somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাসিনার ভারত সফর: ভারতের সন্ত্রাসবাদ ধারণা আমাদের বিরোধীতা করতে হবে

৩১ শে জানুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম পর্বের জন্য Click This Link

দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব:
ভারতের "আতঙ্কবাদ" বা টেররিজমকে আমেরিকার "ওয়ার অন টেররের" সাথে এক করে দেখার সুযোগ নিতে শুরু করায় ভারতের "টেররিজমের" আন্তর্জাতিকায়ন ঘটেছে। ফলাফলে সাক্ষ্যাৎ হাতেনাতে পরিবর্তনে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দিক থেকে ভারত রাষ্ট্র একটা সামরিক রাষ্ট্রের আকার নিয়েছে, এর হিংস্র দাঁত নখ উদোম হয়ে গেছে। এতো গেল বাইরের চোখে দেখা দিক। কিন্তু আভ্যন্তরীণভাবে, ভিতর ভিতরে এতে যা ঘটেছে তা আরও মারাত্মক বিপদজনক ঘটনা। রাষ্ট্র গঠনে এক গুরুত্ত্বপূর্ণ উপাদান হলো জনগোষ্ঠির গাঠনিক সামাজিক বেনুনি (social fibre) যার বন্ধনে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিতর দিয়ে সমাজ টিকে থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়টা কেবল একটা সামরিক ধারণা নয়। সমাজের আভ্যন্তরীণ গঠন প্রকৃতি, গাথুনি, কমিউনিটি হারমনি - এসবই দেখে শুনে ঠিকঠিক রাখা, কাউকে নষ্ট করতে না দেয়া, নিজে নষ্ট না করা, বরং যত্ন নেওয়া - রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দিক থেকে খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ। সমাজের আভ্যন্তরীণ গঠন প্রকৃতি, গাথুনি, কমিউনিটি হারমনি ঠিক না থাকলে ঐ রাষ্ট্র আজ অথবা কাল মারাত্মক নিরাপত্তার সঙ্কটে পড়তে বাধ্য। এবং রাষ্ট্র নিরাপত্তার সঙ্কটে পড়ে গেলে, এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রাষ্ট্রকে সরাসরি সামরিক ব্যারাক বানিয়ে ফেললেও তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। কারণ সমস্যাটা সামরিক নয়, ফলে এটা সামরিকভাবে কিছু করে সেই ঘাটতি, অভাব মিটানো সম্ভব নয়। সামাজিক গাঠনিক সমস্যা একমাত্র আবার সামাজিক নতুন গাথুনি দিয়ে সমাধান সম্ভব। কিন্তু কাজটা একদিনে বা এক বছরে অর্জন করে ফেলার বিষয় নয়, আবার আগের জায়গায় একে ফিরানো যাবে কি না সে বিষয় আছে - ফলে কোন বুদ্ধিমান সচেতন রাজনীতি সহসা সমাজের আভ্যন্তরীণ গঠন প্রকৃতি, গাথুনি, কমিউনিটি হারমনি বিষয়ক জনগোষ্ঠির গাঠনিক সামাজিক বেনুনিতে (social fibre) যেন হাত না লাগে এব্যাপারে কঠোর সচেতনতা দেখিয়ে থাকে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে ভারতের ক্ষেত্রে আমরা খোদ রাষ্ট্রকেই বেহুশি উপেক্ষায় একাজ করতে দেখছি। ওয়ার অন টেররের আমেরিকার জোটে অন্তর্ভুক্তির পর থেকে সে একেবারে কাছাখোলা বেপরোয়া।
এশিয়ায় আমেরিকার চীন ঘেরাওয়ের কুটনীতিতে ভারত তার নিজ অর্থনৈতিক যোগ্যতা সামর্থ তাকে যে কুটনৈতিক-সামরিক ক্ষমতা দেয় তারচেয়ে বেশি ক্ষমতা প্রকাশ সে শুরু করেছে আমেরিকান আশীর্বাদ ও চাড় কাঠি হাতের নাগালে আসায়। সামর্থ যোগ্যতার চেয়ে বেশি আয়ের চাকুরি পেলে চাকুরিজীবীর মত তার দশা। এই ক্ষমতা কিভাবে খরচ ব্যবহার করবে তা এমনই এক নেশায় পেয়ে বসেছে, মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল অবস্হার মত, বলপ্রয়োগে সে সবসমস্যা সামলে নিবে - এমন এক মিথ্যা আত্মবিশ্বাস তাকে পেয়ে বসেছে। আগে তার টেররিজমের ব্যাখ্যায় সীমা পার কী আতঙ্কবাদ বলে ইসলাম বা মুসলমানের দিকে সরাসরি আঙুল না তুলেও পাকিস্তানকে দায়ী করে সেটা চলতে পারছিল। কিন্তু ওয়ার অন টেরর যে ইসলাম (মুসলমান) আর পাকিস্তান - এই দুয়ের আবছা পর্দা তাকে আর রাখতে দেয়নি (দেবার কথাও না), সরাসরি ইসলাম বা মুসলমান নাগরিক সবাইকে রাষ্ট্রের শত্রু বানিয়ে ফেলেছে।
ওয়ার অন টেররের সাথে মিলন হবার আগে ভারতের "সীমা পার কী আতঙ্কবাদ" - টেররিজমের এই ব্যাখ্যা ইসলাম প্রসঙ্গে মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই - এই প্রত্যক্ষ মানে থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল; বড় জোড় ওখানে প্রমিনেন্ট ছিল সীমা পারের পাকিস্তান। কিন্তু ওয়ার অন টেররের সাথে মিলনের পর এই পার্থক্য বা ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেনি। রাখা সম্ভবও ছিল না, এই পরিস্হিতিতে রাখা সম্ভবও নয় - এমন সিদ্ধান্তে ভারত রাষ্ট্র ও তা নীতিনির্ধারকেরা পৌছে যায়। ভারতের প্রায় ১৩ ভাগ জনসংখ্যা ইসলাম ধর্ম চর্চা করে। কিন্তু ওয়ার অন টেররের সাথে নিজের "আতঙ্কবাদ" বা টেররিজম মিলন ঘটিয়ে ওর ভিতর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেখতে চাইলে ইসলাম বা নিজের মুসলমান জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়ে যাওয়া ঠেকানোর কোন সুযোগ আর থাকে না - এই গুরুত্ত্বপূর্ণ সেনসেটিভ দিকটা ভারত মারাত্মকভাবে উপেক্ষা করেছে। হিন্দু মুসলমানের বিভক্তির স্মৃতিতে জন্ম নেয়া ভারত রাষ্ট্র মুসলমানেরাও ভারতের নাগরিক হতে পারে - একথা মেনে নিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল। নাগরিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানেরা হিন্দুদের সমান অর্থে ভারতের নাগরিক। অথচ রাষ্ট্রের তথাকথিত নিরাপত্তা ভাবনায় নিজের "আতঙ্কবাদকে ওয়ার অন টেররের সাথে মিলিয়ে এমন একাকার করে নেয়া হলো ফলে ওর ইসলাম বিরোধীতায় নিজের মুসলমান জনগোষ্ঠির সাথে সমাজে যে বন্ধনে জড়িয়ে আছে একে হুমকির মুখে ফেলে হচ্ছে। ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক গুরুত্ত্বপূর্ণ উপাদান - জনগোষ্ঠির গাঠনিক সামাজিক বেনুনিই (social fibre) ধংস করে ফেলা হচ্ছে - রাষ্ট্রেরই নিরাপত্তার কথা বলে। অথচ খোদ সামাজিক বেনুনিটাকে ভেঙ্গে দেওয়া - এটাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে দূর্বল ও ভঙ্গুর করে ফেলার পক্ষে এক মারাত্মক আত্মধ্বংসী পদক্ষেপ - এটা কারও খেয়ালে রইল না। পরিণামে মানুষের ইসলামী নাম বা কোন মুসলিম অধ্যুসিত এলাকার ভারতেরই নাগরিক সবাই রাষ্ট্রের আচার আচরণ, উচ্চারণে একএকজন ভয়ঙ্কর সন্দেহভাজন শত্রু বলে গণ্য হতে শুরু করেছে। কাশ্মিরের নিরাপত্তা সমস্যায় অবলীলায় সরকারী কর্মসূচি নিয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠির মাঝে অস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে - এটা নাকি মুসলমানদের হাত থেকে হিন্দুদের রক্ষা করবে, নিরাপত্তা দিবে। এরপরেও উভয় কমিউনিটিকে কিভাবে একসাথে ভারত রাষ্ট্র প্রতিনিধিত্ত্ব করতে পারে - এই সাধারণ প্রশ্নও কাউকে তাড়িত করেনি। সারা ভারতীয় সমাজে এর প্রভাব কী পড়বে, সামাজিক কমিউনিটি হারমনি কি করে বজায় থাকবে বলে রাষ্ট্র আশা করে? ভারতীয় মুসলমান সমাজের নিরাপত্তাজনিত হতাশা পয়দা করে - ভারতীয় রাষ্ট্র কি করে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এই সাধারণ বিবেচনাও সেখানে কাজ করেনি বলাই বাহুল্য।
ভারত রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই নিজ জনগোষ্ঠির কোন অংশকে বৈরী করে রেখে নিজের নিরাপত্তা আশা করতে পারে না; রাষ্ট্র নিরাপত্তা বিষয়ে যার অআকখ জ্ঞান আছে এমন যে কোন নিরাপত্তা পরিকল্পকই এটা বুঝতে পারেন। তাহলে রাষ্ট্রের এই মরিয়া প্রচেষ্টা কেন? কারণ আমেরিকার সাথে নিরাপত্তা জোটে অংশগ্রহণের সুযোগ দেখে নীতিনির্ধারকরা পাগল হয়ে গেছেন। চীনকে ঘিরতে আমেরিকাকে চাঁড় কাঠি হিসাবে ব্যবহার করে এশিয়ার ক্ষমতা দানব হওয়ার স্বপ্ন এরা বিভোর হয়ে গেছে। তুলনায় ভারতীয় মুসলমানদের কী হলো, সামাজিক বেনুনিই (social fibre) এতে ধংস হলো না থাকলো - এসব একেবারেই যেন তুচ্ছ বিষয়। ভাবটা এমন, দানব বিশ্ব ক্ষমতায় একবার আসীন হতে পারলে পিটিয়ে সব ঠিক করে ফেলা যাবে।
এর পরিণতি দেখার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। আপাতত উপরের বর্ণনায় আমরা দেখলাম সামরিক দানব হয়ে উঠা ভারত রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা ভাবনা ও কি কি নিরাপত্তা সঙ্কট, সমস্যা নিজের জন্য তৈরি করেছে।

এই পরিস্হিতিতে হাসিনার ভারত সফরে যৌথ ঘোষণা ১৭ নম্বর পয়েন্টে ভারতের টেররিজম ও রাষ্ট্র নিরাপত্তা সম্পর্কিত ভাবনা, যা নিয়ে উপরে এতক্ষণ আলোচনা করলাম, সেই তথাকথিত "সন্ত্রাসবাদের" ভাবনার সাথে একমত হয়ে যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে এসেছেন। ঘোষণা ১৭ নম্বর পয়েন্টের গুরুত্ত্ব বিবেচনা করে প্রথমে তা এখানে আগে হুবহু তুলে দিলাম, নীচে অনুবাদ করছি।
17. Both Prime Ministers condemned terrorism in all its forms and manifestations. They noted that security remained a priority for both countries, as terrorists, insurgents and criminals respect no boundaries. They underscored the need for both countries to actively cooperate on security issues. Both leaders reiterated the assurance that the territory of either would not be allowed for activities inimical to the other and resolved not to allow their respective territory to be used for training, sanctuary and other operations by domestic or foreign terrorist/militant and insurgent organizations and their operatives.

উভয় প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদকে ওর সব ধরণের রূপ ও প্রকাশকে নিন্দা জানাচ্ছে। তাঁরা নজর করেছেন, টেররিষ্ট, (বিচ্ছিন্নতাবাদী) বিদ্রোহী ও ক্রিমিনাল কোন সীমানা মানে না বলে উভয় দেশের কাছে নিরাপত্তা একটা প্রাধিকার বিষয় হয়ে আছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে উভয় দেশের সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা দরকার বলে তাঁরা জোর অনুভব করছেন। উভয় নেতা পুনর্বার আশ্বাস দিচ্ছে যে কারও ভুখন্ড অন্যের জন্য অবন্ধুসুলভ হয় এমন তৎপরতায় ব্যবহারের অনুমতি দিবে না এবং এমন সমাধানমূলক সিদ্ধান্ত নিবে না যাতে যার যার ভুখন্ড টেররিষ্টদের ট্রেনিং, পালিয়ে থাকার শান্তির আশ্রয়স্হল, এবং নিজস্ব বা বাইরের টেররিষ্ট/মিলিট্যান্ট ও বিদ্রোহী সংগঠন ও তাদের পরিচালনাকারীদের কর্মক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

প্রথম কথা হলো, ভারতের সীমা পার কী আতঙ্কবাদের "সন্ত্রাসবাদ" এবং পরে যা ইসলাম বিদ্বেষী ওয়ার অন টেররের মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে - এই "সন্ত্রাসবাদের" সংজ্ঞায় "সন্ত্রাসবাদ"কে নিন্দা জানানো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী ও স্বার্থ নয়; বাস্তবতাও নয়। এই সমস্যা যারা সৃষ্টি করছে, তাঁরা নিজ জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ত্ব নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগী হবার বদলে দীর্ঘদিন ধরে কেবল উপেক্ষা, নির্মম নিপীড়নের পথ ধরে ফেলে রেখেছিল; নিজ নিজ রাষ্ট্রের পরিচালিত নীতির কর্মফল হিসাবে যারা নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে ভালনারেবল, দুর্বিষহ হুমকির সম্মুখীন করেছে, নিজ রাষ্ট্রের সামাজিক গাথুনি যারা বেপরোয়াভাবে নষ্ট করেছে - এর সমস্ত দায় একমাত্র তাদের, অন্য কারও নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্র, জনগণের তো নয়ই - প্রশ্নই আসে না। বরং এই দুঃসহ পরিস্হিতিতে কেবল "সন্ত্রাসবাদের" দিকে আঙুল তুলে নিন্দা জানানো মানে ভারতের তাবৎ রাষ্ট্রনীতির অপকর্ম ও উপেক্ষা নিস্পেষণের রাজনীতিকে স্বীকৃতি দেয়া ও দায় নেয়া - এবং সেই সব দায়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেও ভারতের কাতারে ফেলে ভালনারেবল, দুর্বিষহ হুমকির সম্মুখীন করা। ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে যাওয়া, তৈরি করা ওর শত্রুদের অবিবেচকের মত কোন প্রয়োজন, লজিক ছাড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শত্রু ঘোষণা করে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এতে। এছাড়া এতে ইসলাম বিদ্বেষী ওয়ার অন টেররের মধ্যে অহেতুক বাংলাদেশকে সামিল করে নিজেদের ৮৫ ভাগ জনগোষ্ঠিকে খামোখা খেপিয়ে তোলা হয়েছে: সমস্ত জনগণকে এই "সন্ত্রাসবাদের" চোখে আগেই একএকজন সন্দেহভাজন তালেবান, আলকায়েদা, সন্ত্রাসী বলে বিবেচনার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর নীট পরিণতি আমেরিকান ড্রোন যুদ্ধজাহাজ উপহার নিয়ে পাকিস্তানের মত একটা ভেঙ্গে পড়া রাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়া - এই চিত্র আমরা কল্পনাতেও আনতে পারি না; এটা চরম আত্মঘাতি, বেকুবি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দিকে তাকালে আমরা দেখব সে ওয়ার অন টেররের ভাড়া খাটা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে কিন্তু আমেরিকা বা বিশেষ করে ভারতের পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীতে কোন সহানুভুতি সে যোগাড় করতে পারেনি, অথচ পরিহাস হলো, ওদের হয়েই সে যুদ্ধ করছে আবার ওদেরই ঘৃণা সে নিজের জন্য অর্জন করছে।

সাধারণ সার্বজনীন অর্থে কেবল নীতিগতভাবেও বাংলাদেশের আমরা "সন্ত্রাসবাদের" নিন্দা জানাতে পারি না। মনে রাখতে হবে আমাদের জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ত্ব আদায়ের কী কষ্টকর রক্তপাত আত্মত্যাগের সশস্ত্র পথে আমাদের পাকিস্তান নিপীড়ক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও তার সেঙ্গাত জামাতের চোখে আমরা সন্ত্রাসবাদীই ছিলাম। ফলে আমরা হাড়ে হাড়ে জানি "সন্ত্রাসবাদ" - এই বয়ান কীভাবে কখন তৈরি হয়, কাদের বিরুদ্ধে তা ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হয়।
কাজেই পাকিস্তান রাষ্ট্র ও তার সেঙ্গাত জামাতের চোখে যে "সন্ত্রাসবাদী" পরিচয় আমাদের জন্য ছিল গৌরবের, মুক্তির সংগ্রাম আন্দোলন - একে নীতিগতভাবে নিন্দা জানানোর আত্মঘাতি কাজে নিজের পিঠে ছুরি মারার প্রশ্নই উঠে না। ঢাকার বিচ্ছু বাহিনী, জাহানারা ইমামের সন্তান বিখ্যাত রুমি ও তাঁর অগণিত সহযোদ্ধা, যে খালেদ মোশাররফ এইদলকে গুরুত্ত্বপূর্ণ ও নির্ধারক হয়ে উঠতে সব বাধা উপেক্ষা করে সহযোগিতা করেছিলেন - এদের অপমানিত করার কোন অধিকার আমাদের নাই। কিন্তু এরা সবাই পাকিস্তান রাষ্ট্র ও তার সেঙ্গাত জামাতের চোখে "সন্ত্রাসবাদী" পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন। ফলে কাকে আমরা সন্ত্রাসবাদ বলব? ওর সব ধরণের রূপ ও প্রকাশকে নিন্দা করব? খোদ নিজের জন্ম পরিচয় কে? আর এরপর আমরা আমাদের প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের গল্প শুনাব? এর চেয়ে বড় ঠাট্টা, নিজের সাথে তামাশা, প্রতারণা আর কি হতে পারে?
শেখ হাসিনা জাতিতে নিয়ে এসব তামাশা, অপমান করবেন, সারাক্ষণ মুক্তিযুদ্ধকে পকেটে রেখে সওদায় নামবেন আর মুখে বলেবেন - প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি সন্ত্রাসবাদকে ওর সব ধরণের রূপ ও প্রকাশকে নিন্দা জানাচ্ছেন? - এই অধিকার শেখ হাসিনাকে আমরা কেউ দেইনি, দিতে পারি না, নিজেকে নিজে অপমান করতে পারি না। হাসিনা নিজে আমেরিকা ও ভারতের ওয়ার অন টেররের ভাড়াটে সৈনিক হতে চাইতে পারেন ওতে তার ব্যক্তিস্বার্থ খুজে পেতে পারেন হয়ত - আমরা সেক্ষেত্রে কেবল খোদা হাফেজ, আসসালামায়কুম বলে হাত ছেড়ে দিতে পারি। এর সাথে বাংলাদেশের মানুষের কোনই স্বার্থ-সম্পর্ক নাই, থাকতে পারে না।

ভারত ও বাংলাদেশ দুটা আলাদা রাষ্ট্র। ভারত রাষ্ট্র কোন নীতিতে, স্বার্থে কাকে নিজ রাষ্ট্রের শত্রু বানাবে সে সিদ্ধান্ত একান্তই তার নিজের। সিদ্ধান্ত যেমন নিজের - আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করে তার যেমন সিদ্ধান্ত নেবার দায় নাই সেটা অযাচিতও বটে ফলে সেসব সিদ্ধান্তের কোন দায়ভারও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাই।
ভারতের তার শত্রু, কাকে টেররিষ্ট বলবে, কে তার চোখে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী হয়ে উঠবে এগুলো তার নিজ সিদ্ধান্ত ও কর্মফলের ব্যাপার; এমন কোন সার্বজনীন নৈতিক সিদ্ধান্তও নয় সেগুলো। ফলে ভারতের স্বার্থের চোখ দিয়ে দেখে এদেরকে আমাদের রাষ্ট্রের জন্য একই সংজ্ঞায় ফেলে নিজেদেরও শত্রু বিবেচনা করার আহাম্মকি করারও কোন বাস্তবতাও নাই, দায়ও নাই।

দিল্লীতে sanctuary নেয়া হাসিনা আজ sanctuary এর বিপক্ষে:
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হওয়ার সময়ে শেখ হাসিনা স্বামীসহ জার্মানীতে ছিলেন। জার্মানীতে সেসময় রাষ্ট্রদুত ছিলেন পেশাদার কুটনীতিক ও পরে স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। সেসময় পিতা পরিবারহারা শেখ হাসিনা উনার বহু সহযোগিতা পেয়েছিলেন। উনারই ব্যক্তিগত দুতয়ালীতে অচিরেই শেখ হাসিনা ও তাঁর স্বামী সেসময় সেফ হেভেন বা নিরাপদ আশ্রয়স্হল হিসাবে ভারতে জায়গা পেয়েছিলেন। তারপর থেকে ১৯৮১ সালের ১৭ মে, গৃহবধু পরিচয় থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে দেশে ফিরে আসার আগে পর্যন্ত তিনি ভারতের আশ্রয়েই ছিলেন।
শেখ হাসিনার পুরা পরিবারকে যেখানে নিশংসভাবে মেরে ফেলা হয়েছে ঐরকম পরিস্হিতিতে যে কোন জীবিত সদস্য মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরী জীবনে বেঁচে থাকার মত একটা নিরাপদ আশ্রয়। নিরাপত্তা, সহায়-হীন সে সময়ের কথা চিন্তা করলে আমরা আমাদের সংবেদনশীল মনে কষ্টে আপ্লুত না হয়ে পারি না। হাসিনার ভাগ্য ভাল, ঐ দুর্দিনের আশ্রয়ে নিরাপত্তাই শুধু নয়, আহার সংস্হানের একটা ব্যবস্হাও পেয়েছিলেন তিনি। নইলে আরও খারাপ, বাজে অভিজ্ঞতার কথা আজ আমাদের জানতে হত হয়ত। ভারতের সেই মানবিক সিদ্ধান্তকে আমাদের মানবিক সংবেদনশীল মনগুলোর পক্ষ থেকে প্রশংসা করি, বিনীত শ্রদ্ধা জানাই।
শেখ হাসিনা কার মেয়ে, শেখ মুজিব বাংলাদেশের জন্য ভাল লোক ছিলেন না মন্দ লোক ছিলেন, রসিদ-ফারুকদের ঐ হত্যাকান্ড সঠিক না বেঠিক ইত্যাদি - সব বিবেচনার উর্ধে - একজন জানের নিরাপত্তাহীনতায় আশ্রয় খুঁজছেন তাকে স্রেফ নিরাপদ বেঁচে থাকার আশ্রয় দিতে হবে - এটাই ছিল সেই গভীর মানবিক দিক এবং ভারত সে মানবিক দিকে সাড়া দিতে পেরেছিল। এটাই ঘটনার মুখ্য বিবেচনার বিষয়। ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এসব ক্ষেত্রে মানবিক কর্তব্যের দিকটা সবার উপরে স্হান দিয়ে বহু আশ্রয়দানের ঘটনার উদাহরণ আমরা দেখতে পাব।

এখন একটা কাল্পনিক সিনারিও ভেবে নেওয়া যাক। ফারুক-রসিদ মোশতাক ক্ষমতায় থাকার সময় ধরা যাক ভারতের সরকার বদল হয়েছিল; যার অনেক আগেই শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রয় পেয়েছিলেন। এখন যদি মোশতাক ভারতের নতুন সরকারের কাছে হাসিনাকে ফেরত দেবার দাবী করে বসতেন, যুক্তি দিতেন, হাসিনার কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র অস্হিতিশীল হবার নিরাপত্তা বিপদে আছে, সে ক্রিমিনাল, ওকে হেফাজতে নিয়ে বিচারের ব্যবস্হা করা দরকার - তাহলে আমরা সে পরিস্হিতির সুরাহা কেমন দেখতাম। ধরা যাক ভারতের নতুন সরকার জবাবে বলল, কোন বন্দি বিনিময় চুক্তি নাই যেহেতু তাই আমরা হস্তান্তর করতে পারছি না; আপনারা নিজে এসে গোপনে হাসিনাকে নিয়ে যান আমরা সহায়তা করব, অথবা আমরা বর্ডার পার করে ছেড়ে দিব আপনারা যা করতে ভাল মনে করেন কইরেন।

বাস্তবে ফিরে আসি। না, এক্ষেত্রে আমাদের সৌভাগ্য এমন অমানবিক ঘটনা পরিস্হিতি আমাদের দেখতে হয় নাই। এটা বাস্তবে ঘটে নাই।

কিন্তু আজ বাস্তবে ঐ মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে, উপরের ঐ ১৭ নম্বর পয়েন্টে। শেখ হাসিনা কোন বিদ্রোহীকে sanctuary অর্থাৎ স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্হল দিতে রাজি না বলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একমতের কাগজে স্বাক্ষর করে এসেছেন। যে হাসিনার জীবনে এমন সব খারাপ দিন এসেছিল যে নিরাপত্তা আশ্রয়ের খোঁজে বের হওয়া, আহার সংস্হান সেতো অনেক পরের বিষয় ওদিকে স্বজন হারানোর শোক প্রকাশ করাও বিলাসিতার মত - এমন কঠিন জীবন অভিজ্ঞতা যার আছে তিনি কী করে ঐ ১৭ নম্বর পয়েন্ট স্বাক্ষর করেন আমি বুঝতে সত্যিই অক্ষম।
ঐ ১৭ নম্বর পয়েন্ট বলছে হাসিনা ভারতের সাথে একমত হয়ে বলছেন, কাউকে sanctuary অর্থাৎ নিরাপদ আশ্রয়স্হল দিবেন না। সেই হাসিনারই কোন মানবিক বোধ থাকবে না, উনি কারও জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্হল হয়ে উঠতে পারবেন না, আহার আশ্রয়ের ব্যবস্হাটুকু করতে পারবেন না; তিনি করবেন না।
আমরা নির্বাক হয়ে যাই। কী আর বলব। পাঠককে শুধু বলব, মানবিক গুণ হারানো মানুষ আল্লার দুনিয়ার সবচেয়ে বিপদজনক এক অস্তিত্ত্ব।
কে কখন কার দ্বারা টেররিষ্ট, বিদ্রোহী, ক্রিমিনাল বা আমার রাষ্ট্রের নিরাপত্তার শত্রু বলে ঘোষণা খেতাব পাবেন তা কে বলতে পারে? পাঠক, হাসিনাকেই উদাহরণ হিসাবে দেখুন। উনি সরাসরি রাজনীতিক না হলেও নিস্তার পাননি। আমার সবাই যে কেউ, যে কোন সময় নিজের জানের নিরাপত্তাহীন হতেও পারি - দিন কে দিন এই কঠোর বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের বাস কর‌তে হচ্ছে।

আমি সত্যিই বুঝতে পারি না, সেই শেখ হাসিনা কী করে এই কাগজে স্বাক্ষর করতে পারেন। নিজেকে শান্তনা দিতে ভেবেছিলাম হয়ত হাসিনা সেকথা ভুলে গিয়েছেন। মানুষ তো কতকিছু ভুলে যেতেই পারে। কিন্তু না, এক পত্রিকা সবিস্তারে আমাদের জানিয়েছেন হাসিনার সফরে রাষ্ট্রীয় কাজের ফাঁকে সোসালাইজেশনের সময় হাসিনা কিভাবে কাদের সাথে সময় কাটিয়েছেন। ওখান থেকে আমরা জানলাম, হাসিনার সেই ছয় বছরের আশ্রয়প্রার্থী জীবনের কথা, স্মৃতি তিনি রোমন্থন করেছেন ভারতের মন্ত্রী প্রণব মুখার্জির স্ত্রীর সাথে এবার ব্যক্তিগত সময় কাটাবার সময়। আমরা এও জানতে পারলাম, প্রণব মুখার্জির স্ত্রীর সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক সেই দুর্দিনের সময় থেকে।

এর মানে আমরা জানতে পারলাম, হাসিনা সেই জ্বলজ্বলে স্মৃতি জাগরুক অবস্হায় ঠান্ডা মাথার মানবিক খুনির মত এই স্বাক্ষরের কাজ করে এসেছেন।

হায় আমি! লাভের ক্ষতি হলো আমার। একটা শান্তনা পেতে পেতেও হারিয়ে ফেললাম। মানবিক হাসিনাকেও বাঁচাতে পারলাম। তিনি মৃত।
১৭টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×