টিটিউশন বা গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভার সদস্য নির্বাচন) আহ্বানের আইনগত ভিত্তি এটাই।
এখন, কমিউনিষ্টরা সেই আলোচনা বর্জন করেছিল কেন? ভাসানী কেন সেই আলোচনা বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন? এই প্রজন্ম আজকের রাজনীতির ধরণ-ধারণ দেখে যেন ভেবে না বসেন শেখ মুজিব আর ইয়াহিয়া (অভ্যুত্থান শেষে ততদিনে, আয়ুব ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা দিয়ে পদত্যাগ করেছিল) মিলে আতাঁত করে ভাসানী বা কমিউনিষ্টদের আলোচনার বাইরে রেখে LFO করেছিল। মনে রাখতে হবে ১. ভাসানী ন্যাপ ও কমিউনিষ্ট পার্টি দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে এই আলোচনায় অংশগ্রহণ না করা ও বর্জনের ডাক দিয়েছিল। ২. জেল থেকে মুক্তি হয়ে শেখ মুজিব LFO আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন; এবং আক্ষরিক অর্থেই আলোচনায় যাবার পথে মুরুব্বী হুজুরের ভাসানীর দোয়া সমর্থন চাইতে তাঁর বাড়ি হয়ে গিয়েছিলেন।
অর্থাৎ ঘটনার সোজা মানে দাড়িয়েছিল, ভাসানী ন্যাপ ও কমিউনিষ্ট পার্টির সিদ্ধান্ত ভাসানী ও শেখ মুজিব উভয়েই শ্রদ্ধা জানিয়ে মেনে নিলেন। আর, এতে দুজনার দলীয় রাজনৈতিক অবস্হান দুই রাজনীতির পথে হাটা শুরু হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আলোচনায় সফলতার জন্য শেখ মুজিবের দোয়া চাওয়া ও ভাসানীর দোয়া করা আগামি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্ত্বপূর্ণ বাঁক নেয়া বলা যায়। বাংলাদেশের সমাজের আজ যে স্পষ্ট দুই রাজনৈতিক মেরু আমরা দেখি তার শুরুটা পোতা আছে ওখানে, নির্ধারক ঘটনা হয়ে আছে সেটা।

অনেক কমিউনিষ্ট মূল্যায়নে শেখ মুজিবকে বুর্জোয়া, বিপ্লব বিরোধী বা অপছন্দকারী নেতা বলে খাটো করার চেষ্টা দেখা যায়। অথচ, শেখ মুজিব কিন্তু কখনই দাবি করেন নি তিনি কমিউনিষ্ট, কমিউনিষ্ট বিপ্লব তার রাজনীতি বা কমিউনিষ্ট রাজনীতি করা তাঁর দলের লক্ষ্য। ফলে কমিউনিষ্টদের এই অভিযোগের কোন সারবত্তা নাই। বরং এটাকে দেখা যেতে পারে, কমিউনিষ্টরা কেন তাদের বিপ্লব, ভিন্ন রাজনীতি সফল করতে পারলো না সেই অকর্মন্যতার প্রতিক্রিয়াজনিত ঈর্ষাকাতরতা। এছাড়া অন্যকোনভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আমি দেখি না। কিন্তু এসব কিছু সত্ত্বেও সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ ফ্যাক্টস হলো তিনি একটা সশস্ত্র সংগ্রামের নেতা। এটাকে বলা যায় শেখ মুজিবের রাজনৈতিক চিন্তার সীমা চৌহদ্দি ছাড়ানো এক রাজনৈতিক পদক্ষেপ; যখন পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত - যতদূর রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করে নাই বাস্তবে তাকে ছাড়িয়ে চলে যাওয়া। তাই একদিকে যেমন এটা সত্য যে বাস্তব পরিস্হিতি তাকে বুর্জোয়া রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে যেতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে এটাও সমান সত্য যে কমিউনিষ্টরা গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানে সাথে বরাবর থেকেও কেবল ফসল ঘরে তোলার সময় হলে আর গণমানুষের সাথে থাকেনি বা থাকতে পারে নি - সেই অবস্হা; এই না থাকার পিছনে, ভিন্ন রাজনৈতিক পথ নেবার পক্ষে যদিও কমিউনিষ্টদের নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। সারকথায় যেটাকে কমিউনিষ্টরা ভোটের রাজনীতি বলে। ব্যাখ্যাটা হলো, তাঁরা ভোটের রাজনীতির পক্ষে থাকতে চান নি, আর শেখ মুজিব ভোটের রাজনীতির পক্ষে গিয়েছিলেন। ("আগামি" আপনি এখানে ভোটের রাজনীতির বিরোধীতাকে "অর্থনৈতিক মুক্তির" রাজনীতি বলেও মনে করতে পারেন)।
কিন্তু আজ যদি বিচার করে দেখি, শেখ মুজিব কী আসলে ভোটের রাজনীতি করেছিলেন অথবা নির্বাচন-ভোটের মাধ্যমেই কী ক্ষমতা পেয়েছিলেন? উত্তর হলো না।
তিনি তো, সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন বলেই ক্ষমতা পান নি, ক্ষমতা তাঁকে নিতে হয়েছিল বা পেয়েছিলেন সশস্ত্র সংগ্রামে বল প্রয়োগের মাধ্যমে। অর্থাৎ নতুন রাষ্ট্র ও ক্ষমতা কেন তাঁর দলের হওয়া উচিত - নির্বাচন, ভোটের বিজয়টা এর স্বপক্ষে একটা নৈতিকতা তৈরি করেছিল ও জনগণের মুড এর পক্ষে দাড়িয়ে গিয়েছিল মাত্র। এরপর বাকি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের গায়ের জোড়কে গায়ের জোড় দিয়ে মোকাবিলার মুরোদ; বলপ্রয়োগ করে নিজের ক্ষমতা নেয়া ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা। ফলে বাস্তবে নির্বাচন, ভোট তাঁর লক্ষ্য হিসাবে হাজির হয়নি, ক্ষমতা দখলের পথে হয়েছিল একটা হাতিয়ার বা টুল মাত্র। কাজেই শেখ মুজিব নির্বাচন বা ভোটের পথে হাটতে LFO আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন আর তাই ভাসানী ন্যাপ বা কমিউনিষ্টরা এর বিরোধীতা করে বর্জনের ডাক দিয়ে নিজেদের "শ্রেণীর রাজনীতিতে" মনোনিবেশ করেছিলেন - এই ব্যাখ্যা ধোপে টেকে না। কারণ ভোটের রাজনৈতিক কৌশল নিলেই তা সশস্ত্র ক্ষমতা দখলের দিকে অবশেষে যাবে না এমন ধরাবাধা কোন মানে নাই। চোখ বন্ধ করে সবসময় সবধরণের ভোটের রাজনৈতিক কৌশলই খারাপ এই মূল্যায়নের কোন ভিত্তি নাই। ফলে শেখ মুজিবের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা খাঁড়া হয় না। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে এই কমিউনিষ্ট মূল্যায়ন ভিত্তিহীন।

তাহলে কী আসলে সমস্যাটা কোথায়? শেখ মুজিবের রাজনীতির বিরুদ্ধে কী কোন সমালোচনা খাঁড়া করা যায় না?

অবশ্যই যায়। বহু খামতি আছে আমাদের রাষ্ট্রের। তবে যে খামতি আছে তা একটা বড় কারণ কমি্উনিষ্টদের রাজনৈতিক অবস্হান। সেজন্য শেখ মুজিবের রাজনীতির মুল্যায়নের আগে (যেমন নিক "আগামি" তাঁর পোষ্ট "বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূ-খন্ডের প্রয়োজনীয়তা কার স্বার্থে? বলে করেছেন) কমিউনিষ্টদের নিজেদের রাজনীতির মূল্যায়ন আমাদের অবশ্যই করতে হবে। নইলে শেখ মুজিবের মূল্যায়ন অসম্ভব। দোষ ধরবার জন্য নয়, আগামিতে একই ভুল না করবার জন্য। তবেই সম্ভব হতে পারে, জানা যেতে পারে শেখ মুজিবের রাজনীতির সমস্যাটা কোথায়, কেন এই পথটায় কাম্য সফলতা পাব না। সশস্ত্র সংগ্রাম করলেও একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণতি পাবে না, যেটা আমরা এখন হারে হারে টের পাচ্ছি, ভুগছি।

সমস্যার স্পষ্ট উত্তরটা কমিউনিষ্টদের তত্ত্বেও ছিল ও আছে। পুঁজির সাম্রাজ্যবাদী যুগে বিপ্লবের গণতান্ত্রিক স্তরে কমিউনিষ্টদের নেতৃত্ত্বে তা ঘটলে তবেই একটা শক্তিশালী মাথা উচু করা রাষ্ট্রের পত্তন ঘটানো সম্ভব।
আমার বিবেচনায়, ৬৯ এর গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানের কাল এক্ষেত্রে সবচেয়ে আদর্শ উদাহরণ ও পরিপক্ক অবস্হা ছিল। কিন্তু জ্ঞানবুদ্ধির দোষে, ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কমিউনিষ্টদের উপর এর প্রভাব ইত্যাদি নানান কারণে এই পাকা ফল আমরা ঘরে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। ৬৯ এর ঐক্যটা ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য পারফেক্ট ঐক্য। গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট। এজন্যই ওটা আয়ুব খানের মত শাসককে ক্ষমতা হস্তান্তর করার ঘোষণা দিতে বাধ্য করতে পেরেছিল। কিন্তু এরপর আমার কমিউনিষ্টরা একা শেখ মুজিবকে যেন সাম্রাজ্যবাদ-বাঘের মুখে ফেলে পালিয়ে গেলাম। আমরা কমিউনিষ্টরা কী জানতাম না গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট ছাড়া সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই লড়াকু রেডিক্যাল না হলে একা শেখ মুজিব তা সামলাতে পারবে না? নির্ঘাত মারা পারবে? কারণ আন্দোলনের মুড ততদিনে রেডিক্যাল হয়ে গেছে। অথচ হঠাৎ আমাদের যেন হুশ হলো আমরা কমিউনিষ্ট; 'ধনিক শ্রেণী", "নব্য ধনিক শ্রেণী", "শোষণ", "শোষক"; আমরা ধনী গরীব বলে শস্তায় এক নৃশংস বুঝ আমাদের মাথায় ভর করল। অথচ বিপ্লবের স্তর যদি বুর্ঝোয়া বলে মানি, জানি তাহলে ধনী গরীবের কথা তখন কেন তুলব? আমরা কেন দেখতে পেলাম না অর্থনৈতিক মুক্তির বাকোয়াজে তখন ধনী-গরীবের কথা তোলা মানে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোটে বিভক্তি ঘটবে, জনগোষ্ঠির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হবে?

শেখ মুজিব বুর্জোয়া রাজনীতিই তো করবেন। তিনি অন্য কিছু করবেন এমন তো কবুল করেন নি। সমাজে বুর্জোয়া উন্মেষে উন্মুখ চিন্তা বিরাজ করবে এটাই তো ঐ সময়ের সবচেয়ে স্বাভাবিক লক্ষণ। বুর্জোয়া বিপ্লবের যুগে বুর্জোয়া উন্মেষে উন্মুখ চিন্তার গুরুত্ত্ব যে না বুঝতে পারে কমিউনিষ্ট হওয়া দূরে থাক, সে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কিছুই বুঝে নাই। অথচ এভাবেই, ভোটের আগে ভাতের কথা তুলে, ধনী গরীবের কথা তুলে শ্রমিক আন্দোলনের সমর্থনে ৬৯ এ যে গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট তৈরি হয়েছিল তা ধ্বংস করে দিয়েছি। শ্রমিক আন্দোলনের সমর্থনের কারণে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত লড়াকু থাকার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাকে বিনষ্ট করেছি।

গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট দূর্বল ও ভেঙ্গে পরার পরও শেখ মুজিবের সাফল্য এখানেই যে তিনি তার পরেও একে নিজের মত করে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র (দূর্বল হলেও) পর্যন্ত নিতে পেরেছিলেন। এখানেই তিনি আমাদের নির্বিবাদ নেতা। কিন্তু বাঁচতে পারেন নাই। আমাদের দূর্ভাগ্য। যদিও, গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট ভাঙ্গলে এই পরিণতিই তো আমাদের হবার কথা। তবু তিনি অবশ্যই আমাদের নেতা, সাফল্যের প্রতীক। তাঁর দোষগুণের বিচারের আগে কমিউনিষ্টদের মূল্যায়ন হতে হবে। দায়বোধ করতে জানতে হবে। সেই আশায়।

লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে তাই এখানে শেষ করব। মন্তব্য আলোচনার সময় আর কিছু কথা বলার সুযোগ নিব হয়ত।

 

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০০৯ রাত ১০:৪১ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৪ ই মে, ২০০৯ রাত ১১:১৯
প্রশ্নোত্তর বলেছেন: আগামি'র পোস্টটিকে মনে হচ্ছিল বিশ্লেষণ বাকী রয়ে গেছে। এটাতে এসে মনে হয় সেটা খানিকটা কাটল। ধন্যবাদ। তবে বেশকিছু ব্যাপারে একমত নই। সময় করে এসে আলোচনায় অংশ নেয়ার ইচ্ছা রাখছি।
১৪ ই মে, ২০০৯ রাত ১১:২৯

লেখক বলেছেন: অপেক্ষায় থাকব। অংশ নিলে ভাল লাগবে।

২. ১৪ ই মে, ২০০৯ রাত ১১:৪৬
আগামি বলেছেন: আপনি আমার পোস্ট পড়েছেন, সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে আলাদা একটা পোস্ট দিয়েছেন এবং যে বিষয়গুলো আমি এড়িয়ে গেছি সেরকম একটা বিষয়ে চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন-আমি কৃতজ্ঞ আপনার কাছে ।

আর আপনার লেখা সত্যিই দারুন সাবলিল ।

তবে কি, যেটা ধরে নিয়ে আপনি আলোচনাটা করেছেন, আমি ওমন কিছু থেকে আমার লেখাটা লিখিনি । আমার লেখায় হয়তো কিছু টার্ম বা শব্দ এসেছে যেগুলো বাম রাজনীতিকরা ব্যবহার করেন, কিন্তু আমি আদতেই বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত বা বিশ্বাসী কোনটাই নই ।নজরুলের ঐ কথাটা মনে পড়ে ?"ক্ষুধাতুর শিশু চায়না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন "-এমন একটা যায়গা থেকেই আমার লেখাটা লিখতে চেয়েছি ।

আমি কোন মতবাদ, তত্ব বা দর্শন থেকে আমার লেখাটা লিখিনি । আমি নিছকই হাড়-হাভাতের গ্লানিতে পিস্ট খেটে খাওয়া মানুষের পরাজিত জীবনের পক্ষ থেকেই লেখাটা লিখেছি ।

তবে এদেশের বাম রাজনীতি নিয়ে আমার পড়াশুনা আছে কিছুটা সেটা হয়তো বলার মত নয় । তবু আমার ঐ সামান্য পড়াশুনায় যতটুকু মনে হয় -এরা ময়দানের চেয়ে ঘরোয়া, বাস্তবতার চেয়ে তত্বের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয় বলেই আজ তাদের এমন মলিন দশা । আরো বড় ব্যাপার আঃলীগকে গ্রাস করার চিন্তাটাও তাদের ভুল প্রমানিত হয়েছে ।
১৫ ই মে, ২০০৯ রাত ১:১২

লেখক বলেছেন: ভাল লাগল আপনার মন্তব্য পড়ে।
কৌতুহল ছিল আপনার কেমন লাগবে সেটা জানার। আপনার বিনয় প্রকাশ প্রশংসনীয়। জানার পূর্বশর্ত হলো বিনয়, দীনতা প্রকাশ করা। তবেই জ্ঞান সম্ভবত ধরা দিতে রাজি হয়।

আমার কমিউনিষ্ট ধরে নেয়াটা আলোচনা আগিয়ে নেবার সুবিধার্থে।
নজরুলের যে উদ্ধৃতিটা দিয়েছেন, "ক্ষুধাতুর শিশু চায়না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন "- তা না দিলেও আমি আপনাকে তাই ধরে নিয়েছি। "স্বরাজ আর ভাতের" বিবাদ নজরুলের কাল থেকে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সমস্যা। মনে করা হয়েছে এটাই বোধহয় স্বরাজ-ওয়ালাদের চেয়ে কমিউনিষ্টদের আগিয়ে থাকা বা বুদ্ধিমানের মত প্রশ্নটা করা হলো; একটা কমিউনিষ্ট পজিশন। আমি আগে অনেক জায়গায় বলেছি, গরীব দুস্হদের প্রতি দয়া, মমতাবোধ দেখাতে আমি কাউকে না করি না, তবে সাবধান হতে বলি এর সাথে বিপ্লব বা কমিউনিষ্ট চিন্তার কোন সম্পর্ক নাই।

সমস্যা হলো, ১. স্বরাজের সাথে ভাতের সমস্যাটার সম্পর্ক কোথায় এটা প্রায় কোথাওই ট্রানশ্লেট করা হয় নাই।
২. ভাতের সমস্যার কথাটা কিভাবে রাজনৈতিক ভাষায় উপস্হাপন করব তা কারও জানা হয় নাই। শুনতে ভাল লাগে মনে হয় খাস একটা কথা ফেলেছি, পপুলার - শব্দের এই ব্যবহারটা তাই টিকে গেছে।

আসলে ভাতের সমস্যা মানে কী? সবাই বসিয়ে ভাত খাওয়ানোর রাজনৈতিক ব্যবস্হা করব? নাকি সবার চাকরির ব্যবস্হা করব। (খেয়াল করুন ভাত এখন চাকরিতে ট্রানশ্লেট হয়ে গেছে।) আবার চাকরি মানে কী? শিল্প স্হাপন? আবার শিল্প স্হাপন মানে কী একটা সুন্দর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা? নাকি একটা রাষ্ট্র রাজনৈতিক ব্যবস্হা এর প্রি-রিকুইজিট বা পূর্বশর্ত যেটা আছে ধরে নিয়েছে যার উপরে দাড়িয়ে এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা? এসব হাজারো ট্রানশ্লেশন না করেই ভাতের কথা তোলা হয়। আবার ওদিকে দেখুন, মানুষের জন্য কেবল ভাতের নিশ্চিত বন্দোবস্ত করে দিলেই কী হবে? মানুষ তো কেবল খায়-দায় আর ঘুমায় না। তার স্পিরিট বা পরমার্থিক সত্ত্বা বা দিক আছে। এগুলোরও পরিপূরণের দরকার আছে, যার পরিপূরণ আবার তার জীবনযাপন ধারণের, চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তাহলে দেখুন ভাতের সমস্যা বললে সেটা কেবল ভাতের জায়গায় থাকছে না। ভাত কেবল সামনের প্রকাশ্য দিক সহজেই দেখা যায়। তাই বলে সবকিছুকে ভাতে রিডিউস করে নামিয়ে দেখা চলে না। এই সংকীর্ণ চিন্তা ভয়ঙ্কর। এটা কমিউনিষ্ট চিন্তা তো হতেই পারে না।

৩. রাজনীতিতে ধনী-গরীব নামে ভাগ করে একধরণের চিন্তার খবর পাওয়া যায়। অনেকে এটাকেই কমিউনিষ্ট চিন্তা বলে ভাবতে ভালও, বা তা সম্ভব হবে বাসে। অথচ এটা হলো সবচেয়ে নিকৃষ্টমানের চিন্তা।
একজন গরীর মানুষ বা সমাজের সবচেয়ে কম রিসোর্স ভোগকারী বা ভুক্তভোগীর জায়গায় দাড়িয়ে যে কোন রাজনৈতিক চিন্তার ভালো মন্দ বিচারের দরকার আছে। লিটমাস পরীক্ষার মত এই পারস্পেকটিভটা খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ। এর মানে এই না যে ধনীদের প্রতি ঈর্ষা বা ঘৃণা জাগিয়ে কোন রাজনীতি দাড় করাতে হবে।

৩. ১৪ ই মে, ২০০৯ রাত ১১:৫৬
আবদুল ওয়াহিদ বলেছেন:
চে গুয়েভারা তার 'মোটর সাইকেল ডায়েরী'র এক জায়গায় ব্রাক্ষণ কমিউনিষ্টদের কথা বলেছিলেন। বহুদিন আগে পড়া, তাই সঠিক বিবরণটা মনে নাই।

আমাদের ঐতিহাসিক চেতনার জায়গায় হাত গুটিয়ে বসে থাকার কিছু নাই। যেহেতু আমরাই ইতিহাসকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি।

+
১৫ ই মে, ২০০৯ রাত ১:১৬

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ ওয়াহিদ।
মানুষ আর ইতিহাসের সম্পর্ক বুঝা জরুরী।

৪. ১৭ ই মে, ২০০৯ রাত ১১:০২
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: আপনার এই লেখা নিয়ে কিছু কথা বলবার ইচ্ছা আছে। কথা দিচ্ছি বরাবরের মতো ফাঁকি দেব না। তার আগে পাকিস্তান ও তালেবান নিয়ে এই লেখাটার দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছি।

Click This Link
১৮ ই মে, ২০০৯ রাত ১:৩৫

লেখক বলেছেন: আপনার কথার উপর ভরসা রাখলাম।

এইমাত্র সোয়াত ও শরিয়া আইন নিয়ে একটা পোষ্টের প্রথম পর্ব পোষ্ট করলাম। আশা করি দেখবেন।

আপনার লিঙ্কটা অবশ্যই দেখব।

৫. ১৮ ই মে, ২০০৯ রাত ১:২০
প্রতিদিন বলেছেন: আমি কমিউনিষ্ট নয়গো মুনসিজি। তয় আপনেগো বাতচিত পইড়া ভাল লাগছে। যেমন:

''আসলে ভাতের সমস্যা মানে কী? সবাই বসিয়ে ভাত খাওয়ানোর রাজনৈতিক ব্যবস্হা করব? নাকি সবার চাকরির ব্যবস্হা করব। (খেয়াল করুন ভাত এখন চাকরিতে ট্রানশ্লেট হয়ে গেছে।) আবার চাকরি মানে কী? শিল্প স্হাপন? আবার শিল্প স্হাপন মানে কী একটা সুন্দর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা? নাকি একটা রাষ্ট্র রাজনৈতিক ব্যবস্হা এর প্রি-রিকুইজিট বা পূর্বশর্ত যেটা আছে ধরে নিয়েছে যার উপরে দাড়িয়ে এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা? এসব হাজারো ট্রানশ্লেশন না করেই ভাতের কথা তোলা হয়। আবার ওদিকে দেখুন, মানুষের জন্য কেবল ভাতের নিশ্চিত বন্দোবস্ত করে দিলেই কী হবে? মানুষ তো কেবল খায়-দায় আর ঘুমায় না। তার স্পিরিট বা পরমার্থিক সত্ত্বা বা দিক আছে। এগুলোরও পরিপূরণের দরকার আছে, যার পরিপূরণ আবার তার জীবনযাপন ধারণের, চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তাহলে দেখুন ভাতের সমস্যা বললে সেটা কেবল ভাতের জায়গায় থাকছে না। ভাত কেবল সামনের প্রকাশ্য দিক সহজেই দেখা যায়। তাই বলে সবকিছুকে ভাতে রিডিউস করে নামিয়ে দেখা চলে না।''..
১৮ ই মে, ২০০৯ রাত ১:৩৭

লেখক বলেছেন: আপনি কমিউনিষ্ট না হলে আমার ক্ষতি নাই।
আমি সবার কাছে এলেখা পৌছাতে চাই।
তবে কমিউনিষ্ট না হয়েও আপনার ভাল লেগেছে এটা ভাল খবর।

শেষ কথা আমিও বোধ করি "কমিউনিষ্ট" নই। সুতরাং চিন্তার কিছু নাই।আমি তো বিশেষত আপনাদের কাছেই পৌছাতে চাই।

৬. ১৮ ই মে, ২০০৯ দুপুর ২:০২
মুসতাইন জহির বলেছেন: শেখ সাহেবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কল্যাণে, গণআন্দোলনের মারফতে জনগণের নৈতিক সমর্থন পুঁজি করে নিয়মতান্ত্রিক/সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি জনগোষ্ঠীর আকাঙক্ষাকে রূপদানের যে পথ ও পদ্ধতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নাই, সেই প্রজ্ঞা প্রদর্শনের তাৎপর্যও অসাধারণ। মানি।

কিন্তু, আমাদের রাজনৈতিক লড়াই যখন সশস্ত্র জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করল তখন এটাকে আর একই ফ্রেমওয়ার্কএর ভিতর নির্দিষ্ট থাকতে দেখা গেল না। এটা নিছক মুজিবের যুদ্ধকালিন প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দানেরই সমস্যা নয়। এমনকি, যারা নানান সময় কয়েক ধাপ এগিয়ে আলাদা বা স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা তুলেছেন তারাসহ পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অনিবার্যভাবে যাদের হাতে দায়িত্ব এসে পড়েছিল তারাসহ কেউই প্রায় পরিষ্কার করে নিজেদের লড়াইয়ের ফলে অর্জিত একটি স্বধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মানে কি বা তাঁরা কি আদর্শ দাঁড় করাবেন সেটা উপব্দি করতে সক্ষম হননি। আমি বলছিনা যে তাঁরা স্থির করতে পারেনি। তাঁরা প্রায় কিছুই অ-স্থির রাখেনি।কিন্তু যা করেছেন তা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াজাত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। চেতনার কথা তো বাদই। বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূখন্ডের অর্থ বা প্রয়োজনীয়তার কোনো দিকদর্শন হাসেল হয়নি। যতটুকু বাজারে প্রচলিত আছে তা ঐ অর্থনৈতিক শোষণ তত্ত্বই। আর আছে দ্বিজাতীতত্বের ভ্রম সংশোধন এর দাবি। সংশোধনবাদি ও শোষণ যন্ত্রণা থেকে নিজেদের আলাদা ভাবার আর কোনো ন্যয্যতা কি অঅজো আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি?
এইযে পারা না পারা এটা শেখ মুজিবের '৭০ পর্যন্ত সামনে থেকে বাঙ্গাল জাতকে নেতৃত্ব দানের অসামান্য অবদানের দ্ধারা কিছুই নির্ধারিত হয় না। হয়নি। ইতিহাস সাক্ষি।
১৮ ই মে, ২০০৯ রাত ১১:৫৩

লেখক বলেছেন: আমি আপনার কথা স্পষ্ট বুঝিনি। তবু সেই বুঝের উপর দাড়িয়ে বলছি।
"একই ফ্রেমওয়ার্কএর ভিতর নির্দিষ্ট থাকতে দেখা গেল না" - দেখা যাওয়ার তো কথা না। না যাবার জন্য শেখ মুজিব এমনকি তাজউদ্দিনকেও দোষারোপ করতে আমি চাই না।

তত্ত্বের কথা যদি মনে রাখেন, গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট (বুর্জোয়া কমিউনিষ্ট এলায়েন্স) ছাড়াই একা কেবল বুর্জোয়া চৈতন্য পুজি করে শেখ মুজিব আগিয়ে যাবার দায় শেখ মুজিবের নয়। এ দায়ে আমরা শেখ মুজিব বা তাজউদ্দিনকে দোষারোপ করতে পারি না।
"পুঁজির সাম্রাজ্যবাদী যুগে বিপ্লবের গণতান্ত্রিক স্তরে কমিউনিষ্টদের নেতৃত্ত্বে তা ঘটলে তবেই একটা শক্তিশালী মাথা উচু করা রাষ্ট্রের পত্তন ঘটানো সম্ভব"। একথা কমিউনিষ্ট মনে রাখেনি। মনে রাখলে ২৫ মার্চের আগে বা অব্যবহতি পরেও করার চেষ্টা করা বা প্রয়োজন অনুভব করতে দেখা যায়নি। ফলে একা তাজউদ্দিনকে যখন ইন্দিরার কাছে সাহায্যের জন্য যাচ্ছেন তখন ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ প্রাধান্য বজায় রেখে ইন্দিরা গান্ধীর টার্মে নিগোশিয়েট করা ছাড়া তাজউদ্দিনের পথ কী ছিল। কারণ পুরোপুরি ভারতের সাহায্যের উপর নির্ভর করে স্বাধীনতা পেতে চাইলে ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ নূন্যতম ক্ষুন্ন করে আমরা তা আশা করতে পারি না। যে দূর্বল তাজউদ্দিনকে আমরা ইন্দিরার কাছে হাত পাততে দেখি এটা তাজউদ্দিনের নয়, আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষমতার দূর্বলতা। গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোটের ক্ষমতা আমরা গড়তে পারেনি। বহু আগেই ৬৯ এর মার্ভ থেকেই সে পথভ্রষ্ট। আর ততদিনে বাংলাদেশেও কমিউনিষ্টদের একাংশ নকশাল আন্দোলনের ধারায় সংগঠিত হবার পথ নিয়ে ফেলেছে।
ইতিহাস উল্টানো যায় না তবে আমরা যদি গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট ধরে রাখতে পারতাম তবে ইন্ডিয়ার সাথে নিগোশিয়েশন অবশ্যই হত তবে অনেক পরে ভিন্ন টার্মে ভারকেন্দ্র আমাদের কনসার্ন অনেকটাই আমাদের দিক বিবেচনায় রেখে। বিশেষ করে রাষ্ট্র কেমন বৈশিষ্ট নিবে তার অনেকটাই আমরা ঠিক করতে পারতাম। আমি বিশ্বাস করি না কমি্উনিষ্টসহ একই শেখ মুজিব এই কমবিনেশনের ক্ষমতা নিয়ে বুদ্ধিমানের মত আগালে ভারতের কনসার্নগুলোকে জায়গা করে দিতে পারলে ইন্দিরাকে মানানো একটা রফাতে আসা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু আমরা তো প্রায় খালি হাতে দূর্বল এক ক্ষমতার তাজউদ্দিনকেই মাত্র পাঠাতে পেরেছিলাম। ঘরে ছিলাম আমরা বিভক্ত, নিজেদের রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো ছিল পরস্পরের মধ্য অমীমাংসিত। এই বাস্তব পরিস্হিতিটা আর এক দিক থেকে দেখলে ভুলে মনে হতে পারে দূর্বল ক্ষমতার তাজউদ্দিন, ইন্দিরার কাছে যে হাত পাতছে। কাজেই তাজউদ্দিনকে দোষারোপের আগে আমি আমাদের রাজনৈতিক বিভক্তির দিকে চোখ ফেলতে বলব।

তিনটা জিনিষ ইন্দিরাকে তাজউদ্দিনের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নেবার পরই এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে সামরিক, রাজনৈতিক সব অর্থে সমর্থন করতে রাজি হয়েছেন। অথবা বলা যায় তিনটা জিনিষ তাজউদ্দিন নিশ্চিত করার পরই বা এই শর্তে ইন্দিরার সমর্থ তিনি আদায় করেছিলেন। তিনটা জিনিষ হলো - মুসলমান, কমি্উনিষ্ট ও আন্তর্জাতিক ব্লক। এই তিনটা বিষয় কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়ে দেবার পরই তাজউদ্দিনের পক্ষে ভারতের সমর্থন জোগাড় করা সম্ভব হয়েছিল।

যতই আমরা স্বাধীন বাংলার ডাক পারা বাঙালি দাবি করি না কেন আদতে তো আবার আমরা মুসলমানও। সেই সূত্রে ভারত রাষ্ট্রের জন্য কোন হুমকি যেন না হই সে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট অর্থাৎ তাস খেলায় হাত দেখানো বা শো যেটাকে বলি তা করে নিতে হয়েছিল। আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চাই বললে আস্হা অর্জন হয় নাই। ধর্মনিরপেক্ষতা সাথে লাগাতে হয়েছিল।

কমিউনিজম প্রসঙ্গ: ওটা নকশাল আন্দোলনের সুত্রপাতের সময়, পশ্চিমবঙ্গ যার জ্বর বয়ে বেড়াচ্ছিল। ফলে ভারত রাষ্ট্রের জন্য এই হুমকি বাড়ে এমন কাজ করা যাবে না। বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট (চীনপন্থী)দের কে দূরে রাখতে হবে, কোন ট্রেনিংয়ে, রিক্রটে যেন অংশগ্রহণ না করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ইন্দিরার দিক থেকে এটাকে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট (চীনপন্থী) প্রতি ঘৃণা ভয় বা পছন্দ অপছন্দ বিষয় বলে ভাবলে ভুল হবে। ফলে একমাত্র কমিউনিষ্টদের বাইরে রাখার শর্তেই ইন্দিরা রাজি হতে পারে। তবে ইন্দিরা যেরকমভাবে সমাজতন্ত্র বুঝে সেই সমাজতন্ত্র থাকতে পারে।

ব্লক প্রসঙ্গে: মিলিটারি হার্ডওয়ারের দিক থেকে সোভিয়েতের উপর ভরসা করেই ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা গড়া। কাজেই বাংলাদেশের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে বিবাদে জড়াবার আগে সোভিয়েত ব্লকের সাথে একটা চুক্তিতে যাওয়া তার যেমন জরুরি সেই সূত্রে বাংলাদেশের সাথে অনুরূপ একটা চুক্তি ছিল এরই অনুসঙ্গ।

এই পুরা সিনারিওটা ভিন্ন হতে পারত যদি আমাদের গণতান্ত্রিক মৈত্রী জোট ধরে রাখা যেত। এমনকি চীন রাষ্ট্র যে পুরোপুরি আমাদের বিক্রি করে দিয়ে কেবল নিজের রাষ্ট্রস্বার্থে কাজ করেছে - এতেও বদল ঘটানো অসম্ভব ছিল না।

৭. ২১ শে মে, ২০০৯ দুপুর ১:৩৫
নুরুজ্জামান মানিক বলেছেন: শেখ মুজিব আর কমিউনিষ্টদের নিয়ে আপনার বিশ্লেষন খুবই ভাল লাগল ।
২১ শে মে, ২০০৯ দুপুর ২:৪৪

লেখক বলেছেন: ভাল। খুব ভাল।
অনেক দিন পর আপনাকে এদিকে দেখলাম।

১৫ ই জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০৯

লেখক বলেছেন: ভাল লাগল।

৯. ১১ ই এপ্রিল, ২০১০ দুপুর ১:০৭
নুরুজ্জামান মানিক বলেছেন: কমিউনিষ্ট পার্টির নিজেদের অতীত কর্মের একটা মূল্যায়ন বা আত্মসমালোচনার যে গুরুত্ব আছে তা' আপনার লেখায় পেলাম । শুধু কমিউনিষ্ট পার্টিই নয়,সকল ব্যক্তি/দল/সংগঠনেরই এটা করা দরকার (অবশ্য, ভিন্নমতের ব্যক্তি/দল/সংগঠনের সমালোচনারও গুরুত্ব আছে তা' অস্কীকার করি না কিন্তু আয়নায় নিজের মুখও দেখা জরুরি ) ।

অপরের দোষ বা বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ইত্যাদি দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকার প্রক্রিয়ার ফল সব সময় ভাল নয় কারণ শত্রু শুধু বাইরে থাকে না, অন্দরমহলে এমনকি নিজের মনের মধ্যেও ঘাপটি মেরে থাকতে পারে (চিন্তার দাসত্ব ) ।
১২ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ২:০১

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ মানিক।

চীনা ধারার কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোর ভুমিকা ও প্রভাব ৬৯ এর আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান সংগঠনে যেমন নির্ধারক ছিল ঠিক তেমনি একটা সফল গণঅভ্যুত্থানের পর কেন ঐ পার্টিগুলো গোলটেবিল বৈঠক বর্জন থেকে শুরু করে কার্যত এই আন্দোলনকে একটা সফল পরিসমাপ্তির নেবার সব কাজ পরিত্যাগে করলো - আজ আগে এর একটা মুল্যায়ন বা আত্মসমালোচনা ছাড়া আমরা শেখ মুজিবের মুল্যায়ন, বিচার করতে পারব না; অথবা কেন "৭১ বিপ্লব অসমাপ্ত", খামতি থেকে গেলো এই অভিযোগে আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব বা তাজউদ্দিনকে দায়ী করা একপেশে অবিচার হবে।
তবে আমরা অনেকে হয়ত আওয়ামী লীগ বা এর নেতাদের "শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতা" আবিস্কার করে নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার শান্তনামূলক উপাদানও পেতে পারি।
যদিও এটাকে আমি আপনার মত "চিন্তার দাসত্ব" নয়, চিন্তার অসততা হবে বলে মনে করি।

এসব নিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে কোথাও লেখার ইচ্ছা আমার আছে। "একাত্তরে চীন কেন আমাদের সমর্থন করতে পারে নাই" - এই শিরোণামে আমার পোষ্টের শেষে মন্তব্য আকারে তার কিছু অংশ লিখেছিলাম; কিন্তু পোষ্ট করার আগেই তা হারিয়ে যায় ফলে তা আর কোথাও আলোর মুখ দেখেনি। আগামিতে কোথাও সে কথা তুলে ধরব।

১০. ১২ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ৯:০৭
নুরুজ্জামান মানিক বলেছেন: "তবে আমরা অনেকে হয়ত আওয়ামী লীগ বা এর নেতাদের "শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতা" আবিস্কার করে নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার শান্তনামূলক উপাদানও পেতে পারি।
যদিও এটাকে আমি আপনার মত "চিন্তার দাসত্ব" নয়, চিন্তার অসততা হবে বলে মনে করি।"

আমি নিজেও একে চিন্তার অসততাই মনে করি । চিন্তার দাসত্ব আমি ব্যবহার করেছি অন্য কারনে , আপনি নিশ্চয় বুঝেছেন । আকল মন্দ মে ইশারায় কাফি ।
১৫ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ৩:৩১

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ মানিক।

১১. ২২ শে এপ্রিল, ২০১০ দুপুর ২:২৩
নাজনীন১ বলেছেন: আপনার একেকটা পোস্ট পড়া মানে, নতুন একেকটা ডাইমেনশানে কোন কিছুকে দেখতে পাওয়া। তাজউদ্দীনের ভারতের সাথের চুক্তি নিয়ে আমার মনে কিছু জিজ্ঞাসা ছিল, তার কিছু সম্ভাব্য জবাব পেয়ে গেলাম এ পোস্ট পড়ে। অনেক ধন্যবাদ।
২২ শে এপ্রিল, ২০১০ বিকাল ৩:১৭

লেখক বলেছেন: সব কিছুই নির্ভর করে পাঠক কেমন, তাঁর আগ্রহ ও মানের উপর। এই অর্থে আমি পাঠকের তৈরি, পাঠক তৈরি করে লেখক। ভাইসভারসা।

আপনি লেখাটা আগে দেখেন নি জানতাম না। ধন্যবাদ নাজনীন১।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৮১৫ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
পাঠ ও মন্তব্যের জন্য সকলকে স্বাগতম।
কোন পুরানো পোষ্টেও নির্দ্বিধায় মন্তব্য করতে পারেন; সাড়া পাবেন।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই