অতনু তিয়াস / মনীষা তোমাকে
মনীষা, তোমাকে শ্মশানে দেবো না
পৃথিবী জাগার আগেই শবদেহ কাঁধে নিয়ে নেমে যাবো পথে
নরলোকে প্রায়শ্চিত্ত বলে যদি প্রচারিত হয়, হোক
তবুও মনীষা, তোমাকে শ্মশানে দেবো না
তুমি চলে গেছো তবু নির্লিপ্ত প্রত্যঙ্গে ফুটে আছে উজ্জ্বল প্রেমের উৎপল
তোমার চোখে মুখে ঠোঁটে স্তনে অজস্র কথার মঞ্জরি
যেন এইমাত্র হাসতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছো
আধবোজা চোখের কোণে জমে আছে প্রশান্ত হ্রদ
আবহমান কাল ধরে সাঁতরে সাঁতরে অকস্মাৎ থেমে গেছো
একান্ত রাজহাঁস
ঈপ্সিত শবদেহ কাঁধে নিয়ে অনন্ত ভ্রমনে যাবো বিশ্বচরাচর
স্থানে স্থানে খসে পড়বে এক একটি অঙ্গের শিল্পিত কথা
তোমার প্রত্যঙ্গ দিয়ে পৃথিবীর খাতা ভরে
লিখে দেবো মৃত্যুহীন প্রেমের কবিতা!
অনন্ত সুজন / চিত্র
বিকেলকে আমি বাগান মনে করি
ধরা যাক__ হঠাৎ উদিত পথে কারো
পায়ের আওয়াজ চিত্রল রেখা ফেলে
পরিত্যক্ত ধুলোর জ্বালা বাড়িয়ে দেয়
তা থেকে যে আগুন উঠে আসে
তার বিস্তার নিয়ে রচিত হয় বসন্তগান
কেউ কি জানে, এভাবেই এসেছিল ঋতু
এই তথ্য দূর থেকে বিরচিত হলে
হাওয়াকেই নির্ভর জেনে-চিরকাল
উড়েছে হরিৎ প্রজাপতি।
ইমরান মাঝি / জেলিফিস
মনে হয় ঘূর্ণিঝড়ের টানে মটমট ভেঙে পড়ছে আমার বাড়ির গাছপালা। জলেরা জলের দেহে গড়িয়ে পড়লে ফুল হয়ে যায়। ফলে চাঁদের আলোকেই বৃষ্টি বলে ভুল করতে চায় মন। এইদিকে বড় শান্তিতে আছে চাঁদ। বালির উপর দিয়ে অসংখ্য গুটি গুটি আলোর পায়ে হেঁটে যায় সমুদ্রের দিকে। মনে হয় একেকটা মেঘ এসে ঘসে দিয়ে জলের অঙ্গে লুকিয়ে থাকা কোনো জাহাজের জানালার কাচ আর তাতে বিষন্ন মুখ দেখা এক আদিম রূপসী। যাকে মাছ হয়ে দেখছি এখন আমি। বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়েছি রেইন কোটগুলো খুলে রেখে। দেখি এতে সাপ কোথা থেকে এলো আমাদের সাগরের পাড়ে। তখন কোনো পাথরের সঙ্গে বারি খেয়ে ভেঙে গেলে কাচ-রূপসী মুছে যায়। ফলে নিজেকে আমার সমুদ্রে আটকে থাকা কোনো জেলিফিস মনে হয় যা জানাল দিয়ে ঢুকে পড়েছিলো জাহাজের অভ্যন্তরে।
এমরান কবির / মহিলাপুলিশ
কীসের যেন ছায়া থাকে
পোশাকের মধ্যে
প্রতিবিম্বহীন
বৃক্ষ খুঁজি বস্তু খুঁজি
নিশিদিন
শহরে শহরে কেন বেড়ে যায় এত বিবমিষা!
নহরে নহরে দেখা যায় তবু অন্য মনীষা
এত যে গুপ্তলীলা___ আজ থেকে তুমি রয়ে যাও থানা
ব্যক্তির মধ্যে তোমার আত্মায় কে দেবে হানা
বেড়েছে আজ এত যে বাজ কেউ কি তা জানে
চোখের মধ্যে হাতকড়া নাচে নেই কোনো এর মানে!
এ শহরের প্রান্তরে___
তোমাকে দেখলে___ বড্ড চোর হতে ইচ্ছে করে।
নির্লিপ্ত নয়ন / প্রণতি, সমুদ্রপ্রবাদ
বৃষ্টির গোপন বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে এখনে, চোখে চোখে;
কতকাল চোখের ভেতর পৃথিবীর বিষণ্ণ ডায়েরিগুলো___ শাদা
সমুদ্রকে ডেকে আনে শুধু
লোনাজল আর হাড়ের পাঁজরে, দেহে
বৃষ্টি, অবিরাম বৃষ্টিপাত
বয়ে যাচ্ছে সমুদ্র-ফেরত বৃষ্টির ভাইবোন
চোখগুলো...
ওপাশে জানালায়, অধীর শব্দ। এক পৃষ্ঠা ডায়েরি লিখতে বসে
সবাই দেখ কী রকম ভিজে একসা
স্ব-স্ব সমুদ্র্র লুকোতে গিয়ে
নিজের দেহকেই ছুড়ে ফেলছি!
রক্তপ্রবাহে চলে এক ঘন্টার ঘড়ির কাঁটা...বিমর্ষ বৃষ্টিপাত
এখন শেষ বাক্যে, স্তব্ধ তার পাশে কে যেন
লিখল: সমুদ্র, খুব বেশি দূরে নয়
ফেরদৌস মাহমুদ / বৃষ্টি অথবা টাইপমেশিনের আওয়াজ
দুঃস্বপ্নের মধ্যে একটি রেলগাড়ি
হুইসেল বাজিয়ে ঘুম ভাঙায়
চোখ মেলে দেখি
দাদিমা ধান খাওয়াচ্ছেন
ক্যালেন্ডারে আঁকা মুরগিগুলোকে,
আর আমাদের নাম্বার প্লেটে
ডিমের কুসুম সেজেছেন শেষ বিকেলের সূর্য।
কাঁটাচামচ হাতে তুলে
টেবিলের উপর চাঁদওয়ালা সন্ধ্যাকে নামাই,
অয়েল-কথে আঁকা একদল আপেল জীবন্ত হয়ে
সারা ঘরে নেচে বেড়ায় টেনিস বলের মতো।
দুঃস্বপ্নরা খেতে চায় আপেলগুলোর গাছের পাতা।
বিজয় আহমেদ / শীতের কবিতা
শুনছো তো এ শীতকালে, খেজুরবাগানের উষ্ণতা হতে
উড়ে আসা বেপেরোয়া গন্ধের মায়ার সাথে
ঝগড়া করছে তোমার বউ
তোমার বউ,
যে মূর্খ-সুন্দরী এবং কামগন্ধময়
যে কফিতে ঠোঁট ডুবিয়েই ভুলে যায় গ্রামÑরঙধনুর স্মৃতি
বলো তার কেন এক মিহিন-মুগ্ধ
ঝগড়া আর বিবাদ
খেজুর বাগানের উষ্ণতার সাথে?
মাহমুদ শাওন / সন্দেহ
পাশাপাশি দাঁড়ানো প্রতিবেশী বাড়িটির মতো হাত ধরাধরি
করে কোথাও একটা দেয়াল উঠে গেছে আমাদের।
শুধু পাখিগুলো ওড়ে আর ঝড়ে তার নড়ে ওঠে বুক।
শৌখিন ডানা, জানা-অজানার সকল পথে ফেলে গেছে তার
হারানো উড়–লিপি।
আবার ঝড়ে তার সাথে দেখা হলে একটা পালক এঁকে দেব___
যা গত শীতে, দূর কোনও শীতের দেশে ফেলে এসেছে পাখি।
শুধু একটা পালক তার পরিচয় নিয়ে সারাটা দিনের শেষে
একা একা ব্যবধান এঁকে দিয়ে গেল।
মৃদুল মাহবুব / বর্ণমালা দোষ
বহুবার আকাশ থেকেই নেমে এলো পিরামিড
উড়ন্ত ঘোড়ার পাখার পালকে লেগে আছে
পৃথিবীর মতো হাজারে হাজার সোনা-ধুলো
আমারও ইচ্ছা ছিলো সমস্ত বিমূর্ততার জল কিংবা স্রোত ভুলে
আঁধার-আকাশ ভাঙা নত্র-নদীর তীরে আমার যুদ্ধাস্ত্র তলিয়ে দিয়ে
আবার পিছন ফিরে দেখি___
ঐ তো ডলফিন; বিরল অদেখা মাছ___ ধুমকেতু; ওর পুচ্ছে পোড়া
ভূগোলের লোহিত সাগর।
আমি লিখে যেতে চাই শেষ বিষণ্ণতা
আর কেউ লিখবে না এমন___
আর কোনো শিশু লিখবে না বর্ণমালা দোষ; সীমিত ইতিহাস
সফেদ ফরাজী / অনেক দুঃখের দিন
অনেক দুঃখের দিনের শেষে, প্রকৃত গানের
মর্ম বেজে ওঠে___ উন্মাদের বর্মের নিচে
উত্তুঙ্গ কোলাহলে, হারিয়ে যাওয়া কোনো ভোর
ছোবলের দাগ প্রাণে, এ সুর শুনতে পায়:
তখন বিষাদ-পাহাড়ের অহেতু বাতাস বয়___
আকাশের নিশ্বাস থেকে ঝরে পড়ে হাতঘড়ি ও চাকু,
দুর্বোধ্য ছদ্দবেশে, চংক্রমিত;
আর এদিকে আশ্চর্য পাখি এক___ গানের মগ্নতা ভেঙে
উড়ে যায়; উড়ে___
হয়তো অস্পষ্ট হতে হতে তার ছায়াটিই একদিন
উজ্জ্বল-সুর___ উন্মাদ করে আরেক পৃথিবীকে!
সুমন সাজ্জাদ / পরম
গান গেয়ে উড়ে যায় পাখি, সুরের কলঙ্ক শুধু
লেগে থাকে টিলা-পাহাড়ের দেশে। আর যারা
শোনে তারা দেখে___ এক দিগন্ত সর্ষেক্ষেতের
পারে নেচে ওঠে ধানপরি। এর থেকে বহুদূর
চলে গিয়ে কেউ কেউ মাটির গন্ধ পাবে বলে
মাটিতেই নামে বহুবার___ পাখির স্বভাবে।
যে-সুর ফেলে গেছে পাখি, যে-পালকে লেখা
হলো রতির অর, তারই কিছু মাধুরী স্মারক আজ
পড়ে আছে বহুমুখ; আর তাই টিলা-পাহাড়ের
দেশে উদিত হলো আজ জোছনাবাড়ি, মাঠে
মাঠে উড়ে যায় গ্রীবার গুঞ্জর; এর থেকে বহুদূর
চলে গিয়ে ফিরে এসে দেখি; এখানে পরম,
আজ এখানে পরম...গান গেয়ে উড়ে যায় পাখি,
সুরের কলঙ্ক শুধু লেগে থাকে টিলা-পাহাড়ের দেশে
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৫:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


