somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট্টমণিদের জন্য মানুষের ইতিহাস-২

২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ সকাল ১১:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হোমিনিডস
------------
মানুষের মতই দেখতে এক ধরনের প্রাণী যারা মানুষের মতই সোজা হয়ে হাঁটাচলা করতো, তাদেরকে হোমিনিড বা চলতি কথায় বন-মানুষ বলা হয়। ধারণা ও বিশ্বাস করা হয়, আদি-পর্বের হোমিনিড বা বন-মানুষেরা প্রায় ৪.৪ মিলিয়ন বছর আগে আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আর্দ্র-বনভূমিতে বাস করতো। এইসব প্রাণী উচ্চতায় তিন থেকে পাঁচ ফুট আকৃতির হতো। এরা লতাপাতা, ফলমূল এবং মৃতপশুর মাংসাদি খেয়ে জীবন ধারণ করতো। তারা নিজেরা কোনও হাতিয়ার তৈরি করেছে, তমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে, এরা যে আত্মরক্ষার কাজে লাঠি ও মাটি খননের জন্য পশুর হাড়-গোড় ব্যবহার করতো সেটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রমাণিত।

নৃতাত্ত্বিকগণ হোমিনিডদের দেহের গড়ন আর জীবন যাপণ প্রণালীর ভিন্নতার কারণে, এদের আবার তিনটে শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। এদের প্রথমটাকে বলা হয় হোমো হ্যাবিলিস, যার অর্থ দাঁড়ায় 'সামর্থ্যবান ব্যাক্তি'।
বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে, এই শ্রেণীর বন-মানুষ বা হোমিনিডরা আজ থেকে ১.৫ মিলিয়ন বছর আগে পর্যন্ত টিকে ছিলো।

দ্বিতীয় রকমের বন-মানুষদের বলা হয় হোমো ইরেক্টাস, অর্থাৎ যারা 'সোজা হয়ে হাঁটে'। ১৫০,০০০ বছর আগে পর্যন্ত এদের অস্তিত্ব ছিলো।

হোমিনিডদের তৃতীয় ও সর্বশেষ শ্রেণীটিই হোমো স্যাপিয়েন্স বা আজকের মানুষ। আমরাই তারা, যারা আজও টিকে আছি এই দুনিয়ায়।

বরফ যুগ
---------
বিগত ২ মিলিয়ন বছরে পৃথিবী মোট চারবার দীর্ঘস্থায়ী ঠাণ্ডা জলবায়ুর ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে, যেগুলোর প্রত্যেকটাকেই বলা হয় বরফ-যুগ।

প্রতিটি বরফ-যুগেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে নিম্নগামী হয়েছে। ইকুয়েটরের কাছে মধ্য-অক্ষাংশে যখন উষ্ণতা, উত্তর ও দক্ষিণের দূরবর্তী অক্ষাংশ দুটিতে তখন প্রচণ্ড শীত। এই বিপরীতমুখি আবহাওয়ায় প্রাণীদের জন্য ঠিকে থাকা ছিলো খুবই কষ্টকর। এই সময় বড় ধরনের সব হিমবাহ বা তুষার স্রোত সৃষ্টি সৃষ্টি হচ্ছিল, যেগুলো হাজার হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে বরফে ঢেকে দিতো। এইসব বরফ জমাট বেঁধে গাছপালা ও প্রাণীদেরকেও জমিয়ে বরফ বানিয়ে ফেলতো। বরঢ জমতে জমতে সমুদ্রের পানির উপরিতলের উচ্চতা ৩০০ ফুট বেড়ে গিয়েছিলো। এতে স্থলভাগ ও সমুদ্র একাকার হয়ে যায় এবং বরফের সাঁকো তৈরি হয়ে দ্বীপাঞ্চল ও মহাদেশগুলো সংযুক্ত হয়ে ওঠে।

এই ধরনের শীতল তাপমাত্রার কারনে আদিম হোমিনিডেরা তাদের জীবন যাপনে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে হয় তাদেরকে মানিয়ে নিতে হয়েছে, নয়তো উষ্ণতার খোঁজে চলে যেতে হয়েছে অন্য কোনও এলাকায়। যারা এ দুয়ের কোনওটাই করতে পারেনি, তারা মারা পড়েছে। বরফের ব্রিজ তৈরি হবার ফলে আদি মানুষেরা এক জায়গা থেকে সহজেই আরেক জায়গায় চলে যেতে পেরেছে। যে সব নতুন ভূখণ্ডে অধিকাংশ মানুষ চলে গিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আমেরিকা, জাপান, মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শীতল আবহাওয়া পোষাকাদি সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিলো এবং বাধ্য হয়েই্ মানুষ মানুষ আগুনের ব্যবহার শিখেছিলো।

আদি মানব-সম্প্রদায়ের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আগ্রগতি হলো হাতিয়ারের উদ্ভাবন ও ব্যাবহার। প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে হাতিয়ারই মানুষকে চালকের আসনে বসিয়েছিলো। হাতিয়ারের ব্যবহার, শিকার করা, বাসস্থান নির্মাণ এবং আরও সব দরকারী কাজকে সহজতর করেছিলো। মানুষ প্রথমে পাথরের হাতিয়ার উদ্ভাবন ও ব্যবহার করতে শুরু করেছিলো। সে কারনেই, মানুষের লিখিত ইতিহাসের আগের এই সময়টাকে ইতিহাস রচয়িতারা নাম দিয়েছেন পাথর যুগ।

মানুষ যখন পাথরের তৈরি হাতিয়ার ব্যাবহার করতো, তারও আবার তিনটা উপ-বিভাগ আছে। ব্যবহৃত ওইসব হাতিয়ারের আকার-আকৃতি আর তীক্ষ্ণতা বিবেচনায় নিয়ে, বিজ্ঞানীরা, পাথর যুগকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এই যুগের প্রাথমিক দিকটাকে বলা হয় প্যালিওলিথিক যুগ বা প্রাচীন পাথর যুগ। হোমো হিবিলিসদের বানানো পাথরের হাতিয়ারের হাত ধরে, প্রাচীন পাথর যুগ শুরু হয়েছিল এখন থেকে প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগে এবং টিকে ছিলো আজ থেকে ১২,০০ বছর আগে পর্যন্ত। মেসোলিথিক যুগ বা মধ্য পাথর যুগের সূচনা হয় প্রায় ১২,০০ বছর আগে আর টিকে থাকে আজ থেকে ৮,০০০ বছর পূর্বে পর্যন্ত। সর্বশেষ পাথর যুগটাকে বলা হয় নিওলিথিক যুগ বা নব্য পাথরযুগ। এটা এখন থেকে ৮,০০০ বছর আগে শুরু হয়ে ৫,০০০ বছর আগে অব্দি টিকে ছিলো।

বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, হোমো হ্যাবিলিসরাই প্রথমে হাতিয়ার উদ্ভাবন ও ব্যবহার করতে শুরু করেছিলো। আজ থেকে ১.৫ মিলিয়ন বছর আগে এরা আফ্রিকা অঞ্চলে বসবাস করতো। তারা ছিলো দীর্ঘদেহী এবং মাথা বড় ও মগজের পরিমাণ বেশি। ধারণা করা হয়, এই আকৃতিগত দিকটার কারণে তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলো।

হোমো ইরেক্টাসরা ১.৬ মিলিয়ন বছর আগে থেকে আফ্রিকা এবং ইউরোপে বসবাস করতো আর ২৫০,০০০ বছর আগে পর্যন্ত টিকে ছিলো। তাদের মস্তিষ্কের আকৃতি ছিলো বৃহৎ। এতে সম্ভবত পরিবর্তিত আবহাওয়ায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়াটা সহজতর হয়েছিলো। বনভূমি, সমতল ভূমি এবং তৃণভূমিতেও এদের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে।

ইতিহাসবিদের বিশ্বাস হোমো ইরেক্টাসরা ফল-মূল সংগ্রহ করে খেতো। তবে এরা শিকার করতে শুরু করে এবং অনেক প্রজন্ম অব্দি শিকারে নিয়োজিত ছিলো। সেই সব শিকারের দিন গুলোতে, পুরুষেরা শিকারে যেতো আর নারীরা ঘরে থাকেতো, সন্তানদের দেখভাল করতো এবং গ্রহের আশেপাশের ফলমূল, শাক-লতাপাতা সংগ্রহ করতো।

পুরুষেরা মাংস জোগাড় করতে শিকারে যেতো। প্রথমে তারা কেবল সেইসব পশুই খুঁজতো যারা আগে থেকেই মরে গেছে। কালে কালে তারা হাতিয়ার তৈরি করতে শেখে। যেমন, বলা যেতে পারে, গদা মুগুর বা মাথা বাঁকানো লাঠি জাতীয় হাতিয়ারগুলোর কথা। ওগুলো দিয়ে তারা বনের পশুদের মারতে ও শিকার করতে পারতো।

আগুন উদ্ভাবনের ফলে আদি-মানুষের এই গোত্র প্রকৃতির সাথে আরও বেশি খাপ খাইয়ে নিতে শেখে এবং জীবন সংগ্রামে দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকে যায়। আগুন ব্যবহার করে তারা তাদের খাদ্য রান্না করতে পারতো, শীতে দেহের উষ্ণতা আনতো আর গুহাগুলোতেও নিরাপদে বসবাস করতে পারতো।

নিজেদের শরীরের উষ্ণতা বজায় রাখতে হোমো ইরেক্টাস গোত্রের মানুষ পোশাকের ব্যবহার শুরু করে। তারা মৃত পশুর চামড়া পরিধান করতো। সেগুলোকে আরও খানিকটা উন্নত করতে পেরেছিলো, এ কারনে যে, তারা চামড়াগুলোকে টুকরো করতে এবং একটা চামড়ার সাথে আরেকটা চামড়াকে সেলাই করে জুড়ে দিতেও শিখেছিলো।

যথেষ্ট প্রমাণাদি না থাকায়, প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা ঠিক কোন সময় আফ্রিকা ত্যাগ করে পৃথিবীর অন্যান্য এলাকায় চলে যায়, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদগণের মধ্যে অনেক মতভেদ দেখা দিয়েছে।

কিছু কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণাদি এমনটাই আভাস দেয় যে, হোমো হ্যাবিলিস গোত্রের মানুষেরাই সর্ব প্রথম আফ্রিকা ছেড়ে দুনিয়ার অন্য সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিলো।

হোমো ইরেক্টাস গোত্রের মানুষেরা যে, ১.৬ মিলিয়ন বছর আগেই আফ্রিকা থেকে দেশান্তরি হয়েছিলো, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পমাণাদি মিলেছে। প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তারা ৪৬০,০০০ বছর আগে এশিয়ায় এবং ৪০০,০০০ বছর আগে ইউরোপে পৌঁছে গিয়েছিলো।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ২:৪৯
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×