আরেক রকমকের বিজ্ঞানী আছেন, যারা মানুষের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন। তারা হলেন নৃ-তত্ত্ববিদ। তার মানুষ এবং হবহু মানুষের মতই দেখতে এক প্রজাতির প্রাণি (হোমিনিড বা বনমানুষ) নিয়ে গবেষণা করেন। তারা ওই সব প্রাণির এক জনের হাড়-হাড্ডি আরেক জনেরটার সাথে তুলনা করে বোঝার চেষ্টা করেন, তাদের অঙ্গবিন্যাস আর মস্তিষ্কেকর গঠণ কীভাবে বদলাচ্ছিলো।
মাত্র ৫,৫০০ বছর আগে থেকে মানুষেরা ইতিহাস লিখে রাখতে শুরু করেছে। আমরা অধিকাংশ মানুষই মনে করি, তখন থেকেই আমাদের ইতিহাসের শুরু। সে যাই হোক, ইতিহাসের এই শুরুটা মানব জাতির বিশাল ইতিহাসের গায়ে এটা আঁচড়ের দাগ মাত্র। নৃ-তত্ত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা অনুসন্ধান করে বের করেছেন যে, মানুষের ইতিহাস ৪.৪ মিলিয়ন বছরের পুরনো।
আজকের সমাজে, আমার যে সব প্যাকেটজাত খাদ্য বা অষুধ ব্যবহার করে থাকি, সেগুলোর প্যাকেটে গায়ে একটা তারিখ লেখা থাকে। ওতে একটা মেয়াদ বোঝানো হয়, বলা হয় : এই নির্দিষ্ট তারিখের পর এটা আর ব্যবহার করা নিরাপদ হবে না।
কিন্তু প্রাচীন মানুষের যে সব জীবাশ্ম ও ছাপচিত্র পাওয়া যায়, সেগুলোর গায়ে সেই ধরনের কোনও তারিখ লেখা নেই। কাজেই নৃতত্ত্ববিদ বা প্রত্নতত্ত্ববিদের মত বিজ্ঞানীরা কীভাবে বুঝবে যে, এই ছাপচিত্রটা ঠিক কোন সময়ের বা জীবাশ্ম যে প্রাণিটার সে কত দিন আগে বেঁচে ছিলো? সেই জন্য, তাদেরকে এগুলোর সঠিক সময়কাল নির্ণয় করতে কিছু অনুসন্ধান পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়।
প্রাচীনকালের জীবাশ্ম এবং মানুষের তৈরি হাতিয়ারের সময়কাল নির্ণয় করতে, বিজ্ঞানীরা বিশেষ এক পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে, রেডিওকার্বন গণনা পদ্ধতি বা কার্বন-তেজস্ক্রিয় গণনা পদ্ধতি। জগতের সকল প্রাণীর দেহেই উচ্চমাত্রার কার্বন থাকে। অন্যান্য উপাদানের সাথে কার্বন মিশে এক জটিল যৌগ হিসেবে প্রাণীদেহ গঠিত। পৃথিবীতে সকল কার্বনই তেজস্ক্রিয় নয়, খুব স্বল্প কিছু ক্ষেত্রেই এর তেজস্ক্রিয়তা লক্ষ করা যায়। প্রাণীদেহেও খুব স্বল্প পরিমাণ তেজস্ক্রিয় কার্বন থাকে।
কোনও প্রাণী মারা গেলে, সেই প্রাণীদেহ নতুনভাবে আর কার্বন গ্রহণ করতে পারে না। মাটিতে সম্পূর্ণ মিশে না যাওয়া পর্যন্ত মৃতদেহে কার্বন থাকে আর কোনও প্রাণি যদি মৃত্যুর পর জীবাশ্মে পরিণত হয়, তা হলে সেই জীবাশ্মে সব সময়ই কার্বন থেকে যাবে।
তেজস্ক্রিয় কার্বন কমে যেতে থাকে একটা নির্দিষ্ট হার মেপে মেপে। অর্থাৎ প্রতি বছর মোট কী পরিমাণ কার্বন কমে যায়, তার একটা নির্দিষ্ট হিসেব আছে। জীবাশ্মের ওই কমে যাওয়া কার্বনের হিসাব থেকেই বিজ্ঞানীরা তার জীবাশ্মে পরিণত হবার সময়কাল বের করে থাকে।
সময়কাল নির্ধারন বা গণনার এই পদ্ধতি কেবল সেইসব দ্রব্য-সামগ্রী ও জীবাশ্মের ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়, যেগুলে ৫০,০০০ বছরের চেয়ে বেশি প্রাচীন নয়। যাই হোক, বিজ্ঞানীরা অবশ্য আরও কিছু উপাদানের ক্ষয়-প্রাপ্তিকে বিবেচনায় নিয়ে ২.২ বিলিয়ন বছরের প্রাচীনতম নিদর্শনেরও সময়কাল নির্ণয় করতে পারেন।
ব্যবহৃত এইসব পদ্ধতি যে একদম নিখুঁত, এমনটা বলা চলে না। তবে, দিন দিন এই পদ্ধতিগুলো অনেকটাই উন্নত আর নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে। আর এগুলোই এখনও পর্যন্ত মানুষের হাতে ব্যবহৃত শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি বলে গণ্য হচ্ছে।
(ক্রমশ...)
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ সকাল ৯:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



